Archives

রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা/ Ramakanaier Nirbudhwita/Ramkanai’s Folly

রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা

যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝালচচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল, তখন স্তূপাকৃতি চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, “দুটো পান্তাভাত-যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।”
এ দিকে ডাক্তার যখন জবাব দিয়া গেল তখন গুরুচরণের ভাই রামকানাই রোগীর পার্শ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, “দাদা, যদি তোমার উইল করিবার ইচ্ছা থাকে তো বলো!” গুরুচরণ ক্ষীণস্বরে বলিলেন, “আমি বলি, তুমি লিখিয়া লও।” রামকানাই কাগজকলম লইয়া প্রস্তুত হইলেন। গুরুচরণ বলিয়া গেলেন, “আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি আমার ধর্মপত্নী শ্রীমতী বরদাসুন্দরীকে দান করিলাম।” রামকানাই লিখিলেন- কিন্তু লিখিতে তাঁহার কলম সরিতেছিল না। তাঁহার বড়ো আশা ছিল, তাঁহার একমাত্র পুত্র নবদ্বীপ অপুত্রক জ্যাঠামহাশয়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হইবে। যদিও দুই ভাইয়ে পৃথগন্ন ছিলেন, তথাপি এই আশায় নবদ্বীপের মা নবদ্বীপকে কিছুতেই চাকরি করিতে দেন নাই– এবং সকাল-সকাল বিবাহ দিয়াছিলেন, এবং শত্রুর মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করিয়া বিবাহ নিষ্ফল হয় নাই। কিন্তু তথাপি রামকানাই লিখিলেন এবং সই করিবার জন্য কলমটা দাদার হাতে দিলেন। গুরুচরণ নির্জীব হস্তে যাহা সই করিলেন, তাহা কতকগুলা কম্পিত বক্ররেখা কি তাঁহার নাম, বুঝা দুঃসাধ্য।
পান্তাভাত খাইয়া যখন স্ত্রী আসিলেন তখন গুরুচরণের বাক্‌রোধ হইয়াছে দেখিয়া স্ত্রী কাঁদিতে লাগিলেন। যাহারা অনেক আশা করিয়া বিষয় হইতে বঞ্চিত হইয়াছে তাহারা বলিল “মায়াকান্না”। কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য নহে।

উইলের বৃত্তান্ত শুনিয়া নবদ্বীপের মা ছুটিয়া আসিয়া বিষম গোল বাধাইয়া দিল– বলিল, “মরণকালে বুদ্ধিনাশ হয়। এমন সোনার-চাঁদ ভাইপো থাকিতে–”
রামকানাই যদিও স্ত্রীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন– এত অধিক যে তাহাকে ভাষান্তরে ভয় বলা যাইতে পারে– কিন্তু তিনি থাকিতে পারিলেন না, ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন, “মেজোবউ, তোমার তো বুদ্ধিনাশের সময় হয় নাই, তবে তোমার এমন ব্যবহার কেন। দাদা গেলেন, এখন আমি তো রহিয়া গেলাম, তোমার যা-কিছু বক্তব্য আছে, অবসরমত আমাকে বলিয়ো, এখন ঠিক সময় নয়।”
নবদ্বীপ সংবাদ পাইয়া যখন আসিল তখন তাহার জ্যাঠামহাশয়ের কাল হইয়াছে। নবদ্বীপ মৃত ব্যক্তিকে শাসাইয়া কহিল,”দেখিব মুখাগ্নি কে করে– এবং শ্রাদ্ধশান্তি যদি করি তো আমার নাম নবদ্বীপ নয়।” গুরুচরণ লোকটা কিছুই মানিত না। সে ডফ্‌ সাহেবের ছাত্র ছিল। শাস্ত্রমতে যেটা সর্বাপেক্ষা অখাদ্য সেইটাতে তার বিশেষ পরিতৃপ্তি ছিল। লোকে যদি তাহাকে ক্রিশ্চান বলিত, সে জিভ কাটিয়া বলিত “রাম, আমি যদি ক্রিশ্চান হই তো গোমাংস খাই।” জীবিত অবস্থায় যাহার এই দশা, সদ্যমৃত অবস্থায় সে-যে পিণ্ডনাশ-আাশঙ্কায় কিছুমাত্র বিচলিত হইবে, এমন সম্ভাবনা নাই। কিন্তু উপস্থিতমত ইহা ছাড়া আর-কোনো প্রতিশোধের পথ ছিল না। নবদ্বীপ একটা সান্ত্বনা পাইল যে, লোকটা পরকালে গিয়া মরিয়া থাকিবে। যতদিন ইহলোকে থাকা যায় জ্যাঠামহাশয়ের বিষয় না পাইলেও কোনোক্রমে পেট চলিয়া যায়, কিন্তু জ্যাঠামহাশয় যে-লোকে গেলেন সেখানে ভিক্ষা করিয়া পিণ্ড মেলে না। বাঁচিয়া থাকিবার অনেক সুবিধা আছে।
রামকানাই বরদাসুন্দরীর নিকট গিয়া বলিলেন, “বউঠাকুরানী, দাদা তোমাকেই সমস্ত বিষয় দিয়া গিয়াছেন। এই তাঁহার উইল। লোহার সিন্দুকে যত্নপূর্বক রাখিয়া দিয়ো।”
বিধবা তখন মুখে মুখে দীর্ঘপদ রচনা করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতেছিলেন, দুই-চারিজন দাসীও তাঁহার সহিত স্বর মিলাইয়া মধ্যে মধ্যে দুই-চারিটা নূতন শব্দ যোজনাপূর্বক শোকসংগীতে সমস্ত পল্লীর নিদ্রা দূর করিতেছিল। মাঝে হইতে এই কাগজখণ্ড আসিয়া একপ্রকার লয়ভঙ্গ হইয়া গেল এবং ভাবেরও পূর্বাপর যোগ রহিল না। ব্যাপারটা নিম্নলিখিত-মতো অসংলগ্ন আকার ধারণ করিল।–

“ওগো, আমার কী সর্বনাশ হল গো, কী সর্বনাশ হল। আচ্ছা, ঠাকুরপো, লেখাটা কার। তোমার বুঝি? ওগো, তেমন যত্ন করে আমাকে আর কে দেখবে, আমার দিকে কে মুখ তুলে চাইবে গো।– তোরা একটুকু থাম্‌, মেলা চেঁচাস নে, কথাটা শুনতে দে। ওগো, আমি কেন আগে গেলুম না গো– আমি কেন বেঁচে রইলুম।” রামকানাই মনে মনে নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “সে আমাদের কপালের দোষ।”
বাড়ি ফিরিয়া গিয়া নবদ্বীপের মা রামকানাইকে লইয়া পড়িলেন। বোঝাই গাড়িসমেত খাদের মধ্যে পড়িয়া হতভাগ্য বলদ গাড়োয়ানের সহস্র গুঁতা খাইয়াও অনেকক্ষণ যেমন নিরুপায় নিশ্চল ভাবে দাঁড়াইয়া থাকে, রামকানাই তেমনি অনেকক্ষণ চুপ করিয়া সহ্য করিলেন– অবশেষে কাতরস্বরে কহিলেন, “আমার অপরাধ কী। আমি তো দাদা নই।”
নবদ্বীপের মা ফোঁস্‌ করিয়া উঠিয়া বলিলেন, “না, তুমি বড়ো ভালো মানুষ, তুমি কিছু বোঝ না; দাদা বললেন “লেখো”, ভাই অমনি লিখে গেলেন। তোমরা সবাই সমান। তুমিও সময়কালে ঐ কীর্তি করবে বলে বসে আছ। আমি মলেই কোন্‌ পোড়ামুখী ডাইনীকে ঘরে আনবে– আর আমার সোনার-চাঁদ নবদ্বীপকে পাথারে ভাসাবে। কিন্তু সেজন্যে ভেবো না, আমি শিগগির মরছি নে।”

এইরূপে রামকানাইয়ের ভাবী অত্যাচার আলোচনা করিয়া গৃহিণী উত্তরোত্তর অধিকতর অসহিষ্ঞু হইয়া উঠিতে লাগিলেন। রামকানাই নিশ্চয় জানিতেন, যদি এই-সকল উৎকট কাল্পনিক আশঙ্কা নিবারণ-উদ্দেশে ইহার তিলমাত্র প্রতিবাদ করেন, তবে হিতে বিপরীত হইবে। এই ভয়ে অপরাধীর মতো চুপ করিয়া রহিলেন, যেন কাজটা করিয়া ফেলিয়াছেন। যেন তিনি সোনার নবদ্বীপকে বিষয় হইতে বঞ্চিত করিয়া তাঁহার ভাবী দ্বিতীয়পক্ষকে সমস্ত লিখিয়া দিয়া মরিয়া বসিয়া আছেন, এখন অপরাধ স্বীকার না করিয়া কোনো গতি নাই।
ইতিমধ্যে নবদ্বীপ তাহার বুদ্ধিমান বন্ধুদের সহিত অনেক পরামর্শ করিয়া মাকে আসিয়া বলিল, “কোনো ভাবনা নাই। এ-বিষয় আমিই পাইব। কিছুদিনের মতো বাবাকে এখান হইতে স্থানান্তরিত করা চাই। তিনি থাকিলে সমস্ত ভণ্ডুল হইয়া যাইবে।” নবদ্বীপের বাবার বুদ্ধিসুদ্ধির প্রতি নবদ্বীপের মার কিছুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না; সুতরাং কথাটা তাঁরও যুক্তিযুক্ত মনে হইল। অবশেষে মার তাড়নায় এই নিতান্ত অনাবশ্যক নির্বোধ কর্মনাশা বাবা একটা যেমন-তেমন ছল করিয়া কিছুদিনের মতো কাশীতে গিয়া আশ্রয় লইলেন।
অল্পদিনের মধ্যেই বরদাসুন্দরী এবং নবদ্বীপচন্দ্র পরস্পরের নামে উইলজালের অভিযোগ করিয়া আদালতে গিয়া উপস্থিত হইল। নবদ্বীপ তাহার নিজের নামে যে-উইলখানি বাহির করিয়াছে, তাহার নামসহি দেখিলে গুরুচরণের হস্তাক্ষর স্পষ্ট প্রমাণ হয়; উইলের দুই-একজন নিঃস্বার্থ সাক্ষীও পাওয়া গিয়াছে। বরদাসুন্দরীর পক্ষে নবদ্বীপের বাপ একমাত্র সাক্ষী এবং সহি কারো বুঝিবার সাধ্য নাই। তাঁহার গৃহপোষ্য একটি মামাতো ভাই ছিল, সে বলিল, “দিদি, তোমার ভাবনা নাই। আমি সাক্ষ্য দিব এবং আরো সাক্ষ্য জুটাইব।”

ব্যাপারটা যখন সম্পূর্ণ পাকিয়া উঠিল, তখন নবদ্বীপের মা নবদ্বীপের বাপকে কাশী হইতে ডাকিয়া পাঠাইলেন। অনুগত ভদ্রলোকটি ব্যাগ ও ছাতা হাতে যথাসময়ে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এমন-কি, কিঞ্চিৎ রসালাপ করিবারও চেষ্টা করিলেন, জোড়হস্তে সহাস্যে বলিলেন, “গোলাম হাজির, এখন মহারানীর কী অনুমতি হয়।”
গৃহিণী মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “নেও নেও, আর রঙ্গ করতে হবে না। এতদিন ছুতো করে কাশীতে কাটিয়ে এলেন, একদিনের তরে তো মনে পড়ে নি।” ইত্যাদি।

এইরূপে উভয় পক্ষে অনেকক্ষণ ধরিয়া পরস্পরের নামে আদরের অভিযোগ আনিতে লাগিলেন– অবশেষে নালিশ ব্যক্তিকে ছাড়িয়া জাতিতে গিয়া পৌঁছিল– নবদ্বীপের মা পুরুষের ভালোবাসার সহিত মুসলমানের মুরগি-বাৎসল্যের তুলনা করিলেন। নবদ্বীপের বাপ বলিলেন, “রমণীর মুখে মধু, হৃদয়ে ক্ষুর”- যদিও এই মৌখিক মধুরতার পরিচয় নবদ্বীপের বাপ কবে পাইলেন, বলা শক্ত।

ইতিমধ্যে রামকানাই সহসা আদালত হইতে এক সাক্ষীর সপিনা পাইলেন। অবাক হইয়া যখন তাহার মর্মগ্রহণের চেষ্টা করিতেছেন, তখন নবদ্বীপের মা আসিয়া কাঁদিয়া ভাসাইয়া দিলেন। বলিলেন, “হাড়জ্বালানী ডাকিনী কেবল-যে বাছা নবদ্বীপকে তাহার স্নেহশীল জ্যাঠার ন্যায্য উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত করিতে চায় তাহা নহে, আবার সোনার ছেলেকে জেলে পাঠাইবার আয়োজন করিতেছে।”

অবশেষে ক্রমে ক্রমে সমস্ত ব্যাপারটা অনুমান করিয়া লইয়া রামকানাইয়ের চক্ষুস্থির হইয়া গেল। উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলেন, “তোরা এ কি সর্বনাশ করিয়াছিস!” গৃহিণী ক্রমে নিজমূর্তি ধারণ করিয়া বলিলেন, “কেন, এতে নবদ্বীপের দোষ হয়েছে কী। সে তার জ্যাঠার বিষয় নেবে না! অমনি এক কথায় ছেড়ে দেবে!”

কোথা হইতে এক চক্ষুখাদিকা, ভর্তার পরমায়ুহন্ত্রী, অষ্টকুষ্ঠীর পুত্রী উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিবে, ইহা কোন্‌ সৎকুলপ্রদীপ কনকচন্দ্র সন্তান সহ্য করিতে পারে। যদি-বা মরণকালে এবং ডাকিনীর মন্ত্রগুণে কোনো-এক মূঢ়মতি জ্যেষ্ঠতাতের বুদ্ধিভ্রম হইয়া থাকে, তবে সুবর্ণময় ভ্রাতুষ্পুত্র সে ভ্রম নিজহস্তে সংশোধন করিয়া লইলে এমন কী অন্যায় কার্য হয়!

হতবুদ্ধি রামকানাই যখন দেখিলেন, তাঁহার স্ত্রী পুত্র উভয়ে মিলিয়া কখনো-বা তর্জনগর্জন কখনো-বা অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন, তখন ললাটে করাঘাত করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন– আহার ত্যাগ করিলেন, জল পর্যন্ত স্পর্শ করিলেন না।

এইরূপে দুইদিন নীরবে অনাহারে কাটিয়া গেল, মকদ্দমার দিন উপস্থিত হইল। ইতিমধ্যে নবদ্বীপ বরদাসুন্দরীর মামাতো ভাইটিকে ভয় প্রলোভন দেখাইয়া এমনি বশ করিয়া লইয়াছে যে, সে অনায়াসে নবদ্বীপের পক্ষে সাক্ষ্য দিল। জয়শ্রী যখন বরদাসুন্দরীকে ত্যাগ করিয়া অন্য পক্ষে যাইবার আয়োজন করিতেছে, তখন রামকানাইকে ডাক পড়িল।

অনাহারে মৃতপ্রায় শুষ্কওষ্ঠ শুষ্করসনা বৃদ্ধ কম্পিত শীর্ণ অঙ্গুলি দিয়া সাক্ষ্যমঞ্চের কাঠগড়া চাপিয়া ধরিলেন। চতুর ব্যারিস্টার অত্যন্ত কৌশলে কথা বাহির করিয়া লইবার জন্য জেরা করিতে আরম্ভ করিলেন– বহুদূর হইতে আরম্ভ করিয়া সাবধানে অতি ধীর বক্রগতিতে প্রসঙ্গের নিকটবর্তী হইবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন।

তখন রামকানাই জজের দিকে ফিরিয়া জোড়হস্তে কহিলেন, “হুজুর, আমি বৃদ্ধ, অত্যন্ত দুর্বল। অধিক কথা কহিবার সামর্থ্য নাই। আমার যা বলিবার সংক্ষেপে বলিয়া লই। আমার দাদা স্বর্গীয় গুরুচরণ চক্রবর্তী মৃত্যুকালে সমস্ত বিষয়সম্পত্তি তাঁহার পত্নী শ্রীমতী বরদাসুন্দরীকে উইল করিয়া দিয়া যান। সে উইল আমি নিজহস্তে লিখিয়াছি এবং দাদা নিজহস্তে স্বাক্ষর করিয়াছেন। আমার পুত্র নবদ্বীপচন্দ্র যে উইল দাখিল করিয়াছেন তাহা মিথ্যা।” এই বলিয়া রামকানাই কাঁপিতে কাঁপিতে মূর্ছিত হইয়া পড়িলেন।
চতুর ব্যারিস্টার সকৌতুকে পার্শ্ববর্তী অ্যাটর্নিকে বলিলেন, “বাই জোভ! লোকটাকে কেমন ঠেসে ধরেছিলুম।”

মামাতো ভাই ছুটিয়া গিয়া দিদিকে বলিল, “বুড়ো সমস্ত মাটি করিয়াছিল– আমার সাক্ষ্যে মকদ্দমা রক্ষা পায়।”

দিদি বলিলেন, “বটে! লোক কে চিনতে পারে। আমি বুড়োকে ভালো বলে জানতুম।”

কারারুদ্ধ নবদ্বীপের বুদ্ধিমান বন্ধুরা অনেক ভাবিয়া স্থির করিল, নিশ্চয়ই বৃদ্ধ ভয়ে এই কাজ করিয়া ফেলিয়াছে; সাক্ষীর বাক্সের মধ্যে উঠিয়া বুড়া বুদ্ধি ঠিক রাখতে পারে নাই; এমনতরো আস্ত নির্বোধ সমস্ত শহর খুঁজিলে মিলে না।

গৃহে ফিরিয়া আসিয়া রামকানাইয়ের কঠিন বিকার-জ্বর উপস্থিত হইল। প্রলাপে পুত্রের নাম উচ্চারণ করিতে করিতে এই নির্বোধ সর্বকর্মপণ্ডকারী নবদ্বীপের অনাবশ্যক বাপ পৃথিবী হইতে অপসৃত হইয়া গেল; আত্মীয়দের মধ্যে কেহ কেহ কহিল, “আর কিছুদিন পূর্বে গেলেই ভালো হইত”– কিন্ত তাহাদের নাম করিতে চাহি না।

Ramkanai’s Folly

Those who say Gurucharan’s second wife was playing cards in her own quarters while he lay dying, are a slanderous bunch making mountains out of molehills. In actual fact, she was then sitting propped on one leg with the other knee drawn up to her chest, eating day old rice with green tamarind, chillies and a spicy prawn curry. When the call came from the sickroom, she put away the mound of chewed vegetables and the emptied plate and said sombrely, ‘I do not even have the time to eat a few morsels of stale rice!’
When the doctor left saying there was nothing more that he could do, Gurucharan’s brother Ramkanai sat next to him and said slowly, ‘If you wish to make a will tell me so.’ Gurucharan said weakly , ‘I will speak, please write everything down.’ Ramakanai gathered pen and paper as Gurucharan started saying, ‘I leave all my moveable and immoveable property to my lawfully wedded wife Madam Borodashundori.’ Ramakanai did write this down but his pen seemed to take forever. He had hoped so much that his only child Nabadwip would inherit the entire estate of this childless uncle. Even though the two brothers had separate kitchens, his wife had prevented Nabadwip from taking up any gainful employment in this hope and had married him off rather early. To the dismay of their enemies the marriage had also been fruitful. But he still wrote everything down faithfully and handed the pen to his elder brother for his signature. Gurucharan’s scribble was so faint that it was hard to understand whether it was his name or a few shaky lines on the paper.
When his wife did come after finishing her meal, he was no longer able to talk and his wife started weeping. The people who had greatly wished for a windfall all said she was pretending but that is not true.

When Nabadwip’s mother heard of the will she arrived in an incensed state and created an uproar saying, ‘People lose their senses when death approaches. Why else would he ignore such a suitable nephew..’
Even though Ramkanai respected his wife excessively – infact to the extent that it might be described as fear – he could not ignore this. He swiftly stepped in and said, ‘It is not the time for you to lose yours, then why are you behaving this way? He has gone, but I am here, if you have something to say, say it to me later, now is not the time for this.’

When Nabadwip heard the news he came and found his uncle had passed away. He angrily threatened him none the less and said, ‘I will see who performs the funeral rites! If you expect me to do them, you are greatly mistaken.’
Gurucharan had never believed in any of these things. He had been a student of Mr Duff’s. He took great enjoyment in doing the things described as taboo in the Scriptures. If people called him a Christian, he shook his head and said, ‘Then I must eat beef.’ The person who had been like this all his life could hardly be expected to be disturbed by threats to the funeral ceremony now that he was newly dead. But there was no other way of taking revenge on him. Nabadwip was mollified by the realisation that his uncle would never come back to life again. Even without his uncle’s money he would be able to subsist for the rest of his days, but his uncle was now in such a place where one could not find a thing even if one begged for it. There is much to be said about being alive.
Ramkanai went to Barodashundori and said to her, ‘Sister-in-law, my brother has left everything to you. This is his will. Lock it away carefully in your iron chest.’
The widow was then busily wailing, making up new phrases to express her sorrow as she went along; a couple of the maids also joined in and added a few words of their own; between them they were successfully keeping the neighbourhood awake. The arrival of the piece of paper Ramkanai was giving her caused a break in the pattern and led to the disjointed events described below:

‘Alas, what misfortune, what a terrible thing this is for me. Okay, brother-in-law, whose handwriting is this? Yours? Alas, who will look after me with that kind of attention, who will look at me at all! Can you people be quiet, don’t shriek so much, let me hear his words. Alas, why did I not get taken first? Why am I still alive!’
Ramkanai thought quietly, ‘That is our cruel fate.’

When he went home, his wife started on him. Ramkanai stood silently for a long time, putting up with all of it, much as a bullock will steadfastly stand after slipping into a ditch with an overloaded cart no matter how much the driver pokes him; finally he said in a pained voice, ‘What is my fault here, I am not the one who made the will.’

Nabadwip’s mother hissed at him, ‘No of course not, you are such a good man, you don’t understand what you have done; your brother said write this, and you wrote it down straight away. You are all the same! You must be waiting for your turn to be able to do the same. The minute I die you will marry some horrible witch and bring her home – and cast out my darling Nabadwip. But don’t worry, I am not going to die any time soon.’

She grew more and more annoyed as she discussed this future misbehaviour. Ramkanai knew for certain that if he said anything to assure against these outlandish imagined fears, it would only get worse. He hence stood there looking guilty as though the deed had already been done and he had died and deprived ‘darling Nabadwip’, giving everything to his second wife! There was nothing to do but admit to the offence.

in the meantime Nabadwip consulted his clever friends and came to his mother saying, ‘There is nothing to worry about. I will have it all. We have to get my father somewhere else for a few days. If he stays things will not work out.’ His mother had no respect for his father’s sense either and this seemed a logical thing to do. In a few days, this extremely unnecessary, foolish, obstinate man was packed off to Kashi for a few days on some excuse.

Within a short while Barodashundori and Nabadwipchandra had gone to court after accusing each other of forging the will. Nabadwip had produced a will in his favour where Gurucharan’s name was clearly written in his own hand, he even had a couple of unbiased witnesses. Barodashundori’s only witness was his father and there was no way of reading the signature on the will she had. She had a cousin living in their house who said, ‘Sister, never fear, I will be your witness and I will find other witnesses.’
When the situation was completely muddled up, Nabadwip’s mother sent for his father. The devoted gentleman came with his bag and his brolly. He even tried out some humour, saying with folded hands, ‘The knave is here! What does the queen wish me to do?’

She shook her head and said, ‘Enough of this lying. I am sure you never thought of me when you were in Kashi all this time…’
The two continued to trade playful insults for a long time. Gradually the insults became complaints that were directed against the other’s gender rather than the individual. Nabadwip’s mother compared the love in the hearts of men with the love of a Mussalman for chicken*. Nabadwip’s father said, ‘Women have honey on their lips but blades in their hearts’- although it is hard to say when if ever he had received proof of these honeyed words.

Ramkanai received a sub poena from the court asking him to stand witness. While he was trying to comprehend this, Nabadwip’s mother came to him in floods of tears saying, ‘That witch is not just trying to deprive my dear Nabadwip from rightfully inheriting his loving uncle’s property, she is now working on sending him to jail.’

Eventually when he understood the entire affair Ramkanai was appalled. He shouted, ‘What have you done!’ His wife adopted her usual attitude and asked, ‘Why, how is this Nabadwip’s fault in any way? Why should he not inherit his uncle’s property! Why should he let it go!’
What golden, deserving descendant can bear it when a rapacious, husband eating, daughter of evil comes out of nowhere and takes it all. If a foolish uncle loses his mind thanks to death and the spells of said witch, then why is it wrong for the faultless nephew to try and correct the wrongs himself?
Ramkanai was astounded to see that his wife and son had joined forces in alternately berating him and shedding tears, he struck his forehead in shame, refusing to eat or even drink water.

After two days had passed in this silent fasting, the day of the trial arrived. Nabadwip had managed to lure Barodashundori’s cousin with such promises and fear that he gave witness in his favour without any qualms. When victory was about to leave Barodashundori and move to the other side, Ramkanai was summoned to the witness stand.
Weakened by hunger, the old man gripped the stand with his trembling thin fingers, his lips and tongue dry as though he faced the gallows. The cunning barrister began his questioning in an attempt to find out the truth – starting from afar and proceeding to reel his prey in with great care.

Ramkanai then turned to the judge and said respectfully, ‘My lord, I am old and very weak. I do not have the strength to talk a lot. Let me say what I have to. My brother the late Gurucharan Chakravarti left all his property to his wife Madam Barodashundori by legal will at the time of his death. I wrote it out and he signed it with his own hand. The will that my son Nabadwip Chandra has submitted to this court is false.’ He fainted having said these words.

Amused, the clever barrister said to the attorney beside him, ‘By Jove! How well did I corner the fellow!’
The cousin ran to his sister and said, ‘The old man was about to ruin the case, but thanks to my statement the tide is turning.’
The sister said, ‘Really!I always thought of him as a good man!’
The clever friends of the imprisoned Nabadwip decided after much discussion that the old man must have been frightened into doing such a thing, he had lost his head in the witness stand; a more complete fool would be hard to find in the city.
When he came home, Ramkanai became feverish. Soon this stupid, unnecessary, man who had managed to ruin all the plans of others died, calling for his son in his delirious state. Some of his relatives said, ‘It would have been best if he had gone a few days earlier.’ But I do not wish to say who these were.

তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

মণিহারা/Monihara/The Jewels

মণিহারা

সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে।

বোটের ছাদের উপরে মাঝি নমাজ পড়িতেছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত আকাশপটে তাহার নীরব উপাসনা ক্ষণে ক্ষণে ছবির মতো আঁকা পড়িতেছিল। স্থির রেখাহীন নদীর জলের উপর ভাষাতীত অসংখ্য বর্ণচ্ছটা দেখিতে দেখিতে ফিকা হইতে গাঢ় লেখায়, সোনার রঙ হইতে ইস্পাতের রঙে, এক আভা হইতে আর-এক আভায় মিলাইয়া আসিতেছিল।

জানালা-ভাঙা বারান্দা-ঝুলিয়া-পড়া জরাগ্রস্ত বৃহৎ অট্টালিকার সম্মুখে অশ্বত্থমূলবিদারিত ঘাটের উপরে ঝিল্লিমুখর সন্ধ্যাবেলায় একলা বসিয়া আমার শুষ্ক চক্ষুর কোণ ভিজিবে-ভিজিবে করিতেছে, এমন সময়ে মাথা হইতে পা পর্যন্ত হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া শুনিলাম, ‘মহাশয়ের কোথা হইতে আগমন।’

দেখিলাম, ভদ্রলোকটি স্বল্পাহারশীর্ণ, ভাগ্যলক্ষ্মী কর্তৃক নিতান্ত অনাদৃত। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদেশী চাক্‌রের যেমন একরকম বহুকাল-জীর্ণসংস্কার-বিহীন চেহারা, ইঁহারও সেইরূপ। ধুতির উপরে একখানি মলিন তৈলাক্ত আসামী মটকার বোতামখোলা চাপকান; কর্মক্ষেত্রে হইতে যেন অল্পক্ষণ হইল ফিরিতেছেন। এবং যেসময় কিঞ্চিৎ জলপান খাওয়া উচিত ছিল সে-সময় হতভাগ্য নদীতীরে কেবল সন্ধ্যার হাওয়া খাইতে আসিয়াছেন।

আগন্তুক সোপানপার্শ্বে আসনগ্রহণ করিলেন। আমি কহিলাম, ‘আমি রাঁচি হইতে আসিতেছি।’

‘কী করা হয়।’

‘ব্যবসা করিয়া থাকি।’

‘কী ব্যবসা।’

‘হরীতকী, রেশমের গুটি এবং কাঠের ব্যবসা।’

‘কী নাম।’

ঈষৎ থামিয়া একটা নাম বলিলাম। কিন্তু সে আমার নিজের নাম নহে।

ভদ্রলোকের কৌতুহলনিবৃত্তি হইল না। পুনরায় প্রশ্ন হইল, ‘এখানে কী করিতে আগমন।’

আমি কহিলাম, ‘বায়ুপরিবর্তন।’

লোকটি কিছু আশ্চর্য হইল। কহিল, ‘মহাশয়, আজ প্রায় ছয়বৎসর ধরিয়া এখানকার বায়ু এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যহ গড়ে পনেরো গ্রেন্‌ করিয়া কুইনাইন খাইতেছি কিন্তু কিছু তো ফল পাই নাই।’

আমি কহিলাম, ‘এ কথা মানিতেই হইবে, রাঁচি হইতে এখানে বায়ুর যথেষ্ট পরিবর্তন দেখা যাইবে।’

তিনি কহিলেন, ‘আজ্ঞা হাঁ, যথেষ্ট। এখানে কোথায় বাসা করিবেন।’

আমি ঘাটের উপরকার জীর্ণবাড়ি দেখাইয়া কহিলাম, ‘এই বাড়িতে।’

বোধকরি লোকটির মনে সন্দেহ হইল, আমি এই পোড়ো বাড়িতে কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পাইয়াছি। কিন্তু এ সম্বন্ধে আর কোনো তর্ক তুলিলেন না, কেবল আজ পনেরো বৎসর পূর্বে এই অভিশাপগ্রস্ত বাড়িতে যে-ঘটনাটি ঘটিয়াছিল তাহারই বিস্তারিত বর্ণনা করিলেন।

লোকটি এখানকার ইস্কুলমাস্টার। তাঁহার ক্ষুধা ও রোগ-শীর্ণ মুখে মস্ত একটা টাকের নিজে একজোড়া বড়ো বড়ো চক্ষু আপন কোটরের ভিতর হইতে অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় জ্বলিতেছিল। তাঁহাকে দেখিয়া ইংরাজ কবি কোল্‌রিজের সৃষ্ট প্রাচীন নাবিকের কথা আমার মনে পড়িল।

মাঝি নমাজ পড়া সমাধা করিয়া রন্ধনকার্যে মন দিয়াছে। সন্ধ্যার শেষ আভাটুকু মিলাইয়া আসিয়া ঘাটের উপরকার জনশূন্য অন্ধকার বাড়ি আপন পূর্বাবস্থার প্রকাণ্ড প্রেতমূর্তির মতো নিস্তব্ধ দাঁড়াইয়া রহিল।

ইস্কুলমাস্টার কহিলেন–

আমি এই গ্রামে আসার প্রায় দশ বৎসর পূর্বে এই বাড়িতে ফণিভূষণ সাহা বাস করিতেন। তিনি তাঁহার অপুত্রক পিতৃব্য দুর্গামোহন সাহার বৃহৎ বিষয় এবং ব্যবসায়ের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন।

কিন্তু, তাঁহাকে একালে ধরিয়াছিল। তিনি লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন। তিনি জুতাসমেত সাহেবের আপিসে, ঢুকিয়া সম্পূর্ণ খাঁটি ইংরাজি বলিতেন। তাহাতে আবার দাড়ি রাখিয়াছিলেন, সুতরাং সাহেব-সওদাগরের নিকট তাঁহার উন্নতির সম্ভাবনামাত্র ছিল না। তাঁহাকে দেখিবামাত্রই নব্যবঙ্গ বলিয়া ঠাহর হইত।

আবার ঘরের মধ্যেও এক উপসর্গ জুটিয়াছিল। তাঁহার স্ত্রীটি ছিলেন সুন্দরী। একে কালেজে-পড়া তাহাতে সুন্দরী স্ত্রী, সুতরাং সেকালের চালচলন আর রহিল না। এমনকি, ব্যামো হইলে অ্যাসিস্ট্যান্ট-সার্জনকে ডাকা হইত। অশন বসন ভূষণও এই পরিমাণে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল।

মহাশয় নিশ্চয়ই বিবাহিত, অতএব এ কথা আপনাকে বলাই বাহুল্য যে, সাধারণত স্ত্রীজাতি কাঁচা আম, ঝাল লঙ্কা এবং কড়া স্বামীই ভালোবাসে। যে দুর্ভাগ্য পুরুষ নিজের স্ত্রীর ভালোবাসা হইতে বঞ্চিত সে-যে কুশ্রী অথবা নির্ধন তাহা নহে, সে নিতান্ত নিরীহ।

যদি জিজ্ঞাসা করেন, কেন এমন হইল, আমি এ সম্বন্ধে অনেক কথা ভাবিয়া রাখিয়াছি। যাহার যা প্রবৃত্তি এবং ক্ষমতা সেটার চর্চা না করিলে সে সুখী হয় না। শিঙে শাপ দিবার জন্য হরিণ শক্ত গাছের গুঁড়ি খোঁজে, কলাগাছে তাহার শিং ঘষিবার সুখ হয় না। নরনারীর ভেদ হইয়া অবধি স্ত্রীলোক দুরন্ত পুরুষকে নানা কৌশলে ভুলাইয়া বশ করিবার বিদ্যা চর্চা করিয়া আসিতেছে। যে-স্বামী আপনি বশ হইয়া বসিয়া থাকে তাহারা স্ত্রী-বেচারা একেবারেই বেকার, সে তাহার মাতামহীদের নিকট হইতে শতলক্ষ বৎসরের শাণ-দেওয়া যে উজ্জ্বল বরুণাস্ত্র, অগ্নিবাণ ও নাগপাশবন্ধনগুলি পাইয়াছিল তাহা সমস্ত নিস্ফল হইয়া যায়।

স্ত্রীলোক পুরুষকে ভুলাইয়া নিজের শক্তিতে ভালোবাসা আদায় করিয়া লইতে চায়, স্বামী যদি ভালোমানুষ হইয়া সে অবসরটুকু না দেয়, তবে স্বামীর অদৃষ্ট মন্দ এবং স্ত্রীরও ততোধিক।

নবসভ্যতার শিক্ষামন্ত্রে পুরুষ আপন স্বভাবসিদ্ধ বিধাতাদত্ত সুমহৎ বর্বরতা হারাইয়া আধুনিক দাম্পত্যসম্বন্ধটাকে এমন শিথিল করিয়া ফেলিয়াছে। অভাগা ফণিভূষণ আধুনিক সভ্যতার কল হইতে অত্যন্ত ভালোমানুষটি হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছিল– ব্যবসায়েও সে সুবিধা করিতে পারিল না, দাম্পত্যেও তাহার তেমন সুযোগ ঘটে নাই।

ফণিভূষণের স্ত্রী মণিমালিকা, বিনা চেষ্টায় আদর, বিনা অশ্রুবর্ষণে ঢাকাই শাড়ি এবং বিনা দুর্জয় মানে বাজুবন্ধ লাভ করিত। এইরূপে তাহার নারীপ্রকৃতি এবং সেইসঙ্গে তাহার ভালোবাসা নিশ্চেষ্ট হইয়া গিয়াছিল। সে কেবল গ্রহণ করিত, কিছু দিত না। তাহার নিরীহ এবং নির্বোধ স্বামীটি মনে করিত, দানই বুঝি প্রতিদান পাইবার উপায়। একেবারে উল্‌টা বুঝিয়াছিল আর কি।

ইহার ফল হইল এই যে, স্বামীকে সে আপন ঢাকাই শাড়ি এবং বাজুবন্ধ জোগাইবার যন্ত্রস্বরূপ জ্ঞান করিত; যন্ত্রটিও এমন সুচারু যে, কোনোদিন তাহার চাকায় এক ফোঁটা তেল জোগাইবারও দরকার হয় নাই।

ফণিভূষণের জন্মস্থান ফুলবেড়ে, বাণিজ্যস্থান এখানে কর্মানুরোধে এইখানেই তাহাকে অধিকাংশ সময় থাকিতে হইত। ফুলবেড়ের বাড়িতে তাহার মা ছিল না, তবু পিসি মাসি অন্য পাঁচজন ছিল। কিন্তু, ফণিভূষণ পিসি মাসি ও অন্য পাঁচজনের উপকারার্থেই বিশেষ করিয়া সুন্দরী স্ত্রী ঘরে আনে নাই। সুতরাং স্ত্রীকে সে পাঁচজনের কাছ থেকে আনিয়া এই কুঠিতে একলা নিজের কাছেই রাখিল। কিন্তু অন্যান্য অধিকার হইতে স্ত্রী-অধিকারের প্রভেদ এই যে, স্ত্রীকে পাঁচজনের কাছ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া একলা নিজের কাছে রাখিলেই যে সব সময় বেশি করিয়া পাওয়া যায় তাহা নহে।

স্ত্রীটি বেশি কথাবার্তা কহিত না, পাড়াপ্রতিবেশিনীদের সঙ্গেও তাহার মেলামেশা ছিল না; ব্রত উপলক্ষ্য করিয়া দুটো ব্রাহ্মণকে খাওয়ানো, বা বৈষ্ণবীকে দুটো পয়সা ভিক্ষা বেশী দেওয়া কখনো তাহার দ্বারা ঘটে নাই। তাহার হাতে কোনো জিনিস নষ্ট হয় নাই; কেবল স্বামীর আদরগুলা ছাড়া আর যাহা পাইয়াছে সমস্তই জমা করিয়া রাখিয়াছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সে নিজের অপরূপ যৌবনশ্রী হইতেও যেন লেশমাত্র অপব্যয় ঘটিতে দেয় নাই। চব্বিশবৎসর বয়সের সময়ও তাহাকে চৌদ্দবৎসরের মতো কাঁচা দেখিতে ছিল। যাহাদের হৃৎপিণ্ড বরফের পিণ্ড, যাহাদের বুকের মধ্যে ভালোবাসার জ্বালাযন্ত্রণা স্থান পায় না, তাহারা বোধ করি সুদীর্ঘকাল তাজা থাকে, তাহারা কৃপণের মতো অন্তরে বাহিরে আপনাকে জমাইয়া রাখিতে পারে।

ঘনপল্লবিত অতিসতেজ লতার মতো বিধাতা মণিমালিকাকে নিষ্ফলা করিয়া রাখিলেন, তাহাকে সন্তান হইতে বঞ্চিত করিলেন। অর্থাৎ, তাহাকে এমন একটা কিছু দিলেন না যাহাকে সে আপন লোহার সিন্দুকের মণিমাণিক্য অপেক্ষা বেশি করিয়া বুঝিতে পারে, যাহা বসন্তপ্রভাতের নবসূর্যের মতো আপন কোমল উত্তাপে তাহার হৃদয়ের বরফপিণ্ডটা গলাইয়া সংসারের উপর একটা স্নেহনির্ঝর বহাইয়া দেয়।

কিন্তু মণিমালিকা কাজকর্মে মজবুত ছিল। কখনোই সে লোকজন বেশি রাখে নাই। যে-কাজ তাহার দ্বারা সাধ্য সে কাজে কেহ বেতন লইয়া যাইবে ইহা সে সহিতে পারিত না। সে কাহারও জন্য চিন্তা করিত না, কাহাকেও ভালোবাসিত না, কেবল কাজ করিত এবং জমা করিত, এইজন্য তাহার রোগ শোক তাপ কিছুই ছিল না; অপরিমিত স্বাস্থ্য, অবিচলিত শান্তি এবং সঞ্চীয়মান সম্পদের মধ্যে সে সবলে বিরাজ করিত।

অধিকাংশ স্বামীর পক্ষে ইহাই যথেষ্ট; যথেষ্ট কেন, ইহা দুর্লভ। অঙ্গের মধ্যে কটিদেশ বলিয়া একটা ব্যাপার আছে তাহা কোমরে ব্যথা না হইলে মনে পড়ে না; গৃহের আশ্রয়স্বরূপে স্ত্রী-যে একজন আছে ভালোবাসার তাড়নায় তাহা পদে পদে এবং তাহা চব্বিশঘণ্টা অনুভব করার নাম ঘরকর্‌নার কোমরে ব্যথা। নিরতিশয় পাতিব্রত্যটা স্ত্রীর পক্ষে গৌরবের বিষয় কিন্তু পতির পক্ষে আরামের নহে, আমার তো এইরূপ মত।

মহাশয়, স্ত্রীর ভালোবাসা ঠিক কতটা পাইলাম, ঠিক কতটুকু কম পড়িল, অতি সূক্ষ্ণ নিক্তি ধরিয়া তাহা অহরহ তৌল করিতে বসা  কি পুরুষমানুষের কর্ম! স্ত্রী আপনার কাজ করুক, আমি আপনার কাজ করি, ঘরের মোটা হিসাবটা তো এই। অব্যক্তের মধ্যে কতটা ব্যক্ত, ভাবের মধ্যে কতটুকু অভাব, সুস্পষ্টের মধ্যেও কী পরিমাণ ইঙ্গিত, অণুপরমাণুর মধ্যে কতটা বিপুলতা– ভালোবাসাবাসির তত সুসূক্ষ্ণ বোধশক্তি বিধাতা পুরুষমানুষকে দেন নাই, দিবার প্রয়োজন হয় নাই। পুরুষমানুষের তিলপরিমাণ অনুরাগ-বিরাগের লক্ষণ হইয়া মেয়েরা বটে ওজন করিতে বসে। কথার মধ্য হইতে আসল ভঙ্গীটুকু এবং ভঙ্গীর মধ্য হইতে আসল কথাটুকু চিরিয়া চিরিয়া চুনিয়া চুনিয়া বাহির করিতে থাকে। কারণ, পুরুষের ভালোবাসাই মেয়েদের বল, তাহাদের জীবনব্যবসায়ের মূলধন। ইহারই হাওয়ার গতিক লক্ষ্য করিয়া ঠিক সময়ে ঠিকমতো পাল ঘুরাইতে পারিলে তবেই তাহাদের তরণী তরিয়া যায়। এইজন্যই বিধাতা ভালোবাসামান-যন্ত্রটি মেয়েদের হৃদয়ের মধ্যে ঝুলাইয়া দিয়াছেন, পুরুষদের দেন নাই।

কিন্তু বিধাতা যাহা দেন নাই সম্প্রতি পুরুষরা সেটি সংগ্রহ করিয়া লইয়াছেন। কবিরা বিধাতার উপর টেক্কা দিয়া এই দুর্লভ যন্ত্রটি, এই দিগ্‌দর্শন যন্ত্রশলাকাটি নির্বিচারে সর্বসাধারণের হস্তে দিয়াছেন। বিধাতার দোষ দিই না, তিনি মেয়েপুরুষকে যথেষ্ট ভিন্ন করিয়াই সৃষ্টি করিয়াছিলেন, কিন্তু সভ্যতায় সে ভেদ আর থাকে না, এখন মেয়েও পুরুষ হইতেছে, পুরুষও মেয়ে হইতেছে; সুতরাং ঘরের মধ্য হইতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিদায় লইল। এখন শুভবিবাহের পূর্বে, পুরুষকে বিবাহ করিতেছি না মেয়েকে বিবাহ করিতেছি, তাহা কোনোমতে নিশ্চয় করিতে না পারিয়া, বরকন্যা উভয়েরই চিত্ত আশঙ্কায় দুরু দুরু করিতে থাকে।

আপনি বিরক্ত হইতেছেন! একলা পড়িয়া থাকি, স্ত্রীর নিকট হইতে নির্বাসিত; দূর হইতে সংসারের অনেক নিগূঢ় তত্ত্ব মনের মধ্যে উদয় হয়– এগুলো ছাত্রদের কাছে বলিবার বিষয় নয়, কথাপ্রসঙ্গে আপনাকে বলিয়া লইলাম, চিন্তা করিয়া দেখিবেন।

মোটকথাটা এই যে, যদিচ রন্ধনে নুন কম হইত না এবং পানে চুন বেশি হইত না, তথাপি ফণিভূষণের হৃদয় কী-যেন-কী নামক একটু দুঃসাধ্য উৎপাত অনুভব করিত। স্ত্রীর কোনো দোষ ছিল না, কোনো ভ্রম ছিল না, তবু স্বামীর কোনো সুখ ছিল না। সে তাহার সহধর্মিণীর শূন্যগহ্বর হৃদয় লক্ষ্য করিয়া কেবল হীরামুক্তার গহনা ঢালিত কিন্তু সেগুলা পড়িত গিয়া লোহার সিন্দুকে, হৃদয় শূন্যই থাকিত। খুড়া দুর্গামোহন ভালোবাসা এত সূক্ষ্ণ করিয়া বুঝিত না, এত কাতর হইয়া চাহিত না, এত প্রচুর পরিমাণে দিত না, অথচ খুড়ির নিকট হইতে তাহা অজস্র পরিমাণে লাভ করিত। ব্যবসায়ী হইতে গেলে নব্যবাবু হইলে চলে না এবং স্বামী হইতে গেলে পুরুষ হওয়া দরকার, এ কথায় সন্দেহমাত্র করিবেন না।

ঠিক এই সময়ে শৃগালগুলা নিকটবর্তী ঝোপের মধ্য হইতে অত্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল। মাস্টারমহাশয়ের গল্পস্রোতে মিনিটকয়েকের জন্য বাধা পড়িল। ঠিক মনে হইল, সেই অন্ধকার সভাভূমিতে কৌতুকপ্রিয় শৃগালসম্প্রদায় ইস্কুলমাস্টারের ব্যাখ্যাত দাম্পত্যনীতি শুনিয়াই হউক বা নবসভ্যতাদুর্বল ফণিভূষণের আচরণেই হউক রহিয়া অট্টহাস্য করিয়া উঠিতে লাগিল। তাহাদের ভাবোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত হইয়া জলস্থল দ্বিগুণতর নিস্তব্ধ হইলে পর, মাস্টার সন্ধ্যার অন্ধকারে তাঁহার বৃহৎ উজ্জ্বল চক্ষু পাকাইয়া গল্প বলিতে লাগিলেন–

ফণিভূষণের জটিল এবং বহুবিস্তৃত ব্যবসায়ে হঠাৎ একটা ফাঁড়া উপস্থিত হইল। ব্যাপারটা কী তাহা আমার মতো অব্যবসায়ীর পক্ষে বোঝা এবং বোঝানো শক্ত। মোদ্দা কথা, সহসা কী কারণে বাজারে তাহার ক্রেডিট রাখা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। যদি কেবলমাত্র পাঁচটা দিনের জন্যও সে কোথাও হইতে লাখদেড়েক টাকা বাহির করিতে পারে, বাজারে একবার বিদ্যুতের মতো এই টাকাটার চেহারা দেখাইয়া যায় তাহা হইলেই মুহূর্তের মধ্যে সংকট উত্তীর্ণ হইয়া তাহার ব্যাবসা পালভরে ছুটিয়া চলিতে পারে।

টাকাটার সুযোগ হইতেছিল না। স্থানীয় পরিচিত মহাজনদের নিকট হইতে ধার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে এরূপ জনরব উঠিলে তাহার ব্যবসায়ের দ্বিগুণ অনিষ্ট হইবে, আশঙ্কায় তাহাকে অপরিচিত স্থানে ঋণের চেষ্টা দেখিতে হইতেছিল। সেখানে উপযুক্ত বন্ধক না রাখিলে চলে না।

গহনা বন্ধক রাখিলে লেখাপড়া এবং বিলম্বের কারণ থাকে না, চট্‌পট্‌ এবং সহজেই কাজ হইয়া যায়।

ফণিভূষণ একবার স্ত্রীর কাছে গেল। নিজের স্ত্রীর কাছে স্বামী যেমন সহজভাবে যাইতে পারে ফণিভূষণের তেমন করিয়া যাইবার ক্ষমতা ছিল  না। সে দুর্ভাগ্যক্রমে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসিত, যেমন ভালোবাসা কাব্যের নায়ক কাব্যের নায়িকাকে বাসে; যে-ভালোবাসায় সন্তর্পণে পদক্ষেপ করিতে হয় এবং সকল কথা মুখে ফুটিয়া বাহির হইতে পারে না, যে-ভালোবাসার প্রবল আকর্ষণ সূর্য এবং পৃথিবীর আকর্ষণের ন্যায় মাঝখানে একটা অতিদূর ব্যবধান রাখিয়া দেয়।

তথাপি তেমন তেমন দায়ে পড়িলে কাব্যের নায়ককেও প্রেয়সীর নিকট হুণ্ডি এবং বন্ধক এবং হ্যাণ্ড্‌নোটের প্রসঙ্গ তুলিতে হয়; কিন্তু সুর বাধিয়া যায়, বাক্যস্খলন হয়, এমন সকল পরিষ্কার কাজের কথার মধ্যেও ভাবের জড়িমা ও বেদনার বেপথু আসিয়া উপস্থিত হয়। হতভাগ্য ফণিভূষণ স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারিল না, ‘ওগো, আমার দরকার হইয়াছে, তোমার গহনাগুলো দাও।’

কথাটা বলিল, অথচ অত্যন্ত দুর্বলভাবে বলিল। মণিমালিকা যখন কঠিন মুখ করিয়া হাঁ-না কিছুই উত্তর করিল না, তখন সে একটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আঘাত পাইল কিন্তু আঘাত করিল না। কারণ, পুরুষোচিত বর্বরতার লেশমাত্র তাহার ছিল না। যেখানে জোর করিয়া কাড়িয়া লওয়া উচিত ছিল, সেখানে সে আপনার আন্তরিক ক্ষোভ পর্যন্ত চাপিয়া গেল। যেখানে ভালোবাসার একমাত্র অধিকার, সর্বনাশ হইয়া গেলেও সেখানে বলকে প্রবেশ করিতে দিবে না, এই তাহার মনের ভাব। এ সম্বন্ধে তাহাকে যদি ভর্ৎসনা করা যাইত তবে সম্ভবত সে এইরূপ সূক্ষ্ণ তর্ক করিত যে, বাজারে যদি অন্যায় কারণেও আমার ক্রেডিট না থাকে তবে তাই বলিয়া বাজার লুটিয়া লইবার অধিকার আমার নাই, স্ত্রী যদি স্বেচ্ছাপূর্বক বিশ্বাস করিয়া আমাকে গহনা না দেয় তবে তাহা আমি কাড়িয়া লইতে পারি না। বাজারে যেমন ক্রেডিট ঘরে তেমনি ভালোবাসা, বাহুবল কেবলমাত্র রণক্ষেত্রে। পদে পদে এইরূপ অত্যন্ত সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ তর্কসূত্র কাটিবার জন্যই কি বিধাতা পুরুষমানুষকে এরূপ উদার, এরূপ প্রবল, এরূপ বৃহদাকার করিয়া নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহার কি বসিয়া বসিয়া অত্যন্ত সুকুমার চিত্তবৃত্তিকে নিরতিশয় তনিমার সহিত অনুভব করিবার অবকাশ আছে না ইহা তাহাকে শোভা পায়।

যাহা হউক, আপন উন্নত হৃদয়বৃত্তির গর্বে স্ত্রীর গহনা স্পর্শ না করিয়া ফণিভূষণ অন্য উপায়ে অর্থ সংগ্রহের জন্য কলিকাতায় চলিয়া গেল।

সংসারে সাধারণত স্ত্রীকে স্বামী যতটা চেনে স্বামীকে স্ত্রী তাহার চেয়ে অনেক বেশি চেনে; কিন্তু স্বামীর প্রকৃতি যদি অত্যন্ত সূক্ষ্ণ হয় তবে স্ত্রীর অনুবীক্ষণে তাহার সমস্তটা ধরা পড়ে না। আমাদের ফণিভূষণকে ফণিভূষণের স্ত্রী ঠিক বুঝিত না। স্ত্রীলোকের অশিক্ষিতপটুত্ব যে-সকল বহুকালাগত প্রাচীন সংস্কারের দ্বারা গঠিত, অত্যন্ত নব্য পুরুষেরা তাহার বাহিরে গিয়া পড়ে। ইহারা এক রকমের! ইহারা মেয়েমানুষের মতোই রহস্যময় হইয়া উঠিতেছে। সাধারণ পুরুষমানুষের যে-কটা বড়ো বড়ো কোটা আছে, অর্থাৎ কেহবা বর্বর, কেহবা নির্বোধ, কেহবা অন্ধ, তাহার মধ্যে কোনোটাতেই ইহাদিগকে ঠিকমতো স্থাপন করা যায় না।

সুতরাৎ মণিমালিকা পরামর্শের জন্য তাহার মন্ত্রীকে ডাকিল। গ্রামসম্পর্কে অথবা দূরসম্পর্কের মণিমালিকার এক ভাই ফণিভূষণের কুঠিতে গোমস্তার অধীনে কাজ করিত। তাহার এমন স্বভাব ছিল না যে কাজের দ্বারা উন্নতি লাভ করে, কোনো একটা উপলক্ষ্য করিয়া আত্মীয়তার জোরে বেতন এবং বেতনেরও বেশি কিছু কিছু সংগ্রহ করিত।

মণিমালিকা তাহাকে ডাকিয়া সকল কথা বলিল; জিজ্ঞাসা করিল, ‘এখন পরামর্শ কী।’

সে অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো মাথা নাড়িল; অর্থাৎ গতিক ভালো নহে। বুদ্ধিমানেরা কখনোই গতিক ভালো দেখে না। সে কহিল, ‘বাবু কখনোই টাকা সংগ্রহ করিতে পারিবেন না, শেষকালে তোমার এ গহনাতে টান পড়িবেই।’

মণিমালিকা মানুষকে যেরূপ জানিত তাহাতে বুঝিল, এইরূপ হওয়াই সম্ভব এবং ইহাই সংগত। তাহার দুশ্চিন্তা সুতীব্র হইয়া উঠিল। সংসারে তাহার সন্তান নাই, স্বামী আছে বটে কিন্তু স্বামীর অস্তিত্ব সে অন্তরের মধ্যে অনুভব করে না, অতএব যাহা তাহার একমাত্র যত্নের ধন, যাহা তাহার ছেলের মতো ক্রমে ক্রমে বৎসরে বৎসরে বাড়িয়া উঠিতেছে, যাহা রূপকমাত্র নহে, যাহা প্রকৃতই সোনা, যাহা মানিক, যাহা বক্ষের, যাহা কণ্ঠের, যাহা মাথার– সেই অনেকদিনের অনেক সাধের সামগ্রী এক মুহূর্তেই ব্যবসায়ের অতলস্পর্শ গহ্বরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইবে ইহা কল্পনা করিয়া তাহার সর্বশরীর হিম হইয়া আসিল। সে কহিল, ‘কী করা যায়।’

মধুসূদন কহিল, গহনাগুলো লইয়া এইবেলা বাপের বাড়ি চলো।’ গহনার কিছু অংশ, এমনকি অধিকাংশই যে তাহার ভাগে আসিবে বুদ্ধিমান মধু মনে মনে তাহার উপায় ঠাহরাইল।

মণিমালিকা এ-প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইল।

আষাঢ়শেষের সন্ধ্যাবেলায় এই ঘাটের ধারে একখানি নৌকা আসিয়া লাগিল। ঘনমেঘাচ্ছন্ন প্রত্যুষে নিবিড় অন্ধকারে নিদ্রাহীন ভেকের কলরবের মধ্যে একখানি মোটা চাদরে পা হইতে মাথা পর্যন্ত আবৃত করিয়া মণিমালিকা নৌকায় উঠিল। মধুসূদন নৌকার মধ্য হইতে জাগিয়া উঠিয়া কহিল, ‘গহনার বাক্সটা আমার কাছে দাও।’ মণি কহিল, ‘সে পরে হইবে, এখন নৌকা খুলিয়া দাও।’

নৌকা খুলিয়া দিল, খরস্রোতে হুহু করিয়া ভাসিয়া গেল।

মণিমালিকা সমস্ত রাত ধরিয়া একটি একটি করিয়া তাহার সমস্ত গহনা সর্বাঙ্গ ভরিয়া পরিয়াছে, মাথা হইতে পা পর্যন্ত আর স্থান ছিল না। বাক্সে করিয়া গহনা লইলে সে-বাক্স হাতছাড়া হইয়া যাইতে পারে, এ আশঙ্কা তাহার ছিল। কিন্তু, গায়ে পরিয়া গেলে তাহাকে না বধ করিয়া সে-গহনা কেহ লইতে পারিবে না।

সঙ্গে কোনোপ্রকার বাক্স না দেখিয়া মধুসূদন কিছু বুঝিতে পারিল না, মোটা চাদরের নিচে যে মণিমালিকার দেহপ্রাণের সঙ্গে সঙ্গে দেহপ্রাণের অধিক গহনাগুলি আচ্ছন্ন ছিল তাহা সে অনুমান করিতে পারে নাই! মণিমালিকা ফণিভূষণকে বুঝিত না বটে, কিন্তু মধুসূদনকে চিনিতে তাহার বাকি ছিল না।

মধুসূদন গোমস্তার কাছে একখানা চিঠি রাখিয়া গেল যে, সে কত্রীকে পিত্রালয়ে পৌঁছাইয়া দিতে রওনা হইল। গোমস্তা ফণিভূষণের বাপের আমলের; সে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া হ্রস্ব-ইকারকে দীর্ঘ-ঈকার এবং দন্ত্য-সকে তালব্য-শ করিয়া মনিবকে এক পত্র লিখিল, ভালো বাংলা লিখিল না কিন্তু স্ত্রীকে অযথা প্রশ্রয় দেওয়া যে পুরুষোচিত নহে এ কথাটা ঠিকমতোই প্রকাশ করিল।

ফণিভূষণ মণিমালিকার মনের কথাটা ঠিক বুঝিল। তাহার মনে এই আঘাতটা প্রবল হইল যে, ‘আমি গুরুতর ক্ষতিসম্ভাবনা সত্ত্বেও স্ত্রীর অলংকার পরিত্যাগ করিয়া প্রাণপণ চেষ্টায় অর্থসংগ্রহে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তবু আমাকে সন্দেহ। আমাকে আজিও চিনিল না।’

নিজের প্রতি যে নিদারুণ অন্যায়ে ক্রুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, ফণিভূষণ তাহাতে ক্ষুব্ধ হইল মাত্র। পুরুষমানুষ বিধাতার ন্যায়দণ্ড, তাহার মধ্যে তিনি বজ্রাগ্নি নিহিত করিয়া রাখিয়াছেন, নিজের প্রতি অথবা অপরের প্রতি অন্যায়ের সংঘর্ষে সে যদি দপ্‌ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতে না পারে তবে ধিক্‌ তাহাকে। পুরুষমানুষ দাবাগ্নির মতো রাগিয়া উঠিবে সামান্য কারণে, আর স্ত্রীলোক শ্রাবণমেঘের মতো অশ্রুপাত করিতে থাকিবে বিনা উপলক্ষে, বিধাতা এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, কিন্তু সে আর টেঁকে না।

ফণিভূষণ অপরাধিনী স্ত্রীকে লক্ষ্য করিয়া মনে মনে কহিল, ‘এই যদি তোমার বিচার হয় তবে এইরূপই হউক, আমার কর্তব্য আমি করিয়া যাইব।’ আরো শতাব্দী-পাঁচছয় পরে যখন কেবল অধ্যাত্মশক্তিতে জগৎ চলিবে তখন যাহার জন্মগ্রহণ করা উচিত ছিল সেই ভাবী যুগের ফণিভূষণ ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবতীর্ণ হইয়া সেই আদিযুগের স্ত্রীলোককে বিবাহ করিয়া বসিয়াছে শাস্ত্রে যাহার বুদ্ধিকে প্রলয়ংকরী বলিয়া থাকে। ফণিভূষণ স্ত্রীকে এক-অক্ষর পত্র লিখিল না এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল, এ সম্বন্ধে স্ত্রীর কাছে কখনও সে কোনো কথার উল্লেখ করিবে না। কী ভীষণ দণ্ডবিধি।

দিনদশেক পরে কোনোমতে যথোপযুক্ত টাকা সংগ্রহ করিয়া বিপদুত্তীর্ণ ফণিভূষণ বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল। সে জানিত, বাপের বাড়িতে গহনাপত্র রাখিয়া এতদিনে মণিমালিকা ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে। সেদিনকার দীনপ্রার্থীভাব ত্যাগ করিয়া কৃতকার্য কৃতীপুরুষ স্ত্রীর কাছে দেখা দিলে মণি যে কিরূপ লজ্জিত এবং অনাবশ্যক প্রয়াসের জন্য কিঞ্চিৎ অনুতপ্ত হইবে, ইহাই কল্পনা করিতে করিতে ফণিভূষণ অন্তঃপুরে শয়নাগারের দ্বারের কাছে আসিয়া উপনীত হইল।

দেখিল, দ্বার রুদ্ধ। তালা ভাঙিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, ঘর শূন্য। কোণে লোহার সিন্দুক খোলা পড়িয়া আছে, তাহাতে গহনাপত্রের চিহ্নমাত্র নাই। স্বামীর বুকের মধ্যে ধক্‌ করিয়া একটা ঘা লাগিল। মনে হইল, সংসার উদ্দেশ্যহীন এবং ভালোবাসা ও বাণিজ্যব্যবসা সমস্তই ব্যর্থ। আমরা এই সংসারপিঞ্জরের প্রত্যেক শলাকার উপরে প্রাণপাত করিতে বসিয়াছি, কিন্তু তাহার ভিতরে পাখি নাই, রাখিলেও সে থাকে না। তবে অহরহ হৃদয়খানির রক্তমানিক ও অশ্রুজলের মুক্তামালা দিয়া কী সাজাইতে বসিয়াছি। এই চিরজীবনের সর্বস্বজুড়ানো শূন্য সংসার-খাঁচাটা ফণিভূষণ মনে মনে পদাঘাত করিয়া অতিদূরে ফেলিয়া দিল।

ফণিভূষণ স্ত্রীর সম্বন্ধে কোনোরূপ চেষ্টা করিতে চাহিল না। মনে করিল, যদি ইচ্ছা হয় তো ফিরিয়া আসিবে। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ গোমস্তা আসিয়া কহিল, ‘চুপ করিয়া থাকিলে কী হইবে, কত্রীবধূর খবর লওয়া চাই তো।’ এই বলিয়া মণিমালিকার পিত্রালয়ে লোক পাঠাইয়া দিল। সেখান হইতে খবর আসিল, মণি অথবা মধু এ-পর্যন্ত সেখানে পৌঁছে নাই।

তখন চারিদিকে খোঁজ পড়িয়া গেল। নদীতীরে-তীরে প্রশ্ন করিতে করিতে লোক ছুটিল। মধুর তল্লাস করিতে পুলিসে খবর দেওয়া হইল– কোন্‌ নৌকা, নৌকার মাঝি কে, কোন্‌ পথে তাহারা কোথায় চলিয়া গেল, তাহার কোনো সন্ধান মিলিল না।

সর্বপ্রকার আশা ছাড়িয়া দিয়া একদিন ফণিভূষণ সন্ধ্যাকালে তাহার পরিত্যক্ত শয়নগৃহের মধ্যে প্রবেশ করিল। সেদিন জন্মাষ্টমী, সকাল হইতে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়িতেছে। উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামের প্রান্তরে একটা মেলা বসে, সেখানে আটচালার মধ্যে বারোয়ারির যাত্রা আরম্ভ হইয়াছে। মুষলধারায় বৃষ্টিপাতশব্দে যাত্রার গানের সুর মৃদুতর হইয়া কানে আসিয়া প্রবেশ করিতেছে। ঐযে বাতায়নের উপরে শিথিলকব্জা দরজাটা ঝুলিয়া পড়িয়াছে ঐখানে ফণিভূষণ অন্ধকারে একলা বসিয়াছিল–বাদলার হাওয়া বৃষ্টির ছাট এবং যাত্রার গান ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতেছিল, কোনো খেয়ালই ছিল না। ঘরের দেওয়ালে আট্‌#টুডিয়ো-রচিত লক্ষ্মীসরস্বতীর একজোড়া ছবি টাঙানো; আলনার উপরে একটি গামছা ও তোয়ালে, একটি চুড়িপেড়ে ও একটি ডুরে শাড়ি সদ্যব্যবহারযোগ্যভাবে পাকানো ঝুলানো রহিয়াছে। ঘরের কোণে টিপাইয়ের উপরে পিতলের ডিবায় মণিমালিকার স্বহস্তরচিত গুটিকতক পান শুষ্ক হইয়া পড়িয়া আছে। কাচের আলমারির মধ্যে তাহার আবাল্যসঞ্চিত চীনের পুতুল, এসেন্সের শিশি, রঙিন কাচের ডিক্যাণ্টার, শৌখিন তাস, সমুদ্রের বড়ো বড়ো কড়ি, এমন কি শূন্য সাবানের বাক্সগুলি পর্যন্ত অতি পরিপাটি করিয়া সাজানো; যে অতিক্ষুদ্র গোলকবিশিষ্ট ছোটো শখের কেরোসিন-ল্যাম্প সে নিজে প্রতিদিন প্রস্তুত করিয়া স্বহস্তে জ্বালাইয়া কুলুঙ্গিটির উপর রাখিয়া দিত তাহা যথাস্থানে নির্বাপিত এবং ম্লান হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, কেবল সেই ক্ষুদ্র ল্যাম্পটি এই শয়নকক্ষে মণিমালিকার শেষমুহূর্তের নিরুত্তর সাক্ষী; সমস্ত শূন্য করিয়া যে চলিয়া যায়, সেও এত চিহ্ন, এত ইতিহাস, সমস্ত জড়সামগ্রীর উপর আপন সজীব হৃদয়ের এত স্নেহস্বাক্ষর রাখিয়া যায়! এসো মণিমালিকা, এসো, তোমার দীপটি তুমি জ্বালাও, তোমার ঘরটি তুমি আলো করো, আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া তোমার যত্নকুঞ্চিত শাড়িটি তুমি পরো, তোমার জিনিসগুলি তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তোমার কাছ হইতে কেহ কিছু প্রত্যাশা করে না, কেবল তুমি উপস্থিত হইয়া মাত্র তোমার অক্ষয় যৌবন তোমার অম্লান সৌন্দর্য লইয়া চারিদিকের এই সকল বিপুল বিক্ষিপ্ত অনাথ জড়সামগ্রীরাশিকে একটি প্রাণের ঐক্যে সঞ্জীবিত করিয়া রাখো; এই সকল মূক প্রাণহীন পদার্থের অব্যক্ত ক্রন্দন গৃহকে শ্মশান করিয়া তুলিয়াছে।

My boat was moored at the edge of a dilapidated jetty. The sun had already set.

The boatmen were conducting their evening prayers on the roof of the boat. It seemed as though their silent prayers were being expressed as an ever changing tableau on the burning skies in the west. The still, unmarked surface of the river reflected an indescribable spectrum of colours from pale to bold, from sunset gold to the steel grey of night, one beam merging with another.

As I was about to succumb to the insect song that heralded that sky, coupled with the brooding presence of an ancient decaying mansion, slightly moist eyed at its broken windows and collapsed balconies which were adding to the already depressing surrounds of the jetty strangled by tree roots, I suddenly started at the sound of someone saying, ‘And where might you be coming from?’

I saw that the speaker was an emaciated, unfortunate looking individual. He looked like so many of the country’s foreign workers, as though he had been in need of making over for a long time. He was dressed in a dhoti and a dirty greasy unbuttoned top made of Assamese raw silk that made him look like he had just returned from work. He seemed to have come to sample the evening breeze at the river’s edge rather than have the meal that he should have had at the time.

The newcomer sat on the steps at one side.

‘I have come from Ranchi,’ I said.

‘What do you do?’

‘I am in business.’

‘What kind of business?’

‘Myrobalan, silk cocoons and wood.’

‘What is your name?’

I paused slightly before giving him a name that was not my own.

His curiosity was still not satisfied. He asked again, ‘Why are you here?’

I said, ‘For a change of scenery.’

The fellow was slightly astonished. He said, ‘Dear Sir, I have been savouring the change of scenery here for the past six years along with fifteen grains of quinine each day but to no avail!’

I said, ‘The scenery is bound to be different from Ranchi.’

‘That is true, where are you staying here?’ he said.

I indicated the old house above the bank and said, ‘Over there.’

I think he was suspicious that I had found some hidden treasure in the old house. But instead of raising that, he described the event that took place fifteen years ago in this cursed mansion in some detail.

The man was the local school master. His prominent eyes burned unnaturally bright in the sunken depths of his famished and sickly face. His head was large and hairless. He reminded me of Coleridge’s Ancient Mariner.

The boatmen had started to cook their evening meals after their prayers. The last of the evening light had faded and the empty house stood in the darkness like a huge ghostly presence.

The school master said –

Ten years before I came to the village, Phanibhushan Saha used to live in this house. He had inherited the vast property and business interests of his childless uncle.

But he was affected by the modern times. He had been educated. He went to work with foreigners wearing shoes and spoke proper English there. He had also grown a beard which meant that he had little chance of advancing in his career in the employ of the foreign trader. He was easily recognized as a member of the New Bengal when one laid eyes on him.

In the meantime there was another influence at home. His wife was beautiful. Added to his college education, this meant a total abandonment of the old ways. When they were unwell, they even went so far as to send for the assistant surgeon. Their food, clothes and style also took the same upward path.

Sir, you are most probably married, therefore it is completely unnecessary to tell you that ordinarily women love raw mangoes, hot chilly peppers and strict husbands. The unfortunate man who is deprived of his wife’s love is not ugly or poor; the truth is he is too excessively mild.

If you ask, why would this happen, I have thought much about this. One becomes unhappy unless able to exercise their instincts and abilities. A deer looks for a sturdy tree to rub its antlers against and finds no pleasure in doing that against a banana plant. Ever since men and women have been separate genders, women have been practicing the art of taming restless men by various means. The wife whose husband is already tamed finds herself in need of occupying; she finds all the sharpened weapons of tears, anger and love she has received from generations of women completely fruitless.

Women like the love that they earn by using their feminine power to seduce a man, if a husband is too good natured to give his wife that opportunity; it indicates bad times ahead for both him and his wife.

The man that learns the new ways and ideas loses the natural freedom of barbarian instincts given to him by his Maker and makes the bonds of matrimony rather loose and relaxed. Our unfortunate Phani Bhushan had been spat out by the machinery of modernity as an extremely good natured person who could not hope to find great success in business or in marriage.

His wife Monimalika kept accumulating affection without really trying, costly saris without crying a few tears and jewellery without any pretence at being inconsolably offended. Her woman’s heart and her love had both stopped trying anymore. She now only took and never gave back anything. Her inoffensive and somewhat stupid husband used to think one must always give in order to receive something in return. He had clearly got it completely wrong.

The result was that she had started seeing her husband as a machine that was there to supply her with saris and jewellery; a machine so efficient that there had never been a need to oil its wheels and gears.

Even though Phanibhushan was born in Phoolbere, his place of work was here where he had to spend most of his time. In the house in Phoolbere, he had no mother of his own, but aunts and others. But he had not married a beautiful woman for the benefit of these women. Hence he brought his wife to live where he was, with him. But the difference between other rights and rights to a wife is that just keeping her with oneself separated from others may not mean that she will be more available.

His wife rarely spoke a lot, she did not mix with the neighbourhood women, the feeding of Brahmins on holy days or giving alms to a travelling mendicant – these were not things she had ever done. She never wasted anything, hoarding every thing except the affection she received from her husband. The strangest thing was that this extended to the preservation of her astounding beauty which remained untouched by time. Even at twenty four, she looked as fresh as she did when she had been fourteen. Those who have ice where their hearts should be, who do not give the pain and suffering of love any space within their breast, I suppose they remain fresher for longer, holding on to themselves both outside and within.

The Creator made Monimalika fruitless in one respect, like a vine with excessive leaves and growth, by making her childless. In other words he did not give her the one thing that she could have understood better than all the jewels in her iron safe, the one thing that could have melted her heart of ice with the gentle heat of a spring sunrise and allowed her household to fill with affection.

Monimalika was good at housework. She never employed too many people. If there was something that she could do herself she could not bear to pay someone else to do it. She did not think of anyone else nor did she did not love anyone, all she did was work and save. This meant that she never suffered from illness or sorrow and reigned over endless good health, imperturbable peace and ever increasing wealth.

For most husbands this is enough, why, this is hard to obtain. That we have a part known as the waist is not something easily remembered unless there is a pain in the region. To be aware continually through the day of the loving admonishments of a wife are like an ache in life that reminds us that we have someone who cares for us. Excessive devotion to a husband may be a source of pride for a wife but is rarely pleasing for the husband. At least that is what I feel.

Good sir! How much love one receives from a wife, how much has not been given, to measure this daily with a pair of scales is hardly a man’s job. Let her do her work and I will do mine; this is what the mathematics of daily life is all about. Our Maker has not given men the ability to tell what is hidden in the unspoken, how much want there is in fulfillment, the indications hiding in the obvious, the vast worlds within the atoms because there has been never been any need. When there is even a minute lessening in a man’s love, women will sit down to analyse it. They endlessly analyse to find the intention hidden in words and the real words that hide in intentions. This is because women find their strength in the love of men, that is the capital they trade in. When they learn how to turn their sails to that wind, their life finds what they seek. This is why the scales that measure love have been placed within a woman’s heart and not within men.

But lately, men have achieved what the Creator did not give them. Poets have defeated the natural order and have given this priceless device, this divining rod to everyone. One cannot blame the Creator, he did make men and women with enough differences, but civilization has removed those; today women are becoming men and men too are becoming women, leading to the departure of peace and discipline from the domestic scene. These days before marriage, both groom and bride feels worried about whether they are marrying a man or a woman.

You are feeling annoyed. I stay alone here, away from my wife, many deeply philosophical things about life come to mind – I cannot say these to my students, I am saying these to you, do think about them.

The important thing is that even though there was never a lack of seasoning in his food and enough lime to accompany his betel leaf, Phanibhushan still felt irritated by a tiny nagging doubt in his heart. His wife had no faults, there was nothing perceptibly wrong and yet he was not happy. He noticed his wife’s emptiness and tried to pour diamonds and pearls into it but those went into the iron safe, leaving the heart as empty as before. His uncle Durgamohan had not understood the finer nuances of love, or craved it thus, he had never given so much and yet he received much from his own wife. Do not doubt it for once, one must not be modern in matters of business and one must be a man in order to be husband.

At this time jackals started howling very loudly in the nearby bushes. The teacher’s tale was paused for a while. It felt just as though the humorous animals were laughing at either the teacher’s theories on matrimony or modern Phanibhushan’s weaknesses. When the expressions of their joy had settled down, the surroundings seemed even quieter and the master stared with his huge shining eyes as he started on his story.

A problem rose somewhere in the many arms of Phanibhushan’s complex business. As a non-business minded person, it is hard for me to either understand or explain what exactly happened. The main thing was that it became hard for him to have credit in the markets. If he had but a spare hundred and fifty thousand rupees for just five days, he would have managed to flash that as a guarantee and his business would have regained the wind in its sails.

The money was proving hard to find. The fear that borrowing from local money lenders would damage his credit even further made him look to unknown sources for loans. There was the small matter of having enough to give them as collateral.

If he could pawn his wife’s jewellery, there would be little need for receipts and delays and things could be done quickly and easily.

Phanibhushan went to his wife once. He could not go to her as easily as a husband goes to his wife. Unfortunately he loved his wife with the same love as a hero loves his heroine in a poem, the kind of love that demands careful footsteps and carefully worded sentences, the kind that exists like the tremendous attraction between the sun  and the earth over the vast distances that separate them.

Even so, in the poems the hero may still have to raise the topic of loans and IOUs with the heroine, but this leads to the tune faltering, the words failing and a kind of hesitation and sorrow dogs the steps. The unfortunate Phanibhushan could not clearly say, ‘Listen, a need has come up, give me your jewellery.’

He did say it, but he said it very meekly. When Monimalika hardened her face and did not deign to say yes or no, he was terribly hurt but he could not hurt her back. This was because he lacked the barbarity of the male. Where he could have taken by force, he did not even express his genuine sadness. Where love was the only right, he was of the opinion that he would not allow force to enter even if it meant ruination. If one had attempted to rebuke him over this, he would have presented a well reasoned argument about how just as he could not force the market to lend him money when he was seen to be a risk, he would not force his wife to give him her jewellery when she did not do that of her free will. Credit to him was the same as love; the only place for force was the battlefield. Did the Creator make men this generous, this powerful, this mighty so that they could dispatch arguments so well? Does it suit them to sit and observe the gentle nuances and subtleties of someone’s nature or do they have the time?

Phanibhushan went off to Kolkata to find the money he needed by some other means, thanks to his natural pride that prevented him from demanding his wife’s help.

Generally in life, a wife knows her husband far better than the husband knows his wife, but if a husband is excessively sensitive, this is not completely understood by the wife. Phanibhushan’s wife did not really understand him. Very progressive men do not fall within the scope of the ancient beliefs that form the untutored expertise of women. These men are just as mysterious as women. The usual general quotas within which one may fit ordinary men, such as boorish, stupid or even unseeing – the modern man defies classification within those.

For this reason, Monimalika called on her counsel for advice. She had a very distant cousin who was from her village who now worked for Phanibhushan. He was not the type to advance far by hard work but he managed to make a living and supplement that by virtue of his relationship.

Monimalika told him everything and asked him, ‘What do you advise now?’

He shook his head very wisely, indicating this was not a good turn of events. The wise rarely see a turn of events as good. He said, ‘The owner will never be able to come up  with the money, he will come after your jewellery eventually.’

From what Monimalika knew of people, this was not just inevitable, it was also very logical. She grew very worried indeed. She had no child, she did have a husband but she did not feel his presence within her heart. When she thought that the only thing of value to her, raised like a child over the years, not an abstract like love but real gold, meant to shine at chest, throat and hair – that much loved hoard would disappear into the bottomless pit of a failing business her very heart froze. She asked, ‘What can I do?’

Madhusudan said, ‘Let me take you and your jewellery back home, while you still  can.’ Clever Madhu had already decided on a plan which would see him get a part of that wealth, possibly even most of it.

Monimalika immediately agreed to this proposal.

One evening in the rainy season a boat came and moored at this very jetty. Monimalika boarded the boat the following dawn in dense darkness broken only by the calls of sleepless frogs, covered in a thick shawl that covered her from  head to toe. Madhusudan woke up within the boat and said, ‘Give the jewellery box.’ Moni answered, ‘Later, let us set off now.’

The boat set sail and moved fast before the wind.

Monimalika had worn all her jewellery, one precious piece at a time, all through the night, there was an inch uncovered on her body. She had a fear of taking her jewellery box and losing it to thieves. But she knew that if she wore them all, she would have to be killed before a single jewel was lost.

Madhusudan was unable to understand where the jewellery was as she had no case with her. He did not think of the possibility that she was carrying what she valued as much as herself on her own person. She could not fathom her husband Phanibhushan but she had seen into Madhusudan’s heart with ease.

Madhusudan left a note with the rent-collector saying he was taking the lady of the house home. The man had been working since Phanibhushan’s father was running the business and he was very annoyed. He wrote a letter to his employer, a letter filled with spelling errors and incorrect language but he managed to make it clear that it was not correct to show too much leniency to one’s wife.

Phanibhushan understood what had gone through Monimalika’s mind. He felt worse because he thought, ‘Inspite of every chance of losing everything I did not touch your jewels and am engaged  in finding the money, and still you suspect me! You fail to recognize me, even today!’

Instead of becoming angered at this mistreatment, he only felt deeply hurt. A man is the sceptre of divine justice within which he has concealed his lightning, if a man cannot flare up in rage at the injustice wrought upon him and others, then shame upon him! Men are meant to be inflamed easily like forest fires while women will shed tears like rain at the slightest excuse, this was the Creator’s design, but that is no longer applicable.

In his thoughts Phanibhushan said to his erring wife, ‘If this is to be your decision, let it be, I will keep doing my duty.’ The tragedy was that a man like Phanibhushan who should have come along a few centuries later when conscience would be all that would be needed to rule the world, had been born today and had married the kind of ancient woman whose wisdom was called demonic in the scriptures. He did not write a single line to her and promised himself he would never mention this to his wife ever again. What a strange punishment!

After about ten days after managing somehow to scrounge the money, a redeemed Phanibhushan came home. He knew that Monimalika would have returned after leaving the jewellery with her parents. As he approached the bedroom door he cast aside the air of supplication he had worn the previous time and thought of how Moni might be ashamed and slightly repentant to see him after his success.

He saw the door was barred. He broke the padlock and found the room empty. In a corner lay the iron chest without a trace of any jewellery. Suddenly he felt a pang. He thought life was meaningless and love and success were all false. We bleed on every spike of the cage that we build but there is no bird within, it does not stay even if we place it there. Then what have I been adorning with rubies of my blood and pearls of my tears! He kicked the empty dreams of family life far away.

He did not want to look for her. He thought to himself if she wanted she would come back. The old Brahmin rent collector came and said to him, ‘What good can come of sitting and doing nothing, we have to look for her.’ When he sent word to her parents’ village, word came back that neither Moni nor Madhu had reached there.

People were sent all over the place. People asked questions all along the river bank in search of information. The police were involved in the search for Madhu – which boat, who was their boatman, which way had they gone, no news was heard of them at all.

One day Phanibhushan entered his abandoned bedroom in the evening after all hope had been abandoned. The day was Janmashtami and it had been raining all day. There was a fair in the village to celebrate the holy day and a play had been organized in the community shed. The continual sound of heavy rain had lessened the sound of the voices singing in the play. See that window where the shutter hangs loosely? Phanibhushan was sitting there alone in the dark – he paid no heed to the splatter of rain and the songs entering the room. There was a pair of Art Studio paintings of Lakshmi and Saraswati on the wall, a couple of towels and two saris, one striped and one with thin bands on the border hanging on the rack, ready to be used. A few mouth freshening paan made by Monimalika lay dried in a brass bowl on a side table. Inside the china cabinet were the porcelain dolls she had collected from the days of her childhood, bottles of perfume, coloured glass decanters, fancy playing cards, large seashells, even empty soap boxes kept with great care; the little round kerosene lamp that she would prepare each day and light in the alcove sat there, unlit and dulled.  That little lamp was the only wordless witness to her last minutes in the room; even the one who goes away taking everything with  her leaves behind so many things to remember her by, so much of her history, so many little touches of her once living soul upon all these inanimate objects!

Come Monimalika, light your lamp, illuminate your room, stand before your mirror and wear your carefully folded sari, all your things await you. No one expects anything from you, just come back and allow your eternal youth and your undiminished beauty to give life to these many scattered lifeless objects, binding them together, for the unsaid cries of these have made this house a graveyard.

Atithee/The Guest

আকাশে নববর্ষার মেঘ উঠিল। গ্রামের নদী এতদিন শুষ্কপ্রায় হইয়া ছিল, মাঝে মাঝে কেবল এক-একটা ডোবায় জল বাধিয়া থাকিত; ছোটো ছোটো নৌকা সেই পঙ্কিল জলে ডোবানো ছিল এবং শুষ্ক নদীপথে গোরুর গাড়ি-চলাচলের সুগভীর চক্রচিহ্ন খোদিত হইতেছিল– এমন সময় একদিন, পিতৃগৃহপ্রত্যাগত পার্বতীর মতো কোথা হইতে দ্রুতগামিনী জলধারা কলহাস্যসহকারে গ্রামের শূন্যবক্ষে আসিয়া সমাগত হইল– উলঙ্গ বালকবালিকারা তীরে আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে নৃত্য করিতে লাগিল, অতৃপ্ত আনন্দে বারম্বার জলে ঝাঁপ দিয়া দিয়া নদীকে যেন আলিঙ্গন করিয়া ধরিতে লাগিল, কুটির-বাসিনীরা তাহাদের পরিচিত প্রিয়সঙ্গিনীকে দেখিবার জন্য বাহির হইয়া আসিল– শুষ্ক নির্জীব গ্রামের মধ্যে কোথা হইতে এক প্রবল বিপুল প্রাণহিল্লোল আসিয়া প্রবেশ করিল। দেশবিদেশ হইতে বোঝাই হইয়া ছোটো বড়ো নানা আয়তনের নৌকা আসিতে লাগিল, বাজারের ঘাট সন্ধ্যাবেলায় বিদেশী মাঝির সংগীতে ধ্বনিত হইয়া উঠিল। দুই তীরের গ্রামগুলি সম্বৎসর আপনার নিভৃত কোণে আপনার ক্ষুদ্র ঘরকন্না লইয়া একাকিনী দিন-যাপন করিতে থাকে, বর্ষার সময় বাহিরের বৃহৎ পৃথিবী বিচিত্র পণ্যোপহার লইয়া গৈরিকবর্ণজলরথে চড়িয়া এই গ্রাম্যকন্যাগুলির তত্ত্ব লইতে আসে; তখন জগতের সঙ্গে আত্মীয়তাগর্বে কিছুদিনের জন্য তাহাদের ক্ষুদ্রতা ঘুচিয়া যায়, সমস্তই সচল সজাগ সজীব হইয়া উঠে এবং মৌন নিস্তব্ধ দেশের মধ্যে সুদূর রাজ্যের কলালাপধ্বনি আসিয়া চারি দিকের আকাশকে আন্দোলিত করিয়া তুলে।

এই সময়ে কুড়ুলকাটায় নাগবাবুদের এলাকায় বিখ্যাত রথযাত্রার মেলা হইবে। জ্যোৎস্নাসন্ধ্যায় তারাপদ ঘাটে গিয়া দেখিল, কোনো নৌকা নাগরদোলা, কোনো নৌকা যাত্রার দল, কোনো নৌকা পণ্যদ্রব্য লইয়া প্রবল নবীন স্রোতের মুখে দ্রুতবেগে মেলা অভিমুখে চলিয়াছে; কলিকাতার কন্‌সর্টের দল বিপুলশব্দে দ্রুততালের বাজনা জুড়িয়া দিয়াছে; যাত্রার দল বেহালার সঙ্গে গান গাহিতেছে এবং সমের কাছে হাহাহাঃ শব্দে চীৎকার উঠিতেছে; পশ্চিমদেশী নৌকার দাঁড়িমাল্লাগুলো কেবলমাত্র মাদল এবং করতাল লইয়া উন্মত্ত উৎসাহে বিনা সংগীতে খচমচ শব্দে আকাশ বিদীর্ণ করিতেছে– উদ্দীপনার সীমা নাই। দেখিতে দেখিতে পূর্বদিগন্ত হইতে ঘনমেঘরাশি প্রকাণ্ড কালো পাল তুলিয়া দিয়া আকাশের মাঝখানে উঠিয়া পড়িল, চাঁদ আচ্ছন্ন হইল– পুবে-বাতাস বেগে বহিতে লাগিল, মেঘের পশ্চাতে মেঘ ছুটিয়া চলিল, নদীর জল খল খল হাস্যে স্ফীত হইয়া উঠিতে লাগিল- নদীতীরবর্তী আন্দোলিত বনশ্রেণীর মধ্যে অন্ধকার পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিল, ভেক ডাকিতে আরম্ভ করিল, ঝিল্লিধ্বনি যেন করাত দিয়া অন্ধকারকে চিরিতে লাগিল। সম্মুখে আজ যেন সমস্ত জগতের রথযাত্রা — চাকা ঘুরিতেছে, ধ্বজা উড়িতেছে, পৃথিবী কাঁপিতেছে; মেঘ উড়িয়াছে, বাতাস ছুটিয়াছে, নদী বহিয়াছে, নৌকা চলিয়াছে, গান উঠিয়াছে; দেখিতে দেখিতে গুরু গুরু শব্দে মেঘ ডাকিয়া উঠিল, বিদ্যুৎ আকাশকে কাটিয়া কাটিয়া ঝলসিয়া উঠিল, সুদুর অন্ধকার হইতে একটা মুষলধারাবর্ষী বৃষ্টির গন্ধ আসিতে লাগিল। কেবল নদীর এক তীরে এক পার্শ্বে কাঁঠালিয়া গ্রাম আপন কুটিরদ্বার বন্ধ করিয়া দীপ নিবাইয়া দিয়া নিঃশব্দে ঘুমাইতে লাগিল।

পরদিন তারাপদর মাতা ও ভ্রাতাগণ কাঁঠালিয়ায় আসিয়া অবতরণ করিলেন, পরদিন কলিকাতা হইতে বিবিধসামগ্রীপূর্ণ তিনখানা বড়ো নৌকা আসিয়া কাঁঠালিয়ার জমিদারি কাছারির ঘাটে লাগিল, এবং পরদিন অতি প্রাতে সোনামণি কাগজে কিঞ্চিৎ আমসত্ত এবং পাতার ঠোঙায় কিঞ্চিৎ আচার লইয়া ভয়ে ভয়ে তারাপদর পাঠগৃহদ্বারে আসিয়া নিঃশব্দে দাঁড়াইল, কিন্তু পরদিন তারাপদকে দেখা গেল না। স্নেহ-প্রেম-বন্ধুত্বের ষড়যন্ত্রবন্ধন তাহাকে চারি দিক হইতে সম্পূর্ণরূপে ঘিরিবার পূর্বেই সমস্ত গ্রামের হৃদয়খানি চুরি করিয়া একদা বর্ষার মেঘান্ধকার রাত্রে এই ব্রাহ্মণবালক আসক্তিবিহীন উদাসীন জননী বিশ্বপৃথিবীর নিকট চলিয়া গিয়াছে।

***

The sky was overcast with the clouds heralding the start to the new rainy season. The river in the village had been nearly dried up, with waterholes here and there filled with muddy water where snall boats were moored. The deep ruts of bullock carts that had used the paths marked the dry river bed. And then suddenly, like Parvati returning home to her parents, a fast flowing stream of water arrives out of nowhere, bringing laughter and music to the empty heart of the village – naked children noisily dance around on her banks, jumping again and again into the water, as if to hug her, the women come from their huts to greet their friend again – the dry lifeless village awakens to the touch of a great life force. Boats of many sizes come laden with things from other places, near and far, and each evening the banks of the market ring to the songs of foreign boatmen. The villages on each bank spend the whole year with their own affairs alone, with the rains the vast outer world comes bearing many gifts for the these gentle women on chariots of ochre water; for a few days they are exalted by their ties to that world, where everything is in motion, alive and awake. Sounds and words from far away places come and fill the skies of these silent spaces.

This was just before the famous Ratha fair was held by the Nagbabus of Kurulkata. Tarapada went to the moonlit river bank and saw the boats all leaving with the tide, some carrying the ferris wheel, some the performing troupes, others laden with things to sell. The musical group from Kolkata had started playing some fast rhythm very loudly; the actors were singing their parts to the accompaniment of violins and emphasizing the beat with a loud roar; while the boatmen from the west raised a cacophony of sound alone with their gongs and cymbals – there was no end to the excitement. As he watched, a great flotilla of clouds moved across the sky from the east, hiding the moon. The east wind blew hard, moving cloud after cloud, the river rose steadily, in joyful splashing – the darkness pooling in the forests on its banks, where frogs croaked and crickets sang loud enough to saw right through the darkness. It was as though the whole world was staging a festival of motion – wheels were turning, flags were flying, the earth trembled, the clouds moved, the wind blew, the river flowed, the boats floated, songs were sung, thunder rumbled in the clouds, the lightning split the sky again and again, and a smell of torrents of rain came to him from somewhere dark and far away. Only the village of Kanthaliya kept on sleeping in silence with their doors barred against all this somewhere on the banks of this same river.

 

The next day, Tarapada’s mother and his brothers arrived in Kanthaliya, the day after that three large boats filled with various things from Kolkata came and moored at the landowner’s own jetty and the following day, Shonamoni fearfully went and stood at Tarapada’s study room door very early in the morning, with a little preserved mango wrapped in newspaper and some pickles in a leaf twist but he was no longer there on that following day. Before affection, love and friendship could swallow him up completely; this boy who had stolen the hearts of the entire village had chosen to leave, and had vanished once again into the aloof embrace of mother earth.

 

 

Children on way to Rather mela by Pallab Seth

Chuti/ The Holiday

কলিকাতায় মামার বাড়ি পৌঁছিয়া প্রথমত মামির সঙ্গে আলাপ হইল। মামি এই অনাবশ্যক পরিবারবৃদ্ধিতে মনে মনে যে বিশেষ সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন, তাহা বলিতে পারি না। তাঁহার নিজের তিনটি ছেলে লইয়া তিনি নিজের নিয়মে ঘরকন্না পাতিয়া বসিয়া আছেন, ইহার মধ্যে সহসা একটি তেরো বৎসরের অপরিচিত অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়ে ছেলে ছাড়িয়া দিলে কিরূপ একটা বিপ্লবের সম্ভাবনা উপস্থিত হয়। বিশ্বম্ভরের এত বয়স হইল, তবু কিছুমাত্র যদি জ্ঞানকাণ্ড আছে।

বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধে-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্‌ভতা। হঠাৎ কাপড়চোপড়ের পরিমাণ রক্ষা না করিয়া বেমানানরূপে বাড়িয়া উঠে; লোকে সেটা তাহার একটা কুশ্রী স্পর্ধাস্বরূপ জ্ঞান করে। তাহার শৈশবের লালিত্য এবং কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায়, লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মনে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না। শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়।

সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে। অথচ এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ কিংবা সখ্য লাভ করিতে পারে, তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না, কারণ সেটা সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে। সুতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায়।

অতএব, এমন অবস্থায় মাতৃভবন ছাড়া আর-কোনা অপরিচিত স্থান বালকের পক্ষে নরক। চারি দিকের স্নেহশূন্য বিরাগ তাহাকে পদে পদে কাঁটার মতো বিঁধে। এই বয়সে সাধারণত নারীজাতিকে কোনো-এক শ্রেষ্ঠ স্বর্গলোকের দুর্লভ জীব বলিয়া মনে ধারণা হইতে আরম্ভ হয়, অতএব তাঁহাদের নিকট হইতে উপেক্ষা অত্যন্ত দুঃসহ বোধ হয়।

 

 An excerpt from Chuti, The Holiday

When he arrived in Kolkata, he met his uncle’s wife, his aunt for the first time. I do not think that she was very pleased at this unnecessary addition to her family. She had been happily raising three sons of her own and to have a stranger, an uneducated thirteen year old boy from the village suddenly let loose on them was almost an incitement to revolution. Her husband was advanced in years but where was the sense in this?

In this world of ours there is nothing that is as great a source of annoyance as a boy of thirteen or fourteen. They are not pleasant to look at nor are they useful. They do not engender love nor is their company very desirable. A childish lisp seems affected on their lips, mature words sound impertinent and in fact any word at all can be a word too many. They suddenly seem to outgrow their clothing and this is deemed an unpleasant liberty by those around them. The softness of childhood and the sweetness of voice are suddenly lost to angularity and a strange hoarseness; others somehow blame them for this as well. Many of the transgressions of childhood and youth may be forgiven, but the natural and inevitable lapses of these in between years are somehow unbearable to others.

He too can sense that somehow he does not really fit anywhere; this makes him continually ashamed and apologetic. And yet this is the age when the need for some affection is actually felt more acutely. If he can have some affectionate consideration from a kindhearted person, he will be eternally bound to them. But sadly no one dares to approach him with affection, because most see that as leniency and thus bad for him . This is why with constant scolding and correction he becomes like an unloved stray dog, both in appearance and in manner.

As a result any new place outside the mother’s home is hell for such boys. The loveless dislike that surrounds him stings him like barbs. This is also the age when the female members of the species starts appearing like an unattainable being of a superior heavenly sphere and therefore any neglect from them is utterly unbearable.

 

 

Painting of rural  Bengal by Alaykumar Ghoshal

http://fineartamerica.com/featured/rural-bengal-5-alaykumar-ghoshal.html

ক্ষুধিত পাষাণ/Khudhito Pashaan/The Hungry Stones

ক্ষুধিত পাষাণ

আমি এবং আমার আত্মীয় পূজার ছুটিতে দেশভ্রমণ সারিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতেছিলাম, এমন সময় রেলগাড়িতে বাবুটির সঙ্গে দেখা হয় । তাঁহার বেশভূষা দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল । তাঁহার কথাবার্তা শুনিয়া আরো ধাঁধা লাগিয়া যায় । পৃথিবীর সকল বিষয়েই এমন করিয়া আলাপ করিতে লাগিলেন , যেন তাঁহার সহিত প্রথম পরামর্শ করিয়া বিশ্ববিধাতা সকল কাজ করিয়া থাকেন । বিশ্বসংসারের ভিতরে ভিতরে যে এমন-সকল অশ্রুতপূর্ব নিগূঢ় ঘটনা ঘটিতেছিল , রুশিয়ানরা যে এতদূর অগ্রসর হইয়াছে , ইংরাজদের যে এমন-সকল গোপন মতলব আছে , দেশীয় রাজাদের মধ্যে যে একটা খিচুড়ি পাকিয়া উঠিয়াছে , এ সমস্ত কিছুই না জানিয়া আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইয়া ছিলাম । আমাদের নবপরিচিত আলাপীটি ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন: There happen more things in heaven and earth, Horatio, than are reported in your newspapers . আমরা এই প্রথম ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়াছি , সুতরাং লোকটির রকম সকম দেখিয়া অবাক হইয়া গেলাম । লোকটা সামান্য উপলক্ষে কখনো বিজ্ঞান বলে , কখনো বেদের ব্যাখ্যা করে , আবার হঠাৎ কখনো পার্সি বয়েত আওড়াইতে থাকে। বিজ্ঞান বেদ এবং পার্সিভাষায় আমাদের কোনোরূপ অধিকার না থাকাতে তাঁহার প্রতি আমাদের ভক্তি উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল । এমন-কি , আমার থিয়সফিস্ট্‌ আত্মীয়টির মনে দৃঢ় বিশ্বাস হইল যে , আমাদের এই সহযাত্রীর সহিত কোনো এক রকমের অলৌকিক ব্যাপারের কিছু-একটা যোগ আছে; কোনো একটা অর্পূব ম্যাগ্‌‍নেটিজ্‌‍ম্ অথবা দৈবশক্তি , অথবা সূক্ষ্ম শরীর , অথবা ঐ ভাবের একটা-কিছু। তিনি এই অসামান্য লোকের সমস্ত সামান্য কথাও ভক্তিবিহ্বল মুগ্ধভাবে শুনিতেছিলেন এবং গোপনে নোট করিয়া লইতেছিলেন; আমার ভাবে বোধ হইল , অসামান্য ব্যক্তিটিও গোপনে তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং কিছু খুশি হইয়াছিলেন।

গাড়িটি আসিয়া জংশনে থামিলে আমরা দ্বিতীয় গাড়ির অপেক্ষায় ওয়েটিংরুমে সমবেত হইলাম। তখন রাত্রি সাড়ে দশটা। পথের মধ্যে একটা কী ব্যাঘাত হওয়াতে গাড়ি অনেক বিলম্বে আসিবে শুনিলাম। আমি ইতিমধ্যে টেবিলের উপর বিছানা পাতিয়া ঘুমাইব স্থির করিয়াছি, এমন সময়ে সেই অসামান্য ব্যক্তিটি নিম্নলিখিত গল্প ফাঁদিয়া বসিলেন। সে রাত্রে আমার আর ঘুম হইল না।

রাজ্যচালনা সম্বন্ধে দুই-একটা বিষয়ে মতান্তর হওয়াতে আমি জুনাগড়ের কর্ম ছাড়িয়া দিয়া হাইদ্রাবাদে যখন নিজাম সরকারে প্রবেশ করিলাম তখন আমাকে অল্পবয়স্ক ও মজবুত লোক দেখিয়া প্রথমে বরীচে তুলার মাশুল-আদায়ে নিযুক্ত করিয়া দিল।

বরীচ জায়গাটি বড়ো রমণীয়। নির্জন পাহাড়ের নীচে বড়ো বড়ো বনের ভিতর দিয়া শুস্তা নদীটি (সংস্কৃত স্বচ্ছতোয়ার অপভ্রংশ) উপলমুখরিত পথে নিপুণা নর্তকীর মতো পদে পদে বাঁকিয়া বাঁকিয়া দ্রুত নৃত্যে চলিয়া গিয়াছে । ঠিক সেই নদীর ধারেই পাথর-বাঁধানো দেড়-শত-সোপান-ময় অত্যুচ্চ ঘাটের উপরে একটি শ্বেতপ্রস্তরের প্রাসাদ শৈলপদমূলে একাকী দাঁড়াইয়া আছে — নিকটে কোথাও লোকালয় নাই। বরীচের তুলার হাট এবং গ্রাম এখান হইতে দূরে।

প্রায় আড়াই শত বৎসর পূর্বে দ্বিতীয় শা-মামুদ ভোগবিলাসের জন্য প্রাসাদটি এই নির্জন স্থানে নির্মাণ করিয়াছিলেন। তখন হইতে স্নানশালার ফোয়ারার মুখ হইতে গোলাপগন্ধী জলধারা উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকিত এবং সেই শীকরশীতল নিভৃত গৃহের মধ্যে মর্মরখচিত স্নিগ্ধ শিলাসনে বসিয়া কোমল নগ্ন পদপল্লব জলাশয়ের নির্মল জলরাশির মধ্যে প্রসারিত করিয়া তরুণী পারসিক রমণীগণ স্নানের পূর্বে কেশ মুক্ত করিয়া দিয়া সেতার-কোলে দ্রাক্ষাবনের গজল গান করিত।

এখন আর সে ফোয়ারা খেলে না , সে গান নাই , সাদা পাথরের উপর শুভ্র চরণের সুন্দর আঘাত পড়ে না — এখন ইহা আমাদের মতো নির্জনবাসপীড়িত সঙ্গিনীহীন মাশুল-কালেক্টরের অতি বৃহৎ এবং অতি শূন্য বাসস্থান । কিন্তু আপিসের বৃদ্ধ কেরানি করিম খাঁ আমাকে এই প্রাসাদে বাস করিতে বারংবার নিষেধ করিয়াছিল; বলিয়াছিল, ইচ্ছা হয় দিনের বেলা থাকিবেন , কিন্তু কখনো এখানে রাত্রিযাপন করিবেন না। আমি হাসিয়া উড়াইয়া দিলাম। ভৃত্যেরা বলিল, তাহারা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করিবে, কিন্তু রাত্রে এখানে থাকিবে না। আমি বলিলাম, তথাস্তু। এ বাড়ির এমন বদনাম ছিল যে, রাত্রে চোরও এখানে আসিতে সাহস করিত না।

প্রথম প্রথম আসিয়া এই পরিত্যক্ত পাষাণপ্রাসাদের বিজনতা আমার বুকের উপর যেন একটা ভয়ংকর ভারের মতো চাপিয়া থাকিত, আমি যতটা পারিতাম বাহিরে থাকিয়া অবিশ্রাম কাজকর্ম করিয়া রাত্রে ঘরে ফিরিয়া শ্রান্তদেহে নিদ্রা দিতাম।

কিন্তু সপ্তাহখানেক না যাইতেই বাড়িটার এক অপূর্ব নেশা আমাকে ক্রমশ আক্রমণ করিয়া ধরিতে লাগিল। আমার সে অবস্থা বর্ণনা করাও কঠিন এবং সে কথা লোককে বিশ্বাস করানোও শক্ত। সমস্ত বাড়িটা একটা সজীব পদার্থের মতো আমাকে তাহার জঠরস্থ মোহরসে অল্পে অল্পে যেন জীর্ণ করিতে লাগিল।

বোধ হয় এ বাড়িতে পদার্পণমাত্রেই এ প্রক্রিয়ার আরম্ভ হইয়াছিল — কিন্তু আমি যেদিন সচেতনভাবে প্রথম ইহার সূত্রপাত অনুভব করি সেদিনকার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

তখন গ্রীষ্মকালের আরম্ভে বাজার নরম; আমার হাতে কোনো কাজ ছিল না। সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে আমি সেই নদীতীরে ঘাটের নিম্নতলে একটা আরাম-কেদারা লইয়া বসিয়াছি । তখন শুস্তানদী শীর্ণ হইয়া আসিয়াছে ; ও পারে অনেকখানি বালুতট অপরাহ্নের আভায় রঙিন হইয়া উঠিয়াছে, এ পারে ঘাটের সোপানমূলে স্বচ্ছ অগভীর জলের তলে নুড়িগুলি ঝিক্‌ ঝিক্‌ করিতেছে। সেদিন কোথাও বাতাস ছিল না। নিকটের পাহাড়ে বনতুলসী পুদিনা ও মৌরির জঙ্গল হইতে একটা ঘন সুগন্ধ উঠিয়া স্থির আকাশকে ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়াছিল।

সূর্য যখন গিরিশিখরের অন্তরালে অবতীর্ণ হইল তৎক্ষণাৎ দিবসের নাট্যশালার একটা দীর্ঘ ছায়াযবনিকা পড়িয়া গেল — এখানে পর্বতের ব্যবধান থাকাতে সূর্যাস্তের সময় আলো-আঁধারের সম্মিলন অধিকক্ষণ স্থায়ী হয় না। ঘোড়ায় চড়িয়া একবার ছুটিয়া বেড়াইয়া আসিব মনে করিয়া উঠিব-উঠিব করিতেছি , এমন সময়ে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনিতে পাইলাম। পিছনে ফিরিয়া দেখিলাম , কেহ নাই।

ইন্দ্রিয়ের ভ্রম মনে করিয়া পুনরায় ফিরিয়া বসিতেই একেবারে অনেকগুলি পায়ের শব্দ শোনা গেল , যেন অনেকে মিলিয়া ছুটাছুটি করিয়া নামিয়া আসিতেছে। ঈষৎ ভয়ের সহিত এক অপরূপ পুলক মিশ্রিত হইয়া আমার সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল। যদিও আমার সম্মুখে কোনো মূর্তি ছিল না তথাপি স্পষ্ট প্রত্যক্ষবৎ মনে হইল যে , এই গ্রীষ্মের সায়াহ্নে একদল প্রমোদচঞ্চল নারী শুস্তার জলের মধ্যে স্মান করিতে নামিয়াছে । যদিও সেই সন্ধ্যাকালে নিস্তব্ধ গিরিতটে , নদীতীরে নির্জন প্রাসাদে কোথাও কিছুমাত্র শব্দ ছিল না , তথাপি আমি যেন স্পষ্ট শুনিতে পাইলাম নির্ঝরের শতধারার মতো সকৌতুক কলহাস্যের সহিত পরস্পরের দ্রুত অনুধাবন করিয়া আমার পার্শ্ব দিয়া স্মানার্থিনীরা চলিয়া গেল । আমাকে যেন লক্ষ্য করিল না। তাহারা যেমন আমার নিকট অদৃশ্য , আমিও যেন সেইরূপ তাহাদের নিকট অদৃশ্য। নদী পূর্ববৎ স্থির ছিল , কিন্তু আমার নিকট স্পষ্ট বোধ হইল , স্বচ্ছতোয়ার অগভীর স্রোত অনেকগুলি বলয়শিঞ্জিত বাহুবিক্ষেপে বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে; হাসিয়া হাসিয়া সখীগণ পরস্পরের গায়ে জল ছুঁড়িয়া মারিতেছে, এবং সন্তরণকারিণীদের পদাঘাতে জলবিন্দুরাশি মুক্তামুষ্টির মতো আকাশে ছিটিয়া পড়িতেছে।

 

We met the gentleman on the train while my relative and I were returning to Kolkata after our holidays. At first I thought he was one of the Muslims from the west when I saw his clothes. My confusion increased when I heard him speak. He had so much to say about each and every thing on earth, it was as though the Creator did everything after discussing it with him first. We had been completely at peace in our ignorance about many unheard of secrets, the advance of the Russians, the secret plans of the English and the tangled intrigues of the Indian princes. Our new found acquaintance smiled slightly and said, ‘There happen more things in heaven and earth, Horatio, than are reported in your newspapers.’ We had left our homes for the first time, and this man’s strange behaviour surprised us. At the slightest excuse, he talked about science or explained the Vedas, and recited Farsi couplets. As we had no knowledge of science, the Vedas or Farsi our reverence for him grew progressively. Even my theosophist relative started believing that this co-traveller of ours had some kind of supernatural link; a kind of astonishing magnetism or unearthly power, or paranormal abilities or something of a similar nature. He was listening to everything this extraordinary man said with awestruck reverence and was secretly making notes; I felt that the extraordinary man had understood this too and was enjoying it.

When the train stopped at the junction we waited in a group in the waiting room. It was half past ten at night. We heard that the train was greatly delayed due to some problems on the route. I had already decided to spread out my bed roll and sleep on a table when the extraordinary gentleman started to tell us the story below. I did not get any sleep at all that night.

After I had resigned my position at Junagadh after a few disagreements regarding how the kingdom should be run and joined the Nizam’s government at Hyderabad, they posted me at Barich as a cotton tax collector, seeing that I was a hardy young man.

Barich was a very pleasant place. The Shusta(from the original Swachchatoya in Sanskrit) flowed fast over  a pebbled bed like the swaying motion of an expert dancer through great forests at the feet of lonely peaks. Right next to the river were a hundred and fifty marble steps that led to a palace made of white stone that stood alone at the base of the mountains – there were no other houses near by. The cotton market at Barich and the village were far from here.

Shah Mahmud the Second had built his palace for pleasure in this remote place almost two hundred and fifty years ago. From then on rose scented water flowed in fountains from the bathing houses and young Persian beauties sat, their hair flowing down their backs, with their pretty bare feet in the clear waters of the pools on stone seats in those secret rooms with their sitars across their laps singing songs of the grape arbors of their native lands.

Those fountains do not flow any more, those songs no longer fill the air, nor do  those fair feet fall upon the white stone floors – today it is a vast and terribly empty dwelling for tax collectors like me, deprived of female company and oppressed by the loneliness of our surroundings. But the ancient clerk at work, Karim Khan had cautioned me repeatedly against staying there, saying to me, ‘stay here if you must during the day, but never spend the night here.’ I laughed his worries off. The servants said they would work till evening but they too refused to stay at night. I said, ‘So be it.’ The house was so infamous that even thieves refused to try their luck at night.

Initially the emptiness of the abandoned palace used to weigh on me like a terrible weight, I used to try and stay away for as long as possible and work continually to return home exhausted and fall asleep.

But within a week the house began to encompass me with intoxication. It would be hard to describe my state and even to make people believe me. The entire house started to absorb me like a living thing being drawn slowly within its digestive system.

Possibly this process had started the moment I set foot in the house – but I still remember the day when I first noticed its beginnings within my consciousness.

The market was slow at the start of summer; I had no work to do. I was sitting on an easy chair at the bottom of those steps one evening a little before sunset. The river had grown shallow over summer; a large part of the sandy banks on the opposite side was coloured by the rays of the setting sun, on this shore the pebbles could be seen glinting in the the shallow waters of the river hugging the steps. There was not a whisper of breeze any where. A dense perfume rose from the wild basil, mint and fennel forests of the nearby mountains filling the still skies with heaviness.

When the sun descended behind the shelter of the peaks a curtain of shadow immediately fell across the arena of the day – the mountains here prevent the mingling of light and dark from lasting long at sunset. I was thinking of going for a ride on my horse when I suddenly heard footsteps on the stairs. When I looked back, there was no one there.

Thinking it a trick of my senses I turned my back once again; immediately I heard the sounds of feet, as though many people were running down the stairs. My whole body trembled with a most delicious thrill mixed with a slight degree of fear. Even though there was nothing before me, I felt as though I could clearly see a group of vivacious women descending into the river to bathe. Even though there was no sound to be heard anywhere that evening either on the silent mountain slopes or in the deserted palace on that river bank, I could still clearly hear the bathers chase each other past me with peals of amused laughter like the hundred streams of a waterfall. They did not seem to notice me. Just as they were invisible to me, I was invisible to them. The river was just as peaceful as before, but I clearly felt the shallow water being churned by the movements of many bangle bedecked arms; they were splashing each other with water as they laughed and the water droplets splashed like fistfuls of pearls into the sky as the swimmers playfully kicked  their legs in the river.

 

 

The  film was directed  by Tapan Sinha in 1960 Soumitra Chatterjee, Arundhuti Debi, Padma Debi, Radhamohan Bhattacharya, , Dilip Roy, and Chhabi Biswas. Ustad Ali Akbar Khan Scored the Music in the Film.

http://www.youtube.com/watch?v=vg7WzFPO6So&feature=relmfu

স্ত্রীর পত্র /Streer Potro/ A wife’s letter to her husband

কিন্তু আমি আর তোমাদের সেই সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলিতে ফিরব না। আমি বিন্দুকে দেখেছি সংসারের মাঝখানে মেয়েমানুষের পরিচয়টা যে কী তা আমি পেয়েছি। আর আমার দরকার নেই ।

তার পরে এও দেখেছি, ও মেয়ে বটে তবু ভগবান ওকে ত্যাগ করেন নি। ওর উপরে তোমাদের যত জোরই থাক্‌-না কেন, সে জোরের অন্ত আছে। ও আপনার হতভাগ্য মানবজন্মের চেয়ে বড়ো। তোমরাই যে আপন ইচ্ছামতো আপন দস্তুর দিয়ে ওর জীবনটাকে চিরকাল পায়ের তলায় চেপে রেখে দেবে, তোমাদের পা এত লম্বা নয়। মৃত্যু তোমাদের চেয়ে বড়ো। সেই মৃত্যুর মধ্যে সে মহান — সেখানে বিন্দু কেবল বাঙালি ঘরের মেয়ে নয়, কেবল খুড়ততো ভায়ের বোন নয়, কেবল অপরিচিত পাগল স্বামীর প্রবঞ্চিত স্ত্রী নয়। সেখানে সে অনন্ত।

সেই মৃত্যুর বাঁশি এই বালিকার ভাঙা হৃদয়ের ভিতর দিয়ে আমার জীবনের যমুনাপারে যেদিন বাজল সেদিন প্রথমটা আমার বুকের মধ্যে যেন বাণ বিঁধল। বিধাতাকে জিজ্ঞাসা করলুম, জগতের মধ্যে যা-কিছু সব চেয়ে তুচ্ছ তাই সব চেয়ে কঠিন কেন? এই গলির মধ্যকার চারি-দিকে-প্রাচীর-তোলা নিরানন্দের অতি সামান্য বুদ্‌বুদটা এমন ভয়ংকর বাধা কেন। তোমার বিশ্বজগৎ তার ছয় ঋতুর সুধাপাত্র হাতে করে যেমন করেই ডাক দিক-না, এক মুহূর্তের জন্যে কেন আমি এই অন্দরমহলটার এইটুকু মাত্র চৌকাঠ পেরতে পারি নে। তোমার এমন ভুবনে আমার এমন জীবন নিয়ে কেন ঐ অতি তুচ্ছ ইটঁকাঠের আড়ালটার মধ্যেই আমাকে তিলে তিলে মরতেই হবে। কত তুচ্ছ আমার এই প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, কত তুচ্ছ এর সমস্ত বাঁধা নিয়ম, বাঁধা অভ্যাস, বাঁধা বুলি, এর সমস্ত বাঁধা মার — কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দীনতার নাগপাশ বন্ধনেরই হবে জিত — আর হার হল তোমার নিজের সৃষ্টি ঐ আনন্দলোকের?

কিন্তু মৃত্যুর বাঁশি বাজাতে লাগল — কোথায় রে রাজমিস্ত্রির গড়া দেয়াল, কোথায় রে তোমাদের ঘোরো আইন দিয়ে গড়া কাঁটার বেড়া; কোন্‌ দুঃখে কোন্‌ অপমানে মানুষকে বন্দী করে রেখে দিতে পারে! ঐ তো মৃত্যুর হাতে জীবনের জয়পতাকা উড়ছে! ওরে মেজোবউ, ভয় নেই তোর! তোর মেজবউয়ের খোলস ছিন্ন হতে এক নিমেষও লাগে না।

তোমাদের গলিকে আর আমি ভয় করি নে। আমার সম্মুখে আজ নীল সমুদ্র, আমার মাথার উপরে আষাঢ়ের মেঘপুঞ্জ।

তোমাদের অভ্যাসের অন্ধকারে আমাকে ঢেকে রেখে দিয়েছিলে। ক্ষণকালের জন্য বিন্দু এসে সেই আবরণের ছিদ্র দিয়ে আমাকে দেখে নিয়েছিল। সেই মেয়েটাই তার আপনার মৃত্যু দিয়ে আবরণখানা আগাগোড়া ছিন্ন করে দিয়ে গেল। আজ বাইরে এসে দেখি, আমার গৌরব রাখবার আর জায়গা নেই। আমার এই আনাদৃত রূপ যাঁর চোখে ভালো লেগেছে, সেই সুন্দর সমস্ত আকাশ দিয়ে আমাকে চেয়ে দেখছেন। এইবার মরেছে মেজোবউ।

তুমি ভাবছ আমি মরতে যাচ্ছি– ভয় নেই, অমন পুরোনো ঠাট্টা তোমাদের সঙ্গে আমি করব না। মীরাবাঈও তো আমারই মতো মেয়েমানুষ ছিল– তার শিকলও তো কম ভারী ছিল না তাকে তো বাঁচবার জন্যে মরতে হয় নি। মীরাবাঈ তার গানে বলেছিল,’ছাড়ুক বাপ, ছাড়ুক মা, ছাড়ুক যে যেখানে আছে, মীরা কিন্তু লেগেই রইল, প্রভু– তাতে তার যা হবার তা হোক।’ এই লেগে থাকাই তো বেঁচে থাকা। আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।

তোমাদের চরণতলাশ্রয়ছিন্ন–

মৃণাল।

But I will not go back to your house at No 27 Makhan Boral Lane. I have seen Bindu and the way women are viewed in life. I do not need to see any more.

I have also seen that even although she was a woman, God did not abandon her. What ever power you all had over her was finite. She was greater than her accursed human life. You do not have the reach to crush her life for eternity under your feet as your will demands. Death is greater than you. There, in the embrace of Death, Bindu is not just a girl from a Bengali family, not just an ill treated cousin sister nor a betrayed wife of an insane man that we knew nothing about. There she is eternal.

The day that Death played his flute for the first time on the banks of the Yamuna of my life through the pain of that child’s broken heart; it pierced my soul. I asked my Fate why it was that the most ordinary of things was the hardest. Why did a tiny bubble of discontent spawned within the walled confines of this lane become such an obstacle? No matter how much your vast world beckons with the intoxicating beauty of its six seasons, why can I not cross that little threshold and step outside? Why do I have to spend this amazing gift of life within this wonderful world of yours behind such an insignificant hurdle, dying a little at a time as I must? How very contemptible is my daily life, how insignificant its routines, its habits, its rituals, its utterances, and even its deprivations – but still in the end, why must the serpentine coils of those restrictions win – and this world of happiness that you have created lose?

But the flute sang to me – where do these walls built by masons, where do the barbed wires of your domestic rules, what sorrow or insult has ever imprisoned  the human spirit. Look, there flies the pennant of Life in the grasp of Death. Second daughter in law, have no fear. It does not take a moment to shed the husk of your existence as a second daughter in law.

I do not fear your lane any more.  Before me stretches the blue ocean, above me a lies  a sky full of rain clouds.

The darkness of your customs had covered me. For a short while Bindu came and saw my worth through a rent in that cloak. She tore it off completely with her own death. Today I step outside to find there is hardly room enough to contain my pride. The Beautiful one who has liked this unloved form of mine surrounds me with his gaze from the skies above. Now the second daughter in law has died.

You think I am going to die, never fear, I would not dream of playing that old trick on you. Meerabai was a woman just like me – the chains that bound her were heavy indeed and yet she did not have to die in order to be released. She said in her song, ‘Let my father forsake me, let my mother, let everyone give up, but Meera stays with you. Lord Krishna – come what may.’

This staying on is what surviving is. I too will survive. in fact I have survived.

Sincerely

The one who is no more in need of shelter at your feet,

Mrinal.

রথযাত্রা /Ratha Yatra/The Coming Of The Chariot

রথযাত্রা

রথযাত্রার দিন কাছে।

তাই রানী রাজাকে বললে, ‘চলো, রথ দেখতে যাই।’

রাজা বললে, ‘আচ্ছা।’

ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া বেরোল, হাতিশাল থেকে হাতি। ময়ূরপংখি যায় সারে সারে, আর বল্লম হাতে সারে সারে সিপাইসান্ত্রি। দাসদাসী দলে দলে পিছে পিছে চলল।

কেবল বাকি রইল একজন। রাজবাড়ির ঝাঁটার কাঠি কুড়িয়ে আনা তার কাজ।

সর্দার এসে দয়া করে তাকে বললে, ‘ওরে, তুই যাবি তো আয়।’

সে হাত জোড় করে বললে, ‘আমার যাওয়া ঘটবে না।’

রাজার কানে কথা উঠল, সবাই সঙ্গে যায়, কেবল সেই দুঃখীটা যায় না।

রাজা দয়া করে মন্ত্রীকে বললে, ‘ওকেও ডেকে নিয়ো।’

রাস্তার ধারে তার বাড়ি। হাতি যখন সেইখানে পৌঁছল মন্ত্রী তাকে ডেকে বললে, ‘ওরে দুঃখী, ঠাকুর দেখবি চল্‌।’

সে হাত জোড় করে বলল, ‘কত চলব। ঠাকুরের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছই এমন সাধ্য কি আমার আছে।’

মন্ত্রী বললে, ‘ভয় কী রে তোর, রাজার সঙ্গে চলবি।’

সে বললে, ‘সর্বনাশ! রাজার পথ কি আমার পথ।’

মন্ত্রী বললে, ‘তবে তোর উপায়? তোর ভাগ্যে কি রথযাত্রা দেখা ঘটবে না।’

সে বললে, ‘ঘটবে বই কি। ঠাকুর তো রথে করেই আমার দুয়ারে আসেন।’

মন্ত্রী হেসে উঠল। বললে, ‘তোর দুয়ারে রথের চিহ্ন কই।’

দুঃখী বললে, ‘তাঁর রথের চিহ্ন পড়ে না।’

মন্ত্রী বললে, ‘কেন বল্‌ তো।’

দুঃখী বললে, ‘তিনি যে আসেন পুষ্পকরথে।’

মন্ত্রী বললে, ‘কই রে সেই রথ।’

দুঃখী দেখিয়ে দিলে, তার দুয়ারের দুই পাশে দুটি সূর্যমুখী ফুটে আছে।

লিপিকা,
১৯১৭-১৯১৯

Ratha Yatra/The Coming Of The Chariot

The day of the Chariot festival drew near.

The queen said to her king, “Let us go and see the Chariot”

The king said, “Alright”

The horses were summoned from the stables, the elephants from their pens. Peacock barges sailed in serried ranks; foot soldiers with spears at the ready. An army of servants brought the rear.

There was only one person left behind. Her job was to collect twigs to make the brooms used in the palace.

The leader came and said to them benevolently, “If you want, you can still go”

She put her hands together humbly and said, “I do not think I can”

The king heard the story of how every one was going except for one poor wretch.

He said to his minister magnanimously, “Let us also take her along”

She lived along the road. When the elephants got there, the minister said, “Come along wretch, let us go and look at the deity”

She clasped her hands together and said, “How far will I have to go? Do I have the ability to go up to the deity’s door?”

The minister said, “Fear not, you will go with the king”

She said, “For shame! Can the king’s path and mine be the same?”

The minister said, “What will happen then? Are you not fated to see the deity in his chariot?”

She said, “Of course it will happen! The deity himself rides to my door!”

The minister laughed and said, “Where are the ruts in the dust leading to your door?”

The wretch said, “His chariot does not leave marks”

The minister said, “Why is that?”

She said, “He comes in a chariot of flowers”

The minister said, “Where is that chariot?”

The woman pointed, there were two sunflower plants in bloom on either side of her door.

This is taken from Lipika which Tagore wrote between 1917 and 1919. He translated it himself into English.

To listen to the poem: http://youtu.be/NhFiLg2b9sE

image courtesy of

একটি দিন/One Day

                                                           একটি দিন

মনে পড়ছে সেই দুপুরবেলাটি। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টিধারা ক্লান্ত হয়ে আসে, আবার দমকা হাওয়া তাকে মাতিয়ে তোলে।

ঘরে অন্ধকার, কাজে মন যায় না। যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বর্ষার গানে মল্লারের সুর লাগালেম।

পাশের ঘর থেকে একবার সে কেবল দুয়ার পর্যন্ত এল। আবার ফিরে গেল। আবার একবার বাইরে এসে দাঁড়াল। তার পরে ধীরে ধীরে ভিতরে এসে বসল। হাতে তার সেলাইয়ের কাজ ছিল, মাথা নিচু করে সেলাই করতে লাগল। তার পরে সেলাই বন্ধ করে জানলার বাইরে ঝাপসা গাছগুলোর দিকে চেয়ে রইল।

বৃষ্টি ধরে এল, আমার গান থামল। সে উঠে চুল বাঁধতে গেল।

এইটুকু ছাড়া আর কিছুই না। বৃষ্টিতে গানেতে অকাজে আঁধারে জড়ানো কেবল সেই একটি দুপুরবেলা।

ইতিহাসে রাজাবাদশার কথা, যুদ্ধবিগ্রহের কাহিনী, সস্তা হয়ে ছড়াছড়ি যায়। কিন্তু একটি দুপুরবেলার ছোটো একটু কথার টুকরো দুর্লভ রত্নের মতো কালের কৌটোর মধ্যে লুকোনো রইল, দুটি লোক তার খবর জানে।

I remember that afternoon. The rain lessened every now and again, until gusts of wind encouraged it back into torrents.

The room grew dark, I could not pay attention to my work.I picked up my instrument and started playing a song about the rain, set to the Mallar raga.

She came from the next room and stood at the door. Then she went back. She returned and stood outside the door; finally, she walked in slowly and sat down. She had some needlework with her which she now concentrated on. Presently, she put down the needlework and gazed at the faint outlines of trees outside the window.

The rain stopped. My music came to an end. She went away to comb her hair.

This is all. Just one afternoon filled with rain, song, idleness and shadows.

In the pages of history, the stories of kings and the wars they fight happen so often, they become commonplace. But our memories of that one afternoon are locked away like a precious gem in the coffers of time, only two people know about that.

স্ত্রীর পত্র/A letter To My Husband

শ্রীচরণকমলেষু

আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে, আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি— মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি, চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায় নি।

আজ আমি এসেছি তীর্থ করতে শ্রীক্ষেত্রে, তুমি আছ তোমার আপিসের কাজে। শামুকের সঙ্গে খোলসের যে সম্বন্ধ কলকাতার সঙ্গে তোমার তাই, সে তোমার দেহমনের সঙ্গে এঁটে গিয়েছে; তাই তুমি আপিসে ছুটির দরখাস্ত করলে না। বিধাতার তাই অভিপ্রায় ছিল; তিনি আমার ছুটির দরখাস্ত মঞ্জুর করেছেন।

আমি তোমাদের মেজোবউ। আজ পনেরো বছরের পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি, আমার জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই চিঠিখানি লিখছি, এ তোমাদের মেজোবউয়ের চিঠি নয়।

তোমাদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কপালে যিনি লিখেছিলেন তিনি ছাড়া যখন সেই সম্ভাবনার কথা আর কেউ জানত না, সেই শিশুবয়সে আমি আর আমার ভাই একসঙ্গেই সান্নিপাতিক জ্বরে পড়ি। আমার ভাইটি মারা গেল, আমি বেঁচে উঠলুম। পাড়ার সব মেয়েরাই বলতে লাগল , “মৃণাল মেয়ে কি না, তাই ও বাঁচল,বেটাছেলে হলে কি আর রক্ষা পেত?” চুরিবিদ্যাতে যম পাকা, দামি জিনিসের ’পরেই তার লোভ।

আমার মরণ নেই। সেই কথাটাই ভালো করে বুঝিয়ে বলবার জন্যে এই চিঠিখানি লিখতে বসেছি।

যেদিন তোমাদের দূরসম্পর্কের মামা তোমার বন্ধু নীরদকে নিয়ে কনে দেখতে এলেন তখন আমার বয়স বারো। দুর্গম পাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি, সেখানে দিনের বেলা শেয়াল ডাকে। স্টেশন থেকে সাত ক্রোশ স্যক্‌রা গাড়িতে এসে বাকি তিন মাইল কাঁচা রাস্তায় পালকি করে তবে আমাদের গাঁয়ে পৌঁছনো যায়। সেদিন তোমাদের কী হয়রানি। তার উপরে আমাদের বাঙাল দেশের রান্না— সেই রান্নার প্রহসন আজও মামা ভোলেন নি।

তোমাদের বড়োবউয়ের রূপের অভাব মেজবউকে দিয়ে পূরণ করবার জন্যে তোমার মায়ের একান্ত জিদ ছিল। নইলে এত কষ্ট করে আমাদের সে গাঁয়ে তোমরা যাবে কেন? বাংলা দেশে পিলে যকৃত অম্লশূল এবং ক’নের জন্যে তো কাউকে খোঁজ করতে হয় না- তারা আপনি এসে চেপে ধরে, কিছুতে ছাড়তে চায় না।

বাবার বুক দুর্‌‌‍দুর্ করতে লাগল, মা দুর্গানাম জপ করতে লাগলেন। শহরের দেবতাকে পাড়াগাঁয়ের পূজারি কী দিয়ে সন্তুষ্ট করবে। মেয়ের রূপের উপর ভরসা; কিন্তু, সেই রূপের গুমর তো মেয়ের মধ্যে নেই, যে ব্যক্তি দেখতে এসেছে সে তাকে যে-দামই দেবে সেই তার দাম। তাই তো হাজার রূপে গুণেও মেয়েমানুষের সংকোচ কিছুতে ঘোচে না।

The Wife’s Letter

Most respected husband,

We have been married for fifteen years, yet I have never written a letter to you. I have always been with you, you have heard my words as I have heard yours, and a letter has never been needed between the two of us.

Today I have come to Srikshetra on a pilgrimage, and you have remained at work. Your relationship with Kolkata is like that of a snail within its shell, the city has become glued to your very body and soul. That is why you did not even apply for leave; God wanted it thus, he granted me leave.

I am the Mejo-Bou in your family. After fifteen years of that existence, as I stand beside the sea, I begin to understand that I have another identity, in my world and in the eyes of my maker. That is how I have had the courage to write this letter, I do not write this as your Mejo-Bou.

When I was a child and none but my destiny knew that I was to become part of your world, my brother and I both had typhoid. My brother died, I remained alive. All the local women said, “Mrinal has survived only because she is a girl, would she be here if she had been a boy?” Yama, the god of death is an expert thief, he only takes things that are of some value.

I will not die so easily. I have started to write this letter to explain that.

The day when your uncle came with your friend Nirad to see me, I was twelve years old. Our village was so far from any town; the calls of jackals could be heard even during hours of daylight. They had to ride in a carriage for fourteen miles and then in a palanquin for the last three miles. It was an ordeal. Added to that was the rustic food that they were served at our house – your uncle still remembers that farce.

Your mother was very insistent that the lack of beauty in her eldest daughter-in-law was to be compensated for by the appearance of your wife. What else would have taken them to that remote village? In Bengal, one does not have to seek out afflictions of the liver, spleen and the digestive system or brides – they are plentiful, appear of their own free will and then do not let go easily.

My father was sick with worry, my mother called upon all her gods. How does a simple, rural offering satisfy the needs of an urban god? They had every belief in the allure of my beauty, but as I had no pride in that, it was only worth what the visitors from town would offer for it. That is why women remain unsure of themselves, even when they bear every outward sign of beauty.