Archives

নতুন পুতুলঃ লিপিকা /The New Doll: Lipika

 

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

***

 

The New Doll

 

|1|

There was a master craftsman who only made dolls; dolls fit for a princess to play with.

Every year there was a doll fair in the palace courtyard. All the other artisans at the fair honoured the master craftsman with the respect reserved for the best.

When he was almost eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal; youthful in years was he, hitherto unseen his methods.

The dolls he made looked complete in some ways and unfinished in others. He touches them with paint in some parts and leaves other parts untouched. The dolls look as if they are still being made, as if they will never be completed.

The young say, ‘Now this is courage!’

The old say, ‘Courage? This is effrontery!’

But, new times demand new things. Today’s princesses say, ‘We want these dolls.’

The old courtiers say, ‘For shame!’

Of course, this only strengthens the young people’s resolve.

The crowds no longer flock to the old man’s shop. His baskets filled with dolls wait just as people at the river bank wait for the ferry, staring at the other bank.

One year passed and then another; everyone forgot the old fellow’s name. Kishanlal became the leader of the doll sellers at the palace fair.

|2|

The old man was heartbroken. It was hard for him to make a living. In the end his daughter came and said to him, Come and stay with me.’

His son-in-law said, ‘Eat, drink and be merry. All you have to do us drive the stray cattle from the fields.’

His daughter is busy with her chores all day long. His son-in-law makes clay lamps and takes them to sell in the city when his boat is full.

The old man does not see that the times have changed, just as he does not understand that his granddaughter is now sixteen years old.

She goes to him where he sits in the shade of the trees, dozing off as he guards the field and puts her arms about his neck. Even his bones grow happy as he says, ‘What is it? What do you want?’

His granddaughter says, ‘Make me dolls to play with.’

The old man said, ‘But are you sure you even like the dolls I make?’

His granddaughter said, ‘Tell me then, is there anyone who makes better dolls than you?’

The old man said, ‘Why, how about Kishanlal?’

The girl answered, ‘He wishes he had your talent!’

The two often squabble like this. It is always about the same thing.

The old man then takes his equipment out of his bag and puts his enormous round glasses on.

He says to his granddaughter, ‘But dear, what about the crows eating the corn?’

His granddaughter says, ‘Grandfather, I will drive the crows away!’

Time passes; the bullock draws water noisily at the distant canal; the granddaughter drives the crows away and the old man makes his doll

3|

The old man fears his daughter most of all. She rules her world with an iron grasp, everyone is careful about what they do when she is around.

The old man was fashioning dolls with all his concentration today; he did not notice when his daughter came walking towards him from behind, her arms swinging busily.

When she came right up to him and spoke, he took his glasses off and looked at her with childlike innocence.

His daughter said, ‘The milking can wait I suppose, while you while away your time with Subhadra. She is a big girl now, is she going to play with dolls anymore?’

The old man said hurriedly, ‘Why would Subhadra play with these? I will sell these at the palace. For I have to give a necklace of coins to my child on the day her husband comes asking for her hand. I want to save money for that.’

His daughter said with some annoyance, ‘Who will buy these dolls at the palace!’

The old man’s head sank in shame. He sat in silence.

Subhadra shook her head and said, ‘I dare the people in the palace to keep their hands off my grandfather’s dolls.’

|4|

Two days later Subhadra brought a measure of gold and gave it to her mother saying, ‘Here you are, money for my grandfather’s dolls.’

Her mother asked, ‘Where did you get this?’

The girl answered, ‘I sold them at the palace.’

The old man said with a smile, ‘And yet your grandfather does not see so well these days, and yet you know that his hands tremble.’

Her mother said happily, ‘Sixteen gold pieces like this should make a fine adornment for Subhadra’s neck.’

The old man answered, ‘Do not worry about that.’

Subhadra wrapped her arms about his neck and said, ‘I do not need anyone else.’

The old man kept smiling as he wiped a tear from his eye.

|5|

The old man seemed to have regained his youth. He would sit under the tree and make dolls. Subhadra would drive off the crows and the bullock would draw water from the distant canal with a wheezing sound.

One by one the sixteen coins were strung and the necklace was completed.

Her mother said, ‘Now all we need is a groom!’

Subhadra whispered in his ear, ‘Grandfather, I have a groom all ready and waiting.’

‘But tell me, where did you find your groom?’

Subhadra answered, ‘That day when I went to the palace, the guard asked me what I wanted. I said that I was there to sell my dolls to the princesses. He said that my dolls were not in fashion any more. With those words he turned me away. One man was moved by my tears and said, ‘Give those dolls to me, I will dress them up a little and they will sell. If you say yes old grandfather, I will marry that man.’

The old craftsman asked, ‘Where is he?’

His granddaughter said, ‘There he stands, beneath the Piyal tree.’

Her groom entered the room; the old man said, ‘But this is Kishanlal!’

Kishanlal touched his feet in respectful greeting and said, ‘Yes, I am Kishanlal indeed.’

The old man clasped him to his chest and said, ‘Once you took the dolls I made, today you take the treasure of my heart.’

His granddaughter put her arms around his neck and whispered in his ear, ‘Along with you!’

 

 

 

Advertisements

মেঘদূত/Meghduut/The Cloud Messenger

মেঘদূত

 

মিলনের প্রথম দিনে বাঁশি কী বলেছিল।

 

সে বলেছিল, ‘সেই মানুষ আমার কাছে এল যে মানুষ আমার দূরের।’

 

আর, বাঁশি বলেছিল, ‘ধরলেও যাকে ধরা যায় না তাকে ধরেছি, পেলেও সকল পাওয়াকে যে ছাড়িয়ে যায় তাকে পাওয়া গেল।’

 

তার পরে রোজ বাঁশি বাজে না কেন।

 

কেননা, আধখানা কথা ভুলেছি। শুধু মনে রইল, সে কাছে; কিন্তু সে যে দূরেও তা খেয়াল রইল না। প্রেমের সে আধখানায় মিলন সেইটেই দেখি, যে আধখানায় বিরহ সে চোখে পড়ে না, তাই দূরের চিরতৃপ্তিহীন দেখাটা আর দেখা যায় না; কাছের পর্দা আড়াল করেছে।

 

দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।

 

সেই আমাদের মাঝের আকাশটি আঁধিতে ঢেকেছে, প্রতি দিনের কাজে কর্মে কথায় ভরে গিয়েছে, প্রতি দিনের ভয়ভাবনা-কৃপণতায়।

***

The Cloud Messenger

1

What did the flute say on the first day of union?

It said, ‘The one who was once distant has now come near.’

And, it said, ‘The one who may not be bound by bonds has been caught, the one who is beyond all capture even when caught has been found.’

Then why does the flute no longer play each day.

Because I have forgotten half of what I had to say. All I remember is that the beloved is near; but the vast distance that still parts us no longer bothers me. I only see that part of love where one meets the beloved, I ignore the part where there is separation and that is why I fail to see the unfulfilled in the gaze of the distant; proximity has curtained it from me.

The endless sky that lies between two people is always silent, that space is not for words. That vast silence must be filled with flute song. The flute cannot play without the freedom of the infinite sky.

That sky that lies between us is often obscured by dust storms, the daily business of words and tasks and shrouded by the miserliness that is companion to mundane doubts and fears.
 

 

 

এক-একদিন জ্যোৎস্নারাত্রে হাওয়া দেয়; বিছানার ‘পরে জেগে ব’সে বুক ব্যথিয়ে ওঠে; মনে পড়ে, এই পাশের লোকটিকে তো হারিয়েছি।

 

এই বিরহ মিটবে কেমন করে, আমার অনন্তের সঙ্গে তার অনন্তের বিরহ।

 

দিনের শেষে কাজের থেকে ফিরে এসে যার সঙ্গে কথা বলি সে কে। সে তো সংসারের হাজার লোকের মধ্যে একজন; তাকে তো জানা হয়েছে, চেনা হয়েছে, সে তো ফুরিয়ে গেছে।

 

কিন্তু, ওর মধ্যে কোথায় সেই আমার অফুরান একজন, সেই আমার একটিমাত্র। ওকে আবার নূতন করে খুঁজে পাই কোন্‌ কূলহারা কামনার ধারে।

 

ওর সঙ্গে আবার একবার কথা বলি সময়ের কোন্‌ ফাঁকে, বনমল্লিকার গন্ধে নিবিড় কোন্‌ কর্মহীন সন্ধ্যার অন্ধকারে।

***

The Cloud Messenger
2

Some times the wind grows strong on a full moon night; the heart pines for something as one wakes up; and I remember, the one who lies beside is already lost to me.

How will this separation be overcome, this that divides my eternal from his.

Who is this that I speak with after returning from work at day’s end? That is but one among the thousands on this earth; I have learned him and known him, that is done with.

But where within is the one without end, the one who is mine alone. Where will I discover him anew, led by what desire.

Where will I find the time to talk to him again, on an indolent evening perfumed and heavy with jasmine.

 

হাস্যকৌতুকঃ ছাত্রের পরীক্ষা/Cchatrer Porikkha/ An examination

ছাত্রের পরীক্ষা

 

 

ছাত্র শ্রীমধুসূদন

 

শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

 

অভিভাবকের প্রবেশ

 

অভিভাবক।

মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু?

 

কালাচাঁদ।

আজ্ঞে, মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে, কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত। কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না।

 

অভিভাবক।

বটে! তা, আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

 

কালাচাঁদ।

তা , দেখুন-না।

 

মধুসূদন।

(স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে। আজ এর শোধ তুলব। ওঁকে আমি তাড়াব।

 

অভিভাবক।

কেমন রে মোধো, পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো?

 

মধুসূদন।

মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি।

 

মধুসূদন।

যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

 

অভিভাবক।

একটা উদাহরণ দে।

 

মধুসূদন।

কেঁচো!

 

কালাচাঁদ।

(চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

 

অভিভাবক।

রসুন মশায়, এখন কিছু বলবেন না।

 

মধুসূদনের প্রতি

 

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ; আচ্ছা, কাননে কী ফোটে বলো দেখি?

 

মধুসূদন।

কাঁটা।

 

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

 

কী মশায়, মারেন কেন? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে? ইতিহাসে কী বলে?

 

মধুসূদন।

পোকায়।

 

বেত্রাঘাত

 

আজ্ঞে, মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি– শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন, সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন।

 

প্রদর্শন।

কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

 

অভিভাবক।

ব্যাকরণ মনে আছে?

 

মধুসূদন।

আছে।

 

অভিভাবক।

“কর্তা’ কী, তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি।

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, কর্তা ওপাড়ার জয়মুন্‌শি।

 

অভিভাবক।

কেন বলো দেখি।

 

মধুসূদন।

তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন।

 

কালাচাঁদ।

(সরোষে) তোমার মাথা!

 

পৃষ্ঠে বেত্র

 

মধুসূদন।

(চমকিয়া) আজ্ঞে, মাথা নয়, ওটা পিঠ।

 

অভিভাবক।

ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে?

 

মধুসুদন।

জানি নে।

 

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

 

মধুসদন।

ওটা বিলক্ষণ জানি– ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ।

 

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

 

অভিভাবক।

অঙ্কশিক্ষা হয়েছে?

 

মধুসূদন।

হয়েছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, তোমাকে সাড়ে ছ’টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে,পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে। একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে, কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে?

 

মধুসূদন।

একটাও নয়।

 

কালাচাঁদ।

কেমন করে।

 

মধুসূদন।

সবগুলো খেয়ে ফেলব। দিতে পারব না।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে?

 

মধুসূদন।

যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে, যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই।

 

কালাচাঁদ।

মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া, মেরে তোমার পিঠ লাল করব, তবে তুমি সিধে হবে!

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায়।

 

অভিভাবক।

কালাচাঁদবাবু, ওটা আপনার ভ্রম। মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয়। কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না, কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায়। অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না। কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই। আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন, দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক, তার পরে আমিই ওকে পড়াব।

 

মধুসূদন।

( স্বগত) আঃ, বাঁচা গেল।

 

কালাচাঁদ।

বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম, কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার। ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই, সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয়।

***

AN EXAMINATION

The student: Madhu

The teacher: Kalachand

 

Madhu’s guardian enters the room.

 

Guardian: How is he doing in his studies Mr. Kalachand?

Kalachand: Despite being very naughty he is very good at his studies. One does not have to repeat things to him at all. He remembers everything after I say it to him once.

Guardian: Really! Let me test his aptitude today for myself.

Kalachand: Of course, go ahead.

Madhusudan to himself: (You hit me so hard yesterday that my back still hurts. I will take revenge today. I will get rid of you!)

Guardian: So my boy, you remember all the previous lessons?

Madhu: I remember everything the teacher said to me.

 

Guardian: Okay, tell me then what a plant is.

Madhu: Things that emerge from the ground.

Guardian: Give me an example.

Madhu: A worm.

 

Kalachand: What! What are you saying? (visibly angry)

Guardian: Wait, do not interrupt now.

To Madhu: You have read the poetry book; tell me, what pops up in the garden?

Madhu: Thorns. (Upon hearing this the teacher strikes him with his cane.)

Madhu: Why are you hitting me sir? Am I lying?

Guardian: Now, what felled Sirajuddaulah? What does history tell us?

Madhu: Insects. (Swishing of the cane)

Excuse me, you strike me without reason – why just Sirajuddaulah, all the chapters have been eaten up by silverfish. See?

He shows the pages. The teacher scratches his head.

Guardian: Do you remember your grammar?

Madhu: Yes.

Guardian: Give an example and explain the idea of subject or ‘karta

Madhu: Please, that must be our neighbour Joy Munshi.

Guardian: Why is that?

 

Madhu: He does all the work.

 

Kalachand, angrily: You fat head!

(Hits him on the back)

Madhu: But sir! That is not my head, that is my back.

Guardian: What is ‘Shashthi Tatpurush’?

Madhu: I do not know.

 

Kalachand shows him the cane again.

Madhu: I know that  very well. It is a stick without a carrot.

His guardian smiles while the teacher scowls.

Guardian: Have you studied mathematics?

Madhu: I have.

Guardian: Well, imagine you are given six and a half cakes and are told to eat cake for five minutes and then give the remainder to your younger brother. You can eat one cake in two minutes, how many cakes will you give your brother?

 

Madhu: None.

Kalachand: But how?

 

Madhu: I will eat all of them. I won’t give him any.

Guardian: If a tree grows a quarter of an inch each day then how tall will a ten inch tree be in the period from Baishakh this year till Baishakh next year.

Madhu: If the tree bends, I cannot say and if it grows straight we will be able to measure it and tell how much it grew. Of course, if it dies then there is no mathematics in this at all.

Kalachand: I can see you will smarten up without a couple of licks of the switch! Stupid fool, I will give you such a thrashing I will straighten you out for good!

 

Madhu: Excuse me, sometimes beatings can make straight stuff crooked.

Guardian: Kalachand, that is your mistake. Very little can be achieved by thrashings. It is said that one cannot turn a donkey into a horse by hitting it but the converse is often true as well; a horse can be turned into a donkey with ill treatment. Most children are able to learn easily but most teachers do not know how to teach. You may take your cane and depart; I will let Madhu’s back heal and then begin teaching him myself.

Madhusudan to himself: Good riddance!

 

Kalachand: Thank God! Teaching is pure drudgery, like manual labour! I get so little after thirty days of teaching one boy, I could easily get double that each day if I dug holes for a living.

 

ভাইফোঁটা/Bhai phnota/ Brotherly Love

ভাইফোঁটা

আমার পিতামহ উদ্ধব দত্ত তাঁর প্রভুবংশকে বিপদের দিনে নিজের সম্পত্তি দিয়া রক্ষা করিয়াছেন। সেই হইতে আমাদের দারিদ্র্যই অন্য লোকের ধনের চেয়ে মাথা উঁচু করিয়াছে। আমার পিতা সনাতন দত্ত ডিরোজিয়োর ছাত্র। মদের সম্বন্ধে তাঁর যেমন অদ্ভুত নেশা ছিল সত্যের সম্বন্ধে ততোধিক। মা আমাদের একদিন নাপিত ভায়ার গল্প বলিয়াছিলেন শুনিয়া পরদিন হইতে সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়ির ভিতরে যাওয়া তিনি একেবারে বন্ধ করিয়া দিলেন। বাহিরে পড়িবার ঘরে শুইতাম। সেখানে দেয়াল জুড়িয়া ম্যাপগুলা সত্য কথা বলিত, তেপান্তর মাঠের খবর দিত না, এবং সাত সমুদ্র তেরো নদীর গল্পটাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলাইয়া রাখিত। সততা সম্বন্ধেও তাঁর শুচিবায়ু প্রবল ছিল। আমাদের জবাবদিহির অন্ত ছিল না। একদিন একজন ‘হকার’ দাদাকে কিছু জিনিস বেচিয়াছিল। তারই কোনো একটা মোড়কের একখানা দড়ি লইয়া খেলা করিতেছিলাম । বাবার হুকুমে সেই দড়ি হকারকে ফিরাইয়া দিবার জন্য রাস্তায় আমাকে ছুটিতে হইয়াছিল ।

আমরা সাধুতার জেলখানায় সততার লোহার বেড়ি পরিয়া মানুষ। মানুষ বলিলে একটু বেশি বলা হয়– আমরা ছাড়া আর সকলেই মানুষ, কেবল আমরা মানুষের দৃষ্টান্তস্থল। আমাদের খেলা ছিল কঠিন, ঠাট্টা বন্ধ, গল্প নীরস, বাক্য স্বল্প, হাসি সংযত, ব্যবহার নিখুঁত। ইহাতে বাল্যলীলায় মস্ত যে একটা ফাঁক পড়িয়াছিল লোকের প্রশংসায় সেটা ভর্তি হইত। আমাদের মাস্টার হইতে মুদি পর্যন্ত সকলেই স্বীকার করিত, দত্তবাড়ির ছেলেরা সত্যযুগ হইতে হঠাৎ পথ ভুলিয়া আসিয়াছে।

পাথর দিয়া নিরেট করিয়া বাঁধানো রাস্তাতেও একটু ফাঁক পাইলেই প্রকৃতি তার মধ্য হইতে আপনার প্রাণশক্তির সবুজ জয়পতাকা তুলিয়া বসে। আমার নবীন জীবনে সকল তিথিই একাদশী হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু উহারই মধ্যে উপবাসের একটা কোন্‌ ফাঁকে আমি একটুখানি সুধার স্বাদ পাইয়াছিলাম।

যে কয়জনের ঘরে আমাদের যাওয়া-আসার বাধা ছিল না তার মধ্যে একজন ছিলেন অখিলবাবু। তিনি ব্রাহ্মসমাজের লোক; বাবা তাঁকে বিশ্বাস করিতেন। তাঁর মেয়ে ছিল অনসূয়া, আমার চেয়ে ছয় বছরের ছোটো। আমি তার শাসনকর্তার পদ লইয়াছিলাম।

তার শিশুমুখের সেই ঘন কালো চোখের পল্লব আমার মনে পড়ে। সেই পল্লবের ছায়াতে এই পৃথিবীর অলোর সমস্ত প্রখরতা তার চোখে যেন কোমল হইয়া আসিয়াছিল। কী স্নিগ্ধ করিয়াই সে মুখের দিকে চাহিত। পিঠের উপরে দুলিতেছে তার সেই বেণীটি, সেও আমার মনে পড়ে; আর মনে পড়ে সেই দুইখানি হাত– কেন জানি না, তার মধ্যে বড়ো একটি করুণা ছিল। সে যেন পথে চলিতে আর-কারো হাত ধরিতে চায়; তার সেই কচি আঙুলগুলি যেন সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিয়া কার মুঠার মধ্যে ধরা দিবার জন্য পথ চাহিয়া আছে।

ঠিক সেদিন এমন করিয়া তাকে দেখিতে পাইয়াছিলাম, এ কথা বলিলে বেশি বলা হইবে। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ বুঝিবার আগেও অনেকটা বুঝি। অগোচরে মনের মধ্যে অনেক ছবি আঁকা হইয়া যায়– হঠাৎ একদিন কোনো-এক দিক হইতে আলো পড়িলে সেগুলা চোখে পড়ে।

***

My grandfather Uddhab Dutta had rescued his employers from certain doom by giving up everything he had. From that day onwards our poverty had held its head higher than the wealth that other people had. My father Sanatan Dutta was a student of Derozio’s. He was just addicted to alcohol as he was to the upholding of truth. After hearing that our mother had told us the story of the stupid barber, he banned us from going indoors after evenfall. We used to sleep in the study room at night. There the maps on each wall spoke only of real things and never of the vast field of Tepantar; there, each of the stories that spoke of the seven seas and the thirteen rivers hung in shame from the beams overhead. He was also obsessed with honesty. One day a hawker had sold something to my elder brother. I was playing with a bit of string that had tied up one of the packages. My father saw me and I was made to run after the hawker to return the string to him.

We were raised in a jailhouse of virtue shackled by the iron bands of truthfulness. It is an exaggeration to say that we were raised – we were elevated to be examples for everyone else. Our play was hard, our humour was non-existent, our stories were without soul, our words were few, our laughter was controlled and our behavior was flawless. The gaps this left in our childhood were filled with the praise of others. From governess to grocer, everyone admitted that the Dutta children had lost their way in some distant better times to find themselves here.

Nature raises her green standards of victory as soon as a road paved with stone yields. Although the days of my youth were like days of ritual fasting, there was one place where I learned that there was sweetness in life.

Of the few that we were not barred from associating with was Akhilbabu. He belonged to the Brahmo Samaj; my father believed in him. His daughter was Anasuya, she was six years younger than me. I took on the role of disciplining her.I remember the thick eye lashes that shaded her little face. All the harshness of this earthly light seemed to be filtered by those lashes. How gentle were the eyes that she raised to my face. I also remember the plait that hung upon her back; and her arms – I do not know why, they had a strange tenderness. It was as if she wanted to hold another hand; her little fingers seemed to want to completely believe in someone else.

It would be an exaggeration to say that I saw all this in her at the time. But we understand much before we understand all of it. Many a picture is painted within the mind without effort – a sudden ray of light brings it all to the surface.

A True Fairy/ Porir Porichoy/ পরীর পরিচয়

A true fairy

1

The prince is now twenty; word comes from near and far from kings who wish to form alliances with him

The matchmaker says, ‘The daughter of the king of the Bahlikas is truly beautiful, like a cascade of snow white roses.’

The prince turned his face away and did not say a thing.

The messenger brings word, ‘The daughter of the King of Gandhara is a paragon of beauty, like a bunch of luscious grapes on the vine.’

The prince went away to the forest saying he was on a hunt. Days became weeks but he would not return.

Another messenger says, ‘I have come back from Camboj; their princess has lashes as curved as the  horizon at dawn, dew washed, brightened by light.’

The prince kept his nose buried in a book of classical poems and would not even look up.

The king asked, ‘What is the reason for this? Send for the Minister’s son.’

The Minister’s son came. The king said to him, ‘You are my son’s friend; tell me truthfully, why does he not wish to get married?’

The Minister’s son answered, ‘King, it has been your son’s wish to marry a fairy ever since the day he heard about their land.’

2

The king ordered all his men to find out about the land of the fairies.

Great scholars were summoned and they studied all the books they could find. They then shook their heads and said, ‘There is nothing about a land peopled by fairies in any of these books.’

Then all the traders were sent for to come to the court. They said, ‘We have visited so many islands dotted across the seas – the Cardamom Isles, the Pepper Isles and even the islands where the clove vines grow. We have been to the Malay isles to bring sandal wood and to the cedar forests of Kailash to find musk from the musk deer. But not once did we hear of a land populated by fairies.’

The king said, ‘Summon the Minister’s son.’

When he came, the king asked him, ‘Where did the prince hear of this land of fairies? Who told him of this?’

The Minister’s son said, ‘You have seen Nabin the mad, the one who wanders through the forests with a flute in hand; the prince meets him when he goes to hunt and listens to tales of the land of fairies.’

The king said, ‘Well, then let us call for him.

The mad man came with a fist full of flowers picked in the forest and gave them to the king as a gift. The king asked, ‘Where did you hear of the land of fairies?’

He answered, ‘I go there all the time!’

The king asked, ‘Where is that place?’

The mad man answered, ‘It is by the side of the Kamyak lake, over there where your kingdom ends.’

The king asked, ‘Can one see fairies there?’

The mad man answered, ‘One can see them but not know them. Sometimes they give themselves away as they are leaving but they can no longer be caught at that point.’

The king then asked, ‘How come you know them?’

The mad man answered, ‘Sometimes from tunes I hear, at other times from a little glimmer of light.’

The king was very annoyed by these answers and said, ‘This is nothing but gibberish. Drive him away!’

3.

The treatment of the mad man touched the prince deeply.

Saal flowers filled the branches in the month of spring and Shirish flowers seemed to glow through the entire forest. The prince went to Chitra Giri on his own.

Everyone asked, ‘Where are you going?’

He did not answer any of their questions.

There was a stream that flowed out of the cave and into the Kamyak Lake. It was called Udas Jhora by the villagers. He took refuge in an old temple by the side of that stream.

A month passed. The new young leaves that had appeared in the trees darkened gradually and the forest paths became covered in fallen flowers.  One day at dawn, the prince heard a flute play a tune in his dream. As soon as he woke he said, ‘Today I will see her!’

4

He rode his horse by the stream and reached the edge of the lake. There he found a daughter of the hill folk sitting by its lotus covered surface. Her pitcher was filled but she did not leave to go home. A bright red Shirish flower glowed in the jet hair of the dusky maiden, like the first star at twilight.

The prince dismounted and said to her, ‘Will you give me that flower from your hair?’

The girl was like a deer that knew no fear. She turned and looked him straight in the eye. Something darkened the dark pupils of her eyes even more – like a dream descending upon sleep, like the first rain clouds on the distant horizon.

She plucked the flower from her ear and gave it to him saying, ‘Here, take it.’

The prince asked, ‘Tell me the truth, which fairy are you?’

She heard this and her face filled with wonder. Then like a sudden rain storm in autumn she began laughing, she could not stop.

The prince thought, ‘My dream must be coming true – this laugh sounds like that flute.’

He stretched his arms out and said, ‘Come.’

She held his arm and climbed atop the horse without pausing to think. Her water filled pitcher stayed on the banks of the river.

A cuckoo called out from the branches of the Shirish – Coo! Coo!

The prince whispered in her ear, ‘What is your name?’

She answered, ‘My name is Kajari.’

They went to the old temple by the side of Udas Jhora. The prince asked, ‘Now take your disguise off!’

The girl answered, ‘We are forest folk, we hardly know how to disguise ourselves.’

The prince insisted, ‘But I want to see you as a fairy.’

‘As a fairy?’ The peals of laughter rang out again. The prince thought, ‘this laugh sounds like the ring of these waters, this must be the fairy of the water fall.’

5

The kind heard that the prince had married a fairy. Horses were sent from the palace; elephants too, and litters.

Kajari asked, ‘Why are these here?’

The prince answered, ‘You must go to the palace.’

Her eyes glittered with tears. She remembered her pitcher, still by the water fall; she remembered the grass seed that was drying in her courtyard; she remembered that her father had taken her brother on a hunt and that it was time for them to return. She remembered that her mother was sitting under a tree weaving a trousseau for her as she sang to herself.

She said, ‘No, I will not go.’

But the drums rang out, along with flutes, cymbals, and bigger drums that drowned out what she said.

When she got out of the litter at the palace, the queen wept and asked, ‘What kind of fairy is this!’

The princess said, ‘Shame!’

The queen’s maid said, ‘What kind of clothes are these for someone said to be a fairy?’

The prince hushed them all and said, ‘Quiet! The fairy is in disguise.’

6.

Days passed. The prince woke on moonlit nights to check if Kajari’s disguise had slipped a little. He would see the dark tresses on her dusky head and the perfection of her body at rest like a black stone goddess. He would sit and think quietly, ‘Where did the fairy hide like the sun behind darkness at dawn.’

The prince was ashamed to face his own people. He grew quite angry one day. As  Kajari was about to leave the bed he grabbed her hand and said, ‘Today I will not let you go without showing your true self, I wish to see you!’

The peals of laughter that had once filled the forest air could be heard no longer. Instead, her eyes filled with tears.

The prince asked, ‘Will you trick me forever?’

She said, ‘No, never again.’

The prince said, ‘Then let everyone see you on the full moon night in autumn.’

7.

The full moon was now exactly in the middle of the heavens. The flutes were playing faster and faster.

The prince came in all ready to get married; soon he would be looking into the eyes of his fairy bride.

There were white sheets on the bed and white scented flowers heaped on the white sheets; the silvery moonlight shone down on them all.

And Kajari?

She was nowhere to be seen.

The third hour was rung out. The moon moved to the western sky. The house filled up with relatives.

Where was the fairy?

The prince answered, ‘The fairies show themselves by leaving us; one can never find them again after that.’

লিপিকাঃ পায়ে চলার পথ /Lipika: Paaye Cholar Pawth/ Lipika: The road I took

এই তো পায়ে চলার পথ।

এসেছে বনের মধ্যে দিয়ে মাঠে, মাঠের মধ্যে দিয়ে নদীর ধারে, খেয়াঘাটের পাশে বটগাছেরতলায়। তার পরে ও পারের ভাঙা ঘাট থেকে বেঁকে চলে গেছে গ্রামের মধ্যে; তার পরে তিসির খেতের ধার দিয়ে, আমবাগানের ছায়া দিয়ে, পদ্মদিঘির পাড় দিয়ে, রথতলার পাশ দিয়ে কোন্‌ গাঁয়ে গিয়ে পৌঁচেছে জানি নে।

এই পথে কত মানুষ কেউ বা আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে, কেউ বা সঙ্গ নিয়েছে, কাউকে বা দূর থেকে দেখা গেল; কারো বা ঘোমটা আছে, কারো বা নেই; কেউ বা জল ভরতে চলেছে, কেউ বা জল নিয়ে ফিরে এল।

এখন দিন গিয়েছে, অন্ধকার হয়ে আসে।

একদিন এই পথকে মনে হয়েছিল আমারই পথ, একান্তই আমার; এখন দেখছি, কেবল একটিবার মাত্র এই পথ দিয়ে চলার হুকুম নিয়ে এসেছি, আর নয়।

নেবুতলা উজিয়ে সেই পুকুরপাড়, দ্বাদশ দেউলের ঘাট, নদীর চর, গোয়ালবাড়ি, ধানের গোলা পেরিয়ে–সেই চেনা চাউনি, চেনা কথা, চেনা মুখের মহলে আর একটিবারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না, ‘এই যে!’ এ পধ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।

আজ ধূসর সন্ধ্যায় একবার পিছন ফিরে তাকালুম; দেখলুম, এই পথটি বহুবিস্মৃত পদচিহ্নের পদাবলী, ভৈরবীর সুরে বাঁধা।

যত কাল যত পথিক চলে গেছে তাদের জীবনের সমস্ত কথাকেই এই পথ আপনার একটিমাত্র ধূলিরেখায় সংক্ষিপ্ত করে এঁকেছে; সেই একটি রেখা চলেছে সূর্যোদয়ের দিক থেকে সূর্যাস্তের দিকে, এক সোনার সিংহদ্বার থেকে আর-এক সোনার সিংহদ্বারে।

‘ওগো পায়ে চলার পথ, অনেক কালের অনেক কথাকে তোমার ধূলিবন্ধনে বেঁধে নীরব করে রেখো না। আমি তোমার ধুলোয় কান পেতে আছি, আমাকে কানে কানে বলো।’

পথ নিশীথের কালো পর্দার তর্জনী বাড়িয়ে চুপ ক’রে থাকে।

‘ওগো পায়ে চলার পথ, এত পথিকের এত ভাবনা, এত ইচ্ছা, সে-সব গেল কোথায়।’

বোবা পথ কথা কয় না। কেবল সূর্যোদয়ের দিক থেকে সূর্যাস্ত অবধি ইশারা মেলে রাখে।

‘ওগো পায়ে চলার পথ, তোমার বুকের উপর যে-সমস্ত চরণপাত একদিন পুষ্পবৃষ্টির মতো পড়েছিল আজ তারা কি কোথাও নেই।’

পথ কি নিজের শেষকে জানে, যেখানে লুপ্ত ফুল আর স্তব্ধ গান পৌঁছল, যেখানে তারার আলোয় অনির্বাণ বেদনার দেয়ালি-উৎসব।

1

This is the road that I have walked on.

  It has come through forests to field, and from field to river bank where the shade of banyan trees darken the jetty. It then crosses the river; from the broken steps on the other side it winds, through the village and past it, along fields of flax and linseed, under the shade of mango trees. passing by the waters of Padmadighi and Rathtala to a nameless village I know nothing about.

So many have walked along this path, some passing me, others walking with me while some kept a distance as we walked; some with their heads veiled from me, others without; some going to fetch water while others return after finishing that chore.

2

 Now the day is over, the darkness descends.

Once I had thought this road to be mine, mine alone; today I see, I had permission to pass along this path just once and no more.

 After the lemon tree comes the edge of the pond, the twelve temples by the river, the sand bar, the cow sheds, the granaries – the familiar roofs, the oft heard words, the loved faces – not once will I be able to return and say, ‘Beware this road! This road takes you on and on, but never brings you back.’

I looked back once today in the fading light of dusk; this road is a litany of many forgotten footsteps, set to the tune of departures.

 All those who have gone before, all their words – this road has written in marks upon the dust; one of those lines go from dawn towards dusk, from one golden gate to another.

3

 ‘Road under my feet, do not silence all the words of the past in the bonds of your dust. I am waiting, ears pressed to the dust, whisper them to me.’

 The road is like a silent finger of night, extending from a curtain of black.

 ‘Road under my feet, all the thoughts of all the travellers, all their wishes, where did those all go?’

 The mute path does not speak. It merely points the way from sunrise to day-set.

‘Road under my feet, those footsteps that once fell upon your heart like flowers from above, are they no longer here?’

Does this road know its own ending, where faded flowers and silenced song await, where starlight shines, a festival of undiminished sorrow?

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন/Khokababur Protyaborton/The return of the young master

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

কিন্তু চন্ন বলিয়া কেহ উত্তর দিল না , দুষ্টামি করিয়া কোনো শিশুর কন্ঠ হাসিয়া উঠিল না ; কেবল পদ্মা পূর্ববৎ ছল্‌ছল্‌ খল্‌খল্‌ করিয়া ছুটিয়া চলিতে লাগিল , যেন সে কিছুই জানে না, এবং পৃথিবীর এই-সকল সামান্য ঘটনায় মনোযোগ দিতে তাহার যেন এক মুহূর্ত সময় নাই ।

সন্ধ্যা হইয়া আসিলে উৎকন্ঠিত জননী চার দিকে লোক পাঠাইয়া দিলেন । লন্ঠন হাতে নদীতীরে লোক আসিয়া দেখিল , রাইচরণ নিশীথের ঝোড়ো বাতাসের মতো সমস্ত ক্ষেত্রময় “ বাবু খোকাবাবু আমার ” বলিয়া ভগ্নকন্ঠে চীৎকার করিয়া বেড়াইতেছে । অবশেষে ঘরে ফিরিয়া রাইচরণ দড়াম করিয়া মাঠাকরুনের পায়ের কাছে আসিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল । তাহাকে যত জিজ্ঞাসা করে সে কাঁদিয়া বলে , “ জানি নে, মা । ”

যদিও সকলেই মনে মনে বুঝিল পদ্মারই এই কাজ , তথাপি গ্রামের প্রান্তে যে এক দল বেদের সমাগম হইয়াছে তাহাদের প্রতিও সন্দেহ দূর হইল না । এবং মাঠাকুরানীর মনে এমন সন্দেহ উপস্থিত হইল যে, রাইচরণই বা চুরি করিয়াছে ; এমন-কি , তাহাকে ডাকিয়া অত্যন্ত অনুনয়পূর্বক বলিলেন , “ তুই আমার বাছাকে ফিরিয়ে এনে দে — তুই যত টাকা চাস তোকে দেব । ” শুনিয়া রাইচরণ কেবল কপালে করাঘাত করিল । গৃহিণী তাহাকে দূর করিয়া তাড়াইয়া দিলেন ।

অনুকূলবাবু তাঁহার স্ত্রীর মন হইতে রাইচরণের প্রতি এই অন্যায় সন্দেহ দূর করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন ; জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, রাইচরণ এমন জঘন্য কাজ কী উদ্দেশ্যে করিতে পারে । গৃহিণী বলিলেন , “ কেন । তাহার গায়ে সোনার গহনা ছিল । ”

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

রাইচরণ দেশে ফিরিয়া গেল । এতকাল তাহার সন্তানাদি হয় নাই , হইবার বিশেষ আশাও ছিল না । কিন্তু দৈবক্রমে বৎসর না যাইতেই তাহার স্ত্রী অধিক বয়সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করিয়া লোকলীলা সংবরণ করিল ।

এই নবজাত শিশুটির প্রতি রাইচরণের অত্যন্ত বিদ্বেষ জন্মিল । মনে করিল , এ যেন ছল করিয়া খোকাবাবুর স্থান অধিকার করিতে আসিয়াছে । মনে করিল , প্রভুর একমাত্র ছেলেটি জলে ভাসাইয়া নিজে পুত্রসুখ উপভোগ করা যেন একটি মহাপাতক । রাইচরণের বিধবা ভগ্নী যদি না থাকিত তবে এ শিশুটি পৃথিবীর বায়ু বেশিদিন ভোগ করিতে পাইত না ।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে , এই ছেলেটিও কিছুদিন বাদে চৌকাঠ পার হইতে আরম্ভ করিল এবং সর্বপ্রকার নিষেধ লঙ্ঘন করিতে সকৌতুক চতুরতা প্রকাশ করিতে লাগিল । এমন-কি , ইহার কন্ঠস্বর হাস্যক্রন্দনধ্বনি অনেকটা সেই শিশুরই মতো । এক-একদিন যখন ইহার কান্না শুনিত রাইচরণের বুকটা সহসা ধড়াস্‌ করিয়া উঠিত; মনে হইত, দাদাবাবু রাইচরণকে হারাইয়া কোথায় কাঁদিতেছে ।

ফেল্‌না — রাইচরণের ভগ্নী ইহার নাম রাখিয়াছিল ফেল্‌না — যথাসময়ে পিসিকে পিসি বলিয়া ডাকিল । সেই পরিচিত ডাক শুনিয়া একদিন হঠাৎ রাইচরণের মনে হইল, ‘ তবে তো খোকাবাবু আমার মায়া ছাড়িতে পারে নাই , সে তো আমার ঘরে আসিয়াই জন্মগ্রহণ করিয়াছে । ‘

এই বিশ্বাসের অনুকূলে কতকগুলি অকাট্য যুক্তি ছিল, প্রথমত , সে যাইবার অনতিবিলম্বেই ইহার জন্ম । দ্বিতীয়ত , এতকাল পরে সহসা যে তাহার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান জন্মে এ কখনোই স্ত্রীর নিজগুণে হইতে পারে না । তৃতীয়ত , এও হামাগুড়ি দেয় , টল্‌মল্‌ করিয়া চলে, এবং পিসিকে পিসি বলে । যে-সকল লক্ষণ থাকিলে ভবিষ্যতে জজ হইবার কথা তাহার অনেকগুলি ইহাতে বর্তিয়াছে ।

তখন মাঠাকরুনের সেই দারুণ সন্দেহের কথা হঠাৎ মনে পড়িল — আশ্চর্য হইয়া মনে মনে কহিল , ‘ আহা , মায়ের মন জানিতে পারিয়াছিল তাহার ছেলেকে কে চুরি করিয়াছে । ‘ তখন , এতদিন শিশুকে যে অযত্ন করিয়াছে সেজন্য বড়ো অনুতাপ উপস্থিত হইল । শিশুর কাছে আবার ধরা দিল ।

এখন হইতে ফেল্‌নাকে রাইচরণ এমন করিয়া মানুষ করিতে লাগিল যেন সে বড়ো ঘরের ছেলে । সাটিনের জামা কিনিয়া দিল । জরির টুপি আনিল । মৃত স্ত্রীর গহনা গলাইয়া চুড়ি এবং বালা তৈয়ারি হইল । পাড়ার কোনো ছেলের সহিত তাহাকে খেলিতে দিত না; রাত্রিদিন নিজেই তাহার একমাত্র খেলার সঙ্গী হইল । পাড়ার ছেলেরা সুযোগ পাইলে তাহাকে নবাবপুত্র বলিয়া উপহাস করিত এবং দেশের লোক রাইচরণের এইরূপ উন্মত্তবৎ আচরণে আশ্চর্য হইয়া গেল ।

ফেল্‌নার যখন বিদ্যাভ্যাসের বয়স হইল তখন রাইচরণ নিজের জোতজমা সমস্ত বিক্রয় করিয়া ছেলেটিকে কলিকাতায় লইয়া গেল । সেখানে বহুকষ্টে একটি চাকরি জোগাড় করিয়া ফেল্‌নাকে বিদ্যালয়ে পাঠাইল । নিজে যেমন-তেমন করিয়া থাকিয়া ছেলেকে ভালো খাওয়া , ভালো পরা , ভালো শিক্ষা দিতে ত্রুটি করিত না । মনে মনে বলিত , ‘ বৎস , ভালোবাসিয়া আমার ঘরে আসিয়াছ বলিয়া যে তোমার কোনো অযত্ন হইবে , তা হইবে না । ‘

এমনি করিয়া বারো বৎসর কাটিয়া গেল । ছেলে পড়ে শুনে ভালো এবং দেখিতে শুনিতেও বেশ , হৃষ্টপুষ্ট উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ — কেশবেশবিন্যাসের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি , মেজাজ কিছু সুখী এবং শৌখিন । বাপকে ঠিক বাপের মতো মনে করিতে পারিত না । কারণ , রাইচরণ স্নেহে বাপ এবং সেবায় ভৃত্য ছিল , এবং তাহার আর-একটি দোষ ছিল সে যে ফেল্‌নার বাপ এ কথা সকলের কাছেই গোপন রাখিয়াছিল । যে ছাত্রনিবাসে ফেল্‌না বাস করিত সেখানকার ছাত্রগণ বাঙাল রাইচরণকে লইয়া সর্বদা কৌতুক করিত এবং পিতার অসাক্ষাতে ফেল্‌নাও যে সেই কৌতুকালাপে যোগ দিত না তাহা বলিতে পারি না । অথচ নিরীহ বৎসলস্বভাব রাইচরণকে সকল ছাত্রই বড়ো ভালোবাসিত; এবং ফেল্‌নাও ভালোবাসিত , কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি ঠিক বাপের মতো নহে- তাহাতে কিঞ্চিৎ অনুগ্রহ মিশ্রিত ছিল ।

রাইচরণ বৃদ্ধ হইয়া আসিয়াছে । তাহার প্রভু কাজকর্মে সর্বদাই দোষ ধরে । বাস্তবিক তাহার শরীরও শিথিল হইয়া আসিয়াছে , কাজেও তেমন মন দিতে পারে না , কেবলই ভুলিয়া যায় — কিন্তু , যে ব্যক্তি পুরা বেতন দেয় বার্ধক্যের ওজর সে মানিতে চাহে না । এ দিকে রাইচরণ বিষয় বিক্রয় করিয়া যে নগদ টাকা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল তাহাও নিঃশেষ হইয়া আসিয়াছে । ফেলনা আজকাল বসনভূষণের অভাব লইয়া সর্বদাই খুঁতখুঁত করিতে আরম্ভ করিয়াছে ।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

একদিন রাইচরণ হঠাৎ কর্মে জবাব দিল এবং ফেল্‌নাকে কিছু টাকা দিয়া বলিল , “ আবশ্যক পড়িয়াছে , আমি কিছুদিনের মতো দেশে যাইতেছি । ” এই বলিয়া বারাসাতে গিয়া উপস্থিত হইল । অনুকূলবাবু তখন সেখানে মুন্সেফ ছিলেন ।

অনুকূলের আর দ্বিতীয় সন্তান হয় নাই , গৃহিণী এখনো সেই পুত্রশোক বক্ষের মধ্যে লালন করিতেছিলেন ।

একদিন সন্ধ্যার সময় বাবু কাছারি হইতে আসিয়া বিশ্রাম করিতেছেন এবং কর্ত্রী একটি সন্ন্যাসীর নিকট হইতে সন্তানকামনায় বহু মূল্যে একটি শিকড় ও আশীর্বাদ কিনিতেছেন, এমন সময়ে প্রাঙ্গনে শব্দ উঠিল “ জয় হোক, মা ” ।

বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন , “ কে রে । ”

রাইচরণ আসিয়া প্রণাম করিয়া বলিল , “ আমি রাইচরণ । ”

বৃদ্ধকে দেখিয়া অনুকূলের হৃদয় আর্দ্র হইয়া উঠিল । তাহার বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে সহস্র প্রশ্ন এবং আবার তাহাকে কর্মে নিয়োগ করিবার প্রস্তাব করিলেন ।

রাইচরণ ম্লান হাস্য করিয়া কহিল , “ মাঠাকরুনকে একবার প্রণাম করিতে চাই । ”

অনুকূল তাহাকে সঙ্গে করিয়া অন্তঃপুরে লইয়া গেলেন । মাঠাকরুন রাইচরণকে তেমন প্রসন্নভাবে সমাদর করিলেন না; রাইচরণ তৎপ্রতি লক্ষ না করিয়া জোড়হস্তে কহিল , “ প্রভু , মা , আমিই তোমাদের ছেলেকে চুরি করিয়া লইয়াছিলাম । পদ্মাও নয় , আর কেহও নয় , কৃতঘ্ন অধম এই আমি — ”

অনুকূল বলিয়া উঠিলেন , “ বলিস কী রে । কোথায় সে । ”

“ আজ্ঞা , আমার কাছেই আছে , আমি পরশ্ব আনিয়া দিব । ”

সেদিন রবিবার , কাছারি নাই । প্রাতঃকাল হইতে স্ত্রীপুরুষ দুইজনে উন্মুখভাবে পথ চাহিয়া বসিয়া আছেন । দশটার সময় ফেল্‌নাকে সঙ্গে লইয়া রাইচরণ আসিয়া উপস্থিত হইল ।

অনুকূলের স্ত্রী কোনো প্রশ্ন কোনো বিচার না করিয়া , তাহাকে কোলে বসাইয়া , তাহাকে স্পর্শ করিয়া , তাহার আঘ্রাণ লইয়া , অতৃপ্তনয়নে তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিয়া , কাঁদিয়া হাসিয়া ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন । বাস্তবিক ছেলেটি দেখিতে বেশ — বেশভূষা আকারপ্রকারে দারিদ্র্যের কোনো লক্ষণ নাই । মুখে অত্যন্ত প্রিয়দর্শন বিনীত সলজ্জ ভাব । দেখিয়া অনুকূলের হৃদয়েও সহসা স্নেহ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল ।

তথাপি তিনি অবিচলিত ভাব ধারণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন , “ কোনো প্রমাণ আছে ? ”

রাইচরণ কহিল , “ এমন কাজের প্রমাণ কী করিয়া থাকিবে । আমি যে তোমার ছেলে চুরি করিয়াছিলাম সে কেবল ভগবান জানেন , পৃথিবীতে আর কেহ জানে না । ”

অনুকূল ভাবিয়া স্থির করিলেন যে , ছেলেটিকে পাইবামাত্র তাঁহার স্ত্রী যেরূপ আগ্রহের সহিত তাহাকে আগলাইয়া ধরিয়াছেন এখন প্রমাণসংগ্রহের চেষ্টা করা সুযুক্তি নহে ; যেমনই হউক , বিশ্বাস করাই ভালো । তা ছাড়া রাইচরণ এমন ছেলেই বা কোথায় পাইবে । এবং বৃদ্ধ ভৃত্য তাঁহাকে অকারণে প্রতারণাই বা কেন করিবে ।

ছেলেটির সহিতও কথোপকথন করিয়া জানিলেন যে , সে শিশুকাল হইতে রাইচরণের সহিত আছে এবং রাইচরণকে সে পিতা বলিয়া জানিত , কিন্তু রাইচরণ কখনো তাহার প্রতি পিতার ন্যায় ব্যবহার করে নাই , অনেকটা ভৃত্যের ভাব ছিল ।

অনুকূল মন হইতে সন্দেহ দূর করিয়া বলিলেন , “ কিন্তু রাইচরণ , তুই আর আমাদের ছায়া মাড়াইতে পাইবি না । ”

রাইচরণ করজোড়ে গদ্‌গদ কণ্ঠে বলিল , “ প্রভু বৃদ্ধ বয়সে কোথায় যাইব । ”

কর্ত্রী বলিলেন , “ আহা, থাক্‌ । আমার বাছার কল্যাণ হউক । ওকে আমি মাপ করিলাম । ”

ন্যায়পরায়ণ অনুকূল কহিলেন , “ যে কাজ করিয়াছে উহাকে মাপ করা যায় না । ”

রাইচরণ অনুকুলের পা জড়াইয়া কহিল , “ আমি করি নাই, ঈশ্বর করিয়াছেন । ”

নিজের পাপ ঈশ্বরের স্কন্ধে চাপাইবার চেষ্টা দেখিয়া অনুকূল আরো বিরক্ত হইয়া কহিলেন , “ যে এমন বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করিয়াছে তাহাকে আর বিশ্বাস করা কর্তব্য নয় । ”

রাইচরণ প্রভুর পা ছাড়িয়া কহিল , “ সে আমি নয়, প্রভু । ”

“ তবে কে । ”

“ আমার অদৃষ্ট । ”

কিন্তু এরূপ বৈফিয়তে কোনো শিক্ষিত লোকের সন্তোষ হইতে পারে না ।

রাইচরণ বলিল , “ পৃথিবীতে আমার আর কেহ নাই । ”

ফেল্‌না যখন দেখিল সে মুন্সেফের সন্তান , রাইচরণ তাহাকে এত দিন চুরি করিয়া নিজের ছেলে বলিয়া অপমানিত করিয়াছে , তখন তাহার মনে মনে কিছু রাগ হইল । কিন্তু তথাপি উদারভাবে পিতাকে বলিল , “ বাবা , উহাকে মাপ করো । বাড়িতে থাকিতে না দাও , উহার মাসিক কিছু টাকা বরাদ্দ করিয়া দাও । ”

ইহার পর রাইচরণ কোনো কথা না বলিয়া একবার পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ করিল , সকলকে প্রণাম করিল ; তাহার পর দ্বারের বাহির হইয়া পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে মিশিয়া গেল । মাসান্তে অনুকূল যখন তাহার দেশের ঠিকানায় কিঞ্চিৎ বৃত্তি পাঠাইলেন তখন সে টাকা ফিরিয়া আসিল । সেখানে কোনো লোক নাই ।

But no one answered with a childish Channo, no childish voice laughed in response, only the Padma flowed past as before, whirling and gurgling, as if she knew nothing and did not have the time to pay attention to such trivial matters.

As it grew dark, the alarmed mother sent people all over the place. People came with search lights to the river’s side and found Raicharan roaming the area like a restless wind, crying, “Babu, young master!” in a broken voice. Eventually he came home and collapsed at her feet, answering all questions that were asked of him with, “I do not know!”

Even though people knew that the river was responsible, they still suspected that the band of gypsies camped outside the village were involved in some way. The child’s mother even suspected Raicharan of kidnapping; asking him with many a supplication, “Bring my child back to me, I will give you as much money as you want…” Raicharan only clapped his hands to his brow in response. She sent him away in anger. Anukul attempted to plead on Raicharan’s behalf with his wife, asking her why he would do such a thing. She replied, “He had gold on his wrists and his feet!”

Raicharan went back to his village. He had no children previously, but in a cruel twist of fate, within a year, his wife died in the process of giving birth to a son.

Raicharan felt a great sense of animosity towards the boy. He felt that the child had come to usurp his little master’s position. He suffered, thinking that it was a sin to enjoy the company of his own son after having failed to save his employer’s son from drowning. In fact, this child would not have survived for very long without the care of Raicharan’s widowed sister.

Most amazingly, this child too started crossing the threshold and started breaking various restrictions with amusing willfulness. Even his cries of distress and joy sounded very similar to the departed child. Some days when he heard his son cry, his heart used to skip a beat, it was as though the little master was crying for Raicharan!

Phelna, the foundling – Raicharan’s sister had named the boy thus, started calling his aunt Pishi at the right age. When Raicharan heard him use this familiar form of address, he suddenly thought, “It does not seem like the little master could leave me after all, he has come back to me.” There were some reasons behind such a thought, Phelna had been born shortly after the tragic death of the other child. Secondly, he did not believe that his wife was to be entirely credited for the birth of a child after all this time. Thirdly this child too crawled and walked unsteadily, and called his aunt Pishi. This was an indication of his future potential as a judge.

He suddenly remembered the terrible suspicions voiced by his employer’s wife and thought with amazement, “How did her mother’s heart know the truth about who had stolen her child?” He began to regret his previous neglect of his son and once again surrendered himself to a child.

From then on, Raicharan began raising his son in a manner befitting a child born to wealthy parents. He bought satin shirts and brocade caps. His wife’s gold was melted down to make bangles for the child. Phelna was not allowed to play with the neighbourhood boys as Raicharan was now his only play mate. These boys started to refer to him as Prince whenever they had the opportunity and everyone thought that Raicharan had completely lost his senses.

When Phelna was old enough to start school, Raicharan sold what little land he had and took the boy off to Kolkata. He found employment with great difficulty and enrolled the boy at a school. He provided Phelna with everything the child asked for while ignoring his own needs, saying to himself, “Just because you came to my family out of love, does not mean I shall give you any less.”

Twelve years passed thus. The boy did well at school and turned out to be a good-looking child, even if he did pay a little too much attention to his hair, and was just a little too fond of comfort and luxury. He was never quite able to think of Raicharan as his father. There were two reasons behind this, the first being the fact that Raicharan was a father in his affections but remained a servant in the way he cared for the boy. The second was the fact that he concealed the boy’s parentage from everyone. The students from Phelna’s boarding school all joked about Raicharan’s rustic ways; sadly, even Phelna took part in this when Raicharan was not around. This was in spite of the fact that they all, including Phelna, loved kindhearted old Raicharan; but as I have said earlier, Phelna could never look upon Raicharan without an element of pity in his heart.

Raicharan was getting older. His employer constantly found fault with what he did. Raicharan was actually feeling worn out and kept forgetting things at work. Unfortunately employers do not accept old age as an excuse. At home, the situation was hardly better; the money he had got from the sale of his land was almost gone, and Phelna was starting to complain about the lack of new clothes.

One day Raicharan suddenly resigned from his job and gave Phelna some money, saying, “There is a pressing need for me to go back to the village.” He then went to Barasat, where he knew Anukul was working in the Court.

Anukul and his wife had not had another child since their first son died, and his wife continued to nurse her loss.

One evening, he was resting at home. His wife was about to pay a mendicant a great deal of money for a cure for her childless state, when someone called out, “God bless you, Mother!”

Anukul asked, “Who is it?”

Raicharan entered and said, “It’s me.”

Anukul felt mortified at the sight of his old caregiver. He enquired about his current position and asked him to start working for them again.

Raicharan smiled weakly and said, “Let me first go and say hello to your wife.”

Anukul took him into the house. His wife was not pleased to see Raicharan, who paid little heed to the distinctly cool reception and said, hands folded in entreaty, “I was the one who stole your child! Not the river, not the gypsies, it was this ungrateful wretch.”

Anukul said, “What are you saying? Where is he?”

“He is at my home. I will bring him here the day after tomorrow.”

The day was a Sunday. Anukul did not have to go to work. The couple watched the road with great eagerness. At ten o’clock, Raicharan appeared with Phelna.

Anukul’s wife had no questions or doubts about him as she drew him close, touched his face and looked at him with all the unsatisfied love that was in her heart. Tears poured down her face. He was a handsome boy, with no visible signs of poverty in his clothing or his appearance. His manner was very pleasant, polite and slightly apologetic. Even Anukul felt his heart fill with love as he looked upon the child.

He still put on a calm exterior and asked, “What proof do you have?”

Raicharan answered, “What proof can there be? Only God knows that I stole your child.”

Anukul saw his wife’s reaction to the child and thought that it would not be wise to ask for proof at this stage. It was easier to believe. Besides, he asked himself, where would Raicharan ever find such a child? Why would he trick them like this again?

He also spoke to the boy and found that he had lived with Raicharan all his life and had known him as his father, but Raicharan had behaved less as a father and more like a servant.

All doubt now removed from his lie, Anukul said, “Raicharan, you are never to come to our house ever again!”

Raicharan said emotionally, “Master, where else will I go at this age?”

Anukul’s wife said, “Poor creature! I forgive him! May my child be blessed in return!”

Anukul, who could be very righteous, said, “He cannot be forgiven after what he did.”

Raicharan implored Anukul, “I did not do it, God made me do it!”

Anukul grew even more annoyed at what he saw as an attempt to blame God for his wrongdoings on Raicharan’s part, saying, “One can never believe such a treacherous man.”

Raicharan stopped pleading and said, “That was not me.”

“Then who was it?”

“It was my fate.”

But such an answer was unlikely to satisfy an educated man such as Anukul.

Raicharan said, “I have no one else in the world.”

Phelna was quite annoyed that he had been kidnapped by Raicharan and kept in penury all his life, even though he was a son of a District official. In spite of that, he said rather magnanimously, “Father, forgive him. Let us give him a monthly allowance, if he is to never return here.”

Raicharan looked at his son’s face once, said nothing more and left the house after saluting everyone, to blend into the great anonymous sea of humanity. When Anukul sent a small sum of money to his village at the end of that month, it came back. There was no one living there anymore.