চোখের বালি ১৮, Chokher Bali 18

১৮

চড়িভাতির দুর্দিনের পরে মহেন্দ্র বিনোদিনীকে আর-এক বার ভালো করিয়া আয়ত্ত করিয়া লইতে উৎসুক ছিল। কিন্তু তাহার পরদিনেই রাজলক্ষ্মী ইনফ্লুয়েঞ্জা-জ্বরে পড়িলেন। রোগ গুরুতর নহে, তবু তাহার অসুখ ও দুর্বলতা যথেষ্ট। বিনোদিনী দিনরাত্রি তাঁহার সেবায় নিযুক্ত হইল।

মহেন্দ্র কহিল, “দিনরাত এমন করিয়া খাটিলে শেষকালে তুমিই যে অসুখে পড়িবে। মার সেবার জন্যে আমি লোক ঠিক করিয়া দিতেছি।”

বিহারী কহিল, “মহিনদা, তুমি অত ব্যস্ত হইয়ো না। উনি সেবা করিতেছেন, করিতে দাও। এমন করিয়া কি আর কেহ করিতে পারিবে।”

মহেন্দ্র রোগীর ঘরে ঘনঘন যাতায়াত আরম্ভ করিল। একটা লোক কোনো কাজ করিতেছে না, অথচ কাজের সময় সর্বদাই সঙ্গে লাগিয়া আছে, ইহা কর্মিষ্ঠা বিনোদিনীর পক্ষে অসহ্য। সে বিরক্ত হইয়া দুই-তিনবার কহিল, “মহিনবাবু, আপনি এখানে বসিয়া থাকিয়া কী সুবিধা করিতেছেন। আপনি যান– অনর্থক কালেজ কামাই করিবেন না।”

মহেন্দ্র তাহাকে অনুসরণ করে, ইহাতে বিনোদিনীর গর্ব এবং সুখ ছিল, কিন্তু তাই বলিয়া এমনতরো কাঙালপনা, রুগ্‌না মাতার শয্যাপার্শ্বেও লুব্ধহৃদয়ে বসিয়া থাকা– ইহাতে তাহার ধৈর্য থাকিত না, ঘৃণাবোধ হইত। কোনো কাজ যখন বিনোদিনীর উপর নির্ভর করে, তখন সে আর-কিছুই মনে রাখে না। যতক্ষণ খাওয়ানো-দাওয়ানো, রোগীর সেবা, ঘরের কাজ প্রয়োজন, ততক্ষণ বিনোদিনীকে কেহ অনবধান দেখে নাই–সেও প্রয়োজনের সময় কোনোপ্রকার অপ্রয়োজনীয় ব্যাপার দেখিতে পারে না।

বিহারী অল্পক্ষণের জন্য মাঝে মাঝে রাজলক্ষ্মীর সংবাদ লইতে আসে। ঘরে ঢুকিয়াই কী দরকার, তাহা সে তখনই বুঝিতে পারে– কোথায় একটা-কিছুর অভাব আছে, তাহা তাহার চোখে পড়ে– মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ঠিক করিয়া দিয়া সে বাহির হইয়া যায়। বিনোদিনী মনে বুঝিতে পারিত, বিহারী তাহার শুশ্রূষাকে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেছে। সেইজন্য বিহারীর আগমনে সে যেন বিশেষ পুরষ্কার লাভ করিত।

মহেন্দ্র নিতান্ত ধিক্‌কারবেগে অত্যন্ত কড়া নিয়মে কালেজে বাহির হইতে লগিল। একে তাহার মেজাজ অত্যন্ত রুক্ষ হইয়া রহিল, তাহার পরে এ কী পরিবর্তন। খাবার ঠিক সময়ে হয় না, সইসটা নিরুদ্দেশ হয়, মোজাজোড়ার ছিদ্র ক্রমেই অগ্রসর হইতে থাকে। এখন এই-সমস্ত বিশৃঙ্খলায় মহেন্দ্রের পূর্বের ন্যায় আমোদ বোধ হয় না। যখন যেটি দরকার, তখনি সেটি হাতের কাছে সুসজ্জিত পাইবার আরাম কাহাকে বলে, তাহা সে কয়দিন জানিতে পারিয়াছে। এক্ষণে তাহার অভাবে, আশার অশিক্ষিত অপটুতায় মহেন্দ্রের আর কৌতুকবোধ হয় না।

“চুনি, আমি তোমাকে কতদিন বলিয়াছি, স্নানের আগেই আমার জামায় বোতাম পরাইয়া প্রস্তুত রাখিবে, আর আমার চাপকান-প্যাণ্টলুন ঠিক করিয়া রাখিয়া দিবে– একদিনও তাহা হয় না। স্নানের পর বোতাম পরাইতে আর কাপড় খুঁজিয়া বেড়াইতে আমার দু ঘণ্টা যায়।”

অনুতপ্ত আশা লজ্জায় ম্লান হইয়া বলে, “আমি বেহারাকে বলিয়া দিয়াছিলাম।”

“বেহারাকে বলিয়া দিয়াছিলে! নিজের হাতে করিতে দোষ কী। তোমার দ্বারা যদি কোনো কাজ পাওয়া যায়!”

ইহা আশার পক্ষে বজ্রাঘাত। এমন ভর্ৎসনা সে কখনো পায় নাই। এ জবাব তাহার মুখে বা মনে আসিল না যে, “তুমিই তো আমার কর্মশিক্ষার ব্যাঘাত করিয়াছ।’ এই ধারণাই তাহার ছিল না যে, গৃহকর্মশিক্ষা নিয়ত অভ্যাস ও অভিজ্ঞতাসাপেক্ষ। সে মনে করিত, “আমার স্বাভাবিক অক্ষমতা ও নির্বুদ্ধিতাবশতই কোনো কাজ ঠিকমতো করিয়া উঠিতে পারি না।’ মহেন্দ্র যখন আত্মবিস্মৃত হইয়া বিনোদিনীর সহিত তুলনা দিয়া আশাকে ধিক্‌কার দিয়াছে, তখন সে তাহা বিনয়ে ও বিনা বিদ্বেষে গ্রহণ করিয়াছে।

আশা এক-একবার তাহার রুগ্‌ণা শাশুড়ির ঘরের আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়ায়– এক-একবার লজ্জিতভাবে ঘরের দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়ায়। সে নিজেকে সংসারের পক্ষে আবশ্যক করিয়া তুলিতে ইচ্ছা করে, সে কাজ দেখাইতে চায়, কিন্তু কেহ তাহার কাজ চাহে না। সে জানে না কেমন করিয়া কাজের মধ্যে প্রবেশ করা যায়, কেমন করিয়া সংসারের মধ্যে স্থান করিয়া লইতে হয়। সে নিজের অক্ষমতার সংকোচে বাহিরে বাহিরে ফিরে। তাহার কী-একটা মনোবেদনার কথা অন্তরে প্রতিদিন বাড়িতেছে, কিন্তু তাহার সেই অপরিস্ফুট বেদনা, সেই অব্যক্ত আশঙ্কাকে সে স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে পারে না। সে অনুভব করে, তাহার চারি দিকের সমস্তই সে যেন নষ্ট করিতেছে– কিন্তু কেমন করিয়াই যে তাহা গড়িয়া উঠিয়াছিল এবং কেমন করিয়াই যে তাহা নষ্ট হইতেছে, এবং কেমন করিলে যে তাহার প্রতিকার হইতে পারে তাহা সে জানে না। থাকিয়া থাকিয়া কেবল গলা ছাড়িয়া কাঁদিয়া বলিতে ইচ্ছা করে, “আমি অত্যন্ত অযোগ্য, নিতান্ত অক্ষম, আমার মূঢ়তার কোথাও তুলনা নাই।’

পূর্বে তো আশা ও মহেন্দ্র সুদীর্ঘকালে দুইজনে এক গৃহকোণে বসিয়া কখনো কথা কহিয়া, কখনো কথা না কহিয়া, পরিপূর্ণ সুখে সময় কাটাইয়াছে। আজকাল বিনোদিনীর অভাবে আশার সঙ্গে একলা বসিয়া মহেন্দ্রের মুখে কিছুতেই যেন সহজে কথা জোগায় না– এবং কিছু না কহিয়া চুপ করিয়া থাকিতেও তাহার বাধো-বাধো ঠেকে।

মহেন্দ্র বেহারাকে জিজ্ঞাসা করিল, “ও চিঠি কাহার।”

“বিহারীবাবুর।”

“কে দিল।”

“বহু ঠাকুরাণী।” (বিনোদিনী)

“দেখি” বলিয়া চিঠিখানা লইল। ইচ্ছা হইল ছিঁড়িয়া পড়ে। দু-চারিবার উল্‌টাপাল্‌টা করিয়া নাড়িয়া-চাড়িয়া বেহারার হাতে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। যদি চিঠি খুলিত, তবে দেখিত, তাহাতে লেখা আছে, “পিসিমা কোনোমতেই সাগু-বার্লি খাইতে চান না, আজ কি তাঁহাকে ডালের ঝোল খাইতে দেওয়া হইবে।’ ঔষধপথ্য লইয়া বিনোদিনী মহেন্দ্রকে কখনো কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিত না, সে-সম্বন্ধে বিহারীর প্রতিই তাহার নির্ভর।

মহেন্দ্র বারান্দায় খানিকক্ষণ পায়চারি করিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, দেয়ালে টাঙানো একটা ছবির দড়ি ছিন্নপ্রায় হওয়াতে ছবিটা বাঁকা হইয়া আছে। আশাকে অত্যন্ত ধমক দিয়া কহিল, “তোমার চোখে কিছুই পড়ে না, এমনি করিয়া সমস্ত জিনিস নষ্ট হইয়া যায়।” দমদমের বাগান হইতে ফুল সংগ্রহ করিয়া যে-তোড়া বিনোদিনী পিতলের ফুলদানিতে সাজাইয়া রাখিয়াছিল, আজও তাহা শুষ্ক অবস্থায় তেমনিভাবে আছে; অন্যদিন মহেন্দ্র এ-সমস্ত লক্ষ্যই করে না– আজ তাহা চোখে পড়িল। কহিল, “বিনোদিনী আসিয়া না ফেলিয়া দিলে, ও আর ফেলাই হইবে না।” বলিয়া ফুলসুদ্ধ ফুলদানি বাহিরে ছুঁড়িয়া ফেলিল, তাহা ঠংঠং শব্দে সিঁড়ি দিয়া গড়াইয়া চলিল। “কেন আশা আমার মনের মতো হইতেছে না, কেন সে আমার মনের মতো কাজ করিতেছে না, কেন তাহার স্বভাবগত শৈথিল্য ও দুর্বলতায় সে আমাকে দাম্পত্যের পথে দৃঢ়ভাবে ধরিয়া রাখিতেছে না, সর্বদা আমাকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দিতেছে।’– এই কথা মহেন্দ্র মনে মনে আন্দোলন করিতে করিতে হঠাৎ দেখিল, আশার মুখ পাংশুবর্ণ হইয়া গেছে, সে খাটের থাম ধরিয়া আছে, তাহার ঠোঁট দুটি কাঁপিতেছে– কাঁপিতে কাঁপিতে সে হঠাৎ বেগে পাশের ঘর দিয়া চলিয়া গেল।

মহেন্দ্র তখন ধীরে ধীরে গিয়া ফুলদানিটা কুড়াইয়া আনিয়া রাখিল। ঘরের কোণে তাহার পড়িবার টেবিল ছিল– চৌকিতে বসিয়া এই টেবিলটার উপর হাতের মধ্যে মাথা রাখিয়া অনেকক্ষণ পড়িয়া রহিল।

সন্ধ্যার পর ঘরে আলো দিয়া গেল, কিন্তু, আশা আসিল না। মহেন্দ্র দ্রুতপদে ছাদের উপর পায়চারি করিয়া বেড়াইতে লাগিল। রাত্রি নটা বাজিল, মহেন্দ্রদের লোকবিরল গৃহ রাত-দুপুরের মতো নিস্তব্ধ হইয়া গেল– তবু আশা আসিল না। মহেন্দ্র তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইল। আশা সংকুচিতপদে আসিয়া ছাদের প্রবেশদ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। মহেন্দ্র কাছে আসিয়া তাহাকে বুকে টানিয়া লইল– মুহূর্তের মধ্যে স্বামীর বুকের উপর আশার কান্না ফাটিয়া পড়িল– সে আর থামিতে পারে না, তাহার চোখের জল আর ফুরায় না, কান্নার শব্দ গলা ছাড়িয়া বাহির হইতে চায়, সে আর চাপা থাকে না। মহেন্দ্র তাহাকে বক্ষে বদ্ধ করিয়া কেশচুম্বন করিল– নিঃশব্দ আকাশে তারাগুলি নিস্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল।

রাত্রে বিছানায় বসিয়া মহেন্দ্র কহিল, “কালেজে আমাদের নাইট-ডিউটি অধিক পড়িয়াছে, অতএব এখন কিছুকাল আমাকে কালেজের কাছেই বাসা করিয়া থাকিতে হইবে।”

আশা ভাবিল, “এখনো কি রাগ আছে। আমার উপর বিরক্ত হইয়া চলিয়া যাইতেছেন? নিজের নিগুZতায় আমি স্বামীকে ঘর হইতে বিদায় করিয়া দিলাম? আমার তো মরা ভালো ছিল।’

কিন্তু মহেন্দ্রের ব্যবহারে রাগের লক্ষণ কিছুই দেখা গেল না। সে অনেকক্ষণ কিছু না বলিয়া আশার মুখ বুকের উপর রাখিল এবং বারংবার অঙ্গুলি দিয়া তাহার চুল চিরিতে চিরিতে তাহার খোঁপা শিথিল করিয়া দিল। পূর্বে আদরের দিনে মহেন্দ্র এমন করিয়া আশার বাঁধা চুল খুলিয়া দিত– আশা তাহাতে আপত্তি করিত। আজ আর সে তাহাতে কোনো আপত্তি না করিয়া পুলকে বিহ্বল হইয়া চুপ করিয়া রহিল। হঠাৎ এক সময় তাহার ললাটের উপর অশ্রুবিন্দু পড়িল, এবং মহেন্দ্র তাহার মুখ তুলিয়া ধরিয়া স্নেহরুদ্ধ স্বরে ডাকিল, “চুনি।” আশা কথায় তাহার কোনো উত্তর না দিয়া দুই কোমল হস্তে মহেন্দ্রকে চাপিয়া ধরিল। মহেন্দ্র কহিল, “অপরাধ করিয়াছি, আমাকে মাপ করো।”

আশা তাহার কুসুম-সুকুমার করপল্লব মহেন্দ্রের মুখের উপর চাপা দিয়া কহিল,”না, না, অমন কথা বলিয়ো না। তুমি কোনো অপরাধ কর নাই। সকল দোষ আমার। আমাকে তোমার দাসীর মতো শাসন করো। আমাকে তোমার চরণাশ্রয়ের যোগ্য করিয়া লও।”

বিদায়ের প্রভাতে শয্যাত্যাগ করিবার সময় মহেন্দ্র কহিল, “চুনি, আমার রত্ন, তোমাকে আমার হৃদয়ে সকলের উপরে ধারণ করিয়া রাখিব, সেখানে কেহ তোমাকে ছাড়াইয়া যাইতে পারিবে না।”

তখন আশা দৃঢ়চিত্তে সর্বপ্রকার ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত হইয়া স্বামীর নিকট নিজের একটিমাত্র ক্ষুদ্র দাবি দাখিল করিল। কহিল, “তুমি আমাকে রোজ একখানি করিয়া চিঠি দিবে?”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমিও দিবে?”

আশা কহিল, “আমি কি লিখিতে জানি।”

মহেন্দ্র তাহার কানের কাছে অলকগুচ্ছ টানিয়া দিয়া কহিল, “তুমি অক্ষয়কুমার দত্তের চেয়ে ভালো লিখিতে পার-চারুপাঠ যাহাকে বলে।”

আশা কহিল, “যাও, আমাকে আর ঠাট্টা করিয়ো না।”

যাইবার পূর্বে আশা যথাসাধ্য নিজের হাতে মহেন্দ্রের পোর্টম্যাণ্টো সাজাইতে বসিল। মহেন্দ্রের মোটা মোটা শীতের কাপড় ঠিকমতো ভাঁজ করা কঠিন, বাক্সে ধরানো শক্ত– উভয়ে মিলিয়া কোনোমতে চাপাচাপি ঠাসাঠুসি করিয়া, যাহা এক বাক্সে ধরিত, তাহাতে দুই বাক্স বোঝাই করিয়া তুলিল। তবু যাহা ভুলক্রমে বাকি রহিল, তাহাতে আরো অনেকগুলি স্বতন্ত্র পুঁটুলির সৃষ্টি হইল। ইহা লইয়া আশা যদিও বার বার লজ্জাবোধ করিল, তবু তাহাদের কাড়াকাড়ি, কৌতুক ও পরস্পরের প্রতি সহাস্য দোষারোপে পূর্বেকার আনন্দের দিন ফিরিয়া আসিল। এ যে বিদায়ের আয়োজন হইতেছে, তাহা আশা ক্ষণকালের জন্য ভুলিয়া গেল। সহিস দশবার গাড়ি তৈয়ারির কথা মহেন্দ্রকে স্মরণ করাইয়া দিল, মহেন্দ্র কানে তুলিল না– অবশেষে বিরক্ত হইয়া বলিল, “ঘোড়া খুলিয়া দাও।”

সকাল ক্রমে বিকাল হইয়া গেল, বিকাল সন্ধ্যা হয়। তখন স্বাস্থ্যপালন করিতে পরস্পরকে সতর্ক করিয়া দিয়া এবং নিয়মিত চিঠি লেখা সম্বন্ধে বারংবার প্রতিশ্রুত করাইয়া লইয়া ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পরস্পরের বিচ্ছেদ হইল।

রাজলক্ষ্মী আজ দুইদিন হইল উঠিয়া বসিয়াছেন। সন্ধ্যাবেলায় গায়ে মোটা কাপড় মুড়ি দিয়া বিনোদিনীর সঙ্গে তাস খেলিতেছেন। আজ তাঁহার শরীরে কোনো গ্লানি নাই। মহেন্দ্র ঘরে প্রবেশ করিয়া বিনোদিনীর দিকে একেবারেই চাহিল না– মাকে কহিল, “মা, কালেজে আমার রাত্রের কাজ পড়িয়াছে, এখানে থাকিয়া সুবিধা হয় না– কালেজের কাছে বাসা লইয়াছি। সেখানে আজ হইতে থাকিব।’

রাজলক্ষ্মী মনে মনে অভিমান করিয়া কহিলেন, “তা যাও। পড়ার ক্ষতি হইলে কেমন করিয়া থাকিবে।”

যদিও তাঁহার রোগ সারিয়াছে, তবু মহেন্দ্র যাইবে শুনিয়া তখনি তিনি নিজেকে অত্যন্ত রুগ্‌ণ ও দুর্বল বলিয়া কল্পনা করিলেন; বিনোদিনীকে বলিলেন, “দাও তো বাছা, বালিশটা আগাইয়া দাও।” বলিয়া বালিশ অবলম্বন করিয়া শুইলেন, বিনোদিনী আস্তে আস্তে তাঁহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল।

মহেন্দ্র একবার মার কপালে হাত দিয়া দেখিল, তাঁহার নাড়ী পরীক্ষা করিল। রাজলক্ষ্মী হাত ছাড়াইয়া লইয়া কহিলেন, “নাড়ী দেখিয়া তো ভারি বোঝা যায়। তোর আর ভাবিতে হইবে না, আমি বেশ আছি।” বলিয়া অত্যন্ত দুর্বলভাবে পাশ ফিরিয়া শুইলেন।

মহেন্দ্র বিনোদিনীকে কোনোপ্রকার বিদায়সম্ভাষণ না করিয়া রাজলক্ষ্মীকে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল।

chokher bali 5

18

Mahendra was keen to get the better of Binodini after the disaster of the picnic. But the very next day, Rajlakshmi became ill with influenza. It was not a serious ailment but she was quite ill and rather weak. Binodini was the one who looked after her day and night.

Mahendra said, ‘If you work all day and all night like this you will end up getting ill yourself. I will engage someone to look after my mother.’

Bihari reassured him saying, ‘Mahendra, you should not be so worried. Let her look after the patient. Who else is there who can take such good care?’

Mahendra started frequenting the room where his mother was convalescing. The continual presence of a person who was not actually doing anything was unbearable to the hardworking Binodini. She said a couple of times with some vehemence, ‘Mahendra, are you helping in any way by sitting here? Go! There is little point in you missing your classes.’

Binodini did feel a sense of pride and happiness in the fact that Mahendra followed her around, but this pathetic neediness and lack of shame in front of his sick mother tried both her patience and disgusted her. When she was occupied with a task, she thought of nothing else. No one had ever seen her to be unmindful of her duties while something needed to be done, whether it was for the family or for the patient. She could not bear any dawdling while there was unfinished business.

Bihari occasionally came for a short while to see Rajlakshmi. He always knew what needed to be bought after he had been in the room for a short while and would set things right quickly before leaving. Binodini could tell that he respected her ability to look after the sick. This felt like an unspoken reward to her.

Mahendra had started going to his classes very punctually out of sheer frustration and dismay. To his annoyance things did not seem to be going his way at all. His meals were never on time, the coachman disappeared when he was neded and the holes in his socks grew daily. He no longer found these lapses and signs of carelessness as amusing as he had in the past. He had grown used in the past few days to the luxury of having a well run household where things were available when needed. Now he did not find Asha’s untrained ineptitude endearing any more.

‘Chuni, I have told you, you must find my cufflinks and get my coat and trousers ready before I go into the bathroom? But you never do that. I waste a couple of hours looking for my clothes and cufflinks after my bath every day!’

Asha was ashamed and said timidly, ‘I did tell the valet.’

‘You told the valet! Why not do it yourself. What good are you then?’

Asha was struck by this. She had never been chastised like this before. She was not able to say, ‘You are the one that stopped me from learning how to run a household.’ She had no idea that even housework needed daily practice and experience. She had always thought, ‘I do not do anything well because of my inability and my ignorance.’ Whenever Mahendra thoughtlessly compared her with Binodini, she had accepted it meekly and without protest.

At times she would circle her mother – in – law’s room, sometimes standing at the door shyly. She wanted to be necessary to the household, she wished to do things, but no one wanted her help. She did not know how she could become a part of the activity within the house. She stayed on the periphery mostly due to her own lack of confidence in herself. There was an anguish that was growing inside her but she could not tell what was causing this hidden sadness, this unvoiced apprehension. She could feel that she was causing great harm to herself but she was unsure as to what had caused this to happen and how she could stop this from going on further. She felt like crying out aloud, ‘I am so unfit, so unable, there is no one as stupid as me!’

In the past Asha and Mahendra had spent time together, sometimes even in silence, but always completely satisfied and happy. These days Mahendra seemed unable to think of things to say to Asha when Binodini was absent and to say nothing felt strange to her too.

Mahendra asked the servant, ‘Who is that letter for?’

‘It is for Biharibabu.’

‘Who is it from?’

‘The new mistress(Binodini)’

‘Let me see,’ he said as he took the letter. He felt like ripping it open and reading it. He turned it over a couple of times and then threw it back at the servant. If he had bothered to open it, he would have seen the words – ‘Aunt does not like eating sago and barley, should I make her some lentil soup today?’ Binodini never asked Mahendra about the medicines, Bihari was the one she trusted in all these matters.

Mahendra walked around the verandah for a while and then returned to the room. His eye was caught by a picture that was hanging askew on the wall as the string holding it up had become very frayed. He angrily reproached Asha, ‘You do not keep an eye on anything around you, this is how everything gets ruined.’ Binodini had arranged the flowers she had picked during the picnic in a brass vase; they still sat in it although they were dried up. At other times he noticed none of this but today he did. He said, ‘Those will never be thrown out unless Binodini comes along and does it!’ He then threw the vase with its flowers outside the room where it rolled down the stairs with a loud ringing sound. He thought to himself, ‘Why can Asha not do what I want? Why do I not love her? Why can she not hold me steadfast to the path of marital bliss because of her natural diffidence and weakness, why am I always distracted from it?’ While he thought of these and a hundred other things, he looked at Asha to see that she had turned pale and was clutching the bedpost; her lips quivered and she suddenly escaped to the next room.

Mahendra then got up and walked slowly to where the vase lay and picked it up. He sat on the bed for a long time, cradling his head in his arms as he leaned against his study table.

Someone brought a light to the room when darkness fell, but Asha did not come. Agitated, Mahendra walked about on the terrace. It struck nine and the almost empty house grew as quiet as midnight, but still, Asha did not come to him. Mahendra then sent for her. She came hesitantly and stood at the door that led to the roof terrace. Mahendra came to her and pulled her into his arms – Asha immediately burst into tears. She wept as though she would never stop, tears running down her face, the sound of her grief threatening to find voice. He held her close and kissed her hair, watched by the spellbound stars in the silent sky.

Mahendra sat on the bed and said, ‘I have night duty coming up at college, I feel I should stay near the hospital for a few days now.’

Asha thought, ‘He must still be annoyed with me. Is that why he is leaving? Am I driving away with my ineptitude? I should die of shame.’

But there were no signs of anger in his behavior. He held her close without speaking for a long time and undid her hair by running his fingers through it again and again. When he did this while making love in the past, she would protest. Today she was moved to the core by this and said nothing to stop him. Suddenly a tear fell on her forehead and she heard Mahendra say with great feeling, as he raised her face to him, ‘Chuni.’She held him tight within her gentle embrace. Mahendra said again, ‘I have wronged you, please forgive me.’

Asha placed her petal soft palms across Mahendra’s mouth and stopped him, saying, ‘No, please! You must not say such things! You have done nothing wrong, the fault is entirely mine. You must discipline me as your inferior and train me to be suitable for a place at your feet.’

On the morning of his departure as he rose from bed, Mahendra said, ‘Chuni, you are indeed a ruby to me, I will place you above everyone else in my heart, no one will ever rise above you there.’

Asha drew on all her reserves of strength, prepared to put up with every kind of hardship and made one request. She asked Mahendra, ‘Will you write to me once each day?’

Mahendra replied, ‘Will you write too?’

Asha said, ‘Do I know how to write?’

Mahendra tucked her hair behind her ears and said, ‘You write something far better than Akshay Kumar Dutta, in the book of love.’

Asha answered, ‘You don’t have to tease me!’

Before he left Asha prepared to help him pack his portmanteau by her self. His warm clothes were bulky and hard to fold, and harder to fit into the case – consequently the two of them worked hard, pushing the lid down and managing to pack two cases where one would have done the job. All the things left behind by mistake filled a number of other untidy packages. Even though Asha felt ashamed at her lack of expertise, their playful banter and amusement at each other’s mistakes seemed to bring back the happier days of the past. She could even forget for a while that this was indeed preparations for a farewell. The coachman came and reminded Mahendra a number of times that the carriage was ready but he ignored this and eventually ordered the horses back to the stable with some irritation.

Gradually morning became afternoon and afternoon progressed into evening. Finally after many reminders to look after their own health and many promises to write to each other daily had been extracted, they parted with heavy hearts.

Rajlakshmi had been well enough to sit up for two days. She was wrapped up warmly as she played cards with Binodini. There was no discomfort any more today. Mahendra entered the room and without looking at Binodini at all, said to his mother, ‘Ma, as I have night shifts at college, I have taken rooms nearer the place so that I do not have to travel all the way after work. I am going to stay there from today.’

Rajlakshmi was filled with hurt and thought,’Of course, one cannot neglect their studies.’

Although she was better, when she heard of her son’s departure she instantly imagined herself to be very ill and weak and said to Binodini, ‘Give me the pillow, my child.’ She then propped herself on the pillow as Binodini stroked her skin slowly.

Mahendra touched her forehead and took her pulse. She pulled her hand away and said, ‘What will my pulse tell you? You must not worry any more, I am much better,’ before turning weakly on to her side.

Mahendra went away after touching Rajlakshmi’s feet in respect and without saying any words of farewell to Binodini.