প্রভু, বলো বলো কবে/ Prabhu, bawlo bawlo kawbe/ Lord, I beseech you, tell me when

প্রভু,   বলো বলো কবে

তোমার    পথের ধুলার রঙে রঙে আঁচল রঙিন হবে।

              তোমার বনের রাঙা ধূলি  ফুটায় পূজার কুসুমগুলি,

    সেই ধূলি হায় কখন আমায় আপন করি’ লবে?

    প্রণাম দিতে চরণতলে  ধুলার কাঙাল যাত্রীদলে

    চলে যারা, আপন ব’লে চিনবে আমায় সবে॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1342
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1936
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

Lord, I beseech you, tell me when

My robes will turn red in the dust that rises from the path that leads to you

              The red dust in your forests takes the form of the blooms that I offer at your feet

    When will that dust alas accept me as one of its own?

    Those who journey to your feet, craving the dust as a blessing

    They too will then know me on sight.

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written: 1936
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link, to hear Suchitra Mitra:

https://www.youtube.com/watch?v=fwqJqoFcUSs

This entry was posted on September 4, 2014, in Prayer/Puja.

তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে/Alor awmol kawmolkhani ke phutaley/Who has helped this spotless lotus bloom with its petals of pure light

আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে,

নীল আকাশের ঘুম ছুটালে॥

আমার মনের ভাব্‌নাগুলি   বাহির হল পাখা তুলি,

ওই কমলের পথে তাদের সেই জুটালে॥

শরতবাণীর বীণা বাজে কমলদলে।

ললিত রাগের সুর ঝরে তাই শিউলিতলে।

তাই তো বাতাস বেড়ায় মেতে   কচি ধানের সবুজ ক্ষেতে,

বনের প্রাণে মর্‌মরানির ঢেউ উঠালে॥

রাগ: রামকেলী

তাল: দাদরা

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ফাল্গুন, ১৩৩৩

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1927

স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

diyas

Who has helped this spotless lotus bloom with its petals of pure light,

Who has rendered the blue skies sleepless?

My thoughts fly into that great yonder, their wings answering

The call of that wondrous lotus of light!

The season speaks, its words singing from the petals of the lotus,

That is why the shiuli sheds its blooms about its feet to the strains of Lalit

That is why the wind rises, playful among the young green heads of rice.

That is why the forest murmurs in joy, a wave running through its very heart.

Debabrata Biswas:

Raga: Ramkeli

Beat: Dadra

Bengali year: Phalgun, 1333

Written in 1927

Score: Dinendranath Tagore

ইঁদুরের ভোজ/ Indurer Bhoj/ A Feast for the Mice

ইঁদুরের ভোজ

ছেলেরা বললে, ভারি অন্যায়, আমরা নতুন পণ্ডিতের কাছে কিছুতেই পড়ব না।

নতুন পণ্ডিতমশায় যিনি আসছেন তাঁর নাম কালীকুমার তর্কালঙ্কার।

ছুটির পরে ছেলেরা রেলগাড়িতে যে যার বাড়ি থেকে ফিরে আসছে ইস্কুলে। ওদের মধ্যে একজন রসিক ছেলে কালো কুমড়োর বলিদান বলে একটা ছড়া বানিয়েছে, সেইটে সকলে মিলে চীৎকার শব্দে আওড়াচ্ছে। এমন সময় আড়খোলা ইস্টেশন থেকে গাড়িতে উঠলেন একজন বুড়ো ভদ্রলোক। সঙ্গে আছে তাঁর কাঁথায় মোড়া বিছানা। ন্যাকড়া দিয়ে মুখ বন্ধ করা দু-তিনটে হাঁড়ি, একটা টিনের ট্রাঙ্ক্‌, আর কিছু পুঁটুলি। একটা ষণ্ডাগোছের ছেলে, তাকে ডাকে সবাই বিচকুন ব’লে, সে চেঁচিয়ে উঠল– এখানে জায়গা হবে না বুড্‌ঢা, যাও দুসরা গাড়িতে।

বুড়ো বললেন, বড়ো ভিড়, কোথাও জায়গা নেই, আমি এই কোণটুকুতে থাকব, তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। ব’লে ওদের বেঞ্চি ছেড়ে দিয়ে নিজে এক কোণে মেঝের উপর বিছানা পেতে বসলেন।

ছেলেদের জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা, তোমরা কোথায় যাচ্ছ, কী করতে।

বিচকুন বলে উঠল, শ্রাদ্ধ করতে। বুড়ো জিজ্ঞাসা করলেন, কার শ্রাদ্ধ? উত্তরে শুনলেন, কালো কুমড়ো টাটকা লঙ্কার। ছেলেগুলো সব সুর করে চেঁচিয়ে উঠল–

কালো কুমড়ো টাটকা লঙ্কা

দেখিয়ে দেব লবোডঙ্কা।

আসানসোলে গাড়ি এসে থামল, বুড়ো মানুষটি নেমে গেলেন, সেখানে স্নান করে নেবেন। স্নান সেরে গাড়িতে ফিরতেই বিচকুন বললে, এ গাড়িতে থাকবেন না মশায়।

কেন বলো তো

ভারি ইঁদুরের উৎপাত।

ইঁদুরের? সে কী কথা।

দেখুন-না আপনার ঐ হাঁড়ির মধ্যে ঢুকে কী কাণ্ড করেছিল।

ভদ্রোলোক দেখলেন তাঁর যে হাঁড়িতে কদমা ছিল সে হাঁড়ি ফাঁকা। আর যেটাতে ছিল খইচুর তার একটা দানাও বাকি নেই।

বিচকুন বললে, আর আপনার ন্যাকড়াতে কী একটা বাঁধা ছিল সেটা সুদ্ধ নিয়ে দৌড় দিয়েছে।

সেটাতে ছিল ওঁর বাগানের গুটি-পাঁচেক পাকা আম।

ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন, আহা, ইঁদুরের অত্যন্ত ক্ষিদে পেয়েছে দেখছি।

বিচকুন বললে, না না, ও জাতটাই ওরকম, ক্ষিদে না পেলেও খায়।

ছেলেগুলো চীৎকার করে হেসে উঠল, বললে, হাঁ মশায়, আরো থাকলে আরো খেত।

ভদ্রলোক বললেন, ভুল হয়েছে, গাড়িতে এত ইঁদুর একসঙ্গে যাবে জানলে আরো কিছু আনতুম।

এত উৎপাতেও বুড়ো রাগ করলে না দেখে ছেলেরা দমে গেল– রাগলে মজা হত।

বর্ধমানে এসে গাড়ি থামল। ঘন্টাখানেক থামবে। অন্য লাইনে গাড়ি বদল করতে হবে। ভদ্রলোকটি বললেন, বাবা, এবারে তোমাদের কষ্ট দেব না, অন্য কামরায় জায়গা হবে।

না না, সে হবে না, আমাদের গাড়িতেই উঠতে হবে। আপনার পুঁটুলিতে যদি কিছু বাকি থাকে আমরা সবাই মিলে পাহারা দেব, কিছুই নষ্ট হবে না।

ভদ্রলোক বললেন, আচ্ছা বাবা, তোমরা গাড়িতে ওঠো, আমি আসছি।

ছেলেরা তো উঠল গাড়িতে। একটু বাদেই মিঠাইওয়ালার ঠেলাগাড়ি ওদের কামরার সামনে এসে দাঁড়ালো, সেইসঙ্গে ভদ্রলোক।

এক-এক ঠোঙা এক-একজনের হাতে দিয়ে বললেন, এবারে ইঁদুরের ভোজে অনটন হবে না।

ছেলেগুলো হুর্‌রে ব’লে লাফালাফি করতে লাগল। আমের ঝুড়ি নিয়ে আমওয়ালা এল — ভোজে আমও বাদ গেল না।

ছেলেরা তাঁকে বললে,আপনি কী করতে কোথায় যাচ্ছেন বলুন।

তিনি বললেন, আমি কাজ খুঁজতে চলেছি, যেখানে কাজ পাব সেখানেই নেবে পড়ব।

ওরা জিজ্ঞাসা করলে, কী কাজ আপনি করেন?

তিনি বললেন, আমি টুলো পণ্ডিত, সংস্কৃত পড়াই।

ওরা সবাই হাততালি দিয়ে উঠল; বললে, তা হলে আমাদের ইস্কুলে আসুন।

তোমাদের কর্তারা আমাকে রাখবেন কেন?

রাখতেই হবে। কালো কুমড়ো টাটকা লঙ্কাকে আমরা পাড়ায় ঢুকতেই দেব না।

মুশকিলে ফেললে দেখছি! যদি সেক্রেটারিবাবু আমাকে পছন্দ না করেন?

পছন্দ করতেই হবে– না করলে আমরা সবাই ইস্কুল ছেড়ে চলে যাব।

আচ্ছা বাবা, তোমরা আমাকে তবে নিয়ে চলো।

গাড়ি এসে পৌঁছল স্টেশনে। সেখানে স্বয়ং সেক্রেটারিবাবু উপস্থিত। বৃদ্ধ লোকটিকে দেখে বললেন, আসুন, আসুন তর্কালঙ্কার মশায়! আপনার বাসা প্রস্তুত আছে।

ব’লে পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলেন।

A feast for the mice

The boys said, ‘This is very wrong! We will not study under the new teacher at all.’

The name of the teacher newly appointed to the school was Kalikumar Torkalonkar or Black pumpkin, fresh chillies as the boys called him.

The boys were all coming back to school after their holidays by train. One of the humorous fellows had made up a rhyme called the sacrifice of the black pumpkin and they were all yelling it out loudly. At Arkhola, an old man boarded the train. He had with him his bedding wrapped in a quilt, a few terracotta pots sealed with cloth, a tin trunk and a few bundles. A stout boy whom the rest called Bichkun shouted at him, ‘There is no space here old man, go to another carriage.’

The gentleman answered, ‘It is very crowded, there is hardly any space; I will be out of your way in this corner.’ He then moved from their bench and spread his mat on a corner of the floor.

He asked the boys, ‘Sons, where are you going and why?’

Bichkun spoke up, ‘To a funeral.’

The old man asked, ‘Who died?’

‘Black pumpkin, fresh chillies!’

The boys shouted altogether, ‘Black pumpkin fresh chillies/We will teach him how to leave!’

When the train stopped at Asansol, the old man left the carriage to have a bath. When he came back after his bath, Bichkun said, ‘Do not stay in this carriage Sir.’

‘Why is that?’

‘It is infested with mice.’

‘What? Mice?’

‘See what they did in those pots of yours!’

The gentleman saw that the pot that had held sweets was empty and the one that had puffed sweet rice had not a grain left.

Bichkun said, ‘The mice even carried away the bundles you had.’

Those had contained a few mangoes from his own garden.

He smiled a little and said, ‘That is sad! The mice must have been hungry.’

Bichkun answered, ‘No! These are the kind that eat even if they are not hungry.’

The boys laughed loudly and said, ‘Yes Sir! They would have eaten it all if there had been more.’

He said, ‘It is my fault entirely! I would have brought much more if I had known there would be so many mice on the train.’

The boys soon became quiet when they saw he would not get angry no matter what; there is little fun in teasing someone who will not get annoyed.

The train arrived at Bardhaman and halted there for a couple of hours. The carriages had to be routed to another line. The gentleman said, ‘This time I will not pose a problem to you, there will be space in the other carriages.’

‘No, no! You must stay in our carriage. We will guard your bundles if there is anything left in them; nothing will happen.;

He answered, ‘Alright, get yourselves on the train, I am coming soon.’

The boys got on the train. A little later a sweetmeat vendor arrived at their carriage accompanied by the old gentleman.

He gave each of them a packet of sweets and said, ‘Now there should be no shortage at the feast for the mice.’

The boys all called out Hurrah! Then the mango seller came with his basket – there were mangoes too at the feast.

The boys asked, ‘Where are you going? Tell us please.’

He answered, ‘I am looking for work, I will simply get off the train wherever I can find a job.’

The boys asked, ‘What do you do?’

He said, ‘I am a Sanskrit teacher.’

They all clapped in happiness; ‘Then come to our school.’

‘Why would your authorities give me the job?’

‘They must employ you. We will not let Black pumpkin, fresh chillies enter the area.’

‘How can that be? What if the secretary does not like me?’

‘He must agree – or we will all stage a walk out!’

‘Okay, then you can take me.’

The train came and stopped at the station. The secretary was waiting there. He said to the old man, ‘Welcome,  Mr Black pumpkin, fresh chillies! Your house is ready.’

He then bent down to pay his respects.

আমি কান পেতে রই ও আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বারে বারে বারে/ Ami kaan petey roi o amar apon/ I listen carefully at the secret doors to my soul, again and again

আমি    কান পেতে রই      ও আমার   আপন হৃদয়গহন-দ্বারে   বারে বারে

কোন্‌   গোপনবাসীর কান্নাহাসির   গোপন কথা শুনিবারে–   বারে বারে ॥

ভ্রমর সেথা হয় বিবাগি   নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে,

কোন্‌   রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে   বারে বারে ॥

কে সে মোর   কেই বা জানে,   কিছু তার   দেখি আভা।

কিছু পাই   অনুমানে,   কিছু তার   বুঝি না বা।

মাঝে মাঝে তার বারতা   আমার ভাষায় পায় কি কথা রে,

ও সে   আমায় জানি পাঠায় বাণী   গানের তানে লুকিয়ে তারে   বারে বারে ॥

রাগ: বিভাস-বাউল

তাল: দাদরা

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২ শ্রাবণ, ১৩২৯

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৮ জুলাই, ১৯২২

স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Rabi baul

I listen carefully                            at the secret doors to my soul, again and again

To the whispers of the one who hides within as he tells me his secrets, again and again.

The bees are drunk with need              for the blue lotus that blooms all alone,

What night bird is it that sings, lonesome in the darkness, again and again?

Who knows what he means to me, I simply see his fleeting presence,

Sometimes I feel his breath around me, sometimes I hardly know him.

Do his messages find voice in my words sometimes?

I only know that he speaks to me, hiding his words in song, again and again.

*****

Raga: Bibhas Baul

Beat: Dadra

Written: 18th July, 1922

Score: Dinendranath Tagore

Follow the links:

Debabrata Biswas:

Sahana Bajpaie:

ছাত্রশাসনতন্ত্র/ Student Discipline: Excerpt

যেখান হইতে আমরা জ্ঞান পাই, সেখানে আমাদের শ্রদ্ধা যাইবে, এটা মানবপ্রকৃতির ধর্ম। তাহার উল্টা দেখিলে বাহিরের শাসনে এই বিকৃতির প্রতিকার করিতে হইবে, সে কথা সকলেই স্বীকার করিবেন।

কিন্তু প্রতিকারের প্রণালী স্থির করিবার পূর্বে ভাবিয়া দেখা চাই, স্বভাব ওল্টায় কিসে।

কাগজে দেখিতে পাই, অনেকে এই বলিয়া আক্ষেপ করিতেছেন যে, যে ভারতবর্ষে গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ ধর্মসম্বন্ধ সেখানে এমনতরো ঘটনা বিশেষভাবে গর্হিত। শুধু গর্হিত এ কথা বলিয়া পার পাইব না, চিরকালীন এই সংস্কার অস্থিমজ্জার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারে তাহার ব্যতিক্রম ঘটিতেছে কেন এর একটা সত্য উত্তর বাহির করিতে হইবে।

বাংলাদেশের ছাত্রদের মনস্তত্ত্ব যে বিধাতার একটা খাপছাড়া খেয়াল এ কথা মানি না। ছেলেরা যে বয়সে কলেজে পড়ে সেটা একটা বয়ঃসন্ধির কাল। তখন শাসনের সীমানা হইতে স্বাধীনতার এলাকায় সে প্রথম পা বাড়াইয়াছে। এই স্বাধীনতা কেবল বাহিরের ব্যবহারগত নহে; মনোরাজ্যেও সে ভাষার খাঁচা ছাড়িয়া ভাবের আকাশে ডানা মেলিতে শুরু করিয়াছে। তার মন প্রশ্ন করিবার, তর্ক করিবার, বিচার করিবার অধিকার প্রথম লাভ করিয়াছে। শরীর-মনের এই বয়ঃসন্ধিকালটিই বেদনাকাতরতায় ভরা। এই সময়েই অল্পমাত্র অপমান মর্মে গিয়া বিঁধিয়া থাকে এবং আভাসমাত্র প্রীতি জীবনকে সুধাময় করিয়া তোলে। এই সময়েই মানবসংস্রবের জোর তার ‘পরে যতটা খাটে এমন আর-কোনো সময়েই নয়।

এই বয়সটাই মানুষের জীবন মানুষের সঙ্গপ্রভাবেই গড়িয়া উঠিবার পক্ষে সকলের চেয়ে অনুকূল, স্বভাবের এই সত্যটিকে সকল দেশের লোকেই মানিয়া লইয়াছে। এইজন্যই আমাদের দেশে বলে: প্রাপ্তে তু ষোড়শে বর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ। তার মানে এই বয়সেই ছেলে যেন বাপকে পুরাপুরি মানুষ বলিয়া বুঝিতে পারে, শাসনের কল বলিয়া নহে; কেননা, মানুষ হইবার পক্ষে মানুষের সংস্রব এই বয়সেই দরকার। এইজন্যই সকল দেশেই য়ুনিভার্সিটিতে ছাত্ররা এমন একটুখানি সম্মানের পদ পাইয়া থাকে যাহাতে অধ্যাপকদের বিশেষ কাছে তারা আসিতে পারে এবং সে সুযোগে তাদের জীবনের ‘পরে মানব-সংস্রবের হাত পড়িতে পায়। এই বয়সে ছাত্রগণ শিক্ষার উদ্যোগপর্ব শেষ করিয়া মনুষ্যত্বের সার জিনিসগুলিকে আত্মসাৎ করিবার পালা আরম্ভ করে; এই কাজটি স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান ছাড়া হইবার জো নাই। সেইজন্যই এই বয়সে আত্মসম্মানের সম্বন্ধে দরদ বড়ো বেশি হয়। চিবাইয়া খাইবার বয়স আসিলে বেশ একটু জানান দিয়া দাঁত ওঠে, তেমনি মনুষ্যত্বলাভের যখন বয়স আসে তখন আত্মসম্মানবোটা একটু ঘটা করিয়াই দেখা দেয়।

এই বয়ঃসন্ধির কালে ছাত্ররা মাঝে মাঝে এক-একটা হাঙ্গামা বাধাইয়া বসে। যেখানে ছাত্রদের সঙ্গে অধ্যাপকের সম্বন্ধ স্বাভাবিক সেখানে এই-সকল উৎপাতকে জোয়ারের জলের জঞ্জালের মতো ভাসিয়া যাইতে দেওয়া হয়; কেননা, তাকে টানিয়া তুলিতে গেলেই সেটা বিশ্রী হইয়া উঠে।

বিধাতার নিয়ম অনুসারে বাঙালি ছাত্রদেরও এই বয়ঃসন্ধির কাল আসে, তখন তাহাদের মনোবৃত্তি যেমন এক দিকে আত্মশক্তির অভিমুখে মাটি ফুঁড়িয়া উঠিতে চায় তেমনি আর-এক দিকে যেখানে তারা কোনো মহত্ত্ব দেখে, যেখান হইতে তারা শ্রদ্ধা পায়, জ্ঞান পায়, দরদ পায়, প্রাণের প্রেরণা পায়, সেখানে নিজেকে উৎসর্গ করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠে।

জেলখানার কয়েদি নিয়মে নড়চড় করিলে তাকে কড়া শাসন করিতে কারও বাধে না; কেননা তাকে অপরাধী বলিয়াই দেখা হয়, মানুষ বলিয়া নয়। অপমানের কঠোরতায় মানুষের মনে কড়া পড়িয়া তাকে কেবলই অমানুষ করিতে থাকে, সে হিসাবটা কেহ করিতে চায় না; কেননা, মানুষের দিক দিয়া তাকে হিসাব করাই হয় না। এইজন্য জেলখানার সর্দারি যে করে সে মানুষকে নয়, আপরাধীকেই সকলের চেয়ে বড়ো করিয়া দেখে।

সৈন্যদলকে তৈরি করিয়া তুলিবার ভার যে লইয়াছে সে মানুষকে একটিমাত্র সংকীর্ণ প্রয়োজনের দিক হইতেই দেখিতে বাধ্য। লড়াইয়ের নিখুঁত কল বানাইবার ফর্মাশ তার উপরে। সুতরাং, সেই কলের হিসাবে যে-কিছু ত্রুটি সেইটে সে একান্ত করিয়া দেখে এবং নির্মমভাবে সংশোধন করে।

কিন্তু ছাত্রকে জেলের কয়েদি বা ফৌজের সিপাই বলিয়া আমরা তো মনে ভাবিতে পারি না। আমরা জানি, তাহাদিগকে মানুষ করিয়া তুলিতে হইবে। মানুষের প্রকৃতি সূক্ষ্ম এবং সজীব তন্তুজালে বড়ো বিচিত্র করিয়া গড়া। এইজন্যই মানুষের মাথা ধরিলে মাথায় মুগুর মারিয়া সেটা সারানো যায় না; অনেক দিক বাঁচাইয়া প্রকৃতির সাধ্যসাধনা করিয়া তার চিকিৎসা করিতে হয়। এমন লোকও আছে এ সম্বন্ধে যারা বিজ্ঞানকে খুবই সহজ করিয়া আনিয়াছে; তারা সকল ব্যাধিরই একটিমাত্র কারণ ঠিক করিয়া রাখিয়াছে, সে ভূতে পাওয়া।

এ হইল আনাড়ির চিকিৎসা। যারা বিচক্ষণ তারা ব্যাধিটাকেই স্বতন্ত্র করিয়া দেখে না; চিকিৎসার সময় তারা মানুষের সমস্ত ধাতটাকে অখণ্ড করিয়া দেখে; মানবপ্রকৃতির জটিলতা ও সূক্ষ্মতাকে তারা মানিয়া লয় এবং বিশেষ কোনো ব্যাধিকে শাসন করিতে গিয়া সমস্ত মানুষকে নিকাশ করিয়া বসে না।

অতএব যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা বা ড্রিল সার্জেণ্ট্‌ বা ভূতের ওঝা হওয়া তাদের কোনোমতেই উচিত হয় না ছাত্রদিগকে মানুষ করিবার ভার লওয়া। ছাত্রদের ভার তাঁরাই লইবার অধিকারী যাঁরা নিজের চেয়ে বয়সে অল্প, জ্ঞানে অপ্রবীণ ও ক্ষমতায় দুর্বলকেও সহজেই শ্রদ্ধা করিতে পারেন; যাঁরা জানেন, শক্তস্য ভূষণং ক্ষমা; যাঁরা ছাত্রকেও মিত্র বলিয়া  গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হন না।

ছাত্রদিগকে কড়া শাসনের জালে যাঁরা মাথা হইতে পা পর্যন্ত বাঁধিয়া ফেলিতে চান তাঁরা অধ্যাপকদের যে কত বড়ো ক্ষতি করিতেছেন সেটা যেন ভাবিয়া দেখেন। পৃথিবীতে অল্প লোকই আছে নিজের অন্তরের মহৎ আদর্শ যাহাদিগকে সত্য পথে আহ্বান করিয়া লইয়া যায়। বাহিরের সঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাতের ঠেলাতেই তারা কর্তব্য সম্বন্ধে সতর্ক হইয়া থাকে। বাহিরের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে বলিয়াই তারা আত্মবিস্মৃত হইতে পারে না।

এইজন্যই চারি দিকে যেখানে দাসত্ব মনিবের সেখানে দুর্গতি, শূদ্র যেখানে শূদ্র ব্রাহ্মণের সেখানে অধঃপতন। কঠোর শাসনের চাপে ছাত্রেরা যদি মানবস্বভাব হইতে ভ্রষ্ট হয়, সকলপ্রকার অপমান দুর্ব্যবহার ও অযোগ্যতা যদি তারা নির্জীবভাবে নিঃশব্দে সহিয়া যায়, তবে অধিকাংশ অধ্যাপকদিগকেই তাহা অধোগতির দিকে টানিয়া লইবে। ছাত্রদের মধ্যে অবজ্ঞার কারণ তাঁরা নিজে ঘটাইয়া তুলিয়া তাহাদের অবমাননার দ্বারা নিজেকে অহরহ অবমানিত করিতে থাকিবেন। অবজ্ঞার ক্ষেত্রে নিজের কর্তব্য কখনোই কেহ সাধন করিতে পারে না।

অপর পক্ষ বলিবেন, তবে কি ছেলেরা যা খুশি তাই করিবে তার সমস্তই সহিয়া লইতে হইবে? আমার কথা এই, ছেলেরা যা খুশি তাই কখনোই করিবে না। তারা ঠিক পথেই চলিবে, যদি তাহাদের সঙ্গে ঠিকমত ব্যবহার করা হয়। যদি তাহাদিগকে অপমান কর, তাহাদের জাতি বা ধর্ম বা আচারকে গালি দাও, যদি দেখে তাহাদের পক্ষে সুবিচার পাইবার আশা নাই, যদি অনুভব করে যোগ্যতাসত্ত্বেও তাহাদের স্বদেশীয় অধ্যাপকেরা অযোগ্যের কাছে মাথা হেঁট করিতে বাধ্য, তবে ক্ষণে ক্ষণে তারা অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করিবেই; যদি না করে তবে আমরা সেটাকে লজ্জা এবং দুঃখের বিষয় বলিয়া মনে করিব।

*****

That we will direct our respect towards the place where we derive our learning from is in the nature of mankind. Everyone will agree that if the opposite is seen the aberration must be rectified through external discipline.

But prior to deciding on the method of correction thought must be given to the reasons behind this change.

I see that many people are stating regretfully that such incidents are especially ruinous in a country like India where the relationship between guru and shishya borders on the religious. Merely calling them ruinous is not enough, one must look for the truth behind a change to behaviour that is contrary despite the tradition being embedded in our heritage.

I do not agree with the view that the psychology of the students of Bengal is the result of a whim on the part of nature. Young people study in college during a transitional part of their lives. They are taking their first steps from a framework of rules into an arena of freedom. This freedom is not merely limited to external behaviour, it is also the time when they spread their wings internally and leave the cage of words to test the skies of thought. Their minds have achieved the right to question, to debate, and to judge for the first time. This transitional phase of both bodies and minds is filled with pain. It is a time when the smallest slight pierces the soul and the slightest indication of affection fills life with joy. The effects of socializing with other people has the most effect during these times and never to this extent ever again.

This is the age which is the most suitable for molding a life under the influence of the others, every nation agrees with this truth about human nature. That is why it is said in our country: When the son attains the age of sixteen years, one must treat him like a friend. This means that sons of this age begin to see their fathers as human beings and not as vehicles of discipline; because one can grow best in the company of others at this age. That is why students in the universities across the world are given positions that accord them respect and allow them to approach professors and gain the benefit of social interactions. The students finish the preparatory stages of their education and are now about to make the essence of humanity their own; a task that cannot be achieved without freedom and self respect. This is why self respect is greatly treasured at this age. Just as teeth emerge with a little accompanying pain when the time is right for chewing one’s food, self respect too arrives with some excessive feelings when the age is appropriate for achieving adulthood.

Sometimes students get into strife at this age of transition. In those situations where the relationship between teachers and students are normal, these troubles wash away easily like flotsam before the tide; it is in fact unpleasant only when one attempts to pick at it with an eye at removal.

As per the laws of nature this age of transition arrives in the lives of Bengali students too; a point when their inclination is to go where their strength takes them and they feel strongly about committing themselves to greatness when they are rewarded with respect, knowledge and their souls receive inspiration.

When a prisoner breaks rules no one feels unable to discipline them severely; this is because they are seen only as offenders and not as people. The harshness of the punishment merely serves to harden him further and makes him subhuman but no one considers this; because no one considers the effects as affecting a human being. That is why the jails are supervised by people who do not see the human but consider his offence to be the true identity of the prisoner.

The person in charge of building an army is forced to consider people with one specific need in mind. His orders are to create an efficient war machine. Hence he sees only the faults that lie in the way of achieving this and having seen them proceeds to correct them with brutality.

But we must not think of students as prisoners or soldiers. We know that they must be molded into human beings. Human nature is delicate and constructed of intricately woven living strands. This is the very reason why a headache may not be cured by smashing the head in with a club; many things have to be considered before working with nature in order to heal it.

This then is the nature of treatment at the hands of the inexperienced. The experts never see the disease as a separate thing but consider the nature of the whole human being; they accept the complexities of human nature and do not do away with the entire human being in the name of attacking one particular disease.

Hence the person who was meant to be a jailor or a drill sergeant or an exorcist should never take up the job of instructing students in becoming humans. The only people fit to take responsibility for students should be those who can easily respect individuals who are younger than them, who know less than them and those who hold less power than them; those who have learned that forgiveness is an ornament to the strong; who are not afraid of accepting their students as their friends.

Let those who wish to bind students within bonds of strict rules also think about the great harm they do to the teachers. There are very few people on earth who can progress along the path of truth inspired by the great ideals within themselves. They are alerted to their responsibilities by the to-ing and fro-ing they undergo in their interactions with the outside. They never forget themselves because they are in complete understanding with their environment.

This is why masters are in danger wherever slaves exist, the high castes are fallen wherever the lower castes are suppressed. If students move from the rightful path as human beings under strict control, if they bear every kind of insult, ill treatment and injustice in silence and without protest, then most teachers will also be pulled down by this. They will see to their own downfall if they allow their students to become subjugated and subjects of derision. No one can carry out their own responsibilities in the face of derision.

The opposition will say, does that mean we must put up with everything that the young will do? To them I say, the young will never do whatever they please. They will walk along the right paths if they are treated properly. If you insult them, curse their race, religion or customs, if they see that there is little chance of getting fair treatment, if they see that their own teachers are forced to bow to others despite their own worth, then they will express their discontent at each moment; if they do not then we must think of it as a matter of shame and sadness.

রবিবার/ Robibar/Sunday

ছেলে মাকে গিয়ে বললে, ‘মা, দেবতাকে অনেককাল ছেড়েছি, এমন অবস্থায় আমাকে দেবতার ছাড়াটা নেহাত বাহুল্য। কিন্তু জানি বেড়ার ফাঁকের মধ্য দিয়ে হাত বাড়ালে তোমার প্রসাদ মিলবেই। ঐখানে কোনো দেবতার দেবতাগিরি খাটে না, তা যত বড়ো জাগ্রত হোন-না তিনি।’

মা চোখের জল মুছতে মুছতে আঁচল থেকে খুলে ওকে একখানি নোট দিতে গেলেন। ও বললে, ‘ঐ নোটখানায় যখন আমার অত্যন্ত বেশি দরকার আর থাকবে না তখনই তোমার হাত থেকে নেব। অলক্ষ্মীর সঙ্গে কারবার করতে জোর লাগে, ব্যাঙ্কনোট হাতে নিয়ে তাল ঠোকা যায় না।’

অভীকের সম্বন্ধে আরো দুটো-একটা কথা বলতে হবে। জীবনে ওর দুটি উলটো জাতের শখ ছিল, এক কলকারখানা জোড়াতাড়া দেওয়া, আর-এক ছবি আঁকা। ওর বাপের ছিল তিনখানা মোটরগাড়ি, তাঁর মফস্বল-অভিযানের বাহন। যন্ত্রবিদ্যায় ওর হাতেখড়ি সেইগুলো নিয়ে। তা ছাড়া তাঁর ক্লায়েন্টের ছিল মোটরের কারখানা, সেইখানে ও শখ ক’রে বেগার খেটেছে অনেকদিন।

অভীক ছবি আঁকা শিখতে গিয়েছিল সরকারী আর্টস্কুলে। কিছুকালের মধ্যেই ওর এই বিশ্বাস দৃঢ় হল যে, আর বেশিদিন শিখলে ওর হাত হবে কলে-তৈরি, ওর মগজ হবে ছাঁচে-ঢালা। ও আর্টিস্ট, সেই কথাটা প্রমাণ করতে লাগল নিজের জোর আওয়াজে। প্রদর্শনী বের করলে ছবির, কাগজের বিজ্ঞাপনে তার পরিচয় বেরল আধুনিক ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ আর্টিস্ট অভীককুমার, বাঙালি টিশিয়ান। ও যতই গর্জন করে বললে ‘আমি আর্টিস্ট’, ততই তার প্রতিধ্বনি উঠতে থাকল একদল লোকের ফাঁকা মনের গুহায়, তারা অভিভূত হয়ে গেল। শিষ্য এবং তার চেয়ে বেশি সংখ্যক শিষ্যা জমল ওর পরিমণ্ডলীতে। তারা বিরুদ্ধদলকে আখ্যা দিল ফিলিস্টাইন। বলল বুর্জোয়া।

অবশেষে দুর্দিনের সময় অভীক আবিষ্কার করলে যে তার ধনী পিতার তহবিলের কেন্দ্র থেকে আর্টিস্টের নামের ‘পরে যে রজতচ্ছটা বিচ্ছুরিত হত তারই দীপ্তিতে ছিল তার খ্যাতির অনেকখানি উজ্জ্বলতা। সঙ্গে সঙ্গে সে আর-একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিল যে অর্থভাগ্যের বঞ্চনা উপলক্ষ করে মেয়েদের নিষ্ঠায় কোনো ইতরবিশেষ ঘটে নি। উপাসিকারা শেষ পর্যন্ত দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে উচ্চমধুর কণ্ঠে তাকে বলছে আর্টিস্ট। কেবল নিজেদের মধ্যে পরস্পরকে সন্দেহ করেছে যে স্বয়ং তারা দুই-একজন ছাড়া বাকি সবাই আর্টের বোঝে না কিছুই, ভণ্ডামি করে, গা জ্বলে যায়।

অভীকের জীবনে এর পরবর্তী ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং অস্পষ্ট। ময়লা টুপি আর তেলকালিমাখা নীলরঙের জামা-ইজের প’রে বার্ন কোম্পানির কারখানায় প্রথমে মিস্ত্রিগিরি ও পরে হেডমিস্ত্রির কাজ পর্যন্ত চালিয়ে দিয়েছে। মুসলমান খালাসিদের দলে মিশে চার পয়সার পরোটা আর তার চেয়ে কম দামের শাস্ত্রনিষিদ্ধ পশুমাংস খেয়ে ওর দিন কেটেছে সস্তায়। লোকে বলেছে, ও মুসলমান হয়েছে; ও বলেছে, মুসলমান কি নাস্তিকের চেয়েও বড়ো। হাতে যখন কিছু টাকা জমল তখন অজ্ঞাতবাস থেকে বেরিয়ে এসে আবার সে পূর্ণ পরিস্ফুট আর্টিস্টরূপে বোহেমিয়ানি করতে লেগে গেল। শিষ্য জুটল, শিষ্যা জুটল। চশমাপরা তরুণীরা তার স্টুডিয়োতে আধুনিক বে-আব্রু রীতিতে যে-সব নগ্নমনস্তত্ত্বের আলাপ-আলোচনা করতে লাগল, ঘন সিগারেটের ধোঁয়া জমল তার কালিমা আবৃত করে। পরস্পর পরস্পরের প্রতি কটাক্ষপাত ও অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললে, পজিটিভ্‌লি ভাল্‌গর।

                                                                                     Sunday

The son went and said to his mother, ‘Ma, I have forsaken the gods a long time ago; thus their forsaking me now is completely unnecessary. But I know that I will receive your blessings whenever I reach through the gaps of the fence that separate us. No divine intervention will apply there, no matter how mighty they are.’

As she dried her eyes with her sari his mother untied a knot and tried to give him some money. He said, ‘I will take that money from you only when I have the very least need of it. One needs strength to deal with evil, one cannot keep up with banknotes in hand.’

 Here we have to say a couple of things about Abheek. He had two quite disparate hobbies; one was repairing machinery and the other was painting. His father had three cars which provided transport during his travels in the country. His initiation into mechanics was through these. His father also had a client who had a automobile factory and Abheek had voluntarily spent a lot of time there working for free.

 He had gone to study art at the Government Art School. Within a few days he began to firmly believe that if he continued to learn any longer his hand would become mechanical and his ideas manufactured by someone else. He began to prove that he was an artist in his own voice. Before an exhibition of his paintings, the newspapers wrote of him as modern India’s greatest artist Abheek Kumar, the Bengali Titian. The more he roared, ‘I am an artist!’ the more his words reverberated in the empty caves of some minds and the owners of those minds were overwhelmed. He became surrounded by devotees who were largely female. They called his detractors philistines and described them as bourgeois.

 But eventually when the dark times came, Abheek discovered that a great part of the glow surrounding his fame came from the light cast upon the artist’s name by the silvery sheen of his wealthy father’s bank account. He had also discovered that the devotion of women did not waver a great deal with the ebb of his financial fortunes. They called him an artist to the very end in loud sweet tones with widened eyes. But in private they each suspected the others of not really knowing anything about art at all, excluding themselves of course; the rest were all fakes who were to be abhorred.

 The next part of Abheek’s life story is lengthy and unclear. He worked as a mechanic and then as the head technician of Burn Company in a dirty cap and grease stained blue overalls. He ate cheaply with the Muslim labourers, buying meals of bread at four paise and meat that was not strictly allowed by the tenets of the scriptures for even less. People talked, saying he has converted to Islam; he asked them whether that was worse than becoming an atheist. When he had saved enough he returned from his exile to become an artist and lead a Bohemian lifestyle again. Young women in glasses began to discuss the explicit psychological advances of the time in a frank manner, their lack of shame hidden under a dense fog of cigarette smoke. They nodded at each other and pointed fingers declaring everyone else to be positively vulgar.

স্ফুলিঙ্গ/Sphulingo/ Embers

eternal

1

অজানা ভাষা দিয়ে

    পড়েছ ঢাকা তুমি, চিনিতে নারি প্রিয়ে!

কুহেলী আছে ঘিরি,

    মেঘের মতো তাই দেখিতে হয় গিরি।

Awjana bhasha diye

Porecho Dhaka tumi, chinitey nari priye!

Kuheli acche ghiri,

Megher mawto tai dekhitey hoy giri.

Unknown words

cover you till I know you not, beloved!

Mists all around,

Making each mountain seem like a cloud.

2

অতিথি ছিলাম যে বনে সেথায়

      গোলাপ উঠিল ফুটে–

“ভুলো না আমায়’ বলিতে বলিতে

      কখন পড়িল লুটে।

Otithee cchilam je boney shethay

Golap uthilo phutey -

‘Bhulo na amaay’ bolitey bolitey

Kawkhon porilo lutey.

In the forest where I wandered

There bloomed a rose delicate -

‘Forget me not’ she said to me

Before bowing her head to fate.

3

অত্যাচারীর বিজয়তোরণ

      ভেঙেছে ধুলার ‘পর,

শিশুরা তাহারই পাথরে আপন

      গড়িছে খেলার ঘর।

Otyacharir bijoytoron

Bhengeche dhular por,

Shishura tahari pathorey apon

Goricche khelar ghawr.

The triumphal arches of the tyrant

In the dust lie broken,

Children glean stones from that

Making play houses of their own.

4

অনিত্যের যত আবর্জনা

     পূজার প্রাঙ্গণ হতে

           প্রতিক্ষণে করিয়ো মার্জনা।

Awnityer jawto aborjona

Pujar prangon hotey

Protikkhoney koriyo marjona.

The useless ephemera of existence

From sacred ground

Remove at every instant.

5

অনেক তিয়াষে করেছি ভ্রমণ,

      জীবন কেবলই খোঁজা।অনেক বচন করেছি রচন,

      জমেছে অনেক বোঝা।

যা পাই নি তারি লইয়া সাধনা

      যাব কি সাগরপার?

যা গাই নি তারি বহিয়া বেদনা

      ছিঁড়িবে বীণার তার?

Awnek tiyashey korechi bhromon,

Jeebawn keboli khnoja. Awnek bawchon korechi rawchon,

Jomecche awnek bojha.

Ja paini taari loiya shadhona

Jaabo ki shagorpar?

Ja paini  taari bohiya bedona

Cchniribe beenar taar?

A great thirst has driven me

Through a life full of searching. Many are the words I have written.

And much have I collected on the way.

Will the striving for what never was mine

Walk me to the far shores?

Will the pain of not achieving them

Silence the music ever more?

মৃত্যুশোক/Mrityushok/ The pain caused by death

মৃত্যুশোক

 

ইতিমধ্যে বাড়িতে পরে পরে কয়েকটি মৃত্যুঘটনা ঘটিল। ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মা’ র যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অম্ভ্রপ।  অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন। কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়– তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে।” তখনই বউঠাকুরানী তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন– পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে- দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না– সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকন্যার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। বেলা হইল, শশ্মান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম– তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।

 

The pain caused by death

 

In the mean while a number of deaths had occurred at home. Prior to this I had never witnessed death. I was of a tender age when mother died. She had been ill for a long time and I had not known when her condition became life threatening. She had slept in a separate bed in the same room as us all this time. But while she was ill, she was once taken on a boat trip on the Ganges for a few days – and after her return she began staying in an inner room on the third floor. The night that she died we had been asleep; I do not know how late it was that an ancient maid rushed into our room and wailed out piteously, “Alas! You are all ruined!” My sister-in-law hurriedly scolded her and pulled her out of that room – she was fearful that the news would cause a great harm to our minds if given so abruptly at that hour. My heart suddenly sank as I woke up for a short while in the gloom of the dimmed lamp but I did not understand at all what had happened. When I woke in the morning and heard the news of her death I could not comprehend the full meaning of the words. I came to the outer verandah where her dressed body was lying on a cot. But the body bore no signs of the terrible nature of death — the death that I saw in the light of that dawn was as peaceful and serene as restful sleep. I could not see the difference between life and its ending very clearly. But when they carried her body out of the house through the main gate and we walked after her to the cremation ground a crescendo of grief seemed to crash upon the insides of my mind; a cry rose that said my mother would never walk back again through that door into that house ever again and take her own seat among the things that had been hers. When we returned from the cremation grounds, it was late; I looked at my father’s rooms on the third floor from the street and saw him – he was still sitting in meditation on the veranda that lay before his room.