Archives

শেষের সপ্তকঃ এক/Shesher Shawptok: Ek/ The Seven at the End: One

এক

 

স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে,

মনেও হয়নি

তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা।

তুমিও মূল্য করনি দাবি।

দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত,

দিলে ডালি উজাড় ক’রে।

আড়চোখে চেয়ে

আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে;

পরদিনে মনে রইল না।

নববসন্তের মাধবী

যোগ দিয়েছিল তোমার দানের সঙ্গে,

শরতের পূর্ণিমা দিয়েছিল তারে স্পর্শ।

তোমার কালো চুলের বন্যায়

আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে

“তোমাকে যা দিই

তোমার রাজকর তার চেয়ে অনেক বেশি;

আরো দেওয়া হল না

আরো যে আমার নেই।”

বলতে বলতে তোমার চোখ এল ছলছলিয়ে।

আজ তুমি গেছ চলে,

দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত,

তুমি আস না।

এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে

দেখছি তোমার রত্নমালা,

নিয়েছি তুলে বুকে।

যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন

সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে

যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা।

তোমার প্রেমের দাম দেওয়া হল বেদনায়,

হারিয়ে তাই পেলেম তোমায় পূর্ণ ক’রে।

 

 

শান্তিনিকেতন, ১ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯

 

***

ONE

 

I knew for certain, I had you.

I never thought

Of putting a value on what you gave.

And you never asked.

Day passed after day, and night followed night,

You gave everything you had to me.

With a sideways glance

I gathered them without thought;

My mind moving onto other things within the day.

The blossoms of newly arrived spring

Held hands with your gifts,

And the autumn moon favoured them with its touch.

In the cascade of your dark tresses

You covered my feet and said

‘Whatever I bring to you

In tribute could be so much greater;

But I could not give any more

In truth I have nothing left.’

As you spoke your eyes brimmed over.

Now that you are gone today,

Days pass and night follows night,

But you do not come any more.

Today I have opened my heart at last

To see what treasures you gave,

And to clasp them to my breast.

That same pride that had made me oblivious

Now bows to the ground

Where your feet once walked.

I have paid for your love with pain,

And I seek you again in loss.

 

 

Written: 15th November, 1932

 

 

সমাপ্তি -ক্ষণিকা/Samapti – Khonika/ The Ending – the final poem from the collection known as Khonika

সমাপ্তি

 

পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।

সব শেষ হল যেখানে সেথায় তুমি আর আমি একা।

নানা বসন্তে নানা বরষায়

অনেক দিবসে অনেক নিশায়

দেখেছি অনেক, সহেছি অনেক, লিখেছি অনেক লেখা–

পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।

 

কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!

পিছনে চাহিয়া দেখিনু কখন চলিয়া গিয়াছে সবে।

তোমার নীরব নিভৃত ভবনে

জানি না কখন পশিনু কেমনে।

অবাক রহিনু আপন প্রাণের নূতন গানের রবে।

কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!

 

চিহ্ন কি আছে শ্রান্ত নয়নে অশ্রুজলের রেখা?

বিপুল পথের বিবিধ কাহিনী আছে কি ললাটে লেখা?

রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন,

বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন,

তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে তুমি আর আমি একা।

নয়নে আমার অশ্রুজলের চিহ্ন কি যায় দেখা!

***

The Ending

 

Upon the road while I walked many were the faces I saw

But where the road ended we were alone, only you and I.

            Over many a spring and many a rain

            And through many a day and night

I have seen so much and borne so much and written many a line –

Upon the road while I walked many were the faces I saw.

 

I do not recall when the road ended of its own accord, or when day’s close fell!

As I looked behind, I found the others had walked ahead.

            Into the silent solitude of your kingdom

            I know not when I had entered.

Silenced was I in wonder at the new song that rose in my heart.

When did the road end of its own accord, when did day’s close fall!

 

 Are there signs of tears beneath these worn eyes?

Are the tales of my journey engraved upon my brow?

            You have shut away the outside world

            You have made a haven for me to rest

 By the light of your evening lamp, you and me alone

Can you see the tears of joy that rise, to these worn eyes!

 

 

 

Arogyo 3: নির্জন রোগীর ঘর। খোলা দ্বার দিয়ে বাঁকা ছায়া পড়েছে শয্যায়

নির্জন রোগীর ঘর।

খোলা দ্বার দিয়ে

বাঁকা ছায়া পড়েছে শয্যায়।

শীতের মধ্যাহ্নতাপে তন্দ্রাতুর বেলা

চলেছে মন্থরগতি

শৈবালে দুর্বলস্রোত নদীর মতন।

মাঝে মাঝে জাগে যেন দূর অতীতের দীর্ঘশ্বাস

শস্যহীন মাঠে।

মনে পড়ে কতদিন

ভাঙা পাড়িতলে পদ্মা

কর্মহীন প্রৌঢ় প্রভাতের

ছায়াতে আলোতে

আমার উদাস চিন্তা দেয় ভাসাইয়া

ফেনায় ফেনায়।

স্পর্শ করি শূন্যের কিনারা

জেলেডিঙি চলে পাল তুলে,

যূথভ্রষ্ট শুভ্র মেঘ পড়ে থাকে আকাশের কোণে।

আলোতে ঝিকিয়া-ওঠা ঘট কাঁখে পল্লীমেয়েদের

ঘোমটায় গুন্ঠিত আলাপে

গুঞ্জরিত বাঁকা পথে আম্রবনচ্ছায়ে

কোকিল কোথায় ডাকে ক্ষণে ক্ষণে নিভৃত শাখায়,

ছায়ায় কুন্ঠিত পল্লীজীবনযাত্রার

রহস্যের আবরণ কাঁপাইয়া তোলে মোর মনে।

পুকুরের ধারে ধারে সর্ষেখেতে পূর্ণ হয়ে যায়

ধরণীর প্রতিদান রৌদ্রের দানের,

সূর্যের মন্দিরতলে পুষ্পের নৈবেদ্য থাকে পাতা।

আমি শান্ত দৃষ্টি মেলি নিভৃত প্রহরে

পাঠায়েছি নিঃশব্দ বন্দনা,

সেই সবিতারে যাঁর জ্যোতীরূপে প্রথম মানুষ

মর্তের প্রাঙ্গণতলে দেবতার দেখেছে স্বরূপ।

মনে মনে ভাবিয়াছি, প্রাচীন যুগের

বৈদিক মন্ত্রের বাণী কন্ঠে যদি থাকিত আমার

মিলিত আমার স্তব স্বচ্ছ এই আলোকে আলোকে;

ভাষা নাই, ভাষা নাই;

চেয়ে দূর দিগন্তের পানে

মৌন মোর মেলিয়াছি পাণ্ডুনীল মধ্যাহ্ন-আকাশে।

  উদয়ন, ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ – দুপুর, পূর্বপাঠ: ৭ পৌষ, ২২ ডিসেম্বর, ১৯৪০

***

The quiet room of the convalescent.

Through the open door

Shadows bend to fall across the bed.

Winter’s welcome sun kisses the hours to sleep

Slowing down the day

 Like a stream slowed down by algae

 Some times a sigh breaks the reverie

Memories of a distant past upon today’s barren field.

I remember once 

How the river would roil beneath broken deck

As idle morning unfolded

 In shadow and glorious light

I let my thoughts ramble

With ebb and flow of foam

Touching the edge of nothingness

 A fishing craft follows its sail,

While an errant cloud is left to wander the skies on its own.

The village women with flashing water pots on hip

In their veiled conversation

 By the shade of mango trees on winding paths

Where does the cuckoo call, unseen upon a dense branch,

The life of the village, shy under tree shade

The mystery deepens in my mind.

 The mustard fields by the lake ripen with seed

The earth’s repayment for sunshine’s gift,

A golden offering at the sun’s feet.

I cast my calm glance upon the silent hour

Sending a wordless prayer

To the sun in whose rays the first humans beheld

The image of god upon the dust of this earth.

I have thought to myself, if only

I had the words of the ancient Vedic hymns on my lips

I would have sent them to join that purest of light;

 But words I lack, I have none to speak;

As I gaze at the distant horizon

My silence I hold in offering to the pale blue of the midday firmament.

Udayan, afternoon February 1st 1941
Previously: 7th Poush, 22nd December 1940

 

পরম সুন্দর/ Pawrom Shundor/In the glorious beauty

পরম সুন্দর

আলোকের স্নানপুণ্য প্রাতে।

অসীম অরূপ

রূপে রূপে স্পর্শমণি

রসমূর্তি করিছে রচনা,

প্রতিদিন

চিরনূতনের অভিষেক

চিরপুরাতন বেদীতলে।

মিলিয়া শ্যামলে নীলিমায়

ধরণীর উত্তরীয়

বুনে চলে ছায়াতে আলোতে।

আকাশের হৃৎস্পন্দন

পল্লবে পল্লবে দেয় দোলা।

প্রভাতের কন্ঠ হতে মণিহার করে ঝিলিমিলি

বন হতে বনে।

পাখিদের অকারণ গান

সাধুবাদ দিতে থাকে জীবনলক্ষ্মীরে।

সবকিছু সাথে মিশে মানুষের প্রীতির পরশ

অমৃতের অর্থ দেয় তারে,

মধুময় করে দেয় ধরণীর ধূলি,

সর্বত্র বিছায়ে দেয় চিরমানবের সিংহাসন।

 

 

উদয়ন, ১২ জানুয়ারি, ১৯৪১ – দুপুর

***

In the glorious beauty

Of a dawn bathed with the purest of light.

The formless eternal

Touches the ordinary with beauty

To create images of grace,

Daily.

The crowning of the forever new

At the altar of the forever familiar.

Blues and greens join

In cloaking the earth

Spinning a veil from shadow and light.

The heartbeat of the sky

Moves each leaf in dance.

Dawn’s necklace glitters

In each tree and forest.

Birds sing without cause

Hailing the glory of life.

Man’s love joins the symphony

Raising it all to immortal planes,

Granting sweetness even to dust,

And thus we ascend to greatness enthroned.

 

 

Udayan, 12th January afternoon, 1941

 

এ দ্যুলোক মধুময়/ E dyulok modhumoy/ This earth is filled with sweetness

এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি–

অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি

এই মহামন্ত্রখানি,

চরিতার্থ জীবনের বাণী।

দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহার

মধুরসে ক্ষয় নাই তার।

তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে–

সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে।

শেষ স্পর্শ নিয়ে যাব যবে ধরণীর

ব’লে যাব তোমার ধূলির

তিলক পরেছি ভালে,

দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে।

সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মুরতি,

এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি।

 উদয়ন, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ – সকাল

***

 This earth is filled with sweetness, sweet its very dust –

 And I have taken to heart

This great tenet,

To fulfil the song of life.

 What I have received each day as a gift of truth

Will not be diminished at all.

And that is why it rings out on the eve of death –

Erasing all loss, shining as a beacon infinite.

  When I let go for the final time

I will declare to the earth

 Your dust I have worn with pride upon my brow,

 I have seen your light burn bright behind the illusion of loss

 Truth finds its most joyous expression in this dust,

 In this I believe as I bow in respect.

  Udayan, 14th February, 1941 – morning.

কর্ণ কুন্তি সংবাদ/Karna Kunti Sambad/Karna and Kunti Speak

 

কর্ণ।

মাতঃ, করিয়ো না ভয়।

কহিলাম, পাণ্ডবের হইবে বিজয়।

আজি এই রজনীর তিমিরফলকে

প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র-আলোকে

ঘোর যুদ্ধ-ফল। এই শান্ত স্তব্ধ ক্ষণে

অনন্ত আকাশ হতে পশিতেছে মনে

জয়হীন চেষ্টার সংগীত, আশাহীন

কর্মের উদ্যম– হেরিতেছি শান্তিময়

শূন্য পরিণাম। যে পক্ষের পরাজয়

সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান।

জয়ী হোক, রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান–

আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে।

জন্মরাত্রে ফেলে গেছ মোরে ধরাতলে

নামহীন, গৃহহীন– আজিও তেমনি

আমারে নির্মমচিত্তে তেয়াগো জননী

দীপ্তিহীন কীর্তিহীন পরাভব-‘পরে।

শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে

জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,

বীরের সদ্‌গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।

 

১৫ ফাল্গুন, ১৩০৬

***

Karna:

Mother, do not fear.

I say, victory will be the Pandavas’.

Upon the dark backdrop of this night

I can see clearly lit by star light

The fate of the great battle to come. At this serene silent moment

Descends upon my mind from the endless skies

A song that speaks of fruitless effort, of hopeless

Striving – I see the peace that will come at

The empty end. The side that will certainly lose

Do not beseech me to abandon them.

Let them be victorious, let them be kings – your Pandava sons

Let me remain, as ever with those who yield no fruit, nor know success.

You left me to the embrace of the earth on the night of my birth

Without a name or a home to call my own – today as well

Forsake me with a cruel heart, give me up Mother

To the darkness and ignominy of defeat

Simply leave for me this blessing if you may

That lust for victory, for fame and wealth does not sway

This son of yours from the path of the brave, from Truth’s way .

 

15th Phalgun, 1306

দুর্বোধ /Duurbodh/Beyond Understanding

দুর্বোধ

 

অধ্যাপকমশায় বোঝাতে গেলেন নাটকটার অর্থ,

সেটা হয়ে উঠল বোধের অতীত।

আমার সেই নাটকের কথা বলি।–

বইটার নাম “পত্রলেখা’,

নায়ক তার কুশলসেন।

নবনীর কাছে বিদায় নিয়ে সে গেল বিলেতে।

চার বছর পরে ফিরে এসে হবে বিয়ে।

নবনী কাঁদল উপুড় হয়ে বিছানায়,

তার মনে হল, এ যেন চার বছরের মৃতুদণ্ড।

নবনীকে কুশলের প্রয়োজন ছিল না ভালোবাসার পথে,

প্রয়োজন ছিল সুগম করতে বিলাত-যাত্রার পথ।

সে কথা জানত নবনী,

সে পণ করেছিল হৃদয় জয় করবে প্রাণপণ সাধনায়।

কুশল মাঝে মাঝে

রুচিতে বুদ্ধিতে উঁচট খেয়ে ওকে হঠাৎ বলেছে রূঢ় কথা,

ও সয়েছে চুপ করে;

মেনে নিয়েছে নিজেকে অযোগ্য বলে,

ওর নালিশ নিজেরই উপরে।

ভেবেছিল দীনা বলেই একদিন হবে ওর জয়,

ঘাস যেমন দিনে দিনে নেয় ঘিরে কঠোর পাহাড়কে।

এ যেন ছিল ওর ভালোবাসার শিল্পরচনা,

নির্দয় পাথরটাকে ভেঙে ভেঙে রূপ আবাহন করা

ব্যথিত বক্ষের নিরন্তর আঘাতে।

আজ নবনীর সেই দিনরাতের আরাধনার ধন গেল দূরে।

ওর দুঃখের থালাটি ছিল অশ্রু-ভেজা অর্ঘ্যে ভরা,

আজ থেকে দুঃখ রইবে কিন্তু দুঃখের নৈবেদ্য রইবে না।

এখন ওদের সম্বন্ধের পথ রইল

শুধু এ পারে ও পারে চিঠি লেখার সাঁকো বেয়ে।

কিন্তু নবনী তো সাজিয়ে লিখতে জানে না মনের কথা,

ও কেবল যত্নের স্বাদ লাগাতে জানে সেবাতে,

অর্‌কিডের চমক দিয়ে যেতে ফুলদানির ‘পরে

কুশলের চোখের আড়ালে,

গোপনে বিছিয়ে আসতে

নিজের-হাতে-কাজ-করা আসন

যেখানে কুশল পা রাখে।

কুশল ফিরল দেশে,

বিয়ের দিন করল স্থির।

আঙটি এনেছে বিলেত থেকে,

গেল সেটা পরাতে;

গিয়ে দেখে ঠিকানা না রেখেই নবনী নিরুদ্দেশ।

তার ডায়ারিতে আছে লেখা,

“যাকে ভালোবেসেছি সে ছিল অন্য মানুষ,

চিঠিতে যার প্রকাশ, এ তো সে নয়।”

এ দিকে কুশলের বিশ্বাস

তার চিঠিগুলি গদ্যে মেঘদূত,

বিরহীদের চিরসম্পদ।

আজ সে হারিয়েছে প্রিয়াকে,

কিন্তু মন গেল না চিঠিগুলি হারাতে —

ওর মমতাজ পালালো, রইল তাজমহল।

নাম লুকিয়ে ছাপালো চিঠি “উদ্‌ভ্রান্তপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে

নবনীর চরিত্র নিয়ে

বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা হয়েছে বিস্তর।

কেউ বলেছে, বাঙালির মেয়েকে

লেখক এগিয়ে নিয়ে চলেছে

ইবসেনের মুক্তিবাণীর দিকে —

কেউ বলেছে রসাতলে।

অনেকে এসেছে আমার কাছে জিজ্ঞাসা নিয়ে;

আমি বলেছি, ” আমি কী জানি।”

বলেছি, ” শাস্ত্রে বলে, দেবা ন জানন্তি।”

পাঠকবন্ধু বলেছে,

“নারীর প্রসঙ্গে না হয় চুপ করলেম

হতবুদ্ধি দেবতারই মতো,

কিন্তু পুরুষ?

তারও কি অজ্ঞাতবাস চিররহস্যে।

ও মানুষটা হঠাৎ পোষ মানলে কোন্‌ মন্ত্রে।”

আমি বলেছি,

“মেয়েই হোক আর পুরুষই হোক; স্পষ্ট নয় কোনো পক্ষই;

যেটুকু সুখ দেয় বা দুঃখ দেয় স্পষ্ট কেবল সেইটুকুই।

প্রশ্ন কোরো না,

পড়ে দেখো কী বলছে কুশল।”

কুশল বলে, “নবনী চার বছর ছিল দৃষ্টির বাইরে,

যেন নেমে গেল সৃষ্টির বাইরেতেই;

ওর মাধুর্যটুকুই রইল মনে,

আর সব-কিছু হল গৌণ।

সহজ হয়েছে ওকে সুন্দর ছাঁদে চিঠি লিখতে।

অভাব হয়েছে, করেছি দাবি —

ওর ভালোবাসার উপর অবাধ ভরসা

মনকে করেছে রসসিক্ত, করেছে গর্বিত।

প্রত্যেক চিঠিতে আপন ভাষায় ভুলিয়েছি আপনারই মন।

লেখার উত্তাপে ঢালাই করা অলংকার

ওর স্মৃতির মূর্তিটিকে সাজিয়ে তুলেছে দেবীর মতো।

ও হয়েছে নূতন রচনা।

এই জন্যেই খ্রীষ্টান শাস্ত্রে বলে,

সৃষ্টির আদিতে ছিল বাণী।”

পাঠকবন্ধু আবার জিগেস করেছে,

“ও কি সত্যি বললে,

না, এটা নাটকের নায়কগিরি?”

আমি বলেছি, “আমি কী জানি।”

 

 

শান্তিনিকেতন, ৫ জুলাই, ১৯৩৬

***

BEYOND UNDERSTANDING

 

The professor tried to explain the meaning of the play,

And took it beyond the scope of comprehension.

Let me talk about that play of mine.

The story is called ‘Letters to a loved one’,

The main character is Kushal Sen.

He went abroad after bidding farewell to Noboni.

They are to marry once he returns in four years.

Noboni prostrated herself upon her bed and wept,

She felt it was a death sentence prolonged over four years.

Kushal had no need for her love on his journey,

But she had smoothed his path to foreign climes.

She knew it too,

And had pledged to make her place in his heart.

Some times when Kushal

Forgot over both manners and wisdom and uttered a rude word,

She bore it in stoic silence;

Accepting herself to be the lesser,

Blaming herself every time.

She had hoped that she would triumph at the end just as the meek are said to do,

Just as grass takes over the tallest mountain day by day.

This was to be the crowning glory of her love,

To breathe life into heartless stone by chipping away

Endlessly beating her pain against it.

Today the object of her adoration goes far away.

Her offerings were soaked in tears,

From today there will remain pain but no one to see it.

Now their relationship exists

Along a bridge spanned by letters to each other.

But Noboni does not know how to put her words down on paper well,

She only knows how to express herself through solicitous care,

Through the placing of an orchid stem in a vase

While Kushal is unaware,

Or by spreading out on the floor

A mat she has embroidered with her own hands

So that Kushal may walk upon it.

Kushal has returned,

The day is fixed for their marriage to take place.

He has brought the ring from abroad,

He went to place it upon her finger;

but Noboni had left without leaving a forwarding address.

In her diary she had written,

“The one I had loved was someone else,

The one who wrote to me is not the same.”

And yet Kushal had imagined

His letters to be romantic odes in prose,

Eternal favours to the one separated.

Today he has lost his beloved,

But he could not fault his letters for that –

Mumtaz had escaped but he still had the edifice he had painstakingly created.

He published them under an alias as ‘Lost in love’

There has been much discussion

About the character of Noboni.

Some have said, Bengali women

Are being taken by the writer

Towards the creed of independence preached by Ibsen

Some have said they are going to hell.

Many have come to me with questions;

I have said, “What do I know!”

I have said, “The Scriptures say even the gods do not know the ways of women, etcetera.”

The readers have said,

“Let us put the woman aside then

Like a dumbfounded god,

But the man?

Will he be exiled in everlasting mystery as well?

What spells had tamed him in the first place!”

I have said,

“Whether woman or man; it is never very clear;

The only thing apparent is the happiness or sorrow they cause.

Do not ask questions,

Just read what Kushal says.”

Kushal says, “Noboni was out of sight for four years,

She seemed to leave completely;

Simply leaving the sweetness that was hers,

Making everything else secondary.

It has been easy writing beautiful letters to her.

When there was need, I made demands –

My great confidence in her affections

Kept my mind happy, proud in its existence.

With each letter I fooled myself alone with more words.

The warmth of those words shaped themselves

Into gifts that I adorned my memories of her.

She was made anew.

This is why the Christians say,

“At the start of Creation there were words.”

The readers asked again,

“Was that true,

Or is this just the play taking over?”

I said, “What do I know!”

 

 

Santiniketan, 5th July 1936