কর্তার ভূত/ Kortar Bhuth/ The Master’s Ghost

কর্তার ভূত

বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠল, ‘তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে।’

শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাবলে, ‘আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে।’

তা ব’লে মরণ তো এড়াবার জো নেই। তবু দেবতা দয়া করে বললেন, ‘ভাবনা কী। লোকটা ভূত হয়েই এদের ঘাড়ে চেপে থাক্‌-না। মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের তো মৃত্যু নেই।’

দেশের লোক ভারি নিশ্চিন্ত হল।

কেননা ভবিষ্যৎকে মানলেই তার জন্যে যত ভাবনা, ভূতকে মানলে কোনো ভাবনাই নেই; সকল ভাবনা ভূতের মাথায় চাপে। অথচ তার মাথা নেই, সুতরাং কারো জন্যে মাথাব্যথাও নেই।

তবু স্বভাবদোষে যারা নিজের ভাবনা নিজে ভাবতে যায় তারা খায় ভূতের কানমলা। সেই কানমলা না যায় ছাড়ানো, তার থেকে না যায় পালানো, তার বিরুদ্ধে না চলে নালিশ, তার সম্বন্ধে না আছে বিচার।

দেশসুদ্ধ লোক ভূতগ্রস্ত হয়ে চোখ বুজে চলে। দেশের তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেন, ‘এই চোখ বুজে চলাই হচ্ছে জগতের সবচেয়ে আদিম চলা। একেই বলে অদৃষ্টের চালে চলা। সৃষ্টির প্রথম চক্ষুহীন কীটাণুরা এই চলা চলত; ঘাসের মধ্যে, গাছের মধ্যে, আজও এই চলার আভাস প্রচলিত।’

শুনে ভূতগ্রস্ত দেশ আপন আদিম আভিজাত্য অনুভব করে। তাতে অত্যন্ত আনন্দ পায়।

ভূতের নায়েব ভুতুড়ে জেলখানার দারোগা। সেই জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না। এইজন্যে ভেবে পাওয়া যায় না, সেটাকে ফুটো করে কী উপায়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।

এই জেলখানায় যে ঘানি নিরন্তর ঘোরাতে হয় তার থেকে এক ছটাক তেল বেরোয় না যা হাটে বিকোতে পারে, বেরোবার মধ্যে বেরিয়ে যায় মানুষের তেজ। সেই তেজ বেরিয়ে গেলে মানুষ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তাতে করে ভূতের রাজত্বে আর কিচ্ছুই না থাক্‌–অন্ন হোক, বস্ত্র হোক, স্বাস্থ্য হোক– শান্তি থাকে।

কত-যে শান্তি তার একটা দৃষ্টান্ত এই যে, অন্য সব দেশে ভূতের বাড়াবাড়ি হলেই মানুষ অস্থির হয়ে ওঝার খোঁজ করে। এখানে সে চিন্তাই নেই। কেননা ওঝাকেই আগেভাগে ভূতে পেয়ে বসেছে।

এই ভাবেই দিন চলত, ভূতশাসনতন্ত্র নিয়ে কারো মনে দ্বিধা জাগত না; চিরকালই গর্ব করতে পারত যে, এদের ভবিষ্যৎটা পোষা ভেড়ার মতো ভূতের খোঁটায় বাঁধা, সে ভবিষ্যৎ ভ্যা’ও করে না, ম্যা’ও করে না, চুপ করে পড়ে থাকে মাটিতে, যেন একেবারে চিরকালের মতো মাটি।

কেবল অতি সামান্য একটা কারণে একটু মুশকিল বাধল। সেটা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোকে ভূতে পায় নি। তাই অন্য সব দেশে যত ঘানি ঘোরে তার থেকে তেল বেরোয় তাদের ভবিষ্যতের রথচক্রটাকে সচল করে রাখবার জন্যে,বুকের রক্ত পিষে ভূতের খর্পরে ঢেলে দেবার জন্যে নয়। কাজেই মানুষ সেখানে একেবারে জুড়িয়ে যায় নি। তারা ভয়ংকর সজাগ আছে।

এ দিকে দিব্যি ঠাণ্ডায় ভূতের রাজ্য জুড়ে ‘খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো’।

সেটা খোকার পক্ষে আরামের, খোকার অভিভাবকের পক্ষেও; আর পাড়ার কথা তো বলাই আছে।

কিন্তু, ‘বর্গি এল দেশে’।

নইলে ছন্দ মেলে না, ইতিহাসের পদটা খোঁড়া হয়েই থাকে।

দেশে যত শিরোমণি চূড়ামণি আছে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা গেল, ‘এমন হল কেন।’

তারা এক বাক্যে শিখা নেড়ে বললে, ‘এটা ভূতের দোষ নয়, ভুতুড়ে দেশের দোষ নয়, একমাত্র বর্গিরই দোষ। বর্গি আসে কেন।’

শুনে সকলেই বললে, ‘তা তো বটেই।’ অত্যন্ত সান্ত্বনা বোধ করলে।

দোষ যারই থাক্‌, খিড়কির আনাচে-কানাচে ঘোরে ভূতের পেয়াদা, আর সদরের রাস্তায়-ঘাটে ঘোরে অভূতের পেয়াদা; ঘরে গেরস্তর টেঁকা দায়, ঘর থেকে বেরোবারও পথ নেই। এক দিক থেকে এ হাঁকে, ‘খাজনা দাও।’ আর-এক দিক থেকে ও হাঁকে, ‘খাজনা দাও।’

এখন কথাটা দাঁড়িয়েছে, ‘খাজনা দেব কিসে’।

এতকাল উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের বুলবুলি এসে বেবাক ধান খেয়ে গেল, কারো হুঁস ছিল না। জগতে যারা হুঁশিয়ার এরা তাদের কাছে ঘেঁষতে চায় না, পাছে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। কিন্তু তারা অকস্মাৎ এদের অত্যন্ত কাছে ঘেঁষে, এবং প্রায়শ্চিতও করে না। শিরোমণি-চূড়ামণির দল পুঁথি খুলে বলেন, ‘বেহুঁশ যারা তারাই পবিত্র, হুঁশিয়ার যারা তারাই অশুচি, অতএব হুঁশিয়ারদের প্রতি উদাসীন থেকো, প্রবুদ্ধমিব সুপ্তঃ।’

শুনে সকলের অত্যন্ত আনন্দ হয়।

কিন্তু, তৎসত্ত্বেও এ প্রশ্নকে ঠেকানো যায় না, ‘খাজনা দেব কিসে’।

শ্মশান থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হাহা ক’রে তার উত্তর আসে, ‘আব্রু দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।’

প্রশ্নমাত্রেরই দোষ এই যে, যখন আসে একা আসে না। তাই আরও একটা প্রশ্ন উঠে পড়েছে, ‘ভূতের শাসনটাই কি অনন্তকাল চলবে।’

শুনে ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি আর মাসতুতো-পিসতুতোর দল কানে হাত দিয়ে বলে, ‘কী সর্বনাশ। এমন প্রশ্ন তো বাপের জন্মে শুনি নি। তা হলে সনাতন ঘুমের কী হবে– সেই আদিমতম, সকল জাগরণের চেয়ে প্রাচীনতম ঘুমের?’

প্রশ্নকারী বলে, ‘সে তো বুঝলুম, কিন্তু আধুনিকতম বুলবুলির ঝাঁক আর উপস্থিততম বর্গির দল, এদের কী করা যায়।’

মাসিপিসি বলে, ‘বুলবুলির ঝাঁককে কৃষ্ণনাম শোনাব, আর বর্গির দলকেও।’

অর্বাচীনেরা উদ্ধত হয়ে বলে ওঠে, ‘যেমন করে পারি ভূত ছাড়াব।’

ভূতের নায়েব চোখ পাকিয়ে বলে, ‘চুপ। এখনো ঘানি অচল হয় নি।’

শুনে দেশের খোকা নিস্তব্ধ হয়, তার পরে পাশ ফিরে শোয়।

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, বুড়ো কর্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না, অথচ ছাড়েও না।

দেশের মধ্যে দুটো-একটা মানুষ, যারা দিনের বেলা নায়েবের ভয়ে কথা কয় না, তারা গভীর রাত্রে হাত জোড় করে বলে, ‘কর্তা, এখনো কি ছাড়বার সময় হয় নি।’

কর্তা বলেন, ‘ওরে অবোধ, আমার ধরাও নেই, ছাড়াও নেই, তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।’

তারা বলে, ‘ভয় করে যে, কর্তা।’

কর্তা বলেন, ‘সেইখানেই তো ভূত।’

THE MASTER’S GHOSTlot-23-tagore-untitled-four-figures

1

When the old master was on his deathbed everyone through the land said, ‘What will happen to us if you go?’

He felt sad too. He thought, ‘Who is going to keep the peace when I am gone?’

But death does not listen to these excuses. But God weakened somewhat and said, ‘I see no problem in letting him hang around as a ghost for a while. After all, they never die!’

2

His countrymen were all very relieved.

Every sort of problem arises when one believes in the future, but nothing can bother you if you believe in ghosts; they worry about everything on your behalf. But since they have no heads to speak of, they never suffer from headaches from worrying too much.

There were still those who tried to do their own worrying. They had their ears thoroughly boxed by the ghost. It is not easy to escape that grasp as one can neither outrun a ghost nor complain to anyone about what no one else can see.

The whole country walked about under the shadow of the ghost with their eyes shut to the world. The philosophers said, ‘This is the best way to live, with your eyes closed. One lets Fate take its course. This is how the blind organisms used to move around in the grasses and in the trees. That is why it is so easily adopted again.

This makes the spellbound people feel rather proud and happy about their ancient lineage.

The ghost’s prime minister was the jailer of his ghostly prison. As the walls of this prison were invisible the prisoners could never figure out how to escape.

The wheels continually turn in the mill inside the jail, but the only thing that is worn down is the strength in the people. When the strength is all gone, people calm down. This ensures that even though there may be no food, clothes or health in the ghostly kingdom, there is always lots of peace.

You will understand how much peace when I tell you that while in every other land people send for an exorcist when they are tormented by ghosts, here the exorcist is already under the ghost’s spell.

3

Things would have gone this way happily enough without people ever doubting the rule of the ghost. They would have been proud of the fact that their futures were destined to be as uneventful as a tethered pet goat’s, with neither bleat nor shake of horns.

But a problem still came about because one tiny, miniscule detail. See, no one had thought to think of the fact that all the other countries in the world were not in some ghostly grip. All the wheels of progress turned in those countries in the direction of the future and not to wear down the people’s will. There the people had not fallen under a spell; there they were all terribly alert.

4

In the kingdom of the ghost, all was quiet and people slept as soundly as babies, complacent that nothing would ever happen.

That is possibly good for babies, and possibly even for their mothers and definitely for the neighbours.

But something did happen. Invaders stormed the land.

It was bound to happen, or the stories that make up our history would be incomplete.

All the wise men were asked one by one, ‘Why did this happen?’

They shook their heads sagely and said, ‘This is no fault of the ghost, this is no fault of ours, it is all the invaders’ fault.’

This was extremely comforting to everyone else. They agreed gravely that it was good to be held blameless.

But even though it was not clear whose fault it really was, the houses were filled with guards belonging to the ghost and the streets were filled with the invaders; it was hard to go out and it was just as hard to stay at home in peace for fear of being asked to pay taxes.

But how would they pay their taxes?

All year round the birds had come from the north, the south, the east and the west to eat the grain in the fields, but no one had paid the slightest heed. These creatures never rob the people who are alert, for fear of being punished. The wise men looked at their books and said, ‘The unheeding are blessed, while the alert are unclean, therefore we must keep away from them at all times.’

Everyone was filled with happiness upon hearing this.

5

But despite everything one cannot stop the question, ‘How will we pay our taxes?’

The answer blows in the wind, from graveyard and killing fields it comes, ‘With pride, with respect, with blood!’

The problem with questions is that they never come alone. One follows another, ‘Will these ghouls rule over us forever?’

When this reaches Mother Goose and all her children, they quickly cover their ears and say, ‘What ever next! We have never heard such questions, such curiosity. What then of that ancient sleep – the one that was there before anyone had needed to wake up?’

Says the one with the questions, ‘I understand, but then do we do with these, these most enlightened of birds and the most recently arrived robbers, what of them?’

Mother Goose says, ‘I will read them a few of my stories, it should do for both bird and bandit.’

The young and the impatient stir up and say impatiently, ‘We will get rid of them in any way we choose.’

The chief minister stares angrily and said, ‘Shut up! The wheels of my government still turn, you know!’

This makes the innocents fall silent and soon go back to sleep.

6

The main thing is that the old master remains, neither living nor dead, but like a ghost. He has nothing to say about the land but he does not leave it either.

There were a few people there who could not speak during the day for fear of the guards; they came to him in the darkness of night and said with the utmost respect, ‘Master, should you not be going now?’

He said, ‘You fools, I can neither leave, nor stay, I can escape only if you people let me.’

They said, ‘But we are afraid!’

The master said, ‘And that fear is the very place where the ghosts will live.’