Tag Archive | Rabindranath Tagore’s essays

ছাত্রশাসনতন্ত্র/ Student Discipline: Excerpt

যেখান হইতে আমরা জ্ঞান পাই, সেখানে আমাদের শ্রদ্ধা যাইবে, এটা মানবপ্রকৃতির ধর্ম। তাহার উল্টা দেখিলে বাহিরের শাসনে এই বিকৃতির প্রতিকার করিতে হইবে, সে কথা সকলেই স্বীকার করিবেন।

কিন্তু প্রতিকারের প্রণালী স্থির করিবার পূর্বে ভাবিয়া দেখা চাই, স্বভাব ওল্টায় কিসে।

কাগজে দেখিতে পাই, অনেকে এই বলিয়া আক্ষেপ করিতেছেন যে, যে ভারতবর্ষে গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ ধর্মসম্বন্ধ সেখানে এমনতরো ঘটনা বিশেষভাবে গর্হিত। শুধু গর্হিত এ কথা বলিয়া পার পাইব না, চিরকালীন এই সংস্কার অস্থিমজ্জার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারে তাহার ব্যতিক্রম ঘটিতেছে কেন এর একটা সত্য উত্তর বাহির করিতে হইবে।

বাংলাদেশের ছাত্রদের মনস্তত্ত্ব যে বিধাতার একটা খাপছাড়া খেয়াল এ কথা মানি না। ছেলেরা যে বয়সে কলেজে পড়ে সেটা একটা বয়ঃসন্ধির কাল। তখন শাসনের সীমানা হইতে স্বাধীনতার এলাকায় সে প্রথম পা বাড়াইয়াছে। এই স্বাধীনতা কেবল বাহিরের ব্যবহারগত নহে; মনোরাজ্যেও সে ভাষার খাঁচা ছাড়িয়া ভাবের আকাশে ডানা মেলিতে শুরু করিয়াছে। তার মন প্রশ্ন করিবার, তর্ক করিবার, বিচার করিবার অধিকার প্রথম লাভ করিয়াছে। শরীর-মনের এই বয়ঃসন্ধিকালটিই বেদনাকাতরতায় ভরা। এই সময়েই অল্পমাত্র অপমান মর্মে গিয়া বিঁধিয়া থাকে এবং আভাসমাত্র প্রীতি জীবনকে সুধাময় করিয়া তোলে। এই সময়েই মানবসংস্রবের জোর তার ‘পরে যতটা খাটে এমন আর-কোনো সময়েই নয়।

এই বয়সটাই মানুষের জীবন মানুষের সঙ্গপ্রভাবেই গড়িয়া উঠিবার পক্ষে সকলের চেয়ে অনুকূল, স্বভাবের এই সত্যটিকে সকল দেশের লোকেই মানিয়া লইয়াছে। এইজন্যই আমাদের দেশে বলে: প্রাপ্তে তু ষোড়শে বর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ। তার মানে এই বয়সেই ছেলে যেন বাপকে পুরাপুরি মানুষ বলিয়া বুঝিতে পারে, শাসনের কল বলিয়া নহে; কেননা, মানুষ হইবার পক্ষে মানুষের সংস্রব এই বয়সেই দরকার। এইজন্যই সকল দেশেই য়ুনিভার্সিটিতে ছাত্ররা এমন একটুখানি সম্মানের পদ পাইয়া থাকে যাহাতে অধ্যাপকদের বিশেষ কাছে তারা আসিতে পারে এবং সে সুযোগে তাদের জীবনের ‘পরে মানব-সংস্রবের হাত পড়িতে পায়। এই বয়সে ছাত্রগণ শিক্ষার উদ্যোগপর্ব শেষ করিয়া মনুষ্যত্বের সার জিনিসগুলিকে আত্মসাৎ করিবার পালা আরম্ভ করে; এই কাজটি স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান ছাড়া হইবার জো নাই। সেইজন্যই এই বয়সে আত্মসম্মানের সম্বন্ধে দরদ বড়ো বেশি হয়। চিবাইয়া খাইবার বয়স আসিলে বেশ একটু জানান দিয়া দাঁত ওঠে, তেমনি মনুষ্যত্বলাভের যখন বয়স আসে তখন আত্মসম্মানবোটা একটু ঘটা করিয়াই দেখা দেয়।

এই বয়ঃসন্ধির কালে ছাত্ররা মাঝে মাঝে এক-একটা হাঙ্গামা বাধাইয়া বসে। যেখানে ছাত্রদের সঙ্গে অধ্যাপকের সম্বন্ধ স্বাভাবিক সেখানে এই-সকল উৎপাতকে জোয়ারের জলের জঞ্জালের মতো ভাসিয়া যাইতে দেওয়া হয়; কেননা, তাকে টানিয়া তুলিতে গেলেই সেটা বিশ্রী হইয়া উঠে।

বিধাতার নিয়ম অনুসারে বাঙালি ছাত্রদেরও এই বয়ঃসন্ধির কাল আসে, তখন তাহাদের মনোবৃত্তি যেমন এক দিকে আত্মশক্তির অভিমুখে মাটি ফুঁড়িয়া উঠিতে চায় তেমনি আর-এক দিকে যেখানে তারা কোনো মহত্ত্ব দেখে, যেখান হইতে তারা শ্রদ্ধা পায়, জ্ঞান পায়, দরদ পায়, প্রাণের প্রেরণা পায়, সেখানে নিজেকে উৎসর্গ করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠে।

জেলখানার কয়েদি নিয়মে নড়চড় করিলে তাকে কড়া শাসন করিতে কারও বাধে না; কেননা তাকে অপরাধী বলিয়াই দেখা হয়, মানুষ বলিয়া নয়। অপমানের কঠোরতায় মানুষের মনে কড়া পড়িয়া তাকে কেবলই অমানুষ করিতে থাকে, সে হিসাবটা কেহ করিতে চায় না; কেননা, মানুষের দিক দিয়া তাকে হিসাব করাই হয় না। এইজন্য জেলখানার সর্দারি যে করে সে মানুষকে নয়, আপরাধীকেই সকলের চেয়ে বড়ো করিয়া দেখে।

সৈন্যদলকে তৈরি করিয়া তুলিবার ভার যে লইয়াছে সে মানুষকে একটিমাত্র সংকীর্ণ প্রয়োজনের দিক হইতেই দেখিতে বাধ্য। লড়াইয়ের নিখুঁত কল বানাইবার ফর্মাশ তার উপরে। সুতরাং, সেই কলের হিসাবে যে-কিছু ত্রুটি সেইটে সে একান্ত করিয়া দেখে এবং নির্মমভাবে সংশোধন করে।

কিন্তু ছাত্রকে জেলের কয়েদি বা ফৌজের সিপাই বলিয়া আমরা তো মনে ভাবিতে পারি না। আমরা জানি, তাহাদিগকে মানুষ করিয়া তুলিতে হইবে। মানুষের প্রকৃতি সূক্ষ্ম এবং সজীব তন্তুজালে বড়ো বিচিত্র করিয়া গড়া। এইজন্যই মানুষের মাথা ধরিলে মাথায় মুগুর মারিয়া সেটা সারানো যায় না; অনেক দিক বাঁচাইয়া প্রকৃতির সাধ্যসাধনা করিয়া তার চিকিৎসা করিতে হয়। এমন লোকও আছে এ সম্বন্ধে যারা বিজ্ঞানকে খুবই সহজ করিয়া আনিয়াছে; তারা সকল ব্যাধিরই একটিমাত্র কারণ ঠিক করিয়া রাখিয়াছে, সে ভূতে পাওয়া।

এ হইল আনাড়ির চিকিৎসা। যারা বিচক্ষণ তারা ব্যাধিটাকেই স্বতন্ত্র করিয়া দেখে না; চিকিৎসার সময় তারা মানুষের সমস্ত ধাতটাকে অখণ্ড করিয়া দেখে; মানবপ্রকৃতির জটিলতা ও সূক্ষ্মতাকে তারা মানিয়া লয় এবং বিশেষ কোনো ব্যাধিকে শাসন করিতে গিয়া সমস্ত মানুষকে নিকাশ করিয়া বসে না।

অতএব যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা বা ড্রিল সার্জেণ্ট্‌ বা ভূতের ওঝা হওয়া তাদের কোনোমতেই উচিত হয় না ছাত্রদিগকে মানুষ করিবার ভার লওয়া। ছাত্রদের ভার তাঁরাই লইবার অধিকারী যাঁরা নিজের চেয়ে বয়সে অল্প, জ্ঞানে অপ্রবীণ ও ক্ষমতায় দুর্বলকেও সহজেই শ্রদ্ধা করিতে পারেন; যাঁরা জানেন, শক্তস্য ভূষণং ক্ষমা; যাঁরা ছাত্রকেও মিত্র বলিয়া  গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হন না।

ছাত্রদিগকে কড়া শাসনের জালে যাঁরা মাথা হইতে পা পর্যন্ত বাঁধিয়া ফেলিতে চান তাঁরা অধ্যাপকদের যে কত বড়ো ক্ষতি করিতেছেন সেটা যেন ভাবিয়া দেখেন। পৃথিবীতে অল্প লোকই আছে নিজের অন্তরের মহৎ আদর্শ যাহাদিগকে সত্য পথে আহ্বান করিয়া লইয়া যায়। বাহিরের সঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাতের ঠেলাতেই তারা কর্তব্য সম্বন্ধে সতর্ক হইয়া থাকে। বাহিরের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে বলিয়াই তারা আত্মবিস্মৃত হইতে পারে না।

এইজন্যই চারি দিকে যেখানে দাসত্ব মনিবের সেখানে দুর্গতি, শূদ্র যেখানে শূদ্র ব্রাহ্মণের সেখানে অধঃপতন। কঠোর শাসনের চাপে ছাত্রেরা যদি মানবস্বভাব হইতে ভ্রষ্ট হয়, সকলপ্রকার অপমান দুর্ব্যবহার ও অযোগ্যতা যদি তারা নির্জীবভাবে নিঃশব্দে সহিয়া যায়, তবে অধিকাংশ অধ্যাপকদিগকেই তাহা অধোগতির দিকে টানিয়া লইবে। ছাত্রদের মধ্যে অবজ্ঞার কারণ তাঁরা নিজে ঘটাইয়া তুলিয়া তাহাদের অবমাননার দ্বারা নিজেকে অহরহ অবমানিত করিতে থাকিবেন। অবজ্ঞার ক্ষেত্রে নিজের কর্তব্য কখনোই কেহ সাধন করিতে পারে না।

অপর পক্ষ বলিবেন, তবে কি ছেলেরা যা খুশি তাই করিবে তার সমস্তই সহিয়া লইতে হইবে? আমার কথা এই, ছেলেরা যা খুশি তাই কখনোই করিবে না। তারা ঠিক পথেই চলিবে, যদি তাহাদের সঙ্গে ঠিকমত ব্যবহার করা হয়। যদি তাহাদিগকে অপমান কর, তাহাদের জাতি বা ধর্ম বা আচারকে গালি দাও, যদি দেখে তাহাদের পক্ষে সুবিচার পাইবার আশা নাই, যদি অনুভব করে যোগ্যতাসত্ত্বেও তাহাদের স্বদেশীয় অধ্যাপকেরা অযোগ্যের কাছে মাথা হেঁট করিতে বাধ্য, তবে ক্ষণে ক্ষণে তারা অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করিবেই; যদি না করে তবে আমরা সেটাকে লজ্জা এবং দুঃখের বিষয় বলিয়া মনে করিব।

*****

That we will direct our respect towards the place where we derive our learning from is in the nature of mankind. Everyone will agree that if the opposite is seen the aberration must be rectified through external discipline.

But prior to deciding on the method of correction thought must be given to the reasons behind this change.

I see that many people are stating regretfully that such incidents are especially ruinous in a country like India where the relationship between guru and shishya borders on the religious. Merely calling them ruinous is not enough, one must look for the truth behind a change to behaviour that is contrary despite the tradition being embedded in our heritage.

I do not agree with the view that the psychology of the students of Bengal is the result of a whim on the part of nature. Young people study in college during a transitional part of their lives. They are taking their first steps from a framework of rules into an arena of freedom. This freedom is not merely limited to external behaviour, it is also the time when they spread their wings internally and leave the cage of words to test the skies of thought. Their minds have achieved the right to question, to debate, and to judge for the first time. This transitional phase of both bodies and minds is filled with pain. It is a time when the smallest slight pierces the soul and the slightest indication of affection fills life with joy. The effects of socializing with other people has the most effect during these times and never to this extent ever again.

This is the age which is the most suitable for molding a life under the influence of the others, every nation agrees with this truth about human nature. That is why it is said in our country: When the son attains the age of sixteen years, one must treat him like a friend. This means that sons of this age begin to see their fathers as human beings and not as vehicles of discipline; because one can grow best in the company of others at this age. That is why students in the universities across the world are given positions that accord them respect and allow them to approach professors and gain the benefit of social interactions. The students finish the preparatory stages of their education and are now about to make the essence of humanity their own; a task that cannot be achieved without freedom and self respect. This is why self respect is greatly treasured at this age. Just as teeth emerge with a little accompanying pain when the time is right for chewing one’s food, self respect too arrives with some excessive feelings when the age is appropriate for achieving adulthood.

Sometimes students get into strife at this age of transition. In those situations where the relationship between teachers and students are normal, these troubles wash away easily like flotsam before the tide; it is in fact unpleasant only when one attempts to pick at it with an eye at removal.

As per the laws of nature this age of transition arrives in the lives of Bengali students too; a point when their inclination is to go where their strength takes them and they feel strongly about committing themselves to greatness when they are rewarded with respect, knowledge and their souls receive inspiration.

When a prisoner breaks rules no one feels unable to discipline them severely; this is because they are seen only as offenders and not as people. The harshness of the punishment merely serves to harden him further and makes him subhuman but no one considers this; because no one considers the effects as affecting a human being. That is why the jails are supervised by people who do not see the human but consider his offence to be the true identity of the prisoner.

The person in charge of building an army is forced to consider people with one specific need in mind. His orders are to create an efficient war machine. Hence he sees only the faults that lie in the way of achieving this and having seen them proceeds to correct them with brutality.

But we must not think of students as prisoners or soldiers. We know that they must be molded into human beings. Human nature is delicate and constructed of intricately woven living strands. This is the very reason why a headache may not be cured by smashing the head in with a club; many things have to be considered before working with nature in order to heal it.

This then is the nature of treatment at the hands of the inexperienced. The experts never see the disease as a separate thing but consider the nature of the whole human being; they accept the complexities of human nature and do not do away with the entire human being in the name of attacking one particular disease.

Hence the person who was meant to be a jailor or a drill sergeant or an exorcist should never take up the job of instructing students in becoming humans. The only people fit to take responsibility for students should be those who can easily respect individuals who are younger than them, who know less than them and those who hold less power than them; those who have learned that forgiveness is an ornament to the strong; who are not afraid of accepting their students as their friends.

Let those who wish to bind students within bonds of strict rules also think about the great harm they do to the teachers. There are very few people on earth who can progress along the path of truth inspired by the great ideals within themselves. They are alerted to their responsibilities by the to-ing and fro-ing they undergo in their interactions with the outside. They never forget themselves because they are in complete understanding with their environment.

This is why masters are in danger wherever slaves exist, the high castes are fallen wherever the lower castes are suppressed. If students move from the rightful path as human beings under strict control, if they bear every kind of insult, ill treatment and injustice in silence and without protest, then most teachers will also be pulled down by this. They will see to their own downfall if they allow their students to become subjugated and subjects of derision. No one can carry out their own responsibilities in the face of derision.

The opposition will say, does that mean we must put up with everything that the young will do? To them I say, the young will never do whatever they please. They will walk along the right paths if they are treated properly. If you insult them, curse their race, religion or customs, if they see that there is little chance of getting fair treatment, if they see that their own teachers are forced to bow to others despite their own worth, then they will express their discontent at each moment; if they do not then we must think of it as a matter of shame and sadness.

Advertisements

ছেলেবেলা/Chelebela/My childhood 3

joras

One of the inner verandahs at the Jorasanko house(my photo)

বেলা বেড়ে যায়, রোদ্দুর ওঠে কড়া হয়ে, দেউরিতে ঘন্টা বেজে ওঠে; পালকির ভিতরকার দিনটা ঘন্টার হিসাব মানে না। সেখানকার বারোটা সেই সাবেক কালের যখন রাজবাড়ির সিংহদ্বারে সভাভঙ্গের ডঙ্কা বাজত, রাজা যেতেন স্নানে, চন্দনের জলে। ছুটির দিন দুপুরবেলা যাদের তাঁবেদারিতে ছিলুম তারা খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুম দিচ্ছে। একলা বসে আছি। চলেছে মনের মধ্যে আমার অচল পালকি, হাওয়ায় তৈরি বেহারাগুলো আমার মনের নিমক খেয়ে মানুষ। চলার পথটা কাটা হয়েছে আমারই খেয়ালে। সেই পথে চলেছে পালকি দূরে দূরে দেশে দেশে, সে-সব দেশের বইপড়া নাম আমারই লাগিয়ে দেওয়া। কখনো বা তার পথটা ঢুকে পড়ে ঘন বনের ভিতর দিয়ে। বাঘের চোখ জ্বল্জ্বল্ করছে, গা করছে ছম্ছম্। সঙ্গে আছে বিশ্বনাথ শিকারী, বন্দুক ছুটল দুম্, ব্যাস্ সব চুপ। তার পরে এক সময়ে পালকির চেহারা বদলে গিয়ে হয়ে ওঠে ময়ূরপঙ্খি, ভেসে চলে সমুদ্রে, ডাঙা যায় না দেখা। দাঁড় পড়তে থাকে ছপ্ছপ্ ছপ্ছপ্, ঢেউ উঠতে থাকে দুলে দুলে ফুলে ফুলে। মাল্লারা বলে ওঠে, সামাল সামাল, ঝড় উঠল। হালের কাছে আবদুল মাঝি, ছুঁচলো তার দাড়ি, গোঁফ তার কামানো, মাথা তার নেড়া। তাকে চিনি, সে দাদাকে এনে দিত পদ্মা থেকে ইলিশমাছ আর কচ্ছপের ডিম।

সে আমার কাছে গল্প করেছিল– একদিন মাসের শেষে ডিঙিতে মাছ ধরতে গিয়েছে, হঠাৎ এল কালবৈশাখী। ভীষণ তুফান, নৌকা ডোবে ডোবে। আবদুল দাঁতে রশি কামড়ে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে, সাঁৎরে উঠল চরে, কাছি ধরে টেনে তুলল তার ডিঙি। গল্পটা এত শিগ্গির শেষ হল, আমার পছন্দ হল না। নৌকাটা ডুবল না, অমনিই বেঁচে গেল, এ তো গপ্পই নয়। বারবার বলতে লাগলুম “তার পর’?

সে বললে, “তার পর সে এক কাণ্ড। দেখি, এক নেকড়ে বাঘ। ইয়া তার গোঁফজোড়া। ঝড়ের সময়ে সে উঠেছিল ও পারে গঞ্জের ঘাটের পাকুড় গাছে। দমকা হাওয়া যেমনি লাগল গাছ ভেঙে পড়ল পদ্মায়। বাঘ ভায়া ভেসে যায় জলের তোড়ে।

খাবি খেতে খেতে উঠল এসে চরে। তাকে দেখেই আমার রশিতে লাগালুম ফাঁস। জানোয়ারটা এত্তো বড়ো চোখ পাকিয়ে দাঁড়াল আমার সামনে। সাঁতার কেটে তার জমে উঠেছে খিদে। আমাকে দেখে তার লাল-টকটকে জিভ দিয়ে নাল ঝরতে লাগল। বাইরে ভিতরে অনেক মানুষের সঙ্গে তার চেনাশোনা হয়ে গেছে, কিন্তু আবদুলকে সে চেনে না। আমি ডাক দিলুম “আও বাচ্ছা’। সে সামনের দু পা তুলে উঠতেই দিলুম তার গলায় ফাঁস আটকিয়ে, ছাড়াবার জন্যে যতই ছটফট করে ততই ফাঁস এঁটে গিয়ে তার জিভ বেরিয়ে পড়ে’।

এই পর্যন্ত শুনেই আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, “আবদুল, সে মরে গেল নাকি’।

আবদুল বললে, “মরবে তার বাপের সাধ্যি কী। নদীতে বান এসেছে, বাহাদুরগঞ্জে ফিরতে হবে তো? ডিঙির সঙ্গে জুড়ে বাঘের বাচ্ছাকে দিয়ে গুণ টানিয়ে নিলেম অন্তত বিশ ক্রোশ রাস্তা। গোঁ গোঁ করতে থাকে, পেটে দিই দাঁড়ের খোঁচা, দশ-পনেরো ঘন্টার রাস্তা দেড় ঘন্টায় পৌঁছিয়ে দিলে। তার পরেকার কথা আর জিগ্গেস কোরো না বাবা, জবাব মিলবে না’।

আমি বললুম, “আচ্ছা বেশ, বাঘ তো হল, এবার কুমির?’

আবদুল বললে, “জলের উপর তার নাকের ডগা দেখেছি অনেকবার। নদীর ঢালু ডাঙায় লম্বা হয়ে শুয়ে সে যখন রোদ পোহায়, মনে হয় ভারি বিচ্ছিরি হাসি হাসছে। বন্দুক থাকলে মোকাবিলা করা যেত। লাইসেন্স্ ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু মজা হল। একদিন কাঁচি বেদেনি ডাঙায় বসে দা দিয়ে বাখারি চাঁচছে, তার ছাগলছানা পাশে বাঁধা। কখন নদীর থেকে কুমিরটা পাঁঠার ঠ্যাঙ ধরে জলে টেনে নিয়ে চলল। বেদেনি একেবারে লাফ দিয়ে বসল তার পিঠের উপর। দা দিয়ে ঐ দানোগিরগিটির গলায় পোঁচের উপর পোঁচ লাগাল। ছাগলছানা ছেড়ে জন্তুটা ডুবে পড়ল জলে।’

আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, “তার পরে?’

আবদুল বললে, “তার পরেকার খবর তলিয়ে গেছে জলের তলায়, তুলে আনতে দেরি হবে। আসছেবার যখন দেখা হবে চর পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে আসব।’
কিন্তু আর তো সে আসে নি, হয়তো খোঁজ নিতে গেছে।

এই তো ছিল পালকির ভিতর আমার সফর; পালকির বাইরে এক-একদিন ছিল আমার মাস্টারি, রেলিঙগুলো আমার ছাত্র। ভয়ে থাকত চুপ। এক-একটা ছিল ভারি দুষ্ট, পড়াশুনোয় কিচ্ছুই মন নেই; ভয় দেখাই যে বড়ো হলে কুলিগিরি করতে হবে। মার খেয়ে আগাগোড়া গায়ে দাগ পড়ে গেছে, দুষ্টুমি থামতে চায় না, কেননা থামলে যে চলে না, খেলা বন্ধ হয়ে যায়। আরও একটা খেলা ছিল, সে আমার কাঠের সিঙ্গিকে নিয়ে। পূজায় বলিদানের গল্প শুনে ঠিক করেছিলুম সিঙ্গিকে বলি দিলে খুব একটা কাণ্ড হবে। তার পিঠে কাঠি দিয়ে অনেক কোপ দিয়েছি। মন্তর বানাতে হয়েছিল, নইলে পুজো হয় না।–

সিঙ্গিমামা কাটুম
আন্দিবোসের বাটুম
উলুকুট ঢুলুকুট ঢ্যামকুড়কুড়
আখরোট বাখরোট খট খট খটাস
পট পট পটাস।

এর মধ্যে প্রায় সব কথাই ধার-করা, কেবল আখরোট কথাটা আমার নিজের। আখরোট খেতে ভালোবাসতুম। খটাস শব্দ থেকে বোঝা যাবে আমার খাঁড়াটা ছিল কাঠের। আর পটাস শব্দে জানিয়ে দিচ্ছে সে খাঁড়া মজবুত ছিল না।

কাল রাত্তির থেকে মেঘের কামাই নেই। কেবলই চলছে বৃষ্টি। গাছগুলো বোকার মতো জবুস্থবু হয়ে রয়েছে। পাখির ডাক বন্ধ। আজ মনে পড়ছে আমার ছেলেবেলাকার সন্ধেবেলা।

তখন আমাদের ঐ সময়টা কাটত চাকরদের মহলে। তখনও ইংরেজি শব্দের বানান আর মানে-মুখস্থর বুক-ধড়াস সন্ধেবেলার ঘাড়ে চেপে বসে নি। সেজদাদা বলতেন আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন। তাই যখন আমাদের বয়সী ইস্কুলের সব পোড়োরা গড়গড় করে আউড়ে চলেছে I am up আমি হই উপরে,He is down তিনি হন নীচে, তখনও বি-এ-ডি ব্যাড এম-এ-ডি ম্যাড পর্যন্ত আমার বিদ্যে পৌঁছয় নি।

নবাবি জবানিতে চাকর-নোকরদের মহলকে তখন বলা হত তোশাখানা। যদিও সেকেলে আমিরি দশা থেকে আমাদের বাড়ি নেবে পড়েছিল অনেক নীচে তবু তোশাখানা দফতরখানা বৈঠকখানা নামগুলো ছিল ভিত আঁকড়ে।

সেই তোশাখানার দক্ষিণ ভাগে বড়ো একটা ঘরে কাঁচের সেজে রেড়ির তেলে আলো জ্বলছে মিট মিট করে, গণেশমার্কা ছবি আর কলীমায়ের পট রয়েছে দেয়ালে, তারই আশেপাশে টিকটিকি রয়েছে পোকা-শিকারে। ঘরে কোনো আসবাব নেই, মেজের উপরে একখানা ময়লা মাদুর পাতা।

জানিয়ে রাখি আমাদের চাল ছিল গরিবের মতো। গাড়িঘোড়ার বালাই ছিল না বললেই হয়। বাইরে কোণের দিকে তেঁতুল গাছের তলায় ছিল চালাঘরে একটা পালকিগাড়ি আর একটা বুড়ো ঘোড়া। পরনের কাপড় ছিল নেহাত সাদাসিধে। অনেক সময় লেগেছিল পায়ে মোজা উঠতে। যখন ব্রজেশ্বরের ফর্দ এড়িয়ে জলপানে বরাদ্দ হল পাঁউরুটি আর কলাপাতা-মোড়া মাখন, মনে হল আকাশ যেন হাতে নাগাল পাওয়া গেল। সাবেক কালের বড়োমানুষির ভগ্নদশা সহজেই মেনে নেবার তালিম চলছিল।

আমাদের এই মাদুর-পাতা আসরে যে চাকরটি ছিল সর্দার তার নাম ব্রজেশ্বর। চুলে গোঁফে লোকটা কাঁচাপাকা, মুখের উপর টানপড়া শুকনো চামড়া, গম্ভীর মেজাজ, কড়া গলা, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা। তার পূর্ব মনিব ছিলেন লক্ষ্মীমন্ত, নামডাকওয়ালা। সেখান থেকে তাকে নাবতে হয়েছে আমাদের মতো হেলায়-মানুষ ছেলেদের খবরদারির কাজে। শুনেছি গ্রামের পাঠশালায় সে গুরুগিরি করেছে। এই গুরুমশায়ি ভাষা আর চাল ছিল তার শেষ পর্যন্ত। বাবুরা “বসে আছেন’ না বলে সে বলত “অপেক্ষা করে আছেন’। শুনে মনিবরা হাসাহাসি করতেন। যেমন ছিল তার গুমোর তেমনি ছিল তার শুচিবাই। স্নানের সময় সে পুকুরে নেমে উপরকার তেলভাষা জল দুই হাত দিয়ে পাঁচ-সাতবার ঠেলে দিয়ে একেবারে ঝুপ করে দিত ডুব। স্নানের পর পুকুর থেকে উঠে বাগানের রাস্তা দিয়ে ব্রজেশ্বর এমন ভঙ্গীতে হাত বাঁকিয়ে চলত যেন কোনোমতে বিধাতার এই নোংরা পৃথিবীটাকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারলেই তার জাত বাঁচে। চালচলনে কোন্টা ঠিক, কোন্টা ঠিক নয়, এ নিয়ে খুব ঝোঁক দিয়ে সে কথা কইত। এ দিকে তার ঘাড়টা ছিল কিছু বাঁকা, তাতে তার কথার মান বাড়ত। কিন্তু ওরই মধ্যে একটা খুঁত ছিল গুরুগিরিতে। ভিতরে ভিতরে তার আহারের লোভটা ছিল খুব চাপা। আমাদের পাতে আগে থাকতে ঠিকমতো ভাগে খাবার সাজিয়ে রাখা তার নিয়ম ছিল না। আমরা খেতে বসলে একটি একটি করে লুচি আলগোছে দুলিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করত, “আর দেব কি।’ কোন্ উত্তর তার মনের মতো সেটা বোঝা যেত তার গলার সুরে। আমি প্রায়ই বলতুম, “চাই নে।’ তার পরে আর সে পীড়াপীড়ি করত না। দুধের বাটিটার ‘পরেও তার অসামাল রকমের টান ছিল, আমার মোটে ছিল না। শেলফওয়ালা একটা আলমারি ছিল তার ঘরে। তার মধ্যে একটা বড়ো পিতলের বাটিতে থাকত দুধ, আর কাঠের বারকোশে লুচি তরকারি। বিড়ালের লোভ জালের বাইরে বাতাস শুঁকে শুঁকে বেড়াত।

এমনি করে অল্প খাওয়া আমার ছেলেবেলা থেকেই দিব্যি সয়ে গিয়েছিল। সেই কম খাওয়াতে আমাকে কাহিল করেছিল এমন কথা বলবার জো নেই। যে ছেলেরা খেতে কসুর করত না তাদের চেয়ে আমার গায়ের জোর বেশি বই কম ছিল না। শরীর এত বিশ্রী রকমের ভালো ছিল যে, ইস্কুল পালাবার ঝোঁক যখন হয়রান করে দিত তখনও শরীরে কোনোরকম জুলুমের জোরেও ব্যামো ঘটাতে পারতুম না। জুতো জলে ভিজিয়ে বেড়ালুম সারাদিন, সর্দি হল না। কার্তিক মাসে খোলা ছাদে শুয়েছি, চুল জামা গেছে ভিজে, গলার মধ্যে একটু খুসখুসানি কাশিরও সাড়া পাওয়া যায় নি। আর পেট-কামড়ানি বলে ভিতরে ভিতরে বদহজমের যে একটা তাগিদ পাওয়া যায় সেটা বুঝতে পাই নি পেটে, কেবল দরকারমতো মুখে জানিয়েছি মায়ের কাছে। শুনে মা মনে মনে হাসতেন, একটুও ভাবনা করতেন বলে মনে হয় নি। তবু চাকরকে ডেকে বলে দিতেন, “আচ্ছা যা, মাস্টারকে জানিয়ে দে, আজ আর পড়াতে হবে না।’ আমাদের সেকেলে মা মনে করতেন, ছেলে মাঝে মাঝে পড়া কামাই করলে এতই কি লোকসান। এখনকার মায়ের হাতে পড়লে মাস্টারের কাছে তো ফিরে যেতেই হত, তার উপরে খেতে হত কানমলা। হয়তো বা মুচকি হেসে গিলিয়ে দিতেন ক্যাস্টর অয়েল। চিরকালের জন্যে আরাম হত ব্যামোটা। দৈবাৎ কখনো আমার জ্বর হয়েছে; তাকে চক্ষেও দেখি নি। ডাক্তার একটু গায়ে হাত দিয়েই প্রথম দিনের ব্যবস্থা করতেন ক্যাস্টর অয়েল আর উপোস। জল খেতে পেতুম অল্প একটু, সেও গরম জল। তার সঙ্গে এলাচদানা চলতে পারত। তিন দিনের দিনই মৌরলা বাছের ঝোল আর গলা ভাত উপোসের পরে ছিল অমৃত।

জ্বরে ভোগা কাকে বলে মনে পড়ে না। ম্যালেরিয়া বলে শব্দটা শোনাই ছিল না। ওয়াক-ধরানো ওষুধের রাজা ছিল ঐ তেলটা, কিন্তু মনে পড়ে না কুইনীন। গায়ে ফোড়াকাটা ছুরির আঁচড় পড়ে নি কোনোদিন। হাম বা জলবসন্ত কাকে বলে আজ পর্যন্ত জানি নে। শরীরটা ছিল একগুঁয়ে রকমের ভালো। মায়েরা যদি ছেলেদের শরীর এতটা নীরুগী রাখতে চান যাতে মাস্টারের হাত এড়াতে না পারে তা হলে ব্রজেশ্বরের মতো চাকর খুঁজে বের করবেন। খাবার-খরচার সঙ্গে সঙ্গেই সে বাঁচাবে ডাক্তার-খরচা; বিশেষ করে এই কলের জাঁতার ময়দা আর এই ভেজাল দেওয়া ঘি-তেলের দিনে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, তখনও বাজারে চকোলেট দেখা দেয় নি। ছিল এক পয়সা দামের গোলাপি-রেউড়ি। গোলাপি গন্ধের আমেজদেওয়া এই তিলে-ঢাকা চিনির ড্যালা আজও ছেলেদের পকেট চটচটে ক’রে তোলে কিনা জানি নে — নিশ্চয়ই এখনকার মানী লোকের ঘর থেকে লজ্জায় দৌড় মেরেছে। সেই ভাজা মসলার ঠোঙা গেল কোথায়। আর সেই সস্তা দামের তিলে গজা? সে কি এখনও টিঁকে আছে। না থাকে তো তাকে ফিরিয়ে আনার দরকার নেই।

ব্রজেশ্বরের কাছে সন্ধেবেলায় দিনে দিনে শুনেছি কৃত্তিবাসের সাতকাণ্ড রামায়ণটা। সেই পড়ার মাঝে মাঝে এসে পড়ত কিশোরী চাটুজ্যে। সমস্ত রামায়ণের পাঁচালি ছিল সুরসমেত তার মুখস্থ। সে হঠাৎ আসন দখল করে কৃত্তিবাসকে ছাপিয়ে দিয়ে হু হু করে আউড়িয়ে যেত তার পাঁচালির পালা। ওরে রে লক্ষণ, এ কী অলক্ষণ ,বিপদ ঘটেছে বিলক্ষণ। তার মুখে হাসি, মাথার টাক ঝক ঝক করছে, গলা দিয়ে ছড়া-কাটা লাইনের ঝরনা সুর বাজিয়ে চলছে, পদে পদে শব্দের মিলগুলো বেজে ওঠে যেন জলের নিচেকার নুড়ির আওয়াজ। সেই সঙ্গে চলত তার হাত পা নেড়ে ভাব-বাৎলানো। কিশোরী চাটুজ্যের সবচেয়ে বড়ো আপসোস ছিল এই যে, দাদাভাই অর্থাৎ কিনা আমি, এমন গলা নিয়ে পাঁচালির দলে ভরতি হতে পারলুম না। পারলে দেশে যা-হয় একটা নাম থাকত।

রাত হয়ে আসত, মাদুর-পাতা বৈঠক যেত ভেঙে। ভূতের ভয় শিরদাঁড়ার উপর চাপিয়ে চলে যেতুম বাড়ির ভিতরে মায়ের ঘরে। মা তখন তাঁর খুড়িকে নিয়ে তাস খেলছেন। পংখের-কাজ-করা ঘর হাতির দাঁতের মতো চকচকে, মস্ত তক্তপোশের উপর জাজিম পাতা। এমন উৎপাত বাধিয়ে দিতুম যে তিনি হাতের খেলা ফেলে দিয়ে বলতেন, “জ্বালাতন করলে, যাও খুড়ি, ওদের গল্প শোনাও গে।’ আমরা বাইরের বারান্দায় ঘটির জলে পা ধুয়ে দিদিমাকে টেনে নিয়ে বিছানায় উঠতুম। সেখানে শুরু হত দৈত্যপুরী থেকে রাজকন্যার ঘুম ভাঙিয়ে আনার পালা। মাঝখানে আমারই ঘুম ভাঙায় কে। রাতের প্রথম পহরে শেয়াল উঠত ডেকে। তখনও শেয়াল-ডাকা রাত কলকাতার কোনো কোনো পুরোনো বাড়ির ভিতের নীচে ফুকরে উঠত।

teen balok
Teen balok, the three boys: From L-R, Rabindranath, Somendranath, Srikontho Sinha, Satyaprasad
(http://sesquicentinnial.blogspot.com.au/2011/09/rathindranath-and-jorasanko-contd-47.html)

Chelebela/My childhood 3

Time passes, the sunshine grows harsh, a bell rings at the gate; but the day inside the palanquin does not follow the rules set by the bell. There it will be twelve o’clock only when the drums signal an end to the court at the gates to the palace and the king goes to bathe in sandalwood scented water. The people who were my wardens on those holiday afternoons napped after their meals. I was sitting alone. In my imagination the still palanquin was moving, the bearers who were made of the winds faithful to the whims of my mind. The path we took was according to my plan. The palanquin travelled to far off lands, whose names I had picked out of books I had read. At times the path led into dense forests where tiger eyes burned brightly and the skin crawled in fear. With me was the famed hunter Biswanath, he would fire his gun and everything would be silent again. At other times the palanquin changed into a peacock prow ship afloat on the sea, far from any land. The oars fall rhythmically, the waves swell and fall back. The sailors say, Ahoy, there she blows! Abdul Majhi is at the tiller, with his pointy beard and shaved upper lip and head. I recognised him as he used to bring hilsa from the River Padma and turtle eggs for my elder brother.

He had told me once how as he was fishing from his dinghy at the end of the month, a sudden summer storm rose. It was very wild weather and his boat nearly sank. He jumped into the water with the ropes in his teeth and swam to safety on the sand shoals. He then pulled the boat out of the water. I did not like the story as it ended far too quickly. The boat did not sink, he ended up safe without much effort –this was hardly a story worth telling. I kept asking him, ‘And then what happened?’

He said, ‘A great disaster! I saw a leopard. What a pair of whiskers it had! It must have climbed onto the trees on the other bank near the market. As soon as the storm began, the branch broke off and fell into the Padma and the leopard floated along with the currents.

It gasped several times as it climbed onto the shoal. I made a noose as soon as I saw it. The animal glared at me with great big eyes as it stood before me. He was hungry after his swim. His bright red tongue dripped with saliva as he looked at me. I am sure he had met many people and eaten a few too, but he had never met Abdul before! I yelled, ‘Come to me, my child!’ As soon as it reared up, I slipped the noose around its neck, the more it struggled the tighter it got and the more its tongue protruded.

At this point, I became anxious and said, ‘Abdul, did it die?’

Abdul said. ‘It would not dare to die! The tide was coming in and I still had to return to Bahadurganj. So I attached the big cat to my boat and made it pull me along for many miles. Whenever it growled I nudged its sides with the oar. It covered the distance that could have taken ten to fifteen hours in one and a half hours. Do not ask me anymore questions, I have no answers.’

I said, ‘Fine, now tell me about the crocodiles.’

Abdul answered, ‘I have seen its nose above the water often. When they sun themselves on the shallows of the river, they look like they are smiling in a most unpleasant manner. If I had a gun I could have taken care of them. But my license has run out. But something funny happened. One day Knachi the gypsy was sitting on the banks splitting bamboo with her cleaver, her goat tied up next to her. She had not noticed when a crocodile came and pulled the animal into the water. Knachi jumped onto its back and stabbed the giant lizard with her cleaver again and again. The creature left the goat alone and sank into the water.’

I eagerly said, ‘And then, what happened then?’

Abdul said, ‘The rest of that story has disappeared under water, it will take a long time to bring it back. I will send my spies to find out and tell you the next time we meet.’

But he never came back; perhaps he has gone to find out the ending to the story.

These stories were of my travels on the palanquin; on other days I would play at being a teacher with the railings on the verandah as my students. They were mostly silent in fear. One or two were very mischievous, they never paid attention to the lesson and I would try to frighten them that they would have to become porters when they were older. They were marked all over by my beatings, but their mischief could not stop as that would have signaled an end to my games. There was another game I played with my wooden lion. After hearing of animals being sacrificed for the festivals, I decided that I would stage a spectacular sacrifice of my lion. I hit it many times with a stick and as it was a ceremony I made up the necessary incantation to accompany my actions:

Uncle Lion is cutted
Andibos is butted
Ulukutt Dhulukutt Dhyamkurkur
Walnut Fallnut Cut Cut Crash
Split Splat Smash

Almost all the words were borrowed; my only contribution was the word walnut. I loved eating them. It will be clear from the ‘crash’ that my sword was wooden, and the ‘smash’ tells you that it was not very strong at all.

***

The skies have not cleared since last night. It keeps raining continually. The trees are huddled stupidly. The birds are silent. It reminds me of the evenings of my childhood.

We used to spend our days in the servant’s quarters. The heart ache of English spellings and meaning books had not entered our evenings yet. My older brother Shejdada would say one needed a firm foundation in Bengali before learning English. That is why when the other school going children of our age were mechanically repeating the Bengali meanings of ‘I am up’ and ‘He is down’, I was yet to learn about b-a-d being bad and m-a-d meaning mad.

As per the customs of the Nawabs, the servant’s quarters were known as the Toshakhana. Even though our house had descended much lower than the olden days of extravagance, terms such as Toshakhana, Daftarkhana for the offices and Baithakkhana for the living room still clung on.

In the southern part of the Toshakhana is a large room where a glass shaded lamp filled with castor oil burns weakly. On the walls hang pictures of Ganesha and Ma Kali. Geckoes dart around them hunting for insects. There is no furniture in the room except for a dirty mat spread out on the floor.

I better tell you that our lifestyle was quite impoverished. We rarely used cars or carriages. There was a palanquin in a shed and an old horse under the tamarind tree in the corner outside. Our clothes were very plain. It was many years before we were used to wearing socks. When we first started eating bread and butter that came wrapped in banana leaves instead of the rations on Brojeswar’s list, we thought we had managed to finally touch the sky. This is how we practiced getting used to the remnants of the profligacy of the past.

The servant who was the leader in these sessions on the mat was known as Brojeswar. His hair and moustache were a mixture of salt and pepper. The skin over his face was stretched tight and dry, his nature was serious and he chewed out his words in a harsh voice. His previous employer had been wealthy and famous. He had been demoted to the position of managing the casually brought up children in our household. I have heard that he had been a teacher in his village school. This influenced his language and behavior in the years to follow. Instead of saying ‘Someone is sitting outside’, he would say, ‘Someone is waiting outside.’ The adults laughed when they heard this. His pride was only matched by his obsessive cleanliness. When he bathed he would descend into the pond and part the oily surface of the water with his hands about five or six times before taking a quick dip. After his bath he would walk along the garden path, his hand held away from his body as if he wished to preserve his sanctity by avoiding all contact with this world. He spoke with great authority on manners of etiquette. His neck was slightly twisted, adding to the weight of his utterances. But there was one chink in his all knowing armour. He was secretly very fond of his food. He never served us our food on the plates before we sat down to eat. When we did, he would gently swing one luchi at a time in front of us asking, ‘Will I give you any more?’ It was abundantly clear from his tone that he would like an answer in the negative. I would often say, ‘No more.’ He never insisted after that. He also loved bowls of milk, and I did not. He had a cupboard with shelves in his own room. He poured the milk into a large brass bowl inside it and the luchis and accompaniments on a wooden platter. The cats would greedily circle the cupboard sniffing the air.

I became a light eater very easily as a result of this practice from the days of my childhood. No one can say that this made me weak. I was as strong as the boys who never stinted on eating, if not stronger. I was so annoyingly healthy that when I felt like bunking school I could not even try and make myself sick. I would wander around all day in wet shoes, but a runny nose eluded me. I would sleep on the open terrace in the winter month of Kartick, my hair damp from the dew; even though my throat tickled, there would be no cough to follow it. And the stomach aches that I told my mother about were never far reaching enough to affect the actual region, they only occurred on demand. Ma must have smiled to herself over these; I do not think she was ever seriously worried for my sake. All she would do was call for a servant and say to them, ‘Listen, go and tell the tutor, he does not have to teach anyone today.’ Our old fashioned mother used to think there was little harm in her son occasionally neglecting his studies. Today’s mothers would have not just sent me back; I would also have had my ears boxed. Sometimes she would administer a dose of castor oil with a twinkling smile; the illness would disappear forever. If rarely I did have a fever I never saw her fussing over me. The doctor would feel my temperature and prescribe castor oil and a complete fast for the first day. I did get to drink hot water but only in small quantities. Cardamom seeds were allowed with that. After three days of fasting, hot rice with a side dish of little Mourola fish was like absolute ambrosia.

I do not remember ever being sick with a fever. Malaria was almost unheard of. Even though quinine was the worst medicine for making you vomit, I do not remember taking it. I never needed to have a boil lanced. I have still not had chicken pox or the measles. My health was obstinately good. If the mothers of today wish to keep their sons this healthy in the interests of continued discipline at the hands of their school teachers, they must seek out a servant like Brojeswar. He will save expenses both on food as well as doctors; especially in these times of machine made flour and adulterated oil. One must remember though, there was no chocolate in those days. What we had was pink stick candy that cost one paisa. I do not know whether this rose scented sesame seed coated block of sugar still makes children’s pockets sticky these days– it must have vanished in shame from the households of the wealthy of today. Where did the paper bags of fried spices go! And the cheap sesame seed encrusted pastries? Are those still available? Let them be if they are no more.

Early in the evenings I would listen to Brojeswar narrate the seven chapters of the Ramayan by Krittibas. In the midst of that Kishori Chatujje would suddenly make an appearance. He knew the entire folk version of the Ramayan and its songs by heart. He would come and sit down, overwhelming Krittibas with his verses.

‘Oh Lakshman, behold an ill omen, danger is surely near, hear, hear!’

His face beamed and his bald head shone as his voice tripped over the rhymes like a water fall, the syllables ringing out like pebbles on a stream bed. He moved his hands expressively as he sang. His greatest regret was that a boy with a voice like mine could not join a folk music troupe. Surely I would have made a name for myself throughout the land.

As the night deepened, the story telling session on the mats would break up. I would go back into the house to my mother, a fear of ghosts accompanying me all the way. She would be playing cards with her aunt. There was a carpet spread out on her huge bed that was in-laid with mother of pearl as shiny as ivory. I used to create such a fuss that she would put her cards down and say, ‘How annoying! Aunt, you better tell the children stories then.’ We would wash our feet on the verandah outside with water from metal pots and then climb into bed with our grandmother. She would tell us tales of how the princess was rescued from her magical sleep in the giant’s palace. I was soon fast asleep, oblivious to the attempts of the gallant prince who had awakened the damsel. In the first hour of the night jackals would yelp. Those were the times when nights filled with jackal calls still cried out around the foundations of some of Kolkata’s old houses.

ছেলেবেলা/chelebela/My childhood 2

তখন শহরে না ছিল গ্যাস, না ছিল বিজলি বাতি; কেরোসিনের আলো পরে যখন এল তার তেজ দেখে আমরা অবাক। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঘরে এসে জ্বালিয়ে যেত রেড়ির তেলের আলো। আমাদের পড়বার ঘরে জ্বলত দুই সলতের একটা সেজ।

মাস্টারমশায় মিটমিটে আলোয় পড়াতেন প্যারী সরকারের ফার্‌স্ট্‌বুক। প্রথমে উঠত হাই, তার পর আসত ঘুম, তার পর চলত চোখ-রগড়ানি। বারবার শুনতে হত, মাস্টারমশায়ের অন্য ছাত্র সতীন সোনার টুকরো ছেলে, পড়ায় আশ্চর্য মন, ঘুম পেলে চোখে নস্যি ঘষে। আর আমি? সে কথা ব’লে কাজ নেই। সব ছেলের মধ্যে একলা মুর্খু হয়ে থাকবার মতো বিশ্রী ভাবনাতেও আমাকে চেতিয়ে রাখতে পারত না। রাত্রি ন’টা বাজলে ঘুমের ঘোরে ঢুলু ঢুলু চোখে ছুটি পেতুম। বাহিরমহল থেকে বাড়ির ভিতর যাবার সরু পথ ছিল খড়্‌খড়ির আব্রু-দেওয়া, উপর থেকে ঝুলত মিটমিটে আলোর লণ্ঠন। চলতুম আর মন বলত কী জানি কিসে বুঝি পিছু ধরেছে। পিঠ উঠত শিউরে। তখন ভূত প্রেত ছিল গল্পে-গুজবে, ছিল মানুষের মনের আনাচে-কানাচে। কোন্‌ দাসী কখন হঠাৎ শুনতে পেত শাঁকচুন্নির নাকি সুর, দড়াম করে পড়ত আছাড় খেয়ে। ঐ মেয়ে-ভূতটা সবচেয়ে ছিল বদমেজাজি, তার লোভ ছিল মাছের ‘পরে। বাড়ির পশ্চিম কোণে ঘন-পাতা-ওয়ালা বাদামগাছ, তারই ডালে এক পা আর অন্য পা’টা তেতালার কার্নিসের ‘পরে তুলে দাঁড়িয়ে থাকে একটা কোন্‌ মূর্তি–তাকে দেখেছে বলবার লোক তখন বিস্তর ছিল, মেনে নেবার লোকও কম ছিল না। দাদার এক বন্ধু যখন গল্পটা হেসে উড়িয়ে দিতেন তখন চাকররা মনে করত লোকটার ধর্মজ্ঞান একটুও নেই, দেবে একদিন ঘাড় মটকিয়ে, তখন বিদ্যে যাবে বেরিয়ে। সে সময়টাতে হাওয়ায় হাওয়ায় আতঙ্ক এমনি জাল ফেলে ছিল যে, টেবিলের নীচে পা রাখলে পা সুড়সুড় করে উঠত।

তখন জলের কল বসে নি। বেহারা কাঁখে ক’রে কলসি ভ’রে মাঘ-ফাগুনের গঙ্গার জল তুলে আনত। একতলার অন্ধকার ঘরে সারি সারি ভরা থাকত বড়ো বড়ো জালায় সারা বছরের খাবার জল। নীচের তলায় সেই-সব স্যাঁৎসেতে এঁধো কুটুরিতে গা ঢাকা দিয়ে যারা বাসা করেছিল কে না জানে তাদের মস্ত হাঁ, চোখ দুটো বুকে, কান দুটো কুলোর মতো, পা দুটো উলটো দিকে। সেই ভুতুড়ে ছায়ার সামনে দিয়ে যখন বাড়িভিতরের বাগানে যেতুম, তোলপাড় করত বুকের ভিতরটা, পায়ে লাগাত তাড়া।তখন রাস্তার ধারে ধারে বাঁধানো নালা দিয়ে জোয়ারের সময় গঙ্গার জল আসত। ঠাকুরদার আমল থেকে সেই নালার জল বরাদ্দ ছিল আমাদের পুকুরে। যখন কপাট টেনে দেওয়া হত ঝরঝর কলকল করে ঝরনার মতো জল ফেনিয়ে পড়ত। মাছগুলো উলটো দিকে সাঁতার কাটবার কসরত দেখাতে চাইত। দক্ষিণের বারান্দার রেলিঙ ধরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতুম। শেষকালে এল সেই পুকুরের কাল ঘনিয়ে, পড়ল তার মধ্যে গাড়ি-গাড়ি রাবিশ। পুকুরটা বুজে যেতেই পাড়াগাঁয়ের সবুজ-ছায়া-পড়া আয়নাটা যেন গেল সরে। সেই বাদামগাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অমন পা ফাঁক করে দাঁড়াবার সুবিধে থাকতেও সেই ব্রহ্মদত্যির ঠিকানা আর পাওয়া যায় না।

ভিতরে বাইরে আলো বেড়ে গেছে।

পালকিখানা ঠাকুরমাদের আমলের। খুব দরাজ বহর তার, নবাবি ছাঁদের। ডাণ্ডা দুটো আট আট জন বেহারার কাঁধের মাপের। হাতে সোনার কাঁকন কানে মোটা মাকড়ি, গায়ে লালরঙের হাতকাটা মেরজাই-পরা বেহারার দল সূর্য-ডোবার রঙিন মেঘের মতো সাবেক ধনদৌলতের সঙ্গে সঙ্গে গেছে মিলিয়ে। এই পালকির গায়ে ছিল রঙিন লাইনে আঁকজোক কাটা, কতক তার গেছে ক্ষয়ে, দাগ ধরেছে যেখানে সেখানে, নারকোলের ছোবরা বেরিয়ে পড়েছে ভিতরের গদি থেকে। এ যেন একালের নামকাটা আসবাব, পড়ে আছে খাতাঞ্চিখানার বারান্দায় এক কোণে। আমার বয়স তখন সাত-আট বছর। এ সংসারে কোনো দরকারি কাজে আমার হাত ছিল না; আর ঐ পুরানো পালকিটাকেও সকল দরকারের কাজ থেকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে। এইজন্যেই ওর উপরে আমার এতটা মনের টান ছিল। ও যেন সমুদ্রের মাঝখানে দ্বীপ, আর আমি ছুটির দিনের রবিন্‌সন্‌-ক্রুসো, বন্ধ দরজার মধ্যে ঠিকানা হারিয়ে চার দিকের নজরবন্দি এড়িয়ে বসে আছি।

তখন আমাদের বাড়িভরা ছিল লোক, আপন পর কত তার ঠিকানা নেই; নানা মহলের চাকরদাসীর নানা দিকে হৈ হৈ ডাক। সামনের উঠোন দিয়ে প্যারীদাসী ধামা কাঁখে বাজার করে নিয়ে আসছে তরিতরকারি, দুখন বেহারা বাঁখ কাঁধে গঙ্গার জল আনছে, বাড়ির ভিতরে চলেছে তাঁতিনি নতুন-ফ্যাশান-পেড়ে শাড়ির সওদা করতে, মাইনে করা যে দিনু স্যাকরা গলির পাশের ঘরে ব’সে হাপর ফোঁস ফোঁস ক’রে বাড়ির ফরমাশ খাটত সে আসছে খাতাঞ্চিখানায় কানে-পালখের-কলম-গোঁজা কৈলাস মুখুজ্জের কাছে পাওনার দাবি জানাতে; উঠোনে বসে টং টং আওয়াজে পুরোনো লেপের তুলো ধুনছে ধুনুরি। বাইরে কানা পালোয়ানের সঙ্গে মুকুন্দলাল দারোয়ান লুটোপুটি করতে করতে কুস্তির প্যাঁচ কষছে। চটাচট শব্দে দুই পায়ে লাগাচ্ছে চাপড়, ডন ফেলছে বিশ-পঁচিশ বার ঘন ঘন। ভিখিরির দল বসে আছে বরাদ্দ ভিক্ষার আশা ক’রে।

There was neither gas lighting nor electric lights in the city at the time; we were amazed to see how bright kerosene lamps were when they came along. In the evenings a fellow came and lit rapeseed oil lamps in the houses. A lamp with two wicks used to light up our study.

Our tutor used to teach us from Parry Sarkar’s First Book. First came the yawns, then arrived sleep and finally I would rub my eyes continually. I would have to hear again and again, how another student of his, Jatin, an ideal child by all accounts, rubbed snuff into his eyes when he felt sleepy. And me? The less said the better. Even the horrid prospect of remaining illiterate amongst all the boys I knew was not enough to keep me alert for long. When the clock struck nine, I would be allowed to leave with drowsy eyes. The narrow way to the inner house from the outside was covered  with shutters  to maintain privacy, and lit by dim lanterns. As I walked my mind kept saying something was following me. My skin tingled with fear. At that time ghosts were kept real in stories and in the nooks and crannies of people’s minds. A maid would suddenly hear the nasal tones of a female spirit called a Shankhchunni and fall down in a dead faint. That was one of the most bad tempered ghosts, their hankering was for fish. There were many people who could claim to have seen a being stand with one foot on a ledge on the third floor and the other upon a branch of the densely leafed nut tree on the western side of the house; there were any number of people who would believe them. When one of my brother’s friends dismissed the story with a laugh, the servants thought he did not know what was good for him, one day a spirit would surely break his  neck, and he would find out the the error of his ways. Fear was so woven into the air at that time, the skin on my feet crawled even when I sat at a table.

Water taps had not been installed yet. A water carrier would bring water in the winter months of Magh and Phalgun from the Ganga. Rows of large earthen pots held the whole year’s drinking water in the dark rooms of the first floor. Everyone knew that these locked damp rooms downstairs were home to things that had huge open mouths, eyes on their chests, ears like threshing baskets and feet turned backwards. When I walked past those ghostly shadows into the garden inside the house, my emotions swirled in my heart, my feet would find a speed of their own. At that time the covered drains by the side of the roads would fill up with water from the Ganga during high tides. From my grandfather’s  days that water had been allocated to our pond. When the sluice gate was shut the water foamed out like a water fall. The fish would try and swim in the opposite direction to show their expertise. I would watch in amazement from the south verandah. Finally one day the pond’s days came to an end, truck loads of rubbish were dumped in it. As soon as the pond was filled in it was as though the green shaded mirror of rural bliss was moved. That nut tree still stands, but the old Brahmin ghost has left without a sign inspite of the opportunity of standing with its legs planted firmly apart.

The light has grown brighter both inside and out.

The palanquin dated back to my grandmother’s time. It was of very sturdy construction, of the Nawabi style. The supports were made for eight men on each side. The bearers who wore gold at wrist and ear with their red sleeveless vests have faded along with the wealth of yore like the colourful  clouds of sunset. This palanquin had colourful designs on it, some had rubbed off, there were marks here and there, some of the coconut coir stuffing was escaping from the cushioning inside. It was like an antique piece of furniture, lying in a corner of the verandah next to the office. I was then about seven or eight years old. I had no hand in any of the important tasks of the day and the palanquin had also been sacked from all useful employment. This is why I felt so close to it. It was like an island in the middle of the sea and I was Robinson Crusoe on a holiday as I sat inside it, its closed doors giving me a break from the eyes outside.

At that time our house was full of people, relations and unrelated in equal numbers; the servants from the various parts of the house kept things lively with their loud voices. Parry would carry a basket balanced on her hip, filled with vegetables from the market, Dukhan would bring water from the Ganges, a weaver would be going into the house to sell the latest fashions inn saris, the family’s goldsmith Dinu, who spent much time in his own room making ornaments by order with wheezing of his bellows would be asking for his dues from Kailash Mukhujje who always had a quill pen tucked behind his ear; the Dhunuri would raise a Tong Tong sound as he fluffed up old cotton quilts. Outside the doorman Mukunda would be jousting with the blind wrestler. He slapped his thighs and did twenty or so push ups just like that. The beggars waited outside for their regular alms.