Archive | March 2014

ক্ষীরের পুতুল ২: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul 2

Image

 

সন্ধেবেলা সোনার জাহাজ সোনার পাল মেলে অগাধ সাগরের নীল জল কেটে সোনার মেঘের মতো পশ্চিমে মুখে ভেসে গেল।

ভাঙা ঘরে দুওরানী নীল সাগরের পানে চেয়ে,ছেঁড়া কাঁথায় পড়ে রইলেন। আর আদরিনী সুওরানী সাতহল অন্তঃপুরে,সাতশো সখীর  মাঝে,গহনার কথা ভাবতে ভাবতে, সোনার পিঞ্জরে সোনার পাখির গান শুনতে-শুনতে,সোনার পালঙ্কে ঘুমিয়ে পড়লেন।

রাজাও জাহাজে চড়ে দুঃখিনী বড়রানীকে ভুলে গেলেন । বিদায়ের  দিনে ছোটরানীর সেই  হাসি-হাসি মুখ মনে পড়ে আর ভাবেন—এখন রানী কি করছেন ? বোধ হয় চুল বাঁধছেন । এবার রানী কি করছেন? বুঝি রাঙা পায়ে আলতা পরছেন । এবার রানী সাত মালঞ্চে ফুল তুলছেন,এবার বুঝি সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুলে রানী মালা গাঁথছেন আর আমার কথা ভাবছেন । ভাবতে-ভাবতে বুঝি দুই চক্ষে জল এল,মালা আর গাঁথা হল না । .সোনার সুতো, ফূলের সাজি পায়ের  কাছে পড়ে রইল ; বসে বসে সারা  রাত কেটে গেল, রানীর চক্ষে ঘুম  এল না ।

সুওরানী—ছোটরানী রাজার আদরিনী,রাজা তারই কথা ভাবেন ।  আর বড়রানী রাজার জন্যে পাগল,তাঁর কথা একবার মনেও পড়ে না ।

এমনি করে জাহাজে দেশ-বিদেশে রাজার বারো-মাস কেটে গেল।

তেরোমাসে রাজার জাহাজ মানিকের দেশে এল ।

মানিকের দেশে সকলই মানিক । ঘরের দেওয়াল মানিক, ঘাটের  সান্‌ মানিক,পথের কাঁকর মানিক। রাজা সেই মানিকের দেশে সুওরানীর চুড়ি গড়ালেন । আট হাজার মানিকের আটগাছা চুড়ি, পরলে মনে হয় গায়ের রক্ত ফুটে পড়ছে ।

রাজা সেই মানিকের চুড়ি নিয়ে,সোনার দেশে এলেন । সেই সোনার দেশে স্যাকরার দোকানে নিরেট সোনার দশগাছা মল  গড়ালেন । মল জ্বলতে লাগল যেন আণ্ডনের ফিন্‌কি, বাজতে লাগল যেন বীণার ঝঙ্কার—মন্দিরার রিনি-রিনি ।

রাজা মানিকের দেশে মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সোনার মল গড়িয়ে, মুক্তোর রাজ্যে এলেন ।

সে দেশে রাজার বাগানে দুটি পায়রা । তাদের মুক্তোর পা, মানিকের  ঠোঁট, পান্নার গাছে মুক্তোর ফল খেয়ে মুক্তোর ড়িম পাড়ে । দেশের রানী সন্ধ্যাবেলা সেই মুক্তোর মালা গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায়  পরেন, সকাল বেলায় ফেলে দেন ।

দাসীরা সেই বাসি মুক্তোর হার এক জাহাজ রুপো নিয়ে বাজারে  বেচে আসে ।

রাজা এক জাহাজ রুপো দিয়ে সুওরানীর গলায় দিতে সেই মুক্তোর এক ছড়া হার কিনলেন ।

তারপর মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সোনার মল গড়িয়ে,  মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর হার গাঁথিয়ে, ছ’মাস পরে রাজা এক দেশে  এলেন । সে দেশে রাজকন্যের উপবনে নীল মানিকের গাছে নীল  গুটিপোকা নীলকান্ত মণির পাতা খেয়ে,জলের মতো চিকন,বাতাসের মতো ফুরফুরে,আকাশের মতো নীল রেশমের গুটি বাঁধে । রাজার মেয়ে সারা রাত ছাদে বসে,আকাশের সঙ্গে রঙ  মিলিয়ে, সেই নীল রেশমের শাড়ি বোনেন । একখানি শাড়ি বুনতে ছ’মাস যায় । রাজকন্যে একটি দিন সেই আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন শাড়ি পরে  শিবের মন্দিরে মহাদেব নীলকণ্ঠের পূজা করেন। ঘরে এসে শাড়ি ছেড়ে দেন,দাসীরা যার কাছে সাত জাহাজ সোনা পায় তার কাছে শারি বেচে। রাজা সাত জাহাজ সোনা দিয়ে আদরিনী সুওরানীর শখের শাড়ি কিনে নিলেন ।

তারপর আর ছ’মাসে রাজার সাতখানা জাহাজ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে  ছোটোরানীর মানিকের চুড়ি, সোনার মল, মুক্তোর মালা, সাধের শাড়ি নিয়ে দেশে এল। তখন রাজার মনে পড়ল বড়রানী বাঁদর চেয়েছেন।

রাজা মন্ত্রীকে বললেন—মন্ত্রীবর,বড় ভুল হয়েছে। বড়রানীর বাঁদর আনা হযনি, তুমি একটা বাদরের সন্ধানে যাও

রাজমন্ত্রী একটা বাঁদরের সন্ধানে চলে গেলেন। আর রাজা শ্বেতহস্তী চড়ে, লোকারণ্য রাজপথ দিয়ে, ছোটরানীর সাধের গহনা, শখের শাড়ি নিয়ে অন্তঃপুরে চলে গেলেন।

ছোটোরানী সাত-মহল বাড়ির সাত-তলার উপরে সোনার আয়না সামনে রেখে সোনার কাঁকুইয়ে চুল চিরে, সোনার কাঁটা সোনার দরি দিয়ে খোঁপা বেঁধে সোনার চিয়াড়িতে সিঁদুর নিয়ে ভুরুর মাঝে টিপ পরছেন, কাজল-লতায় কাজল পেড়ে চোখের পাতায় কাজল পরছেন, রাঙা পায়ে আলতা দিচ্ছেন, সখীরা ফুলের থালা নিয়ে,পানের বাটা নিয়ে রাজরানী ছোটোরানীর  সেবা করছে—রাজা সেখানে এলেন।

স্ফটিকের সিংহাসনে রানীর পাশে বসে বললেন—এই নাও, রানী! মানিকের  দেশে মানিকের  ঘাট,মানিকের বাট—সেখান থেকে হাতের চুড়ি এনেছি। সোনার  দেশে সোনার ধুলো, সোনার বালি—সেখান থেকে পায়ের মল এনেছি । মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর পা, মানিকের ঠোঁট, দুটি পাখি মুক্তোর ডিম পাড়ে । দেশের রানী সেই  মুক্তোর হার গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায় পরেন, ভোরের বেলায় ফেলে দেন । রানী, তোমার জন্যে সেই মুক্তোর হার এনেছি। রানী, এক দেশে রাজার  মেয়ে এক-খী রেশমে সাত-খী সুতো কেটে নিশুতি রাতে ছাদে বসে  ছ’টি মাসে একখানি শাড়ি বোনেন, এক দিন পরে পূজো করেন, ঘরে  এসে ছেড়ে দেন । রানী, আমি সেই রাজার মেয়ের দেশ থেকে সাত  জাহাজ সোনা দিয়ে রাজকন্যার হাতে বোনা শাড়ি এনেছি। তুমি  একবার চেয়ে দেখ ! পৃথিবী খুজে গায়ের গহনা, পরনের শাড়ি আনলুম, একবার পরে দেখ !

রানী -তখন দু’হাতে আটগাছা চুড়ি পরলেন; মানিকের চুড়ি রানীর হাতে  ঢিলে হল, হাতের চুড়ি  কাধে উঠল।

রানী তখন দু’পায়ে দশ-গাছা মল পরলেন; রাঙা পায়ে সোনার মল আল্‌গা হল; দু-পা যেতে দশ-গাছা মল সানের উপর  খসে পড়ল। রানী  মুখ ভার করে  মুক্তোর  হার গলায় পরলেন ; মুক্তোর  দেশের মুক্তোর হার রানীর গলায় খাটো হল, হার পরতে গলার মাস কেটে গেল।  রানী  ব্যথা পেলেন !

সাত-পুরু করে শখের শাড়ি অঙ্গে পরলেন ; নীল রেশমের নীল  শাড়ি হাতে-বহরে কম পড়ল। রানীর চোখে জল এল ।

তখন মানিনী  ছোটরানী আট-হাজার মানিকের আট-গাছা চুড়ি খুলে  ফেলে, নিরেট সোনার দশ-গাছা মল পায়ে ঠেলে, মুক্তোর  মালা,শখের শাড়ি ধুলোয় ফেলে, বললেন—ছাই গহণা ! ছাই  এ-শাড়ি ! কোন পথের কাঁকর কুড়িয়ে এ-চুড়ি গড়ালে ? মহারাজ, কোন দেশের ধুলো বালিতে এ-মল গড়ালে ? ছি ছি, এ কার বাসি মুক্তোর বাসি হার ! এ কোন রাজকন্যার পরা শাড়ি! দেখলে যে ঘৃণা আসে, পরতে যে লজ্জা হয় ! নিয়ে যাও মহারাজ,এ পরা-শাড়ি পরা-গহণায় আমার কাজ নেই ।

রানী অভিমানে গোসা-ঘরে খিল দিলেন । আর রাজা মলিন-মুখে সাত জাহাজ সোনা দিয়ে কেনা সেই সাধের গহনা,শখের শাড়ি নিয়ে রাজসভায় এলেন ।

রাজমন্ত্রী রাজসিংহাসনের এক পাশে, রাজ্যের মাঠ-ঘাট দোকান-পাট সন্ধান করে, যাদুকরের দেশের এক বণিকের জাহাজ থেকে কানা-কড়ি দিয়ে একটি বাঁদরছানা কিনে বসে আছেন ।

রাজা এসে বললেন—মন্ত্রীবর, আশ্চর্য হলুম ! মাপ দিয়ে ছোটরানীর  গায়ের গহনা,পরনের শাড়ি  আনলুম, সে-শাড়ি, সে-গহনা রানীর গায়ে  হল না !

তখন সেই বনের বানর রাজার পায়ে প্রণাম করে বললে—বড় ভাগ্যবতী পুণ্যবতী না হলে দেবকন্যের হাতে বোনা,নাগকন্যের হাতে গাঁথা, মায়া-রাজ্যের এ  মায়া-গহনা, মায়া-শাড়ি পরতে পারে না । মহারাজ, রাজভাণ্ডারে তুলে রাখ, যাকে বৌ করবে তাকে পরতে দিও ।

বানরের কথায় রাজা অবাক হলেন । হাসতে হাসতে মন্ত্রীকে বললেন—মন্ত্রী, বানরটা বলে কি? ছেলেই হল না বৌ আনব কেমন করে ? মন্ত্রী, তুমি স্যাকরার দোকানে ছোটরানীর নতুন গহনা গড়তে দাওগে, তাঁতির তাঁতে রানীর নতুন শাড়ি বুনতে দাওগে। এ-গহনা, এ-শাড়ি রাজভাণ্ডারে তুলে রাখ; যদি বৌ ঘরে আনি তাকে পরতে দেব।

রাজমন্ত্রী স্যাকরার দোকানে ছোটরানীর নতুন গহনা গড়াতে গেলেন । আর রাজা সেই বাঁদর-কোলে বড়রানীর কাছে গেলেন ।

দুঃখিনী বড়রানী, জীর্ণ আঁচলে পা মুছিয়ে,ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় রাজাকে  বসতে দিয়ে কাদঁতে-কাদঁতে বললেন—মহারাজ, বোসো। আমার এই ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বোসো । আমার আর কি আছে তোমায় বসতে দেব ? হায়,মহারাজ,কতদিন পরে তুমি ফিরে এলে,আমি এমনি অভাগিনী তোমার জন্যে ছেঁড়া কাঁথা পেতে দিলুম ।

রানীর কথায় রাজার চোখে জল এল । ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বসে বড়রানীর কোলে বাঁদর-ছানা দিয়ে বললেন—মহারানী, তোমার এ ছেঁড়া কাঁথা ভাঙা ঘর, ছোটরানীর সোনার সিংহাসন, সোনার ঘরের চেয়ে লক্ষ গুণে ভালো । তোমার এ-ভাঙা ঘরে আদর আছে, যত্ন আছে, দুটো মিষ্টি কথা  আছে, সেখানে তা তো  নেই।  রানী,সাত জাহাজ সোনা দিয়ে গায়ের গহনা, পরনে শাড়ী দিয়েছি, ছোটরানী পায়ে ঠেলেছে; আর কানা-কড়ি দিয়ে তোমার বাঁদর এনেছি, তুমি আদর করে কোলে নিয়েছ । রানী, আমি আর তোমায় দুঃখ দেব না । এখন  বিদায় দাও, আমি আবার আসব রানী ! কিন্তু দেখো, ছোটরানী যেন জানতে না পারে ! তোমার কাছে এসেছি শুনলে আর রক্ষে রাখবে না !  হয় তোমায়, নয়তো আমায় বিষ খাওয়াবে ।

রাজা বড়রানীকে প্রবোধ দিয়ে চলে গেলেন । আর বড়রানী সেই ভাঙা ঘরে দুধ-কলা দিয়ে সেই বাঁদরেরর ছানা মানুষ করতে লাগলেন।

এমনি করে দিন যায়। ছোটরানীর সাতমহলে সাতশ দাসীর মাঝে দিন যায়; আর বড়রানীর  ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বাঁদর-কোলে দিন যায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে গেল! বড়রানীর যে দুঃখ সেই দুঃখই রইল, মোটা চালের ভাত, মোটা সুতোর শাড়ি আর ঘুচলো না। বড়রানী সেই ভাঙা ঘরের দুঃখের দুখী, সাথের সাথী বনের বানরকে কোলে নিয়ে ছোটরানীর সাতমহল বাড়ি,সাতখানা ফুলেরবাগানের দিকে চেয়ে চেয়ে কাঁদেন। বানর বড়রানীকে যখন দেখে তখনই রানীর চোখে জল,একটি দিন হাসতে দেখেনা।

একদিন বানর বললে—হ্যাঁ মা,তুই কাদিস কেন? তোর কিসের দুঃখ ? রাজবাড়ির দিকে চেয়ে চেয়ে কেন কাঁদিস, মা ? ওখানে তোর কে আছে?

রানী বললেন—ওরে বাছা,ওখানে আমার সব আছে আমা্র সাতমহল বাড়ি আছে,সাতশ দাসী আছে,সাতসিন্দুক গহনা আছে, সাতখানা মালঞ্চ আছে। আর বাছা, ওই সাতমহল বাড়িতে রাজার ছোটোরানী আমার এক সতীন আছে। সেই রাক্ষসী আমার রাজাকে জাদু করে আমার সাতমহল বাড়ি, সাতশ দাসী, সাত সিন্দুক গহনা কেড়ে নিয়ে ওই ফুলের মালঞ্চে সোনার মন্দিরে সুখে আছে; আমার সর্বস্বধন রাজাকে নিয়ে আমায় পথের কাঙ্গালিনী করেছে। ওরে বাছা, আমার কিসের দুঃখ! আমি রাজার মেয়ে ছিলুম, রাজার বৌ হলুম, সাতশ দাসী পেলুম, সাতমহল বাড়ি পেলুম, মনের মত রাজস্বামী পেলুম। সব পেলুম তবু কে জানে কার অভিশাপে, চিরদিনে পেলুম না কেবল রাজার কোলে দিতে সোনার চাঁদ রাজপুত্র! হায়, কতজন্মে কত পাপ করেছি, কত লোকের কত সাধে বাধ সেধেছি, কত মায়ের প্রাণে ব্যথা দিয়েছি, তাই এজন্মে সোনার সংসার সতীনকে দিয়ে, রানীর গরবে, স্বামীর সোহাগে, রাজপুত্রের আশায় ছাই দিয়ে পথের কাঙ্গালিনী হয়েছি! বাছারে, বড় পাষাণী তাই এতদিন এত অপমান, এত যন্ত্রণা বুকে সয়ে বেঁচে আছি!

 

***

 

The golden ship unfurled its golden sails and sailed across the endless blue waters of the sea towards the west like a golden cloud.

The Duorani lay on her tattered bed in her broken down room and gazed towards the blue sea. The beloved Shuyorani fell asleep on her golden bed, listening to the golden plumed song birds in their golden cages as she thought of the jewellery she would soon have and her seven hundred hand maidens sat about her.

The king too forgot his sorrowful elder queen as soon as he boarded the ship. All he remembered was the smiling face of the younger queen on the day he had left her.  He thought of her all day; what was she doing then? Perhaps she was doing her hair. What was she doing now? She must have been colouring the soles of her feet; now she must be collecting flowers now from the seven gardens to make garlands from seven baskets filled with blooms while she thinks of me. As she remembers me, her eyes well with tears and the garlands never get made. The golden thread and the basket lie at her feet; she sits there sleepless with worry.

The young Shuyorani is his one love, he only thinks of her. He never once remembers the older queen, the one who is madly in love with him.

The king spent twelve months at sea roaming various lands.

In the thirteenth month the king came to the land of the rubies.

In the land of rubies everything was made of that precious stone. The walls were made of stones as were the steps by the river and the gravel on the streets. The king had bracelets made for his younger queen. The eight thousand stones on her eight bracelets glowed red like droplets of blood on skin.

With the bracelets of rubies, he journeyed to the land of gold. He bought ten pairs of solid gold anklets from the gold smiths of the land. The anklets shone like molten fires, they rang against each other like the tinkling of cymbals and the flourish of veenas.

After he had bought the ruby bracelets from the land of rubies and the golden anklets from the land of gold his ship arrived in the land of pearls.

The king of the land had two pigeons in his gardens. They had feet of pearl and beaks of rubies with which they plucked pearl fruit from emerald trees and laid pearl eggs. His queen made garlands in the evening from those eggs, dressed her hair with them at night and threw them away each day at dawn.

Her maids took those cast offs to sell them at the markets for a ship filled with silver.

Our king bought one of those necklaces with a ship’s cargo of silver for the slender throat of Shuyorani.

Six months after he had bought the bracelets of rubies, the anklets of gold and the necklace of pearls, the king arrived in a new land. In the pleasure gardens of the princess of that land, blue silkworms grew upon sapphire trees. They fed on blue leaves and wove cocoons of blue silk that was as silky as water, as light as the air and as blue as the sky. The princess sat upon her roof all night and wove a blue sari to match the colour of the sky above her. Each sari took her six months. The princess wore the sari which was as silky as water, as light as the air and blue as the sky on the day that she worshipped at the temple of the blue throated god Lord Shiva. When she came home from the temple she discarded the sari on the floor and her handmaidens sold it to anyone who could pay them with seven ships filled with gold. Our king bought this sari for his beloved with seven ships worth of gold.

Six more months passed after that and then the seven ships traversed the seven seas and the thirteen rivers and came back to his own country with rubies for the queen’s arms, gold for her ankles, pearls for her neck and a sari as blue as the sky for her form. Now the king remembered that Duorani had asked for a monkey.

The kind said to his minister, ‘There has been a mistake. I do not have the monkey that the older queen wanted; you must go and look for one.’

The minister went off in search of a monkey. The king rode on a white elephant along streets filled with cheering subjects and went to the palace with all the jewellery and the sari for the younger queen.

She was sitting in the palace with the seven floors, on the seventh floor. She had a golden mirror before her and she combed her hair with a golden comb, tied it with golden cords and fixed it with pins of gold before using a golden nib to paint a dot between her eyebrows. She then drew kohl lines on her eyes, applied red dye to her feet and allowed her handmaidens to tend to her with flowers and trays of mouth freshener. The king came to see her there.

He sat by his queen on a crystal throne and said, ‘Here is what you asked for, my queen! In the land of rubies, the very steps are made of rubies! From there I have brought you bracelets for your arms. In the land of gold the very dust is made of gold! From there I brought you anklets for your feet. In the land of pearls the pigeons with feet of pearls and beaks of rubies lay eggs of pearl. The queen makes necklaces from them, wears them at night and throws them away at dawn. From there I bought them for you. In another country the princess weaves seven measures of silken thread from one measure of silk and sits up at night for six months to make herself a sari. She wears this for a day and never touches it again. I bought that sari for seven ships filled with the yellowest gold, so that you might have it. Here it is! I have roamed the world to bring you jewels for your throat and silk for your skin, wear them once, for me.

The queen then pulled the eight bracelets over her hands but the rubies hung limply against her arms and the bangles rode all the way to her shoulders.

She drew the anklets on to her feet but they were loose about her ankles; as she walked but two paces, they fell off her feet with a clanging sound. She sullenly fastened the pearl necklace around her throat; but the pearls from the land of pearls were too tight around her neck and cut into her flesh, hurting her.

She wore the sari after wrapping it around herself seven times but the blue silk sari was too short for her. Tears welled in her eyes.

The petulant young queen then pulled off the bracelets with their eight thousand rubies, the solid gold anklets, the pearls about her throat and the treasured sari! She said – Fie on these jewels, this sari! Where did you get the pebbles to make these bracelets? Where did you gather the dust to make these anklets? Shame on you for bringing me someone else’s cast off pearls! I hate the sight of this used sari, I am ashamed to wear them all! Take these away king, for I have no use for these old things!

The queen then locked herself in her chamber of anger and sulked. The king grew sombre and brought the sari and the jewels he had bought with seven ships filled with gold to his court.

The minister sat waiting by the king’s throne with a baby monkey that he had bought from a merchant from the land of magic for just a coin.

The king said to his minister, ‘How strange, minister that the things I had made for my younger queen do not fit her!’

The wild monkey then paid his respects to the king and said – Only the very fortunate are allowed to wear what the daughters of gods and snakes weave and make for themselves; these jewels and saris from the lands of make-believe. Put these away in the royal treasury, give them to your daughter-in-law when she comes into the family.

The king was astonished at the monkey’s words. He laughed and said to the minister, ‘What is this monkey saying? I do not even have a son yet! How will I greet a granddaughter-in-law? Go and order new jewels for the younger queen and new saris from the weavers. Put these jewels and clothes away in the royal treasuries for now; if there is ever a daughter-in-law in this house, she will have all these.’

The minister went to the goldsmith to order new jewels for the young queen. The king went to the older queen with the monkey she had wished for.

The unfortunate queen wiped his feet with the end of her threadbare sari, and made the king sit on a tattered mat in her broken room. She wept and said, ‘Sit down, my king. This is all I have to give you as a seat after all these days of absence. How miserable am I!’

The king’s eyes filled with tears when he heard her words. He gave her the monkey child as he sat in her broken room upon her tattered quilt. He said, ‘My queen, your tattered rags and broken doors are a million times better than the other queen’s thrones and rooms of gold. There is kindness and compassion here, there are sweet words to be heard; she has none of that. She kicks away the jewels I bought and the  sari I gave her. Yet, you are embracing the monkey I gave you which did not cost anywhere near that amount. I will not be the cause of your sorrow any more. Bid me farewell, I will return to you again, my queen. But beware, let not the young queen hear of this. She will not rest if she hears of this; she will either poison you and kill me.

The king went away after consoling the queen. She continued to live in her broken room raising the monkey on milk and bananas.

The days passed, as days always do. The younger queen spent her days in the palace with the seven floors surrounded by seven hundred hand maidens; while the older queen lay on a tattered rag in her broke down room, hugging a monkey to her bosom. Days became months and months turned into years. The older queen’s plight did not change; she had coarse rice to eat and coarse clothes to wear. She lay on her broken room, clutched her only companion the monkey to her breast and wept as she looked at the palace and its seven gardens. The monkey always saw her with tears in her eyes.

One day it asked, ‘Mother why do you cry? Why do you cry as you look at the palace? Whom have you lost there?’

The queen said, ‘Child, I have everything there. I have a house with seven floors, seven hundred hand maidens to serve my every need, seven chests filled with jewels and seven gardens to wander in. But in that seven floored palace lives my rival, the younger queen. That witch has cast a spell on my king and taken my house, my maids and my jewels from me; she lives happily in my gardens while I live in poverty. Dear child, what sorrow do I have! I was a king’s daughter, I became a king’s wife with seven hundred handmaidens and a seven floored palace; my husband was what I had dreamed of. I had everything but some curse meant that I could never give the king the heir he desired; a prince as precious as burnished gold! I must have sinned so much, been in the way of so many wishes being fulfilled, hurt so many mothers’ feelings and that is why I have to see my position taken by a usurper who has my all; while I taste only the ashes of disappointment after losing my king and kingdom and with it all hopes of giving him a prince. My child, I am so stony hearted that such ignominy and pain has not been able destroy me.’

 

 

 

Two Rabindrasangeets based on Raga Paraj, a pre-dawn Raga of the Purvi Thaat: হৃদয়ে তোমার দয়া যেন পাই/Hridoye Tomar Doya Jeno Pai and তব প্রেম সুধারসে মেতেছি/Tobo Premo shudharoshe

 

 

Raga Paraj, a pre-dawn Raga of the Purvi Thaat and two Rabindrasangeets based on the raga

First, the raga, by Faiyaz Khan: Manmohan Brij Ko Rasiya

http://youtu.be/1jHh4HaWdig

 

***

Rabindrasangeet in the same raga:

হৃদয়ে তোমার দয়া যেন পাই।
সংসারে যা দিবে মানিব তাই,
হৃদয়ে তোমায় যেন পাই ॥
তব দয়া জাগিবে স্মরণে
নিশিদিন জীবনে মরণে,
দুঃখে সুখে সম্পদে বিপদে তোমারি দয়া-পানে চাই–
তোমারি দয়া যেন পাই ॥
তব দয়া শান্তির নীরে অন্তরে নামিবে ধীরে।
তব দয়া মঙ্গল-আলো
জীবন-আঁধারে জ্বালো–
প্রেমভক্তি মম সকল শক্তি মম তোমারি দয়ারূপে পাই,
আমার ব’লে কিছু নাই ॥

 

রাগ: পরজ
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1316
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

 

Oh, that I may have your compassion within my soul
Whatever you hand to me in life I will bear,
If only I have you within my soul.
Your compassion as beacon to remind me
Eternally in life and in death
In sorrow and joy, in plenty and strife, of your presence –
Only if I have your compassion.
Your mercy will descend, blessings gentle upon my soul.
Your mercy shall be a flame of sanctity
In the midst of darkness befalling my life –
My love and my respect, all the strength within me,
All these are signs of your compassion alone,
For without you I have nothing of my own.

 

Raga: Paraj

Beat: Tritaal

Written: 1909

 

Follow the link to hear Ashoketaru Bandopadhyay sing:

***

 

 

তব প্রেম সুধারসে মেতেছি,

                          ডুবেছে মন ডুবেছে।। 

               কোথা কে আছে নাহি জানি–

    তোমার মাধুরীপানে মেতেছি, ডুবেছে মন ডুবেছে।।

 

রাগ: পরজ
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1292
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1885

 

I am intoxicated in the sweetness of your love

My mind is lost.

I do not know where the others are –

For I am taken up with drinking in your ambrosia,

My mind I have lost.

 

Raga: Paraj

Beat: Tritaal

Written: 1885

 

Follow the link to hear Ustad Rashid Khan sing:

 

 

 

Tagore: by Philip Salom, Australian poet

If the dates are correct, Rabindranath Tagore – whose 150th birthday has just passed – lived a life as brilliantly symmetrical as he was brilliantly talented: born on May 7 in 1861 and dying on August 7, 1941. In the west he is usually considered a great poet (for which he won the Nobel Prize in 1913) but throughout his remarkable eighty years he proved himself the most extraordinary person of the ‘Indian Renaissance’, publishing 30 or so collections of poetry, eight novels, four novellas, ten books of essays, several collections of critical writings and speeches on the culturally central subjects of literature, history, politics and religion. He wrote possibly as many as 2000 songs, including the music, and a large number of dramas, many of them also ‘musicals’. Just for variety, towards the end of his life he took up painting and print-making. But there was more…

Tagore (Thakur) was born into a high caste Brahmin family and began writing from an early age. He was educated in Bengal, and later England, where he attended public schools and University but he left greatly disillusioned with an education system based, as he saw it, on military discipline. This was sadly consistent, in his view, with the dynamics of British colonisation in India and Africa. The same obsession with control was behind Britain’s domination of nature through resource-mining world-wide, with industry and over-reaching commerce. This abuse of nature by force and self-interest was something Tagore was deeply against, so he would now look very much the environmentalist in his overall philosophy. He eventually completed his university education in India.

But his travels left him with a passion to see India as a world nation, as a continually growing culture to be understood on equal terms with western culture, not reduced by empirical condescension to being “oriental’, and ‘Eastern’; these paradigms of definition all too often meant exotic, brooding, playful, magical, and superficial, a presence full of colour and surface and brilliantly fascinating – but not to be taken quite seriously compared to Western achievements.  This was what eventually happened to Tagore’s own profile in the West: taken up suddenly with the first translation into English of his poems in Gitanjali, lauded by WB Yeats and Ezra Pound, made famous as a major world poet by major world poets, awarded the Nobel Prize; and then in a few years came a quite rapid re-evaluation of him as not so important after all. England ‘orientalised’ him.

Image

How rare he was. This man used his Nobel Prize money to establish an ‘alternative’ secondary school and an Agricultural Bank. The former was free, and accepted boys and girls studying the same curriculum; and the latter was a banking system devised to allow peasant farmers to pay off their debts to their landlords and become self-reliant. This rural reconstruction work was opposed to Gandhi’s notion of Swaraj, a rejection of the state as epitomised by British rule. Tagore did not want India to become a traditionalist state but one that took the best of the West and applied it, freely, in agriculture as elsewhere. Tagore taught in the school (Santiniketan) and later travelled extensively throughout Bengal to raise funds for its continuation; the students travelled also, performing plays and musical works – often written by Tagore for this purpose. Students studied each morning and balanced intellectual work with afternoon involvement in community activities, music, sport and physical work, making up a diverse and socially-integrated curriculum. It must have been a fascinating school. Later he added a World University (Visva Bharati ) with international lecturers and students and even more travels by himself, internationally, to generate funding and interest.

Tagore was an educationalist, administrator, critic, humanist, lifelong commentator on politics, friend of Gandhi and famous figures like Einstein, a man who lectured throughout the US and Europe and Japan, someone never afraid of being open but also critical of his and these other major cultures. He supported Gandhi’s ideas of Satygraha but was troubled by the divisions he saw Gandhi’s politics were creating between Hindu and Muslim, and Gandhi later admitted Tagore had been prescient in this criticism. Tagore also wished to see the Untouchables integrated into the social system.
When the British massacred up to 1500 unarmed people at a political gathering in Jallianwala Bagh he returned his earlier-awarded Knighthood. During his life he lost his wife early (she was only 29), then his father, his daughter, his mother and two of his sons. Grief underlies many of his poems, regardless of the celebration of nature and humanity found everywhere in them. No champion of the privileged, his poems and fiction works focus on ordinary people, especially women, and trace deep chords of loss and loneliness within their music. He often cast Untouchables as heroes in his writings.
One early influence on his poetic was the ancient Sanskrit poet Kalidasa, a great figure in the tradition of a poetry that is suffused with philosophy and religion, who is said to have lived in the 4th Century, and a later influence came in the works of the Bakhti Sufi poet Kabir. Sufism and poetry have a strong history and Tagore was greatly impressed by this achievement even though he was not a Sufi and really can’t be called a philosopher. He was an accessible poet whose songs were extremely popular and whose poems and stories were familiar nationally. Tagore was himself was a strikingly flexible poet, using strict and loose forms, prose poems, poems of philosophy alongside intense lyrics and broader, descriptive poems. In the 30s he also took on a more Western Modernism and experimented with various of its styles, especially a narrative-based, vernacular and ‘low’ literature approach.
During the 20C he became a towering influence, not only in India, but throughout Asia, all the way down to Indonesia, where the Hindu people of Bali venerated him.

 

 

http://www.philipsalom.com/Shorts/tagore_an_amazing_life

সেই ভালো সেই ভালো/ Shei Bhalo Shei Bhalo/ Let it then be thus, pretend then not to know me

সেই ভালো সেই ভালো, আমারে নাহয় না জানো।
দূরে গিয়ে নয় দুঃখ দেবে, কাছে কেন লাজে লাজানো ॥
মোর বসন্তে লেগেছে তো সুর, বেণুবনছায়া হয়েছে মধুর–
থাক-না এমনি গন্ধে-বিধুর মিলনকুঞ্জ সাজানো।
গোপনে দেখেছি তোমার ব্যাকুল নয়নে ভাবের খেলা।
উতল আঁচল, এলোথেলো চুল, দেখেছি ঝড়ের বেলা।
তোমাতে আমাতে হয় নি যে কথা মর্মে আমার আছে সে বারতা–
না বলা বাণীর নিয়ে আকুলতা আমার বাঁশিটি বাজানো ॥

রাগ: খাম্বাজ
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): চৈত্র, ১৩৩২
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1926
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Abanindranath Tagore-

Let it then be thus, pretend then not to know me
Go far away and cause me pain, why stay close and cause of my blushes of shame
My spring is filled with song,                 the shade of bamboo groves grow ever sweeter
Why not let these bowers of love stay perfumed like this forever
Secretly I have watched your anxious eyes as feelings play across them
Your careless attire, your undone hair, as you yield to the storm
The words that we are yet to speak,                lie in wait within my soul
My flute I play with the passion, I cannot bring myself to utter aloud

Raga: Khamaj
Beat: Dadra
Written: Chaitra, 1332, CE 1926
At Santiniketan
Score: Dinendranath Tagore

Follow the link to hear Sagar Sen sing: http://youtu.be/RwvL1x1zfnc

চোখের বালি ২৫/Chokher Bali 25

২৫

সেদিন নূতন ফাল্গুনে প্রথম বসন্তের হাওয়া দিতেই আশা অনেক দিন পরে সন্ধ্যার আরম্ভে ছাদে মাদুর পাতিয়া বসিয়াছে। একখানি মাসিক কাগজ লইয়া খণ্ডশ প্রকাশিত একটা গল্প খুব মনোযোগ দিয়া সেই অল্প আলোকে পড়িতেছিল। গল্পের নায়ক তখন সংবৎসর পরে পূজার ছুটিতে বাড়ি আসিবার সময় ডাকাতের হাতে পড়িয়াছে,আশার হৃদয় উদ্বেগে কাঁপিতেছিল; এ দিকে হতভাগিনী নায়িকা ঠিক সেই সময়েই বিপদের স্বপ্ন দেখিয়া কাঁদিয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। আশা চোখের জল আর রাখিতে পারে না। আশা বাংলা গল্পের অত্যন্ত উদার সমালোচক ছিল। যাহা পড়িত,তাহাই মনে হইত চমৎকার। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিত,”ভাই চোখের বালি, মাথা খাও, এ গল্পটা পড়িয়া দেখো। এমন সুন্দর! পড়িয়া আর কাঁদিয়া বাঁচি না।” বিনোদিনী ভালোমন্দ বিচার করিয়া আশার উচ্ছ্বসিত উৎসাহে বড়ো আঘাত করিত।

আজিকার এই গল্পটা আশা মহেন্দ্রকে পড়াইবে বলিয়া স্থির করিয়া যখন সজল-চক্ষে কাগজখানা বন্ধ করিল, এমন সময় মহেন্দ্র আসিয়া উপস্থিত হইল। মহেন্দ্রের মুখ দেখিয়াই আশা উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল। মহেন্দ্র জোর করিয়া প্রফুল্লতা আনিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “একলা ছাদের উপর কোন্ ভাগ্যবানের ভাবনায় আছ?”

আশা নায়ক-নায়িকার কথা একেবারে ভুলিয়া গিয়া কহিল, “তোমার কী শরীর আজ ভালো নাই।”

মহেন্দ্র। শরীর বেশ আছে।

আশা। তবে তুমি মনে মনে কী একটা ভাবিতেছ, আমাকে খুলিয়া বলো।

মহেন্দ্র আশার বাটা হইতে একটা পান তুলিয়া লইয়া মুখে দিয়া কহিল, “আমি ভাবিতেছিলাম, তোমার মাসিমা বেচারা কত দিন তোমাকে দেখেন নাই। একবার হঠাৎ যদি তুমি তাঁহার কাছে গিয়া পড়িতে পার, তবে তিনি কত খুশিই হন।”

আশা কোনো উত্তর না করিয়া মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। হঠাৎ এ কথা আবার নূতন করিয়া কেন মহেন্দ্রের মনে উদয় হইল, তাহা সে বুঝিতে পারিল না।

আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া মহেন্দ্র কহিল, “তোমার যাইতে ইচ্ছা করে না?”

এ কথার উত্তর দেওয়া কঠিন। মাসিকে দেখিবার জন্য যাইতে ইচ্ছা করে, আবার মহেন্দ্রকে ছাড়িয়া যাইতে ইচ্ছাও করে না। আশা কহিল, “কালেজের ছুটি পাইলে তুমি যখন যাইতে পারিবে, আমিও সঙ্গে যাইব।”

মহেন্দ্র। ছুটি পাইলেও যাইবার জো নাই; পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে।

আশা। তবে থাক্, এখন না-ই গেলাম।

মহেন্দ্র। থাক্ কেন। যাইতে চাহিয়াছিলে, যাও-না।

আশা। না, আমার যাইবার ইচ্ছা নাই।

মহেন্দ্র। এই সেদিন এত ইচ্ছা ছিল, হঠাৎ ইচ্ছা চলিয়া গেল?

আশা এই কথায় চুপ করিয়া চোখ নিচু করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনীর সঙ্গে সন্ধি করিবার জন্য বাধাহীন অবসর চাহিয়া মহেন্দ্রের মন ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত অধীর হইয়া উঠিয়াছিল। আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া তাহার একটা অকারণ রাগের সঞ্চার হইল। কহিল, “আমার উপর মনে মনে তোমার কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে নাকি। তাই আমাকে চোখে চোখে পাহারা দিয়া রাখিতে চাও?”

আশার স্বাভাবিক মৃদুতা নম্রতা ধৈর্য মহেন্দ্রের কাছে হঠাৎ অত্যন্ত অসহ্য হইয়া উঠিল। মনে মনে কহিল, “মাসির কাছে যাইতে ইচ্ছা আছে, বলো যে, আমি যাইবই, আমাকে যেমন করিয়া হোক পাঠাইয়া দাও–তা নয়, কখনো হাঁ, কখনো না, কখনো চুপচাপ–এ কী রকম।’

হঠাৎ মহেন্দ্রের এই উগ্রতা দেখিয়া আশা বিস্মিত ভীত হইয়া উঠিল। সে অনেক চেষ্টা করিয়া কোনো উত্তরই ভাবিয়া পাইল না। মহেন্দ্র কেন যে কখনো হঠাৎ এত আদর করে, কখনো হঠাৎ এমন নিষ্ঠুর হইয়া উঠে, তাহা সে কিছুই বুঝিতে পারে না। এইরূপে মহেন্দ্র যতই তাহার কাছে দুর্বোধ্য হইয়া উঠিতেছে, ততই আশার কম্পান্বিত চিত্ত ভয়ে ও ভালোবাসায় তাহাকে যেন অত্যন্ত অধিক করিয়া বেষ্টন করিয়া ধরিতেছে।

মহেন্দ্রকে আশা মনে মনে সন্দেহ করিয়া চোখে চোখে পাহারা দিতে চায়! ইহা কি কঠিন উপহাস, না নির্দয় সন্দেহ? শপথ করিয়া কি ইহার প্রতিবাদ আবশ্যক, না হাস্য করিয়া ইহা উড়াইয়া দিবার কথা?

হতবুদ্ধি আশাকে পুনশ্চ চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া অধীর মহেন্দ্র দ্রুতবেগে সেখান হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল। তখন কোথায় রহিল মাসিক পত্রের সেই গল্পের নায়ক, কোথায় রহিল গল্পের নায়িকা। সূর্যাস্তের আভা অন্ধকারে মিশাইয়া গেল, সন্ধ্যারম্ভের ক্ষণিক বসন্তের বাতাস গিয়া শীতের হাওয়া দিতে লাগিল–তখনো আশা সেই মাদুরের উপর লুণ্ঠিত হইয়া পড়িয়া রহিল।

অনেক রাত্রে আশা শয়নঘরে গিয়া দেখিল, মহেন্দ্র তাহাকে না ডাকিয়াই শুইয়া পড়িয়াছে। তখনই আশার মনে হইল, স্নেহময়ী মাসির প্রতি তাহার উদাসীনতা কল্পনা করিয়া মহেন্দ্র তাহাকে মনে মনে ঘৃণা করিতেছে। বিছানার মধ্যে ঢুকিয়াই আশা মহেন্দ্রের দুই পা জড়াইয়া তাহার পায়ের উপর মুখ রাখিয়া পড়িয়া রহিল। তখন মহেন্দ্র করুণায় বিচলিত হইয়া তাহাকে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিল। আশা কিছুতেই উঠিল না। সে কহিল, “আমি যদি কোনো দোষ করিয়া থাকি, আমাকে মাপ করো।”

মহেন্দ্র আর্দ্রচিত্তে কহিল, “তোমার কোনো দোষ নাই, চুনি। আমি নিতান্ত পাষণ্ড, তাই তোমাকে অকারণে আঘাত করিয়াছি।”

তখন মহেন্দ্রের দুই পা অভিষিক্ত করিয়া আশার অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। মহেন্দ্র উঠিয়া বসিয়া তাহাকে দুই বাহুতে তুলিয়া আপনার পাশে শোয়াইল। আশার রোদনবেগ থামিলে সে কহিল, “মাসিকে কি আমার দেখিতে যাইবার ইচ্ছা করে না। কিন্তু তোমাকে ফেলিয়া আমার যাইতে মন সরে না। তাই আমি যাইতে চাই নাই, তুমি রাগ করিয়ো না।”

মহেন্দ্র ধীরে ধীরে আশার আর্দ্র কপোল মুছাইতে মুছাইতে কহিল, “এ কি রাগ করিবার কথা, চুনি। আমাকে ছাড়িয়া যাইতে পার না, সে লইয়া আমি রাগ করিব? তোমাকে কোথাও যাইতে হইবে না।”

আশা কহিল, “না, আমি কাশী যাইব।”

মহেন্দ্র। কেন।

আশা। তোমাকে মনে মনে সন্দেহ করিয়া যাইতেছি না–এ কথা যখন একবার তোমার মুখ দিয়া বাহির হইয়াছে, তখন আমাকে কিছুদিনের জন্যও যাইতেই হইবে।

মহেন্দ্র। আমি পাপ করিলাম, তাহার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে করিতে হইবে?

আশা। তাহা আমি জানি না–কিন্তু পাপ আমার কোনোখানে হইয়াছেই, নহিলে এমন-সকল অসম্ভব কথা উঠিতেই পারিত না। যে-সব কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিতে পারিতাম না, সে-সব কথা কেন শুনিতে হইতেছে।

মহেন্দ্র। তাহার কারণ, আমি যে কী মন্দ লোক তাহা তোমার স্বপ্নেরও অগোচর।

আশা ব্যস্ত হইয়া কহিল, “আবার! ও কথা বলিয়ো না। কিন্তু এবার আমি কাশী যাইবই।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “আচ্ছা যাও, কিন্তু তোমার চোখের আড়ালে আমি যদি নষ্ট হইয়া যাই, তাহা হইলে কী হইবে।”

আশা কহিল, “তোমার আর অত ভয় দেখাইতে হইবে না, আমি কিনা ভাবিয়া অস্থির হইতেছি।”

মহেন্দ্র। কিন্তু ভাবা উচিত। তোমার এমন স্বামীটিকে যদি অসাবধানে বিগড়াইতে দাও, তবে এর পরে কাহাকে দোষ দিবে?

আশা। তোমাকে দোষ দিব না, সেজন্য তুমি ভাবিয়ো না।

মহেন্দ্র। তখন নিজের দোষ স্বীকার করিবে?

আশা। একশোবার।

মহেন্দ্র। আচ্ছা, তাহা হইলে কাল একবার তোমার জেঠামশায়ের সঙ্গে গিয়া কথাবার্তা ঠিক করিয়া আসিব।

এই বলিয়া মহেন্দ্র “অনেক রাত হইয়াছে’ বলিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল।

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পুনর্বার এ পাশে ফিরিয়া কহিল, “চুনি, কাজ নাই, তুমি নাই বা গেলে।”

আশা কাতর হইয়া কহিল, “আবার বারণ করিতেছ কেন। এবার একবার না গেলে তোমার সেই ভর্ৎসনাটা আমার গায়ে লাগিয়া থাকিবে। আমাকে দু-চার দিনের জন্যও পাঠাইয়া দাও।”

মহেন্দ্র কহিল, “আচ্ছা।” বলিয়া আবার পাশ ফিরিয়া শুইল।

কাশী যাইবার আগের দিন আশা বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া কহিল, “ভাই বালি, আমার গা ছুঁইয়া একটা কথা বল্।”

বিনোদিনী আশার গাল টিপিয়া ধরিয়া কহিল, “কী কথা, ভাই। তোমার অনুরোধ আমি রাখিব না?”

আশা। কে জানে ভাই, আজকাল তুমি কী রকম হইয়া গেছ। কোনোমতেই যেন আমার স্বামীর কাছে বাহির হইতে চাও না।

বিনোদিনী। কেন চাই না সে কি তুই জানিস নে, ভাই। সেদিন বিহারীবাবুকে মহেন্দ্রবাবু যে কথা বলিলেন, সে কি তুই নিজের কানে শুনিস নাই। এ-সকল কথা যখন উঠিল তখন কি আর বাহির হওয়া উচিত–তুমিই বলো-না, ভাই বালি।

ঠিক উচিত যে নহে, তাহা আশা বুঝিত। এ-সকল কথার লজ্জাকরতা যে কতদূর, তাহাও সে নিজের মন হইতেই সম্প্রতি বুঝিয়াছে। তবু বলিল, “কথা অমন কত উঠিয়া থাকে, সে-সব যদি না সহিতে পারিস তবে আর ভালোবাসা কিসের, ভাই। ও কথা ভুলিতে হইবে।”

বিনোদিনী। আচ্ছা ভাই, ভুলিব।

আশা। আমি তো ভাই, কাল কাশী যাইব, আমার স্বামীর যাহাতে কোনো অসুবিধা না হয় তোমাকে সেইটে বিশেষ করিয়া দেখিতে হইবে। এখনকার মতো পালাইয়া বেড়াইলে চলিবে না।

বিনোদিনী চুপ করিয়া রহিল। আশা বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “মাথা খা ভাই বালি, এই কথাটা আমাকে দিতেই হইবে।”

বিনোদিনী কহিল, “আচ্ছা।”

Kalighat-Paintings-04

Chapter 25
Asha had spread a mat upon the terrace at the twilight hour after a very long time as there was a fresh spring breeze at the start of the month of Phalgun. She was reading a serialized story in a monthly magazine with great attentiveness in the fading light. The hero of the story was in the clutches of highwaymen while on his yearly journey back home during the Puja holidays; Asha’s heart was filled with apprehension. At this point the wretched heroine had also just woken from a nightmare and Asha’s eyes welled with tears. Asha was a very lenient critic of Bengali literature. She found everything that she read to be of the highest quality. She would call Binodini and tell her, ‘Bali, upon my heart! Please read this! It is so well written I cannot hold back my tears.’ Binodini would then judge the piece on its merits and cause much grief to Asha’s sense of enthusiastic approval.

As she tearfully shut the book and decided to read the story later to Mahendra, he appeared on the terrace. She grew anxious on seeing his face although he tried hard to compose his features, saying, ‘Who is the fortunate for whom you wait on this terrace?’

Asha forgot all about the characters of the story and asked, ‘Are you not well today?’

Mahendra: I am well.

Asha: Then tell me what is worrying you.

Mahendra took a folded paan from her container, put it in his mouth and said, ‘I was thinking that your poor aunt has not seen you for a very long time. If you pay her a sudden visit, how happy you will make her.’

Asha said nothing and looked at Mahendra. She could not understand why he was suddenly thinking about this again.
Mahendra noticed her silence and remarked, ‘Do you not want to go?’

This was not easily answered. She wanted to see her aunt but she did not wish to leave Mahendra. Asha said, ‘I will go with you, when you have a break from college.’

Mahendra: I cannot go even if I get a break; I will need to prepare for the examinations.

Asha: Then let it be, I won’t go now.

Mahendra: Why? You wanted to go and so you should.

Asha: No, I have no wish to go.

Mahendra: You wanted to go so much just the other day, what happened to that?

Asha remained silent and cast her eyes down at this. Mahendra had been growing very anxious to have Binodini to himself for an uninterrupted length of time in order to mend his bonds with her. He became angry with Asha when she did not say anything and said rather unreasonably, ‘Are you suspecting me of anything? Is that why you wish to keep an eye on me at all times?’

Asha’s natural gentleness and patience suddenly felt completely unbearable in Mahendra’s eyes. He said to himself, ‘If you want to go to your aunt say that you must go, send me any way – but I cannot bear this agreeing at times and refusing at others; this silence is incomprehensible!’

Asha became frightened and amazed at Mahendra’s unexpected rudeness. She could not answer his questions or understand why he could be so loving at times and so cruel on occasion. The less she understood him the more her apprehensive heart filled with fear and love for Mahendra and tried to cling to him.
‘She wants to keep him under watch because she suspects him! Was that a cruel jest or heartless suspicion? Was she to pledge her protest or laugh it away as a fancy?’

Mahendra left the place quickly when he saw Asha’s confusion and silence. No one got to hear of the storybook hero’s trials or of his heroine’s tears. The sunset faded into the night, the pleasant spring breezes disappeared as the terrace grew cold and Asha lay on on her mat alone.

When she went to their bedroom much later that night, she found Mahendra had fallen asleep without calling her to bed. She immediately supposed that he was judging her for her callous attitude towards her loving aunt. She held her face to his feet and lay there till he was overcome with pity and tried to raise her. She would not be moved and said, ‘If I have done anything wrong, forgive me.’

Mahendra said tenderly, ‘You have not done anything wrong, Chuni. I am entirely heartless and have given you pain without reason.’

Asha’s tears continued to fall on his feet. He sat up and took her in his arms and made her lie down beside him. When her tears lessened, she said, ‘Do I not want to see my aunt? But I do not wish to leave you and go. That is the only reason I refused, do not be angry with me.’

Mahendra dried her wet cheeks gently and said, ‘Is this something to get angry over? Why should I be angry because you do not wish to go without me? You do not have to go anywhere!’

Asha said, ‘No, I will go to Kashi.’

Mahendra: Why?

Asha: When you have admitted that I am not staying because I cannot trust you, I must go for a few days at least.
Mahendra: I am the one who sinned, and you are the one that has to seek salvation?

Asha: I do not know about that – but I must have sinned somehow, else why do I have to hear such talk. Why do I have to listen to things that are beyond my wildest dreams.

Mahendra: That is because you cannot dream of how bad I can be.

‘Again? Do not say that! This time I am most definitely going to Kashi,’ Asha said quickly.

Mahendra laughed and answered, ‘Fine, go then! But what will happen if something befalls me in your absence, what then?’

Asha said, ‘You do not have to try and frighten me, am I that worried about it!’

Mahendra: But you need to think about it. If your husband is distracted by someone else through lack of supervision, who will you blame?

Asha: I will never blame you, you do not need to worry about that.

Mahendra: Will you admit your fault then?

Asha: A hundred times!

Mahendra: I will then go and speak to your uncle tomorrow about this and finalise your arrangements for the journey.
He then turned to the other side saying, ‘It is very late.’

After a short while, he suddenly turned to Asha again and said, ‘Chuni, it is perhaps best if you did not go.’

Pained, Asha said, ‘Why are you stopping me again? If I do not go now, the words you once rebuked me with will remain with me forever. Send me even if it is only for a couple of days.’

Mahendra answered, ‘Alright,’and then turned to his side.

The day before she left for Kashi, Asha wrapped her arms around Binodini’s neck and said, ‘Dear Bali, touch my skin and tell me the truth about one thing.’

Binodini pinched Asha’s cheek and said, ‘What must I tell you? Do you think I will not heed a request from you?’
Asha: Who knows why, but you have changed. You never seem to want to be here when my husband is around.

Binodini: Do you not know why I don’t want that? Did you not hear what Mahendra said to Bihari that day? Is it right that I should continue behaving with the freedom that I once enjoyed after these words have been uttered? Why don’t you tell me, Bali?

Asha knew that it was not right. She too had recently begun to comprehend how shameful those words had been. Despite that, she said, ‘People say so many things, if you cannot bear them then where is the love you professed? You must forget all that was said.’

Binodini: Alright, I will forget everything.

Asha: I am leaving for Kashi tomorrow sister; you must take special care to ensure that my husband is not inconvenienced. You will not avoid him as you have been doing lately.

Binodini remained silent. Asha grabbed her hand and pleaded, ‘Please Bali, you must give me your word!’

Binodini said, ‘Certainly.’

জানি নাই গো সাধন তোমার বলে কারে/Jani Nai Go Sadhan Tomar Bole Karey/I do not know how to pray to you in the right way

জানি নাই গো সাধন তোমার বলে কারে।
আমি ধুলায় বসে খেলেছি এই
তোমার দ্বারে ॥
অবোধ আমি ছিলেম বলে যেমন খুশি এলেম চলে,
ভয় করি নি তোমায় আমি অন্ধকারে ॥
তোমার জ্ঞানী আমায় বলে কঠিন তিরস্কারে,
“পথ দিয়ে তুই আসিস নি যে, ফিরে যা রে।’
ফেরার পন্থা বন্ধ করে আপনি বাঁধো বাহুর ডোরে,
ওরা আমায় মিথ্যা ডাকে বারে বারে ॥

রাগ: বাউল
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১ চৈত্র, ১৩২০
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৫ মার্চ, ১৯১৪
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

tag baul

I do not know how to pray to you in the right way
For in the dust I have simply played
Sitting by your door.
Unaware, I came to you knowing so little
Without fearing your might in the darkness.
Those that know have rebuked me again and again,
‘Return, for this is not the path to tread!’
But you held me in your arms and made me stop
And yet they call me, again and again.

Raga: Baul
Beat: Dadra
Written: Chaitra 1,
March 15, 1914
Written: Santiniketan
Score: Dinendranath Tagore.

Follow the links to hear:
Debabrata Biswas: http://youtu.be/mIGhBYzFWy0
Arghya Sen: http://youtu.be/XY8E5U7iZNw

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই/ Majhe Majhe Tobo Dekha Pai/I get to catch a glimpse of you every now and again

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না।
( মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না।
অন্ধ করে রাখে, তোমারে দেখিতে দেয় না। )
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে
ওহে ‘হারাই হারাই’ সদা ভয় হয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।
( আশ না মিটিতে হারাইয়া– পলক না পড়িতে হারাইয়া–
হৃদয় না জুড়াতে হারাইয়া ফেলি চকিতে। )
কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে–
ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব, নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে।
( আমার সাধ্য কিবা তোমারে–
দয়া না করিলে কে পারে–
তুমি আপনি না এলে কে পারে হৃদয়ে রাখিতে। )
আর-কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ–
ওহে তুমি যদি বলো এখনি করিব বিষয় -বাসনা বিসর্জন।
( দিব শ্রীচরণে বিষয়– দিব অকাতরে বিষয়–
দিব তোমার লাগি বিষয় -বাসনা বিসর্জন। )
রাগ: কীর্তন
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৯ মাঘ, ১২৯১

dancing-baul

I get to catch a glimpse of you every now and again, why not all the time
Why do clouds float across the skies within, keeping me from seeing you?
(Illusions that gather as clouds, keep me from seeing you
These blinding illusions keep me from seeing you)
When I do see you, in the blink of an eye, in a flash of light
My mind fears I will lose you, for you vanish as suddenly as you appear
(You are lost before I have had my fill –
Before I have opened my eyes –
Before my soul has had solace, as suddenly as you appear)
Tell me what I must do to have you, to see you always before my eyes –
Dearest, where will I find the love that I must offer, to hold you within my heart
(What do I have to hold you with –?
Unless you bless me with your bounty –
If you do not yield, who can hope to hold you?)
I will never look at another, this I will pledge upon my life
If you say but the word I will forsake all I have
(I will give all I have to you – I will give without holding back
I will give up all I have for you)

Raga: Keertan
Beat: Dadra
Written: 1884

Follow the links to hear

Suchitra Mitra: http://youtu.be/DGDTBbek_tc
Ritu Guha: http://youtu.be/PBQiHpdd1MA
Geeta Ghatak: http://youtu.be/Q8kLHNGvRNc
Arnob: http://youtu.be/P4P88LP10do