Archive | May 2013

Four songs of rain: আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে, আজ বরষার রূপ হেরি, আজি বরিষনমুখরিত, এসেছিলে তবু আস নাই

G_Tagore_Tagore
Painting by Gaganendranath Tagore, who was a nephew of Rabindranath Tagore

আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে গোপন তব চরণ ফেলে
নিশার মতো, নীরব ওহে, সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।
প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি, বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,
নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে॥
কূজনহীন কাননভূমি, দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে–
একেলা কোন্ পথিক তুমি পথিকহীন পথের ‘পরে।
হে একা সখা, হে প্রিয়তম, রয়েছে খোলা এ ঘর মম,
সমুখ দিয়ে স্বপনসম যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে॥

রাগ: গৌড়মল্লার
তাল: ঝম্পক
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): আষাঢ়, ১৩১৬
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1909
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Today in rain soaked enchantment, come on secret steps

Just as the night arrives shrouded in silence, evading all eyes.

The morning sleeps on, the wind calls on it in vain,

Dense clouds veil the shameless blue of the sky.

All the birds sleep, silent the forest, the doors barred to each house –

While you walk alone on these silent unpeopled paths.

Dearest friend, for you my doors remain open,

Do not pass by like a dream pushing my hopes aside.

Raga: Gaudmalhar
Beat: Jhampak
Written in 1909
Written in Santiniketan

Follow the links to hear:
Debabrata Biswas: http://youtu.be/6PIW4YdFJKI
Rezwana Chowdhury Banya: http://youtu.be/raPAFnuPIqA

***

আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে–
চলেছে গরজি, চলেছে নিবিড় সাজে॥
হৃদয়ে তাহার নাচিয়া উঠিছে ভীমা,
ধাইতে ধাইতে লোপ ক’রে চলে সীমা,
কোন্ তাড়নায় মেঘের সহিত মেঘে
বক্ষে বক্ষে মিলিয়া বজ্র বাজে॥
পুঞ্জে পুঞ্জে দূরে সুদূরের পানে
দলে দলে চলে, কেন চলে নাহি জানে।
জানে না কিছুই কোন্ মহাদ্রিতলে
গভীর শ্রাবণে গলিয়া পড়িবে জলে,
নাহি জানে তার ঘনঘোর সমারোহে
কোন্ সে ভীষণ জীবন মরণ রাজে॥

রাগ: অজ্ঞাত
তাল: অজ্ঞাত
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১১ আষাঢ়, ১৩১৭
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1910
রচনাস্থান: বোলপুর

Today I see the glorious rains

Marching along in thunder, adorned in dense cloud.

Hearts awake in great courage,

They break all obstacles as they pass,

What drives cloud to clash against cloud?

And thunder to ring out from their souls.

In great groups they travel far and wide

Where do they go, whom do they seek?

They know not where under which mountain peak

They will shed their tears as rains pour down,

They know not that in the midst of the fanfare

Life and death endlessly battle, waging a great war.

Raga: Unknown
Beat: Unknown
Written on the 11th day of AshaR, 1910
Written in Bolpur

***

আজি বরিষনমুখরিত শ্রাবণরাতি,
স্মৃতিবেদনার মালা একেলা গাঁথি॥
আজি কোন্ ভুলে ভুলি আঁধার ঘরেতে রাখি দুয়ার খুলি,
মনে হয় বুঝি আসিছে সে মোর দুখরজনীর সাথি॥
আসিছে সে ধারাজলে সুর লাগায়ে,
নীপবনে পুলক জাগায়ে।
যদিও বা নাহি আসে তবু বৃথা আশ্বাসে
ধুলি-‘পরে রাখিব রে মিলন-আসনখানি পাতি॥

রাগ: পঞ্চম
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২১ শ্রাবণ, ১৩৪২
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ৬ অগাস্ট, ১৯৩৫
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

Tonight the rains serenade the world,

As I string my memories alone in a garland of pain.

What makes me leave open the doors to my darkened room?

Perhaps I hope that he will come to keep me company on this night.

He comes in the tune of the dripping rain,

Thrilling the palm fronds with his touch.

Even if he should forget, I will still in hope

Lay out a seat for him upon the dust.

Raga: Pancham
Beat: Kaharba
Written on 6th August, 1935
Written in Santiniketan

Follow the links to hear:

Swagatalakshmi Dasgupta: http://youtu.be/xxwqwEPwKbE
A duet: http://youtu.be/hP6onCAf0KI
Kabir Suman: http://youtu.be/dGWe_9YeoRY

***

এসেছিলে তবু আস নাই জানায়ে গেলে
সমুখের পথ দিয়ে পলাতকা ছায়া ফেলে॥
তোমার সে উদাসীনতা সত্য কিনা জানি না সে,
চঞ্চল চরণ গেল ঘাসে ঘাসে বেদনা মেলে॥
তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল,
শ্যামল বনান্তভূমি করে ছলোছল্।
তুমি চলে গেছ ধীরে ধীরে সিক্ত সমীরে,
পিছনে নীপবীথিকায় রৌদ্রছায়া যায় খেলে॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: ২ + ২ ছন্দ
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1346
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1939
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

You came to me and yet it feels so empty, leaving me

A message in the fading shadows on the path.

I will never know whether you have ignored me

As you walk away on quick steps, marking the grass with my pain.

Drops quiver on each green leaf as the forest itself seems to weep.

As you leave slowly, in the rain soaked breeze

Your shadow lingers to play with sunshine among the trees.

Raga: Bhairavi
Beat: 2 + 2
Written in 1939

Follow the links to hear:
Debabrata Biswas: http://youtu.be/CpPNCLp2lKY
Rezwana Chowdhury Banya: http://youtu.be/iTgjSQVEOxI

Advertisements

Chokher Bali 7/চোখের বালি ৭

courtesan-kalighat-painting-PA02_l

রাজলক্ষ্মী জন্মভূমিতে পৌঁছিলেন। বিহারী তাঁহাকে পৌঁছাইয়া চলিয়া আসিবে এরূপ কথা ছিল; কিন্তু সেখানকার অবস্থা দেখিয়া, সে ফিরিল না।

রাজলক্ষ্মীর পৈতৃক বাটিতে দুই-একটি অতিবৃদ্ধা বিধবা বাঁচিয়া ছিলেন মাত্র। চারি দিকে ঘন জঙ্গল ও বাঁশবন, পুষ্করিণীর জল সবুজবর্ণ, দিনে-দুপুরে শেয়ালের ডাকে রাজলক্ষ্মীর চিত্ত উদ্‌ভ্রান্ত হইয়া উঠে।

বিহারী কহিল, “মা, জন্মভূমি বটে, কিন্তু “স্বর্গাদপি গরীয়সী’ কোনোমতেই বলিতে পারি না। কলিকাতায় চলো। এখানে তোমাকে পরিত্যাগ করিয়া গেলে আমার অধর্ম হইবে।”

রাজলক্ষ্মীরও প্রাণ হাঁপাইয়া উঠিয়াছিল। এমন সময় বিনোদিনী আসিয়া তাঁহাকে আশ্রয় দিল এবং আশ্রয় করিল।

বিনোদিনীর পরিচয় প্রথমেই দেওয়া হইয়াছে। এক সময়ে মহেন্দ্র এবং তদভাবে বিহারীর সহিত তাহার বিবাহের প্রস্তাব হইয়াছিল। বিধিনির্বন্ধে যাহার সহিত তাহার শুভবিবাহ হয়, সে লোকটির সমস্ত অন্তরিন্দ্রিয়ের মধ্যে প্লীহাই ছিল সর্বাপেক্ষা প্রবল। সেই প্লীহার অতিভারেই সে দীর্ঘকাল জীবনধারণ করিতে পারিল না।

তাহার মৃত্যুর পর হইতে বিনোদিনী, জঙ্গলের মধ্যে একটিমাত্র উদ্যানলতার মতো, নিরানন্দ পল্লীর মধ্যে মুহ্যমান ভাবে জীবনযাপন করিতেছিল। অদ্য সেই অনাথা আসিয়া তাহার রাজলক্ষ্মী পিস্‌শাশঠাকরুণকে ভক্তিভরে প্রণাম করিল এবং তাঁহার সেবায় আত্মসমর্পণ করিয়া দিল।

সেবা ইহাকেই বলে। মুহূর্তের জন্য আলস্য নাই। কেমন পরিপাটি কাজ, কেমন সুন্দর রান্না, কেমন সুমিষ্ট কথাবার্তা।

রাজলক্ষ্মী বলেন, “বেলা হইল মা, তুমি দুটি খাও গে যাও।”

সে কি শোনে? পাখা করিয়া পিসীমাকে ঘুম না পাড়াইয়া সে উঠে না।

রাজলক্ষ্মী বলেন, “এমন করিলে যে তোমার অসুখ করিবে মা।”

বিনোদিনী নিজের প্রতি নিরতিশয় তাচ্ছিল্য প্রকাশ করিয়া বলে, “আমাদের দুঃখের শরীরে অসুখ করে না পিসিমা। আহা কতদিন পরে জন্মভূমিতে আসিয়াছ, এখানে কী আছে, কী দিয়া তোমাকে আদর করিব।”

বিহারী দুইদিনে পাড়ার কর্তা হইয়া উঠিল। কেহ তার কাছে রোগের ঔষধ কেহ-বা মোকদ্দমার পরামর্শ লইতে আসে, কেহ-বা নিজের ছেলেকে বড়ো আপিসে কাজ জুটাইয়া দিবার জন্য তাহাকে ধরে, কেহ-বা তাহার কাছে দরখাস্ত লিখাইয়া লয়। বৃদ্ধদের তাসপাশার বৈঠক হইতে বাগ্‌দিদের তাড়িপানসভা পর্যন্ত সর্বত্র সে তাহার সকৌতুক কৌতূহল এবং স্বাভাবিক হৃদ্যতা লইয়া যাতায়াত করিত– কেহ তাহাকে দূর মনে করিত না, অথচ সকলেই তাহাকে সম্মান করিত।

বিনোদিনী এই অস্থানে পতিত কলিকাতার ছেলেটির নির্বাসনদণ্ডও যথাসাধ্য লঘু করিবার জন্য অন্তঃপুরের অন্তরাল হইতে চেষ্টা করিত। বিহারী প্রত্যেক বার পাড়া পর্যটন করিয়া আসিয়া দেখিত, কে তাহার ঘরটিকে প্রত্যেক বার পরিপাটি পরিচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে, একটি কাঁসার গ্লাসে দু-চারটি ফুল এবং পাতার তোড়া সাজাইয়াছে এবং তাহার গদির এক ধারে বঙ্কিম ও দীনবন্ধুর গ্রন্থাবলী গুছাইয়া রাখিয়াছে। গ্রন্থের ভিতরের মলাটে মেয়েলি অথচ পাকা অক্ষরে বিনোদিনীর নাম লেখা।

পল্লীগ্রামের প্রচলিত আতিথ্যের সহিত ইহার একটু প্রভেদ ছিল। বিহারী তাহারই উল্লেখ করিয়া প্রশংসাবাদ করিলে রাজলক্ষ্মী কহিতেন, “এই মেয়েকে কিনা তোরা অগ্রাহ্য করিলি।”

বিহারী হাসিয়া কহিত, “ভালো করি নাই মা, ঠকিয়াছি। কিন্তু বিবাহ না করিয়া ঠকা ভালো, বিবাহ করিয়া ঠকিলেই মুশকিল।”

রাজলক্ষ্মী কেবলই মনে করিতে লাগিলেন, “আহা, এই মেয়েই তো আমার বধূ হইতে পারিত। কেন হইল না।’

রাজলক্ষ্মী কলিকাতায় ফিরিবার প্রসঙ্গমাত্র উত্থাপন করিলে বিনোদিনীর চোখ ছলছল করিয়া উঠিত। সে বলিত, “পিসিমা, তুমি দুদিনের জন্যে কেন এলে! যখন তোমাকে জানিতাম না, দিন তো একরকম করিয়া কাটিত। এখন তোমাকে ছাড়িয়া কেমন করিয়া থাকিব।”

রাজলক্ষ্মী মনের আবেগে বলিয়া ফেলিতেন, “মা, তুই আমার ঘরের বউ হলি নে কেন, তা হইলে তোকে বুকের মধ্যে করিয়া রাখিতাম।”

সে কথা শুনিয়া বিনোদিনী কোনো ছুতায় লজ্জায় সেখান হইতে উঠিয়া যাইত।

রাজলক্ষ্মী কলিকাতা হইতে একটা কাতর অনুনয়পত্রের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁহার মহিন জন্মাবধি কখনো এতদিন মাকে ছাড়িয়া থাকে নাই– নিশ্চয় এতদিনে মার বিচ্ছেদ তাহাকে অধীর করিয়া তুলিতেছে। রাজলক্ষ্মী তাঁহার ছেলের অভিমান এবং আবদারের সেই চিঠিখানির জন্য তৃষিত হইয়া ছিলেন।

বিহারী মহেন্দ্রের চিঠি পাইল। মহেন্দ্র লিখিয়াছে, “মা বোধ হয় অনেক দিন পরে জন্মভূমিতে গিয়া বেশ সুখে আছেন।”

রাজলক্ষ্মী ভাবিলেন, “আহা, মহেন্দ্র অভিমান করিয়া লিখিয়াছে। সুখে আছেন! হতভাগিনী মা নাকি মহেন্দ্রকে ছাড়িয়া কোথাও সুখে থাকিতে পারে।’

“ও বিহারী, তার পরে মহিন কী লিখিয়াছে, পড়িয়া শোনা না বাছা।”

বিহারী কহিল, “তার পরে কিছুই না মা।” বলিয়া চিঠিখানা মুঠার মধ্যে দলিত করিয়া একটা বহির মধ্যে পুরিয়া ঘরের এক কোণে ধপ করিয়া ফেলিয়া দিল।

রাজলক্ষ্মী কি আর স্থির থাকিতে পারেন। নিশ্চয়ই মহিন মার উপর এমন রাগ করিয়া লিখিয়াছে যে, বিহারী তাঁহাকে পড়িয়া শোনাইল না।

বাছুর যেমন গাভীর স্তনে আঘাত করিয়া দুগ্ধ এবং বাৎসল্যের সঞ্চার করে, মহেন্দ্রের রাগ তেমনি রাজলক্ষ্মীকে আঘাত করিয়া তাঁহার অবরুদ্ধ বাৎসল্যকে উৎসারিত করিয়া দিল। তিনি মহেন্দ্রকে ক্ষমা করিলেন। কহিলেন, “আহা, বউ লইয়া মহিন সুখে আছে, সুখে থাক্‌– যেমন করিয়া হোক সে সুখী হোক। বউকে লইয়া আমি তাহাকে আর কোনো কষ্ট দিব না। আহা, যে মা কখনো তাহাকে এক দণ্ড ছাড়িয়া থাকিতে পারে না সেই মা চলিয়া আসিয়াছে বলিয়া মহিন মার “পরে রাগ করিয়াছে!’ বার বার তাঁর চোখ দিয়া জল উছলিয়া উঠিতে লাগিল।

সেদিন রাজলক্ষ্মী বিহারীকে বার বার আসিয়া বলিলেন, “যাও বাবা, তুমি স্নান করো গে যাও। এখানে তোমার বড়ো অনিয়ম হইতেছে।”

বিহারীরও সেদিন স্নানাহারে যেন প্রবৃত্তি ছিল না; সে কহিল, “মা, আমার মতো লক্ষ্মীছাড়ারা অনিয়মেই ভালো থাকে।”

রাজলক্ষ্মী পীড়াপীড়ি করিয়া কহিলেন, “না বাছা, তুমি স্নান করিতে যাও।”

বিহারী সহস্র বার অনুরুদ্ধ হইয়া নাহিতে গেল। সে ঘরের বাহির হইবামাত্রই রাজলক্ষ্মী বহির ভিতর হইতে তাড়াতাড়ি সেই কুঞ্চিতদলিত চিঠিখানি বাহির করিয়া লইলেন।

বিনোদিনীর হাতে চিঠি দিয়া কহিলেন, “দেখো তো মা, মহিন বিহারীকে কী লিখিয়াছে।”

বিনোদিনী পড়িয়া শুনাইতে লাগিল। মহেন্দ্র প্রথমটা মার কথা লিখিয়াছে; কিন্তু সে অতি অল্পই, বিহারী যতটুকু শুনাইয়াছিল তাহার অধিক নহে।

তার পরেই আশার কথা। মহেন্দ্র রঙ্গে রহস্যে আনন্দে যেন মাতাল হইয়া লিখিয়াছে।

বিনোদিনী একটুখানি পড়িয়া শুনাইয়াই লজ্জিত হইয়া থামিয়া কহিল, “পিসিমা, ও আর কী শুনিবে।”

রাজলক্ষ্মীর স্নেহব্যগ্র মুখের ভাব এক মুহূর্তের মধ্যেই পাথরের মতো শক্ত হইয়া যেন জমিয়া গেল। রাজলক্ষ্মী একটুখানি চুপ করিয়া রহিলেন, তার পরে বলিলেন, “থাক্‌।” বলিয়া চিঠি ফেরত না লইয়াই চলিয়া গেলেন।

বিনোদিনী সেই চিঠিখানা লইয়া ঘরে ঢুকিল। ভিতর হইতে দ্বার বন্ধ করিয়া বিছানার উপর বসিয়া পড়িতে লাগিল।

চিঠির মধ্যে বিনোদিনী কী রস পাইল, তাহা বিনোদিনীই জানে। কিন্তু তাহা কৌতুকরস নহে। বার বার করিয়া পড়িতে পড়িতে তাহার দুই চক্ষু মধ্যাহ্নের বালুকার মতো জ্বলিতে লাগিল, তাহার নিশ্বাস মরুভূমির বাতাসের মতো উত্তপ্ত হইয়া উঠিল।

মহেন্দ্র কেমন, আশা কেমন, মহেন্দ্র-আশার প্রণয় কেমন, ইহাই তাহার মনের মধ্যে কেবলই পাক খাইতে লাগিল। চিঠিখানা কোলের উপর চাপিয়া ধরিয়া পা ছড়াইয়া দেয়ালের উপর হেলান দিয়া অনেকক্ষণ সম্মুখে চাহিয়া বসিয়া রহিল।

মহেন্দ্রের সে চিঠি বিহারী আর খুঁজিয়া পাইল না।

সেইদিন মধ্যাহ্নে হঠাৎ অন্নপূর্ণা আসিয়া উপস্থিত। দুঃসংবাদের আশঙ্কা করিয়া রাজলক্ষ্মীর বুকটা হঠাৎ কাঁপিয়া উঠিল– কোনো প্রশ্ন করিতে তিনি সাহস করিলেন না, অন্নপূর্ণার দিকে পাংশুবর্ণ মুখে চাহিয়া রহিলেন।

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “দিদি, কলিকাতার খবর সব ভালো।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তবে তুমি এখানে যে?”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “দিদি, তোমার ঘরকন্নার ভার তুমি লও’সে। আমার আর সংসারে মন নাই। আমি কাশী যাইব বলিয়া যাত্রা করিয়া বাহির হইয়াছি। তাই তোমাকে প্রণাম করিতে আসিলাম। জ্ঞানে অজ্ঞানে অনেক অপরাধ করিয়াছি, মাপ করিয়ো। আর তোমার বউ, (বলিতে বলিতে চোখ ভরিয়া উঠিয়া জল পড়িতে লাগিল) সে ছেলেমানুষ, তার মা নাই, সে দোষী হোক নির্দোষ হোক সে তোমার।” আর বলিতে পারিলেন না।

রাজলক্ষ্মী ব্যস্ত হইয়া তাঁহার স্নানাহারের ব্যবস্থা করিতে গেলেন। বিহারী খবর পাইয়া গদাই ঘোষের চণ্ডীমণ্ডপ হইতে ছুটিয়া আসিল। অন্নপূর্ণাকে প্রণাম করিয়া কহিল, “কাকীমা, সে কি হয়? আমাদের তুমি নির্মম হইয়া ফেলিয়া যাইবে?”

অন্নপূর্ণা অশ্রু দমন করিয়া কহিলেন, “আমাকে আর ফিরাইবার চেষ্টা করিস নে, বেহারি– তোরা সবে সুখে থাক্‌, আমার জন্যে কিছুই আটকাইবে না।”

বিহারী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তার পরে কহিল, “মহেন্দ্রের ভাগ্য মন্দ, তোমাকে সে বিদায় করিয়া দিল।”

অন্নপূর্ণা চকিত হইয়া কহিলেন, “অমন কথা বলিস নে। আমি মহিনের উপর কিছুই রাগ করি নাই। আমি না গেলে সংসারের মঙ্গল হইবে না।”

বিহারী দূরের দিকে চাহিয়া নীরবে বসিয়া রহিল। অন্নপূর্ণা অঞ্চল হইতে এক জোড়া মোটা সোনার বালা খুলিয়া কহিলেন, “বাবা, এই বালাজোড়া তুমি রাখো– বউমা যখন আসিবেন, আমার আশীর্বাদ দিয়া তাঁহাকে পরাইয়া দিয়ো।”

বিহারী বালাজোড়া মাথায় ঠেকাইয়া অশ্রু সংবরণ করিতে পাশের ঘরে চলিয়া গেল।

বিদায়কালে অন্নপূর্ণা কহিলেন, “বেহারি, আমার মহিনকে আর আমার আশাকে দেখিস।” রাজলক্ষ্মীর হস্তে একখানি কাগজ দিয়া বলিলেন, “শ্বশুরের সম্পত্তিতে আমার যে অংশ আছে, তাহা এই দানপত্রে মহেন্দ্রকে লিখিয়া দিলাম। আমাকে কেবল মাসে মাসে পনেরোটি করিয়া টাকা পাঠাইয়া দিয়ো।”

বলিয়া ভূতলে পড়িয়া রাজলক্ষ্মীর পদধূলি মাথায় তুলিয়া লইলেন এবং বিদায় হইয়া তীর্থোদ্দেশে যাত্রা করিলেন।

7
Rajlakshmi reached her home. Bihari had planned to settle her there and leave but he could not do that after seeing the condition of the house.

There were only a couple of ancient widows remaining in the house. It was overgrown all around, the pond water was green with neglect and algae and Rajlakshmi’s soul quaked at the sounds of jackals yelping nearby in the day time.

Bihari said, ‘Mother, even though this is your home, I cannot say that it is much of a haven any more. Let us go back to Kolkata. It would be a sin to abandon you here.’

Rajlakshmi too had had enough. But Binodini appeared on the scene, both seeking company and giving it back in equal measure.
The reader has already met Binodini. At one time she was considered as a possible bride for Mahendra and then for Bihari. The man who was fated to be her husband was however endowed with an enlarged spleen and this sadly took him from this planet before long.

After his death Bindodini had been languishing in the joyless village like a lonely garden plant exiled to a forest. She came to greet Rajakshmi who had been her late husband’s aunt and devoted her entire time to looking after her from that moment onwards.

This was indeed true care. She never allowed herself a moment of rest. Her work was neat beyond compare, her skills in the kitchen matched only by the sweetness of her conversation.

Rajlakshmi would say, ‘Go and have your lunch, it is getting late.’

But would she listen? She would not stop fanning Rajlakshmi until she had fallen asleep.

Rajlakshmi said, ‘You will fall ill if you carry on like this.’

Binodini would express extreme disinterest in her own well being and say, ‘Unfortunate people like me never fall ill Aunt. I am only worried that you have come home after so many days and there is so little here with which I can make your stay pleasant for you.’

Bihari became a kind of a leader of the local society in a very short while. Some came to him for medicines, others for legal advice. Others wished he would help them in getting their sons employment in the city or even in writing a letter. He moved easily from the staid card games of the elderly to the noisy drinking sessions of the Bagdi villagers without losing his eager interest in things and his natural friendliness. Everyone thought of him as their own without losing their respect for him.

Binodini tried to lessen the trials of being stranded in the village as much as she could for Bihari although she lived in the inner quarters. Whenever he came in after visiting in the neighbourhood he would find that someone had tidied his room, placing a couple of flowering stems in a brass glass and leaving books written by Bankim Chandra Chattopadhyay and Dinabandhu Mitra on a table by the side of his bed. On the title page would be the name Binodini, written in a well formed feminine hand.

This was quite different from the hospitality usually found in a village. When Bihari praised this Rajlakshmi said, ‘Yet you lot thought she was not suitable!’

Bihari smiled saying, ‘Ma, we have made a mistake, but it is better to be tricked into not marrying rather than be tricked after marriage.’

Rajlakshmi frequently thought with great regret that this was the woman who should have been her daughter-in-law.

Whenever Rajlakshmi raised the topic of returning to Kolkata, Binodini would become tearful. She said, ‘Aunt, why did you come for such a short time? When I did not know you, the days passed well enough. How will I live without you if you leave now?’

Rajlakshmi would sometimes say extremely emotionally, ‘Why did you not become a part of my family, I would have loved you with all my heart.’

This kind of talk made Binodini so embarassed that she would soon leave after inventing an excuse.

Rajlakshmi had been waiting for a letter filled with misery and pleading from Mahin in Kolkata. He had never lived without her since the day he was born – he must have grown anxious at her prolonged absence. Rajlakshmi was ready for a letter filled with words full of repentance and loving.

Finally Bihari did receive a letter from Mahendra. He had written, ‘My mother must be enjoying herself in her childhood home.’

Rajlakshmi thought, ‘Poor Mahendra! He has written of my happiness! How can his poor mother be happy anywhere without him?’

‘Bihari, why don’t you read out what Mahin has written after that?’

Bihari said, ‘There is not much that is important after that,’ crushing the letter in his palm and pushing it between the pages of a book before throwing that in the corner of the room.

Rajlakshmi could bear it no longer. She was certain that Bihari was not telling her what Mahendra had written about her because they were written in anger.

Just as a calf butts its mother’s udders to both get milk and arouse her affection, Mahendra’s anger shook Rajlakshmi into feeling all her suppressed love for him surge forth again. She immediately forgave Mahendra and said to herself, ‘If he is happy with his wife, let him be. I will never cause him any pain again over that issue. How sad he must be that the mother who could never leave him for a moment has now left him alone for so long! He must be so upset with me!’ Tears welled in her eyes again and again as she thought of this.

Rajlakshmi went to Bihari’s room a few times and said, ‘Son, go and bathe. You are not sticking to your usual routine here at all.’

Bihari too seemed to not want a bath that day; he said, ‘Ma, for a vagabond like me, a few departures from routine are part of the routine.’

Rajlakshmi kept urging him, ‘No dear, you really should go and have a bath.’

Bihari went to bathe after being asked a thousand times. As soon as he left, Rajlakshmi extracted the crumpled letter out of its hiding place within the pages of the book.

She gave the letter to Binodini and said, ‘Can you read out to me what Mahendra wrote to Bihari?’

Binodini read it out aloud. Mahendra had indeed enquired after his mother, but that portion was very short, no more than the few lines that Bihari had already read out to her.

He had then moved on to writing about Asha. It was as though his bliss had made him lose his senses and pour his soul out to his friend.

Binodini read a little bit more and then stopped in shame. She said, ‘There is little that I should be reading aloud in the rest of this!’

Rajlakshmi’s expression of eager affection turned to stone in a minute. She remained quiet for a while and then said, ‘That is enough.’ She did not ask for the letter back and left the room shortly.

Bindodini went to her room with the letter and lay down on the bed to read it after locking the door.

Only she could have told us what she gained from reading the letter. But it was not amusement. As she read it over and over, her eyes stung like sand under the midday sun and her breath fell like the hot winds of the desert.

All she could think about was what Mahendra and Asha were like and how loving their relationship was. She sat for a long time with her back against the wall, staring into space, her legs spread before her with the letter in her lap.

If Bihari had looked he would never have found that letter from Mahendra again.

Annapurna arrived unannounced that day around noon, Rajlakshmi’s heart was instantly filled with dire thoughts of bad news but she could not voice her fears. She looked at Annapurna’s face, pale and mute with apprehension.

‘Everyone is fine in Kolkata,’ Annapurna assured her.

Rajlakshmi asked, ‘Then why have you come here?’

Annapurna said, ‘Elder sister, you can have the responsibility of your household back. I have no wish to stay here anymore. I have left home to go to Varanasi and that is why I came here to say farewell and seek your blessings. I have wronged you in many ways; both knowingly and without my own knowledge, forgive me for that. Your daughter-in-law is young, she has no mother, and despite any faults she may have, she is yours to love.’ As she said this her eyes brimmed with tears and she could speak no more.

Rajlakshmi hurried off to make preparations for Annapurna’s bath and her meal. Bihari hurried home from Godai Ghosh’s house as soon as he heard the news. He bent down to touch Annapurna’s feet saying, ‘Aunt, how can this be? You are abandoning your family with such steely resolve?’

Annapurna held her tears back and said, ‘Do not try to keep me here – I want all of you to be happy; you will find that nothing will cease just because I am leaving.’

Bihari sat in silence for a while. He then said, ‘Mahendra is unfortunate indeed, he has forced you into leaving.’

‘Do not say that! I am not angry with Mahin at all. But if I do not leave, there will never be peace in this house.’ Annapurna protested quickly.

Bihari sat quietly staring into the distance. She brought out a pair of heavy gold bangles from underneath her anchol and said, ‘Son, keep these two- for when your wife comes and give them to her with my blessings.’

Bihari raised the pair of bangles to his forehead in respect and went into the next room to suppress his pain.

Before she left, Annapurna said to him, ‘Bihari, please look after Mahin and Asha for me.’

She then handed Rajlakshmi a sheet of paper saying, ‘I have willed my portion of my father-in-law’s property to Mahendra. It will be quite enough for me if you send fifteen rupees each month in my name.’

After prostrating herself at Rajlakshmi’s feet in farewell, she left on her journey to the sacred sites .

Chokher Bali 6/চোখের বালি ৬

একদিন নববর্ষার বর্ষণমুখরিত মেঘাচ্ছন্ন সায়াহ্নে গায়ে একখানি সুবাসিত ফুরফুরে চাদর এবং গলায় একগাছি জুঁইফুলের গোড়ে মালা পরিয়া মহেন্দ্র আনন্দমনে শয়নগৃহে প্রবেশ করিল। হঠাৎ আশাকে বিস্ময়ে চকিত করিবে বলিয়া জুতার শব্দ করিল না। ঘরে উঁকি দিয়া দেখিল, পুবদিকের খোলা জানালা দিয়া প্রবল বাতাস বৃষ্টির ছাঁট লইয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতেছে, বাতাসে দীপ নিবিয়া গেছে এবং আশা নীচের বিছানার উপরে পড়িয়া অব্যক্তকণ্ঠে কাঁদিতেছে।

মহেন্দ্র দ্রুতপদে কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কী হইয়াছে।”

বালিকা দ্বিগুণ আবেগে কাঁদিয়া উঠিল। অনেকক্ষণ পরে মহেন্দ্র ক্রমশ উত্তর পাইল যে, মাসিমা আর সহ্য করিতে না পারিয়া তাঁহার পিসতুত ভাইয়ের বাসায় চলিয়া গেছেন।

মহেন্দ্র রাগিয়া মনে করিল, “গেলেন যদি, এমন বাদলার সন্ধ্যাটা মাটি করিয়া গেলেন।’

শেষকালে সমস্ত রাগ মাতার উপরে পড়িল। তিনিই তো সকল অশান্তির মূল।

মহেন্দ্র কহিল, “কাকী যেখানে গেছেন, আমরাও সেইখানে যাইব, দেখি, মা কাহাকে লইয়া ঝগড়া করেন।”

বলিয়া অনাবশ্যক শোরগোল করিয়া জিনিসপত্র বাঁধাবাঁধি মুটে-ডাকাডাকি শুরু করিয়া দিল।

রাজলক্ষ্মী সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিলেন। ধীরে ধীরে মহেন্দ্রের কাছে আসিয়া শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় যাইতেছিস।”

মহেন্দ্র প্রথমে কোনো উত্তর করিল না। দুই-তিনবার প্রশ্নের পর উত্তর করিল, “কাকীর কাছে যাইব।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তোদের কোথাও যাইতে হইবে না, আমিই তোর কাকীকে আনিয়া দিতেছি।”

বলিয়া তৎক্ষণাৎ পালকি চড়িয়া অন্নপূর্ণার বাসায় গেলেন। গলায় কাপড় দিয়া জোড়হাত করিয়া কহিলেন, “প্রসন্ন হও মেজোবউ, মাপ করো।”

অন্নপূর্ণা শশব্যস্ত হইয়া রাজলক্ষ্মীর পায়ের ধূলা লইয়া কাতরস্বরে কহিলেন, “দিদি, কেন আমাকে অপরাধী করিতেছ। তুমি যেমন আজ্ঞা করিবে তাই করিব।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তুমি চলিয়া আসিয়াছ বলিয়া আমার ছেলে-বউ ঘর ছাড়িয়া আসিতেছে।” বলিতে বলিতে অভিমানে ক্রোধে ধিক্‌কারে তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন।

দুই জা বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন। তখনো বৃষ্টি পড়িতেছে। অন্নপূর্ণা মহেন্দ্রের ঘরে যখন গেলেন তখন আশার রোদন শান্ত হইয়াছে এবং মহেন্দ্র নানা কথার ছলে তাহাকে হাসাইবার চেষ্টা করিতেছে। লক্ষণ দেখিয়া বোধ হয় বাদলার সন্ধ্যাটা সম্পূর্ণ ব্যর্থ না যাইতেও পারে।

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “চুনি, তুই আমাকে ঘরেও থাকতে দিবি না, অন্য কোথাও গেলেই সঙ্গে লাগিবি? আমার কি কোথাও শান্তি নাই?”

আশা অকস্মাৎ বিদ্ধ মৃগীর মতো চকিত হইয়া উঠিল।

মহেন্দ্র একান্ত বিরক্ত হইয়া কহিল, “কেন কাকী, চুনি তোমার কী করিয়াছে।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “বউ-মানুষের এত বেহায়াপনা দেখিতে পারি না বলিয়াই চলিয়া গিয়াছিলাম, আবার শাশুড়িকে কাঁদাইয়া কেন আমাকে ধরিয়া আনিল পোড়ারমুখী।”

জীবনের কবিত্ব-অধ্যায়ে মা খুড়ী যে এমন বিঘ্ন, তাহা মহেন্দ্র জানিত না।

পরদিন রাজলক্ষ্মী বিহারীকে ডাকাইয়া কহিলেন, “বাছা, তুমি একবার মহিনকে বলো, অনেক দিন দেশে যাই নাই, আমি বারাসতে যাইতে চাই।”

বিহারী কহিল, “অনেক দিনই যখন যান নাই তখন আর নাই গেলেন। আচ্ছা, আমি মহিনদাকে বলিয়া দেখি, কিন্তু সে যে কিছুতেই রাজি হইবে তা বোধ হয় না।”

মহেন্দ্র কহিল, “তা, জন্মস্থান দেখিতে ইচ্ছা হয় বটে। কিন্তু বেশি দিন মার সেখানে না থাকাই ভালো–বর্ষার সময় জায়গাটা ভালো নয়।”

মহেন্দ্র সহজেই সম্মতি দিল দেখিয়া বিহারী বিরক্ত হইল। কহিল, “মা একলা যাইবেন, কে তাঁহাকে দেখিবে। বোঠানকেও সঙ্গে পাঠাইয়া দাও-না!” বলিয়া একটু হাসিল।

বিহারীর গূঢ় ভর্ৎসনায় মহেন্দ্র কুণ্ঠিত হইয়া কহিল, “তা বুঝি আর পারি না।”

কিন্তু কথাটা ইহার অধিক আর অগ্রসর হইল না।

এমনি করিয়াই বিহারী আশার চিত্ত বিমুখ করিয়া দেয়, এবং আশা তাহার উপরে বিরক্ত হইতেছে মনে করিয়া সে যেন একপ্রকারের শুষ্ক আমোদ অনুভব করে।

বলা বাহুল্য, রাজলক্ষ্মী জন্মস্থান দেখিবার জন্য অত্যন্ত উৎসুক ছিলেন না। গ্রীষ্মে নদী যখন কমিয়া আসে তখন মাঝি যেমন পদে পদে লগি ফেলিয়া দেখে কোথায় কত জল, রাজলক্ষ্মীও তেমনি ভাবান্তরের সময় মাতাপুত্রের সম্পর্কের মধ্যে লগি ফেলিয়া দেখিতেছিলেন। তাঁহার বারাসতে যাওয়ার প্রস্তাব যে এত শীঘ্র এত সহজেই তল পাইবে, তাহা তিনি আশা করেন নাই। মনে মনে কহিলেন, “অন্নপূর্ণার গৃহত্যাগে এবং আমার গৃহত্যাগে প্রভেদ আছে– সে হইল মন্ত্র-জানা ডাইনী আর আমি হইলাম শুদ্ধমাত্র মা, আমার যাওয়াই ভালো।’

অন্নপূর্ণা ভিতরকার কথাটা বুঝিলেন, তিনি মহেন্দ্রকে বলিলেন, “দিদি গেলে আমিও থাকিতে পারিব না।”

মহেন্দ্র রাজলক্ষ্মীকে কহিল, “শুনিতেছ মা? তুমি গেলে কাকীও যাইবেন, তাহা হইলে আমাদের ঘরের কাজ চলিবে কী করিয়া।”

রাজলক্ষ্মী বিদ্বেষবিষে জর্জরিত হইয়া কহিলেন, “তুমি যাইবে মেজোবউ? এও কি কখনো হয়। তুমি গেলে চলিবে কী করিয়া। তোমার থাকা চাই-ই।”

রাজলক্ষ্মীর আর বিলম্ব সহিল না। পরদিন মধ্যাহ্নেই তিনি দেশে যাইবার জন্য প্রস্তুত। মহেন্দ্রই যে তাঁহাকে দেশে রাখিয়া আসিবে, এ বিষয়ে বিহারীর বা আর-কাহারো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সময়কালে দেখা গেল, মহেন্দ্র মার সঙ্গে একজন সরকার ও দারোয়ান পাঠাইবার ব্যবস্থা করিয়াছে।

বিহারী কহিল, “মহিনদা, তুমি যে এখনো তৈরি হও নাই?”

মহেন্দ্র লজ্জিত হইয়া কহিল, “আমার আবার কালেজের–”

বিহারী কহিল, “আচ্ছা তুমি থাকো, মাকে আমি পৌঁছাইয়া দিয়া আসিব।”

মহেন্দ্র মনে মনে রাগিল। বিরলে আশাকে কহিল, “বাস্তবিক, বিহারী বাড়াবাড়ি আরম্ভ করিয়াছে। ও দেখাইতে চায়, যেন ও আমার চেয়ে মার কথা বেশি ভাবে।”

অন্নপূর্ণাকে থাকিতে হইল, কিন্তু তিনি লজ্জায় ক্ষোভে ও বিরক্তিতে সংকুচিত হইয়া রহিলেন। খুড়ির এইরূপ দূরভাব দেখিয়া মহেন্দ্র রাগ করিল এবং আশাও অভিমান করিয়া রহিল।

photo0165

6

One cloud shaded evening when the rains had newly arrived and the world was filled with their joyous serenading, Mahendra entered his bedroom in a fittingly happy mood. He had perfumed his wrap and was carrying a thick strand of jasmine flowers. He tiptoed in order to give Asha a surprise. As he looked into the room he found the wind had blown the lamp out and was driving the rain in through the windows on the east; Asha lay on the floor in the darkness weeping silently.

Mahendra came to her quickly and asked, ‘What is wrong?’

The girl cried out piteously at this. After much questioning Mahendra found out that circumstances were making it impossible for her aunt to live with them and she had left to stay with her brother in Shyambazar.

His first thought was that she could have picked another time to leave instead of ruining the romance of the rain-soaked evening.

Eventually his anger focused on his mother. She was after all the root of all the unhappiness.

He decided, ‘We will go and live where our aunt is. Let me see who my mother quarrels with then!’
He then made an unnecessarily loud show of calling porters and packing their belongings.

Rajlakshmi understood entirely too well what was going on. She came to Mahendra and asked him calmly, ‘Where are you going?’

He did not answer her initially, deigning to say, ‘To my aunt,’ after she had repeated her question a few times.

Rajlakshmi said, ‘No one needs to go away for that, I will get your aunt for you.’

She went in a palanquin to Annapurna immediately. She stood in front of Annapurna, in abject repentance and said, ‘Please calm yourself and forgive me.’

Annapurna hurried to touch her feet and said unhappily, ‘Do not lay that responsibility on me. I will do whatever you command.’

Rajlakshmi said, ‘My son and daughter-in-law are leaving home to come here because you left.’ As she spoke she cried, unable to conceal her dismay, anger and disgust.

The two women returned in the rain. When Annapurna went to Mahendra’s rooms Asha had dried her tears and Mahendra was now engaged in making her smile with many pleasant words. All signs seemed to indicate that the rains were not going to be completely in vain that evening.

Annapurna said, ‘Chuni, you will not let me live here and you make it impossible for me to leave. Am I to have no peace whatsoever?’

Asha stiffened as though she had been hit.

Mahendra asked, extremely annoyed, ‘Why, what has she done to you?’

Annapurna said, ‘I left so that I would not have to see such shameless behavior in a married woman, and then she makes her mother-in-law go and fetch me!’

Mahendra had not known that mothers and aunts could be such obstacles in the romantic days of one’s life.

The next day, Rajlakshmi summoned Bihari and said, ‘Son, could you tell Mahin that I have not gone home to the village for a long time and would like to go to Barasat?’

Bihari answered, ‘If you haven’t been there for a long time, what does it matter if you do not go at all. I will tell Mahin, but I do not think he will agree.’

Mahendra seemed to see it differently saying, ‘It is only natural to want to see her childhood home. But she should not stay there for long – it is not a healthy place during the rains.’

Bihar was irritated to see that Mahendra agreed so easily. He said with a smile, ‘If your mother goes by herself, who will look after her? Why not send your wife along as well?’

Mahendra was embarrassed by what Bihari had hinted at. He said, ‘Do you think I won’t do that?’

But nothing more came of that plan.

Bihari found a strange kind of pleasure in annoying Asha and in knowing that she felt irritated with him.

Needless to say, Rajlakshmi was not very eager to see her childhood home. Just like a boatman testing the depths of the river in summer by pushing their oar into the shallow waters, Rajlakshmi was testing the depths of strength in her relationship with her son during these disagreements. She had not counted on her proposal to go to Barasat finding such quick acceptance. She said to herself, ‘There is a difference between Annapurna leaving this house and my leaving home – she is a witch who casts spells while I am just a mother, I think it is best that I leave.’

Annapurna understood what was going on and said to Mahendra, ‘If my sister-in-law leaves, I do not want to stay here either.’

Mahendra said, ‘Have you heard Mother? If you leave Aunt says she will go with you, who will look after the household then?’

Rajlakshmi was burning up with jealousy as she said, ‘You will come with me? How can that be? How will anything function without you? You simply must stay!’

Rajlakshmi could not wait any longer. She was ready to leave for her village by noon the very next day. No one doubted that Mahendra would be accompanying her on the journey. But when it was time for them to leave, it seemed she was to travel with just an employee and a doorman for company.

Bihari asked, ‘Mohin, are you not ready to leave yet?’
Mahendra said somewhat shamefully, ‘The thing is, I have this thing at college…’

Bihari said, ‘Fine, I will take accompany her then.’

Mahendra was secretly angered by this and said as much to Asha privately, saying, ‘Honestly! Bihari is going too far with all this. He wants the world to see that he thinks about my mother’s welfare more than I do!’

Annapurna had to stay on but she became withdrawn with disgust, shame and anger. When Mahendra and Asha saw her distancing herself like this he was annoyed while she sulked in silence.

ছেলেবেলা/Chelebela/My childhood 3

joras

One of the inner verandahs at the Jorasanko house(my photo)

বেলা বেড়ে যায়, রোদ্দুর ওঠে কড়া হয়ে, দেউরিতে ঘন্টা বেজে ওঠে; পালকির ভিতরকার দিনটা ঘন্টার হিসাব মানে না। সেখানকার বারোটা সেই সাবেক কালের যখন রাজবাড়ির সিংহদ্বারে সভাভঙ্গের ডঙ্কা বাজত, রাজা যেতেন স্নানে, চন্দনের জলে। ছুটির দিন দুপুরবেলা যাদের তাঁবেদারিতে ছিলুম তারা খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুম দিচ্ছে। একলা বসে আছি। চলেছে মনের মধ্যে আমার অচল পালকি, হাওয়ায় তৈরি বেহারাগুলো আমার মনের নিমক খেয়ে মানুষ। চলার পথটা কাটা হয়েছে আমারই খেয়ালে। সেই পথে চলেছে পালকি দূরে দূরে দেশে দেশে, সে-সব দেশের বইপড়া নাম আমারই লাগিয়ে দেওয়া। কখনো বা তার পথটা ঢুকে পড়ে ঘন বনের ভিতর দিয়ে। বাঘের চোখ জ্বল্জ্বল্ করছে, গা করছে ছম্ছম্। সঙ্গে আছে বিশ্বনাথ শিকারী, বন্দুক ছুটল দুম্, ব্যাস্ সব চুপ। তার পরে এক সময়ে পালকির চেহারা বদলে গিয়ে হয়ে ওঠে ময়ূরপঙ্খি, ভেসে চলে সমুদ্রে, ডাঙা যায় না দেখা। দাঁড় পড়তে থাকে ছপ্ছপ্ ছপ্ছপ্, ঢেউ উঠতে থাকে দুলে দুলে ফুলে ফুলে। মাল্লারা বলে ওঠে, সামাল সামাল, ঝড় উঠল। হালের কাছে আবদুল মাঝি, ছুঁচলো তার দাড়ি, গোঁফ তার কামানো, মাথা তার নেড়া। তাকে চিনি, সে দাদাকে এনে দিত পদ্মা থেকে ইলিশমাছ আর কচ্ছপের ডিম।

সে আমার কাছে গল্প করেছিল– একদিন মাসের শেষে ডিঙিতে মাছ ধরতে গিয়েছে, হঠাৎ এল কালবৈশাখী। ভীষণ তুফান, নৌকা ডোবে ডোবে। আবদুল দাঁতে রশি কামড়ে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে, সাঁৎরে উঠল চরে, কাছি ধরে টেনে তুলল তার ডিঙি। গল্পটা এত শিগ্গির শেষ হল, আমার পছন্দ হল না। নৌকাটা ডুবল না, অমনিই বেঁচে গেল, এ তো গপ্পই নয়। বারবার বলতে লাগলুম “তার পর’?

সে বললে, “তার পর সে এক কাণ্ড। দেখি, এক নেকড়ে বাঘ। ইয়া তার গোঁফজোড়া। ঝড়ের সময়ে সে উঠেছিল ও পারে গঞ্জের ঘাটের পাকুড় গাছে। দমকা হাওয়া যেমনি লাগল গাছ ভেঙে পড়ল পদ্মায়। বাঘ ভায়া ভেসে যায় জলের তোড়ে।

খাবি খেতে খেতে উঠল এসে চরে। তাকে দেখেই আমার রশিতে লাগালুম ফাঁস। জানোয়ারটা এত্তো বড়ো চোখ পাকিয়ে দাঁড়াল আমার সামনে। সাঁতার কেটে তার জমে উঠেছে খিদে। আমাকে দেখে তার লাল-টকটকে জিভ দিয়ে নাল ঝরতে লাগল। বাইরে ভিতরে অনেক মানুষের সঙ্গে তার চেনাশোনা হয়ে গেছে, কিন্তু আবদুলকে সে চেনে না। আমি ডাক দিলুম “আও বাচ্ছা’। সে সামনের দু পা তুলে উঠতেই দিলুম তার গলায় ফাঁস আটকিয়ে, ছাড়াবার জন্যে যতই ছটফট করে ততই ফাঁস এঁটে গিয়ে তার জিভ বেরিয়ে পড়ে’।

এই পর্যন্ত শুনেই আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, “আবদুল, সে মরে গেল নাকি’।

আবদুল বললে, “মরবে তার বাপের সাধ্যি কী। নদীতে বান এসেছে, বাহাদুরগঞ্জে ফিরতে হবে তো? ডিঙির সঙ্গে জুড়ে বাঘের বাচ্ছাকে দিয়ে গুণ টানিয়ে নিলেম অন্তত বিশ ক্রোশ রাস্তা। গোঁ গোঁ করতে থাকে, পেটে দিই দাঁড়ের খোঁচা, দশ-পনেরো ঘন্টার রাস্তা দেড় ঘন্টায় পৌঁছিয়ে দিলে। তার পরেকার কথা আর জিগ্গেস কোরো না বাবা, জবাব মিলবে না’।

আমি বললুম, “আচ্ছা বেশ, বাঘ তো হল, এবার কুমির?’

আবদুল বললে, “জলের উপর তার নাকের ডগা দেখেছি অনেকবার। নদীর ঢালু ডাঙায় লম্বা হয়ে শুয়ে সে যখন রোদ পোহায়, মনে হয় ভারি বিচ্ছিরি হাসি হাসছে। বন্দুক থাকলে মোকাবিলা করা যেত। লাইসেন্স্ ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু মজা হল। একদিন কাঁচি বেদেনি ডাঙায় বসে দা দিয়ে বাখারি চাঁচছে, তার ছাগলছানা পাশে বাঁধা। কখন নদীর থেকে কুমিরটা পাঁঠার ঠ্যাঙ ধরে জলে টেনে নিয়ে চলল। বেদেনি একেবারে লাফ দিয়ে বসল তার পিঠের উপর। দা দিয়ে ঐ দানোগিরগিটির গলায় পোঁচের উপর পোঁচ লাগাল। ছাগলছানা ছেড়ে জন্তুটা ডুবে পড়ল জলে।’

আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, “তার পরে?’

আবদুল বললে, “তার পরেকার খবর তলিয়ে গেছে জলের তলায়, তুলে আনতে দেরি হবে। আসছেবার যখন দেখা হবে চর পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে আসব।’
কিন্তু আর তো সে আসে নি, হয়তো খোঁজ নিতে গেছে।

এই তো ছিল পালকির ভিতর আমার সফর; পালকির বাইরে এক-একদিন ছিল আমার মাস্টারি, রেলিঙগুলো আমার ছাত্র। ভয়ে থাকত চুপ। এক-একটা ছিল ভারি দুষ্ট, পড়াশুনোয় কিচ্ছুই মন নেই; ভয় দেখাই যে বড়ো হলে কুলিগিরি করতে হবে। মার খেয়ে আগাগোড়া গায়ে দাগ পড়ে গেছে, দুষ্টুমি থামতে চায় না, কেননা থামলে যে চলে না, খেলা বন্ধ হয়ে যায়। আরও একটা খেলা ছিল, সে আমার কাঠের সিঙ্গিকে নিয়ে। পূজায় বলিদানের গল্প শুনে ঠিক করেছিলুম সিঙ্গিকে বলি দিলে খুব একটা কাণ্ড হবে। তার পিঠে কাঠি দিয়ে অনেক কোপ দিয়েছি। মন্তর বানাতে হয়েছিল, নইলে পুজো হয় না।–

সিঙ্গিমামা কাটুম
আন্দিবোসের বাটুম
উলুকুট ঢুলুকুট ঢ্যামকুড়কুড়
আখরোট বাখরোট খট খট খটাস
পট পট পটাস।

এর মধ্যে প্রায় সব কথাই ধার-করা, কেবল আখরোট কথাটা আমার নিজের। আখরোট খেতে ভালোবাসতুম। খটাস শব্দ থেকে বোঝা যাবে আমার খাঁড়াটা ছিল কাঠের। আর পটাস শব্দে জানিয়ে দিচ্ছে সে খাঁড়া মজবুত ছিল না।

কাল রাত্তির থেকে মেঘের কামাই নেই। কেবলই চলছে বৃষ্টি। গাছগুলো বোকার মতো জবুস্থবু হয়ে রয়েছে। পাখির ডাক বন্ধ। আজ মনে পড়ছে আমার ছেলেবেলাকার সন্ধেবেলা।

তখন আমাদের ঐ সময়টা কাটত চাকরদের মহলে। তখনও ইংরেজি শব্দের বানান আর মানে-মুখস্থর বুক-ধড়াস সন্ধেবেলার ঘাড়ে চেপে বসে নি। সেজদাদা বলতেন আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন। তাই যখন আমাদের বয়সী ইস্কুলের সব পোড়োরা গড়গড় করে আউড়ে চলেছে I am up আমি হই উপরে,He is down তিনি হন নীচে, তখনও বি-এ-ডি ব্যাড এম-এ-ডি ম্যাড পর্যন্ত আমার বিদ্যে পৌঁছয় নি।

নবাবি জবানিতে চাকর-নোকরদের মহলকে তখন বলা হত তোশাখানা। যদিও সেকেলে আমিরি দশা থেকে আমাদের বাড়ি নেবে পড়েছিল অনেক নীচে তবু তোশাখানা দফতরখানা বৈঠকখানা নামগুলো ছিল ভিত আঁকড়ে।

সেই তোশাখানার দক্ষিণ ভাগে বড়ো একটা ঘরে কাঁচের সেজে রেড়ির তেলে আলো জ্বলছে মিট মিট করে, গণেশমার্কা ছবি আর কলীমায়ের পট রয়েছে দেয়ালে, তারই আশেপাশে টিকটিকি রয়েছে পোকা-শিকারে। ঘরে কোনো আসবাব নেই, মেজের উপরে একখানা ময়লা মাদুর পাতা।

জানিয়ে রাখি আমাদের চাল ছিল গরিবের মতো। গাড়িঘোড়ার বালাই ছিল না বললেই হয়। বাইরে কোণের দিকে তেঁতুল গাছের তলায় ছিল চালাঘরে একটা পালকিগাড়ি আর একটা বুড়ো ঘোড়া। পরনের কাপড় ছিল নেহাত সাদাসিধে। অনেক সময় লেগেছিল পায়ে মোজা উঠতে। যখন ব্রজেশ্বরের ফর্দ এড়িয়ে জলপানে বরাদ্দ হল পাঁউরুটি আর কলাপাতা-মোড়া মাখন, মনে হল আকাশ যেন হাতে নাগাল পাওয়া গেল। সাবেক কালের বড়োমানুষির ভগ্নদশা সহজেই মেনে নেবার তালিম চলছিল।

আমাদের এই মাদুর-পাতা আসরে যে চাকরটি ছিল সর্দার তার নাম ব্রজেশ্বর। চুলে গোঁফে লোকটা কাঁচাপাকা, মুখের উপর টানপড়া শুকনো চামড়া, গম্ভীর মেজাজ, কড়া গলা, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা। তার পূর্ব মনিব ছিলেন লক্ষ্মীমন্ত, নামডাকওয়ালা। সেখান থেকে তাকে নাবতে হয়েছে আমাদের মতো হেলায়-মানুষ ছেলেদের খবরদারির কাজে। শুনেছি গ্রামের পাঠশালায় সে গুরুগিরি করেছে। এই গুরুমশায়ি ভাষা আর চাল ছিল তার শেষ পর্যন্ত। বাবুরা “বসে আছেন’ না বলে সে বলত “অপেক্ষা করে আছেন’। শুনে মনিবরা হাসাহাসি করতেন। যেমন ছিল তার গুমোর তেমনি ছিল তার শুচিবাই। স্নানের সময় সে পুকুরে নেমে উপরকার তেলভাষা জল দুই হাত দিয়ে পাঁচ-সাতবার ঠেলে দিয়ে একেবারে ঝুপ করে দিত ডুব। স্নানের পর পুকুর থেকে উঠে বাগানের রাস্তা দিয়ে ব্রজেশ্বর এমন ভঙ্গীতে হাত বাঁকিয়ে চলত যেন কোনোমতে বিধাতার এই নোংরা পৃথিবীটাকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারলেই তার জাত বাঁচে। চালচলনে কোন্টা ঠিক, কোন্টা ঠিক নয়, এ নিয়ে খুব ঝোঁক দিয়ে সে কথা কইত। এ দিকে তার ঘাড়টা ছিল কিছু বাঁকা, তাতে তার কথার মান বাড়ত। কিন্তু ওরই মধ্যে একটা খুঁত ছিল গুরুগিরিতে। ভিতরে ভিতরে তার আহারের লোভটা ছিল খুব চাপা। আমাদের পাতে আগে থাকতে ঠিকমতো ভাগে খাবার সাজিয়ে রাখা তার নিয়ম ছিল না। আমরা খেতে বসলে একটি একটি করে লুচি আলগোছে দুলিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করত, “আর দেব কি।’ কোন্ উত্তর তার মনের মতো সেটা বোঝা যেত তার গলার সুরে। আমি প্রায়ই বলতুম, “চাই নে।’ তার পরে আর সে পীড়াপীড়ি করত না। দুধের বাটিটার ‘পরেও তার অসামাল রকমের টান ছিল, আমার মোটে ছিল না। শেলফওয়ালা একটা আলমারি ছিল তার ঘরে। তার মধ্যে একটা বড়ো পিতলের বাটিতে থাকত দুধ, আর কাঠের বারকোশে লুচি তরকারি। বিড়ালের লোভ জালের বাইরে বাতাস শুঁকে শুঁকে বেড়াত।

এমনি করে অল্প খাওয়া আমার ছেলেবেলা থেকেই দিব্যি সয়ে গিয়েছিল। সেই কম খাওয়াতে আমাকে কাহিল করেছিল এমন কথা বলবার জো নেই। যে ছেলেরা খেতে কসুর করত না তাদের চেয়ে আমার গায়ের জোর বেশি বই কম ছিল না। শরীর এত বিশ্রী রকমের ভালো ছিল যে, ইস্কুল পালাবার ঝোঁক যখন হয়রান করে দিত তখনও শরীরে কোনোরকম জুলুমের জোরেও ব্যামো ঘটাতে পারতুম না। জুতো জলে ভিজিয়ে বেড়ালুম সারাদিন, সর্দি হল না। কার্তিক মাসে খোলা ছাদে শুয়েছি, চুল জামা গেছে ভিজে, গলার মধ্যে একটু খুসখুসানি কাশিরও সাড়া পাওয়া যায় নি। আর পেট-কামড়ানি বলে ভিতরে ভিতরে বদহজমের যে একটা তাগিদ পাওয়া যায় সেটা বুঝতে পাই নি পেটে, কেবল দরকারমতো মুখে জানিয়েছি মায়ের কাছে। শুনে মা মনে মনে হাসতেন, একটুও ভাবনা করতেন বলে মনে হয় নি। তবু চাকরকে ডেকে বলে দিতেন, “আচ্ছা যা, মাস্টারকে জানিয়ে দে, আজ আর পড়াতে হবে না।’ আমাদের সেকেলে মা মনে করতেন, ছেলে মাঝে মাঝে পড়া কামাই করলে এতই কি লোকসান। এখনকার মায়ের হাতে পড়লে মাস্টারের কাছে তো ফিরে যেতেই হত, তার উপরে খেতে হত কানমলা। হয়তো বা মুচকি হেসে গিলিয়ে দিতেন ক্যাস্টর অয়েল। চিরকালের জন্যে আরাম হত ব্যামোটা। দৈবাৎ কখনো আমার জ্বর হয়েছে; তাকে চক্ষেও দেখি নি। ডাক্তার একটু গায়ে হাত দিয়েই প্রথম দিনের ব্যবস্থা করতেন ক্যাস্টর অয়েল আর উপোস। জল খেতে পেতুম অল্প একটু, সেও গরম জল। তার সঙ্গে এলাচদানা চলতে পারত। তিন দিনের দিনই মৌরলা বাছের ঝোল আর গলা ভাত উপোসের পরে ছিল অমৃত।

জ্বরে ভোগা কাকে বলে মনে পড়ে না। ম্যালেরিয়া বলে শব্দটা শোনাই ছিল না। ওয়াক-ধরানো ওষুধের রাজা ছিল ঐ তেলটা, কিন্তু মনে পড়ে না কুইনীন। গায়ে ফোড়াকাটা ছুরির আঁচড় পড়ে নি কোনোদিন। হাম বা জলবসন্ত কাকে বলে আজ পর্যন্ত জানি নে। শরীরটা ছিল একগুঁয়ে রকমের ভালো। মায়েরা যদি ছেলেদের শরীর এতটা নীরুগী রাখতে চান যাতে মাস্টারের হাত এড়াতে না পারে তা হলে ব্রজেশ্বরের মতো চাকর খুঁজে বের করবেন। খাবার-খরচার সঙ্গে সঙ্গেই সে বাঁচাবে ডাক্তার-খরচা; বিশেষ করে এই কলের জাঁতার ময়দা আর এই ভেজাল দেওয়া ঘি-তেলের দিনে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, তখনও বাজারে চকোলেট দেখা দেয় নি। ছিল এক পয়সা দামের গোলাপি-রেউড়ি। গোলাপি গন্ধের আমেজদেওয়া এই তিলে-ঢাকা চিনির ড্যালা আজও ছেলেদের পকেট চটচটে ক’রে তোলে কিনা জানি নে — নিশ্চয়ই এখনকার মানী লোকের ঘর থেকে লজ্জায় দৌড় মেরেছে। সেই ভাজা মসলার ঠোঙা গেল কোথায়। আর সেই সস্তা দামের তিলে গজা? সে কি এখনও টিঁকে আছে। না থাকে তো তাকে ফিরিয়ে আনার দরকার নেই।

ব্রজেশ্বরের কাছে সন্ধেবেলায় দিনে দিনে শুনেছি কৃত্তিবাসের সাতকাণ্ড রামায়ণটা। সেই পড়ার মাঝে মাঝে এসে পড়ত কিশোরী চাটুজ্যে। সমস্ত রামায়ণের পাঁচালি ছিল সুরসমেত তার মুখস্থ। সে হঠাৎ আসন দখল করে কৃত্তিবাসকে ছাপিয়ে দিয়ে হু হু করে আউড়িয়ে যেত তার পাঁচালির পালা। ওরে রে লক্ষণ, এ কী অলক্ষণ ,বিপদ ঘটেছে বিলক্ষণ। তার মুখে হাসি, মাথার টাক ঝক ঝক করছে, গলা দিয়ে ছড়া-কাটা লাইনের ঝরনা সুর বাজিয়ে চলছে, পদে পদে শব্দের মিলগুলো বেজে ওঠে যেন জলের নিচেকার নুড়ির আওয়াজ। সেই সঙ্গে চলত তার হাত পা নেড়ে ভাব-বাৎলানো। কিশোরী চাটুজ্যের সবচেয়ে বড়ো আপসোস ছিল এই যে, দাদাভাই অর্থাৎ কিনা আমি, এমন গলা নিয়ে পাঁচালির দলে ভরতি হতে পারলুম না। পারলে দেশে যা-হয় একটা নাম থাকত।

রাত হয়ে আসত, মাদুর-পাতা বৈঠক যেত ভেঙে। ভূতের ভয় শিরদাঁড়ার উপর চাপিয়ে চলে যেতুম বাড়ির ভিতরে মায়ের ঘরে। মা তখন তাঁর খুড়িকে নিয়ে তাস খেলছেন। পংখের-কাজ-করা ঘর হাতির দাঁতের মতো চকচকে, মস্ত তক্তপোশের উপর জাজিম পাতা। এমন উৎপাত বাধিয়ে দিতুম যে তিনি হাতের খেলা ফেলে দিয়ে বলতেন, “জ্বালাতন করলে, যাও খুড়ি, ওদের গল্প শোনাও গে।’ আমরা বাইরের বারান্দায় ঘটির জলে পা ধুয়ে দিদিমাকে টেনে নিয়ে বিছানায় উঠতুম। সেখানে শুরু হত দৈত্যপুরী থেকে রাজকন্যার ঘুম ভাঙিয়ে আনার পালা। মাঝখানে আমারই ঘুম ভাঙায় কে। রাতের প্রথম পহরে শেয়াল উঠত ডেকে। তখনও শেয়াল-ডাকা রাত কলকাতার কোনো কোনো পুরোনো বাড়ির ভিতের নীচে ফুকরে উঠত।

teen balok
Teen balok, the three boys: From L-R, Rabindranath, Somendranath, Srikontho Sinha, Satyaprasad
(http://sesquicentinnial.blogspot.com.au/2011/09/rathindranath-and-jorasanko-contd-47.html)

Chelebela/My childhood 3

Time passes, the sunshine grows harsh, a bell rings at the gate; but the day inside the palanquin does not follow the rules set by the bell. There it will be twelve o’clock only when the drums signal an end to the court at the gates to the palace and the king goes to bathe in sandalwood scented water. The people who were my wardens on those holiday afternoons napped after their meals. I was sitting alone. In my imagination the still palanquin was moving, the bearers who were made of the winds faithful to the whims of my mind. The path we took was according to my plan. The palanquin travelled to far off lands, whose names I had picked out of books I had read. At times the path led into dense forests where tiger eyes burned brightly and the skin crawled in fear. With me was the famed hunter Biswanath, he would fire his gun and everything would be silent again. At other times the palanquin changed into a peacock prow ship afloat on the sea, far from any land. The oars fall rhythmically, the waves swell and fall back. The sailors say, Ahoy, there she blows! Abdul Majhi is at the tiller, with his pointy beard and shaved upper lip and head. I recognised him as he used to bring hilsa from the River Padma and turtle eggs for my elder brother.

He had told me once how as he was fishing from his dinghy at the end of the month, a sudden summer storm rose. It was very wild weather and his boat nearly sank. He jumped into the water with the ropes in his teeth and swam to safety on the sand shoals. He then pulled the boat out of the water. I did not like the story as it ended far too quickly. The boat did not sink, he ended up safe without much effort –this was hardly a story worth telling. I kept asking him, ‘And then what happened?’

He said, ‘A great disaster! I saw a leopard. What a pair of whiskers it had! It must have climbed onto the trees on the other bank near the market. As soon as the storm began, the branch broke off and fell into the Padma and the leopard floated along with the currents.

It gasped several times as it climbed onto the shoal. I made a noose as soon as I saw it. The animal glared at me with great big eyes as it stood before me. He was hungry after his swim. His bright red tongue dripped with saliva as he looked at me. I am sure he had met many people and eaten a few too, but he had never met Abdul before! I yelled, ‘Come to me, my child!’ As soon as it reared up, I slipped the noose around its neck, the more it struggled the tighter it got and the more its tongue protruded.

At this point, I became anxious and said, ‘Abdul, did it die?’

Abdul said. ‘It would not dare to die! The tide was coming in and I still had to return to Bahadurganj. So I attached the big cat to my boat and made it pull me along for many miles. Whenever it growled I nudged its sides with the oar. It covered the distance that could have taken ten to fifteen hours in one and a half hours. Do not ask me anymore questions, I have no answers.’

I said, ‘Fine, now tell me about the crocodiles.’

Abdul answered, ‘I have seen its nose above the water often. When they sun themselves on the shallows of the river, they look like they are smiling in a most unpleasant manner. If I had a gun I could have taken care of them. But my license has run out. But something funny happened. One day Knachi the gypsy was sitting on the banks splitting bamboo with her cleaver, her goat tied up next to her. She had not noticed when a crocodile came and pulled the animal into the water. Knachi jumped onto its back and stabbed the giant lizard with her cleaver again and again. The creature left the goat alone and sank into the water.’

I eagerly said, ‘And then, what happened then?’

Abdul said, ‘The rest of that story has disappeared under water, it will take a long time to bring it back. I will send my spies to find out and tell you the next time we meet.’

But he never came back; perhaps he has gone to find out the ending to the story.

These stories were of my travels on the palanquin; on other days I would play at being a teacher with the railings on the verandah as my students. They were mostly silent in fear. One or two were very mischievous, they never paid attention to the lesson and I would try to frighten them that they would have to become porters when they were older. They were marked all over by my beatings, but their mischief could not stop as that would have signaled an end to my games. There was another game I played with my wooden lion. After hearing of animals being sacrificed for the festivals, I decided that I would stage a spectacular sacrifice of my lion. I hit it many times with a stick and as it was a ceremony I made up the necessary incantation to accompany my actions:

Uncle Lion is cutted
Andibos is butted
Ulukutt Dhulukutt Dhyamkurkur
Walnut Fallnut Cut Cut Crash
Split Splat Smash

Almost all the words were borrowed; my only contribution was the word walnut. I loved eating them. It will be clear from the ‘crash’ that my sword was wooden, and the ‘smash’ tells you that it was not very strong at all.

***

The skies have not cleared since last night. It keeps raining continually. The trees are huddled stupidly. The birds are silent. It reminds me of the evenings of my childhood.

We used to spend our days in the servant’s quarters. The heart ache of English spellings and meaning books had not entered our evenings yet. My older brother Shejdada would say one needed a firm foundation in Bengali before learning English. That is why when the other school going children of our age were mechanically repeating the Bengali meanings of ‘I am up’ and ‘He is down’, I was yet to learn about b-a-d being bad and m-a-d meaning mad.

As per the customs of the Nawabs, the servant’s quarters were known as the Toshakhana. Even though our house had descended much lower than the olden days of extravagance, terms such as Toshakhana, Daftarkhana for the offices and Baithakkhana for the living room still clung on.

In the southern part of the Toshakhana is a large room where a glass shaded lamp filled with castor oil burns weakly. On the walls hang pictures of Ganesha and Ma Kali. Geckoes dart around them hunting for insects. There is no furniture in the room except for a dirty mat spread out on the floor.

I better tell you that our lifestyle was quite impoverished. We rarely used cars or carriages. There was a palanquin in a shed and an old horse under the tamarind tree in the corner outside. Our clothes were very plain. It was many years before we were used to wearing socks. When we first started eating bread and butter that came wrapped in banana leaves instead of the rations on Brojeswar’s list, we thought we had managed to finally touch the sky. This is how we practiced getting used to the remnants of the profligacy of the past.

The servant who was the leader in these sessions on the mat was known as Brojeswar. His hair and moustache were a mixture of salt and pepper. The skin over his face was stretched tight and dry, his nature was serious and he chewed out his words in a harsh voice. His previous employer had been wealthy and famous. He had been demoted to the position of managing the casually brought up children in our household. I have heard that he had been a teacher in his village school. This influenced his language and behavior in the years to follow. Instead of saying ‘Someone is sitting outside’, he would say, ‘Someone is waiting outside.’ The adults laughed when they heard this. His pride was only matched by his obsessive cleanliness. When he bathed he would descend into the pond and part the oily surface of the water with his hands about five or six times before taking a quick dip. After his bath he would walk along the garden path, his hand held away from his body as if he wished to preserve his sanctity by avoiding all contact with this world. He spoke with great authority on manners of etiquette. His neck was slightly twisted, adding to the weight of his utterances. But there was one chink in his all knowing armour. He was secretly very fond of his food. He never served us our food on the plates before we sat down to eat. When we did, he would gently swing one luchi at a time in front of us asking, ‘Will I give you any more?’ It was abundantly clear from his tone that he would like an answer in the negative. I would often say, ‘No more.’ He never insisted after that. He also loved bowls of milk, and I did not. He had a cupboard with shelves in his own room. He poured the milk into a large brass bowl inside it and the luchis and accompaniments on a wooden platter. The cats would greedily circle the cupboard sniffing the air.

I became a light eater very easily as a result of this practice from the days of my childhood. No one can say that this made me weak. I was as strong as the boys who never stinted on eating, if not stronger. I was so annoyingly healthy that when I felt like bunking school I could not even try and make myself sick. I would wander around all day in wet shoes, but a runny nose eluded me. I would sleep on the open terrace in the winter month of Kartick, my hair damp from the dew; even though my throat tickled, there would be no cough to follow it. And the stomach aches that I told my mother about were never far reaching enough to affect the actual region, they only occurred on demand. Ma must have smiled to herself over these; I do not think she was ever seriously worried for my sake. All she would do was call for a servant and say to them, ‘Listen, go and tell the tutor, he does not have to teach anyone today.’ Our old fashioned mother used to think there was little harm in her son occasionally neglecting his studies. Today’s mothers would have not just sent me back; I would also have had my ears boxed. Sometimes she would administer a dose of castor oil with a twinkling smile; the illness would disappear forever. If rarely I did have a fever I never saw her fussing over me. The doctor would feel my temperature and prescribe castor oil and a complete fast for the first day. I did get to drink hot water but only in small quantities. Cardamom seeds were allowed with that. After three days of fasting, hot rice with a side dish of little Mourola fish was like absolute ambrosia.

I do not remember ever being sick with a fever. Malaria was almost unheard of. Even though quinine was the worst medicine for making you vomit, I do not remember taking it. I never needed to have a boil lanced. I have still not had chicken pox or the measles. My health was obstinately good. If the mothers of today wish to keep their sons this healthy in the interests of continued discipline at the hands of their school teachers, they must seek out a servant like Brojeswar. He will save expenses both on food as well as doctors; especially in these times of machine made flour and adulterated oil. One must remember though, there was no chocolate in those days. What we had was pink stick candy that cost one paisa. I do not know whether this rose scented sesame seed coated block of sugar still makes children’s pockets sticky these days– it must have vanished in shame from the households of the wealthy of today. Where did the paper bags of fried spices go! And the cheap sesame seed encrusted pastries? Are those still available? Let them be if they are no more.

Early in the evenings I would listen to Brojeswar narrate the seven chapters of the Ramayan by Krittibas. In the midst of that Kishori Chatujje would suddenly make an appearance. He knew the entire folk version of the Ramayan and its songs by heart. He would come and sit down, overwhelming Krittibas with his verses.

‘Oh Lakshman, behold an ill omen, danger is surely near, hear, hear!’

His face beamed and his bald head shone as his voice tripped over the rhymes like a water fall, the syllables ringing out like pebbles on a stream bed. He moved his hands expressively as he sang. His greatest regret was that a boy with a voice like mine could not join a folk music troupe. Surely I would have made a name for myself throughout the land.

As the night deepened, the story telling session on the mats would break up. I would go back into the house to my mother, a fear of ghosts accompanying me all the way. She would be playing cards with her aunt. There was a carpet spread out on her huge bed that was in-laid with mother of pearl as shiny as ivory. I used to create such a fuss that she would put her cards down and say, ‘How annoying! Aunt, you better tell the children stories then.’ We would wash our feet on the verandah outside with water from metal pots and then climb into bed with our grandmother. She would tell us tales of how the princess was rescued from her magical sleep in the giant’s palace. I was soon fast asleep, oblivious to the attempts of the gallant prince who had awakened the damsel. In the first hour of the night jackals would yelp. Those were the times when nights filled with jackal calls still cried out around the foundations of some of Kolkata’s old houses.

বউঠাকুরাণীর হাট/ BouThakurani’s market

প্রথম পরিচ্ছেদ

রাত্রি অনেক হইয়াছে। গ্রীষ্মকাল। বাতাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে। গাছের পাতাটিও নড়িতেছে না। যশোহরের যুবরাজ, প্রতাপাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র, উদয়াদিত্য তাঁহার শয়নগৃহের বাতায়নে বসিয়া আছেন। তাঁহার পার্শ্বে তাঁহার স্ত্রী সুরমা।

সুরমা কহিলেন, “প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাকো, ধৈর্য ধরিয়া থাকো। একদিন সুখের দিন আসিবে।”

উদয়াদিত্য কহিলেন, “আমি তো আর কোনো সুখ চাই না। আমি চাই, আমি রাজপ্রাসাদে না যদি জন্মাইতাম, যুবরাজ না যদি হইতাম, যশোহর-অধিপতির ক্ষুদ্রতম তুচ্ছতম প্রজার প্রজা হইতাম, তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র, তাঁহার সিংহাসনের তাঁহার সমস্ত ধন মান যশ প্রভাব গৌরবের একমাত্র উত্তরাধিকারী না হইতাম! কী তপস্যা করিলে এ-সমস্ত অতীত উল্‌টাইয়া যাইতে পারে!”

সুরমা অতি কাতর হইয়া যুবরাজের দক্ষিণ হস্ত দুই হাতে লইয়া চাপিয়া ধরিলেন, ও তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন। যুবরাজের ইচ্ছা পুরাইতে প্রাণ দিতে পারেন, কিন্তু প্রাণ দিলেও এই ইচ্ছা পুরাইতে পারিবেন না, এই দুঃখ।

যুবরাজ কহিলেন, “সুরমা, রাজার ঘরে জন্মিয়াছি বলিয়াই সুখী হইতে পারিলাম না। রাজার ঘরে সকলে বুঝি কেবল উত্তরাধিকারী হইয়া জন্মায়, সন্তান হইয়া জন্মায় না। পিতা ছেলেবেলা হইতেই আমাকে প্রতিমুহূর্তে পরখ করিয়া দেখিতেছেন, আমি তাঁহার উপার্জিত যশোমান বজায় রাখিতে পারিব কি না, বংশের মুখ উজ্জ্বল করিতে পারিব কি না, রাজ্যের গুরুভার বহন করিতে পারিব কি না। আমার প্রতি কার্য, প্রতি অঙ্গভঙ্গী তিনি পরীক্ষার চক্ষে দেখিয়া আসিতেছেন, স্নেহের চক্ষে নহে। আত্মীয়বর্গ, মন্ত্রী, রাজসভাসদগণ, প্রজারা আমার প্রতি কথা প্রতি কাজ খুঁটিয়া খুঁটিয়া লইয়া আমার ভবিষ্যৎ গণনা করিয়া আসিতেছে। সকলেই ঘাড় নাড়িয়া কহিল– না, আমার দ্বারা এ বিপদে রাজ্য রক্ষা হইবে না। আমি নির্বোধ, আমি কিছুই বুঝিতে পারি না। সকলেই আমাকে অবহেলা করিতে লাগিল, পিতা আমাকে ঘৃণা করিতে লাগিলেন। আমার আশা একেবারে পরিত্যাগ করিলেন। একবার খোঁজও লইতেন না।

সুরমার চক্ষে জল আসিল। সে কহিল, “আহা! কেমন করিয়া পারিত!”

তাহার দুঃখ হইল, তাহার রাগ হইল, সে কহিল, “তোমাকে যাহারা নির্বোধ মনে করিত তাহারাই নির্বোধ।”

উদয়াদিত্য ঈষৎ হাসিলেন, সুরমার চিবুক ধরিয়া তাহার রোষে আরক্তিম মুখখানি নাড়িয়া দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হইয়া কহিলেন, “না, সুরমা, সত্য সত্যই আমার রাজ্যশাসনের বুদ্ধি নাই। তাহার যথেষ্ট পরীক্ষা হইয়া গেছে। আমার যখন ষোল বৎসর বয়স, তখন মহারাজ কাজ শিখাইবার জন্য হোসেনখালি পরগনার ভার আমার হাতে সমর্পণ করেন। ছয় মাসের মধ্যেই বিষম বিশৃঙ্খলা ঘটিতে লাগিল। খাজনা কমিয়া গেল, প্রজারা আশীর্বাদ করিতে লাগিল। কর্মচারীরা আমার বিরুদ্ধে রাজার নিকটে অভিযোগ করিতে লাগিল। রাজসভার সকলেরই মত হইল, যুবরাজ প্রজাদের যখন অত প্রিয়পাত্র হইয়া পড়িয়াছেন, তখনই বুঝা যাইতেছে উঁহার দ্বারা রাজ্যশাসন কখনো ঘটিতে পারিবে না। সেই অবধি মহারাজ আমার পানে আর বড়ো একটা তাকাইতেন না। বলিতেন– ও কুলাঙ্গার ঠিক রায়গড়ের খুড়া বসন্ত রায়ের মতো হইবে, সেতার বাজাইয়া নাচিয়া বেড়াইবে ও রাজ্য অধঃপাতে দিবে।”

সুরমা আবার কহিলেন, “প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাকো, ধৈর্য ধরিয়া থাকো। হাজার হউন, পিতা তো বটেন। আজকাল রাজ্য-উপার্জন, রাজ্যবৃদ্ধির একমাত্র দুরাশায় তাঁহার সমস্ত হৃদয় পূর্ণ রহিয়াছে, সেখানে স্নেহের ঠাঁই নাই। যতই তাঁহার আশা পূর্ণ হইতে থাকিবে, ততই তাঁহার স্নেহের রাজ্য বাড়িতে থাকিবে।”

যুবরাজ কহিলেন, “সুরমা, তোমার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, দূরদর্শী, কিন্তু এইবারে তুমি ভুল বুঝিয়াছ। এক তো আশার শেষ নাই; দ্বিতীয়ত, পিতার রাজ্যের সীমা যতই বাড়িতে থাকিবে, রাজ্য যতই লাভ করিতে থাকিবেন, ততই তাহা হারাইবার ভয় তাঁহার মনে বাড়িতে থাকিবে; রাজকার্য যতই গুরুতর হইয়া উঠিবে, ততই আমাকে তাহার অনুপযুক্ত মনে করিবেন।

সুরমা ভুল বুঝে নাই, ভুল বিশ্বাস করিত মাত্র; বিশ্বাস বুদ্ধিকেও লঙ্ঘন করে। সে একমনে আশা করিত, এইরূপই যেন হয়।

“চারিদিকে কোথাও বা কৃপাদৃষ্টি কোথাও বা অবহেলা সহ্য করিতে না পারিয়া আমি মাঝে মাঝে পলাইয়া রায়গড়ে দাদামহাশয়ের কাছে যাইতাম। পিতা বড়ো একটা খোঁজ লইতেন না। আঃ, সে কী পরিবর্তন। সেখানে গাছপালা দেখিতে পাইতাম, গ্রামবাসীদের কুটিরে যাইতে পারিতাম, দিবানিশি রাজবেশ পরিয়া থাকিতে হইত না। তাহা ছাড়া জান তো, যেখানে দাদামহাশয় থাকেন, তাহার ত্রিসীমায় বিষাদ ভাবনা বা কঠোর গাম্ভীর্য তিষ্ঠিতে পারে না। গাহিয়া বাজাইয়া, আমোদ করিয়া চারিদিক পূর্ণ করিয়া রাখেন। চারিদিকে উল্লাস, সদ্ভাব, শান্তি। সেইখানে গেলেই আমি ভুলিয়া যাইতাম যে, আমি যশোহরের যুবরাজ। সে কী আরামের ভুল। অবশেষে আমার বয়স যখন আঠারো বৎসর, একদিন রায়গড়ে বসন্তের বাতাস বহিতেছিল, চারিদিকে সবুজ কুঞ্জবন, সেই বসন্তে আমি রুক্মিণীকে দেখিলাম।”

It is very late at night in summer. Not a single leaf moves in the still air. The heir to Jessore, Pratapaditya’s eldest son Udayaditya sits at the window of his sleeping quarters. Beside him sits his wife Surama.
Surama said, ‘Dearest, please bear this, be patient. Happier days will come soon.’

Udayaditya said, ‘I do not seek any other happiness. If only I was not born in the palace as a crown prince, but as the most insignificant of the subjects of the ruler of Jessore! If only I was not his eldest son, the only heir to his throne, all his wealth, honour, fame, influence and pride! What prayers must I offer to overturn this past!’

Surama held the prince’s right hand with both her hands in great anguish and looked at him as she sighed slowly. She would give her very life to satisfy his wishes but this particular wish was not to be fulfilled that easily, this was her sadness.

The prince said, ‘Surama, I could not be happy only because of my birth in the royal household. Here everyone takes birth as an heir not as a child. My father has tested me at every moment since childhood, whether I would be able to hold on to the honour and fame he has earned, or make my lineage proud, or even bear the great weight of the kingdom. He has observed every action of mine and each gesture I have made through the eyes of a judge, and not with affection. My relatives, the ministers, the courtiers, the subjects – they have all analysed each word and deed of mine in order to predict my future. They have all shaken their heads and said – No, this kingdom will not be safe with me in these times of danger. I am foolish, I understand nothing. They have all slighted me, my father has hated me. He gave up all hope regarding me. He never asked me once what I was feeling.’

Tears welled in Surama’s eyes. She said, ‘How could they do that!’

She felt sadness and anger and said, ‘The ones who thought you foolish are foolish themselves.’

Surama said once again, ‘Dearest, bear it for a while, be patient. He is after all your father. Today his heart is filled with worries about revenue and expansion of his lands, there is no space there for love. As his hopes are fulfilled, his heart will allow affection to reign within’

The prince said, ‘Surama, your intelligence is keen and far seeing, but this time you have misunderstood. Firstly, there is no end to these hopes and secondly, the more he expands his kingdom, the more the fears of losing it will grow within him; the more governance becomes important, the more he will see me as unsuitable to take up the responsibility of carrying it out.’

Udayaditya smiled gently and took Surama’s anger -reddened face in his hands and held it. In an instant he grew serious and said, ‘No, Surama, I really do not have the intelligence to run the kingdom. There have been enough tests of that. When I was sixteen years old, the king gave me the charge of Hosseinkhali district to teach me the business. Within six months there was great confusion. The revenue decreased, the subjects blessed me. The staff complained about me to the king. Everyone in the court thought if the prince is so beloved of the subjects, then it is evident that ruling will never be done well by him. Since then the king did not consider me much anymore. He would always say – the fellow is going to be just like our uncle in Raigarh, Basanto Ray, prancing around and playing the sitar while the kingdom goes to the dogs.

Surama had not understood anything erroneously, she just believed in the wrong ideals; even though she knew it to be contrary. She hoped that he would do exactly that.

‘Unable to bear neither the pitying looks nor the neglect I would escape some times to my grandfather in Raigarh. My father never tried to find out where I had gone. What a change that was! I would see trees, I would go into the huts of the villagers, I did not have to be dressed like a king all the time. And you know how where our Grandfather is, no sorrow, worries or grave faces cannot last for very long. He fills the air around himself with song, music and laughter. He is surrounded by joy, felicity and peace. As soon I went there I would forget that I was the crown prince of Jessore. What comfort in such forgetfulness! Eventually when I turned eighteen, it was spring in Raigarh and in that spring, surrounded by the green of the groves, I saw Rukmini.’

অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে/Ontoro momo bikoshito koro/Make my soul blossom as a flower

অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে–
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে ॥
জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে ॥
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।
সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিষ্পন্দিত করো হে।
নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে ॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: একতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৭ অগ্রহায়ণ, ১৩১৪
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1907
স্বরলিপিকার: কাঙ্গালীচরণ সেন

opera-fair-discover-your-inner-light-86

Make my soul blossom as a flower, thou who art my very own –
Make me pure, bathe in blessed light and make me beautiful in your eyes
Awaken me and give me the strength to cast aside all fear.
Shower me with your love so that I may grow tireless in casting aside all doubt.
Lead me into the world and free me from all obstacles.
Imbue all my actions with your gentle tune.
Let my soul dance to the beat of your feet
Welcome me, greet me and acknowledge me

Raga: Bhairabi
Beat: Ektal
Written: 1907

Follow the links and listen to:
Sharmila Roypommot: http://youtu.be/D0e1SfnkShA
A choir in Sweden: http://youtu.be/PybG14xVnDo

Photo: National Geographic

Chokher Bali 5/চোখের বালি ৫

কিছুকাল অনাবৃষ্টিতে যে শস্যদল শুষ্ক পীতবর্ণ হইয়া আসে, বৃষ্টি পাইবামাত্র সে আর বিলম্ব করে না; হঠাৎ বাড়িয়া উঠিয়া দীর্ঘকালের উপবাসদৈন্য দূর করিয়া দেয়, দুর্বল নত ভাব ত্যাগ করিয়া শস্যক্ষেত্রের মধ্যে অসংকোচে অসংশয়ে আপনার অধিকার উন্নত ও উজ্জ্বল করিয়া তোলে, আশার সেইরূপ হইল। যেখানে তাহার রক্তের সম্বন্ধ ছিল, সেখানে সে কখনো আত্মীয়তার দাবি করিতে পায় নাই; আজ পরের ঘরে আসিয়া সে যখন বিনা প্রার্থনায় এক নিকটতম সম্বন্ধ এবং নিঃসন্দিগ্ধ অধিকার প্রাপ্ত হইল, যখন সেই অযত্নলালিতা অনাথার মস্তকে স্বামী স্বহস্তে লক্ষ্মীর মুকুট পরাইয়া দিলেন, তখন সে আপন গৌরবপদ গ্রহণ করিতে লেশমাত্র বিলম্ব করিল না, নববধূযোগ্য লজ্জাভয় দূর করিয়া দিয়া সৌভাগ্যবতী স্ত্রীর মহিমায় মুহূর্তের মধ্যেই স্বামীর পদপ্রান্তে অসংকোচে আপন সিংহাসন অধিকার করিল।

রাজলক্ষ্মী সেদিন মধ্যাহ্নে সেই সিংহাসনে এই নূতন-আগত পরের মেয়েকে এমন চিরাভ্যস্তবৎ স্পর্ধার সহিত বসিয়া থাকিতে দেখিয়া দুঃসহ বিস্ময়ে নীচে নামিয়া আসিলেন। নিজের চিত্তদাহে অন্নপূর্ণাকে দগ্ধ করিতে গেলেন। কহিলেন, “ওগো, দেখো গে, তোমার নবাবের পুত্রী নবাবের ঘর হইতে কী শিক্ষা লইয়া আসিয়াছেন। কর্তারা থাকিলে আজ–”

অন্নপূর্ণা কাতর হইয়া কহিলেন, “দিদি, তোমার বউকে তুমি শিক্ষা দিবে, শাসন করিবে, আমাকে কেন বলিতেছ।”

রাজলক্ষ্মী ধনুষ্টংকারের মতো বাজিয়া উঠিলেন, “আমার বউ? তুমি মন্ত্রী থাকিতে সে আমাকে গ্রাহ্য করিবে!”

তখন অন্নপূর্ণা সশব্দপদক্ষেপে দম্পতিকে সচকিত সচেতন করিয়া মহেন্দ্রের শয়নগৃহে উপস্থিত হইলেন। আশাকে কহিলেন, “তুই এমনি করিয়া আমার মাথা হেঁট করিবি পোড়ারমুখী? লজ্জা নাই, শরম নাই, সময় নাই, অসময় নাই, বৃদ্ধা শাশুড়ির উপর সমস্ত ঘরকন্না চাপাইয়া তুমি এখানে আরাম করিতেছ? আমার পোড়াকপাল, আমি তোমাকে এই ঘরে আনিয়াছিলাম!”

বলিতে বলিতে তাঁহার চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িল, আশাও নতমুখে বস্ত্রাঞ্চল খুঁটিতে খুঁটিতে নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া কাঁদিতে লাগিল।

মহেন্দ্র কহিল, “কাকী, তুমি বউকে কেন অন্যায় ভর্ৎসনা করিতেছ। আমিই তো উহাকে ধরিয়া রাখিয়াছি।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি ভালো কাজ করিয়াছ? ও বালিকা, অনাথা, মার কাছ হইতে কোনোদিন কোনো শিক্ষা পায় নাই, ও ভালোমন্দর কী জানে। তুমি উহাকে কী শিক্ষা দিতেছ?”

মহেন্দ্র কহিল, “এই দেখো, উহার জন্যে স্লেট খাতা বই কিনিয়া আনিয়াছি। আমি বউকে লেখাপড়া শিখাইব, তা লোকে নিন্দাই করুক আর তোমরা রাগই কর।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “তাই কি সমস্ত দিনই শিখাইতে হইবে। সন্ধ্যার পর এক-আধ ঘণ্টা পড়ালেই তো ঢের হয়।”

মহেন্দ্র। অত সহজ নয় কাকী, পড়াশুনায় একটু সময়ের দরকার হয়।

অন্নপূর্ণা বিরক্ত হইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। আশাও ধীরে ধীরে তাঁহার অনুসরণের উপক্রম করিল– মহেন্দ্র দ্বার রোধ করিয়া দাঁড়াইল, আশার করুণ সজল নেত্রের কাতর অনুনয় মানিল না। কহিল, “রোসো, ঘুমাইয়া সময় নষ্ট করিয়াছি, সেটা পোষাইয়া লইতে হইবে।”

এমন গম্ভীরপ্রকৃতির শ্রদ্ধেয় মূঢ় থাকিতেও পারেন যিনি মনে করিবেন, মহেন্দ্র নিদ্রাবেশে পড়াইবার সময় নষ্ট করিয়াছে; বিশেষরূপে তাঁহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে, মহেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে অধ্যাপনকার্য যেরূপে নির্বাহ হয়, কোনো স্কুলের ইন্‌সপেকটর তাহার অনুমোদন করিবেন না।

আশা তাহার স্বামীকে বিশ্বাস করিয়াছিল; সে বস্তুতই মনে করিয়াছিল লেখাপড়া শেখা তাহার পক্ষে নানা কারণে সহজ নহে বটে, কিন্তু স্বামীর আদেশবশত নিতান্তই কর্তব্য। এইজন্য সে প্রাণপণে অশান্ত বিক্ষিপ্ত মনকে সংযত করিয়া আনিত, শয়নগৃহের মেঝের উপর ঢালা বিছানার এক পার্শ্বে অত্যন্ত গম্ভীর হইয়া বসিত এবং পুঁথিপত্রের দিকে একেবারে ঝুঁকিয়া পড়িয়া মাথা দুলাইয়া মুখস্থ করিতে আরম্ভ করিত। শয়নগৃহের অপর প্রান্তে ছোটো টেবিলের উপর ডাক্তারি বই খুলিয়া মাস্টারমশায় চৌকিতে বসিয়া আছেন, মাঝে মাঝে কটাক্ষপাতে ছাত্রীর মনোযোগ লক্ষ্য করিয়া দেখিতেছেন। দেখিতে দেখিতে হঠাৎ ডাক্তারি বই বন্ধ করিয়া মহেন্দ্র আশার ডাক-নাম ধরিয়া ডাকিল, “চুনি।” চকিত আশা মুখ তুলিয় চাহিল। মহেন্দ্র কহিল, “বইটা আনো দেখি, দেখি কোন্‌খানটা পড়িতেছ।”

আশার ভয় উপস্থিত হইল, পাছে মহেন্দ্র পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার আশা অল্পই ছিল। কারণ, চারুপাঠের চারুত্ব-প্রলোভনে তাহার অবাধ্য মন কিছুতেই বশ মানে না; বল্মীক সম্বন্ধে সে যতই জ্ঞানলাভের চেষ্টা করে, অক্ষরগুলো ততই তাহার দৃষ্টিপথের উপর দিয়া কালো পিপীলিকার মতো সার বাঁধিয়া চলিয়া যায়।

পরীক্ষকের ডাক শুনিয়া অপরাধীর মতো আশা ভয়ে ভয়ে বইখানি লইয়া মহেন্দ্রের চৌকির পাশে আসিয়া উপস্থিত হয়। মহেন্দ্র এক হাতে কটিদেশ বেষ্টনপূর্বক তাহাকে দৃঢ়রূপে বন্দী করিয়া অপর হাতে বই ধরিয়া কহে, “আজ কতটা পড়িলে দেখি।” আশা যতগুলা লাইনে চোখ বুলাইয়াছিল, দেখাইয়া দেয়। মহেন্দ্র ক্ষুণ্নস্বরে বলে, “উঃ! এতটা পড়িতে পারিয়াছ? আমি কতটা পড়িয়াছি দেখিবে?” বলিয়া তাহার ডাক্তারি বইয়ের কোনো-একটা অধ্যায়ের শিরোনামটুকু মাত্র দেখাইয়া দেয়। আশা বিস্ময়ে চোখদুটা ডাগর করিয়া বলে, “তবে এতক্ষণ কী করিতেছিলে।” মহেন্দ্র তাহার চিবুক ধরিয়া বলে, আমি একজনের কথা ভাবিতেছিলাম, কিন্তু যাহার কথা ভাবিতেছিলাম সেই নিষ্ঠুর তখন চারুপাঠে উইপোকার অত্যন্ত মনোহর বিবরণ লইয়া ভুলিয়া ছিল।” আশা এই অমূলক অভিযোগের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দিতে পারিত– কিন্তু হায়, কেবলমাত্র লজ্জার খাতিরে প্রেমের প্রতিযোগিতায় অন্যায় পরাভব নীরবে মানিয়া লইতে হয়।

ইহা হইতে স্পষ্ট প্রমাণ হইবে, মহেন্দ্রের এই পাঠশালাটি সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিদ্যালয়ের কোনো নিয়ম মানিয়া চলে না।

হয়তো একদিন মহেন্দ্র উপস্থিত নাই– সেই সুযোগে আশা পাঠে মন দিবার চেষ্টা করিতেছে, এমন সময় কোথা হইতে মহেন্দ্র আসিয়া তাহার চোখ টিপিয়া ধরিল, পরে তাহার বই কাড়িয়া লইল, কহিল, “নিষ্ঠুর, আমি না থাকিলে তুমি আমার কথা ভাব না, পড়া লইয়া থাক?”

আশা কহিল, “তুমি আমাকে মূর্খ করিয়া রাখিবে?”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার কল্যাণে আমারই বা বিদ্যা এমনই কী অগ্রসর হইতেছে।”

কথাটা আশাকে হঠাৎ বাজিল; তৎক্ষণাৎ চলিয়া যাইবার উপক্রম করিয়া কহিল, “আমি তোমার পড়ায় কী বাধা দিয়াছি।”

মহেন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “তুমি তাহার কী বুঝিবে। আমাকে ছাড়িয়া তুমি যত সহজে পড়া করিতে পার, তোমাকে ছাড়িয়া তত সহজে আমি আমার পড়া করিতে পারি না।”

গুরুতর দোষারোপ। ইহার পরে স্বভাবতই শরতের এক পসলার মতো এক দফা কান্নার সৃষ্টি হয় এবং অনতিকালমধ্যেই কেবল একটি সজল উজ্জ্বলতা রাখিয়া সোহাগের সূর্যালোকে তাহা বিলীন হইয়া যায়।

শিক্ষক যদি শিক্ষার সর্বপ্রধান অন্তরায় হন, তবে অবলা ছাত্রীর সাধ্য কী বিদ্যারণ্যের মধ্যে পথ করিয়া চলে। মাঝে মাঝে মাসিমার তীব্র ভর্ৎসনা মনে পড়িয়া চিত্ত বিচলিত হয়– বুঝিতে পারে, লেখাপড়া একটা ছুতা মাত্র; শাশুড়িকে দেখিলে লজ্জায় মরিয়া যায়। কিন্তু শাশুড়ি তাহাকে কোনো কাজ করিতে বলেন না, কোনো উপদেশ দেন না; অনাদিষ্ট হইয়া আশা শাশুড়ির গৃহকার্যে সাহায্য করিতে গেলে তিনি ব্যস্তসমস্ত হইয়া বলেন, “কর কী, কর কী, শোবার ঘরে যাও, তোমার পড়া কামাই যাইতেছে।”

অবশেষে অন্নপূর্ণা আশাকে কহিলেন, “তোর যা শিক্ষা হইতেছে সে তো দেখিতেছি, এখন মহিনকেও কি ডাক্তারি দিতে দিবি না।”

শুনিয়া আশা মনকে খুব শক্ত করিল, মহেন্দ্রকে বলিল, “তোমার এক্‌জামিনের পড়া হইতেছে না, আজ হইতে আমি নীচে মাসিমার ঘরে গিয়া থাকিব।”

এ বয়সে এতবড়ো কঠিন সন্ন্যাসব্রত! শয়নালয় হইতে একেবারে মাসিমার ঘরে আত্মনির্বাসন! এই কঠোর প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করিতে তাহার চোখের প্রান্তে জল আসিয়া পড়িল, তাহার অবাধ্য ক্ষুদ্র অধর কাঁপিয়া উঠিল এবং কণ্ঠস্বর রুদ্ধপ্রায় হইয়া আসিল।

মহেন্দ্র কহিল, “তবে তাই চলো, কাকীর ঘরেই যাওয়া যাক– কিন্তু তাহা হইলে তাঁহাকে উপরে আমাদের ঘরে আসিতে হইবে।”

আশা একবড়ো উদার গম্ভীর প্রস্তাবে পরিহাস প্রাপ্ত হইয়া রাগ করিল। মহেন্দ্র কহিল, “তার চেয়ে তুমি স্বয়ং দিনরাত্রি আমাকে চোখে চোখে রাখিয়া পাহারা দাও, দেখো আমি এক্‌জামিনের পড়া মুখস্থ করি কি না।”

অতি সহজেই সেই কথা স্থির হইল। চোখে চোখে পাহারার কার্য কিরূপ ভাবে নির্বাহ হইত তাহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া অনাবশ্যক, কেবল এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, সে বৎসর মহেন্দ্র পরীক্ষায় ফেল করিল এবং চারুপাঠের বিস্তারিত বর্ণনা সত্ত্বেও পুরুভুজ সম্বন্ধে আশার অনভিজ্ঞতা দূর হইল না।

এইরূপ অপূর্ব পঠন-পাঠন-ব্যাপার যে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইয়াছিল তাহা বলিতে পারি না। বিহারী মাঝে মাঝে আসিয়া অত্যন্ত গোল বাধাইয়া দিত। “মহিনদা মহিনদা” করিয়া সে পাড়া মাথায় করিয়া তুলিত। মহেন্দ্রকে তাহার শয়নগৃহের বিবর হইতে টানিয়া না বাহির করিয়া সে কোনোমতেই ছাড়িত না। পড়ায় শৈথিল্য করিতেছে বলিয়া সে মহেন্দ্রকে বিস্তর ভর্ৎসনা করিত। আশাকে বলিত, “বউঠান্‌, গিলিয়া খাইলে হজম হয় না, চিবাইয়া খাইতে হয়। এখন সমস্ত অন্ন এক গ্রাসে গিলিতেছ, ইহার পরে হজমি গুলি খুঁজিয়া পাইবে না।”

মহেন্দ্র বলিত, “চুনি ও কথা শুনিয়ো না– বিহারী আমাদের সুখে হিংসা করিতেছে।”

বিহারী বলিত, “সুখ যখন তোমার হাতেই আছে, তখন এমন করিয়া ভোগ করো যাহাতে পরের হিংসা না হয়।”

মহেন্দ্র উত্তর করিত, “পরের হিংসা পাইতে যে সুখ আছে। চুনি, আর-একটু হইলেই আমি গর্দভের মতো তোমাকে বিহারীর হাতে সমর্পণ করিতেছিলাম।”

বিহারী রক্তবর্ণ হইয়া বলিয়া উঠিত, “চুপ!”

এই-সকল ব্যাপারে আশা মনে মনে বিহারীর উপরে ভারি বিরক্ত হইত। এক সময়ে তাহার সহিত বিহারীর বিবাহ-প্রস্তাব হইয়াছিল বলিয়াই বিহারীর প্রতি তাহার একপ্রকার বিমুখ ভাব ছিল, বিহারী তাহা বুঝিত এবং মহেন্দ্র তাহা লইয়া আমোদ করিত।

রাজলক্ষ্মী বিহারীকে ডাকিয়া দুঃখ করিতেন। বিহারী কহিত, “মা, পোকা যখন গুটি বাঁধে তখন তত বেশি ভয় নয়, কিন্তু যখন কাটিয়া উড়িয়া যায় তখন ফেরানো শক্ত। কে মনে করিয়াছিল, ও তোমার বন্ধন এমন করিয়া কাটিবে।”

মহেন্দ্রের ফেল-করা সংবাদে রাজলক্ষ্মী গ্রীষ্মকালের আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের মতো দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিলেন, কিন্তু তাহার গর্জন এবং দাহনটা সম্পূর্ণ ভোগ করিলেন অন্নপূর্ণা। তাঁহার আহারনিদ্রা দূর হইল।

chokher bali 5

Grasses that have grown dry and yellow during a drought do not wait one moment once it rains and grow fast in defiance of the lengthy period of want. They cast aside all their former weakness and stand tall establishing their position among the others around them; this was the same thing that was happening to Asha. Where she had been bound by ties of blood, she had never been able to claim any rights of belonging, but today in her new home among strangers, she found one of the closest of relationships and unalloyed rights without having to ask for them. When her husband crowned this neglected orphaned creature as a goddess in his world, she did not take long to rise and accept her position of glorious fortune on her throne at her husband’s feet, putting aside all the customary shyness of a new bride.

That afternoon when Rajlakshmi saw this newly arrived girl take up that cherished position with an air of accustomed ease, she came downstairs in an unbearable state of excitement. She went to Annapurna to vent her pent up fury, saying, ‘Go and have a look, your princess has brought such regal airs from her own family! If only his father were alive…’

Annapurna was hurt and said, ‘Sister, when she misbehaves, you must teach your daughter-in-law, even discipline her, why ask me?’

Rajlakshmi snapped like a taut bow saying, ‘My daughter-in-law? While you are playing her ally in this household, why should she listen to me!’

Annapurna then went to Mahendra’s room, warning them of her presence with loud footsteps. She said to Asha, ‘Will you shame me like this, you wretch? You have no sense of decency or of time, nor of what is appropriate, piling all the housework on your old mother-in-law and sitting here as though on holiday! It is my misfortune that I brought you into this family!’

As she spoke, she wept and Asha stood with bowed head, beginning to cry quietly as she picked at her clothes.

Mahendra said, ‘Aunt, why are you accusing her unjustly? I am the one who has made her stay with me here.’

Annapurna asked, ‘Is that the right thing to do? She is still just a girl, an orphan, she has never learned the right ways from a mother, what does she know of what right and wrong are? What kind of behavior are you teaching her?’

Mahendra said, ‘See, I have bought a slate tablet and books for her. I will teach her to read and write, and I don’t care if people talk about this or if you or anyone else feels angry!’

Annapurna said, ‘Do you really have to teach her all day? An hour or so in the evening should be enough I would have thought.’

Mahendra answered, ‘It is not that easy Aunt! One must spend some time in studying.’

Greatly annoyed, Annapurna left the room. Asha was following her out slowly when Mahendra went and stood in her way, barring her from leaving. He refused to heed the plea in her moist tearful eyes and said, ‘Wait, the time lost in sleeping must be made up.’

There probably are some serious and respectable people who are ignorant enough to think that Mahendra had wasted his time sleeping when he should have been teaching Asha; I must inform that person that the mode of study under Mahendra’s supervision was such that no school inspector would ever approve of it.

Asha had believed her husband when he said that it was not easy for her to study for various reasons, but she knew it was essential to obey her husband’s wishes. She would gather her wayward thoughts, sit down at one corner of the mat on the floor with a very serious face and read aloud from the text books as she swayed in concentration. At the other end of the room, her teacher would be studying a medical book at a small table, keeping an occasional eye on his ward’s intense efforts.

He would then suddenly close his book and call her by her nick name, ‘Chuni,’ Asha would look up startled.

‘Let me see which part you are up to?’

Asha was afraid that Mahendra would test her. There was little chance of her ever answering these questions successfully. Her unschooled mind had failed to submit to the promise of scholarliness of the Scholar’s Aid book and the more she tried to learn about termites, the more the letters crowded and wove in front of her eyes like ranks of black ants.

Asha would go fearfully and stand in front of Mahendra’s chair as though she had done something wrong. Mahendra would pull her close by the waist and hold her tightly as he held the book in his other hand and ask, ‘How much did you study today?’ When Asha showed him he would say petulantly, ‘That is a lot! Do you want to know how much I have studied?’ and he would trace out the heading of a chapter on his own medical text book. Asha’s eyes would widen in amazement as she would say, ‘But what did you do all this time?’ Mahendra would turn her face towards him by holding her chin and say, ‘I was thinking about someone, but that cruel person was studying a rather pleasant account of termites at the same time!’ Asha could have easily given a suitable answer to this unjust accusation, but she had to silently admit defeat as this was a contest of love.

This incident proves that this school of Mahendra’s did not follow any of the rules of either government run or privately owned schools.

On some days in Mahendra’s absence, Asha would be trying to focus on her studies when he would come home and surprise her from the back, his hands placed across her eyes. He would then take her book away saying, ‘You cruel girl, how dare you study while I am away instead of thinking about me?’

Asha would reply, ‘Would you rather keep me illiterate then?’

‘What kind of progress am I making in my own studies? Thanks to you, I may add,’ answered Mahendra to this.

Asha felt very hurt when she heard this and made as if to leave instantly, saying, ‘What have I done to prevent you from studying?’

Mahendra held her hand and said, ‘What do you know of that? I cannot study as easily as you do when I am not with you.’

Serious allegations indeed! Of necessity there must be some tears to follow this, like shortlived autumnal showers and soon even these fade away in the sunshine of loving affections.

When the teacher is the biggest obstacle in the path of education, how can an innocent student make any progress along that difficult route? Occasionally when Asha thought of her aunt’s bitter admonishments – she too knew that the study sessions were just a ruse; when she saw her mother-in-law, she would cringe in shame. But her mother-in-law never asked her to do anything nor offered any guidance and when Asha went to her assistance without being asked, she would react immediately saying, ‘What are you doing? Go! Go to the bedroom, you must be missing out on your studies!’

Eventually Annapurna said to Asha, ‘I can see the great education you are getting, now will you not let Mahin become a doctor either?’

This made Asha steel her mind and she said to Mahendra, ‘You are not studying for your examinations, I have decided to go and stay with my aunt in her downstairs rooms from today.’

Such renunciation at this age! Self exile from her own bedroom to her aunt’s rooms! Even as she said the words, tears welled in her eyes and her little mouth quivered uncontrollably as her voice cracked with emotion.

Mahendra said, ‘Then let us go, but if we stay in her rooms, she will have to come upstairs to our bedroom.’

Asha was angry when he made fun of her generous offer. Mahendra said, ‘Why do you not keep me under close watch all the time, making sure that I do study for the examinations?’

This was quite easily decided. It is unnecessary to describe in great detail how this close invigilation was carried out, I feel sure you will understand if I tell you that Mahendra failed in his examinations that year and despite all the lengthy descriptions in her text books Asha remained completely unconscious of the characteristics of Purubhuja.

I cannot say that this unique mode of studying was allowed to be carried on without opposition from any one. Occasionally Bihari would come and create quite an upheaval by calling Mohin loudly enough for the whole neighbourhood to hear. He would not stop until his friend had come out of his own room. He rebuked Mahendra very harshly over the neglect to his education.

He said to Asha, ‘You know, one must not swallow one’s food in one enormous gulp, it is far better for the process of digestive health to chew each mouthful slowly. What you are doing now is eating all your food at one go, later there will be no medicine strong enough to fix your heart burn from this over indulgence.’

Mahendra said, ‘Do not listen to him Chuni, he is jealous of our bliss.’

Bihari said, ‘When you already have the key to happiness, try to enjoy it so that others do not feel envious.’

Mahendra would reply, ‘But there is such pleasure in arousing the envy of others. Chuni, to think that I was almost going to gift you to Bihari like an idiot!’

Bihari turned red and said, ‘Quiet!’

Asha would get very annoyed with Bihari over these events. Bihari understood that she had a negative attitude towards Bihari because they had once been considered as suitable for each other and Mahendra used to joke about it.

Rajlakshmi would speak of her sorrow with Bihari. He would tell her, ‘Ma, when an insect spins a cocoon, there is little to fear but once it emerges to fly off, one cannot bring it back. Who ever knew that he would escape your bonds like this!’

When she heard of Mahendra’s failure in the examinations, Rajlakshmi flared up like a sudden summer blaze but the ferocity of her anger and outrage was borne completely by Annapurna who now became so distraught she could hardly eat or drink.