তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

চোখের বালি ২৬/Chokher Bali 26

২৬

 

এক দিকে চন্দ্র অস্ত যায়, আর-এক দিকে সূর্য উঠে। আশা চলিয়া গেল, কিন্তু মহেন্দ্রের ভাগ্যে এখনো বিনোদিনীর দেখা নাই। মহেন্দ্র ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, মাঝে মাঝে ছুতা করিয়া সময়ে-অসময়ে তাহার মার ঘরে আসিয়া উপস্থিত হয়, বিনোদিনী কেবলই ফাঁকি দিয়া পালায়, ধরা দেয় না।

 

রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রের এইরূপ অত্যন্ত শূন্যভাব দেখিয়া ভাবিলেন, “বউ গিয়াছে, তাই এ বাড়িতে মহিনের কিছুই আর ভালো লাগিতেছে না।’ আজকাল মহেন্দ্রের সুখদুঃখের পক্ষে মা যে বউয়ের তুলনায় একান্ত অনাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে, তাহা মনে করিয়া তাঁহাকে বিঁধিল–তবু মহেন্দ্রের এই লক্ষ্মীছাড়া বিমর্ষ ভাব দেখিয়া তিনি বেদনা পাইলেন। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিলেন, “সেই ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জার পর হইতে আমার হাঁপানির মতো হইয়াছে; আমি তো আজকাল সিঁড়ি ভাঙিয়া ঘন ঘন উপরে যাইতে পারি না। তোমাকে বাছা, নিজে থাকিয়া মহিনের খাওয়াদাওয়া সমস্তই দেখিতে হইবে। বরাবরকার অভ্যাস, একজন কেহ যত্ন না করিলে মহিন থাকিতে পারে না। দেখো-না, বউ যাওয়ার পর হইতে ও কেমন একরকম হইয়া গেছে। বউকেও ধন্য বলি, কেমন করিয়া গেল?”

 

বিনোদিনী একটুখানি মুখ বাঁকাইয়া বিছানার চাদর খুঁটিতে লাগিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কী বউ, কী ভাবিতেছ। ইহাতে ভাবিবার কথা কিছু নাই। যে যাহা বলে বলুক, তুমি আমাদের পর নও।”

 

বিনোদিনী কহিল, “কাজ নাই, মা।”

 

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আচ্ছা, তবে কাজ নাই। দেখি আমি নিজে যা পারি তাই করিব।”

 

বলিয়া তখনই তিনি মহেন্দ্রের তেতলার ঘর ঠিক করিবার জন্য উদ্যত হইলেন। বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “তোমার অসুখ-শরীর, তুমি যাইয়ো না, আমি যাইতেছি। আমাকে মাপ করো পিসিমা, তুমি যেমন আদেশ করিবে আমি তাহাই করিব।”

 

রাজলক্ষ্মী লোকের কথা একেবারেই তুচ্ছ করিতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর হইতে সংসারে এবং সমাজে তিনি মহেন্দ্র ছাড়া আর কিছুই জানিতেন না। মহেন্দ্র সম্বন্ধে বিনোদিনী সমাজনিন্দার আভাস দেওয়াতে তিনি বিরক্ত হইয়াছিলেন। আজন্মকাল তিনি মহিনকে দেখিয়া আসিতেছেন, তাহার মতো এমন ভালো ছেলে আছে কোথায়। সেই মহিনের সম্বন্ধেও নিন্দা! যদি কেহ করে, তবে তাহার জিহ্বা খসিয়া যাক। তাঁহার নিজের কাছে যেটা ভালো লাগে ও ভালো বোধ হয় সে-সম্বন্ধে বিশ্বের লোককে উপেক্ষা করিবার জন্য রাজলক্ষ্মীর একটা স্বাভাবিক জেদ ছিল।

 

আজ মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া আপনার শয়নঘর দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। দ্বার খুলিয়াই দেখিল, চন্দনগুঁড়া ও ধুনার গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়াআছে। মশারিতে গোলাপি রেশমের ঝালর লাগানো। নীচের বিছানায় শুভ্র জাজিম তকতক করিতেছে এবং তাহার উপরে পূর্বেকার পুরাতন তাকিয়ার পরিবর্তে রেশম ও পশমের ফুলকাটা বিলাতি চৌকা বালিশ সুসজ্জিত। তাহার কারুকার্য বিনোদিনীর বহুদিনের পরিশ্রমজাত। আশা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিত, “এগুলি তুই কার জন্যে তৈরি করিতেছিস, ভাই।” বিনোদিনী হাসিয়া বলিত, “আমার চিতাশয্যার জন্য। মরণ ছাড়া তো সোহাগের লোক আমার আর কেহই নাই।”

 

দেয়ালে মহেন্দ্রের যে বাঁধানো ফোটোগ্রাফখানি ছিল, তাহার ফ্রেমের চার কোণে রঙিন ফিতার দ্বারা সুনিপুণভাবে চারিটি গ্রন্থি বাঁধা, এবং সেই ছবির নীচে ভিত্তিগাত্রে একটি টিপাইয়ের দুই ধারে দুই ফুলদানিতে ফুলের তোড়া, যেন মহেন্দ্রের প্রতিমূর্তি কোনো অজ্ঞাত ভক্তের পূজা প্রাপ্ত হইয়াছে। সবসুদ্ধ সমস্ত ঘরের চেহারা অন্যরকম। খাট যেখানে ছিল সেখান হইতে একটুখানি সরানো। ঘরটিকে দুই ভাগ করা হইয়াছে; খাটের সম্মুখে দুটি বড়ো আলনায় কাপড় ঝুলাইয়া দিয়া আড়ালের মতো প্রস্তুত হওয়ায় নীচে বসিবার বিছানা ও রাত্রে শুইবার খাট স্বতন্ত্র হইয়া গেছে। যে আলমারিতে আশার সমস্ত শখের জিনিস চীনের খেলনা প্রভৃতি সাজানো ছিল, সেই আলমারির কাঁচের দরজায় ভিতরের গায়ে লাল সালু কুঞ্চিত করিয়া মারিয়া দেওয়া হইয়াছে; এখন আর তাহার ভিতরের কোনো জিনিস দেখা যায় না। ঘরের মধ্যে তাহার পূর্ব-ইতিহাসের যে-কিছু চিহ্ন ছিল, তাহা নূতন হস্তের নব সজ্জায় সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হইয়া গেছে।

 

পরিশ্রান্ত মহেন্দ্র মেঝের উপরকার শুভ্র বিছানায় শুইয়া নূতন বালিশগুলির উপর মাথা রাখিবামাত্র একটি মৃদু সুগন্ধ অনুভব করিল–বালিশের ভিতরকার তুলার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে নাগকেশর ফুলের রেণু ও কিছু আতর মিশ্রিত ছিল।

 

মহেন্দ্রের চোখ বুজিয়া আসিল, মনে হইতে লাগিল, এই বালিশের উপর যাহার নিপুণ হস্তের শিল্প, তাহারই কোমল চম্পক-অঙ্গুলির যেন গন্ধ পাওয়া যাইতেছে।

 

এমন সময় দাসী রূপার রেকাবিতে ফল ও মিষ্ট এবং কাঁচের গ্লাসে বরফ-দেওয়া আনারসের শরবত আনিয়া দিল। এ সমস্তই পূর্বপ্রথা হইতে কিছু বিভিন্ন এবং বহু যত্ন ও পারিপাট্যের সহিত রচিত। সমস্ত স্বাদে গন্ধে দৃশ্যে নূতনত্ব আসিয়া মহেন্দ্রের ইন্দ্রিয়-সকল আবিষ্ট করিয়া তুলিল।

 

তৃপ্তিপূর্বক ভোজন সমাধা হইলে, রূপার বাটায় পান ও মসলা লইয়া বিনোদিনী ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। হাসিতে হাসিতে কহিল, “এ কয়দিন তোমার খাবার সময় হাজির হইতে পারি নাই, মাপ করিয়ো, ঠাকুরপো। আর যাই কর, আমার মাথার দিব্য রহিল, তোমার অযত্ন হইতেছে, এ খবরটা আমার চোখের বালিকে দিয়ো না। আমার যথাসাধ্য আমি করিতেছি–কিন্তু কী করিব ভাই, সংসারের সমস্ত কাজই আমার ঘাড়ে।”

 

এই বলিয়া বিনোদিনী পানের বাটা মহেন্দ্রের সম্মুখে অগ্রসর করিয়া দিল। আজিকার পানের মধ্যেও কেয়া খয়েরের একটু বিশেষ নূতন গন্ধ পাওয়া গেল।

 

মহেন্দ্র কহিল, “যত্নের মাঝে মাঝে এমন এক-একটা ত্রুটি থাকাই ভালো।”

 

বিনোদিনী কহিল, “ভালো কেন, শুনি।”

 

মহেন্দ্র উত্তর করিল, “তার পরে খোঁটা দিয়া সুদসুদ্ধ আদায় করা যায়।”

 

“মহাজন-মহাশয়, সুদ কত জমিল?”

 

মহেন্দ্র কহিল, “খাবার সময় হাজির ছিলে না, এখন খাবার পরে হাজরি পোষাইয়া আরো পাওনা বাকি থাকিবে।”

 

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “তোমার হিসাব যেরকম কড়াক্কড়, তোমার হাতে একবার পড়িলে আর উদ্ধার নাই দেখিতেছি।”

 

মহেন্দ্র কহিল, “হিসাবে যাই থাক্‌, আদায় কী করিতে পারিলাম।”

 

বিনোদিনী কহিল, “আদায় করিবার মতো আছে কী। তবু তো বন্দী করিয়া রাখিয়াছ।” বলিয়া ঠাট্টাকে হঠাৎ গাম্ভীর্যে পরিণত করিয়া ঈষৎ একটু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

 

মহেন্দ্রও একটু গম্ভীর হইয়া কহিল, “ভাই বালি, এটা কি তবে জেলখানা।”

 

এমন সময় বেহারা নিয়মমত আলো আনিয়া টিপাইয়ের উপর রাখিয়া চলিয়া গেল।

 

হঠাৎ চোখে আলো লাগাতে মুখের সামনে একটু হাতের আড়াল করিয়া নতনেত্রে বিনোদিনী বলিল, “কী জানি ভাই। তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে। এখন যাই, কাজ আছে।”

 

মহেন্দ্র হঠাৎ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “বন্ধন যখন স্বীকার করিয়াছ তখন যাইবে কোথায়?”

 

বিনোদিনী কহিল, “ছি ছি, ছাড়ো–যাহার পালাইবার রাস্তা নাই, তাহাকে আবার বাঁধিবার চেষ্টা কেন।”

 

বিনোদিনী জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইয়া প্রস্থান করিল।

 

মহেন্দ্র সেই বিছানার সুগন্ধ বালিশের উপর পড়িয়া রহিল, তাহার বুকের মধ্যে রক্ত তোলপাড় করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যা, নির্জন ঘর, নববসন্তের বাতাস দিতেছে, বিনোদিনীর মন যে ধরা দিল-দিল–উন্মাদ মহেন্দ্র আপনাকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিবে না, এমনি বোধ হইল। তাড়াতাড়ি আলো নিবাইয়া ঘরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করিল, তাহার উপরে শার্সি আঁটিয়া দিল, এবং সময় না হইতেই বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল।

 

এও তো সে পুরাতন বিছানা নহে। চার-পাঁচখানা তোশকে শয্যাতল পূর্বের চেয়ে অনেক নরম। আবার একটি গন্ধ–সে অগুরুর কি খসখসের, কি কিসের ঠিক বুঝা গেল না। মহেন্দ্র অনেক বার এপাশ-ওপাশ করিতে লাগিল–কোথাও যেন পুরাতনের কোনো একটা নিদর্শন খুঁজিয়া পাইয়া তাহা আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা। কিন্তু কিছুই হাতে ঠেকিল না।

 

রাত্রি নটার সময় রুদ্ধ দ্বারে ঘা পড়িল। বিনোদিনী বাহির হইতে কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার খাবার আসিয়াছে, দুয়ার খোলো।”

 

তখনই দ্বার খুলিবার জন্য মহেন্দ্র ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া শার্শির অর্গলে হাত লাগাইল। কিন্তু খুলিল না–মেঝের উপর উপুড় হইয়া লুটাইয়া কহিল, “না না, আমার ক্ষুধা নাই, আমি খাইব না।”

 

বাহির হইতে উদ্‌বিগ্ন কণ্ঠের প্রশ্ন শোনা গেল, “অসুখ করে নি তো? জল আনিয়া দিব? কিছু চাই কি।”

 

মহেন্দ্র কহিল, “আমার কিছুই চাই না–কোনো প্রয়োজন নাই।”

 

বিনোদিনী কহিল, “মাথা খাও, আমার কাছে ভাঁড়াইয়ো না। আচ্ছা, অসুখ না থাকে তো একবার দরজা খোলো।”

 

মহেন্দ্র সবেগে বলিয়া উঠিল, “না খুলিব না, কিছুতেই না। তুমি যাও।”

 

বলিয়া মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি উঠিয়া পুনর্বার বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল এবং অন্তর্হিতা আশার স্মৃতিকে শূন্য শয্যা ও চঞ্চল হৃদয়ের মধ্যে অন্ধকারে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল।

 

ঘুম যখন কিছুতেই আসিতে চায় না; তখন মহেন্দ্র বাতি জ্বালাইয়া দোয়াত কলম লইয়া আশাকে চিঠি লিখিতে বসিল। লিখিল, “আশা, আর অধিক দিন আমাকে একা ফেলিয়া রাখিয়ো না। আমার জীবনের লক্ষ্মী তুমি। তুমি না থাকিলেই আমার সমস্ত প্রবৃত্তি শিকল ছিঁড়িয়া আমাকে কোন্‌ দিকে টানিয়া লইতে চায়, বুঝিতে পারি না। পথ দেখিয়া চলিব, তাহার আলো কোথায়–সে আলো তোমার বিশ্বাসপূর্ণ দুটি চোখের প্রেমস্নিগ্ধ দৃষ্টিপাতে। তুমি শীঘ্র এসো, আমার শুভ, আমার ধ্রুব, আমার এক। আমাকে স্থির করো, রক্ষা করো, আমার হৃদয় পরিপূর্ণ করো। তোমার প্রতি লেশমাত্র অন্যায়ের মহাপাপ হইতে, তোমাকে মুহূর্তকাল বিস্মরণের বিভীষিকা হইতে আমাকে উদ্ধার করো।”

 

এমনি করিয়া মহেন্দ্র নিজেকে আশার অভিমুখে সবেগে তাড়না করিবার জন্য অনেক রাত ধরিয়া অনেক কথা লিখিল। দূর হইতে সুদূরে অনেকগুলি গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া তিনটা বাজিল। কলিকাতার পথে গাড়ির শব্দ আর প্রায় নাই, পাড়ার পরপ্রান্তে কোনো দোতলা হইতে নটীকণ্ঠে বেহাগ-রাগিণীর যে গান উঠিতেছিল সেও বিশ্বব্যাপিনী শান্তি ও নিদ্রার মধ্যে একেবারে ডুবিয়া গেছে। মহেন্দ্র একান্তমনে আশাকে স্মরণ করিয়া এবং মনের উদ্‌বেগ দীর্ঘ পত্রে নানারূপে ব্যক্ত করিয়া অনেকটা সান্ত্বনা পাইল, এবং বিছানায় শুইবামাত্র ঘুম আসিতে তাহার কিছুমাত্র বিলম্ব হইল না।

 

সকালে মহেন্দ্র যখন জাগিয়া উঠিল, তখন বেলা হইয়াছে, ঘরের মধ্যে রৌদ্র আসিয়াছে। মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল; নিদ্রার পর গতরাত্রির সমস্ত ব্যাপার মনের মধ্যে হালকা হইয়া আসিয়াছে। বিছানার বাহিরে আসিয়া মহেন্দ্র দেখিল–গতরাত্রে আশাকে সে যে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা টিপাইয়ের উপর দোয়াত দিয়া চাপা রহিয়াছে। সেখানি পুনর্বার পড়িয়া মহেন্দ্র ভাবিল, “করেছি কী। এ যে নভেলি ব্যাপার! ভাগ্যে পাঠাই নাই। আশা পড়িলে কী মনে করিত। সে তো এর অর্ধেক কথা বুঝিতেই পারিত না।’ রাত্রে ক্ষণিক কারণে হৃদয়াবেগ যে অসংগত বাড়িয়া উঠিয়াছিল, ইহাতে মহেন্দ্র লজ্জা পাইল; চিঠিখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল; সহজ ভাষায় আশাকে একখানি সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখিল–

 

“তুমি আর কত দেরি করিবে। তোমার জেঠামহাশয়ের যদি শীঘ্র ফিরিবার কথা না থাকে, তবে আমাকে লিখিয়ো, আমি নিজে গিয়া তোমাকে লইয়া আসিব। এখানে একলা আমার ভালো লাগিতেছে না।’

 

img_9613_1_1

26

 

The moon sets in one direction and the sun rises in another. Asha might have left but Mahendra did not manage to see Binodini yet.  Mahendra wandered about and came to his mother’s rooms at odd hours on various excuses but Binodini did not yield so easily.

When she saw his extremely dejected spirits, Rajlakshmi thought to herself, ‘His wife’s absence is causing Mahendra to dislike this house and all in it.’ She felt slighted by the fact that his happiness now seemed to depend more on his wife rather than his mother but she was still upset by his unhappy appearance. She sent for Binodini and said to her, ‘I have been having breathing difficulties since that bout of influenza and cannot climb the stairs to go upstairs as much as I once did. You must look after Mahendra’s welfare from now on. He is used to having someone tend to his needs for a long time. Have you seen how sad he looks ever since his wife left? What a wife! How could she even go?’

Binodini pulled a face and continued picking at the threads of the bedsheet. Rajlakshmi asked, ‘What are you thinking about? You don’t have to think about this. Whatever people may say, you are no stranger to us.’

Binodini answered, ‘There is no need for all that mother.’

Rajlakshmi said, ‘Alright, let it be. I will see if I can manage things on my own.’

She then immediately prepared to tidy up Mahendra’s third floor room. Binodini then grew anxious and said, ‘You are not well, you do not have to go, I will go instead. Forgive me aunt, I will do whatever you order.’

Rajlakshmi completely ignored what other people said. Since the death of her husband she had devoted herself to none other than Mahendra. She had been annoyed by the hint in Binodini ‘s remark about what others in the wider society might think. She had known Mahendra his whole life and was certain there was not another person anywhere as good as him. If someone said a thing against him, she hoped that their tongue would wither and fall off. She had a natural obstinacy that allowed her to have a total disregard for everyone else and do exactly as she pleased.

Mahendra was astonished when he entered his bedroom after returning from his classes. He opened the door and found the room filled with the perfume of sandalwood powder and incense. A pink silken frill had been attached to the mosquito net. A clean white carpet had been spread on the bed and his old bolsters had been replaced by square cushions embroidered in silk and wool. Binodini had spent much time making these. Asha would ask her, ‘Who are you making these for?’ Binodini smiled and answered, ‘For my funeral. Who else but Death will be my lover?’

The photograph of his that hung in a frame on the wall had been skillfully tied with ribbons and a low table placed immediately below the picture with two vases full of bunches of flowers on it; as if Mahendra’s likeness was being worshipped by an unknown devotee. The whole room looked different. The bed had been shifted slightly. The room was now divided into two areas; two supports now held a curtain that created shelter for the bed and separated the sleeping area from the space for lounging during the day. The showcase which contained all the fancies Asha had collected including her porcelain toys had been lined with red pleated fabric on the inside and the interior could not be seen any more. The new décor of the room seemed to have erased all its past history.

Exhausted, Mahendra lay down on the spotless sheets spread on the floor; he detected a slight fragrance as his head touched the new pillows – a large quantity of pollen and a few drops of perfume had been added to the cotton stuffing of the pillows.

His eyes closed and he felt as though he could smell the soft fingers that had worked such skilful magic on the pillows.

The maid entered at this point with a silver bowl filled with fruits and sweets and a glass filled with iced pineapple juice. All this was very different from what he was used to and was done with infinite care and attention. The novelty of these new sensations enveloped Mahendra’s feelings.

After he had eaten to his heart’s content, Binodini entered the room slowly with a silver container filled with mouth freshening pan and spices. She smiled and said, ‘I have not been able to attend you at meal times for the past few days, please forgive me. Whatever you do, you must pledge to me that you will not tell my Bali that you have been not been taken care of. I am doing as much as I can but what can I do, all the household is my responsibility.’

She then gave him the container. There was something new there too, in the perfume of the catechu powder.

Mahendra said, ‘It is good when there is an occasional oversight in attention.’

Binodini asked, ‘Why is it good, pray tell.’

Mahendra: One can charge extra interest.

‘Dear lender, what is the amount?’

Mahendra: You were not here when I was eating, now you must stay with me for longer.

Binodini laughed and said, ‘Your rules are so strict that it seems it will be difficult escaping from your clutches once caught!’

Mahendra answered, ‘Whatever my calculations, have I ever managed to get anything from you?’

Binodini said, ‘What do I have worth taking? But you hold me.’she suddenly turned serious and let out a sigh.

Mahendra grew serious too and asked, ‘Bali, is this then a prison for you?’

 

The man-servant came in a light as usual and left it on the three legged table.

The sudden light in the room made Binodini shade her eyes with her hands as she said with downcast eyes, ‘How should I know! Who can win an argument against you? Let me go now, I have much to do.’

Mahendra grabbed her hand without warning and said, ‘When you have admitted to the bonds where do you want to go now?’

Binodini said, ‘Shame! Why try to stop the one who has nowhere to escape!’

She then drew her hand free and left the place.

Mahendra lay on the scented pillow as his heart beat faster and faster. In the midst of that silent evening in the lonely room and the fresh spring breeze, he felt as though he would not be able to control his madness now that Binodini’s mind seemed on the verge of yielding. He turned the light off, shut the door and closed the shutters and lay down much earlier than usual.

This wasn’t even his old bed. Four or five mattresses had been added to make the bed much softer than before. These were perfumed as well, whether with Khus khus or with Aguru he was not sure. He kept turning from side to side in an effort to hold onto the old. But there was nothing.

There was a knock on the barred door at nine o’clock in the night. Binodini asked from outside, ‘Good Sir, your food is here, open the door.’

Mahendra hurried to open the door instantly. But he did not open it, lying down instead on the floor and saying, ‘No, I am not hungry, I will not eat.’

A worried voice was heard outside, ‘You are not well? Do you want me to get you some water? What would you like?’

Mahendra said, ‘I do not want anything, I really do not.’

Binodini said, ‘Please, do not lie to me. Even if you are not unwell, open the door once!’

Mahendra said with some force, ‘No, I will not open my door. No matter what! You can leave!’

He lay down quickly in his bed again and continued to search for memories of Asha in the empty bed and within the darkness that filled his unsettled heart.

When sleep refused to come to him, he lit a lamp and sat down with inkwell and pen to write a letter to Asha. He wrote, ‘Asha, do not leave me alone like this for too long. You are the guardian spirit of my life. I cannot tell which way my inclinations will carry me without the anchor of your presence. The light that guides my steps comes from the trusting eyes that look upon me, softened with love. Return quickly, you are my good, my steadfast, my only delight! Anchor me, save me, fulfil my heart. Rescue me from the great evil that I may commit by wronging you and the terrible act of forgetting you for more than a moment.’

Mahendra tried to push himself vigorously in Asha’s direction by writing to her till late into the night. Several church bells rang out from far away at three o’clock. There was hardly any noise from the traffic on the roads and even the songstress who had been humming Behag from her second storey window at the other end of the street had become silent and merged in the peace that descended upon the world. Mahendra expressed many sentiments to Asha in a long letter that seemed to calm his agitation greatly and when he finally lay down he fell asleep immediately.

 

When Mahendra woke in the morning, it was late and the sunshine streamed into the room. Mahendra sat up quickly and found that the events of the previous night seemed less foreboding now. After leaving the bed he found the letter he had written to Asha last night was on the stool under an inkwell. He re-read it and thought, ‘What have I done? This is the stuff of novels! Thank goodness I did not send it. What would she have thought on reading this? She would not have understood half the words.’ He felt ashamed that he had been so emotional previously and ripped the letter into pieces. He then wrote a letter to Asha in a calmer frame of mind –

‘How many days do you need to be away for? If your uncle’s return is not fixed for sometime soon, write to me and I will go and fetch you myself. I do not like being here on my own.’

 

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/ Esho, esho, esho Baishakh/Come, come! We welcome you, Baishakh

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপসনিশ্বাসবায়ে   মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥

যাক পুরাতন স্মৃতি,   যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,

অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।

রসের আবেশরাশি   শুষ্ক করি দাও আসি,

আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।

মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥

 

রাগ: ইমনকল্যাণ

তাল: কাহারবা

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২০ফাল্গুন, ১৩৩৩

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ৪মার্চ, ১৯২৭

রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন

স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথঠাকুর

 

 

 

 

Come, come! We welcome you, Baishakh

With your pure breath you blow away all sickness,

Let the dust of the old year be gone.

Let go of old memories, cast away forgotten songs,

Let the mist of regret disappear into the distance.

Let all pain be erased and signs of age be banished,

Cleanse the earth with your fire.

Dry all excesses of feeling,

Bring with you the conch to herald destruction

Let this storm of illusion disappear.

 

 

Raga: Yaman Kalyan

Beat: Kaharba

Written: 4th March, 1927

Written at Santiniketan

Score: Dinendranath Tagore

 

 

Follow the link to hear:

Debabrata Biswas: http://youtu.be/EEyYgr7SJ10

 

 

 

একটি চাউনি/Ekti Chauni/One glance

গাড়িতে ওঠবার সময় একটুখানি মুখ ফিরিয়ে সে আমাকে তার শেষ চাউনিটি দিয়ে গেছে।

 

এই মস্ত সংসারে ঐটুকুকে আমি রাখি কোন্‌খানে।

 

দণ্ড পল মুহূর্ত অহরহ পা ফেলবে না, এমন একটু জায়গা আমি পাই কোথায়।

 

মেঘের সকল সোনার রঙ যে সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায় এই চাউনি কি সেই সন্ধ্যায় মিলিয়ে যাবে। নাগকেশরের সকল সোনালি রেণু যে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় এও কি সেই বৃষ্টিতেই ধুয়ে যাবে।

 

সংসারের হাজার জিনিসের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকলে এ থাকবে কেন– হাজার কথার আবর্জনায়, হাজার বেদনার স্তূপে।

 

তার ঐ এক চকিতের দান সংসারের আর-সমস্তকে ছাড়িয়ে আমারই হাতে এসে পৌঁচেছে। এ’কে আমি রাখব গানে গেঁথে, ছন্দে বেঁধে; আমি এঁকে রাখব সৌন্দর্যের অমরাবতীতে।

 

পৃথিবীর রাজার প্রতাপ, ধনীর ঐশ্বর্য হয়েছে মরবারই জন্যে। কিন্তু, চোখের জলে কি সেই অমৃত নেই যাতে এই নিমেষের চাউনিকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

 

গানের সুর বললে, ‘আচ্ছা, আমাকে দাও। আমি রাজার প্রতাপকে স্পর্শ করি নে, ধনীর ঐশ্বর্যকেও না, কিন্তু ঐ ছোটো জিনিসগুলিই আমার চিরদিনের ধন; ঐগুলি দিয়েই আমি অসীমের গলার হার গাঁথি।’

 

Image

 

THE LOOK

 

As he got on the train, he turned his face a little and gave me the gift of one final look.

Now where will I hide this little treasure in this vast world?

Where will I find a space for it where moments, minutes and seconds will not intrude?

Will this look fade away in that twilight where all the gold fades when clouds go to sleep? Will this be washed away by the same rains that wash the golden pollen out of the Nagkeshar blooms?

Why should this survive in the midst of a thousand mundane things in life – in the ephemera of a thousand useless words, under the weight of a thousand sorrows?

That gift of a moment came to me alone. I will keep this, strung as a pearl in my song, I will hold it to me with tune; I will preserve it as a painting on the walls of an eternal palace.

On earth, the wealth of kings and the riches of the wealthy are impermanent. But do tears not have that magical touch that can keep a look gifted in a moment, alive forever?

Then the tune paid heed and said, ‘Give it to me. I do not covet the wealth of kings nor the riches of the wealthy; these moments are what I fill my treasury with; they are my offerings to the Everlasting.’

 

 

 

ক্ষীরের পুতুল ২: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul 2

Image

 

সন্ধেবেলা সোনার জাহাজ সোনার পাল মেলে অগাধ সাগরের নীল জল কেটে সোনার মেঘের মতো পশ্চিমে মুখে ভেসে গেল।

ভাঙা ঘরে দুওরানী নীল সাগরের পানে চেয়ে,ছেঁড়া কাঁথায় পড়ে রইলেন। আর আদরিনী সুওরানী সাতহল অন্তঃপুরে,সাতশো সখীর  মাঝে,গহনার কথা ভাবতে ভাবতে, সোনার পিঞ্জরে সোনার পাখির গান শুনতে-শুনতে,সোনার পালঙ্কে ঘুমিয়ে পড়লেন।

রাজাও জাহাজে চড়ে দুঃখিনী বড়রানীকে ভুলে গেলেন । বিদায়ের  দিনে ছোটরানীর সেই  হাসি-হাসি মুখ মনে পড়ে আর ভাবেন—এখন রানী কি করছেন ? বোধ হয় চুল বাঁধছেন । এবার রানী কি করছেন? বুঝি রাঙা পায়ে আলতা পরছেন । এবার রানী সাত মালঞ্চে ফুল তুলছেন,এবার বুঝি সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুলে রানী মালা গাঁথছেন আর আমার কথা ভাবছেন । ভাবতে-ভাবতে বুঝি দুই চক্ষে জল এল,মালা আর গাঁথা হল না । .সোনার সুতো, ফূলের সাজি পায়ের  কাছে পড়ে রইল ; বসে বসে সারা  রাত কেটে গেল, রানীর চক্ষে ঘুম  এল না ।

সুওরানী—ছোটরানী রাজার আদরিনী,রাজা তারই কথা ভাবেন ।  আর বড়রানী রাজার জন্যে পাগল,তাঁর কথা একবার মনেও পড়ে না ।

এমনি করে জাহাজে দেশ-বিদেশে রাজার বারো-মাস কেটে গেল।

তেরোমাসে রাজার জাহাজ মানিকের দেশে এল ।

মানিকের দেশে সকলই মানিক । ঘরের দেওয়াল মানিক, ঘাটের  সান্‌ মানিক,পথের কাঁকর মানিক। রাজা সেই মানিকের দেশে সুওরানীর চুড়ি গড়ালেন । আট হাজার মানিকের আটগাছা চুড়ি, পরলে মনে হয় গায়ের রক্ত ফুটে পড়ছে ।

রাজা সেই মানিকের চুড়ি নিয়ে,সোনার দেশে এলেন । সেই সোনার দেশে স্যাকরার দোকানে নিরেট সোনার দশগাছা মল  গড়ালেন । মল জ্বলতে লাগল যেন আণ্ডনের ফিন্‌কি, বাজতে লাগল যেন বীণার ঝঙ্কার—মন্দিরার রিনি-রিনি ।

রাজা মানিকের দেশে মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সোনার মল গড়িয়ে, মুক্তোর রাজ্যে এলেন ।

সে দেশে রাজার বাগানে দুটি পায়রা । তাদের মুক্তোর পা, মানিকের  ঠোঁট, পান্নার গাছে মুক্তোর ফল খেয়ে মুক্তোর ড়িম পাড়ে । দেশের রানী সন্ধ্যাবেলা সেই মুক্তোর মালা গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায়  পরেন, সকাল বেলায় ফেলে দেন ।

দাসীরা সেই বাসি মুক্তোর হার এক জাহাজ রুপো নিয়ে বাজারে  বেচে আসে ।

রাজা এক জাহাজ রুপো দিয়ে সুওরানীর গলায় দিতে সেই মুক্তোর এক ছড়া হার কিনলেন ।

তারপর মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সোনার মল গড়িয়ে,  মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর হার গাঁথিয়ে, ছ’মাস পরে রাজা এক দেশে  এলেন । সে দেশে রাজকন্যের উপবনে নীল মানিকের গাছে নীল  গুটিপোকা নীলকান্ত মণির পাতা খেয়ে,জলের মতো চিকন,বাতাসের মতো ফুরফুরে,আকাশের মতো নীল রেশমের গুটি বাঁধে । রাজার মেয়ে সারা রাত ছাদে বসে,আকাশের সঙ্গে রঙ  মিলিয়ে, সেই নীল রেশমের শাড়ি বোনেন । একখানি শাড়ি বুনতে ছ’মাস যায় । রাজকন্যে একটি দিন সেই আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন শাড়ি পরে  শিবের মন্দিরে মহাদেব নীলকণ্ঠের পূজা করেন। ঘরে এসে শাড়ি ছেড়ে দেন,দাসীরা যার কাছে সাত জাহাজ সোনা পায় তার কাছে শারি বেচে। রাজা সাত জাহাজ সোনা দিয়ে আদরিনী সুওরানীর শখের শাড়ি কিনে নিলেন ।

তারপর আর ছ’মাসে রাজার সাতখানা জাহাজ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে  ছোটোরানীর মানিকের চুড়ি, সোনার মল, মুক্তোর মালা, সাধের শাড়ি নিয়ে দেশে এল। তখন রাজার মনে পড়ল বড়রানী বাঁদর চেয়েছেন।

রাজা মন্ত্রীকে বললেন—মন্ত্রীবর,বড় ভুল হয়েছে। বড়রানীর বাঁদর আনা হযনি, তুমি একটা বাদরের সন্ধানে যাও

রাজমন্ত্রী একটা বাঁদরের সন্ধানে চলে গেলেন। আর রাজা শ্বেতহস্তী চড়ে, লোকারণ্য রাজপথ দিয়ে, ছোটরানীর সাধের গহনা, শখের শাড়ি নিয়ে অন্তঃপুরে চলে গেলেন।

ছোটোরানী সাত-মহল বাড়ির সাত-তলার উপরে সোনার আয়না সামনে রেখে সোনার কাঁকুইয়ে চুল চিরে, সোনার কাঁটা সোনার দরি দিয়ে খোঁপা বেঁধে সোনার চিয়াড়িতে সিঁদুর নিয়ে ভুরুর মাঝে টিপ পরছেন, কাজল-লতায় কাজল পেড়ে চোখের পাতায় কাজল পরছেন, রাঙা পায়ে আলতা দিচ্ছেন, সখীরা ফুলের থালা নিয়ে,পানের বাটা নিয়ে রাজরানী ছোটোরানীর  সেবা করছে—রাজা সেখানে এলেন।

স্ফটিকের সিংহাসনে রানীর পাশে বসে বললেন—এই নাও, রানী! মানিকের  দেশে মানিকের  ঘাট,মানিকের বাট—সেখান থেকে হাতের চুড়ি এনেছি। সোনার  দেশে সোনার ধুলো, সোনার বালি—সেখান থেকে পায়ের মল এনেছি । মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর পা, মানিকের ঠোঁট, দুটি পাখি মুক্তোর ডিম পাড়ে । দেশের রানী সেই  মুক্তোর হার গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায় পরেন, ভোরের বেলায় ফেলে দেন । রানী, তোমার জন্যে সেই মুক্তোর হার এনেছি। রানী, এক দেশে রাজার  মেয়ে এক-খী রেশমে সাত-খী সুতো কেটে নিশুতি রাতে ছাদে বসে  ছ’টি মাসে একখানি শাড়ি বোনেন, এক দিন পরে পূজো করেন, ঘরে  এসে ছেড়ে দেন । রানী, আমি সেই রাজার মেয়ের দেশ থেকে সাত  জাহাজ সোনা দিয়ে রাজকন্যার হাতে বোনা শাড়ি এনেছি। তুমি  একবার চেয়ে দেখ ! পৃথিবী খুজে গায়ের গহনা, পরনের শাড়ি আনলুম, একবার পরে দেখ !

রানী -তখন দু’হাতে আটগাছা চুড়ি পরলেন; মানিকের চুড়ি রানীর হাতে  ঢিলে হল, হাতের চুড়ি  কাধে উঠল।

রানী তখন দু’পায়ে দশ-গাছা মল পরলেন; রাঙা পায়ে সোনার মল আল্‌গা হল; দু-পা যেতে দশ-গাছা মল সানের উপর  খসে পড়ল। রানী  মুখ ভার করে  মুক্তোর  হার গলায় পরলেন ; মুক্তোর  দেশের মুক্তোর হার রানীর গলায় খাটো হল, হার পরতে গলার মাস কেটে গেল।  রানী  ব্যথা পেলেন !

সাত-পুরু করে শখের শাড়ি অঙ্গে পরলেন ; নীল রেশমের নীল  শাড়ি হাতে-বহরে কম পড়ল। রানীর চোখে জল এল ।

তখন মানিনী  ছোটরানী আট-হাজার মানিকের আট-গাছা চুড়ি খুলে  ফেলে, নিরেট সোনার দশ-গাছা মল পায়ে ঠেলে, মুক্তোর  মালা,শখের শাড়ি ধুলোয় ফেলে, বললেন—ছাই গহণা ! ছাই  এ-শাড়ি ! কোন পথের কাঁকর কুড়িয়ে এ-চুড়ি গড়ালে ? মহারাজ, কোন দেশের ধুলো বালিতে এ-মল গড়ালে ? ছি ছি, এ কার বাসি মুক্তোর বাসি হার ! এ কোন রাজকন্যার পরা শাড়ি! দেখলে যে ঘৃণা আসে, পরতে যে লজ্জা হয় ! নিয়ে যাও মহারাজ,এ পরা-শাড়ি পরা-গহণায় আমার কাজ নেই ।

রানী অভিমানে গোসা-ঘরে খিল দিলেন । আর রাজা মলিন-মুখে সাত জাহাজ সোনা দিয়ে কেনা সেই সাধের গহনা,শখের শাড়ি নিয়ে রাজসভায় এলেন ।

রাজমন্ত্রী রাজসিংহাসনের এক পাশে, রাজ্যের মাঠ-ঘাট দোকান-পাট সন্ধান করে, যাদুকরের দেশের এক বণিকের জাহাজ থেকে কানা-কড়ি দিয়ে একটি বাঁদরছানা কিনে বসে আছেন ।

রাজা এসে বললেন—মন্ত্রীবর, আশ্চর্য হলুম ! মাপ দিয়ে ছোটরানীর  গায়ের গহনা,পরনের শাড়ি  আনলুম, সে-শাড়ি, সে-গহনা রানীর গায়ে  হল না !

তখন সেই বনের বানর রাজার পায়ে প্রণাম করে বললে—বড় ভাগ্যবতী পুণ্যবতী না হলে দেবকন্যের হাতে বোনা,নাগকন্যের হাতে গাঁথা, মায়া-রাজ্যের এ  মায়া-গহনা, মায়া-শাড়ি পরতে পারে না । মহারাজ, রাজভাণ্ডারে তুলে রাখ, যাকে বৌ করবে তাকে পরতে দিও ।

বানরের কথায় রাজা অবাক হলেন । হাসতে হাসতে মন্ত্রীকে বললেন—মন্ত্রী, বানরটা বলে কি? ছেলেই হল না বৌ আনব কেমন করে ? মন্ত্রী, তুমি স্যাকরার দোকানে ছোটরানীর নতুন গহনা গড়তে দাওগে, তাঁতির তাঁতে রানীর নতুন শাড়ি বুনতে দাওগে। এ-গহনা, এ-শাড়ি রাজভাণ্ডারে তুলে রাখ; যদি বৌ ঘরে আনি তাকে পরতে দেব।

রাজমন্ত্রী স্যাকরার দোকানে ছোটরানীর নতুন গহনা গড়াতে গেলেন । আর রাজা সেই বাঁদর-কোলে বড়রানীর কাছে গেলেন ।

দুঃখিনী বড়রানী, জীর্ণ আঁচলে পা মুছিয়ে,ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় রাজাকে  বসতে দিয়ে কাদঁতে-কাদঁতে বললেন—মহারাজ, বোসো। আমার এই ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বোসো । আমার আর কি আছে তোমায় বসতে দেব ? হায়,মহারাজ,কতদিন পরে তুমি ফিরে এলে,আমি এমনি অভাগিনী তোমার জন্যে ছেঁড়া কাঁথা পেতে দিলুম ।

রানীর কথায় রাজার চোখে জল এল । ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বসে বড়রানীর কোলে বাঁদর-ছানা দিয়ে বললেন—মহারানী, তোমার এ ছেঁড়া কাঁথা ভাঙা ঘর, ছোটরানীর সোনার সিংহাসন, সোনার ঘরের চেয়ে লক্ষ গুণে ভালো । তোমার এ-ভাঙা ঘরে আদর আছে, যত্ন আছে, দুটো মিষ্টি কথা  আছে, সেখানে তা তো  নেই।  রানী,সাত জাহাজ সোনা দিয়ে গায়ের গহনা, পরনে শাড়ী দিয়েছি, ছোটরানী পায়ে ঠেলেছে; আর কানা-কড়ি দিয়ে তোমার বাঁদর এনেছি, তুমি আদর করে কোলে নিয়েছ । রানী, আমি আর তোমায় দুঃখ দেব না । এখন  বিদায় দাও, আমি আবার আসব রানী ! কিন্তু দেখো, ছোটরানী যেন জানতে না পারে ! তোমার কাছে এসেছি শুনলে আর রক্ষে রাখবে না !  হয় তোমায়, নয়তো আমায় বিষ খাওয়াবে ।

রাজা বড়রানীকে প্রবোধ দিয়ে চলে গেলেন । আর বড়রানী সেই ভাঙা ঘরে দুধ-কলা দিয়ে সেই বাঁদরেরর ছানা মানুষ করতে লাগলেন।

এমনি করে দিন যায়। ছোটরানীর সাতমহলে সাতশ দাসীর মাঝে দিন যায়; আর বড়রানীর  ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বাঁদর-কোলে দিন যায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে গেল! বড়রানীর যে দুঃখ সেই দুঃখই রইল, মোটা চালের ভাত, মোটা সুতোর শাড়ি আর ঘুচলো না। বড়রানী সেই ভাঙা ঘরের দুঃখের দুখী, সাথের সাথী বনের বানরকে কোলে নিয়ে ছোটরানীর সাতমহল বাড়ি,সাতখানা ফুলেরবাগানের দিকে চেয়ে চেয়ে কাঁদেন। বানর বড়রানীকে যখন দেখে তখনই রানীর চোখে জল,একটি দিন হাসতে দেখেনা।

একদিন বানর বললে—হ্যাঁ মা,তুই কাদিস কেন? তোর কিসের দুঃখ ? রাজবাড়ির দিকে চেয়ে চেয়ে কেন কাঁদিস, মা ? ওখানে তোর কে আছে?

রানী বললেন—ওরে বাছা,ওখানে আমার সব আছে আমা্র সাতমহল বাড়ি আছে,সাতশ দাসী আছে,সাতসিন্দুক গহনা আছে, সাতখানা মালঞ্চ আছে। আর বাছা, ওই সাতমহল বাড়িতে রাজার ছোটোরানী আমার এক সতীন আছে। সেই রাক্ষসী আমার রাজাকে জাদু করে আমার সাতমহল বাড়ি, সাতশ দাসী, সাত সিন্দুক গহনা কেড়ে নিয়ে ওই ফুলের মালঞ্চে সোনার মন্দিরে সুখে আছে; আমার সর্বস্বধন রাজাকে নিয়ে আমায় পথের কাঙ্গালিনী করেছে। ওরে বাছা, আমার কিসের দুঃখ! আমি রাজার মেয়ে ছিলুম, রাজার বৌ হলুম, সাতশ দাসী পেলুম, সাতমহল বাড়ি পেলুম, মনের মত রাজস্বামী পেলুম। সব পেলুম তবু কে জানে কার অভিশাপে, চিরদিনে পেলুম না কেবল রাজার কোলে দিতে সোনার চাঁদ রাজপুত্র! হায়, কতজন্মে কত পাপ করেছি, কত লোকের কত সাধে বাধ সেধেছি, কত মায়ের প্রাণে ব্যথা দিয়েছি, তাই এজন্মে সোনার সংসার সতীনকে দিয়ে, রানীর গরবে, স্বামীর সোহাগে, রাজপুত্রের আশায় ছাই দিয়ে পথের কাঙ্গালিনী হয়েছি! বাছারে, বড় পাষাণী তাই এতদিন এত অপমান, এত যন্ত্রণা বুকে সয়ে বেঁচে আছি!

 

***

 

The golden ship unfurled its golden sails and sailed across the endless blue waters of the sea towards the west like a golden cloud.

The Duorani lay on her tattered bed in her broken down room and gazed towards the blue sea. The beloved Shuyorani fell asleep on her golden bed, listening to the golden plumed song birds in their golden cages as she thought of the jewellery she would soon have and her seven hundred hand maidens sat about her.

The king too forgot his sorrowful elder queen as soon as he boarded the ship. All he remembered was the smiling face of the younger queen on the day he had left her.  He thought of her all day; what was she doing then? Perhaps she was doing her hair. What was she doing now? She must have been colouring the soles of her feet; now she must be collecting flowers now from the seven gardens to make garlands from seven baskets filled with blooms while she thinks of me. As she remembers me, her eyes well with tears and the garlands never get made. The golden thread and the basket lie at her feet; she sits there sleepless with worry.

The young Shuyorani is his one love, he only thinks of her. He never once remembers the older queen, the one who is madly in love with him.

The king spent twelve months at sea roaming various lands.

In the thirteenth month the king came to the land of the rubies.

In the land of rubies everything was made of that precious stone. The walls were made of stones as were the steps by the river and the gravel on the streets. The king had bracelets made for his younger queen. The eight thousand stones on her eight bracelets glowed red like droplets of blood on skin.

With the bracelets of rubies, he journeyed to the land of gold. He bought ten pairs of solid gold anklets from the gold smiths of the land. The anklets shone like molten fires, they rang against each other like the tinkling of cymbals and the flourish of veenas.

After he had bought the ruby bracelets from the land of rubies and the golden anklets from the land of gold his ship arrived in the land of pearls.

The king of the land had two pigeons in his gardens. They had feet of pearl and beaks of rubies with which they plucked pearl fruit from emerald trees and laid pearl eggs. His queen made garlands in the evening from those eggs, dressed her hair with them at night and threw them away each day at dawn.

Her maids took those cast offs to sell them at the markets for a ship filled with silver.

Our king bought one of those necklaces with a ship’s cargo of silver for the slender throat of Shuyorani.

Six months after he had bought the bracelets of rubies, the anklets of gold and the necklace of pearls, the king arrived in a new land. In the pleasure gardens of the princess of that land, blue silkworms grew upon sapphire trees. They fed on blue leaves and wove cocoons of blue silk that was as silky as water, as light as the air and as blue as the sky. The princess sat upon her roof all night and wove a blue sari to match the colour of the sky above her. Each sari took her six months. The princess wore the sari which was as silky as water, as light as the air and blue as the sky on the day that she worshipped at the temple of the blue throated god Lord Shiva. When she came home from the temple she discarded the sari on the floor and her handmaidens sold it to anyone who could pay them with seven ships filled with gold. Our king bought this sari for his beloved with seven ships worth of gold.

Six more months passed after that and then the seven ships traversed the seven seas and the thirteen rivers and came back to his own country with rubies for the queen’s arms, gold for her ankles, pearls for her neck and a sari as blue as the sky for her form. Now the king remembered that Duorani had asked for a monkey.

The kind said to his minister, ‘There has been a mistake. I do not have the monkey that the older queen wanted; you must go and look for one.’

The minister went off in search of a monkey. The king rode on a white elephant along streets filled with cheering subjects and went to the palace with all the jewellery and the sari for the younger queen.

She was sitting in the palace with the seven floors, on the seventh floor. She had a golden mirror before her and she combed her hair with a golden comb, tied it with golden cords and fixed it with pins of gold before using a golden nib to paint a dot between her eyebrows. She then drew kohl lines on her eyes, applied red dye to her feet and allowed her handmaidens to tend to her with flowers and trays of mouth freshener. The king came to see her there.

He sat by his queen on a crystal throne and said, ‘Here is what you asked for, my queen! In the land of rubies, the very steps are made of rubies! From there I have brought you bracelets for your arms. In the land of gold the very dust is made of gold! From there I brought you anklets for your feet. In the land of pearls the pigeons with feet of pearls and beaks of rubies lay eggs of pearl. The queen makes necklaces from them, wears them at night and throws them away at dawn. From there I bought them for you. In another country the princess weaves seven measures of silken thread from one measure of silk and sits up at night for six months to make herself a sari. She wears this for a day and never touches it again. I bought that sari for seven ships filled with the yellowest gold, so that you might have it. Here it is! I have roamed the world to bring you jewels for your throat and silk for your skin, wear them once, for me.

The queen then pulled the eight bracelets over her hands but the rubies hung limply against her arms and the bangles rode all the way to her shoulders.

She drew the anklets on to her feet but they were loose about her ankles; as she walked but two paces, they fell off her feet with a clanging sound. She sullenly fastened the pearl necklace around her throat; but the pearls from the land of pearls were too tight around her neck and cut into her flesh, hurting her.

She wore the sari after wrapping it around herself seven times but the blue silk sari was too short for her. Tears welled in her eyes.

The petulant young queen then pulled off the bracelets with their eight thousand rubies, the solid gold anklets, the pearls about her throat and the treasured sari! She said – Fie on these jewels, this sari! Where did you get the pebbles to make these bracelets? Where did you gather the dust to make these anklets? Shame on you for bringing me someone else’s cast off pearls! I hate the sight of this used sari, I am ashamed to wear them all! Take these away king, for I have no use for these old things!

The queen then locked herself in her chamber of anger and sulked. The king grew sombre and brought the sari and the jewels he had bought with seven ships filled with gold to his court.

The minister sat waiting by the king’s throne with a baby monkey that he had bought from a merchant from the land of magic for just a coin.

The king said to his minister, ‘How strange, minister that the things I had made for my younger queen do not fit her!’

The wild monkey then paid his respects to the king and said – Only the very fortunate are allowed to wear what the daughters of gods and snakes weave and make for themselves; these jewels and saris from the lands of make-believe. Put these away in the royal treasury, give them to your daughter-in-law when she comes into the family.

The king was astonished at the monkey’s words. He laughed and said to the minister, ‘What is this monkey saying? I do not even have a son yet! How will I greet a granddaughter-in-law? Go and order new jewels for the younger queen and new saris from the weavers. Put these jewels and clothes away in the royal treasuries for now; if there is ever a daughter-in-law in this house, she will have all these.’

The minister went to the goldsmith to order new jewels for the young queen. The king went to the older queen with the monkey she had wished for.

The unfortunate queen wiped his feet with the end of her threadbare sari, and made the king sit on a tattered mat in her broken room. She wept and said, ‘Sit down, my king. This is all I have to give you as a seat after all these days of absence. How miserable am I!’

The king’s eyes filled with tears when he heard her words. He gave her the monkey child as he sat in her broken room upon her tattered quilt. He said, ‘My queen, your tattered rags and broken doors are a million times better than the other queen’s thrones and rooms of gold. There is kindness and compassion here, there are sweet words to be heard; she has none of that. She kicks away the jewels I bought and the  sari I gave her. Yet, you are embracing the monkey I gave you which did not cost anywhere near that amount. I will not be the cause of your sorrow any more. Bid me farewell, I will return to you again, my queen. But beware, let not the young queen hear of this. She will not rest if she hears of this; she will either poison you and kill me.

The king went away after consoling the queen. She continued to live in her broken room raising the monkey on milk and bananas.

The days passed, as days always do. The younger queen spent her days in the palace with the seven floors surrounded by seven hundred hand maidens; while the older queen lay on a tattered rag in her broke down room, hugging a monkey to her bosom. Days became months and months turned into years. The older queen’s plight did not change; she had coarse rice to eat and coarse clothes to wear. She lay on her broken room, clutched her only companion the monkey to her breast and wept as she looked at the palace and its seven gardens. The monkey always saw her with tears in her eyes.

One day it asked, ‘Mother why do you cry? Why do you cry as you look at the palace? Whom have you lost there?’

The queen said, ‘Child, I have everything there. I have a house with seven floors, seven hundred hand maidens to serve my every need, seven chests filled with jewels and seven gardens to wander in. But in that seven floored palace lives my rival, the younger queen. That witch has cast a spell on my king and taken my house, my maids and my jewels from me; she lives happily in my gardens while I live in poverty. Dear child, what sorrow do I have! I was a king’s daughter, I became a king’s wife with seven hundred handmaidens and a seven floored palace; my husband was what I had dreamed of. I had everything but some curse meant that I could never give the king the heir he desired; a prince as precious as burnished gold! I must have sinned so much, been in the way of so many wishes being fulfilled, hurt so many mothers’ feelings and that is why I have to see my position taken by a usurper who has my all; while I taste only the ashes of disappointment after losing my king and kingdom and with it all hopes of giving him a prince. My child, I am so stony hearted that such ignominy and pain has not been able destroy me.’

 

 

 

Two Rabindrasangeets based on Raga Paraj, a pre-dawn Raga of the Purvi Thaat: হৃদয়ে তোমার দয়া যেন পাই/Hridoye Tomar Doya Jeno Pai and তব প্রেম সুধারসে মেতেছি/Tobo Premo shudharoshe

 

 

Raga Paraj, a pre-dawn Raga of the Purvi Thaat and two Rabindrasangeets based on the raga

First, the raga, by Faiyaz Khan: Manmohan Brij Ko Rasiya

http://youtu.be/1jHh4HaWdig

 

***

Rabindrasangeet in the same raga:

হৃদয়ে তোমার দয়া যেন পাই।
সংসারে যা দিবে মানিব তাই,
হৃদয়ে তোমায় যেন পাই ॥
তব দয়া জাগিবে স্মরণে
নিশিদিন জীবনে মরণে,
দুঃখে সুখে সম্পদে বিপদে তোমারি দয়া-পানে চাই–
তোমারি দয়া যেন পাই ॥
তব দয়া শান্তির নীরে অন্তরে নামিবে ধীরে।
তব দয়া মঙ্গল-আলো
জীবন-আঁধারে জ্বালো–
প্রেমভক্তি মম সকল শক্তি মম তোমারি দয়ারূপে পাই,
আমার ব’লে কিছু নাই ॥

 

রাগ: পরজ
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1316
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

 

Oh, that I may have your compassion within my soul
Whatever you hand to me in life I will bear,
If only I have you within my soul.
Your compassion as beacon to remind me
Eternally in life and in death
In sorrow and joy, in plenty and strife, of your presence -
Only if I have your compassion.
Your mercy will descend, blessings gentle upon my soul.
Your mercy shall be a flame of sanctity
In the midst of darkness befalling my life -
My love and my respect, all the strength within me,
All these are signs of your compassion alone,
For without you I have nothing of my own.

 

Raga: Paraj

Beat: Tritaal

Written: 1909

 

Follow the link to hear Ashoketaru Bandopadhyay sing:

***

 

 

তব প্রেম সুধারসে মেতেছি,

                          ডুবেছে মন ডুবেছে।। 

               কোথা কে আছে নাহি জানি–

    তোমার মাধুরীপানে মেতেছি, ডুবেছে মন ডুবেছে।।

 

রাগ: পরজ
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1292
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1885

 

I am intoxicated in the sweetness of your love

My mind is lost.

I do not know where the others are -

For I am taken up with drinking in your ambrosia,

My mind I have lost.

 

Raga: Paraj

Beat: Tritaal

Written: 1885

 

Follow the link to hear Ustad Rashid Khan sing:

 

 

 

Tagore: by Philip Salom, Australian poet

If the dates are correct, Rabindranath Tagore – whose 150th birthday has just passed – lived a life as brilliantly symmetrical as he was brilliantly talented: born on May 7 in 1861 and dying on August 7, 1941. In the west he is usually considered a great poet (for which he won the Nobel Prize in 1913) but throughout his remarkable eighty years he proved himself the most extraordinary person of the ‘Indian Renaissance’, publishing 30 or so collections of poetry, eight novels, four novellas, ten books of essays, several collections of critical writings and speeches on the culturally central subjects of literature, history, politics and religion. He wrote possibly as many as 2000 songs, including the music, and a large number of dramas, many of them also ‘musicals’. Just for variety, towards the end of his life he took up painting and print-making. But there was more…

Tagore (Thakur) was born into a high caste Brahmin family and began writing from an early age. He was educated in Bengal, and later England, where he attended public schools and University but he left greatly disillusioned with an education system based, as he saw it, on military discipline. This was sadly consistent, in his view, with the dynamics of British colonisation in India and Africa. The same obsession with control was behind Britain’s domination of nature through resource-mining world-wide, with industry and over-reaching commerce. This abuse of nature by force and self-interest was something Tagore was deeply against, so he would now look very much the environmentalist in his overall philosophy. He eventually completed his university education in India.

But his travels left him with a passion to see India as a world nation, as a continually growing culture to be understood on equal terms with western culture, not reduced by empirical condescension to being “oriental’, and ‘Eastern’; these paradigms of definition all too often meant exotic, brooding, playful, magical, and superficial, a presence full of colour and surface and brilliantly fascinating – but not to be taken quite seriously compared to Western achievements.  This was what eventually happened to Tagore’s own profile in the West: taken up suddenly with the first translation into English of his poems in Gitanjali, lauded by WB Yeats and Ezra Pound, made famous as a major world poet by major world poets, awarded the Nobel Prize; and then in a few years came a quite rapid re-evaluation of him as not so important after all. England ‘orientalised’ him.

Image

How rare he was. This man used his Nobel Prize money to establish an ‘alternative’ secondary school and an Agricultural Bank. The former was free, and accepted boys and girls studying the same curriculum; and the latter was a banking system devised to allow peasant farmers to pay off their debts to their landlords and become self-reliant. This rural reconstruction work was opposed to Gandhi’s notion of Swaraj, a rejection of the state as epitomised by British rule. Tagore did not want India to become a traditionalist state but one that took the best of the West and applied it, freely, in agriculture as elsewhere. Tagore taught in the school (Santiniketan) and later travelled extensively throughout Bengal to raise funds for its continuation; the students travelled also, performing plays and musical works – often written by Tagore for this purpose. Students studied each morning and balanced intellectual work with afternoon involvement in community activities, music, sport and physical work, making up a diverse and socially-integrated curriculum. It must have been a fascinating school. Later he added a World University (Visva Bharati ) with international lecturers and students and even more travels by himself, internationally, to generate funding and interest.

Tagore was an educationalist, administrator, critic, humanist, lifelong commentator on politics, friend of Gandhi and famous figures like Einstein, a man who lectured throughout the US and Europe and Japan, someone never afraid of being open but also critical of his and these other major cultures. He supported Gandhi’s ideas of Satygraha but was troubled by the divisions he saw Gandhi’s politics were creating between Hindu and Muslim, and Gandhi later admitted Tagore had been prescient in this criticism. Tagore also wished to see the Untouchables integrated into the social system.
When the British massacred up to 1500 unarmed people at a political gathering in Jallianwala Bagh he returned his earlier-awarded Knighthood. During his life he lost his wife early (she was only 29), then his father, his daughter, his mother and two of his sons. Grief underlies many of his poems, regardless of the celebration of nature and humanity found everywhere in them. No champion of the privileged, his poems and fiction works focus on ordinary people, especially women, and trace deep chords of loss and loneliness within their music. He often cast Untouchables as heroes in his writings.
One early influence on his poetic was the ancient Sanskrit poet Kalidasa, a great figure in the tradition of a poetry that is suffused with philosophy and religion, who is said to have lived in the 4th Century, and a later influence came in the works of the Bakhti Sufi poet Kabir. Sufism and poetry have a strong history and Tagore was greatly impressed by this achievement even though he was not a Sufi and really can’t be called a philosopher. He was an accessible poet whose songs were extremely popular and whose poems and stories were familiar nationally. Tagore was himself was a strikingly flexible poet, using strict and loose forms, prose poems, poems of philosophy alongside intense lyrics and broader, descriptive poems. In the 30s he also took on a more Western Modernism and experimented with various of its styles, especially a narrative-based, vernacular and ‘low’ literature approach.
During the 20C he became a towering influence, not only in India, but throughout Asia, all the way down to Indonesia, where the Hindu people of Bali venerated him.

 

 

http://www.philipsalom.com/Shorts/tagore_an_amazing_life

সেই ভালো সেই ভালো/ Shei Bhalo Shei Bhalo/ Let it then be thus, pretend then not to know me

সেই ভালো সেই ভালো, আমারে নাহয় না জানো।
দূরে গিয়ে নয় দুঃখ দেবে, কাছে কেন লাজে লাজানো ॥
মোর বসন্তে লেগেছে তো সুর, বেণুবনছায়া হয়েছে মধুর–
থাক-না এমনি গন্ধে-বিধুর মিলনকুঞ্জ সাজানো।
গোপনে দেখেছি তোমার ব্যাকুল নয়নে ভাবের খেলা।
উতল আঁচল, এলোথেলো চুল, দেখেছি ঝড়ের বেলা।
তোমাতে আমাতে হয় নি যে কথা মর্মে আমার আছে সে বারতা–
না বলা বাণীর নিয়ে আকুলতা আমার বাঁশিটি বাজানো ॥

রাগ: খাম্বাজ
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): চৈত্র, ১৩৩২
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1926
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Abanindranath Tagore-

Let it then be thus, pretend then not to know me
Go far away and cause me pain, why stay close and cause of my blushes of shame
My spring is filled with song,                 the shade of bamboo groves grow ever sweeter
Why not let these bowers of love stay perfumed like this forever
Secretly I have watched your anxious eyes as feelings play across them
Your careless attire, your undone hair, as you yield to the storm
The words that we are yet to speak,                lie in wait within my soul
My flute I play with the passion, I cannot bring myself to utter aloud

Raga: Khamaj
Beat: Dadra
Written: Chaitra, 1332, CE 1926
At Santiniketan
Score: Dinendranath Tagore

Follow the link to hear Sagar Sen sing: http://youtu.be/RwvL1x1zfnc