প্রভু, বলো বলো কবে/ Prabhu, bawlo bawlo kawbe/ Lord, I beseech you, tell me when

প্রভু,   বলো বলো কবে

তোমার    পথের ধুলার রঙে রঙে আঁচল রঙিন হবে।

              তোমার বনের রাঙা ধূলি  ফুটায় পূজার কুসুমগুলি,

    সেই ধূলি হায় কখন আমায় আপন করি’ লবে?

    প্রণাম দিতে চরণতলে  ধুলার কাঙাল যাত্রীদলে

    চলে যারা, আপন ব’লে চিনবে আমায় সবে॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1342
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1936
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

Lord, I beseech you, tell me when

My robes will turn red in the dust that rises from the path that leads to you

              The red dust in your forests takes the form of the blooms that I offer at your feet

    When will that dust alas accept me as one of its own?

    Those who journey to your feet, craving the dust as a blessing

    They too will then know me on sight.

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written: 1936
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link, to hear Suchitra Mitra:

https://www.youtube.com/watch?v=fwqJqoFcUSs

তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

মৃত্যুশোক/Mrityushok/ The pain caused by death

মৃত্যুশোক

 

ইতিমধ্যে বাড়িতে পরে পরে কয়েকটি মৃত্যুঘটনা ঘটিল। ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মা’ র যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অম্ভ্রপ।  অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন। কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়– তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে।” তখনই বউঠাকুরানী তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন– পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে- দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না– সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকন্যার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। বেলা হইল, শশ্মান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম– তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।

 

The pain caused by death

 

In the mean while a number of deaths had occurred at home. Prior to this I had never witnessed death. I was of a tender age when mother died. She had been ill for a long time and I had not known when her condition became life threatening. She had slept in a separate bed in the same room as us all this time. But while she was ill, she was once taken on a boat trip on the Ganges for a few days – and after her return she began staying in an inner room on the third floor. The night that she died we had been asleep; I do not know how late it was that an ancient maid rushed into our room and wailed out piteously, “Alas! You are all ruined!” My sister-in-law hurriedly scolded her and pulled her out of that room – she was fearful that the news would cause a great harm to our minds if given so abruptly at that hour. My heart suddenly sank as I woke up for a short while in the gloom of the dimmed lamp but I did not understand at all what had happened. When I woke in the morning and heard the news of her death I could not comprehend the full meaning of the words. I came to the outer verandah where her dressed body was lying on a cot. But the body bore no signs of the terrible nature of death — the death that I saw in the light of that dawn was as peaceful and serene as restful sleep. I could not see the difference between life and its ending very clearly. But when they carried her body out of the house through the main gate and we walked after her to the cremation ground a crescendo of grief seemed to crash upon the insides of my mind; a cry rose that said my mother would never walk back again through that door into that house ever again and take her own seat among the things that had been hers. When we returned from the cremation grounds, it was late; I looked at my father’s rooms on the third floor from the street and saw him – he was still sitting in meditation on the veranda that lay before his room.

বাজাও আমারে বাজাও/Bajao Amare Bajao/Play upon me, play upon me

বাজাও আমারে বাজাও

          বাজালে যে সুরে প্রভাত-আলোরে সেই সুরে মোরে বাজাও ॥

যে সুর ভরিলে ভাষাভোলা গীতে    শিশুর নবীন জীবনবাঁশিতে

          জননীর-মুখ-তাকানো হাসিতে– সেই সুরে মোরে বাজাও ॥

                   সাজাও আমারে সাজাও।

          যে সাজে সাজালে ধরার ধূলিরে সেই সাজে মোরে সাজাও।

সন্ধ্যামালতী সাজে যে ছন্দে    শুধু আপনারই গোপন গন্ধে,

          যে সাজ নিজেরে ভোলে আনন্দে– সেই সাজে মোরে সাজাও ॥

 

 

রাগ: রামকেলী

তাল: তেওরা

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৯ ভাদ্র, ১৩২০

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1913

রচনাস্থান: সমুদ্রবক্ষে, SS City of Lahore

স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

                     Play upon me, play upon me

          That tune that you strung in the rays of morning light, play me in that very tune

That tune that you lend to songs that had no words                to the babbling music of a child’s words

          As it looks upon the adored face of a mother,                   play me in that tune

                                                       Adorn me, adorn me with tune

         The love that you have lavished upon the very dust of this earth,               adorn me with that love

The evening blossom dresses to that tune                              its sweet perfume its secret accompaniment

          The ornaments that pale before happiness divine                          adorn me with those.

 

 

Raga: Ramkeli

Beat: Teora

Written on 29th Bhadra, 1320, 1913 CE.

Written aboard the SS City of Lahore

Score: Dinendranath Tagore

 

বড়ো আশা ক’রে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও/Boro Asha Korey Eshechi Go/ I have come with great hope, gather me to your heart

বড়ো আশা ক’রে এসেছি গো,   কাছে ডেকে লও,

                       ফিরায়ো  না  জননী।।

          দীনহীনে কেহ চাহে না,   তুমি তারে রাখিবে জানি গো।

          আর আমি-যে কিছু চাহি নে,   চরণতলে বসে থাকিব।

          আর আমি-যে কিছু চাহি নে,   জননী ব’লে শুধু ডাকিব।

  তুমি না রাখিলে, গৃহ আর পাইব কোথা,   কেঁদে কেঁদে কোথা বেড়াব–

          ওই-যে  হেরি  তমসঘনঘোরা  গহন  রজনী।।

রাগ: ঝিঁঝিট
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1289
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1882

p-60

 

 

I have come with great hope, gather me to your heart

                      Do not sent me away mother.

          No one else may want the poor and meek, but I know that you will have time for him

          There is nothing else I want but to sit at your feet.

          There is nothing else that I want but to call you my mother.

  If you do not give me shelter, where else would I seek it, weeping as I wander

          As I look at the dense night approaching, filled with dark foreboding.

 

Raga: Jhinjhit
Beat: Trital
Written:1882

 

Follow the links to hear:

Debabrata Biswas: 

https://www.youtube.com/watch?v=fEwrm5ukGzI

 

Asha Bhonsle: 

https://www.youtube.com/watch?v=I53z8FH0dpo

 

 

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর/Anondolokey Mongolalokey Birajo Satyashundor/Blissful truth, reign everlasting in the realms of peace and good will

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর ॥

মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগনমাঝে,

বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে ॥

গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে

করিছে পান, করিছে স্নান, অক্ষয় কিরণে ॥

ধরণী’পরে ঝরে নির্ঝর, মোহন মধু শোভা

ফুলপল্লব-গীতবন্ধ-সুন্দর-বরনে ॥

বহে জীবন রজনীদিন চিরনূতনধারা,

করুণা তব অবিশ্রাম জনমে মরণে ॥

স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি কোমল করে প্রাণ,

কত সান্ত্বন করো বর্ষণ সন্তাপহরণে ॥

জগতে তব কী মহোৎসব, বন্দন করে বিশ্ব

শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে ॥

রাগ: ঝিঁঝিট

তাল: একতাল

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1299

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1892

স্বরলিপিকার: কাঙ্গালীচরণ সেন

 

 

 

 Blissful truth, reign everlasting in the realms of peace and good will,

Your majestic glory emanates through the vast expanse of the sky,

The mortal world lies, an adornment about your feet

The Sun, Moon, the planets and stars are forever seeking you

Bathed and nourished by your eternal rays.

The rays shower unceasingly, bringing beauty beyond compare to the earth

Flowers and leaves, the earth’s song in adoration of your glory

Life flows through night and day in a stream that is constant

Your compassion is untiring, in birth as it is in death

Kindness, love, pity and devotion lend gentle grace to the soul

You bestow such consolation upon those who need it

What great festival is this, how does the world felicitate you

Your wealth is held in the soil, in prayer to the fearless and the omnipresent

 

Raga: Jhinjhit

Beat: Ektal

Written: 1892

Based on a Mahishur Bhajan that was composed by the Mysore court poet Basavappa Shastry in 1881 to commemorate the return of the state of Mysore to the Wodeyars by the British who had usurped the throne on the charge of maladministration in 1831.

Score: Kangalicharan Sen

 HH_Sri_Chamarajendra_Wadiyar_X

Maharaja Chamarajendra Wodeyar

 

 

The original Mysore state anthem that influenced Tagore:

https://www.youtube.com/watch?v=YwA4lQFUv1s

 

Anondolokey Mongolalokey Birajo: By the Calcutta Youth Choir

https://www.youtube.com/watch?v=KR0sv_u3h2U

This entry was posted on August 30, 2014, in Prayer/Puja.

আধুনিকা/Adhunika/The Modern Woman: প্রহাসিনী/Prohashinee – An excerpt

আধুনিকা

 

চিঠি তব পড়িলাম, বলিবার নাই মোর,

তাপ কিছু আছে তাহে, সন্তাপ তাই মোর।

কবিগিরি ফলাবার উৎসাহ-বন্যায়

আধুনিকাদের ‘পরে করিয়াছি অন্যায়

যদি সন্দেহ কর এত বড়ো অবিনয়,

চুপ ক’রে যে সহিবে সে কখনো কবি নয়।

বলিব দু-চার কথা, ভালো মনে শুনো তা;

পূরণ করিয়া নিয়ো প্রকাশের ন্যূনতা।

পাঁজিতে যে আঁক টানে গ্রহ-নক্ষত্তর

আমি তো তদনুসারে পেরিয়েছি সত্তর।

আয়ুর তবিল মোর কুষ্ঠির হিসাবে

অতি অল্প দিনেই শূন্যেতে মিশাবে।

চলিতে চলিতে পথে আজকাল হর্‌দম

বুকে লাগে যমরথচক্রের কর্দম।

তবু মোর নাম আজো পারিবে না ওঠাতে

প্রাত্নিক তত্ত্বের গবেষণা-কোঠাতে।

জীর্ণ জীবনে আজ রঙ নাই, মধু নাই–

মনে রেখো, তবু আমি জন্মেছি অধুনাই।

সাড়ে আঠারো শতক এ| ডি|, সে যে বি| সি| নয়;

মোর যারা মেয়ে-বোন নারদের পিসি নয়।

আধুনিকা যারে বল তারে আমি চিনি যে,

কবিযশে তারি কাছে বারো-আনা ঋণী যে।

তারি হাতে চিরদিন যৎপরোনাস্তি

পেয়েছি পুরস্কার, পেয়েছিও শাস্তি।

প্রমাণ গিয়েছি রেখে, এ-কালিনী রমণীর

রমণীয় তালে বাঁধা ছন্দ এ ধমনীর।

কাছে পাই হারাই-বা তবু তারি স্মৃতিতে

সুরসৌরভ জাগে আজো মোর গীতিতে।

মনোলোকে দূতী যারা মাধুরীনিকুঞ্জে

গুঞ্জন করিয়াছি তাহাদেরি গুণ যে।

সেকালেও কালিদাস-বররুচি-আদিরা

পুরসুন্দরীদের প্রশস্তিবাদীরা

যাদের মহিমাগানে জাগালেন বীণারে

তারাও সবাই ছিল অধুনার কিনারে।

 

Kalighat-Paintings-04

 

The Modern Woman

 

I read your letter, I have little to say

There is some heat in your words, making me sad today.

In my enthusiastic rush to be so very poetic

It is today’s woman that I have wronged in a manner most horrific

If you suspect that a lack of charity,

Will go unanswered, then I am no poet in reality.

Let me say a couple of things, listen to them with care

That should fill in the ugly gaps of my expression so spare

The maths that is worked daily by the planets and stars,

According to that I have crossed seventy summers.

The ledger book of age will soon grow narrow

After a few more days, it will come down to zero.

These days as  I walk along often

I hear the rumblings of the approaching end

Still I will not let you push me to the edge

And into the dusty rooms of ancient knowledge

There may be next to no colour or sweetness in this old gent

But you must remember I was born recently

1850 A.D., not as you may think, in the 1800 B.Cs.

My daughters and sisters, they are no aunt of Naradmuni’s.

The one that I consider a modern dame

I am indebted to her indeed for my fame

I have always received the very best indeed

I have had reward and punishment, when in need.

I have left proof enough that today’s woman

has influenced the flow of life in this old man.

Whether she is with me or lost, her memories

awaken a certain sweetness in my songs

Those delightful messengers that visited my mind

The songs I have sung in the gardens have been about their kind

The ancients had Kalidasa, Bararuchi and all the others

singing the praises of the good wives, daughters and mothers

Those that they sang about to the music of the veen

They were without fail all modern, for the time they lived in.

ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে/Bhalobeshe Shokhi Nibhritey Jotoney, My dearest, in careful solitude

ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে

     আমার নামটি লিখো– তোমার

          মনের মন্দিরে।

আমার পরানে যে গান বাজিছে

     তাহার তালটি শিখো– তোমার

          চরণমঞ্জীরে॥

ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে

     আমার মুখর পাখি– তোমার

          প্রাসাদপ্রাঙ্গণে॥

মনে ক’রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো

     আমার হাতের রাখী– তোমার

          কনককঙ্কণে॥

আমার লতার একটি মুকুল

     ভুলিয়া তুলিয়া রেখো– তোমার

          অলকবন্ধনে।

আমার স্মরণ শুভ-সিন্দুরে

     একটি বিন্দু এঁকো– তোমার

          ললাটচন্দনে।

আমার মনের মোহের মাধুরী

     মাখিয়া রাখিয়া দিয়ো– তোমার

     অঙ্গসৌরভে।

আমার আকুল জীবনমরণ

     টুটিয়া লুটিয়া নিয়ো– তোমার

          অতুল গৌরবে॥

রাগ: কীর্তন

তাল: একতাল

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৮ আশ্বিন, ১৩০৪

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1897

রচনাস্থান: সাজাদপুর

স্বরলিপিকার: অনাদিকুমার দস্তিদার

 

 

 G_Tagore_Tagore

 

 

My dearest, in careful solitude

     Do write my name with love

          Upon the shrine of your mind

That tune that plays in my heart

     Do learn that so that it plays

           In the tinkling of your anklets

Capture and cage with love

     The bird that sings my words

          In the courtyard of your palace

Do remember to fasten with care

     The thread that binds my wrist around

           The golden bracelet that graces yours

Pick one flower from my vine

     Pinning it only to forget

To your hair

          With the sindoor that carries memories of me

     Draw a dot 

          Amidst the sandalwood that decorates your forehead

The sweet illusion that fills my mind

     Wrap them around you

     To perfume your being

May my life and death be given

     To the fulfillment pf your

          Incomparable glory

 

Raga: Keertan

Beat: Ektal

Written: 1897

Written at sajadpur

Score: Anadikumar Dastidar

 Follow the links to hear:

Debabrata Biswas:

http://youtu.be/Eq9hgVHChog

Kabir Suman:

http://youtu.be/K55zemu6wPI