Chokher Bali 8/চোখের বালি ৮

Lady_holding_peacock_(c)V&A_Images

আশা কেমন ভয় পাইয়া গেল। এ কী হইল। মা চলিয়া যান, মাসিমা চলিয়া যান। তাহাদের সুখ যেন সকলকেই তাড়াইতেছে, এবার যেন তাহাকেই তাড়াইবার পালা। পরিত্যক্ত শূন্য গৃহস্থালির মাঝখানে দাম্পত্যের নূতন প্রেমলীলা তাহার কাছে কেমন অসংগত ঠেকিতে লাগিল।

সংসারের কঠিন কর্তব্য হইতে প্রেমকে ফুলের মতো ছিঁড়িয়া স্বতন্ত্র করিয়া লইলে, তাহা কেবল আপনার রসে আপনাকে সজীব রাখিতে পারে না, তাহা ক্রমেই বিমর্ষ ও বিকৃত হইয়া আসে। আশাও মনে মনে দেখিতে লাগিল, তাহাদের অবিশ্রাম মিলনের মধ্যে একটা শ্রান্তি ও দুর্বলতা আছে। সে মিলন যেন থাকিয়া থাকিয়া কেবলই মুষড়িয়া পড়ে–সংসারের দৃঢ় ও প্রশস্ত আশ্রয়ের অভাবে তাহাকে টানিয়া খাড়া রাখাই কঠিন হয়। কাজের মধ্যেই প্রেমের মূল না থাকিলে, ভোগের বিকাশ পরিপূর্ণ এবং স্থায়ী হয় না।

মহেন্দ্রও আপনার বিমুখ সংসারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া আপন প্রেমোৎসবের সকল বাতিগুলোই একসঙ্গে জ্বালাইয়া খুব সমারোহের সহিত শূন্যগৃহের অকল্যাণের মধ্যে মিলনের আনন্দ সমাধা করিতে চেষ্টা করিল। আশার মনে সে একটুখানি খোঁচা দিয়াই কহিল, “চুনি, তোমার আজকাল কী হইয়াছে বলো দেখি। মাসি গেছেন, তা লইয়া অমন মন ভার করিয়া আছ কেন। আমাদের দুজনার ভালোবাসাতেই কি সকল ভালোবাসার অবসান নয়।”

আশা দুঃখিত হইয়া ভাবিত, “তবে তো আমার ভালোবাসায় একটা কী অসম্পূর্ণতা আছে। আমি তো মাসির কথা প্রায়ই ভাবি; শাশুড়ি চলিয়া গেছেন বলিয়া তো আমার ভয় হয়।’ তখন সে প্রাণপণে এই-সকল প্রেমের অপরাধ স্খালন করিতে চেষ্টা করে।

এখন গৃহকর্ম ভালো করিয়া চলে না– চাকরবাকরেরা ফাঁকি দিতে আরম্ভ করিয়াছে। একদিন ঝি অসুখ করিয়াছে বলিয়া আসিল না, বামুনঠাকুর মদ খাইয়া নিরুদ্দেশ হইয়া রহিল। মহেন্দ্র আশাকে কহিল, “বেশ মজা হইয়াছে, আজ আমরা নিজেরা রন্ধনের কাজ সারিয়া লইব।”

মহেন্দ্র গাড়ি করিয়া নিউ মার্কেটে বাজার করিতে গেল। কোন্ জিনিসটা কী পরিমাণে দরকার, তাহা তাহার কিছুমাত্র জানা ছিল না– কতকগুলা বোঝা লইয়া আনন্দে ঘরে ফিরিয়া আসিল। সেগুলা লইয়া যে কী করিতে হইবে, আশাও তাহা ভালোরূপ জানে না। পরীক্ষায় বেলা দুটা-তিনটা হইয়া গেল এবং নানাবিধ অভূতপূর্ব অখাদ্য উদ্ভাবন করিয়া মহেন্দ্র অত্যন্ত আমোদ বোধ করিল। আশা মহেন্দ্রের আমোদে যোগ দিতে পারিল না, আপন অজ্ঞতা ও অক্ষমতায় মনে মনে অত্যন্ত লজ্জা ও ক্ষোভ পাইল।

ঘরে ঘরে জিনিসপত্রের এমনি বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে যে, আবশ্যকের সময়ে কোনো জিনিস খুঁজিয়া পাওয়াই কঠিন। মহেন্দ্রের চিকিৎসার অস্ত্র একদিন তরকারি কুটিবার কার্যে নিযুক্ত হইয়া আবর্জনার মধ্যে অজ্ঞাতবাস গ্রহণ করিল এবং তাহার নোটের খাতা হাতপাখার অ্যাকটিনি করিয়া রান্নাঘরের ভস্মশয্যায় বিশ্রাম করিতে লাগিল।

এই-সকল অভাবনীয় ব্যবস্থাবিপর্যয়ে মহেন্দ্রের কৌতুকের সীমা রহিল না, কিন্তু আশা ব্যথিত হইতে থাকিল। উচ্ছৃঙ্খল যথেচ্ছাচারের স্রোতে সমস্ত ঘরকন্না ভাসাইয়া হাস্যমুখে ভাসিয়া চলা বালিকার কাছে বিভীষিকাজনক বলিয়া বোধ হইতে লাগিল।

একদিন সন্ধ্যার সময় দুইজনে ঢাকা-বারান্দায় বিছানা করিয়া বসিয়াছে। সম্মুখে খোলা ছাদ। বৃষ্টির পরে কলিকাতার দিগন্তব্যাপী সৌধশিখরশ্রেণী জ্যোৎস্নায় প্লাবিত। বাগান হইতে রাশীকৃত ভিজা বকুল সংগ্রহ করিয়া আশা নতশিরে মালা গাঁথিতেছে। মহেন্দ্র তাহা লইয়া টানাটানি করিয়া, বাধা ঘটাইয়া, প্রতিকূল সমালোচনা করিয়া, অনর্থক একটা কলহ সৃষ্টি করিবার উদ্যোগ করিতেছিল। আশা এই-সকল অকারণ উৎপীড়ন লইয়া তাহাকে ভর্ৎসনা করিবার উপক্রম করিবামাত্র মহেন্দ্র কোনো-একটি কৃত্রিম উপায়ে আশার মুখ বন্ধ করিয়া শাসনবাক্য অঙ্কুরেই বিনাশ করিতেছিল।

এমন সময় প্রতিবেশীর বাড়ির পিঞ্জরের মধ্য হইতে পোষা কোকিল কুহু কুহু করিয়া ডাকিয়া উঠিল। তখনই মহেন্দ্র এবং আশা তাহাদের মাথার উপরে দোদুল্যমান খাঁচার দিকে দৃষ্টিপাত করিল। তাহাদের কোকিল প্রতিবেশী কোকিলের কুহুধ্বনি কখনো নীরবে সহ্য করে নাই, আজ সে জবাব দেয় না কেন?

আশা উৎকণ্ঠিত হইয়া কহিল, “পাখির আজ কী হইল।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার কণ্ঠ শুনিয়া লজ্জাবোধ করিতেছে।”

আশা সানুনয়স্বরে কহিল, “না, ঠাট্টা নয়, দেখো-না উহার কী হইয়াছে।”

মহেন্দ্র তখন খাঁচা পাড়িয়া নামাইল। খাঁচার আবরণ খুলিয়া দেখিল, পাখি মরিয়া গেছে। অন্নপূর্ণার যাওয়ার পর বেহারা ছুটি লইয়া গিয়াছিল, পাখিকে কেহ দেখে নাই।

দেখিতে দেখিতে আশার মুখ ম্লান হইয়া গেল। তাহার আঙুল চলিল না– ফুল পড়িয়া রহিল। মহেন্দ্রের মনে আঘাত লাগিলেও, অকালে রসভঙ্গের আশঙ্কায় ব্যাপারটা সে হাসিয়া উড়াইবার চেষ্টা করিল। কহিল, “ভালোই হইয়াছে, আমি ডাক্তারি করিতে যাইতাম, আর ওটা কুহুস্বরে তোমাকে জ্বালাইয়া মারিত।” এই বলিয়া মহেন্দ্র আশাকে বাহুপাশে বেষ্টন করিয়া কাছে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিল।

আশা আস্তে আস্তে আপনাকে ছাড়াইয়া লইয়া আঁচল শূন্য করিয়া বকুলগুলা ফেলিয়া দিল। কহিল, “আর কেন। ছি ছি। তুমি শীঘ্র যাও, মাকে ফিরাইয়া আনো গে।”

8

Asha became quite alarmed. Things were not going well at all! First their mother and then their aunt – both had left. If their quest for happiness was driving everyone away, would it be her turn next? The pursuit of love in the midst of an abandoned household started to seem incongruous to her.

When love is plucked like a flower and isolated from the responsibilities of life, it is unable to sustain itself with its own delights and grows wan and twisted. Asha began to feel a tiring monotony in their continuous dalliance. The union seemed to grow weak without the support of the stable framework provided by their family around them. If love is not well rooted in work and activity, it does not express itself well and lacks stability.

Mahendra rebelled against the disappointment of abandonment by his family members and attempted to celebrate his love for Asha in the solitude of the forsaken house. He attempted to rile Asha with his words saying, ‘What is wrong with with you Chuni? So what if your aunt has left, must you sulk like that? Is our love not enough to satisfy all your need for affection?’

Asha would think with some sadness, ‘Then there must be some thing lacking in my love. I frequently think about my aunt; I worry so much about my mother-in-law’s absence.’ She would then try to shake off these feelings of guilt about her failings in love as best as she could.

No one ran the household with a firm hand any more. The servants often neglected their jobs. One day the maid did not come to work at all saying she was ill and the cook stayed away because he was too drunk to come that day. Mahendra said to Asha, ‘This is fun, we will do the cooking ourselves today.’

Mahendra took the car to New Market to get the ingredients. He had no idea about what to get and how much to buy of each necessity – he came home with far more than was needed. Asha did not know much about cooking what he had bought. The experiments in the kitchen went on till two o’clock and Mahendra was much amused with the invention of various hitherto unheard of dishes. Asha could not enjoy herself as much and felt very ashamed and mortified at her own ignorance and inability.

The various things in the house were in such a state that nothing could be found when one wanted it. Mahendra’s surgical scalpel was used for cutting vegetables one day after which it was promptly lost in the rubbish while his notebook was used instead of a hand fan and found itself stored away on a dusty shelf in the kitchen.

These mishaps provided great amusement to Mahendra but Asha felt much pain. The uncaring pursuit of happiness while all around them the household went to the dogs was like a nightmare for her.

One evening they were sitting on a bed laid out under the roof of the terrace which lay open before them. Moonlight flooded the roofs and terraces of Kolkata as the city stretched away to the horizon. Asha sat with a bowed head making a garland from a pile of rain washed mimosa blossoms she had picked from the garden. Mahendra pulled on the thread, stopped her from working and made adverse comments – all with the aim of creating an unnecessary argument. Every time Asha attempted to rebuke him about these needless disturbances, he would silence her in a manner that left her little choice but to fall silent.

The pet cuckoo in the neighbouring house started calling. Asha and Mahendra both looked up at the cage hanging above their heads. Their cuckoo never allowed these calls to go unchallenged and yet today there was no answer from the cage.

Asha anxiously said, ‘What is wrong with the bird today?’

Mahendra answered, ‘It may be shamed into silence after hearing your sweet voice.’

There was a note of appeal in Asha’s voice as she said, ‘Please, no more jokes, do have a look at the bird.’

Mahendra brought the cage down and removed the shade cloth to find that the bird had died. After Annapurna left the servant had taken leave as well and no one had thought to feed the poor creature.

Asha’s face grew saddened at this. Her fingers seemed to grow numb and the flowers lay neglected. Although Mahendra was hurt too, he tried to salvage the mood by laughing the incident away. He said, ‘This is for the best, when I go to work it would have driven you mad with its incessant cooing.’ He then put his arms around Asha and tried to draw her close to himself.

Asha slowly removed his arms and dropped the flowers on the floor. She then said, ‘No more! Shame on us! Please go and bring your mother back.’