ইম্পীরিয়লিজ্ম্/ Imperialism

MP_0101

ইম্পীরিয়লিজ্ম্

বিলাতে ইম্পীরিয়লিজ্মের একটা নেশা ধরিয়াছে। অধীন দেশ ও উপনিবেশ প্রভৃতি জড়াইয়া ইংরেজ-সাম্রাজ্যকে একটা বৃহৎ উপসর্গ করিয়া তুলিবার ধ্যানে সে দেশে অনেকে নিযুক্ত আছেন। বিশ্বামিত্র একটা নূতন জগৎ সৃষ্টি করিবার উদ্যোগ করিয়াছিলেন, বাইবেল-কথিত কোনো রাজা স্বর্গের প্রতি স্পর্ধা করিয়া এক স্তম্ভ তুলিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন,স্বয়ং দশাননের সম্বন্ধেও এরূপ একটা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।
দেখা যাইতেছে, এইরূপ বড়ো বড়ো মতলব পৃথিবীতে অনেক সময়ে অনেক লোকে মনে মনে আঁটিয়াছে। এ-সকল মতলব টেঁকে না; কিন্তু নষ্ট হইবার পূর্বে পৃথিবীতে কিছু অমঙ্গল না সাধিয়া যায় না।
তাঁহাদের দেশের এই খেয়ালের ঢেউ লর্ড্ কার্জনের মনের মধ্যেও যে তোলপাড় করিতেছে সেদিনকার এক অলক্ষণে বক্তৃতায় তিনি তাহার আভাস দিয়াছেন। দেখিয়াছি, আমাদের দেশের কোনো কোনো খবরের কাগজ কখনো কখনো এই বিষয়টাতে একটু উৎসাহ প্রকাশ করিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন, বেশ কথা, ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ ‘এম্পায়ারে’ একাত্ম হইবার অধিকার দাও-না।
কথার ছল ধরিয়া তো কোনো অধিকার পাওয়া যায় না। এমন-কি, লেখাপড়া পাকা কাগজে হইলেও দুর্বল লোকের পক্ষে নিজের স্বত্ব উদ্ধার করা শক্ত। এই কারণে যখন দেখিতে পাই যাঁহারা আমাদের উপরওয়ালা তাঁহারা ইম্পীরিয়ল্বায়ুগ্রস্ত, তখন মনের মধ্যে স্বস্তি বোধ করি না।
পাঠকেরা বলিতে পারেন, তোমার অত ভয় করিবার প্রয়োজন কী। যাহার হাতে ক্ষমতা আছে সে ব্যক্তি ইম্পীরিয়লিজ্পমের বুলি আওড়াক বা নাই আওড়াক, তোমার মন্দ করিতে ইচ্ছা করিলে সে তো অনায়াসে করিতে পারে।
অনায়াসে করিতে পারে না। কেননা, হাজার হইলেও দয়াধর্ম একেবারে ছাড়া কঠিন। লজ্জাও একটা আছে। কিন্তু একটা বড়ো-গোছের বুলি যদি কাহাকেও পাইয়া বসে তবে তাহার পক্ষে নিষ্ঠুরতা ও অন্যায় সহজ হইয়া উঠে।
অনেক লোকে জন্তুকে শুধু শুধু কষ্ট দিতে পীড়া বোধ করে। কিন্তু কষ্ট দেওয়ার একটা নাম যদি দেওয়া যায় ‘শিকার’ তবে সে ব্যক্তি আনন্দের সহিত হত-আহত নিরীহ পাখির তালিকা বৃদ্ধি করিয়া গৌরব বোধ করে। নিশ্চয়ই, বিনা উপলক্ষে যে ব্যক্তি পাখির ডানা ভাঙিয়া দেয় সে ব্যক্তি শিকারির চেয়ে নিষ্ঠুর, কিন্তু পাখির তাহাতে বিশেষ সান্ত্বনা নাই। বরঞ্চ অসহায় পক্ষিকুলের পক্ষে স্বভাবনিষ্ঠুরের চেয়ে শিকারির দল অনেক বেশি নিদারুণ।
যাঁহারা ইম্পীরিয়লিজ্মের খেয়ালে আছেন তাঁহারা দুর্বলের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও অধিকার সম্বন্ধে অকাতরে নির্মম হইতে পারেন এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। পৃথিবীর নানা দিকেই তাহার দৃষ্টান্ত দেখা যাইতেছে।
রাশিয়া ফিন্ল্যাণ্ড্-পোল্যাণ্ড্কে নিজের বিপুল কলেবরের সহিত একেবারে বেমালুম মিশাইয়া লইবার জন্য যে কী পর্যন্ত চাপ দিতেছে তাহা সকলেই জানেন। এতদূর পর্যন্ত কখনোই সম্ভব হইত না যদি-না রাশিয়া মনে করিত, তাহার অধীন দেশের স্বাভাবিক বৈষম্যগুলি জবর্দস্তির সহিত দূর করিয়া দেওয়াই ইম্পীরিয়লিজ্ম্-নামক একটা সর্বাঙ্গীণ বৃহৎ স্বার্থের পক্ষে প্রয়োজনীয়। এই স্বার্থকে রাশিয়া পোল্যাণ্ড্-ফিন্ল্যাণ্ডেরও স্বার্থ বলিয়া গণ্য করে।
লর্ড্্ কার্জনও সেইভাবেই বলিতেছেন, জাতীয়তার কথা ভুলিয়া এম্পায়ারের স্বার্থকে তোমাদের নিজের স্বার্থ করিয়া তোলো।
কোনো শক্তিমানের কানে এ কথা বলিলে তাহার ভয় পাইবার কারণ নাই; কেননা, শুধু কথায় সে ভুলিবে না। বস্তুতই তাহার স্বার্থ কড়ায় গণ্ডায় সপ্রমাণ হওয়া চাই। অর্থাৎ, সে স্থলে তাহাকে দলে টানিতে গেলে নিজের স্বার্থও যথেষ্ট পরিমাণে বিসর্জন না দিলে তাহার মন পাওয়া যাইবে না। অতএব,সেখানে অনেক মধু ঢালিতে হয়, অনেক তেল খরচ না করিয়া চলে না।
ইংলণ্ডের উপনিবেশগুলি তাহার দৃষ্টান্ত। ইংরাজ ক্রমাগতই তাহাদের কানে মন্ত্র আওড়াইতেছে, ‘যদেতৎ হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব’; কিন্তু তাহারা শুধু মন্ত্রে ভুলিবার নয়–পণের টাকা গণিয়া দেখিতেছে।
হতভাগ্য আমাদের বেলায় মন্ত্রেরও কোনো প্রয়োজন নাই, পণের কড়ি তো দূরে থাক্।
আমাদের বেলায় বিচার্য এই যে, বিদেশীয়ের সহিত ভেদবুদ্ধি জাতীয়তার পক্ষে আবশ্যক, কিন্তু ইম্পীরিয়লিজ্আমের পক্ষে প্রতিকূল–অতএব এই ভেদবুদ্ধির যে-সকল কারণ আছে সেগুলাকে উৎপাটন করা কর্তব্য।
কিন্তু সেটা করিতে গেলে দেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশের মধ্যে যে-একটা ঐক্য জমিয়া উঠিতেছে সেটাকে কোনোমতে জমিতে না দেওয়াই শ্রেয়। সে যদি খণ্ড খণ্ড চূর্ণ চূর্ণ অবস্থাতেই থাকে তবে তাহাকে আত্মসাৎ করা সহজ।
ভারতবর্ষের মতো এতবড়ো দেশকে এক করিয়া তোলার মধ্যে একটা গৌরব আছে। ইহাকে চেষ্টা করিয়া বিচ্ছিন্ন রাখা ইংরাজের মতো অভিমানীজাতির পক্ষে লজ্জার কথা।
কিন্তু ইম্পীরিয়লিজ্ম্-মন্ত্রে লজ্জা দূর হয়। ব্রিটিশ এম্পায়ারের মধ্যে এক হইয়া যাওয়াই ভারতবর্ষের পক্ষে যখন পরমার্থলাভ তখন সেই মহদুদ্দেশ্যে ইহাকে জাঁতায় পিষিয়া বিশ্লিষ্ট করাই ‘হিয়ুম্যানিটি’!
ভারতবর্ষের কোনো স্থানে তাহার স্বাধীন শক্তিকে সঞ্চিত হইতে না দেওয়া ইংরেজ-সভ্যনীতি অনুসারে নিশ্চয়ই লজ্জাকর; কিন্তু যদি মন্ত্র বলা যায় ‘ইম্পীরিয়লিজ্ম্’, তবে যাহা মনুষ্যত্বের পক্ষে একান্ত লজ্জা তাহা রাষ্ট্রনীতিকতার পক্ষে চূড়ান্ত গৌরব হইয়া উঠিতে পারে।
নিজেদের নিশ্চিন্ত একাধিপত্যের জন্য একটি বৃহৎ দেশের অসংখ্য লোককে নিরস্ত্র করিয়া তাহাদিগকে চিরকালের জন্য পৃথিবীর জনসমাজে সম্পূর্ণ নিঃস্বত্ব নিরুপায় করিয়া তোলা যে কতবড়ো অধর্ম, কী প্রকাণ্ড নিষ্ঠুরতা, তাহা ব্যাখ্যা করিবার প্রয়োজন নাই; কিন্তু এই অধর্মের গ্লানি হইতে আপনার মনকে বাঁচাইতে হইলে একট বড়ো বুলির ছায়া লইতে হয়।
সেসিল রোড্স্ একজন ইম্পীরিয়ল্বায়ুগ্রস্ত লোক ছিলেন; সেইজন্য দক্ষিণ-আফ্রিকা হইতে বোয়ারদের স্বাতন্ত্র্য লোপ করিবার জন্য তাঁহাদের দলের লোকের কিরূপ আগ্রহ ছিল তাহা সকলেই জানেন।
ব্যক্তিগত ব্যবহারে যে-সকল কাজকে চৌর্য মিথ্যাচার বলে, যাহাকে জাল খুন ডাকতি নাম দেয়, একটা ইজ্ম্-প্রত্যয়-যুক্ত শব্দে তাহাকে শোধন করিয়া কতদূর গৌরবের বিষয় করিয়া তোলে, বিলাতি ইতিহাসের মান্যব্যক্তিদের চরিত্র হইতে তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়।
এইজন্য আমাদের কর্তাদের মুখ হইতে ইম্পীরিয়লিজ্মের আভাস পাইলে আমরা সুস্থির হইতে পারি না। এতবড়ো রথের চাকার তলে যদি আমাদের মর্মস্থান পিষ্ট হয় তবে ধর্মের দোহাই দিলে কাহারও কর্ণগোচর হইবে না। কারণ, পাছে কাজ ভণ্ডুল করিয়া দেয় এই ভয়ে মানুষ তাহার বৃহৎ ব্যাপারগুলিতে ধর্মকে আমল দিতে চাহে না।
প্রাচীন গ্রীসের প্রবল এথীনিয়ান্গণ যখন দুর্বল মেলিয়ান্দের দ্বীপটি অন্যায় নিষ্ঠুরতার সহিত গ্রহণ করিবার উপক্রম করিয়াছিল তখন উভয় পক্ষে কিরূপ বাদানুবাদ হইয়াছিল গ্রীক ইতিহাসবেত্তা থুকিদিদীস তাহার একটা নমুনা দিয়াছিলেন। নিম্নে তাহার কিয়দংশ উদ্ধৃত করিয়া দিলাম। ইহা হইতে পাঠকেরা বুঝিতে পারিবেন, ইম্পীরিয়লিজ্ম্তত্ত্ব য়ুরোপে কত প্রাচীন এবং যে পলিটিক্সের ভিত্তির উপরে য়ুরোপীয় সভ্যতা গঠিত তাহার মধ্যে কিরূপ নিদারুণ ক্রূরতা প্রচ্ছন্ন আছে।

thucydides_by_photoamateur77-d3gsvyq

Imperialism

Imperialism is the latest craze in England. There are many in England who are occupied by a dream of creating a bigger identity for the British Empire by gathering all its colonies and dominions. Viswamitra had tried to create a new world while we hear of a king mentioned in the Bible who tried to raise a column to defy the heavens; there is even a similar story about Dasanan Ravan himself.

Thus it is evident that at various times many people across the world have thought of such grandiose plans. These plans never succeed, but they always manage to cause some harm to the world before coming to an end.
Lord Curzon has given some indication of these plans stirring within him as well in an ominous address he delivered recently. I have noticed that some Indian newspapers are sometimes somewhat enthusiastic about the topic. They say, this is a good plan, why not grant India the right to be one with the British Empire.

But rights are not attained just because one says so. Even a properly executed document does not guarantee rights to a weak individual unable to fight for them. This is why I do not feel easy when I see those that lead us becoming caught up in a fever of imperialism.

The readers might well ask why I am so afraid. The ones with power can harm you easily whether they speak of imperialism or not.

But they cannot do it with impunity. The reason for this is that compassion is very hard to completely do away with. Added to that is the sense of shame that accompanies wrongdoing. But when people are caught up in the spirit of an ideology, it becomes easier to practice cruelty and injustice.

There are many who feel bad about causing an animal pain without reason. But if the act can be given the name ‘hunting’ those people will happily go about adding to the list of wounded or dead birds with pride. Of course, the person who breaks a bird’s wing for no reason is far more cruel than a hunter, but this is of little consolation to the bird. In fact the habitually cruel do far more harm to defenceless birds than those who hunt.

There is no doubt that those who support imperialism can be brutal where the rights of the weak to exist independently are concerned. There are many examples of this across the world.

Everyone is aware of the enormous pressure that Russia is exerting on Finland and Poland to merge with that vast nation. This would never been possible if Russia had not thought that the natural differences within its colonized countries should be forcibly wiped out to ensure the survival of an all encompassing vested interest known as imperialism. Russia considers this to be in the interest of Finland and Poland as well.

Lord Curzon is saying the same thing, ‘Forget nationalism and look upon the welfare of the Empire as your own.’
If this is whispered in the ear of a powerful nation, they have little to fear; for they will not be won over by words alone. In truth their interest is only gained after concrete proof. Thus to win them over to your side one must sacrifice one’s own interests and much honey and oil must be poured to sweeten the deal.

England’s colonies are an example of this. The English are continually saying to them, ‘Our hearts are one’; but they are not to be fooled by vows of everlasting union – they have learnt to inspect the dowry as well.
But for the wretched Indian there is no need for vows, let alone a dowry.

In our case, there is a need to recognise our differences with the foreigners but this is not conducive to imperialism, and thus the characteristics that allow us to have the ability to differentiate must be uprooted.
That is aided by completely destroying the spirit of oneness from developing in different parts of the country. When that unity is reduced to pieces, it is easier to overcome.

To unify the parts of a country as large as India is a matter of pride. Yet to make an attempt to ensure it retains its own identity is a matter of shame for a proud nation such as the English.

Imperialism is a mantra that dissolves the shame. When the ultimate prize for India is to become one with the British Empire, then to crush it into homogeneity must surely be ‘humanity’.

To disallow the independent spirit to take root in any part of India is certainly wrong according to English civil law, but when disguised as ‘imperialism’ what was shameful for humanity can become a matter of great pride for policymaking.

There is no need to explain how great an injustice and extreme a cruelty it is when the innumerable people of a vast nation are rendered completely disenfranchised and defenceless so that one can rule in peace; but the guilt of these wrongdoings can be assuaged by using a grand statement as a shield.

Cecil Rhodes was a man afflicted by imperialism; everyone knows how that made his followers enthusiastic about obliterating the identity of the Boers in South Africa.

Acts that would be described as theft and falsehoods in case of an individual are suffixed with an –ism and cleaned up to make them worthy of great pride; there are many examples of these among the luminaries of British history.

This is why we cannot rest easy after hearing our rulers talk of imperialism. If our spirit is crushed under the wheels of this juggernaut no one will hear our pleas in the name of what is right. Because when it comes to major deeds, men do not heed what is right for fear of failing at what they have set out to do.

In his account of the Peloponnesian wars in ancient Greece, the Greek historian Thucydides described the dialogue between the Athenians and the Melians when the powerful Athenians were preparing to take over the island of the weaker Melians. I include a small part of that below. The readers will understand how ancient the concept of imperialism is in Europe and how extreme the cruelty of the political thought upon which European civilization is based.

***

Athenians: But you and we should say what we really think, and aim only at what is possible, for we both alike know that into the discussion of human affairs the question of justice only enters where the pressure of necessity is equal, and that the powerful exact what they can and weak grant what they must…And we will now endeavour to show that we have come in the interests of our empire and that in what we are about to say we are only seeking the preservation of your city. For we want to make you ours with the least trouble to ourselves, and it is for the interest of us both that you should not be destroyed.

Melians:It may be your interest to be our masters, but how can it be ours to be your slaves?

Athenians:To you the gain will be that by submission you will avert the worst; and we shall be all the richer for your preservation.

4 thoughts on “ইম্পীরিয়লিজ্ম্/ Imperialism

  1. This is quite revealing. I never knew Tagore wrote political commentary too. Loved the Greek dialogue too.🙂

    • Thanks for reading. Yes, he was quite astute about the politics of India and the world. If you think about it, imperialism is still often one of the reasons why countries in the West jump to the aid of countries like Afghanistan. ‘We are going to be a bit in your face, so that we don’t end up punching you!!’ Do read another essay on the blog that he wrote in English himself, called Nationalism. It is such a great prediction of what is happening in Indian politics and the caste/religion based vote banks.

      Take care, and many many greetings of the season!

      Ruma

Comments are closed.