Archive | March 2015

শেষের রাত্রি / Shesher Ratri / The Final Night

1

‘মাসি !’

‘ঘুমোও,যতীন,রাত হল যে ।’

‘হোক-না রাত,আমার দিন তো বেশি নেই । আমি বলছিলুম,মণিকে তার বাপের বাড়ি– ভূলে যাচ্ছি,ওর বাপ এখন কোথায়–‘

‘সীতারামপুরে ।’

‘হাঁ সীতারামপুরে । সেইখানে মণিকে পাঠিয়ে দাও,আরো কতদিন ও রোগীর সেবা করবে । ওর শরীর তো তেমন শক্ত নয় ।’

‘শোনো একবার ! এই অবস্থায় তোমাকে ফেলে বউ বাপের বাড়ি যেতে চাইবেই বা কেন ।’

‘ডাক্তারেরা কী বলেছে সে কথা কি সে–‘

‘তা সে নাই জানল– চোখে তো দেখতে পাচ্ছে । সেদিন বাপের বাড়ি যাবার কথা যেমন একটু ইশারায় বলা অমনি বউ কেঁদে অস্থির ।’

মাসির এই কথাটার মধ্যে সত্যের কিছু অপলাপ ছিল, সে কথা বলা আবশ্যক । মণির সঙ্গে সেদিন তাঁর এই প্রসঙ্গে যে আলাপ হইয়াছিল সেটা নিম্নলিখিত-মতো ।

‘বউ,তোমার বাপের বাড়ি থেকে কিছু খবর এসেছে বুঝি ? তোমার জাঠতুতো ভাই অনাথকে দেখলুম যেন ।

‘হাঁ, মা ব’লে পাঠিয়েছেন, আসছে শুক্রবারে আমার ছোটো বোনের অন্নপ্রাশন । তাই ভাবছি–‘

‘বেশ তো বাছা, একগাছি সোনার হার পাঠিয়ে দাও, তোমার মা খুশি হবেন।’

‘ভাবছি,আমি যাব। আমার ছোটো বোনকে তো দেখিনি, দেখতে ইচ্ছে করে।’

‘সে কী কথা, যতীনকে একলা ফেলে যাবে? ডাক্তার কী বলেছে শুনেছ তো?’

‘ডাক্তার তো বলছিল, এখনো তেমন বিশেষ–‘

‘তা যাই বলুক, ওর এই দশা দেখে যাবে কী ক’রে।’

‘আমার তিন ভাইয়ের পরে এই একটি বোন, বড়ো আদরের মেয়ে –শুনেছি, ধুম ক’রে অন্নপ্রাশন হবে– আমি না গেলে মা ভারি–‘

‘তোমার মায়ের ভাব, বাছা, আমি বুঝতে পারি নে। কিন্তু যতীনের এই সময়ে তুমি যদি যাও, তোমার বাবা রাগ করবেন,সে আমি ব’লে রাখছি।’

‘তা জানি । তোমাকে এক লাইন লিখে দিতে হবে মাসি, যে কোনো ভাবনার কথা নেই– আমি গেলে বিশেষ কোনো–‘

‘তুমি গেলে কোনো ক্ষতিই নেই সে কি জানি নে । কিন্তু তোমার বাপকে যদি লিখতেই হয়, আমার মনে যা আছে সব খুলেই লিখব ।”

‘আচ্ছা,বেশ– তুমি লিখো না । আমি ওঁকে গিয়ে বললেই উনি–‘

‘দেখো বউ, অনেক সয়েছি– কিন্তু এই নিয়ে যদি তুমি যতীনের কাছে যাও, কিছুতেই সইব না । তোমার বাবা তোমাকে ভালো রকমই চেনেন, তাঁকে ভোলাতে পারবে না ।’

এই বলিয়া মাসি চলিয়া আসিলেন । মণি খানিকক্ষণের জন্য রাগ করিয়া বিছানায় উপর পড়িয়া রহিল ।

পাশের বাড়ি হইতে সই আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,’এ কি সই,গোসা কেন ।’

‘দেখো দেখি ভাই, আমার একমাত্র বোনের অন্নপ্রাশন– এরা আমাকে যেতে দিতে চায় না ।’

‘ওমা , সে কী কথা, যাবে কোথায় । স্বামী সে রোগে শুষছে ।’

‘আমি তো কিছুই করি নে, করিতে পারিও নে ; বাড়িতে সবাই চুপচাপ ,আমার প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে । এমন ক’রে আমি থাকিতে পারি নে, তা বলছি !’

‘তুমি ধন্যি মেয়েমানুষ যা হোক ।’

‘তা আমি, ভাই, তোমাদের মতো লোক দেখানে ভান করতে পারি নে । পাছে কেউ কিছু মনে করে বলে মুখ গুঁজড়ে  ঘরের কোণে পড়ে থাকা আমার কর্ম নয়।’

‘তা ,কী করবে শুনি ।’

‘আমি যাবই, আমাকে কেউ ধরে রাখতে পারবে না ।’

‘ইস্‌, তেজ দেখে আর বাঁচি নে । চললুম, আমার কাজ আছে ।’

***

Chapter 1

‘Aunt?’

‘Go to sleep Jatin, it is late.’

‘Let it be late, I do not have much time left. I was saying perhaps Moni could be sent to her parents, I forget where her father lives –‘

‘In Sitarampur.’

‘Yes to Sitarampur; send Moni to them, how much longer will she have to look after an invalid? She is not that strong herself.’

‘Listen to yourself! Why would your wife want to go away while you lie ill here?

‘Does she know what the doctor said?’

‘Even if she does not know what he said, she has eyes that can see. The other day as soon as I hinted at going to her parents’ house, she burst into tears.’

It is important to clarify that was some distortion of the truth in what the aunt had said. Her conversation with Moni had been along the following lines.

‘Daughter, is there some news from your parents’ house? I thought I saw your cousin Anath.’

‘Yes, my mother has sent word that my young sister’s rice ceremony will be held next Friday. I was thinking –‘

‘Well child, why not send a gold necklace, your mother will be pleased.’

‘I am thinking of going. I have not seen this young sister yet, I wish to see her.’

‘But how you will go, leaving Jatin like this? Surely you have heard what the doctor said?’

‘But the doctor said, there is still no sign –‘

‘Be as it may, how will you go leaving him in this state?’

‘ This is the one sister I have after three brothers, she is much loved – and I have heard the ceremony will be held with much pomp – if I am not there, my mother will be very –‘

‘I do not understand what your mother thinks, child. But if you go when Jatin is in this state, I can tell you that your father will be angry.’

‘I know. But if you write one line to him saying that there is nothing to worry about – it will be alright if I leave him –‘

‘You do not have to tell me that there will be little difference to his care if you go. But if I do have to write to your father, I will disclose all that is on my mind.’

‘Fine, you do not have to do it. If I go and speak to my husband he will agree  -‘

‘Look daughter, I have put up with a lot – but if you go to Jatin with this request, I will not bear it at all. Your father knows you too well, you will not be able to fool him.’

The aunt left after saying this. Moni lay on her bed fuming at the injustice.

Her friend came from next door and asked, ‘What is this, why the glum face?’

‘Look at what is happening, it is the rice ceremony for my only sister and these people are not letting me go!’

‘Dear God, what are you saying, where will you go? Your husband is so ill.’

‘I do not have to do anything for him, I couldn’t, even if I tried; everyone is so quiet I feel stifled. I am just saying that I cannot live like this.’

‘You are truly amazing!’

‘Look my friend I am not as good at putting on pretences as you might be. But it is not in my nature to sit quietly in a corner for fear of people saying things.’

’So, what is it that you will do, pray tell.’

’I will go and no one can stop me from doing that.’

‘You know, you have some gall! I am going, I have got better things to do.’

Advertisements

১৪০০ সাল / The Year 1400

১৪০০ সাল

   আজি হতে শতবর্ষ পরে

কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি

      কৌতূহলভরে–

   আজি হতে শতবর্ষ পরে।

আজি নববসন্তের প্রভাতের আনন্দের

      লেশমাত্র ভাগ–

আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান,

   আজিকার কোনো রক্তরাগ

অনুরাগে সিক্ত করি পারিব না পাঠাইতে

      তোমাদের করে

   আজি হতে শতবর্ষ পরে।

তবু তুমি একবার খুলিয়া দক্ষিণদ্বার

      বসি বাতায়নে

সুদূর দিগন্তে চাহি কল্পনায় অবগাহি

      ভেবে দেখো মনে–

   একদিন শতবর্ষ আগে

চঞ্চল পুলকরাশি কোন্‌ স্বর্গ হতে ভাসি

   নিখিলের মর্মে আসি লাগে–

নবীন ফাল্গুনদিন সকল বন্ধনহীন

      উন্মত্ত অধীর–

উড়ায়ে চঞ্চল পাখা পুষ্পরেণুগন্ধমাখা

      দক্ষিণসমীর–

সহসা আসিয়া ত্বরা রাঙায়ে দিয়েছে ধরা

      যৌবনের রাগে

   তোমাদের শতবর্ষ আগে।

সেদিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে,

      কবি এক জাগে–

কত কথা পুষ্পপ্রায় বিকশি তুলিতে চায়

      কত অনুরাগে

   একদিন শতবর্ষ আগে।

   আজি হতে শতবর্ষ পরে

এখন করিছে গান সে কোন্‌ নূতন কবি

      তোমাদের ঘরে?

আজিকার বসন্তের আনন্দ-অভিবাদন

   পাঠায়ে দিলাম তাঁর করে।

আমার বসন্তগান তোমার বসন্তদিনে

   ধ্বনিত হউক ক্ষণতরে

হৃদয়স্পন্দনে তব ভ্রমরগুঞ্জনে নব

      পল্লবমর্মরে

   আজি হতে শতবর্ষ পরে।

  ২ ফাল্গুন, ১৩০২

G_Tagore_Tagore

The Year 1400

   A hundred years from this day

Who are you that sits down to read my poem

      Filled with curiosity –

   A hundred years from this day.

The joy of this newly minted spring morn

      Even a trace of that-

 One perfumed flower, one joyous bird song

  Just one of the colours that painted this day

 Not one of those can I send to you, wrapped in my love

      For you to hold

    A hundred years from this day.

Still I would that you sit once, doors opened to the South

      By a window

And looking upon the distance, allow imagination to reign free

      Think of how once

   On a day a hundred years earlier

A hundred feelings came drifting down from the heavens

   To touch the soul of the universe –

On a day of Phalgun, without rein

      Eager, intoxicated –

On shimmering wings scented with the pollen of a hundred flowers

      That southerly breeze –

Has surprised the old earth, colouring it again

      In a youthful blush

   A hundred years before you walked this earth.

 On that day, his heart restless, enveloped in song,

       A poet kept watch –

How he wished that his words unspoken would burst forth into bloom

      With such love

   On a day a hundred years earlier.

   A hundred years from this day

What new poet will it be that sings for your pleasure?

I send the felicitations of this spring day

   For them to enjoy.

Let my spring song ring across the firmament of your spring

   Even if only for a moment

In the pulse of your heart and in the dancing wings of your bees

      In the rustle of leaf song.

   A hundred years from this day.

                                                                  ~The second day of Phalgun, 1302

Follow the link to hear the poem in the poet’s own voice:
https://www.youtube.com/watch?v=fmZp2SapJGs

রঙ লাগালে বনে বনে/ Ke rong lagaaley boney boney/Who colours the forests bright with their own hands

রঙ লাগালে বনে বনে।

                   ঢেউ জাগালে সমীরণে॥

আজ ভুবনের দুয়ার খোলা   দোল দিয়েছে বনের দোলা–

              দে দোল! দে দোল! দে দোল!

     কোন্‌ ভোলা সে ভাবে-ভোলা   খেলায় প্রাঙ্গণে॥

আন্‌ বাঁশি– আন্‌ রে তোর আন্‌ রে বাঁশি,

                        উঠল সুর উচ্ছ্বাসি   ফাগুন-বাতাসে।

     আজ   দে ছড়িয়ে    শেষ বেলাকার কান্না হাসি–

সন্ধ্যাকাশের বুক-ফাটা সুর   বিদায়-রাতি করবে মধুর,

     মাতল আজি অস্তসাগর সুরের প্লাবনে॥

রাগ: খাম্বাজ
তাল: ষষ্ঠী
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1334
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1927
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

Butea-monosperma-Lamk

 

Who colours the forests bright with their own hands?

                   And makes the wind rise, in an answering wave?

Today the doors to the world open wide – shaken by the rhythm that sighs through the forest

              Swing high! Swing low! Swing to the sky!

     Who is this who plays by himself, all but lost to the world?

Oh bring your flute – bring out your sweet flute,

                        Let the tune ring high on the air of spring

     Scatter your tears for the day that is gone, and the smiles that we once smiled

The haunting call of the evening skies will sweeten this final night,

     As this last sea we will cross thrills to a flood of song.

 

 

Raga: Khambaj
Beat: Shashthi
Written: 1927
Score: Dinendranath Tagore

 

 Follow the link to hear:

Suchitra Mitra:

Srikanto Acharya: