Archive | September 2013

আমার মাঝে তোমারি মায়া জাগালে তুমি কবি/Aamar maajhe tomari maaya jagale tumi kobi/

আমার মাঝে তোমারি মায়া জাগালে তুমি কবি।
আপন-মনে আমারি পটে আঁকো মানস ছবি ॥
তাপস তুমি ধেয়ানে তব কী দেখ মোরে কেমনে কব,
আপন-মনে মেঘস্বপন আপনি রচ রবি।
তোমার জটে আমি তোমারি ভাবের জাহ্নবী ॥
তোমারি সোনা বোঝাই হল, আমি তো তার ভেলা–
নিজেরে তুমি ভোলাবে ব’লে আমারে নিয়ে খেলা।
কণ্ঠে মম কী কথা শোন অর্থ আমি বুঝি না কোনো,
বীণাতে মোর কাঁদিয়া ওঠে তোমারি ভৈরবী।
মুকুল মম সুবাসে তব গোপনে সৌরভী ॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): পৌষ, ১৩৩৬
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1930
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

***

Aamar maajhe tomari maaya jagale tumi kobi.
Apon-mone amari potey anko manosh chobi.
Taposh tumi dheyaane tobo ki dekho morey kemone kobo,
Apon-mone meghoswopon aponi rocho robi.
Tomar jotey ami tomari bhaber janhobi.
Tomari shona bojhai holo, ami to tar bhela –
Nijere tumi bholabe bole amare niye khela
Konthey momo ki katha shono artho ami bujhi na kono,
Beenate mor kandiya othe tomari bhairabi.
Mukul momo subashe tobo gopono shourobhi.

Rag: Bhairabi
Tal: Dadra
Rochonakal: Bongabdo: Poush, 1336, Khristabdo: 1930
Swarolipikar: Dinendranath Thakur

***

Within me you awaken illusions of your own making
As you paint me with your thoughts.
How do I know how I appear in your mind, as you meditate,
Perhaps as fleeting dreams, just as the sun plays with clouds.
Made from your many moods, I become the Janhavi in Shiva’s matted tresses.
I am the vessel that you must fill with all your treasures,
I am the plaything that you must create for your own amusement.
I do not begin to understand the words that I speak,
For in your hands my soul sings only your songs
And each bud of mine is perfumed unseen by your all embracing love.

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written in the Bengali year 1336, A.D 1930
Score: Dinendranath Tagore

Follow the link to hear Suchitra Mitra: http://youtu.be/e26mNBpqHOA

Debabrata Biswas: http://youtu.be/Va51mi9H-o4

Chinmoy Chattopadhyay: http://youtu.be/ck66TwGwdIw

Advertisements

রাজার ছেলে ও রাজার মেয়ে, সোনার তরী/The Prince and Princess, Sonar Toree, The Golden Boat

রাজার ছেলে ও রাজার মেয়ে

রূপকথা
প্রভাতে
রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়,
রাজার মেয়ে যেত তথা।
দুজনে দেখা হত পথের মাঝে,
কে জানে কবেকার কথা।
রাজার মেয়ে দূরে সরে যেত,
চুলের ফুল তার পড়ে যেত,
রাজার ছেলে এসে তুলে দিত
ফুলের সাথে বনলতা।
রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়,
রাজার মেয়ে যেত তথা।
পথের দুই পাশে ফুটেছে ফুল,
পাখিরা গান গাহে গাছে।
রাজার মেয়ে আগে এগিয়ে চলে,
রাজার ছেলে যায় পাছে।

মধ্যাহ্নে
উপরে বসে পড়ে রাজার মেয়ে,
রাজার ছেলে নীচে বসে।
পুঁথি খুলিয়া শেখে কত কী ভাষা,
খড়ি পাতিয়া আঁক কষে।
রাজার মেয়ে পড়া যায় ভুলে,
পুঁথিটি হাত হতে পড়ে খুলে,
রাজার ছেলে এসে দেয় তুলে,
আবার পড়ে যায় খসে।
উপরে বসে পড়ে রাজার মেয়ে,
রাজার ছেলে নীচে বসে।
দুপুরে খরতাপ, বকুলশাখে
কোকিল কুহু কুহরিছে।
রাজার ছেলে চায় উপর-পানে,
রাজার মেয়ে চায় নীচে।

সায়াহ্নে
রাজার ছেলে ঘরে ফিরিয়া আসে,
রাজার মেয়ে যায় ঘরে।
খুলিয়া গলা হতে মোতির মালা
রাজার মেয়ে খেলা করে।
পথে সে মালাখানি গেল ভুলে,
রাজার ছেলে সেটি নিল তুলে,
আপন মণিহার মনোভুলে
দিল সে বালিকার করে।
রাজার ছেলে ঘরে ফিরিয়া এল,
রাজার মেয়ে গেল ঘরে।
শ্রান্ত রবি ধীরে অস্ত যায়
নদীর তীরে একশেষে।
সাঙ্গ হয়ে গেল দোঁহার পাঠ,
যে যার গেল নিজ দেশে।

নিশীথে
রাজার মেয়ে শোয় সোনার খাটে,
স্বপনে দেখে রূপরাশি।
রুপোর খাটে শুয়ে রাজার ছেলে
দেখিছে কার সুধা-হাসি।
করিছে আনাগোনা সুখ-দুখ,
কখনো দুরু দুরু করে বুক,
অধরে কভু কাঁপে হাসিটুক,
নয়ন কভু যায় ভাসি।
রাজার মেয়ে কার দেখিছে মুখ,
রাজার ছেলে কার হাসি।
বাদর ঝর ঝর, গরজে মেঘ,
পবন করে মাতামাতি।
শিথানে মাথা রাখি বিথান বেশ,
স্বপনে কেটে যায় রাতি।

চৈত্র ১২৯৮ জোড়াসাঁকো। কলিকাতা

tarore_video_08-746253

(The inner verandahs at Jorasanko, the poet’s home)

***************

A prince and a princess
In a fairy tale

In the morning
The prince would go to school
The princess went there as well.
The two met perchance on the road
Who knows when this happened for the very first time!
The princess would shy away
Flowers falling from her sweeping hair,
The prince would pick them up for her again,
Returning blossom to a flowering vine.
The prince used to go to school
The princess went there as well.
A hundred flowers bloomed by the sides of the road
The birds sang sweetly out of each tree
The princess would walk a few steps ahead
The prince would follow in her wake.

2
At noon
The princess would read as she sat on high,
The prince would sit upon the ground.
They learned so many words from their books
They practiced their numbers on slate tablets too.
The princess would forget certain things she had read
Abandoned, her book would fall to the floor.
The prince gave it back to her,
Only to find it dropped again.
The princess would read as she sat on high,
The prince would sit upon the ground
In the midday heat, upon the mimosa boughs,
The cuckoo would sing its plaintive song.
The prince would look up at the bird,
While the princess cast her eyes down to the ground.

3
In the evening
The prince comes home
The princess returns too.
She undoes her necklace of precious stones
To play with the beads,
But she loses it on her way back home
The prince picks it up
But gives her back his necklace
Perhaps in a youthful comedy of errors
Now he is home,
She too has returned.
And so the weary sun may slowly end his day
Sinking into the river bank far away.
The two are done with their studies,
Each back in their own home.

4
At night
The princess sleeps upon a bed of pure gold,
In her dreams she sees many a treasure
The prince is asleep on his silver couch
In his dreams he sees many a smile sweet
Happiness and sorrow chase each other about,
Sometimes his heart fills with fear,
Soon to change to a smile that sits lightly on the lips.
Then glitter sudden uninvited tears.
Whose dear face does the princess see?
Whose smiles shine in the prince’s dreams?
The rains fall ceaseless, the sky rings with thunder,
The wind grows stronger with each peal.
Head upon pillow, clothes in sweet disarray,
The night passes in delightful dreams.

Written at Jorasanko, Chaitra 1298 Bongabdo(Bengali calender)

Image from: http://calcutta-kolkata-asim.blogspot.com.au/2011/05/josasanko-thakurbari.html

Chokher Bali 22, Part 1/চোখের বালি ২২, প্রথম অংশ

২২

মহেন্দ্র ঘরে ফিরিয়া আসিবামাত্র তাহার মুখ দেখিয়াই আশার মনের সমস্ত সংশয় ক্ষণকালের কুয়াশার মতো এক মুহূর্তেই কাটিয়া গেল। নিজের চিঠির কথা স্মরণ করিয়া লজ্জায় মহেন্দ্রের সামনে সে যেন মুখ তুলিতেই পারিল না। মহেন্দ্র তাহার উপরে ভর্ৎসনা করিয়া কহিল, “এমন অপবাদ দিয়া চিঠিগুলা লিখিলে কী করিয়া।”

বলিয়া পকেট হইতে বহুবার পঠিত সেই চিঠি তিনখানি বাহির করিল। আশা ব্যাকুল হইয়া কহিল, “তোমার পায়ে পড়ি, ও চিঠিগুলো ছিঁড়িয়া ফেলো।” বলিয়া মহেন্দ্রের হাত হইতে চিঠিগুলা লইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল। মহেন্দ্র তাহাকে নিরস্ত করিয়া সেগুলি পকেটে পুরিল। কহিল, “আমি কর্তব্যের অনুরোধে গেলাম, আর তুমি আমার অভিপ্রায় বুঝিলে না? আমাকে সন্দেহ করিলে?”

আশা ছল-ছল চোখে কহিল, “এবারকার মতো আমাকে মাপ করো। এমন আর কখনোই হইবে না।”

মহেন্দ্র কহিল, “কখনো না?”

আশা কহিল, “কখনো না।”

তখন মহেন্দ্র তাহাকে টানিয়া লইয়া চুম্বন করিল। আশা কহিল, “চিঠিগুলা দাও, ছিঁড়িয়া ফেলি।”

মহেন্দ্র কহিল, “না, ও থাক্‌!”

আশা সবিনয়ে মনে করিল, “আমার শাস্তিস্বরূপ এ চিঠিগুলি উনি রাখিলেন।’

এই চিঠির ব্যাপারে বিনোদিনীর উপর আশার মনটা একটু যেন বাঁকিয়া দাঁড়াইল। স্বামীর আগমনবার্তা লইয়া সে সখীর কাছে আনন্দ করিতে গেল না– বরঞ্চ বিনোদিনীকে একটু যেন এড়াইয়া গেল। বিনোদিনী সেটুকু লক্ষ্য করিল এবং কাজের ছল করিয়া একেবারে দূরে রহিল।

মহেন্দ্র ভাবিল, “এ তো বড়ো অদ্ভুত। আমি ভাবিয়াছিলাম, এবার বিনোদিনীকে বিশেষ করিয়াই দেখা যাইবে– উল্‌টা হইল? তবে সে চিঠিগুলার অর্থ কী।’

নারীহৃদয়ের রহস্য বুঝিবার কোনো চেষ্টা করিবে না বলিয়াই মহেন্দ্র মনকে দৃঢ় করিয়াছিল– ভাবিয়াছিল, বিনোদিনী যদি কাছে আসিবার চেষ্টা করে, তবু আমি দূরে থাকিব।’ আজ সে মনে মনে কহিল, “না, এ তো ঠিক হইতেছে না। যেন আমাদের মধ্যে সত্যই কী একটা বিকার ঘটিয়াছে। বিনোদিনীর সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা আমোদপ্রমোদ করিয়া এই সংশয়াচ্ছন্ন গুমোটের ভাবটা দূর করিয়া দেওয়া উচিত।’

আশাকে মহেন্দ্র কহিল, “দেখিতেছি, আমিই তোমার সখীর চোখের বালি হইলাম। আজকাল তাঁহার আর দেখাই পাওয়া যায় না।”

আশা উদাসীন ভাবে উত্তর করিল, “কে জানে, তাহার কী হইয়াছে।”

এ দিকে রাজলক্ষ্মী আসিয়া কাঁদো-কাঁদো হইয়া কহিলেন, “বিপিনের বউকে আর তো ধরিয়া রাখা যায় না।”

মহেন্দ্র চকিত ভাব সামলাইয়া কহিল, “কেন, মা।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কি জানি বাছা, সে তো এবার বাড়ি যাইবার জন্য নিতান্তই ধরিয়া পড়িয়াছে। তুই তো কাহাকেও খাতির করিতে জানিস না। ভদ্রলোকের মেয়ে পরের বাড়িতে আছে, উহাকে আপনার লোকের মতো আদর-যত্ন না করিলে থাকিবে কেন।”

বিনোদিনী শোবার ঘরে বসিয়া বিছানার চাদর সেলাই করিতেছিল। মহেন্দ্র প্রবেশ করিয়া ডাকিল, “বালি।”

বিনোদিনী সংযত হইয়া বসিল। কহিল, “কী, মহেন্দ্রবাবু।”

মহেন্দ্র কহিল, “কী সর্বনাশ। মহেন্দ্র আবার বাবু হইলেন কবে।”

বিনোদিনী আবার চাদর সেলাইয়ের দিকে নতচক্ষু নিবদ্ধ রাখিয়া কহিল, “তবে কী বলিয়া ডাকিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার সখীকে যা বল– চোখের বালি।”

বিনোদিনী অন্যদিনের মতো ঠাট্টা করিয়া তাহার কোনো উত্তর দিল না– সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল।

মহেন্দ্র কহিল, “ওটা বুঝি সত্যকার সম্বন্ধ হইল, তাই ওটা আর পাতানো চলিতেছে না!”

বিনোদিনী একটু থামিয়া দাঁত দিয়া সেলাইয়ের প্রান্ত হইতে খানিকটা বাড়তি সুতা কাটিয়া ফেলিয়া কহিল, “কী জানি, সে আপনি জানেন।”

বলিয়াই তাহার সর্বপ্রকার উত্তর চাপা দিয়া গম্ভীরমুখে কহিল, “কালেজ হইতে হঠাৎ ফেরা হইল যে?”

মহেন্দ্র কহিল, “কেবল মড়া কাটিয়া আর কত দিন চলিবে।”

আবার বিনোদিনী দন্ত দিয়া সুতা ছেদন করিল এবং মুখ না তুলিয়াই কহিল, “এখন বুঝি জিয়ন্তের আবশ্যক।”

মহেন্দ্র স্থির করিয়াছিল, আজ বিনোদিনীর সঙ্গে অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভাবে হাস্যপরিহাস উত্তরপ্রত্যুত্তর করিয়া আসর জমাইয়া তুলিবে। কিন্তু এমনি গাম্ভীর্যের ভার তাহার উপর চাপিয়া আসিল যে, লঘু জবাব প্রাণপণ চেষ্টাতেও মুখের কাছে জোগাইল না। বিনোদিনী আজ কেমন একরকম কঠিন দূরত্ব রক্ষা করিয়া চলিতেছে দেখিয়া, মহেন্দ্রের মনটা সবেগে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল– ব্যবধানটাকে কোনো একটা নাড়া দিয়া ভূমিসাৎ করিতে ইচ্ছা হইল। বিনোদিনীর শেষ বাক্যঘাতের প্রতিঘাত না দিয়া হঠাৎ তাহার কাছে আসিয়া বসিয়া কহিল, “তুমি আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে কেন। কোনো অপরাধ করিয়াছি?”

বিনোদিনী তখন একটু সরিয়া সেলাই হইতে মুখ তুলিয়া দুই বিশাল উজ্জ্বল চক্ষু মহেন্দ্রের মুখের উপর স্থির রাখিয়া কহিল, “কর্তব্যকর্ম তো সকলেরই আছে। আপনি যে সকল ছাড়িয়া কালেজের বাসায় যান, সে কি কাহারো অপরাধে। আমারও যাইতে হইবে না? আমারও কর্তব্য নাই?”

মহেন্দ্র ভালো উত্তর অনেক ভাবিয়া খুঁজিয়া পাইল না। কিছুক্ষণ থামিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার এমন কী কর্তব্য যে না গেলেই নয়।”

বিনোদিনী অত্যন্ত সাবধানে সূচিতে সুতা পরাইতে পরাইতে কহিল, “কর্তব্য আছে কি না, সে নিজের মনই জানে। আপনার কাছে তাহার আর কী তালিকা দিব।”

মহেন্দ্র গম্ভীর চিন্তিত মুখে জানালার বাহিরে একটা সুদূর নারিকেলগাছের মাথার দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনী নিঃশব্দে সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল। ঘরে ছুঁচটি পড়িলে শব্দ শোনা যায়, এমনি হইল। অনেকক্ষণ পরে মহেন্দ্র হঠাৎ কথা কহিল। অকস্মাৎ নিঃশব্দতাভঙ্গে বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল–তাহার হাতে ছুঁচ ফুটিয়া গেল।

মহেন্দ্র কহিল, “তোমাকে কোনো অনুনয়-বিনয়েই রাখা যাইবে না?”

বিনোদিনী তাহার আহত অঙ্গুলি হইতে রক্তবিন্দু শুষিয়া লইয়া কহিল, “কিসের জন্য এত অনুনয়-বিনয়। আমি থাকিলেই কী, আর না থাকিলেই কী। আপনার তাহাতে কী আসে যায়।”

বলিতে বলিতে গলাটা যেন ভারি হইয়া আসিল; বিনোদিনী অত্যন্ত মাথা নিচুকরিয়া সেলাইয়ের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিল– মনে হইল, হয়তো বা তাহার নতনেত্রের পল্লবপ্রান্তে একটুখানি জলের রেখা দেখা দিয়াছে। মাঘের অপরাহ্ন তখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলাইবার উপক্রম করিতেছিল।

মহেন্দ্র মুহূর্তের মধ্যে বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া রুদ্ধ সজলস্বরে কহিল, “যদি তাহাতে আমার আসে যায়, তবে তুমি থাকিবে?”

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত ছাড়াইয়া লইয়া সরিয়া বসিল। মহেন্দ্রের চমক ভাঙিয়া গেল। নিজের শেষ কথাটা ভীষণ ব্যঙ্গের মতো তাহার নিজের কানে বারংবার প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। অপরাধী জিহ্বাকে মহেন্দ্র দন্ত দ্বারা দংশন করিল– তাহার পর হইতে রসনা নির্বাক হইয়া রহিল।

এমন সময় এই নৈঃশব্দ্যপরিপূর্ণ ঘরের মধ্যে আশা প্রবেশ করিল। বিনোদিনী তৎক্ষণাৎ যেন পূর্ব-কথোপকথনের অনুবৃত্তিস্বরূপে হাসিয়া মহেন্দ্রকে বলিয়া উঠিল, “আমার গুমর তোমরা যখন এত বাড়াইলে, তখন আমারও কর্তব্য, তোমাদের একটা কথা রাখা। যতক্ষণ না বিদায় দিবে ততক্ষণ রহিলাম।”

আশা স্বামীর কৃতকার্যতায় উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়া সখীকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল। কহিল, “তবে এই কথা রহিল। তাহা হইলে তিন-সত্য করো, যতক্ষণ না বিদায় দিব ততক্ষণ থাকিবে, থাকিবে, থাকিবে।”

Portrait-of-a-Lady---Kalighat-Painting-Bengal-c1860's

22

It took one look at Mahendra when he returned home for all the doubts in Asha’s mind to disappear like a morning mist. She could barely bring herself to look at Mahendra when she thought of the letters she had written. Mahendra scolded her and said, ‘How could you write all those things about me!’

He then took the three letters that he had read so often from his pocket. Asha anxiously pleaded, ‘Please, I beg you, you must destroy those!’ She tried to take them from him but he stopped her and said only after putting them back, ‘I went because it was my duty but you did not try to understand me. Did you have any suspicions about me?’

Tearfully Asha said, ‘Please forgive me this time, I will never do this again.’

Mahendra asked, ‘Never again?’

Asha promised, ‘Never!’

Mahendra then drew her close and kissed her. Asha asked, ‘Give me the letters, I will destroy them.’

Mahendra said, ‘No, let them be.’

Asha thought to herself, ‘He is going to hold onto those as a warning to me.’

Asha grew annoyed with Binodini over this matter of the letters. She did not go to her friend as was her habit with the good news of her husband’s homecoming and avoided her instead. Binodini noticed this and stayed away on the pretext of work.

Mahendra thought to himself, ‘This is strange! I had thought she would find excuses to come to see me more often, but it seems the opposite is happening. What did she mean by those letters then?’

Mahendra had steeled himself against any attempts to understand the secret ways of women, he had even decided to stay away from Bindodini in the event of her approaching him. But now he told himself, ‘This is not right. Something seems to be broken between the two of us. I must try and make this air of forced unfamiliarity disappear by talking to her normally.’

He said to Asha, ‘It seems I am now the grit in your friend’s eyes. She never comes here any more.’

Asha answered casually, ‘Who cares? There is always something going on.’

One day Rajlakshmi came to Mahendra in tears and said, ‘Bipin’s wife says she will not stay any longer.’

Mahendra recovered from his surprise and asked, ‘But why Mother?’

Rajlakshmi answered, ‘I do not know, but this time she really is insisting on going home. You deliberately do not give people the respect due to them. How can she stay with everyone behaving so coldly with her?’

Mahendra went to Binodini’s room where she was sewing a hem on a bedsheet and spoke to her, ‘Bali?’

Binodini sat up straighter and said, ‘What is it sir?’

Mahendra declared, ‘Whatever next! Since when have you been addressing me like that?’

Binodini fixed her downcast eyes on her sewing once again and said, ‘Then how should I address you?’

Mahendra: ‘The same way you address your friend, Chokher Bali.’

Binodini did not answer with her customary humour and kept stitching.

Mahendra: ‘Perhaps that is our true relationship, the grit in the eye, and thus we cannot use them as names any more.’

Binodini paused, cut the thread with her teeth and said, ‘How do I know, it is all up to you.’
Before he could come up with an answer, she quickly said, ‘Why did you suddenly come back home now?’

Mahendra answered, ‘How long can one be satisfied with the company of dead people?’

Binodini cut the thread once again with her teeth and murmured without raising her face, ‘So now you must hack into the hearts of the living!’

Mahendra had decided that he would engage Binodini in jest and conversation as usual. But she was in such a serious mood that he could not think of anything light and frivolous in answer. Seeing that she was bent on preserving a cold and hardened distance between the two of them, all he could think of was to do something to shake her implacable calm. His mind rushed headlong towards her. Instead of answering her previous words, he suddenly moved closer to her and asked, ‘Why are you leaving us? Have I done something wrong?’

Binodini moved slightly and raised her huge burning eyes to Mahendra, looking at him steadily as she said, ‘Everyone has responsibilities. When you went to the lodging house leaving us all, was that because we had done something wrong? Can I not go as well? Do I not have responsibilities?’

Mahendra could not think of a suitable answer. He asked after some time, ‘What responsibility have you got that you must leave?’

Binodini threaded her needle very carefully and said, ‘Only I know what responsibilities I have. Why should I have to list them for you?’

Mahendra sat quietly for a long time looking at a distant coconut palm through the window. He looked worried. Binodini continued with her sewing in silence. If she had dropped the needle at that moment it would have broken the silence. Mahendra spoke up after a long time. Binodini was startled by the sudden noise and pricked herself with her needle.

Mahendra said, ‘Will nothing convince you to stay?’

Binodini sucked the blood from her finger and said, ‘Why are you pleading like this? What difference will it make whether I stay or I go? What do you care?’

Her voice seemed to break slightly as she said this; she bent her head very close to her needlework and paid great attention to it – there was a glint of tears at the ends of the sweep of her eyelashes. The winter evening was giving way to the darkness of night outside the window.

Mahendra suddenly grabbed her hand and said in a choked voice, ‘If it did make a difference to me, would you stay?’

Binodini pulled her hand away quickly and moved even further from Mahendra. He was suddenly deeply aware of what he had done. His words seemed to mock him repeatedly like some horrible mistake. He bit his tongue and silenced it into shame.

At this time, Asha entered the silent room. Binodini immediately said to Mahendra, as though this had been what they had discussed only minutes before, ‘When you are all raising me to such heights, it is also my duty to give in to your request. I promise to not leave unless I am sent away.’

Asha was overjoyed at her husband’s success and embraced her friend. She said, ‘That is a promise that you must make to me three times, unless sent away, you will stay, you will stay, you will stay!’

বিদূষক/ Bidushak/The King’s Jester

বিদূষক

কাঞ্চীর রাজা কর্ণাট জয় করতে গেলেন। তিনি হলেন জয়ী। চন্দনে, হাতির দাঁতে, আর সোনামানিকে হাতি বোঝাই হল।

দেশে ফেরবার পথে বলেশ্বরীর মন্দির বলির রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে রাজা পুজো দিলেন।

পুজো দিয়ে চলে আসছেন– গায়ে রক্তবস্ত্র, গলায় জবার মালা, কপালে রক্তচন্দনের তিলক; সঙ্গে কেবল মন্ত্রী আর বিদূষক।

এক জায়গায় দেখলেন, পথের ধারে আমবাগানে ছেলেরা খেলা করছে।

রাজা তাঁর দুই সঙ্গীকে বললেন, ‘দেখে আসি, ওরা কী খেলছে।’

ছেলেরা দুই সারি পুতুল সাজিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলছে।

রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার সঙ্গে কার যুদ্ধ।’

তারা বললে, ‘কর্ণাটের সঙ্গে কাঞ্চীর।’

রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার জিত, কার হার।’

ছেলেরা বুক ফুলিয়ে বললে, ‘কর্ণাটের জিত, কাঞ্চীর হার।’

মন্ত্রীর মুখ গম্ভীর হল, রাজার চক্ষু রক্তবর্ণ, বিদূষক হা হা ক’রে হেসে উঠল।

রাজা যখন তাঁর সৈন্য নিয়ে ফিরে এলেন, তখনো ছেলেরা খেলছে।

রাজা হুকুম করলেন, ‘এক-একটা ছেলেকে গাছের সঙ্গে বাঁধো, আর লাগাও বেত।’

গ্রাম থেকে তাদের মা-বাপ ছুটে এল। বললে, ‘ওরা অবোধ, ওরা খেলা করছিল, ওদের মাপ করো।’

রাজা সেনাপতিকে ডেকে বললেন, ‘এই গ্রামকে শিক্ষা দেবে, কাঞ্চীর রাজাকে কোনোদিন যেন ভুলতে না পারে।’

এই বলে শিবিরে চলে গেলেন।

সন্ধেবেলায় সেনাপতি রাজার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। প্রণাম করে বললে, ‘মহারাজ, শৃগাল কুকুর ছাড়া এ গ্রামের কারো মুখে শব্দ শুনতে পাবে না।’

মন্ত্রী বললে, ‘মহারাজের মান রক্ষা হল।’

পুরোহিত বললে, ‘বিশ্বেশ্বরী মহারাজের সহায়।’

বিদূষক বললে, ‘মহারাজ, এবার আমাকে বিদায় দিন।’

রাজা বললেন, ‘কেন।’

বিদূষক বললে, ‘আমি মারতেও পারি নে, কাটতেও পারি নে, বিধাতার প্রসাদে আমি কেবল হাসতে পারি। মহারাজের সভায় থাকলে আমি হাসতে ভুলে যাব।’

king

The Jester

1

The king of Kanchi went to war against Karnat. After his victory he ordered his elephants to be loaded with sandalwood, ivory and precious gold from the vanquished kingdom.

On the way back to his lands, in gratitude he washed the very stones of the temple of the goddess Baleswari with blood from the sacrifices he made in her honour.

As he left the temple dressed in blood red silk, he wore marigolds around his neck and red sandalwood paste on his brow. With him were only two companions, his minister and his jester.

At one place by the road, there were boys playing in a grove of mango trees.

To his companions the king said, ‘Let me go and see what they are playing.’

2

The boys had arranged their toy soldiers in two rows and were playing at war.

The king asked, ‘Who fights with whom?’

They answered, ‘Karnat fights Kanchi.’

The king asked, ‘Who wins, and who is it that loses?’

The boys puffed their chest out in pride and said, Karnat wins, Kanchi loses.’

The minister grew sombre and the king’s eyes reddened with rage but the jester roared with laughter.

3

When the king came back from war with his army, the boys were still playing.

He ordered, ‘Tie each of them to a tree and have them caned.’

Their parents came running from the village. They wept, ‘These were innocents at play, please, forgive them!’

The king summoned his general and said, ‘Teach this village such a lesson that they never forget who the King of Kanchi is.’

He then went back to the camp to rest.

4

In the evening the general of the king’s armies stood before him, bowed his head and announced, ‘Oh King! You may go where you wish, for there is no other sound in the village tonight, but the barking of dogs and jackals.’

The minister declared, ‘The king’s honour has been upheld.’

The priest cackled, ‘The goddess is the king’s savior.’

The jester said, ‘Oh King! Give me permission now to leave.’

The king asked, ‘But why?’

The jester said, ‘I know little about hitting hard and even less about cutting down; by the grace of God all I know is how to laugh. But if I have to stay in this court I will certainly forget how to do even that!’

**

This and the other stories of Lipika were written in 1922.

চোখের বালি ২১/Chokher Bali 21

২১

ইতিমধ্যে আরো এক চিঠি আসিয়া উপস্থিত হইল।–

“তুমি আমার চিঠির উত্তর দিলে না? ভালোই করিয়াছ। ঠিক কথা তো লেখা যায় না; তোমার যা জবাব, সে আমি মনে মনে বুঝিয়া লইলাম। ভক্ত যখন তাহার দেবতাকে ডাকে, তিনি কি মুখের কথায় তাহার উত্তর দেন। দুখিনীর বিল্বপত্রখানি চরণতলে বোধ করি স্থান পাইয়াছে!

“কিন্তু ভক্তের পূজা লইতে গিয়া শিবের যদি তপোভঙ্গ হয়, তবে তাহাতে রাগ করিয়ো না, হৃদয়দেব! তুমি বর দাও, চোখ মেলিয়া চাও বা না চাও, জানিতে পার বা না পার, পূজা না দিয়া ভক্তের আর গতি নাই। তাই আজিও এই দু-ছত্র চিঠি লিখিলাম– হে আমার পাষাণ-ঠাকুর, তুমি অবিচলিত হইয়া থাকো।’–

মহেন্দ্র আবার চিঠির উত্তর লিখিতে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু আশাকে লিখিতে গিয়া বিনোদিনীর উত্তর কলমের মুখে আপনি আসিয়া পড়ে। ঢাকিয়া লুকাইয়া কৌশল করিয়া লিখিতে পারে না। অনেকগুলি ছিঁড়িয়া রাত্রের অনেক প্রহর কাটাইয়া একটা যদি বা লিখিল, সেটা লেফাফায় পুরিয়া উপরে আশার নাম লিখিবার সময় হঠাৎ তাহার পিঠে যেন কাহার চাবুক পড়িল– কে যেন বলিল,”পাষণ্ড, বিশ্বস্ত বালিকার প্রতি এমনি করিয়া প্রতারণা?” চিঠি মহেন্দ্র সহস্র টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল, এবং বাকি রাতটা টেবিলের উপর দুই হাতের মধ্যে মুখ ঢাকিয়া নিজেকে যেন নিজের দৃষ্টি হইতে লুকাইবার চেষ্টা করিল।

তৃতীয় পত্র– “যে একেবারেই অভিমান করিতে জানে না, সে কি ভালোবাসে। নিজের ভালোবাসাকে যদি অনাদর-অপমান হইতে বাঁচাইয়া রাখিতে না পারি, তবে সে ভালোবাসা তোমাকে দিব কেমন করিয়া।

“তোমার মন হয়তো ঠিক বুঝি নাই, তাই এত সাহস করিয়াছি। তাই যখন ত্যাগ করিয়া গেলে, তখনো নিজে অগ্রসর হইয়া চিঠি লিখিয়াছি; যখন চুপ করিয়া ছিলে, তখনো মনের কথা বলিয়া ফেলিয়াছি। কিন্তু তোমাকে যদি ভুল করিয়া থাকি, সে কি আমারই দোষ। একবার শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সব কথা মনে করিয়া দেখো দেখি, যাহা বুঝিয়াছিলাম, সে কি তুমিই বোঝাও নাই।

“সে যাই হোক, ভুল হোক সত্য হোক, যাহা লিখিয়াছি সে আর মুছিবে না, যাহা দিয়াছি সে আর ফিরাইতে পারিব না, এই আক্ষেপ। ছি ছি, এমন লজ্জাও নারীর ভাগ্যে ঘটে। কিন্তু তাই বলিয়া মনে করিয়ো না, ভালো যে বাসে সে নিজের ভালোবাসাকে বরাবর অপদস্থ করিতে পারে। যদি আমার চিঠি না চাও তো থাক্, যদি উত্তর না লিখিবে তবে এই পর্যন্ত–‘

ইহার পর মহেন্দ্র আর থাকিতে পারিল না। মনে করিল, “অত্যন্ত রাগ করিয়াই ঘরে ফিরিয়া যাইতেছি। বিনোদিনী মনে করে, তাহাকে ভুলিবার জন্যই ঘর ছাড়িয়া পালাইয়াছি!’ বিনোদিনীর সেই স্পর্ধাকে হাতে হাতে অপ্রমাণ করিবার জন্যই তখনি মহেন্দ্র ঘরে ফিরিবার সংকল্প করিল।

এমন সময় বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। বিহারীকে দেখিবামাত্র মহেন্দ্রের ভিতরের পুলক যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিল। ইতিপূর্বে নানা সন্দেহে ভিতরে ভিতরে বিহারীর প্রতি তাহার ঈর্ষা জন্মিতেছিল, উভয়ের বন্ধুত্ব ক্লিষ্ট হইয়া উঠিতেছিল। পত্রপাঠের পর আজ সমস্ত ঈর্ষাভার বিসর্জন দিয়া বিহারীকে সে অতিরিক্ত আবেগের সহিত আহ্বান করিয়া লইল। চৌকি হইতে উঠিয়া, বিহারীর পিঠে চাপড় মারিয়া, তাহার হাত ধরিয়া, তাহাকে একটা কেদারার উপরে টানিয়া বসাইয়া দিল।

কিন্তু বিহারীর মুখ আজ বিমর্ষ। মহেন্দ্র ভাবিল, বেচারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে বিনোদিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়াছে এবং সেখান হইতে ধাক্কা খাইয়া আসিয়াছে। মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারী, এর মধ্যে আমাদের ওখানে গিয়াছিলে?”

বিহারী গম্ভীরমুখে কহিল, “এখনি সেখান হইতে আসিতেছি।”

মহেন্দ্র বিহারীর বেদনা কল্পনা করিয়া মনে মনে একটু কৌতুকবোধ করিল। মনে মনে কহিল, “হতভাগ্য বিহারী। স্ত্রীলোকের ভালোবাসা হইতে বেচারা একেবারে বঞ্চিত।’ বলিয়া নিজের বুকের পকেটের কাছটায় এক বার হাত দিয়া চাপ দিল– ভিতর হইতে তিনটে চিঠি খড়খড় করিয়া উঠিল।

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “সবাইকে কেমন দেখিলে?”

বিহারী তাহার উত্তর না করিয়া কহিল, “বাড়ি ছাড়িয়া তুমি যে এখানে?”

মহেন্দ্র কহিল, “আজকাল প্রায় নাইট-ডিউটি পড়ে– বাড়িতে অসুবিধা হয়।”

বিহারী কহিল, “এর আগেও তো নাইট-ডিউটি পড়িয়াছে, কিন্তু তোমাকে তো বাড়ি ছাড়িতে দেখি নাই।”

মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “মনে কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে না কি।”

বিহারী কহিল, “না, ঠাট্টা নয়, এখনি বাড়ি চলো।”

মহেন্দ্র বাড়ি ফিরিবার জন্য উদ্যত হইয়াই ছিল; বিহারীর অনুরোধ শুনিয়া সে হঠাৎ নিজেকে ভুলাইল, যেন বাড়ি যাইবার জন্য তাহার কিছুমাত্র আগ্রহ নাই। কহিল, “সে কি হয়, বিহারী। তা হলে আমার বৎসরটাই নষ্ট হইবে।”

বিহারী কহিল, “দেখো মহিনদা, তোমাকে আমি এতটুকু বয়স হইতে দেখিতেছি, আমাকে ভুলাইবার চেষ্টা করিয়ো না। তুমি অন্যায় করিতেছ।”

মহেন্দ্র। কার প’রে অন্যায় করিতেছি জজসাহেব!

বিহারী রাগ করিয়া বলিল, “তুমি যে চিরকাল হৃদয়ের বড়াই করিয়া আসিয়াছ, তোমার হৃদয় গেল কোথায় মহিনদা।”

মহেন্দ্র। সম্প্রতি কালেজের হাসপাতালে।

বিহারী। থামো মহিনদা, থামো। তুমি এখানে আমার সঙ্গে হাসিয়া ঠাট্টা করিয়া কথা কহিতেছ, সেখানে আশা তোমার বাহিরের ঘরে, অন্দরের ঘরে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বেড়াইতেছে।

আশার কান্নার কথা শুনিয়া হঠাৎ মহেন্দ্রের মন একটা প্রতিঘাত পাইল। জগতে আর যে কাহারো সুখদুঃখ আছে, সে কথা তাহার নূতন নেশার কাছে স্থান পায় নাই। হঠাৎ চমক লাগিল, জিজ্ঞাসা করিল, “আশা কাঁদিতেছে কী জন্য।”

বিহারী বিরক্ত হইয়া কহিল, “সে কথা তুমি জান না, আমি জানি?”

মহেন্দ্র। তোমার মহিনদা সর্বজ্ঞ নয় বলিয়া যদি রাগ করিতেই হয় তো মহিনদার সৃষ্টিকর্তার উপর রাগ করো।

তখন বিহারী যাহা দেখিয়াছিল, তাহা আগাগোড়া বলিল। বলিতে বলিতে বিনোদিনীর বক্ষোলগ্ন আশার সেই অশ্রুসিক্ত মুখখানি মনে পড়িয়া বিহারীর প্রায় কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল।

বিহারীর এই প্রবল আবেগ দেখিয়া মহেন্দ্র আশ্চর্য হইয়া গেল। মহেন্দ্র জানিত বিহারীর হৃদয়ের বালাই নাই — এ উপসর্গ কবে জুটিল। যেদিন কুমারী আশাকে দেখিতে গিয়াছিল, সেই দিন হইতে নাকি। বেচারা বিহারী। মহেন্দ্র মনে মনে তাহাকে বেচারা বলিল বটে, কিন্তু দুঃখবোধ না করিয়া বরঞ্চ একটু আমোদ পাইল। আশার মনটি একান্তভাবে যে কোন্ দিকে, তাহা মহেন্দ্র নিশ্চয় জানিত। “অন্য লোকের কাছে যাহারা বাঞ্ছার ধন, কিন্তু আয়ত্তের অতীত, আমার কাছে তাহারা চিরদিনের জন্য আপনি ধরা দিয়াছে,’ ইহাতে মহেন্দ্র বক্ষের মধ্যে একটা গর্বের স্ফীতি অনুভব করিল।

মহেন্দ্র বিহারীকে কহিল, “আচ্ছা চলো, যাওয়া যাক। তবে একটা গাড়ি ডাকো।”

img_9613_1_1

21

In the meantime another letter arrived.

This said -‘You did not answer my letter. You have done the right thing for there are some things that cannot be expressed in writing; I know what your answer is already. When the devotee calls upon God, does God have to speak his answer? I know that my supplication has found its place at your feet!’

‘But if Shiva’s meditation should be disturbed by the devotion of a supplicant do not be angry with me, ruler of my heart! Give me something, whether you want to open your eyes to me or not, whether you wish to know my heart or not, I cannot live without offering myself to you. That is why I am writing to you again – though you may remain unmoved, my stony hearted lover.’

Mahendra started to write an answer once again. But as he wrote to Asha, answers that were really meant for Binodini seemed to pour out of his pen. He did not know how to write secret coded messages. After tearing up many sheets of paper over many hours he finally completed a letter. Just as he wrote Asha’s name on the envelope, he felt a sudden twinge of conscience like a whip across his back; an inner voice that seemed to say, ‘How could you betray that faithful one like this!’ He tore the letter up into many pieces and spent the rest of the night with his face shielded in his arms on his desk as if he was trying to hide from his very own eyes.

The third letter arrived; ‘Does the one who does not know how to remonstrate know how to love? If I cannot save my love from neglect, how will I offer it to you?’

‘Perhaps I did not understand your motives when you left and this gave me the courage to write such letters to you. Perhaps that is why even after you abandoned me I still picked up the pen to write the first letter; when you chose silence in response, I still told you of what was in my heart. But if I have misunderstood you, is it my fault alone? If you think of all that has passed, did you not give me the licence to think thus of you?’

‘Nevertheless I regret that whatever I have done, whether right or wrong, and all that I have already written is not to be erased. Nor can I take back what I have already given. For shame that this should happen to a woman! But do not feel that I am going to offer my love again and again so that it may be spurned. If you do not want me to write to you or even reply to me, this is where it ends..’

Mahendra could not stay away any more. He convinced himself that he was returning under duress and in a state of great anger. If Binodini had the audacity to think that he had left home to avoid her, Mahendra would immediately go back to prove her wrong!

Bihari arrived. Mahendra felt even more elated when he saw him. Lately he had been jealous of Bihari for various reasons and their friendship had grown strained. After reading the letter today, he cast aside all his former suspicions and envy and welcomed Bihari with some excessive feeling. He left his seat, thumped Bihari on the back, shook his hand and made him sit down on a chair.

But Bihari was in a sombre mood. Mahendra thought he might have been rejected by Binodini and asked, ‘Bihari, have you been to our house lately?’

Bihari answered quietly, ‘I have just been there.’

Mahendra felt a sense of amusement at the possible reason behind Bihari’s unhappiness. He said to himself, ‘Poor Bihari! He is deprived of a woman’s love.’ He patted his own pocket to hear the comforting rustle of the three letters within.

Mahendra asked, ‘How did you find everyone there?’

Bihari did not answer his question and said instead, ‘Why are you living here instead of at home?’

Mahendra answered, ‘I frequently have to work at night – it is not convenient to do that from home.’

Bihari retorted, ‘You have had night shifts before, but I have never seen you live in lodgings previously.’

Mahendra smiled and said, ‘Why, are you suspecting me of something else?’

Bihari answered, ‘No, I am not joking, you need to go home right away.’

Mahendra had been prepared to do so; but when he heard the plea in Bihari’s voice he convinced himself otherwise and felt that he did not want to go home at all. He said, ‘How is that possible, Bihari! I will lose a whole year then!’

Bihari said, ‘Look Mahendra, I have known since you were a little child, do not try to pull the wool over my eyes. You are doing something wrong.’

Mahendra: Whom am I wronging, dear Judge?

Bihari said with some annoyance, ‘You have always boasted about your kind heart, where did that kindhearted spirit go?’

Mahendra: Most recently, to the hospital.

Bihari: Stop, Mahendra! You sit here cracking jokes with me while at home Asha wanders through the house crying and unhappy.

Mahendra felt a sudden jolt when he heard of Asha’s tears. Full of his new obsession with Binodini, he had been unaware of the existence of anyone else’s feelings in the world. He was startled into asking. ‘Why is she crying?’

Bihari said with some annoyance, ‘If you do not know that, why am I supposed to?

Mahendra: If you have to be angry with me for not knowing everything, do direct your anger towards my creator.’

Then Bihari told him about all that he had seen. His voice almost broke as he recalled Asha’s tear streaked face as he had seen her, in Binodini’s embrace.

Mahendra was amazed at this strong emotional reaction on Bihari’s part. He had known Bihari to be insensitive all along – and wondered when this change had occurred. Was it the day they had gone to see Asha for the first time? Poor Bihari, wretched Bihari. Mahendra might have thought of him as wretched but in truth he felt more happiness than pity. He knew where Asha’s affections were entirely directed. Mahendra felt a sense of pride in knowing that although she was desired by another, she was forever his, and would never to be anyone else’s.

He said to Bihari, ‘Fine, then let us get a carriage and go’.

চোখের বালি ২০/ Chokher Bali 20

২০

অনতিকাল পরেই মহেন্দ্র তাহার ছাত্রাবাসে চেনা হাতের অক্ষরে একখানি চিঠি পাইল। দিনের বেলা গোলমালের মধ্যে খুলিল না– বুকের কাছে পকেটের মধ্যে পুরিয়া রাখিল। কালেজে লেকচার শুনিতে শুনিতে, হাসপাতাল ঘুরিতে ঘুরিতে, হঠাৎ এক-একবার মনে হইতে লাগিল, ভালোবাসার একটা পাখি তাহার বুকের নীড়ে বাসা করিয়া ঘুমাইয়া আছে। তাহাকে জাগাইয়া তুলিলেই তাহার সমস্ত কোমল কূজন কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিবে।

সন্ধ্যায় এক সময় মহেন্দ্র নির্জন ঘরে ল্যাম্পের আলোকে চৌকিতে বেশ করিয়া হেলান দিয়া আরাম করিয়া বসিল। পকেট হইতে তাহার দেহতাপতপ্ত চিঠিখানি বাহির করিয়া লইল। অনেকক্ষণ চিঠি না খুলিয়া লেফাফার উপরকার শিরোনামা নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিল। মহেন্দ্র জানিত, চিঠির মধ্যে বেশি কিছু কথা নাই। আশা নিজের মনের ভাব ঠিকমতো ব্যক্ত করিয়া লিখিতে পারিবে, এমন সম্ভাবনা ছিল না। কেবল তাহার কাঁচা অক্ষরে বাঁকা লাইনে তাহার মনের কোমল কথাগুলি কল্পনা করিয়া লইতে হইবে। আশার কাঁচা হাতে বহুযত্নে লেখা নিজের নামটি পড়িয়া মহেন্দ্র নিজের নামের সঙ্গে যেন একটা রাগিনী শুনিতে পাইল– তাহা সাধ্বী নারী-হৃদয়ের অতি নিভৃত বৈকুণ্ঠলোক হইতে একটি নির্মল প্রেমের সংগীত।

এই দুই-একদিনের বিচ্ছেদে মহেন্দ্রের মন হইতে দীর্ঘ-মিলনের সমস্ত অবসাদ দূরহইয়া সরলা বধূর নবপ্রেমে উদ্ভাসিত সুখস্মৃতি আবার উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। শেষাশেষি প্রাত্যহিক ঘরকন্নার খুঁটিনাটি অসুবিধা তাহাকে উত্ত্যক্ত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, সে-সমস্ত অপসারিত হইয়া কেবলমাত্র কর্মহীন কারণহীন একটি বিশুদ্ধ প্রেমানন্দের আলোকে আশার মানসীমূর্তি তাহার মনের মধ্যে প্রাণ পাইয়া উঠিয়াছে।

মহেন্দ্র অতি ধীরে ধীরে লেফাফা ছিঁড়িয়া চিঠিখানা বাহির করিয়া নিজের ললাটে কপোলে বুলাইয়া লইল। একদিন মহেন্দ্র যে-এসেন্স আশাকে উপহার দিয়াছিল, সেই এসেন্সের গন্ধ চিঠির কাগজ হইতে উতলা দীর্ঘনিশ্বাসের মতো মহেন্দ্রের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিল।

ভাঁজ খুলিয়া মহেন্দ্র চিঠি পড়িল। কিন্তু এ কী। যেমন বাঁকাচোরা লাইন, তেমন সাদাসিধা ভাষা নয় তো। কাঁচা-কাঁচা অক্ষর, কিন্তু কথাগুলি তো তাহার সঙ্গে মিলিল না। লেখা আছে–

“প্রিয়তম, যাহাকে ভুলিবার জন্য চলিয়া গেছ,এ লেখায় তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিব কেন। যে লতাকে ছিঁড়িয়া মাটিতে ফেলিয়া দিলে, সে আবার কোন্ লজ্জায় জড়াইয়া উপরে উঠিতে চেষ্টা করে। সে কেন মাটির সঙ্গে মাটি হইয়া মিশিয়া গেল না!

“কিন্তু এটুকুতে তোমার কী ক্ষতি হইবে, নাথ। নাহয় ক্ষণকালের জন্য মনে পড়িলই বা। মনে তাহাতে কতটুকুই বা বাজিবে। আর, তোমার অবহেলা যে কাঁটার মতো আমার পাঁজরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া রহিল। সকল দিন, সকল রাত, সকল কাজ, সকল চিন্তার মধ্যে যে দিকে ফিরি, সেই দিকেই যে আমাকে বিঁধিতে লাগিল। তুমি যেমন করিয়া ভুলিলে, আমাকে তেমনি করিয়া ভুলিবার একটা উপায় বলিয়া দাও।

“নাথ, তুমি যে আমাকে ভালোবাসিয়াছিলে, সে কি আমারই অপরাধ। আমি কি স্বপ্নেও এত সৌভাগ্য প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। আমি কোথা হইতে আসিলাম, আমাকে কে জানিত। আমাকে যদি না চাহিয়া দেখিতে, আমাকে যদি তোমার ঘরে বিনা-বেতনের দাসী হইয়া থাকিতে হইত, আমি কি তোমাকে কোনো দোষ দিতে পারিতাম। তুমি নিজেই আমার কোন্ গুণে ভুলিলে প্রিয়তম, কী দেখিয়া আমার এত আদর বাড়াইলে। আর, আজ বিনা-মেঘে যদি বজ্রপাতই হইল, তবে সে বজ্র কেবল দগ্ধ করিল কেন। একেবারে দেহমন কেন ছাই করিয়া দিল না।

“এই দুটো দিনে অনেক সহ্য করিলাম, অনেক ভাবিলাম, কিন্তু, একটা কথা বুঝিতে পারিলাম না-ঘরে থাকিয়াও কি তুমি আমাকে ফেলিতে পারিতে না। আমার জন্যও কি তোমার ঘর ছাড়িয়া যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল। আমি কি তোমারএতখানি জুড়িয়া আছি। আমাকে তোমার ঘরের কোণে, তোমার দ্বারের বাহিরে ফেলিয়া রাখিলেও কি আমি তোমার চোখে পড়িতাম। তাই যদি হয়, তুমি কেন গেলে, আমার কি কোথাও যাইবার পথ ছিল না। ভাসিয়া আসিয়াছি, ভাসিয়া যাইতাম।’

এ কী চিঠি। এ ভাষা কাহার, তাহা মহেন্দ্রের বুঝিতে বাকি রহিল না। অকস্মাৎ আহত মূর্ছিতের মতো মহেন্দ্র সে-চিঠিখানি লইয়া স্তম্ভিত হইয়া রহিল। যে-লাইনে রেলগাড়ির মতো তাহার মন পূর্ণবেগে ছুটিয়াছিল, সেই লাইনেই বিপরীত দিক হইতে একটা ধাক্কা খাইয়া লাইনের বাহিরে তাহার মনটা যেন উল্টাপাল্টা স্তূপাকার বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিল।

অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া আবার সে দুইবার তিনবার করিয়া পড়িল। কিছুকাল যাহা সুদূর আভাসের মতো ছিল, আজ তাহা যেন ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। তাহার জীবনাকাশের এক কোণে যে ধূমকেতুটা ছায়ার মতো দেখাইতেছিল, আজ তাহার উদ্যত বিশাল পুচ্ছ অগ্নিরেখায় দীপ্যমান হইয়া দেখা দিল।

এ চিঠি বিনোদিনীরই। সরলা আশা নিজের মনে করিয়া তাহা লিখিয়াছে। পূর্বে যে কথা সে কখনো ভাবে নাই, বিনোদিনীর রচনামত চিঠি লিখিতে গিয়া সেই-সব কথা তাহার মনে জাগিয়া উঠিতে লাগিল। নকল-করা কথা বাহির হইতে বদ্ধমূল হইয়া তাহার আন্তরিক হইয়া গেল; যে-নূতন বেদনার সৃষ্টি হইল, এমন সুন্দর করিয়া তাহা ব্যক্ত করিতে আশা কখনোই পারিত না। সে ভাবিতে লাগিল, “সখী আমার মনের কথা এমন ঠিকটি বুঝিল কী করিয়া। কেমন করিয়া এমন ঠিকটি প্রকাশ করিয়া বলিল।’ অন্তরঙ্গ সখীকে আশা আরো যেন বেশি আগ্রহের সঙ্গে আশ্রয় করিয়া ধরিল, কারণ, যে-ব্যথাটা তাহার মনের মধ্যে, তাহার ভাষাটি তাহার সখীর কাছে– সে এতই নিরুপায়।

মহেন্দ্র চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বিনোদিনীর উপর রাগ করিতে অনেক চেষ্টা করিল, মাঝে থেকে রাগ হইল আশার উপর। “দেখো দেখি, আশার এ কী মূঢ়তা, স্বামীর প্রতি এ কী অত্যাচার।’ বলিয়া চৌকিতে বসিয়া পড়িয়া প্রমাণস্বরূপ চিঠিখানা আবার পড়িল। পড়িয়া ভিতরে ভিতরে একটা হর্ষসঞ্চার হইতে লাগিল। চিঠিখানাকে সে আশারই চিঠি মনে করিয়া পড়িবার অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু এ ভাষায় কেনোমতেই সরলা আশাকে মনে করাইয়া দেয় না। দু-চার লাইন পড়িবামাত্র একটা সুখোন্মাদকর সন্দেহ ফেনিল মদের মতো মনকে চারি দিকে ছাপাইয়া উঠিতে থাকে। এই প্রচ্ছন্ন অথচ ব্যক্ত, নিষিদ্ধ অথচ নিকটাগত, বিষাক্ত অথচ মধুর, একই কালে উপহৃত অথচ প্রত্যাহৃত প্রেমের আভাস মহেন্দ্রকে মাতাল করিয়া তুলিল। তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল, নিজের হাতে-পায়ে কোথাও এক জায়গায় ছুরি বসাইয়া বা আর কিছু করিয়া নেশা ছুটাইয়া মনটাকে আর-কোনো দিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়। টেবিলে সজোরে মুষ্টি বসাইয়া চৌকি হইতে লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, “দূর করো, চিঠিখানা পুড়াইয়া ফেলি।” বলিয়া চিঠিখানি ল্যাম্পের কাছাকাছি লইয়া গেল। পুড়াইল না, আর-একবার পড়িয়া ফেলিল। পরদিন ভৃত্য টেবিল হইতে কাগজপোড়া ছাই অনেক ঝাড়িয়া ফেলিয়াছিল। কিন্তু তাহা আশার চিঠির ছাই নহে, চিঠির উত্তর দিবার অনেকগুলো অসম্পূর্ণ চেষ্টাকে মহেন্দ্র পুড়াইয়া ছাই করিয়াছে।

pic3-big

20

Soon after moving to the hostel, Mahendra received a letter in a handwriting that was familiar to him. He did not open it during the day as he was busy, tucking it into his shirt pocket where it stayed, close to his heart. As he listened to lectures and went on rounds in the hospital, every so often he thought of the letter, nestling against his chest like a bird singing of love. When awakened, its sweet song would fill his ears.

In the evening he finally sat down by a lamp in the privacy of his own room and leaned back on the couch comfortably. Taking out the letter which was still warm from being next to his skin, he looked at his name on the envelope for a long time without opening it. He knew there would be little of importance in the letter. There was hardly any chance of Asha being able to communicate her own feelings in writing. He would have to imagine the gentle words that came straight from her heart from the childish letters scrawled in irregular lines on the paper. As he read his own name in her inexpertly formed letters, he imagined a tune, one that surely came from a secret paradise within her unblemished soul carrying her love to him.

The couple of days that they had been apart had revived the memories of first love with his innocent bride for Mahendra sweeping away all the ennui he had been feeling. Lately, little mishaps in Asha’s housekeeping had started plaguing him; these feelings were now replaced by a pure flame of love that burned without cause or respite and brought Asha’s memories to life.

Mahendra tore the envelope open very slowly and held the letter to his forehead and his cheek. A perfume that he had once presented to Asha seemed to rise from the paper and beat against his soul like an anxious sigh.

He unfolded the letter and read it. Now he was amazed; the lines might have been irregular but the language was far from simple. The letters were unformed, but the words were not. It read –

‘Dearest, why should I use this letter to remind you of the one whom you try to forget by leaving? Why should the vine that you uprooted try to climb upwards again? Why did she not become one with the dust where you left her?

But why will this hurt you in any case, my love. There is little harm in reminding you for a few moments. You will feel very little pain. But what of your neglect towards me that pierces my side like a thorn; all day, all night, in work and in thought, wherever I turn, it hurts. Tell me a way to forget this pain, so that I too might forget you as you have forgotten me.

My love, is it my fault that you loved me? Never in my wildest dreams did I hope for such good fortune. Where did I come from, who had ever heard of me? If you had not looked at me, if you had made me your servant and not bothered to pay me, would I have blamed you? Why did you fall in love with me dearest, why did you love me so much? Today, you leaving me feels like thunder from a clear sky. Why just singe me with lightning, why not reduce me to ashes as well?

I have borne a lot in the past two days. I have had time to think too; but one thing that I could not fathom is why you could not discard me and still stay at home. Why did you have to leave home for my sake? Am I such an important part of you? Would you have constantly noticed me even if you had cast me to one side? If the answer is yes, then why did you have to go and why not me? I came to you on a tide of flotsam; I could have left in the same way.’

What letter was this! Mahendra was left in no doubt as to who the true author of the words was. He sat in stunned silence as though he had suffered a sudden blow. His thoughts were pushed from the path they had taken since the receipt of the letter; this sudden realisation was enough to reduce them to uncomprehending confusion.

After spending a long time in thought, he read the letter two or three more times again. What had been a distant possibility for some time now seemed very real. The comet that had been casting a shadow over his life now showed its vast burning trail.

In reality this was Binodini’s letter to Mahendra. Unsuspectingly, Asha had merely written it down as her own. Thoughts that she had never been able to form came to mind as she wrote down what Binodini dictated to her. Copied words became her own; she could never have expressed her new found sorrow so beautifully. She thought, ‘How does my friend know my mind so well! How does she give voice to the words that I feel!’ She clung with greater eagerness to Binodini as she was the one that had the language to express Asha’s pain. This is how truly helpless Asha was.

Mahendra got up from the bed with a frown, trying as hard as he could to feel angry with Binodini; but his fury grew against Asha instead. He thought, ‘What stupidity, how else will she torment me!’ He then sat down to read the letter again to justify his anger. He now began to feel a certain happiness. He read it again and again, each time imagining them as Asha’s words, but they did not bring her guileless nature to mind at all. Each time after he had read a few lines, his suspicions would deliciously brim over in his mind like a intoxicating drink. He became drunk with this sensation of love, at once expressed yet hidden, forbidden yet available, sweet as poison, a gift that was being offered but also being withheld. He felt like inflicting pain on himself to loosen the spell on his mind so that he could think of other things. He brought his fist down on the table heavily and jumped to his feet, declaring, ‘Enough, let me burn the damned thing!’ He held the letter to the lamp flame; instead of burning it he read it again. The fellow cleaning the table the next day removed a lot of ash from burnt paper. But these were not from the letter; they were from Mahendra’s unsuccessful attempts at answering it.

Image:http://www.ngmaindia.gov.in/sh-miniature-painting.asp