Archive | June 2013

চোখের বালি ১৪/ Chokher Bali 14

১৪

আশা জিজ্ঞাসা করিল, “সত্য করিয়া বলো, আমার চোখের বালিকে কেমন লাগিল।”

মহেন্দ্র কহিল, “মন্দ নয়।”

আশা অত্যন্ত ক্ষুণ্ন হইয়া কহিল, “তোমার কাউকে আর পছন্দই হয় না।”

মহেন্দ্র। কেবল একটি লোক ছাড়া।

আশা কহিল, “আচ্ছা, ওর সঙ্গে আর-একটু ভালো করিয়া আলাপ হউক, তার পরে বুঝিব, পছন্দ হয় কি না।”

মহেন্দ্র কহিল, “আবার আলাপ! এখন বুঝি বরাবরই এমনি চলিবে।”

আশা কহিল, “ভদ্রতার খাতিরেও তো মানুষের সঙ্গে আলাপ করিতে হয়। একদিন পরিচয়ের পরেই যদি দেখাশুনা বন্ধ কর, তবে চোখের বালি কী মনে করিবে বলো দেখি। তোমার কিন্তু সকলই আশ্চর্য। আর কেউ হইলে অমন মেয়ের সঙ্গে আলাপ করিবার জন্য সাধিয়া বেড়াইত, তোমার যেন একটা মস্ত বিপদ উপস্থিত হইল।”

অন্য লোকের সঙ্গে তাহার এই প্রভেদের কথা শুনিয়া মহেন্দ্র ভারি খুশি হইল। কহিল, “আচ্ছা, বেশ তো। ব্যস্ত হইবার দরকার কী। আমার তো পালাইবারস্থান নাই, তোমার সখীরও পালাইবার তাড়া দেখি না– সুতরাং দেখা মাঝে মাঝে হইবেই, এবং দেখা হইলে ভদ্রতা রক্ষা করিবে, তোমার স্বামীর সেটুকু শিক্ষা আছে।”

মহেন্দ্র মনে স্থির করিয়া রাখিয়াছিল, বিনোদিনী এখন হইতে কোনো-না-কোনো ছুতায় দেখা দিবেই। ভুল বুঝিয়াছিল। বিনোদিনী কাছ দিয়াও যায় না– দৈবাৎ যাতায়াতের পথেও দেখা হয় না।

পাছে কিছুমাত্র ব্যগ্রতা প্রকাশ হয় বলিয়া মহেন্দ্র বিনোদিনীর প্রসঙ্গ স্ত্রীর কাছে উত্থাপন করিতে পারে না। মাঝে মাঝে বিনোদিনীর সঙ্গলাভের জন্য স্বাভাবিক সামান্য ইচ্ছাকেও গোপন ও দমন করিতে গিয়া মহেন্দ্রের ব্যগ্রতা আরো যেন বাড়িয়া উঠিতে থাকে। তাহার পরে বিনোদিনীর ঔদাস্যে তাহাকে আরো উত্তেজিত করিতে থাকিল।

বিনোদিনীর সঙ্গে দেখা হইবার পরদিনে মহেন্দ্র নিতান্তই যেন প্রসঙ্গক্রমে হাস্যচ্ছলে আশাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা, তোমার অযোগ্য এই স্বামীটিকে চোখের বালির কেমন লাগিল।”

প্রশ্ন করিবার পূর্বেই আশার কাছ হইতে এ সম্বন্ধে উচ্ছ্বাসপূর্ণ বিস্তারিত রিপোর্ট পাইবে, মহেন্দ্রের এরূপ দৃঢ় প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেজন্য সবুর করিয়া যখন ফল পাইল না, তখন লীলাচ্ছলে প্রশ্নটা উত্থাপন করিল।

আশা মুশকিলে পড়িল। চোখের বালি কোনো কথাই বলে নাই। তাহাতে আশা সখীর উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়াছিল।

স্বামীকে বলিল, “রোসো, দু-চারি দিন আগে আলাপ হউক, তার পরে তো বলিবে। কাল কতক্ষণেরই বা দেখা, ক’টা কথাই বা হইয়াছিল।”

ইহাতেও মহেন্দ্র কিছু নিরাশ হইল এবং বিনোদিনী সম্বন্ধে নিশ্চেষ্টতা দেখানো তাহার পক্ষে আরো দুরূহ হইল।

এই-সকল আলোচনার মধ্যে বিহারী আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কী মহিনদা, আজ তোমাদের তর্কটা কী লইয়া।”

মহেন্দ্র কহিল, “দেখো তো ভাই, কুমুদিনী না প্রমোদিনী না কার সঙ্গে তোমার বোঠান চুলের দড়ি না মাছের কাঁটা না কী একটা পাতাইয়াছেন, কিন্তু আমাকেও তাই বলিয়া তাঁর সঙ্গে চুরোটের ছাই কিংবা দেশালাইয়ের কাঠি পাতাইতে হইবে, এ হইলে তো বাঁচা যায় না।”

আশার ঘোমটার মধ্যে নীরবে তুমুল কলহ ঘনাইয়া উঠিল। বিহারী ক্ষণকাল নিরুত্তরে মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া হাসিল– কহিল, “বোঠান, লক্ষণ ভালো নয়। এ-সব ভোলাইবার কথা। তোমার চোখের বালিকে আমি দেখিয়াছি। আরো যদি ঘন ঘন দেখিতে পাই, তবে সেটাকে দুর্ঘটনা বলিয়া মনে করিব না, সে আমি শপথ করিয়া বলিতে পারি। কিন্তু মহিনদা যখন এত করিয়া বেকবুল যাইতেছেন তখন বড়ো সন্দেহের কথা।”

মহেন্দ্রের সঙ্গে বিহারীর যে অনেক প্রভেদ, আশা তাহার আর-একটি প্রমাণ পাইল।

হঠাৎ মহেন্দ্রের ফোটোগ্রাফ-অভ্যাসের শখ চাপিল। পূর্বে সে একবার ফোটোগ্রাফি শিখিতে আরম্ভ করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছিল। এখন আবার ক্যামেরা মেরামত করিয়া আরক কিনিয়া ছবি তুলিতে শুরু করিল। বাড়ির চাকর-বেহারাদের পর্যন্ত ছবি তুলিতে লাগিল।

আশা ধরিয়া পড়িল, চোখের বালির একটা ছবি লইতেই হইবে।

মহেন্দ্র অত্যন্ত সংক্ষেপে বলিল, “আচ্ছা।”

চোখের বালি তদপেক্ষা সংক্ষেপে বলিল, “না।”

আশাকে আবার একটা কৌশল করিতে হইল এবং সে কৌশল গোড়া হইতেই বিনোদিনীর অগোচর রহিল না।

মতলব এই হইল, মধ্যাহ্নে আশা তাহাকে নিজের শোবার ঘরে আনিয়া কোনোমতে ঘুম পাড়াইবে এবং মহেন্দ্র সেই অবস্থায় ছবি তুলিয়া অবাধ্য সখীকে উপযুক্তরূপ জব্দ করিবে।

আশ্চর্য এই, বিনোদিনী কোনোদিন দিনের বেলায় ঘুমায় না। কিন্তু আশার ঘরে আসিয়া সেদিন তাহার চোখ ঢুলিয়া পড়িল। গায়ে একখানি লাল শাল দিয়া খোলা জানালার দিকে মুখ করিয়া হাতে মাথা রাখিয়া এমনই সুন্দর ভঙ্গিতে ঘুমাইয়া পড়িল যে মহেন্দ্র কহিল, “ঠিক মনে হইতেছে, যেন ছবি লইবার জন্য ইচ্ছা করিয়াই প্রস্তুত হইয়াছে।”

মহেন্দ্র পা টিপিয়া টিপিয়া ক্যামেরা আনিল। কোন্‌ দিক হইতে ছবি লইলে ভালো হইবে, তাহা স্থির করিবার জন্য বিনোদিনীকে অনেকক্ষণ ধরিয়া নানাদিক হইতে বেশ করিয়া দেখিয়া লইতে হইল। এমন-কি, আর্টের খাতিরে অতি সন্তর্পণে শিয়রের কাছে তাহার খোলা চুল এক জায়গায় একটু সরাইয়া দিতে হইল– পছন্দ না হওয়ায় পুনরায় তাহা সংশোধন করিয়া লইতে হইল। আশাকে কানে কানে কহিল, “পায়ের কাছে শালটা একটুখানি বাঁ দিকে সরাইয়া দাও।”

অপটু আশা কানে কানে কহিল, “আমি ঠিক পারিব না, ঘুম ভাঙাইয়া দিব– তুমি সরাইয়া দাও।”

মহেন্দ্র সরাইয়া দিল।

অবশেষে যেই ছবি লইবার জন্য ক্যামেরার মধ্যে কাচ পুরিয়া দিল, অমনি যেন কিসের শব্দে বিনোদিনী নড়িয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিল। আশা উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল। বিনোদিনী বড়োই রাগ করিল– তাহার জ্যোতির্ময় চক্ষু দুইটি হইতে মহেন্দ্রের প্রতি অগ্নিবাণ বর্ষণ করিয়া কহিল, “ভারি অন্যায়।”

মহেন্দ্র কহিল, “অন্যায়, তাহার আর সন্দেহ নাই। কিন্তু চুরিও করিলাম, অথচ চোরাই মাল ঘরে আসিল না, ইহাতে যে আমার ইহকাল পরকাল দুই গেল! অন্যায়টাকে শেষ করিতে দিয়া তাহার পরে দণ্ড দিবেন।”

আশাও বিনোদিনীকে অত্যন্ত ধরিয়া পড়িল। ছবি লওয়া হইল। কিন্তু প্রথম ছবিটা খারাপ হইয়া গেল। সুতরাং পরের দিন আর-একটা ছবি না লইয়া চিত্রকর ছাড়িল না। তার পরে আবার দুই সখীকে একত্র করিয়া বন্ধুত্বের চিরনিদর্শনস্বরূপ একখানি ছবি তোলার প্রস্তাবে বিনোদিনী “না’ বলিতে পারিল না। কহিল, “কিন্তু এইটেই শেষ ছবি।”

শুনিয়া মহেন্দ্র সে ছবিটাকে নষ্ট করিয়া ফেলিল। এমনি করিয়া ছবি তুলিতে তুলিতে আলাপ পরিচয় বহুদূর অগ্রসর হইয়া গেল।

photo0165

14

Asha asked, ‘Tell me honestly, how did you like my best friend?’

Mahendra conceded, ‘She is not bad.’

Asha was very mortified, ‘You don’t know how to appreciate anyone.’

Mahendra: Except for one person.

Asha said, ‘Well, once you get to know her a bit, I will ask you if you still feel this way about her.’

Mahendra said, ‘Get to know her? Are we to do this thing regularly from now on?’

Asha answered, ‘One meets people if only for the sake of propriety. If you stop seeing her just after a day, what do you think she will think? You are really strange, you know that? If it was any other man, they would be eager to meet a woman like her, and you act as if it is a huge hassle!’

Mahendra was rather excessively pleased to find this difference between him and others. He said, ‘Oh well, there is no hurry then, is there? I have nowhere to run to, your friend too shows no sign of going anywhere soon – so we will meet occasionally, and if we do, I will behave politely, even I know that much!’

Mahendra had assumed that Binodini would now appear before him frequently on the flimsiest of excuses. But he was wrong about her. She completely avoided him; he never saw her while he was leaving home or going about the house.

He could not raise the topic with his wife for fear that of giving away his eagerness to see her friend. Somehow the fact that he felt he had to hide even a natural interest in Binodini’s company seemed to make him want to see her even more. Her disinterest fuelled his desire even more.

The day after he met Binodini, he asked Asha very casually as an aside, ‘So, what did your friend think of this undeserving husband of yours?’

He had firmly expected that Asha would give him a detailed and enthusiastic report on the subject without him asking. But when he waited in vain without hearing from her, he asked the question with a show of nonchalance.

Asha was in a fix. Her friend had actually said nothing. This made Asha very annoyed.

She said to her husband, ‘Wait, once you talk to her a couple more times, she will be able to say something about you. After all, yesterday you met for such a short while, you barely spoke two words to each other!’

Mahendra was a bit disappointed at this; in addition, it had the effect of making it even harder for him to remain ambivalent about Binodini.

Bihari arrived in the midst of this conversation and asked, ‘What are you two arguing about today?’

Mahendra said, ‘Your sister –in-law has established some kind of ‘hair tie’ or ‘herring bone’ relationship with some one called Kumudini or Promodini; but does that mean I will now have to call her endearing names too, like ‘cheroot ash’ or ‘match stick’? This is quite beyond me!’

Asha grew flustered in silent protest behind her veil. Bihari looked at Mahendra for a while without saying anything and then said with a smile, ‘Sister–in–law, this does not bode well. These are all excuses. I have seen your Chokher Bali. I can swear that if I did see her more regularly there is no way I would have considered that a mishap. But I am very suspicious to see that Mahendra is protesting so much.’

This was another proof that Mahendra was very different from everyone else, including Bihari, Asha thought.

Mahendra suddenly developed a keen interest in taking photographs. He had once started to learn photography before but had quickly tired of it. This time he even got his camera fixed and bought the chemicals needed to develop the prints before starting to take photographs of everyone, even the domestic staff at home.

Asha requested Mahendra to take one photograph of Binodini.

Mahendra said in short, ‘Yes.’

Binodini answered with even more economy, ‘No.’

Asha had to think up another plan and this time again Binodini was completely aware of the scheme as soon as Asha thought of it.

The plan was that Asha would entice her to her own bedroom and somehow put her to sleep upon which Mahendra would take a photograph of her and they would have their revenge.

The astonishing thing was that Binodini who never ever took day time naps, came to Asha’s room that very day and fell fast asleep. She slept so prettily, her face turned to the window with her arm framing it, a red shawl wrapped about her that Mahendra said, ‘She looks just as if she was readying herself to be photographed!’

Mahendra tiptoed about, setting up the camera. He had to look at Binodini from various angles for a long time in order to decide on the best aspect from which to take his photo. In fact, purely for the sake of art, he even had to go really close to her to move her flowing hair to one side and then re-adjust it. He then whispered to Asha, ‘Can you move her shawl so that it drapes to the left of her feet?’

Asha who did not trust herself whispered back, ‘I won’t be able to do it without waking her up, you do it!’

So Mahendra moved it.

Eventually just as he inserted a glass plate in the camera, Binodini stirred with a sigh and sat up suddenly at some sound. Asha laughed out aloud. Binodini was furious and her blazing eyes rained reproach on Mahendra saying, ‘This is so wrong!’

Mahendra said, ‘I have behaved very wrongly without doubt. But if I have done anything wrong, I might as well have something to show for that. You can punish me after that if you want to.’

Asha insisted too that Binodini would have to have her photo taken. It was taken. But the first shot was ruined. The photographer insisted on another photo the next day. Binodini could not refuse the offer to have her friendship with Asha caught in another photograph for posterity after that was taken. But she said, ‘This is the very last one!’

Mahendra destroyed the photo when he heard this. In this manner, through frequent photography sessions the two became very familiar with each other.

Advertisements

চার অধ্যায় /Char Adhyay/Four Chapters

চার অধ্যায়
ভূমিকা

ভূমিকা

এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে। তার মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার-বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না। বেহিসাবি মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে তিনি যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, শাসন করতেন অন্যায় করে, সন্দেহ করতেন অকারণে। মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ অবিমিশ্র সত্যকথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়। এজন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সব-চেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা তার স্বভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। তার মার কাছে মনে হয়েছে, এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।

একটা কথা সে বাল্যকাল থেকে বুঝেছে যে, দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন। ওদের পরিবারে যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী ছিল, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্পবয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।

এলার বাপ নরেশ দাশগুপ্ত সাইকলজিতে বিলিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। তীক্ষ্ণ তাঁর বৈজ্ঞানিক বিচারশক্তি, অধ্যাপনায় তিনি বিশেষভাবে যশম্বী। প্রাদেশিক প্রাইভেট কলেজে তিনি স্থান নিয়েছেন যেহেতু সেই প্রদেশে তাঁর জন্ম, সাংসারিক উন্নতির দিকে তাঁর লোভ কম, সে-সম্বন্ধে দক্ষতাও সামান্য। ভুল করে লোককে বিশ্বাস করা ও বিশ্বাস করে নিজের ক্ষতি করা বারবারকার অভিজ্ঞতাতেও তাঁর শোধন হয় নি। ঠকিয়ে কিংবা অনায়াসে যারা উপকার আদায় করে তাদের কৃতঘ্নতা সব-চেয়ে অকরুণ। যখন সেটা প্রকাশ পেত সেটাকে মনস্তত্ত্বের বিশেষ তথ্য বলে মানুষটি অনায়াসে স্বীকার করে নিতেন, মনে বা মুখে নালিশ করতেন না। বিষয়বুদ্ধির ত্রুটি নিয়ে স্ত্রীর কাছে কখনো তিনি ক্ষমা পান নি, খোঁটা খেয়েছেন প্রতিদিন। নালিশের কারণ অতীতকালবর্তী হলেও তাঁর স্ত্রী কখনো ভুলতে পারতেন না, যখন-তখন তীক্ষ্ণ খোঁচায় উসকিয়ে দিয়ে তার দাহকে ঠাণ্ডা হতে দেওয়া অসাধ্য করে তুলতেন। বিশ্বাসপরায়ণ ঔদার্যগুণেই তার বাপকে কেবলই ঠকতে ও দুঃখ পেতে দেখে বাপের উপর এলার ছিল সদাব্যথিত স্নেহ–যেমন সকরুণ স্নেহ মায়ের থাকে অবুঝ বালকের ‘পরে। সব-চেয়ে তাকে আঘাত করত যখন মায়ের কলহের ভাষায় তীব্র ইঙ্গিত থাকত যে, বুদ্ধিবিবেচনায় তিনি তাঁর স্বামীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এলা নানা উপলক্ষ্যে মায়ের কাছে তার বাবার অসম্মান দেখতে পেয়েছে, তা নিয়ে নিষ্ফল আক্রোশে চোখের জলে রাত্রে তার বালিশ গেছে ভিজে। এ-রকম অতিমাত্র ধৈর্য অন্যায় বলে এলা অনেক সময় তার বাবাকে মনে মনে অপরাধী না করে থাকতে পারে নি।

অত্যন্ত পীড়িত হয়ে একদিন এলা বাবাকে বলেছিল, “এ-রকম অন্যায় চুপ করে সহ্য করাই অন্যায়।”

নরেশ বললেন, “স্বভাবের প্রতিবাদ করাও যা আর তপ্ত লোহায় হাত বুলিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করতে যাওয়াও তাই, তাতে বীরত্ব থাকতে পারে কিন্তু আরাম নেই।”

“চুপ করে থাকাতে আরাম আরও কম”– বলে এলা দ্রুত চলে গেল।

এদিকে সংসারে এলা দেখতে পায়, যারা মায়ের মন জুগিয়ে চলবার কৌশল জানে তাদের চক্রান্তে নিষ্ঠুর অন্যায় ঘটে অপরাধহীনের প্রতি। এলা সইতে পারে না, উত্তেজিত হয়ে সত্য প্রমাণ উপস্থিত করে বিচারকর্ত্রীর সামনে। কিন্তু কর্তৃত্বের অহমিকার কাছে অকাট্য যুক্তিই দুঃসহ স্পর্ধা। অনুকূল ঝ’ড়ো হাওয়ার মতো তাতে বিচারের নৌকো এগিয়ে দেয় না, নৌকো দেয় কাত করে।

এই পরিবারে আরও একটি উপসর্গ ছিল যা এলার মনকে নিয়ত আঘাত করেছে। সে তার মায়ের শুচিবায়ু। একদিন কোনো মুসলমান অভ্যাগতকে বসবার জন্যে এলা মাদুর পেতে দিয়েছিল– সে মাদুর মা ফেলে দিলেন, গালচে দিলে দোষ হত না। এলার তার্কিক মন, তর্ক না করে থাকতে পারে না। বাবাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা এই সব ছোঁয়াছুঁয়ি নাওয়াখাওয়া নিয়ে কটকেনা মেয়েদেরই কেন এত পেয়ে বসে? এতে হৃদয়ের তো স্থান নেই, বরং বিরুদ্ধতা আছে; এ তো কেবল যন্ত্রের মতো অন্ধভাবে মেনে চলা।” সাইকলজিস্ট বাবা বললেন, “মেয়েদের হাজার বছরের হাতকড়ি-লাগানো মন; তারা মানবে, প্রশ্ন করবে না,–এইটেতেই সমাজ-মনিবের কাছে বকশিশ পেয়েছে, সেইজন্যে মানাটা যত অন্ধ হয় তার দাম তাদের কাছে তত বড়ো হয়ে ওঠে। মেয়েলি পুরুষদেরও এই দশা।” আচারের নিরর্থকতা সম্বন্ধে এলা বারবার মাকে প্রশ্ন না করে থাকতে পারে নি, বারবার তার উত্তর পেয়েছে ভর্ৎসনায়। নিয়ত এই ধাক্কায় এলার মন অবাধ্যতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

নরেশ দেখলেন পরিবারিক এই সব দ্বন্দ্বে মেয়ের শরীর খারাপ হয়ে উঠেছে, সেটা তাঁকে অত্যন্ত বাজল। এমন সময় একদিন এলা একটা বিশেষ অবিচারে কঠোরভাবে আহত হয়ে নরেশের কাছে এসে জানাল, “বাবা, আমাকে কলকাতায় বোর্ডিঙে পাঠাও। প্রস্তাবটা তাদের দুজনের পক্ষেই দুঃখকর, কিন্তু বাপ অবস্থা বুঝলেন, এবং মায়াময়ীর দিক থেকে প্রতিকূল ঝঞ্ঝাঘাতের মধ্যেও এলাকে পাঠিয়ে দিলেন দূরে। আপন নিষ্করুণ সংসারে নিমগ্ন হয়ে রইলেন অধ্যয়ন-অধ্যাপনায়।

মা বললেন, “শহরে পাঠিয়ে মেয়েকে মেমসাহেব বানাতে চাও তো বানাও কিন্তু ওই তোমার আদুরে মেয়েকে প্রাণান্ত ভুগতে হবে শ্বশুরঘর করবার দিনে। তখন আমাকে দোষ দিয়ো না।” মেয়ের ব্যবহারে কলিকালোচিত স্বাতন্ত্র৻ের দুর্লক্ষণ দেখে এই আশঙ্কা তার মা বারবার প্রকাশ করেছেন। এলা তার ভাবী শাশুড়ীর হাড় জ্বালাতন করবে সেই সম্ভাবনা নিশ্চিত জেনে সেই কাল্পনিক গৃহিণীর প্রতি তাঁর অনুকম্পা মুখর হয়ে উঠত। এর থেকে মেয়ের মনে ধারণা দৃঢ় হয়েছিল যে, বিয়ের জন্যে মেয়েদের প্রস্তুত হতে হয় আত্মসম্মানকে পঙ্গু করে, ন্যায়-অন্যায়বোধকে অসাড় করে দিয়ে।

এলা যখন ম্যাট্‌রিক পার হয়ে কলেজে প্রবেশ করেছে তখন মায়ের মৃত্যু হল। নরেশ মাঝে মাঝে বিয়ের প্রস্তাবে মেয়েকে রাজি করতে চেষ্টা করেছেন। এলা অপূর্ব-সুন্দরী, পাত্রের তরফে প্রার্থীর অভাব ছিল না, কিন্তু বিবাহের প্রতি বিমুখতা তার সংস্কারগত। মেয়ে পরীক্ষাগুলো পাস করলে, তাকে অবিবাহিত রেখেই বাপ গেলেন মারা।

সুরেশ ছিল তাঁর কনিষ্ঠ ভাই। নরেশ এই ভাইকে মানুষ করেছেন, শেষ পর্যন্ত পড়িয়েছেন খরচ দিয়ে। দু-বছরের মতো তাঁকে বিলেতে পাঠিয়ে স্ত্রীর কাছে লাঞ্ছিত এবং মহাজনের কাছে ঋণী হয়েছেন। সুরেশ এখন ডাকবিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। কর্ম উপলক্ষ্যে ঘুরতে হয় নানা প্রদেশে। তাঁরই উপর পড়ল এলার ভার। একান্ত যত্ন করেই ভার নিলেন।

সুরেশের স্ত্রীর নাম মাধবী। তিনি যে-পরিবারের মেয়ে সে-পরিবারে স্ত্রীলোকদের পরিমিত পড়াশুনোই ছিল প্রচলিত; তার পরিমাণ মাঝারি মাপের চেয়ে কম বই বেশি নয়। স্বামী বিলেত থেকে ফিরে এসে উচ্চপদ নিয়ে দূরে দূরে যখন ঘুরতেন তখন তাঁকে বাইরের নানা লোকের সঙ্গে সামাজিকতা করতে হত। কিছুদিন অভ্যাসের পরে মাধবী নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণে বিজাতীয় লৌকিকতা পালন করতে অভ্যস্ত হয়েছিলেন। এমন-কি, গোরাদের ক্লাবে ও পঙ্গু ইংরেজি ভাষাকে সকারণ ও অকারণ হাসির দ্বারা পূরণ করে কাজ চালিয়ে আসতে পারতেন।

এমন সময় সুরেশ কোনো প্রদেশের বড়ো শহরে যখন আছেন এলা এল তাঁর ঘরে; রূপে গুণে বিদ্যায় কাকার মনে গর্ব জাগিয়ে তুললে। ওঁর উপরিওআলা বা সহকর্মী এবং দেশী ও বিলিতি আলাপী-পরিচিতদের কাছে নানা উপলক্ষ্যে এলাকে প্রকাশিত করবার জন্যে তিনি ব্যগ্র হয়ে উঠলেন। এলার স্ত্রীবুদ্ধিতে বুঝতে বাকি রইল না যে, এর ফল ভালো হচ্ছে না। মাধবী মিথ্যা আরামের ভান করে ক্ষণে ক্ষণে বলতে লাগলেন, “বাঁচা গেল– বিলিতি কায়দার সামাজিকতার দায় আমার ঘাড়ে চাপানো কেন বাপু। আমার না আছে বিদ্যে, না আছে বুদ্ধি।” ভাবগতিক দেখে এলা নিজের চারিদিকে প্রায় একটা জেনানা খাড়া করে তুললে। সুরেশের মেয়ে সুরমার পড়াবার ভার সে অতিরিক্ত উৎসাহের সঙ্গে নিলে। একটা থীসিস লিখতে লাগিয়ে দিলে তার বাকি সময়টুকু। বিষয়টা বাংলা মঙ্গলকাব্য ও চসারের কাব্যের তুলনা। এই নিয়ে সুরেশ মহা উৎসাহিত। এই সংবাদটা চারদিকে প্রচার করে দিলেন। মাধবী মুখ বাঁকা করে বললেন, “বাড়াবাড়ি।”

স্বামীকে বললেন, “এলার কাছে ফস করে মেয়েকে পড়তে দিলে! কেন, অধর মাস্টার কী দোষ করেছে? যাই বল না আমি কিন্তু–”

সুরেশ অবাক হয়ে বললেন, “কী বল তুমি! এলার সঙ্গে অধরের তুলনা!”

“দুটো নোটবই মুখস্থ করে পাস করলেই বিদ্যে হয় না,”– বলে ঘাড় বেঁকিয়ে গৃহিণী ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন।

একটা কথা স্বামীকে বলতেও তাঁর মুখে বাধে–“সুরমার বয়স তেরো পেরোতে চলল, আজ বাদে কাল পাত্র খুঁজতে দেশ ঝেঁটিয়ে বেড়াতে হবে, তখন এলা সুরমার কাছে থাকলে– ছেলেগুলোর চোখে যে ফ্যাঁকাসে কটা রঙের নেশা– ওরা কি জানে কাকে বলে সুন্দর?” দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন আর ভাবেন, এ-সব কর্তাকে জানিয়ে ফল নেই, পুরুষরা যে সংসার-কানা।

যত শীঘ্র হয় এলার বিয়ে হয়ে যাক এই চেষ্টায় উঠে পড়ে লাগলেন গৃহিণী। বেশি চেষ্টা করতে হয় না, ভালো ভালো পাত্র আপনি এসে জোটে– এমন সব পাত্র, সুরমার সঙ্গে যাদের সম্বন্ধ ঘটাবার জন্য মাধবী লুব্ধ হয়ে ওঠেন। অথচ এলা তাদের বারে বারে নিরাশ করে ফিরিয়ে দেয়।

ভাইঝির একগুঁয়ে অবিবেচনায় উদ্বিগ্ন হলেন সুরেশ, কাকী হলেন অত্যন্ত অসহিষ্ণু। তিনি জানেন সৎপাত্রকে উপেক্ষা করা সমর্থবয়সের বাঙালি মেয়ের পক্ষে অপরাধ। নানারকম বয়সোচিত দুর্যোগের আশঙ্কা করতে লাগলেন, এবং দায়িত্ববোধে অভিভূত হল তাঁর অন্তঃকরণ। এলা স্পষ্টই বুঝতে পারলে যে, সে তার কাকার স্নেহের সঙ্গে কাকার সংসারের দ্বন্দ্ব ঘটাতে বসেছে।

এমন সময় ইন্দ্রনাথ এলেন সেই শহরে। দেশের ছাত্রেরা তাঁকে মানত রাজচক্রবর্তীর মতো। অসাধারণ তাঁর তেজ, আর বিদ্যার খ্যাতিও প্রভূত। একদিন সুরেশের ওখানে তাঁর নিমন্ত্রণ। সেদিন কোনো এক সুযোগে এলা অপরিচয়সত্ত্বেও অসংকোচে তাঁর কাছে এসে বললে “আমাকে আপনার কোনো একটা কাজ দিতে পারেন না?”

আজকালকার দিনে এ-রকম আবেদন বিশেষ আশ্চর্যের নয় কিন্তু তবু মেয়েটির দীপ্তি দেখে চমক লাগল ইন্দ্রনাথের। তিনি বললেন, “কলকাতায় সম্প্রতি নারায়ণী হাই স্কুল মেয়েদের জন্যে খোলা হয়েছে। তোমাকে তার কর্ত্রীপদ দিতে পারি, প্রস্তুত আছ?”

“প্রস্তুত আছি যদি আমাকে বিশ্বাস করেন।”

ইন্দ্রনাথ এলার মুখের দিকে তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টি রেখে বললেন, “আমি লোক চিনি। তোমাকে বিশ্বাস করতে আমার মুহূর্তকাল বিলম্ব হয় নি। তোমাকে দেখবামাত্রই মনে হয়েছে, তুমি নবযুগের দূতী, নবযুগের আহ্বান তোমার মধ্যে!”

হঠাৎ ইন্দ্রনাথের মুখে এমন কথা শুনে এলার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল।

সে বললে, “আপনার কথায় আমার ভয় হয়। ভুল করে আমাকে বাড়াবেন না। আপনার ধারণার যোগ্য হবার জন্যে দুঃসাধ্য চেষ্টা করতে গেলে ভেঙে পড়ব। আমার শক্তির সীমার মধ্যে যতটা পারি বাঁচিয়ে চলব আপনার আদর্শ, কিন্তু ভান করতে পারব না।”

ইন্দ্রনাথ বললেন, “সংসারের বন্ধনে কোনোদিন বদ্ধ হবে না এই প্রতিজ্ঞা তোমাকে স্বীকার করতে হবে। তুমি সমাজের নও তুমি দেশের।”

এলা মাথা তুলে বললে “এই প্রতিজ্ঞাই আমার।”

কাকা গমনোদ্যত এলাকে বললেন “তোকে আর কোনোদিন বিয়ের কথা বলব না। তুই আমার কাছেই থাক্‌। এখানেই পাড়ার মেয়েদের পড়াবার ভার নিয়ে একটা ছোটোখাটো ক্লাস খুললে দোষ কী।”

কাকী স্নেহার্দ্র স্বামীর অবিবেচনায় বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওর বয়স হয়েছে, ও নিজের দায় নিজেই নিতে চায়, সে ভালোই তো। তুমি কেন বাধা দিতে যাও মাঝের থেকে। তুমি যা-ই মনে কর না কেন, আমি বলে রাখছি ওর ভাবনা আমি ভাবতে পারব না।”

এলা খুব জোর করেই বললে, “আমি কাজ পেয়েছি, কাজ করতেই যাব।”

এলা কাজ করতেই গেল।

Four Chapters
The introduction

Ela remembers that the beginnings of her life were enveloped in opposition. Her mother Mayamoyee was obsessive by nature, her behavior refusing to take any path dictated by logical thinking. She would throw her family into despair with the ups and downs of the inconsiderate ranting of her illogical nature, she would discipline unjustly and suspect for no reason at all. When her daughter refused to admit to doing something wrong, she would suddenly say, ‘You are lying!’ And yet being completely truthful was one of the characteristics of the girl for which she was punished the most. Her nature grew antagonistic to every kind of injustice. To her mother, it was this very characteristic in her daughter that seemed to go against all the tenets of femininity.

One thing she had observed since childhood was that weakness was the chief spur to oppression. The people who lived as dependents in their family were the ones who poisoned the air at home, encircled as they were within the confines of abuse and benevolence of others; they were the ones who fed her mother’s blind need to oppress without opposition. Her mind revolted against this unhealthy atomosphere and craved freedom more than anything else.

Ela’s father Naresh Dasgupta had a degree in psychology from a foreign university. His powers of scientific analysis were brilliant and he was famous as a teacher. He had taken a position in a private provincial college as he had been born in the province; he paid little attention to his own advancement and knew even less about how to achieve it. Even after being tricked by people repeatedly after trusting them he was still able to trust his fellow men. The ingratitude of those who obtain favours by trickery or with ease is the most unforgiving and cruel. When he was faced with this, he never thought to question the justice of the behavior, preferring instead to explain it as a typical psychological phenomenon. His wife never forgave him for his lack of sense when it came to financial acumen and railed against him daily. Even though the events had happened in the past she was unable to forget them and her sudden barbed comments did nothing to sooth the torment they caused him. Ela was filled with sympathy and love for her father as she saw him betrayed and hurt again and again – the kind of love felt by a mother for an innocent child. She felt worst of all when her mother spitefully alluded in the course of her tirades that she was wiser than her husband. Ela saw many examples of her mother’s disrespect for her father and shed tears in helpless anger at night when she was alone. She could not help blaming her father for the great harm he did by displaying such excessive patience with his wife.

Greatly hurt, she said to her father one day, ‘Putting up with this behavior in silence is just as wrong as the behavior itself.’

Naresh said, ‘Protesting against someone’s nature is like trying to cool heated metal by stroking it, the action might be brave but there is little comfort to be gained from either.’

‘Putting up with it in silence is far less useful,’ Ela said as she walked away.

She had noticed that the people who were good at placating her mother also conspired against those who had done nothing wrong to ensure they were treated cruelly. Ela could not bear this and would often present proof to the contrary to her mother. But irrefutable reason is always seen as unbearable insolence by the superior blinded by pride. It never advances the ship of justice like a fair wind should, but topples it instead.

There was another negative aspect to her family life which hurt Ela’s sensibilities daily. Her mother was obsessive about caste. One day Ela had spread out a grass mat for a Muslim guest; after he left, her mother threw it out, but Ela knew for certain that if she had asked him to sit on the carpet, there would have been no question of disposing of it. Ela’s nature would not be satisfied without questioning things. She asked her father one day, ‘Why do all these rules and restrictions about touching things and bathing if one does touch inappropriate things always seem to apply to women? These do not speak of the kindness of the soul; infact they go against it; there is a sense of blindly adhering in a mechanical way.’ Her psychologist father answered, ‘Women have minds that have been shackled for a thousand years; they follow, they do not question, and this is the very behavior that is rewarded by society, the more unquestioning and blind their submission, the more prized they are by society. Effeminate men have the same problem.’ Ela could not desist from questioning her mother repeatedly about the futility of her rules, but she was always answered with rebukes. This constant sniping was gradually making her grow argumentative.

Naresh noticed that Ela was affected by the discord around her; this was a source of great pain to him. One day Ela came to him after a particularly harsh and unnecessary episode and said, ‘Father, send me away to a boarding school in Kolkata.’ The idea was distressing for both but her father understood and even though Mayamoyee presented many objections to it, Ela was sent away while he remained, immersed in his studies and his teaching in his unhappy household.

Mayamoyee observed, ‘If you want to make your daughter into one of those fancy Westernised types then do so, but your darling will suffer when the day comes for her to live with another family. Do not blame me then!’ She had often expressed her views about her daughter’s desire for independence being a sign of the ill fated times and voiced great sympathy for Ela’s future mother – in – law, a woman who would have to put up with all manner of misbehavior in the near future. This had enforced an idea in Ela’s mind that women prepared for marriage by blunting all sense of self respect and numbing every understanding of what was right and what was wrong.

Her mother passed away when Ela had entered college after finishing her matriculation. Naresh tried to get Ela to agree to proposals of marriage every now and then. Ela was extremely beautiful and there was no shortage of prospective grooms but she was completely averse to the idea of marriage. As a consequence when she finished all her examinations her father passed away too, leaving her unwed.

Suresh was his younger brother. Naresh had helped to raise this sibling and had even paid for his studies. He had suffered many barbs from his wife and had even incurred debts after sending Suresh abroad for two years. Suresh was now employed in a high post in the Postal Department. He had to tour various areas as part of his job. He became Ela’s guardian, a responsibility he accepted with great joy.

His wife was Madhabi. She came from the sort of family where women were required to be educated to a certain degree and not a great deal by any means. When her husband took up his position and had to engage socially with various people, Madhabi managed to pick up foreign pleasantries and mannerisms with ease. She was even able to make do in the British clubs with a smattering of rudimentary English which she disguised by laughing often, with or without reason.

Ela came to their household when Suresh was posted in one of the larger provincial towns; her beauty, her brains and her qualities made him proud of her. He was eager to show her off on various occasions to his superiors and colleagues and to the foreigners he knew. Ela’s feminine intuition told her little good would come of this. Madhabi feigned relief and said, ‘Thank God! Why place the responsibility of these complex social interactions on me? I am neither able nor educated enough!’ Ela understood what was really being said and she put up various restrictions around herself. She took on the duty of guiding Suresh’s daughter, her cousin Surama, with an enthusiasm that was far in excess of the task. She devoted the rest of her time to writing a thesis. The topic was a comparison between the Mangal literature of Bengal and Chaucer’s poetry. Suresh was very interested in this. He spread the news around. Madhabi smirked and said, ‘What next!’

She said to her husband, ‘Why are you letting Ela take on responsibility for Surama? What is she doing that Adhar Master did not do? I don’t think that..’
Suresh said with astonishment, ‘What are you saying? How can you compare Ela with Adhar!’
‘One does not become educated just by learning a couple of notebooks by heart!’ Madhabi said, before leaving the room with a flounce.

Even so she stopped short of saying to Suresh, ‘Your daughter is thirteen. If Ela is still around when you start thinking of her marriage, and the way all these men want pale skinned women, will anyone look at Surama at all? What do they know of beauty?’ She would sigh deeply and think there was little point in telling her husband these things; men were so blind when it came to life.

She stepped up her efforts to organize Ela’s marriage quickly. There was hardly any need to do much as good matches seemed to turn up easily, men that Madhabi would have dearly loved to see wed to her own daughter Surama. And yet, Ela refused them all.

Suresh was worried by this obstinate lack of judgment in his niece while her aunt became very impatient. She knew that dismissing good prospective husbands was a crime for Bengali women of marriageable age. She worried about various possible disasters that were sure to occur given Ela’s age and her heart was overwhelmed with a sense of responsibility. Ela clearly saw that her uncle’s affection for her would soon be at loggerheads with the happiness of his family.

Around this time, Indranath came to the town. The students of the country used to revere him as a true leader. He was extraordinarily brilliant and widely respected for his learning. One day when he was invited to Suresh’s house, Ela came up to him and despite their complete lack of familiarity with each other said to him, ‘Can you not get me a job?’
Even though this is not a request completely unheard of these days, Indranath was startled by the strength of conviction that seemed to shine from Ela. He said, ‘A new high school for girls has been started in Kolkata, Narayani High. I can give you a position as the headmistress there, are you ready to take that on?’
‘I am ready if you are willing to believe in me.’

Indranath looked at Ela with his piercing eyes and said, ‘I know people. It did not take me a minute to believe in you. As soon as I saw you I felt you were a messenger of the new age, you will be able to spread the word!’

Ela trembled when she heard this.

She said, ‘Your words make me afraid. Do not make me out to be any better than I am. If I have to attempt more than I am capable of in order to be worthy of your trust, I will fail. I will do only what I can, but I will not give you false hope.’

‘You must promise never to submit to the bonds of family life. You are not just you, you belong to the nation.’

Ela raised her head and said, ‘This is my pledge, today and always.’

Her uncle said to Ela as she prepared to leave them, ‘I will never say anything to you ever again about getting married. Please stay with me. What harm is there in opening a class for the local girls here?’

Annoyed at her husband’s affectionate and ill thought out interference, his wife said ‘She is old enough! If she wants to be responsible for her own well being, let her be! Why are you stopping her? I don’t care what you might think, I have no desire to be responsible for her.’

Ela said, ‘I have found a job, I will have to go and work.’

And so she did, she went away to work.

চোখের বালি ১৩/Chokher Bali 13

১৩

বিনোদিনী যখন নিতান্তই ধরা দিল না তখন আশার মাথায় একটা ফন্দি আসিল। সে বিনোদিনীকে কহিল, “ভাই বালি, তুমি আমার স্বামীর সম্মুখে বাহির হও না কেন। পলাইয়া বেড়াও কী জন্য।”

বিনোদিনী অতি সংক্ষেপে এবং সতেজে উত্তর করিল, “ছি ছি।”

আশা কহিল, “কেন। মার কাছে শুনিয়াছি, তুমি তো আমাদের পর নও।”

বিনোদিনী গম্ভীরমুখে কহিল, “সংসারে আপন-পর কেহই নাই। যে আপন মনে করে সেই আপন– যে পর বলিয়া জানে, সে আপন হইলেও পর।”

আশা মনে মনে ভাবিল, এ কথার আর উত্তর নাই। বাস্তবিকই তাহার স্বামী বিনোদিনীর প্রতি অন্যায় করেন, বাস্তবিকই তাহাকে পর ভাবেন এবং তাহার প্রতি অকারণে বিরক্ত হন।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আশা স্বামীকে অত্যন্ত আবদার করিয়া ধরিল, “আমার চোখের বালির সঙ্গে তোমাকে আলাপ করিতে হইবে।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “তোমার সাহস তো কম নয়।”

আশা জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, ভয় কিসের।”

মহেন্দ্র। তোমার সখীর যেরকম রূপের বর্ণনা কর, সে তো বড়ো নিরাপদ জায়গা নয়!

আশা কহিল, “আচ্ছা, সে আমি সামলাইতে পারিব। তুমি ঠাট্টা রাখিয়া দাও– তার সঙ্গে আলাপ করিবে কি না বলো।”

বিনোদিনীকে দেখিবে বলিয়া মহেন্দ্রের যে কৌতূহল ছিল না, তাহা নহে। এমনকি, আজকাল তাহাকে দেখিবার জন্য মাঝে মাঝে আগ্রহও জন্মে। সেই অনাবশ্যক আগ্রহটা তাহার নিজের কাছে উচিত বলিয়া ঠেকে নাই।

হৃদয়ের সম্পর্ক সম্বন্ধে মহেন্দ্রের উচিত-অনুচিতের আদর্শ সাধারণের অপেক্ষা কিছু কড়া। পাছে মাতার অধিকার লেশমাত্র ক্ষুণ্ন হয়, এইজন্য ইতিপূর্বে সে বিবাহের প্রসঙ্গমাত্র কানে আনিত না। আজকাল, আশার সহিত সম্বন্ধকে সে এমনভাবে রক্ষা করিতে চায় যে, অন্য স্ত্রীলোকের প্রতি সামান্য কৌতূহলকেও সে মনে স্থান দিতে চায় না। প্রেমের বিষয়ে সে যে বড়ো খুঁতখুঁতে এবং অত্যন্ত খাঁটি, এই লইয়া তাহার মনে একটা গর্ব ছিল। এমন কি, বিহারীকে সে বন্ধু বলিত বলিয়া অন্য কাহাকেও বন্ধু বলিয়া স্বীকার করিতেই চাহিত না। অন্য কেহ যদি তাহার নিকট আকৃষ্ট হইয়া আসিত, তবে মহেন্দ্র যেন তাহাকে গায়ে পড়িয়া উপেক্ষা দেখাইত, এবং বিহারীর নিকটে সেই হতভাগ্য সম্বন্ধে উপহাসতীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়া ইতরসাধারণের প্রতি নিজের একান্ত ঔদাসীন্য ঘোষণা করিত। বিহারী ইহাতে আপত্তি করিলে মহেন্দ্র বলিত, “তুমি পার বিহারী, যেখানে যাও তোমার বন্ধুর অভাব হয় না; আমি কিন্তু যাকে-তাকে বন্ধু বলিয়া টানাটানি করিতে পারি না।”

সেই মহেন্দ্রের মন আজকাল যখন মাঝে মাঝে অনিবার্য ব্যগ্রতা ও কৌতূহলের সহিত এই অপরিচিতার প্রতি আপনি ধাবিত হইতে থাকিত তখন সে নিজের আদর্শের কাছে যেন খাটো হইয়া পড়িত। অবশেষে বিরক্ত হইয়া বিনোদিনীকে বাটী হইতে বিদায় করিয়া দিবার জন্য সে তাহার মাকে পীড়াপীড়ি করিতে আরম্ভ করিল।

মহেন্দ্র কহিল, “থাক্‌ চুনি। তোমার চোখের বালির সঙ্গে আলাপ করিবার সময় কই। পড়িবার সময় ডাক্তারি বই পড়িব, অবকাশের সময় তুমি আছ, ইহার মধ্যে সখীকে কোথায় আনিবে।”

আশা কহিল, “আচ্ছা, তোমার ডাক্তারিতে ভাগ বসাইব না, আমারই অংশ আমি বালিকে দিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমি তো দিবে, আমি দিতে দিব কেন।”

আশা যে বিনোদিনীকে ভালোবাসিতে পারে, মহেন্দ্র বলে, ইহাতে তাহার স্বামীর প্রতি প্রেমের খর্বতা প্রতিপন্ন হয়। মহেন্দ্র অহংকার করিয়া বলিত, “আমার মতো অনন্যনিষ্ঠ প্রেম তোমার নহে।” আশা তাহা কিছুতেই মানিত না– ইহা লইয়া ঝগড়া করিত, কাঁদিত, কিন্তু তর্কে জিতিতে পারিত না।

মহেন্দ্র তাহাদের দুজনের মাঝখানে বিনোদিনীকে সূচ্যগ্র স্থান ছাড়িয়া দিতে চায় না, ইহাই তাহার গর্বের বিষয় হইয়া উঠিল। মহেন্দ্রের এই গর্ব আশার সহ্য হইত না, কিন্তু আজ সে পরাভব স্বীকার করিয়া কহিল, “আচ্ছা, বেশ, আমার খাতিরেই তুমি আমার বালির সঙ্গে আলাপ করো।”

আশায় নিকট মহেন্দ্র নিজের ভালোবাসার দৃঢ়তা ও শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করিয়া অবশেষে বিনোদিনীর সঙ্গে আলাপ করিবার জন্য অনুগ্রহপূর্বক রাজি হইল। বলিয়া রাখিল, “কিন্তু তাই বলিয়া যখন-তখন উৎপাত করিলে বাঁচিব না।”

পরদিন প্রত্যুষে বিনোদিনীকে আশা তাহার বিছানায় গিয়া জড়াইয়া ধরিল। বিনোদিনী কহিল, “এ কী আশ্চর্য। চকোরী যে আজ চাঁদকে ছাড়িয়া মেঘের দরবারে!”

আশা কহিল, “তোমাদের ও-সব কবিতার কথা আমার আসে না ভাই, কেন বেনাবনে মুক্ত ছড়ানো। যে তোমার কথার জবাব দিতে পারিবে, একবার তাহার কাছে কথা শোনাও’সে।”

বিনোদিনী কহিল, “সে রসিক লোকটি কে।”

আশা কহিল, “তোমার দেবর, আমার স্বামী। না ভাই, ঠাট্টা নয়– তিনি তোমার সঙ্গে আলাপ করিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতেছেন।”

বিনোদিনী মনে মনে কহিল, “স্ত্রীর হুকুমে আমার প্রতি তলব পড়িয়াছে, আমি অমনি ছুটিয়া যাইব, আমাকে তেমন পাও নাই।’

বিনোদিনী কোনোমতেই রাজি হইল না। আশা তখন স্বামীর কাছে বড়ো অপ্রতিভ হইল।

মহেন্দ্র মনে মনে বড়ো রাগ করিল। তাহার কাছে বাহির হইতে আপত্তি! তাহাকে অন্য সাধারণ পুরুষের মতো জ্ঞান করা! আর কেহ হইলে তো এতদিনে অগ্রসর হইয়া নানা কৌশলে বিনোদিনীর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ আলাপ-পরিচয় করিত। মহেন্দ্র যে তাহার চেষ্টামাত্রও করে নাই, ইহাতেই কি বিনোদিনী তাহার পরিচয় পায় নাই। বিনোদিনী যদি একবার ভালো করিয়া জানে, তবে অন্য পুরুষ এবং মহেন্দ্রের প্রভেদ বুঝিতে পারে।

বিনোদিনীও দুদিন পূর্বে আক্রোশের সহিত মনে মনে বলিয়াছিল, “এতকাল বাড়িতে আছি, মহেন্দ্র যে একবার আমাকে দেখিবার চেষ্টাও করে না। যখন পিসিমার ঘরে থাকি তখন কোনো ছুতা করিয়াও যে মার ঘরে আসে না। এত ঔদাসীন্য কিসের। আমি কি জড়পদার্থ। আমি কি মানুষ না। আমি কি স্ত্রীলোক নই। একবার যদি আমার পরিচয় পাইত, তবে আদরের চুনির সঙ্গে বিনোদিনীর প্রভেদ বুঝিতে পারিত।’

আশা স্বামীর কাছে প্রস্তাব করিল, “তুমি কালেজে গেছ বলিয়া চোখের বালিকে আমাদের ঘরে আনিব, তাহার পরে বাহির হইতে তুমি হঠাৎ আসিয়া পড়িবে– তা হইলেই সে জব্দ হইবে।”

মহেন্দ্র কহিল, “কী অপরাধে তাহাকে এতবড়ো কঠিন শাসনের আয়োজন।”

আশা কহিল, “না সত্যই আমার ভারি রাগ হইয়াছে। তোমার সঙ্গে দেখা করিতেও তার আপত্তি! প্রতিজ্ঞা ভাঙিব তবে ছাড়িব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার প্রিয়সখীর দর্শনাভাবে আমি মরিয়া যাইতেছি না। আমি অমন চুরি করিয়া দেখা করিতে চাই না।”

আশা সানুনয়ে মহেন্দ্রের হাত ধরিয়া কহিল, “মাথা খাও, একটিবার তোমাকে এ কাজ করিতেই হইবে। একবার যে করিয়া হোক তাহার গুমর ভাঙিতে চাই, তার পর তোমাদের যেমন ইচ্ছা তাই করিয়ো।”

মহেন্দ্র নিরুত্তর হইয়া রহিল। আশা কহিল, “লক্ষ্মীটি, আমার অনুরোধ রাখো।”

মহেন্দ্রের আগ্রহ প্রবল হইয়া উঠিতেছিল– সেইজন্য অতিরিক্ত মাত্রায় ঔদাসীন্য প্রকাশ করিয়া সম্মতি দিল।

শরৎকালের স্বচ্ছ নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে বিনোদিনী মহেন্দ্রের নির্জন শয়নগৃহে বসিয়া আশাকে কার্পেটের জুতা বুনিতে শিখাইতেছিল। আশা অন্যমনস্ক হইয়া ঘন ঘন দ্বারের দিকে চাহিয়া গণনায় ভুল করিয়া বিনোদিনীর নিকট নিজের অসাধ্য অপটুত্ব প্রকাশ করিতেছিল।

অবশেষে বিনোদিনী বিরক্ত হইয়া তাহার হাত হইতে কার্পেট টান মারিয়া ফেলিয়া দিয়া কহিল, “ও তোমার হইবে না, আমার কাজ আছে আমি যাই।”

আশা কহিল, “আর একটু বোসো, এবার দেখো, আমি ভুল করিব না।” বলিয়া আবার সেলাই লইয়া পড়িল।

ইতিমধ্যে নিঃশব্দপদে বিনোদিনীর পশ্চাতে দ্বারের নিকট মহেন্দ্র আসিয়া দাঁড়াইল। আশা সেলাই হইতে মুখ না তুলিয়া আস্তে আস্তে হাসিতে লাগিল।

বিনোদিনী কহিল, “হঠাৎ হাসির কথা কী মনে পড়িল।” আশা আর থাকিতে পারিল না। উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিয়া কার্পেট বিনোদিনীর গায়ের উপরে ফেলিয়া দিয়া কহিল, “না ভাই, ঠিক বলিয়াছ– ও আমার হইবে না”–বলিয়া বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া দ্বিগুণ হাসিতে লাগিল।

প্রথম হইতেই বিনোদিনী সব বুঝিয়াছিল। আশার চাঞ্চল্যে এবং ভাবভঙ্গিতে তাহার নিকট কিছুই গোপন ছিল না। কখন মহেন্দ্র পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহাও সে বেশ জানিতে পারিয়াছিল। নিতান্ত সরল নিরীহের মতো সে আশার এই অত্যন্ত ক্ষীণ ফাঁদের মধ্যে ধরা দিল।

মহেন্দ্র ঘরে ঢুকিয়া কহিল, “হাসির কারণ হইতে আমি হতভাগ্য কেন বঞ্চিত হই।”

বিনোদিনী চমকিয়া মাথায় কাপড় টানিয়া উঠিবার উপক্রম করিল। আশা তাহার হাত চাপিয়া ধরিল।

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “হয় আপনি বসুন আমি যাই, নয় আপনিও বসুন আমিও বসি।”

বিনোদিনী সাধারণ মেয়ের মতো আশার সহিত হাত-কাড়াকাড়ি করিয়া মহাকোলাহলে লজ্জায় ধুম বাধাইয়া দিল না। সহজ সুরেই বলিল, “কেবল আপনার অনুরোধেই বসিলাম, কিন্তু মনে মনে অভিশাপ দিবেন না।”

মহেন্দ্র কহিল, “এই বলিয়া অভিশাপ দিব, আপনার যেন অনেকক্ষণ চলৎশক্তি না থাকে।”

বিনোদিনী কহিল, “সে অভিশাপকে আমি ভয় করি না। কেননা, আপনার অনেকক্ষণ খুব বেশিক্ষণ হইবে না। বোধ হয়, সময় উত্তীর্ণ হইয়া আসিল।”

বলিয়া আবার সে উঠিবার চেষ্টা করিল। আশা তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “মাথা খাও আর একটু বোসো।”

CB13
13

When Binodini refused to see her at all costs Asha decided on a plan. She said to Binodini, ‘Dear Bali, why do you not come to me when my husband is here? Why do you avoid him?’

Binodini said shortly and forcefully ‘Shame on you!’

Asha said, ‘Why? I have heard from our mother, you are not unrelated to the family.’

Binodini said with a serious look, ‘Who is unrelated in this world? The one who thinks of you as family is family, the one who holds you at arm’s length is not even if they are related.’

Asha thought to herself, there was no answer to these words. Her husband did do Binodini a great wrong by thinking of her as an outsider and being annoyed with her for no reason.

That evening Asha pleaded with her husband saying, ‘You must agree to meet my friend Bali.’
Mahendra smiled and said, ‘You are certainly brave!’

Asha asked, ‘Should I be afraid?’

Mahendra: ‘The way you describe your friend’s beauty, it is not very safe either.’

Asha said, ‘Alright, I will take care of that. Stop teasing me; tell me you will meet her.’

It was not as if Mahendra was not eager to see Binodini. He often thought about her these days. But he knew that this interest was inappropriate.

Mahendra’s ideas about relationships were somewhat different from other people. For example he had never raised the topic of his own marriage because he did not wish to hurt his mother’s sense of ownership over him. He was now intent on having the kind of relationship with Asha that made him free from any curiosity about any other woman at all. He was very proud of the fact that he was steadfast in his love. He was even reluctant to make any other friends because he already had a friend in Bihari. When others approached him because they had found something in him to like, he would deliberately show them his disdain and would later describe them to Bihari in the most scathing language as proof of his utter ambivalence towards the general public. When Bihari protested, he would say, ‘Bihari, you can make friends wherever you go; but I cannot do that with everyone that easily.’

When his mind turned to thoughts of the unknown woman with an inevitable eagerness and curiosity he felt belittled before his own ideals. Eventually he asked his mother to get rid of Binodini from the household.

Mahendra said, ‘Let it be Chuni, where is the time to meet your friend? I have to study and at all other times, I have you. What need is there for your friend?’

Asha said, ‘We will not make claims on your study time, I am asking you to meet her in my share of your day.’

Mahendra answered, ‘Why will I let you share that time with anyone else?’

Mahendra used to see the fact that Asha loved Binodini as somehow diminishing her love for him. He would say with some pride, ‘Your love is not as exclusive as mine.’ Asha did not agree to this, she quarreled with him and shed tears but to no avail; she could not win the argument.

For Mahendra it had become a matter of pride that he was not going to relinquish the tiniest space in their world to Binodini. Asha could not bear this but today she admitted defeat and said, ‘Alright, but please meet my friend for my sake.’

Eventually he agreed to meet Binodini, almost as a magnanimous gesture and a sign of the supremacy and strength of his love for Asha. He also added, ‘I hope this does not mean we will have to meet regularly from now on.’

Early the next morning Asha went to Binodini and embraced her while she was still in bed. Binodini said, ‘How unusual, the rain bird has left the moon alone and comes to the court of the clouds today.’

Asha said, ‘There is little point in wasting all your poetry and pretty sayings on me. Perhaps you should say them to the one who will be able to answer you appropriately.’

Binodini asked, ‘And who might that charmer be?’

Asha said, ‘Your brother-in-law, my husband. I am not making this up, he does want to meet you very much.’

‘You want to see me just because your wife says so! I am not to be had that easily!’ Binodini thought to herself.

Binodini did not agree to see him at all. Asha felt quite embarrassed in front of her husband.

Mahendra was secretly very annoyed. Why would she not appear before him? Was he like all other men? If it was any other man, they would have met Binodini a long time ago on some excuse. Mahendra had not even tried that, did not Binodini understand what he was like from observing these things? If Binodini gave him one chance she would see how he was different from all other name.

Binodini too had promised herself two days earlier, ‘I have been here for so long, and still he does not try to see me. When I am in his mother’s rooms, he could easily have made an excuse to come and see me. Why does he have to ignore me so much? Am I not made of flesh and blood? Am I not a woman? If he knew me once, he would see the difference between Binodini and his precious Chuni!’

Asha proposed to her husband that she would bring Binodini to her room when Mahendra was supposed to be at his college and he could then suddenly appear and surprise her.

Mahendra asked, ‘What has she done for you to punish her like that?’

Asha said, ‘No, I really am very angry. Why does she not want to even meet you? I will see to it that she cannot keep her word.’

Mahendra said, ‘I am not fading away just because I have never seen your dear friend. I do not want to steal a glimpse of her like that.’

Asha held Mahendra’s hand and said, ‘Please, you must do this but once. I just want to break her resistance once, do whatever you wish after that.’

Mahendra did not answer her straight away. Asha pleaded with him to keep his word.

Mahendra was growing very keen to see Binodini but he masked this with a great show of careless ambivalence about agreeing to meet her.

Binodini was teaching Asha how to make a pair of carpet slippers in Mahendra’s empty bedroom one sunny afternoon in autumn. All was silent about them. Asha kept looking at the bedroom door and her repeated mistakes only served to demonstrate her lack of skill to Binodini.

She eventually took the tapestry from Asha’s hands with some anger, flung it away and said, ‘You will never learn to do this properly, I have work to do, I am going!’

Asha said, ‘Just wait a bit more, I will get this right this time.’ She then started sewing again.

In the meantime Mahendra had come to the room and was standing at the door behind Binodini, unnoticed. Asha did not look up but she started to smile softly as she sensed his presence.

Binodini said, ‘Whatever has happened to make you laugh so much?’ Asha could not hold her secret to herself any longer. She laughed out aloud and threw the tapestry at Binodini saying, ‘No, you were right, I won’t be able to do this, ever!’ She flung her arms about Binodini’s neck and laughed even harder.

Binodini had guessed Asha’s plan right from the beginning. She had seen through Asha’s excitement and her behavior. She had known the very moment when Mahendra came and stood behind her. She had pretended to be trapped by the extremely flimsy pretences Asha had presented.

Mahendra entered the room and said, ‘Why leave me out? Could I join in the laughter too?’

Binodini started, pulling her veil down making as if to leave. Asha held her by the hands.

Mahendra smiled and said, ‘Perhaps you should sit and I should leave, or perhaps we could both sit down.’

Binodini did not behave in the usual manner of women and engage in a false show of being ashamed with Asha. She said calmly, ‘I am only sitting down because you have asked me to, but please do not wish me ill.’

Mahendra said, ‘I will have to wish you ill then and hope that you are not able to move for a long time.’

Binodini said, ‘I do not fear your ill wishes as your idea of a long time is not that long. It will be over very soon.’

She then tried to leave once again. Asha grabbed her hand and said, ‘Please, you must stay here a little longer.’

চোখের বালি ১২/Chokher Bali 12

মহেন্দ্র একদিন বিরক্ত হইয়া তাহার মাকে ডাকিয়া কহিল, “এ কি ভালো হইতেছে? পরের ঘরের যুবতী বিধবাকে আনিয়া একটা দায় ঘাড়ে করিবার দরকার কী। আমার তো ইহাতে মত নাই– কী জানি কখন কী সংকট ঘটিতে পারে।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও যে আমাদের বিপিনের বউ, উহাকে আমি তো পর মনে করি না।”

মহেন্দ্র কহিল, “না মা, ভালো হইতেছে না। আমার মতে উঁহাকে রাখা উচিত হয় না।”

রাজলক্ষ্মী বেশ জানিতেন, মহেন্দ্রের মত অগ্রাহ্য করা সহজ নহে। তিনি বিহারীকে ডাকিয়া কহিলেন, “ও বেহারি, তুই একবার মহিনকে বুঝাইয়া বল্। বিপিনের বউ আছে বলিয়াই এই বৃদ্ধবয়সে আমি একটু বিশ্রাম করিতে পাই। পর হউক, যা হউক, আপন লোকের কাছ হইতে এমন সেবা তো কখনো পাই নাই।”

বিহারী রাজলক্ষ্মীকে কোনো উত্তর না করিয়া মহেন্দ্রের কাছে গেল– কহিল, “মহিনদা, বিনোদিনীর কথা কিছু ভাবিতেছে?”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “ভাবিয়া রাত্রে ঘুম হয় না। তোমার বোঠানকে জিজ্ঞাসা করো না, আজকাল বিনোদিনীর ধ্যানে আমার আর-সকল ধ্যানই ভঙ্গ হইয়াছে।”

আশা ঘোমটার ভিতর হইতে মহেন্দ্রকে নীরবে তর্জন করিল।

বিহারী কহিল, “বল কী। দ্বিতীয় বিষবৃক্ষ!”

মহেন্দ্র। ঠিক তাই। এখন উহাকে বিদায় করিবার জন্য চুনি ছটফট করিতেছে।

ঘোমটার ভিতর হইতে আশার দুই চক্ষু আবার ভর্ৎসনা বর্ষণ করিল।

বিহারী কহিল, “বিদায় করিলেও ফিরিতে কতক্ষণ। বিধবার বিবাহ দিয়া দাও– বিষদাঁত একেবারে ভাঙিবে।”

মহেন্দ্র। কুন্দরও তো বিবাহ দেওয়া হইয়াছিল।

বিহারী কহিল, “থাক্, ও উপমাটা এখন রাখো। বিনোদিনীর কথা আমি মাঝে মাঝে ভাবি। তোমার এখানে উনি তো চিরদিন থাকিতে পারেন না। তাহার পরে, যে বন দেখিয়া আসিয়াছি সেখানে উঁহাকে যাবজ্জীবন বনবাসে পাঠানো, সেও বড়ো কঠিন দণ্ড।”

মহেন্দ্রের সম্মুখে এ পর্যন্ত বিনোদিনী বাহির হয় নাই, কিন্তু বিহারী তাহাকে দেখিয়াছে। বিহারী এটুকু বুঝিয়াছে, এ নারী জঙ্গলে ফেলিয়া রাখিবার নহে। কিন্তু শিখা এক ভাবে ঘরের প্রদীপরূপে জ্বলে, আর-এক ভাবে ঘরে আগুন ধরাইয়া দেয়– সে আশঙ্কাও বিহারীর মনে ছিল।

মহেন্দ্র বিহারীকে এই কথা লইয়া অনেক পরিহাস করিল। বিহারীও তাহার জবাব দিল। কিন্তু তাহার মন বুঝিয়াছিল, এ নারী খেলা করিবার নহে, ইহাকে উপেক্ষা করাও যায় না।

রাজলক্ষ্মী বিনোদিনীকে সাবধান করিয়া দিলেন। কহিলেন, “দেখো বাছা, বউকে লইয়া তুমি অত টানাটানি করিয়ো না। তুমি পাড়াগাঁয়ের গৃহস্থ-ঘরে ছিলে– আজকালকার চালচলন জান না। তুমি বুদ্ধিমতী, ভালো করিয়া বুঝিয়া চলিয়ো।”–

ইহার পর বিনোদিনী অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্বক আশাকে দূরে দূরে রাখিল। কহিল, “আমি ভাই কে। আমার মতো অবস্থার লোক আপন মান বাঁচাইয়া চলিতে না জানিলে, কোন্ দিন কী ঘটে বলা যায় কি।”

আশা সাধাসাধি কান্নাকাটি করিয়া মরে– বিনোদিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মনের কথায় আশা আকণ্ঠ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল, কিন্তু বিনোদিনী আমল দিল না।

এ দিকে মহেন্দ্রের বাহুপাশ শিথিল এবং তাহার মুগ্ধদৃষ্টি যেন ক্লান্তিতে আবৃত হইয়া আসিয়াছে। পূর্বে যে-সকল অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খলা তাহার কাছে কৌতুকজনক বোধ হইত, এখন তাহা অল্পে অল্পে তাহাকে পীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছে। আশার সাংসারিক অপটুতায় সে ক্ষণে ক্ষণে বিরক্ত হয়, কিন্তু প্রকাশ করিয়া বলে না। প্রকাশ না করিলেও আশা অন্তরে অন্তরে অনুভব করিয়াছে, নিরবচ্ছিন্ন মিলনে প্রেমের মর্যাদা ম্লান হইয়া যাইতেছে। মহেন্দ্রের সোহাগের মধ্যে বেসুর লাগিতেছিল– কতকটা মিথ্যা বাড়াবাড়ি, কতকটা আত্মপ্রতারণা।

এ সময়ে পলায়ন ছাড়া পরিত্রাণ নাই, বিচ্ছেদ ছাড়া ঔষধ নাই। স্ত্রীলোকের স্বভাবসিদ্ধ সংস্কারবশে আশা আজকাল মহেন্দ্রকে ফেলিয়া যাইবার চেষ্টা করিত। কিন্তু বিনোদিনী ছাড়া তাহার যাইবার স্থান কোথায়।

মহেন্দ্র প্রণয়ের উত্তপ্ত বাসরশয্যার মধ্যে চক্ষু উন্মীলন করিয়া ধীরে ধীরে সংসারের কাজকর্ম, পড়াশুনার প্রতি একটু সজাগ হইয়া পাশ ফিরিল। ডাক্তারি বইগুলাকে নানা অসম্ভব স্থান হইতে উদ্ধার করিয়া ধুলা ঝাড়িতে লাগিল এবং চাপকান-প্যাণ্টলুন কয়টা রৌদ্রে দিবার উপক্রম করিল।

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

One day Mahendra spoke to his mother with some anger about Binodini saying, ‘What is going on? You have a widowed young woman staying with us for days on end. Why take on such a responsibility? I never agreed to this – what is the point of inviting troubles?’

Rajlakshmi said, ‘But she is my nephew Bipin’s wife, I don’t think of her as a stranger.’

Mahendra insisted, ‘Nevertheless, this is not right. I don’t think she should stay here.’

Rajlakshmi knew that she would not be able to ignore Mahendra’s opinions for long. She called for Bihari and said to him, ‘Bihari, why do you not have a talk with your friend? I am getting some respite at this age only because Bipin’s wife is here to take care of me. It matters little whether she is my own daughter or not, I have never had such affection from the ones who are close to me.’

Bipin did not answer her immediately. He went to Mahendra and said to him, ‘Are you giving some thought to this matter of Binodini?’

Mahendra smiled and said, ‘I think about little else. Why not ask your sister-in-law, I have stopped thinking about all others because of Binodini!’

Asha silently shook her head in remonstrance at Mahendra from beneath her veil.

Bihari said, ‘What? Like a modern day Poisoned Tree*!’

Mahendra said, ‘Exactly! Chuni wants to get rid of her as soon as possible.’

Asha sent looks of anguish at him again.

Bihari said, ‘Even you get rid of her, how long before she comes back. Why not marry her off, that should be an end to her as a threat.’

Mahendra said, ‘Kundo got married too, in the Poisoned Tree.’

Bihari said, ‘Let us stop considering the book for a while. I have been thinking of Binodini occasionally. She cannot stay here forever. And yet to send her back to the village is the equivalent of exiling her to a forest forever; that would be a great tragedy.’

Mahendra had never seen Binodini so far, but Bihari had. He had understood that she was not the sort of woman one left in a forest to languish. But he also realised that a flame can be both the calming focus of the altar as well as the wild spark that sets a house on fire.

Mahendra teased Bihari at length over his concern for Binodini. Bihari answered back. He knew that she was not to be played with or even to be ignored.

Rajlakshmi cautioned Binodini. She said, ‘Look, why do you have to talk to my daughter –in-law all the time? You are from the village, you know nothing of these city types of today. Be careful and use your senses.’

After this Binodini started to avoid Asha very ostentatiously. She would say, ‘Who am I to come between you and your husband? If I do not watch out for myself, who else is going to do that for me?’

Asha would tearfully beg her to come and talk to her. But Binodini was steadfast. Asha was dying to tell her all about her days and nights but Binodini was not going to budge from her position.

In the meantime Mahendra’s embrace seemed to be relaxing and the constancy of his admiration was starting to dim somewhat. The whimsical ineptitude of the past that he had once found so endearing was now starting to trouble him. He was now constantly annoyed by Asha’s inability to do things right but he would not say anything. Despite this, she understood that their continual togetherness was making his love for her grow less intense. A lot of Mahendra’s affection now seemed false and overwrought to Asha.

There is no cure for this ennui but departure and separation. Her instincts as a woman told her to seek out others; she would try and leave Mahendra alone. But where was she to go to but to her only friend, Binodini?

Mahendra raised his eyes from the heat of the conjugal bed and slowly started to turn back towards his studies and the duties of family life. He gathered his medical texts from a number of impossible hiding places to dust them off and aired his coats and trousers in preparation for his new life.

Image: http://www.oldindianarts.in/2011/04/portrait-of-lady-kalighat-painting.html

তোমারে জানি নে হে, তবু মন তোমাতে ধায়/Tomarey Jani Ne He, Tobu Mon Tomatey Dhaay/I do not know you yet, but my mind follows your footsteps

তোমারে জানি নে হে, তবু মন তোমাতে ধায়।
তোমারে না জেনে বিশ্ব তবু তোমাতে বিরাম পায়।।
অসীম সৌন্দর্য তব কে করেছে অনুভব হে,
সে মাধুরী চিরনব–
আমি না জেনে প্রাণ সঁপেছি তোমায়।।
তুমি জ্যোতির জ্যোতি, আমি অন্ধ আঁধারে।
তুমি মুক্ত মহীয়ান, আমি মগ্ন পাথারে।
তুমি অন্তহীন, আমি ক্ষুদ্র দীন– কী অপূর্ব মিলন তোমায় আমায়।।

রাগ: ভৈরবী
তাল: ঝাঁপতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1293
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1887

eternal

I do not know you yet, but my mind follows your footsteps,

The world does not know you, and yet it finds solace in you.

Has anyone realized your endless beauty?

That sweetness that is forever new –

But my mind follows your footsteps,

I have surrendered my heart to you without knowing you.

You are the light of lights, while I wait blind in darkness,

You are great and unfettered, while I am enclosed by seas.

But my mind follows your footsteps,

You are without end while I am confined by the minute walls that define me,

Yet you allow me a glimpse of the divine through wondrous union with you.

Raga: Bhairavi
Beat:Jhnaap Taal
Written: 1887

Follow the links to hear:

Suchitra Mitra: http://youtu.be/bQli7c4s3EA

Swagatalakshmi Dasgupta:http://youtu.be/VZcHsaoQiQs

চোখের বালি ১১/ Chokher Bali 11

Chokher Bali 3

১১

আশার পক্ষে সঙ্গিনীর বড়ো দরকার হইয়াছিল। ভালোবাসার উৎসবও কেবলমাত্র দুটি লোকের দ্বারা সম্পন্ন হয় না– সুখালাপের মিষ্টান্ন বিতরণের জন্য বাজে লোকের দরকার হয়।

ক্ষুধিতহৃদয়া বিনোদিনীও নববধূর নবপ্রেমের ইতিহাস মাতালের জ্বালাময় মদের মতো কান পাতিয়া পান করিতে লাগিল। তাহার মস্তিষ্ক মাতিয়া শরীরের রক্ত জ্বলিয়া উঠিল।

নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে মা যখন ঘুমাইতেছেন, দাসদাসীরা একতলার বিশ্রামশালায় অদৃশ্য, মহেন্দ্র বিহারীর তাড়নায় ক্ষণকালের জন্য কলেজে গেছে এবং রৌদ্রতপ্ত নীলিমার শেষ প্রান্ত হইতে চিলের তীব্র কণ্ঠ অতিক্ষীণ স্বরে কদাচিৎ শুনা যাইতেছে, তখন নির্জন শয়নগৃহে নীচের বিছানায় বালিশের উপর আশা তাহার খোলা চুল ছড়াইয়া শুইত এবং বিনোদিনী বুকের নীচে বালিশ টানিয়া উপুড় হইয়া শুইয়া গুনগুন-গুঞ্জরিত কাহিনীর মধ্যে আবিষ্ট হইয়া রহিত, তাহার কর্ণমূল আরক্ত হইয়া উঠিত, নিশ্বাস বেগে প্রবাহিত হইতে থাকিত।

বিনোদিনী প্রশ্নকরিয়া করিয়া তুচ্ছতম কথাটি পর্যন্ত বাহির করিত, এক কথা বার বার করিয়া শুনিত, ঘটনা নিঃশেষ হইয়া গেলে কল্পনার অবতারণা করিত– কহিত, “আচ্ছা ভাই, যদি এমন হইত তো কী হইত, যদি অমন হইত তো কী করিতে।” সেই-সকল অসম্ভাবিত কল্পনার পথে সুখালোচনাকে সুদীর্ঘ করিয়া টানিয়া লইয়া চলিতে আশারও ভালো লাগিত।

বিনোদিনী কহিত, “আচ্ছা ভাই চোখের বালি, তোর সঙ্গে যদি বিহারীবাবুর বিবাহ হইত।”

আশা। না ভাই, ও কথা তুমি বলিয়ো না– ছি ছি, আমার বড়ো লজ্জা করে। কিন্তু তোমার সঙ্গে হইলে বেশ হইত, তোমার সঙ্গেও তো কথা হইয়াছিল।

বিনোদিনী। আমার সঙ্গে তো ঢের লোকের ঢের কথা হইয়াছিল। না হইয়াছে, বেশ হইয়াছে– আমি যা আছি, বেশ আছি।

আশা তাহার প্রতিবাদ করে। বিনোদিনীর অবস্থা যে তাহার অবস্থার চেয়ে ভালো, এ কথা সে কেমন করিয়া স্বীকার করিবে। “একবার মনে করিয়া দেখো দেখি ভাই বালি, যদি আমার স্বামীর সঙ্গে তোমার বিবাহ হইয়া যাইত। আর একটু হলেই তো হইত।”

তা তো হইতই। না হইল কেন। আশার এই বিছানা, এই খাট তো একদিন তাহারই জন্য অপেক্ষা করিয়া ছিল। বিনোদিনী এই সুসজ্জিত শয়নঘরের দিকে চায়, আর সে কথা কিছুতেই ভুলিতে পারে না। এ ঘরে আজ সে অতিথিমাত্র– আজ স্থান পাইয়াছে, কাল আবার উঠিয়া যাইতে হইবে।

অপরাহ্নে বিনোদিনী নিজে উদ্‌যোগী হইয়া অপরূপ নৈপুণ্যের সহিত আশার চুল বাঁধিয়া সাজাইয়া তাহাকে স্বামীসম্মিলনে পাঠাইয়া দিত। তাহার কল্পনা যেন অবগুণ্ঠিতা হইয়া এই সজ্জিতা বধূর পশ্চাৎ পশ্চাৎ মুগ্ধ যুবকের অভিসারে জনহীন কক্ষে গমন করিত। আবার এক-এক দিন কিছুতেই আশাকে ছাড়িয়া দিত না। বলিত, “আঃ, আর-একটু বসোই-না। তোমার স্বামী তো পালাইতেছেন না। তিনি তো বনের মায়ামৃগ নন, তিনি অঞ্চলের পোষা হরিণ।” এই বলিয়া নানা ছলে ধরিয়া রাখিয়া দেরি করাইবার চেষ্টা করিত।

মহেন্দ্র অত্যন্ত রাগ করিয়া বলিত, “তোমার সখী যে নড়িবার নাম করেন না– তিনি বাড়ি ফিরিবেন কবে।”

আশা ব্যগ্র হইয়া বলিত, “না, তুমি আমার চোখের বালির উপর রাগ করিয়ো না। তুমি জান না, সে তোমার কথা শুনিতে কত ভালোবাসে– কত যত্ন করিয়া সাজাইয়া আমাকে তোমার কাছে পাঠাইয়া দেয়।”

রাজলক্ষ্মী আশাকে কাজ করিতে দিতেন না। বিনোদিনী বধূর পক্ষ লইয়া তাহাকে কাজে প্রবৃত্ত করাইল। প্রায় সমস্ত দিনই বিনোদিনীর কাজে আলস্য নাই, সেই সঙ্গে আশাকেও সে আর ছুটি দিতে চায় না। বিনোদিনী পরে-পরে এমনি কাজের শৃঙ্খল বানাইতেছিল যে, তাহার মধ্যে ফাঁক পাওয়া আশার পক্ষে ভারি কঠিন হইয়া উঠিল। আশার স্বামী ছাদের উপরকার শূন্য ঘরের কোণে বসিয়া আক্রোশে ছটফট করিতেছে, ইহা কল্পনা করিয়া বিনোদিনী মনে মনে তীব্র কঠিন হাসি হাসিত। আশা উদ্বিগ্ন হইয়া বলিত, “এবার যাই ভাই চোখের বালি, তিনি আবার রাগ করিবেন।”

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি বলিত, “রোসো, এইটুকু শেষ করিয়া যাও। আর বেশি দেরি হইবে না।”

খানিক বাদে আশা আবার ছটফট করিয়া বলিয়া উঠিত, “না ভাই, এবার তিনি সত্যসত্যই রাগ করিবেন–আমাকে ছাড়ো, আমি যাই।”

বিনোদিনী বলিত, “আহা, একটু রাগ করিলই বা। সোহাগের সঙ্গে রাগ না মিশিলে ভালোবাসার স্বাদ থাকে না– তরকারিতে লঙ্কামরিচের মতো।”

কিন্তু লঙ্কামরিচের স্বাদটা যে কী, তাহা বিনোদিনীই বুঝিতেছিল– কেবল সঙ্গে তাহার তরকারি ছিল না। তাহার শিরায় শিরায় যেন আগুন ধরিয়া গেল। সে যে দিকে চায়, তাহার চোখে যেন স্ফুলিঙ্গবর্ষণ হইতে থাকে। “এমন সুখের ঘরকন্না– এমন সোহাগের স্বামী। এ ঘরকে যে আমি রাজার রাজত্ব, এ স্বামীকে যে আমি পায়ের দাস করিয়া রাখিতে পারিতাম। তখন কি এ ঘরের এই দশা, এ মানুষের এই ছিরি থাকিত। আমার জায়গায় কিনা এই কচি খুকি, এই খেলার পুতুল!’ (আশার গলা জড়াইয়া) “ভাই চোখের বালি, বলো-না ভাই, কাল তোমাদের কী কথা হইল ভাই। আমি তোমাকে যাহা শিখাইয়া দিয়াছিলাম তাহা বলিয়াছিলে? তোমাদের ভালোবাসার কথা শুনিলে আমার ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না ভাই।”

11

Asha desperately needed female company. The festival of love is never truly complete without a third person to hear and exult over its stories.

Binodini’s hungry soul devoured all the tales of Mahendra’s wooing like a drunkard swilling down liquor even as it burns his throat. Her head buzzed with strange feelings and her blood grew agitated.

In the silent afternoons when Rajlakshmi would sleep and the servants would disappear to their quarters. Mahendra would be at his classes after Bihari tried to talk some sense into him. The only sounds to be heard were the shrill but faint calls of the kites from the burning skies in the hazy distance. It was then that the two young women would retire to Asha’s bedroom, where she would lie on her bed with her hair spread all over her pillow while Binodini lay next to her, pillow clutched to her breast, her ears reddening at Asha’s whispered accounts of Mahendra’s exploits and her breath growing rapid as the time went by.

Binodini would keep questioning Asha till even the smallest detail was laid bare to her. She would ask about certain things again and again, sometimes asking Asha to imagine different endings, saying, ‘Well, if he had done this, and what would you have done then.’ This would prolong their discussions and there is little doubt that Asha too found this rather enjoyable.

Binodini said, ‘Well, my dear Chokher Bali, what if you had been married to Bihari?’

Asha said, ‘No, no, please do not say that! I feel very ashamed. But it would have been so good if you had married him, as was once planned.’

Binodini said, ‘I was meant to have married so many people! It is fitting that it did not happen, I am quite alright with the way things have turned out.’

Asha objected to that. How would she admit that Binodini was better off than her? She persisted, ‘Just imagine for once, if you had married my husband? It was almost done was it not?’

Of course it could have happened. Why did it not happen? Once upon a time, this room, this bed – all these were meant to have been hers. As Binodini looks at the room today with all its expensive things, she can hardly forget that. Today she is but a guest here, she will have to leave tomorrow.

In the evening Binodini would do up Asha’s hair beautifully and dress her in the latest of fashions before sending her to her husband. Her imagination seemed to veil itself and follow Asha through the empty rooms as she went to her young husband and stood before his admiring eyes. On other days she would not let Asha go so easily and say, ‘Why can you not wait just a bit more? Your husband is not running away! He is no wild horse, he is a tame pony.’ On those days she would try to delay Asha’s departure in various ways.

Mahendra would say very angrily, ‘Your friend makes no mention of leaving – when is she going back home?’

Asha would say hurriedly, ‘No, don’t be angry with her. You don’t know how much she loves to hear of you, how much care she takes as she helps me dress before I come to you.’

Rajlakshmi did not let Asha help with the work. Binodini spoke to her and got her permission for Asha to join in the household chores. She never rested through the day and Asha had to do the same. Binodini managed to arrange the tasks like links in a chain so that Asha rarely got a chance to escape to her husband who would be waiting in vain in the room on the terrace, frustrated and angry. Binodini felt a cruel sense of enjoyment at the thought. Asha would grow anxious and say, ‘I must go now Bali, he will get annoyed with me,’

Binodini would say quickly, ‘Just finish this little bit off. It will only take a little longer.’

Asha would again start to fidget in a little while and say, ‘No, this time I really must go, he gets so annoyed!Let me go!’

Binodini said, ‘Let him get a little angry! When anger is mixed with love, it adds a touch of spice, just as pepper seasons a dish.’

But Binodini was the one with all the taste for seasoning – and yet she did not have a dish of her own to add it to. Her very veins felt like they were on fire. When she was in this mood, her eyes seemed to shower sparks.

‘Such a happy household – such a loving husband! I could have made this my kingdom, I could have made this man my slave. Would this household be in this state then? Would this man be wasting his life like this? Instead, this slip of a girl, this rag doll!’ she thought as she embraced Asha and said, ‘Tell me Bali, please tell me, what did you talk about yesterday? Did you say what I taught you? When I hear about your love making I forget all thirst and hunger.’