Archives

হাস্যকৌতুকঃ ছাত্রের পরীক্ষা/Cchatrer Porikkha/ An examination

ছাত্রের পরীক্ষা

 

 

ছাত্র শ্রীমধুসূদন

 

শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

 

অভিভাবকের প্রবেশ

 

অভিভাবক।

মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু?

 

কালাচাঁদ।

আজ্ঞে, মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে, কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত। কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না।

 

অভিভাবক।

বটে! তা, আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

 

কালাচাঁদ।

তা , দেখুন-না।

 

মধুসূদন।

(স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে। আজ এর শোধ তুলব। ওঁকে আমি তাড়াব।

 

অভিভাবক।

কেমন রে মোধো, পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো?

 

মধুসূদন।

মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি।

 

মধুসূদন।

যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

 

অভিভাবক।

একটা উদাহরণ দে।

 

মধুসূদন।

কেঁচো!

 

কালাচাঁদ।

(চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

 

অভিভাবক।

রসুন মশায়, এখন কিছু বলবেন না।

 

মধুসূদনের প্রতি

 

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ; আচ্ছা, কাননে কী ফোটে বলো দেখি?

 

মধুসূদন।

কাঁটা।

 

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

 

কী মশায়, মারেন কেন? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে? ইতিহাসে কী বলে?

 

মধুসূদন।

পোকায়।

 

বেত্রাঘাত

 

আজ্ঞে, মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি– শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন, সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন।

 

প্রদর্শন।

কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

 

অভিভাবক।

ব্যাকরণ মনে আছে?

 

মধুসূদন।

আছে।

 

অভিভাবক।

“কর্তা’ কী, তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি।

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, কর্তা ওপাড়ার জয়মুন্‌শি।

 

অভিভাবক।

কেন বলো দেখি।

 

মধুসূদন।

তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন।

 

কালাচাঁদ।

(সরোষে) তোমার মাথা!

 

পৃষ্ঠে বেত্র

 

মধুসূদন।

(চমকিয়া) আজ্ঞে, মাথা নয়, ওটা পিঠ।

 

অভিভাবক।

ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে?

 

মধুসুদন।

জানি নে।

 

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

 

মধুসদন।

ওটা বিলক্ষণ জানি– ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ।

 

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

 

অভিভাবক।

অঙ্কশিক্ষা হয়েছে?

 

মধুসূদন।

হয়েছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, তোমাকে সাড়ে ছ’টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে,পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে। একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে, কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে?

 

মধুসূদন।

একটাও নয়।

 

কালাচাঁদ।

কেমন করে।

 

মধুসূদন।

সবগুলো খেয়ে ফেলব। দিতে পারব না।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে?

 

মধুসূদন।

যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে, যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই।

 

কালাচাঁদ।

মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া, মেরে তোমার পিঠ লাল করব, তবে তুমি সিধে হবে!

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায়।

 

অভিভাবক।

কালাচাঁদবাবু, ওটা আপনার ভ্রম। মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয়। কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না, কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায়। অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না। কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই। আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন, দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক, তার পরে আমিই ওকে পড়াব।

 

মধুসূদন।

( স্বগত) আঃ, বাঁচা গেল।

 

কালাচাঁদ।

বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম, কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার। ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই, সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয়।

***

AN EXAMINATION

The student: Madhu

The teacher: Kalachand

 

Madhu’s guardian enters the room.

 

Guardian: How is he doing in his studies Mr. Kalachand?

Kalachand: Despite being very naughty he is very good at his studies. One does not have to repeat things to him at all. He remembers everything after I say it to him once.

Guardian: Really! Let me test his aptitude today for myself.

Kalachand: Of course, go ahead.

Madhusudan to himself: (You hit me so hard yesterday that my back still hurts. I will take revenge today. I will get rid of you!)

Guardian: So my boy, you remember all the previous lessons?

Madhu: I remember everything the teacher said to me.

 

Guardian: Okay, tell me then what a plant is.

Madhu: Things that emerge from the ground.

Guardian: Give me an example.

Madhu: A worm.

 

Kalachand: What! What are you saying? (visibly angry)

Guardian: Wait, do not interrupt now.

To Madhu: You have read the poetry book; tell me, what pops up in the garden?

Madhu: Thorns. (Upon hearing this the teacher strikes him with his cane.)

Madhu: Why are you hitting me sir? Am I lying?

Guardian: Now, what felled Sirajuddaulah? What does history tell us?

Madhu: Insects. (Swishing of the cane)

Excuse me, you strike me without reason – why just Sirajuddaulah, all the chapters have been eaten up by silverfish. See?

He shows the pages. The teacher scratches his head.

Guardian: Do you remember your grammar?

Madhu: Yes.

Guardian: Give an example and explain the idea of subject or ‘karta

Madhu: Please, that must be our neighbour Joy Munshi.

Guardian: Why is that?

 

Madhu: He does all the work.

 

Kalachand, angrily: You fat head!

(Hits him on the back)

Madhu: But sir! That is not my head, that is my back.

Guardian: What is ‘Shashthi Tatpurush’?

Madhu: I do not know.

 

Kalachand shows him the cane again.

Madhu: I know that  very well. It is a stick without a carrot.

His guardian smiles while the teacher scowls.

Guardian: Have you studied mathematics?

Madhu: I have.

Guardian: Well, imagine you are given six and a half cakes and are told to eat cake for five minutes and then give the remainder to your younger brother. You can eat one cake in two minutes, how many cakes will you give your brother?

 

Madhu: None.

Kalachand: But how?

 

Madhu: I will eat all of them. I won’t give him any.

Guardian: If a tree grows a quarter of an inch each day then how tall will a ten inch tree be in the period from Baishakh this year till Baishakh next year.

Madhu: If the tree bends, I cannot say and if it grows straight we will be able to measure it and tell how much it grew. Of course, if it dies then there is no mathematics in this at all.

Kalachand: I can see you will smarten up without a couple of licks of the switch! Stupid fool, I will give you such a thrashing I will straighten you out for good!

 

Madhu: Excuse me, sometimes beatings can make straight stuff crooked.

Guardian: Kalachand, that is your mistake. Very little can be achieved by thrashings. It is said that one cannot turn a donkey into a horse by hitting it but the converse is often true as well; a horse can be turned into a donkey with ill treatment. Most children are able to learn easily but most teachers do not know how to teach. You may take your cane and depart; I will let Madhu’s back heal and then begin teaching him myself.

Madhusudan to himself: Good riddance!

 

Kalachand: Thank God! Teaching is pure drudgery, like manual labour! I get so little after thirty days of teaching one boy, I could easily get double that each day if I dug holes for a living.

 

Advertisements

ছাত্রশাসনতন্ত্র/ Student Discipline: Excerpt

যেখান হইতে আমরা জ্ঞান পাই, সেখানে আমাদের শ্রদ্ধা যাইবে, এটা মানবপ্রকৃতির ধর্ম। তাহার উল্টা দেখিলে বাহিরের শাসনে এই বিকৃতির প্রতিকার করিতে হইবে, সে কথা সকলেই স্বীকার করিবেন।

কিন্তু প্রতিকারের প্রণালী স্থির করিবার পূর্বে ভাবিয়া দেখা চাই, স্বভাব ওল্টায় কিসে।

কাগজে দেখিতে পাই, অনেকে এই বলিয়া আক্ষেপ করিতেছেন যে, যে ভারতবর্ষে গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ ধর্মসম্বন্ধ সেখানে এমনতরো ঘটনা বিশেষভাবে গর্হিত। শুধু গর্হিত এ কথা বলিয়া পার পাইব না, চিরকালীন এই সংস্কার অস্থিমজ্জার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারে তাহার ব্যতিক্রম ঘটিতেছে কেন এর একটা সত্য উত্তর বাহির করিতে হইবে।

বাংলাদেশের ছাত্রদের মনস্তত্ত্ব যে বিধাতার একটা খাপছাড়া খেয়াল এ কথা মানি না। ছেলেরা যে বয়সে কলেজে পড়ে সেটা একটা বয়ঃসন্ধির কাল। তখন শাসনের সীমানা হইতে স্বাধীনতার এলাকায় সে প্রথম পা বাড়াইয়াছে। এই স্বাধীনতা কেবল বাহিরের ব্যবহারগত নহে; মনোরাজ্যেও সে ভাষার খাঁচা ছাড়িয়া ভাবের আকাশে ডানা মেলিতে শুরু করিয়াছে। তার মন প্রশ্ন করিবার, তর্ক করিবার, বিচার করিবার অধিকার প্রথম লাভ করিয়াছে। শরীর-মনের এই বয়ঃসন্ধিকালটিই বেদনাকাতরতায় ভরা। এই সময়েই অল্পমাত্র অপমান মর্মে গিয়া বিঁধিয়া থাকে এবং আভাসমাত্র প্রীতি জীবনকে সুধাময় করিয়া তোলে। এই সময়েই মানবসংস্রবের জোর তার ‘পরে যতটা খাটে এমন আর-কোনো সময়েই নয়।

এই বয়সটাই মানুষের জীবন মানুষের সঙ্গপ্রভাবেই গড়িয়া উঠিবার পক্ষে সকলের চেয়ে অনুকূল, স্বভাবের এই সত্যটিকে সকল দেশের লোকেই মানিয়া লইয়াছে। এইজন্যই আমাদের দেশে বলে: প্রাপ্তে তু ষোড়শে বর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ। তার মানে এই বয়সেই ছেলে যেন বাপকে পুরাপুরি মানুষ বলিয়া বুঝিতে পারে, শাসনের কল বলিয়া নহে; কেননা, মানুষ হইবার পক্ষে মানুষের সংস্রব এই বয়সেই দরকার। এইজন্যই সকল দেশেই য়ুনিভার্সিটিতে ছাত্ররা এমন একটুখানি সম্মানের পদ পাইয়া থাকে যাহাতে অধ্যাপকদের বিশেষ কাছে তারা আসিতে পারে এবং সে সুযোগে তাদের জীবনের ‘পরে মানব-সংস্রবের হাত পড়িতে পায়। এই বয়সে ছাত্রগণ শিক্ষার উদ্যোগপর্ব শেষ করিয়া মনুষ্যত্বের সার জিনিসগুলিকে আত্মসাৎ করিবার পালা আরম্ভ করে; এই কাজটি স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান ছাড়া হইবার জো নাই। সেইজন্যই এই বয়সে আত্মসম্মানের সম্বন্ধে দরদ বড়ো বেশি হয়। চিবাইয়া খাইবার বয়স আসিলে বেশ একটু জানান দিয়া দাঁত ওঠে, তেমনি মনুষ্যত্বলাভের যখন বয়স আসে তখন আত্মসম্মানবোটা একটু ঘটা করিয়াই দেখা দেয়।

এই বয়ঃসন্ধির কালে ছাত্ররা মাঝে মাঝে এক-একটা হাঙ্গামা বাধাইয়া বসে। যেখানে ছাত্রদের সঙ্গে অধ্যাপকের সম্বন্ধ স্বাভাবিক সেখানে এই-সকল উৎপাতকে জোয়ারের জলের জঞ্জালের মতো ভাসিয়া যাইতে দেওয়া হয়; কেননা, তাকে টানিয়া তুলিতে গেলেই সেটা বিশ্রী হইয়া উঠে।

বিধাতার নিয়ম অনুসারে বাঙালি ছাত্রদেরও এই বয়ঃসন্ধির কাল আসে, তখন তাহাদের মনোবৃত্তি যেমন এক দিকে আত্মশক্তির অভিমুখে মাটি ফুঁড়িয়া উঠিতে চায় তেমনি আর-এক দিকে যেখানে তারা কোনো মহত্ত্ব দেখে, যেখান হইতে তারা শ্রদ্ধা পায়, জ্ঞান পায়, দরদ পায়, প্রাণের প্রেরণা পায়, সেখানে নিজেকে উৎসর্গ করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠে।

জেলখানার কয়েদি নিয়মে নড়চড় করিলে তাকে কড়া শাসন করিতে কারও বাধে না; কেননা তাকে অপরাধী বলিয়াই দেখা হয়, মানুষ বলিয়া নয়। অপমানের কঠোরতায় মানুষের মনে কড়া পড়িয়া তাকে কেবলই অমানুষ করিতে থাকে, সে হিসাবটা কেহ করিতে চায় না; কেননা, মানুষের দিক দিয়া তাকে হিসাব করাই হয় না। এইজন্য জেলখানার সর্দারি যে করে সে মানুষকে নয়, আপরাধীকেই সকলের চেয়ে বড়ো করিয়া দেখে।

সৈন্যদলকে তৈরি করিয়া তুলিবার ভার যে লইয়াছে সে মানুষকে একটিমাত্র সংকীর্ণ প্রয়োজনের দিক হইতেই দেখিতে বাধ্য। লড়াইয়ের নিখুঁত কল বানাইবার ফর্মাশ তার উপরে। সুতরাং, সেই কলের হিসাবে যে-কিছু ত্রুটি সেইটে সে একান্ত করিয়া দেখে এবং নির্মমভাবে সংশোধন করে।

কিন্তু ছাত্রকে জেলের কয়েদি বা ফৌজের সিপাই বলিয়া আমরা তো মনে ভাবিতে পারি না। আমরা জানি, তাহাদিগকে মানুষ করিয়া তুলিতে হইবে। মানুষের প্রকৃতি সূক্ষ্ম এবং সজীব তন্তুজালে বড়ো বিচিত্র করিয়া গড়া। এইজন্যই মানুষের মাথা ধরিলে মাথায় মুগুর মারিয়া সেটা সারানো যায় না; অনেক দিক বাঁচাইয়া প্রকৃতির সাধ্যসাধনা করিয়া তার চিকিৎসা করিতে হয়। এমন লোকও আছে এ সম্বন্ধে যারা বিজ্ঞানকে খুবই সহজ করিয়া আনিয়াছে; তারা সকল ব্যাধিরই একটিমাত্র কারণ ঠিক করিয়া রাখিয়াছে, সে ভূতে পাওয়া।

এ হইল আনাড়ির চিকিৎসা। যারা বিচক্ষণ তারা ব্যাধিটাকেই স্বতন্ত্র করিয়া দেখে না; চিকিৎসার সময় তারা মানুষের সমস্ত ধাতটাকে অখণ্ড করিয়া দেখে; মানবপ্রকৃতির জটিলতা ও সূক্ষ্মতাকে তারা মানিয়া লয় এবং বিশেষ কোনো ব্যাধিকে শাসন করিতে গিয়া সমস্ত মানুষকে নিকাশ করিয়া বসে না।

অতএব যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা বা ড্রিল সার্জেণ্ট্‌ বা ভূতের ওঝা হওয়া তাদের কোনোমতেই উচিত হয় না ছাত্রদিগকে মানুষ করিবার ভার লওয়া। ছাত্রদের ভার তাঁরাই লইবার অধিকারী যাঁরা নিজের চেয়ে বয়সে অল্প, জ্ঞানে অপ্রবীণ ও ক্ষমতায় দুর্বলকেও সহজেই শ্রদ্ধা করিতে পারেন; যাঁরা জানেন, শক্তস্য ভূষণং ক্ষমা; যাঁরা ছাত্রকেও মিত্র বলিয়া  গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হন না।

ছাত্রদিগকে কড়া শাসনের জালে যাঁরা মাথা হইতে পা পর্যন্ত বাঁধিয়া ফেলিতে চান তাঁরা অধ্যাপকদের যে কত বড়ো ক্ষতি করিতেছেন সেটা যেন ভাবিয়া দেখেন। পৃথিবীতে অল্প লোকই আছে নিজের অন্তরের মহৎ আদর্শ যাহাদিগকে সত্য পথে আহ্বান করিয়া লইয়া যায়। বাহিরের সঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাতের ঠেলাতেই তারা কর্তব্য সম্বন্ধে সতর্ক হইয়া থাকে। বাহিরের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে বলিয়াই তারা আত্মবিস্মৃত হইতে পারে না।

এইজন্যই চারি দিকে যেখানে দাসত্ব মনিবের সেখানে দুর্গতি, শূদ্র যেখানে শূদ্র ব্রাহ্মণের সেখানে অধঃপতন। কঠোর শাসনের চাপে ছাত্রেরা যদি মানবস্বভাব হইতে ভ্রষ্ট হয়, সকলপ্রকার অপমান দুর্ব্যবহার ও অযোগ্যতা যদি তারা নির্জীবভাবে নিঃশব্দে সহিয়া যায়, তবে অধিকাংশ অধ্যাপকদিগকেই তাহা অধোগতির দিকে টানিয়া লইবে। ছাত্রদের মধ্যে অবজ্ঞার কারণ তাঁরা নিজে ঘটাইয়া তুলিয়া তাহাদের অবমাননার দ্বারা নিজেকে অহরহ অবমানিত করিতে থাকিবেন। অবজ্ঞার ক্ষেত্রে নিজের কর্তব্য কখনোই কেহ সাধন করিতে পারে না।

অপর পক্ষ বলিবেন, তবে কি ছেলেরা যা খুশি তাই করিবে তার সমস্তই সহিয়া লইতে হইবে? আমার কথা এই, ছেলেরা যা খুশি তাই কখনোই করিবে না। তারা ঠিক পথেই চলিবে, যদি তাহাদের সঙ্গে ঠিকমত ব্যবহার করা হয়। যদি তাহাদিগকে অপমান কর, তাহাদের জাতি বা ধর্ম বা আচারকে গালি দাও, যদি দেখে তাহাদের পক্ষে সুবিচার পাইবার আশা নাই, যদি অনুভব করে যোগ্যতাসত্ত্বেও তাহাদের স্বদেশীয় অধ্যাপকেরা অযোগ্যের কাছে মাথা হেঁট করিতে বাধ্য, তবে ক্ষণে ক্ষণে তারা অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করিবেই; যদি না করে তবে আমরা সেটাকে লজ্জা এবং দুঃখের বিষয় বলিয়া মনে করিব।

*****

That we will direct our respect towards the place where we derive our learning from is in the nature of mankind. Everyone will agree that if the opposite is seen the aberration must be rectified through external discipline.

But prior to deciding on the method of correction thought must be given to the reasons behind this change.

I see that many people are stating regretfully that such incidents are especially ruinous in a country like India where the relationship between guru and shishya borders on the religious. Merely calling them ruinous is not enough, one must look for the truth behind a change to behaviour that is contrary despite the tradition being embedded in our heritage.

I do not agree with the view that the psychology of the students of Bengal is the result of a whim on the part of nature. Young people study in college during a transitional part of their lives. They are taking their first steps from a framework of rules into an arena of freedom. This freedom is not merely limited to external behaviour, it is also the time when they spread their wings internally and leave the cage of words to test the skies of thought. Their minds have achieved the right to question, to debate, and to judge for the first time. This transitional phase of both bodies and minds is filled with pain. It is a time when the smallest slight pierces the soul and the slightest indication of affection fills life with joy. The effects of socializing with other people has the most effect during these times and never to this extent ever again.

This is the age which is the most suitable for molding a life under the influence of the others, every nation agrees with this truth about human nature. That is why it is said in our country: When the son attains the age of sixteen years, one must treat him like a friend. This means that sons of this age begin to see their fathers as human beings and not as vehicles of discipline; because one can grow best in the company of others at this age. That is why students in the universities across the world are given positions that accord them respect and allow them to approach professors and gain the benefit of social interactions. The students finish the preparatory stages of their education and are now about to make the essence of humanity their own; a task that cannot be achieved without freedom and self respect. This is why self respect is greatly treasured at this age. Just as teeth emerge with a little accompanying pain when the time is right for chewing one’s food, self respect too arrives with some excessive feelings when the age is appropriate for achieving adulthood.

Sometimes students get into strife at this age of transition. In those situations where the relationship between teachers and students are normal, these troubles wash away easily like flotsam before the tide; it is in fact unpleasant only when one attempts to pick at it with an eye at removal.

As per the laws of nature this age of transition arrives in the lives of Bengali students too; a point when their inclination is to go where their strength takes them and they feel strongly about committing themselves to greatness when they are rewarded with respect, knowledge and their souls receive inspiration.

When a prisoner breaks rules no one feels unable to discipline them severely; this is because they are seen only as offenders and not as people. The harshness of the punishment merely serves to harden him further and makes him subhuman but no one considers this; because no one considers the effects as affecting a human being. That is why the jails are supervised by people who do not see the human but consider his offence to be the true identity of the prisoner.

The person in charge of building an army is forced to consider people with one specific need in mind. His orders are to create an efficient war machine. Hence he sees only the faults that lie in the way of achieving this and having seen them proceeds to correct them with brutality.

But we must not think of students as prisoners or soldiers. We know that they must be molded into human beings. Human nature is delicate and constructed of intricately woven living strands. This is the very reason why a headache may not be cured by smashing the head in with a club; many things have to be considered before working with nature in order to heal it.

This then is the nature of treatment at the hands of the inexperienced. The experts never see the disease as a separate thing but consider the nature of the whole human being; they accept the complexities of human nature and do not do away with the entire human being in the name of attacking one particular disease.

Hence the person who was meant to be a jailor or a drill sergeant or an exorcist should never take up the job of instructing students in becoming humans. The only people fit to take responsibility for students should be those who can easily respect individuals who are younger than them, who know less than them and those who hold less power than them; those who have learned that forgiveness is an ornament to the strong; who are not afraid of accepting their students as their friends.

Let those who wish to bind students within bonds of strict rules also think about the great harm they do to the teachers. There are very few people on earth who can progress along the path of truth inspired by the great ideals within themselves. They are alerted to their responsibilities by the to-ing and fro-ing they undergo in their interactions with the outside. They never forget themselves because they are in complete understanding with their environment.

This is why masters are in danger wherever slaves exist, the high castes are fallen wherever the lower castes are suppressed. If students move from the rightful path as human beings under strict control, if they bear every kind of insult, ill treatment and injustice in silence and without protest, then most teachers will also be pulled down by this. They will see to their own downfall if they allow their students to become subjugated and subjects of derision. No one can carry out their own responsibilities in the face of derision.

The opposition will say, does that mean we must put up with everything that the young will do? To them I say, the young will never do whatever they please. They will walk along the right paths if they are treated properly. If you insult them, curse their race, religion or customs, if they see that there is little chance of getting fair treatment, if they see that their own teachers are forced to bow to others despite their own worth, then they will express their discontent at each moment; if they do not then we must think of it as a matter of shame and sadness.