Tag Archive | Rabindranath Tagore and short stories

On the death of Sukumar Ray

”মানুষ যখন সাংঘাতিক রোগে পীড়িত, তখন মৃত্যুর সঙ্গে তার প্রাণশক্তির সংগ্রামটাই সকলের চেয়ে প্রাধান্যলাভ করে। মানুষের প্রাণ যখন সংকটাপন্ন তখন সে যে প্রাণী এই কথাটাই সকলের চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যান্য জীবের মতোই আমরা যে কেবলমাত্র প্রাণী মানুষের এই পরিচয় তো সম্পূর্ণ নয়। যে প্রাণশক্তি জন্মের ঘাট থেকে মৃত্যুর ঘাটে আমাদের পৌঁছিয়ে দেয় আমরা তার চেয়ে বড়ো পাথেয় নিয়ে জন্মেছি। সেই পাথেয় মৃত্যুকে অতিক্রম করে আমাদের অমৃতলোকে উত্তীর্ণ করে দেবার জন্যে। যারা কেবল প্রাণীমাত্র মৃত্যু তাদের পক্ষে একান্ত মৃত্যু। কিন্তু মানুষের জীবনে মৃত্যুই শেষ কথা নয়। জীবনের ক্ষেত্রে অনেক সময়ে এই কথাটি আমরা ভুলে যাই। সেইজন্যে সংসারে জীবনযাত্রার ব্যাপারে ভয়ে, লোভে, ক্ষোভে পদে পদে আমরা দীনতা প্রকাশ করে থাকি। সেই আত্মবিস্মৃতির অন্ধকারে আমাদের প্রাণের দাবি উগ্র হয়ে ওঠে, আত্মার প্রকাশ ম্লান হয়ে যায়। জীবলোকের ঊর্দ্ধে অধ্যাত্মলোক আছে যে-কোনো মানুষ এই কথাটি নিঃসংশয় বিশ্বাসের দ্বারা নিজের জীবনে সুস্পষ্ট করে তোলেন অমৃতধামের তীর্থযাত্রায় তিনি আমাদের নেতা।

আমার পরম স্নেহভাজন যুবকবন্ধু সুকুমার রায়ের রোগশয্যার পাশে এসে যখন বসেছি এই কথাই বার বার আমার মনে হয়েছে। আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি কিন্তু এই অল্পবয়স্ক যুবকটির মতো, অল্পকালের আয়ুটিকে নিয়ে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অমৃতময় পুরুষকে অর্ঘ্যদান করতে প্রায় আর কাউকে দেখি নি। মৃত্যুর দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে অসীম জীবনের জয়গান তিনি গাইলেন। তাঁর রোগশয্যার পাশে বসে সেই গানের সুরটিতে আমার চিত্ত পূর্ণ হয়েছে।

আমাদের প্রাণের বাহন দেহ যখন দীর্ঘকাল অপটু হয়, শরীরের ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে যখন বিচিত্র দুঃখ দুর্বলতার সৃষ্টি করে, তখন অধিকাংশ মানুষ আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে না, তার সংশয় উপস্থিত হয়। কিন্তু মনুষ্যত্বের সত্যকে যাঁরা জানেন তাঁরা এই কথা জানেন যে, জরামৃত্যু রোগশোক ক্ষতি অপমান সংসারে অপরিহার্য, তবু তার উপরেও মানবাত্মা জয়লাভ করতে পারে এইটেই হল বড়ো কথা। সেইটে প্রমাণ করবার জন্যেই মানুষ আছে; দুঃখ তাপ থেকে পালাবার জন্যে নয়। যে-শক্তির দ্বারা মানুষ ত্যাগ করে, দুঃখকে ক্ষতিকে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে সেই শক্তিই তাকে বুঝিয়ে দেয় যে তার অস্তিত্বের সত্যটি সুখদুঃখবিক্ষুব্ধ আয়ুকালের ছোটো সীমানার মধ্যে বদ্ধ নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

When a man is suffering from a grave illness, the struggle between death and their life force becomes most important. When a human life is in danger, the fact that he is a living organism is the one that comes to the fore. Yet to say that we are merely animals like other living entities is to leave our identity as humans incomplete. We are born with something much bigger than the life force that takes us from the shores of birth to those of death. This allows us to accept death and rise to eternal heights. For animals death is the final ending but for humans death is not the last word. We often forget this while we are alive. This makes us express our distress and helplessness over various aspects of living, such as fear, greed and grief. In those moments of forgetting ourselves, the demands placed by life grow strong; the expression of the self becomes dull. The person who makes their unwavering belief in the existence of a spiritual world beyond this mortal life clear, through the way they lead their lives, is the one to lead us in our pilgrimage towards salvation.

As I sit beside my beloved young friend Sukumar Ray’s sick bed, this thought has come to me again and again. I have seen death many times, but I have hardly ever seen anyone give up the ultimate sacrifice with such devotion to the Supreme Being, as this young man, as he faces death at the close of his short life. He has sung the song of endless life as he stands at death’s door. My soul is fulfilled with that song as I sit by his bed.

When the body that is the vehicle of our lives is disabled for a long time, when the various functions of the body are hampered resulting in pain and weakness, the majority of people cannot show their respect for the soul, they are assailed by a sense of doubt. But the ones who know the truth about life understand that old age, death, illness, loss, insult are all an essential part of life, but the victory of the soul is what is most important. That is why humans exist, not so that they can escape from sorrow or deprivation. The strength that allows us to undergo sacrifice, to scorn sorrow, loss and death, that very same strength proves that the truth of this mortal existence is not defined by happiness and sorrow.”

Rabindranath Tagore wrote this after the death of a young writer friend, Sukumar Ray. Ray was dying of Kalazaar. On this visit, he asked Rabindranath Tagore to sing two songs for him. One of these were,

“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে” (Achche Dukho, Achche Mrityu, Birohodohono Laage) There is sorrow, there is death, the pain of separation like a burning flame

Follow the links to listen to this song:
Achche Dukkho, Achche Mrityu: http://www.youtube.com/watch?v=LOGKwPCYE1c

Advertisements

রথযাত্রা /Ratha Yatra/The Coming Of The Chariot

রথযাত্রা

রথযাত্রার দিন কাছে।

তাই রানী রাজাকে বললে, ‘চলো, রথ দেখতে যাই।’

রাজা বললে, ‘আচ্ছা।’

ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া বেরোল, হাতিশাল থেকে হাতি। ময়ূরপংখি যায় সারে সারে, আর বল্লম হাতে সারে সারে সিপাইসান্ত্রি। দাসদাসী দলে দলে পিছে পিছে চলল।

কেবল বাকি রইল একজন। রাজবাড়ির ঝাঁটার কাঠি কুড়িয়ে আনা তার কাজ।

সর্দার এসে দয়া করে তাকে বললে, ‘ওরে, তুই যাবি তো আয়।’

সে হাত জোড় করে বললে, ‘আমার যাওয়া ঘটবে না।’

রাজার কানে কথা উঠল, সবাই সঙ্গে যায়, কেবল সেই দুঃখীটা যায় না।

রাজা দয়া করে মন্ত্রীকে বললে, ‘ওকেও ডেকে নিয়ো।’

রাস্তার ধারে তার বাড়ি। হাতি যখন সেইখানে পৌঁছল মন্ত্রী তাকে ডেকে বললে, ‘ওরে দুঃখী, ঠাকুর দেখবি চল্‌।’

সে হাত জোড় করে বলল, ‘কত চলব। ঠাকুরের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছই এমন সাধ্য কি আমার আছে।’

মন্ত্রী বললে, ‘ভয় কী রে তোর, রাজার সঙ্গে চলবি।’

সে বললে, ‘সর্বনাশ! রাজার পথ কি আমার পথ।’

মন্ত্রী বললে, ‘তবে তোর উপায়? তোর ভাগ্যে কি রথযাত্রা দেখা ঘটবে না।’

সে বললে, ‘ঘটবে বই কি। ঠাকুর তো রথে করেই আমার দুয়ারে আসেন।’

মন্ত্রী হেসে উঠল। বললে, ‘তোর দুয়ারে রথের চিহ্ন কই।’

দুঃখী বললে, ‘তাঁর রথের চিহ্ন পড়ে না।’

মন্ত্রী বললে, ‘কেন বল্‌ তো।’

দুঃখী বললে, ‘তিনি যে আসেন পুষ্পকরথে।’

মন্ত্রী বললে, ‘কই রে সেই রথ।’

দুঃখী দেখিয়ে দিলে, তার দুয়ারের দুই পাশে দুটি সূর্যমুখী ফুটে আছে।

লিপিকা,
১৯১৭-১৯১৯

Ratha Yatra/The Coming Of The Chariot

The day of the Chariot festival drew near.

The queen said to her king, “Let us go and see the Chariot”

The king said, “Alright”

The horses were summoned from the stables, the elephants from their pens. Peacock barges sailed in serried ranks; foot soldiers with spears at the ready. An army of servants brought the rear.

There was only one person left behind. Her job was to collect twigs to make the brooms used in the palace.

The leader came and said to them benevolently, “If you want, you can still go”

She put her hands together humbly and said, “I do not think I can”

The king heard the story of how every one was going except for one poor wretch.

He said to his minister magnanimously, “Let us also take her along”

She lived along the road. When the elephants got there, the minister said, “Come along wretch, let us go and look at the deity”

She clasped her hands together and said, “How far will I have to go? Do I have the ability to go up to the deity’s door?”

The minister said, “Fear not, you will go with the king”

She said, “For shame! Can the king’s path and mine be the same?”

The minister said, “What will happen then? Are you not fated to see the deity in his chariot?”

She said, “Of course it will happen! The deity himself rides to my door!”

The minister laughed and said, “Where are the ruts in the dust leading to your door?”

The wretch said, “His chariot does not leave marks”

The minister said, “Why is that?”

She said, “He comes in a chariot of flowers”

The minister said, “Where is that chariot?”

The woman pointed, there were two sunflower plants in bloom on either side of her door.

This is taken from Lipika which Tagore wrote between 1917 and 1919. He translated it himself into English.

To listen to the poem: http://youtu.be/NhFiLg2b9sE

image courtesy of