তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তায় কেমনে/Aji Je Rajani Jaay Phiraibo Taay Kemone/

আজি        যে রজনী যায়   ফিরাইব তায় কেমনে।

              নয়নের জল ঝরিছে বিফল নয়নে॥

              এ বেশভূষণ লহো সখী, লহো,   এ কুসুমমালা হয়েছে অসহ–

                             এমন যামিনী কাটিল বিরহশয়নে॥

আমি        বৃথা অভিসারে   এ যমুনাপারে এসেছি,

বহি          বৃথা মন-আশা   এত ভালোবাসা বেসেছি।

শেষে        নিশিশেষে বদন মলিন,   ক্লান্তচরণ, মন উদাসীন,

                             ফিরিয়া চলেছি কোন্‌ সুখহীন ভবনে॥

ওগো        ভোলা ভালো তবে,   কাঁদিয়া কী হবে মিছে আর।

যদি          যেতে হল হায়   প্রাণ কেন চায় পিছে আর।

              কুঞ্জদুয়ারে অবোধের মতো   রজনীপ্রভাতে বসে রব কত–

                             এবারের মতো   বসন্ত গত জীবনে॥

রাগ: ভৈরবী-কীর্তন

তাল: রূপকড়া

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১৬ আষাঢ়, ১৩০০

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ২৯ জুন, ১৮৯৩

রচনাস্থান: শিলাইদহ

How do I turn it back this night that passes

              Tears brim from these unfulfilled eyes

              Take this finery from me and these jewels, even the garland feels unbearable

                             Such a night was spent in a lonely bed

I came on a tryst that came to nothing, on the banks of the Yamuna

I fear I have loved deeply in false hope

At night’s end, sad, exhausted and disappointed

                             I return to an unhappy home

It is then only fitting that I forget, why should I cry needlessly

I know I must leave, then why does my heart look to what I cast behind?

              At the gates to the grove how long must I wait unknowing, in the dawn

                             This fleeting spring is over in this life of mine.

Raga: Bhairavi Keertan

Beat: RupakRa

Written: 29th June, 1893

Written at: Silaidah

Follow the link to hear Ritu Guha:

http://youtu.be/D2tTKq7bg2M

Kanika Bandopadhyay:

http://youtu.be/5cS6yuT2BwY

অয়ি ভুবনমনোমোহিনী, মা/Ayi Bhuvanmonomohini/Hail mother who has enchanted the world,

অয়ি ভুবনমনোমোহিনী, মা,
অয়ি নির্মলসূর্যকরোজ্জ্বল ধরণী জনকজননিজননী ॥
নীলসিন্ধুজলধৌতচরণতল, অনিলবিকম্পিত-শ্যামল-অঞ্চল,
অম্বরচুম্বিতভালহিমাচল, শুভ্রতুষারকিরীটিনী ॥
প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে, প্রথম সামরব তব তপোবনে,
প্রথম প্রচারিত তব বনভবনে জ্ঞানধর্ম কত কাব্যকাহিনী।
চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য, দেশবিদেশে বিতরিছ অন্ন–
জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণা পুণ্যপীষুষস্তন্যবাহিনী ॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1303
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1896
স্বরলিপিকার: সরলা দেবী

Bharat_Mata

Hail, mother who has enchanted the world,
Hail this pure, sunbathed earth, mother of our fathers and mothers.
The blue seas wash your feet, your green robe trembles in the breeze,
Your forehead kisses the sky, the Himalayas a crown of white upon it.
The first dawn breaks in your skies, the first prayers were born in your hermitages,
So many beliefs, poems and stories were heard first in your forests.
Forever compassionate, you are blessed, granting your bounty to other nations -
Your rivers carry the sacred milk of kindness wherever they flow.

Raga: Bhairavi
Beat: Kaharba
Written: 1896
Score: Sarala Devi, his niece.

 

Follow the link to hear Hemanta Mukherjee:

http://youtu.be/YRfvX3AiLdM

কর্তার ভূত/ Kortar Bhuth/ The Master’s Ghost

কর্তার ভূত

বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠল, ‘তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে।’

শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাবলে, ‘আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে।’

তা ব’লে মরণ তো এড়াবার জো নেই। তবু দেবতা দয়া করে বললেন, ‘ভাবনা কী। লোকটা ভূত হয়েই এদের ঘাড়ে চেপে থাক্‌-না। মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের তো মৃত্যু নেই।’

দেশের লোক ভারি নিশ্চিন্ত হল।

কেননা ভবিষ্যৎকে মানলেই তার জন্যে যত ভাবনা, ভূতকে মানলে কোনো ভাবনাই নেই; সকল ভাবনা ভূতের মাথায় চাপে। অথচ তার মাথা নেই, সুতরাং কারো জন্যে মাথাব্যথাও নেই।

তবু স্বভাবদোষে যারা নিজের ভাবনা নিজে ভাবতে যায় তারা খায় ভূতের কানমলা। সেই কানমলা না যায় ছাড়ানো, তার থেকে না যায় পালানো, তার বিরুদ্ধে না চলে নালিশ, তার সম্বন্ধে না আছে বিচার।

দেশসুদ্ধ লোক ভূতগ্রস্ত হয়ে চোখ বুজে চলে। দেশের তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেন, ‘এই চোখ বুজে চলাই হচ্ছে জগতের সবচেয়ে আদিম চলা। একেই বলে অদৃষ্টের চালে চলা। সৃষ্টির প্রথম চক্ষুহীন কীটাণুরা এই চলা চলত; ঘাসের মধ্যে, গাছের মধ্যে, আজও এই চলার আভাস প্রচলিত।’

শুনে ভূতগ্রস্ত দেশ আপন আদিম আভিজাত্য অনুভব করে। তাতে অত্যন্ত আনন্দ পায়।

ভূতের নায়েব ভুতুড়ে জেলখানার দারোগা। সেই জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না। এইজন্যে ভেবে পাওয়া যায় না, সেটাকে ফুটো করে কী উপায়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।

এই জেলখানায় যে ঘানি নিরন্তর ঘোরাতে হয় তার থেকে এক ছটাক তেল বেরোয় না যা হাটে বিকোতে পারে, বেরোবার মধ্যে বেরিয়ে যায় মানুষের তেজ। সেই তেজ বেরিয়ে গেলে মানুষ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তাতে করে ভূতের রাজত্বে আর কিচ্ছুই না থাক্‌–অন্ন হোক, বস্ত্র হোক, স্বাস্থ্য হোক– শান্তি থাকে।

কত-যে শান্তি তার একটা দৃষ্টান্ত এই যে, অন্য সব দেশে ভূতের বাড়াবাড়ি হলেই মানুষ অস্থির হয়ে ওঝার খোঁজ করে। এখানে সে চিন্তাই নেই। কেননা ওঝাকেই আগেভাগে ভূতে পেয়ে বসেছে।

এই ভাবেই দিন চলত, ভূতশাসনতন্ত্র নিয়ে কারো মনে দ্বিধা জাগত না; চিরকালই গর্ব করতে পারত যে, এদের ভবিষ্যৎটা পোষা ভেড়ার মতো ভূতের খোঁটায় বাঁধা, সে ভবিষ্যৎ ভ্যা’ও করে না, ম্যা’ও করে না, চুপ করে পড়ে থাকে মাটিতে, যেন একেবারে চিরকালের মতো মাটি।

কেবল অতি সামান্য একটা কারণে একটু মুশকিল বাধল। সেটা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোকে ভূতে পায় নি। তাই অন্য সব দেশে যত ঘানি ঘোরে তার থেকে তেল বেরোয় তাদের ভবিষ্যতের রথচক্রটাকে সচল করে রাখবার জন্যে,বুকের রক্ত পিষে ভূতের খর্পরে ঢেলে দেবার জন্যে নয়। কাজেই মানুষ সেখানে একেবারে জুড়িয়ে যায় নি। তারা ভয়ংকর সজাগ আছে।

এ দিকে দিব্যি ঠাণ্ডায় ভূতের রাজ্য জুড়ে ‘খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো’।

সেটা খোকার পক্ষে আরামের, খোকার অভিভাবকের পক্ষেও; আর পাড়ার কথা তো বলাই আছে।

কিন্তু, ‘বর্গি এল দেশে’।

নইলে ছন্দ মেলে না, ইতিহাসের পদটা খোঁড়া হয়েই থাকে।

দেশে যত শিরোমণি চূড়ামণি আছে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা গেল, ‘এমন হল কেন।’

তারা এক বাক্যে শিখা নেড়ে বললে, ‘এটা ভূতের দোষ নয়, ভুতুড়ে দেশের দোষ নয়, একমাত্র বর্গিরই দোষ। বর্গি আসে কেন।’

শুনে সকলেই বললে, ‘তা তো বটেই।’ অত্যন্ত সান্ত্বনা বোধ করলে।

দোষ যারই থাক্‌, খিড়কির আনাচে-কানাচে ঘোরে ভূতের পেয়াদা, আর সদরের রাস্তায়-ঘাটে ঘোরে অভূতের পেয়াদা; ঘরে গেরস্তর টেঁকা দায়, ঘর থেকে বেরোবারও পথ নেই। এক দিক থেকে এ হাঁকে, ‘খাজনা দাও।’ আর-এক দিক থেকে ও হাঁকে, ‘খাজনা দাও।’

এখন কথাটা দাঁড়িয়েছে, ‘খাজনা দেব কিসে’।

এতকাল উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের বুলবুলি এসে বেবাক ধান খেয়ে গেল, কারো হুঁস ছিল না। জগতে যারা হুঁশিয়ার এরা তাদের কাছে ঘেঁষতে চায় না, পাছে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। কিন্তু তারা অকস্মাৎ এদের অত্যন্ত কাছে ঘেঁষে, এবং প্রায়শ্চিতও করে না। শিরোমণি-চূড়ামণির দল পুঁথি খুলে বলেন, ‘বেহুঁশ যারা তারাই পবিত্র, হুঁশিয়ার যারা তারাই অশুচি, অতএব হুঁশিয়ারদের প্রতি উদাসীন থেকো, প্রবুদ্ধমিব সুপ্তঃ।’

শুনে সকলের অত্যন্ত আনন্দ হয়।

কিন্তু, তৎসত্ত্বেও এ প্রশ্নকে ঠেকানো যায় না, ‘খাজনা দেব কিসে’।

শ্মশান থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হাহা ক’রে তার উত্তর আসে, ‘আব্রু দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।’

প্রশ্নমাত্রেরই দোষ এই যে, যখন আসে একা আসে না। তাই আরও একটা প্রশ্ন উঠে পড়েছে, ‘ভূতের শাসনটাই কি অনন্তকাল চলবে।’

শুনে ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি আর মাসতুতো-পিসতুতোর দল কানে হাত দিয়ে বলে, ‘কী সর্বনাশ। এমন প্রশ্ন তো বাপের জন্মে শুনি নি। তা হলে সনাতন ঘুমের কী হবে– সেই আদিমতম, সকল জাগরণের চেয়ে প্রাচীনতম ঘুমের?’

প্রশ্নকারী বলে, ‘সে তো বুঝলুম, কিন্তু আধুনিকতম বুলবুলির ঝাঁক আর উপস্থিততম বর্গির দল, এদের কী করা যায়।’

মাসিপিসি বলে, ‘বুলবুলির ঝাঁককে কৃষ্ণনাম শোনাব, আর বর্গির দলকেও।’

অর্বাচীনেরা উদ্ধত হয়ে বলে ওঠে, ‘যেমন করে পারি ভূত ছাড়াব।’

ভূতের নায়েব চোখ পাকিয়ে বলে, ‘চুপ। এখনো ঘানি অচল হয় নি।’

শুনে দেশের খোকা নিস্তব্ধ হয়, তার পরে পাশ ফিরে শোয়।

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, বুড়ো কর্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না, অথচ ছাড়েও না।

দেশের মধ্যে দুটো-একটা মানুষ, যারা দিনের বেলা নায়েবের ভয়ে কথা কয় না, তারা গভীর রাত্রে হাত জোড় করে বলে, ‘কর্তা, এখনো কি ছাড়বার সময় হয় নি।’

কর্তা বলেন, ‘ওরে অবোধ, আমার ধরাও নেই, ছাড়াও নেই, তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।’

তারা বলে, ‘ভয় করে যে, কর্তা।’

কর্তা বলেন, ‘সেইখানেই তো ভূত।’

THE MASTER’S GHOSTlot-23-tagore-untitled-four-figures

1

When the old master was on his deathbed everyone through the land said, ‘What will happen to us if you go?’

He felt sad too. He thought, ‘Who is going to keep the peace when I am gone?’

But death does not listen to these excuses. But God weakened somewhat and said, ‘I see no problem in letting him hang around as a ghost for a while. After all, they never die!’

2

His countrymen were all very relieved.

Every sort of problem arises when one believes in the future, but nothing can bother you if you believe in ghosts; they worry about everything on your behalf. But since they have no heads to speak of, they never suffer from headaches from worrying too much.

There were still those who tried to do their own worrying. They had their ears thoroughly boxed by the ghost. It is not easy to escape that grasp as one can neither outrun a ghost nor complain to anyone about what no one else can see.

The whole country walked about under the shadow of the ghost with their eyes shut to the world. The philosophers said, ‘This is the best way to live, with your eyes closed. One lets Fate take its course. This is how the blind organisms used to move around in the grasses and in the trees. That is why it is so easily adopted again.

This makes the spellbound people feel rather proud and happy about their ancient lineage.

The ghost’s prime minister was the jailer of his ghostly prison. As the walls of this prison were invisible the prisoners could never figure out how to escape.

The wheels continually turn in the mill inside the jail, but the only thing that is worn down is the strength in the people. When the strength is all gone, people calm down. This ensures that even though there may be no food, clothes or health in the ghostly kingdom, there is always lots of peace.

You will understand how much peace when I tell you that while in every other land people send for an exorcist when they are tormented by ghosts, here the exorcist is already under the ghost’s spell.

3

Things would have gone this way happily enough without people ever doubting the rule of the ghost. They would have been proud of the fact that their futures were destined to be as uneventful as a tethered pet goat’s, with neither bleat nor shake of horns.

But a problem still came about because one tiny, miniscule detail. See, no one had thought to think of the fact that all the other countries in the world were not in some ghostly grip. All the wheels of progress turned in those countries in the direction of the future and not to wear down the people’s will. There the people had not fallen under a spell; there they were all terribly alert.

4

In the kingdom of the ghost, all was quiet and people slept as soundly as babies, complacent that nothing would ever happen.

That is possibly good for babies, and possibly even for their mothers and definitely for the neighbours.

But something did happen. Invaders stormed the land.

It was bound to happen, or the stories that make up our history would be incomplete.

All the wise men were asked one by one, ‘Why did this happen?’

They shook their heads sagely and said, ‘This is no fault of the ghost, this is no fault of ours, it is all the invaders’ fault.’

This was extremely comforting to everyone else. They agreed gravely that it was good to be held blameless.

But even though it was not clear whose fault it really was, the houses were filled with guards belonging to the ghost and the streets were filled with the invaders; it was hard to go out and it was just as hard to stay at home in peace for fear of being asked to pay taxes.

But how would they pay their taxes?

All year round the birds had come from the north, the south, the east and the west to eat the grain in the fields, but no one had paid the slightest heed. These creatures never rob the people who are alert, for fear of being punished. The wise men looked at their books and said, ‘The unheeding are blessed, while the alert are unclean, therefore we must keep away from them at all times.’

Everyone was filled with happiness upon hearing this.

5

But despite everything one cannot stop the question, ‘How will we pay our taxes?’

The answer blows in the wind, from graveyard and killing fields it comes, ‘With pride, with respect, with blood!’

The problem with questions is that they never come alone. One follows another, ‘Will these ghouls rule over us forever?’

When this reaches Mother Goose and all her children, they quickly cover their ears and say, ‘What ever next! We have never heard such questions, such curiosity. What then of that ancient sleep – the one that was there before anyone had needed to wake up?’

Says the one with the questions, ‘I understand, but then do we do with these, these most enlightened of birds and the most recently arrived robbers, what of them?’

Mother Goose says, ‘I will read them a few of my stories, it should do for both bird and bandit.’

The young and the impatient stir up and say impatiently, ‘We will get rid of them in any way we choose.’

The chief minister stares angrily and said, ‘Shut up! The wheels of my government still turn, you know!’

This makes the innocents fall silent and soon go back to sleep.

6

The main thing is that the old master remains, neither living nor dead, but like a ghost. He has nothing to say about the land but he does not leave it either.

There were a few people there who could not speak during the day for fear of the guards; they came to him in the darkness of night and said with the utmost respect, ‘Master, should you not be going now?’

He said, ‘You fools, I can neither leave, nor stay, I can escape only if you people let me.’

They said, ‘But we are afraid!’

The master said, ‘And that fear is the very place where the ghosts will live.’

তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো/Tomar Hater Rakhikhani Bnadho/ Bind my right hand with your rakhi

তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে

     সূর্য যেমন ধরার করে আলোক-রাখী জড়ায় প্রাতে ॥

তোমার আশিস আমার কাজে                সফল হবে বিশ্ব-মাঝে,

     জ্বলবে তোমার দীপ্ত শিখা আমার সকল বেদনাতে ॥

     কর্ম করি যে হাত লয়ে কর্মবাঁধন তারে বাঁধে।

     ফলের আশা শিকল হয়ে জড়িয়ে ধরে জটিল ফাঁদে।

তোমার রাখী বাঁধো আঁটি–                 সকল বাঁধন যাবে কাটি,

     কর্ম তখন বীণার মতন বাজবে মধুর মূর্ছনাতে ॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): আশ্বিন, ১৩৩০
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1923
রচনাস্থান: ঢাকা (প্রাচী)
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

***

Tie your rakhi to my right hand

     Just as the sun binds the earth in bonds of light each morning.

Your blessings will see fulfillment through                            each task of mine in the world,

     Your love will burn as a flame that will drive away all my pain.

     The hands that work are entangled by mundane bonds.

     Each deed trapped further by the strangling hopes of reward

Tie your rakhi firmly                                               so that I may free myself of false hope

     Let my deeds ring true as the sweet tunes that spill from a veena.

(A Rakhi: a bracelet that is tied by women on the right wrist of a man that they think of as their brother)

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written: 1330, Bengali Era, AD 1923
Written: Dhaka
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link: Suranjan Roy:

পত্রলেখা/Pawtrawlekha/Letters

পত্রলেখা

দিলে তুমি সোনা-মোড়া ফাউণ্টেন পেন,

           কতমতো লেখার আসবাব।

               ছোটো ডেস্‌কোখানি।

                   আখরোট কাঠ দিয়ে গড়া।

        ছাপ-মারা চিঠির কাগজ

           নানা বহরের।

রুপোর কাগজ-কাটা এনামেল-করা।

        কাঁচি ছুরি গালা লাল-ফিতে।

           কাঁচের কাগজ-চাপা,

        লাল নীল সবুজ পেন্সিল।

    বলে গিয়েছিলে তুমি চিঠি লেখা চাই

           একদিন পরে পরে।

লিখতে বসেছি চিঠি,

           সকালেই স্নান হয়ে গেছে।

লিখি যে কী কথা নিয়ে কিছুতেই ভেবে পাই নে তো।

           একটি খবর আছে শুধু–

               তুমি চলে গেছ।

        সে খবর তোমারো তো জানা।

               তবু মনে হয়,

        ভালো করে তুমি সে জান না।

               তাই ভাবি এ কথাটি জানাই তোমাকে–

                   তুমি চলে গেছ।

               যতবার লেখা শুরু করি

        ততবার ধরা পড়ে এ খবর সহজ তো নয়।

               আমি নই কবি–

ভাষার ভিতরে আমি কণ্ঠস্বর পারি নে তো দিতে;

        না থাকে চোখের চাওয়া।

           যত লিখি তত ছিঁড়ে ফেলি।

দশটা তো বেজে গেল।

    তোমার ভাইপো বকু যাবে ইস্‌কুলে,

           যাই তারে খাইয়ে আসিগে।

               শেষবার এই লিখে যাই–

                   তুমি চলে গেছ।

               বাকি আর যতকিছু

           হিজিবিজি আঁকাজোকা ব্লটিঙের ‘পরে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পত্রলেখা

*

The Letter

You gave me a golden fountain pen,

and so many other things to write with.

A little desk,

made of walnut wood.

Monogrammed paper

of various weights and shades.

A silver letter opener, chased with enamel.

Scissors, a pen knife, sealing wax, red ribbon.

A glass paper weight,

red, blue and green pencils.

You told me that I was to write you

every other day.

I have to write a letter,
I already had my bath this morning.
But I cannot think of what to write about;
there is but one incident worth talking about -
You have left.
Of course, you know this as well.
But I still feel,
Perhaps you do not really know it.
That is why I think, I should let you know -
You have left.
Every time I begin to write
I realise that this is not easily received.
I am not a poet -
I cannot imbue words with voice;
nor use the language my eyes would speak.
And so, I keep writing a letter, only to tear it up.

 

It is already past ten.

Your nephew Boku has to go to school,

let me go and help feed him.

For the last time -

You have left.

Everything else that remains,

mere scribbles on a blotting pad.

*

Tagore, Patralekha from his collection of poems known as Punashcha
(Translation, mine)

মৃত্যু/Mrityu/ Death

                মৃত্যু    

           মরণের ছবি মনে আনি।

ভেবে দেখি শেষ দিন ঠেকেছে শেষের শীর্ণক্ষণে।

        আছে ব’লে যত কিছু

    রয়েছে দেশে কালে–

যত বস্তু, যত জীব, যত ইচ্ছা, যত চেষ্টা,

     যত আশানৈরাশ্যের ঘাতপ্রতিঘাত

        দেশে দেশে ঘরে ঘরে চিত্তে চিত্তে,

যত গ্রহনক্ষত্রের

    দূর হতে দূরতর ঘূর্ণ্যমান স্তরে স্তরে

        অগণিত অজ্ঞাত শক্তির

           আলোড়ন আবর্তন

        মহাকালসমুদ্রের কূলহীন বক্ষতলে,

           সমস্তই আমার এ চৈতন্যের

    শেষ সূক্ষ্ম আকম্পিত রেখার এ ধারে।

           এক পা তখনো আছে সেই প্রান্তসীমায়,

               অন্য পা আমার

           বাড়িয়েছি রেখার ও ধারে,

    সেখানে অপেক্ষা করে অলক্ষিত ভবিষ্যৎ

        লয়ে দিনরজনীর অন্তহীন অক্ষমালা

               আলো-অন্ধকারে-গাঁথা।

    অসীমের অসংখ্য যা-কিছু

           সত্তায় সত্তায় গাঁথা

               প্রসারিত অতীতে ও অনাগতে।

নিবিড় সে সমস্তের মাঝে

        অকস্মাৎ আমি নেই।

 

               একি সত্য হতে পারে।

উদ্ধত এ নাস্তিত্ব যে পাবে স্থান

    এমন কি অণুমাত্র ছিদ্র আছে কোনোখানে।

        সে ছিদ্র কি এতদিনে

           ডুবাতো না নিখিলতরণী

               মৃত্যু যদি শূন্য হত,

                   যদি হত মহাসমগ্রের

                          রূঢ় প্রতিবাদ।

 

 

  ২৬ ভাদ্র, ১৩৩৯
 
G_Tagore_Tagore
 
 
 

                   Death

           I think of death,

 Of when the final day will pause at that diminished ultimate moment.

       Of all the things that remain

   Across nations and across time – 

All that exists, all that lives, all the wishes, every effort,

     All the blows rendered in the conflict between hope and despair

        In every land, in each home and each heart,

All the planets and stars

    That revolve near and far, releasing

        Layer upon layer of infinite, unknown energy

          That moves and spins

        In the shore-less depths of the sea of Time

           All these are held by my consciousness

    at a final, delicate, unwavering thread

           One foot is still upon that edge,

               While the other I have placed

           Ready to cross that line,

   Where waits an unseen future

        With all the stars of day and night 

              Strung like pearls in darkness and light

    All the infinite that fills eternity

          Linked through souls

               From distant past to a future that is yet to arrive

And suddenly in midst of all

        there shall be no one that is me

For I will have gone.

 

               Can this be true?

Where will this proud non-existence find its place,

    Is there even the smallest space for it to hide any where?

        Would that empty space not have sunk then by now

           The great ship of existence 

               If death was an absence

                   If it was a rude protest,

                          Against the great collective wealth of the world.

 

 

  26th Bhadra, 1339