Archive | January 2019

নতুন পুতুল/ Notun Putul/ The New Dolls

নতুন পুতুল

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

 

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

 

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

 

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

 

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

 

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

 

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

 

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

 

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

 

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

 

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

 

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

 

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

 

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

 

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

 

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

 

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

 

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

 

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

 

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

 

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

 

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

 

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

 

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

 

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

 

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

 

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

 

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

 

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

 

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

 

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

 

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

 

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

 

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

 

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

 

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

 

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

 

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

 

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

 

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

 

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

 

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

 

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

 

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

 

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

 

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

 

***

The New Dolls

1

 

This artisan only made dolls; dolls for the girls of the royal family to play with.

Each year there was a doll fair in the grounds of the palace. All the artisans there have always honoured this artisan as their leader.

When he was nearly eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal, he was youthful in years and his style was new.

The dolls he makes are complete but not quite formed, fully painted but still untouched by the brush in parts. It is almost as if the dolls are not quite finished, as if they will never quite grow old.

The young people said, “This is brave work!”

The old people said, “Bravery? More like audacity if you ask us!”

But modern times demand modern things. The princesses of today said, “We want these dolls!”

 

The ancient courtiers said, “For shame!”

That made the princesses crave the new fangled dolls even more.

There were no crowds at the old artisan’s shop these days. Baskets filled with dolls waited like passengers waiting for a ferry with their eyes fixed on the far banks of a river.

One year passed and then another. Everyone forgot all about the old man. Kishanlal was now the top maker of dolls in the fair held in the palace.

 

The old man was heart broken and he barely made any money. Finally his daughter came to him and said, “Come and live with me.”

 

His son-in-law said, “Eat, drink and rest! The only thing you have to do is drive stray cattle from the vegetable patch.”

 

His daughter was busy with her household chores all day. His son-in-law made clay lamps and took them by boat to the town to sell.

 

Just as the old man fails to notice that the times are changing, he also fails to understand that his granddaughter is no child anymore but a young woman of sixteen.

The girl comes and puts her arms around his neck as he sits beneath a tree guarding vegetables in between nodding off to sleep. Even the ribs surrounding his heart ache with happiness when she does this.

His granddaughter says, “Make me a doll, I want to play!”

 

The old man says, “Now, now! Why would you like my work?”

 

The girl says, “Who can make better dolls than you?”

 

 

 

The old man answers, “What about Kishanlal?”

 

The girl answers, “What! Kishanlal wishes he could make these dolls!”

 

How often the two have argued about this! It is always the same.

 

Then the old man takes clay and other stuff out of his bundle and puts his great round rimmed glasses on.

 

He says to his granddaughter, “But child, what of the corn? The crows will eat it all!”

 

 

 

The girl says, “Grandfather, I will drive them away!”

The day passes. The bullock draws water noisily from the distant canal; the girl drives the crows away and the old man makes dolls out of clay.

 

 

 

3

The old man feared his daughter most of all. She was the strictest of them al and everyone in the family was afraid of her.

He was making his dolls with such concentration one day that he did not notice anything else. He certainly never heard his daughter swinging her arms fast as she walked up to him from behind.

He took his glasses off and stared at her like an uncomprehending child when she called him from close by.

She said, “The milking can wait I suppose while you spend time with Subhadra! Why make dolls for her, is she still young enough to play with those?”

The old man spoke up quickly, “Why would Subhadra play with these? I will sell them in the palace. We will need a necklace of gold when a groom comes for my child. I need to save money for that.”

His daughter was annoyed and said, “Who will buy these in the palace?”

The old man bowed his head at this and fell quiet.

Subhadra shook her head and said, “I would like to see anyone say no to dolls made by my grandfather!”

 

 

4

Two days later Subhadra gave a gold coin to her mother and said, “Here, the price for my grandfather’s dolls.”

Her mother asked, “Where did you get these?”

The girl said, “I sold them in the palace.”

The old man smiled and said, “Child, just imagine! I do not see well these days and my hands tremble!”

Her mother was pleased. She said, “Sixteen coins like this will make a beautiful necklace for Subhadra.”

The old man answered, “That should not be a problem.”

Subhadra wrapped her arms about her grandfather’s neck and said, “I do not worry about finding myself a husband!”

The old man smiled and wiped a tear away.

 

 

 

 

 

5

The old man seemed to have found his second youth. He sat under the tree sculpting his dolls while Subhadra drove the crows away. The bullock drew water from the canal with a creaking of the wheel in the distance.

One by one sixteen gold coins were strung on a thread and the necklace was completed.

Her mother said, “All we need now is a groom!”

Subhadra whispered in the old man’s ear, “Grandfather, there is a groom.”

The grandfather asked, “Tell me child, where did you find your groom?”

Subhadra said, “The day I went to the palace, the sentry asked me what I wanted and I told him that I was there to sell dolls to the princesses. He said to me, these dolls are not selling these days and  turned me away with those words. There was one man who saw my tears and said, let me touch those dolls up with a little paint for you, they will sell easily enough. Grandfather, if you like him too, I should like to marry him.”

The old man asked, “Where is he?”

The girl answered, “There, by the Piyal tree outside.”

The groom entered the room; the old man said, “But this is Kishanlal!”

Kishanlal bowed to touch the old man’s feet and said, “Yes, I am Kishanlal indeed.”

The old man hugged him close and said, “Once upon a time you took over the dolls that I made with my own hands, and today you come for the one that lives within my heart.”

His granddaughter threw her arms about his neck and whispered, “He is here to take you too!”

Advertisements

ছেলেটা/ Cheleta/ That Boy

ছেলেটা

 

ছেলেটার বয়স হবে বছর দশেক–

 

পরের ঘরে মানুষ।

 

যেমন আগাছা বেড়ে ওঠে ভাঙা বেড়ার ধারে–

 

মালীর যত্ন নেই,

 

আছে আলোক বাতাস বৃষ্টি

 

পোকামাকড় ধুলোবালি–

 

কখনো ছাগলে দেয় মুড়িয়ে,

 

কখনো মাড়িয়ে দেয় গোরুতে–

 

তবু মরতে চায় না, শক্ত হয়ে ওঠে,

 

ডাঁটা হয় মোটা,

 

পাতা হয় চিকন সবুজ।

 

 

 

ছেলেটা কুল পাড়তে গিয়ে গাছের থেকে পড়ে,

 

হাড় ভাঙে,

 

বুনো বিষফল খেয়ে ওর ভির্মি লাগে,

 

রথ দেখতে গিয়ে কোথায় যেতে কোথায় যায়,

 

কিছুতেই কিছু হয় না–

 

আধমরা হয়েও বেঁচে ওঠে,

 

হারিয়ে গিয়ে ফিরে আসে

 

কাদা মেখে কাপড় ছিঁড়ে–

 

মার খায় দমাদম,

 

গাল খায় অজস্র–

 

ছাড়া পেলেই আবার দেয় দৌড়।

 

 

 

মরা নদীর বাঁকে দাম জমেছে বিস্তর,

 

বক দাঁড়িয়ে থাকে ধারে,

 

দাঁড়কাক বসেছে বৈঁচিগাছের ডালে,

 

আকাশে উড়ে বেড়ায় শঙ্খচিল,

 

বড়ো বড়ো বাঁশ পুঁতে জাল পেতেছে জেলে,

 

বাঁশের ডগায় বসে আছে মাছরাঙা,

 

পাতিহাঁস ডুবে ডুবে গুগলি তোলে।

 

বেলা দুপুর।

 

লোভ হয় জলের ঝিলিমিলি দেখে–

 

তলায় পাতা ছড়িয়ে শেওলাগুলো দুলতে থাকে,

 

মাছগুলো খেলা করে।

 

আরো তলায় আছে নাকি নাগকন্যা?

 

সোনার কাঁকই দিয়ে আঁচড়ায় লম্বা চুল,

 

আঁকাবাঁকা ছায়া তার জলের ঢেউয়ে।

 

ছেলেটার খেয়াল গেল ওইখানে ডুব দিতে–

 

ওই সবুজ স্বচ্ছ জল,

 

সাপের চিকন দেহের মতো।

 

“কী আছে দেখিই-না’ সব তাতে এই তার লোভ।

 

দিল ডুব, দামে গেল জড়িয়ে–

 

চেঁচিয়ে উঠে, খাবি খেয়ে, তলিয়ে গেল কোথায়।

 

ডাঙায় রাখাল চরাচ্ছিল গোরু,

 

জেলেদের ডিঙি নিয়ে টানাটানি করে তুললে তাকে–

 

তখন সে নিঃসাড়।

 

তার পরে অনেক দিন ধরে মনে পড়েছে

 

চোখে কী করে সর্ষেফুল দেখে,

 

আঁধার হয়ে আসে,

 

যে মাকে কচি বেলায় হারিয়েছে

 

তার ছবি জাগে মনে,

 

জ্ঞান যায় মিলিয়ে।

 

ভারি মজা,

 

কী করে মরে সেই মস্ত কথাটা।

 

সাথিকে লোভ দেখিয়ে বলে,

 

“একবার দেখ্‌-না ডুবে, কোমরে দড়ি বেঁধে,

 

আবার তুলব টেনে।’

 

ভারি ইচ্ছা করে জানতে ওর কেমন লাগে।

 

সাথি রাজি হয় না;

 

ও রেগে বলে, “ভীতু, ভীতু, ভীতু কোথাকার।’

 

 

 

বক্সিদের ফলের বাগান, সেখানে লুকিয়ে যায় জন্তুর মতো।

 

মার খেয়েছে বিস্তর, জাম খেয়েছে আরো অনেক বেশি।

 

বাড়ির লোকে বলে, “লজ্জা করে না বাঁদর?’

 

কেন লজ্জা।

 

বক্সিদের খোঁড়া ছেলে তো ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে ফল পাড়ে,

 

ঝুড়ি ভরে নিয়ে যায়,

 

গাছের ডাল যায় ভেঙে,

 

ফল যায় দ’লে–

 

লজ্জা করে না?

 

একদিন পাকড়াশীদের মেজো ছেলে একটা কাঁচ-পরানো চোঙ নিয়ে

 

ওকে বললে, “দেখ্‌-না ভিতর বাগে।’

 

দেখল নানা রঙ সাজানো,

 

নাড়া দিলেই নতুন হয়ে ওঠে।

 

বললে, “দে-না ভাই, আমাকে।

 

তোকে দেব আমার ঘষা ঝিনুক,

 

কাঁচা আম ছাড়াবি মজা ক’রে–

 

আর দেব আমের কষির বাঁশি।’

 

 

 

দিল না ওকে।

 

কাজেই চুরি করে আনতে হল।

 

ওর লোভ নেই–

 

ও কিছু রাখতে চায় না, শুধু দেখতে চায়

 

কী আছে ভিতরে।

 

খোদন দাদা কানে মোচড় দিতে দিতে বললে,

 

“চুরি করলি কেন।’

 

লক্ষ্মীছাড়াটা জবাব করলে,

 

“ও কেন দিল না।’

 

যেন চুরির আসল দায় পাকড়াশিদের ছেলের।

 

 

 

ভয় নেই ঘৃণা নেই ওর দেহটাতে।

 

কোলাব্যাঙ তুলে ধরে খপ ক’রে,

 

বাগানে আছে খোঁটা পোঁতার এক গর্ত,

 

তার মধ্যে সেটা পোষে–

 

পোকামাকড় দেয় খেতে।

 

গুবরে পোকা কাগজের বাক্সোয় এনে রাখে,

 

খেতে দেয় গোবরের গুটি–

 

কেউ ফেলে দিতে গেলে অনর্থ বাধে।

 

ইস্কুলে যায় পকেটে নিয়ে কাঠবিড়ালি।

 

একদিন একটা হেলে সাপ রাখলে মাস্টারের ডেস্কে–

 

ভাবলে, “দেখিই-না কী করে মাস্টারমশায়।’

 

ডেক্‌সো খুলেই ভদ্রলোক লাফিয়ে উঠে দিলেন দৌড়–

 

দেখবার মতো দৌড়টা।

 

 

 

একটা কুকুর ছিল ওর পোষা,

 

কুলীনজাতের নয়,

 

একেবারে বঙ্গজ।

 

চেহারা প্রায় মনিবেরই মতো,

 

ব্যবহারটাও।

 

অন্ন জুটত না সব সময়ে,

 

গতি ছিল না চুরি ছাড়া–

 

সেই অপকর্মের মুখে তার চতুর্থ পা হয়েছিল খোঁড়া।

 

আর, সেইসঙ্গেই কোন্‌ কার্যকারণের যোগে

 

শাসনকর্তাদের শসাখেতের বেড়া গিয়েছিল ভেঙে।

 

মনিবের বিছানা ছাড়া কুকুরটার ঘুম হত না রাতে,

 

তাকে নইলে মনিবেরও সেই দশা।

 

একদিন প্রতিবেশীর বাড়া ভাতে মুখ দিতে গিয়ে

 

তার দেহান্তর ঘটল।

 

মরণান্তিক দুঃখেও কোনোদিন জল বেরোয় নি যে ছেলের চোখে

 

দু দিন সে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে কেঁদে বেড়ালো,

 

মুখে অন্নজল রুচল না,

 

বক্সিদের বাগানে পেকেছে করম্‌চা–

 

চুরি করতে উৎসাহ হল না।

 

সেই প্রতিবেশীদের ভাগ্নে ছিল সাত বছরের,

 

তার মাথার উপর চাপিয়ে দিয়ে এল এক ভাঙা হাঁড়ি।

 

হাঁড়ি-চাপা তার কান্না শোনালো যেন ঘানিকলের বাঁশি।

 

 

 

গেরস্তঘরে ঢুকলেই সবাই তাকে “দূর দূর’ করে,

 

কেবল তাকে ডেকে এনে দুধ খাওয়ায় সিধু গয়লানী।

 

তার ছেলেটি মরে গেছে সাত বছর হল,

 

বয়সে ওর সঙ্গে তিন দিনের তফাত।

 

ওরই মতো কালোকোলো,

 

নাকটা ওইরকম চ্যাপ্টা।

 

ছেলেটার নতুন নতুন দৌরাত্মি এই গয়লানী মাসীর ‘পরে।

 

তার বাঁধা গোরুর দড়ি দেয় কেটে,

 

তার ভাঁড় রাখে লুকিয়ে,

 

খয়েরের রঙ লাগিয়ে দেয় তার কাপড়ে।

 

“দেখি-না কী হয়’ তারই বিবিধ-রকম পরীক্ষা।

 

তার উপদ্রবে গয়লানীর স্নেহ ওঠে ঢেউ খেলিয়ে।

 

তার হয়ে কেউ শাসন করতে এলে

 

সে পক্ষ নেয় ওই ছেলেটারই।

 

 

 

অম্বিকে মাস্টার আমার কাছে দুঃখ ক’রে গেল,

 

“শিশুপাঠে আপনার লেখা কবিতাগুলো

 

পড়তে ওর মন লাগে না কিছুতেই,

 

এমন নিরেট বুদ্ধি।

 

পাতাগুলো দুষ্টুমি ক’রে কেটে রেখে দেয়,

 

বলে ইঁদুরে কেটেছে।

 

এতবড়ো বাঁদর।’

 

আমি বললুম, “সে ত্রুটি আমারই,

 

থাকত ওর নিজের জগতের কবি

 

তা হলে গুবরে পোকা এত স্পষ্ট হত তার ছন্দে

 

ও ছাড়তে পারত না।

 

কোনোদিন ব্যাঙের খাঁটি কথাটি কি পেরেছি লিখতে,

 

আর সেই নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি।’

 

 

 

 

 

২৮ শ্রাবণ, ১৩৩৯

 

***

 

 

 

 

THAT BOY

 

That boy would be no older than ten –

Growing up in a home not his own.

Just as a weed flourishes by a broken fence –

No gardener to watch his every step,

Bathed in light, wind and rain

Under attack from insects and dust

 

Sometimes a goat trims it back to the roots,

 

Sometimes a cow crushes it underfoot –

 

But it still does not die, growing stronger each day

 

Its stem thickening

 

While its leaves grow lush and green.

 

 

 

The boy falls from a tree while picking fruit

 

A bone or two are broken,

 

He falls into a faint after eating poison fruit

 

Ends up far from where he should have been, on his way to the fair.

 

Nothing happens to him though –

 

He comes back from the doors of death,

 

He returns from being lost

Covered in mud, clothes ripped –

 

Fists rain down on him,

 

Harsh words too –

 

But once free he is off again, up to no good.

 

 

 

There by the dried river bed, where algae clouds the stream,

 

Herons wait for fish,

 

A crow perches on a Carissa branch,

 

A kite flies in the skies above,

 

And fishermen have draped their nets over tall bamboo poles,

Capped by jewel bright kingfishers,

Ducks dip their heads looking for things to eat, snails and their like,

 

All under the midday sun.

 

He feels drawn to the sparkling waters –

 

And the dancing weeds beneath,

 

Where the fish dart and play.

 

Does the snake princess live even deeper below?

 

Combing her long hair out with a comb of gold,

 

Till it shimmers, light and shade playing on the waves.

 

The boy thought of diving into that very spot –

 

In the clear green waters,

His body slicing in smooth as a snake.

‘Why not see what there is -’ this his chief wish.

He dived in, only to be entangled in the winding weeds –

He called, struggled a bit, then sank into the depths.

 

There was a cowherd on the banks,

He mustered a fishing boat and managed to pull the boy out –

 

Dead to the world for all purpose.

He has often thought of it since then

 

How stars seemed to fill his eyes,

And it all went dark,

 

And the mother he had lost as a child

 

Why did she come to mind,

Just before everything faded?

 

Such fun,

So that was the big secret about how one died!

He tried to tempt a play mate,

‘Why don’t you take a dip with a rope around your waist,

I will pull you out.’

 

He would really like to know how they feel.

 

But his friend does not want to do it;

 

He screams angrily, ‘Coward, coward, coward!’

 

 

 

He hides in the orchard belonging to the Bakshis, wild thing in its lair.

 

He has been beaten often enough but feasted far more.

 

The people at home ask, ‘Have you no shame, you animal!’

 

But why should he feel any shame?

What about the lame son of the Bakshis, who hits the branches to get the fruit,

 

Fills baskets with the bounty,

 

Leaves the tree’s branches bruised and broken,

 

Stamping the fruit into the ground –

 

Does he feel any shame?

 

One day one of the Pakrashis came with a tube with glass windows

 

Told him, ‘Have a look inside!’

 

Inside, a world of colours

 

Renewing with each shake.

 

The boy said, ‘Please, let me have it.

 

You can have my treasured shell knife, sharpened,

 

Such fun to peel green mangoes with –

 

I will even throw in my mango seed flute!’

 

 

 

But to no avail.

 

What was he to do but steal it then?

 

He does not crave ownership –

He does not care to keep things, he just wants to see

 

What lies inside.

 

But the grown ups twisted his ear so hard as they asked,

 

‘Why did you have to steal?’

 

The rascal replied,

 

‘But why did he not give it to me?’

 

As if all fault lay with the Pakrashi boy.

 

 

 

He knows neither fear not shame.

Happily snatching up a toad,

He puts it in a hole made for a garden post

 

It is his pet to feed –

 

With insects and other creatures.

 

He keeps dung beetles in paper boxes,

 

Feeding them balls of dung –

Raging when anyone suggests throwing them out.

 

He takes a squirrel in his pockets to school.

 

Once he put a snake in the master’s desk –

 

Thinking, ‘Let us see what he does!’

 

The poor man ran as soon as his desk was open –

 

His speed was something to behold.

 

 

 

He had a pet dog,

 

No pedigree of any kind,

 

A mongrel born and raised.

 

In looks a close match to his owner,

 

In his manners too.

 

It never got enough to eat,

The only way out was to steal what it could –

 

That had resulted in one of his legs being lamed.

 

At the same time, mysteriously

 

A section of fence belonging to the disciplining hand was found to be damaged.

 

The dog could not sleep unless it was in its owner’s bed at night,

 

The boy could not sleep either if they were apart.

 

One day the dog got too close to a neighbour’s plate of food

 

Retribution came in death.

The boy who had never cried even in heart rending sorrow

 

Hid his tears for days,

 

Unable to eat or drink,

 

Not even the prospect of ripe fruit in the Bakshi garden –

Could inspire him to theft.

 

The neighbour had a seven year old nephew,

 

The boy jammed a broken pot over the child’s head.

 

The boy’s tears sounded like muffled machinery from his earthen prison.

 

 

 

Everyone chases him off the minute he enters a house,

 

The only one who views him with love is Sidhu Goylani the milk maid.

 

Her own son dead these seven desolate years,

 

They were born merely three days apart, the two.

 

Dark of limb and face,

 

Snub nosed, twins in their plainness.

 

He subjects this loving woman to new torments daily.

 

He lets her cows roam loose, cutting them free.

 

He hides her milk pails,

 

He smears her clothes with catechu.

 

All these are his way to ‘see what happens if -!’

 

But each new trick makes her heart swell with love.

 

When others try to berate him on her behalf

 

She takes up cudgels on his.

 

 

The teacher came to me and ruefully complained,

 

‘Even your poems in the primer

 

He will not once sit down to read,

 

Such a dullard is rarely to be seen.

 

He cuts holes in the pages on purpose,

 

Claiming the mice have been at work.

 

Who knew he had such a wicked heart!’

 

I said, ‘But that is my failing,

 

If only there was a poet who came from his own world

 

They would have caught the dung beetle’s rhythm in their stanzas

 

And the boy would have not been able to put the book down.

 

Have I ever written of what goes on in a toad’s heart,

 

Or of the tragedies that afflict daily the life of a stray dog?’

 

 

 

 

 

 

28th Shravan 1339