নিঃস্বার্থ প্রেম / Selfless Love Part 1

নিঃস্বার্থ প্রেম

দেখো ভাই, সেদিন আমার বাস্তবিক কষ্ট হয়েছিল। অনেকদিন পরে তুমি বিদেশ থেকে এলে;  আমরা গিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম। “আমাদের কি মনে পড়ত?’ তুমি ঠোঁটে একটু হাসি, চোখে একটু ভ্রূকুটি করে বললে, “মনে পড়বে না কেন? উত্তরটা শুনেই তো আমার মাথায় একেবারে বজ্রাঘাত হল; নিতান্ত দুঃসাহসে ভর করে সংকুচিত স্বরে আর-একবার জিজ্ঞাসা করলুম, “অনেক দিন পরে এসে আমাদের কেমন লাগছে।?’ তুমি আশ্চর্য ও বিরক্তিময় স্বরে অথচ ভদ্রতার মিষ্টহাসিটুকু রেখে বললে, “কেন, খারাপ লাগবার কী কারণ আছে?’ আর সাহস হল না। ও-রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা আর হল না। বিদেশে গিয়ে অবধি তুমি আমাকে দু-তিনখানা বৈ চিঠি লেখ নি, সেজন্য আমার মনে মনে একটুখানি অভিমান ছিল। বড়ো সাধ ছিল, সেই কথাটা নিয়ে হেসে হেসে অথচ আন্তরিক কষ্টের সঙ্গে, ঠাট্টা করে অথচ গম্ভীরভাবে একটুখানি খোঁটা দেব’, কিন্তু তোমার ভাব দেখে, তোমার ভদ্রতার অতিমিষ্ট হাসি দেখে তোমার কথার স্বর শুনে আমার অভিমানের মূল পর্যন্ত শুকিয়ে গেল। তখন আমিও প্রশ্নের ভাব পরিবর্তন করলুম। জিজ্ঞাসা করলুম, “যে দেশে গিয়েছিল সে দেশের জল-বাতাস নাকি বড়ো গরম? সে দেশের লোকেরা নাকি মস্ত মস্ত পাগড়ি পরে, আর তামাক খাওয়াকে ভারি পাপ মনে করে? এখান থেকে সেকেণ্ড ক্লাসে সেখেনে যেতে কত ভাড়া লাগে?’ এইরকম করে তোমার কাছ থেকে সেদিন অনেক জ্ঞান লাভ করে বাড়ি ফিরে এয়েছিলুম! তোমার আচরণ দেখে দুঃখ প্রকাশ করেছিলুম শুনে তুমি লিখেছ যে, “প্রথমত আমার যতদূর মনে পড়ে তাতে আমি যে তোমার ওপর কোনো প্রকার কুব্যবহার করেছিলুম, তা তো মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, যদি-বা তোমার কতকগুলি প্রশ্নের ভালোরকম উত্তর না দিয়ে দু-চার কথা বলে উড়িয়ে দিয়ে থাকি, তাতেই বা আমার দোষ কী? সে রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবারই বা তোমার কি আবশ্যক ছিল?’ তোমার প্রথম কথার কোনো উত্তর দেওয়া যায় না। সত্যই তো, তুমি আমার সঙ্গে কোনো কু-ব্যবহারই কর নি। যতগুলি কথা জিজ্ঞাসা করেছিলুম, সকলগুলিরই তুমি একটা-না-একটা উত্তর দিয়েছিলে, তা ছাড়া হেসেও ছিলে, গল্পও করেছিলে। তোমার কোনোরকম দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু তবু তুমি আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর নি; সে তোমাকে বা আর কাউকে আমি বোঝাতে পারব না সুতরাং তার আর বাহুল্য উল্লেখ করব না। দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে, কেন তোমাকে ও-রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলুম। আচ্ছা ভাই তোমার তো হৃদয় আছে, একবার তুমিই বিবেচনা করে দেখো না– কেন জিজ্ঞাসা করেছিলুম। তোমার ভালোবাসার উপর সন্দেহ হয়েছিল বলেই কি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, যে, “আমাদের কি মনে পড়ত’ কিংবা “আমাদের কি ভালো লাগছে’, না তোমার ভালোবাসার ওপর সন্দেহ তিলমাত্র ছিল না বলেই জিজ্ঞাসা করেছুলম? যদি স্বপ্নেও জানতুম যে, আমাকে তোমার মনে পড়ত না, কিংবা আমাকে তোমার ভালো লাগছে না, তা হলে কী ও-রকমের কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতুম। তোমার মুখে শোনবার ভারি ইচ্ছা ছিল যে, বিদেশে আমাকে তোমার প্রায়ই মনে পড়ত। কেবলমাত্র ওই কথাটুকু নয়, ওই কথা থেকে তোমার আরও কত কথা মনে আসত। আমার বড়ো ইচ্ছা ছিল যে, তুমি বলবে– “অমুক জায়গায় আমি একটি সুন্দর উপত্যকা দেখলুম; সেখেনে একটি নির্ঝর বয়ে যাচ্ছিল, জায়গাটা দেখেই মনে হল, আহা ভা– যদি এখানে থাকত তা হলে তার বড়ো ভালো লাগত!’ একটা ছোটো প্রশ্ন থেকে এইরকম কত উত্তরই শুনতে পাবার সম্ভাবনা ছিল। যখন প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করেছিলুম তখন মনের ভিতর এইরকম অনেক কথা চাপা ছিল!

আমি তোমার কাছে দুঃখ করবার জন্যে এ চিঠিটা লিখছি নে; কিংবা তোমার কাছে অভিমান করাও আমার উদ্দেশ্য নয়! আমি ভাই, কোনো কোনো লোকের মতো ঢাক ঢোল বাজিয়ে অভিমান করতে পারি নে; যার প্রতি অভিমান করেছি, তার কাছে গিয়ে “ওগো আমি অভিমান করেছি গো, আমি অভিমান করেছি’ বলে হাঁকাহাঁকি করতেও ভালোবাসি নে। যদি আমি অভিমান করি তো সে মনে মনে। আমার অভিমানের অশ্রু কেউ কখনো দেখতে পায় না, আমার অভিমানের কথাও কেউ কখনো শোনে নি; অভিমান আমার কাছে এমনই গোপনের সামগ্রী। তাই বলছি তোমার কাছে আজ অমি অভিমান করতে বসি নি। তোমার সঙ্গে আমার কতকগুলি তর্ক আছে, তার মীমাংসা করতে আমার ভারি ইচ্ছে।

তোমার সমস্ত চিঠিটার ভাব দেখে এই মনে হল যে তোমার মতে যারা নিঃস্বার্থ ভালোবাসে তারা আর ভালোবাসা ফেরত পাবার আশা করে না। যেখানে ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা পাবার আশা আছে সেইখানেই স্বার্থপরতা আছে। এ সম্বন্ধে তোমাকে একটি কথা বলি শোনো। আমরা অনেক সময়ে ভালো করে অর্থ না বুঝে অনেক কথা ব্যবহার করে থাকি। মুখে মুখে কথাগুলো এমন চলিত, এমন পুরোনো , হয়ে যায় যে, সেগুলো আমরা কানে শুনি বটে কিন্তু মনে বুঝি নে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কথাটাও বোধ করি সেইরকম একটা কিছু হবে। যখন আমরা শুনে যাই তখন আমরা কিছুই বুঝি নে, একটু পীড়াপীড়ি করে বোঝাতে বললে হয়তো দশজনে দশ রকম ব্যাখ্যা করি। স্বার্থপরতা কথা সচরাচর আমরা কী অর্থে ব্যবহার করে থাকি? আহার করা বা স্নান করাকে কি স্বার্থপরতা অতএব নিন্দনীয় বলে? আহার না করা বা স্নান না করাকে কি নিঃস্বার্থপরতা অতএব প্রশংসনীয় বলে? মূল অর্থ ধরতে গেলে আহার বা স্নান করাকে স্বার্থপরতা বলা যায় বৈকি? কিন্তু চলিত অর্থে তাকে স্বার্থপরতা বলে না। সকল মানুষই মনে মনে এমন সামঞ্জস্যবাদী, যে, যখন বলা হল যে, “আহার করা ভালো’ তখন কেউ এমন বোঝেন না, বিরাম বিশ্রাম না দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছাব্বিশ ঘণ্টাই আহার করা ভালো। তেমনি যখন আমরা স্বার্থপরতা কথা ব্যবহার করি, তখন কেউ মনে করে না যে, নিশ্বাস গ্রহণ করা স্বার্থপরতা বা বাতাস খাওয়া স্বার্থপরতা। যা-কিছু পঙ্কজ তাকে যেমন পঙ্কজ বলে না, যা কিছু অচল তাকে যেমন অচল বলে না, তেমনি যা-কিছু স্বার্থপরতা তাকেই স্বার্থপরতা বলে না। খাওয়াদাওয়াকে স্বার্থপরতা বলে না, কিন্তু যে ব্যক্তি কেবলমাত্র খাওয়াদাওয়া করে আর কিছু করে না, কিংবা যার খাওয়াদাওয়াই বেশি, পরের জন্য কোনো কাজ অতি যৎসামান্য, তাকে স্বার্থপর বলা যায়। আবার তার চেয়ে স্বার্থপর হচ্ছে যারা পরের মুখের গ্রাস কেড়ে নিজে খায়। এ ছাড়া আর কোনো অর্থে, কোনো ভাবে স্বার্থপর কথা ব্যবহার করা হয় না। তা যদি হয় তা হলে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বলতে কী বুঝায়? যদি মূল অর্থ ধর তাহলে ভালোবাসC স্বার্থপরতা। যখন এক জনকে দেখতে ভালো লাগে, তার কথা শুনতে ভালো লাগে, তার কাছে থাকতে ভালো লাগে ও সেইসঙ্গে সঙ্গে তাকে না দেখলে, তার কথা না শুনলে ও তার কাছে না থাকলে কষ্ট হয়, তার সুখ হলে আমি সুখী হই, তার দুঃখ হলে আম দুঃখী হই, তখন অতগুলো ভাবের সম্মিলনকেই ভালোবাসা বলে। ভালোবাসার আর-একাট উপাদান হচ্ছে, সে আমাকে ভালো বাসুক, অর্থাৎ তার চোখে আমি সর্বাংশে প্রীতিজনক হই এই বাসনা। ভেবে দেখতে গেলে এর মধ্যে সকলগুলিই স্বার্থপরতা। এতগুলি স্বার্থপরতার সমষ্টি থেকে একটি স্বার্থপরতা বাদ দিলেই কি বাকিটুকু নিঃস্বার্থ হয়ে দাঁড়ায়? কিন্তু যেটিকে বাদ দেওয়া হল সেটি অন্যান্যগুলির চেয়ে কী এমন বেশি অপরাধ করেছে? তা ছাড়া এর মধ্যে কোনোটাকেই বাদ দেওয়া যায় না। এর একটি যখন নেই তখন বোঝা গেল যে, যথার্থ ভালোবাসাই নেই। যাকে তোমার  দেখতে ভালো লাগে না, যার কথা শুনতে ইচ্ছে করে না, যার কাছে থাকতে মন যায় না তাকে যদি ভালোবাসা সম্ভব হয় তা হলেই যার ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে না তাকে ভালোবাসাও সম্ভব হয়। যাকে দেখতে শুনতে ও যার কাছে থাকতে ভালো লাগে, কোনো কোনো ব্যক্তি দুদিন তাকে দেখতে শুনতে না পেলে ও তার কাছে না থাকলে তাকে ভুলে যায় ও তার ওপর থেকে তার ভালোবাসা চলে যায়, তেমনি আবার যার ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে তার ভালোবাসা না পেলেই কোনো কোনো ব্যক্তির ভালোবাসা তার কাছ থেকে দূর হয়; তাদের সম্বন্ধে এই বলা যায় যে, তাদের গভীররূপে ভালোবাসার ক্ষমতা নেই।

****

SELFLESS LOVE

My friend, you know I was really quite pained the other day. You returned from overseas after a long time; we went and asked,’Did you often think of us?’ You kept a little smile on your lips and a little frown about your eyes as you answered, ‘Why wouldn’t I?’ The answer filled me with immediate dread; but I still persisted bravely and asked in a small voice, ‘How do you feel. seeing us after all this time?’ You answered in an amazed but irritated tone, all the while with that polite smile in place, ‘Why? Why should I dislike you?’ I did not dare to go any further. I could not ask any more of those questions. I had a felt little disappointed because you never wrote more than two or three letters to me from overseas. I had greatly hoped to be able to raise the topic, tempering it with laughter but genuine sadness, to jest a little but also to make  the pain I felt clear to you. But your manner, your polite, excessively sweet smile and the tone of your voice made that disappointment wither right away. I also changed the questions I was going to ask. I asked questions such as, ‘Is it true that the land you visited is very hot? Apparently the people there wear huge turbans and have restrictions on the use of tobacco? How much does a second class fare cost from here to there?’ I gained much knowledge from you through these questions and came home. When you heard that I was hurt by your behaviour you wrote, ‘Firstly I do not recall having behaved badly with you. Secondly, if I did ignore some of your questions and talk about other things, what is wrong with that? Why did you have to ask those questions?’ I have nothing to say to your first comment. Truly, you did not treat me badly. You answered all the questions I asked in a manner of speaking and you also smiled and chatted. You cannot be blamed. Yet you did not behave well with me; I will not be able to convince you or anyone else of that so I will not mention it. Secondly, why was it that I asked those questions? Well, you have a soul, why do you not think about why I might have done that. Did I ask you, ‘Did you think of us?’ or ‘How do you like us now?’, only because I suspected the strength of your affections or because I had not the tiniest doubt about your love. If I had imagined even in my dreams that you did not think of me or that you did not like me, would I have asked that question? I wanted so much to hear that you remembered me often while you were away. Not just that, so many other things would have been remembered as a result. I had wanted so much that you woul have said, ‘I saw a beautiful valley in a certain place; there was a waterfall there and when I saw the place I immediately thought, if only Bha_ had been here, he would have truly loved the place!’ One little question could have led to the possibility of so many answers. These were the things that were hidden in my mind when I had asked the questions.

I am not writing to you to express my sadness; nor is it my aim to manipulate you with my disappointment. I cannot make a show out of these feelings like some people do; I do not like going to the person against whom I have a grievance and create an uproar over my disappointment.

If I am disappointed that is all internal. My disappointment is such a private matter that no one has ever seen my tears of angst or heard my words of pain;  That is why I am telling you I am not here for recriminations. I have a few points to resolve with you and I am keen to do that.

The tone of your entire letter makes me think that those who love selflessly like you never hope for any love in return. Wherever love is expected in return for love, there is selfishness. Let me say something to you about this. We often use many words without understanding their meanings. The words become so ordinary, so jaded, that we hear them but we do not understand them with our minds, I think selfless love is one of those phrases too. When we hear it we understand nothing, when pressed for the meaning we end up with different meanings from different people. How do we use the word selfishness usually? Are feeding or bathing acts of selfishness and thus worth censure? Should abstaining from feeding or bathing be thus considered praiseworthy? If you think of the true meaning, feeding and bathing are both acts of selfishness. But we do not call them selfish acts in day to day speech. Every human is so uniform in their way of thinking that when they hear it said that ‘Feeding is good’, no one understands it to mean that one must feed all through the twenty four hours of the day. Similarly when we use the word selfishness, no one thinks that breathing is selfishness or going for some fresh air is selfishness.  Just as not everything born in mud is not a lotus and not every un-moving object is a mountain, not every kind of selfishness is not to described as selfish. Eating itself is not selfish, but the person who only eats at the exclusion of other activities or the one who eats in excess and does little for others; such a person is selfish. Even more selfish than this is the individual who snatches another’s food for himself. This is the only manner in which the word selfish is used. If this is true, then what is selfless love? If one thinks of its true meaning love is also a selfish act. When we like to see someone, hear their words, be near them and at the same time feel bad if we cannot see them, hear their words and be near them; when we are happy at their happiness and saddened by their sorrow, when all these feelings come together, it is love. Another ingredient of love is the other person should love me, which means that I should be pleasing in every way to them. And thus, all of these become imbued with selfishness. Does the act become unselfish as soon as one of the components is removed? But how is one of the many things to be blamed more than the others? In any case, nothing can be left out. Removing any one makes this less than true love. If you do not like seeing someone, nor like hearing their words, nor wish to be near them at all times – if it is still possible to love that person then it is also possible to love the person whose love we do not crave.  When one likes to see and be near someone, but forgets them if they do not see or hear them for a short period of absence and stop loving them, or stop loving the object of their affections simply because they do not love one back, it can be safely said that they are incapable of loving deeply.