Tag Archive | Binodini

চোখের বালি ২৮ / Chokher Bali 28

২৮

সেদিন রাত্রিজাগরণ ও প্রবল আবেগের পরে সকালবেলায় মহেন্দ্রের শরীর-মনে একটা অবসাদ উপস্থিত হইয়াছিল। তখন ফাল্গুনের মাঝামাঝি, গরম পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। মহেন্দ্র অন্যদিন সকালে তাহার শয়নগৃহের কোণে টেবিলে বই লইয়া বসিত। আজ নীচের বিছানায় তাকিয়ায় হেলান দিয়া পড়িল। বেলা হইয়া যায়, স্নানে গেল না। রাস্তা দিয়া ফেরিওয়ালা হাঁকিয়া যাইতেছে। পথে আপিসের গাড়ির শব্দের বিরাম নাই। প্রতিবেশীর নূতন বাড়ি তৈরি হইতেছে, মিস্ত্রি-কন্যারা তাহারই ছাদ পিটিবার তালে তালে সমস্বরে একঘেয়ে গান ধরিল। ঈষৎ তপ্ত দক্ষিণের হাওয়ায় মহেন্দ্রের পীড়িত স্নায়ুজাল শিথিল হইয়া আসিয়াছে; কোনো কঠিন পণ, দুরূহ চেষ্টা, মানস-সংগ্রাম আজিকার এই হালছাড়া গা-ঢালা বসন্তের দিনের উপযুক্ত নহে।

“ঠাকুরপো, তোমার আজ হল কী। স্নান করিবে না? এ দিকে খাবার যে প্রস্তুত। ও কী ভাই, শুইয়া যে! অসুখ করিয়াছে? মাথা ধরিয়াছে?” বলিয়া বিনোদিনী কাছে আসিয়া মহেন্দ্রের কপালে হাত দিল।

মহেন্দ্র অর্ধেক চোখ বুজিয়া জড়িতকণ্ঠে বলিল, “আজ শরীরটা তেমন ভালো নাই–আজ আর স্নান করিব না।”

বিনোদিনী কহিল, “স্নান না কর তো দুটিখানি খাইয়া লও।” বলিয়া পীড়াপীড়ি করিয়া সে মহেন্দ্রকে ভোজনস্থানে লইয়া গেল এবং উৎকণ্ঠিত যত্নের সহিত অনুরোধ করিয়া আহার করাইল।

আহারের পর মহেন্দ্র পুনরায় নীচের বিছানায় আসিয়া শুইলে, বিনোদিনী শিয়রে বসিয়া ধীরে ধীরে তাহার মাথা টিপিয়া দিতে লাগিল। মহেন্দ্র নিমীলিতচক্ষে বলিল, “ভাই বালি, এখনো তো তোমার খাওয়া হয় নাই, তুমি খাইতে যাও।”

বিনোদিনী কিছুতেই গেল না। অলস মধ্যাহ্নের উত্তপ্ত হাওয়ায় ঘরের পর্দা উড়িতে লাগিল এবং প্রাচীরের কাছে কম্পমান নারিকেলগাছের অর্থহীন মর্মরশব্দ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। মহেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড ক্রমশই দ্রুততর তালে নাচিতে লাগিল এবং বিনোদিনীর ঘন নিশ্বাস সেই তালে মহেন্দ্রের কপালের চুলগুলি কাঁপাইতে থাকিল। কাহারো কণ্ঠ দিয়া একটি কথা বাহির হইল না। মহেন্দ্র মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “অসীম বিশ্বসংসারের অনন্ত প্রবাহের মধ্যে ভাসিয়া চলিয়াছি, তরণী ক্ষণকালের জন্য কখন কোথায় ঠেকে, তাহাতে কাহার কী আসে যায় এবং কতদিনের জন্যই বা যায় আসে।’

শিয়রের কাছে বসিয়া কপালে হাত বুলাইতে বুলাইতে বিহ্বল যৌবনের গুরুভারে ধীরে ধীরে বিনোদিনীর মাথা নত হইয়া আসিতেছিল; অবশেষে তাহার কেশাগ্রভাগ মহেন্দ্রের কপোল স্পর্শ করিল। বাতাসে আন্দোলিত সেই কেশগুচ্ছের কম্পিত মৃদু স্পর্শে তাহার সমস্ত শরীর বারংবার কাঁপিয়া উঠিল, হঠাৎ যেন নিশ্বাস তাহার বুকের কাছে অবরুদ্ধ হইয়া বাহির হইবার পথ পাইল না। ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া মহেন্দ্র কহিল, “নাঃ আমার কালেজ আছে, আমি যাই।” বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে না চাহিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল।

বিনোদিনী কহিল, “ব্যস্ত হইয়ো না, আমি তোমার কাপড় আনিয়া দিই।” বলিয়া মহেন্দ্রের কালেজের কাপড় বাহির করিয়া আনিল।

মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি কালেজে চলিয়া গেল, কিন্তু সেখানে কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। পড়াশুনায় মন দিতে অনেকক্ষণ বৃথা চেষ্টা করিয়া সকাল সকাল বাড়ি ফিরিয়া আসিল।

ঘরে ঢুকিয়া দেখে, বিনোদিনী বুকের তলায় বালিশ টানিয়া লইয়া নীচের বিছানায় উপুড় হইয়া কী একটা বই পড়িতেছে–রাশীকৃত কালো চুল পিঠের উপর ছড়ানো। বোধ করি বা সে মহেন্দ্রের জুতার শব্দ শুনিতে পায় নাই। মহেন্দ্র আস্তে আস্তে পা টিপিয়া কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। শুনিতে পাইল, পড়িতে পড়িতে বিনোদিনী একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

মহেন্দ্র কহিল, “ওগো করুণাময়ী, কাল্পনিক লোকের জন্য হৃদয়ের বাজে খরচ করিয়ো না। কী পড়া হইতেছে।”

বিনোদিনী ত্রস্ত হইয়া উঠিয়া বসিয়া তাড়াতাড়ি বইখানা অঞ্চলের মধ্যে লুকাইয়া ফেলিল। মহেন্দ্র কাড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। অনেকক্ষণ হাতাহাতি-কাড়াকাড়ির পর পরাভূত বিনোদিনীর অঞ্চল হইতে মহেন্দ্র বইখানি ছিনাইয়া লইয়া দেখিল–বিষবৃক্ষ। বিনোদিনী ঘন নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

মহেন্দ্রের বক্ষঃস্থল তোলপাড় করিতেছিল। অনেক চেষ্টায় সে হাসিয়া কহিল, “ছি ছি, বড়ো ফাঁকি দিলে। আমি ভাবিয়াছিলাম, খুব একটা গোপনীয় কিছু হইবে বা। এত কাড়াকাড়ি করিয়া শেষকালে কিনা বিষবৃক্ষ বাহির হইয়া পড়িল।”

বিনোদিনী কহিল, “আমার আবার গোপনীয় কী থাকিতে পারে, শুনি।”

মহেন্দ্র ফস্‌ করিয়া বলিয়া ফেলিল, “এই মনে করো, যদি বিহারীর কাছ হইতে কোনো চিঠি আসিত?”

নিমেষের মধ্যে বিনোদিনীর চোখে বিদ্যুৎ স্ফুরিত হইল। এতক্ষণ ফুলশর ঘরের কোণে খেলা করিতেছিল, সে যেন দ্বিতীয় বার ভস্মসাৎ হইয়া গেল। মুহূর্তে-প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার মতো বিনোদিনী উঠিয়া দাঁড়াইল। মহেন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “মাপ করো, আমার পরিহাস মাপ করো।”

বিনোদিনী সবেগে হাত ছিনাইয়া লইয়া কহিল, “পরিহাস করিতেছ কাহাকে। যদি তাঁহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিবার যোগ্য হইতে, তবে তাঁহাকে পরিহাস করিলে সহ্য করিতাম। তোমার ছোটো মন, বন্ধুত্ব করিবার শক্তি নাই, অথচ ঠাট্টা।”

বিনোদিনী চলিয়া যাইতে উদ্যত হইবামাত্র মহেন্দ্র দুই হাতে তাহার পা বেষ্টন করিয়া বাধা দিল।

এমন সময়ে সম্মুখে এক ছায়া পড়িল, মহেন্দ্র বিনোদিনীর পা ছাড়িয়া চমকিয়া মুখ তুলিয়া দেখিল, বিহারী।

বিহারী স্থির দৃষ্টিপাতে উভয়কে দগ্ধ করিয়া শান্ত ধীর স্বরে কহিল, “অত্যন্ত অসময়ে উপস্থিত হইয়াছি, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকিব না। একটা কথা বলিতে আসিয়াছিলাম। আমি কাশী গিয়াছিলাম, জানিতাম না, সেখানে বউঠাকরুণ আছেন। না জানিয়া তাঁহার কাছে অপরাধী হইয়াছি; তাঁহার কাছে ক্ষমা চাহিবার অবসর নাই, তাই তোমার কাছে ক্ষমা চাহিতে আসিয়াছি। আমার মনে জ্ঞানে অজ্ঞানে যদি কখনো কোনো পাপ স্পর্শ করিয়া থাকে, সেজন্য তাঁহাকে যেন কখনো কোনো দুঃখ সহ্য করিতে না হয়, তোমার কাছে আমার এই প্রার্থনা।”

বিহারীর কাছে দুর্বলতা হঠাৎ প্রকাশ পাইল বলিয়া মহেন্দ্রের মনটা যেন জ্বলিয়া উঠিল। এখন তাহার ঔদার্যের সময় নহে। সে একটু হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরঘরে কলা খাইবার যে গল্প আছে, তোমার ঠিক তাই দেখিতেছি। তোমাকে দোষ স্বীকার করিতেও বলি নাই; অস্বীকার করিতেও বলি নাই; তবে ক্ষমা চাহিয়া সাধু হইতে আসিয়াছ কেন।”

বিহারী কাঠের পুতুলের মতো কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল–তার পরে যখন কথা বলিবার প্রবল চেষ্টায় তাহার ঠোঁট কাঁপিতে লাগিল, তখন বিনোদিনী বলিয়া উঠিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, তুমি কোনো উত্তর দিয়ো না। কিছুই বলিয়ো না। ঐ লোকটি যাহা মুখে আনিল, তাহাতে উহারই মুখে কলঙ্ক লাগিয়া রহিল, সে কলঙ্ক তোমাকে স্পর্শ করে নাই।”

বিনোদিনীর কথা বিহারীর কানে প্রবেশ করিল কি না সন্দেহ–সে যেন স্বপ্নচালিতের মতো মহেন্দ্রের ঘরের সম্মুখ হইতে ফিরিয়া সিঁড়ি দিয়া নামিয়া যাইতে লাগিল।

বিনোদিনী তাহার পশ্চাতে গিয়া কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, আমাকে কি তোমার কোনো কথা বলিবার নাই। যদি তিরস্কারের কিছু থাকে, তবে তিরস্কার করো।”

বিহারী যখন কোনো উত্তর না করিয়া চলিতে লাগিল, বিনোদিনী সম্মুখে আসিয়া দুই হাতে তাহার দক্ষিণ হাত চাপিয়া ধরিল। বিহারী অপরিসীম ঘৃণার সহিত তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল। সেই আঘাতে বিনোদিনী যে পড়িয়া গেল তাহা সে জানিতেও পারিল না।

পতনশব্দ শুনিয়া মহেন্দ্র ছুটিয়া আসিল। দেখিল, বিনোদিনীর বাম হাতের কনুয়ের কাছে কাটিয়া রক্ত পড়িতেছে।

মহেন্দ্র কহিল, “ইস্‌, এ যে অনেকটা কাটিয়াছে” বলিয়া তৎক্ষণাৎ নিজের পাতলা জামা খানিকটা টানিয়া ছিঁড়িয়া ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধিতে প্রস্তুত হইল।

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত সরাইয়া লইয়া কহিল, “না না, কিছুই করিয়ো না, রক্ত পড়িতে দাও।”

মহেন্দ্র কহিল, “বাঁধিয়া একটা ঔষধ দিতেছি, তা হইলে আর ব্যথা হইবে না, শীঘ্র সারিয়া যাইবে।”

বিনোদিনী সরিয়া গিয়া কহিল, “আমি ব্যথা সারাইতে চাই না, এ কাটা আমার থাক্‌।”

মহেন্দ্র কহিল, “আজ অধীর হইয়া তোমাকে আমি লোকের সামনে অপদস্থ করিয়াছি, আমাকে মাপ করিতে পারিবে কি।”

বিনোদিনী কহিল, “মাপ কিসের জন্য। বেশ করিয়াছ। আমি কি লোককে ভয় করি। আমি কাহাকেও মানি না। যাহারা আঘাত করিয়া ফেলিয়া চলিয়া যায়, তাহারাই কি আমার সব, আর যাহারা আমাকে পায়ে ধরিয়া টানিয়া রাখিতে চায়, তাহারা আমার কেহই নহে?”

মহেন্দ্র উন্মত্ত হইয়া গদগদকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “বিনোদিনী, তবে আমার ভালোবাসা তুমি পায়ে ঠেলিবে না?”

বিনোদিনী কহিল, “মাথায় করিয়া রাখিব। ভালোবাসা আমি জন্মাবধি এত বেশি পাই নাই যে, “চাই না’ বলিয়া ফিরাইয়া দিতে পারি।”

মহেন্দ্র তখন দুই হাতে বিনোদিনীর দুই হাত ধরিয়া কহিল,”তবে এসো আমার ঘরে। তোমাকে আজ আমি ব্যথা দিয়াছি, তুমিও আমাকে ব্যথা দিয়া চলিয়া আসিয়াছ–যতক্ষণ তাহা একেবারে মুছিয়া না যাইবে, ততক্ষণ আমার খাইয়া শুইয়া কিছুতেই সুখ নাই।”

বিনোদিনী কহিল,”আজ নয়, আজ আমাকে ছাড়িয়া দাও। যদি তোমাকে দুঃখ দিয়া থাকি, মাপ করো।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমিও আমাকে মাপ করো, নহিলে আমি রাত্রে ঘুমাইতে পারিব না।”

বিনোদিনী কহিল,”মাপ করিলাম।”

মহেন্দ্র তখনই অধীর হইয়া বিনোদিনীর কাছে হাতে-হাতে ক্ষমা ও ভালোবাসারএকটা নিদর্শন পাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিল। কিন্তু বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। বিনোদিনী সিঁড়ি দিয়া নামিয়া চলিয়া গেল– মহেন্দ্রও ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া ছাদে বেড়াইতে লাগিল। বিহারীর কাছে হঠাৎ আজ মহেন্দ্র ধরা পড়িয়াছে, ইহাতে তাহার মনে একটা মুক্তির আনন্দ উপস্থিত হইল। লুকোচুরির যে-একটা ঘৃণ্যতা আছে, একজনের কাছে প্রকাশ হইয়াই যেন তাহা অনেটা দূর হইল। মহেন্দ্র মনে মনে কহিল, “আমি নিজেকে ভালো বলিয়া মিথ্যা করিয়া আর চালাইতে চাহি না–কিন্তু আমি ভালোবp–আমি ভালোবাসি, সে কথা মিথ্যে নহে।’ — নিজের ভালোবাসার গৌরবে তাহার স্পর্ধা এতই বাড়িয়া উঠিল যে, নিজেকে মন্দ বলিয়া সে আপন মনে উদ্ধতভাবে গর্ব করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যাকলে নীরব-জ্যোতিষ্কমণ্ডলী-অধিরাজিত অনন্ত জগতের প্রতি একটা অবজ্ঞা নিক্ষেপ করিয়া মনে মনে কহিল, “যে আমাকে যত মন্দই মনে করুক, কিন্তু আমি ভালোবাসি।’ বলিয়া বিনোদিনীর মানসী মূর্তিকে দিয়া মহেন্দ্র সমস্ত আকাশ, সমস্ত সংসার, সমস্ত কর্তব্য আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। বিহারী হঠাৎ আসিয়া আজ যেন মহেন্দ্রের জীবনের ছিপি-আঁটা মসীপাত্র উলটাইয়া ভাঙিয়া ফেলিল–বিনোদিনীর কালো চোখ এবং কালো চুলের কালি দেখিতে দেখিতে বিস্তৃত হইয়া পূর্বেকার সমস্ত সাদা এবং সমস্ত লেখা লেপিয়া একাকার করিয়া দিল।

punampntg

28

Mahendra had been physically and mentally exhausted the next morning after spending a sleepless night in tremendous emotional upheaval. It was the middle of the month of Phalgun and the weather was growing warmer. On other days, Mahendra sat with his books at the table in the corner of his bedroom. Today he leaned against a bolster on the floor and studied. The hours passed but he did not go for a bath. The street vendors hawked their wares on the street. Carriages passed incessantly on the road carrying people to work. The neighbour was building a new house, the women who worked as labourers began their monotonous song to the thuds of the terrace building. The warm southerly breeze made Mahendra’s troubled nerves relax; no terrible pledge, strenuous effort or deep thought seemed to suit the mood of the spring day.

 ‘Sir, what is wrong with you today? Will you not bather? The food is prepared. Why are you lying down? Are you ill? Do you have a headache?’ Binodini drew close to him and felt his forehead.

 Mahendra mumbled, his eyes half closed, ‘I do not feel very well – I will not bathe today.’

 Binodini said, ‘Even if you do not bathe, at least eat something.’ She remonstrated with Mahendra til he submitted to her anxious attentions and went to the dining room where he ate his lunch.

 He returned to his room and lay down on the floor after his meal while Binodini gently pressed his temples. His eyes half closed, he said to her, ‘Bali, you have not eaten yet, go and eat now.’

 Binodini could not be persuaded to leave. The curtains stirred in the hot breeze of that lazy afternoon and the meaningless rustlings of the trembling coconut leaves near the wall filled the room. Mahendra’s heart beat faster and faster and Binodini’s breath blew on the hair on his forehead. No one spoke a word. Mahendra thought, ‘I am floating on the eternal currents of this endless world, does it matter to anyone where my boat moors and for how long.’

As she sat by his head stroking his forehead, the desires of her eager unfulfilled youth made Binodini lean lower and lower till her hair touched Mahendra’s cheek. His body trembled at the gentle touch of that tendril of hair and he felt as though his breath was confined in his chest from whence it could not escape. He sat up suddenly and said, ‘No, I have classes, I have to go!’ He then stood up without looking at Binodini.

 Binodini said, ‘Why the hurry, let me get your clothes,’ and she took his clothes out of the cupboard.

 Mahendra went to classes quickly, but he could not concentrate there either. He tried in vain to focus on his studies but failing that, came home early.

 When he came home, he found Binodini lying on the floor with a pillow under her chest reading a book –  a cloud of black hair covering her back. Possibly she had not heard the sound of his shoes. Mahendra stepped carefully and drew close to her just in time to hear her sigh deeply.

 Mahendra jested, ‘Oh paragon of mercy, do not waste your feelings for imaginary people. What are you reading?’

 Startled, Binodini got up hurriedly and hid the book in her clothes. Mahendra tried to take it from her by force. After much struggling, he got hold of the book and read its title – ‘The Poison Tree’. Binodini panted with the exertions and turned her face from him in anger.

 Mahendra’s heart was filled with emotions. He smiled with a great effort and said, ‘Shame! This is nothing! I thought it would be some great secret that I was wresting from you. ‘The Poison Tree’ after all that!’

Binodini answered, ‘What great secret could I possibly have?’

 Mahendra burst out, ‘Suppose, it had been a letter from Bihari?’

Binodini’s eyes flashed angrily like lightning. Her gentle mood was gone in an instant and she stood up straight as a flame. Mahendra grabbed her hand and entreated, ‘Forgive me, forgive my jest!’

 Binidini snatched her hand away forcefully, saying, ‘Who are you jesting about? If you were even worthy of his friendship, I could have borne your jests. But you have a narrow mind without the strength to sustain a friendship and yet you think you may jest!’

 As she tried to leave, Mahendra circled her feet with his arms and prevented her from moving.

A shadow fell across them and he let go of her feet, looking up to see Bihari.

 Bihari’s constant gaze chastised both as he said calmly, ‘I can see that I have come at the wrong time, but I will not stay for long. I came to say but one thing. I went to Kashi without knowing that your wife was there. I wronged her unknowingly but as there is no time to beg her forgiveness, I am here to beg yours. If I have ever allowed any impure thoughts to dwell within me with or without my knowledge, I implore you that she never be blamed for that.’

Mahendra was furious at being suddenly found out by Bihari. This was not his time to be generous.

He smiled a little and said, ‘The story about someone eating bananas in the temple seems to suit your situation. I have neither asked you to admit you are at fault or to deny it; then why are you trying to redeem yourself by begging to be pardoned?’

 Bihari stood there for a while like a statue – then his lips trembled when he tried to speak. Binodini now spoke out, ‘Bihari, do not answer these words. Say nothing, Whatever this man is saying blackens him alone, it does not touch you at all.’

 I doubt that Bihari heard a word of what Binodini said – for he began descending the stairs like a sleep walker.

Binodini followed him and said, ‘Bihari, do you have nothing to say to me? If you have harsh words, say them.’

 Seeing that Bihari was not listening to her, Binodini held his right hand with both of hers to try and stop him. He shook her off with immense hatred and did not look back to see that she fell down when he pushed her away.

 Mahendra heard the sound of her fall and came rushing to see that she was bleeding from a cut near her left elbow.

He ripped a piece from his own shirt and prepared to bind the cut saying, ‘This is a deep cut.’

Binodini quickly moved her arm away and said, ‘It is nothing, let it bleed.’

Mahendra said, ‘Let me give you a medicine after bandaging it, then it will not hurt so much and will heal quickly.’

Binodini moved away, ‘I do not want to get better, let this pain be mine.’

 Mahendra persisted, ‘I have insulted you in front of others today, will you be able to forgive me?’

 Binodini asked, ‘Why ask for forgiveness? You have done the right thing. Do I fear people? I heed no one. Are those who push me away and leave me, the ones I must care for, and the one who clings to my feet be of no consequence to me?’

 Mahendra, maddened with feeling, said, ‘Binodini, so you will not spurn my love?’

 Binodini answered, ‘I will worship your love. I have not had so much affection that I can afford to turn it away, saying ‘I do not want this.’

Mahendra held her hands in his and said, ‘Then come to my room. I have hurt you today and you too have hurt me – I cannot be happy until I have erased those memories.’

 Binodini: Not today. Let me be today. If I have hurt you, forgive me.

Mahendra: You must forgive me too. Else I will not be able to sleep.

Binodini said, ‘I have forgiven you.’

Mahendra was eager to receive some immediate proof of Binodini’s forgiveness and love, But he could not say anything when he looked at her face. She went downstairs while he climbed up to the terrace where he walked about. He was feeling a sense of freedom at being discovered by Bihari. There is a kind of shame in secrecy and that seemed to have been greatly removed by his unveiling. He told himself, ‘I do not want to pretend to be good but it is no lie that I love someone else.’ He was so emboldened with his pride in being in love that he rejoiced in the knowledge of his own wrong doing. He threw a wordless challenge at the vast universe that lay above him with its stars and constellations and said, ‘No matter what evil people think I am capable of, I am in love.’ His thoughts of Binodini’s gradually drowned out the sky and the world and even his responsibilities. It was as if Bihari had come and tipped over the tightly sealed ink well of Mahendra’s life – the darkness of Binodini’s eyes and her hair seemed to obliterate all the clarity of his past existence and wipe out all that had happened earlier.

Advertisements

চোখের বালি ২৫/Chokher Bali 25

২৫

সেদিন নূতন ফাল্গুনে প্রথম বসন্তের হাওয়া দিতেই আশা অনেক দিন পরে সন্ধ্যার আরম্ভে ছাদে মাদুর পাতিয়া বসিয়াছে। একখানি মাসিক কাগজ লইয়া খণ্ডশ প্রকাশিত একটা গল্প খুব মনোযোগ দিয়া সেই অল্প আলোকে পড়িতেছিল। গল্পের নায়ক তখন সংবৎসর পরে পূজার ছুটিতে বাড়ি আসিবার সময় ডাকাতের হাতে পড়িয়াছে,আশার হৃদয় উদ্বেগে কাঁপিতেছিল; এ দিকে হতভাগিনী নায়িকা ঠিক সেই সময়েই বিপদের স্বপ্ন দেখিয়া কাঁদিয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। আশা চোখের জল আর রাখিতে পারে না। আশা বাংলা গল্পের অত্যন্ত উদার সমালোচক ছিল। যাহা পড়িত,তাহাই মনে হইত চমৎকার। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিত,”ভাই চোখের বালি, মাথা খাও, এ গল্পটা পড়িয়া দেখো। এমন সুন্দর! পড়িয়া আর কাঁদিয়া বাঁচি না।” বিনোদিনী ভালোমন্দ বিচার করিয়া আশার উচ্ছ্বসিত উৎসাহে বড়ো আঘাত করিত।

আজিকার এই গল্পটা আশা মহেন্দ্রকে পড়াইবে বলিয়া স্থির করিয়া যখন সজল-চক্ষে কাগজখানা বন্ধ করিল, এমন সময় মহেন্দ্র আসিয়া উপস্থিত হইল। মহেন্দ্রের মুখ দেখিয়াই আশা উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল। মহেন্দ্র জোর করিয়া প্রফুল্লতা আনিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “একলা ছাদের উপর কোন্ ভাগ্যবানের ভাবনায় আছ?”

আশা নায়ক-নায়িকার কথা একেবারে ভুলিয়া গিয়া কহিল, “তোমার কী শরীর আজ ভালো নাই।”

মহেন্দ্র। শরীর বেশ আছে।

আশা। তবে তুমি মনে মনে কী একটা ভাবিতেছ, আমাকে খুলিয়া বলো।

মহেন্দ্র আশার বাটা হইতে একটা পান তুলিয়া লইয়া মুখে দিয়া কহিল, “আমি ভাবিতেছিলাম, তোমার মাসিমা বেচারা কত দিন তোমাকে দেখেন নাই। একবার হঠাৎ যদি তুমি তাঁহার কাছে গিয়া পড়িতে পার, তবে তিনি কত খুশিই হন।”

আশা কোনো উত্তর না করিয়া মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। হঠাৎ এ কথা আবার নূতন করিয়া কেন মহেন্দ্রের মনে উদয় হইল, তাহা সে বুঝিতে পারিল না।

আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া মহেন্দ্র কহিল, “তোমার যাইতে ইচ্ছা করে না?”

এ কথার উত্তর দেওয়া কঠিন। মাসিকে দেখিবার জন্য যাইতে ইচ্ছা করে, আবার মহেন্দ্রকে ছাড়িয়া যাইতে ইচ্ছাও করে না। আশা কহিল, “কালেজের ছুটি পাইলে তুমি যখন যাইতে পারিবে, আমিও সঙ্গে যাইব।”

মহেন্দ্র। ছুটি পাইলেও যাইবার জো নাই; পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে।

আশা। তবে থাক্, এখন না-ই গেলাম।

মহেন্দ্র। থাক্ কেন। যাইতে চাহিয়াছিলে, যাও-না।

আশা। না, আমার যাইবার ইচ্ছা নাই।

মহেন্দ্র। এই সেদিন এত ইচ্ছা ছিল, হঠাৎ ইচ্ছা চলিয়া গেল?

আশা এই কথায় চুপ করিয়া চোখ নিচু করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনীর সঙ্গে সন্ধি করিবার জন্য বাধাহীন অবসর চাহিয়া মহেন্দ্রের মন ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত অধীর হইয়া উঠিয়াছিল। আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া তাহার একটা অকারণ রাগের সঞ্চার হইল। কহিল, “আমার উপর মনে মনে তোমার কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে নাকি। তাই আমাকে চোখে চোখে পাহারা দিয়া রাখিতে চাও?”

আশার স্বাভাবিক মৃদুতা নম্রতা ধৈর্য মহেন্দ্রের কাছে হঠাৎ অত্যন্ত অসহ্য হইয়া উঠিল। মনে মনে কহিল, “মাসির কাছে যাইতে ইচ্ছা আছে, বলো যে, আমি যাইবই, আমাকে যেমন করিয়া হোক পাঠাইয়া দাও–তা নয়, কখনো হাঁ, কখনো না, কখনো চুপচাপ–এ কী রকম।’

হঠাৎ মহেন্দ্রের এই উগ্রতা দেখিয়া আশা বিস্মিত ভীত হইয়া উঠিল। সে অনেক চেষ্টা করিয়া কোনো উত্তরই ভাবিয়া পাইল না। মহেন্দ্র কেন যে কখনো হঠাৎ এত আদর করে, কখনো হঠাৎ এমন নিষ্ঠুর হইয়া উঠে, তাহা সে কিছুই বুঝিতে পারে না। এইরূপে মহেন্দ্র যতই তাহার কাছে দুর্বোধ্য হইয়া উঠিতেছে, ততই আশার কম্পান্বিত চিত্ত ভয়ে ও ভালোবাসায় তাহাকে যেন অত্যন্ত অধিক করিয়া বেষ্টন করিয়া ধরিতেছে।

মহেন্দ্রকে আশা মনে মনে সন্দেহ করিয়া চোখে চোখে পাহারা দিতে চায়! ইহা কি কঠিন উপহাস, না নির্দয় সন্দেহ? শপথ করিয়া কি ইহার প্রতিবাদ আবশ্যক, না হাস্য করিয়া ইহা উড়াইয়া দিবার কথা?

হতবুদ্ধি আশাকে পুনশ্চ চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া অধীর মহেন্দ্র দ্রুতবেগে সেখান হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল। তখন কোথায় রহিল মাসিক পত্রের সেই গল্পের নায়ক, কোথায় রহিল গল্পের নায়িকা। সূর্যাস্তের আভা অন্ধকারে মিশাইয়া গেল, সন্ধ্যারম্ভের ক্ষণিক বসন্তের বাতাস গিয়া শীতের হাওয়া দিতে লাগিল–তখনো আশা সেই মাদুরের উপর লুণ্ঠিত হইয়া পড়িয়া রহিল।

অনেক রাত্রে আশা শয়নঘরে গিয়া দেখিল, মহেন্দ্র তাহাকে না ডাকিয়াই শুইয়া পড়িয়াছে। তখনই আশার মনে হইল, স্নেহময়ী মাসির প্রতি তাহার উদাসীনতা কল্পনা করিয়া মহেন্দ্র তাহাকে মনে মনে ঘৃণা করিতেছে। বিছানার মধ্যে ঢুকিয়াই আশা মহেন্দ্রের দুই পা জড়াইয়া তাহার পায়ের উপর মুখ রাখিয়া পড়িয়া রহিল। তখন মহেন্দ্র করুণায় বিচলিত হইয়া তাহাকে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিল। আশা কিছুতেই উঠিল না। সে কহিল, “আমি যদি কোনো দোষ করিয়া থাকি, আমাকে মাপ করো।”

মহেন্দ্র আর্দ্রচিত্তে কহিল, “তোমার কোনো দোষ নাই, চুনি। আমি নিতান্ত পাষণ্ড, তাই তোমাকে অকারণে আঘাত করিয়াছি।”

তখন মহেন্দ্রের দুই পা অভিষিক্ত করিয়া আশার অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। মহেন্দ্র উঠিয়া বসিয়া তাহাকে দুই বাহুতে তুলিয়া আপনার পাশে শোয়াইল। আশার রোদনবেগ থামিলে সে কহিল, “মাসিকে কি আমার দেখিতে যাইবার ইচ্ছা করে না। কিন্তু তোমাকে ফেলিয়া আমার যাইতে মন সরে না। তাই আমি যাইতে চাই নাই, তুমি রাগ করিয়ো না।”

মহেন্দ্র ধীরে ধীরে আশার আর্দ্র কপোল মুছাইতে মুছাইতে কহিল, “এ কি রাগ করিবার কথা, চুনি। আমাকে ছাড়িয়া যাইতে পার না, সে লইয়া আমি রাগ করিব? তোমাকে কোথাও যাইতে হইবে না।”

আশা কহিল, “না, আমি কাশী যাইব।”

মহেন্দ্র। কেন।

আশা। তোমাকে মনে মনে সন্দেহ করিয়া যাইতেছি না–এ কথা যখন একবার তোমার মুখ দিয়া বাহির হইয়াছে, তখন আমাকে কিছুদিনের জন্যও যাইতেই হইবে।

মহেন্দ্র। আমি পাপ করিলাম, তাহার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে করিতে হইবে?

আশা। তাহা আমি জানি না–কিন্তু পাপ আমার কোনোখানে হইয়াছেই, নহিলে এমন-সকল অসম্ভব কথা উঠিতেই পারিত না। যে-সব কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিতে পারিতাম না, সে-সব কথা কেন শুনিতে হইতেছে।

মহেন্দ্র। তাহার কারণ, আমি যে কী মন্দ লোক তাহা তোমার স্বপ্নেরও অগোচর।

আশা ব্যস্ত হইয়া কহিল, “আবার! ও কথা বলিয়ো না। কিন্তু এবার আমি কাশী যাইবই।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “আচ্ছা যাও, কিন্তু তোমার চোখের আড়ালে আমি যদি নষ্ট হইয়া যাই, তাহা হইলে কী হইবে।”

আশা কহিল, “তোমার আর অত ভয় দেখাইতে হইবে না, আমি কিনা ভাবিয়া অস্থির হইতেছি।”

মহেন্দ্র। কিন্তু ভাবা উচিত। তোমার এমন স্বামীটিকে যদি অসাবধানে বিগড়াইতে দাও, তবে এর পরে কাহাকে দোষ দিবে?

আশা। তোমাকে দোষ দিব না, সেজন্য তুমি ভাবিয়ো না।

মহেন্দ্র। তখন নিজের দোষ স্বীকার করিবে?

আশা। একশোবার।

মহেন্দ্র। আচ্ছা, তাহা হইলে কাল একবার তোমার জেঠামশায়ের সঙ্গে গিয়া কথাবার্তা ঠিক করিয়া আসিব।

এই বলিয়া মহেন্দ্র “অনেক রাত হইয়াছে’ বলিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল।

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পুনর্বার এ পাশে ফিরিয়া কহিল, “চুনি, কাজ নাই, তুমি নাই বা গেলে।”

আশা কাতর হইয়া কহিল, “আবার বারণ করিতেছ কেন। এবার একবার না গেলে তোমার সেই ভর্ৎসনাটা আমার গায়ে লাগিয়া থাকিবে। আমাকে দু-চার দিনের জন্যও পাঠাইয়া দাও।”

মহেন্দ্র কহিল, “আচ্ছা।” বলিয়া আবার পাশ ফিরিয়া শুইল।

কাশী যাইবার আগের দিন আশা বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া কহিল, “ভাই বালি, আমার গা ছুঁইয়া একটা কথা বল্।”

বিনোদিনী আশার গাল টিপিয়া ধরিয়া কহিল, “কী কথা, ভাই। তোমার অনুরোধ আমি রাখিব না?”

আশা। কে জানে ভাই, আজকাল তুমি কী রকম হইয়া গেছ। কোনোমতেই যেন আমার স্বামীর কাছে বাহির হইতে চাও না।

বিনোদিনী। কেন চাই না সে কি তুই জানিস নে, ভাই। সেদিন বিহারীবাবুকে মহেন্দ্রবাবু যে কথা বলিলেন, সে কি তুই নিজের কানে শুনিস নাই। এ-সকল কথা যখন উঠিল তখন কি আর বাহির হওয়া উচিত–তুমিই বলো-না, ভাই বালি।

ঠিক উচিত যে নহে, তাহা আশা বুঝিত। এ-সকল কথার লজ্জাকরতা যে কতদূর, তাহাও সে নিজের মন হইতেই সম্প্রতি বুঝিয়াছে। তবু বলিল, “কথা অমন কত উঠিয়া থাকে, সে-সব যদি না সহিতে পারিস তবে আর ভালোবাসা কিসের, ভাই। ও কথা ভুলিতে হইবে।”

বিনোদিনী। আচ্ছা ভাই, ভুলিব।

আশা। আমি তো ভাই, কাল কাশী যাইব, আমার স্বামীর যাহাতে কোনো অসুবিধা না হয় তোমাকে সেইটে বিশেষ করিয়া দেখিতে হইবে। এখনকার মতো পালাইয়া বেড়াইলে চলিবে না।

বিনোদিনী চুপ করিয়া রহিল। আশা বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “মাথা খা ভাই বালি, এই কথাটা আমাকে দিতেই হইবে।”

বিনোদিনী কহিল, “আচ্ছা।”

Kalighat-Paintings-04

Chapter 25
Asha had spread a mat upon the terrace at the twilight hour after a very long time as there was a fresh spring breeze at the start of the month of Phalgun. She was reading a serialized story in a monthly magazine with great attentiveness in the fading light. The hero of the story was in the clutches of highwaymen while on his yearly journey back home during the Puja holidays; Asha’s heart was filled with apprehension. At this point the wretched heroine had also just woken from a nightmare and Asha’s eyes welled with tears. Asha was a very lenient critic of Bengali literature. She found everything that she read to be of the highest quality. She would call Binodini and tell her, ‘Bali, upon my heart! Please read this! It is so well written I cannot hold back my tears.’ Binodini would then judge the piece on its merits and cause much grief to Asha’s sense of enthusiastic approval.

As she tearfully shut the book and decided to read the story later to Mahendra, he appeared on the terrace. She grew anxious on seeing his face although he tried hard to compose his features, saying, ‘Who is the fortunate for whom you wait on this terrace?’

Asha forgot all about the characters of the story and asked, ‘Are you not well today?’

Mahendra: I am well.

Asha: Then tell me what is worrying you.

Mahendra took a folded paan from her container, put it in his mouth and said, ‘I was thinking that your poor aunt has not seen you for a very long time. If you pay her a sudden visit, how happy you will make her.’

Asha said nothing and looked at Mahendra. She could not understand why he was suddenly thinking about this again.
Mahendra noticed her silence and remarked, ‘Do you not want to go?’

This was not easily answered. She wanted to see her aunt but she did not wish to leave Mahendra. Asha said, ‘I will go with you, when you have a break from college.’

Mahendra: I cannot go even if I get a break; I will need to prepare for the examinations.

Asha: Then let it be, I won’t go now.

Mahendra: Why? You wanted to go and so you should.

Asha: No, I have no wish to go.

Mahendra: You wanted to go so much just the other day, what happened to that?

Asha remained silent and cast her eyes down at this. Mahendra had been growing very anxious to have Binodini to himself for an uninterrupted length of time in order to mend his bonds with her. He became angry with Asha when she did not say anything and said rather unreasonably, ‘Are you suspecting me of anything? Is that why you wish to keep an eye on me at all times?’

Asha’s natural gentleness and patience suddenly felt completely unbearable in Mahendra’s eyes. He said to himself, ‘If you want to go to your aunt say that you must go, send me any way – but I cannot bear this agreeing at times and refusing at others; this silence is incomprehensible!’

Asha became frightened and amazed at Mahendra’s unexpected rudeness. She could not answer his questions or understand why he could be so loving at times and so cruel on occasion. The less she understood him the more her apprehensive heart filled with fear and love for Mahendra and tried to cling to him.
‘She wants to keep him under watch because she suspects him! Was that a cruel jest or heartless suspicion? Was she to pledge her protest or laugh it away as a fancy?’

Mahendra left the place quickly when he saw Asha’s confusion and silence. No one got to hear of the storybook hero’s trials or of his heroine’s tears. The sunset faded into the night, the pleasant spring breezes disappeared as the terrace grew cold and Asha lay on on her mat alone.

When she went to their bedroom much later that night, she found Mahendra had fallen asleep without calling her to bed. She immediately supposed that he was judging her for her callous attitude towards her loving aunt. She held her face to his feet and lay there till he was overcome with pity and tried to raise her. She would not be moved and said, ‘If I have done anything wrong, forgive me.’

Mahendra said tenderly, ‘You have not done anything wrong, Chuni. I am entirely heartless and have given you pain without reason.’

Asha’s tears continued to fall on his feet. He sat up and took her in his arms and made her lie down beside him. When her tears lessened, she said, ‘Do I not want to see my aunt? But I do not wish to leave you and go. That is the only reason I refused, do not be angry with me.’

Mahendra dried her wet cheeks gently and said, ‘Is this something to get angry over? Why should I be angry because you do not wish to go without me? You do not have to go anywhere!’

Asha said, ‘No, I will go to Kashi.’

Mahendra: Why?

Asha: When you have admitted that I am not staying because I cannot trust you, I must go for a few days at least.
Mahendra: I am the one who sinned, and you are the one that has to seek salvation?

Asha: I do not know about that – but I must have sinned somehow, else why do I have to hear such talk. Why do I have to listen to things that are beyond my wildest dreams.

Mahendra: That is because you cannot dream of how bad I can be.

‘Again? Do not say that! This time I am most definitely going to Kashi,’ Asha said quickly.

Mahendra laughed and answered, ‘Fine, go then! But what will happen if something befalls me in your absence, what then?’

Asha said, ‘You do not have to try and frighten me, am I that worried about it!’

Mahendra: But you need to think about it. If your husband is distracted by someone else through lack of supervision, who will you blame?

Asha: I will never blame you, you do not need to worry about that.

Mahendra: Will you admit your fault then?

Asha: A hundred times!

Mahendra: I will then go and speak to your uncle tomorrow about this and finalise your arrangements for the journey.
He then turned to the other side saying, ‘It is very late.’

After a short while, he suddenly turned to Asha again and said, ‘Chuni, it is perhaps best if you did not go.’

Pained, Asha said, ‘Why are you stopping me again? If I do not go now, the words you once rebuked me with will remain with me forever. Send me even if it is only for a couple of days.’

Mahendra answered, ‘Alright,’and then turned to his side.

The day before she left for Kashi, Asha wrapped her arms around Binodini’s neck and said, ‘Dear Bali, touch my skin and tell me the truth about one thing.’

Binodini pinched Asha’s cheek and said, ‘What must I tell you? Do you think I will not heed a request from you?’
Asha: Who knows why, but you have changed. You never seem to want to be here when my husband is around.

Binodini: Do you not know why I don’t want that? Did you not hear what Mahendra said to Bihari that day? Is it right that I should continue behaving with the freedom that I once enjoyed after these words have been uttered? Why don’t you tell me, Bali?

Asha knew that it was not right. She too had recently begun to comprehend how shameful those words had been. Despite that, she said, ‘People say so many things, if you cannot bear them then where is the love you professed? You must forget all that was said.’

Binodini: Alright, I will forget everything.

Asha: I am leaving for Kashi tomorrow sister; you must take special care to ensure that my husband is not inconvenienced. You will not avoid him as you have been doing lately.

Binodini remained silent. Asha grabbed her hand and pleaded, ‘Please Bali, you must give me your word!’

Binodini said, ‘Certainly.’

চোখের বালি ২৩/ Chokher Bali 23

২৩

সংসারত্যাগিনী অন্নপূর্ণা বহুদিন পরে হঠাৎ মহেন্দ্রকে আসিতে দেখিয়া যেমন স্নেহে আনন্দে আপ্লুত হইয়া গেলেন, তেমনি তাঁহার হঠাৎ ভয় হইল, বুঝি আশাকে লইয়া মার সঙ্গে মহেন্দ্রের আবার কোনো বিরোধ ঘটিয়াছে এবং মহেন্দ্র তাঁহার কাছে নালিশ জানাইয়া সান্ত্বনালাভ করিতে আসিয়াছে। মহেন্দ্র শিশুকাল হইতেই সকলপ্রকার সংকট ও সন্তাপের সময় তাহার কাকীর কাছে ছুটিয়া আসে। কাহারো উপর রাগ করিলে অন্নপূর্ণা তাহার রাগ থামাইয়া দিয়াছেন, দুঃখবোধ করিলে তাহা সহজে সহ্য করিতে উপদেশ দিয়াছেন। কিন্তু বিবাহের পর হইতে মহেন্দ্রের জীবনে সর্বাপেক্ষা যে সংকটের কারণ ঘটিয়াছে, তাহার প্রতিকারচেষ্টা দূরে থাক্‌, কোনোপ্রকার সান্ত্বনা পর্যন্ত তিনি দিতে অক্ষম। সে সম্বন্ধে যেভাবে যেমন করিয়াই তিনি হস্তক্ষেপ করিবেন,তাহাতেই মহেন্দ্রের সাংসারিক বিপ্লব আরো দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিবে ইহাই যখন নিশ্চয় বুঝিলেন, তখনই তিনি সংসার ত্যাগ করিলেন। রুগ্‌ণ শিশু যখন জল চাহিয়া কাঁদে, এবং জল দেওয়া যখন কবিরাজের নিতান্ত নিষেধ, তখন পীড়িতচিত্তে মা যেমন অন্য ঘরে চলিয়া যান, অন্নপূর্ণা তেমনি করিয়া নিজেকে প্রবাসে লইয়া গেছেন। দূর তীর্থবাসে থাকিয়া ধর্মকর্মের নিয়মিত অনুষ্ঠানে এ কয়দিন সংসার অনেকটা ভুলিয়াছিলেন, মহেন্দ্র আবার কি সেই-সকল বিরোধের কথা তুলিয়া তাঁহার প্রচ্ছন্ন ক্ষতে আঘাত করিতে আসিয়াছে।

কিন্তু মহেন্দ্র আশাকে লইয়া তাহার মার সম্বন্ধে কোনো নালিশের কথা তুলিল না। তখন অন্নপূর্ণার আশঙ্কা অন্য পথে গেল। যে মহেন্দ্র আশাকে ছাড়িয়া কালেজে যাইতে পারিত না, সে আজ কাকীর খোঁজ লইতে কাশী আসে কেন। তবে কি আশার প্রতি মহেন্দ্রর টান ক্রমে ঢিলা হইয়া আসিতেছে। মহেন্দ্রকে তিনি কিছু আশঙ্কার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, “হাঁ রে মহিন, আমার মাথা খা, ঠিক করিয়া বল্‌ দেখি, চুনি কেমন আছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে তো বেশ ভালো আছে কাকীমা।”

“আজকাল সে কী করে, মহিন। তোরা কি এখনো তেমনি ছেলেমানুষ আছিস, না কাজকর্মে ঘরকন্নায় মন দিয়াছিস?”

মহেন্দ্র কহিল, “ছেলেমানুষি একেবারেই বন্ধ। সকল ঝঞ্ঝাটের মূল সেই চারুপাঠখানা যে কোথায় অদৃশ্য হইয়াছে, তাহার আর সন্ধান পাইবার জো নাই। তুমি থাকিলে দেখিয়া খুশি হইতে– লেখাপড়া শেখায় অবহেলা করা স্ত্রীলোকের পক্ষে যতদূর কর্তব্য, চুনি তাহা একান্ত মনে পালন করিতেছে।”

“মহিন, বিহারী কী করিতেছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “নিজের কাজ ছাড়া আর-সমস্তই করিতেছে। নায়েব-গোমস্তায় তাহার বিষয়সম্পত্তি দেখে; কী চক্ষে দেখে, তাহা ঠিক বলিতে পারি না। বিহারীর চিরকাল ঐ দশা। তাহার নিজের কাজ পরে দেখে, পরের কাজ সে নিজে দেখে।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি বিবাহ করিবে না, মহিন।”

মহেন্দ্র একটুখানি হাসিয়া কহিল, “কই, কিছুমাত্র উদ্‌যোগ তো দেখি না।”

শুনিয়া অন্নপূর্ণা হৃদয়ের গোপন স্থানে একটা আঘাত পাইলেন। তিনি নিশ্চয় বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাঁহার বোনঝিকে দেখিয়া, একবার বিহারী আগ্রহের সহিত বিবাহ করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহার সেই উন্মুখ আগ্রহ অন্যায় করিয়া অকস্মাৎ দলিত হইয়াছে। বিহারী বলিয়াছিল, “কাকীমা, আমাকে আর বিবাহ করিতে কখনো অনুরোধ করিয়ো না।” সেই বড়ো অভিমানের কথা অন্নপূর্ণার কানে বাজিতেছিল। তাঁহার একান্ত অনুগত সেই স্নেহের বিহারীকে তিনি এমন মনভাঙা অবস্থায় ফেলিয়া আসিয়াছিলেন, তাহাকে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারেন নাই। অন্নপূর্ণা অত্যন্ত বিমর্ষ ও ভীত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, “এখনো কি আশায় প্রতি বিহারীর মন পড়িয়া আছে।’

মহেন্দ্র কখনো ঠাট্টার ছলে, কখনো গম্ভীরভাবে, তাহাদের ঘরকন্নার আধুনিক সমস্ত খবর-বার্তা জানাইল, বিনোদিনীর কথার উল্লেখমাত্র করিল না।

এখন কালেজ খোলা, কাশীতে মহেন্দ্রের বেশি দিন থাকিবার কথা নয়। কিন্তু কঠিন রোগের পর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার মধ্যে গিয়া আরোগ্যলাভের যে সুখ, মহেন্দ্র কাশীতে অন্নপূর্ণার নিকটে থাকিয়া প্রতিদিন সেই সুখ অনুভব করিতেছিল– তাই একে একে দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল। নিজের সঙ্গে নিজের যে একটা বিরোধ জন্মিবার উপক্রম হইয়াছিল, সেটা দেখিতে দেখিতে দূর হইয়া গেল। কয়দিন সর্বদা ধর্মপরায়ণা অন্নপূর্ণার স্নেহমুখচ্ছবির সম্মুখে থাকিয়া, সংসারের কর্তব্যপালন এমনি সহজ ও সুখকর মনে হইতে লাগিল যে, তাহার পূর্বেকার আতঙ্ক হাস্যকর বোধ হইল। মনে হইল, বিনোদিনী কিছুই না। এমন কি, তাহার মুখের চেহারাই মহেন্দ্র স্পষ্ট করিয়া মনে আনিতে পারে না। অবশেষে মহেন্দ্র খুব জোর করিয়াই মনে মনে কহিল, “আশাকে আমার হৃদয় হইতে এক চুল সরাইয়া বসিতে পারে, এমন তো আমি কোথাও কাহাকেও দেখিতে পাই না।’

মহেন্দ্র অন্নপূর্ণাকে কহিল, “কাকীমা, আমার কালেজ কামাই যাইতেছে– এবারকার মতো তবে আসি। যদিও তুমি সংসারের মায়া কাটাইয়া একান্তে আসিয়া আছ– তবু অনুমতি করো মাঝে মাঝে আসিয়া তোমার পায়ের ধূলা লইয়া যাইব।”

মহেন্দ্র গৃহে ফিরিয়া আসিয়া যখন আশাকে তাহার মাসির স্নেহোপহার সিঁদুরের কৌটা ও একটি সাদা পাথরের চুমকি ঘটি দিল, তখন তাহার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাসিমার সেই পরমস্নেহময় ধৈর্য ও মাসিমার প্রতি তাহাদের ও তাহার শাশুড়ির নানাপ্রকার উপদ্রব স্মরণ করিয়া তাহার হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠিল। স্বামীকে জানাইল, “আমার বড়ো ইচ্ছা করে, আমি একবার মাসিমার কাছে গিয়া তাঁহার ক্ষমা ও পায়ের ধূলা লইয়া আসি। সে কি কোনোমতেই ঘটিতে পারে না।”

মহেন্দ্র আশার বেদনা বুঝিল, এবং কিছুদিনের জন্য কাশীতে সে তাহার মাসিমার কাছে যায়, ইহাতে তাহার সম্মতিও হইল। কিন্তু পুনর্বার কালেজ কামাই করিয়া আশাকে কাশী পৌঁছাইয়া দিতে তাহার দ্বিধা বোধ হইতে লাগিল।

আশা কহিল, “জেঠাইমা তো অল্পদিনের মধ্যেই কাশী যাইবেন, সেই সঙ্গে গেলে কি ক্ষতি আছে।”

মহেন্দ্র রাজলক্ষ্মীকে গিয়া কহিল, “মা, বউ একবার কাশীতে কাকীমাকে দেখিতে যাইতে চায়।”

রাজলক্ষ্মী শ্লেষবাক্যে কহিলেন, “বউ যাইতে চান তো অবশ্যই যাইবেন, যাও, তাঁহাকে লইয়া যাও।”

মহেন্দ্র যে আবার অন্নপূর্ণার কাছে যাতায়াত আরম্ভ করিল, ইহা রাজলক্ষ্মীর ভালো লাগে নাই। বধূর যাইবার প্রস্তাবে তিনি মনে মনে আরো বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।

মহেন্দ্র কহিল, “আমার কালেজ আছে, আমি রাখিতে যাইতে পারিব না। তাহার জেঠামশায়ের সঙ্গে যাইবে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে তো ভালো কথা। জেঠামশায়রা বড়োলোক, কখনো আমাদের মতো গরিবের ছায়া মাড়ান না, তাঁহাদের সঙ্গে যাইতে পারিলে কত গৌরব!”

মাতার উত্তরোত্তর শ্লেষবাক্যে মহেন্দ্রের মন একেবারে কঠিন হইয়া বাঁকিল। সে কোনো উত্তর না দিয়া আশাকে কাশী পাঠাইতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া চলিয়া গেল।

বিহারী যখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা করিতে আসিল, রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও বিহারী, শুনিয়াছিস, আমাদের বউমা যে কাশী যাইতে ইচ্ছা করিয়াছেন।”

বিহারী কহিল, “বল কী মা, মহিনদা আবার কালেজ কামাই করিয়া কাশী যাইবে?”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “না না, মহিন কেন যাইবেন। তা হইলে আর বিবিয়ানা হইল কই। মহিন এখানে থাকিবেন, বউ তাঁহার জেঠামহারাজের সঙ্গে কাশী যাইবেন। সবাই সাহেব-বিবি হইয়া উঠিল।”

বিহারী মনে মনে উদ্‌বিগ্ন হইল, বর্তমান কালের সাহেবিয়ানা স্মরণ করিয়া নহে। বিহারী ভাবিতে লাগিল, “ব্যাপারখানা কী। মহেন্দ্র যখন কাশী গেল আশা এখানে রহিল; আবার মহেন্দ্র যখন ফিরিল তখন আশা কাশী যাইতে চাহিতেছে। দুজনের মাঝখানে একটা কী গুরুতর ব্যাপার ঘটিয়াছে। এমন করিয়া কতদিন চলিবে? বন্ধু হইয়াও আমরা ইহার কোনো প্রতিকার করিতে পারিবে না– দূরে দাঁড়াইয়া থাকিব?’

মাতার ব্যবহারে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হইয়া মহেন্দ্র তাহার শয়নঘরে আসিয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী ইতিমধ্যে মহেন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নাই– তাই আশা তাহাকে পাশের ঘর হইতে মহেন্দ্রের কাছে লইয়া আসিবার জন্য অনুরোধ করিতেছিল।

এমন সময় বিহারী আসিয়া মহেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করিল, “আশা-বোঠানের কি কাশী যাওয়া স্থির হইয়াছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “না হইবে কেন। বাধাটা কী আছে।”

বিহারী কহিল, “বাধার কথা কে বলিতেছে। কিন্তু হঠাৎ এ খেয়াল তোমাদের মাথায় আসিল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “মাসিকে দেখিবার ইচ্ছা– প্রবাসী আত্মীয়ের জন্য ব্যাকুলতা, মানবচরিত্রে এমন মাঝে মাঝে ঘটিয়া থাকে।”

বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি সঙ্গে যাইতেছ?”

প্রশ্ন শুনিয়াই মহেন্দ্র ভাবিল, “জেঠার সঙ্গে আশাকে পাঠানো সংগত নহে, এই কথা লইয়া আলোচনা করিতে বিহারী আসিয়াছে।’ পাছে অধিক কথা বলিতে গেলে ক্রোধ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে, তাই সংক্ষেপে বলিল, “না।”

বিহারী মহেন্দ্রকে চিনিত। সে যে রাগিয়াছে, তাহা বিহারীর আগোচর ছিল না। একবার জিদ ধরিলে তাহাকে টলানো যায় না, তাহাও সে জানিত। তাই মহেন্দ্রের যাওয়ার কথা আর তুলিল না। মনে মনে ভাবিল, “বেচারা আশা যদি কোনো বেদনা বহন করিয়াই চলিয়া যাইতেছে হয়, তবে সঙ্গে বিনোদিনী গেলে তাহার সান্ত্বনা হইবে।’ তাই ধীরে ধীরে কহিল, “বিনোদ-বোঠান তাঁর সঙ্গে গেলে হয় না?”

মহেন্দ্র গর্জন করিয়া উঠিল, “বিহারী, তোমার মনের ভিতর যে-কথাটা আছে, তাহা স্পষ্ট করিয়া বলো। আমার সঙ্গে অসরলতা করিবার কোনো দরকার দেখি না। আমি জানি, তুমি মনে মনে সন্দেহ করিয়াছ, আমি বিনোদিনীকে ভালোবাসি। মিথ্যা কথা। আমি বাসি না। আমাকে রক্ষা করিবার জন্য তোমাকে পাহারা দিয়া বেড়াইতে হইবে না। তুমি এখন নিজেকে রক্ষা করো। যদি সরল বন্ধুত্ব তোমার মনে থাকিত, তবে বহুদিন আগে তুমি আমার কাছে তোমার মনের কথা বলিতে এবং নিজেকে বন্ধুর অন্তঃপুর হইতে বহু দূরে লইয়া যাইতে। আমি তোমার মুখের সামনে স্পষ্ট করিয়া বলিতেছি, তুমি আশাকে ভালোবাসিয়াছ।”

অত্যন্ত বেদনার স্থানে দুই পা দিয়া মাড়াইয়া দিলে, আহত ব্যক্তি মুহূর্তকাল বিচার না করিয়া আঘাতকারীকে যেমন সবলে ধাক্কা দিয়া ফেলিতে চেষ্টা করে–রুদ্ধকণ্ঠ বিহারী তেমনি পাংশুমুখে তাহার চৌকি হইতে উঠিয়া মহেন্দ্রের দিকে ধাবিত হইল–হঠাৎ থামিয়া বহুকষ্টে স্বর বাহির করিয়া কহিল, “ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করুন, আমি বিদায় হই।” বলিয়া টলিতে টলিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল!

পাশের ঘর হইতে বিনোদিনী ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, “বিহারী-ঠাকুরপো!”

বিহারী দেয়ালে ভর করিয়া একটুখানি হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “কী, বিনোদ-বোঠান!”

বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, চোখের বালির সঙ্গে আমিও কাশীতে যাইব।”

বিহারী কহিল, “না না, বোঠান, সে হইবে না, সে কিছুতেই হইবে না। তোমাকে মিনতি করিতেছি–আমার কথায় কিছুই করিয়ো না। আমি এখানকার কেহ নই, আমি এখানকার কিছুতেই হস্তক্ষেপ করিতে চাহি না, তাহাতে ভালো হইবে না। তুমি দেবী, তুমি যাহা ভালো বোধ কর, তাহাই করিয়ো। আমি চলিলাম।”

বলিয়া বিহারী বিনোদিনীকে বিনম্র নমস্কার করিয়া চলিল। বিনোদিনী কহিল, “আমি দেবী নই ঠাকুরপো, শুনিয়া যাও। তুমি চলিয়া গেলে কাহারো ভালো হইবে না। ইহার পরে আমাকে দোষ দিয়ো না।”

বিহারী চলিয়া গেল। মহেন্দ্র স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী তাহার প্রতি জ্বলন্ত বজ্রের মতো একটা কঠোর কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল, সে-ঘরে আশা একান্ত লজ্জায় সংকোচে মরিয়া যাইতেছিল। বিহারী তাহাকে ভালোবাসে, এ কথা মহেন্দ্রের মুখে শুনিয়া সে আর মুখ তুলিতে পারিতেছিল না। কিন্তু তাহার উপর বিনোদিনীর আর দয়া হইল না। আশা যদি তখন চোখ তুলিয়া চাহিত, তাহা হইলে সে ভয় পাইত। সমস্ত সংসারের উপর বিনোদিনীর যেন খুন চাপিয়া গেছে। মিথ্যা কথা বটে! বিনোদিনীকে কেহই ভালোবাসে না বটে! সকলেই ভালোবাসে এই লজ্জাবতী ননির পুতুলটিকে।

মহেন্দ্র সেই যে আবেগের মুখে বিহারীকে বলিয়াছিল, “আমি পাষণ্ড”–তাহার পর আবেগ শান্তির পর হইতে সেই হঠাৎ আত্মপ্রকাশের জন্য সে বিহারীর কাছে কুণ্ঠিত হইয়া ছিল। সে মনে করিতেছিল, তাহার সব কথাই যেন ব্যক্ত হইয়া গেছে। সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না, অথচ বিহারী জানিয়াছে যে সে ভালোবাসে–ইহাতে বিহারীর উপরে তাহার বড়ো একটা বিরক্তি জন্মিতেছিল। বিশেষত, তাহার পর হইতে যতবার বিহারী তাহার সম্মুখে আসিতেছিল তাহার মনে হইতেছিল, যেন বিহারী সকৌতূহলে তাহার একটা ভিতরকার কথা খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। সেই-সমস্ত বিরক্তি উত্তরোত্তর জমিতেছিল– আজ একটু আঘাতেই বাহির হইয়া পড়িল।

কিন্তু বিনোদিনী পাশের ঘর হইতে যেরূপ ব্যাকুলভাবে ছুটিয়া আসিল, যেরূপ আর্তকণ্ঠে বিহারীকে রাখিতে চেষ্টা করিল এবং বিহারীর আদেশ পালন স্বরূপে আশার সহিত কাশী যাইতে প্রস্তুত হইল, ইহা মহেন্দ্রের পক্ষে অভাবিতপূর্ব। এই দৃশ্যটি মহেন্দ্রকে প্রবল আঘাতে অভিভূত করিয়া দিল। সে বলিয়াছিল, সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না; কিন্তু যাহা শুনিল, যাহা দেখিল, তাহা তাহাকে সুস্থির হইতে দিল না, তাহাকে চারি দিক হইতে বিচিত্র আকারে পীড়ন করিতে লাগিল। আর কেবলই নিষ্ফল পরিতাপের সহিত মনে হইতে লাগিল, “বিনোদিনী শুনিয়াছে– আমি বলিয়াছি “আমি তাহাকে ভালোবাসি না’।’

punampntg

23

Although Annapurna had forsaken all ties to her home, she was overcome by her love for Mahendra and her happiness at seeing him after such a long time. She was also worried that he had come seeking support from her after quarrelling with his own mother over Asha. Since his childhood he had been in the habit of coming to his aunt whenever he was in strife or distressed. She had soothed his anger when he was upset with others and had taught him to put his pain aside when he was hurt by someone.

But the main reason behind the turmoil that affected Mahendra’s married life was something that she could not help with as she was indeed unable to provide any consolation. She had left home when it became clear to her that whatever her involvement in the matter, it would only serve to double the upheaval within the family. When a sick child cries for some water but the physician issues a strict order against it, the saddened mother must leave the room; Annapurna had gone away for much the same reason. She had largely managed to forget her old life by losing herself in the daily routine of prayers and religious activities and was worried that Mahendra had returned to talk of the conflict and reopen old wounds.

But Mahendra said nothing of his mother’s behavior with Asha. Annapurna then started to worry about something else. The man who had once been unable to attend classes as it would have meant leaving Asha alone was now in Kashi on his own to enquire after his aunt. Did this mean that his affection for Asha was lessening? She asked him with some trepidation. ‘Mahin, do tell me the truth, please! How is Chuni?’

Mahendra said, ‘She is fine Aunt.’

‘What does she do these days? Are you two still as immature as before, or have you started paying attention to the demands of daily life?’

Mahendra answered, ‘All childishness has been put aside. We cannot even find the old Charupath text that was at the root of all the problems. You will be pleased to know that Chuni devotes all her attention to neglecting her studies as wholeheartedly as any woman has ever done.’

‘What is Bihari doing?’

‘He is involved in everything but his own work; His employees look after his affairs but the nature of their vigilance is questionable. He has always been like that. He attends to the business of others while others attend to his affairs.’

Annapurna asked, ‘Does he not wish to get married?’

Mahendra smiled slightly and said, ‘I cannot say there are any signs of that.’

Annapurna was saddened to hear this. She understood that Bihari had once been eager about marriage after seeing her niece Asha but that wish had been thwarted wrongfully and abruptly. He had said to her, ‘Aunt, never ask me to marry someone again.’ She remembered his great pain. Although she loved Bihari she had left without providing him any solace during his disappointment over Asha. Annapurna became very unhappy and worried as she wondered whether Bihari was still in love with Asha.

Mahendra gradually divulged the details of his life with Asha in Kolkata, sometimes jokingly and at other times in all seriousness. He never mentioned Binodini.

His classes had begun and he should have not been able to stay in Kashi for very long. But after each day with Annapurna, he felt the pleasure that one feels after moving to a pleasant locale after suffering from severe illness. The days passed quickly. The inner conflict that he had once suffered was now gone. After spending all his time over a few days with the pious, gentle Annapurna he felt that the responsibilities of family life were so easy and pleasant that his former fears seemed laughable. He began to think of Binodini as unimportant. He could not even remember her face clearly when he tried. Eventually he told himself with complete convicton, ‘I do not think that it would be possible for anyone to dethrone Asha from where she rules within my heart.’

Mahendra said to Annapurna, ‘Aunt, I will have to leave Kashi soon as I am missing classes. But even though you have left family life behind, please give me permission to come and see you occasionally.’

When Mahendra came home and gave Asha the vermilion container and white stone pitcher her aunt had sent for her as gifts, she began to weep. Her heart was pained by memories of her aunt’s loving patience and the misbehavior meted out to her both by the two of them and by her mother-in-law. She asked her husband, ‘I really wish I could go and ask her for her forgiveness. Is that possible at all?’

Mahendra understood her pain and agreed to her visiting her aunt for a few days in Kashi. But he was not keen about missing classes again by accompanying her.

Asha asked, ‘My aunt is going to Kashi soon, what harm in going with her?’

Mahendra went to Rajlakshmi and said, ‘Ma, my wife wishes to go and see her aunt in Kashi.’

Rajlakshmi answered sarcastically, ‘If she has wished this, then of course she must go; do take her.’

She was not pleased that Mahendra had started seeing his aunt Annapurna again. She became even more annoyed when she heard that her daughter-in-law was thinking of visiting the aunt as well.

Mahendra said, ‘I have classes and will not be able to take her. She will have to go with her uncle.’

Rajlakshmi answered, ‘That is great. They are wealthy enough to never condescend to visiting us, so going with them will be a great honour indeed.’

Mahendra’s resolve was hardened by the sharp words from his mother. He said no more and determined to send Asha to Kashi as he left Rajlakshmi’s presence.

When Bihari came to see Rajlakshmi, she said, ‘Have you heard, our daughter-in-law has expressed a desire to go to Kashi?’

Bihari replied, ‘What! Is Mahendra going to take time off classes again to take her there?’

Rajlakshmi answered, ‘No, why should Mahen go? That would not be outrageous enough, would it? He will stay here and she will go with her uncle the Great. Everyone has become so modern these days.’

Bihari became concerned, although not because of the incursions of modernity. He thought, ‘What is going on? Asha stayed here while Mahendra took off for Kashi; now that he is back, she wants to go there. Something seriously wrong has happened between the two of them. How long can this go on for? As a friend am I supposed to stand by doing nothing and just watch from afar?’

Mahendra was sitting in his bedroom feeling extremely upset with his mother. Binodini had not seen him after his arrival and Asha was next door trying to convince her to join the two of them.

Bihari came in and said, ‘Is it certain that your wife is going to Kashi?’

Mahendra asked, ‘Why not? What is stopping her?’

Bihari said, ‘I did not say anyone was stopping her from going. But why now?’

Mahendra answered, ‘She wishes to see her aunt – people do sometimes feel that they would be happy to see relatives living elsewhere.’

Bihari persisted, ‘Are you going with her?’

As soon as Mahendra heard the question he thought, ‘Bihari is here to convince me that Asha should not be sent to Kashi with her uncle.’ He wished to prevent a prolonged discussion and simply said, ‘No.’

Bihari knew Mahendra well. He realised that Mahendra was angry and that it was impossible to change his mind once he had decided on doing something. He did not raise the topic of Mahendra accompanying Asha. He thought to himself, ‘If the wretched Asha is going with a sad heart, Binodini could accompany her as a consolation.’ He then said softly, ‘Would it be possible for Binodini to go with her?’

Mahendra shouted, ‘Bihari, you have to disclose what is in your mind. I see no reason for you to tell me lies. I know that you suspect me of loving Binodini. That is not true! I do not love her. You do not have to be with me constantly in order to protect me. You should save yourself. If you had genuine feelings of friendship for me you could have told me the truth a long time ago and done the honourable thing by removing yourself from our household. I am telling you what you cannot bring yourself to utter, you have fallen in love with Asha.’

Just as a person with an injury does not think for a moment before pushing away someone trying to hurt them, dumbstruck, Bihari quickly rose, moved towards Mahendra as if to strike him; and then came to his senses, saying, ‘May god forgive you, I am leaving now.’ He then walked unsteadily out of the room.

Binodini hurriedly came from next door and called, ‘Bihari!’

Bihari leaned against the wall and smiled wanly, saying, ‘What?’

Binodini said, ‘Brother, I will go to Kashi too with Bali.’

Bihari said, ‘No, sister, that cannot be! I am pleading with you – do not listen to anything I say. I am no one to these people; I do not wish to interfere in any of their business. That can only end in unhappiness. You are a goddess; do whatever you think is right. I am leaving.’

As Bihari folded his hands in a gentle greeting to Binodini and prepared to leave, she said, ‘Listen brother, I am no goddess. If you leave it will not bode well for anyone. Do not blame me for anything after this.’

Bihari went away. Mahendra sat in stunned silence. Binodini looked at him furiously, her eyes flashing like lightning before going next door where Asha was cringing in shame and despair. She could not look at Mahendra after hearing him say that Bihari loved her. But Binodini did not feel the slightest compassion for her. If Asha had looked up at Binodini she would have been frightened as Binodini looked ready to murder someone. Lies indeed! No one loved Binodini! They all loved this shy timid doll-like creature.

Now that he was calmer, Mahendra was mortified that he had bared his soul to Bihari in an emotional outburst when he prided himself on being made of stone. He felt that all his thoughts had been disclosed with that one action. He did not love Binodini and yet the fact that Bihari knew that he did made him dislike Bihari greatly. In particular ,every time the two had met since that day Mahendra felt as though Bihari had been amusing himself by trying to discover his innermost secrets. These aggravations had been accumulating and erupted today with very slight provocation.

But the manner in which Binodini came rushing anxiously from the other room, the pleas with which she tried to prevent Bihari from leaving and her agreement to Bihari’s order to accompany Asha to Kashi astonished Mahendra as he had not anticipated this. He was very affected when he thought of how he had declared that he did not love her; but what he saw and heard made him restless and bothered him with a hundred unexplained thoughts. All he could think of with a sense of hopelessness was, ‘Binodini has heard me say…I do not love her.’

Chokher Bali 22, Part 2/চোখের বালি ২২ দ্বিতীয় ভাগ

বিনোদিনী তিন বার স্বীকার করিল। আশা কহিল, “ভাই চোখের বালি, সেই যদি রহিলেই তবে এত করিয়া সাধাইলে কেন। শেষকালে আমার স্বামীর কাছে তো হার মানিতে হইল।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরপো, আমি হার মানিয়াছি, না তোমাকে হার মানাইয়াছি?”

মহেন্দ্র এতক্ষণ স্তম্ভিত হইয়া ছিল; মনে হইতেছিল, তাহার অপরাধে যেন সমস্ত ঘর ভরিয়া রহিয়াছে, লাঞ্ছনা যেন তাহার সর্বাঙ্গ পরিবেষ্টন করিয়া। আশার সঙ্গে কেমন করিয়া সে প্রসন্নমুখে স্বাভাবিকভাবে কথা কহিবে। এক মুহূর্তের মধ্যে কেমন করিয়া সে আপনার বীভৎস অসংযমকে সহাস্য চটুলতায় পরিণত করিবে। এই পৈশাচিক ইন্দ্রজাল তাহার আয়ত্তের বহির্ভূত ছিল। সে গম্ভীরমুখে কহিল, “আমারই তো হার হইয়াছে।” বলিয়াই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

অনতিকাল পরেই আবার মহেন্দ্র ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বিনোদিনীকে কহিল, “আমাকে মাপ করো।”

বিনোদিনী কহিল, “অপরাধ কী করিয়াছ, ঠাকুরপো।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমাকে জোর করিয়া এখানে ধরিয়া রাখিবার অধিকার আমাদের নাই।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “জোর কই করিলে, তাহা তো দেখিলাম না। ভালোবাসিয়া ভালো মুখেই তো থাকিতে বলিলে। তাহাকে কি জোর বলে। বলো তো ভাই, চোখের বালি, গায়ের জোর আর ভালোবাসা কি একই হইল।”

আশা তাহার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হইয়া কহিল, “কখনোই না।”

বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার ইচ্ছা আমি থাকি, আমি গেলে তোমার কষ্ট হইবে, সে তো আমার সৌভাগ্য। কী বল ভাই চোখের বালি, সংসারে এমন সুহৃদ কয় জন পাওয়া যায়। তেমন ব্যথার ব্যথী, সুখের সুখী, অদৃষ্টগুণে যদিই পাওয়া যায়, তবে আমিই বা তাহাকে ছাড়িয়া যাইবার জন্য ব্যস্ত হইব কেন।”

আশা তাহার স্বামীকে অপদস্থভাবে নিরুত্তর থাকিতে দেখিয়া ঈষৎ ব্যথিতচিত্তে কহিল, “তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে ভাই। আমার স্বামী তো হার মানিয়াছেন, এখন তুমি একটু থামো।”

মহেন্দ্র আবার দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইল। তখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করিয়া বিহারী মহেন্দ্রের সন্ধানে আসিতেছিল। মহেন্দ্র তাহাকে দ্বারের সম্মুখে দেখিতে পাইয়াই বলিয়া উঠিল, “ভাই বিহারী, আমার মতো পাষণ্ড আর জগতে নাই।” এমন বেগে কহিল, সে কথা ঘরের মধ্যে গিয়া পৌঁছিল।

ঘরের মধ্য হইতে তৎক্ষণাৎ আহ্বান আসিল, “বিহারী-ঠাকুরপো।”

বিহারী কহিল, “একটু বাদে আসছি, বিনোদ-বোঠান।”

বিনোদিনী কহিল, “একবার শুনেই যাও না।”

বিহারী ঘরে ঢুকিয়াই মুহূর্তের মধ্যে একবার আশার দিকে চাহিল– ঘোমটার মধ্য হইতে আশার মুখ যতটুকু দেখিতে পাইল, সেখানে বিষাদ বা বেদনার কোনো চিহ্নই তো দেখা গেল না। আশা উঠিয়া যাইবার চেষ্টা করিল, বিনোদিনী তাহাকে জোর করিয়া ধরিয়া রাখিল– কহিল, “আচ্ছা, বিহারী-ঠাকুরপো, আমার চোখের বালির সঙ্গে কি তোমার সতিন-সম্পর্ক। তোমাকে দেখলেই ও পালাতে চায় কেন।”

আশা অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া বিনোদিনীকে তাড়না করিল।

বিহারী হাসিয়া উত্তর করিল, “বিধাতা আমাকে তেমন সুদৃশ্য করিয়া গড়েন নাই বলিয়া।”

বিনোদিনী। দেখছিস ভাই বালি, বিহারী-ঠাকুরপো বাঁচাইয়া কথা বলিতে জানেন– তোর রুচিকে দোষ না দিয়া বিধাতাকেই দোষ দিলেন। লক্ষ্ণণটির মতোএমন সুলক্ষণ দেবর পাইয়াও তাহাকে আদর করিতে শিখিলি না– তোরই কপাল মন্দ।

বিহারী। তোমার যদি তাহাতে দয়া হয় বিনোদ-বোঠান, তবে আর আমার আক্ষেপ কিসের।

বিনোদিনী। সমুদ্র তো পড়িয়া আছে, তবু মেঘের ধারা নইলে চাতকের তৃষ্ণা মেটে না কেন।

আশাকে ধরিয়া রাখা গেল না। সে জোর করিয়া বিনোদিনীর হাত ছাড়াইয়া বাহির হইয়া গেল। বিহারীও চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেছিল। বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, মহেন্দ্রবাবুর কী হইয়াছে, বলিতে পার?”

শুনিয়াই বিহারী থমকিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল। কহিল, “তাহা তো জানি না। কিছু হইয়াছে নাকি।”

বিনোদিনী। কী জানি ঠাকুরপো, আমার তো ভালো বোধ হয় না।

বিহারী উদ্বিগ্ন মুখে চৌকির উপর বসিয়া পড়িল। কথাটা খোলসা শুনিবে বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে ব্যগ্রভাবে চাহিয়া অপেক্ষা করিয়া রহিল। বিনোদিনী কোনো কথা না বলিয়া মনোযোগ দিয়া চাদর সেলাই করিতে লাগিল।

কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়া বিহারী কহিল, “মহিনদার সম্বন্ধে তুমি কি বিশেষ কিছু লক্ষ্য করিয়াছ।”

বিনোদিনী অত্যন্ত সাধারণভাবে কহিল, “কী জানি ঠাকুরপো, আমার তো ভালো বোধ হয় না। আমার চোখের বালির জন্যে আমার কেবলই ভাবনা হয়।” বলিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সেলাই রাখিয়া উঠিয়া যাইতে উদ্যত হইল।

বিহারী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “বোঠান, একটু বোসো।” বলিয়া একটা চৌকিতে বসিল।

বিনোদিনী ঘরের সমস্ত জানালা-দরজা সম্পূর্ণ খুলিয়া দিয়া কেরোসিনের বাতি উস্কাইয়া সেলাই টানিয়া লইয়া বিছানার দূরপ্রান্তে গিয়া বসিল। কহিল, “ঠাকুরপো, আমি তো চিরদিন এখানে থাকিব না– কিন্তু আমি চলিয়া গেলে আমার চোখের বালির উপর একটু দৃষ্টি রাখিয়ো– সে যেন অসুখী না হয়।” বলিয়া যেন হৃদয়োচ্ছ্বাস সংবরণ করিয়া লইবার জন্য বিনোদিনী অন্য দিকে মুখ ফিরাইল।

বিহারী বলিয়া উঠিল, “বোঠান, তোমাকে থাকিতেই হইবে। তোমার নিজের বলিতে কেহ নাই– এই সরলা মেয়েটিকে সুখে দুঃখে রক্ষা করিবার ভার তুমি লও– তুমি তাহাকে ফেলিয়া গেলে আমি তো আর উপায় দেখি না।”

বিনোদিনী। ঠাকুরপো, তুমি তো সংসারের গতিক জান। এখানে বরাবর থাকিব কেমন করিয়া। লোকে কী বলিবে।

বিহারী। লোকে যা বলে বলুক, তুমি কান দিয়ো না। তুমি দেবী– অসহায়া বালিকাকে সংসারের নিষ্ঠুর আঘাত হইতে রক্ষা করা তোমারই উপযুক্ত কাজ। বোঠান, আমি তোমাকে প্রথমে চিনি নাই, সেজন্য আমাকে ক্ষমা করো। আমিও সংকীর্ণ-হৃদয় সাধারণ ইতরলোকদের মতো মনে মনে তোমার সম্বন্ধে অন্যায় ধারণা স্থান দিয়াছিলাম; একবার এমনও মনে হইয়াছিল, যেন আশার সুখে তুমি ঈর্ষা করিতেছ– যেন– কিন্তু সে-সব কথা মুখে উচ্চারণ করিতেও পাপ আছে। তার পরে, তোমার দেবীহৃদয়ের পরিচয় আমি পাইয়াছি– তোমার উপর আমার গভীর ভক্তি জন্মিয়াছে বলিয়াই, আজ তোমার কাছে আমার সমস্ত অপরাধ স্বীকার না করিয়া থাকিতে পারিলাম না।

বিনোদিনীর সর্বশরীর পুলকিত হইয়া উঠিল। যদিও সে ছলনা করিতেছিল, তবু বিহারীর এই ভক্তি-উপহার সে মনে মনেও মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতে পারিল না। এমন জিনিস সে কখনো কাহারো কাছ হইতে পায় নাই। ক্ষণকালের জন্য মনে হইল, সে যেন যথার্থই পবিত্র উন্নত– আশার প্রতি একটা অনির্দেশ্য দয়ায় তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। সেই অশ্রুপাত সে বিহারীর কাছে গোপন করিল না, এবং সেই অশ্রুধারা বিনোদিনীর নিজের কাছে নিজেকে পূজনীয়া বলিয়া মোহ উৎপাদন করিল।

বিহারী বিনোদিনীকে অশ্রু ফেলিতে দেখিয়া নিজের অশ্রুবেগ সংবরণ করিয়া উঠিয়া বাহিরে মহেন্দ্রের ঘরে গেল। মহেন্দ্র যে হঠাৎ নিজেকে পাষণ্ড বলিয়া কেন ঘোষণা করিল, বিহারী তাহার কোনো তাৎপর্য খুঁজিয়া পাইল না। ঘরে গিয়া দেখিল, মহেন্দ্র নাই। খবর পাইল, মহেন্দ্র বেড়াইতে বাহির হইয়াছে। পূর্বে মহেন্দ্র অকারণে কখনোই ঘর ছাড়িয়া বাহির হইত না। সুপরিচিত লোকের এবং সুপরিচিত ঘরের বাহিরে মহেন্দ্রের অত্যন্ত ক্লান্তি ও পীড়া বোধ হইত। বিহারী ভাবিতে ভাবিতে ধীরে ধীরে বাড়ি চলিয়া গেল।

বিনোদিনী আশাকে নিজের শয়নঘরে আনিয়া বুকের কাছে টানিয়া দুই চক্ষু জলে ভরিয়া কহিল, “ভাই চোখের বালি, আমি বড়ো হতভাগিনী, আমি বড়ো অলক্ষণা।”

আশা ব্যথিত হইয়া তাহাকে বাহুপাশে বেষ্টন করিয়া স্নেহার্দ্রকণ্ঠে বলিল, “কেন ভাই, অমন কথা কেন বলিতেছ।”

বিনোদিনী রোদনোচ্ছ্বসিত শিশুর মতো আশার বক্ষে মুখ রাখিয়া কহিল, “আমি যেখানে থাকিব, সেখানে কেবল মন্দই হইবে। দে ভাই, আমাকে ছাড়িয়া দে, আমি আমার জঙ্গলের মধ্যে চলিয়া যাই।”

আশা চিবুকে হাত দিয়া বিনোদিনীর মুখ তুলিয়া ধরিয়া কহিল, “লক্ষ্মীটি ভাই, অমন কথা বলিস নে–তোকে ছাড়িয়া আমি থাকিতে পারিব না– আমাকে ছাড়িয়া যাইবার কথা কেন আজ তোর মনে আসিল।”

মহেন্দ্রের দেখা না পাইয়া বিহারী কোনো একটা ছুতায় পুনর্বার বিনোদিনীর ঘরে আসিয়া মহেন্দ্র ও আশার মধ্যবর্তী আশঙ্কার কথাটা আর-একটু স্পষ্ট করিয়া শুনিবার জন্য উপস্থিত হইল।

মহেন্দ্রকে পরদিন সকালে তাহাদের বাড়ি খাইতে যাইতে বলিবার জন্য বিনোদিনীকে অনুরোধ করিবার উপলক্ষ লইয়া সে উপস্থিত হইল। “বিনোদ-বোঠান” বলিয়া ডাকিয়াই হঠাৎ কেরোসিনের উজ্জ্বল আলোকে বাহির হইতেই আলিঙ্গনবদ্ধ সাশ্রুনেত্র দুই সখীকে দেখিয়াই থমকিয়া দাঁড়াইল। আশার হঠাৎ মনে হইল, নিশ্চয়ই বিহারী তাহার চোখের বালিকে কোনো অন্যায় নিন্দা করিয়া কিছু বলিয়াছে, তাই সে আজ এমন করিয়া চলিয়া যাইবার কথা তুলিয়াছে। বিহারীবাবুর ভারি অন্যায়। উহার মন ভালো নয়। আশা বিরক্ত হইয়া বাহির হইয়া আসিল। বিহারীও বিনোদিনীর প্রতি ভক্তির মাত্রা চড়াইয়া বিগলিতহৃদয়ে দ্রুত প্রস্থান করিল।

সেদিন রাত্রে মহেন্দ্র আশাকে কহিল, “চুনি, আমি কাল সকালের প্যাসেঞ্জারেই কাশী চলিয়া যাইব।”

আশার বক্ষঃস্থল ধক্ করিয়া উঠিল-কহিল, “কেন।”

মহেন্দ্র কহিল, “কাকীমাকে অনেক দিন দেখি নাই।”

শুনিয়া আশা বড়োই লজ্জাবোধ করিল; এ কথা পূর্বেই তাহার মনে উদয় হওয়া উচিত ছিল; নিজের সুখদুঃখের আকর্ষণে স্নেহময়ী মাসিমাকে সে যে ভুলিয়াছিল, অথচ মহেন্দ্র সেই প্রবাসী-তপস্বিনীকে মনে করিয়াছে, ইহাতে নিজেকে কঠিনহৃদয়া বলিয়া বড়োই ধিক্কার জন্মিল।

মহেন্দ্র কহিল, “তিনি আমারই হাতে তাঁহার সংসারের একমাত্র স্নেহের ধনকে সমর্পণ করিয়া দিয়া চলিয়া গেছেন– তাঁহাকে একবার না দেখিয়া আমি কিছুতেই সুস্থির হইতে পারিতেছি না।”

বলিতে বলিতে মহেন্দ্রের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হইয়া আসিল; স্নেহপূর্ণ নীরব আশীর্বাদও অব্যক্ত মঙ্গলকামনার সহিত বারংবার সে আশার ললাট ও মস্তকের উপর দক্ষিণ করতল চালনা করিতে লাগিল। আশা এই অকস্মাৎ স্নেহাবেগের সম্পূর্ণ মর্ম বুঝিতে পারিল না, কেবল তাহার হৃদয় বিগলিত হইয়া অশ্রু পড়িতে লাগিল। আজই সন্ধ্যাবেলায় বিনোদিনী তাহাকে অকারণ স্নেহাতিশয্যে যে-সব কথা বলিয়াছিল, তাহা মনে পড়িল। উভয়ের মধ্যে কোথাও কোনো যোগ আছে কি না, তাহা সে কিছুই বুঝিল না। কিন্তু মনে হইল, যেন ইহা তাহার জীবনে কিসের একটা সূচনা। ভালো কি মন্দ কে জানে।

ভয়ব্যাকুলচিত্তে সে মহেন্দ্রকে বাহুপাশ বদ্ধ করিল। মহেন্দ্র তাহার সেই অকারণ আশঙ্কার আবেশ অনুভব করিতে পারিল। কহিল, “চুনি, তোমার উপর তোমার পুণ্যবতী মাসিমার আশীর্বাদ আছে, তোমার কোনো ভয় নাই, কোনো ভয় নাই। তিনি তোমারই মঙ্গলের জন্য তাঁহার সমস্ত ত্যাগ করিয়া গেছেন, তোমার কখনো কোনো অকল্যাণ হইতে পারে না।”

আশা তখন দৃঢ়চিত্তে সমস্ত ভয় দূর করিয়া ফেলিল। স্বামীর এই আশীর্বাদ অক্ষয়কবচের মতো গ্রহণ করিল। সে মনে মনে বারংবার তাহার মাসিমার পবিত্র পদধূলি মাথায় তুলিয়া লইতে লাগিল, এবং একাগ্রমনে কহিল, “মা, তোমার আশীর্বাদ আমার স্বামীকে সর্বদা রক্ষা করুক!”

পরদিনে মহেন্দ্র চলিয়া গেল, বিনোদিনীকে কিছুই বলিয়া গেল না। বিনোদিনী মনে মনে কহিল, “নিজে অন্যায় করা হইল, আবার আমার উপরে রাগ! এমন সাধু তো দেখি নাই। কিন্তু এমন সাধুত্ব বেশিদিন টেঁকে না।’

Kalighat-Paintings-04

Binodini made the three promises needed to seal the pact. Asha said, ‘Dear Bali, if you were going to stay why did you make us beg you so much? You had to bow to my husband’s requests, did you not?’

Binodini smiled and answered, ‘Sir, did I lose or did I cause you to admit defeat?’

Mahendra had been stupefied into silence all this time; he felt as though his wrongs filled the room and shame surrounded him on all sides. How was he to ever speak to Asha with any semblance of normalcy and a smile on his face? How would he transform the terrible lack of propriety he had shown into a joke that evoked laughter? The degree of evil required to carry off such pretence was beyond his scope. He said unsmilingly, ‘I am the one who lost,’ and immediately left the room.

A few moments later he came back into the room and said to Binodini, ‘Forgive me.’

Binodini said, ‘What have you done wrong?’

Mahendra answered, ‘We have no right to keep you here against your wishes.’

Binodini smiled and said, ‘I didn’t see you force me. You asked me with affection. That is hardly forcing me to stay. Tell me, dearest Bali, love is hardly the same as brute strength!’

Asha completely agreed with her and said, ‘Never!’

Binodini said, ‘Dear Sir, it is my good fortune that you wish for me to stay and that you will miss me when I leave. What do you say Bali, it is rare to find such a friend in life. If I have found such a person thanks to my good fortune, who is constant in sadness and in joy, why should I want to forsake them?’

Asha noticed her husband’s discomfiture and said, slightly pained, ‘Who can match you in verbal sparring? He has admitted defeated, now let my husband be.’

Mahendra left the room hurriedly again. Bihari was on his way to see Mahendra after talking to Rajlakshmi and as soon as Mahendra saw him in front of the doorway he exclaimed, ‘There is none as cruel as me in the world, Bihari!’ He said this so loudly that the words were clearly heard from the room.

There was an immediate call for Bihari from within. It was Binodini.

Bihari said,’I am coming in a short while, madam.’

Binodini urged, ‘It is important that you come right now.’

Bihari entered and took a quick look at Asha- the little that he could see of her face showed no traces of pain or sadness. She was about to get up to leave when Binodini held her back and asked Bihari, ‘Why is there such animosity between you and my friend Bali, as though you are both wives to the same man? She simply cannot bear being in the same room as you.’

Asha was horrified by her words and urged her to be silent.

Bihari smiled and answered, ‘Perhaps it is because I was not blessed with good looks by my maker.’

Binodini: See Bali, Bihari is very good at avoiding the real answers. Instead of blaming your taste he blamed his maker. You have such a charming brother-in-law, just like Lakshman to Ram and yet you have never learned to appreciate him – such is your misfortune.

Bihari: If you see fit to favour me Madam, why should I be sad?

Binodini: The Chataka bird sees the sea, but still craves the sweetness from the clouds. Why pray tell?

Asha would be detained no longer. She forcibly pulled away from Binodini’s grasp and left. Bihari was also about to leave when Binodini asked him, ‘What is going on with your friend Mahendra, do you know at all?’

Bihari immediately stopped and said, ‘I do not know that anything is wrong. Why do you ask?’

Binodini: I am not sure, but I do not like it at all.

Bihari sat down again with a worried look on his face. He looked eagerly at Binodini to hear what she would say. She said nothing and bent her head over her sewing.

After waiting a little while Bihari asked, ‘What have you observed about Mahendra in particular?’

Binodini answered calmly, ‘I do not like it at all. I worry so much about my dear Bali.’ She then sighed deeply and put her needlework down as if to leave.

Bihari said anxiously, ‘Madam, please sit a little while longer.’ He sat down too.

Binodini opened all the doors and windows, turned the kerosene lamp up and sat down again with her sewing at the far end of the bed. She said, ‘Look, I will not be able to stay here for eternity – but when I am gone, do keep an eye on my dear Bali, I do not wish her to be unhappy in any way.’ She seemed to be trying hard to control her emotions as she looked away.

Barely had she finished than Bihari spoke, ‘Madam, you will have to stay. You have no one of your own. Please take charge of this innocent girl – if you leave her I see no other way out.’

Binodini: Sir, you know the ways of the world. How can I stay here all the time? What will people say about that?

Bihari: Do not pay any heed to people; let them say what they want. You are a goddess – it befits you to take up the task of protecting the helpless girl from the cruel blows of life. I did not know you at first, do forgive me for that. I succumbed to narrow mindedness like the others and thought wrongly of you; to the extent that once I even thought you were jealous of Asha’s happiness and that – it is so wrong to even voice my thoughts. Since then I have had ample proof of the sanctity of your soul, I am admitting all this to you only because now I respect you so very deeply.

Binodini was thrilled to hear this. Even though she was pretending to be concerned about Asha’s wellbeing, Bihari’s respectful address was something that she could not ignore as being a lie. She had never received such recognition from anyone in her life. For a few short moments she truly did feel cleansed and pure – her eyes streaming with tears out of pity for Asha. She did not hide them from Bihari and in her own eyes the tears served to make her feel worthier of his worship than she really was.

Bihari suppressed his own tears at the sight of Binodini’s weeping and left the room to go to Mahendra. He could not understand why Mahendra had referred to himself as cruel. He found that Mahendra had gone out. In the past Mahendra had never been one to leave his house without cause. He felt very fatigued and pained when he was removed from the people and the places that he knew very well. Bihari thought about this as he walked home slowly.

Binodini took Asha to her own bedroom and drew her close, tearfully saying, ‘My dear Bali, I am a wretch, I am so ill fated.’

Asha was saddened by this and she hugged her saying gently, ‘Why are you saying these things?’

Binodini hid her face in Asha’s bosom like a child overcome with grief and said, ‘Wherever I am, there is naught but misfortune. Let me go, I beg you, I will go and back to the jungle which was once my home.’

Asha lifted her face by the chin and said, ‘Dearest, do not say such things, I will not be able to live without you – why did you think of leaving me today of all days!’

Bihari came to Binodini’s room once again when he failed to find Mahendra, hoping to hear a little more about her concerns about a misunderstanding between Mahendra and Asha.

He pretended he was there to ask Binodini to send Mahendra to his house for a meal the following morning. As he called her name from the doorway, he was struck when he saw the two women in a tearful embrace by the bright light of the kerosene lamp in the room. Asha thought that Bihari must have accused her friend of something wrongfully and made her feel she must leave. She felt this was very bad of him and that he was not a nice man. Asha left the room quite annoyed with his presence. Bihari left shortly after wards too, his heart overflowing with gratitude towards Binodini.

That night Mahendra said to Asha, ‘Chuni, I will go to Kashi by the early passenger train tomorrow.’
Asha was struck to the very core and asked, ‘Why?’
Mahendra said, ‘It has been a long time since I last saw our aunt.’

Asha was filled with shame when she heard this; she should have rightfully been the one to think of this; the fact that she had forgotten her loving aunt in the pursuit of her own happiness and that Mahendra was the one to remember that distant recluse made her aghast at the coldness of her heart.
Mahendra said, ‘She gave me the responsibility of looking after the only thing dear to her, I must see her just once if I am to calm myself.’

As he spoke Mahendra’s voice choked with feeling; he ran his right hand over Asha’s forehead and hair overwhelmed with affection and unspoken wishes for her welfare. Asha could not fathom the reason behind this sudden emotional display but her heart melted in tears. She remembered the spontaneous words of affection Binodini had said to her earlier in the evening. She did not connect the two events but she did feel that they marked a beginning of sorts in her life. She was not sure whether this was a good omen.

She held onto Mahendra tightly with a heart full of anxiety and misapprehension. Mahendra understood the emotional turmoil within her. He said, ‘Chuni, you have your good aunt’s blessings, you need not have any fear, none at all. She has forsaken everything for your well being, nothing bad can ever happen to you.’

Asha then determined to be unafraid and accepted her husband’s good wishes like a talisman. She mentally paid her respects to her aunt again and again and said with the greatest of sincerity, ‘Mother, may your blessings keep my husband safe at all times.’

Mahendra left the next day without saying anything to Binodini. She said to herself, ‘You are the one who is in the wrong and yet you are angry with me. I have never seen such a show of virtue. But you will not get to preserve it this easily.’