Archive | April 2013

চোখের বালি ২, Chokher Bali Chapter 2

চোখের বালি

kalighat_pat_

মেয়ে দেখিবার কথা মহেন্দ্র প্রায় ভুলিয়াছিল, অন্নপূর্ণা ভোলেন নাই। তিনি শ্যামবাজারে মেয়ের অভিভাবক জেঠার বাড়িতে পত্র লিখিয়া দেখিতে যাইবার দিন স্থির করিয়া পাঠাইলেন।

দিন স্থির হইয়াছে শুনিয়াই মহেন্দ্র কহিল, “এত তাড়াতাড়ি কাজটা করিলে কেন কাকী। এখনো বিহারীকে বলাই হয় নাই।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি হয় মহিন। এখন না দেখিতে গেলে তাহারা কী মনে করিবে।”

মহেন্দ্র বিহারীকে ডাকিয়া সকল কথা বলিল। কহিল, “চলো তো, পছন্দ না হইলে তো তোমার উপর জোর চলিবে না।”

বিহারী কহিল, “সে কথা বলিতে পারি না। কাকীর বোনঝিকে দেখিতে গিয়া পছন্দ হইল না বলা আমার মুখ দিয়া আসিবে না।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে তো উত্তম কথা।”

বিহারী কহিল, “কিন্তু তোমার পক্ষে অন্যায় কাজ হইয়াছে মহিনদা। নিজেকে হালকা রাখিয়া পরের স্কন্ধে এরূপ ভার চাপানো তোমার উচিত হয় নাই। এখন কাকীর মনে আঘাত দেওয়া আমার পক্ষে বড়োই কঠিন হইবে।”

মহেন্দ্র একটু লজ্জিত ও রুষ্ট হইয়া কহিল, “তবে কী করিতে চাও!”

বিহারী কহিল, “যখন তুমি আমার নাম করিয়া তাঁহাকে আশা দিয়াছ, তখন আমি বিবাহ করিব– দেখিতে যাইবার ভড়ং করিবার দরকার নাই।”

অন্নপূর্ণাকে বিহারী দেবীর মতো ভক্তি করিত।

অবশেষে অন্নপূর্ণা বিহারীকে নিজে ডাকিয়া কহিলেন, “সে কি হয় বাছা। না দেখিয়া বিবাহ করিবে, সে কিছুতেই হইবে না। যদি পছন্দ না হয়, তবে বিবাহে সম্মতি দিতে পারিবে না, এই আমার শপথ রহিল।”

নির্ধারিত দিনে মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া মাকে কহিল, “আমার সেই রেশমের জামা এবং ঢাকাই ধুতিটা বাহির করিয়া দাও।”

মা কহিলেন, “কেন, কোথায় যাবি।”

মহেন্দ্র কহিল, “দরকার আছে মা, তুমি দাও-না, আমি পরে বলিব।”

মহেন্দ্র একটু সাজ না করিয়া থাকিতে পারিল না। পরের জন্য হইলেও কন্যা দেখিবার প্রসঙ্গমাত্রেই যৌবনধর্ম আপনি চুলটা একটু ফিরাইয়া লয়, চাদরে কিছু গন্ধ ঢালে।

দুই বন্ধু কন্যা দেখিতে বাহির হইল।

কন্যার জেঠা শ্যামবাজারের অনুকূলবাবু– নিজের উপার্জিত ধনের দ্বারায় তাঁহার বাগানসমেত তিনতলা বাড়িটাকে পাড়ার মাথার উপর তুলিয়াছেন।

দরিদ্র ভ্রাতার মৃত্যুর পর পিতৃমাতৃহীনা ভ্রাতুষ্পুত্রীকে তিনি নিজের বাড়িতে আনিয়া রাখিয়াছেন। মাসি অন্নপূর্ণা বলিয়াছিলেন, “আমার কাছে থাক্‌।” তাহাতে ব্যয়লাঘবের সুবিধা ছিল বটে, কিন্তু গৌরবলাঘবের ভয়ে অনুকূল রাজি হইলেন না। এমন-কি, দেখাসাক্ষাৎ করিবার জন্যও কন্যাকে কখনো মাসির বাড়ি পাঠাইতেন না, নিজেদের মর্যাদা সম্বন্ধে তিনি এতই কড়া ছিলেন।

কন্যাটির বিবাহ-ভাবনার সময় আসিল কিন্তু আজকালকার দিনে কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে “যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী’ কথাটা খাটে না। ভাবনার সঙ্গে খরচও চাই। কিন্তু পণের কথা উঠিলেই অনুকূল বলেন, “আমার তো নিজের মেয়ে আছে, আমি একা আর কত পারিয়া উঠিব।” এমনি করিয়া দিন বহিয়া যাইতেছিল। এমন সময় সাজিয়া-গুজিয়া গন্ধ মাখিয়া রঙ্গভূমিতে বন্ধুকে লইয়া মহেন্দ্র প্রবেশ করিলেন।

তখন চৈত্রমাসের দিবসান্তে সূর্য অস্তোন্মুখ। দোতলার দক্ষিণবারান্দায় চিত্রিত চিক্কণ চীনের টালি গাঁথা; তাহারই প্রান্তে দুই অভ্যাগতের জন্য রুপার রেকাবি ফলমূলমিষ্টান্নে শোভমান এবং বরফজলপূর্ণ রুপার গ্লাস শীতল শিশিরবিন্দু জালে মণ্ডিত। মহেন্দ্র বিহারীকে লইয়া আলজ্জিতভাবে খাইতে বসিয়াছেন। নীচে বাগানে মালী তখন ঝারিতে করিয়া গাছে গাছে জল দিতেছিল; সেই সিক্ত মৃত্তিকার স্নিগ্ধ গন্ধ বহন করিয়া চৈত্রের দক্ষিণ বাতাস মহেন্দ্রের শুভ্র কুঞ্চিত সুবাসিত চাদরের প্রান্তকে দুর্দাম করিয়া তুলিতেছিল। আশপাশের দ্বার-জানালার ছিদ্রান্তরাল হইতে একটু-আধটু চাপা হাসি, ফিসফিস কথা, দুটা-একটা গহনার টুংটাং যেন শুনা যায়।

আহারের পর অনুকূলবাবু ভিতরের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “চুনি, পান নিয়ে আয় তো রে।”

কিছুক্ষণ পরে সংকোচের ভাবে পশ্চাতের একটা দরজা খুলিয়া গেল এবং একটি বালিকা কোথা হইতে সর্বাঙ্গে রাজ্যের লজ্জা জড়াইয়া আনিয়া পানের বাটা হাতে অনুকূলবাবুর কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তিনি কহিলেন, “লজ্জা কী মা। বাটা ঐ ওঁদের সামনে রাখো।”

বালিকা নত হইয়া কম্পিতহস্তে পানের বাটা অতিথিদের আসন-পার্শ্বে ভূমিতে রাখিয়া দিল। বারান্দায় পশ্চিম-প্রান্ত হইতে সূর্যাস্ত-আভা তাহার লজ্জিত মুখকে মণ্ডিত করিয়া গেল। সেই অবকাশে মহেন্দ্র সেই কম্পান্বিতা বালিকার করুণ মুখচ্ছবি দেখিয়া লইল।

বালিকা তখনি চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে অনুকূলবাবু কহিলেন, “একটু দাঁড়া চুনি। বিহারীবাবু, এইটি আমার ছোটো ভাই অপূর্বর কন্যা। সে তো চলিয়া গেছে, এখন আমি ছাড়া ইহার আর কেহ নাই।” বলিয়া তিনি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন।

মহেন্দ্রের হৃদয়ে দয়ার আঘাত লাগিল। অনাথার দিকে আর-এক বার চাহিয়া দেখিল।

কেহ তাহার বয়স স্পষ্ট করিয়া বলিত না। আত্মীয়েরা বলিত, “এই বারো-তেরো হইবে।” অর্থাৎ চৌদ্দ-পনেরো হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। কিন্তু অনুগ্রহপালিত বলিয়া একটি কুণ্ঠিত ভীরু ভাবে তাহার নবযৌবনারম্ভকে সংযত সংবৃত করিয়া রাখিয়াছে।

আর্দ্রচিত্ত মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার নাম কী।” অনুকূলবাবু উৎসাহ দিয়া কহিলেন, “বলো মা, তোমার নাম বলো।” বালিকা তাহার অভ্যস্ত আদেশপালনের ভাবে নতমুখে বলিল, “আমার নাম আশালতা।”

আশা! মহেন্দ্রের মনে হইল নামটি বড়ো করুণ এবং কণ্ঠটি বড়ো কোমল। অনাথা আশা!

দুই বন্ধু পথে বাহির হইয়া আসিয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল। মহেন্দ্র কহিল, “বিহারী, এ মেয়েটিকে তুমি ছাড়িয়ো না।”

বিহারী তাহার স্পষ্ট উত্তর না করিয়া কহিল, “মেয়েটিকে দেখিয়া উহার মাসিমাকে মনে পড়ে; বোধ হয় অমনি লক্ষ্মী হইবে।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার স্কন্ধে যে বোঝা চাপাইলাম, এখন বোধ হয় তাহার ভার তত গুরুতর বোধ হইতেছে না।”

বিহারী কহিল, “না, বোধ হয় সহ্য করিতে পারিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “কাজ কী এত কষ্ট করিয়া। তোমার বোঝা না হয় আমিই স্কন্ধে তুলিয়া লই। কী বল।”

বিহারী গম্ভীরভাবে মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিল। কহিল, “মহিনদা, সত্য বলিতেছ? এখনো ঠিক করিয়া বলো। তুমি বিবাহ করিলে কাকী ঢের বেশি খুশি হইবেন-তাহা হইলে তিনি মেয়েটিকে সর্বদাই কাছে রাখিতে পারিবেন।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমি পাগল হইয়াছ? সে হইলে অনেক কাল আগে হইয়া যাইত।”

বিহারী অধিক আপত্তি না করিয়া চলিয়া গেল, মহেন্দ্রও সোজা পথ ছাড়িয়া দীর্ঘ পথ ধরিয়া বহুবিলম্বে ধীরে ধীরে বাড়ি গিয়া পৌঁছিল।

মা তখন লুচিভাজা-ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলেন, কাকী তখনো তাঁহার বোনঝির নিকট হইতে ফেরেন নাই।

মহেন্দ্র একা নির্জন ছাদের উপর গিয়া মাদুর পাতিয়া শুইল। কলিকাতার হর্ম্যশিখরপুঞ্জের উপর শুক্লসপ্তমীর অর্ধচন্দ্র নিঃশব্দে আপন অপরূপ মায়ামন্ত্র বিকীর্ণ করিতেছিল। মা যখন খাবার খবর দিলেন, মহেন্দ্র অলসস্বরে কহিল, “বেশ আছি, এখন আর উঠিতে পারি না।”

মা কহিলেন, “এইখানেই আনিয়া দিই না?”

মহেন্দ্র কহিল, “আজ আর খাইব না, আমি খাইয়া আসিয়াছি।”

মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় খাইতে গিয়াছিলি।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে অনেক কথা, পরে বলিব।”

মহেন্দ্রের এই অভূতপূর্ব ব্যবহারে অভিমানিনী মাতা কোনো উত্তর না করিয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলেন।

তখন মুহূর্তের মধ্যে আত্মসংবরণ করিয়া অনুতপ্ত মহেন্দ্র কহিল, “মা, আমার খাবার এইখানেই আনো।”

মা কহিলেন, “ক্ষুধা না থাকে তো দরকার কী!”

এই লইয়া ছেলেতে মায়েতে কিয়ৎক্ষণ মান-অভিমানের পর মহেন্দ্রকে পুনশ্চ আহারে বসিতে হইল।

Chokher Bali Chapter 2

Mahendra had almost completely forgotten their discussion about going to see the girl, but Annapurna had not. She wrote to the girl’s guardian, her uncle in Shyambajar, and fixed a date for the meeting.
As soon as Mahendra heard that the day had been decided upon, he said, ‘Why did you rush into this Aunt? I have not told Bihari yet.’
Annapurna said, ‘How can you not go now? What will they think?’

Mahendra summoned Bihari and told him everything. He added, ‘Let us go, if you do not like her, there is no question of any pressure on you.’
Bihari said, ‘I cannot promise that. If I do not like Aunt’s niece, I will never be able to say that out loud.’
Mahendra said, ‘That is perfect.’
Bihari said, ‘But you have not done the right thing Mahendra. You should not have placed this responsibility on my shoulders to save yourself. Now it will be very hard for me to hurt our Aunt.’
Mahendra was slightly ashamed and more than a little annoyed; he said, ‘What do you want to do then?’
‘When you have given her some assurance on my behalf, I will marry the girl – there is no need to go through the farce of seeing her beforehand,’ said Bihari.
Bihari respected Annapurna greatly.

Eventually Annapurna heard this and sent for Bihari, saying, ‘How can that be, my child? You must not marry without seeing her once. If you do not like her, you must not agree to this marriage, promise me this much.’
On the day Mahendra came back from college and told his mother, ‘Fetch me my silk shirt and the Dhakai dhoti.’
His mother asked, ‘Why, where are you going?’
Mahendra replied, ‘I need them, give them to me now, I will tell you later.’

Mahendra could not help dressing with a bit more care than usual. The nature of youth is such that the occasion of going to meet a girl demands an extra brushing of hair, a touch of perfume on one’s clothes, even if it is for another man.

The two friends went to see the prospective bride.
The girl’s uncle was Anukul babu and he had built a three storeyed house set in a garden in Shyambajar with his own earnings.
He had brought his orphaned niece to his own house after his poor brother passed away. Her mother’s sister Annapurna had offered to take her; this would have helped to lessen his household expenditure but being more concerned about loss of pride, he did not agree. He did not even send her to her aunt’s house, such was his strict attention to his own position.
It was time to start thinking about her marriage but these days the phrase ‘Thought begets action’ does not apply to the marriage of a female child. There are expenses that must accompany the thought. But whenever talk of a dowry arose, Anukul said, ‘I have a daughter of my own, how much can I spend by myself?’ Days passed in this manner. This was the arena that Mahendra found himself in, perfumed and dressed to the nines, along with his friend.

The sun was almost setting as the Chaitra day drew to an end. The verandah on the southern side of the second floor was covered with smooth painted porcelain tiles; silver bowls of fruits and sweets and silver glasses filled with iced water, filigreed with dew drops of condensation had been placed at one end of that for the guests. Mahendra and Bihari had begun eating, rather bashfully. The gardener was watering each plant in the garden below; the moist soil giving off a gentle perfume that rose in the southerly breeze of Chaitra to move the white, folded, perfumed ends of Mahendra’s wrap. A few snatches of suppressed laughter, a whispered word, a tinkling of jewellery seemed to come from the gaps of surrounding doors and windows.

After the meal, Anukulbabu looked at one of the doors and said to someone behind it, ‘Chuni, do bring some pan.’
A little later a door behind them opened somewhat hesitantly, a girl appeared bearing a container of pan; she came and stood near Anukulbabu. He said, ‘Why so shy? Put it in front of these gentlemen.’
The girl bent down and placed the pan next to their seats with a trembling hand. The glow of the setting sun enveloped her shy face with light from the western end of the verandah. At that very moment, Mahendra caught a glimpse of her sorrowful face and her trembling form.
She was about to leave immediately but Anukulbabu said, ‘Wait for a while, Chuni. Biharibabu, this is my younger brother Apurba’s daughter. He has passed away and she has no one apart from me now.’ He sighed after saying this.
Mahendra felt a stirring of pity in his heart. He looked at the orphaned girl once more.

No one ever spoke frankly about her age. The relatives would say, ‘Not more than twelve or thirteen,’ which meant it was very possible that she was fourteen or perhaps even fifteen years old. But a tentative fear which came from being raised by the grace of others had suppressed the arrival of glorious youth in her appearance.

Mahendra said gently, ‘What is your name?’ Anukulbabu encouraged her saying, ‘Tell them dear, tell them your name.’ The girl looked at the ground and said in her usual submissive manner, ‘My name is Ashalota.’

Ashalota! Mahendra thought her voice very soft and her name filled with pathos. Asha the orphan!

The two friends let the carriage go when they left the house. Mahendra said, Bihari, do not let this girl slip away.’

Bihari did not directly respond to that, saying instead, ‘I was reminded of her aunt when I saw the girl. She will most probably be just as gracious.’

Mahendra said, ‘I suppose the responsibility I have placed on your shoulders does not seem as irksome as before.’

Bihari answered, ‘No, I have a feeling I will be able to bear it.’

Mahendra said, ‘Why do you have to try so hard? Let me take the responsibility instead. What do you think?’

Bihari looked at Mahendra’s face intently. He then said, ‘Mahendra, are you serious? There is still time. If you were to indeed marry her, it would make our aunt even happier – she will be able to have the girl close by all the time.’

Mahendra said, ‘Are you mad? If that was to be, it would have happened a long time ago.’

Bihari went away without further protest, and Mahendra walked up and down many streets before making his way home very late.

His mother was busy frying luchis at the time and his aunt had not returned from her niece’s house.

Mahendra went up to the empty roof terrace and lay down on a mat. A half moon was casting its magical spell on the houses and mansions of Kolkata. When his mother sent word of dinner, Mahendra answered languidly, ‘I am fine, I do not feel like getting up any more.’

His mother asked, ‘Why don’t I bring the food here?’
Mahendra said, ‘I do not want to eat any more today, I have had dinner.’
‘Where did you go for a meal?’ asked his mother.
Mahendra answered, ‘That is a long story, I will tell you later.’

She was mortified at this hitherto unseen behavior on Mahendra’s part and prepared to leave.
Mahendra collected himself quickly and in an attempt to pacify her, said, ‘Ma, you may bring my food here.’
His mother said, ‘You do not have to eat if you are not hungry.’
This process of soothing her ruffled feelings went on for a while before Mahendra had to sit down to eat dinner once again.

Image: http://chandradey.blogspot.com.au/2009_12_31_archive.html

পল্লীর উন্নতি /Pollir Unnoti/Rural Improvement

A_cottage_at_Shantiniketan

Talodhwoj, a cottage at Santiniketan

হিতসাধনমণ্ডলীর সভায় কথিত

সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় বাষ্পের প্রভাব যখন বেশি তখন গ্রহনক্ষত্রে ল্যাজামুড়োর প্রভেদ থাকে না। আমাদের দেশে সেই দশা– তাই সকলকেই সব কাজে লাগতে হয়, কবিকেও কাজের কথায় টানে। অতএব আমি আজকের এই সভায় দাঁড়ানোর জন্যে যদি ছন্দোভঙ্গ হয়ে থাকে তবে ক্ষমা করতে হবে।

এখানকার আলোচ্য কথাটি সোজা। দেশের হিত করাটা যে দেশের লোকেরই কর্তব্য সেইটে এখানে স্বীকার করতে হবে। এ কথাটা দুর্বোধ নয়। কিন্তু নিতান্ত সোজা কথাও কপালদোষে কঠিন হয়ে ওঠে সেটা পূর্বে পূর্বে দেখেছি। খেতে বললে মানুষ যখন মারতে আসে তখন বুঝতে হবে সহজটা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেইটেই সব চেয়ে মুশকিলের কথা।

আমার মনে পড়ে এক সময়ে যখন আমার বয়স অল্প ছিল, সুতরাং সাহস বেশি ছিল, সে সময়ে বলেছিলুম যে বাঙালির ছেলের পক্ষে বাংলা ভাষার ভিতর দিয়ে শিক্ষা পাওয়ার দরকার আছে। শুনে সেদিন বাঙালির ছেলের বাপদাদার মধ্যে অনেকেই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।

আর-একদিন বলেছিলুম, দেশের কাজ করবার জন্য দেশের লোকের যে অধিকার আছে সেটা আমরা আত্ম-অবিশ্বাসের মোহে বা সুবিধার খাতিরে অন্যের হাতে তুলে দিলে যথার্থপক্ষে নিজের দেশকে হারানো হয়। সামর্থ্যের স্বল্পতা-বশত যদি-বা আমাদের কাজ অসম্পূর্ণও হয়, তবু সে ক্ষতির চেয়ে নিজশক্তি-চালনার গৌরব ও সার্থকতার লাভ অনেক পরিমাণে বেশি। এত বড়ো একটা সাদা কথা লোক ডেকে যে বলতে বসেছিলুম তাতে মনের মধ্যে কিছু লজ্জা বোধ করেছিলুম। কিন্তু বলা হয়ে গেলে পরে লাঠি হাতে দেশের লোকে আমার সেটুকু লজ্জা চুরমার করে দিয়েছিল।

দেশের লোককে দোষ দিই নে। সত্য কথাও খামকা শুনলে রাগ হতে পারে। অন্যমনস্ক মানুষ যখন গর্তর মধ্যে পড়তে যাচ্ছে তখন হঠাৎ তাকে টেনে ধরলে সে হঠাৎ মারতে আসে। যেই, সময় পেলেই, দেখতে পায় সামনে গর্ত আছে, তখন রাগ কেটে যায়। আজ সময় এসেছে, গর্ত চোখে পড়েছে, আজ আর সাবধান করবার দরকারই নেই।

দেশের লোককে দেশের কাজে লাগতে হবে এ কথাটা আজ স্বাভাবিক হয়েছে। তার প্রধান কারণ, দেশ যে দেশ এই উপলব্ধিটা আমাদের মনে আগেকার চেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুতরাং দেশকে সত্য বলে জানবামাত্রই তার সেবা করবার উদ্যমও আপনি সত্য হল, সেটা এখন আর নীতি-উপদেশ মাত্র নয়।

যৌবনের আরম্ভে যখন বিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতা অল্প অথচ আমাদের শক্তি উদ্যত, তখন আমরা নানা বৃথা অনুকরণ করি, নানা বাড়াবাড়িতে প্রবৃত্ত হই। তখন আমরা পথও চিনি নে, ক্ষেত্রও চিনি নে, অথচ ছুটে চলবার তেজ সামলাতে পারি নে। সেই সময়ে আমাদের যাঁরা চালক তাঁরা যদি আমাদের ঠিকমত কাজের পথে লাগিয়ে দেন তা হলে অনেক বিপদ বাঁচে। কিন্তু তাঁরা এ পর্যন্ত এমন কথা বলেন নি যে, “এই আমাদের কাজ, এসো আমরা কোমর বেঁধে লেগে যাই।’ তাঁরা বলেন নি “কাজ করো’, তাঁরা বলেছেন “প্রার্থনা করো’।

When the universe was being formed there was an excess of gas and this means there was little to distinguish between planets and stars. The situation in our country is the same – which is why everyone has a hand in every kind of activity and even a poet must be called upon to speak about sensible things. So forgive me if my presence in this gathering strikes a dischordant note.

The topic being discussed is easy. One must accept that it is the responsibility of the people of the country to try and help it. This is not difficult to understand. But I have seen often in the past that even the simplest words can become unintelligible through sheer bad luck. When people come rushing at you in anger because you invited them to a meal, one must know that the easy has become difficult. That is the most difficult thing of all.

I remember once when I was young, and hence more courageous, I had said that Bengali youth needed to receive their education in the Bengali language. Many of the fathers and brothers of the Bengali youth had been angered that day.

At another time I had said, if we give away the right we have of doing the nation’s work to others on the basis of blind self confidence or for personal ease it is equal to losing the country. Even if the work is left incomplete by us due to lack of ability, that loss is still less than the pride and fulfillment of using one’s own power to achieve. I was feeling slightly ashamed that I had invited people to tell them such an obvious fact. But once I did say it, the people of my country took to me with cudgels and managed to destroy any shame I might have felt.

I do not blame them. A sudden onslaught of truth can make people angry. When one tries to grab an absentminded person falling into a hole they can hit back as a reflex. Given time, when they see the hole in front, their anger disappears. Today the time is ripe, our eyes are on the hole, there is no more need for warnings.

Today it has become natural to assume that the people of a country must work for that country. The main reason for this is that the realization that the country is ours has become clearer than it was in the past. Hence the drive to help the country became an accepted truth as soon as the concept of country became true; it is no longer a dry piece of advice.

In the early days of youth when our experience of the world is limited but our strength is on the rise, we try to ape things in vain and cross boundaries where we can. At the time we know neither the way nor where it leads but we cannot resist the temptation to rush ahead. During this period, if our leaders guide us correctly we can be saved from many dangers. But they have not said yet, ‘This is our task. Come and let us do it all together.’ They have not said, ‘Work for salvation.’ They have said, ‘Pray, for salvation.’ This means rather than depending on yourself for results, depend on outsiders.

চোখের বালি ১/Chokher Bali 1

bonti

চোখের বালি

বিনোদিনীর মাতা হরিমতি মহেন্দ্রের মাতা রাজলক্ষ্মীর কাছে আসিয়া ধন্না দিয়া পড়িল। দুইজনেই এক গ্রামের মেয়ে, বাল্যকালে একত্রে খেলা করিয়াছেন।

রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রকে ধরিয়া পড়িলেন, “বাবা মহিন, গরিবের মেয়েটিকে উদ্ধার করিতে হইবে। শুনিয়াছি মেয়েটি বড়ো সুন্দরী, আবার মেমের কাছে পড়াশুনাও করিয়াছে– তোদের আজকালকার পছন্দর সঙ্গে মিলিবে।”

মহেন্দ্র কহিল, “মা, আজকালকার ছেলে তো আমি ছাড়াও আরো ঢের আছে।”

রাজলক্ষ্মী। মহিন, ঐ তোর দোষ, তোর কাছে বিয়ের কথাটি পাড়িবার জো নাই।

মহেন্দ্র। মা, ও কথাটা বাদ দিয়াও সংসারে কথার অভাব হয় না। অতএব ওটা মারাত্মক দোষ নয়।

মহেন্দ্র শৈশবেই পিতৃহীন। মা-সম্বন্ধে তাহার ব্যবহার সাধারণ লোকের মতো ছিল না। বয়স প্রায় বাইশ হইল, এম| এ| পাস করিয়া ডাক্তারি পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, তবু মাকে লইয়া তাহার প্রতিদিন মান-অভিমান আদর-আবদারের অন্ত ছিল না। কাঙারু-শাবকের মতো মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াও মাতার বহির্গর্ভের থলিটির মধ্যে আবৃত থাকাই তাহার অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল। মার সাহায্য ব্যতীত তাহার আহার বিহার আরাম বিরাম কিছুই সম্পন্ন হইবার জো ছিল না।

এবারে মা যখন বিনোদিনীর জন্য তাহাকে অত্যন্ত ধরিয়া পড়িলেন, তখন মহেন্দ্র বলিল, “আচ্ছা, কন্যাটি একবার দেখিয়া আসি।”

দেখিতে যাইবার দিন বলিল, “দেখিয়া আর কী হইবে। তোমাকে খুশি করিবার জন্য বিবাহ করিতেছি, ভালোমন্দ বিচার মিথ্যা।”

কথাটার মধ্যে একটু রাগের উত্তাপ ছিল, কিন্তু মা ভাবিলেন, শুভদৃষ্টির সময় তাঁহার পছন্দর সহিত যখন পুত্রের পছন্দর নিশ্চয় মিল হইবে তখন মহেন্দ্রের কড়ি-সুর কোমল হইয়া আসিবে।

রাজলক্ষ্মী নিশ্চিন্তচিত্তে বিবাহের দিন স্থির করিলেন। দিন যত নিকটে আসিতে লাগিল, মহেন্দ্রের মন ততই উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল– অবশেষে দুই-চার দিন আগে সে বলিয়া বসিল, “না মা, আমি কিছুতেই পারিব না।”

বাল্যকাল হইতে মহেন্দ্র দেবতা ও মানবের কাছে সর্বপ্রকার প্রশ্রয় পাইয়াছে, এইজন্য তাহার ইচ্ছার বেগ উচ্ছৃঙ্খল। পরের ইচ্ছার চাপ সে সহিতে পারে না। তাহাকে নিজের প্রতিজ্ঞা এবং পরের অনুরোধ একান্ত বাধ্য করিয়া তুলিয়াছে বলিয়াই বিবাহ-প্রস্তাবের প্রতি তাহার অকারণ বিতৃষ্ণা অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল এবং আসন্নকালে সে একেবারেই বিমুখ হইয়া বসিল।

মহেন্দ্রের পরম বন্ধু ছিল বিহারী; সে মহেন্দ্রকে দাদা এবং মহেন্দ্রের মাকে মা বলিত। মা তাহাকে স্টীমবোটের পশ্চাতে আবদ্ধ গাধাবোটের মতো মহেন্দ্রের একটি আবশ্যক ভারবহ আসবাবের স্বরূপ দেখিতেন ও সেই হিসাবে মমতাও করিতেন। রাজলক্ষ্মী তাহাকে বলিলেন, “বাবা, এ কাজ তো তোমাকেই করিতে হয়, নহিলে গরিবের মেয়ে–”

বিহারী জোড়হাত করিয়া কহিল, “মা, ঐটে পারিব না। যে-মেঠাই তোমার মহেন্দ্র ভালো লাগিল না বলিয়া রাখিয়া দেয়, সে-মেঠাই তোমার অনুরোধে পড়িয়া আমি অনেক খাইয়াছি, কিন্তু কন্যার বেলা সেটা সহিবে না।”

রাজলক্ষ্মী ভাবিলেন, “বিহারী আবার বিয়ে করিবে! ও কেবল মহিনকে লইয়াই আছে, বউ আনিবার কথা মনেও স্থান দেয় না।’

এই ভাবিয়া বিহারের প্রতি তাঁহার কৃপামিশ্রিত মমতা আর-একটুখানি বাড়িল।

বিনোদিনীর বাপ বিশেষ ধনী ছিল না, কিন্তু তাহার একমাত্র কন্যাকে সে মিশনারি মেম রাখিয়া বহুযত্নে পড়াশুনা ও কারুকার্য শিখাইয়াছিল। কন্যার বিবাহের বয়স ক্রমেই বহিয়া যাইতেছিল, তবু তাহার হুঁশ ছিল না। অবশেষে তাহার মৃত্যুর পরে বিধবা মাতা পাত্র খুঁজিয়া অস্থির হইয়া পড়িয়াছে। টাকাকড়িও নাই, কন্যার বয়সও অধিক।

তখন রাজলক্ষ্মী তাঁহার জন্মভূমি বারাসতের গ্রামসম্পর্কীয় এক ভ্রাতুষ্পুত্রের সহিত উক্ত কন্যা বিনোদিনীর বিবাহ দেওয়াইলেন।

অনতিকাল পরে কন্যা বিধবা হইল। মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “ভাগ্যে বিবাহ করি নাই, স্ত্রী বিধবা হইলে তো এক দণ্ডও টিকিতে পারিতাম না।”

বছর-তিনেক পরে আর-এক দিন মাতাপুত্রে কথা হইতেছিল।

“বাবা, লোকে যে আমাকেই নিন্দা করে।”

“কেন মা, লোকের তুমি কী সর্বনাশ করিয়াছ?”

“পাছে বউ আসিলে ছেলে পর হইয়া যায়, এই ভয়ে তোর বিবাহ দিতেছি না, লোকে এইরূপ বলাবলি করে।”

মহেন্দ্র কহিল, “ভয় তো হওয়াই উচিত। আমি মা হইলে প্রাণ ধরিয়া ছেলের বিবাহ দিতে পারিতাম না। লোকের নিন্দা মাথা পাতিয়া লইতাম।”

মা হাসিয়া কহিলেন,”শোনো একবার ছেলের কথা শোনো।”

মহেন্দ্র কহিল, “বউ আসিয়া তো ছেলেকে জুড়িয়া বসেই। তখন এত কষ্টের এত স্নেহের মা কোথায় সরিয়া যায়, এ যদি-বা তোমার ভালো লাগে, আমার ভালো লাগে না।”

রাজলক্ষ্মী মনে মনে পুলকিত হইয়া তাঁহার সদ্যসমাগতা বিধবা জাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “শোনো ভাই মেজোবউ, মহিন কী বলে শোনো। বউ পাছে মাকে ছাড়াইয়া উঠে, এই ভয়ে ও বিয়ে করিতে চায় না। এমন সৃষ্টিছাড়া কথা কখনো শুনিয়াছ?”

কাকী কহিলেন, “এ তোমার, বাছা, বাড়াবাড়ি। যখনকার যা তখন তাই শোভা পায়। এখন মার আঁচল ছাড়িয়া বউ লইয়া ঘরকন্না করিবার সময় আসিয়াছে, এখন ছোটো ছেলেটির মতো ব্যবহার দেখিলে লজ্জা বোধ হয়।”

এ কথা রাজলক্ষ্মীর ঠিক মধুর লাগিল না এবং এই প্রসঙ্গে তিনি যে-কটি কথা বলিলেন, তাহা সরল হইতে পারে, কিন্তু মধুমাখা নহে। কহিলেন, “আমার ছেলে যদি অন্যের ছেলেদের চেয়ে মাকে বেশি ভালোবাসে, তোমার তাতে লজ্জা করে কেন মেজোবউ। ছেলে থাকিলে ছেলের মর্ম বুঝিতে।”

রাজলক্ষ্মী মনে করিলেন, পুত্রসৌভাগ্যবতীকে পুত্রহীনা ঈর্ষা করিতেছে।

মেজোবউ কহিলেন, “তুমিই বউ আনিবার কথা পাড়িলে বলিয়া কথাটা উঠিল, নহিলে আমার অধিকার কী।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আমার ছেলে যদি বউ না আনে, তোমার বুকে তাতে শেল বেঁধে কেন। বেশ তো, এতদিন যদি ছেলেকে মানুষ করিয়া আসিতে পারি, এখনো উহাকে দেখিতে শুনিতে পারিব, আর কাহারো দরকার হইবে না।”

মেজোবউ অশ্রুপাত করিয়া নীরবে চলিয়া গেলেন। মহেন্দ্র মনে মনে আঘাত পাইল এবং কালেজ হইতে সকাল-সকাল ফিরিয়াই তাহার কাকীর ঘরে উপস্থিত হইল।

কাকী তাহাকে যাহা বলিয়াছেন, তাহার মধ্যে স্নেহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না, ইহা সে নিশ্চয় জানিত। এবং ইহাও তাহার জানা ছিল, কাকীর একটি পিতৃমাতৃহীনা বোনঝি আছে, এবং মহেন্দ্রের সহিত তাহার বিবাহ দিয়া সন্তানহীনা বিধবা কোনো সূত্রে আপনার ভগিনীর মেয়েটিকে কাছে আনিয়া সুখী দেখিতে চান। যদিচ বিবাহে সে নারাজ, তবু কাকীর এই মনোগত ইচ্ছাটি তাহার কাছে স্বাভাবিক এবং অত্যন্ত করুণাবহ বলিয়া মনে হইত।

মহেন্দ্র তাঁহার ঘরে যখন গেল, তখন বেলা আর বড়ো বাকি নাই। কাকী অন্নপূর্ণা তাঁহার ঘরের কাটা জানালার গরাদের উপর মাথা রাখিয়া শুষ্কবিমর্ষমুখে বসিয়াছিলেন। পাশের ঘরে ভাত ঢাকা পড়িয়া আছে, এখনো স্পর্শ করেন নাই।

অল্প কারণেই মহেন্দ্রের চোখে জল আসিত। কাকীকে দেখিয়া তাহার চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। কাছে আসিয়া স্নিগ্ধস্বরে ডাকিল, “কাকীমা।”

অন্নপূর্ণা হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিলেন, “আয় মহিন, বোস।”

মহেন্দ্র কহিল, “ভারি ক্ষুধা পাইয়াছে, প্রসাদ খাইতে চাই।”

অন্নপূর্ণা মহেন্দ্রের কৌশল বুঝিয়া উচ্ছ্বসিত অশ্রু কষ্টে সংবরণ করিলেন এবং নিজে খাইয়া মহেন্দ্রকে খাওয়াইলেন।

মহেন্দ্রের হৃদয় তখন করুণায় আর্দ্র ছিল। কাকীকে সান্ত্বনা দিবার জন্য আহারান্তে হঠাৎ মনের ঝোঁকে বলিয়া বসিল, “কাকী, তোমার সেই সে বোনঝির কথা বলিয়াছিলে, তাহাকে একবার দেখাইবে না?”

কথাটা উচ্চারণ করিয়াই সে ভীত হইয়া পড়িল।

অন্নপূর্ণা হাসিয়া কহিলেন, “তোর আবার বিবাহে মন গেল নাকি, মহিন।”

মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি কহিল, “না, আমার জন্য নয় কাকী, আমি বিহারীকে রাজি করিয়াছি। তুমি দেখিবার দিন ঠিক করিয়া দাও।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “আহা, তাহার কি এমন ভাগ্য হইবে। বিহারীর মতো ছেলে কি তাহার কপালে আছে।”

কাকীর ঘর হইতে বাহির হইয়া মহেন্দ্র দ্বারের কাছে আসিতেই মার সঙ্গে দেখা হইল। রাজলক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কী মহেন্দ্র, এতক্ষণ তোদের কী পরামর্শ হইতেছিল।”

মহেন্দ্র কহিল, “পরামর্শ কিছুই না, পান লইতে আসিয়াছি।”

মা কহিলেন, “তোর পান তো আমার ঘরে সাজা আছে।”

মহেন্দ্র উত্তর না করিয়া চলিয়া গেল।

রাজলক্ষ্মী ঘরে ঢুকিয়া অন্নপূর্ণার রোদনস্ফীত চক্ষু দেখিবামাত্র অনেক কথা কল্পনা করিয়া লইলেন। ফোঁস করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “কী গো মেজোঠাকরুণ, ছেলের কাছে লাগালাগি করিতেছিলে বুঝি?”

বলিয়া উত্তরমাত্র না শুনিয়া দ্রুতবেগে চলিয়া গেলেন।

1

Binodini’s mother Harimoti came to Mahendra’s mother Rajlakshmi with a request. They were from the same village; they had played together as children.
Rajlakshmi then went to Mahendra and said, ‘Dear Mohin, you must save this poor girl. I have heard she is extremely beautiful, and has studied with a white lady – which should be to the liking of you modern types.’
Mahendra said, ‘Ma, but there are other modern types besides me.’
Rajlakshmi: Mohin, your fault is that you won’t even let me raise the topic of marriage.
Mahendra: Ma, there are many other topics in the world. Hence this is not such a terrible fault.

Mahendra had lost his father in childhood. His relationship with his mother was not like others. He was almost twenty two years old and had started to study medicine after completing a Masters degree. He was still not above sulking and tantrums if his demands were not met by his mother. He had grown used to being enclosed in a protective environment much as a baby kangaroo which lives in its mother’s pouch even after leaving the womb. He was unable to eat, rest or relax without his mother being involved in those activities.

When his mother continued to press him to consider Binodini, Mahendra said, ‘Alright, I will go and see the girl.’
On the day he was meant to go he said, ‘What is the point of going? I am marrying for your sake, there is little to be gained from me judging whether she is suitable or not.’
There was some heat in his words, but his mother thought that once he saw his bride during the ceremony, his angry tone would soften and he would most definitely agree with her choice.
Unconcerned, Rajlakshmi fixed a date for the wedding without further thought. The closer the day came, the more Mahendra grew anxious – eventually a couple of days before the wedding he declared, ‘No! Mother, I definitely cannot do this!’

From his childhood Mahendra had received every kind of allowance from both God and woman; this had led to his nature being entirely unmanageable. He could not bear to comply with the wishes of others; the fact that his promise to his mother and her desires alone were compelling him to marry made him feel unreasonably averse to the prospect and he grew utterly opposed to the idea as the day drew closer.
Mahendra’s closest friend was Bihari; he thought of Mahendra as an older brother and addressed Rajlakshmi as mother. She too viewed him as a sort of load bearing device, a tug boat captive in Mahendra’s wake, and loved him in that light. Rajlakshmi said to him, ‘Dear, this is something you must do this, or a girl from a poor family will…’
Bihari clasped his hands together and said, ‘Ma that is something I will not do. I have eaten many a sweet that Mahendra put aside because he did not like them, just because you asked me; But I would not be able to bear that where a woman is concerned.’
Rajlakshmi thought, ‘What was I thinking? Bihari and marriage! He is content with being Mohin’s friend, he cannot even think of a wife.’ This increased her pity and compassion for Bihari a little more.

Bindodini’s father was not rich, but he had engaged a missionary lady to give his only daughter a well rounded education. He paid little heed to the fact that she was growing up each day. Eventually after his death her widowed mother grew frantic trying to find her a groom. She had little money and her daughter was old by the standards of the day.
Rajlakshmi then arranged to have a nephew, a cousin’s son from her Barasat village marry Binodini.
A short while later the girl was widowed. Mahendra laughed and said, ‘Thank goodness I did not marry her, if my wife was widowed I would not be able to bear it for a second.’

Three years on, mother and son were talking to each other one day.
‘Dear, people are criticising me.’
‘Why is that mother? What harm have you done them?’
‘They say that I am not arranging your marriage so that I can keep you to myself, in case you forget me when your wife arrives on the scene.’
Mahendra said, ‘But that is a real fear; if I was a mother, I would not be able to give my son away in marriage. I would accept whatever people said about me.’
His mother smiled and said, ‘What a thing to say!’
Mahendra said, ‘A wife does come and usurp the son’s attention. What happens then to the mother who has suffered so much pain and done so much for him? You might be able to like this, I cannot.’
Rajlakshmi was secretly thrilled to hear this and said to her recently arrived widowed sister-in-law, ‘Listen to what Mohin says, Middle Sister. He does not want to marry because he fears that his wife will overtake his mother in his affections. Have you ever heard of such a thing?’
The aunt said, ‘This is too much child! One must do what is appropriate to their time of life. It is now time for you to leave your mother’s lap and start your own family, if you behave like a little boy it is shameful.’
Rajlakshmi did not find this exactly comforting and the little that she said in answer might have been simple but it was hardly sweet. She said, ‘If my son loves his mother more than the sons of others, why should you feel any shame? If you had a son, you would have understood his worth.’
She assumed that the childless widow was jealous of her.
The sister-in-law said, ‘This topic came up because you raised it, why else would I assume anything?’
Rajlakshmi said, ‘If my son does not marry and bring a wife home, why should that cause any pain to you? If I have been able to look after him all this time I will be able to do that in the future too, I don’t need anyone else!’

The aunt went away silently in tears. Mahendra felt bad for her and after returning early from classes, he went straight away to her room.
He was certain that what she had said to him earlier was said entirely in affection. He also knew that she had an orphaned niece whom she wanted Mahendra to bring home as his wife. Even though he was unwilling to marry, he did feel that this wish of hers was natural and very worthy of his pity.
When he went to his aunt’s room, there was no longer any daylight left. She was sitting with her head against the bars of her window, her face wan and sombre. Her lunch was lying untouched in the next toom, she had not eaten yet.
Mahendra cried easily. His eyes grew moist when he saw his aunt. He stood near her and called gently, ‘Aunt.’
Annapurna tried to smile and said, ‘Come Mohin, sit down.’
Mahendra said, ‘I am very hungry, feed me your leftovers.’
She understood his ploy and held back her sudden tears. She ate her lunch and gave Mahendra food as well.
His heart was softened with compassion. At the end of the meal, he wanted to console his aunt and said on a sudden impulse, ‘The niece you spoke of, will you not show her once?’
He grew afraid as soon as he had uttered the words.
Annapurna said with a smile, ‘Are you now thinking of marriage then, Mohin?’
Mahendra said quickly, ‘Not for myself! I have made Bihari agree to the idea. You can fix a day for the viewing.’
Annapurna said, ‘Will she be that lucky! Will a man as good as Bihari be her destiny?’

When he left her room and came to his own, he met his mother near the door. She asked, ‘What plans have you two been making all this time?’
Mahendra answered, ‘What plans? I went for a pan.’
His mother said, ‘Your pan is in my room.’
Mahendra went away without responding.
Rajlakshmi entered Annapurna’s room, saw her swollen eyes and imagined many things immediately. She hissed, ‘Were you plotting with my son, Middle Sister?’
She turned on her heel after saying this and left the room swiftly without waiting for an answer.

Image: http://www.gastronomica.org/wp-content/uploads/bonti.jpg

চরণধ্বনি শুনি তব, নাথ/Chorono dhwoni shuni tobo, Nath/I hear your footsteps, my Lord

চরণধ্বনি শুনি তব, নাথ, জীবনতীরে
কত নীরব নির্জনে কত মধুসমীরে ॥
গগনে গ্রহতারাচয় অনিমেষে চাহি রয়,
ভাবনাস্রোত হৃদয়ে বয় ধীরে একান্তে ধীরে ॥
চাহিয়া রহে আঁখি মম তৃষ্ঞাতুর পাখিসম,
শ্রবণ রয়েছি মেলি চিত্তগভীরে–
কোন্ শুভপ্রাতে দাঁড়াবে হৃদিমাঝে,
ভুলিব সব দুঃখ সুখ ডুবিয়া আনন্দনীরে ॥

রাগ: কাফি
তাল: ঝাঁপতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1314
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1908
স্বরলিপিকার: কাঙ্গালীচরণ সেন

footprints

I hear your footsteps, my lord, by the shores of this life
In solitude and quietness, it comes to me, carried on sweet breeze.
The stars and planets in the sky look on in steady gaze,
My thoughts flow within as a stream, slow and calm.
My eyes searching for you just as thirsty birds seek water,
My ears strain to hear your words deep within my soul –
When will that wonderful dawn break and you stand within my heart,
I will forget all sorrow and joy once I immerse myself in that bliss.

Raga: Kafi
Beat: JhnapTaal
Written in 1908

Follow the links to hear

Ritu Guha: http://youtu.be/bfQKQq9–4Q
Swapna Ghoshal: http://youtu.be/HxXtH9X6sxg

Image: http://www.layoutsparks.com/pictures/footprints-0

কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা/Kanna Hashir Dol-dolano Poush Phaguner Pala

tree

কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা,
তারি মধ্যে চিরজীবন বইব গানের ডালা–
এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা
সুরের-গন্ধ-ঢালা?।
তাই কি আমার ঘুম ছুটেছে, বাঁধ টুটেছে মনে,
খ্যাপা হাওয়ার ঢেউ উঠেছে চিরব্যথার বনে,
কাঁপে আমার দিবানিশার সকল আঁধার আলা!
এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা
সুরের-গন্ধ-ঢালা?।
রাতের বাসা হয় নি বাঁধা দিনের কাজে ত্রুটি,
বিনা কাজের সেবার মাঝে পাই নে আমি ছুটি।
শান্তি কোথায় মোর তরে হায় বিশ্বভুবন-মাঝে,
অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে।
নিত্য রবে প্রাণ-পোড়ানো গানের আগুন জ্বালা–
এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা
সুরের-গন্ধ-ঢালা?।

রাগ: কালাংড়া-বাউল
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): চৈত্র, ১৩২৪
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1918
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

The play of seasons are like tears following laughter,
Within that I must always carry my bounty of song –
Does this make you happy, is this why you have given me this garland,
drenched in tune?
Is this why I cannot sleep, my heart moving endlessly,
As a wild wind rises in the forests of eternal pain,
Light and darkness flicker through my days and nights!
Does this make you happy, is this why you have given me this garland,
drenched in tune?
I have not made my nest for the night, work awaits me still,
I have not had time while I played at being busy.
Where is peace for me in this vast world alas,
Unhappiness must strike to make the heart strings sing.
The only constant this flame that feeds on songs of my soul –
Does this make you happy, is this why you have given me this garland,
drenched in tune?

Raga: Kalangra Baul
Beat: Dadra
Written in 1918

Follow the links to hear the song:

Roma Mandal: http://youtu.be/FHHIDnFUN1s

Lopamudra Mitra: http://youtu.be/65dhIpBoWqA

Kolim Sharafi: http://youtu.be/c3q9lbfd3Lg

Tagore Letter Renouncing Knighthood

mss.36-i_3

Today is the 94th anniversary of the Jallianwalla Bagh Massacre, when thousands of unarmed people were fired upon by British troops consisting of Gurkha and Baluchi soldiers. It was the Massacre that ended the Raj as its direct effect was to strengthen the infant Swadeshi Movement. Rabindranath Tagore heard of the massacre on the 22 May 1919. He tried to arrange a protest meeting in Calcutta and finally decided to renounce his knighthood as “a symbolic act of protest”. In the repudiation letter, dated 30 May 1919 and addressed to the Viceroy, Lord Chelmsford, he wrote “I … wish to stand, shorn, of all special distinctions, by the side of those of my countrymen who, for their so called insignificance, are liable to suffer degradation not fit for human beings”

Below is the entire letter.

Your Excellency,

The enormity of the measures taken by the Government in the Punjab for quelling some local disturbances has, with a rude shock, revealed to our minds the helplessness of our position as British subjects in India. The disproportionate severity of the punishments inflicted upon the unfortunate people and the methods of carrying them out, we are convinced, are without parallel in the history of civilised governments, barring some conspicuous exceptions, recent and remote. Considering that such treatment has been meted out to a population, disarmed and resourceless, by a power which has the most terribly efficient organisation for destruction of human lives, we must strongly assert that it can claim no political expediency, far less moral justification. The accounts of the insults and sufferings by our brothers in Punjab have trickled through the gagged silence, reaching every corner of India, and the universal agony of indignation roused in the hearts of our people has been ignored by our rulers—possibly congratulating themselves for what they imagine as salutary lessons. This callousness has been praised by most of the Anglo-Indian papers, which have in some cases gone to the brutal length of making fun of our sufferings, without receiving the least check from the same authority—relentlessly careful in smothering every cry of pain and expression of judgement from the organs representing the sufferers. Knowing that our appeals have been in vain and that the passion of vengeance is blinding the nobler vision of statesmanship in our Government, which could so easily afford to be magnanimous as befitting its physical strength and moral tradition, the very least that I can do for my country is to take all consequences upon myself in giving voice to the protest of the millions of my countrymen, surprised into a dumb anguish of terror. The time has come when badges of honour make our shame glaring in the incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of those of my countrymen, who, for their so-called insignificance, are liable to suffer degradation not fit for human beings.
These are the reasons which have painfully compelled me to ask Your Excellency, with due deference and regret, to relieve me of my title of Knighthood, which I had the honour to accept from His Majesty the King at the hands of your predecessor, for whose nobleness of heart I still entertain great admiration.

Yours faithfully,

Rabindranath Tagore

রাশিয়ার চিঠি/Russiar Chithi/The Russian Letters

images

A stamp bearing the image of Rabindranath Tagore released in Russia

মস্কৌ

রাশিয়ায় অবশেষে আসা গেল। যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলছে।

চিরকালই মানুষের সভ্যতায় একদল অখ্যাত লোক থাকে, তাদেরই সংখ্যা বেশি, তারাই বাহন; তাদের মানুষ হবার সময় নেই; দেশের সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা পালিত। সব চেয়ে কম খেয়ে, কম প’রে, কম শিখে, বাকি সকলের পরিচর্যা করে; সকলের চেয়ে বেশি তাদের পরিশ্রম, সকলের চেয়ে বেশি তাদের অসম্মান। কথায় কথায় তারা রোগে মরে, উপোসে মরে, উপরওয়ালাদের লাথি ঝাঁটা খেয়ে মরে–জীবনযাত্রার জন্য যত-কিছু সুযোগ সুবিধে সব-কিছুর থেকেই তারা বঞ্চিত। তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে– উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে।

আমি অনেক দিন এদের কথা ভেবেছি, মনে হয়েছে এর কোনো উপায় নেই। এক দল তলায় না থাকলে আর-এক দল উপরে থাকতেই পারে না, অথচ উপরে থাকার দরকার আছে। উপরে না থাকলে নিতান্ত কাছের সীমার বাইরে কিছু দেখা যায় না; কেবলমাত্র জীবিকানির্বাহ করার জন্যে তো মানুষের মনুষ্যত্ব নয়। একান্ত জীবিকাকে অতিক্রম করে তবেই তার সভ্যতা। সভ্যতার সমস্ত শ্রেষ্ঠ ফসল অবকাশের ক্ষেত্রে ফলেছে। মানুষের সভ্যতায় এক অংশে অবকাশ রক্ষা করার দরকার আছে। তাই ভাবতুম, যে-সব মানুষ শুধু অবস্থার গতিকে নয়, শরীরমনের গতিকে নীচের তলায় কাজ করতে বাধ্য এবং সেই কাজেরই যোগ্য, যথাসম্ভব তাদের শিক্ষাস্বাস্থ্য-সুখসুবিধার জন্যে চেষ্টা করা উচিত।

মুশকিল এই, দয়া করে কোনো স্থায়ী জিনিস করা চলে না; বাইরে থেকে উপকার করতে গেলে পদে পদে তার বিকার ঘটে। সমান হতে পারলে তবেই সত্যকার সহায়তা সম্ভব হয়। যাই হোক, আমি ভালো করে কিছুই ভেবে পাই নি, অথচ অধিকাংশ মানুষকে তলিয়ে রেখে, অমানুষ করে রেখে, তবেই সভ্যতা সমুচ্চে থাকবে এ কথা অনিবার্য বলে মেনে নিতে গেলে মনে ধিক্কার আসে।

ভেবে দেখো-না, নিরন্ন ভারতবর্ষের অন্নে ইংলণ্ড্ পরিপুষ্ট হয়েছে। ইংলণ্ডের অনেক লোকেরই মনের ভাব এই যে, ইংলণ্ড্কে চিরদিন পোষণ করাই ভারতবর্ষের সার্থকতা। ইংলণ্ড্ বড়ো হয়ে উঠে মানবসমাজে বড়ো কাজ করছে, অতএব এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে চিরকালের মতো একটা জাতিকে দাসত্বে বদ্ধ করে রেখে দিলে দোষ নেই। এই জাতি যদি কম খায়, কম পরে, তাতে কী যায় আসে–তবুও দয়া করে তাদের অবস্থার কিছু উন্নতি করা উচিত, এমন কথা তাদের মনে জাগে। কিন্তু এক-শো বছর হয়ে গেল; না পেলুম শিক্ষা, না পেলুম স্বাস্থ্য, না পেলুম সম্পদ।প্রত্যেক সমাজের নিজের ভিতরেও এই একই কথা। যে মানুষকে মানুষ সম্মান করতে পারে না সে মানুষকে মানুষ উপকার করতে অক্ষম। অন্তত যখনই নিজের স্বার্থে এসে ঠেকে তখনই মারামারি কাটাকাটি বেধে যায়। রাশিয়ায় একেবারে গোড়া ঘেঁষে এই সমস্যা সমাধান করবার চেষ্টা চলছে। তার শেষ ফলের কথা এখনো বিচার করবার সময় হয় নি, কিন্তু আপাতত যা চোখে পড়ছে তা দেখে আশ্চর্য হচ্ছি। আমাদের সকল সমস্যার সব চেয়ে বড়ো রাস্তা হচ্ছে শিক্ষা। এতকাল সমাজের অধিকাংশ লোক শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত– ভারতবর্ষ তো প্রায় সম্পূর্ণই বঞ্চিত। এখানে সেই শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। শিক্ষার পরিমাণ শুধু সংখ্যায় নয়, তার সম্পূর্ণতায়, তার প্রবলতায়। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় ও নিষ্কর্মা হয়ে না থাকে এজন্যে কী প্রচুর আয়োজন ও কী বিপুল উদ্যম। শুধু শ্বেত-রাশিয়ার জন্যে নয়– মধ্য-এশিয়ার অর্ধসভ্য জাতের মধ্যেও এরা বন্যার মতো বেগে শিক্ষা বিস্তার করে চলেছে; সায়েন্সের শেষ-ফসল পর্যন্ত যাতে তারা পায় এইজন্যে প্রয়াসের অন্ত নেই। এখানে থিয়েটারে ভালো ভালো অপেরা ও বড়ো বড়ো নাটকের অভিনয়ে বিষম ভিড়, কিন্তু যারা দেখছে তারা কৃষি ও কর্মীদের দলের। কোথাও এদের অপমান নেই। ইতিমধ্যে এদের যে দুই-একটা প্রতিষ্ঠান দেখলুম সর্বত্রই লক্ষ্য করেছি এদের চিত্তের জাগরণ এবং আত্মমর্যাদার আনন্দ। আমাদের দেশের জনসাধারণের তো কথাই নেই, ইংলণ্ডের মজুর-শ্রেণীর সঙ্গে তুলনা করলে আকাশপাতাল তফাত দেখা যায়। আমরা শ্রীনিকেতনে যা করতে চেয়েছি এরা সমস্ত দেশ জুড়ে প্রকৃষ্টভাবে তাই করছে। আমাদের কর্মীরাযদি কিছুদিন এখানে এসে শিক্ষা করে যেতে পারত তা হলে ভারি উপকার হত। প্রতিদিনই আমি ভারতবর্ষের সঙ্গে এখানকার তুলনা করে দেখি আর ভাবি, কী হয়েছে আর কী হতে পারত। আমার আমেরিকান সঙ্গী ডাক্তার হ্যারি টিম্বর্‌স্‌ এখানকার স্বাস্থ্যবিধানের ব্যবস্থা আলোচনা করছে–তার প্রকৃষ্টতা দেখলে চমক লাগে–আর কোথায় পড়ে আছে রোগতপ্ত অভুক্ত হতভাগ্য নিরুপায় ভারতবর্ষ! কয়েক বৎসর পূর্বে ভারতবর্ষের অবস্থার সঙ্গে এদের জনসাধারণের অবস্থার সম্পূর্ণ সাদৃশ্য ছিল–এই অল্পকালের মধ্যে দ্রুত বেগে বদলে গেছে–আমরা পড়ে আছি জড়তার পাঁকের মধ্যে আকণ্ঠ নিমগ্ন।

২৫ বৈশাখ ১৩৩৮ শান্তিনিকেতন

Moscow

Finally I am in Russia. Whatever I see seems amazing. It is not like any other country. The difference is in the very foundation. They have awakened all their people in an equal manner.

There have always been one group of unseen people in society, their number is always greater, they are the carriers; they have no time to evolve as humans; they live off what their country throws away. They eat the least, they have the least to call their own, they learn less than all the others and they look after the rest; their labour is the greatest as is their misfortune. They die of disease at the slightest excuse, or of starvation and their mistreatment at the hands of those who are above them – they are deprived of every kind of comfort one needs in life. They are the stands upon which the lamp of civilization is placed, standing straight with the flame held above them – they ensure that everyone above receives light while they are covered in the drips of oil.

I have thought of them for a long time as being in a hopeless situation. One group cannot rise unless another group is at the bottom, and yet everyone deserves to be on top. One cannot see beyond what lies very close unless one is on top; just being alive is not where true humanity lies. One must surpass mere subsistence in order to achieve civilization. All the best outcomes of civilization have been derived during moments of leisure. There is a need to preserve leisure in the midst of civilization. That is why I used to feel that for the people who must of necessity work body and soul in the undercarriage of civilization and are not adapted to any other work, effort must be made to provide them with adequate education, health and other comforts as far as possible.

The problem is that nothing permanent can run on pity alone; assistance from the outside may be misconstrued at each step. Equality is a requisite for true assistance. I could never think of a solution but it shames me to think that it is an inevitable truth that civilization will remain elevated only if the majority of mankind is oppressed and dehumanized.

If you think of it, England has been fattened on the food that could have kept India nourished. Many people in England seem to be of the view that India’s only purpose is to nurture England for ever. The country has grown to perform major works for humankind and this justifies keeping another nation in slavery for eternity.If this race eats less and subsists on less- what does it matter, but still some compassion could have been shown and an improvement in their condition could have been made. And yet after a hundred years have passed, we are without education, or healthcare or resources.

It is the same within every society. He who cannot respect other humans cannot help them. Whenever there is a chance of self interest being affected, conflict breaks out. In Russia this problem is being addressed right at the grass roots. The time to judge the final results of this has not come yet but what I observe even now amazes me. The biggest solution to all our problems is education. The majority of society has been excluded from full access to education all this time – in India almost entirely so. One has to admire the extent and energy with which education is being promoted across every section of Russian society. The measure of education is not just in numbers, it is in its completeness and in its influence on people. There is great enthusiasm and much thought to ensure that no one is left without help and employment. This is not restricted to White Russia alone, they are pushing this veritable flood of education among the primitive tribes of Central Asia as well; there is no dearth of effort to take the latest developments in Science to them. Here there are large numbers of people flocking to watch great operas and plays at the theatres but the audience remarkably consists of farmers and workers.
There is no sense of inferiority. The few institutions I have seen are notable for their pride in themselves and their awakened spirits. Let alone the general population of India, the difference with the working class in England is immense. The entire country is doing what we have been attempting at Sriniketan and doing it well. It would be very helpful indeed if our employees were to come and learn from these people for a few days. I compare India with this country each day and think of what we are and what we could have been. My American companion Dr. Harry Timbers is looking at the healthcare system here – the efficiency is startling – compared to disease ridden, starving, helpless India. Only a few years ago, the situations of both our peoples was completely the same – but they have changed rapidly in this short time – while we are stuck neck deep in the mire of immobility.

April, 1931

For those interested: http://indrus.in/arts/2012/10/24/tagore_loved_russia_till_his_dying_day_12676.htmltagore in Russia

Rabindranath Tagore meets a group of schoolchildren. Moscow. 1930. Source: RIA Novosti