স্ত্রীর পত্র /Streer Potro/ A wife’s letter to her husband

কিন্তু আমি আর তোমাদের সেই সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলিতে ফিরব না। আমি বিন্দুকে দেখেছি সংসারের মাঝখানে মেয়েমানুষের পরিচয়টা যে কী তা আমি পেয়েছি। আর আমার দরকার নেই ।

তার পরে এও দেখেছি, ও মেয়ে বটে তবু ভগবান ওকে ত্যাগ করেন নি। ওর উপরে তোমাদের যত জোরই থাক্‌-না কেন, সে জোরের অন্ত আছে। ও আপনার হতভাগ্য মানবজন্মের চেয়ে বড়ো। তোমরাই যে আপন ইচ্ছামতো আপন দস্তুর দিয়ে ওর জীবনটাকে চিরকাল পায়ের তলায় চেপে রেখে দেবে, তোমাদের পা এত লম্বা নয়। মৃত্যু তোমাদের চেয়ে বড়ো। সেই মৃত্যুর মধ্যে সে মহান — সেখানে বিন্দু কেবল বাঙালি ঘরের মেয়ে নয়, কেবল খুড়ততো ভায়ের বোন নয়, কেবল অপরিচিত পাগল স্বামীর প্রবঞ্চিত স্ত্রী নয়। সেখানে সে অনন্ত।

সেই মৃত্যুর বাঁশি এই বালিকার ভাঙা হৃদয়ের ভিতর দিয়ে আমার জীবনের যমুনাপারে যেদিন বাজল সেদিন প্রথমটা আমার বুকের মধ্যে যেন বাণ বিঁধল। বিধাতাকে জিজ্ঞাসা করলুম, জগতের মধ্যে যা-কিছু সব চেয়ে তুচ্ছ তাই সব চেয়ে কঠিন কেন? এই গলির মধ্যকার চারি-দিকে-প্রাচীর-তোলা নিরানন্দের অতি সামান্য বুদ্‌বুদটা এমন ভয়ংকর বাধা কেন। তোমার বিশ্বজগৎ তার ছয় ঋতুর সুধাপাত্র হাতে করে যেমন করেই ডাক দিক-না, এক মুহূর্তের জন্যে কেন আমি এই অন্দরমহলটার এইটুকু মাত্র চৌকাঠ পেরতে পারি নে। তোমার এমন ভুবনে আমার এমন জীবন নিয়ে কেন ঐ অতি তুচ্ছ ইটঁকাঠের আড়ালটার মধ্যেই আমাকে তিলে তিলে মরতেই হবে। কত তুচ্ছ আমার এই প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, কত তুচ্ছ এর সমস্ত বাঁধা নিয়ম, বাঁধা অভ্যাস, বাঁধা বুলি, এর সমস্ত বাঁধা মার — কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দীনতার নাগপাশ বন্ধনেরই হবে জিত — আর হার হল তোমার নিজের সৃষ্টি ঐ আনন্দলোকের?

কিন্তু মৃত্যুর বাঁশি বাজাতে লাগল — কোথায় রে রাজমিস্ত্রির গড়া দেয়াল, কোথায় রে তোমাদের ঘোরো আইন দিয়ে গড়া কাঁটার বেড়া; কোন্‌ দুঃখে কোন্‌ অপমানে মানুষকে বন্দী করে রেখে দিতে পারে! ঐ তো মৃত্যুর হাতে জীবনের জয়পতাকা উড়ছে! ওরে মেজোবউ, ভয় নেই তোর! তোর মেজবউয়ের খোলস ছিন্ন হতে এক নিমেষও লাগে না।

তোমাদের গলিকে আর আমি ভয় করি নে। আমার সম্মুখে আজ নীল সমুদ্র, আমার মাথার উপরে আষাঢ়ের মেঘপুঞ্জ।

তোমাদের অভ্যাসের অন্ধকারে আমাকে ঢেকে রেখে দিয়েছিলে। ক্ষণকালের জন্য বিন্দু এসে সেই আবরণের ছিদ্র দিয়ে আমাকে দেখে নিয়েছিল। সেই মেয়েটাই তার আপনার মৃত্যু দিয়ে আবরণখানা আগাগোড়া ছিন্ন করে দিয়ে গেল। আজ বাইরে এসে দেখি, আমার গৌরব রাখবার আর জায়গা নেই। আমার এই আনাদৃত রূপ যাঁর চোখে ভালো লেগেছে, সেই সুন্দর সমস্ত আকাশ দিয়ে আমাকে চেয়ে দেখছেন। এইবার মরেছে মেজোবউ।

তুমি ভাবছ আমি মরতে যাচ্ছি– ভয় নেই, অমন পুরোনো ঠাট্টা তোমাদের সঙ্গে আমি করব না। মীরাবাঈও তো আমারই মতো মেয়েমানুষ ছিল– তার শিকলও তো কম ভারী ছিল না তাকে তো বাঁচবার জন্যে মরতে হয় নি। মীরাবাঈ তার গানে বলেছিল,’ছাড়ুক বাপ, ছাড়ুক মা, ছাড়ুক যে যেখানে আছে, মীরা কিন্তু লেগেই রইল, প্রভু– তাতে তার যা হবার তা হোক।’ এই লেগে থাকাই তো বেঁচে থাকা। আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।

তোমাদের চরণতলাশ্রয়ছিন্ন–

মৃণাল।

But I will not go back to your house at No 27 Makhan Boral Lane. I have seen Bindu and the way women are viewed in life. I do not need to see any more.

I have also seen that even although she was a woman, God did not abandon her. What ever power you all had over her was finite. She was greater than her accursed human life. You do not have the reach to crush her life for eternity under your feet as your will demands. Death is greater than you. There, in the embrace of Death, Bindu is not just a girl from a Bengali family, not just an ill treated cousin sister nor a betrayed wife of an insane man that we knew nothing about. There she is eternal.

The day that Death played his flute for the first time on the banks of the Yamuna of my life through the pain of that child’s broken heart; it pierced my soul. I asked my Fate why it was that the most ordinary of things was the hardest. Why did a tiny bubble of discontent spawned within the walled confines of this lane become such an obstacle? No matter how much your vast world beckons with the intoxicating beauty of its six seasons, why can I not cross that little threshold and step outside? Why do I have to spend this amazing gift of life within this wonderful world of yours behind such an insignificant hurdle, dying a little at a time as I must? How very contemptible is my daily life, how insignificant its routines, its habits, its rituals, its utterances, and even its deprivations – but still in the end, why must the serpentine coils of those restrictions win – and this world of happiness that you have created lose?

But the flute sang to me – where do these walls built by masons, where do the barbed wires of your domestic rules, what sorrow or insult has ever imprisoned  the human spirit. Look, there flies the pennant of Life in the grasp of Death. Second daughter in law, have no fear. It does not take a moment to shed the husk of your existence as a second daughter in law.

I do not fear your lane any more.  Before me stretches the blue ocean, above me a lies  a sky full of rain clouds.

The darkness of your customs had covered me. For a short while Bindu came and saw my worth through a rent in that cloak. She tore it off completely with her own death. Today I step outside to find there is hardly room enough to contain my pride. The Beautiful one who has liked this unloved form of mine surrounds me with his gaze from the skies above. Now the second daughter in law has died.

You think I am going to die, never fear, I would not dream of playing that old trick on you. Meerabai was a woman just like me – the chains that bound her were heavy indeed and yet she did not have to die in order to be released. She said in her song, ‘Let my father forsake me, let my mother, let everyone give up, but Meera stays with you. Lord Krishna – come what may.’

This staying on is what surviving is. I too will survive. in fact I have survived.

Sincerely

The one who is no more in need of shelter at your feet,

Mrinal.

2 thoughts on “স্ত্রীর পত্র /Streer Potro/ A wife’s letter to her husband

  1. A very touchy, emotional and intense piece…thanks for sharing this gem and thanks much for including my recitation with it…it truly is an honour to me!

Comments are closed.