Tag Archive | নতুন পুতুল

নতুন পুতুলঃ লিপিকা /The New Doll: Lipika

 

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

***

 

The New Doll

 

|1|

There was a master craftsman who only made dolls; dolls fit for a princess to play with.

Every year there was a doll fair in the palace courtyard. All the other artisans at the fair honoured the master craftsman with the respect reserved for the best.

When he was almost eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal; youthful in years was he, hitherto unseen his methods.

The dolls he made looked complete in some ways and unfinished in others. He touches them with paint in some parts and leaves other parts untouched. The dolls look as if they are still being made, as if they will never be completed.

The young say, ‘Now this is courage!’

The old say, ‘Courage? This is effrontery!’

But, new times demand new things. Today’s princesses say, ‘We want these dolls.’

The old courtiers say, ‘For shame!’

Of course, this only strengthens the young people’s resolve.

The crowds no longer flock to the old man’s shop. His baskets filled with dolls wait just as people at the river bank wait for the ferry, staring at the other bank.

One year passed and then another; everyone forgot the old fellow’s name. Kishanlal became the leader of the doll sellers at the palace fair.

|2|

The old man was heartbroken. It was hard for him to make a living. In the end his daughter came and said to him, Come and stay with me.’

His son-in-law said, ‘Eat, drink and be merry. All you have to do us drive the stray cattle from the fields.’

His daughter is busy with her chores all day long. His son-in-law makes clay lamps and takes them to sell in the city when his boat is full.

The old man does not see that the times have changed, just as he does not understand that his granddaughter is now sixteen years old.

She goes to him where he sits in the shade of the trees, dozing off as he guards the field and puts her arms about his neck. Even his bones grow happy as he says, ‘What is it? What do you want?’

His granddaughter says, ‘Make me dolls to play with.’

The old man said, ‘But are you sure you even like the dolls I make?’

His granddaughter said, ‘Tell me then, is there anyone who makes better dolls than you?’

The old man said, ‘Why, how about Kishanlal?’

The girl answered, ‘He wishes he had your talent!’

The two often squabble like this. It is always about the same thing.

The old man then takes his equipment out of his bag and puts his enormous round glasses on.

He says to his granddaughter, ‘But dear, what about the crows eating the corn?’

His granddaughter says, ‘Grandfather, I will drive the crows away!’

Time passes; the bullock draws water noisily at the distant canal; the granddaughter drives the crows away and the old man makes his doll

3|

The old man fears his daughter most of all. She rules her world with an iron grasp, everyone is careful about what they do when she is around.

The old man was fashioning dolls with all his concentration today; he did not notice when his daughter came walking towards him from behind, her arms swinging busily.

When she came right up to him and spoke, he took his glasses off and looked at her with childlike innocence.

His daughter said, ‘The milking can wait I suppose, while you while away your time with Subhadra. She is a big girl now, is she going to play with dolls anymore?’

The old man said hurriedly, ‘Why would Subhadra play with these? I will sell these at the palace. For I have to give a necklace of coins to my child on the day her husband comes asking for her hand. I want to save money for that.’

His daughter said with some annoyance, ‘Who will buy these dolls at the palace!’

The old man’s head sank in shame. He sat in silence.

Subhadra shook her head and said, ‘I dare the people in the palace to keep their hands off my grandfather’s dolls.’

|4|

Two days later Subhadra brought a measure of gold and gave it to her mother saying, ‘Here you are, money for my grandfather’s dolls.’

Her mother asked, ‘Where did you get this?’

The girl answered, ‘I sold them at the palace.’

The old man said with a smile, ‘And yet your grandfather does not see so well these days, and yet you know that his hands tremble.’

Her mother said happily, ‘Sixteen gold pieces like this should make a fine adornment for Subhadra’s neck.’

The old man answered, ‘Do not worry about that.’

Subhadra wrapped her arms about his neck and said, ‘I do not need anyone else.’

The old man kept smiling as he wiped a tear from his eye.

|5|

The old man seemed to have regained his youth. He would sit under the tree and make dolls. Subhadra would drive off the crows and the bullock would draw water from the distant canal with a wheezing sound.

One by one the sixteen coins were strung and the necklace was completed.

Her mother said, ‘Now all we need is a groom!’

Subhadra whispered in his ear, ‘Grandfather, I have a groom all ready and waiting.’

‘But tell me, where did you find your groom?’

Subhadra answered, ‘That day when I went to the palace, the guard asked me what I wanted. I said that I was there to sell my dolls to the princesses. He said that my dolls were not in fashion any more. With those words he turned me away. One man was moved by my tears and said, ‘Give those dolls to me, I will dress them up a little and they will sell. If you say yes old grandfather, I will marry that man.’

The old craftsman asked, ‘Where is he?’

His granddaughter said, ‘There he stands, beneath the Piyal tree.’

Her groom entered the room; the old man said, ‘But this is Kishanlal!’

Kishanlal touched his feet in respectful greeting and said, ‘Yes, I am Kishanlal indeed.’

The old man clasped him to his chest and said, ‘Once you took the dolls I made, today you take the treasure of my heart.’

His granddaughter put her arms around his neck and whispered in his ear, ‘Along with you!’