মণিহারা/Monihara/The Jewels

মণিহারা

সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে।

বোটের ছাদের উপরে মাঝি নমাজ পড়িতেছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত আকাশপটে তাহার নীরব উপাসনা ক্ষণে ক্ষণে ছবির মতো আঁকা পড়িতেছিল। স্থির রেখাহীন নদীর জলের উপর ভাষাতীত অসংখ্য বর্ণচ্ছটা দেখিতে দেখিতে ফিকা হইতে গাঢ় লেখায়, সোনার রঙ হইতে ইস্পাতের রঙে, এক আভা হইতে আর-এক আভায় মিলাইয়া আসিতেছিল।

জানালা-ভাঙা বারান্দা-ঝুলিয়া-পড়া জরাগ্রস্ত বৃহৎ অট্টালিকার সম্মুখে অশ্বত্থমূলবিদারিত ঘাটের উপরে ঝিল্লিমুখর সন্ধ্যাবেলায় একলা বসিয়া আমার শুষ্ক চক্ষুর কোণ ভিজিবে-ভিজিবে করিতেছে, এমন সময়ে মাথা হইতে পা পর্যন্ত হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া শুনিলাম, ‘মহাশয়ের কোথা হইতে আগমন।’

দেখিলাম, ভদ্রলোকটি স্বল্পাহারশীর্ণ, ভাগ্যলক্ষ্মী কর্তৃক নিতান্ত অনাদৃত। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদেশী চাক্‌রের যেমন একরকম বহুকাল-জীর্ণসংস্কার-বিহীন চেহারা, ইঁহারও সেইরূপ। ধুতির উপরে একখানি মলিন তৈলাক্ত আসামী মটকার বোতামখোলা চাপকান; কর্মক্ষেত্রে হইতে যেন অল্পক্ষণ হইল ফিরিতেছেন। এবং যেসময় কিঞ্চিৎ জলপান খাওয়া উচিত ছিল সে-সময় হতভাগ্য নদীতীরে কেবল সন্ধ্যার হাওয়া খাইতে আসিয়াছেন।

আগন্তুক সোপানপার্শ্বে আসনগ্রহণ করিলেন। আমি কহিলাম, ‘আমি রাঁচি হইতে আসিতেছি।’

‘কী করা হয়।’

‘ব্যবসা করিয়া থাকি।’

‘কী ব্যবসা।’

‘হরীতকী, রেশমের গুটি এবং কাঠের ব্যবসা।’

‘কী নাম।’

ঈষৎ থামিয়া একটা নাম বলিলাম। কিন্তু সে আমার নিজের নাম নহে।

ভদ্রলোকের কৌতুহলনিবৃত্তি হইল না। পুনরায় প্রশ্ন হইল, ‘এখানে কী করিতে আগমন।’

আমি কহিলাম, ‘বায়ুপরিবর্তন।’

লোকটি কিছু আশ্চর্য হইল। কহিল, ‘মহাশয়, আজ প্রায় ছয়বৎসর ধরিয়া এখানকার বায়ু এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যহ গড়ে পনেরো গ্রেন্‌ করিয়া কুইনাইন খাইতেছি কিন্তু কিছু তো ফল পাই নাই।’

আমি কহিলাম, ‘এ কথা মানিতেই হইবে, রাঁচি হইতে এখানে বায়ুর যথেষ্ট পরিবর্তন দেখা যাইবে।’

তিনি কহিলেন, ‘আজ্ঞা হাঁ, যথেষ্ট। এখানে কোথায় বাসা করিবেন।’

আমি ঘাটের উপরকার জীর্ণবাড়ি দেখাইয়া কহিলাম, ‘এই বাড়িতে।’

বোধকরি লোকটির মনে সন্দেহ হইল, আমি এই পোড়ো বাড়িতে কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পাইয়াছি। কিন্তু এ সম্বন্ধে আর কোনো তর্ক তুলিলেন না, কেবল আজ পনেরো বৎসর পূর্বে এই অভিশাপগ্রস্ত বাড়িতে যে-ঘটনাটি ঘটিয়াছিল তাহারই বিস্তারিত বর্ণনা করিলেন।

লোকটি এখানকার ইস্কুলমাস্টার। তাঁহার ক্ষুধা ও রোগ-শীর্ণ মুখে মস্ত একটা টাকের নিজে একজোড়া বড়ো বড়ো চক্ষু আপন কোটরের ভিতর হইতে অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় জ্বলিতেছিল। তাঁহাকে দেখিয়া ইংরাজ কবি কোল্‌রিজের সৃষ্ট প্রাচীন নাবিকের কথা আমার মনে পড়িল।

মাঝি নমাজ পড়া সমাধা করিয়া রন্ধনকার্যে মন দিয়াছে। সন্ধ্যার শেষ আভাটুকু মিলাইয়া আসিয়া ঘাটের উপরকার জনশূন্য অন্ধকার বাড়ি আপন পূর্বাবস্থার প্রকাণ্ড প্রেতমূর্তির মতো নিস্তব্ধ দাঁড়াইয়া রহিল।

ইস্কুলমাস্টার কহিলেন–

আমি এই গ্রামে আসার প্রায় দশ বৎসর পূর্বে এই বাড়িতে ফণিভূষণ সাহা বাস করিতেন। তিনি তাঁহার অপুত্রক পিতৃব্য দুর্গামোহন সাহার বৃহৎ বিষয় এবং ব্যবসায়ের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন।

কিন্তু, তাঁহাকে একালে ধরিয়াছিল। তিনি লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন। তিনি জুতাসমেত সাহেবের আপিসে, ঢুকিয়া সম্পূর্ণ খাঁটি ইংরাজি বলিতেন। তাহাতে আবার দাড়ি রাখিয়াছিলেন, সুতরাং সাহেব-সওদাগরের নিকট তাঁহার উন্নতির সম্ভাবনামাত্র ছিল না। তাঁহাকে দেখিবামাত্রই নব্যবঙ্গ বলিয়া ঠাহর হইত।

আবার ঘরের মধ্যেও এক উপসর্গ জুটিয়াছিল। তাঁহার স্ত্রীটি ছিলেন সুন্দরী। একে কালেজে-পড়া তাহাতে সুন্দরী স্ত্রী, সুতরাং সেকালের চালচলন আর রহিল না। এমনকি, ব্যামো হইলে অ্যাসিস্ট্যান্ট-সার্জনকে ডাকা হইত। অশন বসন ভূষণও এই পরিমাণে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল।

মহাশয় নিশ্চয়ই বিবাহিত, অতএব এ কথা আপনাকে বলাই বাহুল্য যে, সাধারণত স্ত্রীজাতি কাঁচা আম, ঝাল লঙ্কা এবং কড়া স্বামীই ভালোবাসে। যে দুর্ভাগ্য পুরুষ নিজের স্ত্রীর ভালোবাসা হইতে বঞ্চিত সে-যে কুশ্রী অথবা নির্ধন তাহা নহে, সে নিতান্ত নিরীহ।

যদি জিজ্ঞাসা করেন, কেন এমন হইল, আমি এ সম্বন্ধে অনেক কথা ভাবিয়া রাখিয়াছি। যাহার যা প্রবৃত্তি এবং ক্ষমতা সেটার চর্চা না করিলে সে সুখী হয় না। শিঙে শাপ দিবার জন্য হরিণ শক্ত গাছের গুঁড়ি খোঁজে, কলাগাছে তাহার শিং ঘষিবার সুখ হয় না। নরনারীর ভেদ হইয়া অবধি স্ত্রীলোক দুরন্ত পুরুষকে নানা কৌশলে ভুলাইয়া বশ করিবার বিদ্যা চর্চা করিয়া আসিতেছে। যে-স্বামী আপনি বশ হইয়া বসিয়া থাকে তাহারা স্ত্রী-বেচারা একেবারেই বেকার, সে তাহার মাতামহীদের নিকট হইতে শতলক্ষ বৎসরের শাণ-দেওয়া যে উজ্জ্বল বরুণাস্ত্র, অগ্নিবাণ ও নাগপাশবন্ধনগুলি পাইয়াছিল তাহা সমস্ত নিস্ফল হইয়া যায়।

স্ত্রীলোক পুরুষকে ভুলাইয়া নিজের শক্তিতে ভালোবাসা আদায় করিয়া লইতে চায়, স্বামী যদি ভালোমানুষ হইয়া সে অবসরটুকু না দেয়, তবে স্বামীর অদৃষ্ট মন্দ এবং স্ত্রীরও ততোধিক।

নবসভ্যতার শিক্ষামন্ত্রে পুরুষ আপন স্বভাবসিদ্ধ বিধাতাদত্ত সুমহৎ বর্বরতা হারাইয়া আধুনিক দাম্পত্যসম্বন্ধটাকে এমন শিথিল করিয়া ফেলিয়াছে। অভাগা ফণিভূষণ আধুনিক সভ্যতার কল হইতে অত্যন্ত ভালোমানুষটি হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছিল– ব্যবসায়েও সে সুবিধা করিতে পারিল না, দাম্পত্যেও তাহার তেমন সুযোগ ঘটে নাই।

ফণিভূষণের স্ত্রী মণিমালিকা, বিনা চেষ্টায় আদর, বিনা অশ্রুবর্ষণে ঢাকাই শাড়ি এবং বিনা দুর্জয় মানে বাজুবন্ধ লাভ করিত। এইরূপে তাহার নারীপ্রকৃতি এবং সেইসঙ্গে তাহার ভালোবাসা নিশ্চেষ্ট হইয়া গিয়াছিল। সে কেবল গ্রহণ করিত, কিছু দিত না। তাহার নিরীহ এবং নির্বোধ স্বামীটি মনে করিত, দানই বুঝি প্রতিদান পাইবার উপায়। একেবারে উল্‌টা বুঝিয়াছিল আর কি।

ইহার ফল হইল এই যে, স্বামীকে সে আপন ঢাকাই শাড়ি এবং বাজুবন্ধ জোগাইবার যন্ত্রস্বরূপ জ্ঞান করিত; যন্ত্রটিও এমন সুচারু যে, কোনোদিন তাহার চাকায় এক ফোঁটা তেল জোগাইবারও দরকার হয় নাই।

ফণিভূষণের জন্মস্থান ফুলবেড়ে, বাণিজ্যস্থান এখানে কর্মানুরোধে এইখানেই তাহাকে অধিকাংশ সময় থাকিতে হইত। ফুলবেড়ের বাড়িতে তাহার মা ছিল না, তবু পিসি মাসি অন্য পাঁচজন ছিল। কিন্তু, ফণিভূষণ পিসি মাসি ও অন্য পাঁচজনের উপকারার্থেই বিশেষ করিয়া সুন্দরী স্ত্রী ঘরে আনে নাই। সুতরাং স্ত্রীকে সে পাঁচজনের কাছ থেকে আনিয়া এই কুঠিতে একলা নিজের কাছেই রাখিল। কিন্তু অন্যান্য অধিকার হইতে স্ত্রী-অধিকারের প্রভেদ এই যে, স্ত্রীকে পাঁচজনের কাছ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া একলা নিজের কাছে রাখিলেই যে সব সময় বেশি করিয়া পাওয়া যায় তাহা নহে।

স্ত্রীটি বেশি কথাবার্তা কহিত না, পাড়াপ্রতিবেশিনীদের সঙ্গেও তাহার মেলামেশা ছিল না; ব্রত উপলক্ষ্য করিয়া দুটো ব্রাহ্মণকে খাওয়ানো, বা বৈষ্ণবীকে দুটো পয়সা ভিক্ষা বেশী দেওয়া কখনো তাহার দ্বারা ঘটে নাই। তাহার হাতে কোনো জিনিস নষ্ট হয় নাই; কেবল স্বামীর আদরগুলা ছাড়া আর যাহা পাইয়াছে সমস্তই জমা করিয়া রাখিয়াছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সে নিজের অপরূপ যৌবনশ্রী হইতেও যেন লেশমাত্র অপব্যয় ঘটিতে দেয় নাই। চব্বিশবৎসর বয়সের সময়ও তাহাকে চৌদ্দবৎসরের মতো কাঁচা দেখিতে ছিল। যাহাদের হৃৎপিণ্ড বরফের পিণ্ড, যাহাদের বুকের মধ্যে ভালোবাসার জ্বালাযন্ত্রণা স্থান পায় না, তাহারা বোধ করি সুদীর্ঘকাল তাজা থাকে, তাহারা কৃপণের মতো অন্তরে বাহিরে আপনাকে জমাইয়া রাখিতে পারে।

ঘনপল্লবিত অতিসতেজ লতার মতো বিধাতা মণিমালিকাকে নিষ্ফলা করিয়া রাখিলেন, তাহাকে সন্তান হইতে বঞ্চিত করিলেন। অর্থাৎ, তাহাকে এমন একটা কিছু দিলেন না যাহাকে সে আপন লোহার সিন্দুকের মণিমাণিক্য অপেক্ষা বেশি করিয়া বুঝিতে পারে, যাহা বসন্তপ্রভাতের নবসূর্যের মতো আপন কোমল উত্তাপে তাহার হৃদয়ের বরফপিণ্ডটা গলাইয়া সংসারের উপর একটা স্নেহনির্ঝর বহাইয়া দেয়।

কিন্তু মণিমালিকা কাজকর্মে মজবুত ছিল। কখনোই সে লোকজন বেশি রাখে নাই। যে-কাজ তাহার দ্বারা সাধ্য সে কাজে কেহ বেতন লইয়া যাইবে ইহা সে সহিতে পারিত না। সে কাহারও জন্য চিন্তা করিত না, কাহাকেও ভালোবাসিত না, কেবল কাজ করিত এবং জমা করিত, এইজন্য তাহার রোগ শোক তাপ কিছুই ছিল না; অপরিমিত স্বাস্থ্য, অবিচলিত শান্তি এবং সঞ্চীয়মান সম্পদের মধ্যে সে সবলে বিরাজ করিত।

অধিকাংশ স্বামীর পক্ষে ইহাই যথেষ্ট; যথেষ্ট কেন, ইহা দুর্লভ। অঙ্গের মধ্যে কটিদেশ বলিয়া একটা ব্যাপার আছে তাহা কোমরে ব্যথা না হইলে মনে পড়ে না; গৃহের আশ্রয়স্বরূপে স্ত্রী-যে একজন আছে ভালোবাসার তাড়নায় তাহা পদে পদে এবং তাহা চব্বিশঘণ্টা অনুভব করার নাম ঘরকর্‌নার কোমরে ব্যথা। নিরতিশয় পাতিব্রত্যটা স্ত্রীর পক্ষে গৌরবের বিষয় কিন্তু পতির পক্ষে আরামের নহে, আমার তো এইরূপ মত।

মহাশয়, স্ত্রীর ভালোবাসা ঠিক কতটা পাইলাম, ঠিক কতটুকু কম পড়িল, অতি সূক্ষ্ণ নিক্তি ধরিয়া তাহা অহরহ তৌল করিতে বসা  কি পুরুষমানুষের কর্ম! স্ত্রী আপনার কাজ করুক, আমি আপনার কাজ করি, ঘরের মোটা হিসাবটা তো এই। অব্যক্তের মধ্যে কতটা ব্যক্ত, ভাবের মধ্যে কতটুকু অভাব, সুস্পষ্টের মধ্যেও কী পরিমাণ ইঙ্গিত, অণুপরমাণুর মধ্যে কতটা বিপুলতা– ভালোবাসাবাসির তত সুসূক্ষ্ণ বোধশক্তি বিধাতা পুরুষমানুষকে দেন নাই, দিবার প্রয়োজন হয় নাই। পুরুষমানুষের তিলপরিমাণ অনুরাগ-বিরাগের লক্ষণ হইয়া মেয়েরা বটে ওজন করিতে বসে। কথার মধ্য হইতে আসল ভঙ্গীটুকু এবং ভঙ্গীর মধ্য হইতে আসল কথাটুকু চিরিয়া চিরিয়া চুনিয়া চুনিয়া বাহির করিতে থাকে। কারণ, পুরুষের ভালোবাসাই মেয়েদের বল, তাহাদের জীবনব্যবসায়ের মূলধন। ইহারই হাওয়ার গতিক লক্ষ্য করিয়া ঠিক সময়ে ঠিকমতো পাল ঘুরাইতে পারিলে তবেই তাহাদের তরণী তরিয়া যায়। এইজন্যই বিধাতা ভালোবাসামান-যন্ত্রটি মেয়েদের হৃদয়ের মধ্যে ঝুলাইয়া দিয়াছেন, পুরুষদের দেন নাই।

কিন্তু বিধাতা যাহা দেন নাই সম্প্রতি পুরুষরা সেটি সংগ্রহ করিয়া লইয়াছেন। কবিরা বিধাতার উপর টেক্কা দিয়া এই দুর্লভ যন্ত্রটি, এই দিগ্‌দর্শন যন্ত্রশলাকাটি নির্বিচারে সর্বসাধারণের হস্তে দিয়াছেন। বিধাতার দোষ দিই না, তিনি মেয়েপুরুষকে যথেষ্ট ভিন্ন করিয়াই সৃষ্টি করিয়াছিলেন, কিন্তু সভ্যতায় সে ভেদ আর থাকে না, এখন মেয়েও পুরুষ হইতেছে, পুরুষও মেয়ে হইতেছে; সুতরাং ঘরের মধ্য হইতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিদায় লইল। এখন শুভবিবাহের পূর্বে, পুরুষকে বিবাহ করিতেছি না মেয়েকে বিবাহ করিতেছি, তাহা কোনোমতে নিশ্চয় করিতে না পারিয়া, বরকন্যা উভয়েরই চিত্ত আশঙ্কায় দুরু দুরু করিতে থাকে।

আপনি বিরক্ত হইতেছেন! একলা পড়িয়া থাকি, স্ত্রীর নিকট হইতে নির্বাসিত; দূর হইতে সংসারের অনেক নিগূঢ় তত্ত্ব মনের মধ্যে উদয় হয়– এগুলো ছাত্রদের কাছে বলিবার বিষয় নয়, কথাপ্রসঙ্গে আপনাকে বলিয়া লইলাম, চিন্তা করিয়া দেখিবেন।

মোটকথাটা এই যে, যদিচ রন্ধনে নুন কম হইত না এবং পানে চুন বেশি হইত না, তথাপি ফণিভূষণের হৃদয় কী-যেন-কী নামক একটু দুঃসাধ্য উৎপাত অনুভব করিত। স্ত্রীর কোনো দোষ ছিল না, কোনো ভ্রম ছিল না, তবু স্বামীর কোনো সুখ ছিল না। সে তাহার সহধর্মিণীর শূন্যগহ্বর হৃদয় লক্ষ্য করিয়া কেবল হীরামুক্তার গহনা ঢালিত কিন্তু সেগুলা পড়িত গিয়া লোহার সিন্দুকে, হৃদয় শূন্যই থাকিত। খুড়া দুর্গামোহন ভালোবাসা এত সূক্ষ্ণ করিয়া বুঝিত না, এত কাতর হইয়া চাহিত না, এত প্রচুর পরিমাণে দিত না, অথচ খুড়ির নিকট হইতে তাহা অজস্র পরিমাণে লাভ করিত। ব্যবসায়ী হইতে গেলে নব্যবাবু হইলে চলে না এবং স্বামী হইতে গেলে পুরুষ হওয়া দরকার, এ কথায় সন্দেহমাত্র করিবেন না।

ঠিক এই সময়ে শৃগালগুলা নিকটবর্তী ঝোপের মধ্য হইতে অত্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল। মাস্টারমহাশয়ের গল্পস্রোতে মিনিটকয়েকের জন্য বাধা পড়িল। ঠিক মনে হইল, সেই অন্ধকার সভাভূমিতে কৌতুকপ্রিয় শৃগালসম্প্রদায় ইস্কুলমাস্টারের ব্যাখ্যাত দাম্পত্যনীতি শুনিয়াই হউক বা নবসভ্যতাদুর্বল ফণিভূষণের আচরণেই হউক রহিয়া অট্টহাস্য করিয়া উঠিতে লাগিল। তাহাদের ভাবোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত হইয়া জলস্থল দ্বিগুণতর নিস্তব্ধ হইলে পর, মাস্টার সন্ধ্যার অন্ধকারে তাঁহার বৃহৎ উজ্জ্বল চক্ষু পাকাইয়া গল্প বলিতে লাগিলেন–

ফণিভূষণের জটিল এবং বহুবিস্তৃত ব্যবসায়ে হঠাৎ একটা ফাঁড়া উপস্থিত হইল। ব্যাপারটা কী তাহা আমার মতো অব্যবসায়ীর পক্ষে বোঝা এবং বোঝানো শক্ত। মোদ্দা কথা, সহসা কী কারণে বাজারে তাহার ক্রেডিট রাখা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। যদি কেবলমাত্র পাঁচটা দিনের জন্যও সে কোথাও হইতে লাখদেড়েক টাকা বাহির করিতে পারে, বাজারে একবার বিদ্যুতের মতো এই টাকাটার চেহারা দেখাইয়া যায় তাহা হইলেই মুহূর্তের মধ্যে সংকট উত্তীর্ণ হইয়া তাহার ব্যাবসা পালভরে ছুটিয়া চলিতে পারে।

টাকাটার সুযোগ হইতেছিল না। স্থানীয় পরিচিত মহাজনদের নিকট হইতে ধার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে এরূপ জনরব উঠিলে তাহার ব্যবসায়ের দ্বিগুণ অনিষ্ট হইবে, আশঙ্কায় তাহাকে অপরিচিত স্থানে ঋণের চেষ্টা দেখিতে হইতেছিল। সেখানে উপযুক্ত বন্ধক না রাখিলে চলে না।

গহনা বন্ধক রাখিলে লেখাপড়া এবং বিলম্বের কারণ থাকে না, চট্‌পট্‌ এবং সহজেই কাজ হইয়া যায়।

ফণিভূষণ একবার স্ত্রীর কাছে গেল। নিজের স্ত্রীর কাছে স্বামী যেমন সহজভাবে যাইতে পারে ফণিভূষণের তেমন করিয়া যাইবার ক্ষমতা ছিল  না। সে দুর্ভাগ্যক্রমে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসিত, যেমন ভালোবাসা কাব্যের নায়ক কাব্যের নায়িকাকে বাসে; যে-ভালোবাসায় সন্তর্পণে পদক্ষেপ করিতে হয় এবং সকল কথা মুখে ফুটিয়া বাহির হইতে পারে না, যে-ভালোবাসার প্রবল আকর্ষণ সূর্য এবং পৃথিবীর আকর্ষণের ন্যায় মাঝখানে একটা অতিদূর ব্যবধান রাখিয়া দেয়।

তথাপি তেমন তেমন দায়ে পড়িলে কাব্যের নায়ককেও প্রেয়সীর নিকট হুণ্ডি এবং বন্ধক এবং হ্যাণ্ড্‌নোটের প্রসঙ্গ তুলিতে হয়; কিন্তু সুর বাধিয়া যায়, বাক্যস্খলন হয়, এমন সকল পরিষ্কার কাজের কথার মধ্যেও ভাবের জড়িমা ও বেদনার বেপথু আসিয়া উপস্থিত হয়। হতভাগ্য ফণিভূষণ স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারিল না, ‘ওগো, আমার দরকার হইয়াছে, তোমার গহনাগুলো দাও।’

কথাটা বলিল, অথচ অত্যন্ত দুর্বলভাবে বলিল। মণিমালিকা যখন কঠিন মুখ করিয়া হাঁ-না কিছুই উত্তর করিল না, তখন সে একটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আঘাত পাইল কিন্তু আঘাত করিল না। কারণ, পুরুষোচিত বর্বরতার লেশমাত্র তাহার ছিল না। যেখানে জোর করিয়া কাড়িয়া লওয়া উচিত ছিল, সেখানে সে আপনার আন্তরিক ক্ষোভ পর্যন্ত চাপিয়া গেল। যেখানে ভালোবাসার একমাত্র অধিকার, সর্বনাশ হইয়া গেলেও সেখানে বলকে প্রবেশ করিতে দিবে না, এই তাহার মনের ভাব। এ সম্বন্ধে তাহাকে যদি ভর্ৎসনা করা যাইত তবে সম্ভবত সে এইরূপ সূক্ষ্ণ তর্ক করিত যে, বাজারে যদি অন্যায় কারণেও আমার ক্রেডিট না থাকে তবে তাই বলিয়া বাজার লুটিয়া লইবার অধিকার আমার নাই, স্ত্রী যদি স্বেচ্ছাপূর্বক বিশ্বাস করিয়া আমাকে গহনা না দেয় তবে তাহা আমি কাড়িয়া লইতে পারি না। বাজারে যেমন ক্রেডিট ঘরে তেমনি ভালোবাসা, বাহুবল কেবলমাত্র রণক্ষেত্রে। পদে পদে এইরূপ অত্যন্ত সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ তর্কসূত্র কাটিবার জন্যই কি বিধাতা পুরুষমানুষকে এরূপ উদার, এরূপ প্রবল, এরূপ বৃহদাকার করিয়া নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহার কি বসিয়া বসিয়া অত্যন্ত সুকুমার চিত্তবৃত্তিকে নিরতিশয় তনিমার সহিত অনুভব করিবার অবকাশ আছে না ইহা তাহাকে শোভা পায়।

যাহা হউক, আপন উন্নত হৃদয়বৃত্তির গর্বে স্ত্রীর গহনা স্পর্শ না করিয়া ফণিভূষণ অন্য উপায়ে অর্থ সংগ্রহের জন্য কলিকাতায় চলিয়া গেল।

সংসারে সাধারণত স্ত্রীকে স্বামী যতটা চেনে স্বামীকে স্ত্রী তাহার চেয়ে অনেক বেশি চেনে; কিন্তু স্বামীর প্রকৃতি যদি অত্যন্ত সূক্ষ্ণ হয় তবে স্ত্রীর অনুবীক্ষণে তাহার সমস্তটা ধরা পড়ে না। আমাদের ফণিভূষণকে ফণিভূষণের স্ত্রী ঠিক বুঝিত না। স্ত্রীলোকের অশিক্ষিতপটুত্ব যে-সকল বহুকালাগত প্রাচীন সংস্কারের দ্বারা গঠিত, অত্যন্ত নব্য পুরুষেরা তাহার বাহিরে গিয়া পড়ে। ইহারা এক রকমের! ইহারা মেয়েমানুষের মতোই রহস্যময় হইয়া উঠিতেছে। সাধারণ পুরুষমানুষের যে-কটা বড়ো বড়ো কোটা আছে, অর্থাৎ কেহবা বর্বর, কেহবা নির্বোধ, কেহবা অন্ধ, তাহার মধ্যে কোনোটাতেই ইহাদিগকে ঠিকমতো স্থাপন করা যায় না।

সুতরাৎ মণিমালিকা পরামর্শের জন্য তাহার মন্ত্রীকে ডাকিল। গ্রামসম্পর্কে অথবা দূরসম্পর্কের মণিমালিকার এক ভাই ফণিভূষণের কুঠিতে গোমস্তার অধীনে কাজ করিত। তাহার এমন স্বভাব ছিল না যে কাজের দ্বারা উন্নতি লাভ করে, কোনো একটা উপলক্ষ্য করিয়া আত্মীয়তার জোরে বেতন এবং বেতনেরও বেশি কিছু কিছু সংগ্রহ করিত।

মণিমালিকা তাহাকে ডাকিয়া সকল কথা বলিল; জিজ্ঞাসা করিল, ‘এখন পরামর্শ কী।’

সে অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো মাথা নাড়িল; অর্থাৎ গতিক ভালো নহে। বুদ্ধিমানেরা কখনোই গতিক ভালো দেখে না। সে কহিল, ‘বাবু কখনোই টাকা সংগ্রহ করিতে পারিবেন না, শেষকালে তোমার এ গহনাতে টান পড়িবেই।’

মণিমালিকা মানুষকে যেরূপ জানিত তাহাতে বুঝিল, এইরূপ হওয়াই সম্ভব এবং ইহাই সংগত। তাহার দুশ্চিন্তা সুতীব্র হইয়া উঠিল। সংসারে তাহার সন্তান নাই, স্বামী আছে বটে কিন্তু স্বামীর অস্তিত্ব সে অন্তরের মধ্যে অনুভব করে না, অতএব যাহা তাহার একমাত্র যত্নের ধন, যাহা তাহার ছেলের মতো ক্রমে ক্রমে বৎসরে বৎসরে বাড়িয়া উঠিতেছে, যাহা রূপকমাত্র নহে, যাহা প্রকৃতই সোনা, যাহা মানিক, যাহা বক্ষের, যাহা কণ্ঠের, যাহা মাথার– সেই অনেকদিনের অনেক সাধের সামগ্রী এক মুহূর্তেই ব্যবসায়ের অতলস্পর্শ গহ্বরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইবে ইহা কল্পনা করিয়া তাহার সর্বশরীর হিম হইয়া আসিল। সে কহিল, ‘কী করা যায়।’

মধুসূদন কহিল, গহনাগুলো লইয়া এইবেলা বাপের বাড়ি চলো।’ গহনার কিছু অংশ, এমনকি অধিকাংশই যে তাহার ভাগে আসিবে বুদ্ধিমান মধু মনে মনে তাহার উপায় ঠাহরাইল।

মণিমালিকা এ-প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইল।

আষাঢ়শেষের সন্ধ্যাবেলায় এই ঘাটের ধারে একখানি নৌকা আসিয়া লাগিল। ঘনমেঘাচ্ছন্ন প্রত্যুষে নিবিড় অন্ধকারে নিদ্রাহীন ভেকের কলরবের মধ্যে একখানি মোটা চাদরে পা হইতে মাথা পর্যন্ত আবৃত করিয়া মণিমালিকা নৌকায় উঠিল। মধুসূদন নৌকার মধ্য হইতে জাগিয়া উঠিয়া কহিল, ‘গহনার বাক্সটা আমার কাছে দাও।’ মণি কহিল, ‘সে পরে হইবে, এখন নৌকা খুলিয়া দাও।’

নৌকা খুলিয়া দিল, খরস্রোতে হুহু করিয়া ভাসিয়া গেল।

মণিমালিকা সমস্ত রাত ধরিয়া একটি একটি করিয়া তাহার সমস্ত গহনা সর্বাঙ্গ ভরিয়া পরিয়াছে, মাথা হইতে পা পর্যন্ত আর স্থান ছিল না। বাক্সে করিয়া গহনা লইলে সে-বাক্স হাতছাড়া হইয়া যাইতে পারে, এ আশঙ্কা তাহার ছিল। কিন্তু, গায়ে পরিয়া গেলে তাহাকে না বধ করিয়া সে-গহনা কেহ লইতে পারিবে না।

সঙ্গে কোনোপ্রকার বাক্স না দেখিয়া মধুসূদন কিছু বুঝিতে পারিল না, মোটা চাদরের নিচে যে মণিমালিকার দেহপ্রাণের সঙ্গে সঙ্গে দেহপ্রাণের অধিক গহনাগুলি আচ্ছন্ন ছিল তাহা সে অনুমান করিতে পারে নাই! মণিমালিকা ফণিভূষণকে বুঝিত না বটে, কিন্তু মধুসূদনকে চিনিতে তাহার বাকি ছিল না।

মধুসূদন গোমস্তার কাছে একখানা চিঠি রাখিয়া গেল যে, সে কত্রীকে পিত্রালয়ে পৌঁছাইয়া দিতে রওনা হইল। গোমস্তা ফণিভূষণের বাপের আমলের; সে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া হ্রস্ব-ইকারকে দীর্ঘ-ঈকার এবং দন্ত্য-সকে তালব্য-শ করিয়া মনিবকে এক পত্র লিখিল, ভালো বাংলা লিখিল না কিন্তু স্ত্রীকে অযথা প্রশ্রয় দেওয়া যে পুরুষোচিত নহে এ কথাটা ঠিকমতোই প্রকাশ করিল।

ফণিভূষণ মণিমালিকার মনের কথাটা ঠিক বুঝিল। তাহার মনে এই আঘাতটা প্রবল হইল যে, ‘আমি গুরুতর ক্ষতিসম্ভাবনা সত্ত্বেও স্ত্রীর অলংকার পরিত্যাগ করিয়া প্রাণপণ চেষ্টায় অর্থসংগ্রহে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তবু আমাকে সন্দেহ। আমাকে আজিও চিনিল না।’

নিজের প্রতি যে নিদারুণ অন্যায়ে ক্রুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, ফণিভূষণ তাহাতে ক্ষুব্ধ হইল মাত্র। পুরুষমানুষ বিধাতার ন্যায়দণ্ড, তাহার মধ্যে তিনি বজ্রাগ্নি নিহিত করিয়া রাখিয়াছেন, নিজের প্রতি অথবা অপরের প্রতি অন্যায়ের সংঘর্ষে সে যদি দপ্‌ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতে না পারে তবে ধিক্‌ তাহাকে। পুরুষমানুষ দাবাগ্নির মতো রাগিয়া উঠিবে সামান্য কারণে, আর স্ত্রীলোক শ্রাবণমেঘের মতো অশ্রুপাত করিতে থাকিবে বিনা উপলক্ষে, বিধাতা এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, কিন্তু সে আর টেঁকে না।

ফণিভূষণ অপরাধিনী স্ত্রীকে লক্ষ্য করিয়া মনে মনে কহিল, ‘এই যদি তোমার বিচার হয় তবে এইরূপই হউক, আমার কর্তব্য আমি করিয়া যাইব।’ আরো শতাব্দী-পাঁচছয় পরে যখন কেবল অধ্যাত্মশক্তিতে জগৎ চলিবে তখন যাহার জন্মগ্রহণ করা উচিত ছিল সেই ভাবী যুগের ফণিভূষণ ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবতীর্ণ হইয়া সেই আদিযুগের স্ত্রীলোককে বিবাহ করিয়া বসিয়াছে শাস্ত্রে যাহার বুদ্ধিকে প্রলয়ংকরী বলিয়া থাকে। ফণিভূষণ স্ত্রীকে এক-অক্ষর পত্র লিখিল না এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল, এ সম্বন্ধে স্ত্রীর কাছে কখনও সে কোনো কথার উল্লেখ করিবে না। কী ভীষণ দণ্ডবিধি।

দিনদশেক পরে কোনোমতে যথোপযুক্ত টাকা সংগ্রহ করিয়া বিপদুত্তীর্ণ ফণিভূষণ বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল। সে জানিত, বাপের বাড়িতে গহনাপত্র রাখিয়া এতদিনে মণিমালিকা ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে। সেদিনকার দীনপ্রার্থীভাব ত্যাগ করিয়া কৃতকার্য কৃতীপুরুষ স্ত্রীর কাছে দেখা দিলে মণি যে কিরূপ লজ্জিত এবং অনাবশ্যক প্রয়াসের জন্য কিঞ্চিৎ অনুতপ্ত হইবে, ইহাই কল্পনা করিতে করিতে ফণিভূষণ অন্তঃপুরে শয়নাগারের দ্বারের কাছে আসিয়া উপনীত হইল।

দেখিল, দ্বার রুদ্ধ। তালা ভাঙিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, ঘর শূন্য। কোণে লোহার সিন্দুক খোলা পড়িয়া আছে, তাহাতে গহনাপত্রের চিহ্নমাত্র নাই। স্বামীর বুকের মধ্যে ধক্‌ করিয়া একটা ঘা লাগিল। মনে হইল, সংসার উদ্দেশ্যহীন এবং ভালোবাসা ও বাণিজ্যব্যবসা সমস্তই ব্যর্থ। আমরা এই সংসারপিঞ্জরের প্রত্যেক শলাকার উপরে প্রাণপাত করিতে বসিয়াছি, কিন্তু তাহার ভিতরে পাখি নাই, রাখিলেও সে থাকে না। তবে অহরহ হৃদয়খানির রক্তমানিক ও অশ্রুজলের মুক্তামালা দিয়া কী সাজাইতে বসিয়াছি। এই চিরজীবনের সর্বস্বজুড়ানো শূন্য সংসার-খাঁচাটা ফণিভূষণ মনে মনে পদাঘাত করিয়া অতিদূরে ফেলিয়া দিল।

ফণিভূষণ স্ত্রীর সম্বন্ধে কোনোরূপ চেষ্টা করিতে চাহিল না। মনে করিল, যদি ইচ্ছা হয় তো ফিরিয়া আসিবে। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ গোমস্তা আসিয়া কহিল, ‘চুপ করিয়া থাকিলে কী হইবে, কত্রীবধূর খবর লওয়া চাই তো।’ এই বলিয়া মণিমালিকার পিত্রালয়ে লোক পাঠাইয়া দিল। সেখান হইতে খবর আসিল, মণি অথবা মধু এ-পর্যন্ত সেখানে পৌঁছে নাই।

তখন চারিদিকে খোঁজ পড়িয়া গেল। নদীতীরে-তীরে প্রশ্ন করিতে করিতে লোক ছুটিল। মধুর তল্লাস করিতে পুলিসে খবর দেওয়া হইল– কোন্‌ নৌকা, নৌকার মাঝি কে, কোন্‌ পথে তাহারা কোথায় চলিয়া গেল, তাহার কোনো সন্ধান মিলিল না।

সর্বপ্রকার আশা ছাড়িয়া দিয়া একদিন ফণিভূষণ সন্ধ্যাকালে তাহার পরিত্যক্ত শয়নগৃহের মধ্যে প্রবেশ করিল। সেদিন জন্মাষ্টমী, সকাল হইতে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়িতেছে। উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামের প্রান্তরে একটা মেলা বসে, সেখানে আটচালার মধ্যে বারোয়ারির যাত্রা আরম্ভ হইয়াছে। মুষলধারায় বৃষ্টিপাতশব্দে যাত্রার গানের সুর মৃদুতর হইয়া কানে আসিয়া প্রবেশ করিতেছে। ঐযে বাতায়নের উপরে শিথিলকব্জা দরজাটা ঝুলিয়া পড়িয়াছে ঐখানে ফণিভূষণ অন্ধকারে একলা বসিয়াছিল–বাদলার হাওয়া বৃষ্টির ছাট এবং যাত্রার গান ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতেছিল, কোনো খেয়ালই ছিল না। ঘরের দেওয়ালে আট্‌#টুডিয়ো-রচিত লক্ষ্মীসরস্বতীর একজোড়া ছবি টাঙানো; আলনার উপরে একটি গামছা ও তোয়ালে, একটি চুড়িপেড়ে ও একটি ডুরে শাড়ি সদ্যব্যবহারযোগ্যভাবে পাকানো ঝুলানো রহিয়াছে। ঘরের কোণে টিপাইয়ের উপরে পিতলের ডিবায় মণিমালিকার স্বহস্তরচিত গুটিকতক পান শুষ্ক হইয়া পড়িয়া আছে। কাচের আলমারির মধ্যে তাহার আবাল্যসঞ্চিত চীনের পুতুল, এসেন্সের শিশি, রঙিন কাচের ডিক্যাণ্টার, শৌখিন তাস, সমুদ্রের বড়ো বড়ো কড়ি, এমন কি শূন্য সাবানের বাক্সগুলি পর্যন্ত অতি পরিপাটি করিয়া সাজানো; যে অতিক্ষুদ্র গোলকবিশিষ্ট ছোটো শখের কেরোসিন-ল্যাম্প সে নিজে প্রতিদিন প্রস্তুত করিয়া স্বহস্তে জ্বালাইয়া কুলুঙ্গিটির উপর রাখিয়া দিত তাহা যথাস্থানে নির্বাপিত এবং ম্লান হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, কেবল সেই ক্ষুদ্র ল্যাম্পটি এই শয়নকক্ষে মণিমালিকার শেষমুহূর্তের নিরুত্তর সাক্ষী; সমস্ত শূন্য করিয়া যে চলিয়া যায়, সেও এত চিহ্ন, এত ইতিহাস, সমস্ত জড়সামগ্রীর উপর আপন সজীব হৃদয়ের এত স্নেহস্বাক্ষর রাখিয়া যায়! এসো মণিমালিকা, এসো, তোমার দীপটি তুমি জ্বালাও, তোমার ঘরটি তুমি আলো করো, আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া তোমার যত্নকুঞ্চিত শাড়িটি তুমি পরো, তোমার জিনিসগুলি তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তোমার কাছ হইতে কেহ কিছু প্রত্যাশা করে না, কেবল তুমি উপস্থিত হইয়া মাত্র তোমার অক্ষয় যৌবন তোমার অম্লান সৌন্দর্য লইয়া চারিদিকের এই সকল বিপুল বিক্ষিপ্ত অনাথ জড়সামগ্রীরাশিকে একটি প্রাণের ঐক্যে সঞ্জীবিত করিয়া রাখো; এই সকল মূক প্রাণহীন পদার্থের অব্যক্ত ক্রন্দন গৃহকে শ্মশান করিয়া তুলিয়াছে।

My boat was moored at the edge of a dilapidated jetty. The sun had already set.

The boatmen were conducting their evening prayers on the roof of the boat. It seemed as though their silent prayers were being expressed as an ever changing tableau on the burning skies in the west. The still, unmarked surface of the river reflected an indescribable spectrum of colours from pale to bold, from sunset gold to the steel grey of night, one beam merging with another.

As I was about to succumb to the insect song that heralded that sky, coupled with the brooding presence of an ancient decaying mansion, slightly moist eyed at its broken windows and collapsed balconies which were adding to the already depressing surrounds of the jetty strangled by tree roots, I suddenly started at the sound of someone saying, ‘And where might you be coming from?’

I saw that the speaker was an emaciated, unfortunate looking individual. He looked like so many of the country’s foreign workers, as though he had been in need of making over for a long time. He was dressed in a dhoti and a dirty greasy unbuttoned top made of Assamese raw silk that made him look like he had just returned from work. He seemed to have come to sample the evening breeze at the river’s edge rather than have the meal that he should have had at the time.

The newcomer sat on the steps at one side.

‘I have come from Ranchi,’ I said.

‘What do you do?’

‘I am in business.’

‘What kind of business?’

‘Myrobalan, silk cocoons and wood.’

‘What is your name?’

I paused slightly before giving him a name that was not my own.

His curiosity was still not satisfied. He asked again, ‘Why are you here?’

I said, ‘For a change of scenery.’

The fellow was slightly astonished. He said, ‘Dear Sir, I have been savouring the change of scenery here for the past six years along with fifteen grains of quinine each day but to no avail!’

I said, ‘The scenery is bound to be different from Ranchi.’

‘That is true, where are you staying here?’ he said.

I indicated the old house above the bank and said, ‘Over there.’

I think he was suspicious that I had found some hidden treasure in the old house. But instead of raising that, he described the event that took place fifteen years ago in this cursed mansion in some detail.

The man was the local school master. His prominent eyes burned unnaturally bright in the sunken depths of his famished and sickly face. His head was large and hairless. He reminded me of Coleridge’s Ancient Mariner.

The boatmen had started to cook their evening meals after their prayers. The last of the evening light had faded and the empty house stood in the darkness like a huge ghostly presence.

The school master said –

Ten years before I came to the village, Phanibhushan Saha used to live in this house. He had inherited the vast property and business interests of his childless uncle.

But he was affected by the modern times. He had been educated. He went to work with foreigners wearing shoes and spoke proper English there. He had also grown a beard which meant that he had little chance of advancing in his career in the employ of the foreign trader. He was easily recognized as a member of the New Bengal when one laid eyes on him.

In the meantime there was another influence at home. His wife was beautiful. Added to his college education, this meant a total abandonment of the old ways. When they were unwell, they even went so far as to send for the assistant surgeon. Their food, clothes and style also took the same upward path.

Sir, you are most probably married, therefore it is completely unnecessary to tell you that ordinarily women love raw mangoes, hot chilly peppers and strict husbands. The unfortunate man who is deprived of his wife’s love is not ugly or poor; the truth is he is too excessively mild.

If you ask, why would this happen, I have thought much about this. One becomes unhappy unless able to exercise their instincts and abilities. A deer looks for a sturdy tree to rub its antlers against and finds no pleasure in doing that against a banana plant. Ever since men and women have been separate genders, women have been practicing the art of taming restless men by various means. The wife whose husband is already tamed finds herself in need of occupying; she finds all the sharpened weapons of tears, anger and love she has received from generations of women completely fruitless.

Women like the love that they earn by using their feminine power to seduce a man, if a husband is too good natured to give his wife that opportunity; it indicates bad times ahead for both him and his wife.

The man that learns the new ways and ideas loses the natural freedom of barbarian instincts given to him by his Maker and makes the bonds of matrimony rather loose and relaxed. Our unfortunate Phani Bhushan had been spat out by the machinery of modernity as an extremely good natured person who could not hope to find great success in business or in marriage.

His wife Monimalika kept accumulating affection without really trying, costly saris without crying a few tears and jewellery without any pretence at being inconsolably offended. Her woman’s heart and her love had both stopped trying anymore. She now only took and never gave back anything. Her inoffensive and somewhat stupid husband used to think one must always give in order to receive something in return. He had clearly got it completely wrong.

The result was that she had started seeing her husband as a machine that was there to supply her with saris and jewellery; a machine so efficient that there had never been a need to oil its wheels and gears.

Even though Phanibhushan was born in Phoolbere, his place of work was here where he had to spend most of his time. In the house in Phoolbere, he had no mother of his own, but aunts and others. But he had not married a beautiful woman for the benefit of these women. Hence he brought his wife to live where he was, with him. But the difference between other rights and rights to a wife is that just keeping her with oneself separated from others may not mean that she will be more available.

His wife rarely spoke a lot, she did not mix with the neighbourhood women, the feeding of Brahmins on holy days or giving alms to a travelling mendicant – these were not things she had ever done. She never wasted anything, hoarding every thing except the affection she received from her husband. The strangest thing was that this extended to the preservation of her astounding beauty which remained untouched by time. Even at twenty four, she looked as fresh as she did when she had been fourteen. Those who have ice where their hearts should be, who do not give the pain and suffering of love any space within their breast, I suppose they remain fresher for longer, holding on to themselves both outside and within.

The Creator made Monimalika fruitless in one respect, like a vine with excessive leaves and growth, by making her childless. In other words he did not give her the one thing that she could have understood better than all the jewels in her iron safe, the one thing that could have melted her heart of ice with the gentle heat of a spring sunrise and allowed her household to fill with affection.

Monimalika was good at housework. She never employed too many people. If there was something that she could do herself she could not bear to pay someone else to do it. She did not think of anyone else nor did she did not love anyone, all she did was work and save. This meant that she never suffered from illness or sorrow and reigned over endless good health, imperturbable peace and ever increasing wealth.

For most husbands this is enough, why, this is hard to obtain. That we have a part known as the waist is not something easily remembered unless there is a pain in the region. To be aware continually through the day of the loving admonishments of a wife are like an ache in life that reminds us that we have someone who cares for us. Excessive devotion to a husband may be a source of pride for a wife but is rarely pleasing for the husband. At least that is what I feel.

Good sir! How much love one receives from a wife, how much has not been given, to measure this daily with a pair of scales is hardly a man’s job. Let her do her work and I will do mine; this is what the mathematics of daily life is all about. Our Maker has not given men the ability to tell what is hidden in the unspoken, how much want there is in fulfillment, the indications hiding in the obvious, the vast worlds within the atoms because there has been never been any need. When there is even a minute lessening in a man’s love, women will sit down to analyse it. They endlessly analyse to find the intention hidden in words and the real words that hide in intentions. This is because women find their strength in the love of men, that is the capital they trade in. When they learn how to turn their sails to that wind, their life finds what they seek. This is why the scales that measure love have been placed within a woman’s heart and not within men.

But lately, men have achieved what the Creator did not give them. Poets have defeated the natural order and have given this priceless device, this divining rod to everyone. One cannot blame the Creator, he did make men and women with enough differences, but civilization has removed those; today women are becoming men and men too are becoming women, leading to the departure of peace and discipline from the domestic scene. These days before marriage, both groom and bride feels worried about whether they are marrying a man or a woman.

You are feeling annoyed. I stay alone here, away from my wife, many deeply philosophical things about life come to mind – I cannot say these to my students, I am saying these to you, do think about them.

The important thing is that even though there was never a lack of seasoning in his food and enough lime to accompany his betel leaf, Phanibhushan still felt irritated by a tiny nagging doubt in his heart. His wife had no faults, there was nothing perceptibly wrong and yet he was not happy. He noticed his wife’s emptiness and tried to pour diamonds and pearls into it but those went into the iron safe, leaving the heart as empty as before. His uncle Durgamohan had not understood the finer nuances of love, or craved it thus, he had never given so much and yet he received much from his own wife. Do not doubt it for once, one must not be modern in matters of business and one must be a man in order to be husband.

At this time jackals started howling very loudly in the nearby bushes. The teacher’s tale was paused for a while. It felt just as though the humorous animals were laughing at either the teacher’s theories on matrimony or modern Phanibhushan’s weaknesses. When the expressions of their joy had settled down, the surroundings seemed even quieter and the master stared with his huge shining eyes as he started on his story.

A problem rose somewhere in the many arms of Phanibhushan’s complex business. As a non-business minded person, it is hard for me to either understand or explain what exactly happened. The main thing was that it became hard for him to have credit in the markets. If he had but a spare hundred and fifty thousand rupees for just five days, he would have managed to flash that as a guarantee and his business would have regained the wind in its sails.

The money was proving hard to find. The fear that borrowing from local money lenders would damage his credit even further made him look to unknown sources for loans. There was the small matter of having enough to give them as collateral.

If he could pawn his wife’s jewellery, there would be little need for receipts and delays and things could be done quickly and easily.

Phanibhushan went to his wife once. He could not go to her as easily as a husband goes to his wife. Unfortunately he loved his wife with the same love as a hero loves his heroine in a poem, the kind of love that demands careful footsteps and carefully worded sentences, the kind that exists like the tremendous attraction between the sun  and the earth over the vast distances that separate them.

Even so, in the poems the hero may still have to raise the topic of loans and IOUs with the heroine, but this leads to the tune faltering, the words failing and a kind of hesitation and sorrow dogs the steps. The unfortunate Phanibhushan could not clearly say, ‘Listen, a need has come up, give me your jewellery.’

He did say it, but he said it very meekly. When Monimalika hardened her face and did not deign to say yes or no, he was terribly hurt but he could not hurt her back. This was because he lacked the barbarity of the male. Where he could have taken by force, he did not even express his genuine sadness. Where love was the only right, he was of the opinion that he would not allow force to enter even if it meant ruination. If one had attempted to rebuke him over this, he would have presented a well reasoned argument about how just as he could not force the market to lend him money when he was seen to be a risk, he would not force his wife to give him her jewellery when she did not do that of her free will. Credit to him was the same as love; the only place for force was the battlefield. Did the Creator make men this generous, this powerful, this mighty so that they could dispatch arguments so well? Does it suit them to sit and observe the gentle nuances and subtleties of someone’s nature or do they have the time?

Phanibhushan went off to Kolkata to find the money he needed by some other means, thanks to his natural pride that prevented him from demanding his wife’s help.

Generally in life, a wife knows her husband far better than the husband knows his wife, but if a husband is excessively sensitive, this is not completely understood by the wife. Phanibhushan’s wife did not really understand him. Very progressive men do not fall within the scope of the ancient beliefs that form the untutored expertise of women. These men are just as mysterious as women. The usual general quotas within which one may fit ordinary men, such as boorish, stupid or even unseeing – the modern man defies classification within those.

For this reason, Monimalika called on her counsel for advice. She had a very distant cousin who was from her village who now worked for Phanibhushan. He was not the type to advance far by hard work but he managed to make a living and supplement that by virtue of his relationship.

Monimalika told him everything and asked him, ‘What do you advise now?’

He shook his head very wisely, indicating this was not a good turn of events. The wise rarely see a turn of events as good. He said, ‘The owner will never be able to come up  with the money, he will come after your jewellery eventually.’

From what Monimalika knew of people, this was not just inevitable, it was also very logical. She grew very worried indeed. She had no child, she did have a husband but she did not feel his presence within her heart. When she thought that the only thing of value to her, raised like a child over the years, not an abstract like love but real gold, meant to shine at chest, throat and hair – that much loved hoard would disappear into the bottomless pit of a failing business her very heart froze. She asked, ‘What can I do?’

Madhusudan said, ‘Let me take you and your jewellery back home, while you still  can.’ Clever Madhu had already decided on a plan which would see him get a part of that wealth, possibly even most of it.

Monimalika immediately agreed to this proposal.

One evening in the rainy season a boat came and moored at this very jetty. Monimalika boarded the boat the following dawn in dense darkness broken only by the calls of sleepless frogs, covered in a thick shawl that covered her from  head to toe. Madhusudan woke up within the boat and said, ‘Give the jewellery box.’ Moni answered, ‘Later, let us set off now.’

The boat set sail and moved fast before the wind.

Monimalika had worn all her jewellery, one precious piece at a time, all through the night, there was an inch uncovered on her body. She had a fear of taking her jewellery box and losing it to thieves. But she knew that if she wore them all, she would have to be killed before a single jewel was lost.

Madhusudan was unable to understand where the jewellery was as she had no case with her. He did not think of the possibility that she was carrying what she valued as much as herself on her own person. She could not fathom her husband Phanibhushan but she had seen into Madhusudan’s heart with ease.

Madhusudan left a note with the rent-collector saying he was taking the lady of the house home. The man had been working since Phanibhushan’s father was running the business and he was very annoyed. He wrote a letter to his employer, a letter filled with spelling errors and incorrect language but he managed to make it clear that it was not correct to show too much leniency to one’s wife.

Phanibhushan understood what had gone through Monimalika’s mind. He felt worse because he thought, ‘Inspite of every chance of losing everything I did not touch your jewels and am engaged  in finding the money, and still you suspect me! You fail to recognize me, even today!’

Instead of becoming angered at this mistreatment, he only felt deeply hurt. A man is the sceptre of divine justice within which he has concealed his lightning, if a man cannot flare up in rage at the injustice wrought upon him and others, then shame upon him! Men are meant to be inflamed easily like forest fires while women will shed tears like rain at the slightest excuse, this was the Creator’s design, but that is no longer applicable.

In his thoughts Phanibhushan said to his erring wife, ‘If this is to be your decision, let it be, I will keep doing my duty.’ The tragedy was that a man like Phanibhushan who should have come along a few centuries later when conscience would be all that would be needed to rule the world, had been born today and had married the kind of ancient woman whose wisdom was called demonic in the scriptures. He did not write a single line to her and promised himself he would never mention this to his wife ever again. What a strange punishment!

After about ten days after managing somehow to scrounge the money, a redeemed Phanibhushan came home. He knew that Monimalika would have returned after leaving the jewellery with her parents. As he approached the bedroom door he cast aside the air of supplication he had worn the previous time and thought of how Moni might be ashamed and slightly repentant to see him after his success.

He saw the door was barred. He broke the padlock and found the room empty. In a corner lay the iron chest without a trace of any jewellery. Suddenly he felt a pang. He thought life was meaningless and love and success were all false. We bleed on every spike of the cage that we build but there is no bird within, it does not stay even if we place it there. Then what have I been adorning with rubies of my blood and pearls of my tears! He kicked the empty dreams of family life far away.

He did not want to look for her. He thought to himself if she wanted she would come back. The old Brahmin rent collector came and said to him, ‘What good can come of sitting and doing nothing, we have to look for her.’ When he sent word to her parents’ village, word came back that neither Moni nor Madhu had reached there.

People were sent all over the place. People asked questions all along the river bank in search of information. The police were involved in the search for Madhu – which boat, who was their boatman, which way had they gone, no news was heard of them at all.

One day Phanibhushan entered his abandoned bedroom in the evening after all hope had been abandoned. The day was Janmashtami and it had been raining all day. There was a fair in the village to celebrate the holy day and a play had been organized in the community shed. The continual sound of heavy rain had lessened the sound of the voices singing in the play. See that window where the shutter hangs loosely? Phanibhushan was sitting there alone in the dark – he paid no heed to the splatter of rain and the songs entering the room. There was a pair of Art Studio paintings of Lakshmi and Saraswati on the wall, a couple of towels and two saris, one striped and one with thin bands on the border hanging on the rack, ready to be used. A few mouth freshening paan made by Monimalika lay dried in a brass bowl on a side table. Inside the china cabinet were the porcelain dolls she had collected from the days of her childhood, bottles of perfume, coloured glass decanters, fancy playing cards, large seashells, even empty soap boxes kept with great care; the little round kerosene lamp that she would prepare each day and light in the alcove sat there, unlit and dulled.  That little lamp was the only wordless witness to her last minutes in the room; even the one who goes away taking everything with  her leaves behind so many things to remember her by, so much of her history, so many little touches of her once living soul upon all these inanimate objects!

Come Monimalika, light your lamp, illuminate your room, stand before your mirror and wear your carefully folded sari, all your things await you. No one expects anything from you, just come back and allow your eternal youth and your undiminished beauty to give life to these many scattered lifeless objects, binding them together, for the unsaid cries of these have made this house a graveyard.