Archive | February 2014

বাংলাভাষা ও বাঙালি চরিত্র: ১

বাংলাভাষা ও বাঙালি চরিত্র : ১

অনেক সময় দেখা যায় সংস্কৃত শব্দ বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে এক প্রকার বিকৃত ভাব প্রকাশ করে। কেমন একরকম ইতর বর্বর আকার ধারণ করে। “ঘৃণা’ শব্দের মধ্যে একটা মানসিক ভাব আছে। Aversion, indignation, contempt প্রভৃতি ইংরাজি শব্দ বিভিন্ন স্থল অনুসারে “ঘৃণা’র প্রতিশব্দ স্বরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে। কিন্তু “ঘেন্না’ বললেই নাকের কাছে একটা দুর্গন্ধ, চোখের সামনে একটা বীভৎস দৃশ্য, গায়ের কাছাকাছি একটা মলিন অস্পৃশ্য বস্তু কল্পনায় উদিত হয়। সংস্কৃত “প্রীতি’ শব্দের মধ্যে একটা বিমল উদার মানসিক ভাব নিহিত আছে। কিন্তু বাংলা “পিরিতি’ শব্দের মধ্যে সেই বিশুদ্ধ ভাবটুকু নাই। বাংলায় “স্বামী’ “স্ত্রী’র সাধারণ প্রচলিত প্রতিশব্দ ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করিতে লজ্জা বোধ হয়। “ভর্তা’ এবং তাহার বাংলা রূপান্তর তুলনা করিয়া দেখিলেই এ কথা স্পষ্ট হইবে। আমার বোধ হয় সংস্কৃত ভাষায় “লজ্জা’ বলিলে যতটা ভাব প্রকাশ করে, বাংলায় “লজ্জা’ ততটা করে না। বাংলায় “লজ্জা’ এক প্রকার প্রথাগত বাহ্য লজ্জা, তাহা modesty নহে। তাহা হ্রী নহে। লজ্জার সহিত শ্রীর সহিত একটা যোগ আছে, বাংলা ভাষায় তাহা নাই। সৌন্দর্যের প্রতি স্বাভাবিক লক্ষ্য থাকিলে আচারে ব্যবহারে, ভাবভঙ্গিতে ভাষায় কণ্ঠস্বরে সাজসজ্জায় একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সংযম আসিয়া পড়ে। বাংলায় লজ্জা বলিতে যাহা বুঝায় তাহা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তাহাতে বরঞ্চ আচার-ব্যবহারের সামঞ্জস্য নষ্ট করে, একটা বাড়াবাড়ি আসিয়া সৌন্দর্যের ব্যাঘাত করে। তাহা শরীর-মনের সুশোভন সংযম নহে, তাহার অনেকটা কেবলমাত্র শারীরিক অভিভূতি।

গল্প আছে– বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন উলোয় শিব গড়িতে বাঁদর হইয়া দাঁড়ায়, তেমনি বাংলার মাটির বাঁদর গড়িবার দিকে একটু বিশেষ প্রবণতা আছে। লক্ষ্য শিব এবং পরিণাম বাঁদর ইহা অনেক স্থলেই দেখা যায়। উদার প্রেমের ধর্ম বৈষ্ণব ধর্ম বাংলাদেশে দেখিতে দেখিতে কেমন হইয়া দাঁড়াইল। একটা বৃহৎ ভাবকে জন্ম দিতে যেমন প্রবল মানসিক বীর্যের আবশ্যক, তাহাকে পোষণ করিয়া রাখিতেও সেইরূপ বীর্যের আবশ্যক। আলস্য এবং জড়তা যেখানে জাতীয় স্বভাব, সেখানে বৃহৎ ভাব দেখিতে দেখিতে বিকৃত হইয়া যায়। তাহাকে বুঝিবার, তাহাকে রক্ষা করিবার এবং তাহার মধ্যে প্রাণসঞ্চার করিয়া দিবার উদ্যম নাই।

আমাদের দেশে সকল জিনিসই যেন এক প্রকার slang হইয়া আসে। আমার তাই এক-একবার ভয় হয় পাছে ইংরাজদের বড়ো ভাব বড়ো কথা আমাদের দেশে ক্রমে সেইরূপ অনার্য ভাব ধারণ করে। দেখিয়াছি বাংলায় অনেকগুলি গানের সুর কেমন দেখিতে দেখিতে ইতর হইয়া যায়। আমার বোধ হয় সভ্যদেশে যে যে সুর সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচলিত, তাহার মধ্যে একটা গভীরতা আছে, তাহা তাহাদের national air, তাহাতে তাহাদের জাতীয় আবেগ পরিপূর্ণভাবে ব্যক্ত হয়। যথা Home Sweet Home, Auld lang Syne–, বাংলাদেশে সেরূপ সুর কোথায়? এখানকার সাধারণ-প্রচলিত সুরের মধ্যে গাম্ভীর্য নাই, স্থায়িত্ব নাই, ব্যাপকতা নাই। সেইজন্য তাহার কোনোটাকেই national air বলা যায় না। হিন্দুস্থানীতে যে-সকল খাম্বাজ ঝিঁঝিট কাফি প্রভৃতি রাগিণীতে শোভন ভদ্রভাব লক্ষিত হয়, বাংলায় সেই রাগিণীই কেমন কুৎসিত আকার ধারণ করিয়া “বড় লজ্জা করে পাড়ায় যেতে’ “কেন বল সখি বিধুমুখী’ “একে অবলা সরলা’ প্রভৃতি গানে পরিণত হইয়াছে।

কেবল তাহাই নহে, আমাদের এক-একবার মনে হয় হিন্দুস্থানী এবং বাংলার উচ্চারণের মধ্যে এই ভদ্র এবং বর্বর ভাবের প্রভেদ লক্ষিত হয়। হিন্দুস্থানী গান বাংলায় ভাঙিতে গেলেই তাহা ধরা পড়ে। সুর তাল অবিকল রক্ষিত হইয়াও অনেক সময় বাংলা গান কেমন “রোথো’ রকম শুনিতে হয়। হিন্দুস্থানীর polite “আ’ উচ্চারণ বাংলায় vulgar “অ’ উচ্চারণে পরিণত হইয়া এই ভাবান্তর সংঘটন করে। “আ’ উচ্চারণের মধ্যে একটি বেশ নির্লিপ্ত ভদ্র suggestive ভাব আছে, আর “অ’ উচ্চারণ নিতান্ত গা-ঘেঁষা সংকীর্ণ এবং দরিদ্র। কাশীর সংস্কৃত উচ্চারণ শুনিলে এই প্রভেদ সহজেই উপলব্ধি হয়।

উপরের প্যারাগ্রাফে এক স্থলে commonplace শব্দ বাংলায় ব্যক্ত করিতে গিয়া “রোথো’ শব্দ ব্যবহার করিয়াছি। কিন্তু উক্ত শব্দ ব্যবহার করিতে কেমন কুণ্ঠিত বোধ করিতেছিলাম। সকল ভাষাতেই গ্রাম্য ইতর শব্দ আছে। কিন্তু দেখিয়াছি বাংলায় বিশেষ ভাবপ্রকাশক শব্দমাত্রই গ্রাম্য। তাহাতে ভাব ছবির মতো ব্যক্ত করে বটে কিন্তু সেইসঙ্গে আরো একটা কী করে যাহা সংকোচজনক। জলভরন শব্দ বাংলায় ব্যক্ত করিতে হইলে হয় “মুচ্‌কে হাসি’ নয় “ঈষদ্ধাস্য’ বলিতে হইবে। কিন্তু “মুচ্‌কে হাসি’ সাধারণত মনের মধ্যে যে ছবি আনয়ন করে তাহা বিশুদ্ধ smile নহে, ঈষদ্ধাস্য কোনো ছবি আনয়ন করে কি না সন্দেহ। Peep শব্দকে বাংলায় “উঁকিমারা’ বলিতে হয়। Creep শব্দকে “গুঁড়িমারা’ বলিতে হয়। কিন্তু “উঁকিমারা’ “গুঁড়িমারা’ শব্দ ভাবপ্রকাশক হইলেও সর্বত্র ব্যবহারযোগ্য নহে। কারণ উক্ত শব্দগুলিতে আমাদের মনে এমন-সকল ছবি আনয়ন করে যাহার সহিত কোনো মহৎ বর্ণনার যোগসাধন করিতে পারা যায় না।

হিন্দুস্থানী বা মুসলমানদের মধ্যে একটা আদব-কায়দা আছে। একজন হিন্দুস্থানী বা মুসলমান ভৃত্য দিনের মধ্যে প্রভুর সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হইবা মাত্রই যে সেলাম অথবা নমস্কার করে তাহার কারণ এমন নহে যে, তাহাদের মনে বাঙালি ভৃত্যের অপেক্ষা অধিক দাস্যভাব আছে, কিন্তু তাহার কারণ এই যে, সভ্যসমাজের সহস্রবিধ সম্বন্ধের ইতিকর্তব্যতা বিষয়ে তাহারা নিরলস ও সতর্ক। প্রভুর নিকটে তাহারা পরিচ্ছন্ন পরিপাটি থাকিবে, মাথায় পাগ্‌ড়ি পরিবে, বিনীত ভাব রক্ষা করিবে। স্বাভাবিক ভাবে থাকা অপেক্ষা ইহাতে অনেক আয়াস ও শিক্ষা আবশ্যক। আমরা অনেক সময়ে যাহাকে স্বাধীন ভাব মনে করি তাহা অশিক্ষিত অসভ্য ভাব। অনেক সময়ে আমাদের এই অশিক্ষিত ও বর্বর ভাব দেখিয়াই ইংরাজেরা আমাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়, অথচ আমরা মনে মনে গর্ব করি যেন প্রভুকে যথাযোগ্য সম্মান না দেখাইয়া আমরা ভারি একটা কেল্লা ফতে করিয়া আসিলাম। এই অশিক্ষা ও অনাচারবশত আমাদের দৈনিক ভাষা ও কাজের মধ্যে একটি সুমার্জিত সুষমা একটি শ্রী লক্ষিত হয় না। আমরা কেমন যেন “আট-পৌরে’ “গায়েপড়া’ “ফেলাছড়া’ “ঢিলেঢালা’ “নড়বোড়ে’ রকমের জাত, পৃথিবীর কাজেও লাগি না, পৃথিবীর শোভাও সাধন করি না।

01SM_Zerin_1_Oh_Ko_1038288g

The Bengali language and Bengali character: 1
It is often seen that Sanskrit words that are transferred into Bengali express a warped sense of the original meaning; they take on a low, uncivilized form. There is a sense of the mind being affected in the word ‘Ghrina’. It can be used as a synonym for the English words aversion, indignation and contempt. But say the word ‘Ghenna’ and immediately one imagines a malodor invading the nose, an ugly scene unfolding before the eyes and a dirty object being placed near one’s body. There is a pure, generous sense of giving in the Sanskrit word ‘Preeti’, which is sadly lacking in the Bengali ‘Piriti’. I feel ashamed to even use the colloquial Bengali words for ‘Swami’ and ‘Stree’. This will become clear if one compares the Sanskrit ‘Bhorta’ to its Bengali form. I think that the amount of feeling conveyed through the Sanskrit word ‘Lojja’ is greater than that expressed by the Bengali ‘Lojja’. ‘Lojja’ or shame in Bengali is merely a mechanical response, rather than being synonymous with modesty. There is no ‘Hri’ or bashfulness. There is a link between ‘Lojja’ and ‘Shree’ which is missing in Bengali. When there is an instinctive eye for beauty, it is accompanied by a fitting sense of balance in behavior, customs, manner, language, voice and clothing. In Bengali, ‘Lojja’ is something completely separate, it tends to destroy the balance between custom and its application and is overdone to the point of ruining beauty. It is not attained by a gentle unity of body and soul but is more of a purely physical expression.

It is rumoured that Vidyasagar once said that if a hoolock gibbon was to make an idol of Shiva, it would end up fashioning a monkey; the soil of Bengal has a tendency to lend itself to the making of monkeys. It is frequently seen that the aim was to create a Shiva and the result is the creation of a simian. One only has to see what happened to the broadminded religion of love known as Vaishnavism in Bengal over time. Just as there is a need of tremendous mental strength to give birth to a school of great thought, the same strength is essential for its survival. Where sloth and lethargy are part of the culture, great thought soon becomes stunted. There is no effort devoted to its understanding, its maintenance and infusing life into it.

Everything is reduced to a form of slang in our part of the world. I sometimes fear that the great philosophy and teachings of the British will be reduced gradually to a vernacular form in this country. I have seen how many songs become baser in Bengal. I feel that the tunes that are established in civilized countries have a depth to them that allow these to become the national air and express their nationalistic spirit; such as Home Sweet Home and Auld Lang Syne. What do we have in Bengal that has the same ring? The common tunes popular here have no depth or permanence. That is why none of them can be described as national airs. The beauty of the Hindusthani ragas such as Khamaj, Jhinjhit and Kafi is reduced to simple rough tunes such as ‘I am shamed much to go there’ and ‘Tell me why my moonfaced maiden’.

It is not just that; sometimes we feel this division into polite and crude in the difference between Hindusthani and Bengali pronunciation. It is apparent as soon as one tries to break a Hindusthani song into Bengali. Even after retaining the tune and the beat the song sounds very ‘Rotho’. The polite ‘Aa’ of Hindusthani becomes the vulgar ‘Aw’ of Bengali and forces the transformation. The sound ‘Aa’ has a suggestion of detachment while ‘Aw’ merely sounds impoverished and narrow minded. Listening to the Sanskrit spoken in Kashi will make this understanding clear.
I have used the word ‘Rotho’ in the paragraph above in an attempt to say ‘commonplace’. But I felt reluctance to use the word. There are rustic common sounds in all languages. But I have noticed that in Bengali, words that express certain feelings are nothing but rustic. They express the meaning much as a picture does but also convey a meaning that is not quite palatable. One has to say ‘Muchke hashi’ or ‘sneaky smile’ to convey the meaning of ‘Ishodhashyo’ or slight smile in Sanskrit. But the phrase ‘sneaky smile’ awakens a mental picture that is not of a pure smile and certainly not a slight smile. The word ‘peep’ is ‘unkimara’ in Bengali; the word ‘creep’ is ‘gnurimara’. But these two Bengali words are not worthy of using in all situations even though they paint a vivid picture of peeping and creeping as they also seem to imbue these pictures with a vulgar touch that are at odds with their use in any polite accounts.

The Hindi speakers and the Muslims have certain etiquette of behaviour. The fact that a serving man of either persuasion greets his employer with a ‘Namaste’ or a ‘Salaam’ when seeing him for the first time in a day is not because he has more servility in his heart than a Bengali servant does, but because they are conscious and tireless in maintaining the intricacies of each relationship in polite society. They will be clean and well presented in the presence of their employer, they will wear proper dress, and they will be courteous. What we often think of as a spirit of freedom is in reality an expression of poor education and crudity. Often the British are dismissive of us when they see this uneducated and uncivilized side to us but we are secretly proud of having done a great deed by not according our masters the honour they deserve. This has resulted in a lack of polish and beauty in our day to day language and actions. We seem to be a common people who are hangers on, slack, unstable and dispensable; we serve no purpose on this earth nor do we add to its charms.

Image: http://www.thehindu.com/features/magazine/oh-calcutta/article3261359.ece

Swami(husband): Sowami
Stree(wife): Istiri
Bhorta(he who looks after, husband): Bhaataar

Advertisements

চোখের বালি ২৪/Chokher Bali 24

২৪
মহেন্দ্র ভাবিতে লাগিল, ‘আমি বলিয়াছি মিথ্যা কথা, আমি বিনোদিনীকে ভালোবাসি না। অত্যন্ত কঠিন করিয়া বলিয়াছি। আমি যে তাহাকে ভালোবাসি তাহা না-ই হইল, কিন্তু ভালোবাসি না, এ কথাটা বড়ো কঠোর। এ কথায় আঘাত না পায় এমন স্ত্রীলোক কে আছে। ইহার প্রতিবাদ করিবার অবসর কবে কোথায় পাইব। ভালোবাসি এ কথা ঠিক বলা যায় না; কিন্তু ভালোবাসি না, এই কথাটাকে একটু ফিকা করিয়া, নরম করিয়া জানানো দরকার। বিনোদিনীর মনে এমন-একটা নিষ্ঠুর অথচ ভুল সংস্কার থাকিতে দেওয়া অন্যায়।’
এই বলিয়া মহেন্দ্র তাহার বাক্সর মধ্য হইতে আর-একবার তাহার চিঠি তিনখানি পড়িল। মনে মনে কহিল, ‘বিনোদিনী আমাকে যে ভালোবাসে, ইহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু কাল সে বিহারীর কাছে অমন করিয়া আসিয়া পড়িল কেন। সে কেবল আমাকে দেখাইয়া। আমি যখন তাহাকে ভালোবাসি না স্পষ্ট করিয়া বলিলাম, তখন সে কোনো সুযোগে আমার কাছে তাহার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান না করিয়া কী করিবে। এমনি করিয়া আমার কাছে অবমানিত হইয়া হয়তো সে বিহারীকে ভালোবাসিতেও পারে।’
মহেন্দ্রের ক্ষোভ এতই বাড়িয়া উঠিতে লাগিল যে, নিজের চাঞ্চল্যে সে নিজে আশ্চর্য এবং ভীত হইয়া উঠিল। নাহয় বিনোদিনী শুনিয়াছে, মহেন্দ্র তাহাকে ভালোবাসে না– তাহাতে দোষ কী। নাহয় এই কথায় অভিমানিনী বিনোদিনী তাহার উপর হইতে মন সরাইয়া লইতে চেষ্টা করিবে– তাহাতেই বা ক্ষতি কী। ঝড়ের সময় নৌকার শিকল যেমন নোঙরকে টানিয়া ধরে, মহেন্দ্র তেমনি ব্যাকুলতার সঙ্গে আশাকে যেন অতিরিক্ত জোর করিয়া ধরিল।
রাত্রে মহেন্দ্র আশার মুখ বক্ষের কাছে ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “চুনি, তুমি আমাকে কতখানি ভালোবাস ঠিক করিয়া বলো।”
আশা ভাবিল, “এ কেমন প্রশ্ন। বিহারীকে লইয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক যে-কথাটা উঠিয়াছে, তাহাতেই কি তাহার উপরে সংশয়ের ছায়া পড়িয়াছে।” সে লজ্জায় মরিয়া গিয়া কহিল, “ছি ছি, আজ তুমি এমন প্রশ্ন কেন করিলে। তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে খুলিয়া বলো– আমার ভালোবাসায় তুমি কবে কোথায় কী অভাব দেখিয়াছ।”
মহেন্দ্র আশাকে পীড়ন করিয়া তাহার মাধুর্য বাহির করিবার জন্য কহিল, “তবে তুমি কাশী যাইতে চাহিতেছ কেন।”
আশা কহিল, “আমি কাশী যাইতে চাই না, আমি কোথাও যাইব না।”
মহেন্দ্র। তখন তো চাহিয়াছিলে।
আশা অত্যন্ত পীড়িত হইয়া কহিল, “তুমি তো জান, কেন চাহিয়াছিলাম।”
মহেন্দ্র। আমাকে ছাড়িয়া তোমার মাসির কাছে বোধ হয় বেশ সুখে থাকিতে।
আশা কহিল, “কখনো না। আমি সুখের জন্য যাইতে চাহি নাই।”
মহেন্দ্র কহিল, “আমি সত্য বলিতেছি চুনি, তুমি আর-কাহাকেও বিবাহ করিলে ঢের বেশি সুখী হইতে পারিতে।”
শুনিয়া আশা চকিতের মধ্যে মহেন্দ্রের বক্ষ হইতে সরিয়া গিয়া, বালিশে মুখ ঢাকিয়া, কাঠের মতো আড়ষ্ট হইয়া রহিল– মুহূর্তপরেই তাহার কান্না আর চাপা রহিল না। মহেন্দ্র তাহাকে সান্ত্বনা দিবার জন্য বক্ষে তুলিয়া লইবার চেষ্টা করিল, আশা বালিশ ছাড়িল না। পতিব্রতার এই অভিমানে মহেন্দ্র সুখে গর্বে ধিক্‌কারে ক্ষুব্ধ হইতে লাগিল।
যে-সব কথা ভিতরে-ভিতরে আভাসে ছিল, সেইগুলা হঠাৎ স্পষ্ট কথায় পরিস্ফুট হইয়া সকলেরই মনে একটা গোলমাল বাধাইয়া দিল। বিনোদিনী মনে মনে ভাবিতে লাগিল– অমন স্পষ্ট অভিযোগের বিরুদ্ধে বিহারী কেন কোনো প্রতিবাদ করিল না। যদি সে মিথ্যা প্রতিবাদও করিত, তাহা হইলেও যেন বিনোদিনী একটু খুশি হইত। বেশ হইয়াছে, মহেন্দ্র বিহারীকে যে-আঘাত করিয়াছে, তাহা তাহার প্রাপ্যই ছিল। বিহারীর মতো অমন মহৎ লোক কেন আশাকে ভালোবাসিবে। এই আঘাতে বিহারীকে যে দূরে লইয়া গেছে, সে যেন ভালোই হইয়াছে– বিনোদিনী যেন নিশ্চিন্ত হইল।
কিন্তু বিহারীর সেই মৃত্যুবাণাহত রক্তহীন পাংশু মুখ বিনোদিনীকে সকল কর্মের মধ্যে যেন অনুসরণ করিয়া ফিরিল। বিনোদিনীর অন্তরে যে সেবাপরায়ণা নারীপ্রকৃতি ছিল, সে সেই আর্ত মুখ দেখিয়া কাঁদিতে লাগিল। রুগ্‌ণ শিশুকে যেমন মাতা বুকের কাছে দোলাইয়া বেড়ায়, তেমনি সেই আতুর মূর্তিকে বিনোদিনী আপন হৃদয়ের মধ্যে রাখিয়া দোলাইতে লাগিল; তাহাকে সুস্থ করিয়া সেই মুখে আবার রক্তের রেখা, প্রাণের প্রবাহ, হাস্যের বিকাশ দেখিবার জন্য বিনোদিনীর একটা অধীর ঔৎসুক্য জন্মিল।
দুই-তিন দিন সকল কর্মের মধ্যে এইরূপ উন্মনা হইয়া ফিরিয়া বিনোদিনী আর থাকিতে পারিল না। বিনোদিনী একখানি সান্ত্বনার পত্র লিখিল, কহিল–

‘ঠাকুরপো, আমি তোমার সেদিনকার সেই শুষ্ক মুখ দেখিয়া অবধি প্রাণমনে কামনা করিতেছি, তুমি সুস্থ হও, তুমি যেমন ছিলে তেমনিটি হও– সেই সহজ হাসি আবার কবে দেখিব, সেই উদার কথা আবার কবে শুনিব। তুমি কেমন আছ, আমাকে একটি ছত্র লিখিয়া জানাও।
তোমার বিনোদ-বৌঠান।’

বিনোদিনী দরোয়ানের হাত দিয়া বিহারীর ঠিকানায় চিঠি পাঠাইয়া দিল।
আশাকে বিহারী ভালোবাসে, এ কথা যে এমন রূঢ় করিয়া, এমন গর্হিতভাবে মহেন্দ্র মুখে উচ্চারণ করিতে পারিবে, তাহা বিহারী স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই। কারণ, সে নিজেও এমন কথা স্পষ্ট করিয়া কখনো মনে স্থান দেয় নাই। প্রথমটা বজ্রাহত হইল– তার পরে ক্রোধে ঘৃণায় ছটফট করিয়া বলিতে লাগিল, ‘অন্যায়, অসংগত, অমূলক।’
কিন্তু কথাটা যখন একবার উচ্চারিত হইয়াছে, তখন তাহাকে আর সম্পূর্ণ মারিয়া ফেলা যায় না। তাহার মধ্যে যেটুকু সত্যের বীজ ছিল, তাহা দেখিতে দেখিতে অঙ্কুরিত হইয়া উঠিতে লাগিল। কন্যা দেখিবার উপলক্ষে সেই যে একদিন সূর্যাস্তকালে বাগানের উচ্ছ্বসিত পুষ্পগন্ধপ্রবাহে লজ্জিতা বালিকার সুকুমার মুখখানিকে সে নিতান্তই আপনার মনে করিয়া বিগলিত অনুরাগের সহিত একবার চাহিয়া দেখিয়াছিল, তাহাই বার বার মনে পড়িতে লাগিল, এবং বুকের কাছে কী যেন চাপিয়া ধরিতে লাগিল, এবং একটা অত্যন্ত কঠিন বেদনা কণ্ঠের কাছ পর্যন্ত আলোড়িত হইয়া উঠিল। দীর্ঘরাত্রি ছাদের উপর শুইয়া শুইয়া, বাড়ির সম্মুখের পথে দ্রুতপদে পায়চারি করিতে করিতে, যাহা এতদিন অব্যক্ত ছিল তাহা বিহারীর মনে ব্যক্ত হইয়া উঠিল। যাহা সংযত ছিল তাহা উদ্দাম হইল; নিজের কাছেও যাহার কোনো প্রমাণ ছিল না, মহেন্দ্রের বাক্যে তাহা বিরাট প্রাণ পাইয়া বিহারীর অন্তর-বাহির ব্যাপ্ত করিয়া দিল।
তখন সে নিজেকে অপরাধী বলিয়া বুঝিল। মনে মনে কহিল, ‘আমার তো আর রাগ করা শোভা পায় না, মহেন্দ্রের কাছে তো ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বিদায় লইতে হইবে। সেদিন এমনভাবে চলিয়া আসিয়াছিলাম, যেন মহেন্দ্র দোষী, আমি বিচারক– সে অন্যায় স্বীকার করিয়া আসিব।’
বিহারী জানিত, আশা কাশী চলিয়া গেছে। একদিন সে সন্ধ্যার সময় ধীরে ধীরে মহেন্দ্রের দ্বারের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজলক্ষ্মীর দূরসম্পর্কের মামা সাধুচরণকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “সাধ্‌দা, কদিন আসিতে পারি নাই– এখানকার সব খবর ভালো?” সাধুচরণ সকলের কুশল জানাইল। বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “বৌঠান কাশীতে কবে গেলেন।” সাধুচরণ কহিল, “তিনি যান নাই। তাঁহার কাশী যাওয়া হইবে না।” শুনিয়া কিছু না মানিয়া অন্তঃপুরে যাইবার জন্য বিহারীর মন ছুটিল। পূর্বে যেমন সহজে যেমন আনন্দে আত্মীয়ের মতো সে পরিচিত সিঁড়ি বাহিয়া ভিতরে যাইত, সকলের সঙ্গে স্নিগ্ধ কৌতুকের সহিত হাস্যালাপ করিয়া আসিত, কিছুই মনে হইত না, আজ তাহা অবিহিত, তাহা দুর্লভ, জানিয়াই তাহার চিত্ত যেন উন্মত্ত হইল। আর-একটিবার, কেবল শেষবার, তেমনি করিয়া ভিতরে গিয়া ঘরের ছেলের মতো রাজলক্ষ্মীর সহিত কথা সারিয়া, একবার ঘোমটাবৃত আশাকে বৌঠান বলিয়া দুটো তুচ্ছ কথা কহিয়া আসা তাহার কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার বিষয় হইয়া উঠিল। সাধুচরণ কহিল, “ভাই, অন্ধকারে দাঁড়াইয়া রহিলে যে, ভিতরে চলো।”
শুনিয়া বিহারী দ্রুতবেগে ভিতরের দিকে কয়েক পদ অগ্রসর হইয়াই ফিরিয়া সাধুকে কহিল, “যাই একটা কাজ আছে।” বলিয়া তাড়াতাড়ি প্রস্থান করিল। সেই রাত্রেই বিহারী পশ্চিমে চলিয়া গেল।
দরোয়ান বিনোদিনীর চিঠি লইয়া বিহারীকে না পাইয়া চিঠি ফিরাইয়া লইয়া আসিল। মহেন্দ্র তখন দেউড়ির সম্মুখে ছোটো বাগানটিতে বেড়াইতেছিল। জিজ্ঞাসা করিল, “এ কাহার চিঠি।” দরোয়ান সমস্ত বলিল। মহেন্দ্র চিঠিখানি নিজে লইল।
একবার সে ভাবিল, চিঠিখানা লইয়া বিনোদিনীর হাতে দিবে– অপরাধিনী বিনোদিনীর লজ্জিত মুখ একবার সে দেখিয়া আসিবে– কোনো কথা বলিবে না। এই চিঠির মধ্যে বিনোদিনীর লজ্জার কারণ যে আছেই, মহেন্দ্রের মনে তাহাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। মনে পড়িল, পূর্বেও আর-একদিন বিহারীর নামে এমনি একখানা চিঠি গিয়াছিল। চিঠিতে কী লেখা আছে, এ কথা না জানিয়া মহেন্দ্র কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। সে মনকে বুঝাইল– বিনোদিনী তাহার অভিভাবকতায় আছে, বিনোদিনীর ভালোমন্দের জন্য সে দায়ী। অতএব এরূপ সন্দেহজনক পত্র খুলিয়া দেখাই তাহার কর্তব্য। বিনোদিনীকে বিপথে যাইতে দেওয়া কোনোমতেই হইতে পারে না।
মহেন্দ্র ছোটো চিঠিখানা খুলিয়া পড়িল। তাহা সরল ভাষায় লেখা, সেইজন্য অকৃত্রিম উদ্‌‍বেগ তাহার মধ্য হইতে পরিষ্কার প্রকাশ পাইয়াছে। চিঠিখানা পুনঃপুন পাঠ করিয়া এবং অনেক চিন্তা করিয়া মহেন্দ্র ভাবিয়া উঠিতে পারিল না, বিনোদিনীর মনের গতি কোন্‌ দিকে। তাহার কেবলই আশঙ্কা হইতে লাগিল, ‘আমি যে তাহাকে ভালোবাসি না বলিয়া অপমান করিয়াছি, সেই অভিমানেই বিনোদিনী অন্য দিকে মন দিবার চেষ্টা করিতেছে। রাগ করিয়া আমার আশা সে একেবারেই ছাড়িয়া দিয়াছে।’
এই কথা মনে করিয়া মহেন্দ্রের ধৈর্যরক্ষা করা একেবারে অসম্ভব হইয়া উঠিল। যে-বিনোদিনী তাহার নিকট আত্মসমর্পণ করিতে আসিয়াছিল, সে যে মুহূর্তকালের মূঢ়তায় সম্পূর্ণ তাহার অধিকারচ্যুত হইয়া যাইবে, সেই সম্ভাবনায় মহেন্দ্রকে স্থির থাকিতে দিল না। মহেন্দ্র ভাবিল, ‘বিনোদিনী আমাকে যদি মনে মনে ভালোবাসে, তাহা বিনোদিনীর পক্ষে মঙ্গলকর– এক জায়গায় সে বদ্ধ হইয়া থাকিবে।’ আমি নিজের মন জানি, আমি তো তাহার প্রতি কখনোই অন্যায় করিব না।সে আমাকে নিরাপদে ভালোবাসিতে পারে। আমি আশাকে ভালোবাসি, আমার দ্বারা তাহার কোনো ভয় নাই। কিন্তু সে যদি অন্য কোনো দিকে মন দেয় তবে তাহার কী সর্বনাশ হইতে পারে কে জানে। মহেন্দ্র স্থির করিল, নিজেকে ধরা না দিয়া বিনোদিনীর মন কোনো অবকাশে আর-একবার ফিরাইতেই হইবে।
মহেন্দ্র অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতেই দেখিল, বিনোদিনী পথের মধ্যেই যেন কাহার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া
প্রতীক্ষা করিতেছে। অমনি মহেন্দ্রের মনে চকিতের মধ্যে বিদ্বেষ জ্বলিয়া উঠিল। কহিল, “ওগো, মিথ্যা দাঁড়াইয়া আছ, দেখা পাইবে না। এই তোমার চিঠি ফিরিয়া আসিয়াছে।” বলিয়া চিঠিখানা ফেলিয়া দিল।
বিনোদিনী কহিল, “খোলা যে?”
মহেন্দ্র তাহার জবাব না দিয়াই চলিয়া গেল। বিহারী চিঠি খুলিয়া পড়িয়া কোনো উত্তর না দিয়া চিঠি ফেরত পাঠাইয়াছে মনে করিয়া বিনোদিনীর সর্বাঙ্গের সমস্ত শিরা দব্‌ দব্‌ করিতে লাগিল। যে দরোয়ান চিঠি লইয়া গিয়াছিল, তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইল; সে অন্য কাজে অনুপস্থিত ছিল, তাহাকে পাওয়া গেল না। প্রদীপের মুখ হইতে যেমন জ্বলন্ত তৈলবিন্দু ক্ষরিয়া পড়ে, রুদ্ধ শয়নকক্ষের মধ্যে বিনোদিনীর দীপ্ত নেত্র হইতে তেমনি হৃদয়ের জ্বালা অশ্রুজলে গলিয়া পড়িতে লাগিল। নিজের চিঠিখানা ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া কুটিকুটি করিয়া কিছুতেই তাহার সান্ত্বনা হইল না– সেই দুই-চারি লাইন কালির দাগকে অতীত হইতে বর্তমান হইতে একেবারেই মুছিয়া ফেলিবার, একেবারেই ‘না’ করিয়া দিবার কোনো উপায় নাই কেন। ক্রুদ্ধা মধুকরী যাহাকে সন্মুখে পায় তাহাকেই দংশন করে, ক্ষুব্ধা বিনোদিনী তেমনি তাহার চারি দিকের সমস্ত সংসারটাকে জ্বালাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। সে যাহা চায় তাহাতেই বাধা? কোনো কিছুতেই কি সে কৃতকার্য হইতে পারিবে না। সুখ যদি না পাইল, তবে যাহারা তাহার সকল সুখের অন্তরায়, যাহারা তাহাকে কৃতার্থতা হইতে ভ্রষ্ট, সমস্ত সম্ভবপর সম্পদ হইতে বঞ্চিত করিয়াছে, তাহাদিগকে পরাস্ত ধূলিলুন্ঠিত করিলেই তাহার ব্যর্থ জীবনের কর্ম সমাধা হইবে।

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

24

Mahendra kept thinking, ‘I said ‘It is a lie, I do not love Binodini.’ I have said this very harshly. I may not love her, but to declare that I do not love her is cruel indeed. There is hardly a woman who would not be hurt by that. When will I have a chance to refute this? I cannot say that I love her; but I need to tell her about not loving her in a gentler manner. It would be wrong to let her harbor such cruel but false notions about me.’

He then took the three letters out of his case and read them. He said to himself, ‘There is no doubt that Binodini loves me. But then why did she rush to Bihari yesterday in that manner? That was only to fool me. When I said clearly that I did not love her, there was little she could do but withdraw her feelings for me. Perhaps she will begin loving Bihari after being insulted by me.

Mahendra became so agitated that he was astonished and slightly worried by the strength of his own feelings. There was after all little harm in Binodini overhearing that he did not love her or in her attempting to curb her feelings for him after what she had heard him say. Just as an anchor feels the pull of the chain most strongly during a storm, Mahendra too felt drawn to Asha with more than usual intensity.

That night he held her face close to his own and asked, ‘Chuni, tell me how much you truly love me.’

Asha wondered, ‘What kind of question is this! Am I under a cloud of suspicion because of the shameful talk about Bihari and me?’ She almost died of shame and protested, saying, ‘Fie, how can you ask me such a question? I beg you to tell me – when did you see a lack of love on my part?’

He wished to extract her love by crushing her heart and said, ‘Why do you want to go to Kashi then?’

Asha answered, ‘I do not want to go to Kashi, I won’t go anywhere.’

Mahendra: But you did want to go previously.

Asha answered, greatly anguished, ‘You know why I did.’

Mahendra: You would have been happier perhaps with your aunt.

Asha answered, ‘Never! I did not want to go for the sake of happiness.’

Mahendra answered, ‘I am telling you honestly Chuni, you could have been much happier if you had married someone else.’

Asha moved away from Mahendra’s embrace, hid her face in her pillow and froze – then her tears could not be held back. Mahendra tried to pull her back to himself, but she would not let go of her pillow. Mahendra was both pleased and mortified at her indignation, seeing it as a sign of her commitment to her husband.

Thoughts that had been suppressed so far were now out in the open and causing turmoil in everyone’s minds. Binodini kept thinking, ‘Why did Bihari not protest such a clearly stated accusation?’ If he had protested, Binodini would have been pleased even if she knew that to be false. She felt that it was only fitting that Mahendra had hurt Bihari. Why should such a good man love Asha? She was happy to see that Bihari had been pushed away by this blow.

But she could not help thinking of his stricken, bloodless, pale face. The compassionate feminine heart that beat within her wept for him. She held onto that mortified image within her heart, much as a mother nurses a sick child and an intense eagerness grew in her heart to be the one to repair his hurt and see his face once again as it used to be, alive, suffused with life and brimming with laughter.

A few days passed in such thought before she could bear it no longer and wrote a note to console him,

‘Brother-in-law, since seeing your mortified face that day, I have been praying with all my heart that you are feeling better, that you become as you were before – when we will see you smile as easily as before and speak as openly as you did. Please write a few lines to me and tell me how you are.
Yours,
Binod, your sister-in-law’

She sent a doorman with the letter to Bihari’s house.

Bihari had not imagined even in his dreams that Mahendra would declare so rudely and vehemently that Bihari loved Asha. The reason was that he had never allowed the thought to enter his own mind. He was dumbstruck at first – then anger and shame tormented him and he protested it, saying, ‘Wrong, unjust, baseless!’

But now that the word had been spoken, it could no longer be silenced. The seeds of truth in it began to grow. He kept recalling how he had once looked up to see a shy girl’s beautiful face during sunset in a flower scented garden and had thought of her as his own; this was the thought that swirled through his mind and rose as a great pain that took him by the throat.

After spending the long night up on the terrace, he walked about on the street in front of his house. He became aware of something that he had not realised before; his emotions rose and what had previously been hidden now came to life as he thought of what Mahendra had said.

He then understood where he had done wrong and said to himself, ‘I do not have the right to be angry any more, I must beg forgiveness from Mahendra and leave. I must admit to him that I did him wrong by leaving him that day as I had judged him to be in the wrong.’

Bihari knew that Asha had gone to Kashi. One night he came to the house, slowly coming to Mahendra’s door. There he saw a distant uncle of Rajlakshmi’s called Sadhucharan, and asked him, ‘Sadhuda, I have not been able to come here for a few days, how are things?’ Sadhucharan told him that they were all well. Bihari then asked, ‘When did the daughter-in-law go to Kashi?’Sadhucharan answered, ‘She did not go. She will not be going.’ Bihari felt like going inside the house as soon as he heard this. His heart felt this all the more because he knew that it would be wrong, even impossible for him to do what he had once done; climb up the stairs like a member of the family and talk to all the family members in tones of happiness.
He wanted so much, for the last time possibly, to go in and talk to Rajlakshmi as her own son, to address the veiled Asha as his sister-in-law for one last time and say a few things to her. Sadhucharan said, ‘Why are you standing here in the dark, let us go in.’

Bihari took a few quick steps towards the inner house and then came back and said to Sadhu, ‘I need to go, I have something to do.’He left soon; that same night he went on a trip to the west.

The doorman came back with the letter as he did not find Bihari at home. Mahendra was walking in the small garden at the front of the house. He asked, ‘Whose letter is that?’ The man told him everything upon which Mahendra took the letter from him.

At one point he did think of giving the letter to Binodini just to see the shamed look on her face, and not say a thing. He had no doubt that the letter would hold information that would shame her. He remembered how she had sent another letter to Bihari once before. He could not control his curiosity about what had written in the letter. He convinced himself that she was in his care and that he was responsible for her well-being. Thus it was his responsibility to open all such suspicious letters. He could not let Binodini step off the path of righteousness.

Mahendra opened the letter and read the few lines. They were written in simple words and the sincerity of emotion was clearly expressed. He read it again and again, but even after that, he could not decide which way Binodini’s heart was inclining. He was fearful of what might happen, thinking, ‘She is turning from me to another because I insulted her by declaring I did not love her. She has forsaken all hope of me in her anger.’

When Mahendra thought of this, it became impossible for him to remain patient. He could not bear the thought that the woman who had come close to him should now be lost through the stupidity of a moment. He thought, ‘If Binodini has loved me, it is for her own good as it will keep her in one place. I know my own mind and I will never wrong her. She can love me without fear for I love Asha and she has no need to fear me. But if she begins to love another, then who can tell what harm she may come to.’ Mahendra decided that he would not yield himself but would try and draw Binodini’s heart back towards himself by any means.

Mahendra entered the inner house to see Binodini waiting there, as if in expectation of someone. His mind immediately filled with hatred. He said, ‘You wait in vain, he is not coming. Here is the letter you sent,’ and he threw the letter down.

Binodini asked, ‘But it seems to have been opened?’

Mahendra left without answering her. When she thought that Bihari might have read the letter and returned it without bothering with a reply, her veins seemed to throb in anger. She sent for the doorman who had taken her letter to Bihari but he was busy elsewhere. In the darkened bedroom where she had confined herself, her eyes seemed burn with the pain within her heart, the tears like heated oil dripping from a lamp. It was not enough to merely tear her own letter into a hundred pieces, she now wondered why it was not possible to completely erase the few lines of ink from both her past and her present and send them to oblivion.

Like an angry bee seeking to sting the first thing it sees, Binodini’s hurt made her want to harm the household that surrounded her. Why should there be such resistance to every one of her wishes? Why should she not succeed at anything at all? If she was to be denied happiness, then she would make it the purpose of her fruitless life to crush the lives of those who had been the obstacles to her happiness, standing in the path to her success and had kept her from enjoying all the riches she might have had otherwise.

ক্ষীরের পুতুল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul, Abanindranath Thakur

ক্ষীরের পুতুল

এক রাজার দুই রানী দুও আর সুও। রাজবাড়িতে সুওরানীর বড় আদর, বড় যত্ন। সুওরানী সাতমহল বাড়িতে থাকেন। সাতশো দাসী তাঁর সেবা করে,পা ধোয়ায়, আলতা পরায়, চুল বাঁধে । সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুল, সেই ফুলে সুওরানী মালা গাঁথেন । সাত সিন্দুকে-ভরা সাত-রাজার-ধন মানিকের গহনা, সেই গহনা অঙ্গে পরেন। সুওরানী রাজার প্রাণ !

আর দুওরানী– বড়োরাণী, তাঁর বড়ো অনাদর, অযত্ন। রাজা বিষ নয়নে দেখেন। একখানি ঘর দিয়েছেন– ভাঙাচোরা ।এক দাসী দিয়েছেন– বোবা-কালা । পরতে দিয়েছেন জীর্ণ শাড়ি, শুতে দিয়েছেন ছেঁড়া কাঁথা। দুওরানীর ঘরে রাজা একটি দিন আসেন একবার বসেন, একটি কথা কয়ে উঠে যান।
সুওরানী—ছোটোরানী, তাঁরই ঘরে রাজা বারোমাস থাকেন ।

একদিন রাজা রাজমন্ত্রীকে ডেকে বললেন–মন্ত্রী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তুমি জাহাজ সাজাও। রাজার আজ্ঞায় রাজমন্ত্রী জাহাজ সাজাতে গেলেন । সাতখানা জাহাজ সাজাতে সাত মাস হয়ে গেল। ছ’খানা জাহাজে রাজার চাকর-বাকর যাবে, আর সোনার চাঁদোয়া-ঢাকা সোনার জাহাজে রাজা নিজে যাবেন। মন্ত্রী এসে খবর দিলেন—মহারাজ জাহাজ প্রস্তুত।

রাজা বললেন— কাল যাব।
মন্ত্রী ঘরে গেলেন।

ছোটো রানী — সুওরানী রাজ-অন্তঃপুরে সোনার পালঙ্কে শুয়েছিলেন, সাত সখী সেবা করছিল, রাজা সেখানে গেলেন। সোনার পালঙ্কে মাথার শিয়রে বসে আদরের ছোটোরানীকে বললেন—রানী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তোমার জন্য কী আনব ?

রানী ননীর হাতে হীরের চুড়ি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বললেন,—হীরের রঙ বড়ো শাদা, হাত যেন শুধু দেখায় । রক্তের মতো রাঙা আট-আট গাছা মানিকের চুড়ি পাই তো পরি।
রাজা বললেন—আচ্ছা রানী, মানিকের দেশ খেকে মানিকের চুড়ি আনব ।

রানী রাঙা-পা নাচিয়ে-নাচিয়ে, পায়ের নূপুর বাজিয়ে-বাজিয়ে বললেন—এ নূপুর ভালো বাজে না । আগুনের বরন নিরেট সোনার দশ গাছা মল পাই তো পরি।
রাজা বললেন—সোনার দেশ থেকে তোমার পায়ের সোনার মল আনব ।

রানী গলার গজমতি হার দেখিয়ে বললেন—দেখ রাজা, এ মুক্তো বড়ো ছোটো, শুনেছি কোন দেশে পায়রার ডিমের মতো মুক্ত আছে, তারি এক ছড়া হার এনো । রাজা বললেন—সাগরের মাঝে মুক্তোর রাজ্য, সেখান থেকে গলার হার আনব । আর কী আনব রানী ?

তখন আদরিনী সুওরানী সোনার অঙ্গে সোনার আঁচল টেনে বললেন— মা গো, শাড়ি নয় তো বোঝা ! আকাশের মতো নীল, বাতাসের মতো ফুরফুরে, জলের মতো চিকন শাড়ি পাই তো পরে বাঁচি।

রাজা বললেন—আহা, আহা, তাই তো রানী, সোনার আঁচলে সোনার অঙ্গে ছড় লেগেছে, ননীর দেহে ব্যথা বেজেছে। রানী হাসি মুখে বিদায় দাও, আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন শাড়ি আনিগে।
ছোট রানী হাসি মুখে রাজাকে বিদায় করলেন।
রাজা বিদায় হয়ে জাহাজে চড়বেন— মনে পড়ল দুঃখিনী বড়োরানীকে। দুওরানী—বড়োরাণী ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কাঁদছেন, রাজা সেখানে এলেন । ভাঙা ঘরের ভাঙা দুয়ারে দাড়িয়ে বললেন- বড়োরাণী, আমি বিদেশ যাব । ছোটোরানীর জন্য হাতের বালা, গলার মালা, পায়ের মল, পরনের শাড়ি আনব। তোমার জন্যে কী আনব? বলে দাও যদি কিছু সাধ থাকে।

রানী বললেন—মহারাজ, ভালোয় ভালোয় তুমি ঘরে এলেই আমার সকল সাধ পূর্ণ হয় । তুমি যখন আমার ছিলে তখন আমার সোহাগও অনেক ছিল, সাধও অনেক ছিল। সোনার শাড়ি অঙ্গে পড়ে সাতমহল বাড়িতে হাজার হাজার আলো জ্বালিয়ে সাতশো সখীর মাঝে রানী হয়ে বসবার সাধ ছিল, সোনার পিঞ্জরে শুক-শারীর পায়ে সোনার নূপুর পড়িয়ে দেবার সাধ ছিল। মহারাজ, অনেক সাধ ছিল। অনেক সাধ মিটেছে। এখন আর সোনার গহনায়, সোনার শাড়িতে কি কাজ ? মহারাজ, আমি কার সোহাগে হীরের বালা হাতে পরব ? মোতির মালা গলায় দেব ? মানিকের সিঁথি মাথায় বাঁধব ? মহারাজ, সেদিন কি আর আছে ! তুমি সোনার গহনা দেবে, সে সোহাগ তো ফিরে দেবে না! আমার সে সাতশো দাসী সাতমহল বাড়ি তো ফিরে দেবে না! বনের পাখি এনে দেবে, কিন্তু মহারাজ, সোনার খাঁচা তো দেবে না! ভাঙা ঘরে সোনার গহনা চোর-ডাকাতে লুটে নেবে, ভাঙা খাঁচায় বনের পাখি কেন ধরা দেবে? মহারাজ, তুমি যাও, যাকে সোহাগ দিয়েছ তার সাধ মেটাও গে, ছাই সাধে আমার কাজ নেই।
রাজা বললেন— না রানী, তা হবে না, লোকে শুনলে নিন্দে করবে। বল তোমার কি সাধ? রানী বললেন— কোন লাজে গহনার কথা মুখে আনব? মহারাজ আমার জন্য পোড়ামুখ একটা বাঁদর এনো।
রাজা বললেন — আচ্ছা রানী, বিদায় দাও।
তখন বড়রানী — দুয়োরানী ছেঁড়া কাঁথায় লুটীয়ে পড়ে কাঁদতে-কাঁদতে রাজা গিয়ে জাহাজে চড়লেন।

1393157873

Kheerer Putul

There was once a king who had two queens, Duyo, the sad queen and Shuyo, the happy queen. Shuyorani lives in the palace surrounded by much love and great comfort. Shuyorani lives in the palace with the seven floors. Seven hundred maids look after her every need, they wash her feet and paint them with red dye and do her hair. Shuyorani makes garlands from flowers she selects from seven baskets filled from seven gardens. She wears the jewels that the king has chosen from the treasures of the seven kings and stored in seven great chests. Shuyorani is the queen of the king’s heart.

Duyorani is the older of the queens, but she lives in great neglect. The king hates her. He has given her one room to stay in but it is falling to pieces. For her, he has hired one maid but she is both deaf and mute. He has given her an old sari to wear and a tattered quilt to lie on. He comes to her but once a month, sits but for a little while and says but one word.
Shuyorani is the younger queen, the king spends the whole year in her rooms.

One day the king called his minister and said, ‘Minister, I wish to go and see the countries of the world, get my ships ready.’ The minister went off to do this. It took seven months to get the seven ships ready. Six of the ships were for the king’s horses and the king’s men, the golden ship with the golden sails was for the king himself.

The minister came and said, ‘Oh King! The ship is ready!’
The king answered, ‘Then we must leave tomorrow.’
The minister went home that day.

The younger queen Shuyorani was lying on her golden bed in the bed chambers while seven ladies-in-waiting tended to her; the king went there. He sat at the head of the golden bed and asked his beloved junior queen, ‘Rani, I am going to faraway lands, what shall I bring back for you?’

The queen moved her milk white arms and looked at her diamond encrusted bangles, saying, ‘Diamonds are so very white, I can barely see them against my arms. If you bring me eight pairs of bracelets studded with blood red rubies , I would wear them and be pleased.’
The king promised, ‘That will be done, I will bring you the ruby bracelets from the land of rubies.’

The queen then tapped her little feet and made her anklets ring out, saying, ‘These anklets do not make a pretty sound. If you bring me ten pairs anklets of solid gold the colour of fire, I would wear them and be pleased.’
The king promised, ‘I will bring you golden anklets from the land of gold.’

The queen played with her necklace of ivory pearls and said, ‘See my king how small these pearls are! I have heard of pearls that are as big as a pigeon’s egg, bring me a strand of those.’
The king promised, ‘There is a kingdom of pearls in the centre of all the seas, I will bring you a strand from the markets there. What else can I bring for you, my queen?’

The beloved queen then drew her golden veil over her golden body and said, ‘How I hate this heavy fabric! If you bring me a sari as blue as the skies, as light as the breeze and as silken as water, I would wear it and be pleased.’

The king said, ‘Sorry, I had not thought of this! The golden sari has scratched you pale gold skin and pained your milky white limbs. Smile at me as I leave, for I go to bring you a sari as blue as the sky, as light as the breeze and as soft as water.’
The younger queen smiled in delight and said farewell to the king.

Just as the king was about to board the ship, he remembered the neglected older queen. He came to where she was, wrapped in her tattered quilt, weeping in her room that was falling to pieces. He stood on the crumbling threshold of that room and said, ‘Queen, I am going on a journey. I shall bring bracelets, necklaces, anklets and saris for the younger queen. What can I bring for you? Tell me if you have any special wishes.’

The queen said, ‘My king, all my wishes will come true if you come back safe and sound. When you were mine and mine alone, I had much love and many wishes. I wished to live as a queen in a house with seven floors, tended by seven hundred maids, as a thousand lamps shone upon my golden sari. I wished to keep a pair of Shuk and Shari birds in a golden cage and shackle their feet with golden chains. My king, I had many wishes once upon a time. Many of them have been fulfilled. What will I do now, with golden necklaces and saris? Whose love will I rejoice in as I show off my diamond bracelets on my arms or the pearls around my throat? Who will look upon me as I place rubies in my hair? My king, those days are long gone. You may give me jewels but you will not give me your love! You will not return me to that house with its seven floors or the seven hundred maids! You will bring a bird from the forests but not the golden cage for it to live in! My jewels will fall to thieves and robbers in this room and the bird will not want to stay in a broken cage! My king, go to the one who has your love, for I have no wishes any more.’

The king answered, ‘No! That cannot be, for people will say I have wronged you. Tell me what you wish for.’

The queen said, ‘How can I ask for jewels when I cannot have you? Bring me a monkey instead.’
The king said, ‘That is what I will do, now bid me farewell.’

The older queen then fell back on her tattered quilt and wept. The king went away and boarded his ship.

Bangla Bhasha/Bengali Language

Bengali, the language.

When I think about the mystery that is language I feel astonished. The same Bengali language that helps to shed light today in the thousand corners of the minds of innumerable people and makes it easy for us to interact with and understand each other; if we were to follow its light into the past, where would we end up? Who were those wanderers, who struggled against all odds on the path of the unknown, the ones who first set out from a nameless home on a journey both long and filled with obstacles carrying the faint flame of the language that we now speak. That ancient flame has travelled, illuminating the way, from one age to another to arrive at the tip of my pen today carrying a message of kinship. Those earliest of travelers took varying routes across the branches created by sweeping changes in history and this has blurred the similarities between those white skinned blond haired strong forest dwellers and this brown skinned short lived city dwelling subject of England with the dust of the ages. The only similarity that remains is the ancient thread of an unbroken language. Occasionally there have been new threads added to this language, sometimes time has repaired stresses in the chain and at other times the touch of non-Aryan hands has removed it further from its Caucasian roots, but it has remained uninterrupted. This language still points its finger back at the distant west to a birthing place whose exact location is not known to anyone.

The indigenous people of ancient India used to speak in a language that was divided into two major strands – Shourosheni and Magdhi. Shourosheni gave rise to the Hindi spoken in the Western parts of the country while Magdhi was the root of the Hindi spoken in eastern India. The other languages were Odri or Oriya and Gaudi or Bangla. There was no mention of Assamese. But in the latter part of ancient history, there are far more examples of Assamese prose than there are of Bengali. The language used in them is almost indistinguishable from Bengali.

Magdhi is the older of the two. According to Hornley, Magdhi was the only language once in use. The language spread from the west to the east gradually. The second wave of language Shourosheni came into India and took over the west. Hornley was of the opinion that there were two influxes of Aryans into India. Even though their languages were similar in origin, there were some differences.

Just as a river descends as many streams into many countries and reaches the sea as a number of branches, the ancient Magdhi travelled through the tongues of the Aryans and after many centuries today its rhythm moves the heart of Bengal and enriches its soul. Its flourish is not ever. It has spread wide and mingled its deep currents beyond the physical boundaries of the land to where it is now standing within the embrace of the world. When I think of how the ancient and yet fresh flow of language ties those times of yore and these times and unites the unknown souls of many lands with the newly awakened soul of Bengal, I am amazed. We use language so easily and yet it is not easy to know its inner secrets. The singular rules that connect language down the ages are both unchanging and also liable to be modified at each step of the way.
.
Rabindranath Tagore
1938, Santiniketan

আদর্শ প্রেম/Adarsh Prem/Ideal Love

আদর্শ প্রেম

সংসারের-কাজ-চালানো, মন্ত্রবদ্ধ, ঘরকন্নার ভালবাসা যেমনই হউক, আমি প্রকৃত আদর্শ ভালবাসার কথা বলিতেছি। যে-হউক এক জনের সহিত ঘেঁষাঘেষি করিয়া থাকা, এক ব্যক্তির অতিরিক্ত একটি অঙ্গের ন্যায় হইয়া থাকা, তাহার পাঁচটা অঙ্গুলির মধ্যে ষষ্ঠ অঙ্গুলির ন্যায় লগ্ন হইয়া থাকাকেই ভালবাসা বলে না। দুইটা আঠাবিশিষ্ট পদার্থকে একত্রে রাখিলে যে জুড়িয়া যায়, সেই জুড়িয়া যাওয়াকেই ভালবাসা বলে। না। অনেক সময়ে আমরা নেশাকে ভালবাসা বলি। রাম ও শ্যাম উভয়ে উভয়ের কাছে হয়ত “মৌতাতের” স্বরূপ হইয়াছে,রাম ও শ্যাম উভয়কে উভয়ের অভ্যাস হইয়া গিয়াছে, রামকে নহিলে শ্যামের বা শ্যামকে নহিলে রামের অভ্যাস-ব্যাঘাতের দরুন কষ্ট বোধ হয়। ইহাকেও ভালবাসা বলে না। প্রণয়ের পাত্র নীচই হউক, নিষ্ঠুরই হউক, আর কুচরিত্র হউক, তাহাকে আঁকড়িয়া ধরিয়া থাকাকে অনেকে প্রণয়ের পরাকাষ্ঠা মনে করিয়া থাকে। কিন্তু,ইহা বিবেচনা করা উচিত, নিতান্ত অপদার্থ দুর্ব্বলহৃদয় নহিলে কেহ নীচের কাছে নীচ হইতে পারে না। এমন অনেক ক্রীতদাসের কথা শুনা গিয়াছে যাহারা নিষ্ঠুর নীচাশয় প্রভুর প্রতিও অন্ধভাবে আসক্ত, কুকুরেরাও সেইরূপ। এরূপ কুকুরের মত, ক্রীতদাসের মত ভালবাসাকে ভালবাসা বলিতে কোন মতেই মন উঠে না। প্রকৃত ভালবাসা দাস নহে, সে ভক্ত; সে ভিক্ষুক নহে, সে ক্রেতা। আদর্শ প্রণয়ী প্রকৃত সৌন্দর্য্যকে ভালবাসেন, মহত্ত্বকে ভালবাসেন; তাঁহার হৃদয়ের মধ্যে যে আদর্শ ভাব জাগিতেছে তাহারই প্রতিমাকে ভালবাসেন। প্রণয়ের পাত্র যেমনই হউক, অন্ধভাবে তাহার চরণ আশ্রয় করিয়া থাকা তাঁহার কর্ম্ম নহে। তাহাকে ত ভালবাসা বলে না, তাহাকে কর্দ্দমবৃত্তি বলে। কর্দ্দম একবার পা জড়াইলে আর ছাড়িতে চায় না, তা সে যাহারই পা হউক না কেন, দেবতারই হউক আর নরাধমেরই হউক! প্রকৃত ভালবাসা যোগ্যপাত্র দেখিলেই আপনাকে তাহার চরণধূলি করিয়া ফেলে। এই নিমিত্ত ধূলিবৃত্তি করাকেই অনেকে ভালবাসা বলিয়া ভুল করেন। তাঁহারা জানেন না যে, দাসের সহিত ভক্তের বাহ্য আচরণে অনেক সাদৃশ্য আছে বটে, কিন্তু একটি প্রধান প্রভেদ আছে– ভক্তের দাসত্বে স্বাধীনতা আছে, ভক্তের স্বাধীন দাসত্ব। তেমনি প্রকৃত প্রণয় স্বাধীন প্রণয়। সে দাসত্ব করে, কেননা দাসত্ববিশেষের মহত্ত্ব সে বুঝিয়াছে। যেখানে দাসত্ব করিয়া গৌরব আছে, সেইখানেই সে দাস, যেখানে হীনতা স্বীকার করাই মর্যাদা, সেইখানেই সে হীন। ভালবাসিবার জন্যই ভালবাসা নহে, ভাল ভালবাসিবার জন্যই ভালবাসা। তা যদি না হয়, যদি ভালবাসা হীনের কাছে হীন হইতে শিক্ষা দেয়, যদি অসৌন্দর্যের কাছে রুচিকে বদ্ধ করিয়া রাখে, তবে ভালবাসা নিপাত যাক।
p-60

IDEAL LOVE

I am talking about the ideal of true love and not about the merely adequate, ritualistic, domesticated love that is often seen within the confines of family life. Just existing in close proximity with another person as an extra appendage to them, rather like a sixth digit, is not all that love is meant to be. When two adhesive substances are pressed together to become as one, that is not love either. We often hear of intoxication being described as love. Ram and Shyam may have become like an ‘addiction’ to each other, a habit formed by both and the absence of one may even cause pain to the other through the disruption of routine. But this is not love. Many people think that to cling to the object of their affections, no matter how evil, cruel and unscrupulous they are, is the height of love. But it must be understood that one cannot submit to evil unless they are themselves plainly ignorant and of a weak nature. One has heard stories of slaves who blindly love their masters despite every kind of cruelty; a trait also seen in dogs. I cannot bring myself to honour such dog-like, unshakable loyalty, such slavish attachment as love. True love is no slave, it is devotion; it does not beg, it gives in exchange and in full measure. The ideal lover loves true beauty and greatness; he loves the embodiment of the ideals within his own heart. Whatever the object of such love, it is not the lover’s duty to blindly seek shelter at their feet. That is not love; that is rolling in mud. Once mud sticks to one’s feet, it is hard to get it off, no matter whether those feet belong to the purest of beings or the lowest of the low. True love makes itself companion to the ideal subject. This is why many think that prostrations in the dust are a sign of love. They do not know that although there is much that is similar between a slave and a devotee, there is one primary difference that distinguishes between the two; the devotee is free within his adoration, his devotion is unshackled. Similarly, true love is that which is accompanied by freedom. There is enslavement but only because the greatness of certain variations of that state is appreciated. True love submits where being enslaved brings glory and bows where there is merit in admitting fault. Love exists, not for the sake of merely loving, but for the sake of loving well. If that cannot be achieved, if love must learn to be oppressed by the mean and must suffer the death of good taste in the presence of ugliness, then I say, let love be gone.

Image: http://kireetjoshiarchives.com/teachers_training/good_teacher/brahmacharins_in_search