দীক্ষা/ Deeksha/The Initiation

Debendranath_Tagore 1.jpg

দীক্ষা

 

একদিন যাঁর চেতনা বিলাসের আরামশয্যা থেকে হঠাৎ জেগে উঠেছিল–এই ৭ই পৌষ দিনটি সেই দেবেন্দ্রনাথের দিন। এই দিনটিকে তিনি আমাদের জন্যে দান করে গিয়েছেন। রত্ন যেমন করে দান করতে হয় তেমনি করে দান করেছেন। ওই দিনটিকে এই আশ্রমের কৌটোটির মধ্যে স্থাপন করে দিয়ে গেছেন। আজ কৌটো উদ্‌ঘাটন করে রত্নটিকে এই প্রান্তরের আকাশের মধ্যে তুলে ধরে দেখব–এখানকার ধূলিবিহীন নির্মল নিভৃত আকাশতলে যে নক্ষত্রমণ্ডলী দীপ্তি পাচ্ছে সেই তারাগুলির মাঝখানে তাকে তুলে ধরে দেখব। সেই সাধকের জীবনের ৭ই পৌষকে আজ উদ্‌ঘাটন করার দিন, সেই নিয়ে আমরা আজ উৎসব করি।

 

এই ৭ই পৌষের দিনে সেই ভক্ত তাঁর দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, সেই দীক্ষার যে কতবড়ো অর্থ আজকের দিন কি সে-কথা আমাদের কাছে কিছু বলছে? সেই কথাটি না শুনে গেলে কী জন্যেই বা এসেছি আর কী নিয়েই বা যাব?

 

সেই যেদিন তাঁর জীবনে এই ৭ই পৌষের সূর্য একদিন উদিত হয়েছিল সেই দিনে আলোও জ্বলে নি, জনসমাগমও হয় নি–সেই শীতের নির্মল দিনটি শান্ত ছিল, স্তব্ধ ছিল। সেই দিনে যে কী ঘটছে তা তিনি নিজেও সম্পূর্ণ জানেন নি, কেবল অন্তর্যামী বিধাতা পুরুষ জানছিলেন।

 

সেই যে দীক্ষা সেদিন তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেটি সহজ ব্যাপার নয়। সে শুধু শান্তির দীক্ষা নয়, সে অগ্নির দীক্ষা। তাঁর প্রভু সেদিন তাঁকে বলেছিলেন, “এই যে জিনিসটি তুমি আজ আমার হাত থেকে নিলে এটি যে সত্য–এর ভার যখন গ্রহণ করেছ তখন তোমার আর আরাম নেই, তোমাকে রাত্রিদিন জাগ্রত থাকতে হবে। এই সত্যকে রক্ষা করতে তোমার যদি সমস্তই যায় তো সমস্তই যাক। কিন্তু সাবধান, তোমার হাতে আমার সত্যের অসম্মান না ঘটে।’

 

তাঁর প্রভুর কাছ থেকে এই সত্যের দান নিয়ে তার পরে আর তো তিনি ঘুমোতে পারেন নি। তাঁর আত্মীয় গেল, ঘর গেল, সমাজ গেল, নিন্দায় দেশ ছেয়ে গেল–এতবড়ো বৃহৎ সংসার, এত মানী বন্ধু, এত ধনী আত্মীয়, এত তার সহায়, সমস্তের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গেল এমন দীক্ষা তিনি নিয়েছিলেন। জগতের সমস্ত আনুকূল্যকে বিমুখ করে দিয়ে এই সত্যটি নিয়ে তিনি দেশে দেশে অরণ্যে পর্বতে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছিলেন। এ যে প্রভুর সত্য। এই অগ্নি রক্ষার ভার নিয়ে আর আরাম নেই, আর নিদ্রা নেই। রুদ্রবেদের সেই অগ্নিদীক্ষা আজকের দিনের উৎসবের মাঝখানে আছে। কিন্তু সে কি প্রচ্ছন্নই থাকবে? এই গীত-বাদ্যকোলাহলের মাঝখানে প্রবেশ করে সেই “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং ভীষণানাং’ যিনি তাঁর দীপ্ত সত্যের বজ্রমূর্তি আজ প্রত্যক্ষ করে যাবে না? গুরুর হাত হতে সেই যে “বজ্রমুদ্যতং” তিনি গ্রহণ করেছিলেন এই ৭ই পৌষের মর্মস্থানে সেই বজ্রতেজ রয়েছে।

 

কিন্তু শুধু বজ্র নয়, শুধু পরীক্ষা নয়, সেই দীক্ষার মধ্যে যে কী বরাভয় আছে তাও দেখে যেতে হবে। সেই ধনিসন্তানের জীবনে যে সংকটের দিন এসেছিল তা তো সকলের জানা আছে। যে বিপুল ঐশ্বর্য রাজহর্ম্যের মতো একদিন তাঁর আশ্রয় ছিল সেইটে যখন অকস্মাৎ তাঁর মাথার উপরে ভেঙে পড়ে তাঁকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবার উদ্‌যোগ করেছিল তখন সেই ভয়ংকর বিপৎপতনের মাঝখানে একমাত্র এই সত্যদীক্ষা তাঁকে আবৃত করে রক্ষা করেছিল–সেইদিন তাঁর আর-কোনো পার্থিব সহায় ছিল না। এই দীক্ষা শুধু যে দুর্দিনের দারুণ অঘাত থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছিল তা নয়–প্রলোভনের দারুণতর আক্রমণ থেকে তাঁকে রক্ষা করেছিল।

 

আজাকের এই ৭ই পৌষের মাঝখানে তাঁর সেই সত্যদীক্ষার রুদ্রদীপ্তি এবং রবাভয়রূপ দুইই রয়েছে–সেটি যদি আমরা দেখতে পাই এবং লেশমাত্রও গ্রহণ করতে পারি তবে ধন্য হব। সত্যের দীক্ষা যে কাকে বলে আজ যদি ভক্তির সঙ্গে তাই স্মরণ করে যেতে পারি তাহলে ধন্য হব। এর মধ্যে ফাঁকি নেই, লুকোচুরি নেই, দ্বিধা নেই, দুই দিক বজায় রেখে চলবার চাতুরী নেই, নিজেকে ভোলাবার জন্যে সুনিপুণ মিথ্যাযুক্তি নেই, সমাজকে প্রসন্ন করবার জন্যে বুদ্ধির দুই চক্ষু অন্ধ করা নেই, মানুষের হাটে বিকিয়ে দেবার জন্যে ভগবানের ধন চুরি করা নেই। সেই সত্যকে সমস্ত দুঃখপীড়নের মধ্যে স্বীকার করে নিলে তার পরে একেবারে নির্ভয়, ধূলিঘর ভেঙে দিয়ে একেবারে পিতৃভবনের অধিকার লাভ–চিরজীবনের যে গম্যস্থান, যে অমৃতনিকেতন, সেই পথের  যিনি একমাত্র বন্ধু তাঁরই আশ্রয়প্রাপ্তি সত্যদীক্ষার এই অর্থ।

 

সেই সাধু সাধক তাঁর জীবনের সকলের চেয়ে বড়ো দিনটিকে, তাঁর দীক্ষার দিনটিকে, এই নির্জন প্রান্তরের মুক্ত আকাশ ও নির্মল আলোকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে দিয়ে গেছেন। তাঁর সেই মহাদিনটির চারিদিকে এই মন্দির, এই আশ্রম, এই বিদ্যালয় প্রতিদিন আকার ধারণ করে উঠছে; আমাদের জীবন, আমাদের হৃদয়, আমাদের চেতনা একে বেষ্টন করে দাঁড়িয়েছে; এই দিনটিরই আহ্বানে কল্যাণ মূর্তিমান হয়ে এখানে আবির্ভূত হয়েছে; এবং তাঁর সেই সত্যদীক্ষার দিনটি ধনী ও দরিদ্রকে, বালক ও বৃদ্ধকে, জ্ঞানী ও মূর্খকে বর্ষে বর্ষে আনন্দ-উৎসবে আমন্ত্রণ করে আনছে। এই দিনটিকে যেন আমাদের অন্যমনস্ক জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে না রাখি–একে ভক্তিপূর্বক সমাদর করে ভিতরে ডেকে নাও, আমাদের তুচ্ছ জীবনের প্রতিদিনের যে দৈন্য তাকে সম্পদে পূর্ণ করো।

 

হে দীক্ষাদাতা, হে গুরু, এখনও যদি প্রস্তুত হয়ে না থাকি তো প্রস্তুত করো, আঘাত করো, চেতনাকে সর্বত্র উদ্যত করো–ফিরিয়ে দিয়ো না, ফিরিয়ে দিয়ো না–দুর্বল ব’লে তোমার সভাসদ্‌দের সকলের পশ্চাতে ঠেলে রেখো না। এই জীবনে সত্যকে গ্রহণ করতেই হবে–নির্ভয়ে এবং অসংকোচে। অসত্যের স্তূপাকার আবর্জনার মধ্যে ব্যর্থ জীবনকে নিক্ষেপ করব না। দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে–তুমি শক্তি দাও।

 

৭ পৌষ
***
Debendranath Tagore 2

Initiation

 

This seventh day of Poush belongs to Debendranath – the one whose consciousness was suddenly aroused one day from a slumber of comfort and luxury. He gifted this day to us; just as one might give away precious jewels. He left the day to be treasured forever in the care of his precious ashram. Today we shall take it out of the box and view it in the surroundings of the fields and the sky – amidst the constellations that shine in the clear, silent, unblemished skies above us. Today is the day to reveal that seventh day of Poush in that seer’s life; today is the day to celebrate it.

He took a vow on this seventh day of Poush but does this day speak to us at all of what immense meaning that vow entailed? If we do not hear it, what meaning can we make of this life and how empty will our departure be?

When the sun rose on that seventh day of Poush in his life, no torches were lit nor did people gather – that clear winter’s day was filled with peace and silence. He himself did not fully comprehend what was happening to him, the only one who was aware of anything was the One that is responsible for the workings of the universe.

That vow he took was not an easy one to follow. It was not merely an initiation into peace but also an initiation by fire. His Master said to him that day, ‘This gift that you have received from me is that of Truth – now that you have taken this burden there will be no rest for you for you will have to remain alert at all times. If you lose everything you have held dear while guarding this Truth, then so be it. But take care that my word is not desecrated in your guardianship.’

He could not rest once he had accepted that gift of truth from his master. His family forsook him, he lost his home and his friends; cries of shame filled the country. His large household, all his respected friends, all his wealthy relations, every support he had – he took a vow that sundered all these bonds. He spurned all the opposition that the world threw at him and wandered through forests and mountains of the land with the knowledge within him. This was the word that he had received from his Master. Once you undertake to protect that flame, there is neither rest nor sleep. That fiery pledge to the Rudra Veda is hidden in the celebrations of today. But will it remain hidden? Will not that ‘fear distilled from all fears and terror that surpasses all terrors’ enter the music and celebration today and will we not see the illumination of that truth? That lightning that he was entrusted with by his master continues to burn at the heart of this seventh day of Poush.

But the vow was not only accompanied by fire and ordeal; we must also be able to see the immense compassion that accompanied it. Everyone knows what terrible times visited this man who had been born in the lap of luxury. That immense wealth that had once sheltered him like the canopy over a throne suddenly came tumbling down upon him and nearly crushed him to the ground; this vow of truth was the only thing that sheltered him during those times – he had no other earthly assistance. The vow did not simply save him from the tribulations of those times; it also stood between him and the assault of petty desire.

In the midst of this seventh day of Poush there burns both the fierce flame of his initiation into Truth as well as gentle assurance – if we can see that and accept even the smallest part of it, we will be blessed. If we can respectfully remember what it means to receive Truth we will be blessed. There is no deception, no hiding, no hesitation, no dexterous juggling of both sides, no clever falsehoods to convince the self, no blinding of intelligent thought to keep society happy nor robbing the divine for material profit. If that Truth can be accepted amidst all of life’s tribulations, then only do we receive the right to inherit His realm without fear in our hearts – the realm that we strive life-long to achieve, that abode of peace, the One who is the only companion on that journey – this initiation into Truth is so that we can be gathered into His fold.

That great devotee placed the most important day of his life; the day of his awakening in the midst of the open skies and clear sunlight of these unpeopled fields. Each day this temple, this hermitage and this school takes shape around that memory. Our lives, our souls and our very consciousness surround it; this day has caused all that is good to come here and has invited the rich and the poor, the young and the old as well as the wise and the ignorant to gather here in celebration year after year. We must not keep this day waiting unattended at the doorstep of our lives – draw it closer with respectful care, let the poverty of our very ordinary daily existence be enriched.

Oh teacher, oh Guru, if I still seem unready then prepare me, strike me, arouse my consciousness – do not turn me from the goal nor push me away behind all your other disciples. One must accept truth in this life – with courage and without prejudice. I will not cast my failed life into the midden heap of lies. I must be initiated – give me the strength to do so.

 

Seventh Poush

Debendranath Tagore 3

Images: Internet sourced.