Archives

চোখের বালি ২৭/ Chokher Bali 27

 

২৭

 

মহেন্দ্রচলিয়াযাওয়ারকিছুদিনপরেইআশাযখনকাশীতেআসিল, তখনঅন্নপূর্ণারমনেবড়োইআশঙ্কাজন্মিল।আশাকেতিনিনানাপ্রকারেনানাপ্রশ্নজিজ্ঞাসাকরিতেলাগিলেন, “হাঁরেচুনি, তুইযেতোরসেইচোখেরবালিরকথাবলিতেছিলি, তোরমতে, তারমতনএমনগুণবতীমেয়েআরজগতেনাই?”

 

“সত্যইমাসি, আমিবাড়াইয়াবলিতেছিনা।তারযেমনবুদ্ধিতেমনিরূপ, কাজকর্মেতারতেমনিহাত।”

 

“তোরসখী, তুইতোতাহাকেসর্বগুণবতীদেখিবি, বাড়িরআর-সকলেতাহাকেকেকীবলেশুনি।”

 

“মারমুখেতোপ্রশংসাধরেনা।চোখেরবালিদেশেযাইবারকথাবলিতেইতিনিঅস্থিরহইয়াওঠেন।এমনসেবাকরিতেকেহজানেনা।বাড়িরচাকরদাসীরওযদিকারোব্যামোহয়তাকেবোনেরমতো, মারমতোযত্নকরে।”

 

“মহেন্দ্রেরমতকী।”

 

“তাঁকেতোজানইমাসি, নিতান্তঘরেরলোকছাড়াআর-কাউকেতাঁরপছন্দইহয়না।আমারবালিকেসকলেইভালোবাসে, কিন্তুতাঁরসঙ্গেতারআজপর্যন্তভালোবনেনাই।”

 

“কীরকম।”

 

“আমিযদি-বাঅনেককরিয়াদেখাসাক্ষাৎকরাইয়াদিলাম, তাঁরসঙ্গেতারকথাবার্তাইপ্রায়বন্ধ।তুমিতোজান, তিনিকীরকমকুনো–লোকেমনেকরে, তিনিঅহংকারী, কিন্তুতানয়মাসি, তিনিদুটি-একটিলোকছাড়াকাহাকেওসহ্যকরিতেপারেননা।”

 

শেষকথাটাবলিয়াফেলিয়াহঠাৎআশারলজ্জাবোধহইল, গাল-দুটিলালহইয়াউঠিল।অন্নপূর্ণাখুশিহইয়ামনেমনেহাসিলেন–কহিলেন, “তাইবটে, সেদিনমহিনযখনআসিয়াছিল, তোরবালিরকথাএকবারমুখেওআনেনাই।”

 

আশাদুঃখিতহইয়াকহিল, “ঐতাঁরদোষ।যাকেভালোবাসেননা, সেযেনএকেবারেইনাই।তাকেযেনএকদিনওদেখেননাই, জানেননাই, এমনিতাঁরভাব।”

 

অন্নপূর্ণাশান্তস্নিগ্ধহাস্যেকহিলেন, “আবারযাকেভালোবাসেনমহিনযেনজন্মজন্মান্তরকেবলতাকেইদেখেনএবংজানেন, এভাবওতাঁরআছে।কীবলিস, চুনি।”

 

আশাতাহারকোনোউত্তরনাকরিয়াচোখনিচুকরিয়াহাসিল।অন্নপূর্ণাজিজ্ঞাসাকরিলেন, “চুনি, বিহারীরকীখবরবল্‌ দেখি।সেকিবিবাহকরিবেনা।”

 

মুহূর্তেরমধ্যেইআশারমুখগম্ভীরহইয়াগেল–সেকীউত্তরদিবেভাবিয়াপাইলনা।

 

আশারনিরুত্তরভাবেঅত্যন্তভয়পাইয়াঅন্নপূর্ণাবলিয়াউঠিলেন, “সত্যবল্‌ চুনি, বিহারীরঅসুখ-বিসুখকিছুহয়নিতো?”

 

বিহারীএইচিরপুত্রহীনারমণীরস্নেহ-সিংহাসনেপুত্রেরমানস-আদর্শরূপেবিরাজকরিত।বিহারীকেতিনিসংসারেপ্রতিষ্ঠিতদেখিয়াআসিতেপারেননাই, এদুঃখপ্রবাসেআসিয়াপ্রতিদিনতাঁহারমনেজাগিত।তাঁহারক্ষুদ্রসংসারেরআর-সমস্তইএকপ্রকারসম্পূর্ণহইয়াছে, কেবলবিহারীরসেইগৃহহীনঅবস্থাস্মরণকরিয়াইতাঁহারপরিপূর্ণবৈরাগ্যচর্চারব্যাঘাতঘটে।

 

আশাকহিল, “মাসি, বিহারী-ঠাকুরপোরকথাআমাকেজিজ্ঞাসাকরিয়োনা।”

 

অন্নপূর্ণাআশ্চর্যহইয়াজিজ্ঞাসাকরিলেন, “কেনবল্‌ দেখি।”

 

আশাকহিল, “সেআমিবলিতেপারিবনা।” বলিয়াঘরহইতেউঠিয়াগেল।

 

অন্নপূর্ণাচুপকরিয়াবসিয়াভাবিতেলাগিলেন, “অমনসোনারছেলেবিহারী, এরইমধ্যেতাহারকিএতইবদলহইয়াছেযে, চুনিআজতাহারনামশুনিয়াউঠিয়াযায়।অদৃষ্টেরইখেলা।কেনতাহারসহিতচুনিরবিবাহেরকথাহইল, কেনই-বামহেন্দ্রতাহারহাতেরকাছহইতেচুনিকেকাড়িয়ালইল।’

 

অনেকদিনপরেআজআবারঅন্নপূর্ণারচোখদিয়াজলপড়িল–মনেমনেতিনিকহিলেন, “আহা, আমারবিহারীযদিএমন-কিছুকরিয়াথাকেযাহাআমারবিহারীরযোগ্যনহে, তবেসেতাহাঅনেকদুঃখপাইয়াইকরিয়াছে, সহজেকরেনাই।’ বিহারীরসেইদুঃখেরপরিমাণকল্পনাকরিয়াঅন্নপূর্ণারবক্ষব্যথিতহইতেলাগিল।

 

সন্ধ্যারসময়যখনঅন্নপূর্ণাআহ্নিকেবসিয়াছেন, তখনএকটাগাড়িআসিয়াদরজায়থামিল, এবংসহিসবাড়িরলোককেডাকিয়ারুদ্ধদ্বারেঘামারিতেলাগিল।অন্নপূর্ণাপূজাগৃহহইতেবলিয়াউঠিলেন, “ঐযা, আমিএকেবারেইভুলিয়াগিয়াছিলাম, আজকুঞ্জরশাশুড়িরএবংতারদুইবোনঝিরএলাহাবাদহইতেআসিবারকথাছিল।ঐবুঝিতাহারাআসিল।চুনি, তুইএকবারআলোটালইয়াদরজাখুলিয়াদে।”

 

আশালণ্ঠন-হাতেদরজাখুলিয়াদিতেইদেখিল, বিহারীদাঁড়াইয়া।বিহারীবলিয়াউঠিল, “একীবোঠান, তবেযেশুনিলাম, তুমিকাশীআসিবেনা।”

 

আশারহাতহইতেলণ্ঠনপড়িয়াগেল।সেযেনপ্রেতমূর্তিদেখিয়াএকনিশ্বাসেদোতলায়ছুটিয়াগিয়াআর্তস্বরেবলিয়াউঠিল, “মাসিমা, তোমারদুটিপায়েপড়ি, উঁহাকেএখনইযাইতেবলো।”

 

অন্নপূর্ণাপূজারআসনহইতেচমকিয়াউঠিয়াকহিলেন, “কাহাকেচুনি, কাহাকে।”

 

আশাকহিল, “বিহারী-ঠাকুরপোএখানেওআসিয়াছেন।” বলিয়াসেপাশেরঘরেগিয়াদ্বাররোধকরিল।

 

বিহারীনীচেহইতেসকলকথাইশুনিতেপাইল।সেতখনইছুটিয়াযাইতেউদ্যত–কিন্তুঅন্নপূর্ণাপূজাহ্নিকফেলিয়াযখননামিয়াআসিলেন, তখনদেখিলেন, বিহারীদ্বারেরকাছেমাটিতেবসিয়াপড়িয়াছে, তাহারশরীরহইতেসমস্তশক্তিচলিয়াগেছে।

 

অন্নপূর্ণাআলোআনেননাই।অন্ধকারেতিনিবিহারীরমুখেরভাবদেখিতেপাইলেননা, বিহারীওতাঁহাকেদেখিতেপাইলনা।

 

অন্নপূর্ণাকহিলেন, “বেহারী!”

 

হায়, সেইচিরদিনেরস্নেহসুধাসিক্তকণ্ঠস্বরকোথায়।একণ্ঠেরমধ্যেযেকঠিনবিচারেরবজ্রধ্বনিপ্রচ্ছন্নহইয়াআছে।জননীঅন্নপূর্ণা, সংহার-খড়গতুলিলেকার ‘পরে।ভাগ্যহীনবিহারীযেআজঅন্ধকারেতোমারমঙ্গলচরণাশ্রয়েমাথারাখিতেআসিয়াছিল।

 

বিহারীরঅবশশরীরআপাদমস্তকবিদ্যুতেরআঘাতেচকিতহইয়াউঠিল, কহিল, “কাকীমা, আরনয়, আরএকটিকথাওবলিয়োনা।আমিচলিলাম।”

 

বলিয়াবিহারীভূমিতেমাথারাখিয়াপ্রণামকরিল, অন্নপূর্ণারপাওস্পর্শকরিলনা।জননীযেমনগঙ্গাসাগরেসন্তানবিসর্জনকরে, অন্নপূর্ণাতেমনিকরিয়াবিহারীকেসেইরাত্রেরঅন্ধকারেনীরবেবিসর্জনকরিলেন, একবারফিরিয়াডাকিলেননা।গাড়িবিহারীকেলইয়াদেখিতেদেখিতেঅদৃশ্যহইয়াগেল।

 

সেইরাত্রেইআশামহেন্দ্রকেচিঠিলিখিল–

 

“বিহারী-ঠাকুরপোহঠাৎআজসন্ধ্যাবেলাএখানেআসিয়াছিলেন।জেঠামশায়রাকবেকলিকাতায়ফিরিবেন, ঠিকনাই–তুমিশীঘ্রআসিয়াআমাকেএখানহইতেলইয়াযাও।’

 

 

 

photo0165

 

27

When Asha came to Kashi within a few days of Mahendra’s departure, Annapurna became very worried. She asked her a great many questions such as, ‘Chuni, your friend Chokher Bali; is it your opinion that there is not one other as accomplished as her?’

‘Truly Aunt, I am not exaggerating her qualities. She is just as clever as she is beautiful and she does everything perfectly.’

‘But then she is your friend and you will of course see her as being accomplished in every way, what do the others in the household think of her?’

‘My mother-in-law cannot say enough in her praise. If Bali even mentions going back home, she grows very disturbed. No one can take such care of others. Even if the lowliest maid in the household falls ill, Bali looks after them as her own flesh and blood.’

‘What does Mahendra think?’

‘You know him Aunt, he does not like people outside his own family. Everyone loves Bali, but he is still unable to treat her civilly.’

‘How is that?’

‘I did make it possible for the two to meet each other but they hardly speak. You know how lazy he is, people even think of him as proud; but it is not so, he cannot be bothered to know more than a couple of people.’

Asha blushed after saying the last words. Annapurna felt happy and smiled to herself, saying, ‘That is true, he never said a word about Bali the other day when he was here.’

Asha said sadly, ‘That is one of his faults. When he does not like someone, he acts as if that person does not exist; as if he has neither seen nor heard of them.’

Annapurna smiled a gentle smile and said, ‘But then, when he does love someone he knows nothing but them for the rest of his life. Would you not agree, Chuni?’

Asha said nothing in response. She only lowered her eyes and smiled. Annapurna asked, ‘Tell me about Bihari. Will he not get married?’

Asha’s face became sombre immediately. She did not know what to say.

Annapurna became very worried when she saw Asha’s silence and said, ‘Tell me the truth Chuni! He is not ill, is he?’

To the childless Annapurna, Bihari had always been the ideal of a son. She was troubled each day in her exile by the thought that she had not done anything to make him embrace the life of a householder. Every wish had been fulfilled in her little world but her complete peace remained ruffled by memories of the rootless life Bihari led.

Asha said, ‘Do not ask me about him.’

Annapurna was amazed; she aske, ‘Why is that?’

Asha replied, ‘I cannot tell you that!’ She then left the room.

Her aunt sat by herself and thought quietly, ‘What a wonderful man Bihari is! What could he have done to make Asha get up and leave on mentioning his name? Fate is cruel indeed. Why did we start planning Chuni’s marriage with him? Why did Mahendra snatch her away?’

She wept after a long time today – as she said to herself, ‘Alas, if Bihari has done something that did not suit his personality, he must have done it under great duress.’ The more she thought of the burden on Bihari’s shoulders, the more she hurt.

When she sat down to her prayers in the evening, a carriage came and stopped at the door and the coachman called out to people as he knocked on the locked door. Annapurna started and said, ‘Oh No! I had completely forgotten that Kunja’s mother-in-law and her two nieces were supposed to arrive today. It must be them. Chuni, could you take a light and open the door for them?’

When Asha opened the door, she saw Bihari standing outside. He said, ‘What is this, I had heard that you were not coming to Kashi!’

The lantern fell from her hand. She hurried upstairs as if she had seen a ghost and cried piteously, ‘Aunt, please tell him to leave right now.’

Annapurna was surprised and asked, ‘Whom must I ask to leave, Chuni?’

Asha answered, ‘Bihari! He has followed me here.’ She then went to the room next door and barred it from the inside.

Bihari heard every word from downstairs. He was about to leave instantly – but when Annapurna came downstairs leaving her prayers incomplete, she saw him sitting on the floor near the door drained of all strength.

Annapurna did not have a light with her. The darkness meant that they could not see each other’s expressions.

Annapurna spoke up, ‘Bihari!’

Alas! Where was the compassionate voice he had known forever? Nothing tempered the thunderbolt of cold judgement in her tones. Who was she raising her ire against? Bihari had come merely to rest his brow against the forgiveness at her feet.

Bihari’s numb flesh started at the shock that coursed through him and said, ‘Aunt, do not say another word. I am going.’

Bihari then bent down and paid his respects to Annapurna but he did not touch her feet. Just as a mother sacrifices a child to the river, Annapurna silently gave up on Bihari that night and did not call him back. The carriage took him away till it could no longer be seen.

Asha wrote to Mahendra that very night –

‘Bihari suddenly appeared here in the evening. I do not know when my uncle plans to go back to Calcutta – I want you to come here soon and take me with you.’

Advertisements

চোখের বালি ২৬/Chokher Bali 26

২৬

এক দিকে চন্দ্র অস্ত যায়, আর-এক দিকে সূর্য উঠে। আশা চলিয়া গেল, কিন্তু মহেন্দ্রের ভাগ্যে এখনো বিনোদিনীর দেখা নাই। মহেন্দ্র ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, মাঝে মাঝে ছুতা করিয়া সময়ে-অসময়ে তাহার মার ঘরে আসিয়া উপস্থিত হয়, বিনোদিনী কেবলই ফাঁকি দিয়া পালায়, ধরা দেয় না।

রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রের এইরূপ অত্যন্ত শূন্যভাব দেখিয়া ভাবিলেন, “বউ গিয়াছে, তাই এ বাড়িতে মহিনের কিছুই আর ভালো লাগিতেছে না।’ আজকাল মহেন্দ্রের সুখদুঃখের পক্ষে মা যে বউয়ের তুলনায় একান্ত অনাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে, তাহা মনে করিয়া তাঁহাকে বিঁধিল–তবু মহেন্দ্রের এই লক্ষ্মীছাড়া বিমর্ষ ভাব দেখিয়া তিনি বেদনা পাইলেন। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিলেন, “সেই ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জার পর হইতে আমার হাঁপানির মতো হইয়াছে; আমি তো আজকাল সিঁড়ি ভাঙিয়া ঘন ঘন উপরে যাইতে পারি না। তোমাকে বাছা, নিজে থাকিয়া মহিনের খাওয়াদাওয়া সমস্তই দেখিতে হইবে। বরাবরকার অভ্যাস, একজন কেহ যত্ন না করিলে মহিন থাকিতে পারে না। দেখো-না, বউ যাওয়ার পর হইতে ও কেমন একরকম হইয়া গেছে। বউকেও ধন্য বলি, কেমন করিয়া গেল?”

বিনোদিনী একটুখানি মুখ বাঁকাইয়া বিছানার চাদর খুঁটিতে লাগিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কী বউ, কী ভাবিতেছ। ইহাতে ভাবিবার কথা কিছু নাই। যে যাহা বলে বলুক, তুমি আমাদের পর নও।”   বিনোদিনী কহিল, “কাজ নাই, মা।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আচ্ছা, তবে কাজ নাই। দেখি আমি নিজে যা পারি তাই করিব।”   বলিয়া তখনই তিনি মহেন্দ্রের তেতলার ঘর ঠিক করিবার জন্য উদ্যত হইলেন। বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “তোমার অসুখ-শরীর, তুমি যাইয়ো না, আমি যাইতেছি। আমাকে মাপ করো পিসিমা, তুমি যেমন আদেশ করিবে আমি তাহাই করিব।”

রাজলক্ষ্মী লোকের কথা একেবারেই তুচ্ছ করিতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর হইতে সংসারে এবং সমাজে তিনি মহেন্দ্র ছাড়া আর কিছুই জানিতেন না। মহেন্দ্র সম্বন্ধে বিনোদিনী সমাজনিন্দার আভাস দেওয়াতে তিনি বিরক্ত হইয়াছিলেন। আজন্মকাল তিনি মহিনকে দেখিয়া আসিতেছেন, তাহার মতো এমন ভালো ছেলে আছে কোথায়। সেই মহিনের সম্বন্ধেও নিন্দা! যদি কেহ করে, তবে তাহার জিহ্বা খসিয়া যাক। তাঁহার নিজের কাছে যেটা ভালো লাগে ও ভালো বোধ হয় সে-সম্বন্ধে বিশ্বের লোককে উপেক্ষা করিবার জন্য রাজলক্ষ্মীর একটা স্বাভাবিক জেদ ছিল।

আজ মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া আপনার শয়নঘর দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। দ্বার খুলিয়াই দেখিল, চন্দনগুঁড়া ও ধুনার গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়াআছে। মশারিতে গোলাপি রেশমের ঝালর লাগানো। নীচের বিছানায় শুভ্র জাজিম তকতক করিতেছে এবং তাহার উপরে পূর্বেকার পুরাতন তাকিয়ার পরিবর্তে রেশম ও পশমের ফুলকাটা বিলাতি চৌকা বালিশ সুসজ্জিত। তাহার কারুকার্য বিনোদিনীর বহুদিনের পরিশ্রমজাত। আশা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিত, “এগুলি তুই কার জন্যে তৈরি করিতেছিস, ভাই।” বিনোদিনী হাসিয়া বলিত, “আমার চিতাশয্যার জন্য। মরণ ছাড়া তো সোহাগের লোক আমার আর কেহই নাই।”

দেয়ালে মহেন্দ্রের যে বাঁধানো ফোটোগ্রাফখানি ছিল, তাহার ফ্রেমের চার কোণে রঙিন ফিতার দ্বারা সুনিপুণভাবে চারিটি গ্রন্থি বাঁধা, এবং সেই ছবির নীচে ভিত্তিগাত্রে একটি টিপাইয়ের দুই ধারে দুই ফুলদানিতে ফুলের তোড়া, যেন মহেন্দ্রের প্রতিমূর্তি কোনো অজ্ঞাত ভক্তের পূজা প্রাপ্ত হইয়াছে। সবসুদ্ধ সমস্ত ঘরের চেহারা অন্যরকম। খাট যেখানে ছিল সেখান হইতে একটুখানি সরানো। ঘরটিকে দুই ভাগ করা হইয়াছে; খাটের সম্মুখে দুটি বড়ো আলনায় কাপড় ঝুলাইয়া দিয়া আড়ালের মতো প্রস্তুত হওয়ায় নীচে বসিবার বিছানা ও রাত্রে শুইবার খাট স্বতন্ত্র হইয়া গেছে। যে আলমারিতে আশার সমস্ত শখের জিনিস চীনের খেলনা প্রভৃতি সাজানো ছিল, সেই আলমারির কাঁচের দরজায় ভিতরের গায়ে লাল সালু কুঞ্চিত করিয়া মারিয়া দেওয়া হইয়াছে; এখন আর তাহার ভিতরের কোনো জিনিস দেখা যায় না। ঘরের মধ্যে তাহার পূর্ব-ইতিহাসের যে-কিছু চিহ্ন ছিল, তাহা নূতন হস্তের নব সজ্জায় সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হইয়া গেছে।

পরিশ্রান্ত মহেন্দ্র মেঝের উপরকার শুভ্র বিছানায় শুইয়া নূতন বালিশগুলির উপর মাথা রাখিবামাত্র একটি মৃদু সুগন্ধ অনুভব করিল–বালিশের ভিতরকার তুলার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে নাগকেশর ফুলের রেণু ও কিছু আতর মিশ্রিত ছিল।   মহেন্দ্রের চোখ বুজিয়া আসিল, মনে হইতে লাগিল, এই বালিশের উপর যাহার নিপুণ হস্তের শিল্প, তাহারই কোমল চম্পক-অঙ্গুলির যেন গন্ধ পাওয়া যাইতেছে।

এমন সময় দাসী রূপার রেকাবিতে ফল ও মিষ্ট এবং কাঁচের গ্লাসে বরফ-দেওয়া আনারসের শরবত আনিয়া দিল। এ সমস্তই পূর্বপ্রথা হইতে কিছু বিভিন্ন এবং বহু যত্ন ও পারিপাট্যের সহিত রচিত। সমস্ত স্বাদে গন্ধে দৃশ্যে নূতনত্ব আসিয়া মহেন্দ্রের ইন্দ্রিয়-সকল আবিষ্ট করিয়া তুলিল।   তৃপ্তিপূর্বক ভোজন সমাধা হইলে, রূপার বাটায় পান ও মসলা লইয়া বিনোদিনী ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। হাসিতে হাসিতে কহিল, “এ কয়দিন তোমার খাবার সময় হাজির হইতে পারি নাই, মাপ করিয়ো, ঠাকুরপো। আর যাই কর, আমার মাথার দিব্য রহিল, তোমার অযত্ন হইতেছে, এ খবরটা আমার চোখের বালিকে দিয়ো না। আমার যথাসাধ্য আমি করিতেছি–কিন্তু কী করিব ভাই, সংসারের সমস্ত কাজই আমার ঘাড়ে।”

এই বলিয়া বিনোদিনী পানের বাটা মহেন্দ্রের সম্মুখে অগ্রসর করিয়া দিল। আজিকার পানের মধ্যেও কেয়া খয়েরের একটু বিশেষ নূতন গন্ধ পাওয়া গেল।

মহেন্দ্র কহিল, “যত্নের মাঝে মাঝে এমন এক-একটা ত্রুটি থাকাই ভালো।”

বিনোদিনী কহিল, “ভালো কেন, শুনি।”

মহেন্দ্র উত্তর করিল, “তার পরে খোঁটা দিয়া সুদসুদ্ধ আদায় করা যায়।”

“মহাজন-মহাশয়, সুদ কত জমিল?”   মহেন্দ্র কহিল, “খাবার সময় হাজির ছিলে না, এখন খাবার পরে হাজরি পোষাইয়া আরো পাওনা বাকি থাকিবে।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “তোমার হিসাব যেরকম কড়াক্কড়, তোমার হাতে একবার পড়িলে আর উদ্ধার নাই দেখিতেছি।”

মহেন্দ্র কহিল, “হিসাবে যাই থাক্‌, আদায় কী করিতে পারিলাম।”   বিনোদিনী কহিল, “আদায় করিবার মতো আছে কী। তবু তো বন্দী করিয়া রাখিয়াছ।” বলিয়া ঠাট্টাকে হঠাৎ গাম্ভীর্যে পরিণত করিয়া ঈষৎ একটু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

মহেন্দ্রও একটু গম্ভীর হইয়া কহিল, “ভাই বালি, এটা কি তবে জেলখানা।”

এমন সময় বেহারা নিয়মমত আলো আনিয়া টিপাইয়ের উপর রাখিয়া চলিয়া গেল।   হঠাৎ চোখে আলো লাগাতে মুখের সামনে একটু হাতের আড়াল করিয়া নতনেত্রে বিনোদিনী বলিল, “কী জানি ভাই। তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে। এখন যাই, কাজ আছে।”

মহেন্দ্র হঠাৎ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “বন্ধন যখন স্বীকার করিয়াছ তখন যাইবে কোথায়?”   বিনোদিনী কহিল, “ছি ছি, ছাড়ো–যাহার পালাইবার রাস্তা নাই, তাহাকে আবার বাঁধিবার চেষ্টা কেন।”   বিনোদিনী জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইয়া প্রস্থান করিল।

মহেন্দ্র সেই বিছানার সুগন্ধ বালিশের উপর পড়িয়া রহিল, তাহার বুকের মধ্যে রক্ত তোলপাড় করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যা, নির্জন ঘর, নববসন্তের বাতাস দিতেছে, বিনোদিনীর মন যে ধরা দিল-দিল–উন্মাদ মহেন্দ্র আপনাকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিবে না, এমনি বোধ হইল। তাড়াতাড়ি আলো নিবাইয়া ঘরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করিল, তাহার উপরে শার্সি আঁটিয়া দিল, এবং সময় না হইতেই বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল।   এও তো সে পুরাতন বিছানা নহে। চার-পাঁচখানা তোশকে শয্যাতল পূর্বের চেয়ে অনেক নরম। আবার একটি গন্ধ–সে অগুরুর কি খসখসের, কি কিসের ঠিক বুঝা গেল না। মহেন্দ্র অনেক বার এপাশ-ওপাশ করিতে লাগিল–কোথাও যেন পুরাতনের কোনো একটা নিদর্শন খুঁজিয়া পাইয়া তাহা আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা। কিন্তু কিছুই হাতে ঠেকিল না।

রাত্রি নটার সময় রুদ্ধ দ্বারে ঘা পড়িল। বিনোদিনী বাহির হইতে কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার খাবার আসিয়াছে, দুয়ার খোলো।”   তখনই দ্বার খুলিবার জন্য মহেন্দ্র ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া শার্শির অর্গলে হাত লাগাইল। কিন্তু খুলিল না–মেঝের উপর উপুড় হইয়া লুটাইয়া কহিল, “না না, আমার ক্ষুধা নাই, আমি খাইব না।”   বাহির হইতে উদ্‌বিগ্ন কণ্ঠের প্রশ্ন শোনা গেল, “অসুখ করে নি তো? জল আনিয়া দিব? কিছু চাই কি।”   মহেন্দ্র কহিল, “আমার কিছুই চাই না–কোনো প্রয়োজন নাই।”   বিনোদিনী কহিল, “মাথা খাও, আমার কাছে ভাঁড়াইয়ো না। আচ্ছা, অসুখ না থাকে তো একবার দরজা খোলো।”   মহেন্দ্র সবেগে বলিয়া উঠিল, “না খুলিব না, কিছুতেই না। তুমি যাও।”   বলিয়া মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি উঠিয়া পুনর্বার বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল এবং অন্তর্হিতা আশার স্মৃতিকে শূন্য শয্যা ও চঞ্চল হৃদয়ের মধ্যে অন্ধকারে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল।

ঘুম যখন কিছুতেই আসিতে চায় না; তখন মহেন্দ্র বাতি জ্বালাইয়া দোয়াত কলম লইয়া আশাকে চিঠি লিখিতে বসিল। লিখিল, “আশা, আর অধিক দিন আমাকে একা ফেলিয়া রাখিয়ো না। আমার জীবনের লক্ষ্মী তুমি। তুমি না থাকিলেই আমার সমস্ত প্রবৃত্তি শিকল ছিঁড়িয়া আমাকে কোন্‌ দিকে টানিয়া লইতে চায়, বুঝিতে পারি না। পথ দেখিয়া চলিব, তাহার আলো কোথায়–সে আলো তোমার বিশ্বাসপূর্ণ দুটি চোখের প্রেমস্নিগ্ধ দৃষ্টিপাতে। তুমি শীঘ্র এসো, আমার শুভ, আমার ধ্রুব, আমার এক। আমাকে স্থির করো, রক্ষা করো, আমার হৃদয় পরিপূর্ণ করো। তোমার প্রতি লেশমাত্র অন্যায়ের মহাপাপ হইতে, তোমাকে মুহূর্তকাল বিস্মরণের বিভীষিকা হইতে আমাকে উদ্ধার করো।”

এমনি করিয়া মহেন্দ্র নিজেকে আশার অভিমুখে সবেগে তাড়না করিবার জন্য অনেক রাত ধরিয়া অনেক কথা লিখিল। দূর হইতে সুদূরে অনেকগুলি গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া তিনটা বাজিল। কলিকাতার পথে গাড়ির শব্দ আর প্রায় নাই, পাড়ার পরপ্রান্তে কোনো দোতলা হইতে নটীকণ্ঠে বেহাগ-রাগিণীর যে গান উঠিতেছিল সেও বিশ্বব্যাপিনী শান্তি ও নিদ্রার মধ্যে একেবারে ডুবিয়া গেছে। মহেন্দ্র একান্তমনে আশাকে স্মরণ করিয়া এবং মনের উদ্‌বেগ দীর্ঘ পত্রে নানারূপে ব্যক্ত করিয়া অনেকটা সান্ত্বনা পাইল, এবং বিছানায় শুইবামাত্র ঘুম আসিতে তাহার কিছুমাত্র বিলম্ব হইল না।

সকালে মহেন্দ্র যখন জাগিয়া উঠিল, তখন বেলা হইয়াছে, ঘরের মধ্যে রৌদ্র আসিয়াছে। মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল; নিদ্রার পর গতরাত্রির সমস্ত ব্যাপার মনের মধ্যে হালকা হইয়া আসিয়াছে।

বিছানার বাহিরে আসিয়া মহেন্দ্র দেখিল–গতরাত্রে আশাকে সে যে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা টিপাইয়ের উপর দোয়াত দিয়া চাপা রহিয়াছে। সেখানি পুনর্বার পড়িয়া মহেন্দ্র ভাবিল, “করেছি কী। এ যে নভেলি ব্যাপার! ভাগ্যে পাঠাই নাই। আশা পড়িলে কী মনে করিত। সে তো এর অর্ধেক কথা বুঝিতেই পারিত না।’ রাত্রে ক্ষণিক কারণে হৃদয়াবেগ যে অসংগত বাড়িয়া উঠিয়াছিল, ইহাতে মহেন্দ্র লজ্জা পাইল; চিঠিখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল; সহজ ভাষায় আশাকে একখানি সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখিল–

“তুমি আর কত দেরি করিবে। তোমার জেঠামহাশয়ের যদি শীঘ্র ফিরিবার কথা না থাকে, তবে আমাকে লিখিয়ো, আমি নিজে গিয়া তোমাকে লইয়া আসিব। এখানে একলা আমার ভালো লাগিতেছে না।’   img_9613_1_1 26   The moon sets in one direction and the sun rises in another. Asha might have left but Mahendra did not manage to see Binodini yet.  Mahendra wandered about and came to his mother’s rooms at odd hours on various excuses but Binodini did not yield so easily.

When she saw his extremely dejected spirits, Rajlakshmi thought to herself, ‘His wife’s absence is causing Mahendra to dislike this house and all in it.’ She felt slighted by the fact that his happiness now seemed to depend more on his wife rather than his mother but she was still upset by his unhappy appearance.

She sent for Binodini and said to her, ‘I have been having breathing difficulties since that bout of influenza and cannot climb the stairs to go upstairs as much as I once did. You must look after Mahendra’s welfare from now on. He is used to having someone tend to his needs for a long time. Have you seen how sad he looks ever since his wife left? What a wife! How could she even go?’

Binodini pulled a face and continued picking at the threads of the bedsheet. Rajlakshmi asked, ‘What are you thinking about? You don’t have to think about this. Whatever people may say, you are no stranger to us.’ Binodini answered, ‘There is no need for all that mother.’

Rajlakshmi said, ‘Alright, let it be. I will see if I can manage things on my own.’ She then immediately prepared to tidy up Mahendra’s third floor room.

Binodini then grew anxious and said, ‘You are not well, you do not have to go, I will go instead. Forgive me aunt, I will do whatever you order.’ Rajlakshmi completely ignored what other people said. Since the death of her husband she had devoted herself to none other than Mahendra. She had been annoyed by the hint in Binodini ‘s remark about what others in the wider society might think. She had known Mahendra his whole life and was certain there was not another person anywhere as good as him. If someone said a thing against him, she hoped that their tongue would wither and fall off. She had a natural obstinacy that allowed her to have a total disregard for everyone else and do exactly as she pleased.

Mahendra was astonished when he entered his bedroom after returning from his classes. He opened the door and found the room filled with the perfume of sandalwood powder and incense. A pink silken frill had been attached to the mosquito net. A clean white carpet had been spread on the bed and his old bolsters had been replaced by square cushions embroidered in silk and wool. Binodini had spent much time making these. Asha would ask her, ‘Who are you making these for?’ Binodini smiled and answered, ‘For my funeral. Who else but Death will be my lover?’

The photograph of his that hung in a frame on the wall had been skillfully tied with ribbons and a low table placed immediately below the picture with two vases full of bunches of flowers on it; as if Mahendra’s likeness was being worshipped by an unknown devotee. The whole room looked different. The bed had been shifted slightly. The room was now divided into two areas; two supports now held a curtain that created shelter for the bed and separated the sleeping area from the space for lounging during the day. The showcase which contained all the fancies Asha had collected including her porcelain toys had been lined with red pleated fabric on the inside and the interior could not be seen any more. The new décor of the room seemed to have erased all its past history.

Exhausted, Mahendra lay down on the spotless sheets spread on the floor; he detected a slight fragrance as his head touched the new pillows – a large quantity of pollen and a few drops of perfume had been added to the cotton stuffing of the pillows. His eyes closed and he felt as though he could smell the soft fingers that had worked such skilful magic on the pillows. The maid entered at this point with a silver bowl filled with fruits and sweets and a glass filled with iced pineapple juice. All this was very different from what he was used to and was done with infinite care and attention. The novelty of these new sensations enveloped Mahendra’s feelings.

After he had eaten to his heart’s content, Binodini entered the room slowly with a silver container filled with mouth freshening pan and spices. She smiled and said, ‘I have not been able to attend you at meal times for the past few days, please forgive me. Whatever you do, you must pledge to me that you will not tell my Bali that you have been not been taken care of. I am doing as much as I can but what can I do, all the household is my responsibility.’ She then gave him the container. There was something new there too, in the perfume of the catechu powder.

Mahendra said, ‘It is good when there is an occasional oversight in attention.’

Binodini asked, ‘Why is it good, pray tell.’

Mahendra: One can charge extra interest.

‘Dear lender, what is the amount?’

Mahendra: You were not here when I was eating, now you must stay with me for longer.

Binodini laughed and said, ‘Your rules are so strict that it seems it will be difficult escaping from your clutches once caught!’

Mahendra answered, ‘Whatever my calculations, have I ever managed to get anything from you?’

Binodini said, ‘What do I have worth taking? But you hold me.’she suddenly turned serious and let out a sigh.

Mahendra grew serious too and asked, ‘Bali, is this then a prison for you?’

The man-servant came in a light as usual and left it on the three legged table. The sudden light in the room made Binodini shade her eyes with her hands as she said with downcast eyes, ‘How should I know! Who can win an argument against you? Let me go now, I have much to do.’ Mahendra grabbed her hand without warning and said, ‘When you have admitted to the bonds where do you want to go now?’ Binodini said, ‘Shame! Why try to stop the one who has nowhere to escape!’ She then drew her hand free and left the place.

Mahendra lay on the scented pillow as his heart beat faster and faster. In the midst of that silent evening in the lonely room and the fresh spring breeze, he felt as though he would not be able to control his madness now that Binodini’s mind seemed on the verge of yielding. He turned the light off, shut the door and closed the shutters and lay down much earlier than usual. This wasn’t even his old bed. Four or five mattresses had been added to make the bed much softer than before. These were perfumed as well, whether with Khus khus or with Aguru he was not sure. He kept turning from side to side in an effort to hold onto the old. But there was nothing.

There was a knock on the barred door at nine o’clock in the night. Binodini asked from outside, ‘Good Sir, your food is here, open the door.’ Mahendra hurried to open the door instantly. But he did not open it, lying down instead on the floor and saying, ‘No, I am not hungry, I will not eat.’ A worried voice was heard outside, ‘You are not well? Do you want me to get you some water? What would you like?’ Mahendra said, ‘I do not want anything, I really do not.’ Binodini said, ‘Please, do not lie to me. Even if you are not unwell, open the door once!’ Mahendra said with some force, ‘No, I will not open my door. No matter what! You can leave!’ He lay down quickly in his bed again and continued to search for memories of Asha in the empty bed and within the darkness that filled his unsettled heart.

When sleep refused to come to him, he lit a lamp and sat down with inkwell and pen to write a letter to Asha. He wrote, ‘Asha, do not leave me alone like this for too long. You are the guardian spirit of my life. I cannot tell which way my inclinations will carry me without the anchor of your presence. The light that guides my steps comes from the trusting eyes that look upon me, softened with love. Return quickly, you are my good, my steadfast, my only delight! Anchor me, save me, fulfil my heart. Rescue me from the great evil that I may commit by wronging you and the terrible act of forgetting you for more than a moment.’

Mahendra tried to push himself vigorously in Asha’s direction by writing to her till late into the night. Several church bells rang out from far away at three o’clock. There was hardly any noise from the traffic on the roads and even the songstress who had been humming Behag from her second storey window at the other end of the street had become silent and merged in the peace that descended upon the world. Mahendra expressed many sentiments to Asha in a long letter that seemed to calm his agitation greatly and when he finally lay down he fell asleep immediately.

When Mahendra woke in the morning, it was late and the sunshine streamed into the room. Mahendra sat up quickly and found that the events of the previous night seemed less foreboding now. After leaving the bed he found the letter he had written to Asha last night was on the stool under an inkwell. He re-read it and thought, ‘What have I done? This is the stuff of novels! Thank goodness I did not send it. What would she have thought on reading this? She would not have understood half the words.’ He felt ashamed that he had been so emotional previously and ripped the letter into pieces.

He then wrote a letter to Asha in a calmer frame of mind — ‘How many days do you need to be away for? If your uncle’s return is not fixed for sometime soon, write to me and I will go and fetch you myself. I do not like being here on my own.’

চোখের বালি ২৫/Chokher Bali 25

২৫

সেদিন নূতন ফাল্গুনে প্রথম বসন্তের হাওয়া দিতেই আশা অনেক দিন পরে সন্ধ্যার আরম্ভে ছাদে মাদুর পাতিয়া বসিয়াছে। একখানি মাসিক কাগজ লইয়া খণ্ডশ প্রকাশিত একটা গল্প খুব মনোযোগ দিয়া সেই অল্প আলোকে পড়িতেছিল। গল্পের নায়ক তখন সংবৎসর পরে পূজার ছুটিতে বাড়ি আসিবার সময় ডাকাতের হাতে পড়িয়াছে,আশার হৃদয় উদ্বেগে কাঁপিতেছিল; এ দিকে হতভাগিনী নায়িকা ঠিক সেই সময়েই বিপদের স্বপ্ন দেখিয়া কাঁদিয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। আশা চোখের জল আর রাখিতে পারে না। আশা বাংলা গল্পের অত্যন্ত উদার সমালোচক ছিল। যাহা পড়িত,তাহাই মনে হইত চমৎকার। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিত,”ভাই চোখের বালি, মাথা খাও, এ গল্পটা পড়িয়া দেখো। এমন সুন্দর! পড়িয়া আর কাঁদিয়া বাঁচি না।” বিনোদিনী ভালোমন্দ বিচার করিয়া আশার উচ্ছ্বসিত উৎসাহে বড়ো আঘাত করিত।

আজিকার এই গল্পটা আশা মহেন্দ্রকে পড়াইবে বলিয়া স্থির করিয়া যখন সজল-চক্ষে কাগজখানা বন্ধ করিল, এমন সময় মহেন্দ্র আসিয়া উপস্থিত হইল। মহেন্দ্রের মুখ দেখিয়াই আশা উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল। মহেন্দ্র জোর করিয়া প্রফুল্লতা আনিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “একলা ছাদের উপর কোন্ ভাগ্যবানের ভাবনায় আছ?”

আশা নায়ক-নায়িকার কথা একেবারে ভুলিয়া গিয়া কহিল, “তোমার কী শরীর আজ ভালো নাই।”

মহেন্দ্র। শরীর বেশ আছে।

আশা। তবে তুমি মনে মনে কী একটা ভাবিতেছ, আমাকে খুলিয়া বলো।

মহেন্দ্র আশার বাটা হইতে একটা পান তুলিয়া লইয়া মুখে দিয়া কহিল, “আমি ভাবিতেছিলাম, তোমার মাসিমা বেচারা কত দিন তোমাকে দেখেন নাই। একবার হঠাৎ যদি তুমি তাঁহার কাছে গিয়া পড়িতে পার, তবে তিনি কত খুশিই হন।”

আশা কোনো উত্তর না করিয়া মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। হঠাৎ এ কথা আবার নূতন করিয়া কেন মহেন্দ্রের মনে উদয় হইল, তাহা সে বুঝিতে পারিল না।

আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া মহেন্দ্র কহিল, “তোমার যাইতে ইচ্ছা করে না?”

এ কথার উত্তর দেওয়া কঠিন। মাসিকে দেখিবার জন্য যাইতে ইচ্ছা করে, আবার মহেন্দ্রকে ছাড়িয়া যাইতে ইচ্ছাও করে না। আশা কহিল, “কালেজের ছুটি পাইলে তুমি যখন যাইতে পারিবে, আমিও সঙ্গে যাইব।”

মহেন্দ্র। ছুটি পাইলেও যাইবার জো নাই; পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে।

আশা। তবে থাক্, এখন না-ই গেলাম।

মহেন্দ্র। থাক্ কেন। যাইতে চাহিয়াছিলে, যাও-না।

আশা। না, আমার যাইবার ইচ্ছা নাই।

মহেন্দ্র। এই সেদিন এত ইচ্ছা ছিল, হঠাৎ ইচ্ছা চলিয়া গেল?

আশা এই কথায় চুপ করিয়া চোখ নিচু করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনীর সঙ্গে সন্ধি করিবার জন্য বাধাহীন অবসর চাহিয়া মহেন্দ্রের মন ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত অধীর হইয়া উঠিয়াছিল। আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া তাহার একটা অকারণ রাগের সঞ্চার হইল। কহিল, “আমার উপর মনে মনে তোমার কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে নাকি। তাই আমাকে চোখে চোখে পাহারা দিয়া রাখিতে চাও?”

আশার স্বাভাবিক মৃদুতা নম্রতা ধৈর্য মহেন্দ্রের কাছে হঠাৎ অত্যন্ত অসহ্য হইয়া উঠিল। মনে মনে কহিল, “মাসির কাছে যাইতে ইচ্ছা আছে, বলো যে, আমি যাইবই, আমাকে যেমন করিয়া হোক পাঠাইয়া দাও–তা নয়, কখনো হাঁ, কখনো না, কখনো চুপচাপ–এ কী রকম।’

হঠাৎ মহেন্দ্রের এই উগ্রতা দেখিয়া আশা বিস্মিত ভীত হইয়া উঠিল। সে অনেক চেষ্টা করিয়া কোনো উত্তরই ভাবিয়া পাইল না। মহেন্দ্র কেন যে কখনো হঠাৎ এত আদর করে, কখনো হঠাৎ এমন নিষ্ঠুর হইয়া উঠে, তাহা সে কিছুই বুঝিতে পারে না। এইরূপে মহেন্দ্র যতই তাহার কাছে দুর্বোধ্য হইয়া উঠিতেছে, ততই আশার কম্পান্বিত চিত্ত ভয়ে ও ভালোবাসায় তাহাকে যেন অত্যন্ত অধিক করিয়া বেষ্টন করিয়া ধরিতেছে।

মহেন্দ্রকে আশা মনে মনে সন্দেহ করিয়া চোখে চোখে পাহারা দিতে চায়! ইহা কি কঠিন উপহাস, না নির্দয় সন্দেহ? শপথ করিয়া কি ইহার প্রতিবাদ আবশ্যক, না হাস্য করিয়া ইহা উড়াইয়া দিবার কথা?

হতবুদ্ধি আশাকে পুনশ্চ চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া অধীর মহেন্দ্র দ্রুতবেগে সেখান হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল। তখন কোথায় রহিল মাসিক পত্রের সেই গল্পের নায়ক, কোথায় রহিল গল্পের নায়িকা। সূর্যাস্তের আভা অন্ধকারে মিশাইয়া গেল, সন্ধ্যারম্ভের ক্ষণিক বসন্তের বাতাস গিয়া শীতের হাওয়া দিতে লাগিল–তখনো আশা সেই মাদুরের উপর লুণ্ঠিত হইয়া পড়িয়া রহিল।

অনেক রাত্রে আশা শয়নঘরে গিয়া দেখিল, মহেন্দ্র তাহাকে না ডাকিয়াই শুইয়া পড়িয়াছে। তখনই আশার মনে হইল, স্নেহময়ী মাসির প্রতি তাহার উদাসীনতা কল্পনা করিয়া মহেন্দ্র তাহাকে মনে মনে ঘৃণা করিতেছে। বিছানার মধ্যে ঢুকিয়াই আশা মহেন্দ্রের দুই পা জড়াইয়া তাহার পায়ের উপর মুখ রাখিয়া পড়িয়া রহিল। তখন মহেন্দ্র করুণায় বিচলিত হইয়া তাহাকে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিল। আশা কিছুতেই উঠিল না। সে কহিল, “আমি যদি কোনো দোষ করিয়া থাকি, আমাকে মাপ করো।”

মহেন্দ্র আর্দ্রচিত্তে কহিল, “তোমার কোনো দোষ নাই, চুনি। আমি নিতান্ত পাষণ্ড, তাই তোমাকে অকারণে আঘাত করিয়াছি।”

তখন মহেন্দ্রের দুই পা অভিষিক্ত করিয়া আশার অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। মহেন্দ্র উঠিয়া বসিয়া তাহাকে দুই বাহুতে তুলিয়া আপনার পাশে শোয়াইল। আশার রোদনবেগ থামিলে সে কহিল, “মাসিকে কি আমার দেখিতে যাইবার ইচ্ছা করে না। কিন্তু তোমাকে ফেলিয়া আমার যাইতে মন সরে না। তাই আমি যাইতে চাই নাই, তুমি রাগ করিয়ো না।”

মহেন্দ্র ধীরে ধীরে আশার আর্দ্র কপোল মুছাইতে মুছাইতে কহিল, “এ কি রাগ করিবার কথা, চুনি। আমাকে ছাড়িয়া যাইতে পার না, সে লইয়া আমি রাগ করিব? তোমাকে কোথাও যাইতে হইবে না।”

আশা কহিল, “না, আমি কাশী যাইব।”

মহেন্দ্র। কেন।

আশা। তোমাকে মনে মনে সন্দেহ করিয়া যাইতেছি না–এ কথা যখন একবার তোমার মুখ দিয়া বাহির হইয়াছে, তখন আমাকে কিছুদিনের জন্যও যাইতেই হইবে।

মহেন্দ্র। আমি পাপ করিলাম, তাহার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে করিতে হইবে?

আশা। তাহা আমি জানি না–কিন্তু পাপ আমার কোনোখানে হইয়াছেই, নহিলে এমন-সকল অসম্ভব কথা উঠিতেই পারিত না। যে-সব কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিতে পারিতাম না, সে-সব কথা কেন শুনিতে হইতেছে।

মহেন্দ্র। তাহার কারণ, আমি যে কী মন্দ লোক তাহা তোমার স্বপ্নেরও অগোচর।

আশা ব্যস্ত হইয়া কহিল, “আবার! ও কথা বলিয়ো না। কিন্তু এবার আমি কাশী যাইবই।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “আচ্ছা যাও, কিন্তু তোমার চোখের আড়ালে আমি যদি নষ্ট হইয়া যাই, তাহা হইলে কী হইবে।”

আশা কহিল, “তোমার আর অত ভয় দেখাইতে হইবে না, আমি কিনা ভাবিয়া অস্থির হইতেছি।”

মহেন্দ্র। কিন্তু ভাবা উচিত। তোমার এমন স্বামীটিকে যদি অসাবধানে বিগড়াইতে দাও, তবে এর পরে কাহাকে দোষ দিবে?

আশা। তোমাকে দোষ দিব না, সেজন্য তুমি ভাবিয়ো না।

মহেন্দ্র। তখন নিজের দোষ স্বীকার করিবে?

আশা। একশোবার।

মহেন্দ্র। আচ্ছা, তাহা হইলে কাল একবার তোমার জেঠামশায়ের সঙ্গে গিয়া কথাবার্তা ঠিক করিয়া আসিব।

এই বলিয়া মহেন্দ্র “অনেক রাত হইয়াছে’ বলিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল।

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পুনর্বার এ পাশে ফিরিয়া কহিল, “চুনি, কাজ নাই, তুমি নাই বা গেলে।”

আশা কাতর হইয়া কহিল, “আবার বারণ করিতেছ কেন। এবার একবার না গেলে তোমার সেই ভর্ৎসনাটা আমার গায়ে লাগিয়া থাকিবে। আমাকে দু-চার দিনের জন্যও পাঠাইয়া দাও।”

মহেন্দ্র কহিল, “আচ্ছা।” বলিয়া আবার পাশ ফিরিয়া শুইল।

কাশী যাইবার আগের দিন আশা বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া কহিল, “ভাই বালি, আমার গা ছুঁইয়া একটা কথা বল্।”

বিনোদিনী আশার গাল টিপিয়া ধরিয়া কহিল, “কী কথা, ভাই। তোমার অনুরোধ আমি রাখিব না?”

আশা। কে জানে ভাই, আজকাল তুমি কী রকম হইয়া গেছ। কোনোমতেই যেন আমার স্বামীর কাছে বাহির হইতে চাও না।

বিনোদিনী। কেন চাই না সে কি তুই জানিস নে, ভাই। সেদিন বিহারীবাবুকে মহেন্দ্রবাবু যে কথা বলিলেন, সে কি তুই নিজের কানে শুনিস নাই। এ-সকল কথা যখন উঠিল তখন কি আর বাহির হওয়া উচিত–তুমিই বলো-না, ভাই বালি।

ঠিক উচিত যে নহে, তাহা আশা বুঝিত। এ-সকল কথার লজ্জাকরতা যে কতদূর, তাহাও সে নিজের মন হইতেই সম্প্রতি বুঝিয়াছে। তবু বলিল, “কথা অমন কত উঠিয়া থাকে, সে-সব যদি না সহিতে পারিস তবে আর ভালোবাসা কিসের, ভাই। ও কথা ভুলিতে হইবে।”

বিনোদিনী। আচ্ছা ভাই, ভুলিব।

আশা। আমি তো ভাই, কাল কাশী যাইব, আমার স্বামীর যাহাতে কোনো অসুবিধা না হয় তোমাকে সেইটে বিশেষ করিয়া দেখিতে হইবে। এখনকার মতো পালাইয়া বেড়াইলে চলিবে না।

বিনোদিনী চুপ করিয়া রহিল। আশা বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “মাথা খা ভাই বালি, এই কথাটা আমাকে দিতেই হইবে।”

বিনোদিনী কহিল, “আচ্ছা।”

Kalighat-Paintings-04

Chapter 25
Asha had spread a mat upon the terrace at the twilight hour after a very long time as there was a fresh spring breeze at the start of the month of Phalgun. She was reading a serialized story in a monthly magazine with great attentiveness in the fading light. The hero of the story was in the clutches of highwaymen while on his yearly journey back home during the Puja holidays; Asha’s heart was filled with apprehension. At this point the wretched heroine had also just woken from a nightmare and Asha’s eyes welled with tears. Asha was a very lenient critic of Bengali literature. She found everything that she read to be of the highest quality. She would call Binodini and tell her, ‘Bali, upon my heart! Please read this! It is so well written I cannot hold back my tears.’ Binodini would then judge the piece on its merits and cause much grief to Asha’s sense of enthusiastic approval.

As she tearfully shut the book and decided to read the story later to Mahendra, he appeared on the terrace. She grew anxious on seeing his face although he tried hard to compose his features, saying, ‘Who is the fortunate for whom you wait on this terrace?’

Asha forgot all about the characters of the story and asked, ‘Are you not well today?’

Mahendra: I am well.

Asha: Then tell me what is worrying you.

Mahendra took a folded paan from her container, put it in his mouth and said, ‘I was thinking that your poor aunt has not seen you for a very long time. If you pay her a sudden visit, how happy you will make her.’

Asha said nothing and looked at Mahendra. She could not understand why he was suddenly thinking about this again.
Mahendra noticed her silence and remarked, ‘Do you not want to go?’

This was not easily answered. She wanted to see her aunt but she did not wish to leave Mahendra. Asha said, ‘I will go with you, when you have a break from college.’

Mahendra: I cannot go even if I get a break; I will need to prepare for the examinations.

Asha: Then let it be, I won’t go now.

Mahendra: Why? You wanted to go and so you should.

Asha: No, I have no wish to go.

Mahendra: You wanted to go so much just the other day, what happened to that?

Asha remained silent and cast her eyes down at this. Mahendra had been growing very anxious to have Binodini to himself for an uninterrupted length of time in order to mend his bonds with her. He became angry with Asha when she did not say anything and said rather unreasonably, ‘Are you suspecting me of anything? Is that why you wish to keep an eye on me at all times?’

Asha’s natural gentleness and patience suddenly felt completely unbearable in Mahendra’s eyes. He said to himself, ‘If you want to go to your aunt say that you must go, send me any way – but I cannot bear this agreeing at times and refusing at others; this silence is incomprehensible!’

Asha became frightened and amazed at Mahendra’s unexpected rudeness. She could not answer his questions or understand why he could be so loving at times and so cruel on occasion. The less she understood him the more her apprehensive heart filled with fear and love for Mahendra and tried to cling to him.
‘She wants to keep him under watch because she suspects him! Was that a cruel jest or heartless suspicion? Was she to pledge her protest or laugh it away as a fancy?’

Mahendra left the place quickly when he saw Asha’s confusion and silence. No one got to hear of the storybook hero’s trials or of his heroine’s tears. The sunset faded into the night, the pleasant spring breezes disappeared as the terrace grew cold and Asha lay on on her mat alone.

When she went to their bedroom much later that night, she found Mahendra had fallen asleep without calling her to bed. She immediately supposed that he was judging her for her callous attitude towards her loving aunt. She held her face to his feet and lay there till he was overcome with pity and tried to raise her. She would not be moved and said, ‘If I have done anything wrong, forgive me.’

Mahendra said tenderly, ‘You have not done anything wrong, Chuni. I am entirely heartless and have given you pain without reason.’

Asha’s tears continued to fall on his feet. He sat up and took her in his arms and made her lie down beside him. When her tears lessened, she said, ‘Do I not want to see my aunt? But I do not wish to leave you and go. That is the only reason I refused, do not be angry with me.’

Mahendra dried her wet cheeks gently and said, ‘Is this something to get angry over? Why should I be angry because you do not wish to go without me? You do not have to go anywhere!’

Asha said, ‘No, I will go to Kashi.’

Mahendra: Why?

Asha: When you have admitted that I am not staying because I cannot trust you, I must go for a few days at least.
Mahendra: I am the one who sinned, and you are the one that has to seek salvation?

Asha: I do not know about that – but I must have sinned somehow, else why do I have to hear such talk. Why do I have to listen to things that are beyond my wildest dreams.

Mahendra: That is because you cannot dream of how bad I can be.

‘Again? Do not say that! This time I am most definitely going to Kashi,’ Asha said quickly.

Mahendra laughed and answered, ‘Fine, go then! But what will happen if something befalls me in your absence, what then?’

Asha said, ‘You do not have to try and frighten me, am I that worried about it!’

Mahendra: But you need to think about it. If your husband is distracted by someone else through lack of supervision, who will you blame?

Asha: I will never blame you, you do not need to worry about that.

Mahendra: Will you admit your fault then?

Asha: A hundred times!

Mahendra: I will then go and speak to your uncle tomorrow about this and finalise your arrangements for the journey.
He then turned to the other side saying, ‘It is very late.’

After a short while, he suddenly turned to Asha again and said, ‘Chuni, it is perhaps best if you did not go.’

Pained, Asha said, ‘Why are you stopping me again? If I do not go now, the words you once rebuked me with will remain with me forever. Send me even if it is only for a couple of days.’

Mahendra answered, ‘Alright,’and then turned to his side.

The day before she left for Kashi, Asha wrapped her arms around Binodini’s neck and said, ‘Dear Bali, touch my skin and tell me the truth about one thing.’

Binodini pinched Asha’s cheek and said, ‘What must I tell you? Do you think I will not heed a request from you?’
Asha: Who knows why, but you have changed. You never seem to want to be here when my husband is around.

Binodini: Do you not know why I don’t want that? Did you not hear what Mahendra said to Bihari that day? Is it right that I should continue behaving with the freedom that I once enjoyed after these words have been uttered? Why don’t you tell me, Bali?

Asha knew that it was not right. She too had recently begun to comprehend how shameful those words had been. Despite that, she said, ‘People say so many things, if you cannot bear them then where is the love you professed? You must forget all that was said.’

Binodini: Alright, I will forget everything.

Asha: I am leaving for Kashi tomorrow sister; you must take special care to ensure that my husband is not inconvenienced. You will not avoid him as you have been doing lately.

Binodini remained silent. Asha grabbed her hand and pleaded, ‘Please Bali, you must give me your word!’

Binodini said, ‘Certainly.’

চোখের বালি ২৪/Chokher Bali 24

২৪
মহেন্দ্র ভাবিতে লাগিল, ‘আমি বলিয়াছি মিথ্যা কথা, আমি বিনোদিনীকে ভালোবাসি না। অত্যন্ত কঠিন করিয়া বলিয়াছি। আমি যে তাহাকে ভালোবাসি তাহা না-ই হইল, কিন্তু ভালোবাসি না, এ কথাটা বড়ো কঠোর। এ কথায় আঘাত না পায় এমন স্ত্রীলোক কে আছে। ইহার প্রতিবাদ করিবার অবসর কবে কোথায় পাইব। ভালোবাসি এ কথা ঠিক বলা যায় না; কিন্তু ভালোবাসি না, এই কথাটাকে একটু ফিকা করিয়া, নরম করিয়া জানানো দরকার। বিনোদিনীর মনে এমন-একটা নিষ্ঠুর অথচ ভুল সংস্কার থাকিতে দেওয়া অন্যায়।’
এই বলিয়া মহেন্দ্র তাহার বাক্সর মধ্য হইতে আর-একবার তাহার চিঠি তিনখানি পড়িল। মনে মনে কহিল, ‘বিনোদিনী আমাকে যে ভালোবাসে, ইহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু কাল সে বিহারীর কাছে অমন করিয়া আসিয়া পড়িল কেন। সে কেবল আমাকে দেখাইয়া। আমি যখন তাহাকে ভালোবাসি না স্পষ্ট করিয়া বলিলাম, তখন সে কোনো সুযোগে আমার কাছে তাহার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান না করিয়া কী করিবে। এমনি করিয়া আমার কাছে অবমানিত হইয়া হয়তো সে বিহারীকে ভালোবাসিতেও পারে।’
মহেন্দ্রের ক্ষোভ এতই বাড়িয়া উঠিতে লাগিল যে, নিজের চাঞ্চল্যে সে নিজে আশ্চর্য এবং ভীত হইয়া উঠিল। নাহয় বিনোদিনী শুনিয়াছে, মহেন্দ্র তাহাকে ভালোবাসে না– তাহাতে দোষ কী। নাহয় এই কথায় অভিমানিনী বিনোদিনী তাহার উপর হইতে মন সরাইয়া লইতে চেষ্টা করিবে– তাহাতেই বা ক্ষতি কী। ঝড়ের সময় নৌকার শিকল যেমন নোঙরকে টানিয়া ধরে, মহেন্দ্র তেমনি ব্যাকুলতার সঙ্গে আশাকে যেন অতিরিক্ত জোর করিয়া ধরিল।
রাত্রে মহেন্দ্র আশার মুখ বক্ষের কাছে ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “চুনি, তুমি আমাকে কতখানি ভালোবাস ঠিক করিয়া বলো।”
আশা ভাবিল, “এ কেমন প্রশ্ন। বিহারীকে লইয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক যে-কথাটা উঠিয়াছে, তাহাতেই কি তাহার উপরে সংশয়ের ছায়া পড়িয়াছে।” সে লজ্জায় মরিয়া গিয়া কহিল, “ছি ছি, আজ তুমি এমন প্রশ্ন কেন করিলে। তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে খুলিয়া বলো– আমার ভালোবাসায় তুমি কবে কোথায় কী অভাব দেখিয়াছ।”
মহেন্দ্র আশাকে পীড়ন করিয়া তাহার মাধুর্য বাহির করিবার জন্য কহিল, “তবে তুমি কাশী যাইতে চাহিতেছ কেন।”
আশা কহিল, “আমি কাশী যাইতে চাই না, আমি কোথাও যাইব না।”
মহেন্দ্র। তখন তো চাহিয়াছিলে।
আশা অত্যন্ত পীড়িত হইয়া কহিল, “তুমি তো জান, কেন চাহিয়াছিলাম।”
মহেন্দ্র। আমাকে ছাড়িয়া তোমার মাসির কাছে বোধ হয় বেশ সুখে থাকিতে।
আশা কহিল, “কখনো না। আমি সুখের জন্য যাইতে চাহি নাই।”
মহেন্দ্র কহিল, “আমি সত্য বলিতেছি চুনি, তুমি আর-কাহাকেও বিবাহ করিলে ঢের বেশি সুখী হইতে পারিতে।”
শুনিয়া আশা চকিতের মধ্যে মহেন্দ্রের বক্ষ হইতে সরিয়া গিয়া, বালিশে মুখ ঢাকিয়া, কাঠের মতো আড়ষ্ট হইয়া রহিল– মুহূর্তপরেই তাহার কান্না আর চাপা রহিল না। মহেন্দ্র তাহাকে সান্ত্বনা দিবার জন্য বক্ষে তুলিয়া লইবার চেষ্টা করিল, আশা বালিশ ছাড়িল না। পতিব্রতার এই অভিমানে মহেন্দ্র সুখে গর্বে ধিক্‌কারে ক্ষুব্ধ হইতে লাগিল।
যে-সব কথা ভিতরে-ভিতরে আভাসে ছিল, সেইগুলা হঠাৎ স্পষ্ট কথায় পরিস্ফুট হইয়া সকলেরই মনে একটা গোলমাল বাধাইয়া দিল। বিনোদিনী মনে মনে ভাবিতে লাগিল– অমন স্পষ্ট অভিযোগের বিরুদ্ধে বিহারী কেন কোনো প্রতিবাদ করিল না। যদি সে মিথ্যা প্রতিবাদও করিত, তাহা হইলেও যেন বিনোদিনী একটু খুশি হইত। বেশ হইয়াছে, মহেন্দ্র বিহারীকে যে-আঘাত করিয়াছে, তাহা তাহার প্রাপ্যই ছিল। বিহারীর মতো অমন মহৎ লোক কেন আশাকে ভালোবাসিবে। এই আঘাতে বিহারীকে যে দূরে লইয়া গেছে, সে যেন ভালোই হইয়াছে– বিনোদিনী যেন নিশ্চিন্ত হইল।
কিন্তু বিহারীর সেই মৃত্যুবাণাহত রক্তহীন পাংশু মুখ বিনোদিনীকে সকল কর্মের মধ্যে যেন অনুসরণ করিয়া ফিরিল। বিনোদিনীর অন্তরে যে সেবাপরায়ণা নারীপ্রকৃতি ছিল, সে সেই আর্ত মুখ দেখিয়া কাঁদিতে লাগিল। রুগ্‌ণ শিশুকে যেমন মাতা বুকের কাছে দোলাইয়া বেড়ায়, তেমনি সেই আতুর মূর্তিকে বিনোদিনী আপন হৃদয়ের মধ্যে রাখিয়া দোলাইতে লাগিল; তাহাকে সুস্থ করিয়া সেই মুখে আবার রক্তের রেখা, প্রাণের প্রবাহ, হাস্যের বিকাশ দেখিবার জন্য বিনোদিনীর একটা অধীর ঔৎসুক্য জন্মিল।
দুই-তিন দিন সকল কর্মের মধ্যে এইরূপ উন্মনা হইয়া ফিরিয়া বিনোদিনী আর থাকিতে পারিল না। বিনোদিনী একখানি সান্ত্বনার পত্র লিখিল, কহিল–

‘ঠাকুরপো, আমি তোমার সেদিনকার সেই শুষ্ক মুখ দেখিয়া অবধি প্রাণমনে কামনা করিতেছি, তুমি সুস্থ হও, তুমি যেমন ছিলে তেমনিটি হও– সেই সহজ হাসি আবার কবে দেখিব, সেই উদার কথা আবার কবে শুনিব। তুমি কেমন আছ, আমাকে একটি ছত্র লিখিয়া জানাও।
তোমার বিনোদ-বৌঠান।’

বিনোদিনী দরোয়ানের হাত দিয়া বিহারীর ঠিকানায় চিঠি পাঠাইয়া দিল।
আশাকে বিহারী ভালোবাসে, এ কথা যে এমন রূঢ় করিয়া, এমন গর্হিতভাবে মহেন্দ্র মুখে উচ্চারণ করিতে পারিবে, তাহা বিহারী স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই। কারণ, সে নিজেও এমন কথা স্পষ্ট করিয়া কখনো মনে স্থান দেয় নাই। প্রথমটা বজ্রাহত হইল– তার পরে ক্রোধে ঘৃণায় ছটফট করিয়া বলিতে লাগিল, ‘অন্যায়, অসংগত, অমূলক।’
কিন্তু কথাটা যখন একবার উচ্চারিত হইয়াছে, তখন তাহাকে আর সম্পূর্ণ মারিয়া ফেলা যায় না। তাহার মধ্যে যেটুকু সত্যের বীজ ছিল, তাহা দেখিতে দেখিতে অঙ্কুরিত হইয়া উঠিতে লাগিল। কন্যা দেখিবার উপলক্ষে সেই যে একদিন সূর্যাস্তকালে বাগানের উচ্ছ্বসিত পুষ্পগন্ধপ্রবাহে লজ্জিতা বালিকার সুকুমার মুখখানিকে সে নিতান্তই আপনার মনে করিয়া বিগলিত অনুরাগের সহিত একবার চাহিয়া দেখিয়াছিল, তাহাই বার বার মনে পড়িতে লাগিল, এবং বুকের কাছে কী যেন চাপিয়া ধরিতে লাগিল, এবং একটা অত্যন্ত কঠিন বেদনা কণ্ঠের কাছ পর্যন্ত আলোড়িত হইয়া উঠিল। দীর্ঘরাত্রি ছাদের উপর শুইয়া শুইয়া, বাড়ির সম্মুখের পথে দ্রুতপদে পায়চারি করিতে করিতে, যাহা এতদিন অব্যক্ত ছিল তাহা বিহারীর মনে ব্যক্ত হইয়া উঠিল। যাহা সংযত ছিল তাহা উদ্দাম হইল; নিজের কাছেও যাহার কোনো প্রমাণ ছিল না, মহেন্দ্রের বাক্যে তাহা বিরাট প্রাণ পাইয়া বিহারীর অন্তর-বাহির ব্যাপ্ত করিয়া দিল।
তখন সে নিজেকে অপরাধী বলিয়া বুঝিল। মনে মনে কহিল, ‘আমার তো আর রাগ করা শোভা পায় না, মহেন্দ্রের কাছে তো ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বিদায় লইতে হইবে। সেদিন এমনভাবে চলিয়া আসিয়াছিলাম, যেন মহেন্দ্র দোষী, আমি বিচারক– সে অন্যায় স্বীকার করিয়া আসিব।’
বিহারী জানিত, আশা কাশী চলিয়া গেছে। একদিন সে সন্ধ্যার সময় ধীরে ধীরে মহেন্দ্রের দ্বারের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজলক্ষ্মীর দূরসম্পর্কের মামা সাধুচরণকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “সাধ্‌দা, কদিন আসিতে পারি নাই– এখানকার সব খবর ভালো?” সাধুচরণ সকলের কুশল জানাইল। বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “বৌঠান কাশীতে কবে গেলেন।” সাধুচরণ কহিল, “তিনি যান নাই। তাঁহার কাশী যাওয়া হইবে না।” শুনিয়া কিছু না মানিয়া অন্তঃপুরে যাইবার জন্য বিহারীর মন ছুটিল। পূর্বে যেমন সহজে যেমন আনন্দে আত্মীয়ের মতো সে পরিচিত সিঁড়ি বাহিয়া ভিতরে যাইত, সকলের সঙ্গে স্নিগ্ধ কৌতুকের সহিত হাস্যালাপ করিয়া আসিত, কিছুই মনে হইত না, আজ তাহা অবিহিত, তাহা দুর্লভ, জানিয়াই তাহার চিত্ত যেন উন্মত্ত হইল। আর-একটিবার, কেবল শেষবার, তেমনি করিয়া ভিতরে গিয়া ঘরের ছেলের মতো রাজলক্ষ্মীর সহিত কথা সারিয়া, একবার ঘোমটাবৃত আশাকে বৌঠান বলিয়া দুটো তুচ্ছ কথা কহিয়া আসা তাহার কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার বিষয় হইয়া উঠিল। সাধুচরণ কহিল, “ভাই, অন্ধকারে দাঁড়াইয়া রহিলে যে, ভিতরে চলো।”
শুনিয়া বিহারী দ্রুতবেগে ভিতরের দিকে কয়েক পদ অগ্রসর হইয়াই ফিরিয়া সাধুকে কহিল, “যাই একটা কাজ আছে।” বলিয়া তাড়াতাড়ি প্রস্থান করিল। সেই রাত্রেই বিহারী পশ্চিমে চলিয়া গেল।
দরোয়ান বিনোদিনীর চিঠি লইয়া বিহারীকে না পাইয়া চিঠি ফিরাইয়া লইয়া আসিল। মহেন্দ্র তখন দেউড়ির সম্মুখে ছোটো বাগানটিতে বেড়াইতেছিল। জিজ্ঞাসা করিল, “এ কাহার চিঠি।” দরোয়ান সমস্ত বলিল। মহেন্দ্র চিঠিখানি নিজে লইল।
একবার সে ভাবিল, চিঠিখানা লইয়া বিনোদিনীর হাতে দিবে– অপরাধিনী বিনোদিনীর লজ্জিত মুখ একবার সে দেখিয়া আসিবে– কোনো কথা বলিবে না। এই চিঠির মধ্যে বিনোদিনীর লজ্জার কারণ যে আছেই, মহেন্দ্রের মনে তাহাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। মনে পড়িল, পূর্বেও আর-একদিন বিহারীর নামে এমনি একখানা চিঠি গিয়াছিল। চিঠিতে কী লেখা আছে, এ কথা না জানিয়া মহেন্দ্র কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। সে মনকে বুঝাইল– বিনোদিনী তাহার অভিভাবকতায় আছে, বিনোদিনীর ভালোমন্দের জন্য সে দায়ী। অতএব এরূপ সন্দেহজনক পত্র খুলিয়া দেখাই তাহার কর্তব্য। বিনোদিনীকে বিপথে যাইতে দেওয়া কোনোমতেই হইতে পারে না।
মহেন্দ্র ছোটো চিঠিখানা খুলিয়া পড়িল। তাহা সরল ভাষায় লেখা, সেইজন্য অকৃত্রিম উদ্‌‍বেগ তাহার মধ্য হইতে পরিষ্কার প্রকাশ পাইয়াছে। চিঠিখানা পুনঃপুন পাঠ করিয়া এবং অনেক চিন্তা করিয়া মহেন্দ্র ভাবিয়া উঠিতে পারিল না, বিনোদিনীর মনের গতি কোন্‌ দিকে। তাহার কেবলই আশঙ্কা হইতে লাগিল, ‘আমি যে তাহাকে ভালোবাসি না বলিয়া অপমান করিয়াছি, সেই অভিমানেই বিনোদিনী অন্য দিকে মন দিবার চেষ্টা করিতেছে। রাগ করিয়া আমার আশা সে একেবারেই ছাড়িয়া দিয়াছে।’
এই কথা মনে করিয়া মহেন্দ্রের ধৈর্যরক্ষা করা একেবারে অসম্ভব হইয়া উঠিল। যে-বিনোদিনী তাহার নিকট আত্মসমর্পণ করিতে আসিয়াছিল, সে যে মুহূর্তকালের মূঢ়তায় সম্পূর্ণ তাহার অধিকারচ্যুত হইয়া যাইবে, সেই সম্ভাবনায় মহেন্দ্রকে স্থির থাকিতে দিল না। মহেন্দ্র ভাবিল, ‘বিনোদিনী আমাকে যদি মনে মনে ভালোবাসে, তাহা বিনোদিনীর পক্ষে মঙ্গলকর– এক জায়গায় সে বদ্ধ হইয়া থাকিবে।’ আমি নিজের মন জানি, আমি তো তাহার প্রতি কখনোই অন্যায় করিব না।সে আমাকে নিরাপদে ভালোবাসিতে পারে। আমি আশাকে ভালোবাসি, আমার দ্বারা তাহার কোনো ভয় নাই। কিন্তু সে যদি অন্য কোনো দিকে মন দেয় তবে তাহার কী সর্বনাশ হইতে পারে কে জানে। মহেন্দ্র স্থির করিল, নিজেকে ধরা না দিয়া বিনোদিনীর মন কোনো অবকাশে আর-একবার ফিরাইতেই হইবে।
মহেন্দ্র অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতেই দেখিল, বিনোদিনী পথের মধ্যেই যেন কাহার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া
প্রতীক্ষা করিতেছে। অমনি মহেন্দ্রের মনে চকিতের মধ্যে বিদ্বেষ জ্বলিয়া উঠিল। কহিল, “ওগো, মিথ্যা দাঁড়াইয়া আছ, দেখা পাইবে না। এই তোমার চিঠি ফিরিয়া আসিয়াছে।” বলিয়া চিঠিখানা ফেলিয়া দিল।
বিনোদিনী কহিল, “খোলা যে?”
মহেন্দ্র তাহার জবাব না দিয়াই চলিয়া গেল। বিহারী চিঠি খুলিয়া পড়িয়া কোনো উত্তর না দিয়া চিঠি ফেরত পাঠাইয়াছে মনে করিয়া বিনোদিনীর সর্বাঙ্গের সমস্ত শিরা দব্‌ দব্‌ করিতে লাগিল। যে দরোয়ান চিঠি লইয়া গিয়াছিল, তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইল; সে অন্য কাজে অনুপস্থিত ছিল, তাহাকে পাওয়া গেল না। প্রদীপের মুখ হইতে যেমন জ্বলন্ত তৈলবিন্দু ক্ষরিয়া পড়ে, রুদ্ধ শয়নকক্ষের মধ্যে বিনোদিনীর দীপ্ত নেত্র হইতে তেমনি হৃদয়ের জ্বালা অশ্রুজলে গলিয়া পড়িতে লাগিল। নিজের চিঠিখানা ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া কুটিকুটি করিয়া কিছুতেই তাহার সান্ত্বনা হইল না– সেই দুই-চারি লাইন কালির দাগকে অতীত হইতে বর্তমান হইতে একেবারেই মুছিয়া ফেলিবার, একেবারেই ‘না’ করিয়া দিবার কোনো উপায় নাই কেন। ক্রুদ্ধা মধুকরী যাহাকে সন্মুখে পায় তাহাকেই দংশন করে, ক্ষুব্ধা বিনোদিনী তেমনি তাহার চারি দিকের সমস্ত সংসারটাকে জ্বালাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। সে যাহা চায় তাহাতেই বাধা? কোনো কিছুতেই কি সে কৃতকার্য হইতে পারিবে না। সুখ যদি না পাইল, তবে যাহারা তাহার সকল সুখের অন্তরায়, যাহারা তাহাকে কৃতার্থতা হইতে ভ্রষ্ট, সমস্ত সম্ভবপর সম্পদ হইতে বঞ্চিত করিয়াছে, তাহাদিগকে পরাস্ত ধূলিলুন্ঠিত করিলেই তাহার ব্যর্থ জীবনের কর্ম সমাধা হইবে।

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

24

Mahendra kept thinking, ‘I said ‘It is a lie, I do not love Binodini.’ I have said this very harshly. I may not love her, but to declare that I do not love her is cruel indeed. There is hardly a woman who would not be hurt by that. When will I have a chance to refute this? I cannot say that I love her; but I need to tell her about not loving her in a gentler manner. It would be wrong to let her harbor such cruel but false notions about me.’

He then took the three letters out of his case and read them. He said to himself, ‘There is no doubt that Binodini loves me. But then why did she rush to Bihari yesterday in that manner? That was only to fool me. When I said clearly that I did not love her, there was little she could do but withdraw her feelings for me. Perhaps she will begin loving Bihari after being insulted by me.

Mahendra became so agitated that he was astonished and slightly worried by the strength of his own feelings. There was after all little harm in Binodini overhearing that he did not love her or in her attempting to curb her feelings for him after what she had heard him say. Just as an anchor feels the pull of the chain most strongly during a storm, Mahendra too felt drawn to Asha with more than usual intensity.

That night he held her face close to his own and asked, ‘Chuni, tell me how much you truly love me.’

Asha wondered, ‘What kind of question is this! Am I under a cloud of suspicion because of the shameful talk about Bihari and me?’ She almost died of shame and protested, saying, ‘Fie, how can you ask me such a question? I beg you to tell me – when did you see a lack of love on my part?’

He wished to extract her love by crushing her heart and said, ‘Why do you want to go to Kashi then?’

Asha answered, ‘I do not want to go to Kashi, I won’t go anywhere.’

Mahendra: But you did want to go previously.

Asha answered, greatly anguished, ‘You know why I did.’

Mahendra: You would have been happier perhaps with your aunt.

Asha answered, ‘Never! I did not want to go for the sake of happiness.’

Mahendra answered, ‘I am telling you honestly Chuni, you could have been much happier if you had married someone else.’

Asha moved away from Mahendra’s embrace, hid her face in her pillow and froze – then her tears could not be held back. Mahendra tried to pull her back to himself, but she would not let go of her pillow. Mahendra was both pleased and mortified at her indignation, seeing it as a sign of her commitment to her husband.

Thoughts that had been suppressed so far were now out in the open and causing turmoil in everyone’s minds. Binodini kept thinking, ‘Why did Bihari not protest such a clearly stated accusation?’ If he had protested, Binodini would have been pleased even if she knew that to be false. She felt that it was only fitting that Mahendra had hurt Bihari. Why should such a good man love Asha? She was happy to see that Bihari had been pushed away by this blow.

But she could not help thinking of his stricken, bloodless, pale face. The compassionate feminine heart that beat within her wept for him. She held onto that mortified image within her heart, much as a mother nurses a sick child and an intense eagerness grew in her heart to be the one to repair his hurt and see his face once again as it used to be, alive, suffused with life and brimming with laughter.

A few days passed in such thought before she could bear it no longer and wrote a note to console him,

‘Brother-in-law, since seeing your mortified face that day, I have been praying with all my heart that you are feeling better, that you become as you were before – when we will see you smile as easily as before and speak as openly as you did. Please write a few lines to me and tell me how you are.
Yours,
Binod, your sister-in-law’

She sent a doorman with the letter to Bihari’s house.

Bihari had not imagined even in his dreams that Mahendra would declare so rudely and vehemently that Bihari loved Asha. The reason was that he had never allowed the thought to enter his own mind. He was dumbstruck at first – then anger and shame tormented him and he protested it, saying, ‘Wrong, unjust, baseless!’

But now that the word had been spoken, it could no longer be silenced. The seeds of truth in it began to grow. He kept recalling how he had once looked up to see a shy girl’s beautiful face during sunset in a flower scented garden and had thought of her as his own; this was the thought that swirled through his mind and rose as a great pain that took him by the throat.

After spending the long night up on the terrace, he walked about on the street in front of his house. He became aware of something that he had not realised before; his emotions rose and what had previously been hidden now came to life as he thought of what Mahendra had said.

He then understood where he had done wrong and said to himself, ‘I do not have the right to be angry any more, I must beg forgiveness from Mahendra and leave. I must admit to him that I did him wrong by leaving him that day as I had judged him to be in the wrong.’

Bihari knew that Asha had gone to Kashi. One night he came to the house, slowly coming to Mahendra’s door. There he saw a distant uncle of Rajlakshmi’s called Sadhucharan, and asked him, ‘Sadhuda, I have not been able to come here for a few days, how are things?’ Sadhucharan told him that they were all well. Bihari then asked, ‘When did the daughter-in-law go to Kashi?’Sadhucharan answered, ‘She did not go. She will not be going.’ Bihari felt like going inside the house as soon as he heard this. His heart felt this all the more because he knew that it would be wrong, even impossible for him to do what he had once done; climb up the stairs like a member of the family and talk to all the family members in tones of happiness.
He wanted so much, for the last time possibly, to go in and talk to Rajlakshmi as her own son, to address the veiled Asha as his sister-in-law for one last time and say a few things to her. Sadhucharan said, ‘Why are you standing here in the dark, let us go in.’

Bihari took a few quick steps towards the inner house and then came back and said to Sadhu, ‘I need to go, I have something to do.’He left soon; that same night he went on a trip to the west.

The doorman came back with the letter as he did not find Bihari at home. Mahendra was walking in the small garden at the front of the house. He asked, ‘Whose letter is that?’ The man told him everything upon which Mahendra took the letter from him.

At one point he did think of giving the letter to Binodini just to see the shamed look on her face, and not say a thing. He had no doubt that the letter would hold information that would shame her. He remembered how she had sent another letter to Bihari once before. He could not control his curiosity about what had written in the letter. He convinced himself that she was in his care and that he was responsible for her well-being. Thus it was his responsibility to open all such suspicious letters. He could not let Binodini step off the path of righteousness.

Mahendra opened the letter and read the few lines. They were written in simple words and the sincerity of emotion was clearly expressed. He read it again and again, but even after that, he could not decide which way Binodini’s heart was inclining. He was fearful of what might happen, thinking, ‘She is turning from me to another because I insulted her by declaring I did not love her. She has forsaken all hope of me in her anger.’

When Mahendra thought of this, it became impossible for him to remain patient. He could not bear the thought that the woman who had come close to him should now be lost through the stupidity of a moment. He thought, ‘If Binodini has loved me, it is for her own good as it will keep her in one place. I know my own mind and I will never wrong her. She can love me without fear for I love Asha and she has no need to fear me. But if she begins to love another, then who can tell what harm she may come to.’ Mahendra decided that he would not yield himself but would try and draw Binodini’s heart back towards himself by any means.

Mahendra entered the inner house to see Binodini waiting there, as if in expectation of someone. His mind immediately filled with hatred. He said, ‘You wait in vain, he is not coming. Here is the letter you sent,’ and he threw the letter down.

Binodini asked, ‘But it seems to have been opened?’

Mahendra left without answering her. When she thought that Bihari might have read the letter and returned it without bothering with a reply, her veins seemed to throb in anger. She sent for the doorman who had taken her letter to Bihari but he was busy elsewhere. In the darkened bedroom where she had confined herself, her eyes seemed burn with the pain within her heart, the tears like heated oil dripping from a lamp. It was not enough to merely tear her own letter into a hundred pieces, she now wondered why it was not possible to completely erase the few lines of ink from both her past and her present and send them to oblivion.

Like an angry bee seeking to sting the first thing it sees, Binodini’s hurt made her want to harm the household that surrounded her. Why should there be such resistance to every one of her wishes? Why should she not succeed at anything at all? If she was to be denied happiness, then she would make it the purpose of her fruitless life to crush the lives of those who had been the obstacles to her happiness, standing in the path to her success and had kept her from enjoying all the riches she might have had otherwise.

চোখের বালি ২৩/ Chokher Bali 23

২৩

সংসারত্যাগিনী অন্নপূর্ণা বহুদিন পরে হঠাৎ মহেন্দ্রকে আসিতে দেখিয়া যেমন স্নেহে আনন্দে আপ্লুত হইয়া গেলেন, তেমনি তাঁহার হঠাৎ ভয় হইল, বুঝি আশাকে লইয়া মার সঙ্গে মহেন্দ্রের আবার কোনো বিরোধ ঘটিয়াছে এবং মহেন্দ্র তাঁহার কাছে নালিশ জানাইয়া সান্ত্বনালাভ করিতে আসিয়াছে। মহেন্দ্র শিশুকাল হইতেই সকলপ্রকার সংকট ও সন্তাপের সময় তাহার কাকীর কাছে ছুটিয়া আসে। কাহারো উপর রাগ করিলে অন্নপূর্ণা তাহার রাগ থামাইয়া দিয়াছেন, দুঃখবোধ করিলে তাহা সহজে সহ্য করিতে উপদেশ দিয়াছেন। কিন্তু বিবাহের পর হইতে মহেন্দ্রের জীবনে সর্বাপেক্ষা যে সংকটের কারণ ঘটিয়াছে, তাহার প্রতিকারচেষ্টা দূরে থাক্‌, কোনোপ্রকার সান্ত্বনা পর্যন্ত তিনি দিতে অক্ষম। সে সম্বন্ধে যেভাবে যেমন করিয়াই তিনি হস্তক্ষেপ করিবেন,তাহাতেই মহেন্দ্রের সাংসারিক বিপ্লব আরো দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিবে ইহাই যখন নিশ্চয় বুঝিলেন, তখনই তিনি সংসার ত্যাগ করিলেন। রুগ্‌ণ শিশু যখন জল চাহিয়া কাঁদে, এবং জল দেওয়া যখন কবিরাজের নিতান্ত নিষেধ, তখন পীড়িতচিত্তে মা যেমন অন্য ঘরে চলিয়া যান, অন্নপূর্ণা তেমনি করিয়া নিজেকে প্রবাসে লইয়া গেছেন। দূর তীর্থবাসে থাকিয়া ধর্মকর্মের নিয়মিত অনুষ্ঠানে এ কয়দিন সংসার অনেকটা ভুলিয়াছিলেন, মহেন্দ্র আবার কি সেই-সকল বিরোধের কথা তুলিয়া তাঁহার প্রচ্ছন্ন ক্ষতে আঘাত করিতে আসিয়াছে।

কিন্তু মহেন্দ্র আশাকে লইয়া তাহার মার সম্বন্ধে কোনো নালিশের কথা তুলিল না। তখন অন্নপূর্ণার আশঙ্কা অন্য পথে গেল। যে মহেন্দ্র আশাকে ছাড়িয়া কালেজে যাইতে পারিত না, সে আজ কাকীর খোঁজ লইতে কাশী আসে কেন। তবে কি আশার প্রতি মহেন্দ্রর টান ক্রমে ঢিলা হইয়া আসিতেছে। মহেন্দ্রকে তিনি কিছু আশঙ্কার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, “হাঁ রে মহিন, আমার মাথা খা, ঠিক করিয়া বল্‌ দেখি, চুনি কেমন আছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে তো বেশ ভালো আছে কাকীমা।”

“আজকাল সে কী করে, মহিন। তোরা কি এখনো তেমনি ছেলেমানুষ আছিস, না কাজকর্মে ঘরকন্নায় মন দিয়াছিস?”

মহেন্দ্র কহিল, “ছেলেমানুষি একেবারেই বন্ধ। সকল ঝঞ্ঝাটের মূল সেই চারুপাঠখানা যে কোথায় অদৃশ্য হইয়াছে, তাহার আর সন্ধান পাইবার জো নাই। তুমি থাকিলে দেখিয়া খুশি হইতে– লেখাপড়া শেখায় অবহেলা করা স্ত্রীলোকের পক্ষে যতদূর কর্তব্য, চুনি তাহা একান্ত মনে পালন করিতেছে।”

“মহিন, বিহারী কী করিতেছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “নিজের কাজ ছাড়া আর-সমস্তই করিতেছে। নায়েব-গোমস্তায় তাহার বিষয়সম্পত্তি দেখে; কী চক্ষে দেখে, তাহা ঠিক বলিতে পারি না। বিহারীর চিরকাল ঐ দশা। তাহার নিজের কাজ পরে দেখে, পরের কাজ সে নিজে দেখে।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি বিবাহ করিবে না, মহিন।”

মহেন্দ্র একটুখানি হাসিয়া কহিল, “কই, কিছুমাত্র উদ্‌যোগ তো দেখি না।”

শুনিয়া অন্নপূর্ণা হৃদয়ের গোপন স্থানে একটা আঘাত পাইলেন। তিনি নিশ্চয় বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাঁহার বোনঝিকে দেখিয়া, একবার বিহারী আগ্রহের সহিত বিবাহ করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহার সেই উন্মুখ আগ্রহ অন্যায় করিয়া অকস্মাৎ দলিত হইয়াছে। বিহারী বলিয়াছিল, “কাকীমা, আমাকে আর বিবাহ করিতে কখনো অনুরোধ করিয়ো না।” সেই বড়ো অভিমানের কথা অন্নপূর্ণার কানে বাজিতেছিল। তাঁহার একান্ত অনুগত সেই স্নেহের বিহারীকে তিনি এমন মনভাঙা অবস্থায় ফেলিয়া আসিয়াছিলেন, তাহাকে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারেন নাই। অন্নপূর্ণা অত্যন্ত বিমর্ষ ও ভীত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, “এখনো কি আশায় প্রতি বিহারীর মন পড়িয়া আছে।’

মহেন্দ্র কখনো ঠাট্টার ছলে, কখনো গম্ভীরভাবে, তাহাদের ঘরকন্নার আধুনিক সমস্ত খবর-বার্তা জানাইল, বিনোদিনীর কথার উল্লেখমাত্র করিল না।

এখন কালেজ খোলা, কাশীতে মহেন্দ্রের বেশি দিন থাকিবার কথা নয়। কিন্তু কঠিন রোগের পর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার মধ্যে গিয়া আরোগ্যলাভের যে সুখ, মহেন্দ্র কাশীতে অন্নপূর্ণার নিকটে থাকিয়া প্রতিদিন সেই সুখ অনুভব করিতেছিল– তাই একে একে দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল। নিজের সঙ্গে নিজের যে একটা বিরোধ জন্মিবার উপক্রম হইয়াছিল, সেটা দেখিতে দেখিতে দূর হইয়া গেল। কয়দিন সর্বদা ধর্মপরায়ণা অন্নপূর্ণার স্নেহমুখচ্ছবির সম্মুখে থাকিয়া, সংসারের কর্তব্যপালন এমনি সহজ ও সুখকর মনে হইতে লাগিল যে, তাহার পূর্বেকার আতঙ্ক হাস্যকর বোধ হইল। মনে হইল, বিনোদিনী কিছুই না। এমন কি, তাহার মুখের চেহারাই মহেন্দ্র স্পষ্ট করিয়া মনে আনিতে পারে না। অবশেষে মহেন্দ্র খুব জোর করিয়াই মনে মনে কহিল, “আশাকে আমার হৃদয় হইতে এক চুল সরাইয়া বসিতে পারে, এমন তো আমি কোথাও কাহাকেও দেখিতে পাই না।’

মহেন্দ্র অন্নপূর্ণাকে কহিল, “কাকীমা, আমার কালেজ কামাই যাইতেছে– এবারকার মতো তবে আসি। যদিও তুমি সংসারের মায়া কাটাইয়া একান্তে আসিয়া আছ– তবু অনুমতি করো মাঝে মাঝে আসিয়া তোমার পায়ের ধূলা লইয়া যাইব।”

মহেন্দ্র গৃহে ফিরিয়া আসিয়া যখন আশাকে তাহার মাসির স্নেহোপহার সিঁদুরের কৌটা ও একটি সাদা পাথরের চুমকি ঘটি দিল, তখন তাহার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাসিমার সেই পরমস্নেহময় ধৈর্য ও মাসিমার প্রতি তাহাদের ও তাহার শাশুড়ির নানাপ্রকার উপদ্রব স্মরণ করিয়া তাহার হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠিল। স্বামীকে জানাইল, “আমার বড়ো ইচ্ছা করে, আমি একবার মাসিমার কাছে গিয়া তাঁহার ক্ষমা ও পায়ের ধূলা লইয়া আসি। সে কি কোনোমতেই ঘটিতে পারে না।”

মহেন্দ্র আশার বেদনা বুঝিল, এবং কিছুদিনের জন্য কাশীতে সে তাহার মাসিমার কাছে যায়, ইহাতে তাহার সম্মতিও হইল। কিন্তু পুনর্বার কালেজ কামাই করিয়া আশাকে কাশী পৌঁছাইয়া দিতে তাহার দ্বিধা বোধ হইতে লাগিল।

আশা কহিল, “জেঠাইমা তো অল্পদিনের মধ্যেই কাশী যাইবেন, সেই সঙ্গে গেলে কি ক্ষতি আছে।”

মহেন্দ্র রাজলক্ষ্মীকে গিয়া কহিল, “মা, বউ একবার কাশীতে কাকীমাকে দেখিতে যাইতে চায়।”

রাজলক্ষ্মী শ্লেষবাক্যে কহিলেন, “বউ যাইতে চান তো অবশ্যই যাইবেন, যাও, তাঁহাকে লইয়া যাও।”

মহেন্দ্র যে আবার অন্নপূর্ণার কাছে যাতায়াত আরম্ভ করিল, ইহা রাজলক্ষ্মীর ভালো লাগে নাই। বধূর যাইবার প্রস্তাবে তিনি মনে মনে আরো বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।

মহেন্দ্র কহিল, “আমার কালেজ আছে, আমি রাখিতে যাইতে পারিব না। তাহার জেঠামশায়ের সঙ্গে যাইবে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে তো ভালো কথা। জেঠামশায়রা বড়োলোক, কখনো আমাদের মতো গরিবের ছায়া মাড়ান না, তাঁহাদের সঙ্গে যাইতে পারিলে কত গৌরব!”

মাতার উত্তরোত্তর শ্লেষবাক্যে মহেন্দ্রের মন একেবারে কঠিন হইয়া বাঁকিল। সে কোনো উত্তর না দিয়া আশাকে কাশী পাঠাইতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া চলিয়া গেল।

বিহারী যখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা করিতে আসিল, রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও বিহারী, শুনিয়াছিস, আমাদের বউমা যে কাশী যাইতে ইচ্ছা করিয়াছেন।”

বিহারী কহিল, “বল কী মা, মহিনদা আবার কালেজ কামাই করিয়া কাশী যাইবে?”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “না না, মহিন কেন যাইবেন। তা হইলে আর বিবিয়ানা হইল কই। মহিন এখানে থাকিবেন, বউ তাঁহার জেঠামহারাজের সঙ্গে কাশী যাইবেন। সবাই সাহেব-বিবি হইয়া উঠিল।”

বিহারী মনে মনে উদ্‌বিগ্ন হইল, বর্তমান কালের সাহেবিয়ানা স্মরণ করিয়া নহে। বিহারী ভাবিতে লাগিল, “ব্যাপারখানা কী। মহেন্দ্র যখন কাশী গেল আশা এখানে রহিল; আবার মহেন্দ্র যখন ফিরিল তখন আশা কাশী যাইতে চাহিতেছে। দুজনের মাঝখানে একটা কী গুরুতর ব্যাপার ঘটিয়াছে। এমন করিয়া কতদিন চলিবে? বন্ধু হইয়াও আমরা ইহার কোনো প্রতিকার করিতে পারিবে না– দূরে দাঁড়াইয়া থাকিব?’

মাতার ব্যবহারে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হইয়া মহেন্দ্র তাহার শয়নঘরে আসিয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী ইতিমধ্যে মহেন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নাই– তাই আশা তাহাকে পাশের ঘর হইতে মহেন্দ্রের কাছে লইয়া আসিবার জন্য অনুরোধ করিতেছিল।

এমন সময় বিহারী আসিয়া মহেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করিল, “আশা-বোঠানের কি কাশী যাওয়া স্থির হইয়াছে।”

মহেন্দ্র কহিল, “না হইবে কেন। বাধাটা কী আছে।”

বিহারী কহিল, “বাধার কথা কে বলিতেছে। কিন্তু হঠাৎ এ খেয়াল তোমাদের মাথায় আসিল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “মাসিকে দেখিবার ইচ্ছা– প্রবাসী আত্মীয়ের জন্য ব্যাকুলতা, মানবচরিত্রে এমন মাঝে মাঝে ঘটিয়া থাকে।”

বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি সঙ্গে যাইতেছ?”

প্রশ্ন শুনিয়াই মহেন্দ্র ভাবিল, “জেঠার সঙ্গে আশাকে পাঠানো সংগত নহে, এই কথা লইয়া আলোচনা করিতে বিহারী আসিয়াছে।’ পাছে অধিক কথা বলিতে গেলে ক্রোধ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে, তাই সংক্ষেপে বলিল, “না।”

বিহারী মহেন্দ্রকে চিনিত। সে যে রাগিয়াছে, তাহা বিহারীর আগোচর ছিল না। একবার জিদ ধরিলে তাহাকে টলানো যায় না, তাহাও সে জানিত। তাই মহেন্দ্রের যাওয়ার কথা আর তুলিল না। মনে মনে ভাবিল, “বেচারা আশা যদি কোনো বেদনা বহন করিয়াই চলিয়া যাইতেছে হয়, তবে সঙ্গে বিনোদিনী গেলে তাহার সান্ত্বনা হইবে।’ তাই ধীরে ধীরে কহিল, “বিনোদ-বোঠান তাঁর সঙ্গে গেলে হয় না?”

মহেন্দ্র গর্জন করিয়া উঠিল, “বিহারী, তোমার মনের ভিতর যে-কথাটা আছে, তাহা স্পষ্ট করিয়া বলো। আমার সঙ্গে অসরলতা করিবার কোনো দরকার দেখি না। আমি জানি, তুমি মনে মনে সন্দেহ করিয়াছ, আমি বিনোদিনীকে ভালোবাসি। মিথ্যা কথা। আমি বাসি না। আমাকে রক্ষা করিবার জন্য তোমাকে পাহারা দিয়া বেড়াইতে হইবে না। তুমি এখন নিজেকে রক্ষা করো। যদি সরল বন্ধুত্ব তোমার মনে থাকিত, তবে বহুদিন আগে তুমি আমার কাছে তোমার মনের কথা বলিতে এবং নিজেকে বন্ধুর অন্তঃপুর হইতে বহু দূরে লইয়া যাইতে। আমি তোমার মুখের সামনে স্পষ্ট করিয়া বলিতেছি, তুমি আশাকে ভালোবাসিয়াছ।”

অত্যন্ত বেদনার স্থানে দুই পা দিয়া মাড়াইয়া দিলে, আহত ব্যক্তি মুহূর্তকাল বিচার না করিয়া আঘাতকারীকে যেমন সবলে ধাক্কা দিয়া ফেলিতে চেষ্টা করে–রুদ্ধকণ্ঠ বিহারী তেমনি পাংশুমুখে তাহার চৌকি হইতে উঠিয়া মহেন্দ্রের দিকে ধাবিত হইল–হঠাৎ থামিয়া বহুকষ্টে স্বর বাহির করিয়া কহিল, “ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করুন, আমি বিদায় হই।” বলিয়া টলিতে টলিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল!

পাশের ঘর হইতে বিনোদিনী ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, “বিহারী-ঠাকুরপো!”

বিহারী দেয়ালে ভর করিয়া একটুখানি হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “কী, বিনোদ-বোঠান!”

বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, চোখের বালির সঙ্গে আমিও কাশীতে যাইব।”

বিহারী কহিল, “না না, বোঠান, সে হইবে না, সে কিছুতেই হইবে না। তোমাকে মিনতি করিতেছি–আমার কথায় কিছুই করিয়ো না। আমি এখানকার কেহ নই, আমি এখানকার কিছুতেই হস্তক্ষেপ করিতে চাহি না, তাহাতে ভালো হইবে না। তুমি দেবী, তুমি যাহা ভালো বোধ কর, তাহাই করিয়ো। আমি চলিলাম।”

বলিয়া বিহারী বিনোদিনীকে বিনম্র নমস্কার করিয়া চলিল। বিনোদিনী কহিল, “আমি দেবী নই ঠাকুরপো, শুনিয়া যাও। তুমি চলিয়া গেলে কাহারো ভালো হইবে না। ইহার পরে আমাকে দোষ দিয়ো না।”

বিহারী চলিয়া গেল। মহেন্দ্র স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া ছিল। বিনোদিনী তাহার প্রতি জ্বলন্ত বজ্রের মতো একটা কঠোর কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল, সে-ঘরে আশা একান্ত লজ্জায় সংকোচে মরিয়া যাইতেছিল। বিহারী তাহাকে ভালোবাসে, এ কথা মহেন্দ্রের মুখে শুনিয়া সে আর মুখ তুলিতে পারিতেছিল না। কিন্তু তাহার উপর বিনোদিনীর আর দয়া হইল না। আশা যদি তখন চোখ তুলিয়া চাহিত, তাহা হইলে সে ভয় পাইত। সমস্ত সংসারের উপর বিনোদিনীর যেন খুন চাপিয়া গেছে। মিথ্যা কথা বটে! বিনোদিনীকে কেহই ভালোবাসে না বটে! সকলেই ভালোবাসে এই লজ্জাবতী ননির পুতুলটিকে।

মহেন্দ্র সেই যে আবেগের মুখে বিহারীকে বলিয়াছিল, “আমি পাষণ্ড”–তাহার পর আবেগ শান্তির পর হইতে সেই হঠাৎ আত্মপ্রকাশের জন্য সে বিহারীর কাছে কুণ্ঠিত হইয়া ছিল। সে মনে করিতেছিল, তাহার সব কথাই যেন ব্যক্ত হইয়া গেছে। সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না, অথচ বিহারী জানিয়াছে যে সে ভালোবাসে–ইহাতে বিহারীর উপরে তাহার বড়ো একটা বিরক্তি জন্মিতেছিল। বিশেষত, তাহার পর হইতে যতবার বিহারী তাহার সম্মুখে আসিতেছিল তাহার মনে হইতেছিল, যেন বিহারী সকৌতূহলে তাহার একটা ভিতরকার কথা খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। সেই-সমস্ত বিরক্তি উত্তরোত্তর জমিতেছিল– আজ একটু আঘাতেই বাহির হইয়া পড়িল।

কিন্তু বিনোদিনী পাশের ঘর হইতে যেরূপ ব্যাকুলভাবে ছুটিয়া আসিল, যেরূপ আর্তকণ্ঠে বিহারীকে রাখিতে চেষ্টা করিল এবং বিহারীর আদেশ পালন স্বরূপে আশার সহিত কাশী যাইতে প্রস্তুত হইল, ইহা মহেন্দ্রের পক্ষে অভাবিতপূর্ব। এই দৃশ্যটি মহেন্দ্রকে প্রবল আঘাতে অভিভূত করিয়া দিল। সে বলিয়াছিল, সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না; কিন্তু যাহা শুনিল, যাহা দেখিল, তাহা তাহাকে সুস্থির হইতে দিল না, তাহাকে চারি দিক হইতে বিচিত্র আকারে পীড়ন করিতে লাগিল। আর কেবলই নিষ্ফল পরিতাপের সহিত মনে হইতে লাগিল, “বিনোদিনী শুনিয়াছে– আমি বলিয়াছি “আমি তাহাকে ভালোবাসি না’।’

punampntg

23

Although Annapurna had forsaken all ties to her home, she was overcome by her love for Mahendra and her happiness at seeing him after such a long time. She was also worried that he had come seeking support from her after quarrelling with his own mother over Asha. Since his childhood he had been in the habit of coming to his aunt whenever he was in strife or distressed. She had soothed his anger when he was upset with others and had taught him to put his pain aside when he was hurt by someone.

But the main reason behind the turmoil that affected Mahendra’s married life was something that she could not help with as she was indeed unable to provide any consolation. She had left home when it became clear to her that whatever her involvement in the matter, it would only serve to double the upheaval within the family. When a sick child cries for some water but the physician issues a strict order against it, the saddened mother must leave the room; Annapurna had gone away for much the same reason. She had largely managed to forget her old life by losing herself in the daily routine of prayers and religious activities and was worried that Mahendra had returned to talk of the conflict and reopen old wounds.

But Mahendra said nothing of his mother’s behavior with Asha. Annapurna then started to worry about something else. The man who had once been unable to attend classes as it would have meant leaving Asha alone was now in Kashi on his own to enquire after his aunt. Did this mean that his affection for Asha was lessening? She asked him with some trepidation. ‘Mahin, do tell me the truth, please! How is Chuni?’

Mahendra said, ‘She is fine Aunt.’

‘What does she do these days? Are you two still as immature as before, or have you started paying attention to the demands of daily life?’

Mahendra answered, ‘All childishness has been put aside. We cannot even find the old Charupath text that was at the root of all the problems. You will be pleased to know that Chuni devotes all her attention to neglecting her studies as wholeheartedly as any woman has ever done.’

‘What is Bihari doing?’

‘He is involved in everything but his own work; His employees look after his affairs but the nature of their vigilance is questionable. He has always been like that. He attends to the business of others while others attend to his affairs.’

Annapurna asked, ‘Does he not wish to get married?’

Mahendra smiled slightly and said, ‘I cannot say there are any signs of that.’

Annapurna was saddened to hear this. She understood that Bihari had once been eager about marriage after seeing her niece Asha but that wish had been thwarted wrongfully and abruptly. He had said to her, ‘Aunt, never ask me to marry someone again.’ She remembered his great pain. Although she loved Bihari she had left without providing him any solace during his disappointment over Asha. Annapurna became very unhappy and worried as she wondered whether Bihari was still in love with Asha.

Mahendra gradually divulged the details of his life with Asha in Kolkata, sometimes jokingly and at other times in all seriousness. He never mentioned Binodini.

His classes had begun and he should have not been able to stay in Kashi for very long. But after each day with Annapurna, he felt the pleasure that one feels after moving to a pleasant locale after suffering from severe illness. The days passed quickly. The inner conflict that he had once suffered was now gone. After spending all his time over a few days with the pious, gentle Annapurna he felt that the responsibilities of family life were so easy and pleasant that his former fears seemed laughable. He began to think of Binodini as unimportant. He could not even remember her face clearly when he tried. Eventually he told himself with complete convicton, ‘I do not think that it would be possible for anyone to dethrone Asha from where she rules within my heart.’

Mahendra said to Annapurna, ‘Aunt, I will have to leave Kashi soon as I am missing classes. But even though you have left family life behind, please give me permission to come and see you occasionally.’

When Mahendra came home and gave Asha the vermilion container and white stone pitcher her aunt had sent for her as gifts, she began to weep. Her heart was pained by memories of her aunt’s loving patience and the misbehavior meted out to her both by the two of them and by her mother-in-law. She asked her husband, ‘I really wish I could go and ask her for her forgiveness. Is that possible at all?’

Mahendra understood her pain and agreed to her visiting her aunt for a few days in Kashi. But he was not keen about missing classes again by accompanying her.

Asha asked, ‘My aunt is going to Kashi soon, what harm in going with her?’

Mahendra went to Rajlakshmi and said, ‘Ma, my wife wishes to go and see her aunt in Kashi.’

Rajlakshmi answered sarcastically, ‘If she has wished this, then of course she must go; do take her.’

She was not pleased that Mahendra had started seeing his aunt Annapurna again. She became even more annoyed when she heard that her daughter-in-law was thinking of visiting the aunt as well.

Mahendra said, ‘I have classes and will not be able to take her. She will have to go with her uncle.’

Rajlakshmi answered, ‘That is great. They are wealthy enough to never condescend to visiting us, so going with them will be a great honour indeed.’

Mahendra’s resolve was hardened by the sharp words from his mother. He said no more and determined to send Asha to Kashi as he left Rajlakshmi’s presence.

When Bihari came to see Rajlakshmi, she said, ‘Have you heard, our daughter-in-law has expressed a desire to go to Kashi?’

Bihari replied, ‘What! Is Mahendra going to take time off classes again to take her there?’

Rajlakshmi answered, ‘No, why should Mahen go? That would not be outrageous enough, would it? He will stay here and she will go with her uncle the Great. Everyone has become so modern these days.’

Bihari became concerned, although not because of the incursions of modernity. He thought, ‘What is going on? Asha stayed here while Mahendra took off for Kashi; now that he is back, she wants to go there. Something seriously wrong has happened between the two of them. How long can this go on for? As a friend am I supposed to stand by doing nothing and just watch from afar?’

Mahendra was sitting in his bedroom feeling extremely upset with his mother. Binodini had not seen him after his arrival and Asha was next door trying to convince her to join the two of them.

Bihari came in and said, ‘Is it certain that your wife is going to Kashi?’

Mahendra asked, ‘Why not? What is stopping her?’

Bihari said, ‘I did not say anyone was stopping her from going. But why now?’

Mahendra answered, ‘She wishes to see her aunt – people do sometimes feel that they would be happy to see relatives living elsewhere.’

Bihari persisted, ‘Are you going with her?’

As soon as Mahendra heard the question he thought, ‘Bihari is here to convince me that Asha should not be sent to Kashi with her uncle.’ He wished to prevent a prolonged discussion and simply said, ‘No.’

Bihari knew Mahendra well. He realised that Mahendra was angry and that it was impossible to change his mind once he had decided on doing something. He did not raise the topic of Mahendra accompanying Asha. He thought to himself, ‘If the wretched Asha is going with a sad heart, Binodini could accompany her as a consolation.’ He then said softly, ‘Would it be possible for Binodini to go with her?’

Mahendra shouted, ‘Bihari, you have to disclose what is in your mind. I see no reason for you to tell me lies. I know that you suspect me of loving Binodini. That is not true! I do not love her. You do not have to be with me constantly in order to protect me. You should save yourself. If you had genuine feelings of friendship for me you could have told me the truth a long time ago and done the honourable thing by removing yourself from our household. I am telling you what you cannot bring yourself to utter, you have fallen in love with Asha.’

Just as a person with an injury does not think for a moment before pushing away someone trying to hurt them, dumbstruck, Bihari quickly rose, moved towards Mahendra as if to strike him; and then came to his senses, saying, ‘May god forgive you, I am leaving now.’ He then walked unsteadily out of the room.

Binodini hurriedly came from next door and called, ‘Bihari!’

Bihari leaned against the wall and smiled wanly, saying, ‘What?’

Binodini said, ‘Brother, I will go to Kashi too with Bali.’

Bihari said, ‘No, sister, that cannot be! I am pleading with you – do not listen to anything I say. I am no one to these people; I do not wish to interfere in any of their business. That can only end in unhappiness. You are a goddess; do whatever you think is right. I am leaving.’

As Bihari folded his hands in a gentle greeting to Binodini and prepared to leave, she said, ‘Listen brother, I am no goddess. If you leave it will not bode well for anyone. Do not blame me for anything after this.’

Bihari went away. Mahendra sat in stunned silence. Binodini looked at him furiously, her eyes flashing like lightning before going next door where Asha was cringing in shame and despair. She could not look at Mahendra after hearing him say that Bihari loved her. But Binodini did not feel the slightest compassion for her. If Asha had looked up at Binodini she would have been frightened as Binodini looked ready to murder someone. Lies indeed! No one loved Binodini! They all loved this shy timid doll-like creature.

Now that he was calmer, Mahendra was mortified that he had bared his soul to Bihari in an emotional outburst when he prided himself on being made of stone. He felt that all his thoughts had been disclosed with that one action. He did not love Binodini and yet the fact that Bihari knew that he did made him dislike Bihari greatly. In particular ,every time the two had met since that day Mahendra felt as though Bihari had been amusing himself by trying to discover his innermost secrets. These aggravations had been accumulating and erupted today with very slight provocation.

But the manner in which Binodini came rushing anxiously from the other room, the pleas with which she tried to prevent Bihari from leaving and her agreement to Bihari’s order to accompany Asha to Kashi astonished Mahendra as he had not anticipated this. He was very affected when he thought of how he had declared that he did not love her; but what he saw and heard made him restless and bothered him with a hundred unexplained thoughts. All he could think of with a sense of hopelessness was, ‘Binodini has heard me say…I do not love her.’

Chokher Bali 22, Part 2/চোখের বালি ২২ দ্বিতীয় ভাগ

বিনোদিনী তিন বার স্বীকার করিল। আশা কহিল, “ভাই চোখের বালি, সেই যদি রহিলেই তবে এত করিয়া সাধাইলে কেন। শেষকালে আমার স্বামীর কাছে তো হার মানিতে হইল।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরপো, আমি হার মানিয়াছি, না তোমাকে হার মানাইয়াছি?”

মহেন্দ্র এতক্ষণ স্তম্ভিত হইয়া ছিল; মনে হইতেছিল, তাহার অপরাধে যেন সমস্ত ঘর ভরিয়া রহিয়াছে, লাঞ্ছনা যেন তাহার সর্বাঙ্গ পরিবেষ্টন করিয়া। আশার সঙ্গে কেমন করিয়া সে প্রসন্নমুখে স্বাভাবিকভাবে কথা কহিবে। এক মুহূর্তের মধ্যে কেমন করিয়া সে আপনার বীভৎস অসংযমকে সহাস্য চটুলতায় পরিণত করিবে। এই পৈশাচিক ইন্দ্রজাল তাহার আয়ত্তের বহির্ভূত ছিল। সে গম্ভীরমুখে কহিল, “আমারই তো হার হইয়াছে।” বলিয়াই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

অনতিকাল পরেই আবার মহেন্দ্র ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বিনোদিনীকে কহিল, “আমাকে মাপ করো।”

বিনোদিনী কহিল, “অপরাধ কী করিয়াছ, ঠাকুরপো।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমাকে জোর করিয়া এখানে ধরিয়া রাখিবার অধিকার আমাদের নাই।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “জোর কই করিলে, তাহা তো দেখিলাম না। ভালোবাসিয়া ভালো মুখেই তো থাকিতে বলিলে। তাহাকে কি জোর বলে। বলো তো ভাই, চোখের বালি, গায়ের জোর আর ভালোবাসা কি একই হইল।”

আশা তাহার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হইয়া কহিল, “কখনোই না।”

বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার ইচ্ছা আমি থাকি, আমি গেলে তোমার কষ্ট হইবে, সে তো আমার সৌভাগ্য। কী বল ভাই চোখের বালি, সংসারে এমন সুহৃদ কয় জন পাওয়া যায়। তেমন ব্যথার ব্যথী, সুখের সুখী, অদৃষ্টগুণে যদিই পাওয়া যায়, তবে আমিই বা তাহাকে ছাড়িয়া যাইবার জন্য ব্যস্ত হইব কেন।”

আশা তাহার স্বামীকে অপদস্থভাবে নিরুত্তর থাকিতে দেখিয়া ঈষৎ ব্যথিতচিত্তে কহিল, “তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে ভাই। আমার স্বামী তো হার মানিয়াছেন, এখন তুমি একটু থামো।”

মহেন্দ্র আবার দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইল। তখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করিয়া বিহারী মহেন্দ্রের সন্ধানে আসিতেছিল। মহেন্দ্র তাহাকে দ্বারের সম্মুখে দেখিতে পাইয়াই বলিয়া উঠিল, “ভাই বিহারী, আমার মতো পাষণ্ড আর জগতে নাই।” এমন বেগে কহিল, সে কথা ঘরের মধ্যে গিয়া পৌঁছিল।

ঘরের মধ্য হইতে তৎক্ষণাৎ আহ্বান আসিল, “বিহারী-ঠাকুরপো।”

বিহারী কহিল, “একটু বাদে আসছি, বিনোদ-বোঠান।”

বিনোদিনী কহিল, “একবার শুনেই যাও না।”

বিহারী ঘরে ঢুকিয়াই মুহূর্তের মধ্যে একবার আশার দিকে চাহিল– ঘোমটার মধ্য হইতে আশার মুখ যতটুকু দেখিতে পাইল, সেখানে বিষাদ বা বেদনার কোনো চিহ্নই তো দেখা গেল না। আশা উঠিয়া যাইবার চেষ্টা করিল, বিনোদিনী তাহাকে জোর করিয়া ধরিয়া রাখিল– কহিল, “আচ্ছা, বিহারী-ঠাকুরপো, আমার চোখের বালির সঙ্গে কি তোমার সতিন-সম্পর্ক। তোমাকে দেখলেই ও পালাতে চায় কেন।”

আশা অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া বিনোদিনীকে তাড়না করিল।

বিহারী হাসিয়া উত্তর করিল, “বিধাতা আমাকে তেমন সুদৃশ্য করিয়া গড়েন নাই বলিয়া।”

বিনোদিনী। দেখছিস ভাই বালি, বিহারী-ঠাকুরপো বাঁচাইয়া কথা বলিতে জানেন– তোর রুচিকে দোষ না দিয়া বিধাতাকেই দোষ দিলেন। লক্ষ্ণণটির মতোএমন সুলক্ষণ দেবর পাইয়াও তাহাকে আদর করিতে শিখিলি না– তোরই কপাল মন্দ।

বিহারী। তোমার যদি তাহাতে দয়া হয় বিনোদ-বোঠান, তবে আর আমার আক্ষেপ কিসের।

বিনোদিনী। সমুদ্র তো পড়িয়া আছে, তবু মেঘের ধারা নইলে চাতকের তৃষ্ণা মেটে না কেন।

আশাকে ধরিয়া রাখা গেল না। সে জোর করিয়া বিনোদিনীর হাত ছাড়াইয়া বাহির হইয়া গেল। বিহারীও চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেছিল। বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, মহেন্দ্রবাবুর কী হইয়াছে, বলিতে পার?”

শুনিয়াই বিহারী থমকিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল। কহিল, “তাহা তো জানি না। কিছু হইয়াছে নাকি।”

বিনোদিনী। কী জানি ঠাকুরপো, আমার তো ভালো বোধ হয় না।

বিহারী উদ্বিগ্ন মুখে চৌকির উপর বসিয়া পড়িল। কথাটা খোলসা শুনিবে বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে ব্যগ্রভাবে চাহিয়া অপেক্ষা করিয়া রহিল। বিনোদিনী কোনো কথা না বলিয়া মনোযোগ দিয়া চাদর সেলাই করিতে লাগিল।

কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়া বিহারী কহিল, “মহিনদার সম্বন্ধে তুমি কি বিশেষ কিছু লক্ষ্য করিয়াছ।”

বিনোদিনী অত্যন্ত সাধারণভাবে কহিল, “কী জানি ঠাকুরপো, আমার তো ভালো বোধ হয় না। আমার চোখের বালির জন্যে আমার কেবলই ভাবনা হয়।” বলিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সেলাই রাখিয়া উঠিয়া যাইতে উদ্যত হইল।

বিহারী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “বোঠান, একটু বোসো।” বলিয়া একটা চৌকিতে বসিল।

বিনোদিনী ঘরের সমস্ত জানালা-দরজা সম্পূর্ণ খুলিয়া দিয়া কেরোসিনের বাতি উস্কাইয়া সেলাই টানিয়া লইয়া বিছানার দূরপ্রান্তে গিয়া বসিল। কহিল, “ঠাকুরপো, আমি তো চিরদিন এখানে থাকিব না– কিন্তু আমি চলিয়া গেলে আমার চোখের বালির উপর একটু দৃষ্টি রাখিয়ো– সে যেন অসুখী না হয়।” বলিয়া যেন হৃদয়োচ্ছ্বাস সংবরণ করিয়া লইবার জন্য বিনোদিনী অন্য দিকে মুখ ফিরাইল।

বিহারী বলিয়া উঠিল, “বোঠান, তোমাকে থাকিতেই হইবে। তোমার নিজের বলিতে কেহ নাই– এই সরলা মেয়েটিকে সুখে দুঃখে রক্ষা করিবার ভার তুমি লও– তুমি তাহাকে ফেলিয়া গেলে আমি তো আর উপায় দেখি না।”

বিনোদিনী। ঠাকুরপো, তুমি তো সংসারের গতিক জান। এখানে বরাবর থাকিব কেমন করিয়া। লোকে কী বলিবে।

বিহারী। লোকে যা বলে বলুক, তুমি কান দিয়ো না। তুমি দেবী– অসহায়া বালিকাকে সংসারের নিষ্ঠুর আঘাত হইতে রক্ষা করা তোমারই উপযুক্ত কাজ। বোঠান, আমি তোমাকে প্রথমে চিনি নাই, সেজন্য আমাকে ক্ষমা করো। আমিও সংকীর্ণ-হৃদয় সাধারণ ইতরলোকদের মতো মনে মনে তোমার সম্বন্ধে অন্যায় ধারণা স্থান দিয়াছিলাম; একবার এমনও মনে হইয়াছিল, যেন আশার সুখে তুমি ঈর্ষা করিতেছ– যেন– কিন্তু সে-সব কথা মুখে উচ্চারণ করিতেও পাপ আছে। তার পরে, তোমার দেবীহৃদয়ের পরিচয় আমি পাইয়াছি– তোমার উপর আমার গভীর ভক্তি জন্মিয়াছে বলিয়াই, আজ তোমার কাছে আমার সমস্ত অপরাধ স্বীকার না করিয়া থাকিতে পারিলাম না।

বিনোদিনীর সর্বশরীর পুলকিত হইয়া উঠিল। যদিও সে ছলনা করিতেছিল, তবু বিহারীর এই ভক্তি-উপহার সে মনে মনেও মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতে পারিল না। এমন জিনিস সে কখনো কাহারো কাছ হইতে পায় নাই। ক্ষণকালের জন্য মনে হইল, সে যেন যথার্থই পবিত্র উন্নত– আশার প্রতি একটা অনির্দেশ্য দয়ায় তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। সেই অশ্রুপাত সে বিহারীর কাছে গোপন করিল না, এবং সেই অশ্রুধারা বিনোদিনীর নিজের কাছে নিজেকে পূজনীয়া বলিয়া মোহ উৎপাদন করিল।

বিহারী বিনোদিনীকে অশ্রু ফেলিতে দেখিয়া নিজের অশ্রুবেগ সংবরণ করিয়া উঠিয়া বাহিরে মহেন্দ্রের ঘরে গেল। মহেন্দ্র যে হঠাৎ নিজেকে পাষণ্ড বলিয়া কেন ঘোষণা করিল, বিহারী তাহার কোনো তাৎপর্য খুঁজিয়া পাইল না। ঘরে গিয়া দেখিল, মহেন্দ্র নাই। খবর পাইল, মহেন্দ্র বেড়াইতে বাহির হইয়াছে। পূর্বে মহেন্দ্র অকারণে কখনোই ঘর ছাড়িয়া বাহির হইত না। সুপরিচিত লোকের এবং সুপরিচিত ঘরের বাহিরে মহেন্দ্রের অত্যন্ত ক্লান্তি ও পীড়া বোধ হইত। বিহারী ভাবিতে ভাবিতে ধীরে ধীরে বাড়ি চলিয়া গেল।

বিনোদিনী আশাকে নিজের শয়নঘরে আনিয়া বুকের কাছে টানিয়া দুই চক্ষু জলে ভরিয়া কহিল, “ভাই চোখের বালি, আমি বড়ো হতভাগিনী, আমি বড়ো অলক্ষণা।”

আশা ব্যথিত হইয়া তাহাকে বাহুপাশে বেষ্টন করিয়া স্নেহার্দ্রকণ্ঠে বলিল, “কেন ভাই, অমন কথা কেন বলিতেছ।”

বিনোদিনী রোদনোচ্ছ্বসিত শিশুর মতো আশার বক্ষে মুখ রাখিয়া কহিল, “আমি যেখানে থাকিব, সেখানে কেবল মন্দই হইবে। দে ভাই, আমাকে ছাড়িয়া দে, আমি আমার জঙ্গলের মধ্যে চলিয়া যাই।”

আশা চিবুকে হাত দিয়া বিনোদিনীর মুখ তুলিয়া ধরিয়া কহিল, “লক্ষ্মীটি ভাই, অমন কথা বলিস নে–তোকে ছাড়িয়া আমি থাকিতে পারিব না– আমাকে ছাড়িয়া যাইবার কথা কেন আজ তোর মনে আসিল।”

মহেন্দ্রের দেখা না পাইয়া বিহারী কোনো একটা ছুতায় পুনর্বার বিনোদিনীর ঘরে আসিয়া মহেন্দ্র ও আশার মধ্যবর্তী আশঙ্কার কথাটা আর-একটু স্পষ্ট করিয়া শুনিবার জন্য উপস্থিত হইল।

মহেন্দ্রকে পরদিন সকালে তাহাদের বাড়ি খাইতে যাইতে বলিবার জন্য বিনোদিনীকে অনুরোধ করিবার উপলক্ষ লইয়া সে উপস্থিত হইল। “বিনোদ-বোঠান” বলিয়া ডাকিয়াই হঠাৎ কেরোসিনের উজ্জ্বল আলোকে বাহির হইতেই আলিঙ্গনবদ্ধ সাশ্রুনেত্র দুই সখীকে দেখিয়াই থমকিয়া দাঁড়াইল। আশার হঠাৎ মনে হইল, নিশ্চয়ই বিহারী তাহার চোখের বালিকে কোনো অন্যায় নিন্দা করিয়া কিছু বলিয়াছে, তাই সে আজ এমন করিয়া চলিয়া যাইবার কথা তুলিয়াছে। বিহারীবাবুর ভারি অন্যায়। উহার মন ভালো নয়। আশা বিরক্ত হইয়া বাহির হইয়া আসিল। বিহারীও বিনোদিনীর প্রতি ভক্তির মাত্রা চড়াইয়া বিগলিতহৃদয়ে দ্রুত প্রস্থান করিল।

সেদিন রাত্রে মহেন্দ্র আশাকে কহিল, “চুনি, আমি কাল সকালের প্যাসেঞ্জারেই কাশী চলিয়া যাইব।”

আশার বক্ষঃস্থল ধক্ করিয়া উঠিল-কহিল, “কেন।”

মহেন্দ্র কহিল, “কাকীমাকে অনেক দিন দেখি নাই।”

শুনিয়া আশা বড়োই লজ্জাবোধ করিল; এ কথা পূর্বেই তাহার মনে উদয় হওয়া উচিত ছিল; নিজের সুখদুঃখের আকর্ষণে স্নেহময়ী মাসিমাকে সে যে ভুলিয়াছিল, অথচ মহেন্দ্র সেই প্রবাসী-তপস্বিনীকে মনে করিয়াছে, ইহাতে নিজেকে কঠিনহৃদয়া বলিয়া বড়োই ধিক্কার জন্মিল।

মহেন্দ্র কহিল, “তিনি আমারই হাতে তাঁহার সংসারের একমাত্র স্নেহের ধনকে সমর্পণ করিয়া দিয়া চলিয়া গেছেন– তাঁহাকে একবার না দেখিয়া আমি কিছুতেই সুস্থির হইতে পারিতেছি না।”

বলিতে বলিতে মহেন্দ্রের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হইয়া আসিল; স্নেহপূর্ণ নীরব আশীর্বাদও অব্যক্ত মঙ্গলকামনার সহিত বারংবার সে আশার ললাট ও মস্তকের উপর দক্ষিণ করতল চালনা করিতে লাগিল। আশা এই অকস্মাৎ স্নেহাবেগের সম্পূর্ণ মর্ম বুঝিতে পারিল না, কেবল তাহার হৃদয় বিগলিত হইয়া অশ্রু পড়িতে লাগিল। আজই সন্ধ্যাবেলায় বিনোদিনী তাহাকে অকারণ স্নেহাতিশয্যে যে-সব কথা বলিয়াছিল, তাহা মনে পড়িল। উভয়ের মধ্যে কোথাও কোনো যোগ আছে কি না, তাহা সে কিছুই বুঝিল না। কিন্তু মনে হইল, যেন ইহা তাহার জীবনে কিসের একটা সূচনা। ভালো কি মন্দ কে জানে।

ভয়ব্যাকুলচিত্তে সে মহেন্দ্রকে বাহুপাশ বদ্ধ করিল। মহেন্দ্র তাহার সেই অকারণ আশঙ্কার আবেশ অনুভব করিতে পারিল। কহিল, “চুনি, তোমার উপর তোমার পুণ্যবতী মাসিমার আশীর্বাদ আছে, তোমার কোনো ভয় নাই, কোনো ভয় নাই। তিনি তোমারই মঙ্গলের জন্য তাঁহার সমস্ত ত্যাগ করিয়া গেছেন, তোমার কখনো কোনো অকল্যাণ হইতে পারে না।”

আশা তখন দৃঢ়চিত্তে সমস্ত ভয় দূর করিয়া ফেলিল। স্বামীর এই আশীর্বাদ অক্ষয়কবচের মতো গ্রহণ করিল। সে মনে মনে বারংবার তাহার মাসিমার পবিত্র পদধূলি মাথায় তুলিয়া লইতে লাগিল, এবং একাগ্রমনে কহিল, “মা, তোমার আশীর্বাদ আমার স্বামীকে সর্বদা রক্ষা করুক!”

পরদিনে মহেন্দ্র চলিয়া গেল, বিনোদিনীকে কিছুই বলিয়া গেল না। বিনোদিনী মনে মনে কহিল, “নিজে অন্যায় করা হইল, আবার আমার উপরে রাগ! এমন সাধু তো দেখি নাই। কিন্তু এমন সাধুত্ব বেশিদিন টেঁকে না।’

Kalighat-Paintings-04

Binodini made the three promises needed to seal the pact. Asha said, ‘Dear Bali, if you were going to stay why did you make us beg you so much? You had to bow to my husband’s requests, did you not?’

Binodini smiled and answered, ‘Sir, did I lose or did I cause you to admit defeat?’

Mahendra had been stupefied into silence all this time; he felt as though his wrongs filled the room and shame surrounded him on all sides. How was he to ever speak to Asha with any semblance of normalcy and a smile on his face? How would he transform the terrible lack of propriety he had shown into a joke that evoked laughter? The degree of evil required to carry off such pretence was beyond his scope. He said unsmilingly, ‘I am the one who lost,’ and immediately left the room.

A few moments later he came back into the room and said to Binodini, ‘Forgive me.’

Binodini said, ‘What have you done wrong?’

Mahendra answered, ‘We have no right to keep you here against your wishes.’

Binodini smiled and said, ‘I didn’t see you force me. You asked me with affection. That is hardly forcing me to stay. Tell me, dearest Bali, love is hardly the same as brute strength!’

Asha completely agreed with her and said, ‘Never!’

Binodini said, ‘Dear Sir, it is my good fortune that you wish for me to stay and that you will miss me when I leave. What do you say Bali, it is rare to find such a friend in life. If I have found such a person thanks to my good fortune, who is constant in sadness and in joy, why should I want to forsake them?’

Asha noticed her husband’s discomfiture and said, slightly pained, ‘Who can match you in verbal sparring? He has admitted defeated, now let my husband be.’

Mahendra left the room hurriedly again. Bihari was on his way to see Mahendra after talking to Rajlakshmi and as soon as Mahendra saw him in front of the doorway he exclaimed, ‘There is none as cruel as me in the world, Bihari!’ He said this so loudly that the words were clearly heard from the room.

There was an immediate call for Bihari from within. It was Binodini.

Bihari said,’I am coming in a short while, madam.’

Binodini urged, ‘It is important that you come right now.’

Bihari entered and took a quick look at Asha- the little that he could see of her face showed no traces of pain or sadness. She was about to get up to leave when Binodini held her back and asked Bihari, ‘Why is there such animosity between you and my friend Bali, as though you are both wives to the same man? She simply cannot bear being in the same room as you.’

Asha was horrified by her words and urged her to be silent.

Bihari smiled and answered, ‘Perhaps it is because I was not blessed with good looks by my maker.’

Binodini: See Bali, Bihari is very good at avoiding the real answers. Instead of blaming your taste he blamed his maker. You have such a charming brother-in-law, just like Lakshman to Ram and yet you have never learned to appreciate him – such is your misfortune.

Bihari: If you see fit to favour me Madam, why should I be sad?

Binodini: The Chataka bird sees the sea, but still craves the sweetness from the clouds. Why pray tell?

Asha would be detained no longer. She forcibly pulled away from Binodini’s grasp and left. Bihari was also about to leave when Binodini asked him, ‘What is going on with your friend Mahendra, do you know at all?’

Bihari immediately stopped and said, ‘I do not know that anything is wrong. Why do you ask?’

Binodini: I am not sure, but I do not like it at all.

Bihari sat down again with a worried look on his face. He looked eagerly at Binodini to hear what she would say. She said nothing and bent her head over her sewing.

After waiting a little while Bihari asked, ‘What have you observed about Mahendra in particular?’

Binodini answered calmly, ‘I do not like it at all. I worry so much about my dear Bali.’ She then sighed deeply and put her needlework down as if to leave.

Bihari said anxiously, ‘Madam, please sit a little while longer.’ He sat down too.

Binodini opened all the doors and windows, turned the kerosene lamp up and sat down again with her sewing at the far end of the bed. She said, ‘Look, I will not be able to stay here for eternity – but when I am gone, do keep an eye on my dear Bali, I do not wish her to be unhappy in any way.’ She seemed to be trying hard to control her emotions as she looked away.

Barely had she finished than Bihari spoke, ‘Madam, you will have to stay. You have no one of your own. Please take charge of this innocent girl – if you leave her I see no other way out.’

Binodini: Sir, you know the ways of the world. How can I stay here all the time? What will people say about that?

Bihari: Do not pay any heed to people; let them say what they want. You are a goddess – it befits you to take up the task of protecting the helpless girl from the cruel blows of life. I did not know you at first, do forgive me for that. I succumbed to narrow mindedness like the others and thought wrongly of you; to the extent that once I even thought you were jealous of Asha’s happiness and that – it is so wrong to even voice my thoughts. Since then I have had ample proof of the sanctity of your soul, I am admitting all this to you only because now I respect you so very deeply.

Binodini was thrilled to hear this. Even though she was pretending to be concerned about Asha’s wellbeing, Bihari’s respectful address was something that she could not ignore as being a lie. She had never received such recognition from anyone in her life. For a few short moments she truly did feel cleansed and pure – her eyes streaming with tears out of pity for Asha. She did not hide them from Bihari and in her own eyes the tears served to make her feel worthier of his worship than she really was.

Bihari suppressed his own tears at the sight of Binodini’s weeping and left the room to go to Mahendra. He could not understand why Mahendra had referred to himself as cruel. He found that Mahendra had gone out. In the past Mahendra had never been one to leave his house without cause. He felt very fatigued and pained when he was removed from the people and the places that he knew very well. Bihari thought about this as he walked home slowly.

Binodini took Asha to her own bedroom and drew her close, tearfully saying, ‘My dear Bali, I am a wretch, I am so ill fated.’

Asha was saddened by this and she hugged her saying gently, ‘Why are you saying these things?’

Binodini hid her face in Asha’s bosom like a child overcome with grief and said, ‘Wherever I am, there is naught but misfortune. Let me go, I beg you, I will go and back to the jungle which was once my home.’

Asha lifted her face by the chin and said, ‘Dearest, do not say such things, I will not be able to live without you – why did you think of leaving me today of all days!’

Bihari came to Binodini’s room once again when he failed to find Mahendra, hoping to hear a little more about her concerns about a misunderstanding between Mahendra and Asha.

He pretended he was there to ask Binodini to send Mahendra to his house for a meal the following morning. As he called her name from the doorway, he was struck when he saw the two women in a tearful embrace by the bright light of the kerosene lamp in the room. Asha thought that Bihari must have accused her friend of something wrongfully and made her feel she must leave. She felt this was very bad of him and that he was not a nice man. Asha left the room quite annoyed with his presence. Bihari left shortly after wards too, his heart overflowing with gratitude towards Binodini.

That night Mahendra said to Asha, ‘Chuni, I will go to Kashi by the early passenger train tomorrow.’
Asha was struck to the very core and asked, ‘Why?’
Mahendra said, ‘It has been a long time since I last saw our aunt.’

Asha was filled with shame when she heard this; she should have rightfully been the one to think of this; the fact that she had forgotten her loving aunt in the pursuit of her own happiness and that Mahendra was the one to remember that distant recluse made her aghast at the coldness of her heart.
Mahendra said, ‘She gave me the responsibility of looking after the only thing dear to her, I must see her just once if I am to calm myself.’

As he spoke Mahendra’s voice choked with feeling; he ran his right hand over Asha’s forehead and hair overwhelmed with affection and unspoken wishes for her welfare. Asha could not fathom the reason behind this sudden emotional display but her heart melted in tears. She remembered the spontaneous words of affection Binodini had said to her earlier in the evening. She did not connect the two events but she did feel that they marked a beginning of sorts in her life. She was not sure whether this was a good omen.

She held onto Mahendra tightly with a heart full of anxiety and misapprehension. Mahendra understood the emotional turmoil within her. He said, ‘Chuni, you have your good aunt’s blessings, you need not have any fear, none at all. She has forsaken everything for your well being, nothing bad can ever happen to you.’

Asha then determined to be unafraid and accepted her husband’s good wishes like a talisman. She mentally paid her respects to her aunt again and again and said with the greatest of sincerity, ‘Mother, may your blessings keep my husband safe at all times.’

Mahendra left the next day without saying anything to Binodini. She said to herself, ‘You are the one who is in the wrong and yet you are angry with me. I have never seen such a show of virtue. But you will not get to preserve it this easily.’

Chokher Bali 22, Part 1/চোখের বালি ২২, প্রথম অংশ

২২

মহেন্দ্র ঘরে ফিরিয়া আসিবামাত্র তাহার মুখ দেখিয়াই আশার মনের সমস্ত সংশয় ক্ষণকালের কুয়াশার মতো এক মুহূর্তেই কাটিয়া গেল। নিজের চিঠির কথা স্মরণ করিয়া লজ্জায় মহেন্দ্রের সামনে সে যেন মুখ তুলিতেই পারিল না। মহেন্দ্র তাহার উপরে ভর্ৎসনা করিয়া কহিল, “এমন অপবাদ দিয়া চিঠিগুলা লিখিলে কী করিয়া।”

বলিয়া পকেট হইতে বহুবার পঠিত সেই চিঠি তিনখানি বাহির করিল। আশা ব্যাকুল হইয়া কহিল, “তোমার পায়ে পড়ি, ও চিঠিগুলো ছিঁড়িয়া ফেলো।” বলিয়া মহেন্দ্রের হাত হইতে চিঠিগুলা লইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল। মহেন্দ্র তাহাকে নিরস্ত করিয়া সেগুলি পকেটে পুরিল। কহিল, “আমি কর্তব্যের অনুরোধে গেলাম, আর তুমি আমার অভিপ্রায় বুঝিলে না? আমাকে সন্দেহ করিলে?”

আশা ছল-ছল চোখে কহিল, “এবারকার মতো আমাকে মাপ করো। এমন আর কখনোই হইবে না।”

মহেন্দ্র কহিল, “কখনো না?”

আশা কহিল, “কখনো না।”

তখন মহেন্দ্র তাহাকে টানিয়া লইয়া চুম্বন করিল। আশা কহিল, “চিঠিগুলা দাও, ছিঁড়িয়া ফেলি।”

মহেন্দ্র কহিল, “না, ও থাক্‌!”

আশা সবিনয়ে মনে করিল, “আমার শাস্তিস্বরূপ এ চিঠিগুলি উনি রাখিলেন।’

এই চিঠির ব্যাপারে বিনোদিনীর উপর আশার মনটা একটু যেন বাঁকিয়া দাঁড়াইল। স্বামীর আগমনবার্তা লইয়া সে সখীর কাছে আনন্দ করিতে গেল না– বরঞ্চ বিনোদিনীকে একটু যেন এড়াইয়া গেল। বিনোদিনী সেটুকু লক্ষ্য করিল এবং কাজের ছল করিয়া একেবারে দূরে রহিল।

মহেন্দ্র ভাবিল, “এ তো বড়ো অদ্ভুত। আমি ভাবিয়াছিলাম, এবার বিনোদিনীকে বিশেষ করিয়াই দেখা যাইবে– উল্‌টা হইল? তবে সে চিঠিগুলার অর্থ কী।’

নারীহৃদয়ের রহস্য বুঝিবার কোনো চেষ্টা করিবে না বলিয়াই মহেন্দ্র মনকে দৃঢ় করিয়াছিল– ভাবিয়াছিল, বিনোদিনী যদি কাছে আসিবার চেষ্টা করে, তবু আমি দূরে থাকিব।’ আজ সে মনে মনে কহিল, “না, এ তো ঠিক হইতেছে না। যেন আমাদের মধ্যে সত্যই কী একটা বিকার ঘটিয়াছে। বিনোদিনীর সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা আমোদপ্রমোদ করিয়া এই সংশয়াচ্ছন্ন গুমোটের ভাবটা দূর করিয়া দেওয়া উচিত।’

আশাকে মহেন্দ্র কহিল, “দেখিতেছি, আমিই তোমার সখীর চোখের বালি হইলাম। আজকাল তাঁহার আর দেখাই পাওয়া যায় না।”

আশা উদাসীন ভাবে উত্তর করিল, “কে জানে, তাহার কী হইয়াছে।”

এ দিকে রাজলক্ষ্মী আসিয়া কাঁদো-কাঁদো হইয়া কহিলেন, “বিপিনের বউকে আর তো ধরিয়া রাখা যায় না।”

মহেন্দ্র চকিত ভাব সামলাইয়া কহিল, “কেন, মা।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কি জানি বাছা, সে তো এবার বাড়ি যাইবার জন্য নিতান্তই ধরিয়া পড়িয়াছে। তুই তো কাহাকেও খাতির করিতে জানিস না। ভদ্রলোকের মেয়ে পরের বাড়িতে আছে, উহাকে আপনার লোকের মতো আদর-যত্ন না করিলে থাকিবে কেন।”

বিনোদিনী শোবার ঘরে বসিয়া বিছানার চাদর সেলাই করিতেছিল। মহেন্দ্র প্রবেশ করিয়া ডাকিল, “বালি।”

বিনোদিনী সংযত হইয়া বসিল। কহিল, “কী, মহেন্দ্রবাবু।”

মহেন্দ্র কহিল, “কী সর্বনাশ। মহেন্দ্র আবার বাবু হইলেন কবে।”

বিনোদিনী আবার চাদর সেলাইয়ের দিকে নতচক্ষু নিবদ্ধ রাখিয়া কহিল, “তবে কী বলিয়া ডাকিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার সখীকে যা বল– চোখের বালি।”

বিনোদিনী অন্যদিনের মতো ঠাট্টা করিয়া তাহার কোনো উত্তর দিল না– সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল।

মহেন্দ্র কহিল, “ওটা বুঝি সত্যকার সম্বন্ধ হইল, তাই ওটা আর পাতানো চলিতেছে না!”

বিনোদিনী একটু থামিয়া দাঁত দিয়া সেলাইয়ের প্রান্ত হইতে খানিকটা বাড়তি সুতা কাটিয়া ফেলিয়া কহিল, “কী জানি, সে আপনি জানেন।”

বলিয়াই তাহার সর্বপ্রকার উত্তর চাপা দিয়া গম্ভীরমুখে কহিল, “কালেজ হইতে হঠাৎ ফেরা হইল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “কেবল মড়া কাটিয়া আর কত দিন চলিবে।”

আবার বিনোদিনী দন্ত দিয়া সুতা ছেদন করিল এবং মুখ না তুলিয়াই কহিল, “এখন বুঝি জিয়ন্তের আবশ্যক।”

মহেন্দ্র স্থির করিয়াছিল, আজ বিনোদিনীর সঙ্গে অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভাবে হাস্যপরিহাস উত্তরপ্রত্যুত্তর করিয়া আসর জমাইয়া তুলিবে। কিন্তু এমনি গাম্ভীর্যের ভার তাহার উপর চাপিয়া আসিল যে, লঘু জবাব প্রাণপণ চেষ্টাতেও মুখের কাছে জোগাইল না। বিনোদিনী আজ কেমন একরকম কঠিন দূরত্ব রক্ষা করিয়া চলিতেছে দেখিয়া, মহেন্দ্রের মনটা সবেগে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল– ব্যবধানটাকে কোনো একটা নাড়া দিয়া ভূমিসাৎ করিতে ইচ্ছা হইল। বিনোদিনীর শেষ বাক্যঘাতের প্রতিঘাত না দিয়া হঠাৎ তাহার কাছে আসিয়া বসিয়া কহিল, “তুমি আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে কেন। কোনো অপরাধ করিয়াছি?”

বিনোদিনী তখন একটু সরিয়া সেলাই হইতে মুখ তুলিয়া দুই বিশাল উজ্জ্বল চক্ষু মহেন্দ্রের মুখের উপর স্থির রাখিয়া কহিল, “কর্তব্যকর্ম তো সকলেরই আছে। আপনি যে সকল ছাড়িয়া কালেজের বাসায় যান, সে কি কাহারো অপরাধে। আমারও যাইতে হইবে না? আমারও কর্তব্য নাই?”

মহেন্দ্র ভালো উত্তর অনেক ভাবিয়া খুঁজিয়া পাইল না। কিছুক্ষণ থামিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার এমন কী কর্তব্য যে না গেলেই নয়।”

বিনোদিনী অত্যন্ত সাবধানে সূচিতে সুতা পরাইতে পরাইতে কহিল, “কর্তব্য আছে কি না, সে নিজের মনই জানে। আপনার কাছে তাহার আর কী তালিকা দিব।”

মহেন্দ্র গম্ভীর চিন্তিত মুখে জানালার বাহিরে একটা সুদূর নারিকেলগাছের মাথার দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনী নিঃশব্দে সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল। ঘরে ছুঁচটি পড়িলে শব্দ শোনা যায়, এমনি হইল। অনেকক্ষণ পরে মহেন্দ্র হঠাৎ কথা কহিল। অকস্মাৎ নিঃশব্দতাভঙ্গে বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল–তাহার হাতে ছুঁচ ফুটিয়া গেল।

মহেন্দ্র কহিল, “তোমাকে কোনো অনুনয়-বিনয়েই রাখা যাইবে না?”

বিনোদিনী তাহার আহত অঙ্গুলি হইতে রক্তবিন্দু শুষিয়া লইয়া কহিল, “কিসের জন্য এত অনুনয়-বিনয়। আমি থাকিলেই কী, আর না থাকিলেই কী। আপনার তাহাতে কী আসে যায়।”

বলিতে বলিতে গলাটা যেন ভারি হইয়া আসিল; বিনোদিনী অত্যন্ত মাথা নিচুকরিয়া সেলাইয়ের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিল– মনে হইল, হয়তো বা তাহার নতনেত্রের পল্লবপ্রান্তে একটুখানি জলের রেখা দেখা দিয়াছে। মাঘের অপরাহ্ন তখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলাইবার উপক্রম করিতেছিল।

মহেন্দ্র মুহূর্তের মধ্যে বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া রুদ্ধ সজলস্বরে কহিল, “যদি তাহাতে আমার আসে যায়, তবে তুমি থাকিবে?”

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত ছাড়াইয়া লইয়া সরিয়া বসিল। মহেন্দ্রের চমক ভাঙিয়া গেল। নিজের শেষ কথাটা ভীষণ ব্যঙ্গের মতো তাহার নিজের কানে বারংবার প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। অপরাধী জিহ্বাকে মহেন্দ্র দন্ত দ্বারা দংশন করিল– তাহার পর হইতে রসনা নির্বাক হইয়া রহিল।

এমন সময় এই নৈঃশব্দ্যপরিপূর্ণ ঘরের মধ্যে আশা প্রবেশ করিল। বিনোদিনী তৎক্ষণাৎ যেন পূর্ব-কথোপকথনের অনুবৃত্তিস্বরূপে হাসিয়া মহেন্দ্রকে বলিয়া উঠিল, “আমার গুমর তোমরা যখন এত বাড়াইলে, তখন আমারও কর্তব্য, তোমাদের একটা কথা রাখা। যতক্ষণ না বিদায় দিবে ততক্ষণ রহিলাম।”

আশা স্বামীর কৃতকার্যতায় উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়া সখীকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল। কহিল, “তবে এই কথা রহিল। তাহা হইলে তিন-সত্য করো, যতক্ষণ না বিদায় দিব ততক্ষণ থাকিবে, থাকিবে, থাকিবে।”

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

22

It took one look at Mahendra when he returned home for all the doubts in Asha’s mind to disappear like a morning mist. She could barely bring herself to look at Mahendra when she thought of the letters she had written. Mahendra scolded her and said, ‘How could you write all those things about me!’

He then took the three letters that he had read so often from his pocket. Asha anxiously pleaded, ‘Please, I beg you, you must destroy those!’ She tried to take them from him but he stopped her and said only after putting them back, ‘I went because it was my duty but you did not try to understand me. Did you have any suspicions about me?’

Tearfully Asha said, ‘Please forgive me this time, I will never do this again.’

Mahendra asked, ‘Never again?’

Asha promised, ‘Never!’

Mahendra then drew her close and kissed her. Asha asked, ‘Give me the letters, I will destroy them.’

Mahendra said, ‘No, let them be.’

Asha thought to herself, ‘He is going to hold onto those as a warning to me.’

Asha grew annoyed with Binodini over this matter of the letters. She did not go to her friend as was her habit with the good news of her husband’s homecoming and avoided her instead. Binodini noticed this and stayed away on the pretext of work.

Mahendra thought to himself, ‘This is strange! I had thought she would find excuses to come to see me more often, but it seems the opposite is happening. What did she mean by those letters then?’

Mahendra had steeled himself against any attempts to understand the secret ways of women, he had even decided to stay away from Bindodini in the event of her approaching him. But now he told himself, ‘This is not right. Something seems to be broken between the two of us. I must try and make this air of forced unfamiliarity disappear by talking to her normally.’

He said to Asha, ‘It seems I am now the grit in your friend’s eyes. She never comes here any more.’

Asha answered casually, ‘Who cares? There is always something going on.’

One day Rajlakshmi came to Mahendra in tears and said, ‘Bipin’s wife says she will not stay any longer.’

Mahendra recovered from his surprise and asked, ‘But why Mother?’

Rajlakshmi answered, ‘I do not know, but this time she really is insisting on going home. You deliberately do not give people the respect due to them. How can she stay with everyone behaving so coldly with her?’

Mahendra went to Binodini’s room where she was sewing a hem on a bedsheet and spoke to her, ‘Bali?’

Binodini sat up straighter and said, ‘What is it sir?’

Mahendra declared, ‘Whatever next! Since when have you been addressing me like that?’

Binodini fixed her downcast eyes on her sewing once again and said, ‘Then how should I address you?’

Mahendra: ‘The same way you address your friend, Chokher Bali.’

Binodini did not answer with her customary humour and kept stitching.

Mahendra: ‘Perhaps that is our true relationship, the grit in the eye, and thus we cannot use them as names any more.’

Binodini paused, cut the thread with her teeth and said, ‘How do I know, it is all up to you.’
Before he could come up with an answer, she quickly said, ‘Why did you suddenly come back home now?’

Mahendra answered, ‘How long can one be satisfied with the company of dead people?’

Binodini cut the thread once again with her teeth and murmured without raising her face, ‘So now you must hack into the hearts of the living!’

Mahendra had decided that he would engage Binodini in jest and conversation as usual. But she was in such a serious mood that he could not think of anything light and frivolous in answer. Seeing that she was bent on preserving a cold and hardened distance between the two of them, all he could think of was to do something to shake her implacable calm. His mind rushed headlong towards her. Instead of answering her previous words, he suddenly moved closer to her and asked, ‘Why are you leaving us? Have I done something wrong?’

Binodini moved slightly and raised her huge burning eyes to Mahendra, looking at him steadily as she said, ‘Everyone has responsibilities. When you went to the lodging house leaving us all, was that because we had done something wrong? Can I not go as well? Do I not have responsibilities?’

Mahendra could not think of a suitable answer. He asked after some time, ‘What responsibility have you got that you must leave?’

Binodini threaded her needle very carefully and said, ‘Only I know what responsibilities I have. Why should I have to list them for you?’

Mahendra sat quietly for a long time looking at a distant coconut palm through the window. He looked worried. Binodini continued with her sewing in silence. If she had dropped the needle at that moment it would have broken the silence. Mahendra spoke up after a long time. Binodini was startled by the sudden noise and pricked herself with her needle.

Mahendra said, ‘Will nothing convince you to stay?’

Binodini sucked the blood from her finger and said, ‘Why are you pleading like this? What difference will it make whether I stay or I go? What do you care?’

Her voice seemed to break slightly as she said this; she bent her head very close to her needlework and paid great attention to it – there was a glint of tears at the ends of the sweep of her eyelashes. The winter evening was giving way to the darkness of night outside the window.

Mahendra suddenly grabbed her hand and said in a choked voice, ‘If it did make a difference to me, would you stay?’

Binodini pulled her hand away quickly and moved even further from Mahendra. He was suddenly deeply aware of what he had done. His words seemed to mock him repeatedly like some horrible mistake. He bit his tongue and silenced it into shame.

At this time, Asha entered the silent room. Binodini immediately said to Mahendra, as though this had been what they had discussed only minutes before, ‘When you are all raising me to such heights, it is also my duty to give in to your request. I promise to not leave unless I am sent away.’

Asha was overjoyed at her husband’s success and embraced her friend. She said, ‘That is a promise that you must make to me three times, unless sent away, you will stay, you will stay, you will stay!’