ভাইফোঁটা/Bhai phnota/ Brotherly Love

ভাইফোঁটা

আমার পিতামহ উদ্ধব দত্ত তাঁর প্রভুবংশকে বিপদের দিনে নিজের সম্পত্তি দিয়া রক্ষা করিয়াছেন। সেই হইতে আমাদের দারিদ্র্যই অন্য লোকের ধনের চেয়ে মাথা উঁচু করিয়াছে। আমার পিতা সনাতন দত্ত ডিরোজিয়োর ছাত্র। মদের সম্বন্ধে তাঁর যেমন অদ্ভুত নেশা ছিল সত্যের সম্বন্ধে ততোধিক। মা আমাদের একদিন নাপিত ভায়ার গল্প বলিয়াছিলেন শুনিয়া পরদিন হইতে সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়ির ভিতরে যাওয়া তিনি একেবারে বন্ধ করিয়া দিলেন। বাহিরে পড়িবার ঘরে শুইতাম। সেখানে দেয়াল জুড়িয়া ম্যাপগুলা সত্য কথা বলিত, তেপান্তর মাঠের খবর দিত না, এবং সাত সমুদ্র তেরো নদীর গল্পটাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলাইয়া রাখিত। সততা সম্বন্ধেও তাঁর শুচিবায়ু প্রবল ছিল। আমাদের জবাবদিহির অন্ত ছিল না। একদিন একজন ‘হকার’ দাদাকে কিছু জিনিস বেচিয়াছিল। তারই কোনো একটা মোড়কের একখানা দড়ি লইয়া খেলা করিতেছিলাম । বাবার হুকুমে সেই দড়ি হকারকে ফিরাইয়া দিবার জন্য রাস্তায় আমাকে ছুটিতে হইয়াছিল ।

আমরা সাধুতার জেলখানায় সততার লোহার বেড়ি পরিয়া মানুষ। মানুষ বলিলে একটু বেশি বলা হয়– আমরা ছাড়া আর সকলেই মানুষ, কেবল আমরা মানুষের দৃষ্টান্তস্থল। আমাদের খেলা ছিল কঠিন, ঠাট্টা বন্ধ, গল্প নীরস, বাক্য স্বল্প, হাসি সংযত, ব্যবহার নিখুঁত। ইহাতে বাল্যলীলায় মস্ত যে একটা ফাঁক পড়িয়াছিল লোকের প্রশংসায় সেটা ভর্তি হইত। আমাদের মাস্টার হইতে মুদি পর্যন্ত সকলেই স্বীকার করিত, দত্তবাড়ির ছেলেরা সত্যযুগ হইতে হঠাৎ পথ ভুলিয়া আসিয়াছে।

পাথর দিয়া নিরেট করিয়া বাঁধানো রাস্তাতেও একটু ফাঁক পাইলেই প্রকৃতি তার মধ্য হইতে আপনার প্রাণশক্তির সবুজ জয়পতাকা তুলিয়া বসে। আমার নবীন জীবনে সকল তিথিই একাদশী হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু উহারই মধ্যে উপবাসের একটা কোন্‌ ফাঁকে আমি একটুখানি সুধার স্বাদ পাইয়াছিলাম।

যে কয়জনের ঘরে আমাদের যাওয়া-আসার বাধা ছিল না তার মধ্যে একজন ছিলেন অখিলবাবু। তিনি ব্রাহ্মসমাজের লোক; বাবা তাঁকে বিশ্বাস করিতেন। তাঁর মেয়ে ছিল অনসূয়া, আমার চেয়ে ছয় বছরের ছোটো। আমি তার শাসনকর্তার পদ লইয়াছিলাম।

তার শিশুমুখের সেই ঘন কালো চোখের পল্লব আমার মনে পড়ে। সেই পল্লবের ছায়াতে এই পৃথিবীর অলোর সমস্ত প্রখরতা তার চোখে যেন কোমল হইয়া আসিয়াছিল। কী স্নিগ্ধ করিয়াই সে মুখের দিকে চাহিত। পিঠের উপরে দুলিতেছে তার সেই বেণীটি, সেও আমার মনে পড়ে; আর মনে পড়ে সেই দুইখানি হাত– কেন জানি না, তার মধ্যে বড়ো একটি করুণা ছিল। সে যেন পথে চলিতে আর-কারো হাত ধরিতে চায়; তার সেই কচি আঙুলগুলি যেন সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিয়া কার মুঠার মধ্যে ধরা দিবার জন্য পথ চাহিয়া আছে।

ঠিক সেদিন এমন করিয়া তাকে দেখিতে পাইয়াছিলাম, এ কথা বলিলে বেশি বলা হইবে। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ বুঝিবার আগেও অনেকটা বুঝি। অগোচরে মনের মধ্যে অনেক ছবি আঁকা হইয়া যায়– হঠাৎ একদিন কোনো-এক দিক হইতে আলো পড়িলে সেগুলা চোখে পড়ে।

***

My grandfather Uddhab Dutta had rescued his employers from certain doom by giving up everything he had. From that day onwards our poverty had held its head higher than the wealth that other people had. My father Sanatan Dutta was a student of Derozio’s. He was just addicted to alcohol as he was to the upholding of truth. After hearing that our mother had told us the story of the stupid barber, he banned us from going indoors after evenfall. We used to sleep in the study room at night. There the maps on each wall spoke only of real things and never of the vast field of Tepantar; there, each of the stories that spoke of the seven seas and the thirteen rivers hung in shame from the beams overhead. He was also obsessed with honesty. One day a hawker had sold something to my elder brother. I was playing with a bit of string that had tied up one of the packages. My father saw me and I was made to run after the hawker to return the string to him.

We were raised in a jailhouse of virtue shackled by the iron bands of truthfulness. It is an exaggeration to say that we were raised – we were elevated to be examples for everyone else. Our play was hard, our humour was non-existent, our stories were without soul, our words were few, our laughter was controlled and our behavior was flawless. The gaps this left in our childhood were filled with the praise of others. From governess to grocer, everyone admitted that the Dutta children had lost their way in some distant better times to find themselves here.

Nature raises her green standards of victory as soon as a road paved with stone yields. Although the days of my youth were like days of ritual fasting, there was one place where I learned that there was sweetness in life.

Of the few that we were not barred from associating with was Akhilbabu. He belonged to the Brahmo Samaj; my father believed in him. His daughter was Anasuya, she was six years younger than me. I took on the role of disciplining her.I remember the thick eye lashes that shaded her little face. All the harshness of this earthly light seemed to be filtered by those lashes. How gentle were the eyes that she raised to my face. I also remember the plait that hung upon her back; and her arms – I do not know why, they had a strange tenderness. It was as if she wanted to hold another hand; her little fingers seemed to want to completely believe in someone else.

It would be an exaggeration to say that I saw all this in her at the time. But we understand much before we understand all of it. Many a picture is painted within the mind without effort – a sudden ray of light brings it all to the surface.