আধুনিক কাব্য/Adhunik Kabyo/ Modern Poetry

আধুনিক কাব্য


মডার্‌ন্‌ বিলিতি কবিদের সম্বন্ধে আমাকে কিছু লিখতে অনুরোধ করা হয়েছে। কাজটা সহজ নয়। কারণ, পাঁজি মিলিয়ে মডার্‌নের সীমানা নির্ণয় করবে কে। এটা কালের কথা ততটা নয় যতটা ভাবের কথা।

নদী সামনের দিকে সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক ফেরে। সাহিত্যও তেমনি বরাবর সিধে চলে না। যখন সে বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাকেই বলতে হবে মডার্‌ন্‌। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।

বাল্যকালে যে ইংরেজি কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় হল তখনকার দিনে সেটাকে আধুনিক ব’লে গণ্য করা চলত। কাব্য তখন একটা নতুন বাঁক নিয়েছিল, কবি বার্‌ন্‌স্‌ থেকে তার শুরু। এই ঝোঁকে একসঙ্গে অনেকগুলি বড়ো বড়ো কবি দেখা দিয়েছিলেন। যথা ওয়ার্ড্‌স্বার্থ্‌ কোল্‌রিজ শেলি কীট্‌স্‌।

সমাজে সর্বসাধারণের প্রচলিত ব্যবহাররীতিরে আচার বলে। কোনো কোনো দেশে এই আচার ব্যক্তিগত অভিরুচির স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণ চাপা দিয়ে রাখে। সেখানে মানুষ হয়ে ওঠে পুতুল, তার চালচলন হয় নিখুঁত কেতা-দুরস্ত। সেই সনাতন অভ্যস্ত চালকেই সমাজের লোকে খাতির করে। সাহিত্যকেও এক-এক সময়ে দীর্ঘকাল আচারে পেয়ে বসে — রচনায় নিখুঁত রীতির ফোঁটাতিলক কেটে চললে লোকে তাকে বলে সাধু। কবি বার্‌ন্‌সের পরে ইংরেজি কাব্যে যে যুগ এল সে-যুগে রীতির বেড়া ভেঙে মানুষের মর্জি এসে উপস্থিত। “কুমুদকহ্লারসেবিত সরোবর’ হচ্ছে সাধু-কারখানায় তৈরি সরকারি ঠুলির বিশেষ ছিদ্র দিয়ে দেখা সরোবর। সাহিত্যে কোনো সাহসিক সেই ঠুলি খুলে ফেলে, বুলি সরিয়ে, পুরো চোখ দিয়ে যখন সরোবর দেখে তখন ঠুলির সঙ্গে সঙ্গে সে এমন একটা পথ খুলে দেয় যাতে ক’রে সরোবর নানা দৃষ্টিতে নানা খেয়ালে নানাবিধ হয়ে ওঠে। সাধু বিচারবুদ্ধি তাকে বলে, “ধিক্‌।’

আমরা যখন ইংরেজি কাব্য পড়া শুরু করলুম তখন সেই আচার-ভাঙা ব্যক্তিগত মর্জিকেই সাহিত্য স্বীকার ক’রে নিয়েছিল। এডিন্‌বরা রিভিয়ুতে যে-তর্জনধ্বনি উঠেছিল সেটা তখন শান্ত। যাই হোক, আমাদের সেকাল আধুনিকতার একটা যুগান্তকাল।

তখনকার কালে কাব্যে আধুনিকতার লক্ষণ হচ্ছে ব্যক্তিগত খুশির দৌড়। ওয়ার্ড্‌স্বার্থ্‌ বিশ্বপ্রকৃতিতে যে আনন্দময় সত্তা উপলব্ধি করেছিলেন সেটাকে প্রকাশ করেছিলেন নিজের ছাঁদে। শেলির ছিল প্ল্যাটোনিক ভাবুকতা, তার সঙ্গে রাষ্ট্রগত ধর্মগত সকলপ্রকার স্থূল বাধার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রূপসৌন্দর্যের ধ্যান ও সৃষ্টি নিয়ে কীট্‌সের কাব্য। ঐ যুগে বাহ্যিকতা থেকে আন্তরিকতার দিকে কাব্যের স্রোত বাঁক ফিরিয়েছিল।

কবিচিত্তে যে-অনুভূতি গভীর, ভাষায় সুন্দর রূপ নিয়ে সে আপন নিত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। প্রেম আপনাকে সজ্জিত করে। অন্তরে তার যে আনন্দ বাইরে সেটাকে সে প্রমাণ করতে চায় সৌন্দর্যে। মানুষের একটা কাল গেছে যখন সে অবসর নিয়ে নিজের সম্পর্কীয় জগৎটাকে নানারকম করে সাজিয়ে তুলত। বাইরের সেই লজ্জাই তার ভিতরের অনুরাগের প্রকাশ। যেখানে অনুরাগ সেখানে উপেক্ষা থাকতে পারে না। সেই যুগে নিত্যব্যবহার্য জিনিসগুলিকে মানুষ নিজের রুচির আনন্দে বিচিত্র ক’রে তুলেছে। অন্তরের প্রেরণা তার আঙুলগুলিকে সৃষ্টিকুশলী করেছিল। তখন দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে ঘটিবাটি গৃহসজ্জা দেহসজ্জা রঙে রূপে মানুষের হৃদয়কে জড়িয়ে দিয়েছিল তার বহিরুপকরণে। মানুষ কত অনুষ্ঠান সৃষ্টি করেছিল জীবনযাত্রাকে রস দেবার জন্যে। কত নূতন নূতন সুর; কাঠে ধাতুতে মাটিতে পাথরে রেশমে পশমে তুলোয় কত নূতন নূতন শিল্পকলা। সেই যুগে স্বামী তার স্ত্রীর পরিচয় দিয়েছে, প্রিয়শিষ্যাললিতে কলাবিধৌ। যে দাম্পত্যসংসার রচনা করত তার রচনাকার্যের জন্য ব্যাঙ্কে-জমানো টাকাটাই প্রধান জিনিস ছিল না, তার চেয়ে প্রয়োজন ছিল ললিতকলার। যেমন-তেমন ক’রে মালা গাঁথলে চলত না; চীনাংশুকের অঞ্চলপ্রান্তে চিত্রবয়ন জানত তরুণীরা; নাচের নিপুণতা ছিল প্রধান শিক্ষা; তার সঙ্গে ছিল বীণা বেণু, ছিল গান। মানুষে মানুষে যে-সম্বন্ধ সেটার মধ্যে আত্মিকতার সৌন্দর্য ছিল।

প্রথম বয়সে যে ইংরেজ কবিদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হল তাঁরা বাহিরকে নিজের অন্তরের যোগে দেখেছিলেন; জগৎটা হয়েছিল তাঁদের নিজের ব্যক্তিগত। আপন কল্পনা মত ও রুচি সেই বিশ্বকে শুধু যে কেবল মানবিক ও মানসিক করেছিল তা নয়, তাকে করেছিল বিশেষ কবির মনোগত। ওয়ার্ড্‌স্বার্থের জগৎ ছিল বিশেষভাবে ওয়ার্ড্‌স্বার্থীয়, শেলির ছিল শেলীয়, বাইরনের ছিল বাইরনিক। রচনার ইন্দ্রজালে সেটা পাঠকেরও নিজের হয়ে উঠত। বিশেষ কবির জগতে যেটা আমাদের আনন্দ দিত সেটা বিশেষ ঘরের রসের আতিথ্যে। ফুল তার আপন রঙের গন্ধের বৈশিষ্ট্যদ্বারায় মৌমাছিকে নিমন্ত্রণ পাঠায়; সেই নিমন্ত্রণলিপি মনোহর। কবির নিমন্ত্রণেও স্বভাবতই সেই মনোহারিতা ছিল। যে-যুগে সংসারের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিত্ব-সম্বন্ধটা প্রধান সে-যুগে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণকে সযত্নে জাগিয়ে রাখতে হয়; সে-যুগে বেশে ভূষায় শোভনরীতিতে নিজের পরিচয়কে উজ্জ্বল করবার একটা যেন প্রতিযোগিতা থাকে।

দেখা যাচ্ছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংরেজি কাব্যে পূর্ববর্তীকালের আচারের প্রাধান্য ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের দিকে বাঁক ফিরিয়েছিল। তখনকার কালে সেইটেই হল আধুনিকতা।

কিন্তু, আজকের দিনে সেই আধুনিকতাকে মধ্যভিক্টোরীয় প্রাচীনতা সংজ্ঞা দিয়ে তাকে পাশের কামরায় আরাম-কেদারায় শুইয়ে রাখবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখনকার দিনে ছাঁটা কাপড় ছাঁটা চুলের খট্‌খটে আধুনিকতা। ক্ষণে ক্ষণে গালে পাউডার, ঠোঁটে রঙ লাগানো হয় না তা নয়; কিন্তু সেটা প্রকাশ্য, উদ্ধত অসংকোচে। বলতে চায় মোহ জিনিসটাতে আর-কোনো দরকার নেই। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে পদে পদে মোহ; সেই মোহের বৈচিত্র্যই নানা রূপের মধ্য দিয়ে নানা সুর বাজিয়ে তোলে। কিন্তু, বিজ্ঞান তার নাড়ীনক্ষত্র বিচার ক’রে দেখেছে; বলছে, মূলে মোহ নেই, আছে কার্বন, আছে নাইট্রোজেন, আছে ফিজিওলজি, আছে সাইকলজি। আমরা সেকালের কবি, আমরা এইগুলোকেই গৌণ জানতুম, মায়াকেই জানতুম মুখ্য। তাই সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছন্দে বন্ধে ভাষায় ভঙ্গিতে মায়া বিস্তার ক’রে মোহ জন্মাবার চেষ্টা করেছি, এ কথা কবুল করতেই হবে। ইশারা-ইঙ্গিতে কিছু লুকোচুরি ছিল; লজ্জার যে-আবরণ সত্যের বিরুদ্ধ নয়, সত্যের আভরণ, সেটাকে ত্যাগ করতে পারি নি। তার ঈষৎ বাষ্পের ভিতর দিয়ে যে রঙিন আলো এসেছে সেই আলোতে উষা ও সন্ধ্যার একটি রূপ দেখেছি, নববধূর মতো তা সকরুণ। আধুনিক দুঃশাসন জনসভায় বিশ্বদ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে লেগেছে; ও দৃশ্যটা আমাদের অভ্যস্ত নয়। সেই অভ্যাসপীড়ার জন্যেই কি সংকোচ লাগে। এই সংকোচের মধ্যে কোনো সত্য কি নেই। সৃষ্টিতে যে আবরণ প্রকাশ করে, আচ্ছন্ন করে না, তাকে ত্যাগ করলে সৌন্দর্যকে কি নিঃস্ব হতে হয় না।

কিন্তু, আধুনিক কালের মনের মধ্যেও তাড়াহুড়ো, সময়েরও অভাব। জীবিকা জিনিসটা জীবনের চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে। তাড়া-লাগানো যন্ত্রের ভিড়ের মধ্যেই মানুষের হূ হূ ক’রে কাজ, হুড়মূড় ক’রে আমোদ-প্রমোদ। যে-মানুষ একদিন রয়ে-বসে আপনার সংসারকে আপনার ক’রে সৃষ্টি করত সে আজ কারখানার উপর বরাত দিয়ে প্রয়োজনের মাপে তড়িঘড়ি একটা সরকারি আদর্শে কাজ-চালানো কাণ্ড খাড়া ক’রে তোলে। ভোজ উঠে গেছে, ভোজনটা বাকি। মনের সঙ্গে মিল হল কি না সে কথা ভাববার তাগিদ নেই, কেননা মন আছে অতি প্রকাণ্ড জীবিকা-জগন্নাথের রথের দড়ি ভিড়ের লোকের সঙ্গে মিলে টানবার দিকে। সংগীতের বদলে তার কণ্ঠে শোনা যায়, “মারো ঠেলা হেঁইয়োঁ।’ জনতার জগতেই তাকে বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয়, আত্মীয়সম্বন্ধের জগতে নয়। তার চিত্তবৃত্তিটা ব্যস্তবাগীশের চিত্তবৃত্তি। হুড়োহুড়ির মধ্যে অসজ্জিত কুৎসিতকে পাশ কাটিয়ে চলবার প্রবৃত্তি তার নেই।

কাব্য তা হলে আজ কোন্‌ লক্ষ্য ধরে কোন্‌ রাস্তায় বেরোবে। নিজের মনের মতো ক’রে পছন্দ করা, বাছাই করা, সাজাই করা, এ এখন আর চলবে না। বিজ্ঞান বাছাই করে না, যা-কিছু আছে তাকে আছে ব’লেই মেনে নেয়, ব্যক্তিগত অভিরুচির মূল্যে তাকে যাচাই করে না, ব্যক্তিগত অনুরাগের আগ্রহে তাকে সাজিয়ে তোলে না। এই বৈজ্ঞানিক মনের প্রধান আনন্দ কৌতূহলে, আত্মীয়সম্বন্ধ-বন্ধনে নয়। আমি কী ইচ্ছে করি সেটা তার কাছে বড়ো নয়, আমাকে বাদ দিয়ে জিনিসটা স্বয়ং ঠিকমত কী সেইটেই বিচার্য। আমাকে বাদ দিলে মোহের আয়োজন অনাবশ্যক।

তাই এই বৈজ্ঞানিক যুগের কাব্যব্যবস্থায় যে-ব্যয়সংক্ষেপ চলছে তার মধ্যে সব চেয়ে প্রধান ছাঁট পড়ল প্রসাধনে। ছন্দে বন্ধে ভাষায় অতিমাত্র বাছাবাছি চুকে যাবার পথে। সেটা সহজভাবে নয়, অতীত যুগের নেশা কাটাবার জন্যে তাকে কোমর বেঁধে অস্বীকার করাটা হয়েছে প্রথা। পাছে অভ্যাসের টানে বাছাই-বুদ্ধি পাঁচিল ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে এইজন্যে পাঁচিলের উপর রূঢ় কুশ্রীভাবে ভাঙা কাঁচ বসানোর চেষ্টা। একজন কবি লিখেছেন; I am the greatest laugher of all । বলছেন,” আমি সবার চেয়ে বড়ো হাসিয়ে, সূর্যের চেয়ে বড়ো, ওক গাছের চেয়ে, ব্যাঙের চেয়ে, অ্যাপলো দেবতার চেয়ে।’ Than the frog and Apollo এটা হল ভাঙা কাচ। পাছে কেউ মনে করে কবি মিঠে করে সাজিয়ে কথা কইছে। ব্যাঙ না বলে যদি বলা হত সমুদ্র, তা হলে এখনকার যুগ আপত্তি করে বলতে পারত, ওটা দস্তুরমত কবিয়ানা। হতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি উলটো ছাঁদের দস্তুরমত কবিয়ানা হল ঐ ব্যাঙের কথা। অর্থাৎ, ওটা সহজ কলমের লেখা নয়, গায়ে পড়ে পা মাড়িয়ে দেওয়া। এইটেই হালের কায়দা।

কিন্তু, কথা এই যে, ব্যাঙ জীবটা ভদ্র কবিতায় জল-আচরণীয় নয়, এ কথা মানবার দিন গেছে। সত্যের কোঠায় ব্যাঙ অ্যাপলোর চেয়ে বড়ো বৈ ছোটো নয়। আমিও ব্যাঙকে অবজ্ঞা করতে চাই নে। এমন-কি, যথাস্থানে কবিপ্রেয়সীর হাসির সঙ্গে ব্যাঙের মক্‌মক্‌ হাসিকে এক পঙ্‌ক্তিতেও বসানো যেতে পারে, প্রেয়সী আপত্তি করলেও। কিন্তু, অতিবড়ো বৈজ্ঞানিক সাম্যতত্ত্বেও যে-হাসি সূর্যের, যে-হাসি ওক্‌বনস্পতির, যে-হাসি অ্যাপলোর, সে-হাসি ব্যাঙের নয়। এখানে ওকে আনা হয়েছে জোর ক’রে মোহ ভাঙবার জন্যে।

মোহের আবরণ তুলে দিয়ে যেটা যা সেটাকে ঠিক তাই দেখতে হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মায়ার রঙে যেটা রঙিন ছিল আজ সেটা ফিকে হয়ে এসেছে; সেই মিঠের আভাসমাত্র নিয়ে ক্ষুধা মেটে না, বস্তু চাই। “ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং’ বললে প্রায় বারোআনা অত্যুক্তি করা হয়। একটি আধুনিকা মেয়ে কবি গত যুগের সুন্দরীকে খুব স্পষ্ট ভাষায় যে-সম্ভাষণ করেছেন সেটাকে তর্জমা ক’রে দিই। তর্জমায় মাধুরী সঞ্চার করলে বেখাপ হবে, চেষ্টাও সফল হবে না —

    তুমি সুন্দরী এবং তুমি বাসি

    যেন পুরনো একটা যাত্রার সুর

    বাজছে সেকেলে একটা সারিন্দি যন্ত্রে।

    কিম্বা তুমি সাবেক আমলের বৈঠকখানায়

    যেন রেশমের আসবাব, তাতে রোদ পড়েছে।

    তোমার চোখে আয়ুহারা মুহূর্তের

    ঝরা গোলাপের পাপড়ি যাচ্ছে জীর্ণ হয়ে।

    তোমার প্রাণের গন্ধটুকু অস্পষ্ট, ছড়িয়ে পড়া,

     ভাঁড়ের মধ্যে ঢেকে-রাখা মাথাঘষা মসলার মতো তার ঝাঁজ।

    তোমার অতিকোমল সুরের আমেজ আমার লাগে ভালো —

    তোমার ওই মিলে-মিশে-যাওয়া রঙগুলির দিকে তাকিয়ে

                                 আমার মন ওঠে মেতে।

    আর আমার তেজ যেন টাঁকশালের নতুন পয়সা

             তোমার পায়ের কাছে তাকে দিলেম ফেলে।

    ধুলো থেকে কুড়িয়ে নাও,

    তার ঝক্‌মকানি দেখে হয়তো তোমার মজা লাগবে।

এই আধুনিক পয়সাটার দাম কম কিন্তু জোর বেশি, আর এ খুব স্পষ্ট, টং ক’রে বেজে ওঠে হালের সুরে। সাবেক-কালের যে মাধুরী তার একটা নেশা আছে, কিন্তু এর আছে স্পর্ধা। এর মধ্যে ঝাপসা কিছুই নেই।

এখনকার কাব্যের যা বিষয় তা লালিত্যে মন ভোলাতে চায় না। তা হলে সে কিসের জোরে দাঁড়ায়। তার জোর হচ্ছে আপন সুনিশ্চিত আত্মতা নিয়ে, ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যারেক্টার। সে বলে, “অয়মহং ভোঃ, আমাকে দেখো।’ ঐ মেয়ে কবি, তাঁর নাম এমি লোয়েল, একটি কবিতা লিখেছেন লাল চটিজুতোর দোকান নিয়ে। ব্যাপারখানা এই যে, সন্ধ্যাবেলায় বাইরে বরফের ঝাপটা উড়িয়ে হাওয়া বইছে, ভিতরে পালিশ-করা কাচের পিছনে লম্বা সার করে ঝুলছে লাল চটিজুতোর মালা –like stalactites of blood flooding the eyes of passers-by with dripping color, jamming their crimson reflections against the windows of cabs and tramcars, screaming their claret and salmon into the teeth of the sleet, plopping their little round maroon lights upon the tops of umbrellas। The row of white, sparkling shop fronts is gashed and bleeding, it bleeds red slippers। সমস্তটা এই চটি-জুতো নিয়ে।

একেই বলা যায় নৈর্ব্যক্তিক, impersonal। ঐ চটিজুতোর মালার উপর বিশেষ আসক্তির কোনো কারণ নেই, না খরিদ্‌দার না দোকানদার ভাবে। কিন্তু, দাঁড়িয়ে দেখতে হল, সমস্ত ছবির একটা আত্মতা যেই ফুটে উঠল অমনি তার তুচ্ছতা আর রইল না। যারা মানে-কুড়ানিয়া তারা জিজ্ঞাসা করবে, “মানে কী হল, মশায়। চটিজুতো নিয়ে এত হল্লা কিসের, নাহয় হলই বা তার রঙ লাল।’ উত্তরে বলতে হয়, “চেয়েই দেখো-না।’ “দেখে লাভ কী’ তার কোনো জবাব নাই।

নন্দনতত্ব (Aesthetics) সম্বন্ধে এজ্‌রা পৌণ্ডের একটি কবিতা আছে। বিষয়টি এই যে, একটি মেয়ে চলেছিল রাস্তা দিয়ে, একটা ছোটো ছেলে, তালি দেওয়া কাপড় পরা, তার মন উঠল জেগে, সে থাকতে পারল না; বলে উঠল, “দেখ্‌ চেয়ে রে, কী সুন্দর।” এই ঘটনার তিন বৎসর পরে ঐ ছেলেটারই সঙ্গে আবার দেখা। সে বছর জালে সার্ডিন মাছ পড়েছিল বিস্তর। বড়ো বড়ো কাঠের বাক্সে ওর দাদাখুড়োরা মাছ সাজাচ্ছিল, ব্রেস্‌চিয়ার হাটে বিক্রি করতে পাঠাবে। ছেলেটা মাছ ঘাঁটাঘাঁটি ক’রে লাফালাফি করতে লাগল। বুড়োরা ধমক দিয়ে বললে, “স্থির হয়ে বোস্‌।’ তখন সে সেই সাজানো মাছগুলোর উপর হাত বুলোতে বুলোতে তৃপ্তির সঙ্গে ঠিক সেই একই কথা আপন মনে বলে উঠল, “কী সুন্দর।’ কবি বলছেন, “শুনে I was mildly abashed।’

সুন্দরী মেয়েকেও দেখো সার্ডিন মাছকেও; একই ভাষায় বলতে কুন্ঠিত হোয়ো না, কী সুন্দর। এ দেখা নৈর্ব্যক্তিক — নিছক দেখা; এর পঙ্‌ক্তিতে চটিজুতোর দোকানকেও বাদ দেওয়া যায় না।

কাব্যে বিষয়ীর আত্মতা ছিল উনিশ শতাব্দীতে, বিশ শতাব্দীতে বিষয়ের আত্মতা। এইজন্যে কাব্যবস্তুর বাস্তবতার উপরেই ঝোঁক দেওয়া হয়, অলংকারের উপর নয়। কেননা, অলংকারটা ব্যক্তির নিজেরই রুচিকে প্রকাশ করে, খাঁটি বাস্তবতার জোর হচ্ছে বিষয়ের নিজের প্রকাশের জন্যে।

সাহিত্যে আবির্ভাবের পূর্বেই এই আধুনিকতা ছবিতে ভর করেছিল। চিত্রকলা যে ললিতকলার অঙ্গ, এই কথাটাকে অস্বীকার করবার জন্যে সে বিবিধপ্রকারে উৎপাত শুরু করে দিলে। সে বললে, আর্টের কাজ মনোহারিতা নয়, মনোজয়িতা; তার লক্ষণ লালিত্য নয়, যাথার্থ্য। চেহারার মধ্যে মোহকে মানলে না, মানলে ক্যারেক্টারকে অর্থাৎ একটা সমগ্রতার আত্মঘোষণাকে। নিজের সম্বন্ধে সেই চেহারা আর-কিছু পরিচয় দিতে চায় না, কেবল জোরের সঙ্গে বলতে চায় “আমি দ্রষ্টব্য’। তার এই দ্রষ্টব্যতার জোর হাবভাবের দ্বারা নয়, প্রকৃতির নকলবিশির দ্বারা নয়, আত্মগত সৃষ্টিসত্যের দ্বারা। এই সত্য ধর্মনৈতিক নয়, ব্যবহারনৈতিক নয়, ভাবব্যঞ্জক নয়, এ সত্য সৃষ্টিগত। অর্থাৎ, সে হয়ে উঠেছে ব’লেই তাকে স্বীকার করতে হয়। যেমন আমরা ময়ূরকে মেনে নিই, শকুনিকেও মানি, শুয়োরকেও অস্বীকার করতে পারি নে, হরিণকেও তাই।

কেউ সুন্দর, কেউ অসুন্দর; কেউ কাজের, কেউ অকাজের; কিন্তু সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো ছুতোয় কাউকে বাতিল করে দেওয়া অসম্ভব। সাহিত্যে, চিত্রকলাতেও সেইরকম। কোনো রূপের সৃষ্টি যদি হয়ে থাকে তো আর-কোনো জবাবদিহি নেই; যদি না হয়ে থাকে, যদি তার সত্তার জোর না থাকে, শুধু থাকে ভাবলালিত্য, তা হলে সেটা বর্জনীয়।

এইজন্যে আজকের দিনে যে-সাহিত্য আধুনিকের ধর্ম মেনেছে, সে সাবেক-কালের কৌলীন্যের লক্ষণ সাবধানে মিলিয়ে জাত বাঁচিয়ে চলাকে অবজ্ঞা করে, তার বাছবিচার নেই। এলিয়টের কাব্য এইরকম হালের কাব্য, ব্রিজেসের কাব্যতা নয়। এলিয়ট লিখছেন —

             এ-ঘরে ও-ঘরে যাবার রাস্তায় সিদ্ধ মাংসর গন্ধ,

             তাই নিয়ে শীতের সন্ধ্যা জমে এল।

             এখন ছ’টা —

             ধোঁয়াটে দিন, পোড়া বাতি, ষে অংশে ঠেকল।

             বাদলের হাওয়া পায়ের কাছে উড়িয়ে আনে

             পোড়ো জমি থেকে ঝুলমাখা শুক্‌নো পাতা

                       আর ছেঁড়া খবরের কাগজ।

             ভাঙা সার্শি আর চিম্‌নির চোঙের উপর

                       বৃষ্টির ঝাপট লাগে,

    আর রাস্তার কোণে একা দাঁড়িয়ে এক ভাড়াটে গাড়ির ঘোড়া,

    ভাপ উঠছে তার গা দিয়ে আর সে মাটিতে ঠুকছে খুর।

তার পরে বাসি বিয়ার-মদের গন্ধ-ওয়ালা কাদামাখা সকালের বর্ণনা। এই সকালে একজন মেয়ের উদ্দেশে বলা হচ্ছে —

             বিছানা থেকে তুমি ফেলে দিয়েছ কম্বলটা,

             চিৎ হয়ে পড়ে অপেক্ষা করে আছ,

             কখনো ঝিমচ্ছ, দেখছ রাত্রিতে প্রকাশ পাচ্ছে

             হাজার খেলো খেয়ালের ছবি

             যা দিয়ে তোমার স্বভাব তৈরি।

তার পরে পুরুষটার খবর এই —

His soul stretched tight across the skies

That fade behind a city block,

Or trampled by insistent feet

At four and five and six o’clock;

And short square fingers stuffing pipes

And evening newspapers, and eyes

Assured of certain certainties,

The conscience of a blackened street

Impatient to assume the world.

এই ধোঁয়াটে, এই কাদামাখা, এই নানা বাসি গন্ধ ও ছেঁড়া আবর্জনাওয়ালা নিতান্ত খেলো সন্ধ্যা, খেলো সকালবেলার মাঝখানে কবির মনে একটা বিপরীত জাতের ছবি জাগল। বললেন —

I am moved by fancies that are curled

Around these images, and cling;

The notion of some infinitely gentle

Infinitely suffering thing.

এইখানেই অ্যাপলের সঙ্গে ব্যাঙের মিল আর টিকল না। এইখানে কূপমণ্ডূকের মক্‌মক্‌ শব্দ অ্যাপলোর হাসিকে পীড়া দিল। একটা কথা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, কবি নিতান্তই বৈজ্ঞানিকভাবে নির্বিকার নন। খেলো সংসারটার প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা এই খেলো সংসারের বর্ণনার ভিতর দিয়েই প্রকাশ পাচ্ছে। তাই কবিতাটির উপসংহারে যে কথা বলেছেন সেটা এত কড়া —

             মুখের উপরে একবার হাত বুলিয়ে হেসে নাও।

             দেখো, সংসারটা পাক খাচ্ছে যেন বুড়িগুলো

             ঘুঁটে কুড়োচ্ছে পোড়ো জমি থেকে।

এই ঘুঁটে-কুড়োনো বুড়ো সংসারটার প্রতি কবির অনভিরুচি স্পষ্টই দেখা যায়। সাবেক-কালের সঙ্গে প্রভেদটা এই যে, রঙিন স্বপ্ন দিয়ে মনগড়া সংসারে নিজেকে ভুলিয়ে রাখার ইচ্ছেটা নেই। কবি এই কাদা ঘাঁটাঘাঁটির মধ্যে দিয়েই কাব্যকে হাঁটিয়ে নিয়ে বলেছেন, ধোপ-দেওয়া কাপড়টার উপর মমতা না ক’রে। কাদার উপর অনুরাগ আছে ব’লে নয়, কিন্তু কাদার সংসারে চোখ চেয়ে কাদাটাকেও জানতে হবে, মানতে হবে ব’লেই। যদি তার মধ্যেও অ্যাপলোর হাসি কোথাও ফোটে সে তো ভালোই, যদি না’ও ফোটে, তা হলে ব্যাঙের লম্ফমান অট্টহাস্যকে উপেক্ষা করবার প্রয়োজন নেই। ওটাও একটা পদার্থ তো বটে — এই বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে ওর দিকেও কিছুক্ষণ চেয়ে দেখা যায়, এর তরফেও কিছু বলবার আছে। সুসজ্জিত ভাষার বৈঠকখানায় ঐ ব্যাঙটাকে মানাবে না, কিন্তু অধিকাংশ জগৎসংসার ঐ বৈঠকখানার বাইরে।

সকালবেলায় প্রথম জাগরণ। সেই জাগরণে প্রথমটা নিজের উপলব্ধি, চৈতন্যের নূতন চাঞ্চল্য। এই অবস্থাটাকে রোমান্টিক বলা যায়। সদ্য-জাগা চৈতন্য বাইরে নিজেকে বাজিয়ে দেখতে বেরোয়। মন বিশ্বসৃষ্টিতে এবং নিজের রচনায় নিজের চিন্তাকে, নিজের বাসনাকে রূপ দেয়। অন্তরে যেটাকে চায় বাইরে সেটাকে নানা মায়া দিয়ে গড়ে। তার পরে আলো তীব্র হয়, অভিজ্ঞতা কঠোর হতে থাকে, সংসারের আন্দোলনে অনেক মায়াজাল ছিন্ন হয়ে যায়। তখন অনাবিল আলোকে, অনাবৃত আকাশে, পরিচয় ঘটতে থাকে স্পষ্টতর বাস্তবের সঙ্গে। এই পরিচিত বাস্তবকে ভিন্ন কবি ভিন্নরকম ক’রে অভ্যর্থনা করে। কেউ দেখে এ’কে অবিশ্বাসের চোখে বিদ্রোহের ভাবে; কেউ বা এ’কে এমন অশ্রদ্ধা করে যে, এর প্রতি রূঢ়ভাবে নির্লজ্জ ব্যবহার করতে কুন্ঠিত হয় না। আবার খর আলোকে অতিপ্রকাশিত এর যে-আকৃতি তারও অন্তরে কেউ বা গভীর রহস্য উপলব্ধি করে; মনে করে না, গূঢ় ব’লে কিছুই নেই; মনে করে না, যা প্রতীয়মান তাতেই সব-কিছু নিঃশেষে ধরা পড়ছে। গত য়ুরোপীয় যুদ্ধে মানুষের অভিজ্ঞতা এত কর্কশ, এত নিষ্ঠুর হয়েছিল, তার বহুযুগপ্রচলিত যত-কিছু আদব ও আব্রু তা সাংঘাতিক সংকটের মধ্যে এমন অকস্মাৎ ছারখার হয়ে গেল; দীর্ঘকাল যে-সমাজস্থিতিকে একান্ত বিশ্বাস ক’রে সে নিশ্চিন্ত ছিল তা এক মুহূর্তে দীর্ণবিদীর্ণ হয়ে গেল; মানুষ যে-সকল শোভনরীতি কল্যাণনীতিকে আশ্রয় করেছিল তার বিধ্বস্ত রূপ দেখে এতকাল যা-কিছুকে সে ভদ্র ব’লে জানত তাকে দুর্বল ব’লে, আত্মপ্রতারণার কৃত্রিম উপায় ব’লে, অবজ্ঞা করাতেই যেন সে একটা উগ্র আনন্দ বোধ করতে লাগল; বিশ্বনিন্দুকতাকেই সে সত্যনিষ্ঠতা ব’লে আজ ধরে নিয়েছে।

কিন্তু, আধুনিকতার যদি কোনো তত্ত্ব থাকে, যদি সেই তত্ত্বকে নৈর্ব্যক্তিক আখ্যা দেওয়া যায়, তবে বলতেই হবে, বিশ্বের প্রতি এই উদ্ধত অবিশ্বাস ও কুৎসার দৃষ্টি এও আকস্মিক বিপ্লবজনিত একটা ব্যক্তিগত চিত্তবিকার। এও একটা মোহ, এর মধ্যেও শান্ত নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে সহজভাবে গ্রহণ করবার গভীরতা নেই। অনেকে মনে করেন, এই উগ্রতা, এই কালাপাহাড়ি তাল-ঠোকাই আধুনিকতা। আমি তা মনে করি নে। ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জা আজ হাজার হাজার লোককে আক্রমণ করলেও বলব না, ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জাটাই দেহের আধুনিক স্বভাব। এহ বাহ্য। ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জাটার অন্তরালেই আছে সহজ দেহস্বভাব।

আমাকে যদি জিজ্ঞাসা কর বিশুদ্ধ আধুনিকতাটা কী, তা হলে আমি বলব, বিশ্বকে ব্যক্তিগত আসক্তভাবে না দেখে বিশ্বকে নির্বিকার তদ্‌গতভাবে দেখা। এই দেখাটাই উজ্জ্বল, বিশুদ্ধ; এই মোহমুক্ত দেখাতেই খাঁটি আনন্দ। আধুনিক বিজ্ঞান যে নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে আধুনিক কাব্য সেই নিরাসক্ত চিত্তে বিশ্বকে সমগ্রদৃষ্টিতে দেখবে, এইটেই শাশ্বতভাবে আধুনিক।

কিন্তু, এ’কে আধুনিক বলা নিতান্ত বাজে কথা। এই-যে নিরাসক্ত সহজ দৃষ্টির আনন্দ এ কোনো বিশেষ কালের নয়। যার চোখ এই অনাবৃত জগতে সঞ্চরণ করতে জানে এ তারই। চীনের কবি লি-পো যখন কবিতা লিখছিলেন সে তো হাজার বছরের বেশি হল। তিনি ছিলেন আধুনিক; তাঁর ছিল বিশ্বকে সদ্য-দেখা চোখ। চারটি লাইনে সাদা ভাষায় তিনি লিখছেন —

    এই সবুজ পাহাড়গুলোর মধ্যে থাকি কেন।

    প্রশ্ন শুনে হাসি পায়, জবাব দিই নে। আমার মন নিস্তব্ধ।

    যে আর-এক আকাশে আর-এক পৃথিবীতে বাস করি —

    সে জগৎ কোনো মানুষের না।

    পীচগাছে ফুল ধরে, জলের স্রোত যায় বয়ে।

আর একটা ছবি —

    নীল জল — নির্মল চাঁদ,

    চাঁদের আলোতে সাদা সারস উড়ে চলেছে।

    ওই শোনো, পানফল জড়ো করতে মেয়েরা এসেছিল;

    তারা বাড়ি ফিরছে রাত্রে গান গাইতে গাইতে।

আর-একটা —

    নগ্ন দেহে শুয়ে আছি বসন্তে সবুজ বনে।

   এতই আলস্য যে সাদা পালকের পাখাটা নড়াতে গা লাগছে না।

    টুপিটা রেখে দিয়েছি ওই পাহাড়ের আগায়,

    পাইনগাছের ভিতর দিয়ে হাওয়া আসছে

    আমার খালি মাথার ‘পরে।

একটি বধূর কথা —

    আমার ছাঁটা চুল ছিল খাটো, তাতে কপাল ঢাকত না।

    আমি দরজার সামনে খেলা করছিলুম, তুলছিলুম ফুল।

    তুমি এলে আমার প্রিয়, বাঁশের খেলা-ঘোড়ায় চ’ড়ে,

    কাঁচা কুল ছড়াতে ছড়াতে।

    চাঁঙ্‌কানের গলিতে আমরা থাকতুম কাছে কাছে।

    আমাদের বয়স ছিল অল্প, মন ছিল আনন্দে ভরা।

    তোমার সঙ্গে বিয়ে হল যখন আমি পড়লুম চোদ্দয়।

    এত লজ্জা ছিল যে হাসতে সাহস হত না,

    অন্ধকার কোণে থাকতুম মাথা হেঁট ক’রে,

    তুমি হাজার বার ডাকলেও মুখ ফেরাতুম না।

    পনেরো বছরে পড়তে আমার ভুর্‌কুটি গেল ঘুচে,

    আমি হাসলুম। …

    আমি যখন ষোলো তুমি গেলে দূর প্রবাসে —

    চ্যুটাঙের গিরিপথে, ঘূর্ণিজল আর পাথরের ঢিবির ভিতর দিয়ে।

    পঞ্চম মাস এল, আমার আর সহ্য হয় না।

  আমাদের দরজার সামনে রাস্তা দিয়ে তোমাকে যেতে দেখছিলুম,

    সেখানে তোমার পায়ের চিহ্ন সবুজ শ্যাওলায় চাপা পড়ল —

    সে শ্যাওলা এত ঘন যে ঝাঁট দিয়ে সাফ করা যায় না।

     অবশেষে শরতের প্রথম হাওয়ায় তার উপরে জমে উঠল ঝরা পাতা।

    এখন অষ্টম মাস, হলদে প্রজাপতিগুলো

    আমাদের পশ্চিম-বাগানের ঘাসের উপর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।

  আমার বুক যে ফেটে যাচ্ছে, ভয় হয় পাছে আমার রূপ যায় ম্লান হয়ে।

    ওগো, যখন তিনটে জেলা পার হয়ে তুমি ফিরবে

    আগে থাকতে আমাকে খবর পাঠাতে ভুলো না।

     চাঙফেঙ্‌শার দীর্ঘ পথ বেয়ে আমি আসব, তোমার সঙ্গে দেখা হবে।

    দূর ব’লে একটুও ভয় করব না।

এই কবিতায় সেন্টিমেন্টের সুর একটুও চড়ানো হয় নি, তেমনি তার ‘পরে বিদ্রূপ বা অবিশ্বাসের কটাক্ষপাত দেখছি নে। বিষয়টা অত্যন্ত প্রচলিত, তবু এতে রসের অভাব নেই। স্টাইল বেঁকিয়ে দিয়ে একে ব্যঙ্গ করলে জিনিসটা আধুনিক হত। কেননা, সবাই যাকে অনায়াসে মেনে নেয় আধুনিকেরা কাব্যে তাকে মানতে অবজ্ঞা করে। খুব সম্ভব, আধুনিক কবি ঐ কবিতার উপসংহারে লিখত, স্বামী চোখের জল মুছে পিছন ফিরে তাকাতে তাকাতে চলে গেল, আর মেয়েটি তখনি লাগল শুকনো চিংড়িমাছের বড়া ভাজতে। কার জন্যে। এই প্রশ্নের উত্তরে থাকত দেঢ় লাইন ভরে ফুট্‌কি। সেকেলে পাঠক জিজ্ঞাসা করত, “এটা কী হল।’ একেলে কবি উত্তর করত, “এমনতরো হয়েই থাকে।’ “অন্যটাও তো হয়।’ “হয় বটে, কিন্তু বড়ো বেশি ভদ্র। কিছু দুর্গন্ধ না থাকলে ওর শৌখিন ভাব ঘোচে না, আধুনিক হয় না।’ সেকালে কাব্যের বাবুগিরি ছিল, সৌজন্যের সঙ্গে জড়িত। একেলে কাব্যেরও বাবুগিরি আছে, সেটা পচা মাংসের বিলাসে।

চীনে কবিতাটির পাশে বিলিতি কবিদের আধুনিকতা সহজ ঠেকে না। সে আবিল। তাদের মনটা পাঠককে কনুই দিয়ে ঠেলা মারে। তারা যে-বিশ্বকে দেখছে এবং দেখাচ্ছে সেটা ভাঙন-ধরা, রাবিশ-জমা, ধুলো-ওড়া। ওদের চিত্ত যে আজ অসুস্থ, অসুখী, অব্যবস্থিত। এ অবস্থায় বিশ্ববিষয় থেকে ওরা বিশুদ্ধভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে না। ভাঙা প্রতিমার কাঠ খড় দেখে ওরা অট্টহাস্য করে; বলে, আসল, জিনিসটা এতদিনে ধরা পড়েছে। সেই ঢেলা, সেই কাঠখড়গুলোকে খোঁচা মেরে কড়া কথা বলাকেই ওরা বলে খাঁটি সত্যকে জোরের সঙ্গে স্বীকার করা।

এই প্রসঙ্গে এলিয়টের একটি কবিতা মনে পড়ছে। বিষয়টি এই : বুড়ি মারা গেল, সে বড়ো ঘরের মহিলা। যথানিয়মে ঘরের ঝিলিমিলিগুলো নাবিয়ে দেওয়া, শববাহকেরা এসে দস্তুরমত সময়োচিত ব্যবস্থা করতে প্রবৃত্ত। এ দিকে খাবার ঘরে বাড়ির বড়ো-খান্‌সামা ডিনার-টেবিলের ধারে বসে, বাড়ির মেজো-ঝিকে কোলের উপর টেনে নিয়ে।

ঘটনাটা বিশ্বাসযোগ্য এবং স্বাভাবিক সন্দেহ নাই। কিন্তু, সেকেলে মেজাজের লোকের মনে প্রশ্ন উঠবে, তা হলেই কি যথেষ্ট হল। এ কবিতাটা লেখবার গরজ কী নিয়ে, এটা পড়তেই বা যাব কেন। একটি মেয়ের সুন্দর হাসির খবর কোনো কবির লেখায় যদি পাই তা হলে বলব, এ খবরটা দেবার মতো বটে। কিন্তু, তার পরেই যদি বর্ণনায় দেখি, ডেন্টিস্‌ট্‌ এল, সে তার যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলে মেয়েটির দাঁতে পোকা পড়েছে, তা হলে বলতে হবে, নিশ্চয়ই এটাও খবর বটে কিন্তু সবাইকে ডেকে ডেকে বলবার মতো খবর নয়। যদি দেখি কারো এই কথাটা প্রচার করতেই বিশেষ ঔৎসুক্য, তা হলে সন্দেহ করব, তারও মেজাজে পোকা পড়েছে। যদি বলা হয়, আগেকার কবিরা বাছাই ক’রে কবিতা লিখতেন, অতি-আধুনিকেরা বাছাই করেন না, সে কথা মানতে পারি নে; এঁরাও বাছাই করেন। তাজা ফুল বাছাই করাও বাছাই, আর শুকনো পোকায়-খাওয়া ফুল বাছাইও বাছাই। কেবল তফাত এই যে, এঁরা সর্বদাই ভয় করেন পাছে এঁদের কেউ বদনাম দেয় যে এঁদের বাছাই করার শখ আছে। অঘোরপন্থীরা বেছে বেছে কুৎসিত জিনিস খায়, দূষিত জিনিস ব্যবহার করে, পাছে এটা প্রমাণ হয় ভালো জিনিসে তাদের পক্ষপাত। তাতে ফল হয়, অ-ভালো জিনিসেই তাদের পক্ষপাত পাকা হয়ে ওঠে। কাব্যে অঘোরপন্থীর সাধনা  যদি প্রচলিত হয়, তা হলে শুচি জিনিসে যাদের স্বাভাবিক রুচি তারা যাবে কোথায়। কোনো কোনো গাছে ফুলে পাতায় কেবলই পোকা ধরে, আবার অনেক গাছে ধরে না — প্রথমটাকেই প্রাধান্য দেওয়াকেই কি বাস্তব-সাধনা ব’লে বাহাদুরি করতে হবে।

একজন কবি একটি সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকের বর্ণনা করছেন —

    রিচার্ড কোডি যখন শহরে যেতেন

    পায়ে-চলা পথের মানুষ আমরা তাকিয়ে থাকতুম তাঁর দিকে।

    ভদ্র যাকে বলে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত,

    ছিপছিপে যেন রাজপুত্র।

    সাদাসিধে চালচলন, সাদাসিধে বেশভূষা —

  কিন্তু যখন বলতেন “গুড্‌ মর্নিং’ আমাদের নাড়ী উঠত চঞ্চল হয়ে।

    চলতেন যখন ঝলমল করত।

    ধনী ছিলেন অসম্ভব।

    ব্যবহারে প্রসাদগুণ ছিল চমৎকার।

    যা-কিছু এঁর চোখে পড়ত মনে হত,

    আহা, আমি যদি হতুম ইনি।

    এ দিকে আমরা যখন মরছি খেটে খেটে,

    তাকিয়ে আছি কখন জ্বলবে আলো,

    ভোজনের পালায় মাংস জোটে না,

    গাল পাড়ছি মোটা রুটিকে —

    এমন সময় একদিন শান্ত বসন্তের রাত্রে

    রিচার্ড কোডি গেলেন বাড়িতে,

    মাথার মধ্যে চালিয়ে দিলেন এক গুলি। ১

এই কবিতার মধ্যে আধুনিকতার ব্যঙ্গকটাক্ষ বা অট্টহাস্য নেই, বরঞ্চ কিছু করুণার আভাস আছে। কিন্তু, এর মধ্যে একটা নীতিকথা আছে, সেটা আধুনিক নীতি। সে হচ্ছে এই যে, যা সুস্থ ব’লে সুন্দর ব’লে প্রতীয়মান তার অন্তরে কোথাও একটা সাংঘাতিক রোগ হয়তো আছে। যাকে ধনী ব’লে মনে হয় তার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ব’সে আছে উপবাসী। যাঁরা সেকেলে বৈরাগ্যপন্থী তাঁরাও এই ভাবেই কথা বলেছেন। যারা বেঁচে আছে তাদের তাঁরা মনে করিয়ে দেন, একদিন বাঁশের দোলায় চড়ে শ্মশানে যেতে হবে। য়ুরোপীয় সন্ন্যাসী উপদেষ্টারা বর্ণনা করেছেন মাটির নীচে গলিত দেহকে কেমন ক’রে পোকায় খাচ্ছে। যে দেহকে সুন্দর ব’লে মনে করি সে যে অস্থিমাংস-রসরক্তের কদর্য সমাবেশ, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের চট্‌কা ভাঙিয়ে দেবার চেষ্টা নীতিশাস্ত্রে দেখা গেছে। বৈরাগ্যসাধনার পক্ষে প্রকৃষ্ট উপায়, এইরকম প্রত্যক্ষ বাস্তবের প্রতি বারে বারে অশ্রদ্ধা জন্মিয়ে দেওয়া। কিন্তু, কবি তো বৈরাগীর চেলা নয়, সে তো অনুরাগেরই পক্ষ নিতে এসেছে। কিন্তু, এই আধুনিক যুগ কি এমনি জরাজীর্ণ যে সেই কবিকেও লাগল শ্মশানের হাওয়া — এমন কথা সে খুশি হয়ে বলতে শুরু করেছে, যাকে মহৎ ব’লে মনে করি সে ঘুণে ধরা, যাকে সুন্দর ব’লে আদর করি তারই মধ্যে অস্পৃশ্যতা?

মন যাদের বুড়িয়ে গেছে তাদের মধ্যে বিশুদ্ধ স্বাভাবিকতার জোর নেই। সে মন অশুচি অসুস্থ হয়ে ওঠে। বিপরীত পন্থায় সে মন নিজের অসাড়তাকে দূর করতে চায়, গাঁজিয়ে-ওঠা পচা জিনিসের মতো যত-কিছু বিকৃতি নিয়ে সে নিজেকে ঝাঁঝিয়ে তোলে লজ্জা এবং ঘৃণা ত্যাগ কঁরে তবে তার বলিরেখাগুলোর মধ্যে হাসির প্রবাহ বইতে পারে।

মধ্য ভিক্টোরীয় যুগ বাস্তবকে সম্মান ক’রে তাকে শ্রদ্ধেয়রূপেই অনুভব করতে চেয়েছিল, এ যুগ বাস্তবকে অবমানিত ক’রে সমস্ত আব্রু ঘুচিয়ে দেওয়াকেই সাধনার বিষয় ব’লে মনে করে।

বিশ্ববিষয়ের প্রতি অতিমাত্র শ্রদ্ধাকে যদি বলো সেন্টিমেন্টালিজ্‌ম্‌, তার প্রতি গায়ে-পড়া বিরুদ্ধতাকেও সেই একই নাম দেওয়া যেতে পারে। যে কারণেই হোক, মন এমন বিগড়ে গেলে দৃষ্টি সহজ হয় না। অতএব মধ্য-ভিক্টোরীয় যুগকে যদি অতিভদ্রয়ানার পাণ্ডা ব’লে ব্যঙ্গ কর তবে এডোয়ার্ডি যুগকেও ব্যঙ্গ করতে হয় উলটো বিশেষণ দিয়ে। ব্যাপারখানা স্বাভাবিক নয়, অতএব শাশ্বত নয়। সায়ান্সেই বল আর আর্টেই বল, নিরাসক্ত মনই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন; য়ুরোপ সায়ান্সে সেটা পেয়েছে কিন্তু সাহিত্যে পায় নি।

*************************************************************************************

Modern Poetry

Writing about modern English poets is by no means an easy task, for who defines the limit of the modern age in terms of the almanac? It is not so much a question of time as of spirit.

After flowing straight for a while, most rivers take a sudden turn. Likewise, literature does not always follow the straight path; when it takes a turn, that turn must be called modern or adhunik in Bengali. This modernity depends not upon time but upon temperament.

The poetry to which I was introduced in my boyhood might have been classed as modern in those days. Poetry had taken a new turn, beginning from Robert Burns, and that gave birth to other great poets, such as Wordsworth, Coleridge, Shelley, and Keats.

The manners and customs of a society are shown in social usage. In countries where these social customs suppress all freedom and individual taste, man becomes a puppet, and his conduct conforms meticulously to social etiquette. Society appreciates this traditional and habitual way of life. Sometimes literature remains in this groove for long periods of time, and those anointed with perfect literary style are seen upon as a saintly person. During the age of English poetry that followed Burns, the barriers of style were broken down, and temperament made its debut. “The lake bedecked with lotuses and lilies” became a lake seen through the special view of official blinkers fashioned in the classic workshop. When a daring writer removes those blinkers and catch phrases, and truly begins to open their eyes, they also open up a view through which the lake assumes different aspects and various fancies. But tradition feels a sense of “Shame”.

When we began to read English poetry, this unconventionally individualistic mood had already been acknowledged in literature, and the uproar raised by the Edinburgh Review was spent. That period of our life was a new era in modernism.

In those days, the sign of modernism in poetry was an individual’s measure of delight. Wordsworth expressed in his own style the spirit of delight that he felt in nature. Shelley’s was a Platonic contemplation, accompanied by a spirit of revolt against every kind of obstacle, political, religious or otherwise. Keat’s poetry came from meditation and creation of beauty. In that age, poetry took a turn from outward movement to inner thought.

A poet’s deepest feelings strive for immortality by assuming a form in language. Love adorns itself; it seeks to prove inward joy by outward beauty. There was a time when humanity in its moments of leisure sought to beautify that portion of the universe with which it came into contact, and this outer adornment was the expression of its inner love, and with this love, there could be no indifference. In those days, in the exuberance of his sense of beauty man began to decorate the common articles of daily use; his inspiration lent creative power to his fingers. In every land and village, household utensils and the adornment of the home and person bound man, in color and form, to these outward insignia of life. Many ceremonies were evolved for adding zest to social life, many new melodies, arts and crafts in wood and metal, clay and stone, silk, wool and cotton. In those days, the husband called his wife: “beloved disciple in the fine arts.” The bank balance did not constitute the principal asset of the married couple in the work of setting up house; the arts were a more necessary item. Flower garlands were woven, the art of dancing was taught, accompanied by lessons in the vina, the flute and singing, and young women knew how to paint the ends of their saris of China silk. Then, there was beauty in human relationships.

The English poets with whom we came into contact in my early youth saw the universe with their own eyes; it had become their personal property. Not only did their own imaginations, opinions and tastes humanize and intellectualize the universe, but they molded it according to their individual desires. The universe of Wordsworth was specially “Wordsworthian,” of Shelley, “Shelleyan,” of Byron, “Byronic.” By creative magic it also became the reader’s universe. The joy that we felt in a poet’s world was the joy of enjoying the delight of a particular world aroma. The flower sent its invitation to the bee through a distinctive smell and color, and the note of invitation was sweet. The poet’s invitation possessed a spontaneous charm. In the days when the chief bond between man and universe was individuality, the personal touch in the invitation had to be fostered with care, a sort of competition had to be set up in dress and ornament and manners, in order to show oneself off to the best advantage.

Thus, we find that in the beginning of the nineteenth century the tradition which held priority in the English poetry of the previous age had given place to self-expression. This was called modernism.

But now that modernism is dubbed mid-Victorian senility and made to recline on an easy chair in the next room. Now is the day of the modernism of lopped skirts and lopped hair. Powder is applied to the cheeks and rouge to the lips, and it is proclaimed that the days of illusion are over. But there is always illusion at every step of the creation, and it is only the variety of that illusions which plays so many tunes in so many forms. Science has thoroughly examined every pulse beat, and declares that at the root of things there is no illusion; there is carbon and nitrogen, there is physiology and psychology. We old-fashioned poets thought the illusion was the main thing and carbon and physiology the by-products. Therefore, we must confess that we had striven to compete with the Creator in spreading the snare of illusion through rhyme and rhythm, language and style. In our metaphors and nuances there was some hide-and-seek; we were unable to lift aside that veil of modesty which adorns but does not contradict truth. In the colored light that filtered through the haze, the dawns and evenings appeared in a beauty as tender as a new bride. The modern, Dushashan, engaged in publicly disrobing Draupadi is a sight we are not accustomed to. Is it merely habit that makes us uncomfortable; is there no truth in this sense of shame; isn’t Beauty bankrupted once we lift the veil which reveals rather than conceals?

But the modern age is in a rush, and livelihood is more important. Man races through his work and rushes through his pleasure in a crowd of accelerating machines. The human being who used to create his own intimate world at leisure now delegates his duties to machinery and submits to a temporary mode of entertainment to cater to his needs according to some official recommendation. Feasts are passe; only meals remain. There is no desire to consider whether life is in harmony with the intellect, for the mind of man is also engaged in pulling the rope of the huge car of livelihood. Instead of music, we hear hoarse shouts of “Push, boys, push!” He has to spend most of his time with the crowed, not in the company of his friends; his mentality is the mentality of the hustler. In the midst of all this bustle he has no will power to bypass unadorned ugliness.

Which path must poetry now follow, then, and where does it seek to go? It is not possible these days to follow one’s own taste, to select, to arrange. Science does not select, it accepts whatever is; it does not appraise by the standard of personal taste nor embellish with the eagerness of personal involvement. The chief delight of the scientific mind consists in curiosity, not in forming ties of relationship. It does not regard what “I” want as the main consideration, but rather what the thing in itself exactly is, leaving “me” out of the question; and without “me,” illusion is unnecessary.

Therefore, in the process of economizing that is being carried out in the poetry of this scientific age, it is adornment that has suffered the biggest loss. A fastidious selectivity in the matter of rhyme, rhythm and words has become almost obsolete. The change is not taking place smoothly, but in order to break the spell of the past, it has become the fashion to repudiate it aggressively, like trying to arrange bits of broken glass in an ugly manner, lest the selective faculty should enter the house by jumping over the garden wall. A poet writes, “I am the greatest laugher of all, greater than the sun, than the oak tree, than the frog and Apollo.” “Than the frog and Apollo” is where the bits of broken glass come in, out of fear that someone will think that the poet is arranging his words sweetly and prettily. If the word “sea” were used instead of “frog,” the modernists might object to it as traditional poetry. Mentioning the frog is a more regular poetizing of the opposite kind. That is to say, it is not introduced naturally, but is like intentionally walking on your toes; that would be modern.

But the fact of the matter is, the days are gone for the frog to be admitted into poetry with the same respect as other creatures. In the category of reality, the frog now belongs to a higher class than Apollo. I do not wish to regard the frog with contempt; rather, in an appropriate context, the croaking laugh of the frog might be juxtaposed with the laugh of the poet’s beloved, even if she objected. But even according to the most ultra-scientific theory of equality, the laugh of the sun, of the oak tree, of Apollo, is not that of the frog. It has been dragged in by force in order to destroy the illusion.

Today. this veil of illusion must be removed and the thing must be seen exactly as it is. The illusion which colored the nineteenth century has now faded, and the mere suggestion of sweetness is not enough to satisfy one’s hunger – something tangible is required. When we say that one gains half the pleasure of eating from the mere smell of food, we exaggerate by nearly three quarters.
Here are a few lines from a poem addressed to a beauty of bygone days.

You are beautiful and faded Like an old opera tune
Played upon a harpsichord;
Or like the sun-flooded silks
Of an eighteenth-century boudoir.
In your eyes
Smoulder the fallen roses of outlived minutes,
And the perfume of your soul Is vague and suffusing,
With the pungence of sealed spice-jars.
Your half-tones delight me,
And I grow mad with gazing
At your blent colors.

My vigor is a new-minted penny,
Which I cast at your feet.
Gather it up from the dust,
That its sparkle may amuse you.

This kind of modern coinage is cheaper but stronger, and very definite; it clearly sounds the modern note. Old-fashioned charm had an intoxicating effect, but this poem has insolence; and there is nothing misty about it.

The subject matter of modern poetry does not seek to draw us with charm. Its strength consists in firm self-reliance, that which is called “character” in English. It calls out: Hey! See me, here am I. The same poet Amy Lowell, has written a poem on a shop selling red slippers. The theme is that in the evening the snowflakes are whirling outside in the wind; inside, behind polished glass windows, rows of red slippers hang like garlands, “like stalactites of blood, flooding the eyes of passers-by with dripping color, jamming their crimson reflections against the windows of cabs and tram-cars, screaming their claret and salmon into the teeth of the street, plopping their little round maroon lights upon the tops of umbrellas. The row of white, sparkling shop-fronts is gashed and bleeding, it bleeds red slippers.” The whole poem deals with slippers.

This is called impersonal. There is no ground for being particularly attached to these garlands of slippers, either as a buyer or a seller, but one has to stop and look; as soon as the character of the picture as a whole becomes apparent, it no longer remains trifling. Those concerned with meaning will ask, “What does it all mean, sir? Why so much bother about slippers, even if they are red?” To which one replies – “Just look at them yourself.” But the questioner asks, “What’s the good of looking?” To which there is no reply.

Let us take another example. There is a poem by Ezra Pound called “A Study in Aesthetics,” in which a girl walks along the street, and a boy in patched clothes cries out in uncontrollable excitement, “Oh! look, look, how beautiful!” Three years later, the poet meets the boy again during a great haul of sardines. The father and uncles box the fish in order to send them to the market at Breschia. The boy jumps about, handling the fish, and his elders scold him to be quiet. The boy strokes the neat rows of fish, and says with satisfaction “How beautiful!” On hearing this the poet says, “I was mildly abashed.”

The pretty girl and the sardines invite the same, “How beautiful!” This observation is impersonal, pure and simple; even the slipper-shop is not outside its purview.

In the nineteenth century poetry was subjective in character; in the twentieth it is objective. Hence, emphasis is now laid on the realism of the subject-matter, not on its adornment; for adornment expresses individual taste, whereas the power of reality consists in expressing the subject itself.

Before making its appearance in literature, this modernism exposed itself in painting. By creating disturbances, it sought to contradict the idea that painting was one of the fine arts. The function of art is not to charm but to conquer the mind, it argued; its sign is not beauty but truth. It did not acknowledge the illusion of form but rather the advertisement of the whole. This form has no other introduction to offer; it only wants to proclaim the fact that it is worth observing. This strong case for being observed is not made by appeals of gesture and posture, nor by copying nature, but by its own inherent truth, which is neither religious, moral, nor ideal – it is natural. That is to say, it must be acknowledged simply because it exists, just as we acknowledge the peacock and the vulture, just as we cannot deny the existence of the the pig or the deer.

Some are beautiful, others are ugly; some are useful, others harmful; but there is no possible pretext for discarding any from the sphere of creation. It is the same with literature and art. If any beauty has been created, it needs no apology; but if it possesses no innate strength of being, only sweetness, then it must be rejected.

Hence, present day literature that has accepted the creed of modernity, scorns to keep caste by carefully adjusting itself to bygone standards of aristocracy; it does not pick and choose. Eliot’s poetry is modern in this sense, but not Bridges’. Eliot writes:

The winter evening settles down
With smell of steaks in passageways,
Six o’clock.
The burnt out ends of smoky days.
And now a gusty shower wraps
The grimy scraps
Of withered leaves about your feet
And newspapers from vacant lots;
The showers beat
On broken blinds and chimney-pots.
And at the corner of the street
A lonely cab-horse steams and stamps.
And then the lighting of the lamps.

Then comes a description of a muddy morning filled with the smell of stale beer. On such a morning, the following words are addressed to a girl:

You tossed a blanket from the bed,
You lay upon your back, and waited;
You dozed, and watched the night revealing
The thousand sordid images
Of which your soul was constituted;

And this is the account given of the man:

His soul stretched tight across the skies
That fade behind a city block,
Or trampled by insistent feet
At four and five and six o’clock;
And short square fingers stuffing pipes,
And evening newspapers, and eyes
Assured of certain certainties,
The conscience of a blackened street
Impatient to assume the world.

In the midst of this smoky, this muddy, this altogether dingy morning and evening, full of many stale odors, and waste papers, the opposite picture is evoked in the poet’s mind. He says:

I am moved by fancies that are curled
Around these images, and cling:
The notion of some infinitely gentle
Infinitely suffering thing.

Here the link between Apollo and the frog is broken. Here the croaking of the frog in the well hurts the laughter of Apollo. It is clearly evident that the poet is not absolutely and scientifically impersonal. His loathing for this tawdry world is expressed through the very description he gives of it. Hence the bitter words with which he ends the poem:

Wipe your hand across your mouth, and laugh;
The worlds revolve like ancient women
Gathering fuel in vacant lots.

The poet’s distaste for this gathering world is evident. The difference from the past consists in there being no desire to delude oneself with an imaginary world of rosy dreams. The poet makes his poetry trudge through this mire regardless of his laundered clothes; not because he is fond of mud, but because in this muddy world one must look at mud with open eyes, and accept it. If Apollo’s laugh reaches one’s ears in the mud, well and good; if not, then one need not despise the loud, leaping laughter of the frog. One can look at it for a moment in the context of the universe; there is something to be said for this. The frog will seem out of place in the cultured language of the drawing-room; but then most of the world lies outside the drawing-room….

But if modernism has any philosophy, and if that philosophy is to be called impersonal, then one must admit that this attitude of aggressive disbelief and calumny toward the universe, is also a personal mental aberration owing to the sudden revolution. This also is an illusion, in which there is no serious attempt to accept reality naturally in a calm and dispassionate frame of mind. Many people think that this aggressiveness, this wantonly destructive challenging is what is called modernity.

I don’t agree with this. Even though thousands of people are attacked by influenza today, we cannot say that influenza is the natural state of the body in modern times. The natural body exists behind influenza.

Pure modernism consists in looking at the universe, not in a personal and self-regarding manner, but in an impersonal and matter-of-fact manner. This point of view is bright and pure, and there is real delight in this unclouded vision. In the same dispassionate way that modern science analyzes reality, modern poetry looks upon the universe as a whole; this is what is eternally modern.

But, actually, it is nonsense to call this modern. The joy of a natural and detached way of looking at things belongs to no particular age; it belongs to everyone whose eyes know how to wander over the naked earth. It is over a thousand years since the Chinese poet Li Po wrote his verses, but he was modern; he looked upon the universe with freshly-opened eyes. In a verse of four lines he writes simply:

Why do I live among the mountains?
I laugh and answer not, my soul is serene;
It dwells in another heaven and earth belonging to no man,
The peach trees are in flower, and the water flows on….

Another picture:

Blue water … a clear moon …
In the moonlight the white herons are flying.
Listen! Do you hear the girls who gather water-chestnuts?
They are going home in the night, singing.

Another:

Naked I lie in the green forest of summer…
Too lazy to wave my white-feathered fan.
I hang my cap on a crag,
And bare my head to the wind that comes
Blowing through the pine trees.

A river merchant’s wife writes:

I would play, plucking flowers by the gate;
My hair scarcely covered my forehead, then.
You would come, riding on your bamboo horse,
And loiter about the bench with green plums for toys.
So we both dwelt in Chang-kan town,
We were two children, suspecting nothing.At fourteen I became your wife,
And so bashful I could never bare my face,
But hung my head, and turned to the dark wall;
You would call me a thousand times,
But I could not look back even once.

At fifteen I was able to compose my eyebrows,
And beg you to love me till we were dust and ashes.

I was sixteen when you went on a long journey.
Traveling beyond the Ken-Tang gorge,
Where the giant rocks heap up the swift river,
And the rapids are not passable in May.
Did you hear the monkeys wailing
Up on the skyey height of the crags?

Do you know your footmarks by our gate are old,
And each and every one is filled up with green moss?
The mosses are too deep for me to sweep away;
And already in the autumn wind the leaves are falling.

The yellow butterflies of October
Flutter in pairs over the grass of the west garden
My heart aches at seeing them …
I sit sorrowing alone, and alas!
The vermillion of my face is fading.

Some day when you return down the river,
If you will write me a letter beforehand,
I will come to meet you – the way is not long –
I will come as far as the Long Wind Bench instantly.

In this poem the sentiment is neither maudlin nor ridiculous. The subject is familiar, and there is feeling. If the tone were sarcastic and there was ridicule, then the poem would be modern, because the moderns scorn to acknowledge in poetry that which everybody acknowledges naturally. Most probably a modern poet would have added at the end of this poem that the husband went his way after wiping his eyes and looking back repeatedly, and the girl at once set about frying dried prawn fish-balls. For whom? In reply there are a line-and-a-half of asterisks. The old-fashioned reader would ask, “What does this mean?” The modern poet would answer “This is how things are.” The reader would say, “But they also happen otherwise.” And the modern would answer, “Yes, they do, but that is too respectable. Unless it sheds its refinement, it does not become modern….”

Edwin Arlington Robinson has described an aristocrat thus:

Whenever Richard Cory went down town,
We people on the pavement looked at him:
He was a gentleman from sole to crown,
Clean favoured, and imperially slim.And he was always quietly arrayed,
And he was always human when he talked;
But still he fluttered pulses when he said,
“Good morning,” and he glittered when he walked.

And he was rich – yes, richer than a king –
And admirably schooled in every grace:
In fine, we thought that he was everything
To make us wish that we were in his place.

So on we worked, and waited for the light,
And went without the meat, and cursed the bread;
And Richard Cory, one calm summer night,
Went home a put a bullet through his head.

There is no modern sarcasm or loud laughter in this poem; on the contrary, there is pathos, which consists in the fact that there may be some fatal disease lurking inside the apparently healthy and beautiful.

He whom we consider rich has a hidden personality. The anchorites spoke in the same way. They remind the living that one day they would go to the burning-ground slung on bamboo poles. European monks have described how the decomposed body beneath the soil is eaten by worms. In dissertations on morality we have seen attempts to destroy our illusion by reminding us that the body which seems beautiful is a repulsive compound of bones and flesh and blood and fluids. The best way of cultivating detachment is repeatedly to instil into our minds a contempt for the reality which we perceive. But the poet is not a disciple of detachment, he has come to cultivate attachment. Is the modern age so very degenerate that even the poet is infected with the atmosphere of cremation, that he begins to take pleasure in saying that which we consider great is decayed, that which we admire as beautiful is untouchable at the core? …

The mid-Victorian age felt a respect for reality and wished to accord it a place of honor; the modern age thinks it part of its program to insult reality and tear aside all the veils of decency.

If you call a reverence for universal things sentimentalism, then you must also call your rebellion against them by the same name. If the mind becomes bitter, for whatever reason, the vision can never be natural. Hence, if the mid-Victorian age is to be ridiculed as being the leader of ultra-respectability, then the Edwardian age must also be ridiculed with the opposite adjectives. The thing is not natural and therefore not perennial. As for science, so for art, the detached mind is the best vehicle. Europe has gained that mind in science, but not in literature.

Advertisements