Tag Archive | Chokher Bali

চোখের বালি ২৮ / Chokher Bali 28

২৮

সেদিন রাত্রিজাগরণ ও প্রবল আবেগের পরে সকালবেলায় মহেন্দ্রের শরীর-মনে একটা অবসাদ উপস্থিত হইয়াছিল। তখন ফাল্গুনের মাঝামাঝি, গরম পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। মহেন্দ্র অন্যদিন সকালে তাহার শয়নগৃহের কোণে টেবিলে বই লইয়া বসিত। আজ নীচের বিছানায় তাকিয়ায় হেলান দিয়া পড়িল। বেলা হইয়া যায়, স্নানে গেল না। রাস্তা দিয়া ফেরিওয়ালা হাঁকিয়া যাইতেছে। পথে আপিসের গাড়ির শব্দের বিরাম নাই। প্রতিবেশীর নূতন বাড়ি তৈরি হইতেছে, মিস্ত্রি-কন্যারা তাহারই ছাদ পিটিবার তালে তালে সমস্বরে একঘেয়ে গান ধরিল। ঈষৎ তপ্ত দক্ষিণের হাওয়ায় মহেন্দ্রের পীড়িত স্নায়ুজাল শিথিল হইয়া আসিয়াছে; কোনো কঠিন পণ, দুরূহ চেষ্টা, মানস-সংগ্রাম আজিকার এই হালছাড়া গা-ঢালা বসন্তের দিনের উপযুক্ত নহে।

“ঠাকুরপো, তোমার আজ হল কী। স্নান করিবে না? এ দিকে খাবার যে প্রস্তুত। ও কী ভাই, শুইয়া যে! অসুখ করিয়াছে? মাথা ধরিয়াছে?” বলিয়া বিনোদিনী কাছে আসিয়া মহেন্দ্রের কপালে হাত দিল।

মহেন্দ্র অর্ধেক চোখ বুজিয়া জড়িতকণ্ঠে বলিল, “আজ শরীরটা তেমন ভালো নাই–আজ আর স্নান করিব না।”

বিনোদিনী কহিল, “স্নান না কর তো দুটিখানি খাইয়া লও।” বলিয়া পীড়াপীড়ি করিয়া সে মহেন্দ্রকে ভোজনস্থানে লইয়া গেল এবং উৎকণ্ঠিত যত্নের সহিত অনুরোধ করিয়া আহার করাইল।

আহারের পর মহেন্দ্র পুনরায় নীচের বিছানায় আসিয়া শুইলে, বিনোদিনী শিয়রে বসিয়া ধীরে ধীরে তাহার মাথা টিপিয়া দিতে লাগিল। মহেন্দ্র নিমীলিতচক্ষে বলিল, “ভাই বালি, এখনো তো তোমার খাওয়া হয় নাই, তুমি খাইতে যাও।”

বিনোদিনী কিছুতেই গেল না। অলস মধ্যাহ্নের উত্তপ্ত হাওয়ায় ঘরের পর্দা উড়িতে লাগিল এবং প্রাচীরের কাছে কম্পমান নারিকেলগাছের অর্থহীন মর্মরশব্দ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। মহেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড ক্রমশই দ্রুততর তালে নাচিতে লাগিল এবং বিনোদিনীর ঘন নিশ্বাস সেই তালে মহেন্দ্রের কপালের চুলগুলি কাঁপাইতে থাকিল। কাহারো কণ্ঠ দিয়া একটি কথা বাহির হইল না। মহেন্দ্র মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “অসীম বিশ্বসংসারের অনন্ত প্রবাহের মধ্যে ভাসিয়া চলিয়াছি, তরণী ক্ষণকালের জন্য কখন কোথায় ঠেকে, তাহাতে কাহার কী আসে যায় এবং কতদিনের জন্যই বা যায় আসে।’

শিয়রের কাছে বসিয়া কপালে হাত বুলাইতে বুলাইতে বিহ্বল যৌবনের গুরুভারে ধীরে ধীরে বিনোদিনীর মাথা নত হইয়া আসিতেছিল; অবশেষে তাহার কেশাগ্রভাগ মহেন্দ্রের কপোল স্পর্শ করিল। বাতাসে আন্দোলিত সেই কেশগুচ্ছের কম্পিত মৃদু স্পর্শে তাহার সমস্ত শরীর বারংবার কাঁপিয়া উঠিল, হঠাৎ যেন নিশ্বাস তাহার বুকের কাছে অবরুদ্ধ হইয়া বাহির হইবার পথ পাইল না। ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া মহেন্দ্র কহিল, “নাঃ আমার কালেজ আছে, আমি যাই।” বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে না চাহিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল।

বিনোদিনী কহিল, “ব্যস্ত হইয়ো না, আমি তোমার কাপড় আনিয়া দিই।” বলিয়া মহেন্দ্রের কালেজের কাপড় বাহির করিয়া আনিল।

মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি কালেজে চলিয়া গেল, কিন্তু সেখানে কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। পড়াশুনায় মন দিতে অনেকক্ষণ বৃথা চেষ্টা করিয়া সকাল সকাল বাড়ি ফিরিয়া আসিল।

ঘরে ঢুকিয়া দেখে, বিনোদিনী বুকের তলায় বালিশ টানিয়া লইয়া নীচের বিছানায় উপুড় হইয়া কী একটা বই পড়িতেছে–রাশীকৃত কালো চুল পিঠের উপর ছড়ানো। বোধ করি বা সে মহেন্দ্রের জুতার শব্দ শুনিতে পায় নাই। মহেন্দ্র আস্তে আস্তে পা টিপিয়া কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। শুনিতে পাইল, পড়িতে পড়িতে বিনোদিনী একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

মহেন্দ্র কহিল, “ওগো করুণাময়ী, কাল্পনিক লোকের জন্য হৃদয়ের বাজে খরচ করিয়ো না। কী পড়া হইতেছে।”

বিনোদিনী ত্রস্ত হইয়া উঠিয়া বসিয়া তাড়াতাড়ি বইখানা অঞ্চলের মধ্যে লুকাইয়া ফেলিল। মহেন্দ্র কাড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। অনেকক্ষণ হাতাহাতি-কাড়াকাড়ির পর পরাভূত বিনোদিনীর অঞ্চল হইতে মহেন্দ্র বইখানি ছিনাইয়া লইয়া দেখিল–বিষবৃক্ষ। বিনোদিনী ঘন নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

মহেন্দ্রের বক্ষঃস্থল তোলপাড় করিতেছিল। অনেক চেষ্টায় সে হাসিয়া কহিল, “ছি ছি, বড়ো ফাঁকি দিলে। আমি ভাবিয়াছিলাম, খুব একটা গোপনীয় কিছু হইবে বা। এত কাড়াকাড়ি করিয়া শেষকালে কিনা বিষবৃক্ষ বাহির হইয়া পড়িল।”

বিনোদিনী কহিল, “আমার আবার গোপনীয় কী থাকিতে পারে, শুনি।”

মহেন্দ্র ফস্‌ করিয়া বলিয়া ফেলিল, “এই মনে করো, যদি বিহারীর কাছ হইতে কোনো চিঠি আসিত?”

নিমেষের মধ্যে বিনোদিনীর চোখে বিদ্যুৎ স্ফুরিত হইল। এতক্ষণ ফুলশর ঘরের কোণে খেলা করিতেছিল, সে যেন দ্বিতীয় বার ভস্মসাৎ হইয়া গেল। মুহূর্তে-প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার মতো বিনোদিনী উঠিয়া দাঁড়াইল। মহেন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “মাপ করো, আমার পরিহাস মাপ করো।”

বিনোদিনী সবেগে হাত ছিনাইয়া লইয়া কহিল, “পরিহাস করিতেছ কাহাকে। যদি তাঁহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিবার যোগ্য হইতে, তবে তাঁহাকে পরিহাস করিলে সহ্য করিতাম। তোমার ছোটো মন, বন্ধুত্ব করিবার শক্তি নাই, অথচ ঠাট্টা।”

বিনোদিনী চলিয়া যাইতে উদ্যত হইবামাত্র মহেন্দ্র দুই হাতে তাহার পা বেষ্টন করিয়া বাধা দিল।

এমন সময়ে সম্মুখে এক ছায়া পড়িল, মহেন্দ্র বিনোদিনীর পা ছাড়িয়া চমকিয়া মুখ তুলিয়া দেখিল, বিহারী।

বিহারী স্থির দৃষ্টিপাতে উভয়কে দগ্ধ করিয়া শান্ত ধীর স্বরে কহিল, “অত্যন্ত অসময়ে উপস্থিত হইয়াছি, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকিব না। একটা কথা বলিতে আসিয়াছিলাম। আমি কাশী গিয়াছিলাম, জানিতাম না, সেখানে বউঠাকরুণ আছেন। না জানিয়া তাঁহার কাছে অপরাধী হইয়াছি; তাঁহার কাছে ক্ষমা চাহিবার অবসর নাই, তাই তোমার কাছে ক্ষমা চাহিতে আসিয়াছি। আমার মনে জ্ঞানে অজ্ঞানে যদি কখনো কোনো পাপ স্পর্শ করিয়া থাকে, সেজন্য তাঁহাকে যেন কখনো কোনো দুঃখ সহ্য করিতে না হয়, তোমার কাছে আমার এই প্রার্থনা।”

বিহারীর কাছে দুর্বলতা হঠাৎ প্রকাশ পাইল বলিয়া মহেন্দ্রের মনটা যেন জ্বলিয়া উঠিল। এখন তাহার ঔদার্যের সময় নহে। সে একটু হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরঘরে কলা খাইবার যে গল্প আছে, তোমার ঠিক তাই দেখিতেছি। তোমাকে দোষ স্বীকার করিতেও বলি নাই; অস্বীকার করিতেও বলি নাই; তবে ক্ষমা চাহিয়া সাধু হইতে আসিয়াছ কেন।”

বিহারী কাঠের পুতুলের মতো কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল–তার পরে যখন কথা বলিবার প্রবল চেষ্টায় তাহার ঠোঁট কাঁপিতে লাগিল, তখন বিনোদিনী বলিয়া উঠিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, তুমি কোনো উত্তর দিয়ো না। কিছুই বলিয়ো না। ঐ লোকটি যাহা মুখে আনিল, তাহাতে উহারই মুখে কলঙ্ক লাগিয়া রহিল, সে কলঙ্ক তোমাকে স্পর্শ করে নাই।”

বিনোদিনীর কথা বিহারীর কানে প্রবেশ করিল কি না সন্দেহ–সে যেন স্বপ্নচালিতের মতো মহেন্দ্রের ঘরের সম্মুখ হইতে ফিরিয়া সিঁড়ি দিয়া নামিয়া যাইতে লাগিল।

বিনোদিনী তাহার পশ্চাতে গিয়া কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, আমাকে কি তোমার কোনো কথা বলিবার নাই। যদি তিরস্কারের কিছু থাকে, তবে তিরস্কার করো।”

বিহারী যখন কোনো উত্তর না করিয়া চলিতে লাগিল, বিনোদিনী সম্মুখে আসিয়া দুই হাতে তাহার দক্ষিণ হাত চাপিয়া ধরিল। বিহারী অপরিসীম ঘৃণার সহিত তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল। সেই আঘাতে বিনোদিনী যে পড়িয়া গেল তাহা সে জানিতেও পারিল না।

পতনশব্দ শুনিয়া মহেন্দ্র ছুটিয়া আসিল। দেখিল, বিনোদিনীর বাম হাতের কনুয়ের কাছে কাটিয়া রক্ত পড়িতেছে।

মহেন্দ্র কহিল, “ইস্‌, এ যে অনেকটা কাটিয়াছে” বলিয়া তৎক্ষণাৎ নিজের পাতলা জামা খানিকটা টানিয়া ছিঁড়িয়া ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধিতে প্রস্তুত হইল।

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত সরাইয়া লইয়া কহিল, “না না, কিছুই করিয়ো না, রক্ত পড়িতে দাও।”

মহেন্দ্র কহিল, “বাঁধিয়া একটা ঔষধ দিতেছি, তা হইলে আর ব্যথা হইবে না, শীঘ্র সারিয়া যাইবে।”

বিনোদিনী সরিয়া গিয়া কহিল, “আমি ব্যথা সারাইতে চাই না, এ কাটা আমার থাক্‌।”

মহেন্দ্র কহিল, “আজ অধীর হইয়া তোমাকে আমি লোকের সামনে অপদস্থ করিয়াছি, আমাকে মাপ করিতে পারিবে কি।”

বিনোদিনী কহিল, “মাপ কিসের জন্য। বেশ করিয়াছ। আমি কি লোককে ভয় করি। আমি কাহাকেও মানি না। যাহারা আঘাত করিয়া ফেলিয়া চলিয়া যায়, তাহারাই কি আমার সব, আর যাহারা আমাকে পায়ে ধরিয়া টানিয়া রাখিতে চায়, তাহারা আমার কেহই নহে?”

মহেন্দ্র উন্মত্ত হইয়া গদগদকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “বিনোদিনী, তবে আমার ভালোবাসা তুমি পায়ে ঠেলিবে না?”

বিনোদিনী কহিল, “মাথায় করিয়া রাখিব। ভালোবাসা আমি জন্মাবধি এত বেশি পাই নাই যে, “চাই না’ বলিয়া ফিরাইয়া দিতে পারি।”

মহেন্দ্র তখন দুই হাতে বিনোদিনীর দুই হাত ধরিয়া কহিল,”তবে এসো আমার ঘরে। তোমাকে আজ আমি ব্যথা দিয়াছি, তুমিও আমাকে ব্যথা দিয়া চলিয়া আসিয়াছ–যতক্ষণ তাহা একেবারে মুছিয়া না যাইবে, ততক্ষণ আমার খাইয়া শুইয়া কিছুতেই সুখ নাই।”

বিনোদিনী কহিল,”আজ নয়, আজ আমাকে ছাড়িয়া দাও। যদি তোমাকে দুঃখ দিয়া থাকি, মাপ করো।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমিও আমাকে মাপ করো, নহিলে আমি রাত্রে ঘুমাইতে পারিব না।”

বিনোদিনী কহিল,”মাপ করিলাম।”

মহেন্দ্র তখনই অধীর হইয়া বিনোদিনীর কাছে হাতে-হাতে ক্ষমা ও ভালোবাসারএকটা নিদর্শন পাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিল। কিন্তু বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। বিনোদিনী সিঁড়ি দিয়া নামিয়া চলিয়া গেল– মহেন্দ্রও ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া ছাদে বেড়াইতে লাগিল। বিহারীর কাছে হঠাৎ আজ মহেন্দ্র ধরা পড়িয়াছে, ইহাতে তাহার মনে একটা মুক্তির আনন্দ উপস্থিত হইল। লুকোচুরির যে-একটা ঘৃণ্যতা আছে, একজনের কাছে প্রকাশ হইয়াই যেন তাহা অনেটা দূর হইল। মহেন্দ্র মনে মনে কহিল, “আমি নিজেকে ভালো বলিয়া মিথ্যা করিয়া আর চালাইতে চাহি না–কিন্তু আমি ভালোবp–আমি ভালোবাসি, সে কথা মিথ্যে নহে।’ — নিজের ভালোবাসার গৌরবে তাহার স্পর্ধা এতই বাড়িয়া উঠিল যে, নিজেকে মন্দ বলিয়া সে আপন মনে উদ্ধতভাবে গর্ব করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যাকলে নীরব-জ্যোতিষ্কমণ্ডলী-অধিরাজিত অনন্ত জগতের প্রতি একটা অবজ্ঞা নিক্ষেপ করিয়া মনে মনে কহিল, “যে আমাকে যত মন্দই মনে করুক, কিন্তু আমি ভালোবাসি।’ বলিয়া বিনোদিনীর মানসী মূর্তিকে দিয়া মহেন্দ্র সমস্ত আকাশ, সমস্ত সংসার, সমস্ত কর্তব্য আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। বিহারী হঠাৎ আসিয়া আজ যেন মহেন্দ্রের জীবনের ছিপি-আঁটা মসীপাত্র উলটাইয়া ভাঙিয়া ফেলিল–বিনোদিনীর কালো চোখ এবং কালো চুলের কালি দেখিতে দেখিতে বিস্তৃত হইয়া পূর্বেকার সমস্ত সাদা এবং সমস্ত লেখা লেপিয়া একাকার করিয়া দিল।

punampntg

28

Mahendra had been physically and mentally exhausted the next morning after spending a sleepless night in tremendous emotional upheaval. It was the middle of the month of Phalgun and the weather was growing warmer. On other days, Mahendra sat with his books at the table in the corner of his bedroom. Today he leaned against a bolster on the floor and studied. The hours passed but he did not go for a bath. The street vendors hawked their wares on the street. Carriages passed incessantly on the road carrying people to work. The neighbour was building a new house, the women who worked as labourers began their monotonous song to the thuds of the terrace building. The warm southerly breeze made Mahendra’s troubled nerves relax; no terrible pledge, strenuous effort or deep thought seemed to suit the mood of the spring day.

 ‘Sir, what is wrong with you today? Will you not bather? The food is prepared. Why are you lying down? Are you ill? Do you have a headache?’ Binodini drew close to him and felt his forehead.

 Mahendra mumbled, his eyes half closed, ‘I do not feel very well – I will not bathe today.’

 Binodini said, ‘Even if you do not bathe, at least eat something.’ She remonstrated with Mahendra til he submitted to her anxious attentions and went to the dining room where he ate his lunch.

 He returned to his room and lay down on the floor after his meal while Binodini gently pressed his temples. His eyes half closed, he said to her, ‘Bali, you have not eaten yet, go and eat now.’

 Binodini could not be persuaded to leave. The curtains stirred in the hot breeze of that lazy afternoon and the meaningless rustlings of the trembling coconut leaves near the wall filled the room. Mahendra’s heart beat faster and faster and Binodini’s breath blew on the hair on his forehead. No one spoke a word. Mahendra thought, ‘I am floating on the eternal currents of this endless world, does it matter to anyone where my boat moors and for how long.’

As she sat by his head stroking his forehead, the desires of her eager unfulfilled youth made Binodini lean lower and lower till her hair touched Mahendra’s cheek. His body trembled at the gentle touch of that tendril of hair and he felt as though his breath was confined in his chest from whence it could not escape. He sat up suddenly and said, ‘No, I have classes, I have to go!’ He then stood up without looking at Binodini.

 Binodini said, ‘Why the hurry, let me get your clothes,’ and she took his clothes out of the cupboard.

 Mahendra went to classes quickly, but he could not concentrate there either. He tried in vain to focus on his studies but failing that, came home early.

 When he came home, he found Binodini lying on the floor with a pillow under her chest reading a book –  a cloud of black hair covering her back. Possibly she had not heard the sound of his shoes. Mahendra stepped carefully and drew close to her just in time to hear her sigh deeply.

 Mahendra jested, ‘Oh paragon of mercy, do not waste your feelings for imaginary people. What are you reading?’

 Startled, Binodini got up hurriedly and hid the book in her clothes. Mahendra tried to take it from her by force. After much struggling, he got hold of the book and read its title – ‘The Poison Tree’. Binodini panted with the exertions and turned her face from him in anger.

 Mahendra’s heart was filled with emotions. He smiled with a great effort and said, ‘Shame! This is nothing! I thought it would be some great secret that I was wresting from you. ‘The Poison Tree’ after all that!’

Binodini answered, ‘What great secret could I possibly have?’

 Mahendra burst out, ‘Suppose, it had been a letter from Bihari?’

Binodini’s eyes flashed angrily like lightning. Her gentle mood was gone in an instant and she stood up straight as a flame. Mahendra grabbed her hand and entreated, ‘Forgive me, forgive my jest!’

 Binidini snatched her hand away forcefully, saying, ‘Who are you jesting about? If you were even worthy of his friendship, I could have borne your jests. But you have a narrow mind without the strength to sustain a friendship and yet you think you may jest!’

 As she tried to leave, Mahendra circled her feet with his arms and prevented her from moving.

A shadow fell across them and he let go of her feet, looking up to see Bihari.

 Bihari’s constant gaze chastised both as he said calmly, ‘I can see that I have come at the wrong time, but I will not stay for long. I came to say but one thing. I went to Kashi without knowing that your wife was there. I wronged her unknowingly but as there is no time to beg her forgiveness, I am here to beg yours. If I have ever allowed any impure thoughts to dwell within me with or without my knowledge, I implore you that she never be blamed for that.’

Mahendra was furious at being suddenly found out by Bihari. This was not his time to be generous.

He smiled a little and said, ‘The story about someone eating bananas in the temple seems to suit your situation. I have neither asked you to admit you are at fault or to deny it; then why are you trying to redeem yourself by begging to be pardoned?’

 Bihari stood there for a while like a statue – then his lips trembled when he tried to speak. Binodini now spoke out, ‘Bihari, do not answer these words. Say nothing, Whatever this man is saying blackens him alone, it does not touch you at all.’

 I doubt that Bihari heard a word of what Binodini said – for he began descending the stairs like a sleep walker.

Binodini followed him and said, ‘Bihari, do you have nothing to say to me? If you have harsh words, say them.’

 Seeing that Bihari was not listening to her, Binodini held his right hand with both of hers to try and stop him. He shook her off with immense hatred and did not look back to see that she fell down when he pushed her away.

 Mahendra heard the sound of her fall and came rushing to see that she was bleeding from a cut near her left elbow.

He ripped a piece from his own shirt and prepared to bind the cut saying, ‘This is a deep cut.’

Binodini quickly moved her arm away and said, ‘It is nothing, let it bleed.’

Mahendra said, ‘Let me give you a medicine after bandaging it, then it will not hurt so much and will heal quickly.’

Binodini moved away, ‘I do not want to get better, let this pain be mine.’

 Mahendra persisted, ‘I have insulted you in front of others today, will you be able to forgive me?’

 Binodini asked, ‘Why ask for forgiveness? You have done the right thing. Do I fear people? I heed no one. Are those who push me away and leave me, the ones I must care for, and the one who clings to my feet be of no consequence to me?’

 Mahendra, maddened with feeling, said, ‘Binodini, so you will not spurn my love?’

 Binodini answered, ‘I will worship your love. I have not had so much affection that I can afford to turn it away, saying ‘I do not want this.’

Mahendra held her hands in his and said, ‘Then come to my room. I have hurt you today and you too have hurt me – I cannot be happy until I have erased those memories.’

 Binodini: Not today. Let me be today. If I have hurt you, forgive me.

Mahendra: You must forgive me too. Else I will not be able to sleep.

Binodini said, ‘I have forgiven you.’

Mahendra was eager to receive some immediate proof of Binodini’s forgiveness and love, But he could not say anything when he looked at her face. She went downstairs while he climbed up to the terrace where he walked about. He was feeling a sense of freedom at being discovered by Bihari. There is a kind of shame in secrecy and that seemed to have been greatly removed by his unveiling. He told himself, ‘I do not want to pretend to be good but it is no lie that I love someone else.’ He was so emboldened with his pride in being in love that he rejoiced in the knowledge of his own wrong doing. He threw a wordless challenge at the vast universe that lay above him with its stars and constellations and said, ‘No matter what evil people think I am capable of, I am in love.’ His thoughts of Binodini’s gradually drowned out the sky and the world and even his responsibilities. It was as if Bihari had come and tipped over the tightly sealed ink well of Mahendra’s life – the darkness of Binodini’s eyes and her hair seemed to obliterate all the clarity of his past existence and wipe out all that had happened earlier.

চোখের বালি ২৩/ Chokher Bali 23

২৩

সংসারত্যাগিনী অন্নপূর্ণা বহুদিন পরে হঠাৎ মহেন্দ্রকে আসিতে দেখিয়া যেমন স্নেহে আনন্দে আপ্লুত হইয়া গেলেন, তেমনি তাঁহার হঠাৎ ভয় হইল, বুঝি আশাকে লইয়া মার সঙ্গে মহেন্দ্রের আবার কোনো বিরোধ ঘটিয়াছে এবং মহেন্দ্র তাঁহার কাছে নালিশ জানাইয়া সান্ত্বনালাভ করিতে আসিয়াছে। মহেন্দ্র শিশুকাল হইতেই সকলপ্রকার সংকট ও সন্তাপের সময় তাহার কাকীর কাছে ছুটিয়া আসে। কাহারো উপর রাগ করিলে অন্নপূর্ণা তাহার রাগ থামাইয়া দিয়াছেন, দুঃখবোধ করিলে তাহা সহজে সহ্য করিতে উপদেশ দিয়াছেন। কিন্তু বিবাহের পর হইতে মহেন্দ্রের জীবনে সর্বাপেক্ষা যে সংকটের কারণ ঘটিয়াছে, তাহার প্রতিকারচেষ্টা দূরে থাক্‌, কোনোপ্রকার সান্ত্বনা পর্যন্ত তিনি দিতে অক্ষম। সে সম্বন্ধে যেভাবে যেমন করিয়াই তিনি হস্তক্ষেপ করিবেন,তাহাতেই মহেন্দ্রের সাংসারিক বিপ্লব আরো দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিবে ইহাই যখন নিশ্চয় বুঝিলেন, তখনই তিনি সংসার ত্যাগ করিলেন। রুগ্‌ণ শিশু যখন জল চাহিয়া কাঁদে, এবং জল দেওয়া যখন কবিরাজের নিতান্ত নিষেধ, তখন পীড়িতচিত্তে মা যেমন অন্য ঘরে চলিয়া যান, অন্নপূর্ণা তেমনি করিয়া নিজেকে প্রবাসে লইয়া গেছেন। দূর তীর্থবাসে থাকিয়া ধর্মকর্মের নিয়মিত অনুষ্ঠানে এ কয়দিন সংসার অনেকটা ভুলিয়াছিলেন, মহেন্দ্র আবার কি সেই-সকল বিরোধের কথা তুলিয়া তাঁহার প্রচ্ছন্ন ক্ষতে আঘাত করিতে আসিয়াছে।

কিন্তু মহেন্দ্র আশাকে লইয়া তাহার মার সম্বন্ধে কোনো নালিশের কথা তুলিল না। তখন অন্নপূর্ণার আশঙ্কা অন্য পথে গেল। যে মহেন্দ্র আশাকে ছাড়িয়া কালেজে যাইতে পারিত না, সে আজ কাকীর খোঁজ লইতে কাশী আসে কেন। তবে কি আশার প্রতি মহেন্দ্রর টান ক্রমে ঢিলা হইয়া আসিতেছে। মহেন্দ্রকে তিনি কিছু আশঙ্কার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, “হাঁ রে মহিন, আমার মাথা খা, ঠিক করিয়া বল্‌ দেখি, চুনি কেমন আছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে তো বেশ ভালো আছে কাকীমা।”

“আজকাল সে কী করে, মহিন। তোরা কি এখনো তেমনি ছেলেমানুষ আছিস, না কাজকর্মে ঘরকন্নায় মন দিয়াছিস?”

মহেন্দ্র কহিল, “ছেলেমানুষি একেবারেই বন্ধ। সকল ঝঞ্ঝাটের মূল সেই চারুপাঠখানা যে কোথায় অদৃশ্য হইয়াছে, তাহার আর সন্ধান পাইবার জো নাই। তুমি থাকিলে দেখিয়া খুশি হইতে– লেখাপড়া শেখায় অবহেলা করা স্ত্রীলোকের পক্ষে যতদূর কর্তব্য, চুনি তাহা একান্ত মনে পালন করিতেছে।”

“মহিন, বিহারী কী করিতেছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “নিজের কাজ ছাড়া আর-সমস্তই করিতেছে। নায়েব-গোমস্তায় তাহার বিষয়সম্পত্তি দেখে; কী চক্ষে দেখে, তাহা ঠিক বলিতে পারি না। বিহারীর চিরকাল ঐ দশা। তাহার নিজের কাজ পরে দেখে, পরের কাজ সে নিজে দেখে।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি বিবাহ করিবে না, মহিন।”

মহেন্দ্র একটুখানি হাসিয়া কহিল, “কই, কিছুমাত্র উদ্‌যোগ তো দেখি না।”

শুনিয়া অন্নপূর্ণা হৃদয়ের গোপন স্থানে একটা আঘাত পাইলেন। তিনি নিশ্চয় বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাঁহার বোনঝিকে দেখিয়া, একবার বিহারী আগ্রহের সহিত বিবাহ করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহার সেই উন্মুখ আগ্রহ অন্যায় করিয়া অকস্মাৎ দলিত হইয়াছে। বিহারী বলিয়াছিল, “কাকীমা, আমাকে আর বিবাহ করিতে কখনো অনুরোধ করিয়ো না।” সেই বড়ো অভিমানের কথা অন্নপূর্ণার কানে বাজিতেছিল। তাঁহার একান্ত অনুগত সেই স্নেহের বিহারীকে তিনি এমন মনভাঙা অবস্থায় ফেলিয়া আসিয়াছিলেন, তাহাকে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারেন নাই। অন্নপূর্ণা অত্যন্ত বিমর্ষ ও ভীত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, “এখনো কি আশায় প্রতি বিহারীর মন পড়িয়া আছে।’

মহেন্দ্র কখনো ঠাট্টার ছলে, কখনো গম্ভীরভাবে, তাহাদের ঘরকন্নার আধুনিক সমস্ত খবর-বার্তা জানাইল, বিনোদিনীর কথার উল্লেখমাত্র করিল না।

এখন কালেজ খোলা, কাশীতে মহেন্দ্রের বেশি দিন থাকিবার কথা নয়। কিন্তু কঠিন রোগের পর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার মধ্যে গিয়া আরোগ্যলাভের যে সুখ, মহেন্দ্র কাশীতে অন্নপূর্ণার নিকটে থাকিয়া প্রতিদিন সেই সুখ অনুভব করিতেছিল– তাই একে একে দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল। নিজের সঙ্গে নিজের যে একটা বিরোধ জন্মিবার উপক্রম হইয়াছিল, সেটা দেখিতে দেখিতে দূর হইয়া গেল। কয়দিন সর্বদা ধর্মপরায়ণা অন্নপূর্ণার স্নেহমুখচ্ছবির সম্মুখে থাকিয়া, সংসারের কর্তব্যপালন এমনি সহজ ও সুখকর মনে হইতে লাগিল যে, তাহার পূর্বেকার আতঙ্ক হাস্যকর বোধ হইল। মনে হইল, বিনোদিনী কিছুই না। এমন কি, তাহার মুখের চেহারাই মহেন্দ্র স্পষ্ট করিয়া মনে আনিতে পারে না। অবশেষে মহেন্দ্র খুব জোর করিয়াই মনে মনে কহিল, “আশাকে আমার হৃদয় হইতে এক চুল সরাইয়া বসিতে পারে, এমন তো আমি কোথাও কাহাকেও দেখিতে পাই না।’

মহেন্দ্র অন্নপূর্ণাকে কহিল, “কাকীমা, আমার কালেজ কামাই যাইতেছে– এবারকার মতো তবে আসি। যদিও তুমি সংসারের মায়া কাটাইয়া একান্তে আসিয়া আছ– তবু অনুমতি করো মাঝে মাঝে আসিয়া তোমার পায়ের ধূলা লইয়া যাইব।”

মহেন্দ্র গৃহে ফিরিয়া আসিয়া যখন আশাকে তাহার মাসির স্নেহোপহার সিঁদুরের কৌটা ও একটি সাদা পাথরের চুমকি ঘটি দিল, তখন তাহার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাসিমার সেই পরমস্নেহময় ধৈর্য ও মাসিমার প্রতি তাহাদের ও তাহার শাশুড়ির নানাপ্রকার উপদ্রব স্মরণ করিয়া তাহার হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠিল। স্বামীকে জানাইল, “আমার বড়ো ইচ্ছা করে, আমি একবার মাসিমার কাছে গিয়া তাঁহার ক্ষমা ও পায়ের ধূলা লইয়া আসি। সে কি কোনোমতেই ঘটিতে পারে না।”

মহেন্দ্র আশার বেদনা বুঝিল, এবং কিছুদিনের জন্য কাশীতে সে তাহার মাসিমার কাছে যায়, ইহাতে তাহার সম্মতিও হইল। কিন্তু পুনর্বার কালেজ কামাই করিয়া আশাকে কাশী পৌঁছাইয়া দিতে তাহার দ্বিধা বোধ হইতে লাগিল।

আশা কহিল, “জেঠাইমা তো অল্পদিনের মধ্যেই কাশী যাইবেন, সেই সঙ্গে গেলে কি ক্ষতি আছে।”

মহেন্দ্র রাজলক্ষ্মীকে গিয়া কহিল, “মা, বউ একবার কাশীতে কাকীমাকে দেখিতে যাইতে চায়।”

রাজলক্ষ্মী শ্লেষবাক্যে কহিলেন, “বউ যাইতে চান তো অবশ্যই যাইবেন, যাও, তাঁহাকে লইয়া যাও।”

মহেন্দ্র যে আবার অন্নপূর্ণার কাছে যাতায়াত আরম্ভ করিল, ইহা রাজলক্ষ্মীর ভালো লাগে নাই। বধূর যাইবার প্রস্তাবে তিনি মনে মনে আরো বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।

মহেন্দ্র কহিল, “আমার কালেজ আছে, আমি রাখিতে যাইতে পারিব না। তাহার জেঠামশায়ের সঙ্গে যাইবে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে তো ভালো কথা। জেঠামশায়রা বড়োলোক, কখনো আমাদের মতো গরিবের ছায়া মাড়ান না, তাঁহাদের সঙ্গে যাইতে পারিলে কত গৌরব!”

মাতার উত্তরোত্তর শ্লেষবাক্যে মহেন্দ্রের মন একেবারে কঠিন হইয়া বাঁকিল। সে কোনো উত্তর না দিয়া আশাকে কাশী পাঠাইতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া চলিয়া গেল।

বিহারী যখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা করিতে আসিল, রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও বিহারী, শুনিয়াছিস, আমাদের বউমা যে কাশী যাইতে ইচ্ছা করিয়াছেন।”

বিহারী কহিল, “বল কী মা, মহিনদা আবার কালেজ কামাই করিয়া কাশী যাইবে?”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “না না, মহিন কেন যাইবেন। তা হইলে আর বিবিয়ানা হইল কই। মহিন এখানে থাকিবেন, বউ তাঁহার জেঠামহারাজের সঙ্গে কাশী যাইবেন। সবাই সাহেব-বিবি হইয়া উঠিল।”

বিহারী মনে মনে উদ্‌বিগ্ন হইল, বর্তমান কালের সাহেবিয়ানা স্মরণ করিয়া নহে। বিহারী ভাবিতে লাগিল, “ব্যাপারখানা কী। মহেন্দ্র যখন কাশী গেল আশা এখানে রহিল; আবার মহেন্দ্র যখন ফিরিল তখন আশা কাশী যাইতে চাহিতেছে। দুজনের মাঝখানে একটা কী গুরুতর ব্যাপার ঘটিয়াছে। এমন করিয়া কতদিন চলিবে? বন্ধু হইয়াও আমরা ইহার কোনো প্রতিকার করিতে পারিবে না– দূরে দাঁড়াইয়া থাকিব?’

মাতার ব্যবহারে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হইয়া মহেন্দ্র তাহার শয়নঘরে আসিয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী ইতিমধ্যে মহেন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নাই– তাই আশা তাহাকে পাশের ঘর হইতে মহেন্দ্রের কাছে লইয়া আসিবার জন্য অনুরোধ করিতেছিল।

এমন সময় বিহারী আসিয়া মহেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করিল, “আশা-বোঠানের কি কাশী যাওয়া স্থির হইয়াছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “না হইবে কেন। বাধাটা কী আছে।”

বিহারী কহিল, “বাধার কথা কে বলিতেছে। কিন্তু হঠাৎ এ খেয়াল তোমাদের মাথায় আসিল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “মাসিকে দেখিবার ইচ্ছা– প্রবাসী আত্মীয়ের জন্য ব্যাকুলতা, মানবচরিত্রে এমন মাঝে মাঝে ঘটিয়া থাকে।”

বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি সঙ্গে যাইতেছ?”

প্রশ্ন শুনিয়াই মহেন্দ্র ভাবিল, “জেঠার সঙ্গে আশাকে পাঠানো সংগত নহে, এই কথা লইয়া আলোচনা করিতে বিহারী আসিয়াছে।’ পাছে অধিক কথা বলিতে গেলে ক্রোধ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে, তাই সংক্ষেপে বলিল, “না।”

বিহারী মহেন্দ্রকে চিনিত। সে যে রাগিয়াছে, তাহা বিহারীর আগোচর ছিল না। একবার জিদ ধরিলে তাহাকে টলানো যায় না, তাহাও সে জানিত। তাই মহেন্দ্রের যাওয়ার কথা আর তুলিল না। মনে মনে ভাবিল, “বেচারা আশা যদি কোনো বেদনা বহন করিয়াই চলিয়া যাইতেছে হয়, তবে সঙ্গে বিনোদিনী গেলে তাহার সান্ত্বনা হইবে।’ তাই ধীরে ধীরে কহিল, “বিনোদ-বোঠান তাঁর সঙ্গে গেলে হয় না?”

মহেন্দ্র গর্জন করিয়া উঠিল, “বিহারী, তোমার মনের ভিতর যে-কথাটা আছে, তাহা স্পষ্ট করিয়া বলো। আমার সঙ্গে অসরলতা করিবার কোনো দরকার দেখি না। আমি জানি, তুমি মনে মনে সন্দেহ করিয়াছ, আমি বিনোদিনীকে ভালোবাসি। মিথ্যা কথা। আমি বাসি না। আমাকে রক্ষা করিবার জন্য তোমাকে পাহারা দিয়া বেড়াইতে হইবে না। তুমি এখন নিজেকে রক্ষা করো। যদি সরল বন্ধুত্ব তোমার মনে থাকিত, তবে বহুদিন আগে তুমি আমার কাছে তোমার মনের কথা বলিতে এবং নিজেকে বন্ধুর অন্তঃপুর হইতে বহু দূরে লইয়া যাইতে। আমি তোমার মুখের সামনে স্পষ্ট করিয়া বলিতেছি, তুমি আশাকে ভালোবাসিয়াছ।”

অত্যন্ত বেদনার স্থানে দুই পা দিয়া মাড়াইয়া দিলে, আহত ব্যক্তি মুহূর্তকাল বিচার না করিয়া আঘাতকারীকে যেমন সবলে ধাক্কা দিয়া ফেলিতে চেষ্টা করে–রুদ্ধকণ্ঠ বিহারী তেমনি পাংশুমুখে তাহার চৌকি হইতে উঠিয়া মহেন্দ্রের দিকে ধাবিত হইল–হঠাৎ থামিয়া বহুকষ্টে স্বর বাহির করিয়া কহিল, “ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করুন, আমি বিদায় হই।” বলিয়া টলিতে টলিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল!

পাশের ঘর হইতে বিনোদিনী ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, “বিহারী-ঠাকুরপো!”

বিহারী দেয়ালে ভর করিয়া একটুখানি হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “কী, বিনোদ-বোঠান!”

বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, চোখের বালির সঙ্গে আমিও কাশীতে যাইব।”

বিহারী কহিল, “না না, বোঠান, সে হইবে না, সে কিছুতেই হইবে না। তোমাকে মিনতি করিতেছি–আমার কথায় কিছুই করিয়ো না। আমি এখানকার কেহ নই, আমি এখানকার কিছুতেই হস্তক্ষেপ করিতে চাহি না, তাহাতে ভালো হইবে না। তুমি দেবী, তুমি যাহা ভালো বোধ কর, তাহাই করিয়ো। আমি চলিলাম।”

বলিয়া বিহারী বিনোদিনীকে বিনম্র নমস্কার করিয়া চলিল। বিনোদিনী কহিল, “আমি দেবী নই ঠাকুরপো, শুনিয়া যাও। তুমি চলিয়া গেলে কাহারো ভালো হইবে না। ইহার পরে আমাকে দোষ দিয়ো না।”

বিহারী চলিয়া গেল। মহেন্দ্র স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী তাহার প্রতি জ্বলন্ত বজ্রের মতো একটা কঠোর কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল, সে-ঘরে আশা একান্ত লজ্জায় সংকোচে মরিয়া যাইতেছিল। বিহারী তাহাকে ভালোবাসে, এ কথা মহেন্দ্রের মুখে শুনিয়া সে আর মুখ তুলিতে পারিতেছিল না। কিন্তু তাহার উপর বিনোদিনীর আর দয়া হইল না। আশা যদি তখন চোখ তুলিয়া চাহিত, তাহা হইলে সে ভয় পাইত। সমস্ত সংসারের উপর বিনোদিনীর যেন খুন চাপিয়া গেছে। মিথ্যা কথা বটে! বিনোদিনীকে কেহই ভালোবাসে না বটে! সকলেই ভালোবাসে এই লজ্জাবতী ননির পুতুলটিকে।

মহেন্দ্র সেই যে আবেগের মুখে বিহারীকে বলিয়াছিল, “আমি পাষণ্ড”–তাহার পর আবেগ শান্তির পর হইতে সেই হঠাৎ আত্মপ্রকাশের জন্য সে বিহারীর কাছে কুণ্ঠিত হইয়া ছিল। সে মনে করিতেছিল, তাহার সব কথাই যেন ব্যক্ত হইয়া গেছে। সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না, অথচ বিহারী জানিয়াছে যে সে ভালোবাসে–ইহাতে বিহারীর উপরে তাহার বড়ো একটা বিরক্তি জন্মিতেছিল। বিশেষত, তাহার পর হইতে যতবার বিহারী তাহার সম্মুখে আসিতেছিল তাহার মনে হইতেছিল, যেন বিহারী সকৌতূহলে তাহার একটা ভিতরকার কথা খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। সেই-সমস্ত বিরক্তি উত্তরোত্তর জমিতেছিল– আজ একটু আঘাতেই বাহির হইয়া পড়িল।

কিন্তু বিনোদিনী পাশের ঘর হইতে যেরূপ ব্যাকুলভাবে ছুটিয়া আসিল, যেরূপ আর্তকণ্ঠে বিহারীকে রাখিতে চেষ্টা করিল এবং বিহারীর আদেশ পালন স্বরূপে আশার সহিত কাশী যাইতে প্রস্তুত হইল, ইহা মহেন্দ্রের পক্ষে অভাবিতপূর্ব। এই দৃশ্যটি মহেন্দ্রকে প্রবল আঘাতে অভিভূত করিয়া দিল। সে বলিয়াছিল, সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না; কিন্তু যাহা শুনিল, যাহা দেখিল, তাহা তাহাকে সুস্থির হইতে দিল না, তাহাকে চারি দিক হইতে বিচিত্র আকারে পীড়ন করিতে লাগিল। আর কেবলই নিষ্ফল পরিতাপের সহিত মনে হইতে লাগিল, “বিনোদিনী শুনিয়াছে– আমি বলিয়াছি “আমি তাহাকে ভালোবাসি না’।’

punampntg

23

Although Annapurna had forsaken all ties to her home, she was overcome by her love for Mahendra and her happiness at seeing him after such a long time. She was also worried that he had come seeking support from her after quarrelling with his own mother over Asha. Since his childhood he had been in the habit of coming to his aunt whenever he was in strife or distressed. She had soothed his anger when he was upset with others and had taught him to put his pain aside when he was hurt by someone.

But the main reason behind the turmoil that affected Mahendra’s married life was something that she could not help with as she was indeed unable to provide any consolation. She had left home when it became clear to her that whatever her involvement in the matter, it would only serve to double the upheaval within the family. When a sick child cries for some water but the physician issues a strict order against it, the saddened mother must leave the room; Annapurna had gone away for much the same reason. She had largely managed to forget her old life by losing herself in the daily routine of prayers and religious activities and was worried that Mahendra had returned to talk of the conflict and reopen old wounds.

But Mahendra said nothing of his mother’s behavior with Asha. Annapurna then started to worry about something else. The man who had once been unable to attend classes as it would have meant leaving Asha alone was now in Kashi on his own to enquire after his aunt. Did this mean that his affection for Asha was lessening? She asked him with some trepidation. ‘Mahin, do tell me the truth, please! How is Chuni?’

Mahendra said, ‘She is fine Aunt.’

‘What does she do these days? Are you two still as immature as before, or have you started paying attention to the demands of daily life?’

Mahendra answered, ‘All childishness has been put aside. We cannot even find the old Charupath text that was at the root of all the problems. You will be pleased to know that Chuni devotes all her attention to neglecting her studies as wholeheartedly as any woman has ever done.’

‘What is Bihari doing?’

‘He is involved in everything but his own work; His employees look after his affairs but the nature of their vigilance is questionable. He has always been like that. He attends to the business of others while others attend to his affairs.’

Annapurna asked, ‘Does he not wish to get married?’

Mahendra smiled slightly and said, ‘I cannot say there are any signs of that.’

Annapurna was saddened to hear this. She understood that Bihari had once been eager about marriage after seeing her niece Asha but that wish had been thwarted wrongfully and abruptly. He had said to her, ‘Aunt, never ask me to marry someone again.’ She remembered his great pain. Although she loved Bihari she had left without providing him any solace during his disappointment over Asha. Annapurna became very unhappy and worried as she wondered whether Bihari was still in love with Asha.

Mahendra gradually divulged the details of his life with Asha in Kolkata, sometimes jokingly and at other times in all seriousness. He never mentioned Binodini.

His classes had begun and he should have not been able to stay in Kashi for very long. But after each day with Annapurna, he felt the pleasure that one feels after moving to a pleasant locale after suffering from severe illness. The days passed quickly. The inner conflict that he had once suffered was now gone. After spending all his time over a few days with the pious, gentle Annapurna he felt that the responsibilities of family life were so easy and pleasant that his former fears seemed laughable. He began to think of Binodini as unimportant. He could not even remember her face clearly when he tried. Eventually he told himself with complete convicton, ‘I do not think that it would be possible for anyone to dethrone Asha from where she rules within my heart.’

Mahendra said to Annapurna, ‘Aunt, I will have to leave Kashi soon as I am missing classes. But even though you have left family life behind, please give me permission to come and see you occasionally.’

When Mahendra came home and gave Asha the vermilion container and white stone pitcher her aunt had sent for her as gifts, she began to weep. Her heart was pained by memories of her aunt’s loving patience and the misbehavior meted out to her both by the two of them and by her mother-in-law. She asked her husband, ‘I really wish I could go and ask her for her forgiveness. Is that possible at all?’

Mahendra understood her pain and agreed to her visiting her aunt for a few days in Kashi. But he was not keen about missing classes again by accompanying her.

Asha asked, ‘My aunt is going to Kashi soon, what harm in going with her?’

Mahendra went to Rajlakshmi and said, ‘Ma, my wife wishes to go and see her aunt in Kashi.’

Rajlakshmi answered sarcastically, ‘If she has wished this, then of course she must go; do take her.’

She was not pleased that Mahendra had started seeing his aunt Annapurna again. She became even more annoyed when she heard that her daughter-in-law was thinking of visiting the aunt as well.

Mahendra said, ‘I have classes and will not be able to take her. She will have to go with her uncle.’

Rajlakshmi answered, ‘That is great. They are wealthy enough to never condescend to visiting us, so going with them will be a great honour indeed.’

Mahendra’s resolve was hardened by the sharp words from his mother. He said no more and determined to send Asha to Kashi as he left Rajlakshmi’s presence.

When Bihari came to see Rajlakshmi, she said, ‘Have you heard, our daughter-in-law has expressed a desire to go to Kashi?’

Bihari replied, ‘What! Is Mahendra going to take time off classes again to take her there?’

Rajlakshmi answered, ‘No, why should Mahen go? That would not be outrageous enough, would it? He will stay here and she will go with her uncle the Great. Everyone has become so modern these days.’

Bihari became concerned, although not because of the incursions of modernity. He thought, ‘What is going on? Asha stayed here while Mahendra took off for Kashi; now that he is back, she wants to go there. Something seriously wrong has happened between the two of them. How long can this go on for? As a friend am I supposed to stand by doing nothing and just watch from afar?’

Mahendra was sitting in his bedroom feeling extremely upset with his mother. Binodini had not seen him after his arrival and Asha was next door trying to convince her to join the two of them.

Bihari came in and said, ‘Is it certain that your wife is going to Kashi?’

Mahendra asked, ‘Why not? What is stopping her?’

Bihari said, ‘I did not say anyone was stopping her from going. But why now?’

Mahendra answered, ‘She wishes to see her aunt – people do sometimes feel that they would be happy to see relatives living elsewhere.’

Bihari persisted, ‘Are you going with her?’

As soon as Mahendra heard the question he thought, ‘Bihari is here to convince me that Asha should not be sent to Kashi with her uncle.’ He wished to prevent a prolonged discussion and simply said, ‘No.’

Bihari knew Mahendra well. He realised that Mahendra was angry and that it was impossible to change his mind once he had decided on doing something. He did not raise the topic of Mahendra accompanying Asha. He thought to himself, ‘If the wretched Asha is going with a sad heart, Binodini could accompany her as a consolation.’ He then said softly, ‘Would it be possible for Binodini to go with her?’

Mahendra shouted, ‘Bihari, you have to disclose what is in your mind. I see no reason for you to tell me lies. I know that you suspect me of loving Binodini. That is not true! I do not love her. You do not have to be with me constantly in order to protect me. You should save yourself. If you had genuine feelings of friendship for me you could have told me the truth a long time ago and done the honourable thing by removing yourself from our household. I am telling you what you cannot bring yourself to utter, you have fallen in love with Asha.’

Just as a person with an injury does not think for a moment before pushing away someone trying to hurt them, dumbstruck, Bihari quickly rose, moved towards Mahendra as if to strike him; and then came to his senses, saying, ‘May god forgive you, I am leaving now.’ He then walked unsteadily out of the room.

Binodini hurriedly came from next door and called, ‘Bihari!’

Bihari leaned against the wall and smiled wanly, saying, ‘What?’

Binodini said, ‘Brother, I will go to Kashi too with Bali.’

Bihari said, ‘No, sister, that cannot be! I am pleading with you – do not listen to anything I say. I am no one to these people; I do not wish to interfere in any of their business. That can only end in unhappiness. You are a goddess; do whatever you think is right. I am leaving.’

As Bihari folded his hands in a gentle greeting to Binodini and prepared to leave, she said, ‘Listen brother, I am no goddess. If you leave it will not bode well for anyone. Do not blame me for anything after this.’

Bihari went away. Mahendra sat in stunned silence. Binodini looked at him furiously, her eyes flashing like lightning before going next door where Asha was cringing in shame and despair. She could not look at Mahendra after hearing him say that Bihari loved her. But Binodini did not feel the slightest compassion for her. If Asha had looked up at Binodini she would have been frightened as Binodini looked ready to murder someone. Lies indeed! No one loved Binodini! They all loved this shy timid doll-like creature.

Now that he was calmer, Mahendra was mortified that he had bared his soul to Bihari in an emotional outburst when he prided himself on being made of stone. He felt that all his thoughts had been disclosed with that one action. He did not love Binodini and yet the fact that Bihari knew that he did made him dislike Bihari greatly. In particular ,every time the two had met since that day Mahendra felt as though Bihari had been amusing himself by trying to discover his innermost secrets. These aggravations had been accumulating and erupted today with very slight provocation.

But the manner in which Binodini came rushing anxiously from the other room, the pleas with which she tried to prevent Bihari from leaving and her agreement to Bihari’s order to accompany Asha to Kashi astonished Mahendra as he had not anticipated this. He was very affected when he thought of how he had declared that he did not love her; but what he saw and heard made him restless and bothered him with a hundred unexplained thoughts. All he could think of with a sense of hopelessness was, ‘Binodini has heard me say…I do not love her.’

Chokher Bali 22, Part 1/চোখের বালি ২২, প্রথম অংশ

২২

মহেন্দ্র ঘরে ফিরিয়া আসিবামাত্র তাহার মুখ দেখিয়াই আশার মনের সমস্ত সংশয় ক্ষণকালের কুয়াশার মতো এক মুহূর্তেই কাটিয়া গেল। নিজের চিঠির কথা স্মরণ করিয়া লজ্জায় মহেন্দ্রের সামনে সে যেন মুখ তুলিতেই পারিল না। মহেন্দ্র তাহার উপরে ভর্ৎসনা করিয়া কহিল, “এমন অপবাদ দিয়া চিঠিগুলা লিখিলে কী করিয়া।”

বলিয়া পকেট হইতে বহুবার পঠিত সেই চিঠি তিনখানি বাহির করিল। আশা ব্যাকুল হইয়া কহিল, “তোমার পায়ে পড়ি, ও চিঠিগুলো ছিঁড়িয়া ফেলো।” বলিয়া মহেন্দ্রের হাত হইতে চিঠিগুলা লইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল। মহেন্দ্র তাহাকে নিরস্ত করিয়া সেগুলি পকেটে পুরিল। কহিল, “আমি কর্তব্যের অনুরোধে গেলাম, আর তুমি আমার অভিপ্রায় বুঝিলে না? আমাকে সন্দেহ করিলে?”

আশা ছল-ছল চোখে কহিল, “এবারকার মতো আমাকে মাপ করো। এমন আর কখনোই হইবে না।”

মহেন্দ্র কহিল, “কখনো না?”

আশা কহিল, “কখনো না।”

তখন মহেন্দ্র তাহাকে টানিয়া লইয়া চুম্বন করিল। আশা কহিল, “চিঠিগুলা দাও, ছিঁড়িয়া ফেলি।”

মহেন্দ্র কহিল, “না, ও থাক্‌!”

আশা সবিনয়ে মনে করিল, “আমার শাস্তিস্বরূপ এ চিঠিগুলি উনি রাখিলেন।’

এই চিঠির ব্যাপারে বিনোদিনীর উপর আশার মনটা একটু যেন বাঁকিয়া দাঁড়াইল। স্বামীর আগমনবার্তা লইয়া সে সখীর কাছে আনন্দ করিতে গেল না– বরঞ্চ বিনোদিনীকে একটু যেন এড়াইয়া গেল। বিনোদিনী সেটুকু লক্ষ্য করিল এবং কাজের ছল করিয়া একেবারে দূরে রহিল।

মহেন্দ্র ভাবিল, “এ তো বড়ো অদ্ভুত। আমি ভাবিয়াছিলাম, এবার বিনোদিনীকে বিশেষ করিয়াই দেখা যাইবে– উল্‌টা হইল? তবে সে চিঠিগুলার অর্থ কী।’

নারীহৃদয়ের রহস্য বুঝিবার কোনো চেষ্টা করিবে না বলিয়াই মহেন্দ্র মনকে দৃঢ় করিয়াছিল– ভাবিয়াছিল, বিনোদিনী যদি কাছে আসিবার চেষ্টা করে, তবু আমি দূরে থাকিব।’ আজ সে মনে মনে কহিল, “না, এ তো ঠিক হইতেছে না। যেন আমাদের মধ্যে সত্যই কী একটা বিকার ঘটিয়াছে। বিনোদিনীর সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা আমোদপ্রমোদ করিয়া এই সংশয়াচ্ছন্ন গুমোটের ভাবটা দূর করিয়া দেওয়া উচিত।’

আশাকে মহেন্দ্র কহিল, “দেখিতেছি, আমিই তোমার সখীর চোখের বালি হইলাম। আজকাল তাঁহার আর দেখাই পাওয়া যায় না।”

আশা উদাসীন ভাবে উত্তর করিল, “কে জানে, তাহার কী হইয়াছে।”

এ দিকে রাজলক্ষ্মী আসিয়া কাঁদো-কাঁদো হইয়া কহিলেন, “বিপিনের বউকে আর তো ধরিয়া রাখা যায় না।”

মহেন্দ্র চকিত ভাব সামলাইয়া কহিল, “কেন, মা।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কি জানি বাছা, সে তো এবার বাড়ি যাইবার জন্য নিতান্তই ধরিয়া পড়িয়াছে। তুই তো কাহাকেও খাতির করিতে জানিস না। ভদ্রলোকের মেয়ে পরের বাড়িতে আছে, উহাকে আপনার লোকের মতো আদর-যত্ন না করিলে থাকিবে কেন।”

বিনোদিনী শোবার ঘরে বসিয়া বিছানার চাদর সেলাই করিতেছিল। মহেন্দ্র প্রবেশ করিয়া ডাকিল, “বালি।”

বিনোদিনী সংযত হইয়া বসিল। কহিল, “কী, মহেন্দ্রবাবু।”

মহেন্দ্র কহিল, “কী সর্বনাশ। মহেন্দ্র আবার বাবু হইলেন কবে।”

বিনোদিনী আবার চাদর সেলাইয়ের দিকে নতচক্ষু নিবদ্ধ রাখিয়া কহিল, “তবে কী বলিয়া ডাকিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার সখীকে যা বল– চোখের বালি।”

বিনোদিনী অন্যদিনের মতো ঠাট্টা করিয়া তাহার কোনো উত্তর দিল না– সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল।

মহেন্দ্র কহিল, “ওটা বুঝি সত্যকার সম্বন্ধ হইল, তাই ওটা আর পাতানো চলিতেছে না!”

বিনোদিনী একটু থামিয়া দাঁত দিয়া সেলাইয়ের প্রান্ত হইতে খানিকটা বাড়তি সুতা কাটিয়া ফেলিয়া কহিল, “কী জানি, সে আপনি জানেন।”

বলিয়াই তাহার সর্বপ্রকার উত্তর চাপা দিয়া গম্ভীরমুখে কহিল, “কালেজ হইতে হঠাৎ ফেরা হইল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “কেবল মড়া কাটিয়া আর কত দিন চলিবে।”

আবার বিনোদিনী দন্ত দিয়া সুতা ছেদন করিল এবং মুখ না তুলিয়াই কহিল, “এখন বুঝি জিয়ন্তের আবশ্যক।”

মহেন্দ্র স্থির করিয়াছিল, আজ বিনোদিনীর সঙ্গে অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভাবে হাস্যপরিহাস উত্তরপ্রত্যুত্তর করিয়া আসর জমাইয়া তুলিবে। কিন্তু এমনি গাম্ভীর্যের ভার তাহার উপর চাপিয়া আসিল যে, লঘু জবাব প্রাণপণ চেষ্টাতেও মুখের কাছে জোগাইল না। বিনোদিনী আজ কেমন একরকম কঠিন দূরত্ব রক্ষা করিয়া চলিতেছে দেখিয়া, মহেন্দ্রের মনটা সবেগে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল– ব্যবধানটাকে কোনো একটা নাড়া দিয়া ভূমিসাৎ করিতে ইচ্ছা হইল। বিনোদিনীর শেষ বাক্যঘাতের প্রতিঘাত না দিয়া হঠাৎ তাহার কাছে আসিয়া বসিয়া কহিল, “তুমি আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে কেন। কোনো অপরাধ করিয়াছি?”

বিনোদিনী তখন একটু সরিয়া সেলাই হইতে মুখ তুলিয়া দুই বিশাল উজ্জ্বল চক্ষু মহেন্দ্রের মুখের উপর স্থির রাখিয়া কহিল, “কর্তব্যকর্ম তো সকলেরই আছে। আপনি যে সকল ছাড়িয়া কালেজের বাসায় যান, সে কি কাহারো অপরাধে। আমারও যাইতে হইবে না? আমারও কর্তব্য নাই?”

মহেন্দ্র ভালো উত্তর অনেক ভাবিয়া খুঁজিয়া পাইল না। কিছুক্ষণ থামিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার এমন কী কর্তব্য যে না গেলেই নয়।”

বিনোদিনী অত্যন্ত সাবধানে সূচিতে সুতা পরাইতে পরাইতে কহিল, “কর্তব্য আছে কি না, সে নিজের মনই জানে। আপনার কাছে তাহার আর কী তালিকা দিব।”

মহেন্দ্র গম্ভীর চিন্তিত মুখে জানালার বাহিরে একটা সুদূর নারিকেলগাছের মাথার দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনী নিঃশব্দে সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল। ঘরে ছুঁচটি পড়িলে শব্দ শোনা যায়, এমনি হইল। অনেকক্ষণ পরে মহেন্দ্র হঠাৎ কথা কহিল। অকস্মাৎ নিঃশব্দতাভঙ্গে বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল–তাহার হাতে ছুঁচ ফুটিয়া গেল।

মহেন্দ্র কহিল, “তোমাকে কোনো অনুনয়-বিনয়েই রাখা যাইবে না?”

বিনোদিনী তাহার আহত অঙ্গুলি হইতে রক্তবিন্দু শুষিয়া লইয়া কহিল, “কিসের জন্য এত অনুনয়-বিনয়। আমি থাকিলেই কী, আর না থাকিলেই কী। আপনার তাহাতে কী আসে যায়।”

বলিতে বলিতে গলাটা যেন ভারি হইয়া আসিল; বিনোদিনী অত্যন্ত মাথা নিচুকরিয়া সেলাইয়ের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিল– মনে হইল, হয়তো বা তাহার নতনেত্রের পল্লবপ্রান্তে একটুখানি জলের রেখা দেখা দিয়াছে। মাঘের অপরাহ্ন তখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলাইবার উপক্রম করিতেছিল।

মহেন্দ্র মুহূর্তের মধ্যে বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া রুদ্ধ সজলস্বরে কহিল, “যদি তাহাতে আমার আসে যায়, তবে তুমি থাকিবে?”

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত ছাড়াইয়া লইয়া সরিয়া বসিল। মহেন্দ্রের চমক ভাঙিয়া গেল। নিজের শেষ কথাটা ভীষণ ব্যঙ্গের মতো তাহার নিজের কানে বারংবার প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। অপরাধী জিহ্বাকে মহেন্দ্র দন্ত দ্বারা দংশন করিল– তাহার পর হইতে রসনা নির্বাক হইয়া রহিল।

এমন সময় এই নৈঃশব্দ্যপরিপূর্ণ ঘরের মধ্যে আশা প্রবেশ করিল। বিনোদিনী তৎক্ষণাৎ যেন পূর্ব-কথোপকথনের অনুবৃত্তিস্বরূপে হাসিয়া মহেন্দ্রকে বলিয়া উঠিল, “আমার গুমর তোমরা যখন এত বাড়াইলে, তখন আমারও কর্তব্য, তোমাদের একটা কথা রাখা। যতক্ষণ না বিদায় দিবে ততক্ষণ রহিলাম।”

আশা স্বামীর কৃতকার্যতায় উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়া সখীকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল। কহিল, “তবে এই কথা রহিল। তাহা হইলে তিন-সত্য করো, যতক্ষণ না বিদায় দিব ততক্ষণ থাকিবে, থাকিবে, থাকিবে।”

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

22

It took one look at Mahendra when he returned home for all the doubts in Asha’s mind to disappear like a morning mist. She could barely bring herself to look at Mahendra when she thought of the letters she had written. Mahendra scolded her and said, ‘How could you write all those things about me!’

He then took the three letters that he had read so often from his pocket. Asha anxiously pleaded, ‘Please, I beg you, you must destroy those!’ She tried to take them from him but he stopped her and said only after putting them back, ‘I went because it was my duty but you did not try to understand me. Did you have any suspicions about me?’

Tearfully Asha said, ‘Please forgive me this time, I will never do this again.’

Mahendra asked, ‘Never again?’

Asha promised, ‘Never!’

Mahendra then drew her close and kissed her. Asha asked, ‘Give me the letters, I will destroy them.’

Mahendra said, ‘No, let them be.’

Asha thought to herself, ‘He is going to hold onto those as a warning to me.’

Asha grew annoyed with Binodini over this matter of the letters. She did not go to her friend as was her habit with the good news of her husband’s homecoming and avoided her instead. Binodini noticed this and stayed away on the pretext of work.

Mahendra thought to himself, ‘This is strange! I had thought she would find excuses to come to see me more often, but it seems the opposite is happening. What did she mean by those letters then?’

Mahendra had steeled himself against any attempts to understand the secret ways of women, he had even decided to stay away from Bindodini in the event of her approaching him. But now he told himself, ‘This is not right. Something seems to be broken between the two of us. I must try and make this air of forced unfamiliarity disappear by talking to her normally.’

He said to Asha, ‘It seems I am now the grit in your friend’s eyes. She never comes here any more.’

Asha answered casually, ‘Who cares? There is always something going on.’

One day Rajlakshmi came to Mahendra in tears and said, ‘Bipin’s wife says she will not stay any longer.’

Mahendra recovered from his surprise and asked, ‘But why Mother?’

Rajlakshmi answered, ‘I do not know, but this time she really is insisting on going home. You deliberately do not give people the respect due to them. How can she stay with everyone behaving so coldly with her?’

Mahendra went to Binodini’s room where she was sewing a hem on a bedsheet and spoke to her, ‘Bali?’

Binodini sat up straighter and said, ‘What is it sir?’

Mahendra declared, ‘Whatever next! Since when have you been addressing me like that?’

Binodini fixed her downcast eyes on her sewing once again and said, ‘Then how should I address you?’

Mahendra: ‘The same way you address your friend, Chokher Bali.’

Binodini did not answer with her customary humour and kept stitching.

Mahendra: ‘Perhaps that is our true relationship, the grit in the eye, and thus we cannot use them as names any more.’

Binodini paused, cut the thread with her teeth and said, ‘How do I know, it is all up to you.’
Before he could come up with an answer, she quickly said, ‘Why did you suddenly come back home now?’

Mahendra answered, ‘How long can one be satisfied with the company of dead people?’

Binodini cut the thread once again with her teeth and murmured without raising her face, ‘So now you must hack into the hearts of the living!’

Mahendra had decided that he would engage Binodini in jest and conversation as usual. But she was in such a serious mood that he could not think of anything light and frivolous in answer. Seeing that she was bent on preserving a cold and hardened distance between the two of them, all he could think of was to do something to shake her implacable calm. His mind rushed headlong towards her. Instead of answering her previous words, he suddenly moved closer to her and asked, ‘Why are you leaving us? Have I done something wrong?’

Binodini moved slightly and raised her huge burning eyes to Mahendra, looking at him steadily as she said, ‘Everyone has responsibilities. When you went to the lodging house leaving us all, was that because we had done something wrong? Can I not go as well? Do I not have responsibilities?’

Mahendra could not think of a suitable answer. He asked after some time, ‘What responsibility have you got that you must leave?’

Binodini threaded her needle very carefully and said, ‘Only I know what responsibilities I have. Why should I have to list them for you?’

Mahendra sat quietly for a long time looking at a distant coconut palm through the window. He looked worried. Binodini continued with her sewing in silence. If she had dropped the needle at that moment it would have broken the silence. Mahendra spoke up after a long time. Binodini was startled by the sudden noise and pricked herself with her needle.

Mahendra said, ‘Will nothing convince you to stay?’

Binodini sucked the blood from her finger and said, ‘Why are you pleading like this? What difference will it make whether I stay or I go? What do you care?’

Her voice seemed to break slightly as she said this; she bent her head very close to her needlework and paid great attention to it – there was a glint of tears at the ends of the sweep of her eyelashes. The winter evening was giving way to the darkness of night outside the window.

Mahendra suddenly grabbed her hand and said in a choked voice, ‘If it did make a difference to me, would you stay?’

Binodini pulled her hand away quickly and moved even further from Mahendra. He was suddenly deeply aware of what he had done. His words seemed to mock him repeatedly like some horrible mistake. He bit his tongue and silenced it into shame.

At this time, Asha entered the silent room. Binodini immediately said to Mahendra, as though this had been what they had discussed only minutes before, ‘When you are all raising me to such heights, it is also my duty to give in to your request. I promise to not leave unless I am sent away.’

Asha was overjoyed at her husband’s success and embraced her friend. She said, ‘That is a promise that you must make to me three times, unless sent away, you will stay, you will stay, you will stay!’

চোখের বালি ২১/Chokher Bali 21

২১

ইতিমধ্যে আরো এক চিঠি আসিয়া উপস্থিত হইল।–

“তুমি আমার চিঠির উত্তর দিলে না? ভালোই করিয়াছ। ঠিক কথা তো লেখা যায় না; তোমার যা জবাব, সে আমি মনে মনে বুঝিয়া লইলাম। ভক্ত যখন তাহার দেবতাকে ডাকে, তিনি কি মুখের কথায় তাহার উত্তর দেন। দুখিনীর বিল্বপত্রখানি চরণতলে বোধ করি স্থান পাইয়াছে!

“কিন্তু ভক্তের পূজা লইতে গিয়া শিবের যদি তপোভঙ্গ হয়, তবে তাহাতে রাগ করিয়ো না, হৃদয়দেব! তুমি বর দাও, চোখ মেলিয়া চাও বা না চাও, জানিতে পার বা না পার, পূজা না দিয়া ভক্তের আর গতি নাই। তাই আজিও এই দু-ছত্র চিঠি লিখিলাম– হে আমার পাষাণ-ঠাকুর, তুমি অবিচলিত হইয়া থাকো।’–

মহেন্দ্র আবার চিঠির উত্তর লিখিতে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু আশাকে লিখিতে গিয়া বিনোদিনীর উত্তর কলমের মুখে আপনি আসিয়া পড়ে। ঢাকিয়া লুকাইয়া কৌশল করিয়া লিখিতে পারে না। অনেকগুলি ছিঁড়িয়া রাত্রের অনেক প্রহর কাটাইয়া একটা যদি বা লিখিল, সেটা লেফাফায় পুরিয়া উপরে আশার নাম লিখিবার সময় হঠাৎ তাহার পিঠে যেন কাহার চাবুক পড়িল– কে যেন বলিল,”পাষণ্ড, বিশ্বস্ত বালিকার প্রতি এমনি করিয়া প্রতারণা?” চিঠি মহেন্দ্র সহস্র টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল, এবং বাকি রাতটা টেবিলের উপর দুই হাতের মধ্যে মুখ ঢাকিয়া নিজেকে যেন নিজের দৃষ্টি হইতে লুকাইবার চেষ্টা করিল।

তৃতীয় পত্র– “যে একেবারেই অভিমান করিতে জানে না, সে কি ভালোবাসে। নিজের ভালোবাসাকে যদি অনাদর-অপমান হইতে বাঁচাইয়া রাখিতে না পারি, তবে সে ভালোবাসা তোমাকে দিব কেমন করিয়া।

“তোমার মন হয়তো ঠিক বুঝি নাই, তাই এত সাহস করিয়াছি। তাই যখন ত্যাগ করিয়া গেলে, তখনো নিজে অগ্রসর হইয়া চিঠি লিখিয়াছি; যখন চুপ করিয়া ছিলে, তখনো মনের কথা বলিয়া ফেলিয়াছি। কিন্তু তোমাকে যদি ভুল করিয়া থাকি, সে কি আমারই দোষ। একবার শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সব কথা মনে করিয়া দেখো দেখি, যাহা বুঝিয়াছিলাম, সে কি তুমিই বোঝাও নাই।

“সে যাই হোক, ভুল হোক সত্য হোক, যাহা লিখিয়াছি সে আর মুছিবে না, যাহা দিয়াছি সে আর ফিরাইতে পারিব না, এই আক্ষেপ। ছি ছি, এমন লজ্জাও নারীর ভাগ্যে ঘটে। কিন্তু তাই বলিয়া মনে করিয়ো না, ভালো যে বাসে সে নিজের ভালোবাসাকে বরাবর অপদস্থ করিতে পারে। যদি আমার চিঠি না চাও তো থাক্, যদি উত্তর না লিখিবে তবে এই পর্যন্ত–‘

ইহার পর মহেন্দ্র আর থাকিতে পারিল না। মনে করিল, “অত্যন্ত রাগ করিয়াই ঘরে ফিরিয়া যাইতেছি। বিনোদিনী মনে করে, তাহাকে ভুলিবার জন্যই ঘর ছাড়িয়া পালাইয়াছি!’ বিনোদিনীর সেই স্পর্ধাকে হাতে হাতে অপ্রমাণ করিবার জন্যই তখনি মহেন্দ্র ঘরে ফিরিবার সংকল্প করিল।

এমন সময় বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। বিহারীকে দেখিবামাত্র মহেন্দ্রের ভিতরের পুলক যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিল। ইতিপূর্বে নানা সন্দেহে ভিতরে ভিতরে বিহারীর প্রতি তাহার ঈর্ষা জন্মিতেছিল, উভয়ের বন্ধুত্ব ক্লিষ্ট হইয়া উঠিতেছিল। পত্রপাঠের পর আজ সমস্ত ঈর্ষাভার বিসর্জন দিয়া বিহারীকে সে অতিরিক্ত আবেগের সহিত আহ্বান করিয়া লইল। চৌকি হইতে উঠিয়া, বিহারীর পিঠে চাপড় মারিয়া, তাহার হাত ধরিয়া, তাহাকে একটা কেদারার উপরে টানিয়া বসাইয়া দিল।

কিন্তু বিহারীর মুখ আজ বিমর্ষ। মহেন্দ্র ভাবিল, বেচারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে বিনোদিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়াছে এবং সেখান হইতে ধাক্কা খাইয়া আসিয়াছে। মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারী, এর মধ্যে আমাদের ওখানে গিয়াছিলে?”

বিহারী গম্ভীরমুখে কহিল, “এখনি সেখান হইতে আসিতেছি।”

মহেন্দ্র বিহারীর বেদনা কল্পনা করিয়া মনে মনে একটু কৌতুকবোধ করিল। মনে মনে কহিল, “হতভাগ্য বিহারী। স্ত্রীলোকের ভালোবাসা হইতে বেচারা একেবারে বঞ্চিত।’ বলিয়া নিজের বুকের পকেটের কাছটায় এক বার হাত দিয়া চাপ দিল– ভিতর হইতে তিনটে চিঠি খড়খড় করিয়া উঠিল।

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “সবাইকে কেমন দেখিলে?”

বিহারী তাহার উত্তর না করিয়া কহিল, “বাড়ি ছাড়িয়া তুমি যে এখানে?”

মহেন্দ্র কহিল, “আজকাল প্রায় নাইট-ডিউটি পড়ে– বাড়িতে অসুবিধা হয়।”

বিহারী কহিল, “এর আগেও তো নাইট-ডিউটি পড়িয়াছে, কিন্তু তোমাকে তো বাড়ি ছাড়িতে দেখি নাই।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “মনে কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে না কি।”

বিহারী কহিল, “না, ঠাট্টা নয়, এখনি বাড়ি চলো।”

মহেন্দ্র বাড়ি ফিরিবার জন্য উদ্যত হইয়াই ছিল; বিহারীর অনুরোধ শুনিয়া সে হঠাৎ নিজেকে ভুলাইল, যেন বাড়ি যাইবার জন্য তাহার কিছুমাত্র আগ্রহ নাই। কহিল, “সে কি হয়, বিহারী। তা হলে আমার বৎসরটাই নষ্ট হইবে।”

বিহারী কহিল, “দেখো মহিনদা, তোমাকে আমি এতটুকু বয়স হইতে দেখিতেছি, আমাকে ভুলাইবার চেষ্টা করিয়ো না। তুমি অন্যায় করিতেছ।”

মহেন্দ্র। কার প’রে অন্যায় করিতেছি জজসাহেব!

বিহারী রাগ করিয়া বলিল, “তুমি যে চিরকাল হৃদয়ের বড়াই করিয়া আসিয়াছ, তোমার হৃদয় গেল কোথায় মহিনদা।”

মহেন্দ্র। সম্প্রতি কালেজের হাসপাতালে।

বিহারী। থামো মহিনদা, থামো। তুমি এখানে আমার সঙ্গে হাসিয়া ঠাট্টা করিয়া কথা কহিতেছ, সেখানে আশা তোমার বাহিরের ঘরে, অন্দরের ঘরে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বেড়াইতেছে।

আশার কান্নার কথা শুনিয়া হঠাৎ মহেন্দ্রের মন একটা প্রতিঘাত পাইল। জগতে আর যে কাহারো সুখদুঃখ আছে, সে কথা তাহার নূতন নেশার কাছে স্থান পায় নাই। হঠাৎ চমক লাগিল, জিজ্ঞাসা করিল, “আশা কাঁদিতেছে কী জন্য।”

বিহারী বিরক্ত হইয়া কহিল, “সে কথা তুমি জান না, আমি জানি?”

মহেন্দ্র। তোমার মহিনদা সর্বজ্ঞ নয় বলিয়া যদি রাগ করিতেই হয় তো মহিনদার সৃষ্টিকর্তার উপর রাগ করো।

তখন বিহারী যাহা দেখিয়াছিল, তাহা আগাগোড়া বলিল। বলিতে বলিতে বিনোদিনীর বক্ষোলগ্ন আশার সেই অশ্রুসিক্ত মুখখানি মনে পড়িয়া বিহারীর প্রায় কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল।

বিহারীর এই প্রবল আবেগ দেখিয়া মহেন্দ্র আশ্চর্য হইয়া গেল। মহেন্দ্র জানিত বিহারীর হৃদয়ের বালাই নাই — এ উপসর্গ কবে জুটিল। যেদিন কুমারী আশাকে দেখিতে গিয়াছিল, সেই দিন হইতে নাকি। বেচারা বিহারী। মহেন্দ্র মনে মনে তাহাকে বেচারা বলিল বটে, কিন্তু দুঃখবোধ না করিয়া বরঞ্চ একটু আমোদ পাইল। আশার মনটি একান্তভাবে যে কোন্ দিকে, তাহা মহেন্দ্র নিশ্চয় জানিত। “অন্য লোকের কাছে যাহারা বাঞ্ছার ধন, কিন্তু আয়ত্তের অতীত, আমার কাছে তাহারা চিরদিনের জন্য আপনি ধরা দিয়াছে,’ ইহাতে মহেন্দ্র বক্ষের মধ্যে একটা গর্বের স্ফীতি অনুভব করিল।

মহেন্দ্র বিহারীকে কহিল, “আচ্ছা চলো, যাওয়া যাক। তবে একটা গাড়ি ডাকো।”

img_9613_1_1

21

In the meantime another letter arrived.

This said -‘You did not answer my letter. You have done the right thing for there are some things that cannot be expressed in writing; I know what your answer is already. When the devotee calls upon God, does God have to speak his answer? I know that my supplication has found its place at your feet!’

‘But if Shiva’s meditation should be disturbed by the devotion of a supplicant do not be angry with me, ruler of my heart! Give me something, whether you want to open your eyes to me or not, whether you wish to know my heart or not, I cannot live without offering myself to you. That is why I am writing to you again – though you may remain unmoved, my stony hearted lover.’

Mahendra started to write an answer once again. But as he wrote to Asha, answers that were really meant for Binodini seemed to pour out of his pen. He did not know how to write secret coded messages. After tearing up many sheets of paper over many hours he finally completed a letter. Just as he wrote Asha’s name on the envelope, he felt a sudden twinge of conscience like a whip across his back; an inner voice that seemed to say, ‘How could you betray that faithful one like this!’ He tore the letter up into many pieces and spent the rest of the night with his face shielded in his arms on his desk as if he was trying to hide from his very own eyes.

The third letter arrived; ‘Does the one who does not know how to remonstrate know how to love? If I cannot save my love from neglect, how will I offer it to you?’

‘Perhaps I did not understand your motives when you left and this gave me the courage to write such letters to you. Perhaps that is why even after you abandoned me I still picked up the pen to write the first letter; when you chose silence in response, I still told you of what was in my heart. But if I have misunderstood you, is it my fault alone? If you think of all that has passed, did you not give me the licence to think thus of you?’

‘Nevertheless I regret that whatever I have done, whether right or wrong, and all that I have already written is not to be erased. Nor can I take back what I have already given. For shame that this should happen to a woman! But do not feel that I am going to offer my love again and again so that it may be spurned. If you do not want me to write to you or even reply to me, this is where it ends..’

Mahendra could not stay away any more. He convinced himself that he was returning under duress and in a state of great anger. If Binodini had the audacity to think that he had left home to avoid her, Mahendra would immediately go back to prove her wrong!

Bihari arrived. Mahendra felt even more elated when he saw him. Lately he had been jealous of Bihari for various reasons and their friendship had grown strained. After reading the letter today, he cast aside all his former suspicions and envy and welcomed Bihari with some excessive feeling. He left his seat, thumped Bihari on the back, shook his hand and made him sit down on a chair.

But Bihari was in a sombre mood. Mahendra thought he might have been rejected by Binodini and asked, ‘Bihari, have you been to our house lately?’

Bihari answered quietly, ‘I have just been there.’

Mahendra felt a sense of amusement at the possible reason behind Bihari’s unhappiness. He said to himself, ‘Poor Bihari! He is deprived of a woman’s love.’ He patted his own pocket to hear the comforting rustle of the three letters within.

Mahendra asked, ‘How did you find everyone there?’

Bihari did not answer his question and said instead, ‘Why are you living here instead of at home?’

Mahendra answered, ‘I frequently have to work at night – it is not convenient to do that from home.’

Bihari retorted, ‘You have had night shifts before, but I have never seen you live in lodgings previously.’

Mahendra smiled and said, ‘Why, are you suspecting me of something else?’

Bihari answered, ‘No, I am not joking, you need to go home right away.’

Mahendra had been prepared to do so; but when he heard the plea in Bihari’s voice he convinced himself otherwise and felt that he did not want to go home at all. He said, ‘How is that possible, Bihari! I will lose a whole year then!’

Bihari said, ‘Look Mahendra, I have known since you were a little child, do not try to pull the wool over my eyes. You are doing something wrong.’

Mahendra: Whom am I wronging, dear Judge?

Bihari said with some annoyance, ‘You have always boasted about your kind heart, where did that kindhearted spirit go?’

Mahendra: Most recently, to the hospital.

Bihari: Stop, Mahendra! You sit here cracking jokes with me while at home Asha wanders through the house crying and unhappy.

Mahendra felt a sudden jolt when he heard of Asha’s tears. Full of his new obsession with Binodini, he had been unaware of the existence of anyone else’s feelings in the world. He was startled into asking. ‘Why is she crying?’

Bihari said with some annoyance, ‘If you do not know that, why am I supposed to?

Mahendra: If you have to be angry with me for not knowing everything, do direct your anger towards my creator.’

Then Bihari told him about all that he had seen. His voice almost broke as he recalled Asha’s tear streaked face as he had seen her, in Binodini’s embrace.

Mahendra was amazed at this strong emotional reaction on Bihari’s part. He had known Bihari to be insensitive all along – and wondered when this change had occurred. Was it the day they had gone to see Asha for the first time? Poor Bihari, wretched Bihari. Mahendra might have thought of him as wretched but in truth he felt more happiness than pity. He knew where Asha’s affections were entirely directed. Mahendra felt a sense of pride in knowing that although she was desired by another, she was forever his, and would never to be anyone else’s.

He said to Bihari, ‘Fine, then let us get a carriage and go’.

চোখের বালি ২০/ Chokher Bali 20

২০

অনতিকাল পরেই মহেন্দ্র তাহার ছাত্রাবাসে চেনা হাতের অক্ষরে একখানি চিঠি পাইল। দিনের বেলা গোলমালের মধ্যে খুলিল না– বুকের কাছে পকেটের মধ্যে পুরিয়া রাখিল। কালেজে লেকচার শুনিতে শুনিতে, হাসপাতাল ঘুরিতে ঘুরিতে, হঠাৎ এক-একবার মনে হইতে লাগিল, ভালোবাসার একটা পাখি তাহার বুকের নীড়ে বাসা করিয়া ঘুমাইয়া আছে। তাহাকে জাগাইয়া তুলিলেই তাহার সমস্ত কোমল কূজন কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিবে।

সন্ধ্যায় এক সময় মহেন্দ্র নির্জন ঘরে ল্যাম্পের আলোকে চৌকিতে বেশ করিয়া হেলান দিয়া আরাম করিয়া বসিল। পকেট হইতে তাহার দেহতাপতপ্ত চিঠিখানি বাহির করিয়া লইল। অনেকক্ষণ চিঠি না খুলিয়া লেফাফার উপরকার শিরোনামা নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিল। মহেন্দ্র জানিত, চিঠির মধ্যে বেশি কিছু কথা নাই। আশা নিজের মনের ভাব ঠিকমতো ব্যক্ত করিয়া লিখিতে পারিবে, এমন সম্ভাবনা ছিল না। কেবল তাহার কাঁচা অক্ষরে বাঁকা লাইনে তাহার মনের কোমল কথাগুলি কল্পনা করিয়া লইতে হইবে। আশার কাঁচা হাতে বহুযত্নে লেখা নিজের নামটি পড়িয়া মহেন্দ্র নিজের নামের সঙ্গে যেন একটা রাগিনী শুনিতে পাইল– তাহা সাধ্বী নারী-হৃদয়ের অতি নিভৃত বৈকুণ্ঠলোক হইতে একটি নির্মল প্রেমের সংগীত।

এই দুই-একদিনের বিচ্ছেদে মহেন্দ্রের মন হইতে দীর্ঘ-মিলনের সমস্ত অবসাদ দূরহইয়া সরলা বধূর নবপ্রেমে উদ্ভাসিত সুখস্মৃতি আবার উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। শেষাশেষি প্রাত্যহিক ঘরকন্নার খুঁটিনাটি অসুবিধা তাহাকে উত্ত্যক্ত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, সে-সমস্ত অপসারিত হইয়া কেবলমাত্র কর্মহীন কারণহীন একটি বিশুদ্ধ প্রেমানন্দের আলোকে আশার মানসীমূর্তি তাহার মনের মধ্যে প্রাণ পাইয়া উঠিয়াছে।

মহেন্দ্র অতি ধীরে ধীরে লেফাফা ছিঁড়িয়া চিঠিখানা বাহির করিয়া নিজের ললাটে কপোলে বুলাইয়া লইল। একদিন মহেন্দ্র যে-এসেন্স আশাকে উপহার দিয়াছিল, সেই এসেন্সের গন্ধ চিঠির কাগজ হইতে উতলা দীর্ঘনিশ্বাসের মতো মহেন্দ্রের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিল।

ভাঁজ খুলিয়া মহেন্দ্র চিঠি পড়িল। কিন্তু এ কী। যেমন বাঁকাচোরা লাইন, তেমন সাদাসিধা ভাষা নয় তো। কাঁচা-কাঁচা অক্ষর, কিন্তু কথাগুলি তো তাহার সঙ্গে মিলিল না। লেখা আছে–

“প্রিয়তম, যাহাকে ভুলিবার জন্য চলিয়া গেছ,এ লেখায় তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিব কেন। যে লতাকে ছিঁড়িয়া মাটিতে ফেলিয়া দিলে, সে আবার কোন্ লজ্জায় জড়াইয়া উপরে উঠিতে চেষ্টা করে। সে কেন মাটির সঙ্গে মাটি হইয়া মিশিয়া গেল না!

“কিন্তু এটুকুতে তোমার কী ক্ষতি হইবে, নাথ। নাহয় ক্ষণকালের জন্য মনে পড়িলই বা। মনে তাহাতে কতটুকুই বা বাজিবে। আর, তোমার অবহেলা যে কাঁটার মতো আমার পাঁজরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া রহিল। সকল দিন, সকল রাত, সকল কাজ, সকল চিন্তার মধ্যে যে দিকে ফিরি, সেই দিকেই যে আমাকে বিঁধিতে লাগিল। তুমি যেমন করিয়া ভুলিলে, আমাকে তেমনি করিয়া ভুলিবার একটা উপায় বলিয়া দাও।

“নাথ, তুমি যে আমাকে ভালোবাসিয়াছিলে, সে কি আমারই অপরাধ। আমি কি স্বপ্নেও এত সৌভাগ্য প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। আমি কোথা হইতে আসিলাম, আমাকে কে জানিত। আমাকে যদি না চাহিয়া দেখিতে, আমাকে যদি তোমার ঘরে বিনা-বেতনের দাসী হইয়া থাকিতে হইত, আমি কি তোমাকে কোনো দোষ দিতে পারিতাম। তুমি নিজেই আমার কোন্ গুণে ভুলিলে প্রিয়তম, কী দেখিয়া আমার এত আদর বাড়াইলে। আর, আজ বিনা-মেঘে যদি বজ্রপাতই হইল, তবে সে বজ্র কেবল দগ্ধ করিল কেন। একেবারে দেহমন কেন ছাই করিয়া দিল না।

“এই দুটো দিনে অনেক সহ্য করিলাম, অনেক ভাবিলাম, কিন্তু, একটা কথা বুঝিতে পারিলাম না-ঘরে থাকিয়াও কি তুমি আমাকে ফেলিতে পারিতে না। আমার জন্যও কি তোমার ঘর ছাড়িয়া যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল। আমি কি তোমারএতখানি জুড়িয়া আছি। আমাকে তোমার ঘরের কোণে, তোমার দ্বারের বাহিরে ফেলিয়া রাখিলেও কি আমি তোমার চোখে পড়িতাম। তাই যদি হয়, তুমি কেন গেলে, আমার কি কোথাও যাইবার পথ ছিল না। ভাসিয়া আসিয়াছি, ভাসিয়া যাইতাম।’

এ কী চিঠি। এ ভাষা কাহার, তাহা মহেন্দ্রের বুঝিতে বাকি রহিল না। অকস্মাৎ আহত মূর্ছিতের মতো মহেন্দ্র সে-চিঠিখানি লইয়া স্তম্ভিত হইয়া রহিল। যে-লাইনে রেলগাড়ির মতো তাহার মন পূর্ণবেগে ছুটিয়াছিল, সেই লাইনেই বিপরীত দিক হইতে একটা ধাক্কা খাইয়া লাইনের বাহিরে তাহার মনটা যেন উল্টাপাল্টা স্তূপাকার বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিল।

অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া আবার সে দুইবার তিনবার করিয়া পড়িল। কিছুকাল যাহা সুদূর আভাসের মতো ছিল, আজ তাহা যেন ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। তাহার জীবনাকাশের এক কোণে যে ধূমকেতুটা ছায়ার মতো দেখাইতেছিল, আজ তাহার উদ্যত বিশাল পুচ্ছ অগ্নিরেখায় দীপ্যমান হইয়া দেখা দিল।

এ চিঠি বিনোদিনীরই। সরলা আশা নিজের মনে করিয়া তাহা লিখিয়াছে। পূর্বে যে কথা সে কখনো ভাবে নাই, বিনোদিনীর রচনামত চিঠি লিখিতে গিয়া সেই-সব কথা তাহার মনে জাগিয়া উঠিতে লাগিল। নকল-করা কথা বাহির হইতে বদ্ধমূল হইয়া তাহার আন্তরিক হইয়া গেল; যে-নূতন বেদনার সৃষ্টি হইল, এমন সুন্দর করিয়া তাহা ব্যক্ত করিতে আশা কখনোই পারিত না। সে ভাবিতে লাগিল, “সখী আমার মনের কথা এমন ঠিকটি বুঝিল কী করিয়া। কেমন করিয়া এমন ঠিকটি প্রকাশ করিয়া বলিল।’ অন্তরঙ্গ সখীকে আশা আরো যেন বেশি আগ্রহের সঙ্গে আশ্রয় করিয়া ধরিল, কারণ, যে-ব্যথাটা তাহার মনের মধ্যে, তাহার ভাষাটি তাহার সখীর কাছে– সে এতই নিরুপায়।

মহেন্দ্র চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বিনোদিনীর উপর রাগ করিতে অনেক চেষ্টা করিল, মাঝে থেকে রাগ হইল আশার উপর। “দেখো দেখি, আশার এ কী মূঢ়তা, স্বামীর প্রতি এ কী অত্যাচার।’ বলিয়া চৌকিতে বসিয়া পড়িয়া প্রমাণস্বরূপ চিঠিখানা আবার পড়িল। পড়িয়া ভিতরে ভিতরে একটা হর্ষসঞ্চার হইতে লাগিল। চিঠিখানাকে সে আশারই চিঠি মনে করিয়া পড়িবার অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু এ ভাষায় কেনোমতেই সরলা আশাকে মনে করাইয়া দেয় না। দু-চার লাইন পড়িবামাত্র একটা সুখোন্মাদকর সন্দেহ ফেনিল মদের মতো মনকে চারি দিকে ছাপাইয়া উঠিতে থাকে। এই প্রচ্ছন্ন অথচ ব্যক্ত, নিষিদ্ধ অথচ নিকটাগত, বিষাক্ত অথচ মধুর, একই কালে উপহৃত অথচ প্রত্যাহৃত প্রেমের আভাস মহেন্দ্রকে মাতাল করিয়া তুলিল। তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল, নিজের হাতে-পায়ে কোথাও এক জায়গায় ছুরি বসাইয়া বা আর কিছু করিয়া নেশা ছুটাইয়া মনটাকে আর-কোনো দিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়। টেবিলে সজোরে মুষ্টি বসাইয়া চৌকি হইতে লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, “দূর করো, চিঠিখানা পুড়াইয়া ফেলি।” বলিয়া চিঠিখানি ল্যাম্পের কাছাকাছি লইয়া গেল। পুড়াইল না, আর-একবার পড়িয়া ফেলিল। পরদিন ভৃত্য টেবিল হইতে কাগজপোড়া ছাই অনেক ঝাড়িয়া ফেলিয়াছিল। কিন্তু তাহা আশার চিঠির ছাই নহে, চিঠির উত্তর দিবার অনেকগুলো অসম্পূর্ণ চেষ্টাকে মহেন্দ্র পুড়াইয়া ছাই করিয়াছে।

pic3-big

20

Soon after moving to the hostel, Mahendra received a letter in a handwriting that was familiar to him. He did not open it during the day as he was busy, tucking it into his shirt pocket where it stayed, close to his heart. As he listened to lectures and went on rounds in the hospital, every so often he thought of the letter, nestling against his chest like a bird singing of love. When awakened, its sweet song would fill his ears.

In the evening he finally sat down by a lamp in the privacy of his own room and leaned back on the couch comfortably. Taking out the letter which was still warm from being next to his skin, he looked at his name on the envelope for a long time without opening it. He knew there would be little of importance in the letter. There was hardly any chance of Asha being able to communicate her own feelings in writing. He would have to imagine the gentle words that came straight from her heart from the childish letters scrawled in irregular lines on the paper. As he read his own name in her inexpertly formed letters, he imagined a tune, one that surely came from a secret paradise within her unblemished soul carrying her love to him.

The couple of days that they had been apart had revived the memories of first love with his innocent bride for Mahendra sweeping away all the ennui he had been feeling. Lately, little mishaps in Asha’s housekeeping had started plaguing him; these feelings were now replaced by a pure flame of love that burned without cause or respite and brought Asha’s memories to life.

Mahendra tore the envelope open very slowly and held the letter to his forehead and his cheek. A perfume that he had once presented to Asha seemed to rise from the paper and beat against his soul like an anxious sigh.

He unfolded the letter and read it. Now he was amazed; the lines might have been irregular but the language was far from simple. The letters were unformed, but the words were not. It read –

‘Dearest, why should I use this letter to remind you of the one whom you try to forget by leaving? Why should the vine that you uprooted try to climb upwards again? Why did she not become one with the dust where you left her?

But why will this hurt you in any case, my love. There is little harm in reminding you for a few moments. You will feel very little pain. But what of your neglect towards me that pierces my side like a thorn; all day, all night, in work and in thought, wherever I turn, it hurts. Tell me a way to forget this pain, so that I too might forget you as you have forgotten me.

My love, is it my fault that you loved me? Never in my wildest dreams did I hope for such good fortune. Where did I come from, who had ever heard of me? If you had not looked at me, if you had made me your servant and not bothered to pay me, would I have blamed you? Why did you fall in love with me dearest, why did you love me so much? Today, you leaving me feels like thunder from a clear sky. Why just singe me with lightning, why not reduce me to ashes as well?

I have borne a lot in the past two days. I have had time to think too; but one thing that I could not fathom is why you could not discard me and still stay at home. Why did you have to leave home for my sake? Am I such an important part of you? Would you have constantly noticed me even if you had cast me to one side? If the answer is yes, then why did you have to go and why not me? I came to you on a tide of flotsam; I could have left in the same way.’

What letter was this! Mahendra was left in no doubt as to who the true author of the words was. He sat in stunned silence as though he had suffered a sudden blow. His thoughts were pushed from the path they had taken since the receipt of the letter; this sudden realisation was enough to reduce them to uncomprehending confusion.

After spending a long time in thought, he read the letter two or three more times again. What had been a distant possibility for some time now seemed very real. The comet that had been casting a shadow over his life now showed its vast burning trail.

In reality this was Binodini’s letter to Mahendra. Unsuspectingly, Asha had merely written it down as her own. Thoughts that she had never been able to form came to mind as she wrote down what Binodini dictated to her. Copied words became her own; she could never have expressed her new found sorrow so beautifully. She thought, ‘How does my friend know my mind so well! How does she give voice to the words that I feel!’ She clung with greater eagerness to Binodini as she was the one that had the language to express Asha’s pain. This is how truly helpless Asha was.

Mahendra got up from the bed with a frown, trying as hard as he could to feel angry with Binodini; but his fury grew against Asha instead. He thought, ‘What stupidity, how else will she torment me!’ He then sat down to read the letter again to justify his anger. He now began to feel a certain happiness. He read it again and again, each time imagining them as Asha’s words, but they did not bring her guileless nature to mind at all. Each time after he had read a few lines, his suspicions would deliciously brim over in his mind like a intoxicating drink. He became drunk with this sensation of love, at once expressed yet hidden, forbidden yet available, sweet as poison, a gift that was being offered but also being withheld. He felt like inflicting pain on himself to loosen the spell on his mind so that he could think of other things. He brought his fist down on the table heavily and jumped to his feet, declaring, ‘Enough, let me burn the damned thing!’ He held the letter to the lamp flame; instead of burning it he read it again. The fellow cleaning the table the next day removed a lot of ash from burnt paper. But these were not from the letter; they were from Mahendra’s unsuccessful attempts at answering it.

Image:http://www.ngmaindia.gov.in/sh-miniature-painting.asp

চোখের বালি ১৭/ Chokher Bali 17

১৭

মাঝখানের এই গোলমালটা একেবারে মুছিয়া ফেলিবার জন্য মহেন্দ্র প্রস্তাব করিল, “আসছে রবিবারে দমদমের বাগানে চড়িভাতি করিয়া আসা যাক।”

আশা অত্যন্ত উৎসাহিত হইয়া উঠিল। বিনোদিনী কিছুতেই রাজি হইল না। মহেন্দ্র ও আশা বিনোদিনীর আপত্তিতে ভারি মুষড়িয়া গেল। তাহারা মনে করিল, আজকাল বিনোদিনী কেমন যেন দূরে সরিয়া যাইবার উপক্রম করিতেছে।

বিকালবেলায় বিহারী আসিবামাত্র বিনোদিনী কহিল, “দেখুন তো বিহারীবাবু, মহিনবাবু দমদমের বাগানে চড়িভাতি করিতে যাইবেন, আমি সঙ্গে যাইতে চাহি নাই বলিয়া আজ সকাল হইতে দুইজনে মিলিয়া রাগ করিয়া বসিয়াছেন।”

বিহারী কহিল, “অন্যায় রাগ করেন নাই। আপনি না গেলে ইঁহাদের চড়িভাতিতে যে কাণ্ডটা হইবে, অতিবড়ো শত্রুরও যেন তেমন না হয়।”

বিনোদিনী। চলুন-না বিহারীবাবু। আপনি যদি যান, তবে আমি যাইতে রাজি আছি।

বিহারী। উত্তম কথা। কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, কর্তা কী বলেন।

বিহারীর প্রতি বিনোদিনীর এই বিশেষ পক্ষপাতে কর্তা গৃহিণী উভয়েই মনে মনে ক্ষুণ্ন হইল। বিহারীকে সঙ্গে লইবার প্রস্তাবে মহেন্দ্রের অর্ধেক উৎসাহ উড়িয়া গেল। বিহারীর উপস্থিতি বিনোদিনীর পক্ষে সকল সময়েই অপ্রিয়, এই কথাটাই বন্ধুর মনে মুদ্রিত করিয়া দিবার জন্য মহেন্দ্র ব্যস্ত– কিন্তু অতঃপর বিহারীকে আটক করিয়া রাখা অসাধ্য হইবে।

মহেন্দ্র কহিল, “তা বেশ তো, ভালোই তো। কিন্তু বিহারী, তুমি যেখানে যাও একটা হাঙ্গামা না করিয়া ছাড় না। হয়তো সেখানে পাড়া হইতে রাজ্যের ছেলে জোটাইয়া বসিবে, নয় তো কোন্‌ গোরার সঙ্গে মারামারি বাধাইয়া দিবে– কিছু বলা যায় না।”

বিহারী মহেন্দ্রর আন্তরিক অনিচ্ছা বুঝিয়া মনে মনে হাসিল– কহিল, “সেই তো সংসারের মজা, কিসে কী হয়, কোথায় কী ফেসাদ ঘটে, আগে হইতে কিছুই বলিবার জো নাই। বিনোদ-বোঠান, ভোরের বেলায় ছাড়িতে হইবে, আমি ঠিক সময়ে আসিয়া হাজির হইব।”

রবিবার ভোরে জিনিসপত্র ও চাকরদের জন্য একখানি থার্ড ক্লাস ও মনিবদের জন্য একখানি সেকেণ্ড ক্লাস গাড়ি ভাড়া করিয়া আনা হইয়াছে। বিহারী মস্ত-একটা প্যাকবাক্স সঙ্গে করিয়া যথাসময়ে আসিয়া উপস্থিত। মহেন্দ্র কহিল, “ওটা আবার কী আনিলে। চাকরদের গাড়িতে তো আর ধরিবে না।”

বিহারী কহিল, “ব্যস্ত হইয়ো না দাদা, সমস্ত ঠিক করিয়া দিতেছি।”

বিনোদিনী ও আশা গাড়িতে প্রবেশ করিল। বিহারীকে লইয়া কী করিবে, মহেন্দ্র তাই ভাবিয়া একটু ইতস্তত করিতে লাগিল। বিহারী বোঝাটা গাড়ির মাথায় তুলিয়া দিয়া চট করিয়া কোচবাক্সে চড়িয়া বসিল।

মহেন্দ্র হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। সে ভাবিতেছিল, “বিহারী ভিতরেই বসে কি কী করে, তাহার ঠিক নাই।’ বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া বলিতে লাগিল, “বিহারীবাবু, পড়িয়া যাবেন না তো?”

বিহারী শুনিতে পাইয়া কহিল, “ভয় করিবেন না, পতন ও মূর্ছা– ওটা আমার পার্টের মধ্যে নাই।”

গাড়ি চলিতেই মহেন্দ্র কহিল, “আমিই না-হয় উপরে গিয়া বসি, বিহারীকে ভিতরে পাঠাইয়া দিই।”

আশা ব্যস্ত হইয়া তাহার চাদর চাপিয়া কহিল, “না, তুমি যাইতে পারিবে না।”

বিনোদিনী কহিল, “আপনার অভ্যাস নাই, কাজ কী যদি পড়িয়া যান।”

মহেন্দ্র উত্তেজিত হইয়া কহিল, “পড়িয়া যাব? কখনো না।” বলিয়া তখনই বাহির হইতে উদ্যত হইল।

বিনোদিনী কহিল, “আপনি বিহারীবাবুকে দোষ দেন, কিন্তু আপনিই তো হাঙ্গাম বাধাইতে অদ্বিতীয়।”

মহেন্দ্র মুখ ভার করিয়া কহিল, “আচ্ছা, এক কাজ করা যাক। আমি একটা আলাদা গাড়ি ভাড়া করিয়া যাই, বিহারী ভিতরে আসিয়া বসুক।”

আশা কহিল, “তা যদি হয়, তবে আমিও তোমার সঙ্গে যাইব।”

বিনোদিনী কহিল, “আর আমি বুঝি গাড়ি হইতে লাফাইয়া পড়িব?” এমনি গোলমাল করিয়া কথাটা থামিয়া গেল।

মহেন্দ্র সমস্ত পথ মুখ অত্যন্ত গম্ভীর করিয়া রহিল।

দমদমের বাগানে গাড়ি পৌঁছিল। চাকরদের গাড়ি অনেক আগে ছাড়িয়াছিল, কিন্তু এখনো তাহার খোঁজ নাই।

শরৎকালের প্রাতঃকাল অতি মধুর। রৌদ্র উঠিয়া শিশির মরিয়া গেছে, কিন্তু গাছপালা নির্মল আলোকে ঝলমল করিতেছে। প্রাচীরের গায়ে শেফালি-গাছের সারি রহিয়াছে, তলদেশ ফুলে আচ্ছন্ন এবং গন্ধে আমোদিত।

আশা কলিকাতার ইষ্টকবন্ধন হইতে বাগানের মধ্যে ছাড়া পাইয়া বন্যমৃগীর মতো উল্লসিত হইয়া উঠিল। সে বিনোদিনীকে লইয়া রাশীকৃত ফুল কুড়াইল, গাছ হইতে পাকা আতা পাড়িয়া আতাগাছের তলায় বসিয়া খাইল, দুই সখীতে দিঘির জলে পড়িয়া দীর্ঘকাল ধরিয়া স্নান করিল। এই দুই নারীতে মিলিয়া একটি নিরর্থক আনন্দে–গাছের ছায়া এবং শাখাচ্যুত আলোক, দিঘির জল এবং নিকুঞ্জের পুষ্পপল্লবকে পুলকিত সচেতন করিয়া তুলিল।

স্নানের পর দুই সখী আসিয়া দেখিল, চাকরদের গাড়ি তখনো আসিয়া পৌঁছে নাই। মহেন্দ্র বাড়ির বারান্দায় চৌকি লইয়া অত্যন্ত শুষ্কমুখে একটা বিলাতি দোকানের বিজ্ঞাপন পড়িতেছে।

বিনোদিনী জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারীবাবু কোথায়!”

মহেন্দ্র সংক্ষেপে উত্তর করিল, “জানি না।”

বিনোদিনী। চলুন, তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করি গে।

মহেন্দ্র। তাহাকে কেহ চুরি করিয়া লইবে, এমন আশঙ্কা নাই। না খুঁজিলেও পাওয়া যাইবে।

বিনোদিনী। কিন্তু তিনি হয়তো আপনার জন্য ভাবিয়া মরিতেছেন, পাছে দুর্লভ রত্ন খোওয়া যায়। তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া আসা যাক।

জলাশয়ের ধারে প্রকাণ্ড একটা বাঁধানো বটগাছ আছে, সেইখানে বিহারী তাহার প্যাকবাক্স খুলিয়া একটি কেরোসিন-চুলা বাহির করিয়া জল গরম করিতেছে। সকলে আসিবামাত্র আতিথ্য করিয়া বাঁধা বেদির উপর বসাইয়া এক এক পেয়ালা গরম চা এবং ছোটো রেকাবিতে দুই একটি মিষ্টান্ন ধরিয়া দিল। বিনোদিনী বারবার বলিতে লাগিল, “ভাগ্যে বিহারীবাবু সমস্ত উদ্‌যোগ করিয়া আনিয়াছিলেন, তাই তো রক্ষা, নহিলে চা না পাইলে মহেন্দ্রবাবুর কী দশা হইত।”

চা পাইয়া মহেন্দ্র বাঁচিয়া গেল, তবু বলিল, “বিহারীর সমস্ত বাড়াবাড়ি। চড়িভাতি করিতে আসিয়াছি, এখানেও সমস্ত দস্তুরমত আয়োজন করিয়া আসিয়াছে। ইহাতে মজা থাকে না।”

বিহারী কহিল, “তবে দাও ভাই তোমার চায়ের পেয়ালা, তুমি না খাইয়া মজা করো গে– বাধা দিব না।”

বেলা হয়, চাকররা আসিল না। বিহারীর বাক্স হইতে আহারাদির সর্বপ্রকার সরঞ্জাম বাহির হইতে লাগিল। চাল-ডাল, তরি-তরকারি এবং ছোটো ছোটো বোতলে পেষা মশলা আবিষ্কৃত হইল। বিনোদিনী আশ্চর্য হইয়া বলিতে লাগিল, “বিহারীবাবু, আপনি যে আমাদেরও ছাড়াইয়াছেন। ঘরে তো গৃহিনী নাই, তবে শিখিলেন কোথা হইতে।”

বিহারী কহিল, “প্রাণের দায়ে শিখিয়াছি, নিজের যত্ন নিজেকেই করিতে হয়।”

বিহারী নিতান্ত পরিহাস করিয়া কহিল, কিন্তু বিনোদিনী গম্ভীর হইয়া বিহারীর মুখে করুণচক্ষের কৃপা বর্ষণ করিল।

বিহারী ও বিনোদিনীতে মিলিয়া রাঁধাবাড়ায় প্রবৃত্ত হইল। আশা ক্ষীণ সংকুচিত ভাবে হস্তক্ষেপ করিতে আসিলে, বিহারী তাহাতে বাধা দিল। অপটু মহেন্দ্র সাহায্য করিবার কোনো চেষ্টাও করিল না। সে গুঁড়ির উপরে হেলান দিয়া একটা পায়ের উপরে আর একটা পা তুলিয়া কম্পিত বটপত্রের উপরে রৌদ্রকিরণের নৃত্য দেখিতে লাগিল।

রন্ধন প্রায় শেষ হইলে পর বিনোদিনী কহিল, “মহিনবাবু, আপনি ঐ বটের পাতা গনিয়া শেষ করিতে পারিবেন না, এবারে স্নান করিতে যান।”

ভৃত্যের দল এতক্ষণে জিনিসপত্র লইয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের গাড়ি পথের মধ্যে ভাঙিয়া গিয়াছিল। তখন বেলা দুপুর হইয়া গেছে।

আহারান্তে সেই বটগাছের তলায় তাস খেলিবার প্রস্তাব হইল– মহেন্দ্র কোনোমতেই গা দিল না এবং দেখিতে দেখিতে ছায়াতলে ঘুমাইয়া পড়িল। আশা বাড়ির মধ্যে গিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া বিশ্রামের উদ্‌যোগ করিল।

বিনোদিনী মাথার উপরে একটুখানি কাপড় তুলিয়া দিয়া কহিল, “আমি তবে ঘরে যাই।”

বিহারী কহিল, “কোথায় যাইবেন, একটু গল্প করুন। আপনাদের দেশের কথা বলুন।”

ক্ষণে ক্ষণে উষ্ণ মধ্যাহ্নের বাতাস তরুপল্লব মর্মরিত করিয়া চলিয়া গেল, ক্ষণে ক্ষণে দিঘির পাড়ে জামগাছের ঘনপত্রের মধ্য হইতে কোকিল ডাকিয়া উঠিল। বিনোদিনী তাহার ছেলেবেলাকার কথা বলিতে লাগিল, তাহার বাপমায়ের কথা, তাহার বাল্যসখির কথা। বলিতে বলিতে তাহার মাথা হইতে কাপড়টুকু খসিয়া পড়িল; বিনোদিনীর মুখে খরযৌবনের যে একটি দীপ্তি সর্বদাই বিরাজ করিত, বাল্যস্মৃতির ছায়া আসিয়া তাহাকে স্নিগ্ধ করিয়া দিল। বিনোদিনীর চক্ষে যে কৌতুকতীব্র কটাক্ষ দেখিয়া তীক্ষ্ণদৃষ্টি বিহারীর মনে এ পর্যন্ত নানাপ্রকার সংশয় উপস্থিত হইয়াছিল, সেই উজ্জ্বলকৃষ্ণ জ্যোতি যখন একটি শান্তসজল রেখায় ম্লান হইয়া আসিল তখন বিহারী যেন আর-একটি মানুষ দেখিতে পাইল। এই দীপ্তিমণ্ডলের কেন্দ্রস্থলে কোমল হৃদয়টুকু এখনো সুধাধারায় সরস হইয়া আছে, অপরিতৃপ্ত রঙ্গরস কৌতুকবিলাসের দহনজ্বালায় এখনো নারীপ্রকৃতি শুষ্ক হইয়া যায় নাই। বিনোদিনী সলজ্জ সতীস্ত্রীভাবে একান্ত-ভক্তিভরে পতিসেবা করিতেছে, কল্যাণপরিপূর্ণা জননীর মতো সন্তানকে কোলে ধরিয়া আছে, এ ছবি ইতিপূর্বে মুহূর্তের জন্যও বিহারীর মনে উদিত হয় নাই– আজ যেন রঙ্গমঞ্চের পটখানা ক্ষণকালের জন্য উড়িয়া গিয়া ঘরের ভিতরকার একটি মঙ্গলদৃশ্য তাহার চোখে পড়িল। বিহারী ভাবিল, বিনোদিনী বাহিরে বিলাসিনী যুবতী বটে, কিন্তু তাহার অন্তরে একটি পূজারতা নারী নিরশনে তপস্যা করিতেছে।

বিহারী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে কহিল, “প্রকৃত আপনাকে মানুষ আপনিও জানিতে পারে না, অন্তর্যামীই জানেন; অবস্থাবিপাকে যেটা বাহিরে গড়িয়া উঠে সংসারের কাছে সেইটেই সত্য।’ বিহারী কথাটাকে থামিতে দিল না– প্রশ্ন করিয়াকরিয়া জাগাইয়া রাখিতে লাগিল; বিনোদিনী এ-সকল কথা এ পর্যন্ত এমন করিয়া শোনাইবার লোক পায় নাই– বিশেষত, কোনো পুরুষের কাছে সে এমন আত্মবিস্মৃত স্বাভাবিক ভাবে কথা কহে নাই– আজ অজস্র কলকণ্ঠে নিতান্ত সহজ হৃদয়ের কথা বলিয়া তাহার সমস্ত প্রকৃতি যেন নববারিধারায় স্নাত, স্নিগ্ধ এবং পরিতৃপ্ত হইয়া গেল।

ভোরে উঠিবার উপদ্রবে ক্লান্ত, মহেন্দ্রের পাঁচটার সময় ঘুম ভাঙিল। বিরক্ত হইয়া কহিল, “এবার ফিরিবার উদ্‌যোগ করা যাক।”

বিনোদিনী কহিল, “আর-একটু সন্ধ্যা করিয়া গেলে কি ক্ষতি আছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “না, শেষকালে মাতাল গোরার হাতে পড়িতে হইবে?”

জিনিসপত্র গুছাইয়া তুলিতে অন্ধকার হইয়া আসিল। এমন সময় চাকর আসিয়া খবর দিল, “ঠিকা গাড়ি কোথায় গেছে, খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। গাড়ি বাগানের বাহিরে অপেক্ষা করিতেছিল, দুইজন গোরা গাড়োয়ানের প্রতি বল প্রকাশ করিয়া স্টেশনে লইয়া গেছে।”

আর-একটা গাড়ি ভাড়া করিতে চাকরকে পাঠাইয়া দেওয়া হইল। বিরক্ত মহেন্দ্র কেবলই মনে মনে কহিতে লাগিল, “আজ দিনটা মিথ্যা মাটি হইয়াছে।’ অধৈর্য সে আর কিছুতেই গোপন করিতে পারে না, এমনি হইল।

শুক্লপক্ষের চাঁদ ক্রমে শাখাজালজড়িত দিক্‌প্রান্ত হইতে মুক্ত আকাশে আরোহণ করিল। নিস্তব্ধ নিষ্কম্প বাগান ছায়ালোকে খচিত হইয়া উঠিল। আজ এই মায়ামণ্ডিত পৃথিবীর মধ্যে বিনোদিনী আপনাকে কী একটা অপূর্বভাবে অনুভব করিল। আজ সে যখন তরুবীথিকার মধ্যে আশাকে জড়াইয়া ধরিল, তাহার মধ্যে প্রণয়ের কৃত্রিমতা কিছুই ছিল না। আশা দেখিল, বিনোদিনীর দুই চক্ষু দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতেছে। আশা ব্যথিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কী ভাই চোখের বালি, তুমি কাঁদিতেছ কেন?”

বিনোদিনী কহিল, “কিছুই নয় ভাই, আমি বেশ আছি। আজ দিনটা আমার বড়ো ভালো লাগিল।”

আশা জিজ্ঞাসা করিল, “কিসে তোমার এত ভালো লাগিল, ভাই।”

বিনোদিনী কহিল, “আমার মনে হইতেছে, আমি যেন মরিয়া গেছি, যেন পরলোকে আসিয়াছি, এখানে যেন আমার সমস্তই মিলিতে পারে।”

বিস্মিত আশা এ-সব কথা কিছুই বুঝিতে পারিল না। সে মৃত্যুর কথা শুনিয়া দুঃখিত হইয়া কহিল, “ছি ভাই চোখের বালি, অমন কথা বলিতে নাই।”

গাড়ি পাওয়া গেল। বিহারী পুনরায় কোচবাক্সে চড়িয়া বসিল। বিনোদিনী কোনো কথা না বলিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল, জ্যোৎস্নায় স্তম্ভিত তরুশ্রেণী ধাবমান নিবিড় ছায়াস্রোতের মতো তাহার চোখের উপর দিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। আশা গাড়ির কোণে ঘুমাইয়া পড়িল। মহেন্দ্র সুদীর্ঘ পথ নিতান্ত বিমর্ষ হইয়া বসিয়া থাকিল।

Jamini-Roy_3

17

Wishing to smooth over these troubles, one day Mahendra suggested, ‘Let us go for a picnic to the gardens in Dum Dum next Sunday.’

While Asha was very excited at the idea Binodini opposed the plan strongly. Mahendra and Asha were very disappointed at her reaction and suspected this to be a ploy to distance herself from them.

As soon as Bihari arrived that afternoon, Binodini said to him, ‘These two have been upset with me since this morning because I said I did not want to go to Dum Dum on a picnic.’

Bihari answered, ‘Their disappointment is hardly unreasonable. If you do not join them on this picnic, the event will be reduced to something that one would hardly wish even on their greatest enemy.’

Binodini: Why do you not come as well? I am willing to go if you join the party.’

Bihari: Great. But what does the chief organiser say about this?

Both husband and wife were quite annoyed by this preferential treatment shown to Bihari. Mahendra felt less eager about the trip, now that Bihari was to be a member of the party. His aim had been to convince Bihari that his presence was undesirable to Binodini at all times, but this new turn of events meant Bihari would not be pushed aside as easily any more.

Mahendra said, ‘That is very good, but Bihari is prone to creating a fuss where ever he goes; one can never be sure that he will not gather all the local boys for a cause or not get into a fight with an Englishman.’

Bihari felt Mahendra’s genuine displeasure with the turn of events and smiled to himself; he said, ‘That is the fun of being alive, no one can predict what will happen at any time. We will have to start early, Madam, I will be here at the right time.’

Two carriages were hired early on the Sunday morning. The one that would carry the servants and the picnic things was inferior to the second class carriage that was hired for the family members. Bihari arrived with a huge box at the right time. Mahendra said, ‘What on earth is that? There is no more room in the servants’ carriage!’

Bihari said, ‘Do not worry yourself, I will organise everything.’

Binodini and Asha got into the carriage. Mahendra wondered where Bihari would sit. Bihari quickly placed the box on the top and climbed into the seat with the coachman.

Mahendra was very relieved. He had been worried that Bihari would want to sit inside the carriage with them. Binodini anxiously asked Bihari, ‘You will not fall, will you?’

Bihari heard her and said, ‘Do not fear, falling and fainting are not part of my repertoire!’

Mahendra waited until the carriage had started moving and then said, ‘Perhaps I should rather go and sit on top, Bihari can have my seat.’

Asha hurriedly pulled on his sleeve and said, ‘No, you will not!’

Binodini said, ‘You are not used to that kind of thing, why risk falling off?’

Mahendra grew agitated and said, ‘Me fall? What an idea!’ He made as if to dismount immediately.

Binodini said, ‘You blame Bihari, but you are the one who creates a situation out of nothing!’

Mahendra sulked and said, ‘Well, let me then get another carriage for myself so that Bihari can ride here.’

Asha said, ‘Then I will ride with you.’

Binodini said, ‘Will I then have to jump out of the carriage as well!’ The discussion ended there.

Mahendra was extremely sullen the rest of the way.

Their carriage reached the gardens in Dum Dum. The carriage with the servants had left much earlier than them but was nowhere to be seen.

The autumn morning was very pleasant. The dew had dried in the sunshine but the trees sparkled in the clear light. There were shefali shrubs by the wall, their feet smothered by fallen flowers that filled the air around with their perfume.

Asha became as happy as a wild doe in the freedom of the garden away from the bricks and mortar of their home. She gathered innumerable flowers with Binodini, picked ripe custard fruits from the trees and ate them as she sat underneath the tree. The two friends then bathed for a long time in the lake within the grounds. The two women filled the place with an innocent happiness…tree shade, the lake water and the flowering boughs that seemed to shower light and shade upon them – all thrilled with their presence.

The two came back to find that the other carriage had not arrived. Mahendra was sitting on the verandah with a face like thunder reading a catalogue from one of the foreign shops.

Binodini asked, ‘Where is Biharibabu?’

Mahendra answered shortly, ‘I do not know.’

Binodini: Come, let us find him.

Mahendra: There is no fear that someone would have abducted him. He will turn up without us going looking for him.

Binodini: But perhaps he is worried to death about his precious friend. Let us at least go and reassure him.

There was a great tree by the lake whose base had been framed with a seat. Bihari had unpacked his box there and was heating water on a kerosene stove. As soon as he saw them, he seated them and gave them a cup of hot tea each and a plate with some refreshments. Binodini kept saying, ‘How lucky that Biharibabu had brought all this, what ever would Mahendra have done without his tea!’

Although Mahendra was very glad to have the tea, he said, ‘Bihari just has to overdo things! We came for a picnic, but look at how he has got everything organized! One misses doing things spontaneously!’

Bihari said, ‘Give your tea back then, go and have fun on an empty stomach, I will not stop you!’

The day passed but the servants failed to show up. Bihari brought everything they needed for lunch out of his box. Rice, lentils, vegetables and even ground spices in little jars! Binodini was continually moved to exclaim, ‘Biharibabu, you are even better than us women! Where did you learn all this from, you have no ladies at home!’

Bihari said, ‘I have had to learn to save my own hide, who else would look after me.’

Even though he said it in jest, Binodini grew serious and her eyes rested on him with a look of great compassion.

Bihari and Binodini got busy with the cooking of the meal. Asha offered to help in her usual hesitant way, but Bihari would not permit her to do so. Mahendra who was inept at this sort of thing offered no help at all, prefering to lean back against the trunk of the tree and cross his legs as he watched the play of sunlight on the trembling banyan leaves above.

When the meal was almost ready, Binodini said, ‘Mahendrababu, you will not be able to finish counting them all, now go and have a bath.’

The servants finally arrived with the news that their carriage had broken down enroute. It was already past noon.

They planned to play cards under the tree when their lunch was done. Mahendra showed no inclination to join them and was soon fast asleep in the shade. Asha went into the house and prepared to have a nap.

Binodini covered her head slightly as a nod to the seclusion they found themselves surrounded by and said, ‘Perhaps I should go in too.’

Bihari said, ‘Where will you go? Let us talk for a while. Tell me about your village.’

The warm midday breeze ruffled the leaves above them as cuckoos called out again and again in the dense leaves of the jambu tree on the side of the lake. She talked about her childhood, her parents and her childhood friends. Her veil fell off her hair and the soothing memories of childhood seemed to soften the fierce passion of youth that always seemed to shine from her face. The teasing glances that the observant Bihari had previously observed and worried about were now dimmed to a gentle calm that finally allowed him to see another side to her. The soft heart at the centre of the bright exterior was still drenched in sweetness and her feminine core was not withered away by years of fruitless searching for love and the amusements natural to youth. Bihari had never thought of her as a demure wife tending to her husband or as a loving mother carrying a child in her arms. But today he suddenly saw a picture of loving domesticity as the curtains parted for a short while. He thought to himself, she might be a young woman who wanted everything outwardly but on the inside there still lived a woman filled with prayer and piety.

Bihari sighed and said to himself, ‘A person never truly knows what lies within themselves, that is left to the One who knows all; to everyone else, whatever floats to the surface of the soul through the trials of life becomes your entire identity.’ Bihari did not let her stop – he kept the conversation going with his questions; Binodini who had never found anyone willing to listen to these words so far, let alone a man to whom she was able to unburden herself in such a natural way found herself soothed, cleansed and fulfilled by the experience of being able to do so.

Mahendra who had been tired as he had woken at dawn slept till five in the afternoon; when awake he said testily, ‘Let us now make preparations to return.’

Binodini said, ‘What harm in starting when it is a little darker?’

Mahendra answered, ‘No, what if we fall in with drunken Englishmen?’

By the time all the things were packed, it was dark. The servants came and said, ‘We cannot find the carriages any more. They were waiting outside the gardens but two foreigners came and forcibly took them to the station.’

They were then sent to hire another carriage. Mahendra kept thinking, ‘The whole day has been in vain.’ He was so annoyed that he could not hide it any longer.

The waxing moon rose higher in the sky, freed from the branches that had hidden it from view. The stillness of the silent garden was now punctuated by shadows. Binodini had rediscovered herself today. For the first time, when she put her arms around Asha amid the trees, there was nothing false in her feelings of love. Asha looked at her and saw she was weeping. Upset by this, she asked, ‘Why are you crying, Chokher Bali?’

Binodini answered, ‘Nothing is wrong, I am fine. This day has been so good.’

Asha asked, ‘What did you enjoy so much?’

Binodini said, ‘I feel as though I have died and come to the next world where I may have everything I have wanted.’

Amazed though she was, Asha understood nothing of what was said. She heard the word death and was moved enough to say, ‘No, you must not say such things.’

A carriage was found. Bihari climbed into the seat next to the coachman again. Binodini stared outside the carriage without a word, the moonlit trees seeming to flow past like a shadowy current before her. Asha fell asleep in a corner and Mahendra sat through the long journey back in a very bad mood.

চোখের বালি ১৩/Chokher Bali 13

১৩

বিনোদিনী যখন নিতান্তই ধরা দিল না তখন আশার মাথায় একটা ফন্দি আসিল। সে বিনোদিনীকে কহিল, “ভাই বালি, তুমি আমার স্বামীর সম্মুখে বাহির হও না কেন। পলাইয়া বেড়াও কী জন্য।”

বিনোদিনী অতি সংক্ষেপে এবং সতেজে উত্তর করিল, “ছি ছি।”

আশা কহিল, “কেন। মার কাছে শুনিয়াছি, তুমি তো আমাদের পর নও।”

বিনোদিনী গম্ভীরমুখে কহিল, “সংসারে আপন-পর কেহই নাই। যে আপন মনে করে সেই আপন– যে পর বলিয়া জানে, সে আপন হইলেও পর।”

আশা মনে মনে ভাবিল, এ কথার আর উত্তর নাই। বাস্তবিকই তাহার স্বামী বিনোদিনীর প্রতি অন্যায় করেন, বাস্তবিকই তাহাকে পর ভাবেন এবং তাহার প্রতি অকারণে বিরক্ত হন।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আশা স্বামীকে অত্যন্ত আবদার করিয়া ধরিল, “আমার চোখের বালির সঙ্গে তোমাকে আলাপ করিতে হইবে।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “তোমার সাহস তো কম নয়।”

আশা জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, ভয় কিসের।”

মহেন্দ্র। তোমার সখীর যেরকম রূপের বর্ণনা কর, সে তো বড়ো নিরাপদ জায়গা নয়!

আশা কহিল, “আচ্ছা, সে আমি সামলাইতে পারিব। তুমি ঠাট্টা রাখিয়া দাও– তার সঙ্গে আলাপ করিবে কি না বলো।”

বিনোদিনীকে দেখিবে বলিয়া মহেন্দ্রের যে কৌতূহল ছিল না, তাহা নহে। এমনকি, আজকাল তাহাকে দেখিবার জন্য মাঝে মাঝে আগ্রহও জন্মে। সেই অনাবশ্যক আগ্রহটা তাহার নিজের কাছে উচিত বলিয়া ঠেকে নাই।

হৃদয়ের সম্পর্ক সম্বন্ধে মহেন্দ্রের উচিত-অনুচিতের আদর্শ সাধারণের অপেক্ষা কিছু কড়া। পাছে মাতার অধিকার লেশমাত্র ক্ষুণ্ন হয়, এইজন্য ইতিপূর্বে সে বিবাহের প্রসঙ্গমাত্র কানে আনিত না। আজকাল, আশার সহিত সম্বন্ধকে সে এমনভাবে রক্ষা করিতে চায় যে, অন্য স্ত্রীলোকের প্রতি সামান্য কৌতূহলকেও সে মনে স্থান দিতে চায় না। প্রেমের বিষয়ে সে যে বড়ো খুঁতখুঁতে এবং অত্যন্ত খাঁটি, এই লইয়া তাহার মনে একটা গর্ব ছিল। এমন কি, বিহারীকে সে বন্ধু বলিত বলিয়া অন্য কাহাকেও বন্ধু বলিয়া স্বীকার করিতেই চাহিত না। অন্য কেহ যদি তাহার নিকট আকৃষ্ট হইয়া আসিত, তবে মহেন্দ্র যেন তাহাকে গায়ে পড়িয়া উপেক্ষা দেখাইত, এবং বিহারীর নিকটে সেই হতভাগ্য সম্বন্ধে উপহাসতীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়া ইতরসাধারণের প্রতি নিজের একান্ত ঔদাসীন্য ঘোষণা করিত। বিহারী ইহাতে আপত্তি করিলে মহেন্দ্র বলিত, “তুমি পার বিহারী, যেখানে যাও তোমার বন্ধুর অভাব হয় না; আমি কিন্তু যাকে-তাকে বন্ধু বলিয়া টানাটানি করিতে পারি না।”

সেই মহেন্দ্রের মন আজকাল যখন মাঝে মাঝে অনিবার্য ব্যগ্রতা ও কৌতূহলের সহিত এই অপরিচিতার প্রতি আপনি ধাবিত হইতে থাকিত তখন সে নিজের আদর্শের কাছে যেন খাটো হইয়া পড়িত। অবশেষে বিরক্ত হইয়া বিনোদিনীকে বাটী হইতে বিদায় করিয়া দিবার জন্য সে তাহার মাকে পীড়াপীড়ি করিতে আরম্ভ করিল।

মহেন্দ্র কহিল, “থাক্‌ চুনি। তোমার চোখের বালির সঙ্গে আলাপ করিবার সময় কই। পড়িবার সময় ডাক্তারি বই পড়িব, অবকাশের সময় তুমি আছ, ইহার মধ্যে সখীকে কোথায় আনিবে।”

আশা কহিল, “আচ্ছা, তোমার ডাক্তারিতে ভাগ বসাইব না, আমারই অংশ আমি বালিকে দিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমি তো দিবে, আমি দিতে দিব কেন।”

আশা যে বিনোদিনীকে ভালোবাসিতে পারে, মহেন্দ্র বলে, ইহাতে তাহার স্বামীর প্রতি প্রেমের খর্বতা প্রতিপন্ন হয়। মহেন্দ্র অহংকার করিয়া বলিত, “আমার মতো অনন্যনিষ্ঠ প্রেম তোমার নহে।” আশা তাহা কিছুতেই মানিত না– ইহা লইয়া ঝগড়া করিত, কাঁদিত, কিন্তু তর্কে জিতিতে পারিত না।

মহেন্দ্র তাহাদের দুজনের মাঝখানে বিনোদিনীকে সূচ্যগ্র স্থান ছাড়িয়া দিতে চায় না, ইহাই তাহার গর্বের বিষয় হইয়া উঠিল। মহেন্দ্রের এই গর্ব আশার সহ্য হইত না, কিন্তু আজ সে পরাভব স্বীকার করিয়া কহিল, “আচ্ছা, বেশ, আমার খাতিরেই তুমি আমার বালির সঙ্গে আলাপ করো।”

আশায় নিকট মহেন্দ্র নিজের ভালোবাসার দৃঢ়তা ও শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করিয়া অবশেষে বিনোদিনীর সঙ্গে আলাপ করিবার জন্য অনুগ্রহপূর্বক রাজি হইল। বলিয়া রাখিল, “কিন্তু তাই বলিয়া যখন-তখন উৎপাত করিলে বাঁচিব না।”

পরদিন প্রত্যুষে বিনোদিনীকে আশা তাহার বিছানায় গিয়া জড়াইয়া ধরিল। বিনোদিনী কহিল, “এ কী আশ্চর্য। চকোরী যে আজ চাঁদকে ছাড়িয়া মেঘের দরবারে!”

আশা কহিল, “তোমাদের ও-সব কবিতার কথা আমার আসে না ভাই, কেন বেনাবনে মুক্ত ছড়ানো। যে তোমার কথার জবাব দিতে পারিবে, একবার তাহার কাছে কথা শোনাও’সে।”

বিনোদিনী কহিল, “সে রসিক লোকটি কে।”

আশা কহিল, “তোমার দেবর, আমার স্বামী। না ভাই, ঠাট্টা নয়– তিনি তোমার সঙ্গে আলাপ করিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতেছেন।”

বিনোদিনী মনে মনে কহিল, “স্ত্রীর হুকুমে আমার প্রতি তলব পড়িয়াছে, আমি অমনি ছুটিয়া যাইব, আমাকে তেমন পাও নাই।’

বিনোদিনী কোনোমতেই রাজি হইল না। আশা তখন স্বামীর কাছে বড়ো অপ্রতিভ হইল।

মহেন্দ্র মনে মনে বড়ো রাগ করিল। তাহার কাছে বাহির হইতে আপত্তি! তাহাকে অন্য সাধারণ পুরুষের মতো জ্ঞান করা! আর কেহ হইলে তো এতদিনে অগ্রসর হইয়া নানা কৌশলে বিনোদিনীর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ আলাপ-পরিচয় করিত। মহেন্দ্র যে তাহার চেষ্টামাত্রও করে নাই, ইহাতেই কি বিনোদিনী তাহার পরিচয় পায় নাই। বিনোদিনী যদি একবার ভালো করিয়া জানে, তবে অন্য পুরুষ এবং মহেন্দ্রের প্রভেদ বুঝিতে পারে।

বিনোদিনীও দুদিন পূর্বে আক্রোশের সহিত মনে মনে বলিয়াছিল, “এতকাল বাড়িতে আছি, মহেন্দ্র যে একবার আমাকে দেখিবার চেষ্টাও করে না। যখন পিসিমার ঘরে থাকি তখন কোনো ছুতা করিয়াও যে মার ঘরে আসে না। এত ঔদাসীন্য কিসের। আমি কি জড়পদার্থ। আমি কি মানুষ না। আমি কি স্ত্রীলোক নই। একবার যদি আমার পরিচয় পাইত, তবে আদরের চুনির সঙ্গে বিনোদিনীর প্রভেদ বুঝিতে পারিত।’

আশা স্বামীর কাছে প্রস্তাব করিল, “তুমি কালেজে গেছ বলিয়া চোখের বালিকে আমাদের ঘরে আনিব, তাহার পরে বাহির হইতে তুমি হঠাৎ আসিয়া পড়িবে– তা হইলেই সে জব্দ হইবে।”

মহেন্দ্র কহিল, “কী অপরাধে তাহাকে এতবড়ো কঠিন শাসনের আয়োজন।”

আশা কহিল, “না সত্যই আমার ভারি রাগ হইয়াছে। তোমার সঙ্গে দেখা করিতেও তার আপত্তি! প্রতিজ্ঞা ভাঙিব তবে ছাড়িব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার প্রিয়সখীর দর্শনাভাবে আমি মরিয়া যাইতেছি না। আমি অমন চুরি করিয়া দেখা করিতে চাই না।”

আশা সানুনয়ে মহেন্দ্রের হাত ধরিয়া কহিল, “মাথা খাও, একটিবার তোমাকে এ কাজ করিতেই হইবে। একবার যে করিয়া হোক তাহার গুমর ভাঙিতে চাই, তার পর তোমাদের যেমন ইচ্ছা তাই করিয়ো।”

মহেন্দ্র নিরুত্তর হইয়া রহিল। আশা কহিল, “লক্ষ্মীটি, আমার অনুরোধ রাখো।”

মহেন্দ্রের আগ্রহ প্রবল হইয়া উঠিতেছিল– সেইজন্য অতিরিক্ত মাত্রায় ঔদাসীন্য প্রকাশ করিয়া সম্মতি দিল।

শরৎকালের স্বচ্ছ নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে বিনোদিনী মহেন্দ্রের নির্জন শয়নগৃহে বসিয়া আশাকে কার্পেটের জুতা বুনিতে শিখাইতেছিল। আশা অন্যমনস্ক হইয়া ঘন ঘন দ্বারের দিকে চাহিয়া গণনায় ভুল করিয়া বিনোদিনীর নিকট নিজের অসাধ্য অপটুত্ব প্রকাশ করিতেছিল।

অবশেষে বিনোদিনী বিরক্ত হইয়া তাহার হাত হইতে কার্পেট টান মারিয়া ফেলিয়া দিয়া কহিল, “ও তোমার হইবে না, আমার কাজ আছে আমি যাই।”

আশা কহিল, “আর একটু বোসো, এবার দেখো, আমি ভুল করিব না।” বলিয়া আবার সেলাই লইয়া পড়িল।

ইতিমধ্যে নিঃশব্দপদে বিনোদিনীর পশ্চাতে দ্বারের নিকট মহেন্দ্র আসিয়া দাঁড়াইল। আশা সেলাই হইতে মুখ না তুলিয়া আস্তে আস্তে হাসিতে লাগিল।

বিনোদিনী কহিল, “হঠাৎ হাসির কথা কী মনে পড়িল।” আশা আর থাকিতে পারিল না। উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিয়া কার্পেট বিনোদিনীর গায়ের উপরে ফেলিয়া দিয়া কহিল, “না ভাই, ঠিক বলিয়াছ– ও আমার হইবে না”–বলিয়া বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া দ্বিগুণ হাসিতে লাগিল।

প্রথম হইতেই বিনোদিনী সব বুঝিয়াছিল। আশার চাঞ্চল্যে এবং ভাবভঙ্গিতে তাহার নিকট কিছুই গোপন ছিল না। কখন মহেন্দ্র পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহাও সে বেশ জানিতে পারিয়াছিল। নিতান্ত সরল নিরীহের মতো সে আশার এই অত্যন্ত ক্ষীণ ফাঁদের মধ্যে ধরা দিল।

মহেন্দ্র ঘরে ঢুকিয়া কহিল, “হাসির কারণ হইতে আমি হতভাগ্য কেন বঞ্চিত হই।”

বিনোদিনী চমকিয়া মাথায় কাপড় টানিয়া উঠিবার উপক্রম করিল। আশা তাহার হাত চাপিয়া ধরিল।

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “হয় আপনি বসুন আমি যাই, নয় আপনিও বসুন আমিও বসি।”

বিনোদিনী সাধারণ মেয়ের মতো আশার সহিত হাত-কাড়াকাড়ি করিয়া মহাকোলাহলে লজ্জায় ধুম বাধাইয়া দিল না। সহজ সুরেই বলিল, “কেবল আপনার অনুরোধেই বসিলাম, কিন্তু মনে মনে অভিশাপ দিবেন না।”

মহেন্দ্র কহিল, “এই বলিয়া অভিশাপ দিব, আপনার যেন অনেকক্ষণ চলৎশক্তি না থাকে।”

বিনোদিনী কহিল, “সে অভিশাপকে আমি ভয় করি না। কেননা, আপনার অনেকক্ষণ খুব বেশিক্ষণ হইবে না। বোধ হয়, সময় উত্তীর্ণ হইয়া আসিল।”

বলিয়া আবার সে উঠিবার চেষ্টা করিল। আশা তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “মাথা খাও আর একটু বোসো।”

CB13
13

When Binodini refused to see her at all costs Asha decided on a plan. She said to Binodini, ‘Dear Bali, why do you not come to me when my husband is here? Why do you avoid him?’

Binodini said shortly and forcefully ‘Shame on you!’

Asha said, ‘Why? I have heard from our mother, you are not unrelated to the family.’

Binodini said with a serious look, ‘Who is unrelated in this world? The one who thinks of you as family is family, the one who holds you at arm’s length is not even if they are related.’

Asha thought to herself, there was no answer to these words. Her husband did do Binodini a great wrong by thinking of her as an outsider and being annoyed with her for no reason.

That evening Asha pleaded with her husband saying, ‘You must agree to meet my friend Bali.’
Mahendra smiled and said, ‘You are certainly brave!’

Asha asked, ‘Should I be afraid?’

Mahendra: ‘The way you describe your friend’s beauty, it is not very safe either.’

Asha said, ‘Alright, I will take care of that. Stop teasing me; tell me you will meet her.’

It was not as if Mahendra was not eager to see Binodini. He often thought about her these days. But he knew that this interest was inappropriate.

Mahendra’s ideas about relationships were somewhat different from other people. For example he had never raised the topic of his own marriage because he did not wish to hurt his mother’s sense of ownership over him. He was now intent on having the kind of relationship with Asha that made him free from any curiosity about any other woman at all. He was very proud of the fact that he was steadfast in his love. He was even reluctant to make any other friends because he already had a friend in Bihari. When others approached him because they had found something in him to like, he would deliberately show them his disdain and would later describe them to Bihari in the most scathing language as proof of his utter ambivalence towards the general public. When Bihari protested, he would say, ‘Bihari, you can make friends wherever you go; but I cannot do that with everyone that easily.’

When his mind turned to thoughts of the unknown woman with an inevitable eagerness and curiosity he felt belittled before his own ideals. Eventually he asked his mother to get rid of Binodini from the household.

Mahendra said, ‘Let it be Chuni, where is the time to meet your friend? I have to study and at all other times, I have you. What need is there for your friend?’

Asha said, ‘We will not make claims on your study time, I am asking you to meet her in my share of your day.’

Mahendra answered, ‘Why will I let you share that time with anyone else?’

Mahendra used to see the fact that Asha loved Binodini as somehow diminishing her love for him. He would say with some pride, ‘Your love is not as exclusive as mine.’ Asha did not agree to this, she quarreled with him and shed tears but to no avail; she could not win the argument.

For Mahendra it had become a matter of pride that he was not going to relinquish the tiniest space in their world to Binodini. Asha could not bear this but today she admitted defeat and said, ‘Alright, but please meet my friend for my sake.’

Eventually he agreed to meet Binodini, almost as a magnanimous gesture and a sign of the supremacy and strength of his love for Asha. He also added, ‘I hope this does not mean we will have to meet regularly from now on.’

Early the next morning Asha went to Binodini and embraced her while she was still in bed. Binodini said, ‘How unusual, the rain bird has left the moon alone and comes to the court of the clouds today.’

Asha said, ‘There is little point in wasting all your poetry and pretty sayings on me. Perhaps you should say them to the one who will be able to answer you appropriately.’

Binodini asked, ‘And who might that charmer be?’

Asha said, ‘Your brother-in-law, my husband. I am not making this up, he does want to meet you very much.’

‘You want to see me just because your wife says so! I am not to be had that easily!’ Binodini thought to herself.

Binodini did not agree to see him at all. Asha felt quite embarrassed in front of her husband.

Mahendra was secretly very annoyed. Why would she not appear before him? Was he like all other men? If it was any other man, they would have met Binodini a long time ago on some excuse. Mahendra had not even tried that, did not Binodini understand what he was like from observing these things? If Binodini gave him one chance she would see how he was different from all other name.

Binodini too had promised herself two days earlier, ‘I have been here for so long, and still he does not try to see me. When I am in his mother’s rooms, he could easily have made an excuse to come and see me. Why does he have to ignore me so much? Am I not made of flesh and blood? Am I not a woman? If he knew me once, he would see the difference between Binodini and his precious Chuni!’

Asha proposed to her husband that she would bring Binodini to her room when Mahendra was supposed to be at his college and he could then suddenly appear and surprise her.

Mahendra asked, ‘What has she done for you to punish her like that?’

Asha said, ‘No, I really am very angry. Why does she not want to even meet you? I will see to it that she cannot keep her word.’

Mahendra said, ‘I am not fading away just because I have never seen your dear friend. I do not want to steal a glimpse of her like that.’

Asha held Mahendra’s hand and said, ‘Please, you must do this but once. I just want to break her resistance once, do whatever you wish after that.’

Mahendra did not answer her straight away. Asha pleaded with him to keep his word.

Mahendra was growing very keen to see Binodini but he masked this with a great show of careless ambivalence about agreeing to meet her.

Binodini was teaching Asha how to make a pair of carpet slippers in Mahendra’s empty bedroom one sunny afternoon in autumn. All was silent about them. Asha kept looking at the bedroom door and her repeated mistakes only served to demonstrate her lack of skill to Binodini.

She eventually took the tapestry from Asha’s hands with some anger, flung it away and said, ‘You will never learn to do this properly, I have work to do, I am going!’

Asha said, ‘Just wait a bit more, I will get this right this time.’ She then started sewing again.

In the meantime Mahendra had come to the room and was standing at the door behind Binodini, unnoticed. Asha did not look up but she started to smile softly as she sensed his presence.

Binodini said, ‘Whatever has happened to make you laugh so much?’ Asha could not hold her secret to herself any longer. She laughed out aloud and threw the tapestry at Binodini saying, ‘No, you were right, I won’t be able to do this, ever!’ She flung her arms about Binodini’s neck and laughed even harder.

Binodini had guessed Asha’s plan right from the beginning. She had seen through Asha’s excitement and her behavior. She had known the very moment when Mahendra came and stood behind her. She had pretended to be trapped by the extremely flimsy pretences Asha had presented.

Mahendra entered the room and said, ‘Why leave me out? Could I join in the laughter too?’

Binodini started, pulling her veil down making as if to leave. Asha held her by the hands.

Mahendra smiled and said, ‘Perhaps you should sit and I should leave, or perhaps we could both sit down.’

Binodini did not behave in the usual manner of women and engage in a false show of being ashamed with Asha. She said calmly, ‘I am only sitting down because you have asked me to, but please do not wish me ill.’

Mahendra said, ‘I will have to wish you ill then and hope that you are not able to move for a long time.’

Binodini said, ‘I do not fear your ill wishes as your idea of a long time is not that long. It will be over very soon.’

She then tried to leave once again. Asha grabbed her hand and said, ‘Please, you must stay here a little longer.’