ঘরে বাইরে /বিমলার আত্মকথা/Bimala’s Story

তিনি হয়তো ভাবলেন, আমি লুকিয়ে পুণ্য অর্জন করছি। কিন্তু, নয়, নয়, সে আমার পুণ্য নয়— সে আমার নারীর হৃদয়, তার ভালোবাসা আপনিই পূজা করতে চায়।

আমার শ্বশুর-পরিবার সাবেক নিয়মে বাঁধা। তার কতক কায়দা-কানুন মোগল পাঠানের, কতক বিধিবিধান মনুপরাশরের। কিন্তু আমার স্বামী একেবারে একেলে। এ বংশে তিনিই প্রথম রীতিমত লেখাপড়া শেখেন আর এম. এ. পাস করেন। তাঁর বড়ো দুই ভাই মদ খেয়ে অল্প বয়সে মারা গেছেন ; তাঁদের ছেলেপুলে নেই। আমার স্বামী মদ খান না, তাঁর চরিত্রে কোনো চঞ্চলতা নেই ; এ বংশে এটা এত খাপছাড়া যে সকলে এতটা পছন্দ করে না, মনে করে যাদের ঘরে লক্ষ্মী নেই অত্যন্ত নির্মল হওয়া তাদেরই সাজে। কলঙ্কের প্রশস্ত জায়গা তারার মধ্যে নেই, চাঁদের মধ্যেই আছে।

He might have thought I was gathering my blessings in secret. But no, not at all, those were  not my blessings, it was my woman’s heart; the love that lives there, it wants to give itself up in worship.

My in-laws followed the old ways. Some of their rules came from the Mughals and the Pathans, some from the laws laid down by Manu. But my husband was completely modern. He was the first in the family to get a proper education and earn a Masters degree. His two older brothers drank themselves to death at an early age; they had no children. My husband does not drink alcohol, there is no restlessness in his  nature. This is  so against the nature of the family that not everyone likes him, they are of the opinion that being so faultless is a sign of poverty. They do not put up with such imagined failings in the way the moon seems to embrace the marks upon her face.

বহুকাল হল আমার শ্বশুর-শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। আমার দিদিশাশুড়িই ঘরের কর্ত্রী। আমার স্বামী তাঁর বক্ষের হার, তাঁর চক্ষের মণি। এইজন্যেই আমার স্বামী কায়দার গণ্ডি ডিঙিয়ে চলতে সাহস করতেন। এইজন্যেই তিনি যখন মিস গিল্‌‍বিকে আমার সঙ্গিনী আর শিক্ষক নিযুক্ত করলেন তখন ঘরে বাইরে যত রসনা ছিল তার সমস্ত রস বিষ হয়ে উঠল, তবু আমার স্বামীর জেদ বজায় রইল।

সেই সময়েই তিনি বি. এ. পাস করে এম. এ. পড়ছিলেন। কলেজে পড়বার জন্যে তাঁকে কলকাতায় থাকতে হত। তিনি প্রায় রোজই আমাকে একটি করে চিঠি লিখতেন, তার কথা অল্প, তার ভাষা সাদা, তাঁর হাতের সেই গোটা গোটা গোল গোল অক্ষরগুলি যেন স্নিগ্ধ হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকত।

একটি চন্দনকাঠের বাক্সের মধ্যে আমি তাঁর চিঠিগুলি রাখতুম আর রোজ বাগান থেকে ফুল তুলে সেগুলি ঢেকে দিতুম। তখন আমার সেই রূপকথার রাজপুত্র অরুণালোকে চাঁদের মতো মিলিয়ে গেছে। সেদিন আমার সত্যকার রাজপুত্র বসেছে আমার হৃদয়-সিংহাসনে। আমি তাঁর রানী, তাঁর পাশে আমি বসতে পেরেছি ; কিন্তু তার চেয়ে আনন্দ, তাঁর পায়ের কাছে আমার যথার্থ স্থান।

My parents-in-law had passed away a long time ago. My grandmother-in-law was  the matriarch of the home. My husband was her favourite. This was why he had managed to overcome some of the restrictions that were in place. This is why when he appointed Miss Gilbey as my companion and teacher, every tongue in the house dripped poison, but my husband was able to maintain his stand.

That was when he was studying his Masters course.He had to stay in Kolkata as that was where the college was. He wrote to me almost every day, a few words, in a simple fashion, the rounded even letters seeming to smile up at me from the page.

I used to put these letters away in a sandalwood box and cover them with fresh flowers from the garden each day. The fairy tale prince had now vanished like the moon surrendering to the sun during the daytime. My real prince was now seated on the throne of my heart. I was his queen, I was able to  sit next to him, but I had more pleasure in knowing my appropriate place was at his feet.

আমি লেখাপড়া করেছি, সুতরাং এখনকার কালের সঙ্গে আমার এখনকার ভাষাতেই পরিচয় হয়ে গেছে। আমার আজকের এই কথাগুলো আমার নিজের কাছেই কবিত্বের মতো শোনাচ্ছে। এ কালের সঙ্গে যদি কোনো-একদিন আমার মোকাবিলা না হত তা হলে আমার সেদিনকার সেই ভাবটাকে সোজা গদ্য বলেই জানতুম— মনে জানতুম মেয়ে হয়ে জন্মেছি এ যেমন আমার ঘর-গড়া কথা নয় তেমনি মেয়েমানুষ প্রেমকে ভক্তিতে গলিয়ে দেবে এও তেমনি সহজ কথা, এর মধ্যে বিশেষ কোনো-একটা অপরূপ কাব্যসৌন্দর্য আছে কি না সেটা এক মুহূর্তের জন্যে ভাববার দরকার নেই।

কিন্তু সেই কিশোর বয়স থেকে আজ এই যৌবনের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতে আর-এক যুগে এসে পড়েছি। যেটা নিশ্বাসের মতো সহজ ছিল এখন সেটাকে কাব্যকলার মতো করে গড়ে তোলবার উপদেশ আসছে। এখনকার ভাবুক পুরুষেরা সধবার পাতিব্রত্যে এবং বিধবার ব্রহ্মচর্যে যে কী অপূর্ব কবিত্ব আছে, সে কথা প্রতিদিন সুর চড়িয়ে চড়িয়ে বলছেন। তার থেকে বোঝা যাচ্ছে জীবনের এই জায়গায় কেমন করে সত্যে আর সুন্দরে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এখন কি কেবলমাত্র সুন্দরের দোহাই দিলে আর সত্যকে ফিরে পাওয়া যাবে?

I had been educated, thus my acquaintance with the  present was on my own terms in a language I knew. These words sound rather poetic to me. If I did not have to deal  with the present, I would have called that feeling prosaic – just as the fact that I am a woman by virtue of birth is not something I have made up, the tendency of women to distill respect from love is also natural; there is no need to  try and find a sense of the poetic in this natural progression of things.

But somewhere, in between my childhood and my youth, I arrived at a different place altogether. Something that had been as natural as breathing suddenly became something as complex as poetry. Today sentimental men talk increasingly loudly about the wonderful poetry in a married woman’s devotion to her duties and a widow’s celibacy. This will make it clear how there is a distinct schism between truth and beauty at this point. Can truth be brought back for the sake of beauty alone?

মেয়েমানুষের মন সবই যে এক-ছাঁচে-ঢালা তা আমি মনে করি নে। কিন্তু এটুকু জানি, আমার মনের মধ্যে আমার মায়ের সেই জিনিসটি ছিল, সেই ভক্তি করবার ব্যগ্রতা। সে যে আমার সহজ ভাব তা আজকে স্পষ্ট বুঝতে পারছি যখন সেটা বাইরের দিক থেকে আর সহজ নেই।

এমনি আমার কপাল, আমার স্বামী আমাকে সেই পূজার অবকাশ দিতে চাইতেন না। সেই ছিল তাঁর মহত্ত্ব। তীর্থের অর্থপিশাচ পাণ্ডা পূজার জন্যে কাড়াকাড়ি করে, কেননা সে পূজনীয় নয় ; পৃথিবীতে যারা কাপুরুষ তারাই স্ত্রীর পূজা দাবি করেথাকে। তাতে পূজারি ও পূজিত দুইয়েরই অপমানের একশেষ।

কিন্তু, এত সেবা আমার জন্যে কেন? সাজসজ্জা দাসদাসী জিনিসপত্রের মধ্যে দিয়ে যেন আমার দুই কূল ছাপিয়ে তাঁর আদরের বান ডেকে বইল। এই-সমস্তকে ঠেলে আমি নিজেকে দান করব কোন্‌ ফাঁকে! আমার পাওয়ার সুযোগের চেয়ে দেওয়ার সুযোগের দরকার অনেক বেশি ছিল। প্রেম যে স্বভাববৈরাগী ; সে যে পথের ধারে ধুলার ’পরে আপনার ফুল অজস্র ফুটিয়ে দেয়, সে তো বৈঠকখানার চীনের টবে আপনার ঐশ্বর্য মেলতে পারে না।

I do not believe that all feminine minds are made in the same mould. But I do know that one thing that  my mind had inherited from my mother was her eagerness to please through respect. Today, when that has become harder  to do outwardly, I begin to understand it as a part of my mentality.

My luck was such that my husband did not give me a chance to shower him with that devotion. That was his greatness. The priests at a temple who squabble over the offerings, do  so because they are not worth the worship themselves. Only the coward wants his wife to be devoted to him; that is demeaning to both the servile as well as to he who receives it.

But why was so much given to me?  He gave me servants and material  things, he gave me everything possible till I could have no more. How could I give these up and give myself to him? I needed to have a chance to give a lot more than the chance to receive. Love is by nature, needy. It blooms in the dust of neglect, rather than in a flower pot in a living room

আমাদের অন্তঃপুরে যে-সমস্ত সাবেক দস্তুর চলিত ছিল আমার স্বামী তাকে সম্পূর্ণ ঠেলতে পারতেন না। দিনে-দুপুরে যখন-তখন অবাধে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হতে পারত না। আমি জানতুম ঠিক কখন তিনি আসবেন ; তাই যেমন-তেমন এলোমেলো হয়ে আমাদের মিলন ঘটতে পারত না। আমাদের মিলন যেন কবিতার মিল ; সে আসত ছন্দের ভিতর দিয়ে, যতির ভিতর দিয়ে। দিনের কাজ সেরে, গা ধুয়ে, যত্ন করে চুল বেঁধে, কপালে সিঁদুরের টিপ দিয়ে,কোঁচানো শাড়িটি প’রে, ছড়িয়ে-পড়া দেহ-মনকে সমস্ত সংসার থেকে সম্পূর্ণ ফিরিয়ে এনে একজনের কাছে একটি বিশেষ সময়ের সোনার থালায় নিবেদন করে দিতুম। সেই সময়টুকু অল্প, কিন্তু অল্পের মধ্যে সে অসীম।

আমার স্বামী বরাবর বলে এসেছেন, স্ত্রীপুরুষের পরস্পরের প্রতি সমান অধিকার, সুতরাং তাদের সমান প্রেমের সম্বন্ধ। এ নিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে কোনোদিন তর্ক করি নি। কিন্তু আমার মন বলে, ভক্তিতে মানুষকে সমান হবার বাধা দেয় না। ভক্তিতে মানুষকে উপরের দিকে তুলে সমান করতে চায়। তাই সমান হতে থাকবার আনন্দ তাতে বরাবর পাওয়া যায়, কোনোদিন তা চুকে গিয়ে হেলার জিনিস হয়ে ওঠে না। প্রেমের থালায় ভক্তি পূজা আরতির আলোর মতো— পূজা যে করে এবং যাকে পূজা করা হয় দুয়ের উপরেই সে আলো সমান হয়ে পড়ে। আমি আজ নিশ্চয় জেনেছি, স্ত্রীলোকের ভালোবাসা পূজা করেই পূজিত হয়— নইলে সে ধিক্‌ ধিক্‌। আমাদের ভালোবাসার প্রদীপ যখন জ্বলে তখন তার শিখা উপরের দিকে ওঠে— প্রদীপের পোড়া তেলই নীচের দিকে পড়তে পারে।

My husband had been unable to give up completely all the old fashioned rules of the inner quarters. We could never meet whenever we pleased, whether during the day or at night.  I always knew exactly when he would come;  therefore we could were never spontaneous. Our unions were like rhyme in poetry; through rhythm and in punctuated breaks. At the end of  the day, after the housework was done, I would have a bath, do my hair with care, put on a red vermilion dot on my forehead, wear a folded saree, bring my body and mind back from the wanderings of the day and offer myself up to one person at a specific time, on a golden platter. That time was short but it meant the world.

My husband has always said, men and women hold equal rights to each other, therefore they must love equally. I never argued with him over this. But  my mind says that, respect does not prevent people from being equal. It seeks to lift people to  the same heights and make them equal. That is why the joy of being equal can be experienced continually. it never becomes tedious. The offering of respect and love is like the holy flame, both worshipped and worshipper are equally illuminated. I know with certainty today that a woman’s love is sanctified when it is offered, other wise it flickers wanly. When the flame of love burns, it rises higher, the oil spills from the lamp only when there is no flame.

প্রিয়তম, তুমি আমার পূজা চাও নি সে তোমারই যোগ্য, কিন্তু পূজা নিলে ভালো করতে। তুমি আমাকে সাজিয়ে ভালোবেসেছ, শিখিয়ে ভালোবেসেছ, যা চেয়েছি তা দিয়ে ভালাবেসেছ, যা চাই নি তা দিয়ে ভালাবেসেছ, আমার ভালোবাসায় তোমার চোখে পাতা পড়ে নি তা দেখেছি, আমার ভালোবাসায় তোমার লুকিয়ে নিশ্বাস পড়েছে তা দেখেছি। আমার দেহকে তুমি এমন করে ভালোবেসেছ যেন সে স্বর্গের পারিজাত, আমার স্বভাবকে তুমি এমনি করে ভালোবেসেছ যেন সে তোমার সৌভাগ্য! এতে আমার মনে গর্ব আসে, আমার মনে হয় এ আমারই ঐশ্বর্য যার লোভে তুমি এমন করে আমার দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছ। তখন রানীর সিংহাসনে বসে মানের দাবি করি ; সে দাবি কেবল বাড়তেই থাকে, কোথাও তার তৃপ্তি হয় না। পুরুষকে বশ করবার শক্তি আমার হাতে আছে এই কথা মনে করেই কি নারীর সুখ, না তাতেই নারীর কল্যাণ? ভক্তির মধ্যে সেই পর্বকে ভাসিয়ে দিয়ে তবেই তার রক্ষা। শংকর তো ভিক্ষুক হয়েই অন্নপূর্ণার দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু এই ভিক্ষার রুদ্রতেজ কি অন্নপূর্ণা সইতে পারতেন যদি তিনি শিবের জন্যে তপস্যা না করতেন?

আজ মনে পড়ছে সেদিন আমার সৌভাগ্যে সংসারে কত লোকের মনে কত ঈর্ষার আগুন ধিকিধিকি জ্বলেছিল। ঈর্ষা হবারই তো কথা— আমি যে অমনি পেয়েছি, ফাঁকি দিয়ে পেয়েছি। কিন্তু ফাঁকি তো বরাবর চলে না। দাম দিতেই হবে। নইলে বিধাতা সহ্য করেন না— দীর্ঘকাল ধরে প্রতিদিন সৌভাগ্যের ঋণ শোধ করতে হয়, তবেই স্বত্ব ধ্রুব হয়ে ওঠে। ভগবান আমাদের দিতেই পারেন, কিন্তু নিতে যে হয় নিজের গুণে। পাওয়া জিনিসও আমরা পাই নে এমনি আমাদের পোড়া কপাল।

Dearest, that you did not want me to worship you is typical of your nature, but it would have been better had you allowed it. You have loved me by dressing me up, by teaching me, by giving whatever I wanted and what I did not ask for, I have seen you forgetting to blink at the intensity of my love, I have seen you sigh at the intensity of my love. You have loved my body as though it was a heavenly flower, you have loved  my nature as though that was your good fortune. This has given me pride, it has made me  feel as though, you had come to ask for a share of my wealth. That is when I felt like  sitting  on the queen’s throne and demanding respect. This demand keeps increasing, it is never satisfied. Is it a woman’s happiness or her well being that depends on the knowledge that she can control men? This pride needs to be offered  up along with respect to render it harmless. Shiva came to Annapurna as a mendicant begging for alms, but would Annapurna have been able to bear Shiva’s ferocious aura if she had not prayed for him?

Today I remember how many people were overcome by the flickering flames of jealousy at my good  fortune at the time. Jealousy was natural. I had received without asking, hence it had to follow that I had received through deception. but deception cannot go on forever; a price must be paid. Other wise our Maker finds it intolerable – one has to pay one’s debt to good fortune each day for a long time, .only then does it become a constant truth. Our Maker can always give us, but the taking depends on ourselves. Sometimes even something we have received may remain out of reach, simply because of our misfortune.

5 thoughts on “ঘরে বাইরে /বিমলার আত্মকথা/Bimala’s Story

  1. বাঃ !
    তাঁর মনের কথাগুলি এইভাবে হৃদয়ঙ্গম করে
    ইংরিজিতে অনন্য ভাবে উপস্থাপনা,
    যথেষ্ট প্রশংসার দাবী রাখে !
    চরৈবেতি………

  2. Ruma, bheeshon bhalo lagchhe…tomar raat jaga sharthok! Ki oboleelakrome tumi ki shohoj bhashaye translate koro…daroon ekta project haate niyechho, onek onke shubhechchha, ashakori kono publisher-er chokhe porbe. These need to be published some day.

Comments are closed.