Archives

শেষ সপ্তক: তেতাল্লিশ (পঁচিশে বৈশাখ চলেছে)/Shesh Shoptok: Poem Forty Three ( Ponchishey Baishakh Cholecche)/The twenty fifth day of Baisakh

 

শ্রীমান অমিয়চন্দ্র চক্রবতী কল্যাণীয়েষু

পঁচিশে বৈশাখ চলেছে

 

জন্মদিনের ধারাকে বহন করে

 

মৃত্যুদিনের দিকে।

 

সেই চলতি আসনের উপর বসে

 

কোন্‌ কারিগর গাঁথছে

 

ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়

 

নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা।

 

রথে চড়ে চলেছে কাল;

 

পদাতিক পথিক চলতে চলতে

 

পাত্র তুলে ধরে,

 

পায় কিছু পানীয়;–

 

পান সারা হলে

 

পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে;

 

চাকার তলায়

 

ভাঙা পাত্র ধুলায় যায় গুঁড়িয়ে।

 

তার পিছনে পিছনে

 

নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে,

 

পায় নতুন রস,

 

একই তার নাম,

 

কিন্তু সে বুঝি আর-একজন।

 

একদিন ছিলেম বালক।

 

কয়েকটি জন্মদিনের ছাঁদের মধ্যে

 

সেই যে-লোকটার মূর্তি হয়েছিল গড়া

 

তোমরা তাকে কেউ জান না।

 

সে সত্য ছিল যাদের জানার মধ্যে

 

কেউ নেই তারা।

 

সেই বালক না আছে আপন স্বরূপে

 

না আছে কারো স্মৃতিতে।

 

সে গেছে চলে তার ছোটো সংসারটাকে নিয়ে;

 

তার সেদিনকার কান্না-হাসির

 

প্রতিধ্বনি আসে না কোনো হাওয়ায়।

 

তার ভাঙা খেলনার টুকরোগুলোও

 

দেখিনে ধুলোর ‘পরে।

 

সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে

 

সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।

 

তার বিশ্ব ছিল

 

সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে।

 

তার অবোধ চোখ-মেলে চাওয়া

 

ঠেকে যেত বাগানের পাঁচিলটাতে

 

সারি সারি নারকেল গাছে।

 

সন্ধ্যেবেলাটা রূপকথার রসে নিবিড়;

 

বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝখানে

 

বেড়া ছিল না উঁচু,

 

মনটা এদিক থেকে ওদিকে

 

ডিঙিয়ে যেত অনায়াসেই।

 

প্রদোষের আলো-আঁধারে

 

বস্তুর সঙ্গে ছায়াগুলো ছিল জড়িয়ে,

 

দুইই ছিল একগোত্রের।

 

সে-কয়দিনের জন্মদিন

 

একটা দ্বীপ,

 

কিছুকাল ছিল আলোতে,

 

কাল-সমুদ্রের তলায় গেছে ডুবে।

 

ভাঁটার সময় কখনো কখনো

 

দেখা যায় তার পাহাড়ের চূড়া,

 

দেখা যায় প্রবালের রক্তিম তটরেখা।

 

পঁচিশে বৈশাখ তার পরে দেখা দিল

 

আর-এক কালান্তরে,

 

ফাল্গুনের প্রত্যুষে

 

রঙিন আভার অস্পষ্টতায়।

 

তরুণ যৌবনের বাউল

 

সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে,

 

ডেকে বেড়াল

 

নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে

 

অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে।

 

সেই শুনে কোনো-কোনোদিন বা

 

বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীর আসন টলেছিল,

 

তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন

 

তাঁর কোনো কোনো দূতীকে

 

পলাশবনের রঙমাতাল ছায়াপথে

 

কাজ-ভোলানো সকাল-বিকালে।

 

তখন কানে কানে মৃদু গলায় তাদের কথা শুনেছি,

 

কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝিনি।

 

দেখেছি কালো চোখের পক্ষ্ণরেখায়

 

জলের আভাস;

 

দেখেছি কম্পিত অধরে নিমীলিত বাণীর

 

বেদনা;

 

শুনেছি ক্বণিত কঙ্কণে

 

চঞ্চল আগ্রহের চকিত ঝংকার।

 

তারা রেখে গেছে আমার অজানিতে

 

পঁচিশে বৈশাখের

 

প্রথম ঘুমভাঙা প্রভাতে

 

নতুন ফোটা বেলফুলের মালা;

 

ভোরের স্বপ্ন

 

তারি গন্ধে ছিল বিহ্বল।

 

সেদিনকার জন্মদিনের কিশোর জগৎ

 

ছিল রূপকথার পাড়ার গায়ে-গায়েই,

 

জানা না-জানার সংশয়ে।

 

সেখানে রাজকন্যা আপন এলোচুলের আবরণে

 

কখনো বা ছিল ঘুমিয়ে,

 

কখনো বা জেগেছিল চমকে উঠে’

 

সোনার কাঠির পরশ লেগে।

 

দিন গেল।

 

সেই বসন্তীরঙের পঁচিশে বৈশাখের

 

রঙ-করা প্রাচীরগুলো

 

পড়ল ভেঙে।

 

যে পথে বকুলবনের পাতার দোলনে

 

ছায়ায় লাগত কাঁপন,

 

হাওয়ায় জাগত মর্মর,

 

বিরহী কোকিলের

 

কুহুরবের মিনতিতে

 

আতুর হত মধ্যাহ্ন,

 

মৌমাছির ডানায় লাগত গুঞ্জন

 

ফুলগন্ধের অদৃশ্য ইশারা বেয়ে,

 

সেই তৃণ-বিছানো বীথিকা

 

পৌঁছল এসে পাথরে-বাঁধানো রাজপথে।

 

সেদিনকার কিশোরক

 

সুর সেধেছিল যে-একতারায়

 

একে একে তাতে চড়িয়ে দিল

 

তারের পর নতুন তার।

 

সেদিন পঁচিশে বৈশাখ

 

আমাকে আনল ডেকে

 

বন্ধুর পথ দিয়ে

 

তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে।

 

বেলা-অবেলায়

 

ধ্বনিতে ধ্বনিতে গেঁথে

 

জাল ফেলেছি মাঝদরিয়ায়;

 

কোনো মন দিয়েছে ধরা,

 

ছিন্ন জালের ভিতর থেকে

 

কেউ বা গেছে পালিয়ে।

 

কখনো দিন এসেছে ম্লান হয়ে,

 

সাধনায় এসেছে নৈরাশ্য,

 

গ্লানিভারে নত হয়েছে মন।

 

এমন সময়ে অবসাদের অপরাহ্নে

 

অপ্রত্যাশিত পথে এসেছে

 

অমরাবতীর মর্ত্যপ্রতিমা;

 

সেবাকে তারা সুন্দর করে,

 

তপঃক্লান্তের জন্যে তারা

 

আনে সুধার পাত্র;

 

ভয়কে তারা অপমানিত করে

 

উল্লোল হাস্যের কলোচ্ছ্বাসে;

 

তারা জাগিয়ে তোলে দুঃসাহসের শিখা

 

ভস্মে-ঢাকা অঙ্গারের থেকে;

 

তারা আকাশবাণীকে ডেকে আনে

 

প্রকাশের তপস্যায়।

 

তারা আমার নিবে-আসা দীপে

 

জ্বালিয়ে গেছে শিখা,

 

শিথিল-হওয়া তারে

 

বেঁধে দিয়েছে সুর,

 

পঁচিশে বৈশাখকে

 

বরণমাল্য পরিয়েছে

 

আপন হাতে গেঁথে।

 

তাদের পরশমণির ছোঁওয়া

 

আজো আছে

 

আমার গানে আমার বাণীতে।

 

সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে

 

দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত

 

গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।

 

একতারা ফেলে দিয়ে

 

কখনো বা নিতে হল ভেরী।

 

খর মধ্যাহ্নের তাপে

 

ছুটতে হল

 

জয়পরাজয়ের আবর্তনের মধ্যে।

 

পায়ে বিঁধেছে কাঁটা,

 

ক্ষত বক্ষে পড়েছে রক্তধারা।

 

নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ

 

আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে,

 

জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে

 

নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে।

 

বিদ্বেষে অনুরাগে

 

ঈর্ষায় মৈত্রীতে,

 

সংগীতে পরুষ কোলাহলে

 

আলোড়িত তপ্ত বাষ্পনিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে

 

আমার জগৎ গিয়েছে তার কক্ষপথে।

 

এই দুর্গমে, এই বিরোধ-সংক্ষোভের মধ্যে

 

পঁচিশে বৈশাখের প্রৌঢ় প্রহরে

 

তোমরা এসেছ আমার কাছে।

 

জেনেছ কি,

 

আমার প্রকাশে

 

অনেক আছে অসমাপ্ত

 

অনেক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন

 

অনেক উপেক্ষিত?

 

অন্তরে বাহিরে

 

সেই ভালো মন্দ,

 

স্পষ্ট অস্পষ্ট,

 

খ্যাত অখ্যাত,

 

ব্যর্থ চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণের মধ্য থেকে

 

যে আমার মূর্তি

 

তোমাদের শ্রদ্ধায়, তোমাদের ভালোবাসায়,

 

তোমাদের ক্ষমায়

 

আজ প্রতিফলিত,

 

আজ যার সামনে এনেছ তোমাদের মালা,

 

তাকেই আমার পঁচিশে বৈশাখের

 

শেষবেলাকার পরিচয় বলে

 

নিলেম স্বীকার করে,

 

আর রেখে গেলেম তোমাদের জন্যে

 

আমার আশীর্বাদ।

 

যাবার সময় এই মানসী মূর্তি

 

রইল তোমাদের চিত্তে,

 

কালের হাতে রইল বলে

 

করব না অহংকার।

 

তার পরে দাও আমাকে ছুটি

 

জীবনের কালো-সাদা সূত্রে গাঁথা

 

সকল পরিচয়ের অন্তরালে;

 

নির্জন নামহীন নিভৃতে;

 

নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে

 

সুর মিলিয়ে নিতে দাও

এক চরম সংগীতের গভীরতায়।

****

To Sriman Amiya Chandra Chakravarty

 

The twenty fifth day of Baisakh

Carries with it a stream of birthdays

Towards the finality of death.

Seated on that moving throne

Who is the craftsman that strings

A hundred inconsequential lives and little deaths,

A strand of all the different expressions of me.

Time moves along like a chariot;

We are but travellers who walk along

Raising their bowl in supplication,

Receiving a little reward;

Once that is gone

We are slowly lost in the darkness;

While the wheels crush underfoot

The broken bowl to dust.

The one who follows

Raising arms in hope,

The one who receives new reward,

They carry the same name,

But verily they are not the same.

Once I was a boy.

A few birthdays together helped to form

A certain me.

But not one of you know that boy.

Those whose consciousness made his life a reality

None of them live to speak.

That boy lives neither in physical form

Nor in anyone’s memory.

He has gone taking all trace of his existence

The tears he shed and his laughter both

Invite no echoes on the wind

I do not even see his broken toys

Upon the dust today.

And yet once he too sat at life’s window

Looking outward

At the world that was his

Held within that little encompass

His innocent wide eyed gaze

Would find itself bound by the garden’s boundary walls

Trapped by row upon row of coconut palms

His evenings were rich with the mystery of fables

Suspended between trust and disbelief

In his eyes both very nearly the same,

His mind would journey from one to the other

With supple ease.

Like evenings touched by darkness and light

Shadows clung to reality,

There was little to separate the two.

Those birthdays

Together an island,

Once lit by beams,

Now lost beneath an ocean of time.

Sometimes when the waves pull back

Its peaks yield themselves to view,

Encircled by blushing coral shores.

Then the twenty fifth of Baishakh appears

Another turn of the wheels of time,

At the dawn of Phalgun

Through a shimmering haze.

The minstrel of youth

Tuned his strings to his own song

And called out

To the wanderer’s heart

His voice plaintive with the maddening lilt of unspoken sorrow

Some days it must even have reached

The gods sitting high above and shook their seats,

And they sent

One of their maidens

To walk the hidden paths under the intoxicating shade of Palas boughs

Setting aside all thought of work for those hours

It was then that I used to hear them softly whisper in my ear,

I understood some of what they said, some of the words were beyond my ken.

I have seen dark luminous eyes glisten

With the threat of held back tears

I have seen the pain of unsaid words pause on trembling lips;

I have heard the tinkling of anklets

Raised suddenly in eager response.

They have left without my knowledge

On the first hour of dawn

On the twenty fifth of Baishakh

A garland of freshly opened jasmine buds;

My dreams at that hour

Were stirred by that perfume.

The youthful realization of that birthday

Was neighbour to the fantasy of fairy tales

United by uncertainty over truth and illusion.

There a princess lay clothed in open tresses

Now asleep;

Now suddenly awake

At the touch of a golden wand.

The day passed.

Its spring tinted hours fading,

Its colourful walls

Crashing down.

The paths where light and shadow had once danced

Shimmering under trembling mimosa leaves

Raising a murmur in the winds,

Where a lonely cuckoo

Called incessantly

Filling the midday with its yearning song,

Bee wings hummed

Heeding the unseen messages of floral perfume,

Then that grassy bower was no more

Became a thoroughfare of stone

The youth who

Had once tuned his strings

Now began to string them anew

Note upon note and wire upon wire.

The twenty fifth of Baishakh

Called to me

Along thoroughfares roughened with wear

To face the clamour of a great sea of people.

And I spent hour upon hour

Weaving sounds together

A web to cast over the waves;

Some minds yielded to me,

Some escaped through the rents

Returning to whence they had come from.

Sometimes as the day faded,

Despair grew entwined with my efforts,

And sadness burdened my heart.

When as evening drew down upon my weariness

Along unexpected avenues there arrived

Celestial beings drawn from this earth;

They bring beauty to their administrations

And for the belaboured they bring

Ambrosia;

They drive doubt away

With peals of joyous laughter;

They help stoke the flames of adventure anew

From hidden embers;

And coax speech from the heavens

As reward for untiring effort.

They have lit my dying lamp

And brought it to life

They have brought music afresh

To my slackened bow,

They have greeted the twenty fifth of Baishakh

Garlanding it

With their own hands

Their magical touch

Still lingers

In my song and in the midst of my words.

And some days on the battle field that is life

The sounds of conflict rose in every direction

Deep like thunder among the clouds.

Some days I had to cast the lute aside

To take up the trumpet call to arms.

In the midday heat

I had to enter headfirst

Into a maelstrom of victory and defeat.

Thorns pierced my feet,

And my heart bled with pain.

Cruel waves struck

My craft from all sides,

The very business of life threatening

To drag me below calumny and vicious filth.

In hatred and love

In jealousy and amity,

In song and wicked cacophony

When each breath came as a gasp

As my existence journeyed on its path.

In the midst of this strife

As the twenty fifth of Baishakh grows grey

You have come to me

But do you realise

That within what you see

Much is incomplete

And so much has been lost

And ever more ruined by neglect?

Within and without

Good and evil,

Clarity and shadows,

Fame and ignorance,

From the complex marriage of failure and achievement

The form that you see

Through your respect and affection,

Through your forgiving eyes

That is a reflection of me.

The one to whom you bring your gifts,

I will accept that

As who I am on this twenty fifth day

As the one I am today,

And I will leave for you all

My blessings.

As I leave, may this image of mine wrought from the mind

Live on in your hearts,

I will not suffer false pride

That time will take pains to preserve it.

After that, allow me to leave

To retreat where life comes to rest,

Away from all pretence of fame;

Where solitude takes the place of name;

And all the music from every throat and string

Must be allowed to add their tune

To the depth of one final song.

Advertisements

Day one after my father’s passing away: দু:খ এ নয়, সুখ নহে গো /Dukkho e noy, shukh nawhe go/This is not sorrow, nor mere happiness

“দু:খ এ নয়, সুখ নহে গো– গভীর শান্তি এ যে
আমার সকল ছাড়িয়ে গিয়ে উঠল কোথায় বেজে।।
ছাড়িয়ে গৃহ, ছাড়িয়ে আরাম, ছাড়িয়ে আপনারে
সাথে করে নিল আমায় জন্মমরণপারে–
এল পথিক সেজে।।
চরণে তার নিখিল ভুবন নীরব গগনেতে
আলো-আঁধার আঁচলখানি আসন দিল পেতে।
এত কালের ভয় ভাবনা কোথায় যে যায় সরে,
ভালোমন্দ ভাঙাচোরা আলোয় ওঠে ভ’রে–
কালিমা যায় মেজে।”

This is not sorrow, nor mere happiness – but peace beyond measure
Overwhelming all, raising me into the infinite vastness
Leaving home behind and solace behind, leaving behind ego and self
Taking me to a realm beyond birth and death –
You who has wandered into my life.
At your feet the world gathers in the silent sky
To spread a cloak of darkness and light
Where did all the fear I had always felt disappear
Good, evil, broken and whole – flood with light divine –
As all imperfection washes away from this life of mine.

শিবাজি-উৎসব /Shivaji Utsav/Celebrating Shivaji: An excerpt

শিবাজি-উৎসব

 

কোন্‌ দূর শতাব্দের কোন্‌-এক অখ্যাত দিবসে

নাহি জানি আজি

মারাঠার কোন্‌ শৈলে অরণ্যের অন্ধকারে ব’সে,

হে রাজা শিবাজি,

তব ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবনা তড়িৎপ্রভাবৎ

এসেছিল নামি–

“একধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত

বেঁধে দিব আমি।’

 

সেদিন এ বঙ্গদেশ উচ্চকিত জাগে নি স্বপনে,

পায় নি সংবাদ–

বাহিরে আসে নি ছুটে, উঠে নাই তাহার প্রাঙ্গণে

শুভ শঙ্খনাদ–

শান্তমুখে বিছাইয়া আপনার কোমলনির্মল

শ্যামল উত্তরী

তন্দ্রাতুর সন্ধ্যাকালে শত পল্লিসন্তানের দল

ছিল বক্ষে করি।

 

তার পরে একদিন মারাঠার প্রান্তর হইতে

তব বজ্রশিখা

আঁকি দিল দিগ্‌দিগন্তে যুগান্তের বিদ্যুদ্‌বহ্নিতে

মহামন্ত্রলিখা।

মোগল-উষ্ণীষশীর্ষ প্রস্ফুরিল প্রলয়প্রদোষে

পক্কপত্র যথা–

সেদিনও শোনে নি বঙ্গ মারাঠার সে বজ্রনির্ঘোষে

কী ছিল বারতা।

 

তার পরে শূন্য হল ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ নিবিড় নিশীথে

দিল্লিরাজশালা–

একে একে কক্ষে কক্ষে অন্ধকারে লাগিল মিশিতে

দীপালোকমালা।

শবলুব্ধ গৃধ্রদের ঊর্ধ্বস্বর বীভৎস চীৎকারে

মোগলমহিমা

রচিল শ্মশানশয্যা–মুষ্টিমেয় ভস্মরেখাকারে

হল তার সীমা।

 

সেদিন এ বঙ্গপ্রান্তে পণ্যবিপণীর এক ধারে

নিঃশব্দচরণ

আনিল বণিকলক্ষ্মী সুরঙ্গপথের অন্ধকারে

রাজসিংহাসন।

বঙ্গ তারে আপনার গঙ্গোদকে অভিষিক্ত করি

নিল চুপে চুপে–

বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল পোহালে শর্বরী

রাজদণ্ডরূপে।

 

সেদিন কোথায় তুমি হে ভাবুক, হে বীর মারাঠি,

কোথা তব নাম!

গৈরিক পতাকা তব কোথায় ধুলায় হল মাটি–

তুচ্ছ পরিণাম!

বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলি করে পরিহাস

অট্টহাস্যরবে–

তব পুণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিষ্ফল প্রয়াস,

এই জানে সবে।

 

অয়ি ইতিবৃত্তকথা, ক্ষান্ত করো মুখর ভাষণ।

ওগো মিথ্যাময়ী,

তোমার লিখন-‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

হবে আজি জয়ী।

যাহা মরিবার নহে তাহারে কেমনে চাপা দিবে

তব ব্যঙ্গবাণী?

যে তপস্যা সত্য তারে কেহ বাধা দিবে না ত্রিদিবে

নিশ্চয় সে জানি।

 

হে রাজতপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

বিধির ভাণ্ডারে

সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা

পারে হরিবারে?

তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশলক্ষ্মীর পূজাঘরে

সে সত্যসাধন,

কে জানিত, হয়ে গেছে চিরযুগযুগান্তর-তরে

ভারতের ধন।

 

অখ্যাত অজ্ঞাত রহি দীর্ঘকাল, হে রাজবৈরাগী,

গিরিদরীতলে

বর্ষার নির্ঝর যথা শৈল বিদারিয়া উঠে জাগি

পরিপূর্ণ বলে,

সেইমত বাহিরিলে– বিশ্বলোক ভাবিল বিস্ময়ে,

যাহার পতাকা

অম্বর আচ্ছন্ন করে, এতকাল এত ক্ষুদ্র হয়ে

কোথা ছিল ঢাকা।

***

Celebrating Shivaji

 

In what far away century on what unmarked day

I no longer know today

Upon what mountain peak, in darkened forests,

Oh King Shivaji,

Did this thought light up your brow as a touch of lightning

As it came to thee –

“The scattered parts of this land with one religion

‘ Shall I bind for eternity.”

 

Bengal did not stir that day in the midst of a dream,

It had not received the word –

It did not answer thy call, nor heralded it

With the blowing of the sacred conch –

Instead it spread its shielding veil

Its robes of verdant green

Over the slumbering village folk at night

Gathering them to her breast.

 

Then one day from the fields of Mahrattha

Your thunderous flame

Painted the horizons all about with flames of violent change

Imbued with a great clarion call.

The crown upon the Mughal’s brow was shaken by storm

As is a ripening leaf –

Even that day Bengal did not hear that thunderous Marattha call

Nor heed the message within.

 

After that in the midst of turbulent darkness

The palace of Delhi was emptied –

In each of their great halls ravenous night

Began engulfing the brilliance of light.

The corpse craving vultures cackled in hideous tones

As the glory of the Mughals

Finally succumbed to the pyre- in handfuls of ashes

Are their remains retained.

 

That day in this Bengal by the side of the traders route

Upon silent steps

The merchants secretly smuggled in perfidy

The throne that had once housed kings.

And Bengal anointed that very same seat with the water of its own Ganges

In secretive silence –

The weighing scales that had once measured profit refashioned through that dark night

Till at dawn a sceptre was held in the hands of a new king.

 

Where were you that day, Oh thoughtful brave Mahrattha,

Why did we not hear thy name!

Where lay your saffron flag crushed to dust –

What a terrible end!

The foreigner tells your story laughing you off as a bandit king

Roaring with mirth at your fall –

Your devoted effort now seen as a thief’s fruitless quest,

This is how they know you today.

 

Silence your garrulous words, false account

Thou art filled with lies,

Your writ shall be erased by the truth the Creator scribes

That alone shall prevail.

For how will the truth that is for immortality bound

Be disguised by the avarice of your tongue?

The prayers that are true will never be stalled

In the three worlds this I know to be true.

 

Oh brave royal penitent, the greatness of thought

That you have left for fate to treasure

Not one grain of that will

Be lost to the undeserving.

The sacrifice you made at the altar of the goddess who guards our land

The truth that you strove for relentless,

Who would have thought that it will grace till the end of days

The coffers of this land of ours.

 

For long did you remain unknown to the world, ascetic king of mine,

Among the peaks

Just as a stream breaks through the rocks to awaken with rain

In full spate,

You too emerged – to the surprise of the world who thought,

This pennant that

Hides the skies, what shape had it sought

Where was it secreted away for so long.

 

 

Swarnakumari Debi

Ruma Chakravarti

In the year 1876 the December chill in Calcutta was suddenly stirred by the appearance of an anonymous novel. Its title was ‘Deep Nirbaan’ or the Extinguishing of the Lamp. Its readers were amazed by the maturity of the unknown author. And when they found out that it was by an eighteen year old girl? Disbelief joined exclamation.

“It is being said that a lady of high birth has written this. This is glorious indeed. Not many women can be said to possess such education, such authorship, such empathy – not just in Bengal but in other lands as well,” reported the Sadharani periodical.

Swarnakumari

(Swarnakumari Debi)

A decade had hardly passed since the publication of ‘Durgeshnandini’ by Bankim Chatterjee, the first novel in Bengali. But was ‘Deep Nirbaan’ the first novel by a Bengali woman? Swarnakumari Tagore who wrote it was not even the first Bengali authoress. Before her had…

View original post 152 more words

2015 in review

 

Thanks to everyone who made time to see posts on this page. You made it possible for the blog to clock up 120,000 plus visits in 2015. You can read the rest of the cool statistics below:

The WordPress.com stats helper monkeys prepared a 2015 annual report for this blog.

Here’s an excerpt:

The Louvre Museum has 8.5 million visitors per year. This blog was viewed about 120,000 times in 2015. If it were an exhibit at the Louvre Museum, it would take about 5 days for that many people to see it.

Click here to see the complete report.

ধর্মমোহ / Dhormomoho / The illusion of religion

ধর্মমোহ

 

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে

অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।

নাস্তিক সেও পায়ে বিধাতার বর,

ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।

শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,

শাস্ত্রে মানে না, মানে মানুষের ভালো।

বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে,

নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,

পিতার নামেতে হানে তাঁর সন্তানে,

আচার লইয়া বিচার নাহিকো জানে,

পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা, —

দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা।

অনেক যুগের লজ্জা ও লাঞ্ছনা,

বর্বরতার বিকারবিড়ম্বনা

ধর্মের মাঝে আশ্রয় দিল যারা

আবর্জনায় রচে তারা নিজ কারা। —

প্রলয়ের ওই শুনি শৃঙ্গধ্বনি,

মহাকাল আসে লয়ে সম্মার্জনী।

যে দেবে মুক্তি তারে খুঁটিরূপে গাড়া,

যে মিলাবে তারে করিল ভেদের খাঁড়া,

যে আনিবে প্রেম অমৃত-উৎস হতে

তারি নামে ধরা ভাসায় বিষের স্রোতে,

তরী ফুটা করি পার হতে গিয়ে ডোবে —

তবু এরা কারে অপবাদ দেয় ক্ষোভে।

হে ধর্মরাজ, ধর্মবিকার নাশি

ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি।

যে পূজার বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে

ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে —

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।

 

 

রেলপথ, ৩১ বৈশাখ, ১৩৩৩

***

WHEN RELIGION IS MERE ILLUSION

When illusion under the guise of religion takes over a soul

That blind wretch is forever doomed, to kill or be killed.

Even the atheist will receive the kingdom of God,

Though he may never have dressed himself in a show of faith

For he alone lights a torch of intelligent appraisal and respect,

He cares naught for dead scripture but for the good of living men.

But the one who pulls down another’s faith as false,

He only heaps insult at his own cursed altars,

He strikes at a child for its father’s imagined faults,

He does not know how to judge right from wrong,

He raises bloodied pennants in prayer halls across the land, –

This is simply worship of evil costumed as good.

The shame and abuses of a thousand years,

The ugly corruption of barbarism

Those who shelter these within religious sanction

They merely build a prison of decay around themselves. –

Hark, there ring out the harbingers of upheaval,

Time comes with mighty scourge in hand.

The one who would bring freedom, you use to imprison and cage,

The one who would unite, you use as an instrument of hate,

The one who would draw love from an undying fount

You have drenched the earth with bile in his name,

– Your boat sinks under your repeated onslaught

And still you blame everyone else in petulant anger.

Righteous one, destroy this farce in the name of creed

Come and save the wretch whose ignorance rules his breed.

The altars that are awash with innocent blood

Crush them now till every trace is ground into dust –

Rain thunder upon these prison walls of faith,

Bring the blessing of sight to this unfortunate land.

 

 

On a train, 14th May, 1926

 

বীর গুরু/ Bir Guru/ The Brave Guru

The history of the Sikhs during Mughal rule and particularly by the orders of Aurangzeb is full of stories of triumph and bravery in the face of unspeakable cruelty and torture. This is an excerpt from one of those stories; on the occasion of Nanak Jayanti and the martyrdom of Teg Bahadur, this seemed appropriate.

 

বীর গুরু

বনের একটা গাছে আগুন লাগিলে অন্যান্য যে-সকল গাছে উত্তাপ প্রচ্ছন্ন ছিল সেগুলাও যেমন আগুন হইয়া উঠে, তেমনি যে জাতির মধ্যে একজন বড়োলোক উঠে, সে জাতির মধ্যে দেখিতে দেখিতে মহত্ত্বের শিখা ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে, তাহার গতি আর কেহই রোধ করিতে পারে না।

নানক যে মহত্ত্ব লইয়া জন্মিয়াছিলেন সে তাঁহার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই নিবিয়া গেল না। তিনি যে ধর্মের সংগীত, যে আনন্দ ও আশার গান গাহিলেন, তাহা ধ্বনিত হইতে লাগিল। কত নূতন নূতন গুরু জাগিয়া উঠিয়া শিখদিগকে মহত্ত্বের পথে অগ্রসর করিতে লাগিলেন।

তখনকার যথেচ্ছাচারী মুসলমান রাজারা অনেক অত্যাচার করিলেন, কিন্তু নবধর্মোৎসাহে দীপ্ত শিখ জাতির উন্নতির পথে বাধা দিতে পারিলেন না। বাধা ও অত্যাচার পাইয়া শিখেরা কেমন করিয়া বীর জাতি হইয়া উঠিল তাহার গল্প বলি শুন।

নানকের পর পঞ্জাবে আট জন গুরু জন্মিয়াছেন, আট জন গুরু মরিয়াছেন, নবম গুরুর নাম তেগ্বাহাদুর। আমরা যে সময়কার কথা বলিতেছি তখন নিষ্ঠুর আরঞ্জীব দিল্লীর সম্রাট ছিলেন। রামরায় বলিয়া তেগ্বাহাদুরের একজন শত্রু সম্রাটের সভায় বাস করিত। তাহারই কথা শুনিয়া সম্রাট তেগ্বাহাদুরের উপরে ক্রুদ্ধ হইয়াছেন, তাঁহাকে ডাকিতে পাঠাইয়াছেন।

আরঞ্জীবের লোক যখন তেগ্বাহাদুরকে ডাকিতে আসিল তখন তিনি বুঝিলেন যে তাঁহার আর রক্ষা নাই। যাইবার সময়ে তিনি তাঁহার ছেলেকে কাছে ডাকিলেন। ছেলের নাম গোবিন্দ, তাহার বয়স চোদ্দ বৎসর। পূর্বপুরুষের তলোয়ার গোবিন্দের কোমরে বাঁধিয়া দিয়া তাহাকে বলিলেন, “তুমিই শিখেদের গুরু হইলে। সম্রাটের আদেশে ঘাতক আমাকে যদি বধ করে তো আমার শরীরটা যেন শেয়াল-কুকুরে না খায়! আর এই অন্যায় অত্যাচারের বিচার তুমি করিয়ো, ইহার প্রতিশোধ তুমি লইয়ো।’ বলিয়া তিনি দিল্লী চলিয়া গেলেন।

রাজসভায় তাঁহাকে তাঁহার গোপনীয় কথা সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করা হইল। কেব বা বলিল, “আচ্ছা, তুমি যে মস্ত লোক তাহার প্রমাণস্বরূপ একটা অলৌকিক কারখানা দেখাও দেখি!’ তেগ্বাহাদুর বলিলেন, “সে তো আমার কাজ নহে। মানুষের কর্তব্য ঈশ্বরের শরণাপন্ন হইয়া থাকা। তবে তোমাদের অনুরোধে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখাইতে পারি। একটা কাগজে মন্ত্র লিখিয়া ঘাড়ে রাখিয়া দিব, সে ঘাড় তলোয়ারে বিচ্ছিন্ন হইবে না।’ এই বলিয়া মন্ত্র-লেখা কাগজ ঘাড়ে রাখিয়া তিনি ঘাড় পাতিয়া দিলেন। ঘাতক তরবারি উঠাইয়া আঘাত করিলে মাথা বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। কাগজ তুলিয়া লইয়া সকলে দেখিল, তাহাতে লেখা আছে, “শির দিয়া, সির নেহি দিয়া।’ অর্থাৎ মাথা দিলাম, গুপ্ত কথা দিলাম না।’ এইরূপে মাথা দিয়া তেগ্বাহাদুর রাজসভার প্রশ্নের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন।

বালক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
*****

The Brave Guru

Just as nearby trees that feel the heat can go up in flames when one tree catches fire in a forest, when a great man is born among a group of people the whole nation is illumined by the flame of that great spirit; no one can stop its progress.

The indomitable spirit that was Nanak’s did not die out with his death. The song of joy and hope that he sang resounded through the land. Teacher after teacher arose and led the Sikhs along the path to salvation.

The tyrannical Muslim rulers of the time committed many atrocities but they could not halt the advance of the Sikh nation, inflamed as they were by the teachings of their young faith. Let me tell you the story of how the Sikhs became a race of brave warriors by passing through obstacles and hardship.

Eight gurus or teachers had come out of the Punjab after Nanak; the ninth was Teg Bahadur. We are talking about the time when the cruel Aurangzeb was the emperor in Delhi. One of Teg Bahadur’s enemies Ram Rai, was a member of the Emperor’s court and it was he who filled the Emperor’s ears with falsehoods until Aurangzeb was incensed and sent for Teg.

When Teg saw the Emperor’s men at his door he knew he was doomed. Before leaving he called for his son. This child of fourteen was named Govind. Teg tied the sword that had served his ancestors to Govind’s waist and said to him, ‘You are now the guru to all Sikhs. If the executioner should slay me by the order of the Emperor, see to it that my body is not left to the mercy of jackals and dogs. You will have to right this wrong, you will have to take revenge.’ He then went to Delhi.

He was questioned over and over about his activities by the court. Some asked him, ‘Why do you not prove that you are a great leader by performing a miracle?’ Teg Bahadur said, ‘That is not my purpose. A man’s purpose is merely to seek God. But I can show you something unusual since you have asked. I will write an incantation on a piece of paper and place it on my neck and that will stop you from severing my head.’ He then placed the paper on his neck and bared his throat. When the executioner raised his sword and brought it down, his head rolled away. Someone picked up the paper and saw these words written there – ‘I gave up my head but not my beliefs.’ This was the manner in which Teg Bahadur found respite from the interrogation in the court.