Tag Archive | Rabindranath and poetry

দুর্বোধ /Duurbodh/Beyond Understanding

দুর্বোধ

 

অধ্যাপকমশায় বোঝাতে গেলেন নাটকটার অর্থ,

সেটা হয়ে উঠল বোধের অতীত।

আমার সেই নাটকের কথা বলি।–

বইটার নাম “পত্রলেখা’,

নায়ক তার কুশলসেন।

নবনীর কাছে বিদায় নিয়ে সে গেল বিলেতে।

চার বছর পরে ফিরে এসে হবে বিয়ে।

নবনী কাঁদল উপুড় হয়ে বিছানায়,

তার মনে হল, এ যেন চার বছরের মৃতুদণ্ড।

নবনীকে কুশলের প্রয়োজন ছিল না ভালোবাসার পথে,

প্রয়োজন ছিল সুগম করতে বিলাত-যাত্রার পথ।

সে কথা জানত নবনী,

সে পণ করেছিল হৃদয় জয় করবে প্রাণপণ সাধনায়।

কুশল মাঝে মাঝে

রুচিতে বুদ্ধিতে উঁচট খেয়ে ওকে হঠাৎ বলেছে রূঢ় কথা,

ও সয়েছে চুপ করে;

মেনে নিয়েছে নিজেকে অযোগ্য বলে,

ওর নালিশ নিজেরই উপরে।

ভেবেছিল দীনা বলেই একদিন হবে ওর জয়,

ঘাস যেমন দিনে দিনে নেয় ঘিরে কঠোর পাহাড়কে।

এ যেন ছিল ওর ভালোবাসার শিল্পরচনা,

নির্দয় পাথরটাকে ভেঙে ভেঙে রূপ আবাহন করা

ব্যথিত বক্ষের নিরন্তর আঘাতে।

আজ নবনীর সেই দিনরাতের আরাধনার ধন গেল দূরে।

ওর দুঃখের থালাটি ছিল অশ্রু-ভেজা অর্ঘ্যে ভরা,

আজ থেকে দুঃখ রইবে কিন্তু দুঃখের নৈবেদ্য রইবে না।

এখন ওদের সম্বন্ধের পথ রইল

শুধু এ পারে ও পারে চিঠি লেখার সাঁকো বেয়ে।

কিন্তু নবনী তো সাজিয়ে লিখতে জানে না মনের কথা,

ও কেবল যত্নের স্বাদ লাগাতে জানে সেবাতে,

অর্‌কিডের চমক দিয়ে যেতে ফুলদানির ‘পরে

কুশলের চোখের আড়ালে,

গোপনে বিছিয়ে আসতে

নিজের-হাতে-কাজ-করা আসন

যেখানে কুশল পা রাখে।

কুশল ফিরল দেশে,

বিয়ের দিন করল স্থির।

আঙটি এনেছে বিলেত থেকে,

গেল সেটা পরাতে;

গিয়ে দেখে ঠিকানা না রেখেই নবনী নিরুদ্দেশ।

তার ডায়ারিতে আছে লেখা,

“যাকে ভালোবেসেছি সে ছিল অন্য মানুষ,

চিঠিতে যার প্রকাশ, এ তো সে নয়।”

এ দিকে কুশলের বিশ্বাস

তার চিঠিগুলি গদ্যে মেঘদূত,

বিরহীদের চিরসম্পদ।

আজ সে হারিয়েছে প্রিয়াকে,

কিন্তু মন গেল না চিঠিগুলি হারাতে —

ওর মমতাজ পালালো, রইল তাজমহল।

নাম লুকিয়ে ছাপালো চিঠি “উদ্‌ভ্রান্তপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে

নবনীর চরিত্র নিয়ে

বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা হয়েছে বিস্তর।

কেউ বলেছে, বাঙালির মেয়েকে

লেখক এগিয়ে নিয়ে চলেছে

ইবসেনের মুক্তিবাণীর দিকে —

কেউ বলেছে রসাতলে।

অনেকে এসেছে আমার কাছে জিজ্ঞাসা নিয়ে;

আমি বলেছি, ” আমি কী জানি।”

বলেছি, ” শাস্ত্রে বলে, দেবা ন জানন্তি।”

পাঠকবন্ধু বলেছে,

“নারীর প্রসঙ্গে না হয় চুপ করলেম

হতবুদ্ধি দেবতারই মতো,

কিন্তু পুরুষ?

তারও কি অজ্ঞাতবাস চিররহস্যে।

ও মানুষটা হঠাৎ পোষ মানলে কোন্‌ মন্ত্রে।”

আমি বলেছি,

“মেয়েই হোক আর পুরুষই হোক; স্পষ্ট নয় কোনো পক্ষই;

যেটুকু সুখ দেয় বা দুঃখ দেয় স্পষ্ট কেবল সেইটুকুই।

প্রশ্ন কোরো না,

পড়ে দেখো কী বলছে কুশল।”

কুশল বলে, “নবনী চার বছর ছিল দৃষ্টির বাইরে,

যেন নেমে গেল সৃষ্টির বাইরেতেই;

ওর মাধুর্যটুকুই রইল মনে,

আর সব-কিছু হল গৌণ।

সহজ হয়েছে ওকে সুন্দর ছাঁদে চিঠি লিখতে।

অভাব হয়েছে, করেছি দাবি —

ওর ভালোবাসার উপর অবাধ ভরসা

মনকে করেছে রসসিক্ত, করেছে গর্বিত।

প্রত্যেক চিঠিতে আপন ভাষায় ভুলিয়েছি আপনারই মন।

লেখার উত্তাপে ঢালাই করা অলংকার

ওর স্মৃতির মূর্তিটিকে সাজিয়ে তুলেছে দেবীর মতো।

ও হয়েছে নূতন রচনা।

এই জন্যেই খ্রীষ্টান শাস্ত্রে বলে,

সৃষ্টির আদিতে ছিল বাণী।”

পাঠকবন্ধু আবার জিগেস করেছে,

“ও কি সত্যি বললে,

না, এটা নাটকের নায়কগিরি?”

আমি বলেছি, “আমি কী জানি।”

 

 

শান্তিনিকেতন, ৫ জুলাই, ১৯৩৬

***

BEYOND UNDERSTANDING

 

The professor tried to explain the meaning of the play,

And took it beyond the scope of comprehension.

Let me talk about that play of mine.

The story is called ‘Letters to a loved one’,

The main character is Kushal Sen.

He went abroad after bidding farewell to Noboni.

They are to marry once he returns in four years.

Noboni prostrated herself upon her bed and wept,

She felt it was a death sentence prolonged over four years.

Kushal had no need for her love on his journey,

But she had smoothed his path to foreign climes.

She knew it too,

And had pledged to make her place in his heart.

Some times when Kushal

Forgot over both manners and wisdom and uttered a rude word,

She bore it in stoic silence;

Accepting herself to be the lesser,

Blaming herself every time.

She had hoped that she would triumph at the end just as the meek are said to do,

Just as grass takes over the tallest mountain day by day.

This was to be the crowning glory of her love,

To breathe life into heartless stone by chipping away

Endlessly beating her pain against it.

Today the object of her adoration goes far away.

Her offerings were soaked in tears,

From today there will remain pain but no one to see it.

Now their relationship exists

Along a bridge spanned by letters to each other.

But Noboni does not know how to put her words down on paper well,

She only knows how to express herself through solicitous care,

Through the placing of an orchid stem in a vase

While Kushal is unaware,

Or by spreading out on the floor

A mat she has embroidered with her own hands

So that Kushal may walk upon it.

Kushal has returned,

The day is fixed for their marriage to take place.

He has brought the ring from abroad,

He went to place it upon her finger;

but Noboni had left without leaving a forwarding address.

In her diary she had written,

“The one I had loved was someone else,

The one who wrote to me is not the same.”

And yet Kushal had imagined

His letters to be romantic odes in prose,

Eternal favours to the one separated.

Today he has lost his beloved,

But he could not fault his letters for that –

Mumtaz had escaped but he still had the edifice he had painstakingly created.

He published them under an alias as ‘Lost in love’

There has been much discussion

About the character of Noboni.

Some have said, Bengali women

Are being taken by the writer

Towards the creed of independence preached by Ibsen

Some have said they are going to hell.

Many have come to me with questions;

I have said, “What do I know!”

I have said, “The Scriptures say even the gods do not know the ways of women, etcetera.”

The readers have said,

“Let us put the woman aside then

Like a dumbfounded god,

But the man?

Will he be exiled in everlasting mystery as well?

What spells had tamed him in the first place!”

I have said,

“Whether woman or man; it is never very clear;

The only thing apparent is the happiness or sorrow they cause.

Do not ask questions,

Just read what Kushal says.”

Kushal says, “Noboni was out of sight for four years,

She seemed to leave completely;

Simply leaving the sweetness that was hers,

Making everything else secondary.

It has been easy writing beautiful letters to her.

When there was need, I made demands –

My great confidence in her affections

Kept my mind happy, proud in its existence.

With each letter I fooled myself alone with more words.

The warmth of those words shaped themselves

Into gifts that I adorned my memories of her.

She was made anew.

This is why the Christians say,

“At the start of Creation there were words.”

The readers asked again,

“Was that true,

Or is this just the play taking over?”

I said, “What do I know!”

 

 

Santiniketan, 5th July 1936

 

Advertisements

সন্ধ্যাসংগীত:উপহার/Shondhya Shongeet: Upohaar/ Songs of the Evening: The Gift.

উপহার

 

ভুলে গেছি কবে তুমি    ছেলেবেলা একদিন

মরমের কাছে এসেছিলে,

স্নেহময় ছায়াময়                  সন্ধ্যাসম আঁখি মেলি

একবার বুঝি হেসেছিলে।

বুঝি গো সন্ধ্যার কাছে শিখেছে সন্ধ্যার মায়া

ওই আঁখি দুটি–

চাহিলে হৃদয়পানে                 মরমেতে পড়ে ছায়া,

তারা উঠে ফুটি।

আগে কে জানিত বলো কত কী লুকানো ছিল

হৃদয়নিভৃতে,

তোমার নয়ন দিয়া                 আমার নিজের হিয়া

পাইনু দেখিতে।

কখনো গাও নি তুমি     কেবল নীরবে রহি

শিখায়েছ গান–

স্বপ্নময় শান্তিময়          পূরবীরাগিনী-তানে

বাঁধিয়াছ প্রাণ।

আকাশের পানে চাই, সেই সুরে গান গাই

একেলা বসিয়া।

একে একে সুরগুলি, অনন্তে হারায়ে যায়

আঁধারে পশিয়া।

বলো দেখি কতদিন     আস নি এ শূন্য প্রাণে।

বলো দেখি কতদিন      চাও নি হৃদয়পানে,

বলো দেখি কতদিন      শোনো নি এ মোর গান–

তবে সখী গান-গাওয়া    হল বুঝি অবসান।

যে রাগ শিখায়েছিলে    সে কি আমি গেছি ভুলে?

তার সাথে মিলিছে না সুর?

তাই কি আস না প্রাণে,    তাই কি শোন না গান–

তাই সখী, রয়েছ কি দূর?

ভালো সখী, আবার শিখাও,

আরবার মুখপানে চাও,

একবার ফেলো অশ্রুজল,

আঁখিপানে দুটি আঁখি তুলি।

তা হলে পুরানো সুর                আবার পড়িবে মনে,

আর কভু যাইব না ভুলি।

সেই পুরাতন চোখে               মাঝে মাঝে চেয়ো সখী,

উজলিয়া স্মৃতির মন্দির।

এই পুরাতন প্রাণে                 মাঝে মাঝে এসো সখী,

শূন্য আছে প্রাণের কুটির।

নহিলে আঁধার মেঘরাশি

হৃদয়ের আলোক নিবাবে,

একে একে ভুলে যাব সুর,

গান গাওয়া সাঙ্গ হয়ে যাবে।

***

THE GIFT

 

I have long forgotten when one day in my youth

You came close to my soul,

Your eyes filled with compassion and evening shade

Perhaps you smiled but once.

I suppose they learnt to shelter with their gaze from evening itself

Those two eyes –

They look inwards and draw a calm repose upon the soul,

Starlight begins to glow.

Who would have known how much was once kept from the world

Within the recesses of the heart,

With your eyes                 my own heart

I see clearly.

Never did you speak once     but in silence

You still gave me song.

Filled with dreams and peace to the strains of Purabi

You have tuned my soul.

I look to the skies and sing to that tune

Alone.

One by one the tunes, are lost into the infinite

Once they enter that darkness.

Tell me how it has been since you have not been to this empty heart.

And how long it has been that you have not looked at this heart,

Tell me how long you have not heard me sing –

But then perhaps I am done with my song.

Have I forgotten that tune you taught?

Does my song not ring true?

Is that why you no longer visit my heart, is that why you listen no more –

Is that why you remain afar?

Then I ask you, teach me once more,

Look upon me once again,

Shed tears once,

As you raise your eyes once more to mine.

Then that old song I will recall once more,

And never lose again.

Look upon me with the eyes of our past

Brightening the altar of memories.

To this old soul too, come when you can

This heart lies empty.

Or else the dark clouds

Will blow out the light within,

And I will forget each tune,

Silenced will be my days of song.
To hear the Raga Purvi:

 

 

সামান্য ক্ষতি/Shamanyo Kshoti/Very Little Harm

সামান্য ক্ষতি

বহে মাঘমাসে শীতের বাতাস,

স্বচ্ছসলিলা বরুণা।

পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জনে

শিলাময় ঘাট চম্পকবনে,

স্নানে চলেছেন শতসখীসনে

কাশীর মহিষী করুণা।

সে পথ সে ঘাট আজি এ প্রভাতে

জনহীন রাজশাসনে।

নিকটে যে ক’টি আছিল কুটির

ছেড়ে গেছে লোক, তাই নদীতীর

স্তব্ধ গভীর, কেবল পাখির

কূজন উঠিছে কাননে।

আজি উতরোল উত্তর বায়ে

উতলা হয়েছে তটিনী।

সোনার আলোক পড়িয়াছে জলে,

পুলকে উছলি ঢেউ ছলছলে–

লক্ষ মানিক ঝলকি আঁচলে

নেচে চলে যেন নটিনী।

কলকল্লোলে লাজ দিল আজ

নারী কণ্ঠের কাকলি।

মৃণালভুজের ললিত বিলাসে

চঞ্চলা নদী মাতে উল্লাসে,

আলাপে প্রলাপে হাসি-উচ্ছ্বাসে

আকাশ উঠিল আকুলি।

স্নান সমাপন করিয়া যখন

কূলে উঠে নারী সকলে

মহিষী কহিলা, “উহু! শীতে মরি,

সকল শরীর উঠিছে শিহরি,

জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচরী–

শীত নিবারিব অনলে।’

Very Little Harm

In the month of Magh, the cold wind blows,

And clear flow the waters of the Baruna.

Far from the palace, a village serene

Stone strewn the banks, flowers bloom in the green,

A hundred girls step lightly on the path,

Accompanying Queen Karuna of Kashi to her bath.</p>

The path, the banks both lie empty this morn

By King’s orders they are left alone.

A few poor huts, no life stirs within

Bereft of movement, the river bank green

The birds unaware of the visit, fill the air with song

As they have joyfully done all life long.

Today the restless North Wind

Makes the water shimmer, anxious its mind.

Golden light makes the surface glitter,

And little waves tremble in rapture –

As though a million diamonds in the dress

Of a beautiful dancing seductress.

The murmurs of the river are drowned today

By peals of laughter from beauty at play.

Their lotus stem arms swirl through the water

Awakening the still river in tinkling answer

Words and repartee fill the air

The sky rings out in reply loud and clear.

Finally, when her bath was over

They climbed out of the water

The queen shivered ever so prettily

Saying the cold was too much to bear easily.

Handmaidens of mine, you must light a fire

The warmth of flames for myself I desire.

Image: http://karava.org/white_umbrella

ছুটি/Chuti/Some Time Away

ছুটি

দাও-না ছুটি,
কেমন করে বুঝিয়ে বলি
কোন্‌খানে।
যেখানে ওই শিরীষ বনের গন্ধপথে
মৌমাছিদের কাঁপছে ডানা সারাবেলা।
যেখানেতে মেঘ-ভাসা ওই সুদূরতা,
জলের প্রলাপ যেখানে প্রাণ উদাস করে
সন্ধ্যাতারা ওঠার মুখে,
যেখানে সব প্রশ্ন গেছে থেমে—
শূন্য ঘরে অতীত স্মৃতি গুন্‌গুনিয়ে
ঘুম ভাঙিয়ে রাখে না আর বাদলরাতে।
যেখানে এই মন
গোরুচরা মাঠের মধ্যে স্তব্ধ বটের মতো
গাঁয়ে – চলা পথের পাশে।
কেউ বা এসে প্রহরখানেক বসে তলায়,
পা ছড়িয়ে কেউ বা বাজায় বাঁশি,
নববধূর পাল্‌কিখানা নামিয়ে রাখে
ক্লান্ত দুই-পহরে;
কৃষ্ণ-একাদশীর রাতে
ছায়ার সঙ্গে ঝিল্লিরবে জড়িয়ে পড়ে
চাঁদের শীর্ণ আলো।
যাওয়া-আসার স্রোত বহে যায় দিনে রাতে—
ধরে-রাখার নাই কোনো আগ্রহ,
দূরে রাখার নাই তো অভিমান।
রাতের তারা স্বপ্নপ্রদীপখানি
ভোরের আলোয় ভাসিয়ে দিয়ে
যায় চলে, তার দেয় না ঠিকানা।

Some Time Away

Why not some time away,
How do I convey
Where I wish I could be.
Where the Shirish trees grow in dense perfumed closeness
And bee wings shimmer all day.
Where clouds float in a distance all of their own,
Where the rush of water speaks to a distracted mind
Where all questions come to cease,
As the evening star rises-
Memories do not hum in empty rooms
Nor keep sleep away on rainy nights.
Where the mind becomes
As a great tree in silent watch, over cattle grazed fields
By little used village paths.
Where one may pause to sit a while
Or play a flute full of yearning,
As a retinue escorting a new bride,
Waits in the heat of mid day;
On dark moonless nights
Listless lunar light clings to the embrace
Of shadows serenaded by insect song
Comings and goings night and day
No eager hold on any thing
Nor bruised pride over leaving.
There the stars of the night illumine dreams
Then give way to pearly dawn light
As they leave for places unknown.

মনে পড়ে, যেন এককালে লিখিতাম/Mone Porey Jeno Ek Kaale Likhitam/I remember, it seems I once wrote

নিমন্ত্রণ

মনে পড়ে, যেন এককালে লিখিতাম
চিঠিতে তোমারে প্রেয়সী অথবা প্রিয়ে।
একালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম–
থাক্‌ সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে।
তুমি দাবি কর কবিতা আমার কাছে
মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে লেখা,
আমার কাব্য তোমার দুয়ারে যাচে
নম্র চোখের কম্প্র কাজলরেখা।
সহজ ভাষায় কথাটা বলাই শ্রেয়–
যে-কোনো ছুতায় চলে এসো মোর ডাকে,
সময় ফুরালে আবার ফিরিয়া যেয়ো,
বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে।
গৌরবরন তোমার চরণমূলে
ফল্‌সাবরন শাড়িটি ঘেরিবে ভালো;
বসনপ্রান্ত সীমন্তে রেখো তুলে,
কপোলপ্রান্তে সরু পাড় ঘন কালো।

The Invitation

I remember, it seems I once wrote
Dearest or beloved, to you on a note.
I suppose, today they only write a name —
Let that be, nameless you remain the same.
You demand poetry from me and my pen
Words that rhyme in complex refrain
At your door my words seek so much less
A flutter of kohl-lined gentle eyes! Largesse!
It is perhaps best to keep my words simply designed
Answer my call at the slightest ruse you can find
When the time is over, return to your own space
But till then, let us linger face to face.
Your sari encircles your bare feet,
Its purple the colour of Phalsa berries so sweet;
Place it as a veil upon your hair so sleek
Its dark border glowing against your cheek.

Painting by Subhas Roy, ‘Radha’
Taken from the Tribune, Chandigarh.

সাধারণ মেয়ে/ The Ordinary Woman

সাধারণ মেয়ে

আমি অন্তঃপুরের মেয়ে,

চিনবে না আমাকে।

তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েছি, শরৎবাবু,

‘বাসি ফুলের মালা’।

তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরণ-দশা ধরেছিল

পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে।

পঁচিশ বছর বয়সের সঙ্গে ছিল তার রেষারেষি,

দেখলেম তুমি মহদাশয় বটে —

জিতিয়ে দিলে তাকে।

নিজের কথা বলি।

বয়স আমার অল্প।

একজনের মন ছুঁয়েছিল

আমার এই কাঁচা বয়সের মায়া।

তাই জেনে পুলক লাগত আমার দেহে —

ভুলে গিয়েছিলেম, অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে আমি।

আমার মতো এমন আছে হাজার হাজার মেয়ে,

অল্পবয়সের মন্ত্র তাদের যৌবনে।

তোমাকে দোহাই দিই,

একটি সাধারণ মেয়ের গল্প লেখো তুমি।

বড়ো দুঃখ তার।

তারও স্বভাবের গভীরে

অসাধারণ যদি কিছু তলিয়ে থাকে কোথাও

কেমন করে প্রমাণ করবে সে,

এমন কজন মেলে যারা তা ধরতে পারে।

কাঁচা বয়সের জাদু লাগে ওদের চোখে,

মন যায় না সত্যের খোঁজে,

আমরা বিকিয়ে যাই মরীচিকার দামে।

কথাটা কেন উঠল তা বলি।

মনে করো তার নাম নরেশ।

সে বলেছিল কেউ তার চোখে পড়ে নি আমার মতো।

এতবড়ো কথাটা বিশ্বাস করব যে সাহস হয় না,

না করব যে এমন জোর কই।

একদিন সে গেল বিলেতে।

চিঠিপত্র পাই কখনো বা।

মনে মনে ভাবি, রাম রাম! এত মেয়েও আছে সে দেশে,

এত তাদের ঠেলাঠেলি ভিড়!

আর তারা কি সবাই অসামান্য —

এত বুদ্ধি, এত উজ্জ্বলতা।

আর তারা সবাই কি আবিষ্কার করেছে এক নরেশ সেনকে

স্বদেশে যার পরিচয় চাপা ছিল দশের মধ্যে।

গেল মেলের চিঠিতে লিখেছে

লিজির সঙ্গে গিয়েছিল সমুদ্রে নাইতে —

বাঙালি কবির কবিতা ক’ লাইন দিয়েছে তুলে

সেই যেখানে উর্বশী উঠছে সমুদ্র থেকে —

তার পরে বালির ‘পরে বসল পাশাপাশি —

সামনে দুলছে নীল সমুদ্রের ঢেউ,

আকাশে ছড়ানো নির্মল সূর্যালোক।

লিজি তাকে খুব আস্তে আস্তে বললে,

‘এই সেদিন তুমি এসেছ, দুদিন পরে যাবে চলে;

ঝিনুকের দুটি খোলা,

মাঝখানটুকু ভরা থাক্‌

একটি নিরেট অশ্রুবিন্দু দিয়ে —

দুর্লভ , মূল্যহীন। ‘

কথা বলবার কী অসামান্য ভঙ্গি।

সেইসঙ্গে নরেশ লিখেছে,

‘কথাগুলি যদি বানানো হয় দোষ কী,

কিন্তু চমৎকার —

হীরে-বসানো সোনার ফুল কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়। ‘

বুঝতেই পারছ

একটা তুলনার সংকেত ওর চিঠিতে অদৃশ্য কাঁটার মতো

আমার বুকের কাছে বিঁধিয়ে দিয়ে জানায় —

আমি অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে।

মূল্যবানকে পুরো মূল্য চুকিয়ে দিই

এমন ধন নেই আমার হাতে।

ওগো, নাহয় তাই হল,

নাহয় ঋণীই রইলেম চিরজীবন।

পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি শরৎবাবু,

নিতান্তই সাধারণ মেয়ের গল্প —

যে দুর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয়

অন্তত পাঁচ-সাতজন অসামান্যার সঙ্গে —

অর্থাৎ, সপ্তরথিনীর মার।

বুঝে নিয়েছি আমার কপাল ভেঙেছে,

হার হয়েছে আমার।

কিন্তু তুমি যার কথা লিখবে

তাকে জিতিয়ে দিয়ো আমার হয়ে,

পড়তে পড়তে বুক যেন ওঠে ফুলে।

ফুলচন্দন পড়ুক তোমার কলমের মুখে।

তাকে নাম দিয়ো মালতী।

ওই নামটা আমার।

ধরা পড়বার ভয় নেই।

এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে,

তারা সবাই সামান্য মেয়ে।

তারা ফরাসি জর্মান জানে না,

কাঁদতে জানে।

কী করে জিতিয়ে দেবে।

উচ্চ তোমার মন, তোমার লেখনী মহীয়সী।

তুমি হয়তো ওকে নিয়ে যাবে ত্যাগের পথে,

দুঃখের চরমে, শকুন্তলার মতো।

দয়া কোরো আমাকে।

নেমে এসো আমার সমতলে।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাত্রির অন্ধকারে

দেবতার কাছে যে অসম্ভব বর মাগি —

সে বর আমি পাব না,

কিন্তু পায় যেন তোমার নায়িকা।

রাখো-না কেন নরেশকে সাত বছর লণ্ডনে,

বারে বারে ফেল করুক তার পরীক্ষায়,

আদরে থাক্‌ আপন উপাসিকামণ্ডলীতে।

ইতিমধ্যে মালতী পাস করুক এম . এ .

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে,

গণিতে হোক প্রথম তোমার কলমের এক আঁচড়ে।

কিন্তু ওইখানেই যদি থাম

তোমার সাহিত্যসম্রাট নামে পড়বে কলঙ্ক।

আমার দশা যাই হোক

খাটো কোরো না তোমার কল্পনা।

তুমি তো কৃপণ নও বিধাতার মতো।

মেয়েটাকে দাও পাঠিয়ে য়ুরোপে।

সেখানে যারা জ্ঞানী, যারা বিদ্বান, যারা বীর,

যারা কবি, যারা শিল্পী, যারা রাজা,

দল বেঁধে আসুক ওর চার দিকে।

জ্যোতির্বিদের মতো আবিষ্কার করুক ওকে —

শুধু বিদুষী ব’লে নয়, নারী ব’লে।

ওর মধ্যে যে বিশ্ববিজয়ী জাদু আছে

ধরা পড়ুক তার রহস্য, মূঢ়ের দেশে নয় —

যে দেশে আছে সমজদার, আছে দরদি,

আছে ইংরেজ জর্মান ফরাসি।

মালতীর সম্মানের জন্য সভা ডাকা হোক-না,

বড়ো বড়ো নামজাদার সভা।

মনে করা যাক সেখানে বর্ষণ হচ্ছে মুষলধারে চাটুবাক্য,

মাঝখান দিয়ে সে চলেছে অবহেলায় —

ঢেউয়ের উপর দিয়ে যেন পালের নৌকো।

ওর চোখ দেখে ওরা করছে কানাকানি,

সবাই বলছে ভারতবর্ষের সজল মেঘ আর উজ্জ্বল রৌদ্র

মিলেছে ওর মোহিনী দৃষ্টিতে।

( এইখানে জনান্তিকে বলে রাখি

সৃষ্টিকর্তার প্রসাদ সত্যই আছে আমার চোখে।

বলতে হল নিজের মুখেই,

এখনো কোনো য়ুরোপীয় রসজ্ঞের

সাক্ষাৎ ঘটে নি কপালে। )

নরেশ এসে দাঁড়াক সেই কোণে,

আর তার সেই অসামান্য মেয়ের দল।

আর তার পরে?

তার পরে আমার নটেশাকটি মুড়োল,

স্বপ্ন আমার ফুরোল।

হায় রে সামান্য মেয়ে!

হায় রে বিধাতার শক্তির অপব্যয়!

The Ordinary Woman

I  am a woman who lives away from the world,

You will not have met me.

I have read your recent novel, Saratbabu,

‘Garland Of Stale Flowers’.

Your heroine Elokeshi almost died

At the age of thirty five.

She was competing with the age of twenty five.

I found that you are generous indeed –

You allowed her to win.

Let me tell you something about myself,

I am young.

Someone came into my life,

At this tender age.

That brought such a thrill to my body –

I even forgot I am after all, very ordinary.

There are thousands of women like me,

Who have been touched by the magic of youth.

Let me plead with you,

Please write about an ordinary woman.

She has much to feel sorry about.

Even within that plainness,

If anything extraordinary is hiding

How is she to prove it?

How many can be found that are able to see that?

They only see the illusion of youth,

Their minds do not seek the truth

We women are mirages.

Let me tell you why I brought this up:

Let us say, his name is Naresh.

He said that he had never met anyone like me

I was not brave enough to believe such a statement

Nor strong enough to see it as a lie.

One day he went abroad.

Sometimes I got a letter or two.

I used to think, “Good God, there are so many women even there,

There must be crowds of them.

And are they all extraordinary?

Such brains, such brilliance!

And have they all discovered the one Naresh Sen?

Who was hidden amongst many, when he was here”.

In his latest letter he writes,

“Went sea bathing with Lizzie”

He even quotes from a Bengali poem,

That part about the heavenly dancer Urvashi rising from the sea!

Then they sat side by side on the sands,

The waves of the blue sea before them,

The sky above filled with spotless sunshine.

Lizzie said to him very softly,

“You have just arrived, you will leave in a short while

Two halves of a shell –

Let there be a perfect, priceless teardrop in between them”

What a lovely way of saying things!

Naresh too has written,

“Even if they are made up words

Are they not beautiful?

A diamond encrusted golden flower is not real but still real enough”.

You can understand,

How this makes me feel,

A thorn of comparison from his letter straight to my heart.

I am exceedingly ordinary.

I do not have any thing of any worth

To pay in full for something so valuable.

To you, I say, let that be

Let me be indebted for eternity.

I implore you, please write a story Saratbabu,

About a very ordinary woman

One who must compete from afar

With not one but maybe seven such extraordinary women

Like seven suns of womanhood.

I know, I am unfortunate,

I have  already lost.

But when you write about the ordinary woman,

Let her win, on my behalf,

Let my heart swell with pride on her behalf.

May your  pen be blessed.

Give her the name Malati

That by the way is my name.

Never fear,

There are many such Malatis in this land

All ordinary women.

They do not know French or German,

They know how to cry.

How will you make her win?

You are magnanimous, mighty is your pen.

Perhaps you will take her down the path of sacrifice.

To the depths of sorrow, like Sakuntala!

Please, be kind to me.

Come down to my level.

As I lie in bed and in the dark of night

Ask for the impossible from my god –

I know that I will never get that.

But may your heroine receive all of that.

Let Naresh be in London for seven years,

Let him fail his examinations again and again,

In the midst of his circle of admiring females.

In the mean time, Malati completes her M.A.

From Calcutta University.

Let her come first in Mathematics with one stroke of your pen,

But if you stop there,

Your fame as a literary genius would be sullied.

Whatever my condition is,

Do not rein in your imagination.

You are not a miser like my fate.

Send the woman to Europe.

There, their knowledgeable, their wise, their brave,

Their poets, their artists, their kings –

Let them surround her in great numbers.

Let them discover her like astronomers do –

Not just as a scholar, but as a woman too.

Let her world conquering magic win them over,

Let that mystery unfold, not in this ignorant nation –

But in the land where there are connoisseurs, sympathizers

There are Englishmen, Germans and French.

Let them felicitate  her at gatherings,

Where famous names will gather.

Let us imagine that praise is  being showered on her,

She walks amongst that, unimpressed –

A galleon in full sail upon the waves.

Everyone whispers about the beauty of her eyes

They say the clouds of India’s monsoon and the brightness of her summer sun

Unite in her bewitching eyes.

(Let me say here

My eyes truly are blessed by the gods.

I had to say this for myself,

I  have not yet met any European aficionado.)

Let Naresh come and stand there,

Alongside his band of extraordinary women.

And what happens after that?

Like the children’s rhyme,

My plants withered,

My dreams came to an end.

Alas! Ordinary woman –

Alas! Such a waste of the Creator’s energy!

Follow the link to hear Bratati Banerjee recite the poem:

http://www.youtube.com/watch?v=bW5wPNnfGro&feature=share

আমি রূপে তোমায় ভোলাব না /I will not beguile you with mere beauty

আমি     রূপে তোমায় ভোলাব না , ভালোবাসায় ভোলাব ।
আমি     হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো , গান দিয়ে দ্বার খোলাব ॥
ভরাব না ভূষণভারে ,     সাজাব না ফুলের হারে –
সোহাগ আমার মালা করে গলায় তোমার দোলাব ।
জানবে না কেউ কোন্‌ তুফানে   তরঙ্গদল নাচবে প্রাণে ,
চাঁদের মতন অলখ টানে জোয়ারে ঢেউ তোলাব ॥

 

I will not beguile you with mere beauty; I would rather conquer you with selfless love

I will not push open the doors to your heart; rather I will serenade you with melody

I will not adorn myself with ornaments bright, not garland myself with flowers perfumed

My love for you shall be the only offering I bring.

No one will know what storms will stir such emotions in your heart

Like the moon in the sky, I will sway from afar the thoughts that swirl through your mind.

Follow the links to listen to the song:

Vikram Singh Khangura: http://www.youtube.com/watch?v=PMQhlVWiyo4

Kanika Banerjee: http://www.youtube.com/watch?v=9vhNL3rfWIk