Archive | January 4, 2019

নতুন পুতুল/ Notun Putul/ The New Dolls

নতুন পুতুল

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

 

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

 

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

 

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

 

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

 

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

 

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

 

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

 

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

 

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

 

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

 

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

 

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

 

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

 

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

 

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

 

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

 

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

 

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

 

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

 

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

 

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

 

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

 

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

 

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

 

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

 

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

 

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

 

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

 

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

 

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

 

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

 

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

 

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

 

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

 

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

 

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

 

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

 

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

 

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

 

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

 

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

 

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

 

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

 

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

 

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

 

***

The New Dolls

1

 

This artisan only made dolls; dolls for the girls of the royal family to play with.

Each year there was a doll fair in the grounds of the palace. All the artisans there have always honoured this artisan as their leader.

When he was nearly eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal, he was youthful in years and his style was new.

The dolls he makes are complete but not quite formed, fully painted but still untouched by the brush in parts. It is almost as if the dolls are not quite finished, as if they will never quite grow old.

The young people said, “This is brave work!”

The old people said, “Bravery? More like audacity if you ask us!”

But modern times demand modern things. The princesses of today said, “We want these dolls!”

 

The ancient courtiers said, “For shame!”

That made the princesses crave the new fangled dolls even more.

There were no crowds at the old artisan’s shop these days. Baskets filled with dolls waited like passengers waiting for a ferry with their eyes fixed on the far banks of a river.

One year passed and then another. Everyone forgot all about the old man. Kishanlal was now the top maker of dolls in the fair held in the palace.

 

The old man was heart broken and he barely made any money. Finally his daughter came to him and said, “Come and live with me.”

 

His son-in-law said, “Eat, drink and rest! The only thing you have to do is drive stray cattle from the vegetable patch.”

 

His daughter was busy with her household chores all day. His son-in-law made clay lamps and took them by boat to the town to sell.

 

Just as the old man fails to notice that the times are changing, he also fails to understand that his granddaughter is no child anymore but a young woman of sixteen.

The girl comes and puts her arms around his neck as he sits beneath a tree guarding vegetables in between nodding off to sleep. Even the ribs surrounding his heart ache with happiness when she does this.

His granddaughter says, “Make me a doll, I want to play!”

 

The old man says, “Now, now! Why would you like my work?”

 

The girl says, “Who can make better dolls than you?”

 

 

 

The old man answers, “What about Kishanlal?”

 

The girl answers, “What! Kishanlal wishes he could make these dolls!”

 

How often the two have argued about this! It is always the same.

 

Then the old man takes clay and other stuff out of his bundle and puts his great round rimmed glasses on.

 

He says to his granddaughter, “But child, what of the corn? The crows will eat it all!”

 

 

 

The girl says, “Grandfather, I will drive them away!”

The day passes. The bullock draws water noisily from the distant canal; the girl drives the crows away and the old man makes dolls out of clay.

 

 

 

3

The old man feared his daughter most of all. She was the strictest of them al and everyone in the family was afraid of her.

He was making his dolls with such concentration one day that he did not notice anything else. He certainly never heard his daughter swinging her arms fast as she walked up to him from behind.

He took his glasses off and stared at her like an uncomprehending child when she called him from close by.

She said, “The milking can wait I suppose while you spend time with Subhadra! Why make dolls for her, is she still young enough to play with those?”

The old man spoke up quickly, “Why would Subhadra play with these? I will sell them in the palace. We will need a necklace of gold when a groom comes for my child. I need to save money for that.”

His daughter was annoyed and said, “Who will buy these in the palace?”

The old man bowed his head at this and fell quiet.

Subhadra shook her head and said, “I would like to see anyone say no to dolls made by my grandfather!”

 

 

4

Two days later Subhadra gave a gold coin to her mother and said, “Here, the price for my grandfather’s dolls.”

Her mother asked, “Where did you get these?”

The girl said, “I sold them in the palace.”

The old man smiled and said, “Child, just imagine! I do not see well these days and my hands tremble!”

Her mother was pleased. She said, “Sixteen coins like this will make a beautiful necklace for Subhadra.”

The old man answered, “That should not be a problem.”

Subhadra wrapped her arms about her grandfather’s neck and said, “I do not worry about finding myself a husband!”

The old man smiled and wiped a tear away.

 

 

 

 

 

5

The old man seemed to have found his second youth. He sat under the tree sculpting his dolls while Subhadra drove the crows away. The bullock drew water from the canal with a creaking of the wheel in the distance.

One by one sixteen gold coins were strung on a thread and the necklace was completed.

Her mother said, “All we need now is a groom!”

Subhadra whispered in the old man’s ear, “Grandfather, there is a groom.”

The grandfather asked, “Tell me child, where did you find your groom?”

Subhadra said, “The day I went to the palace, the sentry asked me what I wanted and I told him that I was there to sell dolls to the princesses. He said to me, these dolls are not selling these days and  turned me away with those words. There was one man who saw my tears and said, let me touch those dolls up with a little paint for you, they will sell easily enough. Grandfather, if you like him too, I should like to marry him.”

The old man asked, “Where is he?”

The girl answered, “There, by the Piyal tree outside.”

The groom entered the room; the old man said, “But this is Kishanlal!”

Kishanlal bowed to touch the old man’s feet and said, “Yes, I am Kishanlal indeed.”

The old man hugged him close and said, “Once upon a time you took over the dolls that I made with my own hands, and today you come for the one that lives within my heart.”

His granddaughter threw her arms about his neck and whispered, “He is here to take you too!”

Advertisements