Archives

নতুন পুতুলঃ লিপিকা /The New Doll: Lipika

 

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

***

 

The New Doll

 

|1|

There was a master craftsman who only made dolls; dolls fit for a princess to play with.

Every year there was a doll fair in the palace courtyard. All the other artisans at the fair honoured the master craftsman with the respect reserved for the best.

When he was almost eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal; youthful in years was he, hitherto unseen his methods.

The dolls he made looked complete in some ways and unfinished in others. He touches them with paint in some parts and leaves other parts untouched. The dolls look as if they are still being made, as if they will never be completed.

The young say, ‘Now this is courage!’

The old say, ‘Courage? This is effrontery!’

But, new times demand new things. Today’s princesses say, ‘We want these dolls.’

The old courtiers say, ‘For shame!’

Of course, this only strengthens the young people’s resolve.

The crowds no longer flock to the old man’s shop. His baskets filled with dolls wait just as people at the river bank wait for the ferry, staring at the other bank.

One year passed and then another; everyone forgot the old fellow’s name. Kishanlal became the leader of the doll sellers at the palace fair.

|2|

The old man was heartbroken. It was hard for him to make a living. In the end his daughter came and said to him, Come and stay with me.’

His son-in-law said, ‘Eat, drink and be merry. All you have to do us drive the stray cattle from the fields.’

His daughter is busy with her chores all day long. His son-in-law makes clay lamps and takes them to sell in the city when his boat is full.

The old man does not see that the times have changed, just as he does not understand that his granddaughter is now sixteen years old.

She goes to him where he sits in the shade of the trees, dozing off as he guards the field and puts her arms about his neck. Even his bones grow happy as he says, ‘What is it? What do you want?’

His granddaughter says, ‘Make me dolls to play with.’

The old man said, ‘But are you sure you even like the dolls I make?’

His granddaughter said, ‘Tell me then, is there anyone who makes better dolls than you?’

The old man said, ‘Why, how about Kishanlal?’

The girl answered, ‘He wishes he had your talent!’

The two often squabble like this. It is always about the same thing.

The old man then takes his equipment out of his bag and puts his enormous round glasses on.

He says to his granddaughter, ‘But dear, what about the crows eating the corn?’

His granddaughter says, ‘Grandfather, I will drive the crows away!’

Time passes; the bullock draws water noisily at the distant canal; the granddaughter drives the crows away and the old man makes his doll

3|

The old man fears his daughter most of all. She rules her world with an iron grasp, everyone is careful about what they do when she is around.

The old man was fashioning dolls with all his concentration today; he did not notice when his daughter came walking towards him from behind, her arms swinging busily.

When she came right up to him and spoke, he took his glasses off and looked at her with childlike innocence.

His daughter said, ‘The milking can wait I suppose, while you while away your time with Subhadra. She is a big girl now, is she going to play with dolls anymore?’

The old man said hurriedly, ‘Why would Subhadra play with these? I will sell these at the palace. For I have to give a necklace of coins to my child on the day her husband comes asking for her hand. I want to save money for that.’

His daughter said with some annoyance, ‘Who will buy these dolls at the palace!’

The old man’s head sank in shame. He sat in silence.

Subhadra shook her head and said, ‘I dare the people in the palace to keep their hands off my grandfather’s dolls.’

|4|

Two days later Subhadra brought a measure of gold and gave it to her mother saying, ‘Here you are, money for my grandfather’s dolls.’

Her mother asked, ‘Where did you get this?’

The girl answered, ‘I sold them at the palace.’

The old man said with a smile, ‘And yet your grandfather does not see so well these days, and yet you know that his hands tremble.’

Her mother said happily, ‘Sixteen gold pieces like this should make a fine adornment for Subhadra’s neck.’

The old man answered, ‘Do not worry about that.’

Subhadra wrapped her arms about his neck and said, ‘I do not need anyone else.’

The old man kept smiling as he wiped a tear from his eye.

|5|

The old man seemed to have regained his youth. He would sit under the tree and make dolls. Subhadra would drive off the crows and the bullock would draw water from the distant canal with a wheezing sound.

One by one the sixteen coins were strung and the necklace was completed.

Her mother said, ‘Now all we need is a groom!’

Subhadra whispered in his ear, ‘Grandfather, I have a groom all ready and waiting.’

‘But tell me, where did you find your groom?’

Subhadra answered, ‘That day when I went to the palace, the guard asked me what I wanted. I said that I was there to sell my dolls to the princesses. He said that my dolls were not in fashion any more. With those words he turned me away. One man was moved by my tears and said, ‘Give those dolls to me, I will dress them up a little and they will sell. If you say yes old grandfather, I will marry that man.’

The old craftsman asked, ‘Where is he?’

His granddaughter said, ‘There he stands, beneath the Piyal tree.’

Her groom entered the room; the old man said, ‘But this is Kishanlal!’

Kishanlal touched his feet in respectful greeting and said, ‘Yes, I am Kishanlal indeed.’

The old man clasped him to his chest and said, ‘Once you took the dolls I made, today you take the treasure of my heart.’

His granddaughter put her arms around his neck and whispered in his ear, ‘Along with you!’

 

 

 

Advertisements

মেঘদূত/Meghduut/The Cloud Messenger

মেঘদূত

 

মিলনের প্রথম দিনে বাঁশি কী বলেছিল।

 

সে বলেছিল, ‘সেই মানুষ আমার কাছে এল যে মানুষ আমার দূরের।’

 

আর, বাঁশি বলেছিল, ‘ধরলেও যাকে ধরা যায় না তাকে ধরেছি, পেলেও সকল পাওয়াকে যে ছাড়িয়ে যায় তাকে পাওয়া গেল।’

 

তার পরে রোজ বাঁশি বাজে না কেন।

 

কেননা, আধখানা কথা ভুলেছি। শুধু মনে রইল, সে কাছে; কিন্তু সে যে দূরেও তা খেয়াল রইল না। প্রেমের সে আধখানায় মিলন সেইটেই দেখি, যে আধখানায় বিরহ সে চোখে পড়ে না, তাই দূরের চিরতৃপ্তিহীন দেখাটা আর দেখা যায় না; কাছের পর্দা আড়াল করেছে।

 

দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।

 

সেই আমাদের মাঝের আকাশটি আঁধিতে ঢেকেছে, প্রতি দিনের কাজে কর্মে কথায় ভরে গিয়েছে, প্রতি দিনের ভয়ভাবনা-কৃপণতায়।

***

The Cloud Messenger

1

What did the flute say on the first day of union?

It said, ‘The one who was once distant has now come near.’

And, it said, ‘The one who may not be bound by bonds has been caught, the one who is beyond all capture even when caught has been found.’

Then why does the flute no longer play each day.

Because I have forgotten half of what I had to say. All I remember is that the beloved is near; but the vast distance that still parts us no longer bothers me. I only see that part of love where one meets the beloved, I ignore the part where there is separation and that is why I fail to see the unfulfilled in the gaze of the distant; proximity has curtained it from me.

The endless sky that lies between two people is always silent, that space is not for words. That vast silence must be filled with flute song. The flute cannot play without the freedom of the infinite sky.

That sky that lies between us is often obscured by dust storms, the daily business of words and tasks and shrouded by the miserliness that is companion to mundane doubts and fears.
 

 

 

এক-একদিন জ্যোৎস্নারাত্রে হাওয়া দেয়; বিছানার ‘পরে জেগে ব’সে বুক ব্যথিয়ে ওঠে; মনে পড়ে, এই পাশের লোকটিকে তো হারিয়েছি।

 

এই বিরহ মিটবে কেমন করে, আমার অনন্তের সঙ্গে তার অনন্তের বিরহ।

 

দিনের শেষে কাজের থেকে ফিরে এসে যার সঙ্গে কথা বলি সে কে। সে তো সংসারের হাজার লোকের মধ্যে একজন; তাকে তো জানা হয়েছে, চেনা হয়েছে, সে তো ফুরিয়ে গেছে।

 

কিন্তু, ওর মধ্যে কোথায় সেই আমার অফুরান একজন, সেই আমার একটিমাত্র। ওকে আবার নূতন করে খুঁজে পাই কোন্‌ কূলহারা কামনার ধারে।

 

ওর সঙ্গে আবার একবার কথা বলি সময়ের কোন্‌ ফাঁকে, বনমল্লিকার গন্ধে নিবিড় কোন্‌ কর্মহীন সন্ধ্যার অন্ধকারে।

***

The Cloud Messenger
2

Some times the wind grows strong on a full moon night; the heart pines for something as one wakes up; and I remember, the one who lies beside is already lost to me.

How will this separation be overcome, this that divides my eternal from his.

Who is this that I speak with after returning from work at day’s end? That is but one among the thousands on this earth; I have learned him and known him, that is done with.

But where within is the one without end, the one who is mine alone. Where will I discover him anew, led by what desire.

Where will I find the time to talk to him again, on an indolent evening perfumed and heavy with jasmine.

 

হাস্যকৌতুকঃ ছাত্রের পরীক্ষা/Cchatrer Porikkha/ An examination

ছাত্রের পরীক্ষা

 

 

ছাত্র শ্রীমধুসূদন

 

শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

 

অভিভাবকের প্রবেশ

 

অভিভাবক।

মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু?

 

কালাচাঁদ।

আজ্ঞে, মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে, কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত। কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না।

 

অভিভাবক।

বটে! তা, আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

 

কালাচাঁদ।

তা , দেখুন-না।

 

মধুসূদন।

(স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে। আজ এর শোধ তুলব। ওঁকে আমি তাড়াব।

 

অভিভাবক।

কেমন রে মোধো, পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো?

 

মধুসূদন।

মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি।

 

মধুসূদন।

যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

 

অভিভাবক।

একটা উদাহরণ দে।

 

মধুসূদন।

কেঁচো!

 

কালাচাঁদ।

(চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

 

অভিভাবক।

রসুন মশায়, এখন কিছু বলবেন না।

 

মধুসূদনের প্রতি

 

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ; আচ্ছা, কাননে কী ফোটে বলো দেখি?

 

মধুসূদন।

কাঁটা।

 

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

 

কী মশায়, মারেন কেন? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে? ইতিহাসে কী বলে?

 

মধুসূদন।

পোকায়।

 

বেত্রাঘাত

 

আজ্ঞে, মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি– শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন, সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন।

 

প্রদর্শন।

কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

 

অভিভাবক।

ব্যাকরণ মনে আছে?

 

মধুসূদন।

আছে।

 

অভিভাবক।

“কর্তা’ কী, তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি।

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, কর্তা ওপাড়ার জয়মুন্‌শি।

 

অভিভাবক।

কেন বলো দেখি।

 

মধুসূদন।

তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন।

 

কালাচাঁদ।

(সরোষে) তোমার মাথা!

 

পৃষ্ঠে বেত্র

 

মধুসূদন।

(চমকিয়া) আজ্ঞে, মাথা নয়, ওটা পিঠ।

 

অভিভাবক।

ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে?

 

মধুসুদন।

জানি নে।

 

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

 

মধুসদন।

ওটা বিলক্ষণ জানি– ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ।

 

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

 

অভিভাবক।

অঙ্কশিক্ষা হয়েছে?

 

মধুসূদন।

হয়েছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, তোমাকে সাড়ে ছ’টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে,পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে। একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে, কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে?

 

মধুসূদন।

একটাও নয়।

 

কালাচাঁদ।

কেমন করে।

 

মধুসূদন।

সবগুলো খেয়ে ফেলব। দিতে পারব না।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে?

 

মধুসূদন।

যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে, যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই।

 

কালাচাঁদ।

মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া, মেরে তোমার পিঠ লাল করব, তবে তুমি সিধে হবে!

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায়।

 

অভিভাবক।

কালাচাঁদবাবু, ওটা আপনার ভ্রম। মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয়। কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না, কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায়। অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না। কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই। আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন, দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক, তার পরে আমিই ওকে পড়াব।

 

মধুসূদন।

( স্বগত) আঃ, বাঁচা গেল।

 

কালাচাঁদ।

বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম, কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার। ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই, সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয়।

***

AN EXAMINATION

The student: Madhu

The teacher: Kalachand

 

Madhu’s guardian enters the room.

 

Guardian: How is he doing in his studies Mr. Kalachand?

Kalachand: Despite being very naughty he is very good at his studies. One does not have to repeat things to him at all. He remembers everything after I say it to him once.

Guardian: Really! Let me test his aptitude today for myself.

Kalachand: Of course, go ahead.

Madhusudan to himself: (You hit me so hard yesterday that my back still hurts. I will take revenge today. I will get rid of you!)

Guardian: So my boy, you remember all the previous lessons?

Madhu: I remember everything the teacher said to me.

 

Guardian: Okay, tell me then what a plant is.

Madhu: Things that emerge from the ground.

Guardian: Give me an example.

Madhu: A worm.

 

Kalachand: What! What are you saying? (visibly angry)

Guardian: Wait, do not interrupt now.

To Madhu: You have read the poetry book; tell me, what pops up in the garden?

Madhu: Thorns. (Upon hearing this the teacher strikes him with his cane.)

Madhu: Why are you hitting me sir? Am I lying?

Guardian: Now, what felled Sirajuddaulah? What does history tell us?

Madhu: Insects. (Swishing of the cane)

Excuse me, you strike me without reason – why just Sirajuddaulah, all the chapters have been eaten up by silverfish. See?

He shows the pages. The teacher scratches his head.

Guardian: Do you remember your grammar?

Madhu: Yes.

Guardian: Give an example and explain the idea of subject or ‘karta

Madhu: Please, that must be our neighbour Joy Munshi.

Guardian: Why is that?

 

Madhu: He does all the work.

 

Kalachand, angrily: You fat head!

(Hits him on the back)

Madhu: But sir! That is not my head, that is my back.

Guardian: What is ‘Shashthi Tatpurush’?

Madhu: I do not know.

 

Kalachand shows him the cane again.

Madhu: I know that  very well. It is a stick without a carrot.

His guardian smiles while the teacher scowls.

Guardian: Have you studied mathematics?

Madhu: I have.

Guardian: Well, imagine you are given six and a half cakes and are told to eat cake for five minutes and then give the remainder to your younger brother. You can eat one cake in two minutes, how many cakes will you give your brother?

 

Madhu: None.

Kalachand: But how?

 

Madhu: I will eat all of them. I won’t give him any.

Guardian: If a tree grows a quarter of an inch each day then how tall will a ten inch tree be in the period from Baishakh this year till Baishakh next year.

Madhu: If the tree bends, I cannot say and if it grows straight we will be able to measure it and tell how much it grew. Of course, if it dies then there is no mathematics in this at all.

Kalachand: I can see you will smarten up without a couple of licks of the switch! Stupid fool, I will give you such a thrashing I will straighten you out for good!

 

Madhu: Excuse me, sometimes beatings can make straight stuff crooked.

Guardian: Kalachand, that is your mistake. Very little can be achieved by thrashings. It is said that one cannot turn a donkey into a horse by hitting it but the converse is often true as well; a horse can be turned into a donkey with ill treatment. Most children are able to learn easily but most teachers do not know how to teach. You may take your cane and depart; I will let Madhu’s back heal and then begin teaching him myself.

Madhusudan to himself: Good riddance!

 

Kalachand: Thank God! Teaching is pure drudgery, like manual labour! I get so little after thirty days of teaching one boy, I could easily get double that each day if I dug holes for a living.

 

কর্তার ভূত/ Kortar Bhuth/ The Master’s Ghost

কর্তার ভূত

বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠল, ‘তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে।’

শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাবলে, ‘আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে।’

তা ব’লে মরণ তো এড়াবার জো নেই। তবু দেবতা দয়া করে বললেন, ‘ভাবনা কী। লোকটা ভূত হয়েই এদের ঘাড়ে চেপে থাক্‌-না। মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের তো মৃত্যু নেই।’

দেশের লোক ভারি নিশ্চিন্ত হল।

কেননা ভবিষ্যৎকে মানলেই তার জন্যে যত ভাবনা, ভূতকে মানলে কোনো ভাবনাই নেই; সকল ভাবনা ভূতের মাথায় চাপে। অথচ তার মাথা নেই, সুতরাং কারো জন্যে মাথাব্যথাও নেই।

তবু স্বভাবদোষে যারা নিজের ভাবনা নিজে ভাবতে যায় তারা খায় ভূতের কানমলা। সেই কানমলা না যায় ছাড়ানো, তার থেকে না যায় পালানো, তার বিরুদ্ধে না চলে নালিশ, তার সম্বন্ধে না আছে বিচার।

দেশসুদ্ধ লোক ভূতগ্রস্ত হয়ে চোখ বুজে চলে। দেশের তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেন, ‘এই চোখ বুজে চলাই হচ্ছে জগতের সবচেয়ে আদিম চলা। একেই বলে অদৃষ্টের চালে চলা। সৃষ্টির প্রথম চক্ষুহীন কীটাণুরা এই চলা চলত; ঘাসের মধ্যে, গাছের মধ্যে, আজও এই চলার আভাস প্রচলিত।’

শুনে ভূতগ্রস্ত দেশ আপন আদিম আভিজাত্য অনুভব করে। তাতে অত্যন্ত আনন্দ পায়।

ভূতের নায়েব ভুতুড়ে জেলখানার দারোগা। সেই জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না। এইজন্যে ভেবে পাওয়া যায় না, সেটাকে ফুটো করে কী উপায়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।

এই জেলখানায় যে ঘানি নিরন্তর ঘোরাতে হয় তার থেকে এক ছটাক তেল বেরোয় না যা হাটে বিকোতে পারে, বেরোবার মধ্যে বেরিয়ে যায় মানুষের তেজ। সেই তেজ বেরিয়ে গেলে মানুষ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তাতে করে ভূতের রাজত্বে আর কিচ্ছুই না থাক্‌–অন্ন হোক, বস্ত্র হোক, স্বাস্থ্য হোক– শান্তি থাকে।

কত-যে শান্তি তার একটা দৃষ্টান্ত এই যে, অন্য সব দেশে ভূতের বাড়াবাড়ি হলেই মানুষ অস্থির হয়ে ওঝার খোঁজ করে। এখানে সে চিন্তাই নেই। কেননা ওঝাকেই আগেভাগে ভূতে পেয়ে বসেছে।

এই ভাবেই দিন চলত, ভূতশাসনতন্ত্র নিয়ে কারো মনে দ্বিধা জাগত না; চিরকালই গর্ব করতে পারত যে, এদের ভবিষ্যৎটা পোষা ভেড়ার মতো ভূতের খোঁটায় বাঁধা, সে ভবিষ্যৎ ভ্যা’ও করে না, ম্যা’ও করে না, চুপ করে পড়ে থাকে মাটিতে, যেন একেবারে চিরকালের মতো মাটি।

কেবল অতি সামান্য একটা কারণে একটু মুশকিল বাধল। সেটা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোকে ভূতে পায় নি। তাই অন্য সব দেশে যত ঘানি ঘোরে তার থেকে তেল বেরোয় তাদের ভবিষ্যতের রথচক্রটাকে সচল করে রাখবার জন্যে,বুকের রক্ত পিষে ভূতের খর্পরে ঢেলে দেবার জন্যে নয়। কাজেই মানুষ সেখানে একেবারে জুড়িয়ে যায় নি। তারা ভয়ংকর সজাগ আছে।

এ দিকে দিব্যি ঠাণ্ডায় ভূতের রাজ্য জুড়ে ‘খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো’।

সেটা খোকার পক্ষে আরামের, খোকার অভিভাবকের পক্ষেও; আর পাড়ার কথা তো বলাই আছে।

কিন্তু, ‘বর্গি এল দেশে’।

নইলে ছন্দ মেলে না, ইতিহাসের পদটা খোঁড়া হয়েই থাকে।

দেশে যত শিরোমণি চূড়ামণি আছে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা গেল, ‘এমন হল কেন।’

তারা এক বাক্যে শিখা নেড়ে বললে, ‘এটা ভূতের দোষ নয়, ভুতুড়ে দেশের দোষ নয়, একমাত্র বর্গিরই দোষ। বর্গি আসে কেন।’

শুনে সকলেই বললে, ‘তা তো বটেই।’ অত্যন্ত সান্ত্বনা বোধ করলে।

দোষ যারই থাক্‌, খিড়কির আনাচে-কানাচে ঘোরে ভূতের পেয়াদা, আর সদরের রাস্তায়-ঘাটে ঘোরে অভূতের পেয়াদা; ঘরে গেরস্তর টেঁকা দায়, ঘর থেকে বেরোবারও পথ নেই। এক দিক থেকে এ হাঁকে, ‘খাজনা দাও।’ আর-এক দিক থেকে ও হাঁকে, ‘খাজনা দাও।’

এখন কথাটা দাঁড়িয়েছে, ‘খাজনা দেব কিসে’।

এতকাল উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের বুলবুলি এসে বেবাক ধান খেয়ে গেল, কারো হুঁস ছিল না। জগতে যারা হুঁশিয়ার এরা তাদের কাছে ঘেঁষতে চায় না, পাছে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। কিন্তু তারা অকস্মাৎ এদের অত্যন্ত কাছে ঘেঁষে, এবং প্রায়শ্চিতও করে না। শিরোমণি-চূড়ামণির দল পুঁথি খুলে বলেন, ‘বেহুঁশ যারা তারাই পবিত্র, হুঁশিয়ার যারা তারাই অশুচি, অতএব হুঁশিয়ারদের প্রতি উদাসীন থেকো, প্রবুদ্ধমিব সুপ্তঃ।’

শুনে সকলের অত্যন্ত আনন্দ হয়।

কিন্তু, তৎসত্ত্বেও এ প্রশ্নকে ঠেকানো যায় না, ‘খাজনা দেব কিসে’।

শ্মশান থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হাহা ক’রে তার উত্তর আসে, ‘আব্রু দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।’

প্রশ্নমাত্রেরই দোষ এই যে, যখন আসে একা আসে না। তাই আরও একটা প্রশ্ন উঠে পড়েছে, ‘ভূতের শাসনটাই কি অনন্তকাল চলবে।’

শুনে ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি আর মাসতুতো-পিসতুতোর দল কানে হাত দিয়ে বলে, ‘কী সর্বনাশ। এমন প্রশ্ন তো বাপের জন্মে শুনি নি। তা হলে সনাতন ঘুমের কী হবে– সেই আদিমতম, সকল জাগরণের চেয়ে প্রাচীনতম ঘুমের?’

প্রশ্নকারী বলে, ‘সে তো বুঝলুম, কিন্তু আধুনিকতম বুলবুলির ঝাঁক আর উপস্থিততম বর্গির দল, এদের কী করা যায়।’

মাসিপিসি বলে, ‘বুলবুলির ঝাঁককে কৃষ্ণনাম শোনাব, আর বর্গির দলকেও।’

অর্বাচীনেরা উদ্ধত হয়ে বলে ওঠে, ‘যেমন করে পারি ভূত ছাড়াব।’

ভূতের নায়েব চোখ পাকিয়ে বলে, ‘চুপ। এখনো ঘানি অচল হয় নি।’

শুনে দেশের খোকা নিস্তব্ধ হয়, তার পরে পাশ ফিরে শোয়।

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, বুড়ো কর্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না, অথচ ছাড়েও না।

দেশের মধ্যে দুটো-একটা মানুষ, যারা দিনের বেলা নায়েবের ভয়ে কথা কয় না, তারা গভীর রাত্রে হাত জোড় করে বলে, ‘কর্তা, এখনো কি ছাড়বার সময় হয় নি।’

কর্তা বলেন, ‘ওরে অবোধ, আমার ধরাও নেই, ছাড়াও নেই, তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।’

তারা বলে, ‘ভয় করে যে, কর্তা।’

কর্তা বলেন, ‘সেইখানেই তো ভূত।’

THE MASTER’S GHOSTlot-23-tagore-untitled-four-figures

1

When the old master was on his deathbed everyone through the land said, ‘What will happen to us if you go?’

He felt sad too. He thought, ‘Who is going to keep the peace when I am gone?’

But death does not listen to these excuses. But God weakened somewhat and said, ‘I see no problem in letting him hang around as a ghost for a while. After all, they never die!’

2

His countrymen were all very relieved.

Every sort of problem arises when one believes in the future, but nothing can bother you if you believe in ghosts; they worry about everything on your behalf. But since they have no heads to speak of, they never suffer from headaches from worrying too much.

There were still those who tried to do their own worrying. They had their ears thoroughly boxed by the ghost. It is not easy to escape that grasp as one can neither outrun a ghost nor complain to anyone about what no one else can see.

The whole country walked about under the shadow of the ghost with their eyes shut to the world. The philosophers said, ‘This is the best way to live, with your eyes closed. One lets Fate take its course. This is how the blind organisms used to move around in the grasses and in the trees. That is why it is so easily adopted again.

This makes the spellbound people feel rather proud and happy about their ancient lineage.

The ghost’s prime minister was the jailer of his ghostly prison. As the walls of this prison were invisible the prisoners could never figure out how to escape.

The wheels continually turn in the mill inside the jail, but the only thing that is worn down is the strength in the people. When the strength is all gone, people calm down. This ensures that even though there may be no food, clothes or health in the ghostly kingdom, there is always lots of peace.

You will understand how much peace when I tell you that while in every other land people send for an exorcist when they are tormented by ghosts, here the exorcist is already under the ghost’s spell.

3

Things would have gone this way happily enough without people ever doubting the rule of the ghost. They would have been proud of the fact that their futures were destined to be as uneventful as a tethered pet goat’s, with neither bleat nor shake of horns.

But a problem still came about because one tiny, miniscule detail. See, no one had thought to think of the fact that all the other countries in the world were not in some ghostly grip. All the wheels of progress turned in those countries in the direction of the future and not to wear down the people’s will. There the people had not fallen under a spell; there they were all terribly alert.

4

In the kingdom of the ghost, all was quiet and people slept as soundly as babies, complacent that nothing would ever happen.

That is possibly good for babies, and possibly even for their mothers and definitely for the neighbours.

But something did happen. Invaders stormed the land.

It was bound to happen, or the stories that make up our history would be incomplete.

All the wise men were asked one by one, ‘Why did this happen?’

They shook their heads sagely and said, ‘This is no fault of the ghost, this is no fault of ours, it is all the invaders’ fault.’

This was extremely comforting to everyone else. They agreed gravely that it was good to be held blameless.

But even though it was not clear whose fault it really was, the houses were filled with guards belonging to the ghost and the streets were filled with the invaders; it was hard to go out and it was just as hard to stay at home in peace for fear of being asked to pay taxes.

But how would they pay their taxes?

All year round the birds had come from the north, the south, the east and the west to eat the grain in the fields, but no one had paid the slightest heed. These creatures never rob the people who are alert, for fear of being punished. The wise men looked at their books and said, ‘The unheeding are blessed, while the alert are unclean, therefore we must keep away from them at all times.’

Everyone was filled with happiness upon hearing this.

5

But despite everything one cannot stop the question, ‘How will we pay our taxes?’

The answer blows in the wind, from graveyard and killing fields it comes, ‘With pride, with respect, with blood!’

The problem with questions is that they never come alone. One follows another, ‘Will these ghouls rule over us forever?’

When this reaches Mother Goose and all her children, they quickly cover their ears and say, ‘What ever next! We have never heard such questions, such curiosity. What then of that ancient sleep – the one that was there before anyone had needed to wake up?’

Says the one with the questions, ‘I understand, but then do we do with these, these most enlightened of birds and the most recently arrived robbers, what of them?’

Mother Goose says, ‘I will read them a few of my stories, it should do for both bird and bandit.’

The young and the impatient stir up and say impatiently, ‘We will get rid of them in any way we choose.’

The chief minister stares angrily and said, ‘Shut up! The wheels of my government still turn, you know!’

This makes the innocents fall silent and soon go back to sleep.

6

The main thing is that the old master remains, neither living nor dead, but like a ghost. He has nothing to say about the land but he does not leave it either.

There were a few people there who could not speak during the day for fear of the guards; they came to him in the darkness of night and said with the utmost respect, ‘Master, should you not be going now?’

He said, ‘You fools, I can neither leave, nor stay, I can escape only if you people let me.’

They said, ‘But we are afraid!’

The master said, ‘And that fear is the very place where the ghosts will live.’

একটি চাউনি/Ekti Chauni/One glance

গাড়িতে ওঠবার সময় একটুখানি মুখ ফিরিয়ে সে আমাকে তার শেষ চাউনিটি দিয়ে গেছে।

 

এই মস্ত সংসারে ঐটুকুকে আমি রাখি কোন্‌খানে।

 

দণ্ড পল মুহূর্ত অহরহ পা ফেলবে না, এমন একটু জায়গা আমি পাই কোথায়।

 

মেঘের সকল সোনার রঙ যে সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায় এই চাউনি কি সেই সন্ধ্যায় মিলিয়ে যাবে। নাগকেশরের সকল সোনালি রেণু যে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় এও কি সেই বৃষ্টিতেই ধুয়ে যাবে।

 

সংসারের হাজার জিনিসের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকলে এ থাকবে কেন– হাজার কথার আবর্জনায়, হাজার বেদনার স্তূপে।

 

তার ঐ এক চকিতের দান সংসারের আর-সমস্তকে ছাড়িয়ে আমারই হাতে এসে পৌঁচেছে। এ’কে আমি রাখব গানে গেঁথে, ছন্দে বেঁধে; আমি এঁকে রাখব সৌন্দর্যের অমরাবতীতে।

 

পৃথিবীর রাজার প্রতাপ, ধনীর ঐশ্বর্য হয়েছে মরবারই জন্যে। কিন্তু, চোখের জলে কি সেই অমৃত নেই যাতে এই নিমেষের চাউনিকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

 

গানের সুর বললে, ‘আচ্ছা, আমাকে দাও। আমি রাজার প্রতাপকে স্পর্শ করি নে, ধনীর ঐশ্বর্যকেও না, কিন্তু ঐ ছোটো জিনিসগুলিই আমার চিরদিনের ধন; ঐগুলি দিয়েই আমি অসীমের গলার হার গাঁথি।’

 

Image

 

THE LOOK

 

As he got on the train, he turned his face a little and gave me the gift of one final look.

Now where will I hide this little treasure in this vast world?

Where will I find a space for it where moments, minutes and seconds will not intrude?

Will this look fade away in that twilight where all the gold fades when clouds go to sleep? Will this be washed away by the same rains that wash the golden pollen out of the Nagkeshar blooms?

Why should this survive in the midst of a thousand mundane things in life – in the ephemera of a thousand useless words, under the weight of a thousand sorrows?

That gift of a moment came to me alone. I will keep this, strung as a pearl in my song, I will hold it to me with tune; I will preserve it as a painting on the walls of an eternal palace.

On earth, the wealth of kings and the riches of the wealthy are impermanent. But do tears not have that magical touch that can keep a look gifted in a moment, alive forever?

Then the tune paid heed and said, ‘Give it to me. I do not covet the wealth of kings nor the riches of the wealthy; these moments are what I fill my treasury with; they are my offerings to the Everlasting.’

 

 

 

কাবুলিওয়ালা/Kabuliwalla/The Merchant of Kabul

Kabuliwala1956cover

My five year old daughter Mini cannot stay quiet for even one moment. After her arrival on earth, she only took a year to learn how to speak and has not wasted a single waking moment since then in silence. Her mother often scolds her into holding her tongue, but I cannot do that. It is so unnatural to see her when she is not saying something that I cannot bear it for too long. This is why her conversations with me are quite enthusiastic and prolonged.

In the morning I had just started the seventeenth chapter of the novel I am writing, when Mini arrived and started, ‘Baba, the doorman Ramdayal calls a crow Kauwa, he does not know anything. Does he?’

Before I could to enlighten her on the differences between the various languages spoken, she moved on to another topic. ‘See Baba, Bhola was saying that elephants spray water from their trunks in the sky, and that is how it rains. It is amazing what nonsense he can speak! All day and all night, how does he do it?’

Without giving me time to express my views on this either, she suddenly asked me, ‘How are Ma and you related?’

Although I felt like saying she is my wife’s sister, I said aloud, ‘Mini, go and play with Bhola now. I have work to do.’

She then sat down by my feet next to the desk and started playing an animated game of Agdum Bagdum, clapping her own knees with her hands. In my seventeenth chapter, Pratapsinha was about to leap from the high windows of the prison into the fast flowing waters of the river below on a dark night with Kanchanmala clasped to his breast.

My room was by the roadside. Suddenly Mini left her game and ran to the window and started calling loudly, ‘Kabuliwalla, Kabuliwalla.’

A tall Afghan Kabuliwalla was ambling down the street, wearing loose clothes which were somewhat worse for wear, and a turban. He had a sack slung over his back and carried a couple of boxes of grapes. It is hard to say what Mini thought when she saw him, but she started to call him very loudly. I thought it would be a real problem if this fellow came over with his sack; it would certainly signal an end to my wish of finishing my seventeenth chapter.

But as soon as the man turned his face, smiled at Mini’s calls and started walking towards our house, she ran off into the house at top speed, to be seen no more. She had a firm belief that if one looked into the Kabuliwalla’s sack, a couple of live children were sure to be found.

The Kabuliwalla came and greeted me with a smile – and I thought, even though Pratapsinha and Kanchanmala were in grave danger, it would be rather rude to not buy something from the fellow after calling him.

A few things were bought. Then we talked a bit. The talk revolved around politics, the Russians, the English and the border protection policies.

Finally before leaving he asked, ‘Babu, where did your daughter go?’

I wished to wean Mini off her irrational fear and had her called from inside the house – she stood very close to me and looked suspiciously at the man’s face and the sack. He took some sultanas and prunes out of it and offered them to her. She did not accept them in spite of his entreaties and, doubly suspicious of his gesture, remained hidden behind my knees. The first visit went like this.

One morning a few days later, as I was leaving the house for work, I saw my daughter sitting on a bench near the front door and talking without pause to the Kabuliwalla, who sat at her feet smiling happily and occasionally voicing his opinions in broken Bangla. In her five years of experience Mini had never had such a patient audience apart from her father. I also noticed that her little lap was filled with nuts and raisins. I told the Kabuliwalla, ‘Why have you given her these? Don’t do that any more.’ I then gave him a fifty paise piece which he stowed away in his sack without any hesitation.

When I came home, I found that the fifty paise coin was at the centre of a full scale argument.

Mini’s mother had a shiny white disc in her hand as she questioned Mini in a voice filled with rebuke, ‘Where did you find this?’

Mini explained, ‘The Kabuliwalla gave it to me.’

Her mother asked, ‘Why did you take money from the Kabuliwalla?’

Mini who was very near tears by now said, ‘I did not want it, but he still gave to me.’

I arrived on the scene and rescued Mini from imminent danger and inevitable tears.

I learnt that this was not the second interaction that Mini had had with the Kabuliwalla, he had been coming every day and had conquered a large part of her tiny greedy heart with bribes of pistachio nuts.

I noticed that there were a few words and jokes that were in use between these two friends – such as my daughter’s smiling question as soon as she saw Rahamat, ‘Kabuliwalla, please tell me what you have in that sack of yours?’

To this Rahamat would reply in needlessly nasal tones, ‘Hnati, Elephant!’

There was a subtle sense of the ridiculous in the statement that his sack would hold an elephant. It was not really that subtle, but it amused them both a great deal – and I felt good as I listened to the innocent laughter of two children, one old and one young on those autumn mornings.

There was another thing that was a matter of mirth to the two. Rahamat would say to Mini, ‘Khnoki, wee lass, you should never go to your in-laws’ home!’

Bengali girls are familiar with the term ‘in-laws’ home’ all their lives, but as we were quite modern in our attitudes, we had not informed our little daughter about this place. Thus she could not understand fully what Rahamat meant but to not have a reply ready was foreign to her nature, and she used to ask him in turn, ‘Will you go to your in-laws’ home?’

Rahamat would then shake a huge fist at the imaginary in law and say, ‘Rahamat will beat the in-law soundly first!’

Mini would hear this and laugh a great deal at the thought of this unknown creature’s plight.

It was now autumn and the weather was beautiful. In ancient times kings used to go conquering other lands in this season. I had never gone any where outside Kolkata, but for that very reason my heart would wander the world freely. I was like a traveler forever in my own home; I always missed the places out there. Whenever I heard of foreign places my heart felt drawn to them, similarly when I saw foreigners, my mind conjured a tranquil scene of a river running through a forest, a hut in a clearing and mountains in the distance, and thoughts of a carefree happy existence would spring to mind.
And yet I was of such a lazy disposition that I intensely disliked leaving my familiar corner and going out. This is why the story telling sessions with the Kabuliwalla in the mornings in my little room sitting at my own table satisfied a lot of my yearnings for travel. As he talked in his slow baritone in broken Bangla of his own land, scenes of high mountains on either side of narrow desert tracks, camel caravans loaded with treasures, turbaned riders and men on foot, some armed with spears, others with ancient flint lock muskets floated before my eyes.

Mini’s mother was very easily frightened. A noise on the street was enough to convince her that all the drunks and miscreants in the world were descending on our house. In spite of having lived on this planet for a not inconsiderable period of time, she was constantly fearful that the place was filled with thieves, drunks, snakes, tigers, diseases such as malaria, caterpillars, cockroaches and pesky foreigners.

She was not completely at ease with Rahamat the Kabuliwalla. She had repeatedly asked me to keep a careful eye on him. When I tried to laugh her suspicions away, she asked me a series of questions, ‘Have children never been kidnapped? Is there no slavery in Kabul? Is it totally impossible for a huge Kabuliwalla to steal a small child?’

I had to admit that even though it was not impossible it was unbelievable. Not everyone has the same ability to believe however, and she continued to be afraid of most things. But I could not ask Rahamat to stop coming to our house through no fault of his own.

Every year in winter Rahamat would go home. He was extremely busy collecting his dues at this time. He had to go to many houses but he always came to see Mini once a day. It always seemed like they were conspiring when you saw them together. When he could not make it during the day, I would see him in the evening; to see that tall man in his loose flowing clothes with his huge bag looming up in the darkness was quite a shock at first. But when I saw Mini running to him with cries of ‘Kabuliwalla’ and her face wreathed in smiles, and heard the familiar innocent banter between two friends of disparate ages, my heart was filled with happiness.

One morning I was checking proof sheets in my little room. The last couple of days before winter finally took its leave had been unseasonably cold. The pale winter sun that came through the window and fell on my feet underneath the table felt comfortingly warm. It was probably around eight in the morning – the early risers were returning from their morning walks, wrapped against the weather in mufflers. Suddenly a great uproar was heard on the road.

I looked to see two guardsmen dragging Rahamat along in chains – with a band of curious children in tow. Rahamat’s clothes were bloodstained as was a dagger in the hands of one of his captors. I went outside and asked the men what the matter was.

After speaking to both parties, I managed to find out that one of our neighbours had borrowed money from Rahamat for a Rampuri shawl – he had denied having done this and in the ensuing argument and scuffle Rahamat had stabbed him.

As Rahamat showered the liar with many unmentionable curses, Mini came out calling, ‘Kabuliwalla, Kabuliwalla?’

Rahamat’s face immediately broke into amused smiles. He did not have his sack with him and thus their usual banter could not take place. Mini directly asked him, ‘Will you go to your in-laws’ house?’

Rahamat smiled and said, ‘That is where I am going.’

He realized that Mini did not smile and, showing his bound hands, he said,’I would have beaten him up, but how can I, my hands are tied.’

Rahamat was jailed for a few years for the crime of causing grievous bodily harm.

I forgot about him, in a manner of speaking. While we were spending our days at home in the midst of our familiar daily routine, any thought of how a freedom-loving mountain man was spending years behind prison walls never really occurred to me.

As a father even I have to admit that Mini’s capricious behaviour was very shameful. She forgot her old friend quite easily and made friends with the coachman Nabi. Even later, as she grew older, she made friends with girls rather than with males. She did not even visit her father’s study as much as before. This was a source of much disagreement between the two of us.

Many years have passed since then. Another autumn is here. My Mini’s wedding has been fixed and she will be married during the Puja holidays. Along with the goddess returning to Kailash, the source of happiness in my home will also leave for her in-laws’ home leaving us in darkness.

The morning had started beautifully. The freshly minted autumn sunshine was the colour of liquid gold that had been purified with sulphur. That sunshine had granted an ethereal splendour even on the dreary exposed bricks of untidy crowded houses in our Kolkata alley.

The shehnai flute had started playing in our house as soon as the night ended. That tune seemed to weep from within my ribs. The sad strains of Bhairavi filled the earth with the pain of approaching separation. It is my Mini’s wedding today.

There was a great deal of noise all morning, with the arrival of many people. A cover was being erected on a framework of bamboo, glass shades were being hung in the rooms and verandas with much tinkling of the crystals, and workmen called out loudly to each other all over the house.

As I sat in my study checking accounts, Rahamat came and saluted me.

I did not recognize him at first. His sack was not there. He did not have the long hair of old and his body had lost its sense of pure physical strength. I eventually recognized him by his smile.

I said, ‘How are you, when did you get back?’

He said, ‘I was released from jail yesterday evening.’

The words sounded somewhat incongruous. I had never seen a murderer face to face; my heart seemed to withdraw into itself at his sight. I kept thinking it would be best if this man had just left us alone on this auspicious day.

I said to him, ‘There is a ceremony at home today, and I am a bit busy; you should go now.’

As soon as he heard this he got up to leave. Near the door he paused, and after hesitating a bit, said, ‘Can I not see the wee lass?’

He must have believed Mini was still just the same. It was as though he thought Mini would come running for him, calling, ‘Kabuliwalla, Kabuliwalla’; there would be no change to the old routine of very amusing banter. He had even brought a box of grapes and some dried fruit in a paper bag, possibly borrowed from some friend of his – he no longer had his own supplies.

I said, ‘Today there is a ceremony here, you will not get to meet anyone.’

He seemed a little upset. He looked steadily at me in silence and then saluted me and left the room.

I felt a strange pain. I was thinking of calling him back when I saw him coming back on his own.

He came in and said, ‘I brought these grapes and some dried fruits, please give them to her.’

I took them and started to get some money out to pay for them. He suddenly grabbed my hand and said, ‘You are very kind Sir, I will remember this forever – but do not try to pay me. Sir, just like you have a daughter, I too have a daughter back home. I used to bring dry fruits for your daughter because she reminds me of my child, I have never come for the business.’

Saying this he put his hand into his loose clothing and pulled out a scrap of dirty paper from somewhere near his chest. He unfolded it very carefully and smoothed it onto my table.

I saw a tiny hand print on that piece of paper. Not a photograph or a painting, but a print taken by coating a palm with some soot and pressing it on paper. Rahamat had come to Kolkata every year to sell dried fruits carrying that memento of his daughter – that soft tiny palm touching his saddened heart with sweetness.

My eyes filled with tears at this. I forgot that he was an Afghan fruit seller and that I was a well-to-do Bengali gentleman – I understood that we were both the same, he was a father and so was I. The little hand print of his girl so far from us in her mountain home reminded me of Mini. I instantly sent for her to be brought outside. The womenfolk were not pleased. But I paid no attention to this. Mini shyly came and stood near me dressed in red bridal clothes, her forehead decorated with sandalwood.

Rahamat was startled at first on seeing her, he could not bring back their old camaraderie back. Finally he smiled and said, ‘Khnokhi, little girl, will you go to your in-laws’ home?’

Today Mini understands what the in-laws’ home holds, she could not give him the answer that she had before – she blushed on hearing his question and turned her face away. I remembered the first day the two had met and felt a strange sense of pain.

After Mini had gone Rahamat sighed deeply and sat down on the ground heavily. Suddenly it was clear to him that his own daughter had grown up as well in the mean time – he would have to re-acquaint himself with her – and he would never get the old times back. Who knows what he had gone through in the past eight years! The shehnai flutes played on in the gentle autumn sunshine, as Rahamat sat in an alley in Kolkata and dreamed of a desert in the mountains of Afghanistan.

I took some money and gave it to him. I said, ‘Rahamat, go back to your land and to your daughter; let the joy of that reunion bless Mini’s life.’

As a result of giving this money away I did have to do without a few things I had planned for the celebrations. I could not organize the sort of lighting I had wanted, nor the band I had hoped for and the family was not happy about this; but the light of goodwill brightened the happy ceremony.

স্ত্রীর পত্র/Streer Potro/The Wife’s Letter

শ্রীচরণকমলেষু

আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে,আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি — মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি;চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায় নি।

আজ আমি এসেছি তীর্থ করতে শ্রীক্ষেত্রে, তুমি আছ তোমার আপিসের কাজে। শামুকের সঙ্গে খোলসের যে সম্বন্ধ কলকাতার সঙ্গে তোমার তাই; সে তোমার দেহ মনের সঙ্গে এঁটে গিয়েছে; তাই তুমি আপিসে ছুটির দরখাস্ত করলে না। বিধাতার তাই অভিপ্রায় ছিল; তিনি আমার ছুটির দরখাস্ত মঞ্জুর করেছেন।

আমি তোমাদের মেজোবউ। আজ পনেরো বছরের পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি, আমার জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই চিঠিখানি লিখছি, এ তোমাদের মেজোবউয়ের চিঠি নয়।

তোমাদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কপালে যিনি লিখেছিলেন তিনি ছাড়া যখন সেই সম্ভাবনার কথা আর কেউ জানত না,সেই শিশুবয়সে আমি আর আমার ভাই একসঙ্গেই সান্নিপাতিক জ্বরে পড়ি। আমার ভাইটি মারা গেল, আমি বেঁচে উঠলুম। পাড়ার সব মেয়েরাই বলতে লাগল ,’মৃণাল মেয়ে কি না, তাই ও বাঁচল,বেটাছেলে হলে কি আর রক্ষা পেত?’ চুরিবিদ্যাতে যম পাকা, দামি জিনিসের পরেই তার লোভ।

আমার মরণ নেই। সেই কথাটাই ভালো করে বুঝিয়ে বলবার জন্যে এই চিঠিখানি লিখতে বসেছি।

যেদিন তোমাদের দূরসম্পর্কের মামা তোমার বন্ধু নীরদকে নিয়ে কনে দেখতে এলেন,তখন আমার বয়স বারো। দুর্গম পাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি, সেখানে দিনের বেলা শেয়াল ডাকে। স্টেশান থেকে সাত ক্রোশ স্যক্‌রা গাড়িতে এসে বাকি তিন মাইল কাঁচা রাস্তায় পালকি করে তবে আমাদের গাঁয়ে পৌঁছনো যায়। সেদিন তোমাদের কী হয়রানি। তার উপরে আমাদের বাঙাল দেশের রান্না — সেই রান্নার প্রহসন আজও মামা ভোলেন নি।

তোমাদের বড়োবউয়ের রূপের অভাব মেজবউকে দিয়ে পূরণ করবার জন্যে তোমার মায়ের একান্ত জিদ ছিল। নইলে এত কষ্ট করে আমাদের সে গাঁয়ে তোমরা যাবে কেন? বাংলাদেশে পিলে যকৃত অম্লশূল এবং কনের জন্যে তো কাউকে খোঁজ করতে হয় না — তারা আপনি এসে চেপে ধরে, কিছুতে ছাড়তে চায় না।

বাবার বুক দুর্‌দুর্‌ করতে লাগল,মা দুর্গানাম জপ করতে লাগলেন। শহরের দেবতাকে পাড়াগাঁয়ের পূজারি কী দিয়ে সন্তুষ্ট করবে। মেয়ের রূপের উপর ভরসা, কিন্তু, সেই রূপের গুমর তো মেয়ের মধ্যে নেই, যে ব্যক্তি দেখতে এসেছে সে তাকে যে-দামই দেবে সেই তার দাম। তাই তো হাজার রূপে গুণেও মেয়েমানুষের সংকোচ কিছুতে ঘোচে না।

সমস্ত বাড়ির, এমন-কি, সমস্ত পাড়ার এই আতঙ্ক আমার বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে বসল। সেদিনকার আকাশের যত আলো এবং জগতের সকল শক্তি যেন বারো বছরের একটি পাড়াগেঁয়ে মেয়েকে দুইজন পরীক্ষকের দুইজোড়া চোখের সামনে শক্ত করে তুলে ধরবার জন্যে পেয়াদাগিরি করছিল — আমার কোথাও লুকোবার জায়গা ছিল না।

সমস্ত আকাশকে কাঁদিয়ে দিয়ে বাঁশি বাজাতে লাগল — তোমাদের বাড়িতে এসে উঠলুম। আমার খুঁতগুলি সবিস্তারে খতিয়ে দেখেও গিন্নির দল সকলে স্বীকার করলেন, মোটের উপর আমি সুন্দরী বটে। সে কথা শুনে আমার বড়ো জায়ের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল । কিন্তু,আমার রূপের দরকার কী ছিল তাই ভাবি। রূপ-জিনিসটাকে যদি কোনো সেকেলে পন্ডিত গঙ্গামৃত্তিকা দিয়ে গড়তেন, তা হলে ওর আদর থাকত; কিন্তু,ওটা যে কেবল বিধাতা নিজের আনন্দে গড়েছেন, তাই তোমাদের ধর্মের সংসারে ওর দাম নেই।

আমার যে রূপ আছে, সে কথা ভুলতে তোমার বেশিদিন লাগে নি। কিন্তু, আমার যে বুদ্ধি আছে, সেটা তোমাদের পদে পদে স্মরণ করতে হয়েছে। ঐ বুদ্ধিটা আমার এতই স্বাভাবিক যে তোমাদের ঘরকন্নার মধ্যে এতকাল কাটিয়েও আজও সে টিঁকে আছে। মামার এই বুদ্ধিটার জন্যে বিষম উদ্‌বিগ্ন ছিলেন, মেয়েমানুষের পক্ষে এ এক বালাই । যাকে বাধা মেনে চলতে হবে, সে যদি বুদ্ধিকে মেনে চলতে চায় তবে ঠোকর খেয়ে তার কপাল ভাঙবেই। কিন্তু কী করব বলো। তোমাদের ঘরের বউয়ের যতটা বুদ্ধির দরকার বিধাতা অসতর্ক হয়ে আমাকে তার চেয়ে অনেকটা বেশি দিয়ে ফেলেছেন, সে আমি এখন ফিরিয়ে দিই কাকে। তোমরা আমাকে মেয়ে-জ্যাঠা বলে দুবেলা গাল দিয়েছে। কটু কথাই হচ্ছে অক্ষমের সান্ত্বনা; অতএব সে আমি ক্ষমা করলুম।

আমার একটা জিনিস তোমাদের ঘরকন্নার বাইরে ছিল, সেটা কেউ তোমরা জান নি। আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতুম। সে ছাইপাঁশ যাই হোক-না, সেখানে তোমাদের অন্দরমহলের পাঁচিল ওঠে নি। সেইখানে আমার মুক্তি; সেইখানে আমি আমি। আমার মধ্যে যা-কিছু তোমাদের মেজোবউকে ছাড়িয়ে রয়েছে, সে তোমরা পছন্দ কর নি,চিনতেও পার নি; আমি যে কবি, সে এই পনেরো বছরেও তোমাদের কাছে ধরা পড়ে নি।

তোমাদের ঘরের প্রথম স্মৃতির মধ্যে সব চেয়ে যেটা আমার মনে জাগছে সে তোমাদের গোয়ালঘর। অন্দরমহলের সিঁড়িতে ওঠবার ঠিক পাশের ঘরেই তোমাদের গোরু থাকে, সামনের উঠোনটুকু ছাড়া তাদের আর নড়বার জায়গা নেই। সেই উঠোনের কোণে তাদের জাব্‌না দেবার কাঠের গামলা। সকালে বেহারার নানা কাজ; উপবাসী গোরুগুলো ততক্ষণ সেই গামলার ধারগুলো চেটে চেটে চিবিয়ে চিবিয়ে খাব্‌লা করে দিত। আমার প্রাণ কাঁদত। আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে — তোমাদের বাড়িতে যেদিন নতুন এলুম সেদিন সেই দুটি গোরু এবং তিনটি বাছুরই সমস্ত শহরের মধ্যে আমার চিরপরিচিত আত্মীয়ের মতো আমার চোখে ঠেকল। যতদিন নূতন বউ ছিলুম নিজে না খেয়ে লুকিয়ে ওদের খাওয়াতুম; যখন বড়ো হলুম তখন গোরুর প্রতি আমার প্রকাশ্য মমতা লক্ষ করে আমার ঠাট্টার সম্পর্কীয়েরা আমার গোত্র সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগবেন।

আমার মেয়েটি জন্ম নিয়েই মারা গেল। আমাকেও সে সঙ্গে যাবার সময় ডাক দিয়েছিল। সে যদি বেঁচে থাকত তা হলে সেই আমার জীবনে যা-কিছু বড়ো, যা-কিছু সত্য সমস্ত এনে দিত; তখন মেজোবউ থেকে একেবারে মা হয়ে বসতুম। মা যে এক-সংসারের মধ্যে থেকেও বিশ্ব-সংসারের। মা হবার দুঃখটুকু পেলুম কিন্তু মা হবার মুক্তিটুকু পেলুম না ।

মনে অছে, ইংরেজ ডাক্তার এসে আমদের অন্দর দেখে আশ্চর্য্য হয়েছিল এবং আঁতুড়ঘর দেখে বিরক্ত হয়ে বকাবকি করেছিল। সদরে তোমাদের একটু বাগান আছে। ঘরে সাজসজ্জা আসবাবের অভাব নেই, আর,অন্দরটা যেন পশমের কাজের উলটো পিঠ; সেদিকে কোনো লজ্জা নেই, শ্রী নেই , সজ্জা নেই। সেদিকে আলো মিট্‌মিট্‌ করে জ্বলে; হাওয়া চোরের মতো প্রবেশ করে; উঠোনের আবর্জনা নড়তে চায় না; দেওয়ালের এবং মেজের সমস্ত কলঙ্ক অক্ষয় হয়ে বিরাজ করে। কিন্তু, ডাক্তার একটা ভুল করেছিল, সে ভেবেছিল, এটা বুঝি আমাদের অহোরাত্র দুঃখ দেয়। ঠিক উলটো অনাদর জিনিসটা ছাইয়ের মতো,সে ছাই আগুনকে হয়তো ভিতরে ভিতরে জমিয়ে রাখে কিন্তু বাইরে থেকে তার তাপটাকে বুঝতে দেয় না। আত্মসন্মান যখন কমে যায় তখন অনাদরকে তো অন্যায্য বলে মনে হয় না। সেইজন্যে তার বেদনা নেই। তাই তো মেয়েমানুষ দুঃখ বোধ করতেই লজ্জা পায়। আমি তাই বলি, মেয়েমানুষকে দুঃখ পেতেই হবে, এইটে যদি তোমাদের ব্যবস্থা হয়, তা হলে যতদূর সম্ভব তাকে অনাদরে রেখে দেওয়াই ভালো; আদরে দুঃখে ব্যাথাটা কেবল বেড়ে ওঠে।

যেমন করেই রাখ, দুঃখ যে আছে,এ কথা মনে করবার কথাও কোনোদিন মনে আসে নি। আঁতুড়ঘরে মরণ মাথার কাছে এসে দাঁড়াল,মনে ভয়ই হল না। জীবন আমাদের কীই-বা যে মরণকে ভয় করতে হবে? আদরে যত্নে যাদের প্রাণের বাঁধন শক্ত করেছে মরতে তাদেরই বাধে। সেদিন যম যদি আমাকে ধরে টান দিত তা হলে আলগা মাটি থেকে যেমন অতি সহজে ঘাসের চাপড়া উঠে আসে সমস্ত শিকড়সুদ্ধ আমি তেমনি করে উঠে আসতুম। বাঙালির মেয়ে তো কথায় মরতে যায়। কিন্তু, এমন মরায় বাহাদুরিটা কী। মরতে লজ্জা হয়; আমাদের পক্ষে ওটা এতই সহজ।

আমার মেয়েটি তো সন্ধ্যাতারার মতো ক্ষণকালের জন্যে উদয় হয়েই অস্ত গেল। আবার আমার নিত্যকর্ম এবং গোরুবাছুর নিয়ে পড়লুম। জীবন তেমনি করেই গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত কেটে যেত; আজকে তোমাকে এই চিঠি লেখবার দরকারই হত না। কিন্তু, বাতাসে সামান্য একটা বীজ উড়িয়ে নিয়ে এসে পাকা দালানের মধ্যে অশথগাছের অঙ্কুর বের করে; শেষকালে সেইটুকু থেকে ইঁটকাঠের বুকের পাঁজর বিদীর্ণ হয়ে যায়। আমার সংসারের পাকা বন্দোবস্তের মাঝখানে ছেটো একটুখানি জীবনের কণা কোথা থেকে উড়ে এসে পড়ল; তার পর থেকে ফাটল শুরু হল।

বিধবা মার মৃত্যুর পরে আমার বড়ো জায়ের বোন বিন্দু তার খুড়ততো ভাইদের অত্যাচারে আমাদের বাড়িতে তার দিদির কাছে এসে যেদিন আশ্রয় নিলে, তোমরা সেদিন ভাবলে, এ আবার কোথাকার আপদ। আমার পোড়া স্বভাব , কী করব বলো — দেখলুম, তোমরা সকলেই মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠেছ, সেইজন্যেই এই নিরাশ্রয় মেয়েটির পাশে আমার সমস্ত মন যেন একেবারে কোমর বেঁধে দাঁড়াল। পরের বাড়িতে পরের অনিচ্ছাতে এসে আশ্রয় নেওয়া — সে কতবড়ো অপমান। দায়ে পড়ে সেও যাকে স্বীকার করতে হল, তাকে কি এক পাশে ঠেলে রাখা যায়।

তার পরে দেখলুম আমার বড়ো জায়ের দশা। তিনি নিতান্ত দরদে পড়ে বোনটিকে নিজের কাছে এনেছেন। কিন্তু, যখন দেখলেন স্বামীর অনিচ্ছা, তখন এমনি ভাব করতে লাগলেন, যেন এ তাঁর এক বিষম বালাই , যেন একে দূর করতে পারলেই তিনি বাঁচেন। এই অনাথা বোনটিকে মন খুলে প্রকাশ্যে স্নেহ দেখালেন, সে সাহস তাঁর হল না। তিনি পতিব্রতা।

তাঁর এই সংকট দেখে আমার মন আরো ব্যথিত হয়ে উঠল। দেখলুম , বড়ো জা সকলকে একটু বিশেষ করে দেখিয়ে দেখিয়ে বিন্দুর খাওয়াপরার এমনি মোটারকমের ব্যবস্থা করলেন এবং বাড়ির সর্বপ্রকার দাসীবৃত্তিতে তাকে এমনভাবে নিযুক্ত করলেন যে আমার, কেবল দুঃখ নয়, লজ্জা বোধ হল। তিনি সকলের কাছে প্রমাণ করবার জন্যে ব্যস্ত যে, আমাদের সংসারে ফাঁকি দিয়ে বিন্দুকে ভারি সুবিধাদরে পাওয়া গেছে। ও কাজ দেয় বিস্তর, অথচ খরচের হিসাবে বেজায় সস্তা।

আমাদের বড়ো জায়ের বাপের বংশে কুল ছাড়া আর বড়ো কিছু ছিল না — রূপও না, টাকাও না। আমার শ্বশুরের হাতে পায়ে ধরে কেমন করে তোমাদের ঘরে তাঁর বিবাহ হল সে তো সমস্তই জান। তিনি নিজের বিবাহটাকে এ বংশের প্রতি বিষম একটা অপরাধ বলেই চিরকাল মনে জেনেছেন। সেইজন্যে সকল বিষয়েই নিজেকে যতদূর সম্ভব সংকুচিত করে তোমাদের ঘরে তিনি অতি অল্প জায়গা জুড়ে থাকেন।

কিন্তু, তাঁর এই সাধু দৃষ্টান্তে আমাদের বড়ো মুশকিল হয়েছে। আমি সকল দিকে আপনাকে অত অসম্ভব খাটো করতে পারি নে। আমি যেটাকে ভালো বলে বুঝি আর-কারো খাতিরে সেটাকে মন্দ বলে মেনে নেওয়া আমার কর্ম নয় — তুমিও তার অনেক প্রমাণ পেয়েছ ।

বিন্দুকে আমি আমার ঘরে টেনে নিলুম। দিদি বললেন, ‘মেজোবউ গরিবের ঘরের মেয়ের মাথাটি খেতে বসলেন।’ আমি যেন একটা বিপদ ঘটালুম, এমনি ভাবে তিনি সকলের কাছে নালিশ করে বেড়ালেন। কিন্তু, আমি নিশ্চয় জানি, তিনি মনে মনে বেঁচে গেলেন। এখন দোষের বোঝা আমার উপরেই পড়ল। তিনি বোনকে নিজে যে স্নেহ দেখাতে পারতেন না আমাকে দিয়ে সেই স্নেহটুকু করিয়ে নিয়ে তাঁর মনটা হালকা হল। আমার বড়ো জা বিন্দুর বয়স থেকে দু-চারটে অঙ্ক বাদ দিতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু, তার বয়স যে চোদ্দর চেয়ে কম ছিল না , এ কথা লুকিয়ে বললে অন্যায় হত না। তুমি তো জান, সে দেখতে এতই মন্দ ছিল যে পড়ে গিয়ে সে যদি মাথা ভাঙত তবে ঘরের মেজেটার জন্যেই লোকে উদ্‌বিগ্ন হত। কাজেই পিতা-মাতার অভাবে কেউ তাকে বিয়ে দেবার ছিল না, এবং তাকে বিয়ে করবার মতো মনের জোরই বা কজন লোকের ছিল।

বিন্দু বড়ো ভয়ে ভয়ে আমার কাছে এল। যেন আমার গায়ে তার ছোঁয়াচ লাগলে আমি সইতে পারব না। বিশ্বসংসারে তার যেন জন্মাবার কোনো শর্ত ছিল না; তাই সে কেবলই পাশ কাটিয়ে , চোখ এড়িয়ে চলত। তার বাপের বাড়িতে তার খুড়তুতো ভাইরা তাকে এমন একটু কোণও ছেড়ে দিতে চায় নি যে-কোন একটা অনাবশ্যক জিনিস পড়ে থাকতে পারে। অনাবশ্যক আবর্জনা ঘরের আশে-পাশে অনায়াসে স্থান পায়, কেননা মানুষ তাকে ভুলে যায়, কিন্তু অনাবশ্যক মেয়েমানুষ যে একে অনাবশ্যক আবার তার উপরে তাকে ভোলাও শক্ত, সেইজন্যে আঁস্তাকুড়েও তার স্থান নেই। অথচ বিন্দুর খুড়তুতো ভাইরা যে জগতে পরমাবশ্যক পদার্থ তা বলবার জো নেই। কিন্তু, তারা বেশ আছে।

তাই , বিন্দুকে যখন আমার ঘরে ডেকে আনলুম, তার বুকের মধ্যে কাঁপতে লাগল। তার ভয় দেখে আমার বড়ো দুঃখ হল। আমার ঘরে যে তার একটুখানি জায়গা আছে, সেই কথাটি আমি অনেক আদর করে তাকে বুঝিয়ে দিলুম।

কিন্তু, আমার ঘর শুধু তো আমারই ঘর নয়। কাজেই আমার কাজটি সহজ হল না। দু-চারদিন আমার কাছে থাকলেই তার গায়ে লাল-লাল কী উঠল, হয়তো সে ঘামাচি, নয় তো আর-কিছু হবে। তোমরা বললে বসন্ত। কেননা,ও যে বিন্দু। তোমাদের পাড়ায় এক আনাড়ি ডাক্তার এসে বললে আর দুই-একদিন না গেলে ঠিক বলা যায় না । কিন্তু সেই দুই-একদিনের সবুর সইবে কে। বিন্দু তো তার ব্যামোর লজ্জাতেই মরবার জো হল । আমি বললুম, বসন্ত হয় তো হোক, আমি আমাদের সেই আঁতুড়ঘরে ওকে নিয়ে থাকব, আর-কাউকে কিছু করতে হবে না। এই নিয়ে আমার উপরে তোমরা যখন সকলে মারমূর্তি ধরেছ, এমন-কি, বিন্দুর দিদিও যখন অত্যন্ত বিরক্তির ভান করে পোড়াকপালি মেয়েটাকে হাসপাতালে পাঠাবার প্রস্তাব করছেন, এমন সময় ওর গায়ে সমস্ত লাল দাগ একদম মিলিয়ে গেল। তোমরা দেখি তাতে আরো ব্যস্ত হয়ে উঠলে । বললে, নিশ্চয় বসন্ত বসে গিয়েছে। কেননা, ও যে বিন্দু ।

অনাদরে মানুষ হবার একটা মস্ত গুণ শরীরটাকে তাতে একেবারে অজর অমর করে তোলে। ব্যামো হতেই চায় না — মরার সদর রাস্তাগুলো একেবারেই বন্ধ। রোগ তাই ওকে ঠাট্টা করে গেল, কিছুই হল না। কিন্তু এটা বেশ বোঝা গেল, পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে অকিঞ্চিৎকর মানুষকে আশ্রয় দেওয়াই সব চেয়ে কঠিন। আশ্রয়ের দরকার তার যত বেশি আশ্রয়ের বাধাও তার তেমনি বিষম ।

আমার সম্বন্ধে বিন্দুর ভয় যখন ভাঙল তখন ওকে আর-এক গেরোয় ধরল। আমাকে এমনি ভালোবাসতে শুরু করলে যে, আমাকে ভয় ধরিয়ে দিলে। ভালোবাসার এরকম মূর্তি সংসারে তো কোনোদিন দেখি নি। বইয়েতে পড়েছি বটে, সেও মেয়ে পুরুষের মধ্যে । আমার যে রূপ ছিল সে কথা আমার মনে মরবার কোনো কারণ বহুকাল ঘটে নি — এতদিন পরে সেই রূপটা নিয়ে পড়ল এই কুশ্রী মেয়েটি। আমার মুখ দেখে তার চোখের আশ আর মিটত না। বলত, ‘দিদি, তোমার এই মুখখানি আমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় নি।’ যেদিন আমি নিজের চুল নিজে বাঁধতুম , সেদিন তার ভারি অভিমান। আমার চুলের বোঝা দুই হাত দিয়ে নাড়তে-চাড়তে তার ভারি ভালো লাগত। কোথাও নিমন্ত্রণে যাওয়া ছাড়া আমার সাজগোজের তো দরকার ছিল না । কিন্তু, বিন্দু আমাকে অস্থির করে রোজই কিছু না-কিছু সাজ করাত। মেয়েটা আমাকে নিয়ে একেবারে পাগল হয়ে উঠল।

তোমাদের অন্দরমহলে কোথাও জমি এক ছটাক নেই। উত্তরদিকের পাঁচিলের গায়ে নর্দমার ধারে কোনোগতিকে একটা গাবগাছ জন্মেছে। যেদিন দেখতুম সেই গাবের গাছের নতুন পাতাগুলি রাঙা টকটকে হয়ে উঠেছে, সেইদিন জানতুম, ধরাতলে বসন্ত এসেছে বটে। আমার ঘরকন্নার মধ্যে ঐ অনাদৃত মেয়েটার চিত্ত যেদিন আগা গোড়া এমন রঙিন হয়ে উঠল সেদিন আমি বুঝলুম হৃদয়ের জগতেও একটা বসন্তের হাওয়া আছে — সে কোন্‌ স্বর্গ থেকে আসে, গলির মোড় থেকে আসে না ।

বিন্দুর ভালোবাসার দুঃসহ বেগে আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। এক একবার তার উপর রাগ হত, সেকথা স্বীকার করি, কিন্তু তার এই ভালোবাসার ভিতর দিয়ে আমি আপনার একটি স্বরূপ দেখলুম যা আমি জীবনে আর কোনোদিন দেখি নি। সেই আমার মুক্ত স্বরূপ।

এদিকে, বিন্দুর মতো মেয়েকে আমি যে এতটা আদরযত্ন করছি, এ তোমাদের অত্যন্ত বাড়াবাড়ি বলে ঠেকল। এর জন্যে খুঁতখুঁত-খিটখিটের অন্ত ছিল না। যেদিন আমার ঘর থেকে বাজুবন্ধ চুরি গেল, সেদিন সেই চুরিতে বিন্দুর যে কোনোরকমের হাত ছিল, এ কথার আভাস দিতে তোমাদের লজ্জা হল না। যখন স্বদেশী হাঙ্গামায় লোকের বাড়িতল্লাসি হতে লাগল তখন তোমার অনায়াসে সন্দেহ করে বসলে যে, বিন্দুরা পুলিসের পোষা মেয়েচর। তার আর কোনো প্রমাণ ছিল না কেবল এই প্রমাণ যে,ও বিন্দু।

তোমাদের বাড়ির দাসীরা ওর কোনোরকম কাজ করতে আপত্তি করত — তাদের কাউকে ওর কাজ করবার ফরমাশ করলে, ও-মেয়েও একেবারে সংকোচে যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠত। এই-সকল কারণেই ওর জন্যে আমার খরচ বেড়ে গেল। আমি বিশেষ করে একজন আলাদা দাসী রাখলুম। সেটা তোমাদের ভালো লাগে নি। বিন্দুকে আমি যে-সব কাপড় পরতে দিতুম তা দেখে এত রাগ করেছিলে যে, আমার হাত-খরচের টাকা বন্ধ করে দিলে। তার পরদিন থেকে আমি পাঁচ-সিকে দামের জোড়া মোটা কোরা কলের ধুতি পরতে আরম্ভ করে দিলুম। আর, মতির মা যখন আমার এঁটো ভাতের থালা নিয়ে যেতে এল, তাকে বারণ করে দিলুম। আমি নিজে উঠোনের কলতলায় গিয়ে এঁটো ভাত বাছুরকে খাইয়ে বাসন মেজেছি। একদিন হঠাৎ সেই দৃশ্যটি দেখে তুমি খুব খুশি হও নি। আমাকে খুশি না করলেও চলে আর তোমাদের খুশি না করলেই নয় , এই সুবুদ্ধিটা আজ পর্যন্ত আমার ঘটে এল না।

এদিকে তোমাদের রাগও যেমন বেড়ে উঠেছে বিন্দুর বয়সও তেমনি বেড়ে চলেছে। সেই স্বাভাবিক ব্যাপারে তোমরা অস্বাভাবিক রকমের বিব্রত হয়ে উঠেছিল। একটা কথা মনে করে আমি আশ্চর্য হই, তোমরা জোর করে কেন বিন্দুকে তোমাদের বাড়ি থেকে বিদায় করে দাও নি। আমি বেশ বুঝি, তোমরা আমাকে মনে মনে ভয় কর। বিধাতা যে আমাকে বুদ্ধি দিয়েছিলেন, ভিতরে ভিতরে তার খাতির না করে তোমরা বাঁচ না।

অবশেষে বিন্দুকে নিজের শক্তিতে বিদায় করতে না পেরে তোমরা প্রজাপতি দেবতার শরণাপন্ন হলে। বিন্দুর বর ঠিক হল। বড়ো জা বললেন, ‘বাঁচলুম , মা কালী আমাদের বংশের মুখ রক্ষা করলেন।’

বর কেমন তা জানি নে;তোমাদের কাছে শুনলুম, সকল বিষয়েই ভালো। বিন্দু আমার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল; বললে, ‘দিদি আমার আবার বিয়ে করা কেন।’

আমি তাকে অনেক বুঝিয়ে বললুম, ‘বিন্দু, তুই ভয় করিস নে — শুনেছি, তোর বর ভালো।’

বিন্দু বললে, ‘বর যদি ভালো হয়, আমার কী আছে যে আমাকে তার পছন্দ হবে।’

বরপক্ষেরা বিন্দুকে তো দেখতে আসবার নামও করলে না। বড়দিদি তাতে বড়ো নিশ্চিন্ত হলেন।

কিন্তু, দিনরাত্রে বিন্দুর কান্না আর থামতে চায় না। সে তার কী কষ্ট, সে আমি জানি। বিন্দুর জন্যে আমি সংসারে অনেক লড়াই করেছি কিন্তু, ওর বিবাহ বন্ধ হোক এ কথা বলবার সাহস আমার হল না। কিসের জোরেই বা বলব। আমি যদি মারা যাই তো ওর কী দশা হবে। একে তো মেয়ে, তাতে কালো মেয়ে — কার ঘরে চলল, ওর কী দশা হবে, সে কথা না ভাবাই ভালো। ভাবতে গেলে প্রাণ কেঁপে ওঠে।

বিন্দু বললে, ‘দিদি, বিয়ের আর পাঁচদিন আছে, এর মধ্যে আমার মরণ হবে না কি।’

আমি তাকে খুব ধমকে দিলুম, কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি কোনো সহজভাবে বিন্দুর মৃত্যু হতে পারত তা হলে আমি আরাম বোধ করতুম।

বিবাহের আগের দিন বিন্দু তার দিদিকে গিয়ে বললে,’দিদি,আমি তোমাদের গোয়ালঘরে পড়ে থাকব, আমাকে যা বলবে তাই করব,তোমার পায়ে পড়ি আমাকে এমন করে ফেলে দিয়ো না।’

কিছুকাল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দিদির চোখ দিয়ে জল পড়ছিল, সেদিনও পড়ল। কিন্তু,শুধু হৃদয় তো নয়,শাস্ত্রও আছে। তিনি বললেন , ‘জানিস তো,বিন্দি,পতিই হচ্ছে স্ত্রীলোকের গতি মুক্তি সব। কপালে যদি দুঃখ থাকে তো কেউ খণ্ডাতে পারবে না।’

আসল কথা হচ্ছে,কোনো দিকে কোনো রাস্তাই নেই — বিন্দুকে বিবাহ করতেই হবে, তার পরে যা হয় তা হোক।

আমি চেয়েছিলুম,বিবাহটা যাতে আমাদের বাড়িতেই হয়। কিন্তু, তোমরা বলে বসলে,বরের বাড়িতেই হওয়া চাই — সেটা তাদের কৌলিক প্রথা।

আমি বুঝলুম, বিন্দুর বিবাহের জন্য যদি তোমাদের খরচ করতে হয়, তবে সেটা তোমাদের গৃহদেবতার কিছুতেই সইবে না। কাজেই চুপ করে যেতে হল। কিন্তু, একটি কথা তোমরা কেউ জান না। দিদিকে জানবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু জানাই নি, কেননা তা হলে তিনি ভয়েই মরে যেতেন — আমার কিছু কিছু গয়না দিয়ে আমি লুকিয়ে বিন্দুকে সাজিয়ে দিয়েছিলুম। বোধকরি দিদির চোখে সেটা পড়ে থাকবে,কিন্তু সেটা তিনি দেখেও দেখেন নি। দোহাই ধর্মের,সেজন্য তোমরা তাঁকে ক্ষমা কোরো।

যাবার আগে বিন্দু আমাকে জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দিদি, আমাকে তোমরা তা হলে নিতান্তই ত্যাগ করলে?’

আমি বললুম ‘না বিন্দি,তোর যেমন দশাই হোক-না কেন, আমি তোকে শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করব না ।’

তিন দিন গেল। তোমাদের তালুকের প্রজা খাবার জন্যে তোমাকে যে ভেড়া দিয়েছিল, তাকে তোমার জঠরাগ্নি থেকে বাঁচিয়ে আমি আমাদের একতলায় কয়লা-রাখবার ঘরের এক পাশে বাস করতে দিয়েছিলুম। সকালে উঠেই আমি নিজে তাকে দানা খাইয়ে আসতুম; তোমার চাকরদের প্রতি দুই-একদিন নির্ভর করে দেখেছি, তাকে খাওয়ানোর চেয়ে তাকে খাওয়ার প্রতিই তাদের বেশি ঝোঁক।

সেদিন সকালে সেই ঘরে ঢুকে দেখি, বিন্দু এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে । আমাকে দেখেই আমার পা জড়িয়ে ধরে লুটিয়ে পড়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল ।

বিন্দুর স্বামী পাগল।

‘সত্যি বলছিস, বিন্দি?’

‘এত বড়ো মিথ্যা কথা তোমার কাছে বলতে পারি, দিদি? তিনি পাগল। শ্বশুরের এই বিবাহে মত ছিল না — কিন্তু তিনি আমার শাশুড়িকে যমের মতো ভয় করেন। তিনি বিবাহের পূর্বেই কাশী চলে গেছেন। শাশুড়ি জেদ করে তাঁর ছেলের বিয়ে দিয়েছেন।’

আমি সেই রাশ-করা কয়লার উপরে বসে পড়লুম। মেয়েমানুষকে মেয়েমানুষ দয়া করে না। বলে,’ও তো মেয়েমানুষ বই তো নয়। ছেলে হোক-না পাগল, সে তো পুরুষ বটে।’

বিন্দুর স্বামীকে হঠাৎ পাগল বলে বোঝা যায় না, কিন্তু এক-একদিন সে এমন উন্মাদ হয়ে ওঠে যে, তাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে হয়। বিবাহের রাত্রে সে ভালো ছিল কিন্তু রাত-জাগা প্রভৃতি উৎপাতে দ্বিতীয় দিন থেকে তার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে উঠল। বিন্দু দুপুরবেলায় পিতলের থালায় ভাত খেতে বসেছিল,হঠাৎ তার স্বামী থালাসুদ্ধ ভাত টেনে উঠোনে ফেলে দিল। হঠাৎ কেমন তার মনে হয়েছে, বিন্দু স্বয়ং রানী রাসমণি; বেহারাটা নিশ্চয় সোনার থালা চুরি করে রাণীকে তার নিজের থালায় ভাত খেতে দিয়েছে। এই তার রাগ। বিন্দু তো ভয়ে মরে গেল। তৃতীয় রাত্রে শাশুড়ি তাকে যখন স্বামীর ঘরে শুতে বললে, বিন্দুর প্রাণ শুকিয়ে গেল। শাশুড়ি তার প্রচন্ড, রাগলে জ্ঞান থাকে না। সেও পাগল, কিন্তু পুরো নয় বলেই আরো ভয়ানক। বিন্দুকে ঘরে ঢুকতে হল। স্বামী সে রাত্রে ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু , ভয়ে বিন্দুর শরীর যেন কাঠ হয়ে গেল। স্বামী যখন ঘুমিয়েছে অনেক রাত্রে সে অনেক কৌশলে পালিয়ে চলে এসেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ লেখবার দরকার নেই।

ঘৃণায় রাগে আমার সকল শরীর জ্বলতে লাগল। আমি বললুম, ‘এমন ফাঁকির বিয়ে বিয়েই নয়। বিন্দু, তুই যেমন ছিলি তেমনি আমার কাছে থাক্‌, দেখি তোকে কে নিয়ে যেতে পারে।’

তোমরা বললে, ‘বিন্দু মিথ্যা কথা বলছে।’

আমি বললুম , ‘ও কখনো মিথ্যা বলে নি।’

তোমরা বললে, ‘কেমন করে জানলে।’

আমি বললুম,’আমি নিশ্চয় জানি।’

তোমরা ভয় দেখালে, ‘বিন্দুর শ্বশুরবাড়ির লোকে পুলিস-কেস করলে মুশকিলে পড়তে হবে।’

আমি বললুম,’ফাঁকি দিয়ে পাগল বরের সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়েছে এ কথা কি আদালত শুনবে না।’

তোমরা বললে,’তবে কি এই নিয়ে আদালত করতে হবে নাকি । কেন, আমাদের দায় কিসের ।’

আমি বললুম, ‘আমি নিজের গয়না বেচে যা করতে পারি করব ।’

তোমরা বললে,’উকিল বাড়ি ছুটবে নাকি ।’

এ কথার জবাব নেই । কপালে করাঘাত করতে পারি, তার বেশি আর কী করব ।

ওদিকে বিন্দুর শ্বশুড়বাড়ি থেকে ওর ভাসুর এসে বাইরে বিষম গোল বাধিয়েছে । সে বলছে, সে থানায় খবর দেবে ।

আমার যে কি জোর আছে জানি নে — কিন্তু কসাইয়ের হাত থেকে যে গরু প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে আমার আশ্রয় নিয়েছে তাকে পুলিসের তাড়ায় আবার মন মানতে পারল না । আমি স্পর্ধা করে বললুম,’তারা দিক্‌ থানায় খবর ।’

এই ব’লে মনে করলুম, বিন্দুকে এইবেলা আমার শোবার ঘরে এনে তাকে নিয়ে তালাবদ্ধ করে বসে থাকি । খোঁজ করে দেখি , বিন্দু নেই । তোমাদের সঙ্গে আমার বাদপ্রতিবাদ যখন চলছিল তখন বিন্দু আপনি বাইরে গিয়ে তার ভাসুরের কাছে ধরা দিয়েছে । বুঝেছি, এ বাড়িতে যদি সে থাকে তবে আমাকে সে বিষম বিপদে ফেলবে ।

মাঝখানে পালিয়ে এসে বিন্দু আপন দুঃখ আরও বাড়ালে । তার শাশুড়ির তর্ক এই যে। তার ছেলে তো ওকে খেয়ে ফেলছিল না । মন্দ স্বামীর দৃষ্টান্ত সংসারে দুর্লভ নয়, তাদের সঙ্গে তুলনা করলে তার ছেলে যে সোনার চাঁদ ।

আমার বড়ো জা বললেন, ‘ওর পোড়া কপাল, তা নিয়ে দুঃখ করে কী করব । তা পাগল হোক, ছাগল হোক, স্বামী তো বটে ।’

কুষ্টরোগীকে কোলে করে তার স্ত্রী বেশ্যার বাড়িতে নিজে পৌছে দিয়েছে, সতীসাধ্বীর সেই দৃষ্টান্ত, তোমাদের মনে জাগছিল; জগতের মধ্যে অধমতম কাপুরুষতার এই গল্পটা প্রচার করে আসতে তোমাদের পুরুষের মনে আজ পর্যন্ত একটুও সংকোচবোধ হয় নি, সেইজন্যই মানবজন্ম নিয়েও বিন্দুর ব্যবহারে তোমরা রাগ করতে পেরেছ, তোমাদের মাথা হেঁটে হয় নি । বিন্দুর জন্যে আমার বুক ফেটে গেল কিন্তু তোমাদের জন্যে আমার লজ্জার সীমা ছিল না । আমি তো পাড়াগেঁয়ে মেয়ে,তার উপরে তোমাদের ঘরে পড়েছি, ভগবান কোন্‌ ফাঁক দিয়ে আমার মধ্যে এমন বুদ্ধি দিলেন । তোমাদের এই-সব ধর্মের কথা আমি যে কিছুতেই সইতে পারলুম না ।

আমি নিশ্চয় জানতুম, মরে গেলেও বিন্দু আমাদের ঘরে আর আসবে না, কিন্তু আমি যে তাকে বিয়ের আগের দিন আশা দিয়েছিলুম যে, তাকে শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করব না। আমার ছোটো ভাই শরৎ কলকাতায় কলেজে পড়ছিল; তোমরা জানই তো যতরকমের ভলন্টিয়ারি করা,প্লেগের পাড়ার ইঁদুর মারা,দামোদরের বন্যায় ছোটা, এতেই তার এত উৎসাহ যে উপরি উপরি দুবার সে এফ.এ. পরীক্ষায় ফেল করেও কিছুমাত্র দমে যায় নি। তাকে আমি ডেকে বললুম,’বিন্দুর খবর যাতে আমি পাই তোকে সেই বন্দোবস্ত করে দিতে হবে, শরৎ। বিন্দু আমাকে চিঠি লিখতে সাহস করবে না, লিখলেও আমি পাব না।’

এরকম কাজের চেয়ে যদি তাকে বলতুম, বিন্দুকে ডাকাতি করে আনতে কিম্বা তার পাগল স্বামীর মাথা ভেঙে দিতে তা হলে বেশি খুশি হত।

শরতের সঙ্গে আলোচনা করছি এমন সময় তুমি ঘরে এসে বললে, ‘আবার কী হাঙ্গামা বাধিয়েছ।’

আমি বললুম, ‘সেই যা-সব গোড়ায় বাধিয়েছিলুম, তোমাদের ঘরে এসেছিলুম –কিন্তু সে তো তোমাদেরই কীর্তি।’

তুমি জিজ্ঞাসা করলে, ‘বিন্দুকে আবার এনে কোথাও লুকিয়ে রেখেছ?’

আকি বললুম,’বিন্দু যদি আসত তা হলে নিশ্চয় এনে লুকিয়ে রাখতুম। কিন্তু সে আসবে না, তোমাদের ভয় নেই ।’

শরৎকে আমার কাছে দেখে তোমার সন্দেহ আরো বেড়ে উঠল। আমি জানতুম, শরৎ আমাদের বাড়ি যাতায়াত করে, এ তোমরা কিছুতেই পছন্দ করতে না। তোমাদের ভয় ছিল, ওর ‘পরে পুলিসের দৃষ্টি আছে — কোন্‌ দিন ও কোন্‌ রাজনৈতিক মামলায় পড়বে, তখন তোমাদের সুদ্ধ জড়িয়ে ফেলবে। সেইজন্যে আমি ওকে ভাইফোঁটা পর্যন্ত লোক দিয়ে পাঠিয়ে দিতুম, ঘরে ডাকতুম না।

তোমার কাছে শুনলুম, বিন্দু আবার পালিয়েছে, তাই তোমাদের বাড়িতে তার ভাসুর খোঁজ করতে এসেছে। শুনে আমার বুকের মধ্যে শেল বিঁধল। হতভাগিনীর যে কী অসহ্য কষ্ট তা বুঝলুম অথচ কিছুই করবার রাস্তা নেই ।

শরৎ খবর নিতে ছুটল। সন্ধ্যার সময় ফিরে এসে আমাকে বললে, বিন্দু তার খুড়তুতো ভাইদের বাড়ি গিয়েছিল, কিন্তু তারা তুমুল রাগ করে তখনই আবার তাকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। এর জন্যে তাদের খেসারত এবং গাড়িভাড়া দন্ড যা ঘটেছে, তার ঝাঁজ এখনো তাদের মন থেকে মরে নি।

তোমাদের খুড়িমা শ্রীক্ষেত্রে তীর্থ করতে যাবেন বলে তোমাদের বাড়িতে এসে উঠেছেন। আমি তোমাদের বললুম, ‘আমিও যাব।’

আমার হঠাৎ এমন ধর্মে মন হয়েছে দেখে তোমরা এত খুশি হয়ে উঠলে যে, কিছুমাত্র আপত্তি করলে না। এ কথাও মনে ছিল যে,এখন যদি কলকাতায় থাকি তবে আবার কোন্‌ দিন বিন্দুকে নিয়ে ফ্যাসাদ বাধিয়ে বসব। আমাকে নিয়ে বিষম ল্যাঠা।

বুধবার আমাদের যাবার দিন, রবিবারে সমস্ত ঠিক হল। আমি শরৎকে ডেকে বললুম,’যেমন করে হোক, বিন্দুকে বুধবারে পুরী যাবার গাড়িতে তোকে তুলে দিতে হবে।’

শরতের মুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠল; সে বললে, ‘ভয় নেই, দিদি, আমি তাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে পুরী পর্যন্ত চলে যাব। — ফাঁকি দিয়ে জগন্নাথ দেখা হয়ে যাবে। ‘

সেইদিন সন্ধ্যার সময় শরৎ আবার এল। তার মুখ দেখেই আমার বুক দমে গেল। আমি বললুম,’কী,শরৎ? সুবিধা হল না বুঝি?’

সে বললে, না।’

আমি বললুম,’রাজি করতে পারলি নে? ‘

সে বললে,’আর দরকার নেই। কাল রাত্তিরে সে কাপড়ে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে মরেছে। বাড়ির যে ভাইপোটার সঙ্গে ভাব করে নিয়েছিলুম, তার কাছে খবর পেলুম, তোমার নামে সে একটা চিঠি রেখে গিয়েছিল, কিন্তু সে চিঠি ওরা নষ্ট করেছে।’

যাক, শান্তি হল।

দেশসুদ্ধ লোক চটে উঠল। বলতে লাগল,’মেয়েদের কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরা একটা ফ্যাশান হয়েছে।’

তোমরা বললে, ‘এ-সমস্ত নাটক করা।’ তা হবে। কিন্তু নাটকের তামাশাটা কেবল বাঙালি মেয়েদের উপর দিয়েই হয় কেন, আর বাঙালি বীরপুরুষদের কোঁচার উপর দিয়ে হয় না কেন, সেটাও তো ভেবে দেখা উচিত।

বিন্দিটার এমনি পোড়া কপাল বটে! যতদিন বেঁচে ছিল রূপে গুণে কোনো যশ পায় নি — মরবার বেলাও যে একটু ভেবে চিন্তে এমন একটা নতুন ধরনে মরবে যাতে দেশের পুরুষরা খুশি হয়ে হাততালি দেবে তাও তার ঘটে এল না। মরেও লোকদের চটিয়ে দিলে!

দিদি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে কাঁদলেন। কিন্তু সে কান্নার মধ্যে একটা সান্ত্বনা ছিল। যাই হোক্‌-না কেন, তবু রক্ষা হয়েছে, মরেছে বই তো না! বেঁচে থাকলে কী না হতে পারত।

আমি তীর্থে এসেছি। বিন্দুর আর আসবার দরকার হল না, কিন্তু আমার দরকার ছিল।

দুঃখ বলতে লোকে যা বোঝে তোমাদের সংসারে তা আমার ছিল না। তোমাদের ঘরে খাওয়া-পরা অসচ্ছল নয়;তোমার দাদার চরিত্র যেমন হোক, তোমার চরিত্রে এমন কোনো দোষ নেই যাতে বিধাতাকে মন্দ বলতে পারি। যদি বা তোমার স্বভাব তোমার দাদার মতোই হত তা হলে হয়তো মোটের উপর আমার এমনি ভাবেই দিন চলে যেত এবং আমার সতীসাধ্বী বড়ো জায়ের মতো পতিদেবতাকে দোষ না দিয়ে বিশ্বদেবতাকেই আমি দোষ দেবার চেষ্টা করতুম। অতএব তোমাদের নামে আমি কোনো নালিশ উত্থাপন করতে চাই নে — আমার এ চিঠি সেজন্যে নয়।

কিন্তু আমি আর তোমাদের সেই সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলিতে ফিরব না। আমি বিন্দুকে দেখেছি সংসারের মাঝখানে মেয়েমানুষের পরিচয়টা যে কী তা আমি পেয়েছি। আর আমার দরকার নেই ।

তার পরে এও দেখেছি, ও মেয়ে বটে তবু ভগবান ওকে ত্যাগ করেন নি। ওর উপরে তোমাদের যত জোরই থাক্‌-না কেন, সে জোরের অন্ত আছে। ও আপনার হতভাগ্য মানবজন্মের চেয়ে বড়ো। তোমরাই যে আপন ইচ্ছামতো আপন দস্তুর দিয়ে ওর জীবনটাকে চিরকাল পায়ের তলায় চেপে রেখে দেবে, তোমাদের পা এত লম্বা নয়। মৃত্যু তোমাদের চেয়ে বড়ো। সেই মৃত্যুর মধ্যে সে মহান — সেখানে বিন্দু কেবল বাঙালি ঘরের মেয়ে নয়, কেবল খুড়ততো ভায়ের বোন নয়, কেবল অপরিচিত পাগল স্বামীর প্রবঞ্চিত স্ত্রী নয়। সেখানে সে অনন্ত।

সেই মৃত্যুর বাঁশি এই বালিকার ভাঙা হৃদয়ের ভিতর দিয়ে আমার জীবনের যমুনাপারে যেদিন বাজল সেদিন প্রথমটা আমার বুকের মধ্যে যেন বাণ বিঁধল। বিধাতাকে জিজ্ঞাসা করলুম, জগতের মধ্যে যা-কিছু সব চেয়ে তুচ্ছ তাই সব চেয়ে কঠিন কেন? এই গলির মধ্যকার চারি-দিকে-প্রাচীর-তোলা নিরানন্দের অতি সামান্য বুদ্‌বুদটা এমন ভয়ংকর বাধা কেন। তোমার বিশ্বজগৎ তার ছয় ঋতুর সুধাপাত্র হাতে করে যেমন করেই ডাক দিক-না, এক মুহূর্তের জন্যে কেন আমি এই অন্দরমহলটার এইটুকু মাত্র চৌকাঠ পেরতে পারি নে। তোমার এমন ভুবনে আমার এমন জীবন নিয়ে কেন ঐ অতি তুচ্ছ ইটঁকাঠের আড়ালটার মধ্যেই আমাকে তিলে তিলে মরতেই হবে। কত তুচ্ছ আমার এই প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, কত তুচ্ছ এর সমস্ত বাঁধা নিয়ম, বাঁধা অভ্যাস, বাঁধা বুলি, এর সমস্ত বাঁধা মার — কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দীনতার নাগপাশ বন্ধনেরই হবে জিত — আর হার হল তোমার নিজের সৃষ্টি ঐ আনন্দলোকের?

কিন্তু মৃত্যুর বাঁশি বাজাতে লাগল — কোথায় রে রাজমিস্ত্রির গড়া দেয়াল, কোথায় রে তোমাদের ঘোরো আইন দিয়ে গড়া কাঁটার বেড়া; কোন্‌ দুঃখে কোন্‌ অপমানে মানুষকে বন্দী করে রেখে দিতে পারে! ঐ তো মৃত্যুর হাতে জীবনের জয়পতাকা উড়ছে! ওরে মেজোবউ, ভয় নেই তোর! তোর মেজবউয়ের খোলস ছিন্ন হতে এক নিমেষও লাগে না।

তোমাদের গলিকে আর আমি ভয় করি নে। আমার সম্মুখে আজ নীল সমুদ্র, আমার মাথার উপরে আষাঢ়ের মেঘপুঞ্জ।

তোমাদের অভ্যাসের অন্ধকারে আমাকে ঢেকে রেখে দিয়েছিলে। ক্ষণকালের জন্য বিন্দু এসে সেই আবরণের ছিদ্র দিয়ে আমাকে দেখে নিয়েছিল। সেই মেয়েটাই তার আপনার মৃত্যু দিয়ে আবরণখানা আগাগোড়া ছিন্ন করে দিয়ে গেল। আজ বাইরে এসে দেখি, আমার গৌরব রাখবার আর জায়গা নেই। আমার এই আনাদৃত রূপ যাঁর চোখে ভালো লেগেছে, সেই সুন্দর সমস্ত আকাশ দিয়ে আমাকে চেয়ে দেখছেন। এইবার মরেছে মেজোবউ।

তুমি ভাবছ আমি মরতে যাচ্ছি– ভয় নেই, অমন পুরোনো ঠাট্টা তোমাদের সঙ্গে আমি করব না। মীরাবাঈও তো আমারই মতো মেয়েমানুষ ছিল– তার শিকলও তো কম ভারী ছিল না তাকে তো বাঁচবার জন্যে মরতে হয় নি। মীরাবাঈ তার গানে বলেছিল,’ছাড়ুক বাপ, ছাড়ুক মা, ছাড়ুক যে যেখানে আছে, মীরা কিন্তু লেগেই রইল, প্রভু– তাতে তার যা হবার তা হোক।’ এই লেগে থাকাই তো বেঁচে থাকা। আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।

তোমাদের চরণতলাশ্রয়ছিন্ন–

মৃণাল।

nimantran

The Wife’s Letter

Most respected husband,
We have been married for fifteen years, yet I have never written a letter to you. I have always been with you, you have heard my words as I have heard yours, and a letter has never been needed between the two of us.

Today I have come to Srikshetra on a pilgrimage, and you have remained at work. Your relationship with Kolkata is like that of a snail within its shell, the city has become glued to your very body and soul. That is why you did not even apply for leave; God wanted it this way, he granted me leave.

I am the Mejo-Bou, the second daughter in law in your family. After fifteen years of that existence, as I stand beside the sea, I begin to understand that I have another identity, in my world and in the eyes of my maker. That is how I have had the courage to write this letter, I do not write this as your Mejo-Bou.

When I was a child and none but my destiny knew that I was to become part of your world, my brother and I both had typhoid. My brother died, I remained alive. All the local women said, “Mrinal has survived only because she is a girl, would she be here if she had been a boy?” Yama, the god of death, is an expert thief; he only takes things that are of some value.

I will not die so easily. I have started to write this letter to explain that.
That day when your uncle came with your friend Nirad to see me, I was twelve years old. Our village was so far from any town; the calls of jackals could be heard even during hours of daylight. They had to ride in a carriage for fourteen miles and then in a palanquin for the last three miles. It was an ordeal. Added to that was the rustic food that they were served at our house – your uncle still remembers that farce.
Your mother was very insistent that the lack of beauty in her eldest daughter-in-law was to be compensated for by the appearance of your wife. What else would have taken them to that remote village? In Bengal, one does not have to seek out afflictions of the liver, spleen and the digestive system or brides – they are plentiful, appear of their own free will and then do not let go easily.

My father was sick with worry, my mother called upon all her gods. How does a simple, rural offering satisfy the needs of an urban god? They had every belief in the allure of my beauty, but as I had no pride in that, it was only worth what the visitors from town would offer for it. That is why women remain unsure of themselves, even when they bear every outward sign of beauty.
The apprehension that I saw in my house and even amongst my neighbours felt like a weight upon my heart. It felt as though the whole world had conspired to hold me, a twelve year old from a village, up in front of the scrutiny of two pairs of eyes – I had nowhere to hide.

The day I came to your house, the whole sky seemed to weep in tune with the shehnai flute. Even after picking over every defect that I had in detail, the womenfolk decided that I was after all, beautiful. This caused my elder sister-in-law’s face to cloud over. But thinking back now, why did I need to be beautiful? If beauty was something that was shaped out of river clay by some ancient wise man, at least it would have a value, but beauty is something that God has created for his own amusement, that is why there is no real appreciation for it in the world of men.

It did not take you many days to forget that I was beautiful. But you were all reminded at every step that I was intelligent. This was so natural for me that it has survived in spite of all these years spent in the daily grind of life with your family. My mother had always worried about this intelligence. This is truly the bane of a woman’s life. The one who must be shackled will suffer more at every step, if she is confronted by her own intelligence. But what was I to do; fate had carelessly given me far more intelligence than was needed by a daughter-in-law in a family such as yours and who could I return that to? You and the others railed against me daily, calling me a ‘know it all’ at every opportunity. Harsh words are the sole consolation available to the inept, for this reason I have forgiven you.

There was one thing I did that was beyond the grasp of your comprehension; and I never let any of you find out about this. I used to write poetry in secret. Whatever the quality of those words may have been, it was not shaded by the narrow confines of your house. There lay my freedom. In that world, I could truly be myself. None of you knew that I was a poet for fifteen years; you would not have liked that part of me as it far exceeded my identity as the middle daughter-in-law.

The first memory I have of your family home is that of the cow shed. The cows were housed in a cramped space beside the stairs that led to the living quarters, unable to move around much within that courtyard. There was a wooden feeding trough in the corner of that courtyard. The servants were usually busy in the mornings and the famished cows would lick and chew on the edges of the trough in frustrated hunger. My heart wept for them. I was from a village and had formed a kinship with the two cows and three calves the very first day that I arrived. When I was a new wife, I fed them from my portions secretly. When I grew up, my very public compassion for the cattle caused my contemporaries to express doubts over my family background.

The daughter I had died soon after birth. She almost took me along with her. If she had lived she would have brought a touch of truth and the sublime to my life. I would have become a mother, not just a daughter-in-law. A mother may belong within the sphere of her own family but the world forever celebrates her as one at all times. I experienced the pain of becoming a mother but did not enjoy the freedom that came with it.

I remember that the British physician who came to attend on me had been horrified to see our inner quarters, and I recall his anger upon seeing the birthing room. Your family home has a small garden at the front. The living room where the public are welcomed is well furnished. The inner quarters on the other hand are like the reverse side of a piece of needlework; there is neither beauty nor order. There the lights burn dim, fresh air enters surreptitiously like a thief, piles of rubbish remain in the courtyard, and the floors and walls are stained by years of shame. But the physician had made a mistake; he had thought that perhaps, we women suffered because of these circumstances, day and night. The very opposite was in fact true; neglect is like the ash that conceals both the fire and its heat within. When self respect is gone, neglect ceases to feel like an evil; there is no sorrow any more. That is why women are ashamed to admit to feeling sad. That is why I say to your kind, if the intention is to give women pain, it is best to keep them in neglect as love will cause them to feel the pain more acutely.

No matter how badly I was treated, I never thought about unhappiness. In the birthing room, death came and stood near me. I felt no fear at all. What did I even have in life, that I would fear death? Those whose lives are anchored strongly in love and caring are the ones who fear to die. If death had called me that day, I would have released my hold on life as easily as a clump of grass pulls away from loose earth. Bengali women are always threatening to die. But where is the fulfillment in such death? I am ashamed to die; it is so easy for us.

My daughter lived a life as brief as the flicker of the evening star. I went back to my daily routine and the cows. Life would have continued along that path till the end; I would not have needed to write a letter at all. But sometimes the wind can blow in a tiny seed that lodges in a crack in the floor, grows into the seedling of a great tree and breaks the bonds of bricks and mortar. The same thing happened to me.

The day my elder sister-in-law’s younger sister Bindu came to our door for shelter after being abused by her cousin, you all thought, what a hassle! I was different; what can I say, I instantly felt a comradeship with this helpless girl when I saw the displeasure that you were feeling. To have to come to a stranger’s house for shelter in spite of their open disapproval – what a great disgrace that is. If she did have to submit to that, how could I cast her aside any further?

I also observed my sister-in-law’s situation. She had obviously brought Bindu out of love. But when she saw her husband’s ill will towards the girl, she began to behave as though Bindu was a burden that she could not wait to get rid of. She did not have the courage to love her orphaned sister openly. She was committed to being her husband’s wife.

My heart sank even more when I saw her plight. I noticed that my sister-in-law made very obviously inferior arrangements for Bindu’s food and board to show everyone where her loyalty was and asked her to perform the most menial of tasks. This filled me with sadness as well as shame. She was eager to prove to every one that Bindu’s arrival was a very good way of getting an extra pair of hands at little extra cost.

Their family had once been well known. They were not blessed with either good looks or wealth. You know the story about how they had pleaded with your father before the marriage could proceed. She herself thought of her marriage as a grave slight against your family. She was always careful to be invisible in the household.

But this became a problem for us. I cannot be submissive and invisible like that. You have had much proof of how I am unable to change what I believe to be right to comply with someone else’s opinions.

I took Bindu into my heart. My sister-in-law said that I was spoiling a poor man’s daughter. She complained to everyone as if I had created a big problem. I know for certain, she was secretly relieved. Now it would all be my fault. She also felt better as she was able to get me to show Bindu the compassion that she herself was unable to. She always tried to pass Bindu off as a couple of years younger than she was. But even though she was not a day younger than fourteen, it would have been hard to tell if her sister did lie. She was so plain that if she fell and hurt her head, people were more likely to come and tend to the floor. As a result, there was no one to organize her marriage in the absence of her parents and not many with the mental fortitude to take on the responsibility of marrying her.

Bindu came to me with much fear in her heart. It was as if I would not survive the shock of being touched by her. It was as if she knew that she had no right to be born and was intent in avoiding the world at all cost. It was as though she felt that she had no right to be born; she kept trying to avoid the world, staying out of sight. At home her uncle’s sons had not allowed her to have any space she could call her own if they could find another use for it. We allow unnecessary things to accumulate easily in our homes, but an unnecessary female is at once not needed and hard to ignore, hence even the rubbish tip does not accommodate her. And yet, it was not as if her cousins themselves were very important in the worldly scheme of things. But they are allowed to exist.

This is why when I called Bindu to my quarters she trembled inwardly with fear. This made me very sad and I convinced her with much love that she was entitled to her own space within my room.

But my room was not just mine. Hence the job was not very easy. After a couple of days, a red rash appeared on her skin, possibly a reaction to the heat, possibly something else. You all said it was small pox. It would have to be, seeing it was Bindu. A local quack came and said it would be hard to tell unless a couple of days passed. But why wait a couple of days? Bindu was dying of shame anyway due to the drama surrounding her illness. I said, ‘If it is smallpox, let it be so, I will stay with her in the birthing room, no one else will have to do a thing for her.’ Just as you were all growing infuriated with me over this stance and even Bindu’s sister was pretending to be greatly annoyed with her, going to the extent of suggesting a hospital visit, the rash disappeared completely. You were all even more distraught over this. You declared that the pox had gone dormant. Of course, it would have to be, seeing it was Bindu.

A wonderful thing about being raised in neglect is that it makes the body completely indifferent to the wear and tear of life giving it a kind of immortality. Illness does not come near – all the roads leading to death are blocked off. This is why the malady teased her, but nothing happened. But it became quite evident that it was hardest to give shelter to the most unnecessary person on the face of the earth. The obstacles to shelter are greatest where it is most needed.

When Bindu got over her fear of me, she had another problem to contend with. She started loving me with such intensity that she frightened me. I had never seen this face of love before. I had read about it, but that was between man and woman. I had not had reason to dwell on my own looks in ages – but this plain girl reminded me of it after all this time. She could look at me for hours. She would say, ‘Sister, no one has looked at you like I have.’ The days that I did my own hair, she would be very disappointed. She loved to play with my hair, running her hands through its length. I did not need to get dressed up unless there was an invitation to go out. But Bindu pestered me each day to do something special with my appearance. She grew quite obsessed with me.

There is not an extra inch of spare land inside your house. A Gab tree has taken hold somehow near the northern boundary wall next to the drains. The day that I would see the new leaves on the tree unfurl red and bright, I would know that spring had arrived on earth. When I saw that neglected girl blossom like that tree I knew that even the mind can have a spring awakening – it arrives from the heavens and not from the dusty stretches of road.

The unbearable intensity of Bindu’s love disturbed my composure. I would get angry with her at times, I admit, but I saw the real me through her love that I had never seen before in my life. That was the natural me.

The fact that I was showering so much affection and care on a girl like Bindu felt excessive to you. There was no end to bickering over this. The day that a costly bangle went missing from my room, you did not feel ashamed to allege that Bindu was sure to have a hand somehow in its disappearance. When the police came to look from door to door inn search of revolutionaries fighting against the British, you were easily able to say that Bindu was a female police informer. There was no proof of that except for the fact that she was Bindu.
The maids in the household refused to do any of her work – if I asked them to do things for her – Bindu froze with embarrassment. My expenses went up for these reasons. I employed a maid just for her. You did not like that. You were so annoyed when you saw the clothes I gave her to wear that you stopped my allowance. The next day I got a few cheap clothes and started wearing them. When Moti’s mother, the maid came to clear my dirty dishes away, I told her not to. I washed my own dishes after feeding the calf the leftover rice. You were not exactly happy after seeing this accidentally one day. I still have not grasped the idea that it is fine for you to thwart my wishes but it is not alright for me to make you unhappy.

In the meantime just as your anger was increasing, Bindu’s age was increasing too. You grew unnaturally agitated over what was after all a natural event. I am amazed at why you did not forcefully drive Bindu out of your house. I know quite well that you all secretly fear me. Within your mind you respect the intelligence that I was given by my fate.

Eventually having failed to drive Bindu away with your strength you decided to invoke the gods for assistance. A groom was found. My sister in law said, ‘We are saved, Ma Kali has rescued our family.’

I did not know what the groom was like, I heard from you all, everything was alright. Bindu clung to my feet, crying, ‘Sister, why do I need to get married?’

I explained to her at length, I said, ‘Bindu, never fear – I have heard he is a good man.’

Bindu said, ‘If he is good, what do I have that he will like me.’

The groom’s family made no mention of coming to see her. Her sister was very reassured by this.

But Bindu would not stop crying continually. I know how she suffered. I had fought many battles for her, but I could not bring myself to say that the marriage should not take place. Where was the strength that would allow me to do that! If I died what would happen to her? As it was, she was a girl, and a dark girl at that – who was marrying her, what was to become of her, these things were best left alone. My heart trembled when I thought of them.

Bindu said, ‘Sister, there are five more days till the wedding, perhaps I could die before that.’

I scolded her but only I know that if she could have died painlessly I would have been pleased.

The day before the wedding Bindu went to her sister and said, ‘Sister, I will sleep in the cowshed, I will do whatever you tell me to, I am begging you, please do not cast me aside.’

Her sister had been shedding tears in secret for a few days, she wept again that day. But the heart is not all, we have our traditions too. She said, ‘You know this, Bindi, a husband is salvation for a woman. Who can prevent misfortune if that is your destiny?’

The main thing was, there was no way out in any direction – Bindu must marry, let whatever happens afterwards take place.

I had wanted the marriage to take place in our house. But you all said that it had to take place in the groom’s house, it was their family tradition.

I understood that if you had to spend money for her wedding, it would go against the will of your guardian spirit. And thus I had to be quiet. But none of you knew one thing. I wanted to let my sister in law know but I did not, because she would have died of fright – I had secretly dressed Bindu in some of my ornaments. Possibly she did notice, but she pretended not to. Please, in the name of God, forgive her for that.

Before she left, Bindu clung to me and said, ‘Sister, you are then all abandoning me?’

I said, ‘No Bindi, whatever happens to you, I will not abandon you till the end.’

Three days passed. I had saved the sheep that your tenants had given to you for slaughter from the pot and reared it by hand. Each day I fed it myself after waking up in the morning; I had given this duty to some of the domestic help but it was amply clear that they were more interested in eating the animal rather than feeding it.

That day I went into that room and found Bindu huddled in one corner. As soon as she saw me, she clung to my feet and lay there crying quietly.

Her husband had turned out to be insane.

‘Are you telling the truth, Bindi?’

‘How would I say such a lie to you Sister? My father in law was against the marriage but he fears my mother in law more than death. He went away to Kashi before the wedding in order to not have to face it. She forcibly went ahead with the wedding.’

I sat down heavily on the heaped coal. Women do not feel for women. They can glibly say, ‘She is just a woman. Why not my son, even if he is insane, he is after all a man.’

Bindu’s husband does not seem insane on first sight. But some days he grows so wild that he has to be locked in his room. He was fine on the wedding night but the next night the effects of staying awake and other things made him lose his mind completely. Bindu had sat down to have her lunch on a brass plate, he came and took her plate and threw the food away. For some reason he was convinced that Bindu was a queen and that the servants had stolen her golden plate and given her one of theirs. This was the cause of his anger. Bindu was frightened to death. When her mother in law asked her to sleep with her husband on the third night, she was petrified. The woman is capable of violent rages; she loses all sense when angered. She too is insane but not completely so and hence all the more dangerous. Bindu had to go into the room. Her husband was calm that night. But Bindu was paralysed with fear. When he fell asleep late at night, she managed to escape with great difficulty. There is little need to describe all that here.

I was burning up with abhorrence and anger. I said, ‘A marriage contrived by trickery is no marriage at all. Bindu, you stay with me like you used to, I will see what people can do about that.’

You all said, ‘She is lying.’

I said, ‘She has never lied.’

You all said, ‘How do you know?’

I said, ‘I just do.’

You tried to scare me, ‘If her in laws file a case, there will be trouble.’

I said, ‘Will the courts not pay attention to the fact that her marriage was organized by deceit?’

You all said, ‘Will we now have to go to the courts with this matter? What is it to us?’

I said, ‘I will sell my ornaments to raise the money needed.’

You said, ‘Will you go to the lawyer after that as well?’

I had no reply to this. I could only curse my luck, what else could I do.

Bindu’s brother in law had arrived in the meantime and was creating a big fuss. He said that he was going to report matters to the police.

I do not know where I find the strength from – but I could not abandon the poor living thing that had come to me seeking shelter from slaughter to the hands of the police. I challenged you and said, ‘Let them go to the police.’

I then thought I would take Bindu to my room and lock the door while I sat with her inside. When I looked for her, she was nowhere to be found. While I was arguing with you she had gone outside and surrendered to her brother in law. I understood that she knew that she would land me in great danger if she stayed in this house.

The consequence of running away was that Bindu increased her own pain. Her mother in law argued saying it was not as if her son was going to kill her up or anything. There were many examples of bad husbands in the world, in comparison her son was an angel.

My sister in law said, ‘She is ill fated, what is the point in worrying about her? Barking mad he may be, he is still her husband.’

You remembered aloud glorious examples of devotion: the saintly wife who had carried her leprous husband to a brothel for his pleasure; it was little wonder that men who have been narrating this tale of the utmost selfish cowardice without qualms for ages were now able to vent their anger on Bindu without feeling a thing. My heart was breaking for her but for you people my shame knew no bounds. I was but a village girl whose fate had landed her in a family like yours; how did god give me such intelligence. I could not bear such wise words from you.

I knew for sure that even if Bindu was dying, she would not come to our house again, but I had given her hope till the day before her wedding that I would not abandon her in the end. My younger brother Sarat was studying in Kolkata, you know how he was, volunteering himself for everything, eradicating vermin during outbreaks of plague, helping with flood relief, these kept him so happy that he was unconcerned by failing twice in his course. I called him and said, ‘You have to help me get news about Bindu somehow. She will never dare to write to me, and I will never receive them even if she does.’

If I had told him instead to abduct Bindu or perhaps smash her insane husband’s head into a pulp he would have been happier.

As I talked to him you came into the room and said, ‘What have you done now!’

I said, ‘I did something wrong right at the beginning when I came into your family – but that was all your doing.’

You asked, ‘Have you brought Bindu here again and hidden her somewhere?’

I said, ‘If she came I would have hidden her. But she will not come, you have nothing to fear.’

When you saw Sarat with me your suspicions increased much more. I knew that you had never been able to accept the fact that Sarat came to our house. Your fear was that ‘the police were watching him – one of these days he would get involved in some political situation, then you would all become involved. That is why even on Brother’s Days, I had to send him my wishes via another person, I never invited him.
I heard from you that Bindu had run away again, that was why her brother in law had come to our house to look for her. My heart sank when I heard that. I could understand her extreme anguish but there was nothing that I could do.

Sarat went to see if he could find out anything. In the evening he came back and said to me, Bindu had gone to her cousin’s house but they had grown furious and taken her home immediately. They were still fuming over the money and time that they had spent over the business.

Your aunt had come to your house on her way to Puri on a pilgrimage. I told you, ‘I want to go too.’

You were all so happy that I was suddenly gripped by religion that you did not say no at all. It was also apparent to you that I might create a problem over Bindu if I remained in Kolkata. I was a great liability.

Everything was arranged on Sunday; we would leave on Wednesday. I called Sarat and said to him, ‘Do whatever you have to, but you have to get Bindu on to that train to Puri.’

Sarat’s face broke into smiles, he said, ‘Never fear, sister, I will put her on the train and go all the way to Puri. It will be a chance to see the temple again.’

That evening Sarat came again. As soon as I saw his face my heart sank. I said, ‘How did you go Sarat? You could not get her to come?’

He said, ‘No.’

I said, ‘Could you not convince her?’
He said, ‘There is no more need. Last night she set herself on fire and died. The nephew I had made friends with said she left a letter for you, but they destroyed that letter when they found it.

Finally, peace.

Everyone was outraged. They kept saying, ‘These days it has become fashionable for women to set fire to themselves.’

You all said, ‘This is all a farce.’ That could be; yet why this farce is only enacted upon the clothing of the Bengali women and never on those of their brave men, that too needs some thought.

Bindi was so unlucky. As long as she was alive, she had never had any compliments for her looks or other qualities – when she died she neglected to put some thought into finding a new process of dying that would make her countrymen applaud in delight – even her dying angered people.

Her sister hid in her room and wept. But there was a sense of consolation in those tears. What ever had happened, it was a respite, it was not as if she had done any worse than die. What good would have happened if she had lived?

I have come on a pilgrimage. Bindu did not need to come anymore, but I did.

I did not have what people might understand to be sorrow in your household. The food and clothing was of a standard that was comfortable, you did not have any character traits that would make me call my Fate cursed in any way. If your nature had been like your brother’s, I would probably have passed my days like this and like his wife, placed the blame on the one responsible for husbanding the universe rather than on my own husband. That is why I do not wish to lay any complaints against you – that is not why I write this letter.
But I will not go back to your house at No 27 Makhan Boral Lane. I have seen Bindu and the way women are viewed in life. I do not need to see any more.

I have also seen that even although she was a woman, God did not abandon her. What ever power you all had over her was finite. She was greater than her accursed human life. You do not have the reach to crush her life for eternity under your feet as your will demands. Death is greater than you. There in the embrace of Death, Bindu is not just a girl from a Bengali family, not just an ill treated cousin sister nor a betrayed wife of an insane man that we knew nothing about. There she is eternal.

The day that Death played his flute for the first time on the banks of the Yamuna of my life through the pain of that child’s broken heart; at first it pierced my soul. I asked my Fate why it was that the most ordinary of things was the hardest. Why did a tiny bubble of discontent spawned within the walled confines of this lane to become such an obstacle? No matter how much your vast world beckons with the intoxicating beauty of its six seasons, why can I not cross that little threshold and step outside? Why do I have to spend this amazing gift of life within this wonderful world of yours behind such an insignificant hurdle, dying a little at a time as I must? How very contemptible is my daily life, how insignificant its routines, its habits, its rituals, its utterances, and even its deprivations – but still in the end, why must the serpentine coils of those restrictions win – and this world of happiness that you have created lose?

But the flute sang to me – where do these walls built by masons, where do the barbed wires of your domestic rules, what sorrow or insult has ever imprisoned the human spirit. Look, there flies the pennant of Life in the grasp of Death. Mejo Bou, have no fear. It does not take a moment to shed the husk of your existence as a second daughter in law.

I do not fear your lane any more. Before me stretches the blue ocean and above me a lies a sky full of rain clouds.

The darkness of your customs had covered me. For a short while Bindu came and saw my worth through a rent in that cloak. She tore it off completely with her own death. Today I step outside to find there is hardly room enough to contain my pride. The Beautiful one who has liked this unloved form of mine surrounds me with his gaze from the skies above. Now Mejo Bou, the second daughter in law, has died.

You think I am going to die, never fear, I would not dream of playing that old trick on you. Meerabai was a woman just like me – the chains that bound her were heavy indeed and yet she did not have to die in order to be released. She said in her song, ‘Let my father forsake me, let my mother, let everyone give up, but Meera stays with you. Lord Krishna – come what may.’
This staying on is what surviving is. I too will survive. I have survived.

Sincerely

The one who is no more in need of shelter at your feet,
Mrinal.

Follow the link to hear Lopa Banerjee recite: http://www.youtube.com/watch?v=NnLcTb9uXnc&list=UUOzOspca2ubNe31VpUWNbvQ&feature=share&index=7