Archive | August 2013

চোখের বালি ১৯/ Chokher Bali 19

১৯

বিনোদিনী মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “ব্যাপারখানা কী! অভিমান, না রাগ, না ভয়? আমাকে দেখাইতে চান, আমাকে কেয়ার করেন না? বাসায় গিয়া থাকিবেন? দেখি কত দিন থাকিতে পারেন?”

কিন্তু বিনোদিনীরও মনে মনে একটা অশান্ত ভাব উপস্থিত হইল।

মহেন্দ্রকে সে প্রতিদিন নানা পাশে বদ্ধ ও নানা বাণে বিদ্ধ করিতেছিল, সে-কাজ গিয়া বিনোদিনী যেন এ-পাশ ও-পাশ করিতে লাগিল। বাড়ি হইতে তাহার সমস্ত নেশা চলিয়া গেল। মহেন্দ্রবর্জিত আশা তাহার কাছে নিতান্তই স্বাদহীন। আশার প্রতি মহেন্দ্রের সোহাগ-যত্ন বিনোদিনীর প্রণয়বঞ্চিত চিত্তকে সর্বদাই আলোড়িত করিয়া তুলিত– তাহাতে বিনোদিনীর বিরহিণী কল্পনাকে যে বেদনায় জাগরূক করিয়া রাখিত তাহার মধ্যে উগ্র উত্তেজনা ছিল। যে-মহেন্দ্র তাহাকে তাহার সমস্ত জীবনের সার্থকতা হইতে ভ্রষ্ট করিয়াছে, যে-মহেন্দ্র তাহার মতো স্ত্রীরত্নকে উপেক্ষা করিয়া আশার মতো ক্ষীণবুদ্ধি দীনপ্রকৃতি বালিকাকে বরণ করিয়াছে, তাহাকে বিনোদিনী ভালোবাসে কি বিদ্বেষ করে, তাহাকে কঠিন শাস্তি দিবে না তাহাকে হৃদয়সমর্পণ করিবে, তাহা বিনোদিনী ঠিক করিয়া বুঝিতে পারে নাই। একটা জ্বালা মহেন্দ্র তাহারঅন্তরে জ্বালাইয়াছে, তাহা হিংসার না প্রেমের, না দুয়েরই মিশ্রণ, বিনোদিনী তাহা ভাবিয়া পায় না; মনে মনে তীব্র হাসি হাসিয়া বলে, “কোনো নারীর কি আমার মতো এমন দশা হইয়াছে। আমি মরিতে চাই কি মারিতে চাই, তাহা বুঝিতেই পারিলাম না।’ কিন্তু যে কারণেই বল, দগ্ধ হইতেই হউক বা দগ্ধ করিতেই হউক, মহেন্দ্রকে তাহার একান্ত প্রয়োজন। সে তাহার বিষদিগ্ধ অগ্নিবাণ জগতে কোথায় মোচন করিবে। ঘন নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে বিনোদিনী কহিল, “সে যাইবে কোথায়। সে ফিরিবেই। সে আমার।”

আশা ঘর পরিষ্কার করিবার ছুতা করিয়া সন্ধ্যার সময় মহেন্দ্রের বাহিরের ঘরে, মাথার-তেলে-দাগ-পড়া মহেন্দ্রের বসিবার কেদারা, কাগজপত্র-ছড়ানো ডেসক্, তাহার বই, তাহার ছবি প্রভৃতি জিনিসপত্র বার বার নাড়াচাড়া এবং অঞ্চল দিয়া ঝাড়-পোঁচ করিতেছিল। এইরূপে মহেন্দ্রের সকল জিনিস নানা রূপে স্পর্শ করিয়া, একবার রাখিয়া, একবার তুলিয়া, আশার বিরহসন্ধ্যা কাটিতেছিল। বিনোদিনী ধীরে ধীরে তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল; আশা ঈষৎ লজ্জিত হইয়া তাহার নাড়াচাড়ার কাজ রাখিয়া দিয়া, কী যেন খুঁজিতেছে এমনিতরো ভান করিল। বিনোদিনী গম্ভীরমুখে জিজ্ঞাসা করিল, “কী হচ্ছে তোর, ভাই!”

আশা মুখে একটুখানি হাসি জাগাইয়া কহিল, “কিছুই না, ভাই।”

বিনোদিনী তখন আশার গলা জড়াইয়া কহিল, “কেন ভাই বালি, ঠাকুরপো এমন করিয়া চলিয়া গেলেন কেন।”

আশা বিনোদিনীর এই প্রশ্নমাত্রেই সংশয়ান্বিত সশঙ্কিত হইয়া উত্তর করিল, “তুমি তো জানই, ভাই–কালেজে তাঁহার বিশেষ কাজ পড়িয়াছে বলিয়া গেছেন।”

বিনোদিনী ডান হাতে আশার চিবুক তুলিয়া ধরিয়া যেন করুণায় বিগলিত হইয়া স্তব্ধভাবে একবার তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিয়া দেখিল এবং দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

আশার বুক দমিয়া গেল। নিজেকে সে নির্বোধ এবং বিনোদিনীকে বুদ্ধিমতী বলিয়া জানিত। বিনোদিনীর ভাবখানা দেখিয়া হঠাৎ তাহার বিশ্বসংসার অন্ধকার হইয়া উঠিল। সে বিনোদিনীকে স্পষ্ট করিয়া কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিল না। দেয়ালের কাছে একটা সোফার উপরে বসিল। বিনোদিনীও তাহার পাশে বসিয়া দৃঢ় বাহু দিয়া আশাকে বুকের কাছে বাঁধিয়া ধরিল। সখীর সেই আলিঙ্গনে আশা আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না, তাহার দুই চক্ষু দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। দ্বারের কাছে অন্ধ ভিখারি খঞ্জনি বাজাইয়া গাহিতেছিল,

“চরণতরণী দে মা, তারিণী তারা।’

বিহারী মহেন্দ্রের সন্ধানে আসিয়া দ্বারের কাছে পৌঁছিতেই দেখিল– আশা কাঁদিতেছে, এবং বিনোদিনী তাহাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া ধীরে ধীরে তাহার চোখ মুছাইয়া দিতেছে। দেখিয়াই বিহারী সেখান হইতে সরিয়া দাঁড়াইল। পাশের শূন্য ঘরে গিয়া অন্ধকারে বসিল। দুই করতলে মাথা চাপিয়া ধরিয়া ভাবিতে লাগিল, আশা কেন কাঁদিবে। যে মেয়ে স্বভাবতই কাহারো কাছে লেশমাত্র অপরাধ করিতে অক্ষম, তাহাকেও কাঁদাইতে পারে এমন পাষণ্ড জগতে কে আছে! তার পরে বিনোদিনী যেমন করিয়া সান্ত্বনা করিতেছিল, তাহা মনে আনিয়া মনে মনে কহিল, “বিনোদিনীকে ভারি ভুল বুঝিয়াছিলাম। সেবায় সান্ত্বনায়, নিঃস্বার্থ সখীপ্রেমে সে মর্তবাসিনী দেবী।”

বিহারী অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসিয়া রহিল। অন্ধের গান থামিয়া গেলে বিহারী সশব্দে পা ফেলিয়া, কাশিয়া, মহেন্দ্রের ঘরের দিকে চলিল। দ্বারের কাছে না যাইতেই ঘোমটা টানিয়া আশা দ্রুতপদে অন্তঃপুরের দিকে ছুটিয়া গেল।

ঘরে ঢুকিতেই বিনোদিনী বলিয়া উঠিল, “এ কী বিহারীবাবু! আপনার কি অসুখ করিয়াছে।”

বিহারী। কিছু না।

বিনোদিনী। চোখ দুটো অমন লাল কেন।

বিহারী তাহার উত্তর না দিয়া কহিল, “বিনোদ-বোঠান, মহেন্দ্র কোথায় গেল।”

বিনোদিনী মুখ গম্ভীর করিয়া কহিল, “শুনিলাম, হাসপাতালে তাঁহার কাজ পড়িয়াছে বলিয়া কালেজের কাছে তিনি বাসা করিয়া আছেন। বিহারীবাবু একটু সরুন, আমি তবে আসি।”

অন্যমনস্ক বিহারী দ্বারের কাছে বিনোদিনীর পথরোধ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। চকিত হইয়া তাড়াতাড়ি পথ ছাড়িয়া দিল। সন্ধ্যার সময় একলা বাহিরের ঘরে বিনোদিনীর সঙ্গে কথাবার্তা লোকের চক্ষে সুদৃশ্য নয়, সে কথা হঠাৎ মনে পড়িল। বিনোদিনীর চলিয়া যাইবার সময় বিহারী তাড়াতাড়ি বলিয়া লইল, “বিনোদ-বোঠান, আশাকে তুমি দেখিয়ো। সে সরলা, কাহাকেও আঘাত করিতেও জানে না, নিজেকে আঘাত হইতে বাঁচাইতেও পারে না।”

বিহারী অন্ধকারে বিনোদিনীর মুখ দেখিতে পাইল না, সে মুখে হিংসার বিদ্যুৎ খেলিতে লাগিল। আজ বিহারীকে দেখিয়াই সে বুঝিয়াছিল যে, আশার জন্য করুণায় তাহার হৃদয় ব্যথিত। বিনোদিনী নিজে কেহই নহে! আশাকে ঢাকিয়া রাখিবার জন্য, আশার পথের কাঁটা তুলিয়া দিবার জন্য, আশার সমস্ত সুখ সম্পূর্ণ করিবার জন্যই তাহার জন্ম! শ্রীযুক্ত মহেন্দ্রবাবু আশাকে বিবাহ করিবেন, সেইজন্য অদৃষ্টের তাড়নায় বিনোদিনীকে বারাসতের বর্বর বানরের সহিত বনবাসিনী হইতে হইবে। শ্রীযুক্ত বিহারীবাবু সরলা আশার চোখের জল দেখিতে পারেন না, সেইজন্য বিনোদিনীকে তাহার আঁচলের প্রান্ত তুলিয়া সর্বদা প্রস্তুত হইয়া থাকিতে হইবে। একবার এই মহেন্দ্রকে, এই বিহারীকে, বিনোদিনী তাহার পশ্চাতের ছায়ার সহিত ধুলায় লুণ্ঠিত করিয়া বুঝাইতে চায়, আশাই বা কে আর বিনোদিনীই বা কে! দুজনের মধ্যে কত প্রভেদ! প্রতিকূল ভাগ্য-বশত বিনোদিনী আপন প্রতিভাকে কোনো পুরুষের চিত্তক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে জয়ী করিতে না পারিয়া জ্বলন্ত শক্তিশেল উদ্যত করিয়া সংহারমূর্তি ধরিল।

অত্যন্ত মিষ্টস্বরে বিনোদিনী বিহারীকে বলিয়া গেল, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন, বিহারীবাবু। আমার চোখের বালির জন্য ভাবিয়া ভাবিয়া নিজেকে বেশি কষ্ট দিবেন না।”

kalighat pat

19

Binodini wondered, ‘What is going on? Sulking in anger? Or in fear perhaps; you wish to show me that you do not care? You want to stay in lodgings? Let us see how long you can do this?’

But she felt uncertain as well about his absence.

She had sported daily with Mahendra, with ties that bound his soul and words that struck at his heart but now that he was gone, time seemed to hang heavy on her hands. The house lost all its charm for her. Without Mahendra, Asha was utterly unnecessary to Binodini. Her soul, starved as it was of love was continually agitated by Mahendra’s courting of Asha – the pain that awakened her hungry imagination also intensely inflamed her desire. The man who had destroyed her life and withheld fulfillment from her, who had ignored a woman like her in favour of an ignorant, needy waif like Asha – Binodini was not sure whether she loved this man, Mahendra, or hated him, whether she would give him her heart or take vicious revenge on him. Mahendra had lit a flame in her heart but Binodini could not tell whether it was of love or of hatred, or one fuelled by both emotions. She smiled bitterly and said to herself, ‘Has any woman ever been in this state? I do not even know whether I wish to die in his arms or kill him with these two hands of mine!’ But one thing was certain; she needed Mahendra, whether to singe him with her fires or to go up in flames with him. Where would she spill her poisoned arrows now that he was gone? Her breath fell rapidly as she thought, ‘Where will he go! He will have to come back here. He is mine!’

Asha wandered about Mahendra’s living room on the pretence of cleaning up, touching his chair with its wood stained with hair oil where his head had rested, his desk with its scattered papers, his books, his photographs and other things while dusting them with her own clothing. She spent her first evening without him acquainting herself with his possessions by picking one up and then another. Binodini came and stood by her; Asha stopped what she was doing and pretended instead to be looking for something. Binodini asked, a serious look on her face, ‘What is happening to you?’

Asha smiled a little with some effort and said, ‘Nothing, dear.’

Binodini hugged Asha and asked, ‘Why Bali, why did he go away like this?’

Asha heard the question and was immediately overcome with doubts and fear; she said, ‘You know, he has got some work at college.’

Binodini lifted Asha’s face with her right hand, looked at her in silence with an expression of overwhelming compassion and sighed.

Asha’s heart sank. She had known herself to be stupid and Binodini to be clever. Darkness seemed to swirl about her when she realised what the expression on Binodini’s face meant. She could not bring herself to ask Binodini what she was trying to say and sat down on a sofa near the wall. Binodini sat next to her and held her tightly in her arms. The loving embrace served only to make Asha start weeping as she became unable to hide her emotions any further. In the distance, a blind beggar sang on the street as he shook a pair of cymbals to the beat,

‘Give me your feet that I may be absolved, all forgiving mother’

Bihari came looking for Mahendra but found Asha weeping and Binodini sitting by her side with her arms about Asha, gently drying her tears. He quickly moved back. He went to the empty room next door and sat there clutching his head in his palms, thinking about why Asha would be crying. Who would be stony hearted enough to make a soul like her unhappy, she who was naturally unable to harm anyone? He also thought of how Binodini was comforting Asha and said to himself, ‘I have been so wrong about Binodini. She is as benevolent as a goddess where care, consolation and selfless love for her friend are concerned.’

Bihari sat in the darkness for a long time. Once the blind mendicant had finished his song, Bihari made his way towards Mahendra’s room, clearing his throat and stamping his feet in warning. Just as he got to the door, Asha ran out with her face veiled from him on her way to the inner house.

Binodini said as soon as he entered, ‘What is this? Are you sick?’

Bihari: ‘Nothing.’

Binodini: ‘Why are your eyes so red?’

Bihari did not answer her and said instead, ‘Where did Mahendra go to?’

Binodini answered sombrely, ‘I hear he has been staying in lodgings near the college as he has work to do in the hospital. Do move aside, I have to go.’

Bihari had been unconscious of standing in the doorway blocking Binodini’s path. He quickly moved aside. He also suddenly remembered that it was not seemly to talk to Binodini while they were by themselves in one of the outer rooms in the twilit evening. As she left, Bihari quickly said to her, ‘Madam, please look after Asha. She is very innocent, she does not know how to inflict pain on anyone or avoid being mistreated by others.’

Bihari could not see Binodini’s face in the darkness, if he could he would have seen cruel jealousy flicker across it like forked lightning. She had known straight away from seeing Bihari today that his heart was filled with compassion for Asha. Binodini counted for nothing there! Her very existence was to see to it that Asha was protected, that Asha was unharmed and that Asha had every chance at happiness! Mahendra would have to go and marry Asha, so that Binodini could end up with the boorish bridegroom of Barasat! Bihari would not be able to bear innocent Asha’s tears and so Binodini again must be ready at all times to wipe away Asha’s tears.

She wanted just once to see that Mahendra and Bihari become like the very shadows that she cast upon the ground, so that they might know what she was and how little Asha was in comparison to her! How different the two women indeed were! Thwarted by her own fate from becoming the sole captor of a man’s heart, Binodini resolved instead to become a figure of retribution.

To Bihari, Binodini said very gently before she left, ‘You need not worry, sir. There is no need to feel anxious fretting over my Chokher Bali.’

Advertisements

দুর্ভাগা দেশ/Unfortunate land

দুর্ভাগা দেশ

হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
বিধাতার রুদ্ররোষে
দুর্ভিক্ষের-দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে
সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে।
চরণে দলিত হয়ে
ধূলায় সে যায় বয়ে –
সেই নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ।
অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান।

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার,
মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার।
তবু নত করি আঁখি
দেখিবার পাও না কি
নেমেছে ধূলার তলে হীনপতিতের ভগবান।
অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান।

দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে –
অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে।
সবারে না যদি ডাকো,
এখনো সরিয়া থাকো,
আপনারে বেঁধে রাখো চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান –
মৃত্যু-মাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।

Unfortunate land

My unfortunate land, those that you have daily disdained,
One day you must find yourself equal to them.
And those from whom you have withheld
the very right to a human existence,
Making them stand by and watch your uncaring gaze
You will be pulled down till you are on their plane.

Denying yourself the kindness of human touch
Daily you have defiled the spirit within the human soul.
One day the terrible anger of fate
will make certain that famine
will force you to fight for your share of what others throw to you.
You will be their equal in every way.

Where you banished them, far from your throne
there sits your strength, lost forever.
Crushed underfoot
it languishes in cruel dust –
You must descend to that depth, if you wish to save yourself.
That day you must become equal to them all.

The one that you have cast down, they will pull you into the abyss
The ones you left behind hold you back with all their might.
In the darkness of ignorance
Remain those that you discarded.
But that blight grows covering the way to redemption,
You will be their equal in shamed existence.

Centuries of shame have forced your head down
But still you will not honour the living gods
Still you do not lower your eyes
do you never see?
There on the dust sits the god of the meek.
There, where you must become their equal in every way.

Do you not see that messenger of death
that stands at your door marking it with a curse?
If you do not call them all,
keeping them removed and apart,
harshly distancing them with pride.
In death your ashes shall equally mingle with theirs.

20th Day of AshaD, 1317

চোখের বালি ১৮, Chokher Bali 18

১৮

চড়িভাতির দুর্দিনের পরে মহেন্দ্র বিনোদিনীকে আর-এক বার ভালো করিয়া আয়ত্ত করিয়া লইতে উৎসুক ছিল। কিন্তু তাহার পরদিনেই রাজলক্ষ্মী ইনফ্লুয়েঞ্জা-জ্বরে পড়িলেন। রোগ গুরুতর নহে, তবু তাহার অসুখ ও দুর্বলতা যথেষ্ট। বিনোদিনী দিনরাত্রি তাঁহার সেবায় নিযুক্ত হইল।

মহেন্দ্র কহিল, “দিনরাত এমন করিয়া খাটিলে শেষকালে তুমিই যে অসুখে পড়িবে। মার সেবার জন্যে আমি লোক ঠিক করিয়া দিতেছি।”

বিহারী কহিল, “মহিনদা, তুমি অত ব্যস্ত হইয়ো না। উনি সেবা করিতেছেন, করিতে দাও। এমন করিয়া কি আর কেহ করিতে পারিবে।”

মহেন্দ্র রোগীর ঘরে ঘনঘন যাতায়াত আরম্ভ করিল। একটা লোক কোনো কাজ করিতেছে না, অথচ কাজের সময় সর্বদাই সঙ্গে লাগিয়া আছে, ইহা কর্মিষ্ঠা বিনোদিনীর পক্ষে অসহ্য। সে বিরক্ত হইয়া দুই-তিনবার কহিল, “মহিনবাবু, আপনি এখানে বসিয়া থাকিয়া কী সুবিধা করিতেছেন। আপনি যান– অনর্থক কালেজ কামাই করিবেন না।”

মহেন্দ্র তাহাকে অনুসরণ করে, ইহাতে বিনোদিনীর গর্ব এবং সুখ ছিল, কিন্তু তাই বলিয়া এমনতরো কাঙালপনা, রুগ্‌না মাতার শয্যাপার্শ্বেও লুব্ধহৃদয়ে বসিয়া থাকা– ইহাতে তাহার ধৈর্য থাকিত না, ঘৃণাবোধ হইত। কোনো কাজ যখন বিনোদিনীর উপর নির্ভর করে, তখন সে আর-কিছুই মনে রাখে না। যতক্ষণ খাওয়ানো-দাওয়ানো, রোগীর সেবা, ঘরের কাজ প্রয়োজন, ততক্ষণ বিনোদিনীকে কেহ অনবধান দেখে নাই–সেও প্রয়োজনের সময় কোনোপ্রকার অপ্রয়োজনীয় ব্যাপার দেখিতে পারে না।

বিহারী অল্পক্ষণের জন্য মাঝে মাঝে রাজলক্ষ্মীর সংবাদ লইতে আসে। ঘরে ঢুকিয়াই কী দরকার, তাহা সে তখনই বুঝিতে পারে– কোথায় একটা-কিছুর অভাব আছে, তাহা তাহার চোখে পড়ে– মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ঠিক করিয়া দিয়া সে বাহির হইয়া যায়। বিনোদিনী মনে বুঝিতে পারিত, বিহারী তাহার শুশ্রূষাকে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেছে। সেইজন্য বিহারীর আগমনে সে যেন বিশেষ পুরষ্কার লাভ করিত।

মহেন্দ্র নিতান্ত ধিক্‌কারবেগে অত্যন্ত কড়া নিয়মে কালেজে বাহির হইতে লগিল। একে তাহার মেজাজ অত্যন্ত রুক্ষ হইয়া রহিল, তাহার পরে এ কী পরিবর্তন। খাবার ঠিক সময়ে হয় না, সইসটা নিরুদ্দেশ হয়, মোজাজোড়ার ছিদ্র ক্রমেই অগ্রসর হইতে থাকে। এখন এই-সমস্ত বিশৃঙ্খলায় মহেন্দ্রের পূর্বের ন্যায় আমোদ বোধ হয় না। যখন যেটি দরকার, তখনি সেটি হাতের কাছে সুসজ্জিত পাইবার আরাম কাহাকে বলে, তাহা সে কয়দিন জানিতে পারিয়াছে। এক্ষণে তাহার অভাবে, আশার অশিক্ষিত অপটুতায় মহেন্দ্রের আর কৌতুকবোধ হয় না।

“চুনি, আমি তোমাকে কতদিন বলিয়াছি, স্নানের আগেই আমার জামায় বোতাম পরাইয়া প্রস্তুত রাখিবে, আর আমার চাপকান-প্যাণ্টলুন ঠিক করিয়া রাখিয়া দিবে– একদিনও তাহা হয় না। স্নানের পর বোতাম পরাইতে আর কাপড় খুঁজিয়া বেড়াইতে আমার দু ঘণ্টা যায়।”

অনুতপ্ত আশা লজ্জায় ম্লান হইয়া বলে, “আমি বেহারাকে বলিয়া দিয়াছিলাম।”

“বেহারাকে বলিয়া দিয়াছিলে! নিজের হাতে করিতে দোষ কী। তোমার দ্বারা যদি কোনো কাজ পাওয়া যায়!”

ইহা আশার পক্ষে বজ্রাঘাত। এমন ভর্ৎসনা সে কখনো পায় নাই। এ জবাব তাহার মুখে বা মনে আসিল না যে, “তুমিই তো আমার কর্মশিক্ষার ব্যাঘাত করিয়াছ।’ এই ধারণাই তাহার ছিল না যে, গৃহকর্মশিক্ষা নিয়ত অভ্যাস ও অভিজ্ঞতাসাপেক্ষ। সে মনে করিত, “আমার স্বাভাবিক অক্ষমতা ও নির্বুদ্ধিতাবশতই কোনো কাজ ঠিকমতো করিয়া উঠিতে পারি না।’ মহেন্দ্র যখন আত্মবিস্মৃত হইয়া বিনোদিনীর সহিত তুলনা দিয়া আশাকে ধিক্‌কার দিয়াছে, তখন সে তাহা বিনয়ে ও বিনা বিদ্বেষে গ্রহণ করিয়াছে।

আশা এক-একবার তাহার রুগ্‌ণা শাশুড়ির ঘরের আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়ায়– এক-একবার লজ্জিতভাবে ঘরের দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়ায়। সে নিজেকে সংসারের পক্ষে আবশ্যক করিয়া তুলিতে ইচ্ছা করে, সে কাজ দেখাইতে চায়, কিন্তু কেহ তাহার কাজ চাহে না। সে জানে না কেমন করিয়া কাজের মধ্যে প্রবেশ করা যায়, কেমন করিয়া সংসারের মধ্যে স্থান করিয়া লইতে হয়। সে নিজের অক্ষমতার সংকোচে বাহিরে বাহিরে ফিরে। তাহার কী-একটা মনোবেদনার কথা অন্তরে প্রতিদিন বাড়িতেছে, কিন্তু তাহার সেই অপরিস্ফুট বেদনা, সেই অব্যক্ত আশঙ্কাকে সে স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে পারে না। সে অনুভব করে, তাহার চারি দিকের সমস্তই সে যেন নষ্ট করিতেছে– কিন্তু কেমন করিয়াই যে তাহা গড়িয়া উঠিয়াছিল এবং কেমন করিয়াই যে তাহা নষ্ট হইতেছে, এবং কেমন করিলে যে তাহার প্রতিকার হইতে পারে তাহা সে জানে না। থাকিয়া থাকিয়া কেবল গলা ছাড়িয়া কাঁদিয়া বলিতে ইচ্ছা করে, “আমি অত্যন্ত অযোগ্য, নিতান্ত অক্ষম, আমার মূঢ়তার কোথাও তুলনা নাই।’

পূর্বে তো আশা ও মহেন্দ্র সুদীর্ঘকালে দুইজনে এক গৃহকোণে বসিয়া কখনো কথা কহিয়া, কখনো কথা না কহিয়া, পরিপূর্ণ সুখে সময় কাটাইয়াছে। আজকাল বিনোদিনীর অভাবে আশার সঙ্গে একলা বসিয়া মহেন্দ্রের মুখে কিছুতেই যেন সহজে কথা জোগায় না– এবং কিছু না কহিয়া চুপ করিয়া থাকিতেও তাহার বাধো-বাধো ঠেকে।

মহেন্দ্র বেহারাকে জিজ্ঞাসা করিল, “ও চিঠি কাহার।”

“বিহারীবাবুর।”

“কে দিল।”

“বহু ঠাকুরাণী।” (বিনোদিনী)

“দেখি” বলিয়া চিঠিখানা লইল। ইচ্ছা হইল ছিঁড়িয়া পড়ে। দু-চারিবার উল্‌টাপাল্‌টা করিয়া নাড়িয়া-চাড়িয়া বেহারার হাতে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। যদি চিঠি খুলিত, তবে দেখিত, তাহাতে লেখা আছে, “পিসিমা কোনোমতেই সাগু-বার্লি খাইতে চান না, আজ কি তাঁহাকে ডালের ঝোল খাইতে দেওয়া হইবে।’ ঔষধপথ্য লইয়া বিনোদিনী মহেন্দ্রকে কখনো কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিত না, সে-সম্বন্ধে বিহারীর প্রতিই তাহার নির্ভর।

মহেন্দ্র বারান্দায় খানিকক্ষণ পায়চারি করিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, দেয়ালে টাঙানো একটা ছবির দড়ি ছিন্নপ্রায় হওয়াতে ছবিটা বাঁকা হইয়া আছে। আশাকে অত্যন্ত ধমক দিয়া কহিল, “তোমার চোখে কিছুই পড়ে না, এমনি করিয়া সমস্ত জিনিস নষ্ট হইয়া যায়।” দমদমের বাগান হইতে ফুল সংগ্রহ করিয়া যে-তোড়া বিনোদিনী পিতলের ফুলদানিতে সাজাইয়া রাখিয়াছিল, আজও তাহা শুষ্ক অবস্থায় তেমনিভাবে আছে; অন্যদিন মহেন্দ্র এ-সমস্ত লক্ষ্যই করে না– আজ তাহা চোখে পড়িল। কহিল, “বিনোদিনী আসিয়া না ফেলিয়া দিলে, ও আর ফেলাই হইবে না।” বলিয়া ফুলসুদ্ধ ফুলদানি বাহিরে ছুঁড়িয়া ফেলিল, তাহা ঠংঠং শব্দে সিঁড়ি দিয়া গড়াইয়া চলিল। “কেন আশা আমার মনের মতো হইতেছে না, কেন সে আমার মনের মতো কাজ করিতেছে না, কেন তাহার স্বভাবগত শৈথিল্য ও দুর্বলতায় সে আমাকে দাম্পত্যের পথে দৃঢ়ভাবে ধরিয়া রাখিতেছে না, সর্বদা আমাকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দিতেছে।’– এই কথা মহেন্দ্র মনে মনে আন্দোলন করিতে করিতে হঠাৎ দেখিল, আশার মুখ পাংশুবর্ণ হইয়া গেছে, সে খাটের থাম ধরিয়া আছে, তাহার ঠোঁট দুটি কাঁপিতেছে– কাঁপিতে কাঁপিতে সে হঠাৎ বেগে পাশের ঘর দিয়া চলিয়া গেল।

মহেন্দ্র তখন ধীরে ধীরে গিয়া ফুলদানিটা কুড়াইয়া আনিয়া রাখিল। ঘরের কোণে তাহার পড়িবার টেবিল ছিল– চৌকিতে বসিয়া এই টেবিলটার উপর হাতের মধ্যে মাথা রাখিয়া অনেকক্ষণ পড়িয়া রহিল।

সন্ধ্যার পর ঘরে আলো দিয়া গেল, কিন্তু, আশা আসিল না। মহেন্দ্র দ্রুতপদে ছাদের উপর পায়চারি করিয়া বেড়াইতে লাগিল। রাত্রি নটা বাজিল, মহেন্দ্রদের লোকবিরল গৃহ রাত-দুপুরের মতো নিস্তব্ধ হইয়া গেল– তবু আশা আসিল না। মহেন্দ্র তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইল। আশা সংকুচিতপদে আসিয়া ছাদের প্রবেশদ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। মহেন্দ্র কাছে আসিয়া তাহাকে বুকে টানিয়া লইল– মুহূর্তের মধ্যে স্বামীর বুকের উপর আশার কান্না ফাটিয়া পড়িল– সে আর থামিতে পারে না, তাহার চোখের জল আর ফুরায় না, কান্নার শব্দ গলা ছাড়িয়া বাহির হইতে চায়, সে আর চাপা থাকে না। মহেন্দ্র তাহাকে বক্ষে বদ্ধ করিয়া কেশচুম্বন করিল– নিঃশব্দ আকাশে তারাগুলি নিস্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল।

রাত্রে বিছানায় বসিয়া মহেন্দ্র কহিল, “কালেজে আমাদের নাইট-ডিউটি অধিক পড়িয়াছে, অতএব এখন কিছুকাল আমাকে কালেজের কাছেই বাসা করিয়া থাকিতে হইবে।”

আশা ভাবিল, “এখনো কি রাগ আছে। আমার উপর বিরক্ত হইয়া চলিয়া যাইতেছেন? নিজের নিগুZতায় আমি স্বামীকে ঘর হইতে বিদায় করিয়া দিলাম? আমার তো মরা ভালো ছিল।’

কিন্তু মহেন্দ্রের ব্যবহারে রাগের লক্ষণ কিছুই দেখা গেল না। সে অনেকক্ষণ কিছু না বলিয়া আশার মুখ বুকের উপর রাখিল এবং বারংবার অঙ্গুলি দিয়া তাহার চুল চিরিতে চিরিতে তাহার খোঁপা শিথিল করিয়া দিল। পূর্বে আদরের দিনে মহেন্দ্র এমন করিয়া আশার বাঁধা চুল খুলিয়া দিত– আশা তাহাতে আপত্তি করিত। আজ আর সে তাহাতে কোনো আপত্তি না করিয়া পুলকে বিহ্বল হইয়া চুপ করিয়া রহিল। হঠাৎ এক সময় তাহার ললাটের উপর অশ্রুবিন্দু পড়িল, এবং মহেন্দ্র তাহার মুখ তুলিয়া ধরিয়া স্নেহরুদ্ধ স্বরে ডাকিল, “চুনি।” আশা কথায় তাহার কোনো উত্তর না দিয়া দুই কোমল হস্তে মহেন্দ্রকে চাপিয়া ধরিল। মহেন্দ্র কহিল, “অপরাধ করিয়াছি, আমাকে মাপ করো।”

আশা তাহার কুসুম-সুকুমার করপল্লব মহেন্দ্রের মুখের উপর চাপা দিয়া কহিল,”না, না, অমন কথা বলিয়ো না। তুমি কোনো অপরাধ কর নাই। সকল দোষ আমার। আমাকে তোমার দাসীর মতো শাসন করো। আমাকে তোমার চরণাশ্রয়ের যোগ্য করিয়া লও।”

বিদায়ের প্রভাতে শয্যাত্যাগ করিবার সময় মহেন্দ্র কহিল, “চুনি, আমার রত্ন, তোমাকে আমার হৃদয়ে সকলের উপরে ধারণ করিয়া রাখিব, সেখানে কেহ তোমাকে ছাড়াইয়া যাইতে পারিবে না।”

তখন আশা দৃঢ়চিত্তে সর্বপ্রকার ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত হইয়া স্বামীর নিকট নিজের একটিমাত্র ক্ষুদ্র দাবি দাখিল করিল। কহিল, “তুমি আমাকে রোজ একখানি করিয়া চিঠি দিবে?”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমিও দিবে?”

আশা কহিল, “আমি কি লিখিতে জানি।”

মহেন্দ্র তাহার কানের কাছে অলকগুচ্ছ টানিয়া দিয়া কহিল, “তুমি অক্ষয়কুমার দত্তের চেয়ে ভালো লিখিতে পার-চারুপাঠ যাহাকে বলে।”

আশা কহিল, “যাও, আমাকে আর ঠাট্টা করিয়ো না।”

যাইবার পূর্বে আশা যথাসাধ্য নিজের হাতে মহেন্দ্রের পোর্টম্যাণ্টো সাজাইতে বসিল। মহেন্দ্রের মোটা মোটা শীতের কাপড় ঠিকমতো ভাঁজ করা কঠিন, বাক্সে ধরানো শক্ত– উভয়ে মিলিয়া কোনোমতে চাপাচাপি ঠাসাঠুসি করিয়া, যাহা এক বাক্সে ধরিত, তাহাতে দুই বাক্স বোঝাই করিয়া তুলিল। তবু যাহা ভুলক্রমে বাকি রহিল, তাহাতে আরো অনেকগুলি স্বতন্ত্র পুঁটুলির সৃষ্টি হইল। ইহা লইয়া আশা যদিও বার বার লজ্জাবোধ করিল, তবু তাহাদের কাড়াকাড়ি, কৌতুক ও পরস্পরের প্রতি সহাস্য দোষারোপে পূর্বেকার আনন্দের দিন ফিরিয়া আসিল। এ যে বিদায়ের আয়োজন হইতেছে, তাহা আশা ক্ষণকালের জন্য ভুলিয়া গেল। সহিস দশবার গাড়ি তৈয়ারির কথা মহেন্দ্রকে স্মরণ করাইয়া দিল, মহেন্দ্র কানে তুলিল না– অবশেষে বিরক্ত হইয়া বলিল, “ঘোড়া খুলিয়া দাও।”

সকাল ক্রমে বিকাল হইয়া গেল, বিকাল সন্ধ্যা হয়। তখন স্বাস্থ্যপালন করিতে পরস্পরকে সতর্ক করিয়া দিয়া এবং নিয়মিত চিঠি লেখা সম্বন্ধে বারংবার প্রতিশ্রুত করাইয়া লইয়া ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পরস্পরের বিচ্ছেদ হইল।

রাজলক্ষ্মী আজ দুইদিন হইল উঠিয়া বসিয়াছেন। সন্ধ্যাবেলায় গায়ে মোটা কাপড় মুড়ি দিয়া বিনোদিনীর সঙ্গে তাস খেলিতেছেন। আজ তাঁহার শরীরে কোনো গ্লানি নাই। মহেন্দ্র ঘরে প্রবেশ করিয়া বিনোদিনীর দিকে একেবারেই চাহিল না– মাকে কহিল, “মা, কালেজে আমার রাত্রের কাজ পড়িয়াছে, এখানে থাকিয়া সুবিধা হয় না– কালেজের কাছে বাসা লইয়াছি। সেখানে আজ হইতে থাকিব।’

রাজলক্ষ্মী মনে মনে অভিমান করিয়া কহিলেন, “তা যাও। পড়ার ক্ষতি হইলে কেমন করিয়া থাকিবে।”

যদিও তাঁহার রোগ সারিয়াছে, তবু মহেন্দ্র যাইবে শুনিয়া তখনি তিনি নিজেকে অত্যন্ত রুগ্‌ণ ও দুর্বল বলিয়া কল্পনা করিলেন; বিনোদিনীকে বলিলেন, “দাও তো বাছা, বালিশটা আগাইয়া দাও।” বলিয়া বালিশ অবলম্বন করিয়া শুইলেন, বিনোদিনী আস্তে আস্তে তাঁহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল।

মহেন্দ্র একবার মার কপালে হাত দিয়া দেখিল, তাঁহার নাড়ী পরীক্ষা করিল। রাজলক্ষ্মী হাত ছাড়াইয়া লইয়া কহিলেন, “নাড়ী দেখিয়া তো ভারি বোঝা যায়। তোর আর ভাবিতে হইবে না, আমি বেশ আছি।” বলিয়া অত্যন্ত দুর্বলভাবে পাশ ফিরিয়া শুইলেন।

মহেন্দ্র বিনোদিনীকে কোনোপ্রকার বিদায়সম্ভাষণ না করিয়া রাজলক্ষ্মীকে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল।

chokher bali 5

18

Mahendra was keen to get the better of Binodini after the disaster of the picnic. But the very next day, Rajlakshmi became ill with influenza. It was not a serious ailment but she was quite ill and rather weak. Binodini was the one who looked after her day and night.

Mahendra said, ‘If you work all day and all night like this you will end up getting ill yourself. I will engage someone to look after my mother.’

Bihari reassured him saying, ‘Mahendra, you should not be so worried. Let her look after the patient. Who else is there who can take such good care?’

Mahendra started frequenting the room where his mother was convalescing. The continual presence of a person who was not actually doing anything was unbearable to the hardworking Binodini. She said a couple of times with some vehemence, ‘Mahendra, are you helping in any way by sitting here? Go! There is little point in you missing your classes.’

Binodini did feel a sense of pride and happiness in the fact that Mahendra followed her around, but this pathetic neediness and lack of shame in front of his sick mother tried both her patience and disgusted her. When she was occupied with a task, she thought of nothing else. No one had ever seen her to be unmindful of her duties while something needed to be done, whether it was for the family or for the patient. She could not bear any dawdling while there was unfinished business.

Bihari occasionally came for a short while to see Rajlakshmi. He always knew what needed to be bought after he had been in the room for a short while and would set things right quickly before leaving. Binodini could tell that he respected her ability to look after the sick. This felt like an unspoken reward to her.

Mahendra had started going to his classes very punctually out of sheer frustration and dismay. To his annoyance things did not seem to be going his way at all. His meals were never on time, the coachman disappeared when he was neded and the holes in his socks grew daily. He no longer found these lapses and signs of carelessness as amusing as he had in the past. He had grown used in the past few days to the luxury of having a well run household where things were available when needed. Now he did not find Asha’s untrained ineptitude endearing any more.

‘Chuni, I have told you, you must find my cufflinks and get my coat and trousers ready before I go into the bathroom? But you never do that. I waste a couple of hours looking for my clothes and cufflinks after my bath every day!’

Asha was ashamed and said timidly, ‘I did tell the valet.’

‘You told the valet! Why not do it yourself. What good are you then?’

Asha was struck by this. She had never been chastised like this before. She was not able to say, ‘You are the one that stopped me from learning how to run a household.’ She had no idea that even housework needed daily practice and experience. She had always thought, ‘I do not do anything well because of my inability and my ignorance.’ Whenever Mahendra thoughtlessly compared her with Binodini, she had accepted it meekly and without protest.

At times she would circle her mother – in – law’s room, sometimes standing at the door shyly. She wanted to be necessary to the household, she wished to do things, but no one wanted her help. She did not know how she could become a part of the activity within the house. She stayed on the periphery mostly due to her own lack of confidence in herself. There was an anguish that was growing inside her but she could not tell what was causing this hidden sadness, this unvoiced apprehension. She could feel that she was causing great harm to herself but she was unsure as to what had caused this to happen and how she could stop this from going on further. She felt like crying out aloud, ‘I am so unfit, so unable, there is no one as stupid as me!’

In the past Asha and Mahendra had spent time together, sometimes even in silence, but always completely satisfied and happy. These days Mahendra seemed unable to think of things to say to Asha when Binodini was absent and to say nothing felt strange to her too.

Mahendra asked the servant, ‘Who is that letter for?’

‘It is for Biharibabu.’

‘Who is it from?’

‘The new mistress(Binodini)’

‘Let me see,’ he said as he took the letter. He felt like ripping it open and reading it. He turned it over a couple of times and then threw it back at the servant. If he had bothered to open it, he would have seen the words – ‘Aunt does not like eating sago and barley, should I make her some lentil soup today?’ Binodini never asked Mahendra about the medicines, Bihari was the one she trusted in all these matters.

Mahendra walked around the verandah for a while and then returned to the room. His eye was caught by a picture that was hanging askew on the wall as the string holding it up had become very frayed. He angrily reproached Asha, ‘You do not keep an eye on anything around you, this is how everything gets ruined.’ Binodini had arranged the flowers she had picked during the picnic in a brass vase; they still sat in it although they were dried up. At other times he noticed none of this but today he did. He said, ‘Those will never be thrown out unless Binodini comes along and does it!’ He then threw the vase with its flowers outside the room where it rolled down the stairs with a loud ringing sound. He thought to himself, ‘Why can Asha not do what I want? Why do I not love her? Why can she not hold me steadfast to the path of marital bliss because of her natural diffidence and weakness, why am I always distracted from it?’ While he thought of these and a hundred other things, he looked at Asha to see that she had turned pale and was clutching the bedpost; her lips quivered and she suddenly escaped to the next room.

Mahendra then got up and walked slowly to where the vase lay and picked it up. He sat on the bed for a long time, cradling his head in his arms as he leaned against his study table.

Someone brought a light to the room when darkness fell, but Asha did not come. Agitated, Mahendra walked about on the terrace. It struck nine and the almost empty house grew as quiet as midnight, but still, Asha did not come to him. Mahendra then sent for her. She came hesitantly and stood at the door that led to the roof terrace. Mahendra came to her and pulled her into his arms – Asha immediately burst into tears. She wept as though she would never stop, tears running down her face, the sound of her grief threatening to find voice. He held her close and kissed her hair, watched by the spellbound stars in the silent sky.

Mahendra sat on the bed and said, ‘I have night duty coming up at college, I feel I should stay near the hospital for a few days now.’

Asha thought, ‘He must still be annoyed with me. Is that why he is leaving? Am I driving away with my ineptitude? I should die of shame.’

But there were no signs of anger in his behavior. He held her close without speaking for a long time and undid her hair by running his fingers through it again and again. When he did this while making love in the past, she would protest. Today she was moved to the core by this and said nothing to stop him. Suddenly a tear fell on her forehead and she heard Mahendra say with great feeling, as he raised her face to him, ‘Chuni.’She held him tight within her gentle embrace. Mahendra said again, ‘I have wronged you, please forgive me.’

Asha placed her petal soft palms across Mahendra’s mouth and stopped him, saying, ‘No, please! You must not say such things! You have done nothing wrong, the fault is entirely mine. You must discipline me as your inferior and train me to be suitable for a place at your feet.’

On the morning of his departure as he rose from bed, Mahendra said, ‘Chuni, you are indeed a ruby to me, I will place you above everyone else in my heart, no one will ever rise above you there.’

Asha drew on all her reserves of strength, prepared to put up with every kind of hardship and made one request. She asked Mahendra, ‘Will you write to me once each day?’

Mahendra replied, ‘Will you write too?’

Asha said, ‘Do I know how to write?’

Mahendra tucked her hair behind her ears and said, ‘You write something far better than Akshay Kumar Dutta, in the book of love.’

Asha answered, ‘You don’t have to tease me!’

Before he left Asha prepared to help him pack his portmanteau by her self. His warm clothes were bulky and hard to fold, and harder to fit into the case – consequently the two of them worked hard, pushing the lid down and managing to pack two cases where one would have done the job. All the things left behind by mistake filled a number of other untidy packages. Even though Asha felt ashamed at her lack of expertise, their playful banter and amusement at each other’s mistakes seemed to bring back the happier days of the past. She could even forget for a while that this was indeed preparations for a farewell. The coachman came and reminded Mahendra a number of times that the carriage was ready but he ignored this and eventually ordered the horses back to the stable with some irritation.

Gradually morning became afternoon and afternoon progressed into evening. Finally after many reminders to look after their own health and many promises to write to each other daily had been extracted, they parted with heavy hearts.

Rajlakshmi had been well enough to sit up for two days. She was wrapped up warmly as she played cards with Binodini. There was no discomfort any more today. Mahendra entered the room and without looking at Binodini at all, said to his mother, ‘Ma, as I have night shifts at college, I have taken rooms nearer the place so that I do not have to travel all the way after work. I am going to stay there from today.’

Rajlakshmi was filled with hurt and thought,’Of course, one cannot neglect their studies.’

Although she was better, when she heard of her son’s departure she instantly imagined herself to be very ill and weak and said to Binodini, ‘Give me the pillow, my child.’ She then propped herself on the pillow as Binodini stroked her skin slowly.

Mahendra touched her forehead and took her pulse. She pulled her hand away and said, ‘What will my pulse tell you? You must not worry any more, I am much better,’ before turning weakly on to her side.

Mahendra went away after touching Rajlakshmi’s feet in respect and without saying any words of farewell to Binodini.

বলাকা ১, Poem 1, Bolaka

ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা।
আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায়;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে, ওদের ঘরের দাওয়ায়।
ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা,
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়।
আয় জীবন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ,
দেখে না যে বাণ ডেকেছে
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ।
চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির ‘পরে চরণ ফেলে ফেলে,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায়,
আয় অশান্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

তোরে হেথায় করবে সবাই মানা।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে এ কী বিষম কাণ্ডখানা।
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে,
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায়।
আয় প্রচণ্ড, আয় রে আমার কাঁচা।

শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদী
চিরকাল কি রইবে খাড়া।
পাগলামি তুই আয় রে দুয়ার ভেদি।
ঝড়ের মাতন, বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে,
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আন্‌ রে বাছা-বাছা।
আয় প্রমত্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

আন্‌ রে টেনে বাঁধা-পথের শেষে।
বিবাগী কর্‌ অবাধপানে,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে।
আপদ আছে, জানি অঘাত আছে,
তাই জেনে তো বক্ষে পরান নাচে,
ঘুচিয়ে দে ভাই পুঁথি-পোড়োর কাছে
পথে চলার বিধিবিধান যাচা।
আয় প্রমুক্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি।
সবুজ নেশায় ভোর করেছি ধরা,
ঝড়ের মেঘে তোরি তড়িৎ ভরা,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা,
আয় রে অমর, আয় রে আমার কাঁচা।

শান্তিনিকেতন, ১৫ বৈশাখ, ১৩২১

joras

You are young, thankfully unripe,
Green and unconcerned with rules,
So revive these half dead beings with blows.
On this dawn, drunk with blood red light
Let them say whatever they can,
Laugh off all their words with ease
Fan out your feathers with pride.
Come, with your indefatigable will and raw youth.

The cage shakes gently in the breeze;
Nothing else has ever moved I think,
In their rooms or their courtyards.
Look, there sit the old, the excessively wise,
Eyes and ears covered in ragged wings,
Dozing like a painted carnival clown
In a darkened cage.
Come, flooding with life force and youth.

No one looks once to the outer world
They do not see the rise of the tide
As it leaps into great waves,
They do not see that they are of the earth
With feet that still tread the dust,
They love to be idle in their own worlds
Seated high in their own estimation,
Come, to shake these feeble foundations, blessed youth.

Everyone will resist you at first
When the first light pierces the gloom
They will think it a catastrophe of events
Your blows will make their anger rage,
Making them rise from their beds,
That will be the chance to wake them up
To see truth battle it out with lies.
Come, with tremendous might, come my young ones.

That altar to the goddess of chains
Will that remain raised forever?
Break down these doors with whimsical spirit.
In the raging of the storm fly the pennants high
Let your laughter split open the sky,
Shake out the hoards of the ever asleep
Bring out every kind of misadventure and folly.
Come, insanity, come insatiable youth.

Pull us to the ends of the marked paths
Make us seek the call of the unknown,
And tread our own roads into lands never seen.
There will be danger, there may well be pain,
That is the very thing that makes the heart thrill,
Destroy every illusion in the books they read
That one must ask for directions indeed.
Come, blessed freedom, come untrammeled youth.

You will live forever, eternal youth,
Casting aside this ravaged skin of age
You will spread endless life wherever you go.
Your green abandon fills the earth,
You are the lightning in the storm cloud,
You are the one who embraces Spring
Wearing your garlands of mimosa bloom,
Come, everlasting, come eternal youth.

Santiniketan 1914

চোখের বালি ১৭/ Chokher Bali 17

১৭

মাঝখানের এই গোলমালটা একেবারে মুছিয়া ফেলিবার জন্য মহেন্দ্র প্রস্তাব করিল, “আসছে রবিবারে দমদমের বাগানে চড়িভাতি করিয়া আসা যাক।”

আশা অত্যন্ত উৎসাহিত হইয়া উঠিল। বিনোদিনী কিছুতেই রাজি হইল না। মহেন্দ্র ও আশা বিনোদিনীর আপত্তিতে ভারি মুষড়িয়া গেল। তাহারা মনে করিল, আজকাল বিনোদিনী কেমন যেন দূরে সরিয়া যাইবার উপক্রম করিতেছে।

বিকালবেলায় বিহারী আসিবামাত্র বিনোদিনী কহিল, “দেখুন তো বিহারীবাবু, মহিনবাবু দমদমের বাগানে চড়িভাতি করিতে যাইবেন, আমি সঙ্গে যাইতে চাহি নাই বলিয়া আজ সকাল হইতে দুইজনে মিলিয়া রাগ করিয়া বসিয়াছেন।”

বিহারী কহিল, “অন্যায় রাগ করেন নাই। আপনি না গেলে ইঁহাদের চড়িভাতিতে যে কাণ্ডটা হইবে, অতিবড়ো শত্রুরও যেন তেমন না হয়।”

বিনোদিনী। চলুন-না বিহারীবাবু। আপনি যদি যান, তবে আমি যাইতে রাজি আছি।

বিহারী। উত্তম কথা। কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, কর্তা কী বলেন।

বিহারীর প্রতি বিনোদিনীর এই বিশেষ পক্ষপাতে কর্তা গৃহিণী উভয়েই মনে মনে ক্ষুণ্ন হইল। বিহারীকে সঙ্গে লইবার প্রস্তাবে মহেন্দ্রের অর্ধেক উৎসাহ উড়িয়া গেল। বিহারীর উপস্থিতি বিনোদিনীর পক্ষে সকল সময়েই অপ্রিয়, এই কথাটাই বন্ধুর মনে মুদ্রিত করিয়া দিবার জন্য মহেন্দ্র ব্যস্ত– কিন্তু অতঃপর বিহারীকে আটক করিয়া রাখা অসাধ্য হইবে।

মহেন্দ্র কহিল, “তা বেশ তো, ভালোই তো। কিন্তু বিহারী, তুমি যেখানে যাও একটা হাঙ্গামা না করিয়া ছাড় না। হয়তো সেখানে পাড়া হইতে রাজ্যের ছেলে জোটাইয়া বসিবে, নয় তো কোন্‌ গোরার সঙ্গে মারামারি বাধাইয়া দিবে– কিছু বলা যায় না।”

বিহারী মহেন্দ্রর আন্তরিক অনিচ্ছা বুঝিয়া মনে মনে হাসিল– কহিল, “সেই তো সংসারের মজা, কিসে কী হয়, কোথায় কী ফেসাদ ঘটে, আগে হইতে কিছুই বলিবার জো নাই। বিনোদ-বোঠান, ভোরের বেলায় ছাড়িতে হইবে, আমি ঠিক সময়ে আসিয়া হাজির হইব।”

রবিবার ভোরে জিনিসপত্র ও চাকরদের জন্য একখানি থার্ড ক্লাস ও মনিবদের জন্য একখানি সেকেণ্ড ক্লাস গাড়ি ভাড়া করিয়া আনা হইয়াছে। বিহারী মস্ত-একটা প্যাকবাক্স সঙ্গে করিয়া যথাসময়ে আসিয়া উপস্থিত। মহেন্দ্র কহিল, “ওটা আবার কী আনিলে। চাকরদের গাড়িতে তো আর ধরিবে না।”

বিহারী কহিল, “ব্যস্ত হইয়ো না দাদা, সমস্ত ঠিক করিয়া দিতেছি।”

বিনোদিনী ও আশা গাড়িতে প্রবেশ করিল। বিহারীকে লইয়া কী করিবে, মহেন্দ্র তাই ভাবিয়া একটু ইতস্তত করিতে লাগিল। বিহারী বোঝাটা গাড়ির মাথায় তুলিয়া দিয়া চট করিয়া কোচবাক্সে চড়িয়া বসিল।

মহেন্দ্র হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। সে ভাবিতেছিল, “বিহারী ভিতরেই বসে কি কী করে, তাহার ঠিক নাই।’ বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া বলিতে লাগিল, “বিহারীবাবু, পড়িয়া যাবেন না তো?”

বিহারী শুনিতে পাইয়া কহিল, “ভয় করিবেন না, পতন ও মূর্ছা– ওটা আমার পার্টের মধ্যে নাই।”

গাড়ি চলিতেই মহেন্দ্র কহিল, “আমিই না-হয় উপরে গিয়া বসি, বিহারীকে ভিতরে পাঠাইয়া দিই।”

আশা ব্যস্ত হইয়া তাহার চাদর চাপিয়া কহিল, “না, তুমি যাইতে পারিবে না।”

বিনোদিনী কহিল, “আপনার অভ্যাস নাই, কাজ কী যদি পড়িয়া যান।”

মহেন্দ্র উত্তেজিত হইয়া কহিল, “পড়িয়া যাব? কখনো না।” বলিয়া তখনই বাহির হইতে উদ্যত হইল।

বিনোদিনী কহিল, “আপনি বিহারীবাবুকে দোষ দেন, কিন্তু আপনিই তো হাঙ্গাম বাধাইতে অদ্বিতীয়।”

মহেন্দ্র মুখ ভার করিয়া কহিল, “আচ্ছা, এক কাজ করা যাক। আমি একটা আলাদা গাড়ি ভাড়া করিয়া যাই, বিহারী ভিতরে আসিয়া বসুক।”

আশা কহিল, “তা যদি হয়, তবে আমিও তোমার সঙ্গে যাইব।”

বিনোদিনী কহিল, “আর আমি বুঝি গাড়ি হইতে লাফাইয়া পড়িব?” এমনি গোলমাল করিয়া কথাটা থামিয়া গেল।

মহেন্দ্র সমস্ত পথ মুখ অত্যন্ত গম্ভীর করিয়া রহিল।

দমদমের বাগানে গাড়ি পৌঁছিল। চাকরদের গাড়ি অনেক আগে ছাড়িয়াছিল, কিন্তু এখনো তাহার খোঁজ নাই।

শরৎকালের প্রাতঃকাল অতি মধুর। রৌদ্র উঠিয়া শিশির মরিয়া গেছে, কিন্তু গাছপালা নির্মল আলোকে ঝলমল করিতেছে। প্রাচীরের গায়ে শেফালি-গাছের সারি রহিয়াছে, তলদেশ ফুলে আচ্ছন্ন এবং গন্ধে আমোদিত।

আশা কলিকাতার ইষ্টকবন্ধন হইতে বাগানের মধ্যে ছাড়া পাইয়া বন্যমৃগীর মতো উল্লসিত হইয়া উঠিল। সে বিনোদিনীকে লইয়া রাশীকৃত ফুল কুড়াইল, গাছ হইতে পাকা আতা পাড়িয়া আতাগাছের তলায় বসিয়া খাইল, দুই সখীতে দিঘির জলে পড়িয়া দীর্ঘকাল ধরিয়া স্নান করিল। এই দুই নারীতে মিলিয়া একটি নিরর্থক আনন্দে–গাছের ছায়া এবং শাখাচ্যুত আলোক, দিঘির জল এবং নিকুঞ্জের পুষ্পপল্লবকে পুলকিত সচেতন করিয়া তুলিল।

স্নানের পর দুই সখী আসিয়া দেখিল, চাকরদের গাড়ি তখনো আসিয়া পৌঁছে নাই। মহেন্দ্র বাড়ির বারান্দায় চৌকি লইয়া অত্যন্ত শুষ্কমুখে একটা বিলাতি দোকানের বিজ্ঞাপন পড়িতেছে।

বিনোদিনী জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারীবাবু কোথায়!”

মহেন্দ্র সংক্ষেপে উত্তর করিল, “জানি না।”

বিনোদিনী। চলুন, তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করি গে।

মহেন্দ্র। তাহাকে কেহ চুরি করিয়া লইবে, এমন আশঙ্কা নাই। না খুঁজিলেও পাওয়া যাইবে।

বিনোদিনী। কিন্তু তিনি হয়তো আপনার জন্য ভাবিয়া মরিতেছেন, পাছে দুর্লভ রত্ন খোওয়া যায়। তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া আসা যাক।

জলাশয়ের ধারে প্রকাণ্ড একটা বাঁধানো বটগাছ আছে, সেইখানে বিহারী তাহার প্যাকবাক্স খুলিয়া একটি কেরোসিন-চুলা বাহির করিয়া জল গরম করিতেছে। সকলে আসিবামাত্র আতিথ্য করিয়া বাঁধা বেদির উপর বসাইয়া এক এক পেয়ালা গরম চা এবং ছোটো রেকাবিতে দুই একটি মিষ্টান্ন ধরিয়া দিল। বিনোদিনী বারবার বলিতে লাগিল, “ভাগ্যে বিহারীবাবু সমস্ত উদ্‌যোগ করিয়া আনিয়াছিলেন, তাই তো রক্ষা, নহিলে চা না পাইলে মহেন্দ্রবাবুর কী দশা হইত।”

চা পাইয়া মহেন্দ্র বাঁচিয়া গেল, তবু বলিল, “বিহারীর সমস্ত বাড়াবাড়ি। চড়িভাতি করিতে আসিয়াছি, এখানেও সমস্ত দস্তুরমত আয়োজন করিয়া আসিয়াছে। ইহাতে মজা থাকে না।”

বিহারী কহিল, “তবে দাও ভাই তোমার চায়ের পেয়ালা, তুমি না খাইয়া মজা করো গে– বাধা দিব না।”

বেলা হয়, চাকররা আসিল না। বিহারীর বাক্স হইতে আহারাদির সর্বপ্রকার সরঞ্জাম বাহির হইতে লাগিল। চাল-ডাল, তরি-তরকারি এবং ছোটো ছোটো বোতলে পেষা মশলা আবিষ্কৃত হইল। বিনোদিনী আশ্চর্য হইয়া বলিতে লাগিল, “বিহারীবাবু, আপনি যে আমাদেরও ছাড়াইয়াছেন। ঘরে তো গৃহিনী নাই, তবে শিখিলেন কোথা হইতে।”

বিহারী কহিল, “প্রাণের দায়ে শিখিয়াছি, নিজের যত্ন নিজেকেই করিতে হয়।”

বিহারী নিতান্ত পরিহাস করিয়া কহিল, কিন্তু বিনোদিনী গম্ভীর হইয়া বিহারীর মুখে করুণচক্ষের কৃপা বর্ষণ করিল।

বিহারী ও বিনোদিনীতে মিলিয়া রাঁধাবাড়ায় প্রবৃত্ত হইল। আশা ক্ষীণ সংকুচিত ভাবে হস্তক্ষেপ করিতে আসিলে, বিহারী তাহাতে বাধা দিল। অপটু মহেন্দ্র সাহায্য করিবার কোনো চেষ্টাও করিল না। সে গুঁড়ির উপরে হেলান দিয়া একটা পায়ের উপরে আর একটা পা তুলিয়া কম্পিত বটপত্রের উপরে রৌদ্রকিরণের নৃত্য দেখিতে লাগিল।

রন্ধন প্রায় শেষ হইলে পর বিনোদিনী কহিল, “মহিনবাবু, আপনি ঐ বটের পাতা গনিয়া শেষ করিতে পারিবেন না, এবারে স্নান করিতে যান।”

ভৃত্যের দল এতক্ষণে জিনিসপত্র লইয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের গাড়ি পথের মধ্যে ভাঙিয়া গিয়াছিল। তখন বেলা দুপুর হইয়া গেছে।

আহারান্তে সেই বটগাছের তলায় তাস খেলিবার প্রস্তাব হইল– মহেন্দ্র কোনোমতেই গা দিল না এবং দেখিতে দেখিতে ছায়াতলে ঘুমাইয়া পড়িল। আশা বাড়ির মধ্যে গিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া বিশ্রামের উদ্‌যোগ করিল।

বিনোদিনী মাথার উপরে একটুখানি কাপড় তুলিয়া দিয়া কহিল, “আমি তবে ঘরে যাই।”

বিহারী কহিল, “কোথায় যাইবেন, একটু গল্প করুন। আপনাদের দেশের কথা বলুন।”

ক্ষণে ক্ষণে উষ্ণ মধ্যাহ্নের বাতাস তরুপল্লব মর্মরিত করিয়া চলিয়া গেল, ক্ষণে ক্ষণে দিঘির পাড়ে জামগাছের ঘনপত্রের মধ্য হইতে কোকিল ডাকিয়া উঠিল। বিনোদিনী তাহার ছেলেবেলাকার কথা বলিতে লাগিল, তাহার বাপমায়ের কথা, তাহার বাল্যসখির কথা। বলিতে বলিতে তাহার মাথা হইতে কাপড়টুকু খসিয়া পড়িল; বিনোদিনীর মুখে খরযৌবনের যে একটি দীপ্তি সর্বদাই বিরাজ করিত, বাল্যস্মৃতির ছায়া আসিয়া তাহাকে স্নিগ্ধ করিয়া দিল। বিনোদিনীর চক্ষে যে কৌতুকতীব্র কটাক্ষ দেখিয়া তীক্ষ্ণদৃষ্টি বিহারীর মনে এ পর্যন্ত নানাপ্রকার সংশয় উপস্থিত হইয়াছিল, সেই উজ্জ্বলকৃষ্ণ জ্যোতি যখন একটি শান্তসজল রেখায় ম্লান হইয়া আসিল তখন বিহারী যেন আর-একটি মানুষ দেখিতে পাইল। এই দীপ্তিমণ্ডলের কেন্দ্রস্থলে কোমল হৃদয়টুকু এখনো সুধাধারায় সরস হইয়া আছে, অপরিতৃপ্ত রঙ্গরস কৌতুকবিলাসের দহনজ্বালায় এখনো নারীপ্রকৃতি শুষ্ক হইয়া যায় নাই। বিনোদিনী সলজ্জ সতীস্ত্রীভাবে একান্ত-ভক্তিভরে পতিসেবা করিতেছে, কল্যাণপরিপূর্ণা জননীর মতো সন্তানকে কোলে ধরিয়া আছে, এ ছবি ইতিপূর্বে মুহূর্তের জন্যও বিহারীর মনে উদিত হয় নাই– আজ যেন রঙ্গমঞ্চের পটখানা ক্ষণকালের জন্য উড়িয়া গিয়া ঘরের ভিতরকার একটি মঙ্গলদৃশ্য তাহার চোখে পড়িল। বিহারী ভাবিল, বিনোদিনী বাহিরে বিলাসিনী যুবতী বটে, কিন্তু তাহার অন্তরে একটি পূজারতা নারী নিরশনে তপস্যা করিতেছে।

বিহারী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে কহিল, “প্রকৃত আপনাকে মানুষ আপনিও জানিতে পারে না, অন্তর্যামীই জানেন; অবস্থাবিপাকে যেটা বাহিরে গড়িয়া উঠে সংসারের কাছে সেইটেই সত্য।’ বিহারী কথাটাকে থামিতে দিল না– প্রশ্ন করিয়াকরিয়া জাগাইয়া রাখিতে লাগিল; বিনোদিনী এ-সকল কথা এ পর্যন্ত এমন করিয়া শোনাইবার লোক পায় নাই– বিশেষত, কোনো পুরুষের কাছে সে এমন আত্মবিস্মৃত স্বাভাবিক ভাবে কথা কহে নাই– আজ অজস্র কলকণ্ঠে নিতান্ত সহজ হৃদয়ের কথা বলিয়া তাহার সমস্ত প্রকৃতি যেন নববারিধারায় স্নাত, স্নিগ্ধ এবং পরিতৃপ্ত হইয়া গেল।

ভোরে উঠিবার উপদ্রবে ক্লান্ত, মহেন্দ্রের পাঁচটার সময় ঘুম ভাঙিল। বিরক্ত হইয়া কহিল, “এবার ফিরিবার উদ্‌যোগ করা যাক।”

বিনোদিনী কহিল, “আর-একটু সন্ধ্যা করিয়া গেলে কি ক্ষতি আছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “না, শেষকালে মাতাল গোরার হাতে পড়িতে হইবে?”

জিনিসপত্র গুছাইয়া তুলিতে অন্ধকার হইয়া আসিল। এমন সময় চাকর আসিয়া খবর দিল, “ঠিকা গাড়ি কোথায় গেছে, খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। গাড়ি বাগানের বাহিরে অপেক্ষা করিতেছিল, দুইজন গোরা গাড়োয়ানের প্রতি বল প্রকাশ করিয়া স্টেশনে লইয়া গেছে।”

আর-একটা গাড়ি ভাড়া করিতে চাকরকে পাঠাইয়া দেওয়া হইল। বিরক্ত মহেন্দ্র কেবলই মনে মনে কহিতে লাগিল, “আজ দিনটা মিথ্যা মাটি হইয়াছে।’ অধৈর্য সে আর কিছুতেই গোপন করিতে পারে না, এমনি হইল।

শুক্লপক্ষের চাঁদ ক্রমে শাখাজালজড়িত দিক্‌প্রান্ত হইতে মুক্ত আকাশে আরোহণ করিল। নিস্তব্ধ নিষ্কম্প বাগান ছায়ালোকে খচিত হইয়া উঠিল। আজ এই মায়ামণ্ডিত পৃথিবীর মধ্যে বিনোদিনী আপনাকে কী একটা অপূর্বভাবে অনুভব করিল। আজ সে যখন তরুবীথিকার মধ্যে আশাকে জড়াইয়া ধরিল, তাহার মধ্যে প্রণয়ের কৃত্রিমতা কিছুই ছিল না। আশা দেখিল, বিনোদিনীর দুই চক্ষু দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতেছে। আশা ব্যথিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কী ভাই চোখের বালি, তুমি কাঁদিতেছ কেন?”

বিনোদিনী কহিল, “কিছুই নয় ভাই, আমি বেশ আছি। আজ দিনটা আমার বড়ো ভালো লাগিল।”

আশা জিজ্ঞাসা করিল, “কিসে তোমার এত ভালো লাগিল, ভাই।”

বিনোদিনী কহিল, “আমার মনে হইতেছে, আমি যেন মরিয়া গেছি, যেন পরলোকে আসিয়াছি, এখানে যেন আমার সমস্তই মিলিতে পারে।”

বিস্মিত আশা এ-সব কথা কিছুই বুঝিতে পারিল না। সে মৃত্যুর কথা শুনিয়া দুঃখিত হইয়া কহিল, “ছি ভাই চোখের বালি, অমন কথা বলিতে নাই।”

গাড়ি পাওয়া গেল। বিহারী পুনরায় কোচবাক্সে চড়িয়া বসিল। বিনোদিনী কোনো কথা না বলিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল, জ্যোৎস্নায় স্তম্ভিত তরুশ্রেণী ধাবমান নিবিড় ছায়াস্রোতের মতো তাহার চোখের উপর দিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। আশা গাড়ির কোণে ঘুমাইয়া পড়িল। মহেন্দ্র সুদীর্ঘ পথ নিতান্ত বিমর্ষ হইয়া বসিয়া থাকিল।

Jamini-Roy_3

17

Wishing to smooth over these troubles, one day Mahendra suggested, ‘Let us go for a picnic to the gardens in Dum Dum next Sunday.’

While Asha was very excited at the idea Binodini opposed the plan strongly. Mahendra and Asha were very disappointed at her reaction and suspected this to be a ploy to distance herself from them.

As soon as Bihari arrived that afternoon, Binodini said to him, ‘These two have been upset with me since this morning because I said I did not want to go to Dum Dum on a picnic.’

Bihari answered, ‘Their disappointment is hardly unreasonable. If you do not join them on this picnic, the event will be reduced to something that one would hardly wish even on their greatest enemy.’

Binodini: Why do you not come as well? I am willing to go if you join the party.’

Bihari: Great. But what does the chief organiser say about this?

Both husband and wife were quite annoyed by this preferential treatment shown to Bihari. Mahendra felt less eager about the trip, now that Bihari was to be a member of the party. His aim had been to convince Bihari that his presence was undesirable to Binodini at all times, but this new turn of events meant Bihari would not be pushed aside as easily any more.

Mahendra said, ‘That is very good, but Bihari is prone to creating a fuss where ever he goes; one can never be sure that he will not gather all the local boys for a cause or not get into a fight with an Englishman.’

Bihari felt Mahendra’s genuine displeasure with the turn of events and smiled to himself; he said, ‘That is the fun of being alive, no one can predict what will happen at any time. We will have to start early, Madam, I will be here at the right time.’

Two carriages were hired early on the Sunday morning. The one that would carry the servants and the picnic things was inferior to the second class carriage that was hired for the family members. Bihari arrived with a huge box at the right time. Mahendra said, ‘What on earth is that? There is no more room in the servants’ carriage!’

Bihari said, ‘Do not worry yourself, I will organise everything.’

Binodini and Asha got into the carriage. Mahendra wondered where Bihari would sit. Bihari quickly placed the box on the top and climbed into the seat with the coachman.

Mahendra was very relieved. He had been worried that Bihari would want to sit inside the carriage with them. Binodini anxiously asked Bihari, ‘You will not fall, will you?’

Bihari heard her and said, ‘Do not fear, falling and fainting are not part of my repertoire!’

Mahendra waited until the carriage had started moving and then said, ‘Perhaps I should rather go and sit on top, Bihari can have my seat.’

Asha hurriedly pulled on his sleeve and said, ‘No, you will not!’

Binodini said, ‘You are not used to that kind of thing, why risk falling off?’

Mahendra grew agitated and said, ‘Me fall? What an idea!’ He made as if to dismount immediately.

Binodini said, ‘You blame Bihari, but you are the one who creates a situation out of nothing!’

Mahendra sulked and said, ‘Well, let me then get another carriage for myself so that Bihari can ride here.’

Asha said, ‘Then I will ride with you.’

Binodini said, ‘Will I then have to jump out of the carriage as well!’ The discussion ended there.

Mahendra was extremely sullen the rest of the way.

Their carriage reached the gardens in Dum Dum. The carriage with the servants had left much earlier than them but was nowhere to be seen.

The autumn morning was very pleasant. The dew had dried in the sunshine but the trees sparkled in the clear light. There were shefali shrubs by the wall, their feet smothered by fallen flowers that filled the air around with their perfume.

Asha became as happy as a wild doe in the freedom of the garden away from the bricks and mortar of their home. She gathered innumerable flowers with Binodini, picked ripe custard fruits from the trees and ate them as she sat underneath the tree. The two friends then bathed for a long time in the lake within the grounds. The two women filled the place with an innocent happiness…tree shade, the lake water and the flowering boughs that seemed to shower light and shade upon them – all thrilled with their presence.

The two came back to find that the other carriage had not arrived. Mahendra was sitting on the verandah with a face like thunder reading a catalogue from one of the foreign shops.

Binodini asked, ‘Where is Biharibabu?’

Mahendra answered shortly, ‘I do not know.’

Binodini: Come, let us find him.

Mahendra: There is no fear that someone would have abducted him. He will turn up without us going looking for him.

Binodini: But perhaps he is worried to death about his precious friend. Let us at least go and reassure him.

There was a great tree by the lake whose base had been framed with a seat. Bihari had unpacked his box there and was heating water on a kerosene stove. As soon as he saw them, he seated them and gave them a cup of hot tea each and a plate with some refreshments. Binodini kept saying, ‘How lucky that Biharibabu had brought all this, what ever would Mahendra have done without his tea!’

Although Mahendra was very glad to have the tea, he said, ‘Bihari just has to overdo things! We came for a picnic, but look at how he has got everything organized! One misses doing things spontaneously!’

Bihari said, ‘Give your tea back then, go and have fun on an empty stomach, I will not stop you!’

The day passed but the servants failed to show up. Bihari brought everything they needed for lunch out of his box. Rice, lentils, vegetables and even ground spices in little jars! Binodini was continually moved to exclaim, ‘Biharibabu, you are even better than us women! Where did you learn all this from, you have no ladies at home!’

Bihari said, ‘I have had to learn to save my own hide, who else would look after me.’

Even though he said it in jest, Binodini grew serious and her eyes rested on him with a look of great compassion.

Bihari and Binodini got busy with the cooking of the meal. Asha offered to help in her usual hesitant way, but Bihari would not permit her to do so. Mahendra who was inept at this sort of thing offered no help at all, prefering to lean back against the trunk of the tree and cross his legs as he watched the play of sunlight on the trembling banyan leaves above.

When the meal was almost ready, Binodini said, ‘Mahendrababu, you will not be able to finish counting them all, now go and have a bath.’

The servants finally arrived with the news that their carriage had broken down enroute. It was already past noon.

They planned to play cards under the tree when their lunch was done. Mahendra showed no inclination to join them and was soon fast asleep in the shade. Asha went into the house and prepared to have a nap.

Binodini covered her head slightly as a nod to the seclusion they found themselves surrounded by and said, ‘Perhaps I should go in too.’

Bihari said, ‘Where will you go? Let us talk for a while. Tell me about your village.’

The warm midday breeze ruffled the leaves above them as cuckoos called out again and again in the dense leaves of the jambu tree on the side of the lake. She talked about her childhood, her parents and her childhood friends. Her veil fell off her hair and the soothing memories of childhood seemed to soften the fierce passion of youth that always seemed to shine from her face. The teasing glances that the observant Bihari had previously observed and worried about were now dimmed to a gentle calm that finally allowed him to see another side to her. The soft heart at the centre of the bright exterior was still drenched in sweetness and her feminine core was not withered away by years of fruitless searching for love and the amusements natural to youth. Bihari had never thought of her as a demure wife tending to her husband or as a loving mother carrying a child in her arms. But today he suddenly saw a picture of loving domesticity as the curtains parted for a short while. He thought to himself, she might be a young woman who wanted everything outwardly but on the inside there still lived a woman filled with prayer and piety.

Bihari sighed and said to himself, ‘A person never truly knows what lies within themselves, that is left to the One who knows all; to everyone else, whatever floats to the surface of the soul through the trials of life becomes your entire identity.’ Bihari did not let her stop – he kept the conversation going with his questions; Binodini who had never found anyone willing to listen to these words so far, let alone a man to whom she was able to unburden herself in such a natural way found herself soothed, cleansed and fulfilled by the experience of being able to do so.

Mahendra who had been tired as he had woken at dawn slept till five in the afternoon; when awake he said testily, ‘Let us now make preparations to return.’

Binodini said, ‘What harm in starting when it is a little darker?’

Mahendra answered, ‘No, what if we fall in with drunken Englishmen?’

By the time all the things were packed, it was dark. The servants came and said, ‘We cannot find the carriages any more. They were waiting outside the gardens but two foreigners came and forcibly took them to the station.’

They were then sent to hire another carriage. Mahendra kept thinking, ‘The whole day has been in vain.’ He was so annoyed that he could not hide it any longer.

The waxing moon rose higher in the sky, freed from the branches that had hidden it from view. The stillness of the silent garden was now punctuated by shadows. Binodini had rediscovered herself today. For the first time, when she put her arms around Asha amid the trees, there was nothing false in her feelings of love. Asha looked at her and saw she was weeping. Upset by this, she asked, ‘Why are you crying, Chokher Bali?’

Binodini answered, ‘Nothing is wrong, I am fine. This day has been so good.’

Asha asked, ‘What did you enjoy so much?’

Binodini said, ‘I feel as though I have died and come to the next world where I may have everything I have wanted.’

Amazed though she was, Asha understood nothing of what was said. She heard the word death and was moved enough to say, ‘No, you must not say such things.’

A carriage was found. Bihari climbed into the seat next to the coachman again. Binodini stared outside the carriage without a word, the moonlit trees seeming to flow past like a shadowy current before her. Asha fell asleep in a corner and Mahendra sat through the long journey back in a very bad mood.

প্রভু আমার, প্রিয় আমার পরম ধন হে/Prabhu Amar Priyo Amar/My Divine Guide, My Beloved, My Very Own

প্রভু আমার, প্রিয় আমার পরম ধন হে।
চিরপথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে ॥
তৃপ্তি আমার, অতৃপ্তি মোর, মুক্তি আমার, বন্ধনডোর,
দুঃখসুখের চরম আমার জীবন মরণ হে॥
আমার সকল গতির মাঝে পরম গতি হে,
নিত্য প্রেমের ধামে আমার পরম পতি হে।
ওগো সবার, ওগো আমার, বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার–
অন্তবিহীন লীলা তোমার নূতন নূতন হে ॥

রাগ: কেদারা
তাল: একতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৫ আশ্বিন, ১৩১৭
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1910
রচনাস্থান: বোলপুর
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

Tagore art

Prabhu amar, priyo amar param dhon he.
Chiropother shongi amar chirojeebono he.
Tripti amar, otripti mor, mukti amar, bandhandor,
dukkhoshukher chorom amar jeebon moron he.
Amar shokol gotir majhe porom goti he,
Nityo premer dhaame amar porom poti he.
Ogo shobar, ogo amar, biswa hotey chitte bihar –
Ontobiheen leela tomar nuton nuton he.

**

Oh my divine guide, my beloved, my very own –
Companion of my journey through life for ever and more.
You are there in my fulfillment and in emptiness, in freedom and in captivity too,
My ultimate joy and sorrow, you lead me in life as you will in death.
I find your hand in each action I take, you are the one that keeps me going
You are the lord I worship in my temple of love.
You are mine and yet you are the delight of everyone,
From the world I have gathered you to my heart
Your play is without end or beginning as it renews me eternally.

Raga: Kedara
Beat: Ektal
Written: 1910
At Bolpur

Follow the links to hear:

Debabrata Biswas sing : http://youtu.be/RSSZOVTd0fU
Ritu Guha sing: http://youtu.be/rGWuoaY4h5Y
Ajoy Chakraborty sing: http://youtu.be/E9iS0A2q1xk