Archives

নূতন ও পুরাতন/ Nuton O Puraton/ The Old and the New

 

আমরা পুরাতন ভারতবর্ষীয়; বড়ো প্রাচীন, বড়ো শ্রান্ত। আমি অনেক সময়ে নিজের মধ্যে আমাদের সেই জাতিগত প্রকাণ্ড প্রাচীনত্ব অনুভব করি। মনোযোগপূর্বক যখন অন্তরের মধ্যে নিরীক্ষণ করে দেখি তখন দেখতে পাই, সেখানে কেবল চিন্তা এবং বিশ্রাম এবং বৈরাগ্য। যেন অন্তরে বাহিরে একটা সুদীর্ঘ ছুটি। যেন জগতের প্রাতঃকালে আমরা কাছারির কাজ সেরে এসেছি, তাই এই উত্তপ্ত মধ্যাহ্নে যখন আর-সকলে কার্যে নিযুক্ত তখন আমরা দ্বার রুদ্ধ করে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করছি : আমরা আমাদের পুরা বেতন চুকিয়ে নিয়ে কর্মে ইস্তফা দিয়ে পেন্সনের উপর সংসার চালাচ্ছি। বেশ আছি।

এমন সময়ে হঠাৎ দেখা গেল, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বহুকালের যে ব্রহ্মত্রটুকু পাওয়া গিয়েছিল তার ভালো দলিল দেখাতে পারি নি বলে নূতন রাজার রাজত্বে বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। হঠাৎ আমরা গরিব। পৃথিবীর চাষারা যেরকম খেটে মরছে এবং খাজনা দিচ্ছে আমাদেরও তাই করতে হবে। পুরাতন জাতিকে হঠাৎ নূতন চেষ্টা আরম্ভ করতে হয়েছে।

অতএব চিন্তা রাখো, বিশ্রাম রাখো, গৃহকোণ ছাড়ো; ব্যাকরণ ন্যায়শাস্ত্র শ্রুতিস্মৃতি এবং নিত্যনৈমিত্তিক গার্হস্থ্য নিয়ে থাকলে চলবে না; কঠিন মাটির ঢেলা ভাঙো, পৃথিবীকে উর্বরা করো এবং নব-মানব রাজার রাজস্ব দাও; কালেজে পড়ো, হোটেলে খাও এবং আপিসে চাকরি করো।

হায়, ভারতবর্ষের পুরপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এই অনাবৃত বিশাল কর্মক্ষেত্রের মধ্যে আমাদের কে এনে দাঁড় করালে। আমরা চতুর্দিকে মানসিক বাঁধ নির্মাণ করে কালস্রোত বন্ধ করে দিয়ে সমস্ত নিজের মনের মতো গুছিয়ে নিয়ে বসেছিলুম। চঞ্চল পরিবর্তন ভারতবর্ষের বাহিরে সমুদ্রের মতো নিশিদিন গর্জন করত, আমরা অটল স্থিরত্বের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে গতিশীল নিখিল-সংসারের অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে বসেছিলুম। এমন সময় কোন্‌ ছিদ্রপথ দিয়ে চির-অশান্ত মানবস্রোত আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে সমস্ত ছারখার করে দিলে। পুরাতনের মধ্যে নূতন মিশিয়ে, বিশ্বাসের মধ্যে সংশয় এনে, সন্তোষের মধ্যে দুরাশার আক্ষেপ উৎক্ষিপ্ত করে দিয়ে সমস্ত বিপর্যস্ত করে দিলে।

মনে করো আমাদের চতুর্দিকে হিমাদ্রি এবং সমুদ্রের বাধা যদি আরো দুর্গম হত তা হলে এক-দল মানুষ একটি অজ্ঞাত নিভৃত বেষ্টনের মধ্যে স্থির-শান্ত-ভাবে এক-প্রকার সংকীর্ণ পরিপূর্ণতা লাভের অবসর পেত। পৃথিবীর সংবাদ তারা বড়ো একটা জানতে পেত না এবং ভূগোলবিবরণ সম্বন্ধে তাদের নিতান্ত অসম্পূর্ণ ধারণা থাকত; কেবল তাদের কাব্য, তাদের সমাজতন্ত্র, তাদের ধর্মশাস্ত্র, তাদের দর্শনতত্ত্ব অপূর্ব শোভা সুষমা এবং সম্পূর্ণতা লাভ করতে পেত; তারা যেন পৃথিবী-ছাড়া আর-একটি ছোটো গ্রহের মধ্যে বাস করত; তাদের ইতিহাস, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সুখ-সম্পদ তাদের মধ্যেই পর্যাপ্ত থাকত। সমুদ্রের এক অংশ কালক্রমে মৃত্তিকাস্তরে রুদ্ধ হয়ে যেমন একটি নিভৃত শান্তিময় সুন্দর হ্রদের সৃষ্টি হয়; সে কেবল নিস্তরঙ্গভাবে প্রভাতসন্ধ্যার বিচিত্র বর্ণচ্ছায়ায় প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে এবং অন্ধকার রাত্রে স্তিমিত নক্ষত্রালোকে স্তম্ভিতভাবে চিররহস্যের ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকে।

****
THE OLD AND THE NEW

We Indians are an ancient people; extremely old and weary. I often sense our race’s natural sense of a great burden of age within myself. When I examine myself with attention I see only doubts and lethargy and aloofness there. A sort of extended holiday within and without. As if we have finished all our official work at the dawn of creation and can engage in resting without a care in the world behind closed doors, when everyone else is working away in the midday heat; as if we have earned our salaries, resigned from our jobs and are now existing solely on our pensions. This is what satisfies us.

But suddenly we find that the times have changed. The safe haven that we had long believed to be ours is taken away by the leaders of the new order because we failed to prove our rights to it. Suddenly we are rendered poor. We must now work hard like the farmers of the world and pay our dues. An ancient race must suddenly learn to try anew.

Therefore I say to you, put aside your worries, your rest, your love for the corners of your homes; it will not do to occupy your time with grammar, logic and the scriptures and the routines of daily existence; forge this hard earth and make it yield its riches, pay your dues to the new order; go to college, eat out at hotels and take to working in offices.

Alas, who could have brought down the fortress like walls of India and brought us out into this vast open arena of activity! We had put up mental barriers and stemmed the flow of time in order to have things just the way we liked them to be. Restless change has surrounded India like a great roaring ocean since time immemorial but we took comfort from immovable stagnation and forgot all about the existence of the world outside. But everything was shattered when that ever volatile outer world entered ours. Everything was shaken by the mingling of old with new, the collision of question with steadfast belief, the addition of unattainable dreams to complacent satisfaction.

Imagine if the mountains and sea that surround us had been even more inhospitable; within that undiscovered remoteness our people would have attained a certain kind of insulated success. They would not know much of the world and have a very incomplete sense of geography. Only their poems, their social structures, their religion and philosophy would have a chance to flourish and flower; they would live as on a smaller planet separated from this earth; their own history and sciences, their own happiness and wealth would have sufficed for them. Much as silt isolates a part of the sea over time to create a lake of still water which reflects the myriad colours of the sky at dawn and dusk and meditates on the inscrutable by soft starlight in the darkness of night.

Advertisements

ধর্মবোধের দৃষ্টান্ত/ Dharma Bodher Drishtanto/Examples of Right Action

অন্যত্র বলিয়াছি কোনো ইংরেজ অধ্যাপক এ দেশে জুরির বিচার সম্বন্ধে আলোচনাকালে বলিয়াছিলেন যে, যে দেশের অর্ধসভ্য লোক প্রাণের মাহাত্ম্য (Sanctity of Life) বোঝে না, তাহাদের হাতে জুরি-বিচারের অধিকার দেওয়া অন্যায়।

প্রাণের মাহাত্ম্য ইংরেজ আমাদের চেয়ে বেশি বোঝে, সে কথা নাহয় স্বীকার করিয়াই লওয়া গেল। অতএব সেই ইংরেজ যখন প্রাণ হনন করে তখন তাহার অপরাধের গুরুত্ব আমাদের চেয়ে বেশি। অথচ দেখিতে পাই, দেশীয়কে হত্যা করিয়া কোনো ইংরেজ খুনি ইংরেজ জজ ও ইংরেজ জুরির বিচারে ফাঁসি যায় নাই। প্রাণের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে তাহাদের বোধশক্তি যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ইংরেজ অপরাধী হয়তো তাহার প্রমাণ পায়, কিন্তু সে প্রমাণ দেশীয় লোকদের কাছে কিছু অসম্পূর্ণ বলিয়াই ঠেকে।

এইরূপ বিচার আমাদিগকে দুই দিক হইতে আঘাত করে। প্রাণ যা যাবার সে তো যায়ই, ও দিকে মানও নষ্ট হয়। ইহাতে আমাদের জাতির প্রতি যে অবজ্ঞা প্রকাশ পায় তাহা আমাদের সকলেরই গায়ে বাজে।

ইংলণ্ডে গ্লোব বলিয়া একটি সংবাদপত্র আছে। সেটা সেখানকার ভদ্রলোকেরই কাগজ। তাহাতে লিখিয়াছে– টমি অ্যাট্‌কিন (অর্থাৎ পল্টনের গোরা) দেশী লোককে মারিয়া ফেলিবে বলিয়া মারে না, কিন্তু মার খাইলেই দেশী লোকগুলা মরিয়া যায়; এইজন্য টমি-বেচারার লঘু দণ্ড হইলেই দেশী খবরের কাগজগুলা চীৎকার করিয়া মরে।

টমি অ্যাট্‌কিনের প্রতি দরদ খুব দেখিতেছি, কিন্তু “স্যাঙ্ক্‌টিটি অফ লাইফ’ কোন্‌খানে। যে পাশব আঘাতে আমাদের পিলা ফাটে এই ভদ্রকাগজের কয় ছত্রের মধ্যেও কি সেই আঘাতেরই বেগ নাই। স্বজাতিকৃত খুনকে কোমল স্নেহের সহিত দেখিয়া হত ব্যক্তির আত্মীয়সম্প্রদায়ের বিলাপকে যাহারা বিরক্তির সহিত ধিক্‌কার দেয় তাহারাও কি খুন পোষণ করিতেছে না।

কিছুকাল হইতে আমরা দেখিতেছি, য়ুরোপীয় সভ্যতায় ধর্মনীতির আদর্শ সাধারণত অভ্যাসের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। ধর্মবোধশক্তি এই সভ্যতার অন্তঃকরণের মধ্যে উদ্‌ভাসিত হয় নাই। এইজন্য অভ্যাসের গণ্ডির বাহিরে এই আদর্শ পথ খুঁজিয়া পায় না, অনেক সময় বিপথে মারা যায়।

য়ুরোপীয় সমাজে ঘরে ঘরে কাটাকাটি-খুনাখুনি হইতে পারে না, এরূপ ব্যবহার সেখানকার সাধারণ স্বার্থের বিরোধী। বিষপ্রয়োগ বা অস্ত্রাঘাতের দ্বারা খুন করাটা য়ুরোপের পক্ষে কয়েক শতাব্দী হইতে ক্রমশ অনভ্যস্ত হইয়া আসিয়াছে।

কিন্তু খুন বিনা অস্ত্রাঘাতে বিনা রক্তপাতে হইতে পারে। ধর্মবোধ যদি অকৃত্রিম আভ্যন্তরিক হয়, তবে সেরূপ খুনও নিন্দনীয় এবং অসম্ভব হইয়া পড়ে।

একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত অবলম্বন করিয়া এ কথাটা স্পষ্ট করিয়া তোলা যাক।

হেনরি স্যাভেজ ল্যাণ্ডর একজন বিখ্যাত ভ্রমণকারী। তিব্বতের তীর্থস্থান লাসায় যাইবার জন্য তাঁহার দুর্নিবার ঔৎসুক্য জন্মে। সকলেই জানেন, তিব্বতিরা য়ুরোপীয় ভ্রমণকারী ও মিশনারি প্রভৃতিকে সন্দেহ করিয়া থাকে। তাহাদের দুর্গম পথঘাট বিদেশীর কাছে পরিচিত নহে, ইহাই তাহাদের আত্মরক্ষার প্রধান অস্ত্র; সেই অস্ত্রটি যদি তাহারা জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির হস্তে সমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া বসিতে অনিচ্ছুক হয় তবে তাহাদিগকে দোষ দেওয়া যায় না।

কিন্তু অন্যে তাহার নিষেধ মানিবে, সে কাহারো নিষেধ মানিবে না, য়ুরোপের এই ধর্ম। কোনো প্রয়োজন থাক্‌ বা না থাক্‌, শুদ্ধমাত্র বিপদ লঙ্ঘন করিয়া বাহাদুরি করিলে য়ুরোপে এত বাহবা মিলে যে অনেকের পক্ষে সে একটা প্রলোভন। য়ুরোপের বাহাদুর লোকেরা দেশ-বিদেশে বিপদ সন্ধান করিয়া ফেরে। যে-কোনো উপায়ে হোক, লাসায় যে য়ুরোপীয় পদার্পণ করিবে সমাজে তাহার খ্যাতি-প্রতিপত্তির সীমা থাকিবে না।

অতএব তুষারগিরি ও তিব্বতির নিষেধকে ফাঁকি দিয়া লাসায় যাইতে হইবে। ল্যাণ্ডর সাহেব কুমায়ুনে আলমোড়া হইতে যাত্রা আরম্ভ করিলেন। সঙ্গে এক হিন্দু চাকর আসিয়া জুটিল, তাহার নাম চন্দন সিং।

কুমায়ুনের প্রান্তে তিব্বতের সীমানায় বৃটিশ রাজ্যে শোকা বলিয়া এক পাহাড়ি জাত আছে। তিব্বতিদের ভয়ে ও উপদ্রবে তাহারা কম্পমান। বৃটিশরাজ তিব্বতিদের পীড়ন হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিতে পারেন না বলিয়া ল্যাণ্ডর সাহেব বারম্বার আক্ষেপ প্রকাশ করিয়াছেন। সেই শোকাদের মধ্য হইতে সাহেবকে কুলি মজুর সংগ্রহ করিয়া লইতে হইবে। বহুকষ্টে ত্রিশজন কুলি জুটিল।

ইহার পর হইতে যাত্রাকালে সাহেবের এক প্রধান চিন্তা ও চেষ্টা, কিসে কুলিরা না পালায়। তাহাদের পালাইবার যথেষ্ট কারণ ছিল। ল্যাণ্ডর তাঁহার ভ্রমণবৃত্তান্তের পঁচিশ পরিচ্ছেদে লিখিয়াছেন —

এই বাহকদল যখন নিঃশব্দ গম্ভীরভাবে বোঝা পিঠে লইয়া করুণাজনক শ্বাসকষ্টের সহিত হাঁপাইতে হাঁপাইতে উচ্চ হইতে উচ্চে আরোহণ করিতেছিল তখন এই ভয় মনে হইতেছিল, ইহাদের মধ্যে কয়জনই বা কোনো কালে ফিরিয়া যাইতে পারিবে।

আমাদের জিজ্ঞাস্য এই যে, এ শঙ্কা যখন তোমার মনে আছে তখন এই অনিচ্ছুক হতভাগ্যদিগকে মৃত্যুমুখে তাড়না করিয়া লইয়া যাওয়াকে কী নাম দেওয়া যাইতে পারে। তুমি পাইবে গৌরব এবং তাহার সঙ্গে অর্থলাভের সম্ভাবনাও যথেষ্ট আছে। তুমি তাহার প্রত্যাশায় প্রাণপণ করিতে পার, কিন্তু ইহাদের সম্মুখে কোন্‌ প্রলোভন আছে?

বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে জীবচ্ছেদ (vivisection) লইয়া য়ুরোপে অনেক তর্কবিতর্ক হইয়া থাকে। সজীব জন্তুদিগকে লইয়া পরীক্ষা করিবার সময়ে যন্ত্রণানাশক ঔষধ প্রয়োগ করিবার ঔচিত্যও আলোহিত হয়। কিন্তু বাহাদুরি করিয়া বাহবা লইবার উদ্দেশে দীর্ঘকাল ধরিয়া অনিচ্ছুক মানুষদের উপরে যে অসহ্য পীড়ন চলে ভ্রমণবৃত্তান্তের গ্রন্থে তাহার বিবরণ প্রকাশ হয়, সমালোচকেরা করতালি দেন, সংস্করণের পর সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়া যায়, হাজার হাজার পাঠক ও পাঠিকা এই-সকল বর্ণনা বিস্ময়ের সহিত পাঠ ও আনন্দের সহিত আলোচনা করেন। দুর্গম তুষারপথে নিরীহ শোকা বাহকদল দিবারাত্র যে অসহ্য কষ্ট ভোগ করিয়াছে তাহার পরিণাম কী। ল্যাণ্ডর সাহেব নাহয় লাসায় পৌঁছিলেন, তাহাতে জগতের এমন কী উপকার হওয়া সম্ভব যাহাতে এই-সকল ভীত পীড়িত পলায়নেচ্ছু মানুষদিগকে অহরহ এত কষ্ট দিয়া মৃত্যুর পথে তাড়না করা লেশমাত্র বিহিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে। কিন্তু কই, এজন্য তো লেখকের সংকোচ নাই, পাঠকের অনুকম্পা নাই!

তিব্বতিরা কিরূপ নিষ্ঠুরভাবে পীড়ন ও হত্যা করিতে পারে, শোকারা সেই কারণে তিব্বতিদিগকে কিরূপ ভয় করে, এবং তাহাদিগকে তিব্বতিদের হস্ত হইতে রক্ষা করিতে বৃটিশরাজ কিরূপ অক্ষম, তাহা ল্যাণ্ডর জানিতেন। ইহাও তিনি জানিতেন, তাঁহার মধ্যে যে উৎসাহ উত্তেজনা ও প্রলোভন কাজ করিতেছে, শোকাদের মধ্যে তাহার লেশমাত্র নাই। তৎসত্ত্বেও ল্যাণ্ডর তাঁহার গ্রন্থের ১৬৫ পৃষ্ঠায় যে ভাষায় যে ভাবে তাঁহার বাহকদের ভয়দুঃখের বর্ণনা করিয়াছেন তাহা তর্জমা করিয়া দিলাম–

তাহারা প্রত্যেকে হাতে মুখ ঢাকিয়া ব্যাকুল হইয়া কাঁদিতেছিল। কাচির দুই গাল বাহিয়া চোখের জল ঝরিয়া পড়িতেছিল, দোলা ফোঁপাইয়া কাঁদিতেছিল, এবং ডাকু ও অন্য যে-একটি তিব্বতি আমার কাজ লইয়াছিল– যাহারা ভয়ে ছদ্মবেশ গ্রহণ করিয়াছিল– তাহারা তাহাদের বোঝার পশ্চাতে লুকাইয়া বসিয়া ছিল। আমাদের অবস্থা যদিও সংকটাপন্ন ছিল তবু আমাদের লোকজনদের এই আতুর দশা দেখিয়া আমি না হাসিয়া থাকিতে পারিলাম না।

ইহার পরে এই দুর্ভাগারা পলায়নের চেষ্টা করিলে ল্যাণ্ডর তাহাদিগকে এই বলিয়া শান্ত করেন যে, যে-কেহ পলায়নের বা বিদ্রোহের চেষ্টা করিবে তাহাকে গুলি করিয়া মারিব।

কিরূপ তুচ্ছ কারণেই ল্যাণ্ডর সাহেবের গুলি করিবার উত্তেজনা জন্মে অন্যত্র তাহার পরিচয় পাওয়া গেছে। তিব্বতি কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে ল্যাণ্ডর যখন প্রথম নিষেধ প্রাপ্ত হইলেন তখন তিনি ভান করিলেন, যেন, ফিরিয়া যাইতেছেন। একটা উপত্যকায় নামিয়া আসিয়া দুরবীন কষিয়া দেখিলেন, পাহাড়ের শৃঙ্গের উপর হইতে প্রায় ত্রিশটা মাথা পাথরের আড়ালে উঁকি মারিতেছে। সাহেব লিখিতেছেন–

আমার বড়ো বিরক্তি বোধ হইল। যদি ইচ্ছা হয় তো ইহারা প্রকাশ্যভাবেই আমাদের অনুসরণ করে না কেন। দূর হইতে পাহারা দিবার দরকার কী। অতএব আমি আমার আটশো-গজি রাইফেল লইয়া মাটিতে চ্যাপটা হইয়া শুইলাম এবং যে মাথাটাকে অন্যদের চেয়ে স্পষ্ট দেখা যাইতেছিল তাহার প্রতি লক্ষ্য স্থির করিলাম।

এই “অতএব’ -এর বাহার আছে। লুকাচুরিতে ল্যাণ্ডর সাহেব কী ঘৃণাই করেন। তিনি এবং তাঁহার সঙ্গের আর-একটা মিশনারি সাহেব নিজেদের হিন্দু তীর্থযাত্রী বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন, প্রকাশ্যে ভারতবর্ষে ফিরিবার ভান করিয়া গোপনে লাসায় যাইবার উদ্‌যোগ করিতেছেন, কিন্তু পরের লুকাচুরি ইঁহার এতই অসহ্য যে, ভূমিতে চ্যাপটা হইয়া আত্মগোপনপূর্বক তৎক্ষণাৎ আটশো-গজি রাইফেল বাগাইয়া কহিলেন : I only wish to teach these cowards a lesson। “আমি এই কাপুরুষদিগকে শিক্ষা দিতে ইচ্ছা করি’। দূর হইতে লুকাইয়া রাইফেল-চালনায় সাহেব যে পৌরুষের পরিচয় দিতেছিলেন তাহার বিচার করিবার কেহ ছিল না। আমাদের ওরিয়েন্টাল্‌দের অনেক দুর্বলতার কথা আমরা শুনিয়াছি, কিন্তু চালুনি হইয়া ছুঁচকে বিচার করিবার প্রবৃত্তি পাশ্চাত্যদের মতো আমাদের নাই। আসল কথা, গায়ের জোর থাকিলে বিচারাসনের দখল একচেটে করিয়া লওয়া যায়। তখন অন্যকে ঘৃণা করিবার অভ্যাসটাই বদ্ধমূল হইয়া যায়, নিজেকে বিচার করিবার অবসর পাওয়া যায় না।

আশিয়ায় আফ্রিকায় ভ্রমণকারীরা অনিচ্ছুক ভৃত্য বাহকদের প্রতি যেরূপ অত্যাচার করিয়া থাকেন, দেশ-আবিষ্কারের উত্তেজনায় ছলে বলে কৌশলে তাহাদিগকে যে করিয়া বিপদ ও মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া লইয়া যান, তাহা কাহারো অগোচর নাই। অথচ Sanctity of Life সম্বন্ধে এই-সকল পাশ্চাত্য সভ্যজাতির বোধশক্তি অত্যন্ত সুতীব্র হইলেও কোথাও কোনো আপত্তি শুনিতে পাই না। তাহার কারণ, ধর্মবোধ পাশ্চাত্য সভ্যতার আভ্যন্তরিক নহে; স্বার্থরক্ষার প্রাকৃতিক নিয়মে তাহা বাহির হইতে অভিব্যক্ত হইয়া উঠিয়াছে। এইজন্য য়ুরোপীয় গণ্ডির বাহিরে তাহা বিকৃত হইতে থাকে। এমন-কি, সে গণ্ডির মধ্যেও যেখানে স্বার্থবোধ প্রবল সেখানে দয়াধর্ম রক্ষা করার চেষ্টাকে য়ুরোপ দুর্বলতা বলিয়া ঘৃণা করিতে আরম্ভ করিয়াছে! যুদ্ধের সময় বিরুদ্ধ পক্ষের সর্বস্ব জ্বালাইয়া দেওয়া, তাহাদের অনাথ শিশু ও স্ত্রীলোকদিগকে বন্দী করিবার বিরুদ্ধে কথা কহা “সেন্টিমেন্টালিটি’। য়ুরোপে সাধারণত অসত্যপরতা দূষণীয়, কিন্তু পলিটিক্সে এক পক্ষ অপর পক্ষকে অসত্যের অপবাদ সর্বদাই দিতেছে। গ্লাডস্টোনও এই অপবাদ হইতে নিষ্কৃতি পান নাই। এই কারণেই চীনযুদ্ধে য়ুরোপীয় সৈন্যের উপদ্রব বর্বরতারও সীমা লঙ্ঘন করিয়াছিল এবং কংগো-প্রদেশে স্বার্থোন্মত্ত বেলজিয়ামের ব্যবহার পৈশাচিকতায় গিয়া পৌঁছিয়াছে।

দক্ষিণ-আমেরিকায় নিগ্রোদের প্রতি কিরূপ আচরণ চলিতেছে তাহা নিউইয়র্কে প্রকাশিত “পোস্ট’ সংবাদপত্র হইতে গত ২রা জুলাই তারিখের বিলাতি “ডেলি নিউস’ -এ সংকলিত হইয়াছে। তুচ্ছ অপরাধের অছিলায় নিগ্রো স্ত্রীপুরুষকে পুলিসকোর্টে হাজির করা হয়; সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট তাহাদিগকে জরিমানা করে, সেই জরিমানা আদালতে উপস্থিত শ্বেতাঙ্গেরা শুধিয়া দেয় এবং এই সামান্য টাকার পরিবর্তে তাহারা সেই নিগ্রোদিগকে দাসত্বে ব্রতী করে। তাহার পর হইতে চাবুক লৌহশৃঙ্খল এবং অন্যান্য সকলপ্রকার উপায়ে তাহাদিগকে অবাধ্যতা ও পলায়ন হইতে রক্ষা করা হয়। একটি নিগ্রো স্ত্রীলোককে তো চাবুক মারিতে মারিতে মারিয়া ফেলা হইয়াছিল। একটি নিগ্রো স্ত্রীলোককে দ্বৈধব্য (bigamy)-অপরাধে গ্রেফতার করা হইয়াছিল। হাজতে থাকার সময় একজন ব্যারিস্টার তাহার পক্ষ অবলম্বন করিতে স্বীকার করে। কিন্তু কোনো বিচার না হইয়াই নির্দোষ বলিয়া এই স্ত্রীলোকটি খালাস পায়। ব্যারিস্টার ফি’য়ের দাবি করিয়া তাহার প্রাপ্য টাকার পরিবর্তে এই নিগ্রো স্ত্রীলোকটিকে ম্যাক্রিক্যাম্পে চৌদ্দ মাস কাজ করিবার জন্য পাঠায়। সেখানে তাহাকে নয়মাস চাবি তালা দিয়া বন্ধ করিয়া খাটানো হইয়াছে, জোর করিয়া আর-এক ব্যক্তির সহিত তাহার বিবাহ দিয়া বলা হইয়াছে যে, তোমার বৈধস্বামীর সহিত তোমার কোনো কালে মিলন হইবে না। পলায়নের আশঙ্কা করিয়া তাহার পশ্চাতে কুকুর ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহার প্রভু ম্যাক্রিরা তাহাকে নিজের হাতে চাবুক মারিয়াছে এবং তাহাকে শপথ করাইয়া লইয়াছে যে, খালাস পাইলে তাহাকে স্বীকার করিতে হইবে যে সে মাসে পাঁচ ডলার করিয়া বেতন পাইত।

ডেলি নিউস বলিতেছেন, রাশিয়ায় ইহুদি-হত্যা, কংগোয় বেলজিয়ামের অত্যাচার প্রভৃতি লইয়া প্রতিবেশীদের প্রতি দোষারোপ করা দুরূহ হইয়াছে।

 

After all, no great power is entirely innocent of the charge of treating with barbarous harshness the alien races which are subject to its rule.

 

আমাদের দেশে ধর্মের যে আদর্শ আছে তাহা অন্তরের সামগ্রী, তাহা বাহিরে গণ্ডির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিবার নহে। আমরা যদি Sanctity of Life একবার স্বীকার করি তবে পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ কোথাও তাহার সীমাস্থাপন করি না। ভারতবর্ষ একসময়ে মাংসাশী ছিল; মাংস আজ তাহার পক্ষে নিষিদ্ধ। মাংসাশী জাতি নিজেকে বঞ্চিত করিয়া মাংসাহার একেবারে পরিত্যাগ করিয়াছে, জগতে বোধ হয় ইহার আর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নাই। ভারতবর্ষে দেখিতে পাই অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিও যাহা উপার্জন করে তাহা দূর আত্মীয়দের মধ্যে ভাগ করিয়া দিতে কুণ্ঠিত হয় না। স্বার্থেরও যে একটা ন্যায্য অধিকার আছে, এ কথাটাকে আমরা সর্বপ্রকার অসুবিধা স্বীকার করিয়া যত দূর সম্ভব খর্ব করিয়াছি। আমাদের দেশে বলে, যুদ্ধেও ধর্মরক্ষা করিতে হইবে; নিরস্ত্র, পলাতক, শরণাগত শত্রুর প্রতি আমাদের ক্ষত্রিয়দের যেরূপ ব্যবহার ধর্মবিহিত বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে য়ুরোপে তাহা হাস্যকর বলিয়া গণ্য হইবে। তাহার একমাত্র কারণ, ধর্মকে আমরা অন্তরের ধন করিতে চাহিয়াছিলাম। স্বার্থের প্রাকৃতিক নিয়ম আমাদের ধর্মকে গড়িয়া তোলে নাই, ধর্মের নিয়মই আমাদের স্বার্থকে সংযত করিবার চেষ্টা করিয়াছে। সেজন্য আমরা যদি বহির্বিষয়ে দুর্বল হইয়া থাকি, সেইজন্যই বহিঃশত্রুর কাছে যদি আমাদের পরাজয় ঘটে, তথাপি আমরা স্বার্থ ও সুবিধার উপরে ধর্মের আদর্শকে জয়ী করিবার চেষ্টায় যে গৌরবলাভ করিয়াছি তাহা কখনোই ব্যর্থ হইবে না — এক দিন তাহারও দিন আসিবে।

 

১৩১০

McRee letter

A letter from an African American woman Carrie Kinsey in July 1903 seeking help from then President Roosevelt in freeing her fourteen year old brother from a McRee camp.

 

Article similar to the Daily Post one that Tagore must have read:

http://archives.chicagotribune.com/1903/06/19/page/4/article/georgia-negroes-sold-to-slavery

 

***

I have described elsewhere how an English professor while discussing the role of juries in this country opined that it was not right that a half civilized people who lack an understanding of the concept of sanctity of life should have the right to form juries.

Let us for the sake of this argument accept that the English appreciate the sanctity of life better than us. Thus when the English take lives, the gravity of their crime should be greater than when we commit the same crime. But we observe no Englishman being hanged by an English judge and an English jury for killing an Indian. Perhaps this gives the English murderer proof of the fact that his countrymen have a very acute understanding of the sanctity of life, but the evidence remains somewhat elusive to Indians.

These rulings are an affront to us on two counts. On one front there is the inevitability of death and on the other the loss of face. The contempt that is expressed towards our countrymen is an insult to all of us.

There is a newspaper in England titled The Globe. It is for the civilized classes of that country. It said – Tommy Atkins (common slang for a common soldier) does not hit the Indian with the idea of killing him but the Indians die as soon as they are beaten; and when poor Tommy receives a mild sentence the native papers are up in arms.

I see great sympathy for Tommy Atkins but what of the ‘sanctity of life’? Why is there no sign of outrage regarding the brutality that is killing us in even a few lines of this civilized newspaper? Are those who look upon a murder by their own kind with gentle indulgence not guilty of murder too, as they mock the mourning of the families who have suffered a loss?

For some time we have observed that the religious ideals in European civilization are founded on habit alone. The true meaning of religion has not reached the inner core of this civilization. That is why these ideals lose their way outside the familiar boundaries and often die an untimely death.

Murders or killings are no longer regular occurrences in European society within families as that sort of behaviour goes against the common interest. Poisoning or murder with a weapon has grown rare over a few centuries.

But murder can be committed without the use of weapons or bloodshed. If religion is natural and embedded in the soul, then that kind of murder becomes shameful and impossible to carry out as well.

Let us look at a specific example to understand this better;

Henry Savage Landor was a famous traveller. He became greatly interested in visiting Lhasa which is a pilgrimage in Tibet. Everyone will know that the Tibetans are suspicious of European travellers and missionaries. Their main mode of defence is their remoteness and the fact that their remote areas are not known to foreigners; if they feel unwilling to hand that defence over to the Geographical Society complacently, one cannot blame them.

But it is the practice of Europe to not heed anyone else’s restrictions while expecting compliance from others regarding their own. Whether there is a need for it or not, such a tremendous amount of ovation is available in Europe for simply overcoming certain dangers that this proves enticing to many of them. The brave men of Europe seek these dangers in countries across the world. The European to first set foot in Lhasa by hook or by crook would have no end to the honours and fame showered upon him.

And hence to Lhasa one must go, trampling over snowy peaks and the restrictions placed by the Tibetans themselves. Landor began his journey from Almora in the Kumaon Himalayas. With him was a Hindu servant known as Chandan Singh.

A tribe known as the Shaukas lived within the British territory at the borders of Kumaon. They were greatly afraid of the Tibetans. Landor has expressed his dismay at the failure of the British rulers to provide the Shaukas with respite from attack by the Tibetans. He had to organise porters from the members of the Shauka tribe and managed to convince thirty of them to join his expedition with great difficulty.

From then on his main concern and effort was devoted to the possibility of these porters escaping. They had more than sufficient reason to do so. In the twenty fifth chapter of his travelogue Landor wrote –

‘When the porters began climbing higher and higher in solemn silence, gasping miserably for air I was worrying about how many of them would possibly return.’

We ask the question, when this was the fear in your mind then what name would you assign to the relentless pressure on these unwilling wretches to advance towards certain death? You will be showered with praise and quite possibly gain some financial prizes as well. You may give your life in that hope but what sort of reward awaits these people?

Much debate takes place in Europe over the need for vivisection for the advancement of scientific knowledge. The need for alleviating the pain of the live animals while subjecting them to scientific experiments is also discussed. But the unbelievable cruelty that is exerted on unwilling people in the name of bravery and with the aim of attaining fame is described at length in accounts of those journeys, the books run into multiple editions and thousands of readers of both sexes read them with a great sense of wonder and enjoyment. What is the result of the continual suffering that the innocent Shauka porters underwent on the remote icy passes? What kind of benefit was it to the world even if Landor did reach Lhasa that would render negligible the sufferings of the frightened porters who wished to escape but were pushed towards certain death under great duress? But I do not notice any hesitation regarding this on the writer’s part and certainly no sympathy on part of the reader.

Landor knew how cruelly the Tibetans tortured and killed the Shaukas and how they feared the Tibetans for that reason and how ineffectual the British government was at protecting them from the Tibetans. He also knew that the eagerness and hope for adulation that was within him was not present in the Shaukas even in the smallest measure. I provide a translation of the description that he provides of their fearful behavior on Page 165 of his book, despite knowing everything:
‘They all covered their faces with their hands and cried piteously. Tears streamed down both Kachi’s cheeks, Dola’s shoulders heaved and Daku and the other Tibetan who had disguised themselves as Shokas to become my porters hid behind their loads. Even though our plight was fraught with danger, I could not help but laugh at the pathetic state of my entourage.’

After this Landor calmed the porters who were attempting to escape by assuring them that he would shoot them down if they ran away or tried to incite others to revolt.

There is more proof of how easily Landor was driven to a desire to shoot someone. When he received the first notice from the Tibetan authorities asking him to turn back, he pretended to follow their instructions. He descended into a valley and looked through a telescope to find that nearly thirty heads were watching his departure from behind the rocks. He writes –

‘I felt very annoyed. If they wanted to they should have followed us openly. Why guard us from afar? Hence I lay facedown upon the ground and aimed at the most visible head with my rifle which had a range of 800 yards.’

There is a certain style in the usage of the word ‘hence’. How abhorrent Landor finds all this artifice. He and a missionary accompanying him were trying to pass themselves off as Hindu pilgrims, he was openly pretending to return to India while secretly trying to enter Lhasa but when it came to others, he felt so annoyed that he had to hide by lying flat on the ground, take aim with an 800 yard rifle and say: I only wish to teach these cowards a lesson. There was no one there to judge him for his courage in taking aim secretly from such a distance. We have heard of many weaknesses of part of the Orientals but we have no inclination to judge a needle while we are akin to sieves ourselves in the style of the Westerner. The truth is, one can grab the judgement seat if one is stronger. In those instances, despising others becomes a habit and there is little time to analyse one’s own actions.

The ways in which travellers in Asia and Africa torment their unwilling servants and porters and push them towards danger and death by trickery, force and subterfuge in the exultation of discovering new lands are not unknown to anyone. And yet we never hear about Sanctity of Life from anyone despite the acute sensitivity of the West to that issue. The reason for that is that piety is not at the heart of Western civilization; it has escaped under pressure and become distorted outside the boundaries of Europe. Even within those boundaries when self interest is powerful enough, maintaining compassion has recently been deemed as weakness by Europe. It is called ‘sentimentality’ when there are protests against the scorched earth policy and the imprisoning of helpless women and children. Deceit is usually frowned upon in Europe but political sides are forever calling each other liars. Even Gladstone was not exempt from this. That is why the European soldiers crossed the limits of barbaric behavior in the China wars and the self serving actions of Belgium are bordering on hellish in the Congo.

News about how the negroes of Southern America are being treated was published in the Daily News of the second of July. Black men and women are taken to court on minor charges; the magistrate orders them to pay a fine and white people present in the court post bail for them. These small sums bind them into a contract of slavery. From then on they are prevented from committing any transgressions or escaping by means of whips, metal shackles and other methods. One woman was whipped till she died. Another was arrested on grounds of bigamy. While in prison a barrister agreed to take her case. But the woman was freed before the case could be heard as she was innocent. The barrister claimed his fee and sent this woman to the McRee Camp for fourteen months to work off her debt. She was put under lock and key and forced to work for nine months. She was also made to marry a man and told that she would never see her first husband again. Dogs were sent after her when she tried to escape and her owner McRee whipped her himself and extracted a promise from her that she would be freed on condition that she declared that she was paid five dollars every month as a salary.

The Daily News says the killing of Jews in Russia and the Belgian war crimes in the Congo are incidents for which it is increasingly difficult to blame one’s neighbours.

‘After all, no great power is entirely innocent of the charge of treating with barbarous harshness the alien races which are subject to its rule.’

The religious ideals that exist in our country are close to the soul and are not easily transferred to the outside and confined within boundaries. If we once admit to the Sanctity of Life we do not place any further restrictions on animals, birds or insect life. India was once a meat eating nation; today there are bans on eating meat. There is possibly no other example in the world of a meat eating race having given up meat completely. I have seen even the very poor in India give away their meagre earnings to distant family without any qualms. We have accepted every kind of deprivation and diminished the importance that was accorded to self interest as far as possible. It is said in our country that what is right must be adhered to, even in war; the fair treatment of their unarmed enemies, fleeing armies and shelter seekers that the Kshatriyas followed as principle would be laughable to the Europeans. The sole reason for this was that we strove to make religion something of the heart. The natural laws of self-interest did not form our religion; rather the laws of religion helped restrict our self-interest. And for that reason alone, if we are weak in outside matters and if we are defeated by external forces, there will be no lessening of the honour in the victory that we have attained by placing the ideal of truth above self-interest and ease – there will come a day for that too.

1310

Letter image: http://www.washingtonmonthly.com/magazine/january_february_2013/features/americas_twentiethcentury_slav042038.php?page=all

দীক্ষা/ Deeksha/The Initiation

Debendranath_Tagore 1.jpg

দীক্ষা

 

একদিন যাঁর চেতনা বিলাসের আরামশয্যা থেকে হঠাৎ জেগে উঠেছিল–এই ৭ই পৌষ দিনটি সেই দেবেন্দ্রনাথের দিন। এই দিনটিকে তিনি আমাদের জন্যে দান করে গিয়েছেন। রত্ন যেমন করে দান করতে হয় তেমনি করে দান করেছেন। ওই দিনটিকে এই আশ্রমের কৌটোটির মধ্যে স্থাপন করে দিয়ে গেছেন। আজ কৌটো উদ্‌ঘাটন করে রত্নটিকে এই প্রান্তরের আকাশের মধ্যে তুলে ধরে দেখব–এখানকার ধূলিবিহীন নির্মল নিভৃত আকাশতলে যে নক্ষত্রমণ্ডলী দীপ্তি পাচ্ছে সেই তারাগুলির মাঝখানে তাকে তুলে ধরে দেখব। সেই সাধকের জীবনের ৭ই পৌষকে আজ উদ্‌ঘাটন করার দিন, সেই নিয়ে আমরা আজ উৎসব করি।

 

এই ৭ই পৌষের দিনে সেই ভক্ত তাঁর দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, সেই দীক্ষার যে কতবড়ো অর্থ আজকের দিন কি সে-কথা আমাদের কাছে কিছু বলছে? সেই কথাটি না শুনে গেলে কী জন্যেই বা এসেছি আর কী নিয়েই বা যাব?

 

সেই যেদিন তাঁর জীবনে এই ৭ই পৌষের সূর্য একদিন উদিত হয়েছিল সেই দিনে আলোও জ্বলে নি, জনসমাগমও হয় নি–সেই শীতের নির্মল দিনটি শান্ত ছিল, স্তব্ধ ছিল। সেই দিনে যে কী ঘটছে তা তিনি নিজেও সম্পূর্ণ জানেন নি, কেবল অন্তর্যামী বিধাতা পুরুষ জানছিলেন।

 

সেই যে দীক্ষা সেদিন তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেটি সহজ ব্যাপার নয়। সে শুধু শান্তির দীক্ষা নয়, সে অগ্নির দীক্ষা। তাঁর প্রভু সেদিন তাঁকে বলেছিলেন, “এই যে জিনিসটি তুমি আজ আমার হাত থেকে নিলে এটি যে সত্য–এর ভার যখন গ্রহণ করেছ তখন তোমার আর আরাম নেই, তোমাকে রাত্রিদিন জাগ্রত থাকতে হবে। এই সত্যকে রক্ষা করতে তোমার যদি সমস্তই যায় তো সমস্তই যাক। কিন্তু সাবধান, তোমার হাতে আমার সত্যের অসম্মান না ঘটে।’

 

তাঁর প্রভুর কাছ থেকে এই সত্যের দান নিয়ে তার পরে আর তো তিনি ঘুমোতে পারেন নি। তাঁর আত্মীয় গেল, ঘর গেল, সমাজ গেল, নিন্দায় দেশ ছেয়ে গেল–এতবড়ো বৃহৎ সংসার, এত মানী বন্ধু, এত ধনী আত্মীয়, এত তার সহায়, সমস্তের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গেল এমন দীক্ষা তিনি নিয়েছিলেন। জগতের সমস্ত আনুকূল্যকে বিমুখ করে দিয়ে এই সত্যটি নিয়ে তিনি দেশে দেশে অরণ্যে পর্বতে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছিলেন। এ যে প্রভুর সত্য। এই অগ্নি রক্ষার ভার নিয়ে আর আরাম নেই, আর নিদ্রা নেই। রুদ্রবেদের সেই অগ্নিদীক্ষা আজকের দিনের উৎসবের মাঝখানে আছে। কিন্তু সে কি প্রচ্ছন্নই থাকবে? এই গীত-বাদ্যকোলাহলের মাঝখানে প্রবেশ করে সেই “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং ভীষণানাং’ যিনি তাঁর দীপ্ত সত্যের বজ্রমূর্তি আজ প্রত্যক্ষ করে যাবে না? গুরুর হাত হতে সেই যে “বজ্রমুদ্যতং” তিনি গ্রহণ করেছিলেন এই ৭ই পৌষের মর্মস্থানে সেই বজ্রতেজ রয়েছে।

 

কিন্তু শুধু বজ্র নয়, শুধু পরীক্ষা নয়, সেই দীক্ষার মধ্যে যে কী বরাভয় আছে তাও দেখে যেতে হবে। সেই ধনিসন্তানের জীবনে যে সংকটের দিন এসেছিল তা তো সকলের জানা আছে। যে বিপুল ঐশ্বর্য রাজহর্ম্যের মতো একদিন তাঁর আশ্রয় ছিল সেইটে যখন অকস্মাৎ তাঁর মাথার উপরে ভেঙে পড়ে তাঁকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবার উদ্‌যোগ করেছিল তখন সেই ভয়ংকর বিপৎপতনের মাঝখানে একমাত্র এই সত্যদীক্ষা তাঁকে আবৃত করে রক্ষা করেছিল–সেইদিন তাঁর আর-কোনো পার্থিব সহায় ছিল না। এই দীক্ষা শুধু যে দুর্দিনের দারুণ অঘাত থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছিল তা নয়–প্রলোভনের দারুণতর আক্রমণ থেকে তাঁকে রক্ষা করেছিল।

 

আজাকের এই ৭ই পৌষের মাঝখানে তাঁর সেই সত্যদীক্ষার রুদ্রদীপ্তি এবং রবাভয়রূপ দুইই রয়েছে–সেটি যদি আমরা দেখতে পাই এবং লেশমাত্রও গ্রহণ করতে পারি তবে ধন্য হব। সত্যের দীক্ষা যে কাকে বলে আজ যদি ভক্তির সঙ্গে তাই স্মরণ করে যেতে পারি তাহলে ধন্য হব। এর মধ্যে ফাঁকি নেই, লুকোচুরি নেই, দ্বিধা নেই, দুই দিক বজায় রেখে চলবার চাতুরী নেই, নিজেকে ভোলাবার জন্যে সুনিপুণ মিথ্যাযুক্তি নেই, সমাজকে প্রসন্ন করবার জন্যে বুদ্ধির দুই চক্ষু অন্ধ করা নেই, মানুষের হাটে বিকিয়ে দেবার জন্যে ভগবানের ধন চুরি করা নেই। সেই সত্যকে সমস্ত দুঃখপীড়নের মধ্যে স্বীকার করে নিলে তার পরে একেবারে নির্ভয়, ধূলিঘর ভেঙে দিয়ে একেবারে পিতৃভবনের অধিকার লাভ–চিরজীবনের যে গম্যস্থান, যে অমৃতনিকেতন, সেই পথের  যিনি একমাত্র বন্ধু তাঁরই আশ্রয়প্রাপ্তি সত্যদীক্ষার এই অর্থ।

 

সেই সাধু সাধক তাঁর জীবনের সকলের চেয়ে বড়ো দিনটিকে, তাঁর দীক্ষার দিনটিকে, এই নির্জন প্রান্তরের মুক্ত আকাশ ও নির্মল আলোকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে দিয়ে গেছেন। তাঁর সেই মহাদিনটির চারিদিকে এই মন্দির, এই আশ্রম, এই বিদ্যালয় প্রতিদিন আকার ধারণ করে উঠছে; আমাদের জীবন, আমাদের হৃদয়, আমাদের চেতনা একে বেষ্টন করে দাঁড়িয়েছে; এই দিনটিরই আহ্বানে কল্যাণ মূর্তিমান হয়ে এখানে আবির্ভূত হয়েছে; এবং তাঁর সেই সত্যদীক্ষার দিনটি ধনী ও দরিদ্রকে, বালক ও বৃদ্ধকে, জ্ঞানী ও মূর্খকে বর্ষে বর্ষে আনন্দ-উৎসবে আমন্ত্রণ করে আনছে। এই দিনটিকে যেন আমাদের অন্যমনস্ক জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে না রাখি–একে ভক্তিপূর্বক সমাদর করে ভিতরে ডেকে নাও, আমাদের তুচ্ছ জীবনের প্রতিদিনের যে দৈন্য তাকে সম্পদে পূর্ণ করো।

 

হে দীক্ষাদাতা, হে গুরু, এখনও যদি প্রস্তুত হয়ে না থাকি তো প্রস্তুত করো, আঘাত করো, চেতনাকে সর্বত্র উদ্যত করো–ফিরিয়ে দিয়ো না, ফিরিয়ে দিয়ো না–দুর্বল ব’লে তোমার সভাসদ্‌দের সকলের পশ্চাতে ঠেলে রেখো না। এই জীবনে সত্যকে গ্রহণ করতেই হবে–নির্ভয়ে এবং অসংকোচে। অসত্যের স্তূপাকার আবর্জনার মধ্যে ব্যর্থ জীবনকে নিক্ষেপ করব না। দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে–তুমি শক্তি দাও।

 

৭ পৌষ
***
Debendranath Tagore 2

Initiation

 

This seventh day of Poush belongs to Debendranath – the one whose consciousness was suddenly aroused one day from a slumber of comfort and luxury. He gifted this day to us; just as one might give away precious jewels. He left the day to be treasured forever in the care of his precious ashram. Today we shall take it out of the box and view it in the surroundings of the fields and the sky – amidst the constellations that shine in the clear, silent, unblemished skies above us. Today is the day to reveal that seventh day of Poush in that seer’s life; today is the day to celebrate it.

He took a vow on this seventh day of Poush but does this day speak to us at all of what immense meaning that vow entailed? If we do not hear it, what meaning can we make of this life and how empty will our departure be?

When the sun rose on that seventh day of Poush in his life, no torches were lit nor did people gather – that clear winter’s day was filled with peace and silence. He himself did not fully comprehend what was happening to him, the only one who was aware of anything was the One that is responsible for the workings of the universe.

That vow he took was not an easy one to follow. It was not merely an initiation into peace but also an initiation by fire. His Master said to him that day, ‘This gift that you have received from me is that of Truth – now that you have taken this burden there will be no rest for you for you will have to remain alert at all times. If you lose everything you have held dear while guarding this Truth, then so be it. But take care that my word is not desecrated in your guardianship.’

He could not rest once he had accepted that gift of truth from his master. His family forsook him, he lost his home and his friends; cries of shame filled the country. His large household, all his respected friends, all his wealthy relations, every support he had – he took a vow that sundered all these bonds. He spurned all the opposition that the world threw at him and wandered through forests and mountains of the land with the knowledge within him. This was the word that he had received from his Master. Once you undertake to protect that flame, there is neither rest nor sleep. That fiery pledge to the Rudra Veda is hidden in the celebrations of today. But will it remain hidden? Will not that ‘fear distilled from all fears and terror that surpasses all terrors’ enter the music and celebration today and will we not see the illumination of that truth? That lightning that he was entrusted with by his master continues to burn at the heart of this seventh day of Poush.

But the vow was not only accompanied by fire and ordeal; we must also be able to see the immense compassion that accompanied it. Everyone knows what terrible times visited this man who had been born in the lap of luxury. That immense wealth that had once sheltered him like the canopy over a throne suddenly came tumbling down upon him and nearly crushed him to the ground; this vow of truth was the only thing that sheltered him during those times – he had no other earthly assistance. The vow did not simply save him from the tribulations of those times; it also stood between him and the assault of petty desire.

In the midst of this seventh day of Poush there burns both the fierce flame of his initiation into Truth as well as gentle assurance – if we can see that and accept even the smallest part of it, we will be blessed. If we can respectfully remember what it means to receive Truth we will be blessed. There is no deception, no hiding, no hesitation, no dexterous juggling of both sides, no clever falsehoods to convince the self, no blinding of intelligent thought to keep society happy nor robbing the divine for material profit. If that Truth can be accepted amidst all of life’s tribulations, then only do we receive the right to inherit His realm without fear in our hearts – the realm that we strive life-long to achieve, that abode of peace, the One who is the only companion on that journey – this initiation into Truth is so that we can be gathered into His fold.

That great devotee placed the most important day of his life; the day of his awakening in the midst of the open skies and clear sunlight of these unpeopled fields. Each day this temple, this hermitage and this school takes shape around that memory. Our lives, our souls and our very consciousness surround it; this day has caused all that is good to come here and has invited the rich and the poor, the young and the old as well as the wise and the ignorant to gather here in celebration year after year. We must not keep this day waiting unattended at the doorstep of our lives – draw it closer with respectful care, let the poverty of our very ordinary daily existence be enriched.

Oh teacher, oh Guru, if I still seem unready then prepare me, strike me, arouse my consciousness – do not turn me from the goal nor push me away behind all your other disciples. One must accept truth in this life – with courage and without prejudice. I will not cast my failed life into the midden heap of lies. I must be initiated – give me the strength to do so.

 

Seventh Poush

Debendranath Tagore 3

Images: Internet sourced.

নিঃস্বার্থ প্রেম / Selfless Love Part 1

নিঃস্বার্থ প্রেম

দেখো ভাই, সেদিন আমার বাস্তবিক কষ্ট হয়েছিল। অনেকদিন পরে তুমি বিদেশ থেকে এলে;  আমরা গিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম। “আমাদের কি মনে পড়ত?’ তুমি ঠোঁটে একটু হাসি, চোখে একটু ভ্রূকুটি করে বললে, “মনে পড়বে না কেন? উত্তরটা শুনেই তো আমার মাথায় একেবারে বজ্রাঘাত হল; নিতান্ত দুঃসাহসে ভর করে সংকুচিত স্বরে আর-একবার জিজ্ঞাসা করলুম, “অনেক দিন পরে এসে আমাদের কেমন লাগছে।?’ তুমি আশ্চর্য ও বিরক্তিময় স্বরে অথচ ভদ্রতার মিষ্টহাসিটুকু রেখে বললে, “কেন, খারাপ লাগবার কী কারণ আছে?’ আর সাহস হল না। ও-রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা আর হল না। বিদেশে গিয়ে অবধি তুমি আমাকে দু-তিনখানা বৈ চিঠি লেখ নি, সেজন্য আমার মনে মনে একটুখানি অভিমান ছিল। বড়ো সাধ ছিল, সেই কথাটা নিয়ে হেসে হেসে অথচ আন্তরিক কষ্টের সঙ্গে, ঠাট্টা করে অথচ গম্ভীরভাবে একটুখানি খোঁটা দেব’, কিন্তু তোমার ভাব দেখে, তোমার ভদ্রতার অতিমিষ্ট হাসি দেখে তোমার কথার স্বর শুনে আমার অভিমানের মূল পর্যন্ত শুকিয়ে গেল। তখন আমিও প্রশ্নের ভাব পরিবর্তন করলুম। জিজ্ঞাসা করলুম, “যে দেশে গিয়েছিল সে দেশের জল-বাতাস নাকি বড়ো গরম? সে দেশের লোকেরা নাকি মস্ত মস্ত পাগড়ি পরে, আর তামাক খাওয়াকে ভারি পাপ মনে করে? এখান থেকে সেকেণ্ড ক্লাসে সেখেনে যেতে কত ভাড়া লাগে?’ এইরকম করে তোমার কাছ থেকে সেদিন অনেক জ্ঞান লাভ করে বাড়ি ফিরে এয়েছিলুম! তোমার আচরণ দেখে দুঃখ প্রকাশ করেছিলুম শুনে তুমি লিখেছ যে, “প্রথমত আমার যতদূর মনে পড়ে তাতে আমি যে তোমার ওপর কোনো প্রকার কুব্যবহার করেছিলুম, তা তো মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, যদি-বা তোমার কতকগুলি প্রশ্নের ভালোরকম উত্তর না দিয়ে দু-চার কথা বলে উড়িয়ে দিয়ে থাকি, তাতেই বা আমার দোষ কী? সে রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবারই বা তোমার কি আবশ্যক ছিল?’ তোমার প্রথম কথার কোনো উত্তর দেওয়া যায় না। সত্যই তো, তুমি আমার সঙ্গে কোনো কু-ব্যবহারই কর নি। যতগুলি কথা জিজ্ঞাসা করেছিলুম, সকলগুলিরই তুমি একটা-না-একটা উত্তর দিয়েছিলে, তা ছাড়া হেসেও ছিলে, গল্পও করেছিলে। তোমার কোনোরকম দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু তবু তুমি আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর নি; সে তোমাকে বা আর কাউকে আমি বোঝাতে পারব না সুতরাং তার আর বাহুল্য উল্লেখ করব না। দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে, কেন তোমাকে ও-রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলুম। আচ্ছা ভাই তোমার তো হৃদয় আছে, একবার তুমিই বিবেচনা করে দেখো না– কেন জিজ্ঞাসা করেছিলুম। তোমার ভালোবাসার উপর সন্দেহ হয়েছিল বলেই কি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, যে, “আমাদের কি মনে পড়ত’ কিংবা “আমাদের কি ভালো লাগছে’, না তোমার ভালোবাসার ওপর সন্দেহ তিলমাত্র ছিল না বলেই জিজ্ঞাসা করেছুলম? যদি স্বপ্নেও জানতুম যে, আমাকে তোমার মনে পড়ত না, কিংবা আমাকে তোমার ভালো লাগছে না, তা হলে কী ও-রকমের কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতুম। তোমার মুখে শোনবার ভারি ইচ্ছা ছিল যে, বিদেশে আমাকে তোমার প্রায়ই মনে পড়ত। কেবলমাত্র ওই কথাটুকু নয়, ওই কথা থেকে তোমার আরও কত কথা মনে আসত। আমার বড়ো ইচ্ছা ছিল যে, তুমি বলবে– “অমুক জায়গায় আমি একটি সুন্দর উপত্যকা দেখলুম; সেখেনে একটি নির্ঝর বয়ে যাচ্ছিল, জায়গাটা দেখেই মনে হল, আহা ভা– যদি এখানে থাকত তা হলে তার বড়ো ভালো লাগত!’ একটা ছোটো প্রশ্ন থেকে এইরকম কত উত্তরই শুনতে পাবার সম্ভাবনা ছিল। যখন প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করেছিলুম তখন মনের ভিতর এইরকম অনেক কথা চাপা ছিল!

আমি তোমার কাছে দুঃখ করবার জন্যে এ চিঠিটা লিখছি নে; কিংবা তোমার কাছে অভিমান করাও আমার উদ্দেশ্য নয়! আমি ভাই, কোনো কোনো লোকের মতো ঢাক ঢোল বাজিয়ে অভিমান করতে পারি নে; যার প্রতি অভিমান করেছি, তার কাছে গিয়ে “ওগো আমি অভিমান করেছি গো, আমি অভিমান করেছি’ বলে হাঁকাহাঁকি করতেও ভালোবাসি নে। যদি আমি অভিমান করি তো সে মনে মনে। আমার অভিমানের অশ্রু কেউ কখনো দেখতে পায় না, আমার অভিমানের কথাও কেউ কখনো শোনে নি; অভিমান আমার কাছে এমনই গোপনের সামগ্রী। তাই বলছি তোমার কাছে আজ অমি অভিমান করতে বসি নি। তোমার সঙ্গে আমার কতকগুলি তর্ক আছে, তার মীমাংসা করতে আমার ভারি ইচ্ছে।

তোমার সমস্ত চিঠিটার ভাব দেখে এই মনে হল যে তোমার মতে যারা নিঃস্বার্থ ভালোবাসে তারা আর ভালোবাসা ফেরত পাবার আশা করে না। যেখানে ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা পাবার আশা আছে সেইখানেই স্বার্থপরতা আছে। এ সম্বন্ধে তোমাকে একটি কথা বলি শোনো। আমরা অনেক সময়ে ভালো করে অর্থ না বুঝে অনেক কথা ব্যবহার করে থাকি। মুখে মুখে কথাগুলো এমন চলিত, এমন পুরোনো , হয়ে যায় যে, সেগুলো আমরা কানে শুনি বটে কিন্তু মনে বুঝি নে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কথাটাও বোধ করি সেইরকম একটা কিছু হবে। যখন আমরা শুনে যাই তখন আমরা কিছুই বুঝি নে, একটু পীড়াপীড়ি করে বোঝাতে বললে হয়তো দশজনে দশ রকম ব্যাখ্যা করি। স্বার্থপরতা কথা সচরাচর আমরা কী অর্থে ব্যবহার করে থাকি? আহার করা বা স্নান করাকে কি স্বার্থপরতা অতএব নিন্দনীয় বলে? আহার না করা বা স্নান না করাকে কি নিঃস্বার্থপরতা অতএব প্রশংসনীয় বলে? মূল অর্থ ধরতে গেলে আহার বা স্নান করাকে স্বার্থপরতা বলা যায় বৈকি? কিন্তু চলিত অর্থে তাকে স্বার্থপরতা বলে না। সকল মানুষই মনে মনে এমন সামঞ্জস্যবাদী, যে, যখন বলা হল যে, “আহার করা ভালো’ তখন কেউ এমন বোঝেন না, বিরাম বিশ্রাম না দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছাব্বিশ ঘণ্টাই আহার করা ভালো। তেমনি যখন আমরা স্বার্থপরতা কথা ব্যবহার করি, তখন কেউ মনে করে না যে, নিশ্বাস গ্রহণ করা স্বার্থপরতা বা বাতাস খাওয়া স্বার্থপরতা। যা-কিছু পঙ্কজ তাকে যেমন পঙ্কজ বলে না, যা কিছু অচল তাকে যেমন অচল বলে না, তেমনি যা-কিছু স্বার্থপরতা তাকেই স্বার্থপরতা বলে না। খাওয়াদাওয়াকে স্বার্থপরতা বলে না, কিন্তু যে ব্যক্তি কেবলমাত্র খাওয়াদাওয়া করে আর কিছু করে না, কিংবা যার খাওয়াদাওয়াই বেশি, পরের জন্য কোনো কাজ অতি যৎসামান্য, তাকে স্বার্থপর বলা যায়। আবার তার চেয়ে স্বার্থপর হচ্ছে যারা পরের মুখের গ্রাস কেড়ে নিজে খায়। এ ছাড়া আর কোনো অর্থে, কোনো ভাবে স্বার্থপর কথা ব্যবহার করা হয় না। তা যদি হয় তা হলে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বলতে কী বুঝায়? যদি মূল অর্থ ধর তাহলে ভালোবাসC স্বার্থপরতা। যখন এক জনকে দেখতে ভালো লাগে, তার কথা শুনতে ভালো লাগে, তার কাছে থাকতে ভালো লাগে ও সেইসঙ্গে সঙ্গে তাকে না দেখলে, তার কথা না শুনলে ও তার কাছে না থাকলে কষ্ট হয়, তার সুখ হলে আমি সুখী হই, তার দুঃখ হলে আম দুঃখী হই, তখন অতগুলো ভাবের সম্মিলনকেই ভালোবাসা বলে। ভালোবাসার আর-একাট উপাদান হচ্ছে, সে আমাকে ভালো বাসুক, অর্থাৎ তার চোখে আমি সর্বাংশে প্রীতিজনক হই এই বাসনা। ভেবে দেখতে গেলে এর মধ্যে সকলগুলিই স্বার্থপরতা। এতগুলি স্বার্থপরতার সমষ্টি থেকে একটি স্বার্থপরতা বাদ দিলেই কি বাকিটুকু নিঃস্বার্থ হয়ে দাঁড়ায়? কিন্তু যেটিকে বাদ দেওয়া হল সেটি অন্যান্যগুলির চেয়ে কী এমন বেশি অপরাধ করেছে? তা ছাড়া এর মধ্যে কোনোটাকেই বাদ দেওয়া যায় না। এর একটি যখন নেই তখন বোঝা গেল যে, যথার্থ ভালোবাসাই নেই। যাকে তোমার  দেখতে ভালো লাগে না, যার কথা শুনতে ইচ্ছে করে না, যার কাছে থাকতে মন যায় না তাকে যদি ভালোবাসা সম্ভব হয় তা হলেই যার ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে না তাকে ভালোবাসাও সম্ভব হয়। যাকে দেখতে শুনতে ও যার কাছে থাকতে ভালো লাগে, কোনো কোনো ব্যক্তি দুদিন তাকে দেখতে শুনতে না পেলে ও তার কাছে না থাকলে তাকে ভুলে যায় ও তার ওপর থেকে তার ভালোবাসা চলে যায়, তেমনি আবার যার ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে তার ভালোবাসা না পেলেই কোনো কোনো ব্যক্তির ভালোবাসা তার কাছ থেকে দূর হয়; তাদের সম্বন্ধে এই বলা যায় যে, তাদের গভীররূপে ভালোবাসার ক্ষমতা নেই।

****

SELFLESS LOVE

My friend, you know I was really quite pained the other day. You returned from overseas after a long time; we went and asked,’Did you often think of us?’ You kept a little smile on your lips and a little frown about your eyes as you answered, ‘Why wouldn’t I?’ The answer filled me with immediate dread; but I still persisted bravely and asked in a small voice, ‘How do you feel. seeing us after all this time?’ You answered in an amazed but irritated tone, all the while with that polite smile in place, ‘Why? Why should I dislike you?’ I did not dare to go any further. I could not ask any more of those questions. I had a felt little disappointed because you never wrote more than two or three letters to me from overseas. I had greatly hoped to be able to raise the topic, tempering it with laughter but genuine sadness, to jest a little but also to make  the pain I felt clear to you. But your manner, your polite, excessively sweet smile and the tone of your voice made that disappointment wither right away. I also changed the questions I was going to ask. I asked questions such as, ‘Is it true that the land you visited is very hot? Apparently the people there wear huge turbans and have restrictions on the use of tobacco? How much does a second class fare cost from here to there?’ I gained much knowledge from you through these questions and came home. When you heard that I was hurt by your behaviour you wrote, ‘Firstly I do not recall having behaved badly with you. Secondly, if I did ignore some of your questions and talk about other things, what is wrong with that? Why did you have to ask those questions?’ I have nothing to say to your first comment. Truly, you did not treat me badly. You answered all the questions I asked in a manner of speaking and you also smiled and chatted. You cannot be blamed. Yet you did not behave well with me; I will not be able to convince you or anyone else of that so I will not mention it. Secondly, why was it that I asked those questions? Well, you have a soul, why do you not think about why I might have done that. Did I ask you, ‘Did you think of us?’ or ‘How do you like us now?’, only because I suspected the strength of your affections or because I had not the tiniest doubt about your love. If I had imagined even in my dreams that you did not think of me or that you did not like me, would I have asked that question? I wanted so much to hear that you remembered me often while you were away. Not just that, so many other things would have been remembered as a result. I had wanted so much that you woul have said, ‘I saw a beautiful valley in a certain place; there was a waterfall there and when I saw the place I immediately thought, if only Bha_ had been here, he would have truly loved the place!’ One little question could have led to the possibility of so many answers. These were the things that were hidden in my mind when I had asked the questions.

I am not writing to you to express my sadness; nor is it my aim to manipulate you with my disappointment. I cannot make a show out of these feelings like some people do; I do not like going to the person against whom I have a grievance and create an uproar over my disappointment.

If I am disappointed that is all internal. My disappointment is such a private matter that no one has ever seen my tears of angst or heard my words of pain;  That is why I am telling you I am not here for recriminations. I have a few points to resolve with you and I am keen to do that.

The tone of your entire letter makes me think that those who love selflessly like you never hope for any love in return. Wherever love is expected in return for love, there is selfishness. Let me say something to you about this. We often use many words without understanding their meanings. The words become so ordinary, so jaded, that we hear them but we do not understand them with our minds, I think selfless love is one of those phrases too. When we hear it we understand nothing, when pressed for the meaning we end up with different meanings from different people. How do we use the word selfishness usually? Are feeding or bathing acts of selfishness and thus worth censure? Should abstaining from feeding or bathing be thus considered praiseworthy? If you think of the true meaning, feeding and bathing are both acts of selfishness. But we do not call them selfish acts in day to day speech. Every human is so uniform in their way of thinking that when they hear it said that ‘Feeding is good’, no one understands it to mean that one must feed all through the twenty four hours of the day. Similarly when we use the word selfishness, no one thinks that breathing is selfishness or going for some fresh air is selfishness.  Just as not everything born in mud is not a lotus and not every un-moving object is a mountain, not every kind of selfishness is not to described as selfish. Eating itself is not selfish, but the person who only eats at the exclusion of other activities or the one who eats in excess and does little for others; such a person is selfish. Even more selfish than this is the individual who snatches another’s food for himself. This is the only manner in which the word selfish is used. If this is true, then what is selfless love? If one thinks of its true meaning love is also a selfish act. When we like to see someone, hear their words, be near them and at the same time feel bad if we cannot see them, hear their words and be near them; when we are happy at their happiness and saddened by their sorrow, when all these feelings come together, it is love. Another ingredient of love is the other person should love me, which means that I should be pleasing in every way to them. And thus, all of these become imbued with selfishness. Does the act become unselfish as soon as one of the components is removed? But how is one of the many things to be blamed more than the others? In any case, nothing can be left out. Removing any one makes this less than true love. If you do not like seeing someone, nor like hearing their words, nor wish to be near them at all times – if it is still possible to love that person then it is also possible to love the person whose love we do not crave.  When one likes to see and be near someone, but forgets them if they do not see or hear them for a short period of absence and stop loving them, or stop loving the object of their affections simply because they do not love one back, it can be safely said that they are incapable of loving deeply.

বাংলাভাষা ও বাঙালি চরিত্র: ১

বাংলাভাষা ও বাঙালি চরিত্র : ১

অনেক সময় দেখা যায় সংস্কৃত শব্দ বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে এক প্রকার বিকৃত ভাব প্রকাশ করে। কেমন একরকম ইতর বর্বর আকার ধারণ করে। “ঘৃণা’ শব্দের মধ্যে একটা মানসিক ভাব আছে। Aversion, indignation, contempt প্রভৃতি ইংরাজি শব্দ বিভিন্ন স্থল অনুসারে “ঘৃণা’র প্রতিশব্দ স্বরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে। কিন্তু “ঘেন্না’ বললেই নাকের কাছে একটা দুর্গন্ধ, চোখের সামনে একটা বীভৎস দৃশ্য, গায়ের কাছাকাছি একটা মলিন অস্পৃশ্য বস্তু কল্পনায় উদিত হয়। সংস্কৃত “প্রীতি’ শব্দের মধ্যে একটা বিমল উদার মানসিক ভাব নিহিত আছে। কিন্তু বাংলা “পিরিতি’ শব্দের মধ্যে সেই বিশুদ্ধ ভাবটুকু নাই। বাংলায় “স্বামী’ “স্ত্রী’র সাধারণ প্রচলিত প্রতিশব্দ ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করিতে লজ্জা বোধ হয়। “ভর্তা’ এবং তাহার বাংলা রূপান্তর তুলনা করিয়া দেখিলেই এ কথা স্পষ্ট হইবে। আমার বোধ হয় সংস্কৃত ভাষায় “লজ্জা’ বলিলে যতটা ভাব প্রকাশ করে, বাংলায় “লজ্জা’ ততটা করে না। বাংলায় “লজ্জা’ এক প্রকার প্রথাগত বাহ্য লজ্জা, তাহা modesty নহে। তাহা হ্রী নহে। লজ্জার সহিত শ্রীর সহিত একটা যোগ আছে, বাংলা ভাষায় তাহা নাই। সৌন্দর্যের প্রতি স্বাভাবিক লক্ষ্য থাকিলে আচারে ব্যবহারে, ভাবভঙ্গিতে ভাষায় কণ্ঠস্বরে সাজসজ্জায় একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সংযম আসিয়া পড়ে। বাংলায় লজ্জা বলিতে যাহা বুঝায় তাহা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তাহাতে বরঞ্চ আচার-ব্যবহারের সামঞ্জস্য নষ্ট করে, একটা বাড়াবাড়ি আসিয়া সৌন্দর্যের ব্যাঘাত করে। তাহা শরীর-মনের সুশোভন সংযম নহে, তাহার অনেকটা কেবলমাত্র শারীরিক অভিভূতি।

গল্প আছে– বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন উলোয় শিব গড়িতে বাঁদর হইয়া দাঁড়ায়, তেমনি বাংলার মাটির বাঁদর গড়িবার দিকে একটু বিশেষ প্রবণতা আছে। লক্ষ্য শিব এবং পরিণাম বাঁদর ইহা অনেক স্থলেই দেখা যায়। উদার প্রেমের ধর্ম বৈষ্ণব ধর্ম বাংলাদেশে দেখিতে দেখিতে কেমন হইয়া দাঁড়াইল। একটা বৃহৎ ভাবকে জন্ম দিতে যেমন প্রবল মানসিক বীর্যের আবশ্যক, তাহাকে পোষণ করিয়া রাখিতেও সেইরূপ বীর্যের আবশ্যক। আলস্য এবং জড়তা যেখানে জাতীয় স্বভাব, সেখানে বৃহৎ ভাব দেখিতে দেখিতে বিকৃত হইয়া যায়। তাহাকে বুঝিবার, তাহাকে রক্ষা করিবার এবং তাহার মধ্যে প্রাণসঞ্চার করিয়া দিবার উদ্যম নাই।

আমাদের দেশে সকল জিনিসই যেন এক প্রকার slang হইয়া আসে। আমার তাই এক-একবার ভয় হয় পাছে ইংরাজদের বড়ো ভাব বড়ো কথা আমাদের দেশে ক্রমে সেইরূপ অনার্য ভাব ধারণ করে। দেখিয়াছি বাংলায় অনেকগুলি গানের সুর কেমন দেখিতে দেখিতে ইতর হইয়া যায়। আমার বোধ হয় সভ্যদেশে যে যে সুর সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচলিত, তাহার মধ্যে একটা গভীরতা আছে, তাহা তাহাদের national air, তাহাতে তাহাদের জাতীয় আবেগ পরিপূর্ণভাবে ব্যক্ত হয়। যথা Home Sweet Home, Auld lang Syne–, বাংলাদেশে সেরূপ সুর কোথায়? এখানকার সাধারণ-প্রচলিত সুরের মধ্যে গাম্ভীর্য নাই, স্থায়িত্ব নাই, ব্যাপকতা নাই। সেইজন্য তাহার কোনোটাকেই national air বলা যায় না। হিন্দুস্থানীতে যে-সকল খাম্বাজ ঝিঁঝিট কাফি প্রভৃতি রাগিণীতে শোভন ভদ্রভাব লক্ষিত হয়, বাংলায় সেই রাগিণীই কেমন কুৎসিত আকার ধারণ করিয়া “বড় লজ্জা করে পাড়ায় যেতে’ “কেন বল সখি বিধুমুখী’ “একে অবলা সরলা’ প্রভৃতি গানে পরিণত হইয়াছে।

কেবল তাহাই নহে, আমাদের এক-একবার মনে হয় হিন্দুস্থানী এবং বাংলার উচ্চারণের মধ্যে এই ভদ্র এবং বর্বর ভাবের প্রভেদ লক্ষিত হয়। হিন্দুস্থানী গান বাংলায় ভাঙিতে গেলেই তাহা ধরা পড়ে। সুর তাল অবিকল রক্ষিত হইয়াও অনেক সময় বাংলা গান কেমন “রোথো’ রকম শুনিতে হয়। হিন্দুস্থানীর polite “আ’ উচ্চারণ বাংলায় vulgar “অ’ উচ্চারণে পরিণত হইয়া এই ভাবান্তর সংঘটন করে। “আ’ উচ্চারণের মধ্যে একটি বেশ নির্লিপ্ত ভদ্র suggestive ভাব আছে, আর “অ’ উচ্চারণ নিতান্ত গা-ঘেঁষা সংকীর্ণ এবং দরিদ্র। কাশীর সংস্কৃত উচ্চারণ শুনিলে এই প্রভেদ সহজেই উপলব্ধি হয়।

উপরের প্যারাগ্রাফে এক স্থলে commonplace শব্দ বাংলায় ব্যক্ত করিতে গিয়া “রোথো’ শব্দ ব্যবহার করিয়াছি। কিন্তু উক্ত শব্দ ব্যবহার করিতে কেমন কুণ্ঠিত বোধ করিতেছিলাম। সকল ভাষাতেই গ্রাম্য ইতর শব্দ আছে। কিন্তু দেখিয়াছি বাংলায় বিশেষ ভাবপ্রকাশক শব্দমাত্রই গ্রাম্য। তাহাতে ভাব ছবির মতো ব্যক্ত করে বটে কিন্তু সেইসঙ্গে আরো একটা কী করে যাহা সংকোচজনক। জলভরন শব্দ বাংলায় ব্যক্ত করিতে হইলে হয় “মুচ্‌কে হাসি’ নয় “ঈষদ্ধাস্য’ বলিতে হইবে। কিন্তু “মুচ্‌কে হাসি’ সাধারণত মনের মধ্যে যে ছবি আনয়ন করে তাহা বিশুদ্ধ smile নহে, ঈষদ্ধাস্য কোনো ছবি আনয়ন করে কি না সন্দেহ। Peep শব্দকে বাংলায় “উঁকিমারা’ বলিতে হয়। Creep শব্দকে “গুঁড়িমারা’ বলিতে হয়। কিন্তু “উঁকিমারা’ “গুঁড়িমারা’ শব্দ ভাবপ্রকাশক হইলেও সর্বত্র ব্যবহারযোগ্য নহে। কারণ উক্ত শব্দগুলিতে আমাদের মনে এমন-সকল ছবি আনয়ন করে যাহার সহিত কোনো মহৎ বর্ণনার যোগসাধন করিতে পারা যায় না।

হিন্দুস্থানী বা মুসলমানদের মধ্যে একটা আদব-কায়দা আছে। একজন হিন্দুস্থানী বা মুসলমান ভৃত্য দিনের মধ্যে প্রভুর সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হইবা মাত্রই যে সেলাম অথবা নমস্কার করে তাহার কারণ এমন নহে যে, তাহাদের মনে বাঙালি ভৃত্যের অপেক্ষা অধিক দাস্যভাব আছে, কিন্তু তাহার কারণ এই যে, সভ্যসমাজের সহস্রবিধ সম্বন্ধের ইতিকর্তব্যতা বিষয়ে তাহারা নিরলস ও সতর্ক। প্রভুর নিকটে তাহারা পরিচ্ছন্ন পরিপাটি থাকিবে, মাথায় পাগ্‌ড়ি পরিবে, বিনীত ভাব রক্ষা করিবে। স্বাভাবিক ভাবে থাকা অপেক্ষা ইহাতে অনেক আয়াস ও শিক্ষা আবশ্যক। আমরা অনেক সময়ে যাহাকে স্বাধীন ভাব মনে করি তাহা অশিক্ষিত অসভ্য ভাব। অনেক সময়ে আমাদের এই অশিক্ষিত ও বর্বর ভাব দেখিয়াই ইংরাজেরা আমাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়, অথচ আমরা মনে মনে গর্ব করি যেন প্রভুকে যথাযোগ্য সম্মান না দেখাইয়া আমরা ভারি একটা কেল্লা ফতে করিয়া আসিলাম। এই অশিক্ষা ও অনাচারবশত আমাদের দৈনিক ভাষা ও কাজের মধ্যে একটি সুমার্জিত সুষমা একটি শ্রী লক্ষিত হয় না। আমরা কেমন যেন “আট-পৌরে’ “গায়েপড়া’ “ফেলাছড়া’ “ঢিলেঢালা’ “নড়বোড়ে’ রকমের জাত, পৃথিবীর কাজেও লাগি না, পৃথিবীর শোভাও সাধন করি না।

01SM_Zerin_1_Oh_Ko_1038288g

The Bengali language and Bengali character: 1
It is often seen that Sanskrit words that are transferred into Bengali express a warped sense of the original meaning; they take on a low, uncivilized form. There is a sense of the mind being affected in the word ‘Ghrina’. It can be used as a synonym for the English words aversion, indignation and contempt. But say the word ‘Ghenna’ and immediately one imagines a malodor invading the nose, an ugly scene unfolding before the eyes and a dirty object being placed near one’s body. There is a pure, generous sense of giving in the Sanskrit word ‘Preeti’, which is sadly lacking in the Bengali ‘Piriti’. I feel ashamed to even use the colloquial Bengali words for ‘Swami’ and ‘Stree’. This will become clear if one compares the Sanskrit ‘Bhorta’ to its Bengali form. I think that the amount of feeling conveyed through the Sanskrit word ‘Lojja’ is greater than that expressed by the Bengali ‘Lojja’. ‘Lojja’ or shame in Bengali is merely a mechanical response, rather than being synonymous with modesty. There is no ‘Hri’ or bashfulness. There is a link between ‘Lojja’ and ‘Shree’ which is missing in Bengali. When there is an instinctive eye for beauty, it is accompanied by a fitting sense of balance in behavior, customs, manner, language, voice and clothing. In Bengali, ‘Lojja’ is something completely separate, it tends to destroy the balance between custom and its application and is overdone to the point of ruining beauty. It is not attained by a gentle unity of body and soul but is more of a purely physical expression.

It is rumoured that Vidyasagar once said that if a hoolock gibbon was to make an idol of Shiva, it would end up fashioning a monkey; the soil of Bengal has a tendency to lend itself to the making of monkeys. It is frequently seen that the aim was to create a Shiva and the result is the creation of a simian. One only has to see what happened to the broadminded religion of love known as Vaishnavism in Bengal over time. Just as there is a need of tremendous mental strength to give birth to a school of great thought, the same strength is essential for its survival. Where sloth and lethargy are part of the culture, great thought soon becomes stunted. There is no effort devoted to its understanding, its maintenance and infusing life into it.

Everything is reduced to a form of slang in our part of the world. I sometimes fear that the great philosophy and teachings of the British will be reduced gradually to a vernacular form in this country. I have seen how many songs become baser in Bengal. I feel that the tunes that are established in civilized countries have a depth to them that allow these to become the national air and express their nationalistic spirit; such as Home Sweet Home and Auld Lang Syne. What do we have in Bengal that has the same ring? The common tunes popular here have no depth or permanence. That is why none of them can be described as national airs. The beauty of the Hindusthani ragas such as Khamaj, Jhinjhit and Kafi is reduced to simple rough tunes such as ‘I am shamed much to go there’ and ‘Tell me why my moonfaced maiden’.

It is not just that; sometimes we feel this division into polite and crude in the difference between Hindusthani and Bengali pronunciation. It is apparent as soon as one tries to break a Hindusthani song into Bengali. Even after retaining the tune and the beat the song sounds very ‘Rotho’. The polite ‘Aa’ of Hindusthani becomes the vulgar ‘Aw’ of Bengali and forces the transformation. The sound ‘Aa’ has a suggestion of detachment while ‘Aw’ merely sounds impoverished and narrow minded. Listening to the Sanskrit spoken in Kashi will make this understanding clear.
I have used the word ‘Rotho’ in the paragraph above in an attempt to say ‘commonplace’. But I felt reluctance to use the word. There are rustic common sounds in all languages. But I have noticed that in Bengali, words that express certain feelings are nothing but rustic. They express the meaning much as a picture does but also convey a meaning that is not quite palatable. One has to say ‘Muchke hashi’ or ‘sneaky smile’ to convey the meaning of ‘Ishodhashyo’ or slight smile in Sanskrit. But the phrase ‘sneaky smile’ awakens a mental picture that is not of a pure smile and certainly not a slight smile. The word ‘peep’ is ‘unkimara’ in Bengali; the word ‘creep’ is ‘gnurimara’. But these two Bengali words are not worthy of using in all situations even though they paint a vivid picture of peeping and creeping as they also seem to imbue these pictures with a vulgar touch that are at odds with their use in any polite accounts.

The Hindi speakers and the Muslims have certain etiquette of behaviour. The fact that a serving man of either persuasion greets his employer with a ‘Namaste’ or a ‘Salaam’ when seeing him for the first time in a day is not because he has more servility in his heart than a Bengali servant does, but because they are conscious and tireless in maintaining the intricacies of each relationship in polite society. They will be clean and well presented in the presence of their employer, they will wear proper dress, and they will be courteous. What we often think of as a spirit of freedom is in reality an expression of poor education and crudity. Often the British are dismissive of us when they see this uneducated and uncivilized side to us but we are secretly proud of having done a great deed by not according our masters the honour they deserve. This has resulted in a lack of polish and beauty in our day to day language and actions. We seem to be a common people who are hangers on, slack, unstable and dispensable; we serve no purpose on this earth nor do we add to its charms.

Image: http://www.thehindu.com/features/magazine/oh-calcutta/article3261359.ece

Swami(husband): Sowami
Stree(wife): Istiri
Bhorta(he who looks after, husband): Bhaataar

Bangla Bhasha/Bengali Language

Bengali, the language.

When I think about the mystery that is language I feel astonished. The same Bengali language that helps to shed light today in the thousand corners of the minds of innumerable people and makes it easy for us to interact with and understand each other; if we were to follow its light into the past, where would we end up? Who were those wanderers, who struggled against all odds on the path of the unknown, the ones who first set out from a nameless home on a journey both long and filled with obstacles carrying the faint flame of the language that we now speak. That ancient flame has travelled, illuminating the way, from one age to another to arrive at the tip of my pen today carrying a message of kinship. Those earliest of travelers took varying routes across the branches created by sweeping changes in history and this has blurred the similarities between those white skinned blond haired strong forest dwellers and this brown skinned short lived city dwelling subject of England with the dust of the ages. The only similarity that remains is the ancient thread of an unbroken language. Occasionally there have been new threads added to this language, sometimes time has repaired stresses in the chain and at other times the touch of non-Aryan hands has removed it further from its Caucasian roots, but it has remained uninterrupted. This language still points its finger back at the distant west to a birthing place whose exact location is not known to anyone.

The indigenous people of ancient India used to speak in a language that was divided into two major strands – Shourosheni and Magdhi. Shourosheni gave rise to the Hindi spoken in the Western parts of the country while Magdhi was the root of the Hindi spoken in eastern India. The other languages were Odri or Oriya and Gaudi or Bangla. There was no mention of Assamese. But in the latter part of ancient history, there are far more examples of Assamese prose than there are of Bengali. The language used in them is almost indistinguishable from Bengali.

Magdhi is the older of the two. According to Hornley, Magdhi was the only language once in use. The language spread from the west to the east gradually. The second wave of language Shourosheni came into India and took over the west. Hornley was of the opinion that there were two influxes of Aryans into India. Even though their languages were similar in origin, there were some differences.

Just as a river descends as many streams into many countries and reaches the sea as a number of branches, the ancient Magdhi travelled through the tongues of the Aryans and after many centuries today its rhythm moves the heart of Bengal and enriches its soul. Its flourish is not ever. It has spread wide and mingled its deep currents beyond the physical boundaries of the land to where it is now standing within the embrace of the world. When I think of how the ancient and yet fresh flow of language ties those times of yore and these times and unites the unknown souls of many lands with the newly awakened soul of Bengal, I am amazed. We use language so easily and yet it is not easy to know its inner secrets. The singular rules that connect language down the ages are both unchanging and also liable to be modified at each step of the way.
.
Rabindranath Tagore
1938, Santiniketan

আদর্শ প্রেম/Adarsh Prem/Ideal Love

আদর্শ প্রেম

সংসারের-কাজ-চালানো, মন্ত্রবদ্ধ, ঘরকন্নার ভালবাসা যেমনই হউক, আমি প্রকৃত আদর্শ ভালবাসার কথা বলিতেছি। যে-হউক এক জনের সহিত ঘেঁষাঘেষি করিয়া থাকা, এক ব্যক্তির অতিরিক্ত একটি অঙ্গের ন্যায় হইয়া থাকা, তাহার পাঁচটা অঙ্গুলির মধ্যে ষষ্ঠ অঙ্গুলির ন্যায় লগ্ন হইয়া থাকাকেই ভালবাসা বলে না। দুইটা আঠাবিশিষ্ট পদার্থকে একত্রে রাখিলে যে জুড়িয়া যায়, সেই জুড়িয়া যাওয়াকেই ভালবাসা বলে। না। অনেক সময়ে আমরা নেশাকে ভালবাসা বলি। রাম ও শ্যাম উভয়ে উভয়ের কাছে হয়ত “মৌতাতের” স্বরূপ হইয়াছে,রাম ও শ্যাম উভয়কে উভয়ের অভ্যাস হইয়া গিয়াছে, রামকে নহিলে শ্যামের বা শ্যামকে নহিলে রামের অভ্যাস-ব্যাঘাতের দরুন কষ্ট বোধ হয়। ইহাকেও ভালবাসা বলে না। প্রণয়ের পাত্র নীচই হউক, নিষ্ঠুরই হউক, আর কুচরিত্র হউক, তাহাকে আঁকড়িয়া ধরিয়া থাকাকে অনেকে প্রণয়ের পরাকাষ্ঠা মনে করিয়া থাকে। কিন্তু,ইহা বিবেচনা করা উচিত, নিতান্ত অপদার্থ দুর্ব্বলহৃদয় নহিলে কেহ নীচের কাছে নীচ হইতে পারে না। এমন অনেক ক্রীতদাসের কথা শুনা গিয়াছে যাহারা নিষ্ঠুর নীচাশয় প্রভুর প্রতিও অন্ধভাবে আসক্ত, কুকুরেরাও সেইরূপ। এরূপ কুকুরের মত, ক্রীতদাসের মত ভালবাসাকে ভালবাসা বলিতে কোন মতেই মন উঠে না। প্রকৃত ভালবাসা দাস নহে, সে ভক্ত; সে ভিক্ষুক নহে, সে ক্রেতা। আদর্শ প্রণয়ী প্রকৃত সৌন্দর্য্যকে ভালবাসেন, মহত্ত্বকে ভালবাসেন; তাঁহার হৃদয়ের মধ্যে যে আদর্শ ভাব জাগিতেছে তাহারই প্রতিমাকে ভালবাসেন। প্রণয়ের পাত্র যেমনই হউক, অন্ধভাবে তাহার চরণ আশ্রয় করিয়া থাকা তাঁহার কর্ম্ম নহে। তাহাকে ত ভালবাসা বলে না, তাহাকে কর্দ্দমবৃত্তি বলে। কর্দ্দম একবার পা জড়াইলে আর ছাড়িতে চায় না, তা সে যাহারই পা হউক না কেন, দেবতারই হউক আর নরাধমেরই হউক! প্রকৃত ভালবাসা যোগ্যপাত্র দেখিলেই আপনাকে তাহার চরণধূলি করিয়া ফেলে। এই নিমিত্ত ধূলিবৃত্তি করাকেই অনেকে ভালবাসা বলিয়া ভুল করেন। তাঁহারা জানেন না যে, দাসের সহিত ভক্তের বাহ্য আচরণে অনেক সাদৃশ্য আছে বটে, কিন্তু একটি প্রধান প্রভেদ আছে– ভক্তের দাসত্বে স্বাধীনতা আছে, ভক্তের স্বাধীন দাসত্ব। তেমনি প্রকৃত প্রণয় স্বাধীন প্রণয়। সে দাসত্ব করে, কেননা দাসত্ববিশেষের মহত্ত্ব সে বুঝিয়াছে। যেখানে দাসত্ব করিয়া গৌরব আছে, সেইখানেই সে দাস, যেখানে হীনতা স্বীকার করাই মর্যাদা, সেইখানেই সে হীন। ভালবাসিবার জন্যই ভালবাসা নহে, ভাল ভালবাসিবার জন্যই ভালবাসা। তা যদি না হয়, যদি ভালবাসা হীনের কাছে হীন হইতে শিক্ষা দেয়, যদি অসৌন্দর্যের কাছে রুচিকে বদ্ধ করিয়া রাখে, তবে ভালবাসা নিপাত যাক।
p-60

IDEAL LOVE

I am talking about the ideal of true love and not about the merely adequate, ritualistic, domesticated love that is often seen within the confines of family life. Just existing in close proximity with another person as an extra appendage to them, rather like a sixth digit, is not all that love is meant to be. When two adhesive substances are pressed together to become as one, that is not love either. We often hear of intoxication being described as love. Ram and Shyam may have become like an ‘addiction’ to each other, a habit formed by both and the absence of one may even cause pain to the other through the disruption of routine. But this is not love. Many people think that to cling to the object of their affections, no matter how evil, cruel and unscrupulous they are, is the height of love. But it must be understood that one cannot submit to evil unless they are themselves plainly ignorant and of a weak nature. One has heard stories of slaves who blindly love their masters despite every kind of cruelty; a trait also seen in dogs. I cannot bring myself to honour such dog-like, unshakable loyalty, such slavish attachment as love. True love is no slave, it is devotion; it does not beg, it gives in exchange and in full measure. The ideal lover loves true beauty and greatness; he loves the embodiment of the ideals within his own heart. Whatever the object of such love, it is not the lover’s duty to blindly seek shelter at their feet. That is not love; that is rolling in mud. Once mud sticks to one’s feet, it is hard to get it off, no matter whether those feet belong to the purest of beings or the lowest of the low. True love makes itself companion to the ideal subject. This is why many think that prostrations in the dust are a sign of love. They do not know that although there is much that is similar between a slave and a devotee, there is one primary difference that distinguishes between the two; the devotee is free within his adoration, his devotion is unshackled. Similarly, true love is that which is accompanied by freedom. There is enslavement but only because the greatness of certain variations of that state is appreciated. True love submits where being enslaved brings glory and bows where there is merit in admitting fault. Love exists, not for the sake of merely loving, but for the sake of loving well. If that cannot be achieved, if love must learn to be oppressed by the mean and must suffer the death of good taste in the presence of ugliness, then I say, let love be gone.

Image: http://kireetjoshiarchives.com/teachers_training/good_teacher/brahmacharins_in_search