চোখের বালি ২৩/ Chokher Bali 23

২৩

সংসারত্যাগিনী অন্নপূর্ণা বহুদিন পরে হঠাৎ মহেন্দ্রকে আসিতে দেখিয়া যেমন স্নেহে আনন্দে আপ্লুত হইয়া গেলেন, তেমনি তাঁহার হঠাৎ ভয় হইল, বুঝি আশাকে লইয়া মার সঙ্গে মহেন্দ্রের আবার কোনো বিরোধ ঘটিয়াছে এবং মহেন্দ্র তাঁহার কাছে নালিশ জানাইয়া সান্ত্বনালাভ করিতে আসিয়াছে। মহেন্দ্র শিশুকাল হইতেই সকলপ্রকার সংকট ও সন্তাপের সময় তাহার কাকীর কাছে ছুটিয়া আসে। কাহারো উপর রাগ করিলে অন্নপূর্ণা তাহার রাগ থামাইয়া দিয়াছেন, দুঃখবোধ করিলে তাহা সহজে সহ্য করিতে উপদেশ দিয়াছেন। কিন্তু বিবাহের পর হইতে মহেন্দ্রের জীবনে সর্বাপেক্ষা যে সংকটের কারণ ঘটিয়াছে, তাহার প্রতিকারচেষ্টা দূরে থাক্‌, কোনোপ্রকার সান্ত্বনা পর্যন্ত তিনি দিতে অক্ষম। সে সম্বন্ধে যেভাবে যেমন করিয়াই তিনি হস্তক্ষেপ করিবেন,তাহাতেই মহেন্দ্রের সাংসারিক বিপ্লব আরো দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিবে ইহাই যখন নিশ্চয় বুঝিলেন, তখনই তিনি সংসার ত্যাগ করিলেন। রুগ্‌ণ শিশু যখন জল চাহিয়া কাঁদে, এবং জল দেওয়া যখন কবিরাজের নিতান্ত নিষেধ, তখন পীড়িতচিত্তে মা যেমন অন্য ঘরে চলিয়া যান, অন্নপূর্ণা তেমনি করিয়া নিজেকে প্রবাসে লইয়া গেছেন। দূর তীর্থবাসে থাকিয়া ধর্মকর্মের নিয়মিত অনুষ্ঠানে এ কয়দিন সংসার অনেকটা ভুলিয়াছিলেন, মহেন্দ্র আবার কি সেই-সকল বিরোধের কথা তুলিয়া তাঁহার প্রচ্ছন্ন ক্ষতে আঘাত করিতে আসিয়াছে।

কিন্তু মহেন্দ্র আশাকে লইয়া তাহার মার সম্বন্ধে কোনো নালিশের কথা তুলিল না। তখন অন্নপূর্ণার আশঙ্কা অন্য পথে গেল। যে মহেন্দ্র আশাকে ছাড়িয়া কালেজে যাইতে পারিত না, সে আজ কাকীর খোঁজ লইতে কাশী আসে কেন। তবে কি আশার প্রতি মহেন্দ্রর টান ক্রমে ঢিলা হইয়া আসিতেছে। মহেন্দ্রকে তিনি কিছু আশঙ্কার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, “হাঁ রে মহিন, আমার মাথা খা, ঠিক করিয়া বল্‌ দেখি, চুনি কেমন আছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে তো বেশ ভালো আছে কাকীমা।”

“আজকাল সে কী করে, মহিন। তোরা কি এখনো তেমনি ছেলেমানুষ আছিস, না কাজকর্মে ঘরকন্নায় মন দিয়াছিস?”

মহেন্দ্র কহিল, “ছেলেমানুষি একেবারেই বন্ধ। সকল ঝঞ্ঝাটের মূল সেই চারুপাঠখানা যে কোথায় অদৃশ্য হইয়াছে, তাহার আর সন্ধান পাইবার জো নাই। তুমি থাকিলে দেখিয়া খুশি হইতে– লেখাপড়া শেখায় অবহেলা করা স্ত্রীলোকের পক্ষে যতদূর কর্তব্য, চুনি তাহা একান্ত মনে পালন করিতেছে।”

“মহিন, বিহারী কী করিতেছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “নিজের কাজ ছাড়া আর-সমস্তই করিতেছে। নায়েব-গোমস্তায় তাহার বিষয়সম্পত্তি দেখে; কী চক্ষে দেখে, তাহা ঠিক বলিতে পারি না। বিহারীর চিরকাল ঐ দশা। তাহার নিজের কাজ পরে দেখে, পরের কাজ সে নিজে দেখে।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি বিবাহ করিবে না, মহিন।”

মহেন্দ্র একটুখানি হাসিয়া কহিল, “কই, কিছুমাত্র উদ্‌যোগ তো দেখি না।”

শুনিয়া অন্নপূর্ণা হৃদয়ের গোপন স্থানে একটা আঘাত পাইলেন। তিনি নিশ্চয় বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাঁহার বোনঝিকে দেখিয়া, একবার বিহারী আগ্রহের সহিত বিবাহ করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহার সেই উন্মুখ আগ্রহ অন্যায় করিয়া অকস্মাৎ দলিত হইয়াছে। বিহারী বলিয়াছিল, “কাকীমা, আমাকে আর বিবাহ করিতে কখনো অনুরোধ করিয়ো না।” সেই বড়ো অভিমানের কথা অন্নপূর্ণার কানে বাজিতেছিল। তাঁহার একান্ত অনুগত সেই স্নেহের বিহারীকে তিনি এমন মনভাঙা অবস্থায় ফেলিয়া আসিয়াছিলেন, তাহাকে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারেন নাই। অন্নপূর্ণা অত্যন্ত বিমর্ষ ও ভীত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, “এখনো কি আশায় প্রতি বিহারীর মন পড়িয়া আছে।’

মহেন্দ্র কখনো ঠাট্টার ছলে, কখনো গম্ভীরভাবে, তাহাদের ঘরকন্নার আধুনিক সমস্ত খবর-বার্তা জানাইল, বিনোদিনীর কথার উল্লেখমাত্র করিল না।

এখন কালেজ খোলা, কাশীতে মহেন্দ্রের বেশি দিন থাকিবার কথা নয়। কিন্তু কঠিন রোগের পর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার মধ্যে গিয়া আরোগ্যলাভের যে সুখ, মহেন্দ্র কাশীতে অন্নপূর্ণার নিকটে থাকিয়া প্রতিদিন সেই সুখ অনুভব করিতেছিল– তাই একে একে দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল। নিজের সঙ্গে নিজের যে একটা বিরোধ জন্মিবার উপক্রম হইয়াছিল, সেটা দেখিতে দেখিতে দূর হইয়া গেল। কয়দিন সর্বদা ধর্মপরায়ণা অন্নপূর্ণার স্নেহমুখচ্ছবির সম্মুখে থাকিয়া, সংসারের কর্তব্যপালন এমনি সহজ ও সুখকর মনে হইতে লাগিল যে, তাহার পূর্বেকার আতঙ্ক হাস্যকর বোধ হইল। মনে হইল, বিনোদিনী কিছুই না। এমন কি, তাহার মুখের চেহারাই মহেন্দ্র স্পষ্ট করিয়া মনে আনিতে পারে না। অবশেষে মহেন্দ্র খুব জোর করিয়াই মনে মনে কহিল, “আশাকে আমার হৃদয় হইতে এক চুল সরাইয়া বসিতে পারে, এমন তো আমি কোথাও কাহাকেও দেখিতে পাই না।’

মহেন্দ্র অন্নপূর্ণাকে কহিল, “কাকীমা, আমার কালেজ কামাই যাইতেছে– এবারকার মতো তবে আসি। যদিও তুমি সংসারের মায়া কাটাইয়া একান্তে আসিয়া আছ– তবু অনুমতি করো মাঝে মাঝে আসিয়া তোমার পায়ের ধূলা লইয়া যাইব।”

মহেন্দ্র গৃহে ফিরিয়া আসিয়া যখন আশাকে তাহার মাসির স্নেহোপহার সিঁদুরের কৌটা ও একটি সাদা পাথরের চুমকি ঘটি দিল, তখন তাহার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাসিমার সেই পরমস্নেহময় ধৈর্য ও মাসিমার প্রতি তাহাদের ও তাহার শাশুড়ির নানাপ্রকার উপদ্রব স্মরণ করিয়া তাহার হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠিল। স্বামীকে জানাইল, “আমার বড়ো ইচ্ছা করে, আমি একবার মাসিমার কাছে গিয়া তাঁহার ক্ষমা ও পায়ের ধূলা লইয়া আসি। সে কি কোনোমতেই ঘটিতে পারে না।”

মহেন্দ্র আশার বেদনা বুঝিল, এবং কিছুদিনের জন্য কাশীতে সে তাহার মাসিমার কাছে যায়, ইহাতে তাহার সম্মতিও হইল। কিন্তু পুনর্বার কালেজ কামাই করিয়া আশাকে কাশী পৌঁছাইয়া দিতে তাহার দ্বিধা বোধ হইতে লাগিল।

আশা কহিল, “জেঠাইমা তো অল্পদিনের মধ্যেই কাশী যাইবেন, সেই সঙ্গে গেলে কি ক্ষতি আছে।”

মহেন্দ্র রাজলক্ষ্মীকে গিয়া কহিল, “মা, বউ একবার কাশীতে কাকীমাকে দেখিতে যাইতে চায়।”

রাজলক্ষ্মী শ্লেষবাক্যে কহিলেন, “বউ যাইতে চান তো অবশ্যই যাইবেন, যাও, তাঁহাকে লইয়া যাও।”

মহেন্দ্র যে আবার অন্নপূর্ণার কাছে যাতায়াত আরম্ভ করিল, ইহা রাজলক্ষ্মীর ভালো লাগে নাই। বধূর যাইবার প্রস্তাবে তিনি মনে মনে আরো বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।

মহেন্দ্র কহিল, “আমার কালেজ আছে, আমি রাখিতে যাইতে পারিব না। তাহার জেঠামশায়ের সঙ্গে যাইবে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে তো ভালো কথা। জেঠামশায়রা বড়োলোক, কখনো আমাদের মতো গরিবের ছায়া মাড়ান না, তাঁহাদের সঙ্গে যাইতে পারিলে কত গৌরব!”

মাতার উত্তরোত্তর শ্লেষবাক্যে মহেন্দ্রের মন একেবারে কঠিন হইয়া বাঁকিল। সে কোনো উত্তর না দিয়া আশাকে কাশী পাঠাইতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া চলিয়া গেল।

বিহারী যখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা করিতে আসিল, রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও বিহারী, শুনিয়াছিস, আমাদের বউমা যে কাশী যাইতে ইচ্ছা করিয়াছেন।”

বিহারী কহিল, “বল কী মা, মহিনদা আবার কালেজ কামাই করিয়া কাশী যাইবে?”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “না না, মহিন কেন যাইবেন। তা হইলে আর বিবিয়ানা হইল কই। মহিন এখানে থাকিবেন, বউ তাঁহার জেঠামহারাজের সঙ্গে কাশী যাইবেন। সবাই সাহেব-বিবি হইয়া উঠিল।”

বিহারী মনে মনে উদ্‌বিগ্ন হইল, বর্তমান কালের সাহেবিয়ানা স্মরণ করিয়া নহে। বিহারী ভাবিতে লাগিল, “ব্যাপারখানা কী। মহেন্দ্র যখন কাশী গেল আশা এখানে রহিল; আবার মহেন্দ্র যখন ফিরিল তখন আশা কাশী যাইতে চাহিতেছে। দুজনের মাঝখানে একটা কী গুরুতর ব্যাপার ঘটিয়াছে। এমন করিয়া কতদিন চলিবে? বন্ধু হইয়াও আমরা ইহার কোনো প্রতিকার করিতে পারিবে না– দূরে দাঁড়াইয়া থাকিব?’

মাতার ব্যবহারে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হইয়া মহেন্দ্র তাহার শয়নঘরে আসিয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী ইতিমধ্যে মহেন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নাই– তাই আশা তাহাকে পাশের ঘর হইতে মহেন্দ্রের কাছে লইয়া আসিবার জন্য অনুরোধ করিতেছিল।

এমন সময় বিহারী আসিয়া মহেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করিল, “আশা-বোঠানের কি কাশী যাওয়া স্থির হইয়াছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “না হইবে কেন। বাধাটা কী আছে।”

বিহারী কহিল, “বাধার কথা কে বলিতেছে। কিন্তু হঠাৎ এ খেয়াল তোমাদের মাথায় আসিল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “মাসিকে দেখিবার ইচ্ছা– প্রবাসী আত্মীয়ের জন্য ব্যাকুলতা, মানবচরিত্রে এমন মাঝে মাঝে ঘটিয়া থাকে।”

বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি সঙ্গে যাইতেছ?”

প্রশ্ন শুনিয়াই মহেন্দ্র ভাবিল, “জেঠার সঙ্গে আশাকে পাঠানো সংগত নহে, এই কথা লইয়া আলোচনা করিতে বিহারী আসিয়াছে।’ পাছে অধিক কথা বলিতে গেলে ক্রোধ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে, তাই সংক্ষেপে বলিল, “না।”

বিহারী মহেন্দ্রকে চিনিত। সে যে রাগিয়াছে, তাহা বিহারীর আগোচর ছিল না। একবার জিদ ধরিলে তাহাকে টলানো যায় না, তাহাও সে জানিত। তাই মহেন্দ্রের যাওয়ার কথা আর তুলিল না। মনে মনে ভাবিল, “বেচারা আশা যদি কোনো বেদনা বহন করিয়াই চলিয়া যাইতেছে হয়, তবে সঙ্গে বিনোদিনী গেলে তাহার সান্ত্বনা হইবে।’ তাই ধীরে ধীরে কহিল, “বিনোদ-বোঠান তাঁর সঙ্গে গেলে হয় না?”

মহেন্দ্র গর্জন করিয়া উঠিল, “বিহারী, তোমার মনের ভিতর যে-কথাটা আছে, তাহা স্পষ্ট করিয়া বলো। আমার সঙ্গে অসরলতা করিবার কোনো দরকার দেখি না। আমি জানি, তুমি মনে মনে সন্দেহ করিয়াছ, আমি বিনোদিনীকে ভালোবাসি। মিথ্যা কথা। আমি বাসি না। আমাকে রক্ষা করিবার জন্য তোমাকে পাহারা দিয়া বেড়াইতে হইবে না। তুমি এখন নিজেকে রক্ষা করো। যদি সরল বন্ধুত্ব তোমার মনে থাকিত, তবে বহুদিন আগে তুমি আমার কাছে তোমার মনের কথা বলিতে এবং নিজেকে বন্ধুর অন্তঃপুর হইতে বহু দূরে লইয়া যাইতে। আমি তোমার মুখের সামনে স্পষ্ট করিয়া বলিতেছি, তুমি আশাকে ভালোবাসিয়াছ।”

অত্যন্ত বেদনার স্থানে দুই পা দিয়া মাড়াইয়া দিলে, আহত ব্যক্তি মুহূর্তকাল বিচার না করিয়া আঘাতকারীকে যেমন সবলে ধাক্কা দিয়া ফেলিতে চেষ্টা করে–রুদ্ধকণ্ঠ বিহারী তেমনি পাংশুমুখে তাহার চৌকি হইতে উঠিয়া মহেন্দ্রের দিকে ধাবিত হইল–হঠাৎ থামিয়া বহুকষ্টে স্বর বাহির করিয়া কহিল, “ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করুন, আমি বিদায় হই।” বলিয়া টলিতে টলিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল!

পাশের ঘর হইতে বিনোদিনী ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, “বিহারী-ঠাকুরপো!”

বিহারী দেয়ালে ভর করিয়া একটুখানি হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “কী, বিনোদ-বোঠান!”

বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, চোখের বালির সঙ্গে আমিও কাশীতে যাইব।”

বিহারী কহিল, “না না, বোঠান, সে হইবে না, সে কিছুতেই হইবে না। তোমাকে মিনতি করিতেছি–আমার কথায় কিছুই করিয়ো না। আমি এখানকার কেহ নই, আমি এখানকার কিছুতেই হস্তক্ষেপ করিতে চাহি না, তাহাতে ভালো হইবে না। তুমি দেবী, তুমি যাহা ভালো বোধ কর, তাহাই করিয়ো। আমি চলিলাম।”

বলিয়া বিহারী বিনোদিনীকে বিনম্র নমস্কার করিয়া চলিল। বিনোদিনী কহিল, “আমি দেবী নই ঠাকুরপো, শুনিয়া যাও। তুমি চলিয়া গেলে কাহারো ভালো হইবে না। ইহার পরে আমাকে দোষ দিয়ো না।”

বিহারী চলিয়া গেল। মহেন্দ্র স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী তাহার প্রতি জ্বলন্ত বজ্রের মতো একটা কঠোর কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল, সে-ঘরে আশা একান্ত লজ্জায় সংকোচে মরিয়া যাইতেছিল। বিহারী তাহাকে ভালোবাসে, এ কথা মহেন্দ্রের মুখে শুনিয়া সে আর মুখ তুলিতে পারিতেছিল না। কিন্তু তাহার উপর বিনোদিনীর আর দয়া হইল না। আশা যদি তখন চোখ তুলিয়া চাহিত, তাহা হইলে সে ভয় পাইত। সমস্ত সংসারের উপর বিনোদিনীর যেন খুন চাপিয়া গেছে। মিথ্যা কথা বটে! বিনোদিনীকে কেহই ভালোবাসে না বটে! সকলেই ভালোবাসে এই লজ্জাবতী ননির পুতুলটিকে।

মহেন্দ্র সেই যে আবেগের মুখে বিহারীকে বলিয়াছিল, “আমি পাষণ্ড”–তাহার পর আবেগ শান্তির পর হইতে সেই হঠাৎ আত্মপ্রকাশের জন্য সে বিহারীর কাছে কুণ্ঠিত হইয়া ছিল। সে মনে করিতেছিল, তাহার সব কথাই যেন ব্যক্ত হইয়া গেছে। সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না, অথচ বিহারী জানিয়াছে যে সে ভালোবাসে–ইহাতে বিহারীর উপরে তাহার বড়ো একটা বিরক্তি জন্মিতেছিল। বিশেষত, তাহার পর হইতে যতবার বিহারী তাহার সম্মুখে আসিতেছিল তাহার মনে হইতেছিল, যেন বিহারী সকৌতূহলে তাহার একটা ভিতরকার কথা খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। সেই-সমস্ত বিরক্তি উত্তরোত্তর জমিতেছিল– আজ একটু আঘাতেই বাহির হইয়া পড়িল।

কিন্তু বিনোদিনী পাশের ঘর হইতে যেরূপ ব্যাকুলভাবে ছুটিয়া আসিল, যেরূপ আর্তকণ্ঠে বিহারীকে রাখিতে চেষ্টা করিল এবং বিহারীর আদেশ পালন স্বরূপে আশার সহিত কাশী যাইতে প্রস্তুত হইল, ইহা মহেন্দ্রের পক্ষে অভাবিতপূর্ব। এই দৃশ্যটি মহেন্দ্রকে প্রবল আঘাতে অভিভূত করিয়া দিল। সে বলিয়াছিল, সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না; কিন্তু যাহা শুনিল, যাহা দেখিল, তাহা তাহাকে সুস্থির হইতে দিল না, তাহাকে চারি দিক হইতে বিচিত্র আকারে পীড়ন করিতে লাগিল। আর কেবলই নিষ্ফল পরিতাপের সহিত মনে হইতে লাগিল, “বিনোদিনী শুনিয়াছে– আমি বলিয়াছি “আমি তাহাকে ভালোবাসি না’।’

punampntg

23

Although Annapurna had forsaken all ties to her home, she was overcome by her love for Mahendra and her happiness at seeing him after such a long time. She was also worried that he had come seeking support from her after quarrelling with his own mother over Asha. Since his childhood he had been in the habit of coming to his aunt whenever he was in strife or distressed. She had soothed his anger when he was upset with others and had taught him to put his pain aside when he was hurt by someone.

But the main reason behind the turmoil that affected Mahendra’s married life was something that she could not help with as she was indeed unable to provide any consolation. She had left home when it became clear to her that whatever her involvement in the matter, it would only serve to double the upheaval within the family. When a sick child cries for some water but the physician issues a strict order against it, the saddened mother must leave the room; Annapurna had gone away for much the same reason. She had largely managed to forget her old life by losing herself in the daily routine of prayers and religious activities and was worried that Mahendra had returned to talk of the conflict and reopen old wounds.

But Mahendra said nothing of his mother’s behavior with Asha. Annapurna then started to worry about something else. The man who had once been unable to attend classes as it would have meant leaving Asha alone was now in Kashi on his own to enquire after his aunt. Did this mean that his affection for Asha was lessening? She asked him with some trepidation. ‘Mahin, do tell me the truth, please! How is Chuni?’

Mahendra said, ‘She is fine Aunt.’

‘What does she do these days? Are you two still as immature as before, or have you started paying attention to the demands of daily life?’

Mahendra answered, ‘All childishness has been put aside. We cannot even find the old Charupath text that was at the root of all the problems. You will be pleased to know that Chuni devotes all her attention to neglecting her studies as wholeheartedly as any woman has ever done.’

‘What is Bihari doing?’

‘He is involved in everything but his own work; His employees look after his affairs but the nature of their vigilance is questionable. He has always been like that. He attends to the business of others while others attend to his affairs.’

Annapurna asked, ‘Does he not wish to get married?’

Mahendra smiled slightly and said, ‘I cannot say there are any signs of that.’

Annapurna was saddened to hear this. She understood that Bihari had once been eager about marriage after seeing her niece Asha but that wish had been thwarted wrongfully and abruptly. He had said to her, ‘Aunt, never ask me to marry someone again.’ She remembered his great pain. Although she loved Bihari she had left without providing him any solace during his disappointment over Asha. Annapurna became very unhappy and worried as she wondered whether Bihari was still in love with Asha.

Mahendra gradually divulged the details of his life with Asha in Kolkata, sometimes jokingly and at other times in all seriousness. He never mentioned Binodini.

His classes had begun and he should have not been able to stay in Kashi for very long. But after each day with Annapurna, he felt the pleasure that one feels after moving to a pleasant locale after suffering from severe illness. The days passed quickly. The inner conflict that he had once suffered was now gone. After spending all his time over a few days with the pious, gentle Annapurna he felt that the responsibilities of family life were so easy and pleasant that his former fears seemed laughable. He began to think of Binodini as unimportant. He could not even remember her face clearly when he tried. Eventually he told himself with complete convicton, ‘I do not think that it would be possible for anyone to dethrone Asha from where she rules within my heart.’

Mahendra said to Annapurna, ‘Aunt, I will have to leave Kashi soon as I am missing classes. But even though you have left family life behind, please give me permission to come and see you occasionally.’

When Mahendra came home and gave Asha the vermilion container and white stone pitcher her aunt had sent for her as gifts, she began to weep. Her heart was pained by memories of her aunt’s loving patience and the misbehavior meted out to her both by the two of them and by her mother-in-law. She asked her husband, ‘I really wish I could go and ask her for her forgiveness. Is that possible at all?’

Mahendra understood her pain and agreed to her visiting her aunt for a few days in Kashi. But he was not keen about missing classes again by accompanying her.

Asha asked, ‘My aunt is going to Kashi soon, what harm in going with her?’

Mahendra went to Rajlakshmi and said, ‘Ma, my wife wishes to go and see her aunt in Kashi.’

Rajlakshmi answered sarcastically, ‘If she has wished this, then of course she must go; do take her.’

She was not pleased that Mahendra had started seeing his aunt Annapurna again. She became even more annoyed when she heard that her daughter-in-law was thinking of visiting the aunt as well.

Mahendra said, ‘I have classes and will not be able to take her. She will have to go with her uncle.’

Rajlakshmi answered, ‘That is great. They are wealthy enough to never condescend to visiting us, so going with them will be a great honour indeed.’

Mahendra’s resolve was hardened by the sharp words from his mother. He said no more and determined to send Asha to Kashi as he left Rajlakshmi’s presence.

When Bihari came to see Rajlakshmi, she said, ‘Have you heard, our daughter-in-law has expressed a desire to go to Kashi?’

Bihari replied, ‘What! Is Mahendra going to take time off classes again to take her there?’

Rajlakshmi answered, ‘No, why should Mahen go? That would not be outrageous enough, would it? He will stay here and she will go with her uncle the Great. Everyone has become so modern these days.’

Bihari became concerned, although not because of the incursions of modernity. He thought, ‘What is going on? Asha stayed here while Mahendra took off for Kashi; now that he is back, she wants to go there. Something seriously wrong has happened between the two of them. How long can this go on for? As a friend am I supposed to stand by doing nothing and just watch from afar?’

Mahendra was sitting in his bedroom feeling extremely upset with his mother. Binodini had not seen him after his arrival and Asha was next door trying to convince her to join the two of them.

Bihari came in and said, ‘Is it certain that your wife is going to Kashi?’

Mahendra asked, ‘Why not? What is stopping her?’

Bihari said, ‘I did not say anyone was stopping her from going. But why now?’

Mahendra answered, ‘She wishes to see her aunt – people do sometimes feel that they would be happy to see relatives living elsewhere.’

Bihari persisted, ‘Are you going with her?’

As soon as Mahendra heard the question he thought, ‘Bihari is here to convince me that Asha should not be sent to Kashi with her uncle.’ He wished to prevent a prolonged discussion and simply said, ‘No.’

Bihari knew Mahendra well. He realised that Mahendra was angry and that it was impossible to change his mind once he had decided on doing something. He did not raise the topic of Mahendra accompanying Asha. He thought to himself, ‘If the wretched Asha is going with a sad heart, Binodini could accompany her as a consolation.’ He then said softly, ‘Would it be possible for Binodini to go with her?’

Mahendra shouted, ‘Bihari, you have to disclose what is in your mind. I see no reason for you to tell me lies. I know that you suspect me of loving Binodini. That is not true! I do not love her. You do not have to be with me constantly in order to protect me. You should save yourself. If you had genuine feelings of friendship for me you could have told me the truth a long time ago and done the honourable thing by removing yourself from our household. I am telling you what you cannot bring yourself to utter, you have fallen in love with Asha.’

Just as a person with an injury does not think for a moment before pushing away someone trying to hurt them, dumbstruck, Bihari quickly rose, moved towards Mahendra as if to strike him; and then came to his senses, saying, ‘May god forgive you, I am leaving now.’ He then walked unsteadily out of the room.

Binodini hurriedly came from next door and called, ‘Bihari!’

Bihari leaned against the wall and smiled wanly, saying, ‘What?’

Binodini said, ‘Brother, I will go to Kashi too with Bali.’

Bihari said, ‘No, sister, that cannot be! I am pleading with you – do not listen to anything I say. I am no one to these people; I do not wish to interfere in any of their business. That can only end in unhappiness. You are a goddess; do whatever you think is right. I am leaving.’

As Bihari folded his hands in a gentle greeting to Binodini and prepared to leave, she said, ‘Listen brother, I am no goddess. If you leave it will not bode well for anyone. Do not blame me for anything after this.’

Bihari went away. Mahendra sat in stunned silence. Binodini looked at him furiously, her eyes flashing like lightning before going next door where Asha was cringing in shame and despair. She could not look at Mahendra after hearing him say that Bihari loved her. But Binodini did not feel the slightest compassion for her. If Asha had looked up at Binodini she would have been frightened as Binodini looked ready to murder someone. Lies indeed! No one loved Binodini! They all loved this shy timid doll-like creature.

Now that he was calmer, Mahendra was mortified that he had bared his soul to Bihari in an emotional outburst when he prided himself on being made of stone. He felt that all his thoughts had been disclosed with that one action. He did not love Binodini and yet the fact that Bihari knew that he did made him dislike Bihari greatly. In particular ,every time the two had met since that day Mahendra felt as though Bihari had been amusing himself by trying to discover his innermost secrets. These aggravations had been accumulating and erupted today with very slight provocation.

But the manner in which Binodini came rushing anxiously from the other room, the pleas with which she tried to prevent Bihari from leaving and her agreement to Bihari’s order to accompany Asha to Kashi astonished Mahendra as he had not anticipated this. He was very affected when he thought of how he had declared that he did not love her; but what he saw and heard made him restless and bothered him with a hundred unexplained thoughts. All he could think of with a sense of hopelessness was, ‘Binodini has heard me say…I do not love her.’