Archives

নতুন পুতুলঃ লিপিকা /The New Doll: Lipika

 

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

***

 

The New Doll

 

|1|

There was a master craftsman who only made dolls; dolls fit for a princess to play with.

Every year there was a doll fair in the palace courtyard. All the other artisans at the fair honoured the master craftsman with the respect reserved for the best.

When he was almost eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal; youthful in years was he, hitherto unseen his methods.

The dolls he made looked complete in some ways and unfinished in others. He touches them with paint in some parts and leaves other parts untouched. The dolls look as if they are still being made, as if they will never be completed.

The young say, ‘Now this is courage!’

The old say, ‘Courage? This is effrontery!’

But, new times demand new things. Today’s princesses say, ‘We want these dolls.’

The old courtiers say, ‘For shame!’

Of course, this only strengthens the young people’s resolve.

The crowds no longer flock to the old man’s shop. His baskets filled with dolls wait just as people at the river bank wait for the ferry, staring at the other bank.

One year passed and then another; everyone forgot the old fellow’s name. Kishanlal became the leader of the doll sellers at the palace fair.

|2|

The old man was heartbroken. It was hard for him to make a living. In the end his daughter came and said to him, Come and stay with me.’

His son-in-law said, ‘Eat, drink and be merry. All you have to do us drive the stray cattle from the fields.’

His daughter is busy with her chores all day long. His son-in-law makes clay lamps and takes them to sell in the city when his boat is full.

The old man does not see that the times have changed, just as he does not understand that his granddaughter is now sixteen years old.

She goes to him where he sits in the shade of the trees, dozing off as he guards the field and puts her arms about his neck. Even his bones grow happy as he says, ‘What is it? What do you want?’

His granddaughter says, ‘Make me dolls to play with.’

The old man said, ‘But are you sure you even like the dolls I make?’

His granddaughter said, ‘Tell me then, is there anyone who makes better dolls than you?’

The old man said, ‘Why, how about Kishanlal?’

The girl answered, ‘He wishes he had your talent!’

The two often squabble like this. It is always about the same thing.

The old man then takes his equipment out of his bag and puts his enormous round glasses on.

He says to his granddaughter, ‘But dear, what about the crows eating the corn?’

His granddaughter says, ‘Grandfather, I will drive the crows away!’

Time passes; the bullock draws water noisily at the distant canal; the granddaughter drives the crows away and the old man makes his doll

3|

The old man fears his daughter most of all. She rules her world with an iron grasp, everyone is careful about what they do when she is around.

The old man was fashioning dolls with all his concentration today; he did not notice when his daughter came walking towards him from behind, her arms swinging busily.

When she came right up to him and spoke, he took his glasses off and looked at her with childlike innocence.

His daughter said, ‘The milking can wait I suppose, while you while away your time with Subhadra. She is a big girl now, is she going to play with dolls anymore?’

The old man said hurriedly, ‘Why would Subhadra play with these? I will sell these at the palace. For I have to give a necklace of coins to my child on the day her husband comes asking for her hand. I want to save money for that.’

His daughter said with some annoyance, ‘Who will buy these dolls at the palace!’

The old man’s head sank in shame. He sat in silence.

Subhadra shook her head and said, ‘I dare the people in the palace to keep their hands off my grandfather’s dolls.’

|4|

Two days later Subhadra brought a measure of gold and gave it to her mother saying, ‘Here you are, money for my grandfather’s dolls.’

Her mother asked, ‘Where did you get this?’

The girl answered, ‘I sold them at the palace.’

The old man said with a smile, ‘And yet your grandfather does not see so well these days, and yet you know that his hands tremble.’

Her mother said happily, ‘Sixteen gold pieces like this should make a fine adornment for Subhadra’s neck.’

The old man answered, ‘Do not worry about that.’

Subhadra wrapped her arms about his neck and said, ‘I do not need anyone else.’

The old man kept smiling as he wiped a tear from his eye.

|5|

The old man seemed to have regained his youth. He would sit under the tree and make dolls. Subhadra would drive off the crows and the bullock would draw water from the distant canal with a wheezing sound.

One by one the sixteen coins were strung and the necklace was completed.

Her mother said, ‘Now all we need is a groom!’

Subhadra whispered in his ear, ‘Grandfather, I have a groom all ready and waiting.’

‘But tell me, where did you find your groom?’

Subhadra answered, ‘That day when I went to the palace, the guard asked me what I wanted. I said that I was there to sell my dolls to the princesses. He said that my dolls were not in fashion any more. With those words he turned me away. One man was moved by my tears and said, ‘Give those dolls to me, I will dress them up a little and they will sell. If you say yes old grandfather, I will marry that man.’

The old craftsman asked, ‘Where is he?’

His granddaughter said, ‘There he stands, beneath the Piyal tree.’

Her groom entered the room; the old man said, ‘But this is Kishanlal!’

Kishanlal touched his feet in respectful greeting and said, ‘Yes, I am Kishanlal indeed.’

The old man clasped him to his chest and said, ‘Once you took the dolls I made, today you take the treasure of my heart.’

His granddaughter put her arms around his neck and whispered in his ear, ‘Along with you!’

 

 

 

Advertisements

বাণী /Bani/ A Message

বাণী

 

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব’লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।

 

তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই– আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।

 

কিন্তু, কোন দেবতার কৌতুকহাস্যের মতো অপরিমিত চঞ্চলতা নিয়ে আমাদের পাড়ায় ঐ ছোটো মেয়েটির জন্ম। মা তাকে রেগে বলে ‘দস্যি’, বাপ তাকে হেসে বলে ‘পাগলি’।

 

সে পলাতকা ঝরনার জল, শাসনের পাথর ডিঙিয়ে চলে। তার মনটি যেন বেণুবনের উপরডালের পাতা, কেবলই ঝির্‌ ঝির্‌ করে কাঁপছে।

 

 

আজ দেখি, সেই দুরন্ত মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙে ভর দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে, বাদলশেষের ইন্দ্রধনুটি বললেই হয়। তার বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ আজ অচঞ্চল, তমালের ডালে বৃষ্টির দিনে ডানাভেজা পাখির মতো।

 

ওকে এমন স্তব্ধ কখনো দেখি নি। মনে হল, নদী যেন চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে সরোবর হয়েছে।

 

 

কিছুদিন আগে রৌদ্রের শাসন ছিল প্রখর; দিগন্তের মুখ বিবর্ণ; গাছের পাতাগুলো শুকনো, হলদে, হতাশ্বাস।

 

এমন সময় হঠাৎ কালো আলুথালু পাগলা মেঘ আকাশের কোণে কোণে তাঁবু ফেললে। সূর্যাস্তের একটা রক্তরশ্মি খাপের ভিতর থেকে তলোয়ারের মতো বেরিয়ে এল।

 

অর্ধেক রাত্রে দেখি, দরজাগুলো খড়্‌খড়্‌ শব্দে কাঁপছে। সমস্ত শহরের ঘুমটাকে ঝড়ের হাওয়া ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে দিলে।

 

উঠে দেখি, গলির আলোটা ঘন বৃষ্টির মধ্যে মাতালের ঘোলা চোখের মতো দেখতে। আর, গির্জের ঘড়ির শব্দ এল যেন বৃষ্টির শব্দের চাদর মুড়ি দিয়ে।

 

সকালবেলায় জলের ধারা আরও ঘনিয়ে এল, রৌদ্র আর উঠল না।

 

 

এই বাদলায় আমাদের পাড়ার মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে।

 

তার বোন এসে তাকে বললে, ‘মা ডাকছে।’ সে কেবল সবেগে মাথা নাড়ল, তার বেণী উঠল দুলে; কাগজের নৌকো নিয়ে তার ভাই তার হাত ধরে টানলে। সে হাত ছিনিয়ে নিলে। তবু তার ভাই খেলার জন্যে টানাটানি করতে লাগল। তাকে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলে।

 

 

বৃষ্টি পড়ছে। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এল। মেয়েটি স্থির দাঁড়িয়ে।

 

আদিযুগে সৃষ্টির মুখে প্রথম কথা জেগেছিল জলের ভাষায়, হাওয়ার কণ্ঠে। লক্ষকোটি বছর পার হয়ে সেই স্মরণবিস্মরণের অতীত কথা আজ বাদলার কলস্বরে ঐ মেয়েটিকে এসে ডাক দিলে। ও তাই সকল বেড়ার বাইরে চলে গিয়ে হারিয়ে গেল।

 

কত বড়ো কাল, কত বড়ো জগৎ, পৃথিবীতে কত যুগের কত জীবলীলা! সেই সুদূর, সেই বিরাট, আজ এই দুরন্ত মেয়েটির মুখের দিকে তাকালো মেঘের ছায়ায়, বৃষ্টির কলশব্দে।

 

ও তাই বড়ো বড়ো চোখ মেলে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল, যেন অনন্তকালেরই প্রতিমা।

 

A Message

1
The clouds descend as drops of rain, to surrender to the earth. Just as women come to earth to be caught.

They do not need much more than a  little space and a few people to feel happy about the world. And they fill that tiny space with their words, their pains and their thoughts. That is why their heads are veiled, bangles tinkle about their arms and their courtyards are fenced. They are the queens within their little heavens.

Some heavenly being surely came to play on earth through that girl, with her unceasing activity. Her mother calls her a bandit when she is angry, her father smiles and calls her his mad one.

She flows merrily like a waterfall and trips over all obstacles and restrictions. Her mind is like the leafy tips atop a bamboo grove, always rippling with thoughts.

 

2

Today I saw that lively child standing all quiet, leaning on the railings of the verandah, as subdued as a rainbow at the end of the rainy season. Her large dark eyes were still today, like a rain drenched bird in pensive rest upon the branches of the Tamal.

I had never seen her being silent like this. It was as though a river had been made to pause suddenly and a lake had formed.

 

3

A few days ago, the sun had beaten down with great intensity. The horizon sulked, the leaves on the trees were dry and yellow with despair.

Suddenly a dark ill-mannered cloud filled the sky, covering it in all directions like a tent. A blood red beam of sunshine emerged like a blade from a scabbard.

At midnight I woke to find all the doors shaking and rattling. The storm and the winds had taken the sleeping city by the hair and shaken it awake.

I rose and found the streetlight staring back at me through the driving rain like a bleary eye drunk. The church bell rang, its sound muffled by the rain as though smothered in a blanket.

In the morning the rain grew heavier and the sun did not come up.

4

And amid the rain that girl stood, quiet by the railings of the verandah.
Her sister came and called her saying, ‘Mother wants you.’ She only shook her head vigorously, her plaits moving. Her brother came with a paper boat and pulled her by the hand. But she pulled back. He still kept asking her. She slapped him back.

 

5

It is raining. The darkness grows. The girl stands, quiet.

In the ancient times, the first sounds heard on the lips of creation emerged from the language spoken by water and the voices that are carried on the wind. Those half forgotten words traversed the millennia and stirred the heart of the girl. That was why she had escaped to where no fences could hold her back.

Vast is the ocean of time and vast this world and innumerable the things that have happened to this earth through all that time. That vast distance had spoken to the girl today through cloud shadow and rain murmur.

And so she stood and listened, her large eyes silent, like a deity that has ruled since eternity.

 

 

হাস্যকৌতুকঃ ছাত্রের পরীক্ষা/Cchatrer Porikkha/ An examination

ছাত্রের পরীক্ষা

 

 

ছাত্র শ্রীমধুসূদন

 

শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

 

অভিভাবকের প্রবেশ

 

অভিভাবক।

মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু?

 

কালাচাঁদ।

আজ্ঞে, মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে, কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত। কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না।

 

অভিভাবক।

বটে! তা, আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

 

কালাচাঁদ।

তা , দেখুন-না।

 

মধুসূদন।

(স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে। আজ এর শোধ তুলব। ওঁকে আমি তাড়াব।

 

অভিভাবক।

কেমন রে মোধো, পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো?

 

মধুসূদন।

মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি।

 

মধুসূদন।

যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

 

অভিভাবক।

একটা উদাহরণ দে।

 

মধুসূদন।

কেঁচো!

 

কালাচাঁদ।

(চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

 

অভিভাবক।

রসুন মশায়, এখন কিছু বলবেন না।

 

মধুসূদনের প্রতি

 

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ; আচ্ছা, কাননে কী ফোটে বলো দেখি?

 

মধুসূদন।

কাঁটা।

 

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

 

কী মশায়, মারেন কেন? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে? ইতিহাসে কী বলে?

 

মধুসূদন।

পোকায়।

 

বেত্রাঘাত

 

আজ্ঞে, মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি– শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন, সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন।

 

প্রদর্শন।

কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

 

অভিভাবক।

ব্যাকরণ মনে আছে?

 

মধুসূদন।

আছে।

 

অভিভাবক।

“কর্তা’ কী, তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি।

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, কর্তা ওপাড়ার জয়মুন্‌শি।

 

অভিভাবক।

কেন বলো দেখি।

 

মধুসূদন।

তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন।

 

কালাচাঁদ।

(সরোষে) তোমার মাথা!

 

পৃষ্ঠে বেত্র

 

মধুসূদন।

(চমকিয়া) আজ্ঞে, মাথা নয়, ওটা পিঠ।

 

অভিভাবক।

ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে?

 

মধুসুদন।

জানি নে।

 

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

 

মধুসদন।

ওটা বিলক্ষণ জানি– ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ।

 

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

 

অভিভাবক।

অঙ্কশিক্ষা হয়েছে?

 

মধুসূদন।

হয়েছে।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, তোমাকে সাড়ে ছ’টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে,পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে। একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে, কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে?

 

মধুসূদন।

একটাও নয়।

 

কালাচাঁদ।

কেমন করে।

 

মধুসূদন।

সবগুলো খেয়ে ফেলব। দিতে পারব না।

 

অভিভাবক।

আচ্ছা, একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে?

 

মধুসূদন।

যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে, যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই।

 

কালাচাঁদ।

মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া, মেরে তোমার পিঠ লাল করব, তবে তুমি সিধে হবে!

 

মধুসূদন।

আজ্ঞে, মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায়।

 

অভিভাবক।

কালাচাঁদবাবু, ওটা আপনার ভ্রম। মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয়। কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না, কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায়। অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না। কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই। আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন, দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক, তার পরে আমিই ওকে পড়াব।

 

মধুসূদন।

( স্বগত) আঃ, বাঁচা গেল।

 

কালাচাঁদ।

বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম, কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার। ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই, সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয়।

***

AN EXAMINATION

The student: Madhu

The teacher: Kalachand

 

Madhu’s guardian enters the room.

 

Guardian: How is he doing in his studies Mr. Kalachand?

Kalachand: Despite being very naughty he is very good at his studies. One does not have to repeat things to him at all. He remembers everything after I say it to him once.

Guardian: Really! Let me test his aptitude today for myself.

Kalachand: Of course, go ahead.

Madhusudan to himself: (You hit me so hard yesterday that my back still hurts. I will take revenge today. I will get rid of you!)

Guardian: So my boy, you remember all the previous lessons?

Madhu: I remember everything the teacher said to me.

 

Guardian: Okay, tell me then what a plant is.

Madhu: Things that emerge from the ground.

Guardian: Give me an example.

Madhu: A worm.

 

Kalachand: What! What are you saying? (visibly angry)

Guardian: Wait, do not interrupt now.

To Madhu: You have read the poetry book; tell me, what pops up in the garden?

Madhu: Thorns. (Upon hearing this the teacher strikes him with his cane.)

Madhu: Why are you hitting me sir? Am I lying?

Guardian: Now, what felled Sirajuddaulah? What does history tell us?

Madhu: Insects. (Swishing of the cane)

Excuse me, you strike me without reason – why just Sirajuddaulah, all the chapters have been eaten up by silverfish. See?

He shows the pages. The teacher scratches his head.

Guardian: Do you remember your grammar?

Madhu: Yes.

Guardian: Give an example and explain the idea of subject or ‘karta

Madhu: Please, that must be our neighbour Joy Munshi.

Guardian: Why is that?

 

Madhu: He does all the work.

 

Kalachand, angrily: You fat head!

(Hits him on the back)

Madhu: But sir! That is not my head, that is my back.

Guardian: What is ‘Shashthi Tatpurush’?

Madhu: I do not know.

 

Kalachand shows him the cane again.

Madhu: I know that  very well. It is a stick without a carrot.

His guardian smiles while the teacher scowls.

Guardian: Have you studied mathematics?

Madhu: I have.

Guardian: Well, imagine you are given six and a half cakes and are told to eat cake for five minutes and then give the remainder to your younger brother. You can eat one cake in two minutes, how many cakes will you give your brother?

 

Madhu: None.

Kalachand: But how?

 

Madhu: I will eat all of them. I won’t give him any.

Guardian: If a tree grows a quarter of an inch each day then how tall will a ten inch tree be in the period from Baishakh this year till Baishakh next year.

Madhu: If the tree bends, I cannot say and if it grows straight we will be able to measure it and tell how much it grew. Of course, if it dies then there is no mathematics in this at all.

Kalachand: I can see you will smarten up without a couple of licks of the switch! Stupid fool, I will give you such a thrashing I will straighten you out for good!

 

Madhu: Excuse me, sometimes beatings can make straight stuff crooked.

Guardian: Kalachand, that is your mistake. Very little can be achieved by thrashings. It is said that one cannot turn a donkey into a horse by hitting it but the converse is often true as well; a horse can be turned into a donkey with ill treatment. Most children are able to learn easily but most teachers do not know how to teach. You may take your cane and depart; I will let Madhu’s back heal and then begin teaching him myself.

Madhusudan to himself: Good riddance!

 

Kalachand: Thank God! Teaching is pure drudgery, like manual labour! I get so little after thirty days of teaching one boy, I could easily get double that each day if I dug holes for a living.

 

বীর গুরু/ Bir Guru/ The Brave Guru

The history of the Sikhs during Mughal rule and particularly by the orders of Aurangzeb is full of stories of triumph and bravery in the face of unspeakable cruelty and torture. This is an excerpt from one of those stories; on the occasion of Nanak Jayanti and the martyrdom of Teg Bahadur, this seemed appropriate.

 

বীর গুরু

বনের একটা গাছে আগুন লাগিলে অন্যান্য যে-সকল গাছে উত্তাপ প্রচ্ছন্ন ছিল সেগুলাও যেমন আগুন হইয়া উঠে, তেমনি যে জাতির মধ্যে একজন বড়োলোক উঠে, সে জাতির মধ্যে দেখিতে দেখিতে মহত্ত্বের শিখা ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে, তাহার গতি আর কেহই রোধ করিতে পারে না।

নানক যে মহত্ত্ব লইয়া জন্মিয়াছিলেন সে তাঁহার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই নিবিয়া গেল না। তিনি যে ধর্মের সংগীত, যে আনন্দ ও আশার গান গাহিলেন, তাহা ধ্বনিত হইতে লাগিল। কত নূতন নূতন গুরু জাগিয়া উঠিয়া শিখদিগকে মহত্ত্বের পথে অগ্রসর করিতে লাগিলেন।

তখনকার যথেচ্ছাচারী মুসলমান রাজারা অনেক অত্যাচার করিলেন, কিন্তু নবধর্মোৎসাহে দীপ্ত শিখ জাতির উন্নতির পথে বাধা দিতে পারিলেন না। বাধা ও অত্যাচার পাইয়া শিখেরা কেমন করিয়া বীর জাতি হইয়া উঠিল তাহার গল্প বলি শুন।

নানকের পর পঞ্জাবে আট জন গুরু জন্মিয়াছেন, আট জন গুরু মরিয়াছেন, নবম গুরুর নাম তেগ্বাহাদুর। আমরা যে সময়কার কথা বলিতেছি তখন নিষ্ঠুর আরঞ্জীব দিল্লীর সম্রাট ছিলেন। রামরায় বলিয়া তেগ্বাহাদুরের একজন শত্রু সম্রাটের সভায় বাস করিত। তাহারই কথা শুনিয়া সম্রাট তেগ্বাহাদুরের উপরে ক্রুদ্ধ হইয়াছেন, তাঁহাকে ডাকিতে পাঠাইয়াছেন।

আরঞ্জীবের লোক যখন তেগ্বাহাদুরকে ডাকিতে আসিল তখন তিনি বুঝিলেন যে তাঁহার আর রক্ষা নাই। যাইবার সময়ে তিনি তাঁহার ছেলেকে কাছে ডাকিলেন। ছেলের নাম গোবিন্দ, তাহার বয়স চোদ্দ বৎসর। পূর্বপুরুষের তলোয়ার গোবিন্দের কোমরে বাঁধিয়া দিয়া তাহাকে বলিলেন, “তুমিই শিখেদের গুরু হইলে। সম্রাটের আদেশে ঘাতক আমাকে যদি বধ করে তো আমার শরীরটা যেন শেয়াল-কুকুরে না খায়! আর এই অন্যায় অত্যাচারের বিচার তুমি করিয়ো, ইহার প্রতিশোধ তুমি লইয়ো।’ বলিয়া তিনি দিল্লী চলিয়া গেলেন।

রাজসভায় তাঁহাকে তাঁহার গোপনীয় কথা সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করা হইল। কেব বা বলিল, “আচ্ছা, তুমি যে মস্ত লোক তাহার প্রমাণস্বরূপ একটা অলৌকিক কারখানা দেখাও দেখি!’ তেগ্বাহাদুর বলিলেন, “সে তো আমার কাজ নহে। মানুষের কর্তব্য ঈশ্বরের শরণাপন্ন হইয়া থাকা। তবে তোমাদের অনুরোধে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখাইতে পারি। একটা কাগজে মন্ত্র লিখিয়া ঘাড়ে রাখিয়া দিব, সে ঘাড় তলোয়ারে বিচ্ছিন্ন হইবে না।’ এই বলিয়া মন্ত্র-লেখা কাগজ ঘাড়ে রাখিয়া তিনি ঘাড় পাতিয়া দিলেন। ঘাতক তরবারি উঠাইয়া আঘাত করিলে মাথা বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। কাগজ তুলিয়া লইয়া সকলে দেখিল, তাহাতে লেখা আছে, “শির দিয়া, সির নেহি দিয়া।’ অর্থাৎ মাথা দিলাম, গুপ্ত কথা দিলাম না।’ এইরূপে মাথা দিয়া তেগ্বাহাদুর রাজসভার প্রশ্নের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন।

বালক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
*****

The Brave Guru

Just as nearby trees that feel the heat can go up in flames when one tree catches fire in a forest, when a great man is born among a group of people the whole nation is illumined by the flame of that great spirit; no one can stop its progress.

The indomitable spirit that was Nanak’s did not die out with his death. The song of joy and hope that he sang resounded through the land. Teacher after teacher arose and led the Sikhs along the path to salvation.

The tyrannical Muslim rulers of the time committed many atrocities but they could not halt the advance of the Sikh nation, inflamed as they were by the teachings of their young faith. Let me tell you the story of how the Sikhs became a race of brave warriors by passing through obstacles and hardship.

Eight gurus or teachers had come out of the Punjab after Nanak; the ninth was Teg Bahadur. We are talking about the time when the cruel Aurangzeb was the emperor in Delhi. One of Teg Bahadur’s enemies Ram Rai, was a member of the Emperor’s court and it was he who filled the Emperor’s ears with falsehoods until Aurangzeb was incensed and sent for Teg.

When Teg saw the Emperor’s men at his door he knew he was doomed. Before leaving he called for his son. This child of fourteen was named Govind. Teg tied the sword that had served his ancestors to Govind’s waist and said to him, ‘You are now the guru to all Sikhs. If the executioner should slay me by the order of the Emperor, see to it that my body is not left to the mercy of jackals and dogs. You will have to right this wrong, you will have to take revenge.’ He then went to Delhi.

He was questioned over and over about his activities by the court. Some asked him, ‘Why do you not prove that you are a great leader by performing a miracle?’ Teg Bahadur said, ‘That is not my purpose. A man’s purpose is merely to seek God. But I can show you something unusual since you have asked. I will write an incantation on a piece of paper and place it on my neck and that will stop you from severing my head.’ He then placed the paper on his neck and bared his throat. When the executioner raised his sword and brought it down, his head rolled away. Someone picked up the paper and saw these words written there – ‘I gave up my head but not my beliefs.’ This was the manner in which Teg Bahadur found respite from the interrogation in the court.

শেষের রাত্রি / Shesher Ratri / The Final Night

1

‘মাসি !’

‘ঘুমোও,যতীন,রাত হল যে ।’

‘হোক-না রাত,আমার দিন তো বেশি নেই । আমি বলছিলুম,মণিকে তার বাপের বাড়ি– ভূলে যাচ্ছি,ওর বাপ এখন কোথায়–‘

‘সীতারামপুরে ।’

‘হাঁ সীতারামপুরে । সেইখানে মণিকে পাঠিয়ে দাও,আরো কতদিন ও রোগীর সেবা করবে । ওর শরীর তো তেমন শক্ত নয় ।’

‘শোনো একবার ! এই অবস্থায় তোমাকে ফেলে বউ বাপের বাড়ি যেতে চাইবেই বা কেন ।’

‘ডাক্তারেরা কী বলেছে সে কথা কি সে–‘

‘তা সে নাই জানল– চোখে তো দেখতে পাচ্ছে । সেদিন বাপের বাড়ি যাবার কথা যেমন একটু ইশারায় বলা অমনি বউ কেঁদে অস্থির ।’

মাসির এই কথাটার মধ্যে সত্যের কিছু অপলাপ ছিল, সে কথা বলা আবশ্যক । মণির সঙ্গে সেদিন তাঁর এই প্রসঙ্গে যে আলাপ হইয়াছিল সেটা নিম্নলিখিত-মতো ।

‘বউ,তোমার বাপের বাড়ি থেকে কিছু খবর এসেছে বুঝি ? তোমার জাঠতুতো ভাই অনাথকে দেখলুম যেন ।

‘হাঁ, মা ব’লে পাঠিয়েছেন, আসছে শুক্রবারে আমার ছোটো বোনের অন্নপ্রাশন । তাই ভাবছি–‘

‘বেশ তো বাছা, একগাছি সোনার হার পাঠিয়ে দাও, তোমার মা খুশি হবেন।’

‘ভাবছি,আমি যাব। আমার ছোটো বোনকে তো দেখিনি, দেখতে ইচ্ছে করে।’

‘সে কী কথা, যতীনকে একলা ফেলে যাবে? ডাক্তার কী বলেছে শুনেছ তো?’

‘ডাক্তার তো বলছিল, এখনো তেমন বিশেষ–‘

‘তা যাই বলুক, ওর এই দশা দেখে যাবে কী ক’রে।’

‘আমার তিন ভাইয়ের পরে এই একটি বোন, বড়ো আদরের মেয়ে –শুনেছি, ধুম ক’রে অন্নপ্রাশন হবে– আমি না গেলে মা ভারি–‘

‘তোমার মায়ের ভাব, বাছা, আমি বুঝতে পারি নে। কিন্তু যতীনের এই সময়ে তুমি যদি যাও, তোমার বাবা রাগ করবেন,সে আমি ব’লে রাখছি।’

‘তা জানি । তোমাকে এক লাইন লিখে দিতে হবে মাসি, যে কোনো ভাবনার কথা নেই– আমি গেলে বিশেষ কোনো–‘

‘তুমি গেলে কোনো ক্ষতিই নেই সে কি জানি নে । কিন্তু তোমার বাপকে যদি লিখতেই হয়, আমার মনে যা আছে সব খুলেই লিখব ।”

‘আচ্ছা,বেশ– তুমি লিখো না । আমি ওঁকে গিয়ে বললেই উনি–‘

‘দেখো বউ, অনেক সয়েছি– কিন্তু এই নিয়ে যদি তুমি যতীনের কাছে যাও, কিছুতেই সইব না । তোমার বাবা তোমাকে ভালো রকমই চেনেন, তাঁকে ভোলাতে পারবে না ।’

এই বলিয়া মাসি চলিয়া আসিলেন । মণি খানিকক্ষণের জন্য রাগ করিয়া বিছানায় উপর পড়িয়া রহিল ।

পাশের বাড়ি হইতে সই আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,’এ কি সই,গোসা কেন ।’

‘দেখো দেখি ভাই, আমার একমাত্র বোনের অন্নপ্রাশন– এরা আমাকে যেতে দিতে চায় না ।’

‘ওমা , সে কী কথা, যাবে কোথায় । স্বামী সে রোগে শুষছে ।’

‘আমি তো কিছুই করি নে, করিতে পারিও নে ; বাড়িতে সবাই চুপচাপ ,আমার প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে । এমন ক’রে আমি থাকিতে পারি নে, তা বলছি !’

‘তুমি ধন্যি মেয়েমানুষ যা হোক ।’

‘তা আমি, ভাই, তোমাদের মতো লোক দেখানে ভান করতে পারি নে । পাছে কেউ কিছু মনে করে বলে মুখ গুঁজড়ে  ঘরের কোণে পড়ে থাকা আমার কর্ম নয়।’

‘তা ,কী করবে শুনি ।’

‘আমি যাবই, আমাকে কেউ ধরে রাখতে পারবে না ।’

‘ইস্‌, তেজ দেখে আর বাঁচি নে । চললুম, আমার কাজ আছে ।’

***

Chapter 1

‘Aunt?’

‘Go to sleep Jatin, it is late.’

‘Let it be late, I do not have much time left. I was saying perhaps Moni could be sent to her parents, I forget where her father lives –‘

‘In Sitarampur.’

‘Yes to Sitarampur; send Moni to them, how much longer will she have to look after an invalid? She is not that strong herself.’

‘Listen to yourself! Why would your wife want to go away while you lie ill here?

‘Does she know what the doctor said?’

‘Even if she does not know what he said, she has eyes that can see. The other day as soon as I hinted at going to her parents’ house, she burst into tears.’

It is important to clarify that was some distortion of the truth in what the aunt had said. Her conversation with Moni had been along the following lines.

‘Daughter, is there some news from your parents’ house? I thought I saw your cousin Anath.’

‘Yes, my mother has sent word that my young sister’s rice ceremony will be held next Friday. I was thinking –‘

‘Well child, why not send a gold necklace, your mother will be pleased.’

‘I am thinking of going. I have not seen this young sister yet, I wish to see her.’

‘But how you will go, leaving Jatin like this? Surely you have heard what the doctor said?’

‘But the doctor said, there is still no sign –‘

‘Be as it may, how will you go leaving him in this state?’

‘ This is the one sister I have after three brothers, she is much loved – and I have heard the ceremony will be held with much pomp – if I am not there, my mother will be very –‘

‘I do not understand what your mother thinks, child. But if you go when Jatin is in this state, I can tell you that your father will be angry.’

‘I know. But if you write one line to him saying that there is nothing to worry about – it will be alright if I leave him –‘

‘You do not have to tell me that there will be little difference to his care if you go. But if I do have to write to your father, I will disclose all that is on my mind.’

‘Fine, you do not have to do it. If I go and speak to my husband he will agree  -‘

‘Look daughter, I have put up with a lot – but if you go to Jatin with this request, I will not bear it at all. Your father knows you too well, you will not be able to fool him.’

The aunt left after saying this. Moni lay on her bed fuming at the injustice.

Her friend came from next door and asked, ‘What is this, why the glum face?’

‘Look at what is happening, it is the rice ceremony for my only sister and these people are not letting me go!’

‘Dear God, what are you saying, where will you go? Your husband is so ill.’

‘I do not have to do anything for him, I couldn’t, even if I tried; everyone is so quiet I feel stifled. I am just saying that I cannot live like this.’

‘You are truly amazing!’

‘Look my friend I am not as good at putting on pretences as you might be. But it is not in my nature to sit quietly in a corner for fear of people saying things.’

’So, what is it that you will do, pray tell.’

’I will go and no one can stop me from doing that.’

‘You know, you have some gall! I am going, I have got better things to do.’