Tag Archive | Rabindranath Tagore’s novels

চোখের বালি ১৬/ Chokher Bali 16

১৬

বিহারী ভাবিল, “আর দূরে থাকিলে চলিবে না, যেমন করিয়া হউক, ইহাদের মাঝখানে আমাকেও একটা স্থান লইতে হইবে। ইহাদের কেহই আমাকে চাহিবে না, তবু আমাকে থাকিতে হইবে।’

বিহারী আহ্বান-অভ্যর্থনার অপেক্ষা না রাখিয়াই মহেন্দ্রের ব্যুহের মধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল। বিনোদিনীকে কহিল, “বিনোদ-বোঠান, এই ছেলেটিকে ইহার মা মাটি করিয়াছে, বন্ধু মাটি করিয়াছে, স্ত্রী মাটি করিতেছে– তুমিও সেই দলে না ভিড়িয়া একটা নূতন পথ দেখাও– দোহাই তোমার।”

মহেন্দ্র। অর্থাৎ–

বিহারী। অর্থাৎ আমার মতো লোক, যাহাকে কেহ কোনোকালে পোঁছে না–

মহেন্দ্র। তাহাকে মাটি করো। মাটি হইবার উমেদারি সহজ নয় হে বিহারী, দরখাস্ত পেশ করিলেই হয় না।

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “মাটি হইবার ক্ষমতা থাকা চাই, বিহারীবাবু।”

বিহারী কহিল, “নিজগুণ না থাকিলেও হাতের গুণে হইতে পারে। একবার প্রশ্রয় দিয়া দেখোই-না।”

বিনোদিনী। আগে হইতে প্রস্তুত হইয়া আসিলে কিছু হয় না, অসাবধান থাকিতে হয়। কী বল, ভাই চোখের বালি। তোমার এই দেওরের ভার তুমিই লও-না, ভাই।

আশা তাহাকে দুই অঙ্গুলি দিয়া ঠেলিয়া দিল। বিহারীও এ ঠাট্টায় যোগ দিল না।

আশার সম্বন্ধে বিহারী কোনো ঠাট্টা সহিবে না, এটুকু বিনোদিনীর কাছে এড়াইতে পারে নাই। বিহারী আশাকে শ্রদ্ধা করে এবং বিনোদিনীকে হালকা করিতে চায়, ইহা বিনোদিনীকে বিঁধিল।

সে পুনরায় আশাকে কহিল, “তোমার এই ভিক্ষুক দেওরটি আমাকে উপলক্ষ করিয়া তোমারই কাছে আদর ভিক্ষা করিতে আসিয়াছে– কিছু দে, ভাই।”

আশা অত্যন্ত বিরক্ত হইল। ক্ষণকালের জন্য বিহারীর মুখ লাল হইল, পরক্ষণেই হাসিয়া কহিল, “আমার বেলাতেই কি পরের উপর বরাত চালাইবে, আর মহিনদার সঙ্গেই নগদ কারবার!”

বিহারী সমস্ত মাটি করিতে আসিয়াছে, বিনোদিনীর ইহা বুঝিতে বাকি রহিল না। বুঝিল, বিহারীর সম্মুখে সশস্ত্রে থাকিতে হইবে।

মহেন্দ্র বিরক্ত হইল। খোলসা কথায় কবিত্বের মাধুর্য নষ্ট হয়। সে ঈষৎ তীব্র স্বরেই কহিল, “বিহারী, তোমার মহিনদা কোনো কারবারে যান না– হাতে যা আছে, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট।”

বিহারী। তিনি না যেতে পারেন, কিন্তু ভাগ্যে লেখা থাকিলে কারবারের ঢেউ বাহির হইতে আসিয়াও লাগে।

বিনোদিনী। আপনার উপস্থিত হাতে কিছুই নাই, কিন্তু আপনার ঢেউটা কোন্‌ দিক হইতে আসিতেছে!–বলিয়া সে সকটাক্ষহাস্যে আশাকে টিপিল। আশা বিরক্ত হইয়া উঠিয়া গেল। বিহারী পরাভূত হইয়া ক্রোধে নীরব হইল; উঠিবার উপক্রম করিতেই বিনোদিনী কহিল, “হতাশ হইয়া যাবেন না, বিহারীবাবু। আমি চোখের বালিকে পাঠাইয়া দিতেছি।”

বিনোদিনী চলিয়া যাইতেই সভাভঙ্গে মহেন্দ্র মনে মনে রাগিল। মহেন্দ্রের অপ্রসন্ন মুখ দেখিয়া বিহারীর রুদ্ধ আবেগ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। কহিল, “মহিনদা, নিজের সর্বনাশ করিতে চাও, করো– বরাবর তোমার সেই অভ্যাস হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু যে সরলহৃদয়া সাধ্বী তোমাকে একান্ত বিশ্বাসে আশ্রয় করিয়া আছে, তাহার সর্বনাশ করিয়ো না। এখনো বলিতেছি, তাহার সর্বনাশ করিয়ো না।”

বলিতে বলিতে বিহারীর কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল।

মহেন্দ্র রুদ্ধরোষে কহিল, “বিহারী, তোমার কথা আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। হেঁয়ালি ছাড়িয়া স্পষ্ট কথা কও।”

বিহারী কহিল, “স্পষ্টই কহিব। বিনোদিনী তোমাকে ইচ্ছা করিয়া অধর্মের দিকে টানিতেছে এবং তুমি না জানিয়া মূঢ়ের মতো অপথে পা বাড়াইতেছ।”

মহেন্দ্র গর্জন করিয়া উঠিয়া কহিল, “মিথ্যা কথা। তুমি যদি ভদ্রলোকের মেয়েকে এমন অন্যায় সন্দেহের চোখে দেখ, তবে অন্তঃপুরে তোমার আসা উচিত নয়।”

এমন সময় একটি থালায় মিষ্টান্ন সাজাইয়া বিনোদিনী হাস্যমুখে তাহা বিহারীর সম্মুখে রাখিল। বিহারী কহিল, “এ কী ব্যাপার। আমার তো ক্ষুধা নাই।”

বিনোদিনী কহিল, “সে কি হয়। একটু মিষ্টমুখ করিয়া আপনাকে যাইতেই হইবে।”

বিহারী হাসিয়া কহিল, “আমার দরখাস্ত মঞ্জুর হইল বুঝি। সমাদর আরম্ভ হইল।”

বিনোদিনী অত্যন্ত টিপিয়া হাসিল; কহিল, “আপনি যখন দেওর তখন সম্পর্কের যে জোর আছে। যেখানে দাবি করা চলে সেখানে ভিক্ষা করা কেন। আদর যে কাড়িয়া লইতে পারেন। কী বলেন মহেন্দ্রবাবু।”

মহেন্দ্রবাবুর তখন বাক্যস্ফূর্তি হইতেছিল না।

বিনোদিনী। বিহারীবাবু, লজ্জা করিয়া খাইতেছেন না, না রাগ করিয়া? আর-কাহাকেও ডাকিয়া আনিতে হইবে?

বিহারী। কোনো দরকার নাই। যাহা পাইলাম তাহাই প্রচুর।

বিনোদিনী। ঠাট্টা? আপনার সঙ্গে পারিবার জো নাই। মিষ্টান্ন দিলেও মুখ বন্ধ হয় না।

রাত্রে আশা মহেন্দ্রের নিকটে বিহারী সম্বন্ধে রাগ প্রকাশ করিল– মহেন্দ্র অন্য দিনের মতো হাসিয়া উড়াইয়া দিল না– সম্পূর্ণ যোগ দিল।

প্রাতঃকালে উঠিয়াই মহেন্দ্র বিহারীর বাড়ি গেল। কহিল, “বিহারী, বিনোদিনী হাজার হউক ঠিক বাড়ির মেয়ে নয়– তুমি সামনে আসিলে সে যেন কিছু বিরক্ত হয়।”

বিহারী কহিল, “তাই না কি। তবে কাজটা ভালো হয় না। তিনি যদি আপত্তি করেন, তাঁর সামনে নাই গেলাম।”

মহেন্দ্র নিশ্চিন্ত হইল। এত সহজে এই অপ্রিয় কার্য শেষ হইবে, তাহা সে মনে করে নাই। বিহারীকে মহেন্দ্র ভয় করে।

সেইদিনই বিহারী মহেন্দ্রের অন্তঃপুরে গিয়া কহিল, “বিনোদ-বোঠান, মাপ করিতে হইবে।”

বিনোদিনী। কেন, বিহারীবাবু।

বিহারী। মহেন্দ্রের কাছে শুনিলাম, আমি অন্তঃপুরে আপনার সামনে বাহির হই বলিয়া আপনি বিরক্ত হইয়াছেন। তাই ক্ষমা চাহিয়া বিদায় হইব।

বিনোদিনী। সে কি হয়, বিহারীবাবু। আমি আজ আছি কাল নাই, আপনি আমার জন্যে কেন যাইবেন। এত গোল হইবে জানিলে আমি এখানে আসিতাম না।

এই বলিয়া বিনোদিনী মুখ ম্লান করিয়া যেন অশ্রুসংবরণ করিতে দ্রুতপদে চলিয়া গেল।

বিহারী ক্ষণকালের জন্যে মনে করিল, “মিথ্যা সন্দেহ করিয়া আমি বিনোদিনীকে অন্যায় আঘাত করিয়াছি।’

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় রাজলক্ষ্মী বিপন্নভাবে আসিয়া কহিলেন, “মহিন, বিপিনের বউ যে বাড়ি যাইবে বলিয়া ধরিয়া বসিয়াছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “কেন মা, এখানে তাঁর কি অসুবিধা হইতেছে।”

রাজলক্ষ্মী। অসুবিধা না। বউ বলিতেছে, তাহার মতো সমর্থবয়সের বিধবা মেয়ে পরের বাড়ি বেশি দিন থাকিলে লোকে নিন্দা করিবে।

মহেন্দ্র ক্ষুদ্ধভাবে কহিল, “এ বুঝি পরের বাড়ি হইল?”

বিহারী বসিয়া ছিল– মহেন্দ্র তাহার প্রতি ভর্ৎসনাদৃষ্টি নিক্ষেপ করিল।

অনুতপ্ত বিহারী ভাবিল, “কাল আমার কথাবার্তায় একটু যেন নিন্দার আভাস ছিল; বিনোদিনী বোধ হয় তাহাতেই বেদনা পাইয়াছে।’

স্বামী স্ত্রী উভয়ে মিলিয়া বিনোদিনীর উপর অভিমান করিয়া বসিল।

ইনি বলিলেন, “আমাদের পর মনে কর, ভাই!” উনি বলিলেন, “এতদিন পরে আমরা পর হইলাম!”

বিনোদিনী কহিল, “আমাকে কি তোমরা চিরকাল ধরিয়া রাখিবে, ভাই।”

মহেন্দ্র কহিল, “এত কি আমাদের স্পর্ধা।”

আশা কহিল, “তবে কেন এমন করিয়া আমাদের মন কাড়িয়া লইলে।”

সেদিন কিছুই স্থির হইল না। বিনোদিনী কহিল, “না ভাই, কাজ নাই, দুদিনের জন্য মায়া না বাড়ানোই ভালো।” বলিয়া ব্যাকুলচক্ষে একবার মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিল।

পরদিন বিহারী আসিয়া কহিল, “বিনোদ-বোঠান, যাবার কথা কেন বলিতেছেন। কিছু দোষ করিয়াছি কি–তাহারই শাস্তি?”

বিনোদিনী একটু মুখ ফিরাইয়া কহিল, “দোষ আপনি কেন করিবেন, আমার অদৃষ্টের দোষ।”

বিহারী। আপনি যদি চলিয়া যান তো আমার কেবলই মনে হইবে, আমারই উপর রাগ করিয়া গেলেন।

বিনোদিনী করুণচক্ষে মিনতি প্রকাশ করিয়া বিহারীর মুখের দিকে চাহিল– কহিল, “আমার কি থাকা উচিত হয়, আপনিই বলুন-না।”

বিহারী মুশকিলে পড়িল। থাকা উচিত, এ কথা সে কেমন করিয়া বলিবে। কহিল, “অবশ্য আপনাকে তো যাইতেই হইবে, না-হয় আর দু-চার দিন থাকিয়া গেলেন, তাহাতে ক্ষতি কী।”

বিনোদিনী দুই চক্ষু নত করিয়া কহিল,”আপনারা সকলেই আমাকে থাকিবার জন্য অনুরোধ করিতেছেন– আপনাদের কথা এড়াইয়া যাওয়া আমার পক্ষে কঠিন– কিন্তু আপনারা বড়ো অন্যায় করিতেছেন।”

বলিতে বলিতে তাহার ঘনদীর্ঘ চক্ষুপল্লবের মধ্য দিয়া মোটা মোটা অশ্রুর ফোঁটা দ্রুতবেগে গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।

বিহারী এই নীরব অজস্র অশ্রুজলে ব্যাকুল হইয়া বলিয়া উঠিল, “কয়দিনমাত্র আসিয়া আপনার গুণে আপনি সকলকে বশ করিয়া লইয়াছেন, সেইজন্যই আপনাকে কেহ ছাড়িতে চান না– কিছু মনে করিবেন না বিনোদ-বোঠান, এমন লক্ষ্মীকে কে ইচ্ছা করিয়া বিদায় দেয়!”

আশা এক কোণে ঘোমটা দিয়া বসিয়া ছিল, সে আঁচল তুলিয়া ঘনঘন চোখ মুছিতে লাগিল।

ইহার পরে বিনোদিনী আর যাইবার কথা উত্থাপন করিল না।

16.-img_3925_kal-87_size-13x19_price-8_000
16

Bihari thought to himself, ‘It would not be wise remaining aloof any longer; I have to place myself within this group by any means possible. They will not want that, but I will have to do that.’

He then frequently began to drop in on Mahendra’s little coterie without waiting to be invited by them. He said to Binodini, ‘This man has been spoilt by his mother, his friend and his wife – I urge you to not join the rest of us, but to take a new path.’

Mahendra said, ‘By which you mean…’

Bihari: ‘By which I mean, instead look to me, one who has always been neglected…’

Mahendra: ‘Spoil him rotten. It is not easy getting such indulgence, it is not just a matter of asking for it.’

Binodini smiled and said, ‘One must have the ability to be influenced by indulgence, dear sir.’

Bihari answered, ‘Even if I lack the ability, perhaps you might succeed with your talent. Why not try me once?’

Binodini: ‘It is difficult when one comes prepared, you must be less wary. What do you say, Chokher Bali? You must take charge of this friend of ours.’

Asha nudged Binodini while Bihari ignored the remark.

Binodini had already noticed that Bihari would never take part in teasing Asha. She could not bear it that he treated her lightly but respected Asha.

She said again, ‘This man is actually appealing to you for indulgence, while pretending to ask me. Give him something at least.’

Asha was extremely annoyed. Bihari turned red for a while and then laughed out saying, ‘You are trying to pass me off to another while Mahendra gets to barter with you!’

Binodini understood that Bihari was there to ruin her plans and that she would have to have her wits about her in his presence.

Mahendra was annoyed too. Such straightforward talk is the principal enemy of romance. He said with some bitterness, ‘Bihari, your friend does not engage in barter with any one, I am quite happy with what I have.’

Bihari said, ‘You might not have to go anywhere if the chance comes knocking at the door.’

Binodini: ‘I see you have nothing either, but where are your opportunities coming from then?’
She then looked at Asha and smiled archly. Asha left unhappily. Bihari knew when he was beaten and held his tongue in anger; when he too looked like he was leaving, Binodini teased him, saying, ‘Do not leave in such despair, I will call her back.’

As soon as Binodini left and Mahendra realised the pleasantries were over, he was enraged. Bihari looked at his unhappy face and all his emotions boiled over. He said, ‘Mahendra, ruin yourself if you wish for that has always been your way; but do not hurt the innocent one who relies on you with all her trusting heart. I am telling you, there is still time, do not ruin her life.’

Bihari’s voice betrayed his emotion.

Mahendra spoke with suppressed anger, ‘Bihari, I do not understand a word of what you just said, perhaps you should stop with the riddles.’

Bihari answered, ‘I will; Binodini draws you towards adultery and you are following her like a fool.’
Mahendra burst out harshly, ‘Lies! If you look upon the behavior of a good woman with such suspicion, perhaps you should not come into the inner quarters at all!’

Before he could say any more, Binodini returned with a plate filled with sweets and placed it before Bihari with a smile. Bihari said, ‘What is going on? I am not hungry at all.’

Binodini said, ‘How can that be? You must have one of these before you leave.’

Bihari said with a laugh, ‘Does this mean you have approved my plea for indulgence?’

Binodini smiled slyly and said, ‘You have every right as a brother-in-law to demand to be indulged. Why plead when one can exercise their rights? You can grab them with both hands. What do you say, Mahendrababu?’

Mahendrababu was rendered speechless.

Binodini: Biharibabu, are you not eating out of reticence or out of anger? Should I fetch a rather special person to request you?

Bihari: There is hardly any need for that. This is more than enough.

Binodini: Are you teasing me? One can never win with you! I have not succeeded at shutting you up, even with a mouthful of sweets!

That night Asha expressed her annoyance with Bihari to Mahendra once again. Unlike all the other times, Mahendra did not dismiss her words with a smile but joined in whole heartedly.

He went to Bihari’s house as soon as morning broke and said, ‘Bihari, Binodini is not a member of the family despite what we might think. She always seems to feel slightly uncomfortable when you are there.’

Bihari answered, ‘Is that so? I do feel bad now. Perhaps I should not do that if it displeases her so much.’

Mahendra was reassured by this; he had not hoped to solve the issue quite so easily. He used to fear Bihari for his ability to read him.

Bihari went to Mahendra’s house that very day and said to Binodini, ‘Madam, you must forgive me.’

Binodini: Why?

Bihari: I heard from Mahendra that you are annoyed with me as I come into the inner quarters of the house. I have come to ask forgiveness and leave.

Binodini: How is that possible Biharibabu! I have come only for a day or two, why should you leave on my account? I would not have come here at all if I had known there would be so many problems.

Binodini seemed to hold her tears back with difficulty as she quickly left with a sad face.

Bihari thought for a moment, ‘I have hurt her without cause on my false suspicions.’

That evening Rajlakshmi came to Mahendra and said anxiously, ‘Mahin, Bipin’s wife says she wants to go home.’

Mahendra asked, ‘Why, is she finding it difficult staying here?’

Rajlakshmi: Not as such but she says people will talk if a young widow stays with strangers for such a long time.

Mahendra angrily said, ‘Is this a house full of strangers then?’

He looked reproachfully at Bihari who was sitting there.

Bihari thought with some remorse that his remarks of the previous day had been somewhat critical and that Binodini must have been hurt by them.

Both husband and wife felt anguished by Binodini’s behavior.

One said, ‘Do you think of us as strangers?’

The other said, ‘How can we be strangers after all this time?’

Binodini asked, ‘Can you keep me here for ever?’

Mahendra answered, ‘Would we dare to do that?’

Asha said, ‘Why make us love you so much then?’

Nothing more was decided that day. Binodini said, ‘No, it is best that I go. There is little to be gained by extending these ties for two more days.’ She looked at Mahendra with mute appeal in her eyes as she said this.

Bihari came back the next day and said, ‘Madam, why are you talking about leaving? Have I done something wrong, that you are punishing me now?’

Binodini turned her face away and said, ‘Not at all, it is all my misfortune.’

Bihari: If you leave, I will be left wondering whether you left, angered with me.

Binodini looked at Bihari as she pleaded with him, ‘You tell me, is it right that I should stay?’

Bihari was trapped; how could he say that it would be right for her to stay. He answered, ‘You will have to leave of course, but why not stay a little while longer?’

Binodini cast her eyes downwards and murmured, ‘All of you are asking me to stay – and it is hard for me to leave despite that, but this is so unreasonable of you all!’

As she spoke huge tears began to fall rapidly down her long thick eyelashes.

Bihari grew anxious at this silent flood of tears and said, ‘You have charmed everyone with your qualities within this short time and that is why no one wants to let you go. If you do not mind me saying so, who would willingly send such a good woman away?’

Asha who had been sitting in a corner with her head covered began wiping her tears away.

After that, Binodini never talked about leaving.

Advertisements

চার অধ্যায় /Char Adhyay/Four Chapters

চার অধ্যায়
ভূমিকা

ভূমিকা

এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে। তার মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার-বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না। বেহিসাবি মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে তিনি যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, শাসন করতেন অন্যায় করে, সন্দেহ করতেন অকারণে। মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ অবিমিশ্র সত্যকথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়। এজন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সব-চেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা তার স্বভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। তার মার কাছে মনে হয়েছে, এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।

একটা কথা সে বাল্যকাল থেকে বুঝেছে যে, দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন। ওদের পরিবারে যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী ছিল, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্পবয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।

এলার বাপ নরেশ দাশগুপ্ত সাইকলজিতে বিলিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। তীক্ষ্ণ তাঁর বৈজ্ঞানিক বিচারশক্তি, অধ্যাপনায় তিনি বিশেষভাবে যশম্বী। প্রাদেশিক প্রাইভেট কলেজে তিনি স্থান নিয়েছেন যেহেতু সেই প্রদেশে তাঁর জন্ম, সাংসারিক উন্নতির দিকে তাঁর লোভ কম, সে-সম্বন্ধে দক্ষতাও সামান্য। ভুল করে লোককে বিশ্বাস করা ও বিশ্বাস করে নিজের ক্ষতি করা বারবারকার অভিজ্ঞতাতেও তাঁর শোধন হয় নি। ঠকিয়ে কিংবা অনায়াসে যারা উপকার আদায় করে তাদের কৃতঘ্নতা সব-চেয়ে অকরুণ। যখন সেটা প্রকাশ পেত সেটাকে মনস্তত্ত্বের বিশেষ তথ্য বলে মানুষটি অনায়াসে স্বীকার করে নিতেন, মনে বা মুখে নালিশ করতেন না। বিষয়বুদ্ধির ত্রুটি নিয়ে স্ত্রীর কাছে কখনো তিনি ক্ষমা পান নি, খোঁটা খেয়েছেন প্রতিদিন। নালিশের কারণ অতীতকালবর্তী হলেও তাঁর স্ত্রী কখনো ভুলতে পারতেন না, যখন-তখন তীক্ষ্ণ খোঁচায় উসকিয়ে দিয়ে তার দাহকে ঠাণ্ডা হতে দেওয়া অসাধ্য করে তুলতেন। বিশ্বাসপরায়ণ ঔদার্যগুণেই তার বাপকে কেবলই ঠকতে ও দুঃখ পেতে দেখে বাপের উপর এলার ছিল সদাব্যথিত স্নেহ–যেমন সকরুণ স্নেহ মায়ের থাকে অবুঝ বালকের ‘পরে। সব-চেয়ে তাকে আঘাত করত যখন মায়ের কলহের ভাষায় তীব্র ইঙ্গিত থাকত যে, বুদ্ধিবিবেচনায় তিনি তাঁর স্বামীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এলা নানা উপলক্ষ্যে মায়ের কাছে তার বাবার অসম্মান দেখতে পেয়েছে, তা নিয়ে নিষ্ফল আক্রোশে চোখের জলে রাত্রে তার বালিশ গেছে ভিজে। এ-রকম অতিমাত্র ধৈর্য অন্যায় বলে এলা অনেক সময় তার বাবাকে মনে মনে অপরাধী না করে থাকতে পারে নি।

অত্যন্ত পীড়িত হয়ে একদিন এলা বাবাকে বলেছিল, “এ-রকম অন্যায় চুপ করে সহ্য করাই অন্যায়।”

নরেশ বললেন, “স্বভাবের প্রতিবাদ করাও যা আর তপ্ত লোহায় হাত বুলিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করতে যাওয়াও তাই, তাতে বীরত্ব থাকতে পারে কিন্তু আরাম নেই।”

“চুপ করে থাকাতে আরাম আরও কম”– বলে এলা দ্রুত চলে গেল।

এদিকে সংসারে এলা দেখতে পায়, যারা মায়ের মন জুগিয়ে চলবার কৌশল জানে তাদের চক্রান্তে নিষ্ঠুর অন্যায় ঘটে অপরাধহীনের প্রতি। এলা সইতে পারে না, উত্তেজিত হয়ে সত্য প্রমাণ উপস্থিত করে বিচারকর্ত্রীর সামনে। কিন্তু কর্তৃত্বের অহমিকার কাছে অকাট্য যুক্তিই দুঃসহ স্পর্ধা। অনুকূল ঝ’ড়ো হাওয়ার মতো তাতে বিচারের নৌকো এগিয়ে দেয় না, নৌকো দেয় কাত করে।

এই পরিবারে আরও একটি উপসর্গ ছিল যা এলার মনকে নিয়ত আঘাত করেছে। সে তার মায়ের শুচিবায়ু। একদিন কোনো মুসলমান অভ্যাগতকে বসবার জন্যে এলা মাদুর পেতে দিয়েছিল– সে মাদুর মা ফেলে দিলেন, গালচে দিলে দোষ হত না। এলার তার্কিক মন, তর্ক না করে থাকতে পারে না। বাবাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা এই সব ছোঁয়াছুঁয়ি নাওয়াখাওয়া নিয়ে কটকেনা মেয়েদেরই কেন এত পেয়ে বসে? এতে হৃদয়ের তো স্থান নেই, বরং বিরুদ্ধতা আছে; এ তো কেবল যন্ত্রের মতো অন্ধভাবে মেনে চলা।” সাইকলজিস্ট বাবা বললেন, “মেয়েদের হাজার বছরের হাতকড়ি-লাগানো মন; তারা মানবে, প্রশ্ন করবে না,–এইটেতেই সমাজ-মনিবের কাছে বকশিশ পেয়েছে, সেইজন্যে মানাটা যত অন্ধ হয় তার দাম তাদের কাছে তত বড়ো হয়ে ওঠে। মেয়েলি পুরুষদেরও এই দশা।” আচারের নিরর্থকতা সম্বন্ধে এলা বারবার মাকে প্রশ্ন না করে থাকতে পারে নি, বারবার তার উত্তর পেয়েছে ভর্ৎসনায়। নিয়ত এই ধাক্কায় এলার মন অবাধ্যতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

নরেশ দেখলেন পরিবারিক এই সব দ্বন্দ্বে মেয়ের শরীর খারাপ হয়ে উঠেছে, সেটা তাঁকে অত্যন্ত বাজল। এমন সময় একদিন এলা একটা বিশেষ অবিচারে কঠোরভাবে আহত হয়ে নরেশের কাছে এসে জানাল, “বাবা, আমাকে কলকাতায় বোর্ডিঙে পাঠাও। প্রস্তাবটা তাদের দুজনের পক্ষেই দুঃখকর, কিন্তু বাপ অবস্থা বুঝলেন, এবং মায়াময়ীর দিক থেকে প্রতিকূল ঝঞ্ঝাঘাতের মধ্যেও এলাকে পাঠিয়ে দিলেন দূরে। আপন নিষ্করুণ সংসারে নিমগ্ন হয়ে রইলেন অধ্যয়ন-অধ্যাপনায়।

মা বললেন, “শহরে পাঠিয়ে মেয়েকে মেমসাহেব বানাতে চাও তো বানাও কিন্তু ওই তোমার আদুরে মেয়েকে প্রাণান্ত ভুগতে হবে শ্বশুরঘর করবার দিনে। তখন আমাকে দোষ দিয়ো না।” মেয়ের ব্যবহারে কলিকালোচিত স্বাতন্ত্র৻ের দুর্লক্ষণ দেখে এই আশঙ্কা তার মা বারবার প্রকাশ করেছেন। এলা তার ভাবী শাশুড়ীর হাড় জ্বালাতন করবে সেই সম্ভাবনা নিশ্চিত জেনে সেই কাল্পনিক গৃহিণীর প্রতি তাঁর অনুকম্পা মুখর হয়ে উঠত। এর থেকে মেয়ের মনে ধারণা দৃঢ় হয়েছিল যে, বিয়ের জন্যে মেয়েদের প্রস্তুত হতে হয় আত্মসম্মানকে পঙ্গু করে, ন্যায়-অন্যায়বোধকে অসাড় করে দিয়ে।

এলা যখন ম্যাট্‌রিক পার হয়ে কলেজে প্রবেশ করেছে তখন মায়ের মৃত্যু হল। নরেশ মাঝে মাঝে বিয়ের প্রস্তাবে মেয়েকে রাজি করতে চেষ্টা করেছেন। এলা অপূর্ব-সুন্দরী, পাত্রের তরফে প্রার্থীর অভাব ছিল না, কিন্তু বিবাহের প্রতি বিমুখতা তার সংস্কারগত। মেয়ে পরীক্ষাগুলো পাস করলে, তাকে অবিবাহিত রেখেই বাপ গেলেন মারা।

সুরেশ ছিল তাঁর কনিষ্ঠ ভাই। নরেশ এই ভাইকে মানুষ করেছেন, শেষ পর্যন্ত পড়িয়েছেন খরচ দিয়ে। দু-বছরের মতো তাঁকে বিলেতে পাঠিয়ে স্ত্রীর কাছে লাঞ্ছিত এবং মহাজনের কাছে ঋণী হয়েছেন। সুরেশ এখন ডাকবিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। কর্ম উপলক্ষ্যে ঘুরতে হয় নানা প্রদেশে। তাঁরই উপর পড়ল এলার ভার। একান্ত যত্ন করেই ভার নিলেন।

সুরেশের স্ত্রীর নাম মাধবী। তিনি যে-পরিবারের মেয়ে সে-পরিবারে স্ত্রীলোকদের পরিমিত পড়াশুনোই ছিল প্রচলিত; তার পরিমাণ মাঝারি মাপের চেয়ে কম বই বেশি নয়। স্বামী বিলেত থেকে ফিরে এসে উচ্চপদ নিয়ে দূরে দূরে যখন ঘুরতেন তখন তাঁকে বাইরের নানা লোকের সঙ্গে সামাজিকতা করতে হত। কিছুদিন অভ্যাসের পরে মাধবী নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণে বিজাতীয় লৌকিকতা পালন করতে অভ্যস্ত হয়েছিলেন। এমন-কি, গোরাদের ক্লাবে ও পঙ্গু ইংরেজি ভাষাকে সকারণ ও অকারণ হাসির দ্বারা পূরণ করে কাজ চালিয়ে আসতে পারতেন।

এমন সময় সুরেশ কোনো প্রদেশের বড়ো শহরে যখন আছেন এলা এল তাঁর ঘরে; রূপে গুণে বিদ্যায় কাকার মনে গর্ব জাগিয়ে তুললে। ওঁর উপরিওআলা বা সহকর্মী এবং দেশী ও বিলিতি আলাপী-পরিচিতদের কাছে নানা উপলক্ষ্যে এলাকে প্রকাশিত করবার জন্যে তিনি ব্যগ্র হয়ে উঠলেন। এলার স্ত্রীবুদ্ধিতে বুঝতে বাকি রইল না যে, এর ফল ভালো হচ্ছে না। মাধবী মিথ্যা আরামের ভান করে ক্ষণে ক্ষণে বলতে লাগলেন, “বাঁচা গেল– বিলিতি কায়দার সামাজিকতার দায় আমার ঘাড়ে চাপানো কেন বাপু। আমার না আছে বিদ্যে, না আছে বুদ্ধি।” ভাবগতিক দেখে এলা নিজের চারিদিকে প্রায় একটা জেনানা খাড়া করে তুললে। সুরেশের মেয়ে সুরমার পড়াবার ভার সে অতিরিক্ত উৎসাহের সঙ্গে নিলে। একটা থীসিস লিখতে লাগিয়ে দিলে তার বাকি সময়টুকু। বিষয়টা বাংলা মঙ্গলকাব্য ও চসারের কাব্যের তুলনা। এই নিয়ে সুরেশ মহা উৎসাহিত। এই সংবাদটা চারদিকে প্রচার করে দিলেন। মাধবী মুখ বাঁকা করে বললেন, “বাড়াবাড়ি।”

স্বামীকে বললেন, “এলার কাছে ফস করে মেয়েকে পড়তে দিলে! কেন, অধর মাস্টার কী দোষ করেছে? যাই বল না আমি কিন্তু–”

সুরেশ অবাক হয়ে বললেন, “কী বল তুমি! এলার সঙ্গে অধরের তুলনা!”

“দুটো নোটবই মুখস্থ করে পাস করলেই বিদ্যে হয় না,”– বলে ঘাড় বেঁকিয়ে গৃহিণী ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন।

একটা কথা স্বামীকে বলতেও তাঁর মুখে বাধে–“সুরমার বয়স তেরো পেরোতে চলল, আজ বাদে কাল পাত্র খুঁজতে দেশ ঝেঁটিয়ে বেড়াতে হবে, তখন এলা সুরমার কাছে থাকলে– ছেলেগুলোর চোখে যে ফ্যাঁকাসে কটা রঙের নেশা– ওরা কি জানে কাকে বলে সুন্দর?” দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন আর ভাবেন, এ-সব কর্তাকে জানিয়ে ফল নেই, পুরুষরা যে সংসার-কানা।

যত শীঘ্র হয় এলার বিয়ে হয়ে যাক এই চেষ্টায় উঠে পড়ে লাগলেন গৃহিণী। বেশি চেষ্টা করতে হয় না, ভালো ভালো পাত্র আপনি এসে জোটে– এমন সব পাত্র, সুরমার সঙ্গে যাদের সম্বন্ধ ঘটাবার জন্য মাধবী লুব্ধ হয়ে ওঠেন। অথচ এলা তাদের বারে বারে নিরাশ করে ফিরিয়ে দেয়।

ভাইঝির একগুঁয়ে অবিবেচনায় উদ্বিগ্ন হলেন সুরেশ, কাকী হলেন অত্যন্ত অসহিষ্ণু। তিনি জানেন সৎপাত্রকে উপেক্ষা করা সমর্থবয়সের বাঙালি মেয়ের পক্ষে অপরাধ। নানারকম বয়সোচিত দুর্যোগের আশঙ্কা করতে লাগলেন, এবং দায়িত্ববোধে অভিভূত হল তাঁর অন্তঃকরণ। এলা স্পষ্টই বুঝতে পারলে যে, সে তার কাকার স্নেহের সঙ্গে কাকার সংসারের দ্বন্দ্ব ঘটাতে বসেছে।

এমন সময় ইন্দ্রনাথ এলেন সেই শহরে। দেশের ছাত্রেরা তাঁকে মানত রাজচক্রবর্তীর মতো। অসাধারণ তাঁর তেজ, আর বিদ্যার খ্যাতিও প্রভূত। একদিন সুরেশের ওখানে তাঁর নিমন্ত্রণ। সেদিন কোনো এক সুযোগে এলা অপরিচয়সত্ত্বেও অসংকোচে তাঁর কাছে এসে বললে “আমাকে আপনার কোনো একটা কাজ দিতে পারেন না?”

আজকালকার দিনে এ-রকম আবেদন বিশেষ আশ্চর্যের নয় কিন্তু তবু মেয়েটির দীপ্তি দেখে চমক লাগল ইন্দ্রনাথের। তিনি বললেন, “কলকাতায় সম্প্রতি নারায়ণী হাই স্কুল মেয়েদের জন্যে খোলা হয়েছে। তোমাকে তার কর্ত্রীপদ দিতে পারি, প্রস্তুত আছ?”

“প্রস্তুত আছি যদি আমাকে বিশ্বাস করেন।”

ইন্দ্রনাথ এলার মুখের দিকে তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টি রেখে বললেন, “আমি লোক চিনি। তোমাকে বিশ্বাস করতে আমার মুহূর্তকাল বিলম্ব হয় নি। তোমাকে দেখবামাত্রই মনে হয়েছে, তুমি নবযুগের দূতী, নবযুগের আহ্বান তোমার মধ্যে!”

হঠাৎ ইন্দ্রনাথের মুখে এমন কথা শুনে এলার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল।

সে বললে, “আপনার কথায় আমার ভয় হয়। ভুল করে আমাকে বাড়াবেন না। আপনার ধারণার যোগ্য হবার জন্যে দুঃসাধ্য চেষ্টা করতে গেলে ভেঙে পড়ব। আমার শক্তির সীমার মধ্যে যতটা পারি বাঁচিয়ে চলব আপনার আদর্শ, কিন্তু ভান করতে পারব না।”

ইন্দ্রনাথ বললেন, “সংসারের বন্ধনে কোনোদিন বদ্ধ হবে না এই প্রতিজ্ঞা তোমাকে স্বীকার করতে হবে। তুমি সমাজের নও তুমি দেশের।”

এলা মাথা তুলে বললে “এই প্রতিজ্ঞাই আমার।”

কাকা গমনোদ্যত এলাকে বললেন “তোকে আর কোনোদিন বিয়ের কথা বলব না। তুই আমার কাছেই থাক্‌। এখানেই পাড়ার মেয়েদের পড়াবার ভার নিয়ে একটা ছোটোখাটো ক্লাস খুললে দোষ কী।”

কাকী স্নেহার্দ্র স্বামীর অবিবেচনায় বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওর বয়স হয়েছে, ও নিজের দায় নিজেই নিতে চায়, সে ভালোই তো। তুমি কেন বাধা দিতে যাও মাঝের থেকে। তুমি যা-ই মনে কর না কেন, আমি বলে রাখছি ওর ভাবনা আমি ভাবতে পারব না।”

এলা খুব জোর করেই বললে, “আমি কাজ পেয়েছি, কাজ করতেই যাব।”

এলা কাজ করতেই গেল।

Four Chapters
The introduction

Ela remembers that the beginnings of her life were enveloped in opposition. Her mother Mayamoyee was obsessive by nature, her behavior refusing to take any path dictated by logical thinking. She would throw her family into despair with the ups and downs of the inconsiderate ranting of her illogical nature, she would discipline unjustly and suspect for no reason at all. When her daughter refused to admit to doing something wrong, she would suddenly say, ‘You are lying!’ And yet being completely truthful was one of the characteristics of the girl for which she was punished the most. Her nature grew antagonistic to every kind of injustice. To her mother, it was this very characteristic in her daughter that seemed to go against all the tenets of femininity.

One thing she had observed since childhood was that weakness was the chief spur to oppression. The people who lived as dependents in their family were the ones who poisoned the air at home, encircled as they were within the confines of abuse and benevolence of others; they were the ones who fed her mother’s blind need to oppress without opposition. Her mind revolted against this unhealthy atomosphere and craved freedom more than anything else.

Ela’s father Naresh Dasgupta had a degree in psychology from a foreign university. His powers of scientific analysis were brilliant and he was famous as a teacher. He had taken a position in a private provincial college as he had been born in the province; he paid little attention to his own advancement and knew even less about how to achieve it. Even after being tricked by people repeatedly after trusting them he was still able to trust his fellow men. The ingratitude of those who obtain favours by trickery or with ease is the most unforgiving and cruel. When he was faced with this, he never thought to question the justice of the behavior, preferring instead to explain it as a typical psychological phenomenon. His wife never forgave him for his lack of sense when it came to financial acumen and railed against him daily. Even though the events had happened in the past she was unable to forget them and her sudden barbed comments did nothing to sooth the torment they caused him. Ela was filled with sympathy and love for her father as she saw him betrayed and hurt again and again – the kind of love felt by a mother for an innocent child. She felt worst of all when her mother spitefully alluded in the course of her tirades that she was wiser than her husband. Ela saw many examples of her mother’s disrespect for her father and shed tears in helpless anger at night when she was alone. She could not help blaming her father for the great harm he did by displaying such excessive patience with his wife.

Greatly hurt, she said to her father one day, ‘Putting up with this behavior in silence is just as wrong as the behavior itself.’

Naresh said, ‘Protesting against someone’s nature is like trying to cool heated metal by stroking it, the action might be brave but there is little comfort to be gained from either.’

‘Putting up with it in silence is far less useful,’ Ela said as she walked away.

She had noticed that the people who were good at placating her mother also conspired against those who had done nothing wrong to ensure they were treated cruelly. Ela could not bear this and would often present proof to the contrary to her mother. But irrefutable reason is always seen as unbearable insolence by the superior blinded by pride. It never advances the ship of justice like a fair wind should, but topples it instead.

There was another negative aspect to her family life which hurt Ela’s sensibilities daily. Her mother was obsessive about caste. One day Ela had spread out a grass mat for a Muslim guest; after he left, her mother threw it out, but Ela knew for certain that if she had asked him to sit on the carpet, there would have been no question of disposing of it. Ela’s nature would not be satisfied without questioning things. She asked her father one day, ‘Why do all these rules and restrictions about touching things and bathing if one does touch inappropriate things always seem to apply to women? These do not speak of the kindness of the soul; infact they go against it; there is a sense of blindly adhering in a mechanical way.’ Her psychologist father answered, ‘Women have minds that have been shackled for a thousand years; they follow, they do not question, and this is the very behavior that is rewarded by society, the more unquestioning and blind their submission, the more prized they are by society. Effeminate men have the same problem.’ Ela could not desist from questioning her mother repeatedly about the futility of her rules, but she was always answered with rebukes. This constant sniping was gradually making her grow argumentative.

Naresh noticed that Ela was affected by the discord around her; this was a source of great pain to him. One day Ela came to him after a particularly harsh and unnecessary episode and said, ‘Father, send me away to a boarding school in Kolkata.’ The idea was distressing for both but her father understood and even though Mayamoyee presented many objections to it, Ela was sent away while he remained, immersed in his studies and his teaching in his unhappy household.

Mayamoyee observed, ‘If you want to make your daughter into one of those fancy Westernised types then do so, but your darling will suffer when the day comes for her to live with another family. Do not blame me then!’ She had often expressed her views about her daughter’s desire for independence being a sign of the ill fated times and voiced great sympathy for Ela’s future mother – in – law, a woman who would have to put up with all manner of misbehavior in the near future. This had enforced an idea in Ela’s mind that women prepared for marriage by blunting all sense of self respect and numbing every understanding of what was right and what was wrong.

Her mother passed away when Ela had entered college after finishing her matriculation. Naresh tried to get Ela to agree to proposals of marriage every now and then. Ela was extremely beautiful and there was no shortage of prospective grooms but she was completely averse to the idea of marriage. As a consequence when she finished all her examinations her father passed away too, leaving her unwed.

Suresh was his younger brother. Naresh had helped to raise this sibling and had even paid for his studies. He had suffered many barbs from his wife and had even incurred debts after sending Suresh abroad for two years. Suresh was now employed in a high post in the Postal Department. He had to tour various areas as part of his job. He became Ela’s guardian, a responsibility he accepted with great joy.

His wife was Madhabi. She came from the sort of family where women were required to be educated to a certain degree and not a great deal by any means. When her husband took up his position and had to engage socially with various people, Madhabi managed to pick up foreign pleasantries and mannerisms with ease. She was even able to make do in the British clubs with a smattering of rudimentary English which she disguised by laughing often, with or without reason.

Ela came to their household when Suresh was posted in one of the larger provincial towns; her beauty, her brains and her qualities made him proud of her. He was eager to show her off on various occasions to his superiors and colleagues and to the foreigners he knew. Ela’s feminine intuition told her little good would come of this. Madhabi feigned relief and said, ‘Thank God! Why place the responsibility of these complex social interactions on me? I am neither able nor educated enough!’ Ela understood what was really being said and she put up various restrictions around herself. She took on the duty of guiding Suresh’s daughter, her cousin Surama, with an enthusiasm that was far in excess of the task. She devoted the rest of her time to writing a thesis. The topic was a comparison between the Mangal literature of Bengal and Chaucer’s poetry. Suresh was very interested in this. He spread the news around. Madhabi smirked and said, ‘What next!’

She said to her husband, ‘Why are you letting Ela take on responsibility for Surama? What is she doing that Adhar Master did not do? I don’t think that..’
Suresh said with astonishment, ‘What are you saying? How can you compare Ela with Adhar!’
‘One does not become educated just by learning a couple of notebooks by heart!’ Madhabi said, before leaving the room with a flounce.

Even so she stopped short of saying to Suresh, ‘Your daughter is thirteen. If Ela is still around when you start thinking of her marriage, and the way all these men want pale skinned women, will anyone look at Surama at all? What do they know of beauty?’ She would sigh deeply and think there was little point in telling her husband these things; men were so blind when it came to life.

She stepped up her efforts to organize Ela’s marriage quickly. There was hardly any need to do much as good matches seemed to turn up easily, men that Madhabi would have dearly loved to see wed to her own daughter Surama. And yet, Ela refused them all.

Suresh was worried by this obstinate lack of judgment in his niece while her aunt became very impatient. She knew that dismissing good prospective husbands was a crime for Bengali women of marriageable age. She worried about various possible disasters that were sure to occur given Ela’s age and her heart was overwhelmed with a sense of responsibility. Ela clearly saw that her uncle’s affection for her would soon be at loggerheads with the happiness of his family.

Around this time, Indranath came to the town. The students of the country used to revere him as a true leader. He was extraordinarily brilliant and widely respected for his learning. One day when he was invited to Suresh’s house, Ela came up to him and despite their complete lack of familiarity with each other said to him, ‘Can you not get me a job?’
Even though this is not a request completely unheard of these days, Indranath was startled by the strength of conviction that seemed to shine from Ela. He said, ‘A new high school for girls has been started in Kolkata, Narayani High. I can give you a position as the headmistress there, are you ready to take that on?’
‘I am ready if you are willing to believe in me.’

Indranath looked at Ela with his piercing eyes and said, ‘I know people. It did not take me a minute to believe in you. As soon as I saw you I felt you were a messenger of the new age, you will be able to spread the word!’

Ela trembled when she heard this.

She said, ‘Your words make me afraid. Do not make me out to be any better than I am. If I have to attempt more than I am capable of in order to be worthy of your trust, I will fail. I will do only what I can, but I will not give you false hope.’

‘You must promise never to submit to the bonds of family life. You are not just you, you belong to the nation.’

Ela raised her head and said, ‘This is my pledge, today and always.’

Her uncle said to Ela as she prepared to leave them, ‘I will never say anything to you ever again about getting married. Please stay with me. What harm is there in opening a class for the local girls here?’

Annoyed at her husband’s affectionate and ill thought out interference, his wife said ‘She is old enough! If she wants to be responsible for her own well being, let her be! Why are you stopping her? I don’t care what you might think, I have no desire to be responsible for her.’

Ela said, ‘I have found a job, I will have to go and work.’

And so she did, she went away to work.

চোখের বালি ১১/ Chokher Bali 11

Chokher Bali 3

১১

আশার পক্ষে সঙ্গিনীর বড়ো দরকার হইয়াছিল। ভালোবাসার উৎসবও কেবলমাত্র দুটি লোকের দ্বারা সম্পন্ন হয় না– সুখালাপের মিষ্টান্ন বিতরণের জন্য বাজে লোকের দরকার হয়।

ক্ষুধিতহৃদয়া বিনোদিনীও নববধূর নবপ্রেমের ইতিহাস মাতালের জ্বালাময় মদের মতো কান পাতিয়া পান করিতে লাগিল। তাহার মস্তিষ্ক মাতিয়া শরীরের রক্ত জ্বলিয়া উঠিল।

নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে মা যখন ঘুমাইতেছেন, দাসদাসীরা একতলার বিশ্রামশালায় অদৃশ্য, মহেন্দ্র বিহারীর তাড়নায় ক্ষণকালের জন্য কলেজে গেছে এবং রৌদ্রতপ্ত নীলিমার শেষ প্রান্ত হইতে চিলের তীব্র কণ্ঠ অতিক্ষীণ স্বরে কদাচিৎ শুনা যাইতেছে, তখন নির্জন শয়নগৃহে নীচের বিছানায় বালিশের উপর আশা তাহার খোলা চুল ছড়াইয়া শুইত এবং বিনোদিনী বুকের নীচে বালিশ টানিয়া উপুড় হইয়া শুইয়া গুনগুন-গুঞ্জরিত কাহিনীর মধ্যে আবিষ্ট হইয়া রহিত, তাহার কর্ণমূল আরক্ত হইয়া উঠিত, নিশ্বাস বেগে প্রবাহিত হইতে থাকিত।

বিনোদিনী প্রশ্নকরিয়া করিয়া তুচ্ছতম কথাটি পর্যন্ত বাহির করিত, এক কথা বার বার করিয়া শুনিত, ঘটনা নিঃশেষ হইয়া গেলে কল্পনার অবতারণা করিত– কহিত, “আচ্ছা ভাই, যদি এমন হইত তো কী হইত, যদি অমন হইত তো কী করিতে।” সেই-সকল অসম্ভাবিত কল্পনার পথে সুখালোচনাকে সুদীর্ঘ করিয়া টানিয়া লইয়া চলিতে আশারও ভালো লাগিত।

বিনোদিনী কহিত, “আচ্ছা ভাই চোখের বালি, তোর সঙ্গে যদি বিহারীবাবুর বিবাহ হইত।”

আশা। না ভাই, ও কথা তুমি বলিয়ো না– ছি ছি, আমার বড়ো লজ্জা করে। কিন্তু তোমার সঙ্গে হইলে বেশ হইত, তোমার সঙ্গেও তো কথা হইয়াছিল।

বিনোদিনী। আমার সঙ্গে তো ঢের লোকের ঢের কথা হইয়াছিল। না হইয়াছে, বেশ হইয়াছে– আমি যা আছি, বেশ আছি।

আশা তাহার প্রতিবাদ করে। বিনোদিনীর অবস্থা যে তাহার অবস্থার চেয়ে ভালো, এ কথা সে কেমন করিয়া স্বীকার করিবে। “একবার মনে করিয়া দেখো দেখি ভাই বালি, যদি আমার স্বামীর সঙ্গে তোমার বিবাহ হইয়া যাইত। আর একটু হলেই তো হইত।”

তা তো হইতই। না হইল কেন। আশার এই বিছানা, এই খাট তো একদিন তাহারই জন্য অপেক্ষা করিয়া ছিল। বিনোদিনী এই সুসজ্জিত শয়নঘরের দিকে চায়, আর সে কথা কিছুতেই ভুলিতে পারে না। এ ঘরে আজ সে অতিথিমাত্র– আজ স্থান পাইয়াছে, কাল আবার উঠিয়া যাইতে হইবে।

অপরাহ্নে বিনোদিনী নিজে উদ্‌যোগী হইয়া অপরূপ নৈপুণ্যের সহিত আশার চুল বাঁধিয়া সাজাইয়া তাহাকে স্বামীসম্মিলনে পাঠাইয়া দিত। তাহার কল্পনা যেন অবগুণ্ঠিতা হইয়া এই সজ্জিতা বধূর পশ্চাৎ পশ্চাৎ মুগ্ধ যুবকের অভিসারে জনহীন কক্ষে গমন করিত। আবার এক-এক দিন কিছুতেই আশাকে ছাড়িয়া দিত না। বলিত, “আঃ, আর-একটু বসোই-না। তোমার স্বামী তো পালাইতেছেন না। তিনি তো বনের মায়ামৃগ নন, তিনি অঞ্চলের পোষা হরিণ।” এই বলিয়া নানা ছলে ধরিয়া রাখিয়া দেরি করাইবার চেষ্টা করিত।

মহেন্দ্র অত্যন্ত রাগ করিয়া বলিত, “তোমার সখী যে নড়িবার নাম করেন না– তিনি বাড়ি ফিরিবেন কবে।”

আশা ব্যগ্র হইয়া বলিত, “না, তুমি আমার চোখের বালির উপর রাগ করিয়ো না। তুমি জান না, সে তোমার কথা শুনিতে কত ভালোবাসে– কত যত্ন করিয়া সাজাইয়া আমাকে তোমার কাছে পাঠাইয়া দেয়।”

রাজলক্ষ্মী আশাকে কাজ করিতে দিতেন না। বিনোদিনী বধূর পক্ষ লইয়া তাহাকে কাজে প্রবৃত্ত করাইল। প্রায় সমস্ত দিনই বিনোদিনীর কাজে আলস্য নাই, সেই সঙ্গে আশাকেও সে আর ছুটি দিতে চায় না। বিনোদিনী পরে-পরে এমনি কাজের শৃঙ্খল বানাইতেছিল যে, তাহার মধ্যে ফাঁক পাওয়া আশার পক্ষে ভারি কঠিন হইয়া উঠিল। আশার স্বামী ছাদের উপরকার শূন্য ঘরের কোণে বসিয়া আক্রোশে ছটফট করিতেছে, ইহা কল্পনা করিয়া বিনোদিনী মনে মনে তীব্র কঠিন হাসি হাসিত। আশা উদ্বিগ্ন হইয়া বলিত, “এবার যাই ভাই চোখের বালি, তিনি আবার রাগ করিবেন।”

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি বলিত, “রোসো, এইটুকু শেষ করিয়া যাও। আর বেশি দেরি হইবে না।”

খানিক বাদে আশা আবার ছটফট করিয়া বলিয়া উঠিত, “না ভাই, এবার তিনি সত্যসত্যই রাগ করিবেন–আমাকে ছাড়ো, আমি যাই।”

বিনোদিনী বলিত, “আহা, একটু রাগ করিলই বা। সোহাগের সঙ্গে রাগ না মিশিলে ভালোবাসার স্বাদ থাকে না– তরকারিতে লঙ্কামরিচের মতো।”

কিন্তু লঙ্কামরিচের স্বাদটা যে কী, তাহা বিনোদিনীই বুঝিতেছিল– কেবল সঙ্গে তাহার তরকারি ছিল না। তাহার শিরায় শিরায় যেন আগুন ধরিয়া গেল। সে যে দিকে চায়, তাহার চোখে যেন স্ফুলিঙ্গবর্ষণ হইতে থাকে। “এমন সুখের ঘরকন্না– এমন সোহাগের স্বামী। এ ঘরকে যে আমি রাজার রাজত্ব, এ স্বামীকে যে আমি পায়ের দাস করিয়া রাখিতে পারিতাম। তখন কি এ ঘরের এই দশা, এ মানুষের এই ছিরি থাকিত। আমার জায়গায় কিনা এই কচি খুকি, এই খেলার পুতুল!’ (আশার গলা জড়াইয়া) “ভাই চোখের বালি, বলো-না ভাই, কাল তোমাদের কী কথা হইল ভাই। আমি তোমাকে যাহা শিখাইয়া দিয়াছিলাম তাহা বলিয়াছিলে? তোমাদের ভালোবাসার কথা শুনিলে আমার ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না ভাই।”

11

Asha desperately needed female company. The festival of love is never truly complete without a third person to hear and exult over its stories.

Binodini’s hungry soul devoured all the tales of Mahendra’s wooing like a drunkard swilling down liquor even as it burns his throat. Her head buzzed with strange feelings and her blood grew agitated.

In the silent afternoons when Rajlakshmi would sleep and the servants would disappear to their quarters. Mahendra would be at his classes after Bihari tried to talk some sense into him. The only sounds to be heard were the shrill but faint calls of the kites from the burning skies in the hazy distance. It was then that the two young women would retire to Asha’s bedroom, where she would lie on her bed with her hair spread all over her pillow while Binodini lay next to her, pillow clutched to her breast, her ears reddening at Asha’s whispered accounts of Mahendra’s exploits and her breath growing rapid as the time went by.

Binodini would keep questioning Asha till even the smallest detail was laid bare to her. She would ask about certain things again and again, sometimes asking Asha to imagine different endings, saying, ‘Well, if he had done this, and what would you have done then.’ This would prolong their discussions and there is little doubt that Asha too found this rather enjoyable.

Binodini said, ‘Well, my dear Chokher Bali, what if you had been married to Bihari?’

Asha said, ‘No, no, please do not say that! I feel very ashamed. But it would have been so good if you had married him, as was once planned.’

Binodini said, ‘I was meant to have married so many people! It is fitting that it did not happen, I am quite alright with the way things have turned out.’

Asha objected to that. How would she admit that Binodini was better off than her? She persisted, ‘Just imagine for once, if you had married my husband? It was almost done was it not?’

Of course it could have happened. Why did it not happen? Once upon a time, this room, this bed – all these were meant to have been hers. As Binodini looks at the room today with all its expensive things, she can hardly forget that. Today she is but a guest here, she will have to leave tomorrow.

In the evening Binodini would do up Asha’s hair beautifully and dress her in the latest of fashions before sending her to her husband. Her imagination seemed to veil itself and follow Asha through the empty rooms as she went to her young husband and stood before his admiring eyes. On other days she would not let Asha go so easily and say, ‘Why can you not wait just a bit more? Your husband is not running away! He is no wild horse, he is a tame pony.’ On those days she would try to delay Asha’s departure in various ways.

Mahendra would say very angrily, ‘Your friend makes no mention of leaving – when is she going back home?’

Asha would say hurriedly, ‘No, don’t be angry with her. You don’t know how much she loves to hear of you, how much care she takes as she helps me dress before I come to you.’

Rajlakshmi did not let Asha help with the work. Binodini spoke to her and got her permission for Asha to join in the household chores. She never rested through the day and Asha had to do the same. Binodini managed to arrange the tasks like links in a chain so that Asha rarely got a chance to escape to her husband who would be waiting in vain in the room on the terrace, frustrated and angry. Binodini felt a cruel sense of enjoyment at the thought. Asha would grow anxious and say, ‘I must go now Bali, he will get annoyed with me,’

Binodini would say quickly, ‘Just finish this little bit off. It will only take a little longer.’

Asha would again start to fidget in a little while and say, ‘No, this time I really must go, he gets so annoyed!Let me go!’

Binodini said, ‘Let him get a little angry! When anger is mixed with love, it adds a touch of spice, just as pepper seasons a dish.’

But Binodini was the one with all the taste for seasoning – and yet she did not have a dish of her own to add it to. Her very veins felt like they were on fire. When she was in this mood, her eyes seemed to shower sparks.

‘Such a happy household – such a loving husband! I could have made this my kingdom, I could have made this man my slave. Would this household be in this state then? Would this man be wasting his life like this? Instead, this slip of a girl, this rag doll!’ she thought as she embraced Asha and said, ‘Tell me Bali, please tell me, what did you talk about yesterday? Did you say what I taught you? When I hear about your love making I forget all thirst and hunger.’

বউঠাকুরাণীর হাট/ BouThakurani’s market

প্রথম পরিচ্ছেদ

রাত্রি অনেক হইয়াছে। গ্রীষ্মকাল। বাতাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে। গাছের পাতাটিও নড়িতেছে না। যশোহরের যুবরাজ, প্রতাপাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র, উদয়াদিত্য তাঁহার শয়নগৃহের বাতায়নে বসিয়া আছেন। তাঁহার পার্শ্বে তাঁহার স্ত্রী সুরমা।

সুরমা কহিলেন, “প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাকো, ধৈর্য ধরিয়া থাকো। একদিন সুখের দিন আসিবে।”

উদয়াদিত্য কহিলেন, “আমি তো আর কোনো সুখ চাই না। আমি চাই, আমি রাজপ্রাসাদে না যদি জন্মাইতাম, যুবরাজ না যদি হইতাম, যশোহর-অধিপতির ক্ষুদ্রতম তুচ্ছতম প্রজার প্রজা হইতাম, তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র, তাঁহার সিংহাসনের তাঁহার সমস্ত ধন মান যশ প্রভাব গৌরবের একমাত্র উত্তরাধিকারী না হইতাম! কী তপস্যা করিলে এ-সমস্ত অতীত উল্‌টাইয়া যাইতে পারে!”

সুরমা অতি কাতর হইয়া যুবরাজের দক্ষিণ হস্ত দুই হাতে লইয়া চাপিয়া ধরিলেন, ও তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন। যুবরাজের ইচ্ছা পুরাইতে প্রাণ দিতে পারেন, কিন্তু প্রাণ দিলেও এই ইচ্ছা পুরাইতে পারিবেন না, এই দুঃখ।

যুবরাজ কহিলেন, “সুরমা, রাজার ঘরে জন্মিয়াছি বলিয়াই সুখী হইতে পারিলাম না। রাজার ঘরে সকলে বুঝি কেবল উত্তরাধিকারী হইয়া জন্মায়, সন্তান হইয়া জন্মায় না। পিতা ছেলেবেলা হইতেই আমাকে প্রতিমুহূর্তে পরখ করিয়া দেখিতেছেন, আমি তাঁহার উপার্জিত যশোমান বজায় রাখিতে পারিব কি না, বংশের মুখ উজ্জ্বল করিতে পারিব কি না, রাজ্যের গুরুভার বহন করিতে পারিব কি না। আমার প্রতি কার্য, প্রতি অঙ্গভঙ্গী তিনি পরীক্ষার চক্ষে দেখিয়া আসিতেছেন, স্নেহের চক্ষে নহে। আত্মীয়বর্গ, মন্ত্রী, রাজসভাসদগণ, প্রজারা আমার প্রতি কথা প্রতি কাজ খুঁটিয়া খুঁটিয়া লইয়া আমার ভবিষ্যৎ গণনা করিয়া আসিতেছে। সকলেই ঘাড় নাড়িয়া কহিল– না, আমার দ্বারা এ বিপদে রাজ্য রক্ষা হইবে না। আমি নির্বোধ, আমি কিছুই বুঝিতে পারি না। সকলেই আমাকে অবহেলা করিতে লাগিল, পিতা আমাকে ঘৃণা করিতে লাগিলেন। আমার আশা একেবারে পরিত্যাগ করিলেন। একবার খোঁজও লইতেন না।

সুরমার চক্ষে জল আসিল। সে কহিল, “আহা! কেমন করিয়া পারিত!”

তাহার দুঃখ হইল, তাহার রাগ হইল, সে কহিল, “তোমাকে যাহারা নির্বোধ মনে করিত তাহারাই নির্বোধ।”

উদয়াদিত্য ঈষৎ হাসিলেন, সুরমার চিবুক ধরিয়া তাহার রোষে আরক্তিম মুখখানি নাড়িয়া দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হইয়া কহিলেন, “না, সুরমা, সত্য সত্যই আমার রাজ্যশাসনের বুদ্ধি নাই। তাহার যথেষ্ট পরীক্ষা হইয়া গেছে। আমার যখন ষোল বৎসর বয়স, তখন মহারাজ কাজ শিখাইবার জন্য হোসেনখালি পরগনার ভার আমার হাতে সমর্পণ করেন। ছয় মাসের মধ্যেই বিষম বিশৃঙ্খলা ঘটিতে লাগিল। খাজনা কমিয়া গেল, প্রজারা আশীর্বাদ করিতে লাগিল। কর্মচারীরা আমার বিরুদ্ধে রাজার নিকটে অভিযোগ করিতে লাগিল। রাজসভার সকলেরই মত হইল, যুবরাজ প্রজাদের যখন অত প্রিয়পাত্র হইয়া পড়িয়াছেন, তখনই বুঝা যাইতেছে উঁহার দ্বারা রাজ্যশাসন কখনো ঘটিতে পারিবে না। সেই অবধি মহারাজ আমার পানে আর বড়ো একটা তাকাইতেন না। বলিতেন– ও কুলাঙ্গার ঠিক রায়গড়ের খুড়া বসন্ত রায়ের মতো হইবে, সেতার বাজাইয়া নাচিয়া বেড়াইবে ও রাজ্য অধঃপাতে দিবে।”

সুরমা আবার কহিলেন, “প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাকো, ধৈর্য ধরিয়া থাকো। হাজার হউন, পিতা তো বটেন। আজকাল রাজ্য-উপার্জন, রাজ্যবৃদ্ধির একমাত্র দুরাশায় তাঁহার সমস্ত হৃদয় পূর্ণ রহিয়াছে, সেখানে স্নেহের ঠাঁই নাই। যতই তাঁহার আশা পূর্ণ হইতে থাকিবে, ততই তাঁহার স্নেহের রাজ্য বাড়িতে থাকিবে।”

যুবরাজ কহিলেন, “সুরমা, তোমার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, দূরদর্শী, কিন্তু এইবারে তুমি ভুল বুঝিয়াছ। এক তো আশার শেষ নাই; দ্বিতীয়ত, পিতার রাজ্যের সীমা যতই বাড়িতে থাকিবে, রাজ্য যতই লাভ করিতে থাকিবেন, ততই তাহা হারাইবার ভয় তাঁহার মনে বাড়িতে থাকিবে; রাজকার্য যতই গুরুতর হইয়া উঠিবে, ততই আমাকে তাহার অনুপযুক্ত মনে করিবেন।

সুরমা ভুল বুঝে নাই, ভুল বিশ্বাস করিত মাত্র; বিশ্বাস বুদ্ধিকেও লঙ্ঘন করে। সে একমনে আশা করিত, এইরূপই যেন হয়।

“চারিদিকে কোথাও বা কৃপাদৃষ্টি কোথাও বা অবহেলা সহ্য করিতে না পারিয়া আমি মাঝে মাঝে পলাইয়া রায়গড়ে দাদামহাশয়ের কাছে যাইতাম। পিতা বড়ো একটা খোঁজ লইতেন না। আঃ, সে কী পরিবর্তন। সেখানে গাছপালা দেখিতে পাইতাম, গ্রামবাসীদের কুটিরে যাইতে পারিতাম, দিবানিশি রাজবেশ পরিয়া থাকিতে হইত না। তাহা ছাড়া জান তো, যেখানে দাদামহাশয় থাকেন, তাহার ত্রিসীমায় বিষাদ ভাবনা বা কঠোর গাম্ভীর্য তিষ্ঠিতে পারে না। গাহিয়া বাজাইয়া, আমোদ করিয়া চারিদিক পূর্ণ করিয়া রাখেন। চারিদিকে উল্লাস, সদ্ভাব, শান্তি। সেইখানে গেলেই আমি ভুলিয়া যাইতাম যে, আমি যশোহরের যুবরাজ। সে কী আরামের ভুল। অবশেষে আমার বয়স যখন আঠারো বৎসর, একদিন রায়গড়ে বসন্তের বাতাস বহিতেছিল, চারিদিকে সবুজ কুঞ্জবন, সেই বসন্তে আমি রুক্মিণীকে দেখিলাম।”

It is very late at night in summer. Not a single leaf moves in the still air. The heir to Jessore, Pratapaditya’s eldest son Udayaditya sits at the window of his sleeping quarters. Beside him sits his wife Surama.
Surama said, ‘Dearest, please bear this, be patient. Happier days will come soon.’

Udayaditya said, ‘I do not seek any other happiness. If only I was not born in the palace as a crown prince, but as the most insignificant of the subjects of the ruler of Jessore! If only I was not his eldest son, the only heir to his throne, all his wealth, honour, fame, influence and pride! What prayers must I offer to overturn this past!’

Surama held the prince’s right hand with both her hands in great anguish and looked at him as she sighed slowly. She would give her very life to satisfy his wishes but this particular wish was not to be fulfilled that easily, this was her sadness.

The prince said, ‘Surama, I could not be happy only because of my birth in the royal household. Here everyone takes birth as an heir not as a child. My father has tested me at every moment since childhood, whether I would be able to hold on to the honour and fame he has earned, or make my lineage proud, or even bear the great weight of the kingdom. He has observed every action of mine and each gesture I have made through the eyes of a judge, and not with affection. My relatives, the ministers, the courtiers, the subjects – they have all analysed each word and deed of mine in order to predict my future. They have all shaken their heads and said – No, this kingdom will not be safe with me in these times of danger. I am foolish, I understand nothing. They have all slighted me, my father has hated me. He gave up all hope regarding me. He never asked me once what I was feeling.’

Tears welled in Surama’s eyes. She said, ‘How could they do that!’

She felt sadness and anger and said, ‘The ones who thought you foolish are foolish themselves.’

Surama said once again, ‘Dearest, bear it for a while, be patient. He is after all your father. Today his heart is filled with worries about revenue and expansion of his lands, there is no space there for love. As his hopes are fulfilled, his heart will allow affection to reign within’

The prince said, ‘Surama, your intelligence is keen and far seeing, but this time you have misunderstood. Firstly, there is no end to these hopes and secondly, the more he expands his kingdom, the more the fears of losing it will grow within him; the more governance becomes important, the more he will see me as unsuitable to take up the responsibility of carrying it out.’

Udayaditya smiled gently and took Surama’s anger -reddened face in his hands and held it. In an instant he grew serious and said, ‘No, Surama, I really do not have the intelligence to run the kingdom. There have been enough tests of that. When I was sixteen years old, the king gave me the charge of Hosseinkhali district to teach me the business. Within six months there was great confusion. The revenue decreased, the subjects blessed me. The staff complained about me to the king. Everyone in the court thought if the prince is so beloved of the subjects, then it is evident that ruling will never be done well by him. Since then the king did not consider me much anymore. He would always say – the fellow is going to be just like our uncle in Raigarh, Basanto Ray, prancing around and playing the sitar while the kingdom goes to the dogs.

Surama had not understood anything erroneously, she just believed in the wrong ideals; even though she knew it to be contrary. She hoped that he would do exactly that.

‘Unable to bear neither the pitying looks nor the neglect I would escape some times to my grandfather in Raigarh. My father never tried to find out where I had gone. What a change that was! I would see trees, I would go into the huts of the villagers, I did not have to be dressed like a king all the time. And you know how where our Grandfather is, no sorrow, worries or grave faces cannot last for very long. He fills the air around himself with song, music and laughter. He is surrounded by joy, felicity and peace. As soon I went there I would forget that I was the crown prince of Jessore. What comfort in such forgetfulness! Eventually when I turned eighteen, it was spring in Raigarh and in that spring, surrounded by the green of the groves, I saw Rukmini.’

Chokher Bali 3/চোখের বালি ৩

CB 3

রাত্রে মহেন্দ্রের ভালো নিদ্রা হইল না। প্রত্যুষেই সে বিহারীর বাসায় আসিয়া উপস্থিত। কহিল, “ভাই, ভাবিয়া দেখিলাম, কাকীমার মনোগত ইচ্ছা আমিই তাঁহার বোনঝিকে বিবাহ করি।”

বিহারী কহিল, “সেজন্য তো হঠাৎ নূতন করিয়া ভাবিবার কোনো দরকার ছিল না। তিনি তো ইচ্ছা নানাপ্রকারেই ব্যক্ত করিয়াছেন।”

মহেন্দ্র কহিল, “তাই বলিতেছি, আমার মনে হয়, আশাকে আমি বিবাহ না করিলে তাঁহার মনে একটা খেদ থাকিয়া যাইবে।”

বিহারী কহিল, “সম্ভব বটে।”

মহেন্দ্র কহিল, “আমার মনে হয়, সেটা আমার পক্ষে নিতান্ত অন্যায় হইবে।”

বিহারী কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক উৎসাহের সহিত কহিল, “বেশ কথা, সে তো ভালো কথা, তুমি রাজি হইলে তো আর কোনো কথাই থাকে না। এ কর্তব্যবুদ্ধি কাল তোমার মাথায় আসিলেই তো ভালো হইত।”

মহেন্দ্র। একদিন দেরিতে আসিয়া কী এমন ক্ষতি হইল।

যেই বিবাহের প্রস্তাবে মহেন্দ্র মনকে লাগাম ছাড়িয়া দিল, সেই তাহার পক্ষে ধৈর্য রক্ষা করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল। তাহার মনে হইতে লাগিল, “আর অধিক কথাবার্তা না হইয়া কাজটা সম্পন্ন হইয়া গেলেই ভালো হয়।’

মাকে গিয়া কহিল, “আচ্ছা মা, তোমার অনুরোধ রাখিব। বিবাহ করিতে রাজি হইলাম।”

মা মনে মনে কহিলেন, “বুঝিয়াছি, সেদিন মেজোবউ কেন হঠাৎ তাহার বোনঝিকে দেখিতে চলিয়া গেল এবং মহেন্দ্র সাজিয়া বাহির হইল।’

তাঁহার বারংবার অনুরোধ অপেক্ষা অন্নপূর্ণার চক্রান্ত যে সফল হইল, ইহাতে তিনি সমস্ত বিশ্ববিধানের উপর অসন্তুষ্ট হইয়া উঠিলেন। বলিলেন, “একটি ভালো মেয়ে সন্ধান করিতেছি।”

মহেন্দ্র আশার উল্লেখ করিয়া কহিল, “কন্যা তো পাওয়া গেছে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে কন্যা হইবে না বাছা, তাহা আমি বলিয়া রাখিতেছি।”

মহেন্দ্র যথেষ্ট সংযত ভাষায় কহিল, “কেন মা, মেয়েটি তো মন্দ নয়।”

রাজলক্ষ্মী। তাহার তিন কুলে কেহ নাই, তাহার সহিত বিবাহ দিয়া আমার কুটুম্বের সুখ কী হইবে।

মহেন্দ্র। কুটুম্বের সুখ না হইলেও আমি দুঃখিত হইব না, কিন্তু মেয়েটিকে আমার বেশ পছন্দ হইয়াছে মা।

ছেলের জেদ দেখিয়া রাজলক্ষ্মীর চিত্ত আরো কঠিন হইয়া উঠিল। অন্নপূর্ণাকে গিয়া কহিলেন, “বাপ-মা-মরা অলক্ষণা কন্যার সহিত আমার এক ছেলের বিবাহ দিয়া তুমি আমার ছেলেকে আমার কাছ হইতে ভাঙাইয়া লইতে চাও? এতবড়ো শয়তানি!”

অন্নপূর্ণা কাঁদিয়া কহিলেন, “মহিনের সঙ্গে বিবাহের কোনো কথাই হয় নাই, সে আপন ইচ্ছামত তোমাকে কী বলিয়াছে আমিও জানি না।”

মহেন্দ্রের মা সে কথা কিছুমাত্র বিশ্বাস করিলেন না। তখন অন্নপূর্ণা বিহারীকে ডাকাইয়া সাশ্রুনেত্রে কহিলেন, “তোমার সঙ্গেই তো সব ঠিক হইয়াছিল, আবার কেন উল্‌টাইয়া দিলে। আবার তোমাকেই মত দিতে হইবে। তুমি উদ্ধার না করিলে আমাকে বড়ো লজ্জায় পড়িতে হইবে। মেয়েটি বড়ো লক্ষ্মী, তোমার অযোগ্য হইবে না।”

বিহারী কহিল, “কাকীমা, সে কথা আমাকে বলা বাহুল্য। তোমার বোনঝি যখন, তখন আমার অমতের কোনো কথাই নাই। কিন্তু মহেন্দ্র–”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “না বাছা, মহেন্দ্রের সঙ্গে তাহার কোনোমতেই বিবাহ হইবার নয়। আমি তোমাকে সত্য কথাই বলিতেছি, তোমার সঙ্গে বিবাহ হইলেই আমি সব চেয়ে নিশ্চিন্ত হই। মহিনের সঙ্গে সম্বন্ধে আমার মত নাই।”

বিহারী কহিল, “কাকী, তোমার যদি মত না থাকে, তাহা হইলে কোনো কথাই নাই।”

এই বলিয়া সে রাজলক্ষ্মীর নিকটে গিয়া কহিল,”মা, কাকীর বোনঝির সঙ্গে আমার বিবাহ স্থির হইয়া গেছে, আত্মীয় স্ত্রীলোক কেহ কাছে নাই– কাজেই লজ্জার মাথা খাইয়া নিজেই খবরটা দিতে হইল।”

রাজলক্ষ্মী। বলিস কী বিহারী। বড়ো খুশি হইলাম। মেয়েটি লক্ষ্মী মেয়ে, তোর উপযুক্ত। এ মেয়ে কিছুতেই হাতছাড়া করিস নে।

বিহারী। হাতছাড়া কেন হইবে। মহিনদা নিজে পছন্দ করিয়া আমার সঙ্গে সম্বন্ধ করিয়া দিয়াছেন।

এই-সকল বাধাবিঘ্নে মহেন্দ্র দ্বিগুণ উত্তেজিত হইয়া উঠিল। সে মা ও কাকীর উপর রাগ করিয়া একটা দীনহীন ছাত্রাবাসে গিয়া আশ্রয় লইল।

রাজলক্ষ্মী কাঁদিয়া অন্নপূর্ণার ঘরে উপস্থিত হইলেন; কহিলেন, “মেজোবউ, আমার ছেলে বুঝি উদাস হইয়া ঘর ছাড়িল, তাহাকে রক্ষা করো।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “দিদি, একটু ধৈর্য ধরিয়া থাকো, দুদিন বাদেই তাহার রাগ পড়িয়া যাইবে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তুমি তাহাকে জান না। সে যাহা চায়, না পাইলে যাহা-খুশি করিতে পারে। তোমার বোনঝির সঙ্গে যেমন করিয়া হউক, তার–”

অন্নপূর্ণা। দিদি, সে কী করিয়া হয়– বিহারীর সঙ্গে কথাবার্তা একপ্রকার পাকা হইয়াছে।

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে ভাঙিতে কতক্ষণ।” বলিয়া বিহারীকে ডাকিয়া কহিলেন,”বাবা, তোমার জন্য ভালো পাত্রী দেখিয়া দিতেছি, এই কন্যাটি ছাড়িয়া দিতে হইবে, এ তোমার যোগ্যই নয়।”

বিহারী কহিল, “না মা, সে হয় না। সে-সমস্তই ঠিক হইয়া গেছে।”

তখন রাজলক্ষ্মী অন্নপূর্ণাকে গিয়া কহিলেন, “আমার মাথা খাও মেজোবউ, তোমার পায়ে ধরি, তুমি বিহারীকে বলিলেই সব ঠিক হইবে।”

অন্নপূর্ণা বিহারীকে কহিলেন, “বিহারী, তোমাকে বলিতে আমার মুখ সরিতেছে না, কিন্তু কী করি বলো। আশা তোমার হাতে পড়িলেই আমি বড়ো নিশ্চিন্ত হইতাম, কিন্তু সব তো জানিতেছই–”

বিহারী। বুঝিয়াছি কাকী। তুমি যেমন আদেশ করিবে, তাহাই হইবে। কিন্তু আমাকে আর কখনো কাহারো সঙ্গে বিবাহের জন্য অনুরোধ করিয়ো না।

বলিয়া বিহারী চলিয়া গেল। অন্নপূর্ণার চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল, মহেন্দ্রের অকল্যাণ-আশঙ্কায় মুছিয়া ফেলিলেন। বার বার মনকে বুঝাইলেন-যাহা হইল, তাহা ভালোই হইল।

এইরূপ রাজলক্ষ্মী অন্নপূর্ণা এবং মহেন্দ্রের মধ্যে নিষ্ঠুর নিগূঢ় নীরব ঘাত-প্রতিঘাত চলিতে চলিতে বিবাহের দিন সমাগত হইল। বাতি উজ্জ্বল হইয়া জ্বলিল, সানাই মধুর হইয়া বাজিল, মিষ্টান্নে মিষ্টের ভাগ লেশমাত্র কম পড়িল না।

আশা সজ্জিতসুন্দরদেহে লজ্জিতমুগ্ধমুখে আপন নূতন সংসারে প্রথম পদার্পণ করিল; তাহার এই কুলায়ের মধ্যে কোথাও যে কোনো কণ্টক আছে, তাহা তাহার কম্পিত-কোমল হৃদয় অনুভব করিল না; বরঞ্চ জগতে তাহার একমাত্র মাতৃস্থানীয়া অন্নপূর্ণার কাছে আসিতেছে বলিয়া আশ্বাসে ও আনন্দে তাহার সর্বপ্রকার ভয় সংশয় দূর হইয়া গেল।

বিবাহের পর রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রকে ডাকিয়া কহিলেন, “আমি বলি, এখন বউমা কিছুদিন তাঁর জেঠার বাড়ি গিয়াই থাকুন।”

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “কেন মা।”

মা কহিলেন, “এবারে তোমার এক্‌জামিন আছে, পড়াশুনার ব্যাঘাত হইতে পারে।”

মহেন্দ্র। আমি কি ছেলেমানুষ। নিজের ভালোমন্দ বুঝে চলিতে পারি না?

রাজলক্ষ্মী। তা হোক-না বাপু, আর-একটা বৎসর বৈ তো নয়।

মহেন্দ্র কহিল, “বউয়ের বাপ-মা যদি কেহ থাকিতেন, তাহাদের কাছে পাঠাইতে আপত্তি ছিল না-কিন্তু জেঠার বাড়িতে আমি উহাকে রাখিতে পারিব না।”

রাজলক্ষ্মী। (আত্মগত) ওরে বাস্‌ রে! উনিই কর্তা, শাশুড়ি কেহ নয়! কাল বিয়ে করিয়া আজই এত দরদ! কর্তারা তো আমাদেরও একদিন বিবাহ করিয়াছিলেন, কিন্তু এমন স্ত্রৈণতা, এমন বেহায়াপনা তো তখন ছিল না!

মহেন্দ্র খুব জোরের সহিত কহিল, “কিছু ভাবিয়ো না মা। একজামিনের কোনো ক্ষতি হইবে না।”

Chokher Bali 3

3

Mahendra did not sleep well that night. He was at Bihari’s house as soon as it was dawn.
‘The more I think about it, it seems to me that it is my aunt’s secret wish that I marry her niece,’ he said.

Bihari said, ‘There was no need to think about it. She has already expressed her wish in many different ways.’

Mahendra answered, ‘That is why I have the feeling, if I do not marry Asha my aunt will feel let down.’

‘That is quite possible,’ Bihari agreed.

Mahendra said, ‘I feel that will be very wrong of me.’

Bihari seemed to answer with more than the necessary eagerness, ‘This is great news, nothing will be better than your approval. It would have been good if this sense of responsibility had shown itself yesterday.’

Mahendra asked, ‘What is the harm in approval albeit a day later?’

As soon as Mahendra allowed his mind to accept the proposal, he found it hard to remain objective about the marriage. He kept thinking, ‘It is best to have things happen without wasting time in discussions.’

He went to his mother and said, ‘Fine, I will go along with your idea. I am ready to get married.’

His mother thought to herself, ‘Now I understand why my sister-in-law suddenly went off to see her niece and why Mahendra went out dressed like a dandy.’

She was dissatisfied with the whole scheme of things because her repeated requests to Mahendra had failed where her sister-in-law’s cunning plan had succeeded. She said, ‘I will look for a good girl then.’

Mahendra mentioned Asha and said, ‘But a girl has been found.’

Rajlakshmi answered, ‘That girl will not do son, I am telling you right now.’

Mahendra answered calmly, ‘Why Ma, she is not that bad.’

Rajlakshmi: She has no family to speak of, who will I call my in laws?

Mahendra: I have to admit the lack of in-laws does not pain me as I really like this girl.

When she saw how determined her son was, Rajlakshmi’s resolve hardened. She went to Annapurna and said, ‘You think you can steal my son from me by getting your orphaned niece married off to him? How wicked of you!’
Annapurna wept at the accusations and said, ‘There has been no talk of her marrying Mahin, I do not even know what he has told you.’

Mahendra’s mother did not believe a word. Annapurna then called for Bihari and said to him in tears, ‘Everything was fixed with you, what happened? You must agree again. If you do not marry her I will be very ashamed. She is a very good girl; she will be perfect for you.’

Bihari answered, ‘Aunt, you do not need to tell me that. When she is your niece, there is no question of me disagreeing to the marriage. But Mahendra….’

Annapurna answered, ‘No, my son, she should not marry Mahin at all. I am telling you the truth, I will be most relieved if she marries you. I do not approve of the match with Mahin.’

Bihari said, ‘Aunt, if you do not approve, there can be no discussion about this.’

He then went to Rajlakshmi and said to her, ‘Ma, my marriage has been fixed with Aunt’s niece, as I have no female relatives I must shamelessly give you this news myself.’
Rajlakshmi: That is great news. I am very happy. The girl is very good, she will be just right for you. Do not let this girl go.’
Bihari said, ‘Why would I let her go. Mahin himself has organised this match.

Mahendra became doubly angered by these events hindering him from marrying Asha. He decided to punish his mother and aunt by moving into a very average hostel for students.

Rajlakshmi now went to Annapurna in tears and said, ‘Sister, I think my son has run away in desperation, please help me get him back.’

Annapurna assured her, ‘Have a little patience, he will calm down in a couple of days.’

But Rajlakshmi pleaded, ‘You do not know him. If he does not get what he wants he can do anything. Please do something, anything to get your niece to marry him..’

Annapurna: Sister! How can that be – everything is almost fixed with Bihari.’

Rajlakshmi said, ‘How long before that is cancelled!’ She then proceeded to talk to Bihari saying, ‘I will find a good wife for you, let this one go, she is no good for you.’
Bihari said, ‘No mother, that cannot be. Everything is decided.’

Rajlakshmi then went back to Annapurna, ‘Please, I will give you anything you want, but do talk to Bihari about the girl. He will listen to you.’

Annapurna said to Bihari, ‘I feel so embarassed I can hardly say this to you, but I am helpless. I would have been happiest if you had married Asha, but you know what is going on..’
Bihari: I understand Aunt. It will be as you wish. But never ever ask me to marry anyone again.’

Bihari went away leaving Annapurna in tears that she tried to suppress fearing they would bring bad luck to Mahendra. She told herself again and again; whatever has happened is for the best.

This bitter, silent war went on between Rajlakshmi, Annapurna and Mahendra till the day of the wedding was upon them. Then all the lights were brightly lit, the flutes played their sweetest tunes and there was no lack of sweetness in any of the dishes prepared.

Asha stepped into her new family home for the first time, beautifully dressed and shy with wonder; her gentle fearful heart blissfully unaware of any thorns in this nest of hers. She was filled with relief and joy as she was finally coming to live with the only person who had been like a mother to her.

Rajlakshmi said to Mahendra after the marriage, ‘I think it is best that my daughter-in-law should go and stay with her uncle for a few days.’

Mahendra asked, ‘Why Ma?’

His mother answered, ‘You have examinations soon, there may be disruptions to your studies.’

Mahendra: Am I a child? Am I not capable of doing what is right for myself?’

Rajlakshmi: Do not carry on so. It is not more than a year, is it?’

Mahendra said, ‘If she had parents to go to, I would not mind sending her away – but I cannot send her to stay in her uncle’s home.’

Rajlakshmi said to herself, ‘Dear Lord! As if he is the master, and I am no one! You just got married yesterday and such love already! We too have been married once, but then there was never such excessive fondness, shameless display in those times.’

Mahendra then said with some force, ‘Do not worry at all Ma, there will be no problems with my studies.’