Tag Archive | Mahendra and Asha

চোখের বালি ২১/Chokher Bali 21

২১

ইতিমধ্যে আরো এক চিঠি আসিয়া উপস্থিত হইল।–

“তুমি আমার চিঠির উত্তর দিলে না? ভালোই করিয়াছ। ঠিক কথা তো লেখা যায় না; তোমার যা জবাব, সে আমি মনে মনে বুঝিয়া লইলাম। ভক্ত যখন তাহার দেবতাকে ডাকে, তিনি কি মুখের কথায় তাহার উত্তর দেন। দুখিনীর বিল্বপত্রখানি চরণতলে বোধ করি স্থান পাইয়াছে!

“কিন্তু ভক্তের পূজা লইতে গিয়া শিবের যদি তপোভঙ্গ হয়, তবে তাহাতে রাগ করিয়ো না, হৃদয়দেব! তুমি বর দাও, চোখ মেলিয়া চাও বা না চাও, জানিতে পার বা না পার, পূজা না দিয়া ভক্তের আর গতি নাই। তাই আজিও এই দু-ছত্র চিঠি লিখিলাম– হে আমার পাষাণ-ঠাকুর, তুমি অবিচলিত হইয়া থাকো।’–

মহেন্দ্র আবার চিঠির উত্তর লিখিতে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু আশাকে লিখিতে গিয়া বিনোদিনীর উত্তর কলমের মুখে আপনি আসিয়া পড়ে। ঢাকিয়া লুকাইয়া কৌশল করিয়া লিখিতে পারে না। অনেকগুলি ছিঁড়িয়া রাত্রের অনেক প্রহর কাটাইয়া একটা যদি বা লিখিল, সেটা লেফাফায় পুরিয়া উপরে আশার নাম লিখিবার সময় হঠাৎ তাহার পিঠে যেন কাহার চাবুক পড়িল– কে যেন বলিল,”পাষণ্ড, বিশ্বস্ত বালিকার প্রতি এমনি করিয়া প্রতারণা?” চিঠি মহেন্দ্র সহস্র টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল, এবং বাকি রাতটা টেবিলের উপর দুই হাতের মধ্যে মুখ ঢাকিয়া নিজেকে যেন নিজের দৃষ্টি হইতে লুকাইবার চেষ্টা করিল।

তৃতীয় পত্র– “যে একেবারেই অভিমান করিতে জানে না, সে কি ভালোবাসে। নিজের ভালোবাসাকে যদি অনাদর-অপমান হইতে বাঁচাইয়া রাখিতে না পারি, তবে সে ভালোবাসা তোমাকে দিব কেমন করিয়া।

“তোমার মন হয়তো ঠিক বুঝি নাই, তাই এত সাহস করিয়াছি। তাই যখন ত্যাগ করিয়া গেলে, তখনো নিজে অগ্রসর হইয়া চিঠি লিখিয়াছি; যখন চুপ করিয়া ছিলে, তখনো মনের কথা বলিয়া ফেলিয়াছি। কিন্তু তোমাকে যদি ভুল করিয়া থাকি, সে কি আমারই দোষ। একবার শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সব কথা মনে করিয়া দেখো দেখি, যাহা বুঝিয়াছিলাম, সে কি তুমিই বোঝাও নাই।

“সে যাই হোক, ভুল হোক সত্য হোক, যাহা লিখিয়াছি সে আর মুছিবে না, যাহা দিয়াছি সে আর ফিরাইতে পারিব না, এই আক্ষেপ। ছি ছি, এমন লজ্জাও নারীর ভাগ্যে ঘটে। কিন্তু তাই বলিয়া মনে করিয়ো না, ভালো যে বাসে সে নিজের ভালোবাসাকে বরাবর অপদস্থ করিতে পারে। যদি আমার চিঠি না চাও তো থাক্, যদি উত্তর না লিখিবে তবে এই পর্যন্ত–‘

ইহার পর মহেন্দ্র আর থাকিতে পারিল না। মনে করিল, “অত্যন্ত রাগ করিয়াই ঘরে ফিরিয়া যাইতেছি। বিনোদিনী মনে করে, তাহাকে ভুলিবার জন্যই ঘর ছাড়িয়া পালাইয়াছি!’ বিনোদিনীর সেই স্পর্ধাকে হাতে হাতে অপ্রমাণ করিবার জন্যই তখনি মহেন্দ্র ঘরে ফিরিবার সংকল্প করিল।

এমন সময় বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। বিহারীকে দেখিবামাত্র মহেন্দ্রের ভিতরের পুলক যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিল। ইতিপূর্বে নানা সন্দেহে ভিতরে ভিতরে বিহারীর প্রতি তাহার ঈর্ষা জন্মিতেছিল, উভয়ের বন্ধুত্ব ক্লিষ্ট হইয়া উঠিতেছিল। পত্রপাঠের পর আজ সমস্ত ঈর্ষাভার বিসর্জন দিয়া বিহারীকে সে অতিরিক্ত আবেগের সহিত আহ্বান করিয়া লইল। চৌকি হইতে উঠিয়া, বিহারীর পিঠে চাপড় মারিয়া, তাহার হাত ধরিয়া, তাহাকে একটা কেদারার উপরে টানিয়া বসাইয়া দিল।

কিন্তু বিহারীর মুখ আজ বিমর্ষ। মহেন্দ্র ভাবিল, বেচারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে বিনোদিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়াছে এবং সেখান হইতে ধাক্কা খাইয়া আসিয়াছে। মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারী, এর মধ্যে আমাদের ওখানে গিয়াছিলে?”

বিহারী গম্ভীরমুখে কহিল, “এখনি সেখান হইতে আসিতেছি।”

মহেন্দ্র বিহারীর বেদনা কল্পনা করিয়া মনে মনে একটু কৌতুকবোধ করিল। মনে মনে কহিল, “হতভাগ্য বিহারী। স্ত্রীলোকের ভালোবাসা হইতে বেচারা একেবারে বঞ্চিত।’ বলিয়া নিজের বুকের পকেটের কাছটায় এক বার হাত দিয়া চাপ দিল– ভিতর হইতে তিনটে চিঠি খড়খড় করিয়া উঠিল।

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “সবাইকে কেমন দেখিলে?”

বিহারী তাহার উত্তর না করিয়া কহিল, “বাড়ি ছাড়িয়া তুমি যে এখানে?”

মহেন্দ্র কহিল, “আজকাল প্রায় নাইট-ডিউটি পড়ে– বাড়িতে অসুবিধা হয়।”

বিহারী কহিল, “এর আগেও তো নাইট-ডিউটি পড়িয়াছে, কিন্তু তোমাকে তো বাড়ি ছাড়িতে দেখি নাই।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “মনে কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে না কি।”

বিহারী কহিল, “না, ঠাট্টা নয়, এখনি বাড়ি চলো।”

মহেন্দ্র বাড়ি ফিরিবার জন্য উদ্যত হইয়াই ছিল; বিহারীর অনুরোধ শুনিয়া সে হঠাৎ নিজেকে ভুলাইল, যেন বাড়ি যাইবার জন্য তাহার কিছুমাত্র আগ্রহ নাই। কহিল, “সে কি হয়, বিহারী। তা হলে আমার বৎসরটাই নষ্ট হইবে।”

বিহারী কহিল, “দেখো মহিনদা, তোমাকে আমি এতটুকু বয়স হইতে দেখিতেছি, আমাকে ভুলাইবার চেষ্টা করিয়ো না। তুমি অন্যায় করিতেছ।”

মহেন্দ্র। কার প’রে অন্যায় করিতেছি জজসাহেব!

বিহারী রাগ করিয়া বলিল, “তুমি যে চিরকাল হৃদয়ের বড়াই করিয়া আসিয়াছ, তোমার হৃদয় গেল কোথায় মহিনদা।”

মহেন্দ্র। সম্প্রতি কালেজের হাসপাতালে।

বিহারী। থামো মহিনদা, থামো। তুমি এখানে আমার সঙ্গে হাসিয়া ঠাট্টা করিয়া কথা কহিতেছ, সেখানে আশা তোমার বাহিরের ঘরে, অন্দরের ঘরে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বেড়াইতেছে।

আশার কান্নার কথা শুনিয়া হঠাৎ মহেন্দ্রের মন একটা প্রতিঘাত পাইল। জগতে আর যে কাহারো সুখদুঃখ আছে, সে কথা তাহার নূতন নেশার কাছে স্থান পায় নাই। হঠাৎ চমক লাগিল, জিজ্ঞাসা করিল, “আশা কাঁদিতেছে কী জন্য।”

বিহারী বিরক্ত হইয়া কহিল, “সে কথা তুমি জান না, আমি জানি?”

মহেন্দ্র। তোমার মহিনদা সর্বজ্ঞ নয় বলিয়া যদি রাগ করিতেই হয় তো মহিনদার সৃষ্টিকর্তার উপর রাগ করো।

তখন বিহারী যাহা দেখিয়াছিল, তাহা আগাগোড়া বলিল। বলিতে বলিতে বিনোদিনীর বক্ষোলগ্ন আশার সেই অশ্রুসিক্ত মুখখানি মনে পড়িয়া বিহারীর প্রায় কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল।

বিহারীর এই প্রবল আবেগ দেখিয়া মহেন্দ্র আশ্চর্য হইয়া গেল। মহেন্দ্র জানিত বিহারীর হৃদয়ের বালাই নাই — এ উপসর্গ কবে জুটিল। যেদিন কুমারী আশাকে দেখিতে গিয়াছিল, সেই দিন হইতে নাকি। বেচারা বিহারী। মহেন্দ্র মনে মনে তাহাকে বেচারা বলিল বটে, কিন্তু দুঃখবোধ না করিয়া বরঞ্চ একটু আমোদ পাইল। আশার মনটি একান্তভাবে যে কোন্ দিকে, তাহা মহেন্দ্র নিশ্চয় জানিত। “অন্য লোকের কাছে যাহারা বাঞ্ছার ধন, কিন্তু আয়ত্তের অতীত, আমার কাছে তাহারা চিরদিনের জন্য আপনি ধরা দিয়াছে,’ ইহাতে মহেন্দ্র বক্ষের মধ্যে একটা গর্বের স্ফীতি অনুভব করিল।

মহেন্দ্র বিহারীকে কহিল, “আচ্ছা চলো, যাওয়া যাক। তবে একটা গাড়ি ডাকো।”

img_9613_1_1

21

In the meantime another letter arrived.

This said -‘You did not answer my letter. You have done the right thing for there are some things that cannot be expressed in writing; I know what your answer is already. When the devotee calls upon God, does God have to speak his answer? I know that my supplication has found its place at your feet!’

‘But if Shiva’s meditation should be disturbed by the devotion of a supplicant do not be angry with me, ruler of my heart! Give me something, whether you want to open your eyes to me or not, whether you wish to know my heart or not, I cannot live without offering myself to you. That is why I am writing to you again – though you may remain unmoved, my stony hearted lover.’

Mahendra started to write an answer once again. But as he wrote to Asha, answers that were really meant for Binodini seemed to pour out of his pen. He did not know how to write secret coded messages. After tearing up many sheets of paper over many hours he finally completed a letter. Just as he wrote Asha’s name on the envelope, he felt a sudden twinge of conscience like a whip across his back; an inner voice that seemed to say, ‘How could you betray that faithful one like this!’ He tore the letter up into many pieces and spent the rest of the night with his face shielded in his arms on his desk as if he was trying to hide from his very own eyes.

The third letter arrived; ‘Does the one who does not know how to remonstrate know how to love? If I cannot save my love from neglect, how will I offer it to you?’

‘Perhaps I did not understand your motives when you left and this gave me the courage to write such letters to you. Perhaps that is why even after you abandoned me I still picked up the pen to write the first letter; when you chose silence in response, I still told you of what was in my heart. But if I have misunderstood you, is it my fault alone? If you think of all that has passed, did you not give me the licence to think thus of you?’

‘Nevertheless I regret that whatever I have done, whether right or wrong, and all that I have already written is not to be erased. Nor can I take back what I have already given. For shame that this should happen to a woman! But do not feel that I am going to offer my love again and again so that it may be spurned. If you do not want me to write to you or even reply to me, this is where it ends..’

Mahendra could not stay away any more. He convinced himself that he was returning under duress and in a state of great anger. If Binodini had the audacity to think that he had left home to avoid her, Mahendra would immediately go back to prove her wrong!

Bihari arrived. Mahendra felt even more elated when he saw him. Lately he had been jealous of Bihari for various reasons and their friendship had grown strained. After reading the letter today, he cast aside all his former suspicions and envy and welcomed Bihari with some excessive feeling. He left his seat, thumped Bihari on the back, shook his hand and made him sit down on a chair.

But Bihari was in a sombre mood. Mahendra thought he might have been rejected by Binodini and asked, ‘Bihari, have you been to our house lately?’

Bihari answered quietly, ‘I have just been there.’

Mahendra felt a sense of amusement at the possible reason behind Bihari’s unhappiness. He said to himself, ‘Poor Bihari! He is deprived of a woman’s love.’ He patted his own pocket to hear the comforting rustle of the three letters within.

Mahendra asked, ‘How did you find everyone there?’

Bihari did not answer his question and said instead, ‘Why are you living here instead of at home?’

Mahendra answered, ‘I frequently have to work at night – it is not convenient to do that from home.’

Bihari retorted, ‘You have had night shifts before, but I have never seen you live in lodgings previously.’

Mahendra smiled and said, ‘Why, are you suspecting me of something else?’

Bihari answered, ‘No, I am not joking, you need to go home right away.’

Mahendra had been prepared to do so; but when he heard the plea in Bihari’s voice he convinced himself otherwise and felt that he did not want to go home at all. He said, ‘How is that possible, Bihari! I will lose a whole year then!’

Bihari said, ‘Look Mahendra, I have known since you were a little child, do not try to pull the wool over my eyes. You are doing something wrong.’

Mahendra: Whom am I wronging, dear Judge?

Bihari said with some annoyance, ‘You have always boasted about your kind heart, where did that kindhearted spirit go?’

Mahendra: Most recently, to the hospital.

Bihari: Stop, Mahendra! You sit here cracking jokes with me while at home Asha wanders through the house crying and unhappy.

Mahendra felt a sudden jolt when he heard of Asha’s tears. Full of his new obsession with Binodini, he had been unaware of the existence of anyone else’s feelings in the world. He was startled into asking. ‘Why is she crying?’

Bihari said with some annoyance, ‘If you do not know that, why am I supposed to?

Mahendra: If you have to be angry with me for not knowing everything, do direct your anger towards my creator.’

Then Bihari told him about all that he had seen. His voice almost broke as he recalled Asha’s tear streaked face as he had seen her, in Binodini’s embrace.

Mahendra was amazed at this strong emotional reaction on Bihari’s part. He had known Bihari to be insensitive all along – and wondered when this change had occurred. Was it the day they had gone to see Asha for the first time? Poor Bihari, wretched Bihari. Mahendra might have thought of him as wretched but in truth he felt more happiness than pity. He knew where Asha’s affections were entirely directed. Mahendra felt a sense of pride in knowing that although she was desired by another, she was forever his, and would never to be anyone else’s.

He said to Bihari, ‘Fine, then let us get a carriage and go’.

Advertisements

চোখের বালি ২০/ Chokher Bali 20

২০

অনতিকাল পরেই মহেন্দ্র তাহার ছাত্রাবাসে চেনা হাতের অক্ষরে একখানি চিঠি পাইল। দিনের বেলা গোলমালের মধ্যে খুলিল না– বুকের কাছে পকেটের মধ্যে পুরিয়া রাখিল। কালেজে লেকচার শুনিতে শুনিতে, হাসপাতাল ঘুরিতে ঘুরিতে, হঠাৎ এক-একবার মনে হইতে লাগিল, ভালোবাসার একটা পাখি তাহার বুকের নীড়ে বাসা করিয়া ঘুমাইয়া আছে। তাহাকে জাগাইয়া তুলিলেই তাহার সমস্ত কোমল কূজন কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিবে।

সন্ধ্যায় এক সময় মহেন্দ্র নির্জন ঘরে ল্যাম্পের আলোকে চৌকিতে বেশ করিয়া হেলান দিয়া আরাম করিয়া বসিল। পকেট হইতে তাহার দেহতাপতপ্ত চিঠিখানি বাহির করিয়া লইল। অনেকক্ষণ চিঠি না খুলিয়া লেফাফার উপরকার শিরোনামা নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিল। মহেন্দ্র জানিত, চিঠির মধ্যে বেশি কিছু কথা নাই। আশা নিজের মনের ভাব ঠিকমতো ব্যক্ত করিয়া লিখিতে পারিবে, এমন সম্ভাবনা ছিল না। কেবল তাহার কাঁচা অক্ষরে বাঁকা লাইনে তাহার মনের কোমল কথাগুলি কল্পনা করিয়া লইতে হইবে। আশার কাঁচা হাতে বহুযত্নে লেখা নিজের নামটি পড়িয়া মহেন্দ্র নিজের নামের সঙ্গে যেন একটা রাগিনী শুনিতে পাইল– তাহা সাধ্বী নারী-হৃদয়ের অতি নিভৃত বৈকুণ্ঠলোক হইতে একটি নির্মল প্রেমের সংগীত।

এই দুই-একদিনের বিচ্ছেদে মহেন্দ্রের মন হইতে দীর্ঘ-মিলনের সমস্ত অবসাদ দূরহইয়া সরলা বধূর নবপ্রেমে উদ্ভাসিত সুখস্মৃতি আবার উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। শেষাশেষি প্রাত্যহিক ঘরকন্নার খুঁটিনাটি অসুবিধা তাহাকে উত্ত্যক্ত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, সে-সমস্ত অপসারিত হইয়া কেবলমাত্র কর্মহীন কারণহীন একটি বিশুদ্ধ প্রেমানন্দের আলোকে আশার মানসীমূর্তি তাহার মনের মধ্যে প্রাণ পাইয়া উঠিয়াছে।

মহেন্দ্র অতি ধীরে ধীরে লেফাফা ছিঁড়িয়া চিঠিখানা বাহির করিয়া নিজের ললাটে কপোলে বুলাইয়া লইল। একদিন মহেন্দ্র যে-এসেন্স আশাকে উপহার দিয়াছিল, সেই এসেন্সের গন্ধ চিঠির কাগজ হইতে উতলা দীর্ঘনিশ্বাসের মতো মহেন্দ্রের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিল।

ভাঁজ খুলিয়া মহেন্দ্র চিঠি পড়িল। কিন্তু এ কী। যেমন বাঁকাচোরা লাইন, তেমন সাদাসিধা ভাষা নয় তো। কাঁচা-কাঁচা অক্ষর, কিন্তু কথাগুলি তো তাহার সঙ্গে মিলিল না। লেখা আছে–

“প্রিয়তম, যাহাকে ভুলিবার জন্য চলিয়া গেছ,এ লেখায় তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিব কেন। যে লতাকে ছিঁড়িয়া মাটিতে ফেলিয়া দিলে, সে আবার কোন্ লজ্জায় জড়াইয়া উপরে উঠিতে চেষ্টা করে। সে কেন মাটির সঙ্গে মাটি হইয়া মিশিয়া গেল না!

“কিন্তু এটুকুতে তোমার কী ক্ষতি হইবে, নাথ। নাহয় ক্ষণকালের জন্য মনে পড়িলই বা। মনে তাহাতে কতটুকুই বা বাজিবে। আর, তোমার অবহেলা যে কাঁটার মতো আমার পাঁজরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া রহিল। সকল দিন, সকল রাত, সকল কাজ, সকল চিন্তার মধ্যে যে দিকে ফিরি, সেই দিকেই যে আমাকে বিঁধিতে লাগিল। তুমি যেমন করিয়া ভুলিলে, আমাকে তেমনি করিয়া ভুলিবার একটা উপায় বলিয়া দাও।

“নাথ, তুমি যে আমাকে ভালোবাসিয়াছিলে, সে কি আমারই অপরাধ। আমি কি স্বপ্নেও এত সৌভাগ্য প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। আমি কোথা হইতে আসিলাম, আমাকে কে জানিত। আমাকে যদি না চাহিয়া দেখিতে, আমাকে যদি তোমার ঘরে বিনা-বেতনের দাসী হইয়া থাকিতে হইত, আমি কি তোমাকে কোনো দোষ দিতে পারিতাম। তুমি নিজেই আমার কোন্ গুণে ভুলিলে প্রিয়তম, কী দেখিয়া আমার এত আদর বাড়াইলে। আর, আজ বিনা-মেঘে যদি বজ্রপাতই হইল, তবে সে বজ্র কেবল দগ্ধ করিল কেন। একেবারে দেহমন কেন ছাই করিয়া দিল না।

“এই দুটো দিনে অনেক সহ্য করিলাম, অনেক ভাবিলাম, কিন্তু, একটা কথা বুঝিতে পারিলাম না-ঘরে থাকিয়াও কি তুমি আমাকে ফেলিতে পারিতে না। আমার জন্যও কি তোমার ঘর ছাড়িয়া যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল। আমি কি তোমারএতখানি জুড়িয়া আছি। আমাকে তোমার ঘরের কোণে, তোমার দ্বারের বাহিরে ফেলিয়া রাখিলেও কি আমি তোমার চোখে পড়িতাম। তাই যদি হয়, তুমি কেন গেলে, আমার কি কোথাও যাইবার পথ ছিল না। ভাসিয়া আসিয়াছি, ভাসিয়া যাইতাম।’

এ কী চিঠি। এ ভাষা কাহার, তাহা মহেন্দ্রের বুঝিতে বাকি রহিল না। অকস্মাৎ আহত মূর্ছিতের মতো মহেন্দ্র সে-চিঠিখানি লইয়া স্তম্ভিত হইয়া রহিল। যে-লাইনে রেলগাড়ির মতো তাহার মন পূর্ণবেগে ছুটিয়াছিল, সেই লাইনেই বিপরীত দিক হইতে একটা ধাক্কা খাইয়া লাইনের বাহিরে তাহার মনটা যেন উল্টাপাল্টা স্তূপাকার বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিল।

অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া আবার সে দুইবার তিনবার করিয়া পড়িল। কিছুকাল যাহা সুদূর আভাসের মতো ছিল, আজ তাহা যেন ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। তাহার জীবনাকাশের এক কোণে যে ধূমকেতুটা ছায়ার মতো দেখাইতেছিল, আজ তাহার উদ্যত বিশাল পুচ্ছ অগ্নিরেখায় দীপ্যমান হইয়া দেখা দিল।

এ চিঠি বিনোদিনীরই। সরলা আশা নিজের মনে করিয়া তাহা লিখিয়াছে। পূর্বে যে কথা সে কখনো ভাবে নাই, বিনোদিনীর রচনামত চিঠি লিখিতে গিয়া সেই-সব কথা তাহার মনে জাগিয়া উঠিতে লাগিল। নকল-করা কথা বাহির হইতে বদ্ধমূল হইয়া তাহার আন্তরিক হইয়া গেল; যে-নূতন বেদনার সৃষ্টি হইল, এমন সুন্দর করিয়া তাহা ব্যক্ত করিতে আশা কখনোই পারিত না। সে ভাবিতে লাগিল, “সখী আমার মনের কথা এমন ঠিকটি বুঝিল কী করিয়া। কেমন করিয়া এমন ঠিকটি প্রকাশ করিয়া বলিল।’ অন্তরঙ্গ সখীকে আশা আরো যেন বেশি আগ্রহের সঙ্গে আশ্রয় করিয়া ধরিল, কারণ, যে-ব্যথাটা তাহার মনের মধ্যে, তাহার ভাষাটি তাহার সখীর কাছে– সে এতই নিরুপায়।

মহেন্দ্র চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বিনোদিনীর উপর রাগ করিতে অনেক চেষ্টা করিল, মাঝে থেকে রাগ হইল আশার উপর। “দেখো দেখি, আশার এ কী মূঢ়তা, স্বামীর প্রতি এ কী অত্যাচার।’ বলিয়া চৌকিতে বসিয়া পড়িয়া প্রমাণস্বরূপ চিঠিখানা আবার পড়িল। পড়িয়া ভিতরে ভিতরে একটা হর্ষসঞ্চার হইতে লাগিল। চিঠিখানাকে সে আশারই চিঠি মনে করিয়া পড়িবার অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু এ ভাষায় কেনোমতেই সরলা আশাকে মনে করাইয়া দেয় না। দু-চার লাইন পড়িবামাত্র একটা সুখোন্মাদকর সন্দেহ ফেনিল মদের মতো মনকে চারি দিকে ছাপাইয়া উঠিতে থাকে। এই প্রচ্ছন্ন অথচ ব্যক্ত, নিষিদ্ধ অথচ নিকটাগত, বিষাক্ত অথচ মধুর, একই কালে উপহৃত অথচ প্রত্যাহৃত প্রেমের আভাস মহেন্দ্রকে মাতাল করিয়া তুলিল। তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল, নিজের হাতে-পায়ে কোথাও এক জায়গায় ছুরি বসাইয়া বা আর কিছু করিয়া নেশা ছুটাইয়া মনটাকে আর-কোনো দিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়। টেবিলে সজোরে মুষ্টি বসাইয়া চৌকি হইতে লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, “দূর করো, চিঠিখানা পুড়াইয়া ফেলি।” বলিয়া চিঠিখানি ল্যাম্পের কাছাকাছি লইয়া গেল। পুড়াইল না, আর-একবার পড়িয়া ফেলিল। পরদিন ভৃত্য টেবিল হইতে কাগজপোড়া ছাই অনেক ঝাড়িয়া ফেলিয়াছিল। কিন্তু তাহা আশার চিঠির ছাই নহে, চিঠির উত্তর দিবার অনেকগুলো অসম্পূর্ণ চেষ্টাকে মহেন্দ্র পুড়াইয়া ছাই করিয়াছে।

pic3-big

20

Soon after moving to the hostel, Mahendra received a letter in a handwriting that was familiar to him. He did not open it during the day as he was busy, tucking it into his shirt pocket where it stayed, close to his heart. As he listened to lectures and went on rounds in the hospital, every so often he thought of the letter, nestling against his chest like a bird singing of love. When awakened, its sweet song would fill his ears.

In the evening he finally sat down by a lamp in the privacy of his own room and leaned back on the couch comfortably. Taking out the letter which was still warm from being next to his skin, he looked at his name on the envelope for a long time without opening it. He knew there would be little of importance in the letter. There was hardly any chance of Asha being able to communicate her own feelings in writing. He would have to imagine the gentle words that came straight from her heart from the childish letters scrawled in irregular lines on the paper. As he read his own name in her inexpertly formed letters, he imagined a tune, one that surely came from a secret paradise within her unblemished soul carrying her love to him.

The couple of days that they had been apart had revived the memories of first love with his innocent bride for Mahendra sweeping away all the ennui he had been feeling. Lately, little mishaps in Asha’s housekeeping had started plaguing him; these feelings were now replaced by a pure flame of love that burned without cause or respite and brought Asha’s memories to life.

Mahendra tore the envelope open very slowly and held the letter to his forehead and his cheek. A perfume that he had once presented to Asha seemed to rise from the paper and beat against his soul like an anxious sigh.

He unfolded the letter and read it. Now he was amazed; the lines might have been irregular but the language was far from simple. The letters were unformed, but the words were not. It read –

‘Dearest, why should I use this letter to remind you of the one whom you try to forget by leaving? Why should the vine that you uprooted try to climb upwards again? Why did she not become one with the dust where you left her?

But why will this hurt you in any case, my love. There is little harm in reminding you for a few moments. You will feel very little pain. But what of your neglect towards me that pierces my side like a thorn; all day, all night, in work and in thought, wherever I turn, it hurts. Tell me a way to forget this pain, so that I too might forget you as you have forgotten me.

My love, is it my fault that you loved me? Never in my wildest dreams did I hope for such good fortune. Where did I come from, who had ever heard of me? If you had not looked at me, if you had made me your servant and not bothered to pay me, would I have blamed you? Why did you fall in love with me dearest, why did you love me so much? Today, you leaving me feels like thunder from a clear sky. Why just singe me with lightning, why not reduce me to ashes as well?

I have borne a lot in the past two days. I have had time to think too; but one thing that I could not fathom is why you could not discard me and still stay at home. Why did you have to leave home for my sake? Am I such an important part of you? Would you have constantly noticed me even if you had cast me to one side? If the answer is yes, then why did you have to go and why not me? I came to you on a tide of flotsam; I could have left in the same way.’

What letter was this! Mahendra was left in no doubt as to who the true author of the words was. He sat in stunned silence as though he had suffered a sudden blow. His thoughts were pushed from the path they had taken since the receipt of the letter; this sudden realisation was enough to reduce them to uncomprehending confusion.

After spending a long time in thought, he read the letter two or three more times again. What had been a distant possibility for some time now seemed very real. The comet that had been casting a shadow over his life now showed its vast burning trail.

In reality this was Binodini’s letter to Mahendra. Unsuspectingly, Asha had merely written it down as her own. Thoughts that she had never been able to form came to mind as she wrote down what Binodini dictated to her. Copied words became her own; she could never have expressed her new found sorrow so beautifully. She thought, ‘How does my friend know my mind so well! How does she give voice to the words that I feel!’ She clung with greater eagerness to Binodini as she was the one that had the language to express Asha’s pain. This is how truly helpless Asha was.

Mahendra got up from the bed with a frown, trying as hard as he could to feel angry with Binodini; but his fury grew against Asha instead. He thought, ‘What stupidity, how else will she torment me!’ He then sat down to read the letter again to justify his anger. He now began to feel a certain happiness. He read it again and again, each time imagining them as Asha’s words, but they did not bring her guileless nature to mind at all. Each time after he had read a few lines, his suspicions would deliciously brim over in his mind like a intoxicating drink. He became drunk with this sensation of love, at once expressed yet hidden, forbidden yet available, sweet as poison, a gift that was being offered but also being withheld. He felt like inflicting pain on himself to loosen the spell on his mind so that he could think of other things. He brought his fist down on the table heavily and jumped to his feet, declaring, ‘Enough, let me burn the damned thing!’ He held the letter to the lamp flame; instead of burning it he read it again. The fellow cleaning the table the next day removed a lot of ash from burnt paper. But these were not from the letter; they were from Mahendra’s unsuccessful attempts at answering it.

Image:http://www.ngmaindia.gov.in/sh-miniature-painting.asp

চোখের বালি ১২/Chokher Bali 12

মহেন্দ্র একদিন বিরক্ত হইয়া তাহার মাকে ডাকিয়া কহিল, “এ কি ভালো হইতেছে? পরের ঘরের যুবতী বিধবাকে আনিয়া একটা দায় ঘাড়ে করিবার দরকার কী। আমার তো ইহাতে মত নাই– কী জানি কখন কী সংকট ঘটিতে পারে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও যে আমাদের বিপিনের বউ, উহাকে আমি তো পর মনে করি না।”

মহেন্দ্র কহিল, “না মা, ভালো হইতেছে না। আমার মতে উঁহাকে রাখা উচিত হয় না।”

রাজলক্ষ্মী বেশ জানিতেন, মহেন্দ্রের মত অগ্রাহ্য করা সহজ নহে। তিনি বিহারীকে ডাকিয়া কহিলেন, “ও বেহারি, তুই একবার মহিনকে বুঝাইয়া বল্। বিপিনের বউ আছে বলিয়াই এই বৃদ্ধবয়সে আমি একটু বিশ্রাম করিতে পাই। পর হউক, যা হউক, আপন লোকের কাছ হইতে এমন সেবা তো কখনো পাই নাই।”

বিহারী রাজলক্ষ্মীকে কোনো উত্তর না করিয়া মহেন্দ্রের কাছে গেল– কহিল, “মহিনদা, বিনোদিনীর কথা কিছু ভাবিতেছে?”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “ভাবিয়া রাত্রে ঘুম হয় না। তোমার বোঠানকে জিজ্ঞাসা করো না, আজকাল বিনোদিনীর ধ্যানে আমার আর-সকল ধ্যানই ভঙ্গ হইয়াছে।”

আশা ঘোমটার ভিতর হইতে মহেন্দ্রকে নীরবে তর্জন করিল।

বিহারী কহিল, “বল কী। দ্বিতীয় বিষবৃক্ষ!”

মহেন্দ্র। ঠিক তাই। এখন উহাকে বিদায় করিবার জন্য চুনি ছটফট করিতেছে।

ঘোমটার ভিতর হইতে আশার দুই চক্ষু আবার ভর্ৎসনা বর্ষণ করিল।

বিহারী কহিল, “বিদায় করিলেও ফিরিতে কতক্ষণ। বিধবার বিবাহ দিয়া দাও– বিষদাঁত একেবারে ভাঙিবে।”

মহেন্দ্র। কুন্দরও তো বিবাহ দেওয়া হইয়াছিল।

বিহারী কহিল, “থাক্, ও উপমাটা এখন রাখো। বিনোদিনীর কথা আমি মাঝে মাঝে ভাবি। তোমার এখানে উনি তো চিরদিন থাকিতে পারেন না। তাহার পরে, যে বন দেখিয়া আসিয়াছি সেখানে উঁহাকে যাবজ্জীবন বনবাসে পাঠানো, সেও বড়ো কঠিন দণ্ড।”

মহেন্দ্রের সম্মুখে এ পর্যন্ত বিনোদিনী বাহির হয় নাই, কিন্তু বিহারী তাহাকে দেখিয়াছে। বিহারী এটুকু বুঝিয়াছে, এ নারী জঙ্গলে ফেলিয়া রাখিবার নহে। কিন্তু শিখা এক ভাবে ঘরের প্রদীপরূপে জ্বলে, আর-এক ভাবে ঘরে আগুন ধরাইয়া দেয়– সে আশঙ্কাও বিহারীর মনে ছিল।

মহেন্দ্র বিহারীকে এই কথা লইয়া অনেক পরিহাস করিল। বিহারীও তাহার জবাব দিল। কিন্তু তাহার মন বুঝিয়াছিল, এ নারী খেলা করিবার নহে, ইহাকে উপেক্ষা করাও যায় না।

রাজলক্ষ্মী বিনোদিনীকে সাবধান করিয়া দিলেন। কহিলেন, “দেখো বাছা, বউকে লইয়া তুমি অত টানাটানি করিয়ো না। তুমি পাড়াগাঁয়ের গৃহস্থ-ঘরে ছিলে– আজকালকার চালচলন জান না। তুমি বুদ্ধিমতী, ভালো করিয়া বুঝিয়া চলিয়ো।”–

ইহার পর বিনোদিনী অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্বক আশাকে দূরে দূরে রাখিল। কহিল, “আমি ভাই কে। আমার মতো অবস্থার লোক আপন মান বাঁচাইয়া চলিতে না জানিলে, কোন্ দিন কী ঘটে বলা যায় কি।”

আশা সাধাসাধি কান্নাকাটি করিয়া মরে– বিনোদিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মনের কথায় আশা আকণ্ঠ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল, কিন্তু বিনোদিনী আমল দিল না।

এ দিকে মহেন্দ্রের বাহুপাশ শিথিল এবং তাহার মুগ্ধদৃষ্টি যেন ক্লান্তিতে আবৃত হইয়া আসিয়াছে। পূর্বে যে-সকল অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খলা তাহার কাছে কৌতুকজনক বোধ হইত, এখন তাহা অল্পে অল্পে তাহাকে পীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছে। আশার সাংসারিক অপটুতায় সে ক্ষণে ক্ষণে বিরক্ত হয়, কিন্তু প্রকাশ করিয়া বলে না। প্রকাশ না করিলেও আশা অন্তরে অন্তরে অনুভব করিয়াছে, নিরবচ্ছিন্ন মিলনে প্রেমের মর্যাদা ম্লান হইয়া যাইতেছে। মহেন্দ্রের সোহাগের মধ্যে বেসুর লাগিতেছিল– কতকটা মিথ্যা বাড়াবাড়ি, কতকটা আত্মপ্রতারণা।

এ সময়ে পলায়ন ছাড়া পরিত্রাণ নাই, বিচ্ছেদ ছাড়া ঔষধ নাই। স্ত্রীলোকের স্বভাবসিদ্ধ সংস্কারবশে আশা আজকাল মহেন্দ্রকে ফেলিয়া যাইবার চেষ্টা করিত। কিন্তু বিনোদিনী ছাড়া তাহার যাইবার স্থান কোথায়।

মহেন্দ্র প্রণয়ের উত্তপ্ত বাসরশয্যার মধ্যে চক্ষু উন্মীলন করিয়া ধীরে ধীরে সংসারের কাজকর্ম, পড়াশুনার প্রতি একটু সজাগ হইয়া পাশ ফিরিল। ডাক্তারি বইগুলাকে নানা অসম্ভব স্থান হইতে উদ্ধার করিয়া ধুলা ঝাড়িতে লাগিল এবং চাপকান-প্যাণ্টলুন কয়টা রৌদ্রে দিবার উপক্রম করিল।

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

One day Mahendra spoke to his mother with some anger about Binodini saying, ‘What is going on? You have a widowed young woman staying with us for days on end. Why take on such a responsibility? I never agreed to this – what is the point of inviting troubles?’

Rajlakshmi said, ‘But she is my nephew Bipin’s wife, I don’t think of her as a stranger.’

Mahendra insisted, ‘Nevertheless, this is not right. I don’t think she should stay here.’

Rajlakshmi knew that she would not be able to ignore Mahendra’s opinions for long. She called for Bihari and said to him, ‘Bihari, why do you not have a talk with your friend? I am getting some respite at this age only because Bipin’s wife is here to take care of me. It matters little whether she is my own daughter or not, I have never had such affection from the ones who are close to me.’

Bipin did not answer her immediately. He went to Mahendra and said to him, ‘Are you giving some thought to this matter of Binodini?’

Mahendra smiled and said, ‘I think about little else. Why not ask your sister-in-law, I have stopped thinking about all others because of Binodini!’

Asha silently shook her head in remonstrance at Mahendra from beneath her veil.

Bihari said, ‘What? Like a modern day Poisoned Tree*!’

Mahendra said, ‘Exactly! Chuni wants to get rid of her as soon as possible.’

Asha sent looks of anguish at him again.

Bihari said, ‘Even you get rid of her, how long before she comes back. Why not marry her off, that should be an end to her as a threat.’

Mahendra said, ‘Kundo got married too, in the Poisoned Tree.’

Bihari said, ‘Let us stop considering the book for a while. I have been thinking of Binodini occasionally. She cannot stay here forever. And yet to send her back to the village is the equivalent of exiling her to a forest forever; that would be a great tragedy.’

Mahendra had never seen Binodini so far, but Bihari had. He had understood that she was not the sort of woman one left in a forest to languish. But he also realised that a flame can be both the calming focus of the altar as well as the wild spark that sets a house on fire.

Mahendra teased Bihari at length over his concern for Binodini. Bihari answered back. He knew that she was not to be played with or even to be ignored.

Rajlakshmi cautioned Binodini. She said, ‘Look, why do you have to talk to my daughter –in-law all the time? You are from the village, you know nothing of these city types of today. Be careful and use your senses.’

After this Binodini started to avoid Asha very ostentatiously. She would say, ‘Who am I to come between you and your husband? If I do not watch out for myself, who else is going to do that for me?’

Asha would tearfully beg her to come and talk to her. But Binodini was steadfast. Asha was dying to tell her all about her days and nights but Binodini was not going to budge from her position.

In the meantime Mahendra’s embrace seemed to be relaxing and the constancy of his admiration was starting to dim somewhat. The whimsical ineptitude of the past that he had once found so endearing was now starting to trouble him. He was now constantly annoyed by Asha’s inability to do things right but he would not say anything. Despite this, she understood that their continual togetherness was making his love for her grow less intense. A lot of Mahendra’s affection now seemed false and overwrought to Asha.

There is no cure for this ennui but departure and separation. Her instincts as a woman told her to seek out others; she would try and leave Mahendra alone. But where was she to go to but to her only friend, Binodini?

Mahendra raised his eyes from the heat of the conjugal bed and slowly started to turn back towards his studies and the duties of family life. He gathered his medical texts from a number of impossible hiding places to dust them off and aired his coats and trousers in preparation for his new life.

Image: http://www.oldindianarts.in/2011/04/portrait-of-lady-kalighat-painting.html

Chokher Bali 5/চোখের বালি ৫

কিছুকাল অনাবৃষ্টিতে যে শস্যদল শুষ্ক পীতবর্ণ হইয়া আসে, বৃষ্টি পাইবামাত্র সে আর বিলম্ব করে না; হঠাৎ বাড়িয়া উঠিয়া দীর্ঘকালের উপবাসদৈন্য দূর করিয়া দেয়, দুর্বল নত ভাব ত্যাগ করিয়া শস্যক্ষেত্রের মধ্যে অসংকোচে অসংশয়ে আপনার অধিকার উন্নত ও উজ্জ্বল করিয়া তোলে, আশার সেইরূপ হইল। যেখানে তাহার রক্তের সম্বন্ধ ছিল, সেখানে সে কখনো আত্মীয়তার দাবি করিতে পায় নাই; আজ পরের ঘরে আসিয়া সে যখন বিনা প্রার্থনায় এক নিকটতম সম্বন্ধ এবং নিঃসন্দিগ্ধ অধিকার প্রাপ্ত হইল, যখন সেই অযত্নলালিতা অনাথার মস্তকে স্বামী স্বহস্তে লক্ষ্মীর মুকুট পরাইয়া দিলেন, তখন সে আপন গৌরবপদ গ্রহণ করিতে লেশমাত্র বিলম্ব করিল না, নববধূযোগ্য লজ্জাভয় দূর করিয়া দিয়া সৌভাগ্যবতী স্ত্রীর মহিমায় মুহূর্তের মধ্যেই স্বামীর পদপ্রান্তে অসংকোচে আপন সিংহাসন অধিকার করিল।

রাজলক্ষ্মী সেদিন মধ্যাহ্নে সেই সিংহাসনে এই নূতন-আগত পরের মেয়েকে এমন চিরাভ্যস্তবৎ স্পর্ধার সহিত বসিয়া থাকিতে দেখিয়া দুঃসহ বিস্ময়ে নীচে নামিয়া আসিলেন। নিজের চিত্তদাহে অন্নপূর্ণাকে দগ্ধ করিতে গেলেন। কহিলেন, “ওগো, দেখো গে, তোমার নবাবের পুত্রী নবাবের ঘর হইতে কী শিক্ষা লইয়া আসিয়াছেন। কর্তারা থাকিলে আজ–”

অন্নপূর্ণা কাতর হইয়া কহিলেন, “দিদি, তোমার বউকে তুমি শিক্ষা দিবে, শাসন করিবে, আমাকে কেন বলিতেছ।”

রাজলক্ষ্মী ধনুষ্টংকারের মতো বাজিয়া উঠিলেন, “আমার বউ? তুমি মন্ত্রী থাকিতে সে আমাকে গ্রাহ্য করিবে!”

তখন অন্নপূর্ণা সশব্দপদক্ষেপে দম্পতিকে সচকিত সচেতন করিয়া মহেন্দ্রের শয়নগৃহে উপস্থিত হইলেন। আশাকে কহিলেন, “তুই এমনি করিয়া আমার মাথা হেঁট করিবি পোড়ারমুখী? লজ্জা নাই, শরম নাই, সময় নাই, অসময় নাই, বৃদ্ধা শাশুড়ির উপর সমস্ত ঘরকন্না চাপাইয়া তুমি এখানে আরাম করিতেছ? আমার পোড়াকপাল, আমি তোমাকে এই ঘরে আনিয়াছিলাম!”

বলিতে বলিতে তাঁহার চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িল, আশাও নতমুখে বস্ত্রাঞ্চল খুঁটিতে খুঁটিতে নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া কাঁদিতে লাগিল।

মহেন্দ্র কহিল, “কাকী, তুমি বউকে কেন অন্যায় ভর্ৎসনা করিতেছ। আমিই তো উহাকে ধরিয়া রাখিয়াছি।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি ভালো কাজ করিয়াছ? ও বালিকা, অনাথা, মার কাছ হইতে কোনোদিন কোনো শিক্ষা পায় নাই, ও ভালোমন্দর কী জানে। তুমি উহাকে কী শিক্ষা দিতেছ?”

মহেন্দ্র কহিল, “এই দেখো, উহার জন্যে স্লেট খাতা বই কিনিয়া আনিয়াছি। আমি বউকে লেখাপড়া শিখাইব, তা লোকে নিন্দাই করুক আর তোমরা রাগই কর।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “তাই কি সমস্ত দিনই শিখাইতে হইবে। সন্ধ্যার পর এক-আধ ঘণ্টা পড়ালেই তো ঢের হয়।”

মহেন্দ্র। অত সহজ নয় কাকী, পড়াশুনায় একটু সময়ের দরকার হয়।

অন্নপূর্ণা বিরক্ত হইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। আশাও ধীরে ধীরে তাঁহার অনুসরণের উপক্রম করিল– মহেন্দ্র দ্বার রোধ করিয়া দাঁড়াইল, আশার করুণ সজল নেত্রের কাতর অনুনয় মানিল না। কহিল, “রোসো, ঘুমাইয়া সময় নষ্ট করিয়াছি, সেটা পোষাইয়া লইতে হইবে।”

এমন গম্ভীরপ্রকৃতির শ্রদ্ধেয় মূঢ় থাকিতেও পারেন যিনি মনে করিবেন, মহেন্দ্র নিদ্রাবেশে পড়াইবার সময় নষ্ট করিয়াছে; বিশেষরূপে তাঁহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে, মহেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে অধ্যাপনকার্য যেরূপে নির্বাহ হয়, কোনো স্কুলের ইন্‌সপেকটর তাহার অনুমোদন করিবেন না।

আশা তাহার স্বামীকে বিশ্বাস করিয়াছিল; সে বস্তুতই মনে করিয়াছিল লেখাপড়া শেখা তাহার পক্ষে নানা কারণে সহজ নহে বটে, কিন্তু স্বামীর আদেশবশত নিতান্তই কর্তব্য। এইজন্য সে প্রাণপণে অশান্ত বিক্ষিপ্ত মনকে সংযত করিয়া আনিত, শয়নগৃহের মেঝের উপর ঢালা বিছানার এক পার্শ্বে অত্যন্ত গম্ভীর হইয়া বসিত এবং পুঁথিপত্রের দিকে একেবারে ঝুঁকিয়া পড়িয়া মাথা দুলাইয়া মুখস্থ করিতে আরম্ভ করিত। শয়নগৃহের অপর প্রান্তে ছোটো টেবিলের উপর ডাক্তারি বই খুলিয়া মাস্টারমশায় চৌকিতে বসিয়া আছেন, মাঝে মাঝে কটাক্ষপাতে ছাত্রীর মনোযোগ লক্ষ্য করিয়া দেখিতেছেন। দেখিতে দেখিতে হঠাৎ ডাক্তারি বই বন্ধ করিয়া মহেন্দ্র আশার ডাক-নাম ধরিয়া ডাকিল, “চুনি।” চকিত আশা মুখ তুলিয় চাহিল। মহেন্দ্র কহিল, “বইটা আনো দেখি, দেখি কোন্‌খানটা পড়িতেছ।”

আশার ভয় উপস্থিত হইল, পাছে মহেন্দ্র পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার আশা অল্পই ছিল। কারণ, চারুপাঠের চারুত্ব-প্রলোভনে তাহার অবাধ্য মন কিছুতেই বশ মানে না; বল্মীক সম্বন্ধে সে যতই জ্ঞানলাভের চেষ্টা করে, অক্ষরগুলো ততই তাহার দৃষ্টিপথের উপর দিয়া কালো পিপীলিকার মতো সার বাঁধিয়া চলিয়া যায়।

পরীক্ষকের ডাক শুনিয়া অপরাধীর মতো আশা ভয়ে ভয়ে বইখানি লইয়া মহেন্দ্রের চৌকির পাশে আসিয়া উপস্থিত হয়। মহেন্দ্র এক হাতে কটিদেশ বেষ্টনপূর্বক তাহাকে দৃঢ়রূপে বন্দী করিয়া অপর হাতে বই ধরিয়া কহে, “আজ কতটা পড়িলে দেখি।” আশা যতগুলা লাইনে চোখ বুলাইয়াছিল, দেখাইয়া দেয়। মহেন্দ্র ক্ষুণ্নস্বরে বলে, “উঃ! এতটা পড়িতে পারিয়াছ? আমি কতটা পড়িয়াছি দেখিবে?” বলিয়া তাহার ডাক্তারি বইয়ের কোনো-একটা অধ্যায়ের শিরোনামটুকু মাত্র দেখাইয়া দেয়। আশা বিস্ময়ে চোখদুটা ডাগর করিয়া বলে, “তবে এতক্ষণ কী করিতেছিলে।” মহেন্দ্র তাহার চিবুক ধরিয়া বলে, আমি একজনের কথা ভাবিতেছিলাম, কিন্তু যাহার কথা ভাবিতেছিলাম সেই নিষ্ঠুর তখন চারুপাঠে উইপোকার অত্যন্ত মনোহর বিবরণ লইয়া ভুলিয়া ছিল।” আশা এই অমূলক অভিযোগের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দিতে পারিত– কিন্তু হায়, কেবলমাত্র লজ্জার খাতিরে প্রেমের প্রতিযোগিতায় অন্যায় পরাভব নীরবে মানিয়া লইতে হয়।

ইহা হইতে স্পষ্ট প্রমাণ হইবে, মহেন্দ্রের এই পাঠশালাটি সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিদ্যালয়ের কোনো নিয়ম মানিয়া চলে না।

হয়তো একদিন মহেন্দ্র উপস্থিত নাই– সেই সুযোগে আশা পাঠে মন দিবার চেষ্টা করিতেছে, এমন সময় কোথা হইতে মহেন্দ্র আসিয়া তাহার চোখ টিপিয়া ধরিল, পরে তাহার বই কাড়িয়া লইল, কহিল, “নিষ্ঠুর, আমি না থাকিলে তুমি আমার কথা ভাব না, পড়া লইয়া থাক?”

আশা কহিল, “তুমি আমাকে মূর্খ করিয়া রাখিবে?”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার কল্যাণে আমারই বা বিদ্যা এমনই কী অগ্রসর হইতেছে।”

কথাটা আশাকে হঠাৎ বাজিল; তৎক্ষণাৎ চলিয়া যাইবার উপক্রম করিয়া কহিল, “আমি তোমার পড়ায় কী বাধা দিয়াছি।”

মহেন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “তুমি তাহার কী বুঝিবে। আমাকে ছাড়িয়া তুমি যত সহজে পড়া করিতে পার, তোমাকে ছাড়িয়া তত সহজে আমি আমার পড়া করিতে পারি না।”

গুরুতর দোষারোপ। ইহার পরে স্বভাবতই শরতের এক পসলার মতো এক দফা কান্নার সৃষ্টি হয় এবং অনতিকালমধ্যেই কেবল একটি সজল উজ্জ্বলতা রাখিয়া সোহাগের সূর্যালোকে তাহা বিলীন হইয়া যায়।

শিক্ষক যদি শিক্ষার সর্বপ্রধান অন্তরায় হন, তবে অবলা ছাত্রীর সাধ্য কী বিদ্যারণ্যের মধ্যে পথ করিয়া চলে। মাঝে মাঝে মাসিমার তীব্র ভর্ৎসনা মনে পড়িয়া চিত্ত বিচলিত হয়– বুঝিতে পারে, লেখাপড়া একটা ছুতা মাত্র; শাশুড়িকে দেখিলে লজ্জায় মরিয়া যায়। কিন্তু শাশুড়ি তাহাকে কোনো কাজ করিতে বলেন না, কোনো উপদেশ দেন না; অনাদিষ্ট হইয়া আশা শাশুড়ির গৃহকার্যে সাহায্য করিতে গেলে তিনি ব্যস্তসমস্ত হইয়া বলেন, “কর কী, কর কী, শোবার ঘরে যাও, তোমার পড়া কামাই যাইতেছে।”

অবশেষে অন্নপূর্ণা আশাকে কহিলেন, “তোর যা শিক্ষা হইতেছে সে তো দেখিতেছি, এখন মহিনকেও কি ডাক্তারি দিতে দিবি না।”

শুনিয়া আশা মনকে খুব শক্ত করিল, মহেন্দ্রকে বলিল, “তোমার এক্‌জামিনের পড়া হইতেছে না, আজ হইতে আমি নীচে মাসিমার ঘরে গিয়া থাকিব।”

এ বয়সে এতবড়ো কঠিন সন্ন্যাসব্রত! শয়নালয় হইতে একেবারে মাসিমার ঘরে আত্মনির্বাসন! এই কঠোর প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করিতে তাহার চোখের প্রান্তে জল আসিয়া পড়িল, তাহার অবাধ্য ক্ষুদ্র অধর কাঁপিয়া উঠিল এবং কণ্ঠস্বর রুদ্ধপ্রায় হইয়া আসিল।

মহেন্দ্র কহিল, “তবে তাই চলো, কাকীর ঘরেই যাওয়া যাক– কিন্তু তাহা হইলে তাঁহাকে উপরে আমাদের ঘরে আসিতে হইবে।”

আশা একবড়ো উদার গম্ভীর প্রস্তাবে পরিহাস প্রাপ্ত হইয়া রাগ করিল। মহেন্দ্র কহিল, “তার চেয়ে তুমি স্বয়ং দিনরাত্রি আমাকে চোখে চোখে রাখিয়া পাহারা দাও, দেখো আমি এক্‌জামিনের পড়া মুখস্থ করি কি না।”

অতি সহজেই সেই কথা স্থির হইল। চোখে চোখে পাহারার কার্য কিরূপ ভাবে নির্বাহ হইত তাহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া অনাবশ্যক, কেবল এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, সে বৎসর মহেন্দ্র পরীক্ষায় ফেল করিল এবং চারুপাঠের বিস্তারিত বর্ণনা সত্ত্বেও পুরুভুজ সম্বন্ধে আশার অনভিজ্ঞতা দূর হইল না।

এইরূপ অপূর্ব পঠন-পাঠন-ব্যাপার যে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইয়াছিল তাহা বলিতে পারি না। বিহারী মাঝে মাঝে আসিয়া অত্যন্ত গোল বাধাইয়া দিত। “মহিনদা মহিনদা” করিয়া সে পাড়া মাথায় করিয়া তুলিত। মহেন্দ্রকে তাহার শয়নগৃহের বিবর হইতে টানিয়া না বাহির করিয়া সে কোনোমতেই ছাড়িত না। পড়ায় শৈথিল্য করিতেছে বলিয়া সে মহেন্দ্রকে বিস্তর ভর্ৎসনা করিত। আশাকে বলিত, “বউঠান্‌, গিলিয়া খাইলে হজম হয় না, চিবাইয়া খাইতে হয়। এখন সমস্ত অন্ন এক গ্রাসে গিলিতেছ, ইহার পরে হজমি গুলি খুঁজিয়া পাইবে না।”

মহেন্দ্র বলিত, “চুনি ও কথা শুনিয়ো না– বিহারী আমাদের সুখে হিংসা করিতেছে।”

বিহারী বলিত, “সুখ যখন তোমার হাতেই আছে, তখন এমন করিয়া ভোগ করো যাহাতে পরের হিংসা না হয়।”

মহেন্দ্র উত্তর করিত, “পরের হিংসা পাইতে যে সুখ আছে। চুনি, আর-একটু হইলেই আমি গর্দভের মতো তোমাকে বিহারীর হাতে সমর্পণ করিতেছিলাম।”

বিহারী রক্তবর্ণ হইয়া বলিয়া উঠিত, “চুপ!”

এই-সকল ব্যাপারে আশা মনে মনে বিহারীর উপরে ভারি বিরক্ত হইত। এক সময়ে তাহার সহিত বিহারীর বিবাহ-প্রস্তাব হইয়াছিল বলিয়াই বিহারীর প্রতি তাহার একপ্রকার বিমুখ ভাব ছিল, বিহারী তাহা বুঝিত এবং মহেন্দ্র তাহা লইয়া আমোদ করিত।

রাজলক্ষ্মী বিহারীকে ডাকিয়া দুঃখ করিতেন। বিহারী কহিত, “মা, পোকা যখন গুটি বাঁধে তখন তত বেশি ভয় নয়, কিন্তু যখন কাটিয়া উড়িয়া যায় তখন ফেরানো শক্ত। কে মনে করিয়াছিল, ও তোমার বন্ধন এমন করিয়া কাটিবে।”

মহেন্দ্রের ফেল-করা সংবাদে রাজলক্ষ্মী গ্রীষ্মকালের আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের মতো দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিলেন, কিন্তু তাহার গর্জন এবং দাহনটা সম্পূর্ণ ভোগ করিলেন অন্নপূর্ণা। তাঁহার আহারনিদ্রা দূর হইল।

chokher bali 5

Grasses that have grown dry and yellow during a drought do not wait one moment once it rains and grow fast in defiance of the lengthy period of want. They cast aside all their former weakness and stand tall establishing their position among the others around them; this was the same thing that was happening to Asha. Where she had been bound by ties of blood, she had never been able to claim any rights of belonging, but today in her new home among strangers, she found one of the closest of relationships and unalloyed rights without having to ask for them. When her husband crowned this neglected orphaned creature as a goddess in his world, she did not take long to rise and accept her position of glorious fortune on her throne at her husband’s feet, putting aside all the customary shyness of a new bride.

That afternoon when Rajlakshmi saw this newly arrived girl take up that cherished position with an air of accustomed ease, she came downstairs in an unbearable state of excitement. She went to Annapurna to vent her pent up fury, saying, ‘Go and have a look, your princess has brought such regal airs from her own family! If only his father were alive…’

Annapurna was hurt and said, ‘Sister, when she misbehaves, you must teach your daughter-in-law, even discipline her, why ask me?’

Rajlakshmi snapped like a taut bow saying, ‘My daughter-in-law? While you are playing her ally in this household, why should she listen to me!’

Annapurna then went to Mahendra’s room, warning them of her presence with loud footsteps. She said to Asha, ‘Will you shame me like this, you wretch? You have no sense of decency or of time, nor of what is appropriate, piling all the housework on your old mother-in-law and sitting here as though on holiday! It is my misfortune that I brought you into this family!’

As she spoke, she wept and Asha stood with bowed head, beginning to cry quietly as she picked at her clothes.

Mahendra said, ‘Aunt, why are you accusing her unjustly? I am the one who has made her stay with me here.’

Annapurna asked, ‘Is that the right thing to do? She is still just a girl, an orphan, she has never learned the right ways from a mother, what does she know of what right and wrong are? What kind of behavior are you teaching her?’

Mahendra said, ‘See, I have bought a slate tablet and books for her. I will teach her to read and write, and I don’t care if people talk about this or if you or anyone else feels angry!’

Annapurna said, ‘Do you really have to teach her all day? An hour or so in the evening should be enough I would have thought.’

Mahendra answered, ‘It is not that easy Aunt! One must spend some time in studying.’

Greatly annoyed, Annapurna left the room. Asha was following her out slowly when Mahendra went and stood in her way, barring her from leaving. He refused to heed the plea in her moist tearful eyes and said, ‘Wait, the time lost in sleeping must be made up.’

There probably are some serious and respectable people who are ignorant enough to think that Mahendra had wasted his time sleeping when he should have been teaching Asha; I must inform that person that the mode of study under Mahendra’s supervision was such that no school inspector would ever approve of it.

Asha had believed her husband when he said that it was not easy for her to study for various reasons, but she knew it was essential to obey her husband’s wishes. She would gather her wayward thoughts, sit down at one corner of the mat on the floor with a very serious face and read aloud from the text books as she swayed in concentration. At the other end of the room, her teacher would be studying a medical book at a small table, keeping an occasional eye on his ward’s intense efforts.

He would then suddenly close his book and call her by her nick name, ‘Chuni,’ Asha would look up startled.

‘Let me see which part you are up to?’

Asha was afraid that Mahendra would test her. There was little chance of her ever answering these questions successfully. Her unschooled mind had failed to submit to the promise of scholarliness of the Scholar’s Aid book and the more she tried to learn about termites, the more the letters crowded and wove in front of her eyes like ranks of black ants.

Asha would go fearfully and stand in front of Mahendra’s chair as though she had done something wrong. Mahendra would pull her close by the waist and hold her tightly as he held the book in his other hand and ask, ‘How much did you study today?’ When Asha showed him he would say petulantly, ‘That is a lot! Do you want to know how much I have studied?’ and he would trace out the heading of a chapter on his own medical text book. Asha’s eyes would widen in amazement as she would say, ‘But what did you do all this time?’ Mahendra would turn her face towards him by holding her chin and say, ‘I was thinking about someone, but that cruel person was studying a rather pleasant account of termites at the same time!’ Asha could have easily given a suitable answer to this unjust accusation, but she had to silently admit defeat as this was a contest of love.

This incident proves that this school of Mahendra’s did not follow any of the rules of either government run or privately owned schools.

On some days in Mahendra’s absence, Asha would be trying to focus on her studies when he would come home and surprise her from the back, his hands placed across her eyes. He would then take her book away saying, ‘You cruel girl, how dare you study while I am away instead of thinking about me?’

Asha would reply, ‘Would you rather keep me illiterate then?’

‘What kind of progress am I making in my own studies? Thanks to you, I may add,’ answered Mahendra to this.

Asha felt very hurt when she heard this and made as if to leave instantly, saying, ‘What have I done to prevent you from studying?’

Mahendra held her hand and said, ‘What do you know of that? I cannot study as easily as you do when I am not with you.’

Serious allegations indeed! Of necessity there must be some tears to follow this, like shortlived autumnal showers and soon even these fade away in the sunshine of loving affections.

When the teacher is the biggest obstacle in the path of education, how can an innocent student make any progress along that difficult route? Occasionally when Asha thought of her aunt’s bitter admonishments – she too knew that the study sessions were just a ruse; when she saw her mother-in-law, she would cringe in shame. But her mother-in-law never asked her to do anything nor offered any guidance and when Asha went to her assistance without being asked, she would react immediately saying, ‘What are you doing? Go! Go to the bedroom, you must be missing out on your studies!’

Eventually Annapurna said to Asha, ‘I can see the great education you are getting, now will you not let Mahin become a doctor either?’

This made Asha steel her mind and she said to Mahendra, ‘You are not studying for your examinations, I have decided to go and stay with my aunt in her downstairs rooms from today.’

Such renunciation at this age! Self exile from her own bedroom to her aunt’s rooms! Even as she said the words, tears welled in her eyes and her little mouth quivered uncontrollably as her voice cracked with emotion.

Mahendra said, ‘Then let us go, but if we stay in her rooms, she will have to come upstairs to our bedroom.’

Asha was angry when he made fun of her generous offer. Mahendra said, ‘Why do you not keep me under close watch all the time, making sure that I do study for the examinations?’

This was quite easily decided. It is unnecessary to describe in great detail how this close invigilation was carried out, I feel sure you will understand if I tell you that Mahendra failed in his examinations that year and despite all the lengthy descriptions in her text books Asha remained completely unconscious of the characteristics of Purubhuja.

I cannot say that this unique mode of studying was allowed to be carried on without opposition from any one. Occasionally Bihari would come and create quite an upheaval by calling Mohin loudly enough for the whole neighbourhood to hear. He would not stop until his friend had come out of his own room. He rebuked Mahendra very harshly over the neglect to his education.

He said to Asha, ‘You know, one must not swallow one’s food in one enormous gulp, it is far better for the process of digestive health to chew each mouthful slowly. What you are doing now is eating all your food at one go, later there will be no medicine strong enough to fix your heart burn from this over indulgence.’

Mahendra said, ‘Do not listen to him Chuni, he is jealous of our bliss.’

Bihari said, ‘When you already have the key to happiness, try to enjoy it so that others do not feel envious.’

Mahendra would reply, ‘But there is such pleasure in arousing the envy of others. Chuni, to think that I was almost going to gift you to Bihari like an idiot!’

Bihari turned red and said, ‘Quiet!’

Asha would get very annoyed with Bihari over these events. Bihari understood that she had a negative attitude towards Bihari because they had once been considered as suitable for each other and Mahendra used to joke about it.

Rajlakshmi would speak of her sorrow with Bihari. He would tell her, ‘Ma, when an insect spins a cocoon, there is little to fear but once it emerges to fly off, one cannot bring it back. Who ever knew that he would escape your bonds like this!’

When she heard of Mahendra’s failure in the examinations, Rajlakshmi flared up like a sudden summer blaze but the ferocity of her anger and outrage was borne completely by Annapurna who now became so distraught she could hardly eat or drink.