Archive | January 3, 2019

ছেলেটা/ Cheleta/ That Boy

ছেলেটা

 

ছেলেটার বয়স হবে বছর দশেক–

 

পরের ঘরে মানুষ।

 

যেমন আগাছা বেড়ে ওঠে ভাঙা বেড়ার ধারে–

 

মালীর যত্ন নেই,

 

আছে আলোক বাতাস বৃষ্টি

 

পোকামাকড় ধুলোবালি–

 

কখনো ছাগলে দেয় মুড়িয়ে,

 

কখনো মাড়িয়ে দেয় গোরুতে–

 

তবু মরতে চায় না, শক্ত হয়ে ওঠে,

 

ডাঁটা হয় মোটা,

 

পাতা হয় চিকন সবুজ।

 

 

 

ছেলেটা কুল পাড়তে গিয়ে গাছের থেকে পড়ে,

 

হাড় ভাঙে,

 

বুনো বিষফল খেয়ে ওর ভির্মি লাগে,

 

রথ দেখতে গিয়ে কোথায় যেতে কোথায় যায়,

 

কিছুতেই কিছু হয় না–

 

আধমরা হয়েও বেঁচে ওঠে,

 

হারিয়ে গিয়ে ফিরে আসে

 

কাদা মেখে কাপড় ছিঁড়ে–

 

মার খায় দমাদম,

 

গাল খায় অজস্র–

 

ছাড়া পেলেই আবার দেয় দৌড়।

 

 

 

মরা নদীর বাঁকে দাম জমেছে বিস্তর,

 

বক দাঁড়িয়ে থাকে ধারে,

 

দাঁড়কাক বসেছে বৈঁচিগাছের ডালে,

 

আকাশে উড়ে বেড়ায় শঙ্খচিল,

 

বড়ো বড়ো বাঁশ পুঁতে জাল পেতেছে জেলে,

 

বাঁশের ডগায় বসে আছে মাছরাঙা,

 

পাতিহাঁস ডুবে ডুবে গুগলি তোলে।

 

বেলা দুপুর।

 

লোভ হয় জলের ঝিলিমিলি দেখে–

 

তলায় পাতা ছড়িয়ে শেওলাগুলো দুলতে থাকে,

 

মাছগুলো খেলা করে।

 

আরো তলায় আছে নাকি নাগকন্যা?

 

সোনার কাঁকই দিয়ে আঁচড়ায় লম্বা চুল,

 

আঁকাবাঁকা ছায়া তার জলের ঢেউয়ে।

 

ছেলেটার খেয়াল গেল ওইখানে ডুব দিতে–

 

ওই সবুজ স্বচ্ছ জল,

 

সাপের চিকন দেহের মতো।

 

“কী আছে দেখিই-না’ সব তাতে এই তার লোভ।

 

দিল ডুব, দামে গেল জড়িয়ে–

 

চেঁচিয়ে উঠে, খাবি খেয়ে, তলিয়ে গেল কোথায়।

 

ডাঙায় রাখাল চরাচ্ছিল গোরু,

 

জেলেদের ডিঙি নিয়ে টানাটানি করে তুললে তাকে–

 

তখন সে নিঃসাড়।

 

তার পরে অনেক দিন ধরে মনে পড়েছে

 

চোখে কী করে সর্ষেফুল দেখে,

 

আঁধার হয়ে আসে,

 

যে মাকে কচি বেলায় হারিয়েছে

 

তার ছবি জাগে মনে,

 

জ্ঞান যায় মিলিয়ে।

 

ভারি মজা,

 

কী করে মরে সেই মস্ত কথাটা।

 

সাথিকে লোভ দেখিয়ে বলে,

 

“একবার দেখ্‌-না ডুবে, কোমরে দড়ি বেঁধে,

 

আবার তুলব টেনে।’

 

ভারি ইচ্ছা করে জানতে ওর কেমন লাগে।

 

সাথি রাজি হয় না;

 

ও রেগে বলে, “ভীতু, ভীতু, ভীতু কোথাকার।’

 

 

 

বক্সিদের ফলের বাগান, সেখানে লুকিয়ে যায় জন্তুর মতো।

 

মার খেয়েছে বিস্তর, জাম খেয়েছে আরো অনেক বেশি।

 

বাড়ির লোকে বলে, “লজ্জা করে না বাঁদর?’

 

কেন লজ্জা।

 

বক্সিদের খোঁড়া ছেলে তো ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে ফল পাড়ে,

 

ঝুড়ি ভরে নিয়ে যায়,

 

গাছের ডাল যায় ভেঙে,

 

ফল যায় দ’লে–

 

লজ্জা করে না?

 

একদিন পাকড়াশীদের মেজো ছেলে একটা কাঁচ-পরানো চোঙ নিয়ে

 

ওকে বললে, “দেখ্‌-না ভিতর বাগে।’

 

দেখল নানা রঙ সাজানো,

 

নাড়া দিলেই নতুন হয়ে ওঠে।

 

বললে, “দে-না ভাই, আমাকে।

 

তোকে দেব আমার ঘষা ঝিনুক,

 

কাঁচা আম ছাড়াবি মজা ক’রে–

 

আর দেব আমের কষির বাঁশি।’

 

 

 

দিল না ওকে।

 

কাজেই চুরি করে আনতে হল।

 

ওর লোভ নেই–

 

ও কিছু রাখতে চায় না, শুধু দেখতে চায়

 

কী আছে ভিতরে।

 

খোদন দাদা কানে মোচড় দিতে দিতে বললে,

 

“চুরি করলি কেন।’

 

লক্ষ্মীছাড়াটা জবাব করলে,

 

“ও কেন দিল না।’

 

যেন চুরির আসল দায় পাকড়াশিদের ছেলের।

 

 

 

ভয় নেই ঘৃণা নেই ওর দেহটাতে।

 

কোলাব্যাঙ তুলে ধরে খপ ক’রে,

 

বাগানে আছে খোঁটা পোঁতার এক গর্ত,

 

তার মধ্যে সেটা পোষে–

 

পোকামাকড় দেয় খেতে।

 

গুবরে পোকা কাগজের বাক্সোয় এনে রাখে,

 

খেতে দেয় গোবরের গুটি–

 

কেউ ফেলে দিতে গেলে অনর্থ বাধে।

 

ইস্কুলে যায় পকেটে নিয়ে কাঠবিড়ালি।

 

একদিন একটা হেলে সাপ রাখলে মাস্টারের ডেস্কে–

 

ভাবলে, “দেখিই-না কী করে মাস্টারমশায়।’

 

ডেক্‌সো খুলেই ভদ্রলোক লাফিয়ে উঠে দিলেন দৌড়–

 

দেখবার মতো দৌড়টা।

 

 

 

একটা কুকুর ছিল ওর পোষা,

 

কুলীনজাতের নয়,

 

একেবারে বঙ্গজ।

 

চেহারা প্রায় মনিবেরই মতো,

 

ব্যবহারটাও।

 

অন্ন জুটত না সব সময়ে,

 

গতি ছিল না চুরি ছাড়া–

 

সেই অপকর্মের মুখে তার চতুর্থ পা হয়েছিল খোঁড়া।

 

আর, সেইসঙ্গেই কোন্‌ কার্যকারণের যোগে

 

শাসনকর্তাদের শসাখেতের বেড়া গিয়েছিল ভেঙে।

 

মনিবের বিছানা ছাড়া কুকুরটার ঘুম হত না রাতে,

 

তাকে নইলে মনিবেরও সেই দশা।

 

একদিন প্রতিবেশীর বাড়া ভাতে মুখ দিতে গিয়ে

 

তার দেহান্তর ঘটল।

 

মরণান্তিক দুঃখেও কোনোদিন জল বেরোয় নি যে ছেলের চোখে

 

দু দিন সে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে কেঁদে বেড়ালো,

 

মুখে অন্নজল রুচল না,

 

বক্সিদের বাগানে পেকেছে করম্‌চা–

 

চুরি করতে উৎসাহ হল না।

 

সেই প্রতিবেশীদের ভাগ্নে ছিল সাত বছরের,

 

তার মাথার উপর চাপিয়ে দিয়ে এল এক ভাঙা হাঁড়ি।

 

হাঁড়ি-চাপা তার কান্না শোনালো যেন ঘানিকলের বাঁশি।

 

 

 

গেরস্তঘরে ঢুকলেই সবাই তাকে “দূর দূর’ করে,

 

কেবল তাকে ডেকে এনে দুধ খাওয়ায় সিধু গয়লানী।

 

তার ছেলেটি মরে গেছে সাত বছর হল,

 

বয়সে ওর সঙ্গে তিন দিনের তফাত।

 

ওরই মতো কালোকোলো,

 

নাকটা ওইরকম চ্যাপ্টা।

 

ছেলেটার নতুন নতুন দৌরাত্মি এই গয়লানী মাসীর ‘পরে।

 

তার বাঁধা গোরুর দড়ি দেয় কেটে,

 

তার ভাঁড় রাখে লুকিয়ে,

 

খয়েরের রঙ লাগিয়ে দেয় তার কাপড়ে।

 

“দেখি-না কী হয়’ তারই বিবিধ-রকম পরীক্ষা।

 

তার উপদ্রবে গয়লানীর স্নেহ ওঠে ঢেউ খেলিয়ে।

 

তার হয়ে কেউ শাসন করতে এলে

 

সে পক্ষ নেয় ওই ছেলেটারই।

 

 

 

অম্বিকে মাস্টার আমার কাছে দুঃখ ক’রে গেল,

 

“শিশুপাঠে আপনার লেখা কবিতাগুলো

 

পড়তে ওর মন লাগে না কিছুতেই,

 

এমন নিরেট বুদ্ধি।

 

পাতাগুলো দুষ্টুমি ক’রে কেটে রেখে দেয়,

 

বলে ইঁদুরে কেটেছে।

 

এতবড়ো বাঁদর।’

 

আমি বললুম, “সে ত্রুটি আমারই,

 

থাকত ওর নিজের জগতের কবি

 

তা হলে গুবরে পোকা এত স্পষ্ট হত তার ছন্দে

 

ও ছাড়তে পারত না।

 

কোনোদিন ব্যাঙের খাঁটি কথাটি কি পেরেছি লিখতে,

 

আর সেই নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি।’

 

 

 

 

 

২৮ শ্রাবণ, ১৩৩৯

 

***

 

 

 

 

THAT BOY

 

That boy would be no older than ten –

Growing up in a home not his own.

Just as a weed flourishes by a broken fence –

No gardener to watch his every step,

Bathed in light, wind and rain

Under attack from insects and dust

 

Sometimes a goat trims it back to the roots,

 

Sometimes a cow crushes it underfoot –

 

But it still does not die, growing stronger each day

 

Its stem thickening

 

While its leaves grow lush and green.

 

 

 

The boy falls from a tree while picking fruit

 

A bone or two are broken,

 

He falls into a faint after eating poison fruit

 

Ends up far from where he should have been, on his way to the fair.

 

Nothing happens to him though –

 

He comes back from the doors of death,

 

He returns from being lost

Covered in mud, clothes ripped –

 

Fists rain down on him,

 

Harsh words too –

 

But once free he is off again, up to no good.

 

 

 

There by the dried river bed, where algae clouds the stream,

 

Herons wait for fish,

 

A crow perches on a Carissa branch,

 

A kite flies in the skies above,

 

And fishermen have draped their nets over tall bamboo poles,

Capped by jewel bright kingfishers,

Ducks dip their heads looking for things to eat, snails and their like,

 

All under the midday sun.

 

He feels drawn to the sparkling waters –

 

And the dancing weeds beneath,

 

Where the fish dart and play.

 

Does the snake princess live even deeper below?

 

Combing her long hair out with a comb of gold,

 

Till it shimmers, light and shade playing on the waves.

 

The boy thought of diving into that very spot –

 

In the clear green waters,

His body slicing in smooth as a snake.

‘Why not see what there is -’ this his chief wish.

He dived in, only to be entangled in the winding weeds –

He called, struggled a bit, then sank into the depths.

 

There was a cowherd on the banks,

He mustered a fishing boat and managed to pull the boy out –

 

Dead to the world for all purpose.

He has often thought of it since then

 

How stars seemed to fill his eyes,

And it all went dark,

 

And the mother he had lost as a child

 

Why did she come to mind,

Just before everything faded?

 

Such fun,

So that was the big secret about how one died!

He tried to tempt a play mate,

‘Why don’t you take a dip with a rope around your waist,

I will pull you out.’

 

He would really like to know how they feel.

 

But his friend does not want to do it;

 

He screams angrily, ‘Coward, coward, coward!’

 

 

 

He hides in the orchard belonging to the Bakshis, wild thing in its lair.

 

He has been beaten often enough but feasted far more.

 

The people at home ask, ‘Have you no shame, you animal!’

 

But why should he feel any shame?

What about the lame son of the Bakshis, who hits the branches to get the fruit,

 

Fills baskets with the bounty,

 

Leaves the tree’s branches bruised and broken,

 

Stamping the fruit into the ground –

 

Does he feel any shame?

 

One day one of the Pakrashis came with a tube with glass windows

 

Told him, ‘Have a look inside!’

 

Inside, a world of colours

 

Renewing with each shake.

 

The boy said, ‘Please, let me have it.

 

You can have my treasured shell knife, sharpened,

 

Such fun to peel green mangoes with –

 

I will even throw in my mango seed flute!’

 

 

 

But to no avail.

 

What was he to do but steal it then?

 

He does not crave ownership –

He does not care to keep things, he just wants to see

 

What lies inside.

 

But the grown ups twisted his ear so hard as they asked,

 

‘Why did you have to steal?’

 

The rascal replied,

 

‘But why did he not give it to me?’

 

As if all fault lay with the Pakrashi boy.

 

 

 

He knows neither fear not shame.

Happily snatching up a toad,

He puts it in a hole made for a garden post

 

It is his pet to feed –

 

With insects and other creatures.

 

He keeps dung beetles in paper boxes,

 

Feeding them balls of dung –

Raging when anyone suggests throwing them out.

 

He takes a squirrel in his pockets to school.

 

Once he put a snake in the master’s desk –

 

Thinking, ‘Let us see what he does!’

 

The poor man ran as soon as his desk was open –

 

His speed was something to behold.

 

 

 

He had a pet dog,

 

No pedigree of any kind,

 

A mongrel born and raised.

 

In looks a close match to his owner,

 

In his manners too.

 

It never got enough to eat,

The only way out was to steal what it could –

 

That had resulted in one of his legs being lamed.

 

At the same time, mysteriously

 

A section of fence belonging to the disciplining hand was found to be damaged.

 

The dog could not sleep unless it was in its owner’s bed at night,

 

The boy could not sleep either if they were apart.

 

One day the dog got too close to a neighbour’s plate of food

 

Retribution came in death.

The boy who had never cried even in heart rending sorrow

 

Hid his tears for days,

 

Unable to eat or drink,

 

Not even the prospect of ripe fruit in the Bakshi garden –

Could inspire him to theft.

 

The neighbour had a seven year old nephew,

 

The boy jammed a broken pot over the child’s head.

 

The boy’s tears sounded like muffled machinery from his earthen prison.

 

 

 

Everyone chases him off the minute he enters a house,

 

The only one who views him with love is Sidhu Goylani the milk maid.

 

Her own son dead these seven desolate years,

 

They were born merely three days apart, the two.

 

Dark of limb and face,

 

Snub nosed, twins in their plainness.

 

He subjects this loving woman to new torments daily.

 

He lets her cows roam loose, cutting them free.

 

He hides her milk pails,

 

He smears her clothes with catechu.

 

All these are his way to ‘see what happens if -!’

 

But each new trick makes her heart swell with love.

 

When others try to berate him on her behalf

 

She takes up cudgels on his.

 

 

The teacher came to me and ruefully complained,

 

‘Even your poems in the primer

 

He will not once sit down to read,

 

Such a dullard is rarely to be seen.

 

He cuts holes in the pages on purpose,

 

Claiming the mice have been at work.

 

Who knew he had such a wicked heart!’

 

I said, ‘But that is my failing,

 

If only there was a poet who came from his own world

 

They would have caught the dung beetle’s rhythm in their stanzas

 

And the boy would have not been able to put the book down.

 

Have I ever written of what goes on in a toad’s heart,

 

Or of the tragedies that afflict daily the life of a stray dog?’

 

 

 

 

 

 

28th Shravan 1339

Advertisements