বিদ্যাপতির রাধিকা/Bidyapati’s Radhika

radha

বিদ্যাপতির রাধিকা

গতি এবং উত্তাপ যেমন একটি শক্তির ভিন্ন অবস্থা, বিদ্যাপতি এবং চণ্ডীদাসের কবিতায় প্রেমশক্তির সেই প্রকার দুই ভিন্ন রূপ দেখা যায়। বিদ্যাপতির কবিতায় প্রেমের ভঙ্গি, প্রেমের নৃত্য, প্রেমের চাঞ্চল্য; চণ্ডীদাসের কবিতায় প্রেমের তীব্রতা, প্রেমের দাহ, প্রেমের আলোক। এইজন্য ছন্দ সংগীত এবং বিচিত্র রঙে বিদ্যাপতির পদ এমন পরিপূর্ণ, এইজন্য তাহাতে সৌন্দর্যসুখসম্ভোগের এমন তরঙ্গলীলা। ইহা কেবল যৌবনের প্রথম-আরম্ভের আনেন্দোচ্ছ্বাস। কেবল অবিমিশ্র সুখ এবং অব্যাহত-সংগীতধ্বনি। দুঃখ নাই যে তাহা নহে কিন্তু সুখদুঃখের মাঝখানে একটা অন্তরাল-ব্যবধান আছে। হয় সুখ নয় দুঃখ, হয় মিলন নয় বিরহ, এইরূপ পরিষ্কার শ্রেণীবিভাগ। চণ্ডীদাসের মতো সুখে দুঃখে বিরহে মিলনে জড়িতে হইয়া যায় নাই।সেইজন্য বিদ্যাপতির প্রেমে যৌবনের নবীনতা এবং চণ্ডীদাসের প্রেমে অধিক বয়সের প্রগাঢ়তা আছে।
অল্প বয়সের ধর্মই এই, সুখ এবং দুঃখ, ভালো এবং মন্দ অত্যন্ত স্বতন্ত্র করিয়া দেখে। যেন জগতে এক দিকে বিশুদ্ধ ভালো আর-এক দিকে বিশুদ্ধ মন্দ, এক দিকে একান্ত সুখ আর-এক দিকে একান্ত দুঃখ প্রতিপক্ষতা অবলম্বন করিয়া পরস্পর বিমুখ হইয়া বসিয়া আছে। সে বয়সে সকল বিষয়ের একটা পরিপূর্ণ আদর্শ হৃদয়ে বিরাজ করিতে থাকে। গুণ দেখিলেই সর্বগুণ কল্পনা করি, দোষ দেখিলেই সর্বদোষ একত্র হইয়া পিশাচমূর্তি ধারণ করে। সুখ দেখা দিলেই ত্রিভুবনে দুঃখের চিহ্ন লুপ্ত হইয়া যায়, এবং দুঃখ উপস্থিত হইলে কোথাও সুখের লেশমাত্র দেখা যায় না। সংগীত সেইজন্য সর্বদাই উচ্ছ্বসিত পঞ্চম স্বরে বাঁধা। বিদ্যাপতিতে সেইজন্য কেবল বসন্ত।
রাধা অল্পে মুকুলিত বিকশিত হইয়া উঠিতেছে। সৌন্দর্য ঢলঢল করিতেছে। শ্যামের সহিত দেখা হয় এবং চারি দিকে একটা যৌবনের কম্পন হিল্লোলিত হইয়া উঠে। খানিকটা হাসি, খানিকটা ছলনা, খানিকটা আড়চক্ষে দৃষ্টি। একটু ব্যাকুলতা, একটু আশানৈরাশ্যের আন্দোলনও আছে। কিন্তু তাহা নিতান্ত মর্মঘাতী নহে। চণ্ডীদাসের যেমন–

নয়ন চকোর মোর পিতে করে উতরোল,
নিমিখে নিমিখ নাহি হয়—

বিদ্যাপতিতে সেরূপ উতরোল ভাব নয়– কতকটা উতলা বটে। কেবল আপনাকে আধখানা প্রকাশ এবং আধখানা গোপন; কেবল হঠাৎ উদ্দাম বাতাসের একটা আন্দোলনে অমনি খানিকটা উন্মেষিত হইয়া পড়ে। বিদ্যাপতির রাধা নবীনা নবস্ফুটা। আপনাকে এবং পরকে ভালো করিয়া জানে না। দূরে সহাস্য সতৃষ্ণ লীলাময়ী; নিকটে কম্পিত শঙ্কিত বিহ্বল। কেবল একবার কৌতূহলে চম্পক-অঙ্গুলির অগ্রভাগ দিয়া অতিসাবধানে অপরিচিত প্রেমকে একটুমাত্র স্পর্শ করিয়া অমনি পলায়নপর হইতেছে। যেমন একটি ভীরু বালিকা স্বাভাবিক পশুস্নেহে আকৃষ্ট হইয়া অজ্ঞাতস্বভাব মৃগকে একবার সচকিতে স্পর্শ করে, একবার পালায়, ক্রমে ক্রমে ভয় ভাঙে, সেইরূপ।
যৌবন, সেও সবে আরম্ভ হইতেছে, তখন সকলই রহস্যপরিপূর্ণ। সদ্য-বিকচ হৃদয় সহসা আপনার সৌরভ আপনি অনুভব করিতেছে; আপনার সম্বন্ধে আপনি সবেমাত্র সচেতন হইয়া উঠিতেছে; তাই লজ্জায় ভয়ে– আনন্দে সংশয়ে আপনাকে গোপন করিবে কি প্রকাশ করিবে ভাবিয়া পাইতেছে না–

কবহুঁ বান্ধয়ে কচ কবহুঁ বিথারি।
কবহু ঝাঁপয়ে অঙ্গ কবহুঁ উঘারি।

হৃদয়ের নবীন বাসনাসকল পাখা মেলিয়া উড়িতে চায়, কিন্তু এখনো পথ জানে নাই। কৌতূহল এবং অনভিজ্ঞতায় সে একবার ঈষৎ অগ্রসর হয় আবার জড়সড় অঞ্চলটির অন্তরালে আপনার নিভৃত কোমল কুলায়ের মধ্যে ফিরিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে।
এখন প্রেমে বেদনা অপেক্ষা বিলাস বেশি। ইহাতে গভীরতার অটল স্থৈর্য নাই, কেবল নবানুরাগের উদ্ভ্রান্ত লীলাচাঞ্চল্য। বিদ্যাপতির এই পদগুলি পড়িতে পড়িতে একটি সমীরচঞ্চল সমুদ্রের উপরিভাগ চক্ষে পড়ে। ঢেউ খেলিতেছে; ফেন উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছে, মেঘের ছায়া পড়িতেছে; সূর্যের আলোক শত শত অংশে প্রতিস্ফুরিত হইয়া চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হইতেছে; তরঙ্গে তরঙ্গে স্পর্শ এবং পলায়ন, কলরব, কলহাস্য, করতালি; কেবল নৃত্য এবং গীত, আভাস এবং আন্দোলন, আলোক এবং বর্ণবৈচিত্র্য। এই নবীন চঞ্চল প্রেমহিল্লোলের উপর সৌন্দর্য যে কত ছন্দে কত ভঙ্গিতে বিচ্ছুরিত হইয়া উঠে, বিদ্যাপতির গানে তাহাই প্রকাশ পাইয়াছে। কিন্তু সমুদ্রের অন্তর্দেশে যে গভীরতা, নিস্তব্ধতা, যে বিশ্ববিস্মৃত ধ্যানলীনতা আছে তাহা বিদ্যাপতির গীতি-তরঙ্গের মধ্যে পাওয়া যায় না।
কদাচ কখনো দেখা যায়, যমুনার জলে অথবা স্নান করিয়া ফিরিবার সময়। কিন্তু ভালো করিয়া দেখা হয় না। একে অল্পক্ষণের দেখা, তাহাতে অধৈর্যচঞ্চল দোদুল্যমান হৃদয়ে সৌন্দর্যের যে প্রতিবিম্ব পড়ে তাহা ভাঙিয়া ভাঙিয়া যায়– মনকে শান্ত করিয়া ধৈর্য করিয়া দেখিবার অবসর পাওয়া যায় না– যেটুকু দেখা গেল সে কেবল—

“আধ আঁচর খসি আধবদনে হাসি,
আধ হি নয়ান তরঙ্গ।’

কিন্তু

“ভাল করি পেখন না ভেল।’

তাহার পর কত আসা-যাওয়া, কত বলা-কওয়া, কত ছলে কত ভাব প্রকাশ, কত ভয়, কত ভাবনা– অবশেষে একদিন মধুর বসন্তে নবীন মিলন; কিন্তু তাহাও নিবিড় নিগূঢ় নিরতিশয় মিলন নহে। তাহার মধ্যে কত আশঙ্কা, কত আশ্বাস, কত কৌতুক, কত ছদ্মলীলা, কত মান-অভিমান সাধ্যসাধনা! আবার সখীর সহিত পরামর্শ; সখীকে ডাকিয়া গৃহকোণে নিভৃতে বসিয়া নানা ছলে এবং কথার কৌশলে আপনার সুখস্মৃতি লইয়া আলোচনা। নবীনার নবপ্রেম যেমন মুগ্ধ যেমন মিশ্রিত বিচিত্র কৌতুককৌতূহলপরিপূর্ণ হইয়া থাকে, ইহাতে তাহার কিছুই কম নাই।
চণ্ডীদাস গভীর এবং ব্যাকুল, বিদ্যাপতি নবীন এবং মধুর।

“নব বৃন্দাবন, নবীন তরুগণ,
নব নব বিকশিত ফুল।
নবীন বসন্ত নবীন মলয়ানিল
মাতল নব অলিকুল।
বিহরই নওল কিশোর।
কালিন্দী-পুলিন-কুঞ্জ নব শোভন,
নব নব প্রেম বিভোর।
নবীন রসাল-মুকুল মধুমাতিয়া
নব কোকিলকুল গায়।
নব যুবতীগণ চিত উময়তাই
নব রসে কাননে ধায়।
নব যুবরাজ নবীন নব নাগরী
মিলয়ে নব নব ভাতি।
নিতি নিতি ঐছন নব নব খেলন
বিদ্যাপতি মতি মাতি।’

ইহার সহিত আর-একটি গীত যোগ না করিলে ইহা সম্পূর্ণ হয় না।

“মধু ঋতু, মধুকর পাঁতি;
মধুর-কুসুম-মধু-মাতি।
মধুর বৃন্দাবন মাঝ,
মধুর মধুর রসরাজ।
মধুর-যুবতীগণ-সঙ্গ
মধুর মধুর রস রঙ্গ।
মধুর যন্ত্র সুরসাল,
মধুর মধুর করতাল।
মধুর নটন-গতিভঙ্গ,
মধুর নটনী-নট-রঙ্গ।
মধুর মধুর রস গান,
মধুর বিদ্যাপতি ভান।‘

এইখানেই শেষ করা যাইত। কিন্তু এখানে শেষ করিলে বড়ো অসমাপ্ত থাকে। ঠিক সমে আসিয়া থামে না। এইজন্য বিদ্যাপতি একটি শেষ কথা বলিয়া রাখিয়াছেন। তাহাকে শেষ কথা বলা যাইতে পারে অশেষ কথাও বলা যাইতে পারে; এত লীলাখেলা নব নব রসোল্লাসের পরিণাম-কথা এই যে—

‘জনম অবধি হাম রূপ নেহারিনু
নয়ন না তিরপিত ভেল।
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু
তবু হিয়ে জুড়ন না গেল।‘

নবীন প্রেম একেবারে লক্ষ লক্ষ যুগের পুরাতন হইয়া গেল। ইহার পরে ছন্দ এবং রাগিণী পরিবর্তন করা আবশ্যক। চিরনবীন প্রেমের ভূমিকা সমাপ্ত হইয়াছে। চণ্ডীদাস আসিয়া চিরপুরাতন প্রেমের গান আরম্ভ করিয়া দিলেন।

চৈত্র ১২৯৮

Bidyapati’s Radhika

Just as motion and heat are different states of one kind of energy, the expression of the power of love is seen in two differing forms in the poems of Bidyapati and Chandidas. In Bidyapati’s verse we see the gestures, the playful movement and the quicksilver nature of love; in Chandidas’s poetry we see the intensity, the suffering caused by love, and the illumining effect that love can have. This is why Bidyapati’s verses are so full of rhythm, song and various moods, and so dedicated to the enjoyment of beauty. This is only the outpouring of happiness in the early days of youth; filled with unbroken pleasure and uninterrupted music. It is not without sadness but there is a distinction between happiness and sorrow. It is either joy or sorrow, either union or the yearning for that; the two are clearly separated. Happiness and sorrow, union and longing are not entwined with each other as in Chandidas’s writing. That is why the love described by Bidyapati carries the freshness of youth and the love of Chandidas has the depth of maturity.

This is the way of youth; it looks at happiness and sorrow, good and evil as very distinct from each other. As if the world is split between the purely good and the purely evil, complete happiness and total misery sitting in conflicting corners at odds with each other. One good quality seems to indicate the presence of many such qualities while one fault immediately indicates a demonic nature filled with every kind of defect. The appearance of happiness erases all sorrow from the world while sorrow appears to remove all signs of joy. The music is constantly set to an effusive pitch. That is why Bidyapati speaks only of eternal spring.

Radha is blossoming slowly. Her beauty is mesmerizing. When she meets Shyam, a youthful thrill seems to shimmer through the air. A little laughter, some wiles, a few sideway glances. There is a sense of yearning, a little uncertainty over hope and disappointment. But that does not affect the soul too deeply. As Chandidas has written –

‘My eyes like thirsting birds, my soul grows restless,
Seeing is never enough.’

Bidyapati is not restless in that sense – just a little anxious. The desire is to remain half hidden while also disclosing oneself; the sudden unveiling by a burst of wild wind. The Radha described by Bidyapati is young and has become a woman just recently. She does not know herself or others that well. From afar she is smiling, eager and vivacious. When one draws close she is trembling with fear and sad. Curiosity makes her reach out very carefully and touch the unknown sensation of love but once and then she vanishes. She is like a timid girl who might touch a deer without knowing its nature because she is naturally drawn to animals and then draw back, only to approach it again.

Youth is also a new phase for them, everything is filled with mystery. The newly awakened soul senses its own charm and wakes up in realization. Somewhat shy, somewhat afraid; happy and yet doubtful, it is not entirely sure whether it should hide or be out in the open.

‘Sometimes bound and sometimes free
Sometimes the limbs move fast, sometimes hardly.’

All the newly born desires wish to fly but they do not know the way. Curiosity and inexperience makes her move slightly forward and then retreat behind the protective veil and within the gentle familiar nest.

This love is more about gestures than about pain. It does not have the immoveable stillness of depth but is filled with the erratic comings and goings of newly blossoming feelings. Reading these verses by Bidyapati bring to mind the surface of a windswept ocean. The waves rise, foam flecked, shadowed by cloud, the sunlight glimmers, a hundred shards of light reflecting in all directions; waves touching each other and retreating, noise, laughter, clapping of hands; nothing but song and dance, inference and movement, light and an infinite variety of colour. Bidyapati’s songs express how beauty is reflected in a myriad ways by this young, ever moving love. But the depth, the silence, the entirely unconscious submission to thought that is hidden below the sea is absent in Bidyapati’s verse.

Sometimes they meet when bathing in the Yamuna or on the way back from the river. But this is not enough. Firstly the meeting is short lived; the reflection of beauty that falls upon the impatient agitated soul is shattered again and again – there is little time to compose the heart and look patiently – what little can be seen is –

‘Half the veil falls away, half a smile I see
A wave that sways half my sight’

But

‘I could not see as clearly as I wanted’

Afterwards there is much coming and going, many words said, many feelings expressed in many ways, many fears and doubts – eventually one sweet day in spring there will be tender union; but that will not be the deep, intense, ultimate of bonds. There will be much apprehension, much assurance, much humour, many wiles, many pretences and assuaging of hurts! There will be discussion with friends; and much reminiscing over pleasant memories with many clever words. This is no less enriched in amusements than the new love of a young woman, no less gratifying or variegated.
Chandidas is deep and full of angst, Bidyapati is young and sweet.

‘Brindavan feels new, young trees,
Fresh flowers blooming.
Spring has come with young breeze
All the bees are excited.
The young Krishna wanders about.
The banks of the Kalindi are adorned
And young love overwhelms all.
The young mango tree covered in new bloom
Lovesick Koels sing.
The young women are all excited
As they move towards the groves.
The young prince with his young lover
They glow with happiness.
With new hopes and new games
Bidyapati is delighted to see.
Sweet the season, the bee buzzes about;
In sweet flowers seeking honey.
In sweet Vrindavam
The sweet Lord of all things
Along with sweet young women
He engages in such sweet play.
Music plays sweetly,
And cymbals ring.
The dance is sweetly graceful
With dancers of delicate form.
The songs are sweet to the ear,
Says Bidyapati with love.’

One more song must be included to make this complete.
This could have ended here. But it would feel incomplete if it was to end. The beat would not have been complete. Bidyapati finishes it off in the following manner. One could say this was the last word or even the word that spoke of the infinite. After all the dalliance and charming effusions the last words are thus –

‘I have looked upon this beauty for all my life
My eyes still do not feel sated.
I have kept you alone in my heart for a thousand ages
And yet my heart does not feel complete.’

Young love ages a million years immediately. There comes the need to make changes to the rhythms and the tunes after this. The days of eternally young love have passed. Chandidas arrives and starts singing songs of eternally ancient love.

Chaitra 1298(Bengali calender)

Image from:http://www.iskcondesiretree.net/group/shriashtasakhiji

3 thoughts on “বিদ্যাপতির রাধিকা/Bidyapati’s Radhika

Comments are closed.