ছেলেবেলা/chelebela/My childhood 2

তখন শহরে না ছিল গ্যাস, না ছিল বিজলি বাতি; কেরোসিনের আলো পরে যখন এল তার তেজ দেখে আমরা অবাক। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঘরে এসে জ্বালিয়ে যেত রেড়ির তেলের আলো। আমাদের পড়বার ঘরে জ্বলত দুই সলতের একটা সেজ।

মাস্টারমশায় মিটমিটে আলোয় পড়াতেন প্যারী সরকারের ফার্‌স্ট্‌বুক। প্রথমে উঠত হাই, তার পর আসত ঘুম, তার পর চলত চোখ-রগড়ানি। বারবার শুনতে হত, মাস্টারমশায়ের অন্য ছাত্র সতীন সোনার টুকরো ছেলে, পড়ায় আশ্চর্য মন, ঘুম পেলে চোখে নস্যি ঘষে। আর আমি? সে কথা ব’লে কাজ নেই। সব ছেলের মধ্যে একলা মুর্খু হয়ে থাকবার মতো বিশ্রী ভাবনাতেও আমাকে চেতিয়ে রাখতে পারত না। রাত্রি ন’টা বাজলে ঘুমের ঘোরে ঢুলু ঢুলু চোখে ছুটি পেতুম। বাহিরমহল থেকে বাড়ির ভিতর যাবার সরু পথ ছিল খড়্‌খড়ির আব্রু-দেওয়া, উপর থেকে ঝুলত মিটমিটে আলোর লণ্ঠন। চলতুম আর মন বলত কী জানি কিসে বুঝি পিছু ধরেছে। পিঠ উঠত শিউরে। তখন ভূত প্রেত ছিল গল্পে-গুজবে, ছিল মানুষের মনের আনাচে-কানাচে। কোন্‌ দাসী কখন হঠাৎ শুনতে পেত শাঁকচুন্নির নাকি সুর, দড়াম করে পড়ত আছাড় খেয়ে। ঐ মেয়ে-ভূতটা সবচেয়ে ছিল বদমেজাজি, তার লোভ ছিল মাছের ‘পরে। বাড়ির পশ্চিম কোণে ঘন-পাতা-ওয়ালা বাদামগাছ, তারই ডালে এক পা আর অন্য পা’টা তেতালার কার্নিসের ‘পরে তুলে দাঁড়িয়ে থাকে একটা কোন্‌ মূর্তি–তাকে দেখেছে বলবার লোক তখন বিস্তর ছিল, মেনে নেবার লোকও কম ছিল না। দাদার এক বন্ধু যখন গল্পটা হেসে উড়িয়ে দিতেন তখন চাকররা মনে করত লোকটার ধর্মজ্ঞান একটুও নেই, দেবে একদিন ঘাড় মটকিয়ে, তখন বিদ্যে যাবে বেরিয়ে। সে সময়টাতে হাওয়ায় হাওয়ায় আতঙ্ক এমনি জাল ফেলে ছিল যে, টেবিলের নীচে পা রাখলে পা সুড়সুড় করে উঠত।

তখন জলের কল বসে নি। বেহারা কাঁখে ক’রে কলসি ভ’রে মাঘ-ফাগুনের গঙ্গার জল তুলে আনত। একতলার অন্ধকার ঘরে সারি সারি ভরা থাকত বড়ো বড়ো জালায় সারা বছরের খাবার জল। নীচের তলায় সেই-সব স্যাঁৎসেতে এঁধো কুটুরিতে গা ঢাকা দিয়ে যারা বাসা করেছিল কে না জানে তাদের মস্ত হাঁ, চোখ দুটো বুকে, কান দুটো কুলোর মতো, পা দুটো উলটো দিকে। সেই ভুতুড়ে ছায়ার সামনে দিয়ে যখন বাড়িভিতরের বাগানে যেতুম, তোলপাড় করত বুকের ভিতরটা, পায়ে লাগাত তাড়া।তখন রাস্তার ধারে ধারে বাঁধানো নালা দিয়ে জোয়ারের সময় গঙ্গার জল আসত। ঠাকুরদার আমল থেকে সেই নালার জল বরাদ্দ ছিল আমাদের পুকুরে। যখন কপাট টেনে দেওয়া হত ঝরঝর কলকল করে ঝরনার মতো জল ফেনিয়ে পড়ত। মাছগুলো উলটো দিকে সাঁতার কাটবার কসরত দেখাতে চাইত। দক্ষিণের বারান্দার রেলিঙ ধরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতুম। শেষকালে এল সেই পুকুরের কাল ঘনিয়ে, পড়ল তার মধ্যে গাড়ি-গাড়ি রাবিশ। পুকুরটা বুজে যেতেই পাড়াগাঁয়ের সবুজ-ছায়া-পড়া আয়নাটা যেন গেল সরে। সেই বাদামগাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অমন পা ফাঁক করে দাঁড়াবার সুবিধে থাকতেও সেই ব্রহ্মদত্যির ঠিকানা আর পাওয়া যায় না।

ভিতরে বাইরে আলো বেড়ে গেছে।

পালকিখানা ঠাকুরমাদের আমলের। খুব দরাজ বহর তার, নবাবি ছাঁদের। ডাণ্ডা দুটো আট আট জন বেহারার কাঁধের মাপের। হাতে সোনার কাঁকন কানে মোটা মাকড়ি, গায়ে লালরঙের হাতকাটা মেরজাই-পরা বেহারার দল সূর্য-ডোবার রঙিন মেঘের মতো সাবেক ধনদৌলতের সঙ্গে সঙ্গে গেছে মিলিয়ে। এই পালকির গায়ে ছিল রঙিন লাইনে আঁকজোক কাটা, কতক তার গেছে ক্ষয়ে, দাগ ধরেছে যেখানে সেখানে, নারকোলের ছোবরা বেরিয়ে পড়েছে ভিতরের গদি থেকে। এ যেন একালের নামকাটা আসবাব, পড়ে আছে খাতাঞ্চিখানার বারান্দায় এক কোণে। আমার বয়স তখন সাত-আট বছর। এ সংসারে কোনো দরকারি কাজে আমার হাত ছিল না; আর ঐ পুরানো পালকিটাকেও সকল দরকারের কাজ থেকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে। এইজন্যেই ওর উপরে আমার এতটা মনের টান ছিল। ও যেন সমুদ্রের মাঝখানে দ্বীপ, আর আমি ছুটির দিনের রবিন্‌সন্‌-ক্রুসো, বন্ধ দরজার মধ্যে ঠিকানা হারিয়ে চার দিকের নজরবন্দি এড়িয়ে বসে আছি।

তখন আমাদের বাড়িভরা ছিল লোক, আপন পর কত তার ঠিকানা নেই; নানা মহলের চাকরদাসীর নানা দিকে হৈ হৈ ডাক। সামনের উঠোন দিয়ে প্যারীদাসী ধামা কাঁখে বাজার করে নিয়ে আসছে তরিতরকারি, দুখন বেহারা বাঁখ কাঁধে গঙ্গার জল আনছে, বাড়ির ভিতরে চলেছে তাঁতিনি নতুন-ফ্যাশান-পেড়ে শাড়ির সওদা করতে, মাইনে করা যে দিনু স্যাকরা গলির পাশের ঘরে ব’সে হাপর ফোঁস ফোঁস ক’রে বাড়ির ফরমাশ খাটত সে আসছে খাতাঞ্চিখানায় কানে-পালখের-কলম-গোঁজা কৈলাস মুখুজ্জের কাছে পাওনার দাবি জানাতে; উঠোনে বসে টং টং আওয়াজে পুরোনো লেপের তুলো ধুনছে ধুনুরি। বাইরে কানা পালোয়ানের সঙ্গে মুকুন্দলাল দারোয়ান লুটোপুটি করতে করতে কুস্তির প্যাঁচ কষছে। চটাচট শব্দে দুই পায়ে লাগাচ্ছে চাপড়, ডন ফেলছে বিশ-পঁচিশ বার ঘন ঘন। ভিখিরির দল বসে আছে বরাদ্দ ভিক্ষার আশা ক’রে।

There was neither gas lighting nor electric lights in the city at the time; we were amazed to see how bright kerosene lamps were when they came along. In the evenings a fellow came and lit rapeseed oil lamps in the houses. A lamp with two wicks used to light up our study.

Our tutor used to teach us from Parry Sarkar’s First Book. First came the yawns, then arrived sleep and finally I would rub my eyes continually. I would have to hear again and again, how another student of his, Jatin, an ideal child by all accounts, rubbed snuff into his eyes when he felt sleepy. And me? The less said the better. Even the horrid prospect of remaining illiterate amongst all the boys I knew was not enough to keep me alert for long. When the clock struck nine, I would be allowed to leave with drowsy eyes. The narrow way to the inner house from the outside was covered  with shutters  to maintain privacy, and lit by dim lanterns. As I walked my mind kept saying something was following me. My skin tingled with fear. At that time ghosts were kept real in stories and in the nooks and crannies of people’s minds. A maid would suddenly hear the nasal tones of a female spirit called a Shankhchunni and fall down in a dead faint. That was one of the most bad tempered ghosts, their hankering was for fish. There were many people who could claim to have seen a being stand with one foot on a ledge on the third floor and the other upon a branch of the densely leafed nut tree on the western side of the house; there were any number of people who would believe them. When one of my brother’s friends dismissed the story with a laugh, the servants thought he did not know what was good for him, one day a spirit would surely break his  neck, and he would find out the the error of his ways. Fear was so woven into the air at that time, the skin on my feet crawled even when I sat at a table.

Water taps had not been installed yet. A water carrier would bring water in the winter months of Magh and Phalgun from the Ganga. Rows of large earthen pots held the whole year’s drinking water in the dark rooms of the first floor. Everyone knew that these locked damp rooms downstairs were home to things that had huge open mouths, eyes on their chests, ears like threshing baskets and feet turned backwards. When I walked past those ghostly shadows into the garden inside the house, my emotions swirled in my heart, my feet would find a speed of their own. At that time the covered drains by the side of the roads would fill up with water from the Ganga during high tides. From my grandfather’s  days that water had been allocated to our pond. When the sluice gate was shut the water foamed out like a water fall. The fish would try and swim in the opposite direction to show their expertise. I would watch in amazement from the south verandah. Finally one day the pond’s days came to an end, truck loads of rubbish were dumped in it. As soon as the pond was filled in it was as though the green shaded mirror of rural bliss was moved. That nut tree still stands, but the old Brahmin ghost has left without a sign inspite of the opportunity of standing with its legs planted firmly apart.

The light has grown brighter both inside and out.

The palanquin dated back to my grandmother’s time. It was of very sturdy construction, of the Nawabi style. The supports were made for eight men on each side. The bearers who wore gold at wrist and ear with their red sleeveless vests have faded along with the wealth of yore like the colourful  clouds of sunset. This palanquin had colourful designs on it, some had rubbed off, there were marks here and there, some of the coconut coir stuffing was escaping from the cushioning inside. It was like an antique piece of furniture, lying in a corner of the verandah next to the office. I was then about seven or eight years old. I had no hand in any of the important tasks of the day and the palanquin had also been sacked from all useful employment. This is why I felt so close to it. It was like an island in the middle of the sea and I was Robinson Crusoe on a holiday as I sat inside it, its closed doors giving me a break from the eyes outside.

At that time our house was full of people, relations and unrelated in equal numbers; the servants from the various parts of the house kept things lively with their loud voices. Parry would carry a basket balanced on her hip, filled with vegetables from the market, Dukhan would bring water from the Ganges, a weaver would be going into the house to sell the latest fashions inn saris, the family’s goldsmith Dinu, who spent much time in his own room making ornaments by order with wheezing of his bellows would be asking for his dues from Kailash Mukhujje who always had a quill pen tucked behind his ear; the Dhunuri would raise a Tong Tong sound as he fluffed up old cotton quilts. Outside the doorman Mukunda would be jousting with the blind wrestler. He slapped his thighs and did twenty or so push ups just like that. The beggars waited outside for their regular alms.

2 thoughts on “ছেলেবেলা/chelebela/My childhood 2

  1. I am enjoying your anecdotes. It is reminding me of those days. I thank you for sharing vivid images of those days, Please keep on writing. You have the ‘gift’.

Comments are closed.