ছাত্রের পরীক্ষা / Cchatrer Porikkha/ The Student’s Test

ছাত্রের পরীক্ষা

 

 

ছাত্র শ্রীমধুসূদন

 

 

 

শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

 

 

 

অভিভাবকের প্রবেশ

 

 

 

অভিভাবক।

 

মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু?

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

আজ্ঞে, মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে, কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত। কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না।

 

 

 

অভিভাবক।

 

বটে! তা, আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

তা , দেখুন-না।

 

 

 

মধুসূদন।

 

(স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে। আজ এর শোধ তুলব। ওঁকে আমি তাড়াব।

 

 

 

অভিভাবক।

 

কেমন রে মোধো, পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো?

 

 

 

মধুসূদন।

 

মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি।

 

 

 

মধুসূদন।

 

যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

একটা উদাহরণ দে।

 

 

 

মধুসূদন।

 

কেঁচো!

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

(চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

 

 

 

অভিভাবক।

 

রসুন মশায়, এখন কিছু বলবেন না।

 

 

 

মধুসূদনের প্রতি

 

 

 

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ; আচ্ছা, কাননে কী ফোটে বলো দেখি?

 

 

 

মধুসূদন।

 

কাঁটা।

 

 

 

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

 

 

 

কী মশায়, মারেন কেন? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে? ইতিহাসে কী বলে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

পোকায়।

 

 

 

বেত্রাঘাত

 

 

 

আজ্ঞে, মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি– শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন, সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন।

 

 

 

প্রদর্শন।

 

কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

 

 

 

অভিভাবক।

 

ব্যাকরণ মনে আছে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

আছে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

“কর্তা’ কী, তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি।

 

 

 

মধুসূদন।

 

আজ্ঞে, কর্তা ওপাড়ার জয়মুন্‌শি।

 

 

 

অভিভাবক।

 

কেন বলো দেখি।

 

 

 

মধুসূদন।

 

তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

(সরোষে) তোমার মাথা!

 

 

 

পৃষ্ঠে বেত্র

 

 

 

মধুসূদন।

 

(চমকিয়া) আজ্ঞে, মাথা নয়, ওটা পিঠ।

 

 

 

অভিভাবক।

 

ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে?

 

 

 

মধুসুদন।

 

জানি নে।

 

 

 

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

 

 

 

মধুসদন।

 

ওটা বিলক্ষণ জানি– ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ।

 

 

 

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

 

 

 

অভিভাবক।

 

অঙ্কশিক্ষা হয়েছে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

হয়েছে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, তোমাকে সাড়ে ছ’টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে,পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে। একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে, কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

একটাও নয়।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

কেমন করে।

 

 

 

মধুসূদন।

 

সবগুলো খেয়ে ফেলব। দিতে পারব না।

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে, যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া, মেরে তোমার পিঠ লাল করব, তবে তুমি সিধে হবে!

 

 

 

মধুসূদন।

 

আজ্ঞে, মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায়।

 

 

 

অভিভাবক।

 

কালাচাঁদবাবু, ওটা আপনার ভ্রম। মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয়। কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না, কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায়। অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না। কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই। আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন, দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক, তার পরে আমিই ওকে পড়াব।

 

 

 

মধুসূদন।

 

( স্বগত) আঃ, বাঁচা গেল।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম, কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার। ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই, সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয়।

 

 

 

শ্রাবণ ১২৯২

***

The Student’s Test

 

 

Student: Master Madhusudan
Tutor: Kalachand Master.
Madhu’s guardian’s enters.

 

Guardian: How is Madhusudan doing, Kalachand babu?

Kalachand: Even though he is extremely naughty, he is very strong academically. I never have to repeat things. Once I have gone over a topic with him he never forgets it.

Guardian: Really? Well. I will test him with some questions today.

Kalachand: Yes, please go ahead by all means.

Madhusudan (to himself): You gave me such a thrashing yesterday that my back is still aching. I will take revenge today. I will get rid of you!

Guardian: So, Modho, do you remember all your old lessons?

Madhusudan: I remember everything that the teacher said.

Guardian: So, tell me what a plant is.

Madhusudan: Things that appear out of the ground.

Guardian: And an example of that would be…

Madhusudan: An earthworm.

Kalachand (fiercely): What did you say?

Guardian: Wait now, do not say anything.

To Madhu: You have studied the poetry primer: tell me please, what draws our attention in the garden?

Madhusudan: Thorns

(The cane in Kalachand’s grasp comes down angrily)

Madhusudan: Why are you hitting me? Am I lying?

Guardian: What destroyed Sirajuddaulah? What does history tell us?

Madhusudan: Termites

(The cane swishes again)

Pardon me, but I am getting beaten for no reason – why just Sirajuddaulah, the whole history book has been ruined by termites. Here, have a look.

(The book is brought out, Kalachand scratches his head)

Guardian: Do you remember your grammar lessons?

Madhusudan: Yes

Guardian: Explain what first person means with an example.

Madhusudan: That would be Joy Munshi from down the street.

Guardian: Why is that?

Madhusudan: Because he is always talking about himself.

Kalachand (angrily): Your foot!

(Hitting Madhu on the back with his cane)

Madhusudan (startled): That is not my foot, that is my back.

Guardian: What is a portmanteau word?

Madhusudan: I do not know.

Kalachand shakes the cane at him.

Madhusudan: I know that! It is a dangling participle.

 

His guardian smiles while Kalachand frowns.

Guardian: Have you had lessons in mathematics?
Madhusudan: Yes.

Guardian: You are given six and half sweets and told that you can eat as many as you can in five minutes and give the rest to your younger brother. You take two minutes to eat one sweet, how many then will you give him?

Madhusudan: None!

Kalachand: How did you arrive at that answer?

Madhusudan: I would eat them all. I would not be giving any away.

Guardian: Now, if a tree grows a quarter of an inch every day then how tall will a tree be in a year if it was ten inches tall on the first day of that year?

Madhusudan: I could not tell you what the final height would be if the tree was bent. But if it grew straight then one needs to measure its height to find out the answer: and if it dried up in that time, then the question does not arise at all.

Kalachand: The only way you will apply yourself is with a beating! Scoundrel, you will learn once I have beaten you black and blue!

Madhusudan: Even upright things can become bent through punishment.

Guardian: That is where you have made a mistake. Little can be achieved through corporal punishment. As the saying goes, a donkey cannot be beaten into becoming a horse but a horse may be broken down and made to follow orders. Most boys have the ability to learn, but most teachers cannot teach. The student gets beaten into submission. You may take your cane and go, let his body recover a bit. After that I will tutor him.

Madhusudan to himself: Freedom at last.

Kalachand: Thank God for that! Teaching this boy is hard work, pure manual labour. I get so little from teaching a boy for thirty days, I could make double that in a day if I dug earth for a living.

 

Shravan 1292/ AD 1885

প্রভু, বলো বলো কবে/ Prabhu, bawlo bawlo kawbe/ Lord, I beseech you, tell me when

প্রভু,   বলো বলো কবে

তোমার    পথের ধুলার রঙে রঙে আঁচল রঙিন হবে।

              তোমার বনের রাঙা ধূলি  ফুটায় পূজার কুসুমগুলি,

    সেই ধূলি হায় কখন আমায় আপন করি’ লবে?

    প্রণাম দিতে চরণতলে  ধুলার কাঙাল যাত্রীদলে

    চলে যারা, আপন ব’লে চিনবে আমায় সবে॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1342
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1936
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

Lord, I beseech you, tell me when

My robes will turn red in the dust that rises from the path that leads to you

              The red dust in your forests takes the form of the blooms that I offer at your feet

    When will that dust alas accept me as one of its own?

    Those who journey to your feet, craving the dust as a blessing

    They too will then know me on sight.

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written: 1936
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link, to hear Suchitra Mitra:

This entry was posted on September 4, 2014, in Prayer/Puja.

তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

Translated book nominated for IBBY Honour List 2020!

About The Adventures of Kakababu

After a secret mission in Afghanistan ends in a terrible accident, Raja Roychowdhury, fondly known as Kakababu, resigns as the director of the Archaeological Survey of India and goes home to his second-hand books. But the desire to hunt down old, unsolved mysteries of the world refuses to leave him alone. Despite living with an amputated leg, Kakababu insists on taking biannual holidays to remote, little-known areas – and refuses to tell anyone what he does there. Now that he’s old enough, Shontu, Kakababu’s nephew, has finally been allowed to accompany Kakababu on these mysterious trips. And he cannot wait for the thrilling adventures to begin!

In ‘The Emperor’s Lost Head’, Kakababu takes Shontu to Kashmir to find a hidden sulphur mine. Except that that’s a lie, and Shontu has no idea how to get his uncle to admit the truth. ‘The King of the Emerald Isle’ finds uncle and nephew on an uncharted island in the Indian Ocean. Stubbornly secretive as always, Kakababu refuses to tell Shontu what has brought him to the dangerous island. Is he ready for the answers he might find?Kakababu

 

HarperCollins Children’s Books on IBBY Honours List 2020

প্রথম পূজা/Prothom Puja/ The First Puja

 

ত্রিলোকেশ্বরের মন্দির।

 

লোকে বলে স্বয়ং বিশ্বকর্মা তার ভিত-পত্তন করেছিলেন

 

কোন্‌ মান্ধাতার আমলে,

 

স্বয়ং হনুমান এনেছিলেন তার পাথর বহন করে।

 

ইতিহাসের পণ্ডিত বলেন, এ মন্দির কিরাত জাতের গড়া,

 

এ দেবতা কিরাতের।

 

একদা যখন ক্ষত্রিয় রাজা জয় করলেন দেশ

 

দেউলের আঙিনা পূজারিদের রক্তে গেল ভেসে,

 

দেবতা রক্ষা পেলেন নতুন নামে নতুন পূজাবিধির আড়ালে–

 

হাজার বৎসরের প্রাচীন ভক্তিধারার স্রোত গেল ফিরে।

 

কিরাত আজ অস্পৃশ্য, এ মন্দিরে তার প্রবেশপথ লুপ্ত।

 

 

 

কিরাত থাকে সমাজের বাইরে,

 

নদীর পূর্বপারে তার পাড়া।

 

সে ভক্ত, আজ তার মন্দির নেই, তার গান আছে।

 

নিপুণ তার হাত, অভ্রান্ত তার দৃষ্টি।

 

সে জানে কী করে পাথরের উপর পাথর বাঁধে,

 

কী করে পিতলের উপর রুপোর ফুল তোলা যায়–

 

কৃষ্ণশিলায় মূর্তি গড়বার ছন্দটা কী।

 

রাজশাসন তার নয়, অস্ত্র তার নিয়েছে কেড়ে,

 

বেশে বাসে ব্যবহারে সম্মানের চিহ্ন হতে সে বর্জিত,

 

বঞ্চিত সে পুঁথির বিদ্যায়।

 

ত্রিলোকেশ্বর মন্দিরের স্বর্ণচূড়া পশ্চিম দিগন্তে যায় দেখা,

 

চিনতে পারে নিজেদেরই মনের আকল্প,

 

বহু দূরের থেকে প্রণাম করে।

 

 

 

কার্তিক পূর্ণিমা, পূজার উৎসব।

 

মঞ্চের উপরে বাজছে বাঁশি মৃদঙ্গ করতাল,

 

মাঠ জুড়ে কানাতের পর কানাত,

 

মাঝে মাঝে উঠেছে ধ্বজা।

 

পথের দুই ধারে ব্যাপারীদের পসরা–

 

তামার পাত্র, রুপোর অলংকার, দেবমূর্তির পট, রেশমের কাপড়;

 

ছেলেদের খেলার জন্যে কাঠের ডমরু, মাটির পুতুল, পাতার বাঁশি;

 

অর্ঘ্যের উপকরণ, ফল মালা ধূপ বাতি, ঘড়া ঘড়া তীর্থবারি।

 

বাজিকর তারস্বরে প্রলাপবাক্যে দেখাচ্ছে বাজি,

 

কথক পড়ছে রামায়ণকথা।

 

উজ্জ্বলবেশে সশস্ত্র প্রহরী ঘুরে বেড়ায় ঘোড়ায় চড়ে;

 

রাজ-অমাত্য হাতির উপর হাওদায়,

 

সম্মুখে বেজে চলেছে শিঙা।

 

কিংখাবে ঢাকা পাল্কিতে ধনীঘরের গৃহিণী,

 

আগে পিছে কিংকরের দল।

 

সন্ন্যাসীর ভিড় পঞ্চবটের তলায়–

 

নগ্ন, জটাধারী, ছাইমাখা;

 

মেয়েরা পায়ের কাছে ভোগ রেখে যায়–

 

ফল, দুধ, মিষ্টান্ন, ঘি, আতপতণ্ডুল।

 

 

 

থেকে থেকে আকাশে উঠছে চীৎকারধ্বনি

 

“জয় ত্রিলোকেশ্বরের জয়’।

 

কাল আসবে শুভলগ্নে রাজার প্রথম পূজা,

 

স্বয়ং আসবেন মহারাজা রাজহস্তীতে চড়ে।

 

তাঁর আগমন-পথের দুই ধারে

 

সারি সারি কলার গাছে ফুলের মালা,

 

মঙ্গলঘটে আম্রপল্লব।

 

আর ক্ষণে ক্ষণে পথের ধুলায় সেচন করছে গন্ধবারি।

 

 

 

শুক্লত্রয়োদশীর রাত।

 

মন্দিরে প্রথম প্রহরের শঙ্খ ঘণ্টা ভেরী পটহ থেমেছে।

 

আজ চাঁদের উপরে একটা ঘোলা আবরণ,

 

জ্যোৎস্না আজ ঝাপসা–

 

যেন মূর্ছার ঘোর লাগল।

 

বাতাস রুদ্ধ–

 

ধোঁয়া জমে আছে আকাশে,

 

গাছপালাগুলো যেন শঙ্কায় আড়ষ্ট।

 

কুকুর অকারণে আর্তনাদ করছে,

 

ঘোড়াগুলো কান খাড়া করে উঠছে ডেকে

 

কোন্‌ অলক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে।

 

হঠাৎ গম্ভীর ভীষণ শব্দ শোনা গেল মাটির নীচে–

 

পাতালে দানবেরা যেন রণদামামা বাজিয়ে দিলে–

 

গুরু-গুরু গুরু-গুরু।

 

মন্দিরে শঙ্খ ঘণ্টা বাজতে লাগল প্রবল শব্দে।

 

হাতি বাঁধা ছিল,

 

তারা বন্ধন ছিঁড়ে গর্জন করতে করতে

 

ছুটল চার দিকে

 

যেন ঘূর্ণি-ঝড়ের মেঘ।

 

তুফান উঠল মাটিতে–

 

ছুটল উট মহিষ গোরু ছাগল ভেড়া

 

ঊর্ধ্বশ্বাসে পালে পালে।

 

হাজার হাজার দিশাহারা লোক

 

আর্তস্বরে ছুটে বেড়ায়–

 

চোখে তাদের ধাঁধা লাগে,

 

আত্মপরের ভেদ হারিয়ে কে কাকে দেয় দ’লে।

 

মাটি ফেটে ফেটে ওঠে ধোঁয়া, ওঠে গরম জল–

 

ভীম-সরোবরের দিঘি বালির নীচে গেল শুষে।

 

মন্দিরের চূড়ায় বাঁধা বড়ো ঘণ্টা দুলতে দুলতে

 

বাজতে লাগল ঢং ঢং।

 

আচম্‌কা ধ্বনি থামল একটা ভেঙে-পড়ার শব্দে।

 

পৃথিবী যখন স্তব্ধ হল

 

পূর্ণপ্রায় চাঁদ তখন হেলেছে পশ্চিমের দিকে।

 

আকাশে উঠছে জ্বলে-ওঠা কানাতগুলোর ধোঁয়ার কুণ্ডলী,

 

জ্যোৎস্নাকে যেন অজগর সাপে জড়িয়েছে।

 

 

 

পরদিন আত্মীয়দের বিলাপে দিগ্‌বিদিক যখন শোকার্ত

 

তখন রাজসৈনিকদল মন্দির ঘিরে দাঁড়ালো,

 

পাছে অশুচিতার কারণ ঘটে।

 

রাজমন্ত্রী এল, দৈবজ্ঞ এল, স্মার্ত পণ্ডিত এল।

 

দেখলে বাহিরের প্রাচীর ধূলিসাৎ।

 

দেবতার বেদীর উপরের ছাদ পড়েছে ভেঙে।

 

পণ্ডিত বললে, সংস্কার করা চাই আগামী পূর্ণিমার পূর্বেই,

 

নইলে দেবতা পরিহার করবেন তাঁর মূর্তিকে।

 

রাজা বললেন, “সংস্কার করো।’

 

মন্ত্রী বললেন, “ওই কিরাতরা ছাড়া কে করবে পাথরের কাজ।

 

ওদের দৃষ্টিকলুষ থেকে দেবতাকে রক্ষা করব কী উপায়ে,

 

কী হবে মন্দিরসংস্কারে যদি মলিন হয় দেবতার অঙ্গমহিমা।’

 

কিরাতদলপতি মাধবকে রাজা আনলেন ডেকে।

 

বৃদ্ধ মাধব, শুক্লকেশের উপর নির্মল সাদা চাদর জড়ানো–

 

পরিধানে পীতধড়া, তাম্রবর্ণ দেহ কটি পর্যন্ত অনাবৃত,

 

দুই চক্ষু সকরুণ নম্রতায় পূর্ণ।

 

সাবধানে রাজার পায়ের কাছে রাখলে একমুঠো কুন্দফুল,

 

প্রণাম করলে স্পর্শ বাঁচিয়ে।

 

রাজা বললেন, “তোমরা না হলে দেবালয়-সংস্কার হয় না।’

 

“আমাদের ‘পরে দেবতার ওই কৃপা’

 

এই ব’লে দেবতার উদ্দেশে মাধব প্রণাম জানালে।

 

নৃপতি নৃসিংহরায় বললেন, “চোখ বেঁধে কাজ করা চাই,

 

দেবমূর্তির উপর দৃষ্টি না পড়ে। পারবে?’

 

মাধব বললে, “অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে কাজ করিয়ে নেবেন অন্তর্যামী।

 

যতক্ষণ কাজ চলবে, চোখ খুলব না।’

 

বাহিরে কাজ করে কিরাতের দল,

 

মন্দিরের ভিতরে কাজ করে মাধব,

 

তার দুই চক্ষু পাকে পাকে কালো কাপড়ে বাঁধা।

 

দিনরাত সে মন্দিরের বাহিরে যায় না–

 

ধ্যান করে, গান গায়,আর তার আঙুল চলতে থাকে।

 

মন্ত্রী এসে বলে, “ত্বরা করো, ত্বরা করো–

 

তিথির পরে তিথি যায়, কবে লগ্ন হবে উত্তীর্ণ।’

 

মাধব জোড়হাতে বলে, “যাঁর কাজ তাঁরই নিজের আছে ত্বরা,

 

আমি তো উপলক্ষ।’

 

 

 

অমাবস্যা পার হয়ে শুক্লপক্ষ এল আবার।

 

অন্ধ মাধব আঙুলের স্পর্শ দিয়ে পাথরের সঙ্গে কথা কয়,

 

পাথর তার সাড়া দিতে থাকে।

 

কাছে দাঁড়িয়ে থাকে প্রহরী।

 

পাছে মাধব চোখের বাঁধন খোলে।

 

পণ্ডিত এসে বললে, “একাদশীর রাত্রে প্রথম পূজার শুভক্ষণ।

 

কাজ কি শেষ হবে তার পূর্বে।’

 

মাধব প্রণাম করে বললে, “আমি কে যে উত্তর দেব।

 

কৃপা যখন হবে সংবাদ পাঠাব যথাসময়ে,

 

তার আগে এলে ব্যাঘাত হবে, বিলম্ব ঘটবে।’

 

 

 

ষষ্ঠী গেল, সপ্তমী পেরোল–

 

মন্দিরের দ্বার দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ে

 

মাধবের শুক্লকেশে।

 

সূর্য অস্ত গেল। পাণ্ডুর আকাশে একাদশীর চাঁদ।

 

মাধব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে,

 

“যাও প্রহরী, সংবাদ দিয়ে এসো গে

 

মাধবের কাজ শেষ হল আজ।

 

লগ্ন যেন বয়ে না যায়।’

 

প্রহরী গেল।

 

মাধব খুলে ফেললে চোখের বন্ধন।

 

মুক্ত দ্বার দিয়ে পড়েছে একাদশী-চাঁদের পূর্ণ আলো

 

দেবমূর্তির উপরে।

 

মাধব হাঁটু গেড়ে বসল দুই হাত জোড় করে,

 

একদৃষ্টে চেয়ে রইল দেবতার মুখে,

 

দুই চোখে বইল জলের ধারা।

 

আজ হাজার বছরের ক্ষুধিত দেখা দেবতার সঙ্গে ভক্তের।

 

রাজা প্রবেশ করলেন মন্দিরে।

 

 

 

তখন মাধবের মাথা নত বেদীমূলে।

 

রাজার তলোয়ারে মুহূর্তে ছিন্ন হল সেই মাথা।

 

দেবতার পায়ে এই প্রথম পূজা, এই শেষ প্রণাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

***

THE TEMPLE TO THE LORD OF THE THREE WORLDS

 

People say the celestial architect Viswakarma himself laid its foundations

In a distant time in antiquity,

And Hanuman gathered its stones together

The historians say, the temple was made by the hunters,

This god guards them from harm.

 

Once when the Kshatriya king won the land

This courtyard was flooded with the blood of the priests,

The gods were saved by their veiled acceptance of new names and new rituals –

And the devotion of a thousand years was lost.

The hunter is an untouchable today, his way barred into this temple.

The hunter is an outcaste today,

They live on the eastern banks of the river.

He still believes, today his temple has been taken, but he has his song.

His hands are steady, his eyes sharp beyond compare.

He knows how to place stone upon stone,

And how to inlay silver swirls on molten brass –

And the rhythm that cleaves statues out of black stone.

He has no hand in governing, his weapons taken off him,

He can lay no claim to any signs of rank in clothing, shelter or society,

The world of letters is not for him.

The golden spires of the temple shine from afar in the west,

They know the work of their own kind,

Paying respect from a great distance.

 

It is the full moon in the month of Kartik, a festival for the gods in the temple.

Upon the stage play the strains of flutes, drums and cymbals,

Tents and marquees cover the fields,

Pennants flutter here and there.

Traders sit by the roadside –

Copper pots, silver rings, idols of the gods, silken cloth by the bolt;

Wooden tambourines for the children, clay dolls, leaf whistles;

Sacrificial goods, fruits, garlands, incense, pot upon pot filled with holy water

Here a firework seller setting off sparks with his rapid-fire speech,

There, a story-teller softly narrating the Ramayana.

Armed guards ride about on horses in bright uniforms;

The king’s minister rides upon an elephant,

His coming heralded by trumpets

Brocaded palanquins shield the wives of the wealthy from sight,

Servants lead the way, while others bring up the back.

The ascetics gather underneath the five clustered fig trees –

Naked, dreadlocked, ash flecked their skin;

Women leave offerings at their feet –

Fruit, milk, sweetmeats, ghee, fragrant rice.

 

 

Again and again cries rise to the skies

“Glory be to the Lord of the Three Realms!”

Tomorrow the king will offer his first obeisance at an ordained hour,

He will be here himself riding a royal elephant.

By the side of the path he will take

Rows of banana palms have been decked with garlands,

And mango leaves placed in auspicious pots.

Perfumed water is thrown upon the dust

 

The thirteenth day of the new moon.

The conch shells, bells and horns that marked the first watch at the temple have stopped.

There is a mist veiling the moon tonight,

The moonlight is pale –

As if caught in a fainting spell.

The wind has paused –

Smoke lies trapped against the sky,

Even the very trees are stilled as though by fright.

A dog barks without cause,

The horses prick their ears up and neigh

At something unseen by the others.

Suddenly a great rumble started within the earth –

As if the giants had begun beating their war drums in the deep of the underworld

Boom-boom, boom-boom.

The priests rang the bells and conch shells in a great cacophony

The elephants that had been tethered

Ripped their bonds and thundered about

Dark grey clouds in a maelstrom.

A storm rose in the dust

Herds of camels, buffalo, cattle, goats, sheep

Scattered in fearful disorder.

Thousands of people mill about

Their screams rending the air –

In their frightened disarray,

Some crush their dearest underfoot

 

The earth yawns wide, steam and hot water bubble forth –

The waters of Bhima lake disappear beneath the sands

The great bell at the spire of the temple sways back and forth

Peals loudly – Ding! Dong!

Then suddenly every sound silenced by a loud crash.

When everything was still again

The full moon was low in the western sky.

Smoke rose in coils to the sky from the burning tents,

As if the moonlight was being slowly strangled by a great snake’s grip.

 

The next day as mournful cries from those that lived filled the air

The king’s soldiers surrounded the temple,

Lest it be polluted by an unclean touch.

The minister came and with him the soothsayer and the scholars

To discover that the outer walls were turned to rubble.

And the roof now lay where the altar had once been.

The scholars said that it would have to be repaired before the full moon was upon them,

Or the god would forsake his stone likeness.

The king said, ‘Then repair it!’

The minister said, ‘But who will do this stonework but those hunters?

How will we save the gods from their impure gaze?

What point in repairing the temple if the gods are insulted?’

The king sent for the leader of the hunters, a man known only as Madhav.

An old man, a white turban wrapped about his white hair –

A yellow cloth about his copper coloured body, bare to the waist,

His eyes filled with gentle compassion.

Carefully he placed a handful of white blossoms at the king’s feet,

Bowing to him from afar.

 

The king said, ‘No one but your people can fix the temple.

‘That is by His grace upon us’

Madhav inclined his head in submission to the gods as he said these words.

King Nrisingharay said, ‘You will bind your eyes before you start work,

So that your gaze does not fall upon the idol. Do you hear me?’

Madhav answered, ‘He will let us see him with the sight that is of the soul.

I will not open my eyes for as long as I work.’

Outside the band of hunters work at repair,

Inside the sanctum works Madhav alone,

His eyes wrapped in layers of black cloth.

He does not leave the temple at day’s end or at night –

He prays, he sings, his fingers work.

The minister comes and says, ‘Hurry up, hurry up –

Hour after hour passes, what if the sacred moment is lost!’

Madhav says with folded palms, ‘The master himself knows the need to rush,

I am but an instrument in his hands.’

The night of the new moon passed, and the moon grew again.

The blind Madhav speaks with the stone through his fingers,

The stone answers him back.

The guard hovers close by,

Keenly keeping watch, just in case Madhav opens his blindfold.

The scholar comes and says, ‘The first worship should be held on the night of the eleventh lunar day.

Will the work be done before that?’

Madhav bows and says, ‘Who am I to answer that.

I will send word when He grants his grace,

If you come any earlier than that, there will only be interruptions, only delays.’

 

The sixth night passed, then the seventh –

Moonlight streams in through the temple door

Washing with silver Madhav’s white hair.

The sun set and in the pale sky rose the moon of the eleventh day.

Madhav sighed and said,

‘Go now guard, give them the news

Madhav has finished his work.

Let the hour not be allowed to pass.’

The guard left.

The old man took off the ties that bound his eyes.

The light of the full moon streamed through the open door

Upon the idol.

Madhav fell to his knees with folded palms,

He looked unblinking at its stone face,

And tears ran from his eyes.

Today the devotee meets his Maker with the thirst of a thousand years

The king arrived at the temple.

 

Madhav’s bared head was bent at the altar.

The king’s sword rose and fell in a flash.

The first time Madhav worshipped his god was also the last time he bowed his head.

 

আধুনিক কাব্য/Adhunik Kabyo/ Modern Poetry

আধুনিক কাব্য


মডার্‌ন্‌ বিলিতি কবিদের সম্বন্ধে আমাকে কিছু লিখতে অনুরোধ করা হয়েছে। কাজটা সহজ নয়। কারণ, পাঁজি মিলিয়ে মডার্‌নের সীমানা নির্ণয় করবে কে। এটা কালের কথা ততটা নয় যতটা ভাবের কথা।

নদী সামনের দিকে সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক ফেরে। সাহিত্যও তেমনি বরাবর সিধে চলে না। যখন সে বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাকেই বলতে হবে মডার্‌ন্‌। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।

বাল্যকালে যে ইংরেজি কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় হল তখনকার দিনে সেটাকে আধুনিক ব’লে গণ্য করা চলত। কাব্য তখন একটা নতুন বাঁক নিয়েছিল, কবি বার্‌ন্‌স্‌ থেকে তার শুরু। এই ঝোঁকে একসঙ্গে অনেকগুলি বড়ো বড়ো কবি দেখা দিয়েছিলেন। যথা ওয়ার্ড্‌স্বার্থ্‌ কোল্‌রিজ শেলি কীট্‌স্‌।

সমাজে সর্বসাধারণের প্রচলিত ব্যবহাররীতিরে আচার বলে। কোনো কোনো দেশে এই আচার ব্যক্তিগত অভিরুচির স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণ চাপা দিয়ে রাখে। সেখানে মানুষ হয়ে ওঠে পুতুল, তার চালচলন হয় নিখুঁত কেতা-দুরস্ত। সেই সনাতন অভ্যস্ত চালকেই সমাজের লোকে খাতির করে। সাহিত্যকেও এক-এক সময়ে দীর্ঘকাল আচারে পেয়ে বসে — রচনায় নিখুঁত রীতির ফোঁটাতিলক কেটে চললে লোকে তাকে বলে সাধু। কবি বার্‌ন্‌সের পরে ইংরেজি কাব্যে যে যুগ এল সে-যুগে রীতির বেড়া ভেঙে মানুষের মর্জি এসে উপস্থিত। “কুমুদকহ্লারসেবিত সরোবর’ হচ্ছে সাধু-কারখানায় তৈরি সরকারি ঠুলির বিশেষ ছিদ্র দিয়ে দেখা সরোবর। সাহিত্যে কোনো সাহসিক সেই ঠুলি খুলে ফেলে, বুলি সরিয়ে, পুরো চোখ দিয়ে যখন সরোবর দেখে তখন ঠুলির সঙ্গে সঙ্গে সে এমন একটা পথ খুলে দেয় যাতে ক’রে সরোবর নানা দৃষ্টিতে নানা খেয়ালে নানাবিধ হয়ে ওঠে। সাধু বিচারবুদ্ধি তাকে বলে, “ধিক্‌।’

আমরা যখন ইংরেজি কাব্য পড়া শুরু করলুম তখন সেই আচার-ভাঙা ব্যক্তিগত মর্জিকেই সাহিত্য স্বীকার ক’রে নিয়েছিল। এডিন্‌বরা রিভিয়ুতে যে-তর্জনধ্বনি উঠেছিল সেটা তখন শান্ত। যাই হোক, আমাদের সেকাল আধুনিকতার একটা যুগান্তকাল।

তখনকার কালে কাব্যে আধুনিকতার লক্ষণ হচ্ছে ব্যক্তিগত খুশির দৌড়। ওয়ার্ড্‌স্বার্থ্‌ বিশ্বপ্রকৃতিতে যে আনন্দময় সত্তা উপলব্ধি করেছিলেন সেটাকে প্রকাশ করেছিলেন নিজের ছাঁদে। শেলির ছিল প্ল্যাটোনিক ভাবুকতা, তার সঙ্গে রাষ্ট্রগত ধর্মগত সকলপ্রকার স্থূল বাধার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রূপসৌন্দর্যের ধ্যান ও সৃষ্টি নিয়ে কীট্‌সের কাব্য। ঐ যুগে বাহ্যিকতা থেকে আন্তরিকতার দিকে কাব্যের স্রোত বাঁক ফিরিয়েছিল।

কবিচিত্তে যে-অনুভূতি গভীর, ভাষায় সুন্দর রূপ নিয়ে সে আপন নিত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। প্রেম আপনাকে সজ্জিত করে। অন্তরে তার যে আনন্দ বাইরে সেটাকে সে প্রমাণ করতে চায় সৌন্দর্যে। মানুষের একটা কাল গেছে যখন সে অবসর নিয়ে নিজের সম্পর্কীয় জগৎটাকে নানারকম করে সাজিয়ে তুলত। বাইরের সেই লজ্জাই তার ভিতরের অনুরাগের প্রকাশ। যেখানে অনুরাগ সেখানে উপেক্ষা থাকতে পারে না। সেই যুগে নিত্যব্যবহার্য জিনিসগুলিকে মানুষ নিজের রুচির আনন্দে বিচিত্র ক’রে তুলেছে। অন্তরের প্রেরণা তার আঙুলগুলিকে সৃষ্টিকুশলী করেছিল। তখন দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে ঘটিবাটি গৃহসজ্জা দেহসজ্জা রঙে রূপে মানুষের হৃদয়কে জড়িয়ে দিয়েছিল তার বহিরুপকরণে। মানুষ কত অনুষ্ঠান সৃষ্টি করেছিল জীবনযাত্রাকে রস দেবার জন্যে। কত নূতন নূতন সুর; কাঠে ধাতুতে মাটিতে পাথরে রেশমে পশমে তুলোয় কত নূতন নূতন শিল্পকলা। সেই যুগে স্বামী তার স্ত্রীর পরিচয় দিয়েছে, প্রিয়শিষ্যাললিতে কলাবিধৌ। যে দাম্পত্যসংসার রচনা করত তার রচনাকার্যের জন্য ব্যাঙ্কে-জমানো টাকাটাই প্রধান জিনিস ছিল না, তার চেয়ে প্রয়োজন ছিল ললিতকলার। যেমন-তেমন ক’রে মালা গাঁথলে চলত না; চীনাংশুকের অঞ্চলপ্রান্তে চিত্রবয়ন জানত তরুণীরা; নাচের নিপুণতা ছিল প্রধান শিক্ষা; তার সঙ্গে ছিল বীণা বেণু, ছিল গান। মানুষে মানুষে যে-সম্বন্ধ সেটার মধ্যে আত্মিকতার সৌন্দর্য ছিল।

প্রথম বয়সে যে ইংরেজ কবিদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হল তাঁরা বাহিরকে নিজের অন্তরের যোগে দেখেছিলেন; জগৎটা হয়েছিল তাঁদের নিজের ব্যক্তিগত। আপন কল্পনা মত ও রুচি সেই বিশ্বকে শুধু যে কেবল মানবিক ও মানসিক করেছিল তা নয়, তাকে করেছিল বিশেষ কবির মনোগত। ওয়ার্ড্‌স্বার্থের জগৎ ছিল বিশেষভাবে ওয়ার্ড্‌স্বার্থীয়, শেলির ছিল শেলীয়, বাইরনের ছিল বাইরনিক। রচনার ইন্দ্রজালে সেটা পাঠকেরও নিজের হয়ে উঠত। বিশেষ কবির জগতে যেটা আমাদের আনন্দ দিত সেটা বিশেষ ঘরের রসের আতিথ্যে। ফুল তার আপন রঙের গন্ধের বৈশিষ্ট্যদ্বারায় মৌমাছিকে নিমন্ত্রণ পাঠায়; সেই নিমন্ত্রণলিপি মনোহর। কবির নিমন্ত্রণেও স্বভাবতই সেই মনোহারিতা ছিল। যে-যুগে সংসারের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিত্ব-সম্বন্ধটা প্রধান সে-যুগে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণকে সযত্নে জাগিয়ে রাখতে হয়; সে-যুগে বেশে ভূষায় শোভনরীতিতে নিজের পরিচয়কে উজ্জ্বল করবার একটা যেন প্রতিযোগিতা থাকে।

দেখা যাচ্ছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংরেজি কাব্যে পূর্ববর্তীকালের আচারের প্রাধান্য ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের দিকে বাঁক ফিরিয়েছিল। তখনকার কালে সেইটেই হল আধুনিকতা।

কিন্তু, আজকের দিনে সেই আধুনিকতাকে মধ্যভিক্টোরীয় প্রাচীনতা সংজ্ঞা দিয়ে তাকে পাশের কামরায় আরাম-কেদারায় শুইয়ে রাখবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখনকার দিনে ছাঁটা কাপড় ছাঁটা চুলের খট্‌খটে আধুনিকতা। ক্ষণে ক্ষণে গালে পাউডার, ঠোঁটে রঙ লাগানো হয় না তা নয়; কিন্তু সেটা প্রকাশ্য, উদ্ধত অসংকোচে। বলতে চায় মোহ জিনিসটাতে আর-কোনো দরকার নেই। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে পদে পদে মোহ; সেই মোহের বৈচিত্র্যই নানা রূপের মধ্য দিয়ে নানা সুর বাজিয়ে তোলে। কিন্তু, বিজ্ঞান তার নাড়ীনক্ষত্র বিচার ক’রে দেখেছে; বলছে, মূলে মোহ নেই, আছে কার্বন, আছে নাইট্রোজেন, আছে ফিজিওলজি, আছে সাইকলজি। আমরা সেকালের কবি, আমরা এইগুলোকেই গৌণ জানতুম, মায়াকেই জানতুম মুখ্য। তাই সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছন্দে বন্ধে ভাষায় ভঙ্গিতে মায়া বিস্তার ক’রে মোহ জন্মাবার চেষ্টা করেছি, এ কথা কবুল করতেই হবে। ইশারা-ইঙ্গিতে কিছু লুকোচুরি ছিল; লজ্জার যে-আবরণ সত্যের বিরুদ্ধ নয়, সত্যের আভরণ, সেটাকে ত্যাগ করতে পারি নি। তার ঈষৎ বাষ্পের ভিতর দিয়ে যে রঙিন আলো এসেছে সেই আলোতে উষা ও সন্ধ্যার একটি রূপ দেখেছি, নববধূর মতো তা সকরুণ। আধুনিক দুঃশাসন জনসভায় বিশ্বদ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে লেগেছে; ও দৃশ্যটা আমাদের অভ্যস্ত নয়। সেই অভ্যাসপীড়ার জন্যেই কি সংকোচ লাগে। এই সংকোচের মধ্যে কোনো সত্য কি নেই। সৃষ্টিতে যে আবরণ প্রকাশ করে, আচ্ছন্ন করে না, তাকে ত্যাগ করলে সৌন্দর্যকে কি নিঃস্ব হতে হয় না।

কিন্তু, আধুনিক কালের মনের মধ্যেও তাড়াহুড়ো, সময়েরও অভাব। জীবিকা জিনিসটা জীবনের চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে। তাড়া-লাগানো যন্ত্রের ভিড়ের মধ্যেই মানুষের হূ হূ ক’রে কাজ, হুড়মূড় ক’রে আমোদ-প্রমোদ। যে-মানুষ একদিন রয়ে-বসে আপনার সংসারকে আপনার ক’রে সৃষ্টি করত সে আজ কারখানার উপর বরাত দিয়ে প্রয়োজনের মাপে তড়িঘড়ি একটা সরকারি আদর্শে কাজ-চালানো কাণ্ড খাড়া ক’রে তোলে। ভোজ উঠে গেছে, ভোজনটা বাকি। মনের সঙ্গে মিল হল কি না সে কথা ভাববার তাগিদ নেই, কেননা মন আছে অতি প্রকাণ্ড জীবিকা-জগন্নাথের রথের দড়ি ভিড়ের লোকের সঙ্গে মিলে টানবার দিকে। সংগীতের বদলে তার কণ্ঠে শোনা যায়, “মারো ঠেলা হেঁইয়োঁ।’ জনতার জগতেই তাকে বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয়, আত্মীয়সম্বন্ধের জগতে নয়। তার চিত্তবৃত্তিটা ব্যস্তবাগীশের চিত্তবৃত্তি। হুড়োহুড়ির মধ্যে অসজ্জিত কুৎসিতকে পাশ কাটিয়ে চলবার প্রবৃত্তি তার নেই।

কাব্য তা হলে আজ কোন্‌ লক্ষ্য ধরে কোন্‌ রাস্তায় বেরোবে। নিজের মনের মতো ক’রে পছন্দ করা, বাছাই করা, সাজাই করা, এ এখন আর চলবে না। বিজ্ঞান বাছাই করে না, যা-কিছু আছে তাকে আছে ব’লেই মেনে নেয়, ব্যক্তিগত অভিরুচির মূল্যে তাকে যাচাই করে না, ব্যক্তিগত অনুরাগের আগ্রহে তাকে সাজিয়ে তোলে না। এই বৈজ্ঞানিক মনের প্রধান আনন্দ কৌতূহলে, আত্মীয়সম্বন্ধ-বন্ধনে নয়। আমি কী ইচ্ছে করি সেটা তার কাছে বড়ো নয়, আমাকে বাদ দিয়ে জিনিসটা স্বয়ং ঠিকমত কী সেইটেই বিচার্য। আমাকে বাদ দিলে মোহের আয়োজন অনাবশ্যক।

তাই এই বৈজ্ঞানিক যুগের কাব্যব্যবস্থায় যে-ব্যয়সংক্ষেপ চলছে তার মধ্যে সব চেয়ে প্রধান ছাঁট পড়ল প্রসাধনে। ছন্দে বন্ধে ভাষায় অতিমাত্র বাছাবাছি চুকে যাবার পথে। সেটা সহজভাবে নয়, অতীত যুগের নেশা কাটাবার জন্যে তাকে কোমর বেঁধে অস্বীকার করাটা হয়েছে প্রথা। পাছে অভ্যাসের টানে বাছাই-বুদ্ধি পাঁচিল ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে এইজন্যে পাঁচিলের উপর রূঢ় কুশ্রীভাবে ভাঙা কাঁচ বসানোর চেষ্টা। একজন কবি লিখেছেন; I am the greatest laugher of all । বলছেন,” আমি সবার চেয়ে বড়ো হাসিয়ে, সূর্যের চেয়ে বড়ো, ওক গাছের চেয়ে, ব্যাঙের চেয়ে, অ্যাপলো দেবতার চেয়ে।’ Than the frog and Apollo এটা হল ভাঙা কাচ। পাছে কেউ মনে করে কবি মিঠে করে সাজিয়ে কথা কইছে। ব্যাঙ না বলে যদি বলা হত সমুদ্র, তা হলে এখনকার যুগ আপত্তি করে বলতে পারত, ওটা দস্তুরমত কবিয়ানা। হতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি উলটো ছাঁদের দস্তুরমত কবিয়ানা হল ঐ ব্যাঙের কথা। অর্থাৎ, ওটা সহজ কলমের লেখা নয়, গায়ে পড়ে পা মাড়িয়ে দেওয়া। এইটেই হালের কায়দা।

কিন্তু, কথা এই যে, ব্যাঙ জীবটা ভদ্র কবিতায় জল-আচরণীয় নয়, এ কথা মানবার দিন গেছে। সত্যের কোঠায় ব্যাঙ অ্যাপলোর চেয়ে বড়ো বৈ ছোটো নয়। আমিও ব্যাঙকে অবজ্ঞা করতে চাই নে। এমন-কি, যথাস্থানে কবিপ্রেয়সীর হাসির সঙ্গে ব্যাঙের মক্‌মক্‌ হাসিকে এক পঙ্‌ক্তিতেও বসানো যেতে পারে, প্রেয়সী আপত্তি করলেও। কিন্তু, অতিবড়ো বৈজ্ঞানিক সাম্যতত্ত্বেও যে-হাসি সূর্যের, যে-হাসি ওক্‌বনস্পতির, যে-হাসি অ্যাপলোর, সে-হাসি ব্যাঙের নয়। এখানে ওকে আনা হয়েছে জোর ক’রে মোহ ভাঙবার জন্যে।

মোহের আবরণ তুলে দিয়ে যেটা যা সেটাকে ঠিক তাই দেখতে হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মায়ার রঙে যেটা রঙিন ছিল আজ সেটা ফিকে হয়ে এসেছে; সেই মিঠের আভাসমাত্র নিয়ে ক্ষুধা মেটে না, বস্তু চাই। “ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং’ বললে প্রায় বারোআনা অত্যুক্তি করা হয়। একটি আধুনিকা মেয়ে কবি গত যুগের সুন্দরীকে খুব স্পষ্ট ভাষায় যে-সম্ভাষণ করেছেন সেটাকে তর্জমা ক’রে দিই। তর্জমায় মাধুরী সঞ্চার করলে বেখাপ হবে, চেষ্টাও সফল হবে না —

    তুমি সুন্দরী এবং তুমি বাসি

    যেন পুরনো একটা যাত্রার সুর

    বাজছে সেকেলে একটা সারিন্দি যন্ত্রে।

    কিম্বা তুমি সাবেক আমলের বৈঠকখানায়

    যেন রেশমের আসবাব, তাতে রোদ পড়েছে।

    তোমার চোখে আয়ুহারা মুহূর্তের

    ঝরা গোলাপের পাপড়ি যাচ্ছে জীর্ণ হয়ে।

    তোমার প্রাণের গন্ধটুকু অস্পষ্ট, ছড়িয়ে পড়া,

     ভাঁড়ের মধ্যে ঢেকে-রাখা মাথাঘষা মসলার মতো তার ঝাঁজ।

    তোমার অতিকোমল সুরের আমেজ আমার লাগে ভালো —

    তোমার ওই মিলে-মিশে-যাওয়া রঙগুলির দিকে তাকিয়ে

                                 আমার মন ওঠে মেতে।

    আর আমার তেজ যেন টাঁকশালের নতুন পয়সা

             তোমার পায়ের কাছে তাকে দিলেম ফেলে।

    ধুলো থেকে কুড়িয়ে নাও,

    তার ঝক্‌মকানি দেখে হয়তো তোমার মজা লাগবে।

এই আধুনিক পয়সাটার দাম কম কিন্তু জোর বেশি, আর এ খুব স্পষ্ট, টং ক’রে বেজে ওঠে হালের সুরে। সাবেক-কালের যে মাধুরী তার একটা নেশা আছে, কিন্তু এর আছে স্পর্ধা। এর মধ্যে ঝাপসা কিছুই নেই।

এখনকার কাব্যের যা বিষয় তা লালিত্যে মন ভোলাতে চায় না। তা হলে সে কিসের জোরে দাঁড়ায়। তার জোর হচ্ছে আপন সুনিশ্চিত আত্মতা নিয়ে, ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যারেক্টার। সে বলে, “অয়মহং ভোঃ, আমাকে দেখো।’ ঐ মেয়ে কবি, তাঁর নাম এমি লোয়েল, একটি কবিতা লিখেছেন লাল চটিজুতোর দোকান নিয়ে। ব্যাপারখানা এই যে, সন্ধ্যাবেলায় বাইরে বরফের ঝাপটা উড়িয়ে হাওয়া বইছে, ভিতরে পালিশ-করা কাচের পিছনে লম্বা সার করে ঝুলছে লাল চটিজুতোর মালা –like stalactites of blood flooding the eyes of passers-by with dripping color, jamming their crimson reflections against the windows of cabs and tramcars, screaming their claret and salmon into the teeth of the sleet, plopping their little round maroon lights upon the tops of umbrellas। The row of white, sparkling shop fronts is gashed and bleeding, it bleeds red slippers। সমস্তটা এই চটি-জুতো নিয়ে।

একেই বলা যায় নৈর্ব্যক্তিক, impersonal। ঐ চটিজুতোর মালার উপর বিশেষ আসক্তির কোনো কারণ নেই, না খরিদ্‌দার না দোকানদার ভাবে। কিন্তু, দাঁড়িয়ে দেখতে হল, সমস্ত ছবির একটা আত্মতা যেই ফুটে উঠল অমনি তার তুচ্ছতা আর রইল না। যারা মানে-কুড়ানিয়া তারা জিজ্ঞাসা করবে, “মানে কী হল, মশায়। চটিজুতো নিয়ে এত হল্লা কিসের, নাহয় হলই বা তার রঙ লাল।’ উত্তরে বলতে হয়, “চেয়েই দেখো-না।’ “দেখে লাভ কী’ তার কোনো জবাব নাই।

নন্দনতত্ব (Aesthetics) সম্বন্ধে এজ্‌রা পৌণ্ডের একটি কবিতা আছে। বিষয়টি এই যে, একটি মেয়ে চলেছিল রাস্তা দিয়ে, একটা ছোটো ছেলে, তালি দেওয়া কাপড় পরা, তার মন উঠল জেগে, সে থাকতে পারল না; বলে উঠল, “দেখ্‌ চেয়ে রে, কী সুন্দর।” এই ঘটনার তিন বৎসর পরে ঐ ছেলেটারই সঙ্গে আবার দেখা। সে বছর জালে সার্ডিন মাছ পড়েছিল বিস্তর। বড়ো বড়ো কাঠের বাক্সে ওর দাদাখুড়োরা মাছ সাজাচ্ছিল, ব্রেস্‌চিয়ার হাটে বিক্রি করতে পাঠাবে। ছেলেটা মাছ ঘাঁটাঘাঁটি ক’রে লাফালাফি করতে লাগল। বুড়োরা ধমক দিয়ে বললে, “স্থির হয়ে বোস্‌।’ তখন সে সেই সাজানো মাছগুলোর উপর হাত বুলোতে বুলোতে তৃপ্তির সঙ্গে ঠিক সেই একই কথা আপন মনে বলে উঠল, “কী সুন্দর।’ কবি বলছেন, “শুনে I was mildly abashed।’

সুন্দরী মেয়েকেও দেখো সার্ডিন মাছকেও; একই ভাষায় বলতে কুন্ঠিত হোয়ো না, কী সুন্দর। এ দেখা নৈর্ব্যক্তিক — নিছক দেখা; এর পঙ্‌ক্তিতে চটিজুতোর দোকানকেও বাদ দেওয়া যায় না।

কাব্যে বিষয়ীর আত্মতা ছিল উনিশ শতাব্দীতে, বিশ শতাব্দীতে বিষয়ের আত্মতা। এইজন্যে কাব্যবস্তুর বাস্তবতার উপরেই ঝোঁক দেওয়া হয়, অলংকারের উপর নয়। কেননা, অলংকারটা ব্যক্তির নিজেরই রুচিকে প্রকাশ করে, খাঁটি বাস্তবতার জোর হচ্ছে বিষয়ের নিজের প্রকাশের জন্যে।

সাহিত্যে আবির্ভাবের পূর্বেই এই আধুনিকতা ছবিতে ভর করেছিল। চিত্রকলা যে ললিতকলার অঙ্গ, এই কথাটাকে অস্বীকার করবার জন্যে সে বিবিধপ্রকারে উৎপাত শুরু করে দিলে। সে বললে, আর্টের কাজ মনোহারিতা নয়, মনোজয়িতা; তার লক্ষণ লালিত্য নয়, যাথার্থ্য। চেহারার মধ্যে মোহকে মানলে না, মানলে ক্যারেক্টারকে অর্থাৎ একটা সমগ্রতার আত্মঘোষণাকে। নিজের সম্বন্ধে সেই চেহারা আর-কিছু পরিচয় দিতে চায় না, কেবল জোরের সঙ্গে বলতে চায় “আমি দ্রষ্টব্য’। তার এই দ্রষ্টব্যতার জোর হাবভাবের দ্বারা নয়, প্রকৃতির নকলবিশির দ্বারা নয়, আত্মগত সৃষ্টিসত্যের দ্বারা। এই সত্য ধর্মনৈতিক নয়, ব্যবহারনৈতিক নয়, ভাবব্যঞ্জক নয়, এ সত্য সৃষ্টিগত। অর্থাৎ, সে হয়ে উঠেছে ব’লেই তাকে স্বীকার করতে হয়। যেমন আমরা ময়ূরকে মেনে নিই, শকুনিকেও মানি, শুয়োরকেও অস্বীকার করতে পারি নে, হরিণকেও তাই।

কেউ সুন্দর, কেউ অসুন্দর; কেউ কাজের, কেউ অকাজের; কিন্তু সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো ছুতোয় কাউকে বাতিল করে দেওয়া অসম্ভব। সাহিত্যে, চিত্রকলাতেও সেইরকম। কোনো রূপের সৃষ্টি যদি হয়ে থাকে তো আর-কোনো জবাবদিহি নেই; যদি না হয়ে থাকে, যদি তার সত্তার জোর না থাকে, শুধু থাকে ভাবলালিত্য, তা হলে সেটা বর্জনীয়।

এইজন্যে আজকের দিনে যে-সাহিত্য আধুনিকের ধর্ম মেনেছে, সে সাবেক-কালের কৌলীন্যের লক্ষণ সাবধানে মিলিয়ে জাত বাঁচিয়ে চলাকে অবজ্ঞা করে, তার বাছবিচার নেই। এলিয়টের কাব্য এইরকম হালের কাব্য, ব্রিজেসের কাব্যতা নয়। এলিয়ট লিখছেন —

             এ-ঘরে ও-ঘরে যাবার রাস্তায় সিদ্ধ মাংসর গন্ধ,

             তাই নিয়ে শীতের সন্ধ্যা জমে এল।

             এখন ছ’টা —

             ধোঁয়াটে দিন, পোড়া বাতি, ষে অংশে ঠেকল।

             বাদলের হাওয়া পায়ের কাছে উড়িয়ে আনে

             পোড়ো জমি থেকে ঝুলমাখা শুক্‌নো পাতা

                       আর ছেঁড়া খবরের কাগজ।

             ভাঙা সার্শি আর চিম্‌নির চোঙের উপর

                       বৃষ্টির ঝাপট লাগে,

    আর রাস্তার কোণে একা দাঁড়িয়ে এক ভাড়াটে গাড়ির ঘোড়া,

    ভাপ উঠছে তার গা দিয়ে আর সে মাটিতে ঠুকছে খুর।

তার পরে বাসি বিয়ার-মদের গন্ধ-ওয়ালা কাদামাখা সকালের বর্ণনা। এই সকালে একজন মেয়ের উদ্দেশে বলা হচ্ছে —

             বিছানা থেকে তুমি ফেলে দিয়েছ কম্বলটা,

             চিৎ হয়ে পড়ে অপেক্ষা করে আছ,

             কখনো ঝিমচ্ছ, দেখছ রাত্রিতে প্রকাশ পাচ্ছে

             হাজার খেলো খেয়ালের ছবি

             যা দিয়ে তোমার স্বভাব তৈরি।

তার পরে পুরুষটার খবর এই —

His soul stretched tight across the skies

That fade behind a city block,

Or trampled by insistent feet

At four and five and six o’clock;

And short square fingers stuffing pipes

And evening newspapers, and eyes

Assured of certain certainties,

The conscience of a blackened street

Impatient to assume the world.

এই ধোঁয়াটে, এই কাদামাখা, এই নানা বাসি গন্ধ ও ছেঁড়া আবর্জনাওয়ালা নিতান্ত খেলো সন্ধ্যা, খেলো সকালবেলার মাঝখানে কবির মনে একটা বিপরীত জাতের ছবি জাগল। বললেন —

I am moved by fancies that are curled

Around these images, and cling;

The notion of some infinitely gentle

Infinitely suffering thing.

এইখানেই অ্যাপলের সঙ্গে ব্যাঙের মিল আর টিকল না। এইখানে কূপমণ্ডূকের মক্‌মক্‌ শব্দ অ্যাপলোর হাসিকে পীড়া দিল। একটা কথা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, কবি নিতান্তই বৈজ্ঞানিকভাবে নির্বিকার নন। খেলো সংসারটার প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা এই খেলো সংসারের বর্ণনার ভিতর দিয়েই প্রকাশ পাচ্ছে। তাই কবিতাটির উপসংহারে যে কথা বলেছেন সেটা এত কড়া —

             মুখের উপরে একবার হাত বুলিয়ে হেসে নাও।

             দেখো, সংসারটা পাক খাচ্ছে যেন বুড়িগুলো

             ঘুঁটে কুড়োচ্ছে পোড়ো জমি থেকে।

এই ঘুঁটে-কুড়োনো বুড়ো সংসারটার প্রতি কবির অনভিরুচি স্পষ্টই দেখা যায়। সাবেক-কালের সঙ্গে প্রভেদটা এই যে, রঙিন স্বপ্ন দিয়ে মনগড়া সংসারে নিজেকে ভুলিয়ে রাখার ইচ্ছেটা নেই। কবি এই কাদা ঘাঁটাঘাঁটির মধ্যে দিয়েই কাব্যকে হাঁটিয়ে নিয়ে বলেছেন, ধোপ-দেওয়া কাপড়টার উপর মমতা না ক’রে। কাদার উপর অনুরাগ আছে ব’লে নয়, কিন্তু কাদার সংসারে চোখ চেয়ে কাদাটাকেও জানতে হবে, মানতে হবে ব’লেই। যদি তার মধ্যেও অ্যাপলোর হাসি কোথাও ফোটে সে তো ভালোই, যদি না’ও ফোটে, তা হলে ব্যাঙের লম্ফমান অট্টহাস্যকে উপেক্ষা করবার প্রয়োজন নেই। ওটাও একটা পদার্থ তো বটে — এই বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে ওর দিকেও কিছুক্ষণ চেয়ে দেখা যায়, এর তরফেও কিছু বলবার আছে। সুসজ্জিত ভাষার বৈঠকখানায় ঐ ব্যাঙটাকে মানাবে না, কিন্তু অধিকাংশ জগৎসংসার ঐ বৈঠকখানার বাইরে।

সকালবেলায় প্রথম জাগরণ। সেই জাগরণে প্রথমটা নিজের উপলব্ধি, চৈতন্যের নূতন চাঞ্চল্য। এই অবস্থাটাকে রোমান্টিক বলা যায়। সদ্য-জাগা চৈতন্য বাইরে নিজেকে বাজিয়ে দেখতে বেরোয়। মন বিশ্বসৃষ্টিতে এবং নিজের রচনায় নিজের চিন্তাকে, নিজের বাসনাকে রূপ দেয়। অন্তরে যেটাকে চায় বাইরে সেটাকে নানা মায়া দিয়ে গড়ে। তার পরে আলো তীব্র হয়, অভিজ্ঞতা কঠোর হতে থাকে, সংসারের আন্দোলনে অনেক মায়াজাল ছিন্ন হয়ে যায়। তখন অনাবিল আলোকে, অনাবৃত আকাশে, পরিচয় ঘটতে থাকে স্পষ্টতর বাস্তবের সঙ্গে। এই পরিচিত বাস্তবকে ভিন্ন কবি ভিন্নরকম ক’রে অভ্যর্থনা করে। কেউ দেখে এ’কে অবিশ্বাসের চোখে বিদ্রোহের ভাবে; কেউ বা এ’কে এমন অশ্রদ্ধা করে যে, এর প্রতি রূঢ়ভাবে নির্লজ্জ ব্যবহার করতে কুন্ঠিত হয় না। আবার খর আলোকে অতিপ্রকাশিত এর যে-আকৃতি তারও অন্তরে কেউ বা গভীর রহস্য উপলব্ধি করে; মনে করে না, গূঢ় ব’লে কিছুই নেই; মনে করে না, যা প্রতীয়মান তাতেই সব-কিছু নিঃশেষে ধরা পড়ছে। গত য়ুরোপীয় যুদ্ধে মানুষের অভিজ্ঞতা এত কর্কশ, এত নিষ্ঠুর হয়েছিল, তার বহুযুগপ্রচলিত যত-কিছু আদব ও আব্রু তা সাংঘাতিক সংকটের মধ্যে এমন অকস্মাৎ ছারখার হয়ে গেল; দীর্ঘকাল যে-সমাজস্থিতিকে একান্ত বিশ্বাস ক’রে সে নিশ্চিন্ত ছিল তা এক মুহূর্তে দীর্ণবিদীর্ণ হয়ে গেল; মানুষ যে-সকল শোভনরীতি কল্যাণনীতিকে আশ্রয় করেছিল তার বিধ্বস্ত রূপ দেখে এতকাল যা-কিছুকে সে ভদ্র ব’লে জানত তাকে দুর্বল ব’লে, আত্মপ্রতারণার কৃত্রিম উপায় ব’লে, অবজ্ঞা করাতেই যেন সে একটা উগ্র আনন্দ বোধ করতে লাগল; বিশ্বনিন্দুকতাকেই সে সত্যনিষ্ঠতা ব’লে আজ ধরে নিয়েছে।

কিন্তু, আধুনিকতার যদি কোনো তত্ত্ব থাকে, যদি সেই তত্ত্বকে নৈর্ব্যক্তিক আখ্যা দেওয়া যায়, তবে বলতেই হবে, বিশ্বের প্রতি এই উদ্ধত অবিশ্বাস ও কুৎসার দৃষ্টি এও আকস্মিক বিপ্লবজনিত একটা ব্যক্তিগত চিত্তবিকার। এও একটা মোহ, এর মধ্যেও শান্ত নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে সহজভাবে গ্রহণ করবার গভীরতা নেই। অনেকে মনে করেন, এই উগ্রতা, এই কালাপাহাড়ি তাল-ঠোকাই আধুনিকতা। আমি তা মনে করি নে। ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জা আজ হাজার হাজার লোককে আক্রমণ করলেও বলব না, ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জাটাই দেহের আধুনিক স্বভাব। এহ বাহ্য। ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জাটার অন্তরালেই আছে সহজ দেহস্বভাব।

আমাকে যদি জিজ্ঞাসা কর বিশুদ্ধ আধুনিকতাটা কী, তা হলে আমি বলব, বিশ্বকে ব্যক্তিগত আসক্তভাবে না দেখে বিশ্বকে নির্বিকার তদ্‌গতভাবে দেখা। এই দেখাটাই উজ্জ্বল, বিশুদ্ধ; এই মোহমুক্ত দেখাতেই খাঁটি আনন্দ। আধুনিক বিজ্ঞান যে নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে আধুনিক কাব্য সেই নিরাসক্ত চিত্তে বিশ্বকে সমগ্রদৃষ্টিতে দেখবে, এইটেই শাশ্বতভাবে আধুনিক।

কিন্তু, এ’কে আধুনিক বলা নিতান্ত বাজে কথা। এই-যে নিরাসক্ত সহজ দৃষ্টির আনন্দ এ কোনো বিশেষ কালের নয়। যার চোখ এই অনাবৃত জগতে সঞ্চরণ করতে জানে এ তারই। চীনের কবি লি-পো যখন কবিতা লিখছিলেন সে তো হাজার বছরের বেশি হল। তিনি ছিলেন আধুনিক; তাঁর ছিল বিশ্বকে সদ্য-দেখা চোখ। চারটি লাইনে সাদা ভাষায় তিনি লিখছেন —

    এই সবুজ পাহাড়গুলোর মধ্যে থাকি কেন।

    প্রশ্ন শুনে হাসি পায়, জবাব দিই নে। আমার মন নিস্তব্ধ।

    যে আর-এক আকাশে আর-এক পৃথিবীতে বাস করি —

    সে জগৎ কোনো মানুষের না।

    পীচগাছে ফুল ধরে, জলের স্রোত যায় বয়ে।

আর একটা ছবি —

    নীল জল — নির্মল চাঁদ,

    চাঁদের আলোতে সাদা সারস উড়ে চলেছে।

    ওই শোনো, পানফল জড়ো করতে মেয়েরা এসেছিল;

    তারা বাড়ি ফিরছে রাত্রে গান গাইতে গাইতে।

আর-একটা —

    নগ্ন দেহে শুয়ে আছি বসন্তে সবুজ বনে।

   এতই আলস্য যে সাদা পালকের পাখাটা নড়াতে গা লাগছে না।

    টুপিটা রেখে দিয়েছি ওই পাহাড়ের আগায়,

    পাইনগাছের ভিতর দিয়ে হাওয়া আসছে

    আমার খালি মাথার ‘পরে।

একটি বধূর কথা —

    আমার ছাঁটা চুল ছিল খাটো, তাতে কপাল ঢাকত না।

    আমি দরজার সামনে খেলা করছিলুম, তুলছিলুম ফুল।

    তুমি এলে আমার প্রিয়, বাঁশের খেলা-ঘোড়ায় চ’ড়ে,

    কাঁচা কুল ছড়াতে ছড়াতে।

    চাঁঙ্‌কানের গলিতে আমরা থাকতুম কাছে কাছে।

    আমাদের বয়স ছিল অল্প, মন ছিল আনন্দে ভরা।

    তোমার সঙ্গে বিয়ে হল যখন আমি পড়লুম চোদ্দয়।

    এত লজ্জা ছিল যে হাসতে সাহস হত না,

    অন্ধকার কোণে থাকতুম মাথা হেঁট ক’রে,

    তুমি হাজার বার ডাকলেও মুখ ফেরাতুম না।

    পনেরো বছরে পড়তে আমার ভুর্‌কুটি গেল ঘুচে,

    আমি হাসলুম। …

    আমি যখন ষোলো তুমি গেলে দূর প্রবাসে —

    চ্যুটাঙের গিরিপথে, ঘূর্ণিজল আর পাথরের ঢিবির ভিতর দিয়ে।

    পঞ্চম মাস এল, আমার আর সহ্য হয় না।

  আমাদের দরজার সামনে রাস্তা দিয়ে তোমাকে যেতে দেখছিলুম,

    সেখানে তোমার পায়ের চিহ্ন সবুজ শ্যাওলায় চাপা পড়ল —

    সে শ্যাওলা এত ঘন যে ঝাঁট দিয়ে সাফ করা যায় না।

     অবশেষে শরতের প্রথম হাওয়ায় তার উপরে জমে উঠল ঝরা পাতা।

    এখন অষ্টম মাস, হলদে প্রজাপতিগুলো

    আমাদের পশ্চিম-বাগানের ঘাসের উপর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।

  আমার বুক যে ফেটে যাচ্ছে, ভয় হয় পাছে আমার রূপ যায় ম্লান হয়ে।

    ওগো, যখন তিনটে জেলা পার হয়ে তুমি ফিরবে

    আগে থাকতে আমাকে খবর পাঠাতে ভুলো না।

     চাঙফেঙ্‌শার দীর্ঘ পথ বেয়ে আমি আসব, তোমার সঙ্গে দেখা হবে।

    দূর ব’লে একটুও ভয় করব না।

এই কবিতায় সেন্টিমেন্টের সুর একটুও চড়ানো হয় নি, তেমনি তার ‘পরে বিদ্রূপ বা অবিশ্বাসের কটাক্ষপাত দেখছি নে। বিষয়টা অত্যন্ত প্রচলিত, তবু এতে রসের অভাব নেই। স্টাইল বেঁকিয়ে দিয়ে একে ব্যঙ্গ করলে জিনিসটা আধুনিক হত। কেননা, সবাই যাকে অনায়াসে মেনে নেয় আধুনিকেরা কাব্যে তাকে মানতে অবজ্ঞা করে। খুব সম্ভব, আধুনিক কবি ঐ কবিতার উপসংহারে লিখত, স্বামী চোখের জল মুছে পিছন ফিরে তাকাতে তাকাতে চলে গেল, আর মেয়েটি তখনি লাগল শুকনো চিংড়িমাছের বড়া ভাজতে। কার জন্যে। এই প্রশ্নের উত্তরে থাকত দেঢ় লাইন ভরে ফুট্‌কি। সেকেলে পাঠক জিজ্ঞাসা করত, “এটা কী হল।’ একেলে কবি উত্তর করত, “এমনতরো হয়েই থাকে।’ “অন্যটাও তো হয়।’ “হয় বটে, কিন্তু বড়ো বেশি ভদ্র। কিছু দুর্গন্ধ না থাকলে ওর শৌখিন ভাব ঘোচে না, আধুনিক হয় না।’ সেকালে কাব্যের বাবুগিরি ছিল, সৌজন্যের সঙ্গে জড়িত। একেলে কাব্যেরও বাবুগিরি আছে, সেটা পচা মাংসের বিলাসে।

চীনে কবিতাটির পাশে বিলিতি কবিদের আধুনিকতা সহজ ঠেকে না। সে আবিল। তাদের মনটা পাঠককে কনুই দিয়ে ঠেলা মারে। তারা যে-বিশ্বকে দেখছে এবং দেখাচ্ছে সেটা ভাঙন-ধরা, রাবিশ-জমা, ধুলো-ওড়া। ওদের চিত্ত যে আজ অসুস্থ, অসুখী, অব্যবস্থিত। এ অবস্থায় বিশ্ববিষয় থেকে ওরা বিশুদ্ধভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে না। ভাঙা প্রতিমার কাঠ খড় দেখে ওরা অট্টহাস্য করে; বলে, আসল, জিনিসটা এতদিনে ধরা পড়েছে। সেই ঢেলা, সেই কাঠখড়গুলোকে খোঁচা মেরে কড়া কথা বলাকেই ওরা বলে খাঁটি সত্যকে জোরের সঙ্গে স্বীকার করা।

এই প্রসঙ্গে এলিয়টের একটি কবিতা মনে পড়ছে। বিষয়টি এই : বুড়ি মারা গেল, সে বড়ো ঘরের মহিলা। যথানিয়মে ঘরের ঝিলিমিলিগুলো নাবিয়ে দেওয়া, শববাহকেরা এসে দস্তুরমত সময়োচিত ব্যবস্থা করতে প্রবৃত্ত। এ দিকে খাবার ঘরে বাড়ির বড়ো-খান্‌সামা ডিনার-টেবিলের ধারে বসে, বাড়ির মেজো-ঝিকে কোলের উপর টেনে নিয়ে।

ঘটনাটা বিশ্বাসযোগ্য এবং স্বাভাবিক সন্দেহ নাই। কিন্তু, সেকেলে মেজাজের লোকের মনে প্রশ্ন উঠবে, তা হলেই কি যথেষ্ট হল। এ কবিতাটা লেখবার গরজ কী নিয়ে, এটা পড়তেই বা যাব কেন। একটি মেয়ের সুন্দর হাসির খবর কোনো কবির লেখায় যদি পাই তা হলে বলব, এ খবরটা দেবার মতো বটে। কিন্তু, তার পরেই যদি বর্ণনায় দেখি, ডেন্টিস্‌ট্‌ এল, সে তার যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলে মেয়েটির দাঁতে পোকা পড়েছে, তা হলে বলতে হবে, নিশ্চয়ই এটাও খবর বটে কিন্তু সবাইকে ডেকে ডেকে বলবার মতো খবর নয়। যদি দেখি কারো এই কথাটা প্রচার করতেই বিশেষ ঔৎসুক্য, তা হলে সন্দেহ করব, তারও মেজাজে পোকা পড়েছে। যদি বলা হয়, আগেকার কবিরা বাছাই ক’রে কবিতা লিখতেন, অতি-আধুনিকেরা বাছাই করেন না, সে কথা মানতে পারি নে; এঁরাও বাছাই করেন। তাজা ফুল বাছাই করাও বাছাই, আর শুকনো পোকায়-খাওয়া ফুল বাছাইও বাছাই। কেবল তফাত এই যে, এঁরা সর্বদাই ভয় করেন পাছে এঁদের কেউ বদনাম দেয় যে এঁদের বাছাই করার শখ আছে। অঘোরপন্থীরা বেছে বেছে কুৎসিত জিনিস খায়, দূষিত জিনিস ব্যবহার করে, পাছে এটা প্রমাণ হয় ভালো জিনিসে তাদের পক্ষপাত। তাতে ফল হয়, অ-ভালো জিনিসেই তাদের পক্ষপাত পাকা হয়ে ওঠে। কাব্যে অঘোরপন্থীর সাধনা  যদি প্রচলিত হয়, তা হলে শুচি জিনিসে যাদের স্বাভাবিক রুচি তারা যাবে কোথায়। কোনো কোনো গাছে ফুলে পাতায় কেবলই পোকা ধরে, আবার অনেক গাছে ধরে না — প্রথমটাকেই প্রাধান্য দেওয়াকেই কি বাস্তব-সাধনা ব’লে বাহাদুরি করতে হবে।

একজন কবি একটি সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকের বর্ণনা করছেন —

    রিচার্ড কোডি যখন শহরে যেতেন

    পায়ে-চলা পথের মানুষ আমরা তাকিয়ে থাকতুম তাঁর দিকে।

    ভদ্র যাকে বলে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত,

    ছিপছিপে যেন রাজপুত্র।

    সাদাসিধে চালচলন, সাদাসিধে বেশভূষা —

  কিন্তু যখন বলতেন “গুড্‌ মর্নিং’ আমাদের নাড়ী উঠত চঞ্চল হয়ে।

    চলতেন যখন ঝলমল করত।

    ধনী ছিলেন অসম্ভব।

    ব্যবহারে প্রসাদগুণ ছিল চমৎকার।

    যা-কিছু এঁর চোখে পড়ত মনে হত,

    আহা, আমি যদি হতুম ইনি।

    এ দিকে আমরা যখন মরছি খেটে খেটে,

    তাকিয়ে আছি কখন জ্বলবে আলো,

    ভোজনের পালায় মাংস জোটে না,

    গাল পাড়ছি মোটা রুটিকে —

    এমন সময় একদিন শান্ত বসন্তের রাত্রে

    রিচার্ড কোডি গেলেন বাড়িতে,

    মাথার মধ্যে চালিয়ে দিলেন এক গুলি। ১

এই কবিতার মধ্যে আধুনিকতার ব্যঙ্গকটাক্ষ বা অট্টহাস্য নেই, বরঞ্চ কিছু করুণার আভাস আছে। কিন্তু, এর মধ্যে একটা নীতিকথা আছে, সেটা আধুনিক নীতি। সে হচ্ছে এই যে, যা সুস্থ ব’লে সুন্দর ব’লে প্রতীয়মান তার অন্তরে কোথাও একটা সাংঘাতিক রোগ হয়তো আছে। যাকে ধনী ব’লে মনে হয় তার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ব’সে আছে উপবাসী। যাঁরা সেকেলে বৈরাগ্যপন্থী তাঁরাও এই ভাবেই কথা বলেছেন। যারা বেঁচে আছে তাদের তাঁরা মনে করিয়ে দেন, একদিন বাঁশের দোলায় চড়ে শ্মশানে যেতে হবে। য়ুরোপীয় সন্ন্যাসী উপদেষ্টারা বর্ণনা করেছেন মাটির নীচে গলিত দেহকে কেমন ক’রে পোকায় খাচ্ছে। যে দেহকে সুন্দর ব’লে মনে করি সে যে অস্থিমাংস-রসরক্তের কদর্য সমাবেশ, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের চট্‌কা ভাঙিয়ে দেবার চেষ্টা নীতিশাস্ত্রে দেখা গেছে। বৈরাগ্যসাধনার পক্ষে প্রকৃষ্ট উপায়, এইরকম প্রত্যক্ষ বাস্তবের প্রতি বারে বারে অশ্রদ্ধা জন্মিয়ে দেওয়া। কিন্তু, কবি তো বৈরাগীর চেলা নয়, সে তো অনুরাগেরই পক্ষ নিতে এসেছে। কিন্তু, এই আধুনিক যুগ কি এমনি জরাজীর্ণ যে সেই কবিকেও লাগল শ্মশানের হাওয়া — এমন কথা সে খুশি হয়ে বলতে শুরু করেছে, যাকে মহৎ ব’লে মনে করি সে ঘুণে ধরা, যাকে সুন্দর ব’লে আদর করি তারই মধ্যে অস্পৃশ্যতা?

মন যাদের বুড়িয়ে গেছে তাদের মধ্যে বিশুদ্ধ স্বাভাবিকতার জোর নেই। সে মন অশুচি অসুস্থ হয়ে ওঠে। বিপরীত পন্থায় সে মন নিজের অসাড়তাকে দূর করতে চায়, গাঁজিয়ে-ওঠা পচা জিনিসের মতো যত-কিছু বিকৃতি নিয়ে সে নিজেকে ঝাঁঝিয়ে তোলে লজ্জা এবং ঘৃণা ত্যাগ কঁরে তবে তার বলিরেখাগুলোর মধ্যে হাসির প্রবাহ বইতে পারে।

মধ্য ভিক্টোরীয় যুগ বাস্তবকে সম্মান ক’রে তাকে শ্রদ্ধেয়রূপেই অনুভব করতে চেয়েছিল, এ যুগ বাস্তবকে অবমানিত ক’রে সমস্ত আব্রু ঘুচিয়ে দেওয়াকেই সাধনার বিষয় ব’লে মনে করে।

বিশ্ববিষয়ের প্রতি অতিমাত্র শ্রদ্ধাকে যদি বলো সেন্টিমেন্টালিজ্‌ম্‌, তার প্রতি গায়ে-পড়া বিরুদ্ধতাকেও সেই একই নাম দেওয়া যেতে পারে। যে কারণেই হোক, মন এমন বিগড়ে গেলে দৃষ্টি সহজ হয় না। অতএব মধ্য-ভিক্টোরীয় যুগকে যদি অতিভদ্রয়ানার পাণ্ডা ব’লে ব্যঙ্গ কর তবে এডোয়ার্ডি যুগকেও ব্যঙ্গ করতে হয় উলটো বিশেষণ দিয়ে। ব্যাপারখানা স্বাভাবিক নয়, অতএব শাশ্বত নয়। সায়ান্সেই বল আর আর্টেই বল, নিরাসক্ত মনই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন; য়ুরোপ সায়ান্সে সেটা পেয়েছে কিন্তু সাহিত্যে পায় নি।

*************************************************************************************

Modern Poetry

Writing about modern English poets is by no means an easy task, for who defines the limit of the modern age in terms of the almanac? It is not so much a question of time as of spirit.

After flowing straight for a while, most rivers take a sudden turn. Likewise, literature does not always follow the straight path; when it takes a turn, that turn must be called modern or adhunik in Bengali. This modernity depends not upon time but upon temperament.

The poetry to which I was introduced in my boyhood might have been classed as modern in those days. Poetry had taken a new turn, beginning from Robert Burns, and that gave birth to other great poets, such as Wordsworth, Coleridge, Shelley, and Keats.

The manners and customs of a society are shown in social usage. In countries where these social customs suppress all freedom and individual taste, man becomes a puppet, and his conduct conforms meticulously to social etiquette. Society appreciates this traditional and habitual way of life. Sometimes literature remains in this groove for long periods of time, and those anointed with perfect literary style are seen upon as a saintly person. During the age of English poetry that followed Burns, the barriers of style were broken down, and temperament made its debut. “The lake bedecked with lotuses and lilies” became a lake seen through the special view of official blinkers fashioned in the classic workshop. When a daring writer removes those blinkers and catch phrases, and truly begins to open their eyes, they also open up a view through which the lake assumes different aspects and various fancies. But tradition feels a sense of “Shame”.

When we began to read English poetry, this unconventionally individualistic mood had already been acknowledged in literature, and the uproar raised by the Edinburgh Review was spent. That period of our life was a new era in modernism.

In those days, the sign of modernism in poetry was an individual’s measure of delight. Wordsworth expressed in his own style the spirit of delight that he felt in nature. Shelley’s was a Platonic contemplation, accompanied by a spirit of revolt against every kind of obstacle, political, religious or otherwise. Keat’s poetry came from meditation and creation of beauty. In that age, poetry took a turn from outward movement to inner thought.

A poet’s deepest feelings strive for immortality by assuming a form in language. Love adorns itself; it seeks to prove inward joy by outward beauty. There was a time when humanity in its moments of leisure sought to beautify that portion of the universe with which it came into contact, and this outer adornment was the expression of its inner love, and with this love, there could be no indifference. In those days, in the exuberance of his sense of beauty man began to decorate the common articles of daily use; his inspiration lent creative power to his fingers. In every land and village, household utensils and the adornment of the home and person bound man, in color and form, to these outward insignia of life. Many ceremonies were evolved for adding zest to social life, many new melodies, arts and crafts in wood and metal, clay and stone, silk, wool and cotton. In those days, the husband called his wife: “beloved disciple in the fine arts.” The bank balance did not constitute the principal asset of the married couple in the work of setting up house; the arts were a more necessary item. Flower garlands were woven, the art of dancing was taught, accompanied by lessons in the vina, the flute and singing, and young women knew how to paint the ends of their saris of China silk. Then, there was beauty in human relationships.

The English poets with whom we came into contact in my early youth saw the universe with their own eyes; it had become their personal property. Not only did their own imaginations, opinions and tastes humanize and intellectualize the universe, but they molded it according to their individual desires. The universe of Wordsworth was specially “Wordsworthian,” of Shelley, “Shelleyan,” of Byron, “Byronic.” By creative magic it also became the reader’s universe. The joy that we felt in a poet’s world was the joy of enjoying the delight of a particular world aroma. The flower sent its invitation to the bee through a distinctive smell and color, and the note of invitation was sweet. The poet’s invitation possessed a spontaneous charm. In the days when the chief bond between man and universe was individuality, the personal touch in the invitation had to be fostered with care, a sort of competition had to be set up in dress and ornament and manners, in order to show oneself off to the best advantage.

Thus, we find that in the beginning of the nineteenth century the tradition which held priority in the English poetry of the previous age had given place to self-expression. This was called modernism.

But now that modernism is dubbed mid-Victorian senility and made to recline on an easy chair in the next room. Now is the day of the modernism of lopped skirts and lopped hair. Powder is applied to the cheeks and rouge to the lips, and it is proclaimed that the days of illusion are over. But there is always illusion at every step of the creation, and it is only the variety of that illusions which plays so many tunes in so many forms. Science has thoroughly examined every pulse beat, and declares that at the root of things there is no illusion; there is carbon and nitrogen, there is physiology and psychology. We old-fashioned poets thought the illusion was the main thing and carbon and physiology the by-products. Therefore, we must confess that we had striven to compete with the Creator in spreading the snare of illusion through rhyme and rhythm, language and style. In our metaphors and nuances there was some hide-and-seek; we were unable to lift aside that veil of modesty which adorns but does not contradict truth. In the colored light that filtered through the haze, the dawns and evenings appeared in a beauty as tender as a new bride. The modern, Dushashan, engaged in publicly disrobing Draupadi is a sight we are not accustomed to. Is it merely habit that makes us uncomfortable; is there no truth in this sense of shame; isn’t Beauty bankrupted once we lift the veil which reveals rather than conceals?

But the modern age is in a rush, and livelihood is more important. Man races through his work and rushes through his pleasure in a crowd of accelerating machines. The human being who used to create his own intimate world at leisure now delegates his duties to machinery and submits to a temporary mode of entertainment to cater to his needs according to some official recommendation. Feasts are passe; only meals remain. There is no desire to consider whether life is in harmony with the intellect, for the mind of man is also engaged in pulling the rope of the huge car of livelihood. Instead of music, we hear hoarse shouts of “Push, boys, push!” He has to spend most of his time with the crowed, not in the company of his friends; his mentality is the mentality of the hustler. In the midst of all this bustle he has no will power to bypass unadorned ugliness.

Which path must poetry now follow, then, and where does it seek to go? It is not possible these days to follow one’s own taste, to select, to arrange. Science does not select, it accepts whatever is; it does not appraise by the standard of personal taste nor embellish with the eagerness of personal involvement. The chief delight of the scientific mind consists in curiosity, not in forming ties of relationship. It does not regard what “I” want as the main consideration, but rather what the thing in itself exactly is, leaving “me” out of the question; and without “me,” illusion is unnecessary.

Therefore, in the process of economizing that is being carried out in the poetry of this scientific age, it is adornment that has suffered the biggest loss. A fastidious selectivity in the matter of rhyme, rhythm and words has become almost obsolete. The change is not taking place smoothly, but in order to break the spell of the past, it has become the fashion to repudiate it aggressively, like trying to arrange bits of broken glass in an ugly manner, lest the selective faculty should enter the house by jumping over the garden wall. A poet writes, “I am the greatest laugher of all, greater than the sun, than the oak tree, than the frog and Apollo.” “Than the frog and Apollo” is where the bits of broken glass come in, out of fear that someone will think that the poet is arranging his words sweetly and prettily. If the word “sea” were used instead of “frog,” the modernists might object to it as traditional poetry. Mentioning the frog is a more regular poetizing of the opposite kind. That is to say, it is not introduced naturally, but is like intentionally walking on your toes; that would be modern.

But the fact of the matter is, the days are gone for the frog to be admitted into poetry with the same respect as other creatures. In the category of reality, the frog now belongs to a higher class than Apollo. I do not wish to regard the frog with contempt; rather, in an appropriate context, the croaking laugh of the frog might be juxtaposed with the laugh of the poet’s beloved, even if she objected. But even according to the most ultra-scientific theory of equality, the laugh of the sun, of the oak tree, of Apollo, is not that of the frog. It has been dragged in by force in order to destroy the illusion.

Today. this veil of illusion must be removed and the thing must be seen exactly as it is. The illusion which colored the nineteenth century has now faded, and the mere suggestion of sweetness is not enough to satisfy one’s hunger – something tangible is required. When we say that one gains half the pleasure of eating from the mere smell of food, we exaggerate by nearly three quarters.
Here are a few lines from a poem addressed to a beauty of bygone days.

You are beautiful and faded Like an old opera tune
Played upon a harpsichord;
Or like the sun-flooded silks
Of an eighteenth-century boudoir.
In your eyes
Smoulder the fallen roses of outlived minutes,
And the perfume of your soul Is vague and suffusing,
With the pungence of sealed spice-jars.
Your half-tones delight me,
And I grow mad with gazing
At your blent colors.

My vigor is a new-minted penny,
Which I cast at your feet.
Gather it up from the dust,
That its sparkle may amuse you.

This kind of modern coinage is cheaper but stronger, and very definite; it clearly sounds the modern note. Old-fashioned charm had an intoxicating effect, but this poem has insolence; and there is nothing misty about it.

The subject matter of modern poetry does not seek to draw us with charm. Its strength consists in firm self-reliance, that which is called “character” in English. It calls out: Hey! See me, here am I. The same poet Amy Lowell, has written a poem on a shop selling red slippers. The theme is that in the evening the snowflakes are whirling outside in the wind; inside, behind polished glass windows, rows of red slippers hang like garlands, “like stalactites of blood, flooding the eyes of passers-by with dripping color, jamming their crimson reflections against the windows of cabs and tram-cars, screaming their claret and salmon into the teeth of the street, plopping their little round maroon lights upon the tops of umbrellas. The row of white, sparkling shop-fronts is gashed and bleeding, it bleeds red slippers.” The whole poem deals with slippers.

This is called impersonal. There is no ground for being particularly attached to these garlands of slippers, either as a buyer or a seller, but one has to stop and look; as soon as the character of the picture as a whole becomes apparent, it no longer remains trifling. Those concerned with meaning will ask, “What does it all mean, sir? Why so much bother about slippers, even if they are red?” To which one replies – “Just look at them yourself.” But the questioner asks, “What’s the good of looking?” To which there is no reply.

Let us take another example. There is a poem by Ezra Pound called “A Study in Aesthetics,” in which a girl walks along the street, and a boy in patched clothes cries out in uncontrollable excitement, “Oh! look, look, how beautiful!” Three years later, the poet meets the boy again during a great haul of sardines. The father and uncles box the fish in order to send them to the market at Breschia. The boy jumps about, handling the fish, and his elders scold him to be quiet. The boy strokes the neat rows of fish, and says with satisfaction “How beautiful!” On hearing this the poet says, “I was mildly abashed.”

The pretty girl and the sardines invite the same, “How beautiful!” This observation is impersonal, pure and simple; even the slipper-shop is not outside its purview.

In the nineteenth century poetry was subjective in character; in the twentieth it is objective. Hence, emphasis is now laid on the realism of the subject-matter, not on its adornment; for adornment expresses individual taste, whereas the power of reality consists in expressing the subject itself.

Before making its appearance in literature, this modernism exposed itself in painting. By creating disturbances, it sought to contradict the idea that painting was one of the fine arts. The function of art is not to charm but to conquer the mind, it argued; its sign is not beauty but truth. It did not acknowledge the illusion of form but rather the advertisement of the whole. This form has no other introduction to offer; it only wants to proclaim the fact that it is worth observing. This strong case for being observed is not made by appeals of gesture and posture, nor by copying nature, but by its own inherent truth, which is neither religious, moral, nor ideal – it is natural. That is to say, it must be acknowledged simply because it exists, just as we acknowledge the peacock and the vulture, just as we cannot deny the existence of the the pig or the deer.

Some are beautiful, others are ugly; some are useful, others harmful; but there is no possible pretext for discarding any from the sphere of creation. It is the same with literature and art. If any beauty has been created, it needs no apology; but if it possesses no innate strength of being, only sweetness, then it must be rejected.

Hence, present day literature that has accepted the creed of modernity, scorns to keep caste by carefully adjusting itself to bygone standards of aristocracy; it does not pick and choose. Eliot’s poetry is modern in this sense, but not Bridges’. Eliot writes:

The winter evening settles down
With smell of steaks in passageways,
Six o’clock.
The burnt out ends of smoky days.
And now a gusty shower wraps
The grimy scraps
Of withered leaves about your feet
And newspapers from vacant lots;
The showers beat
On broken blinds and chimney-pots.
And at the corner of the street
A lonely cab-horse steams and stamps.
And then the lighting of the lamps.

Then comes a description of a muddy morning filled with the smell of stale beer. On such a morning, the following words are addressed to a girl:

You tossed a blanket from the bed,
You lay upon your back, and waited;
You dozed, and watched the night revealing
The thousand sordid images
Of which your soul was constituted;

And this is the account given of the man:

His soul stretched tight across the skies
That fade behind a city block,
Or trampled by insistent feet
At four and five and six o’clock;
And short square fingers stuffing pipes,
And evening newspapers, and eyes
Assured of certain certainties,
The conscience of a blackened street
Impatient to assume the world.

In the midst of this smoky, this muddy, this altogether dingy morning and evening, full of many stale odors, and waste papers, the opposite picture is evoked in the poet’s mind. He says:

I am moved by fancies that are curled
Around these images, and cling:
The notion of some infinitely gentle
Infinitely suffering thing.

Here the link between Apollo and the frog is broken. Here the croaking of the frog in the well hurts the laughter of Apollo. It is clearly evident that the poet is not absolutely and scientifically impersonal. His loathing for this tawdry world is expressed through the very description he gives of it. Hence the bitter words with which he ends the poem:

Wipe your hand across your mouth, and laugh;
The worlds revolve like ancient women
Gathering fuel in vacant lots.

The poet’s distaste for this gathering world is evident. The difference from the past consists in there being no desire to delude oneself with an imaginary world of rosy dreams. The poet makes his poetry trudge through this mire regardless of his laundered clothes; not because he is fond of mud, but because in this muddy world one must look at mud with open eyes, and accept it. If Apollo’s laugh reaches one’s ears in the mud, well and good; if not, then one need not despise the loud, leaping laughter of the frog. One can look at it for a moment in the context of the universe; there is something to be said for this. The frog will seem out of place in the cultured language of the drawing-room; but then most of the world lies outside the drawing-room….

But if modernism has any philosophy, and if that philosophy is to be called impersonal, then one must admit that this attitude of aggressive disbelief and calumny toward the universe, is also a personal mental aberration owing to the sudden revolution. This also is an illusion, in which there is no serious attempt to accept reality naturally in a calm and dispassionate frame of mind. Many people think that this aggressiveness, this wantonly destructive challenging is what is called modernity.

I don’t agree with this. Even though thousands of people are attacked by influenza today, we cannot say that influenza is the natural state of the body in modern times. The natural body exists behind influenza.

Pure modernism consists in looking at the universe, not in a personal and self-regarding manner, but in an impersonal and matter-of-fact manner. This point of view is bright and pure, and there is real delight in this unclouded vision. In the same dispassionate way that modern science analyzes reality, modern poetry looks upon the universe as a whole; this is what is eternally modern.

But, actually, it is nonsense to call this modern. The joy of a natural and detached way of looking at things belongs to no particular age; it belongs to everyone whose eyes know how to wander over the naked earth. It is over a thousand years since the Chinese poet Li Po wrote his verses, but he was modern; he looked upon the universe with freshly-opened eyes. In a verse of four lines he writes simply:

Why do I live among the mountains?
I laugh and answer not, my soul is serene;
It dwells in another heaven and earth belonging to no man,
The peach trees are in flower, and the water flows on….

Another picture:

Blue water … a clear moon …
In the moonlight the white herons are flying.
Listen! Do you hear the girls who gather water-chestnuts?
They are going home in the night, singing.

Another:

Naked I lie in the green forest of summer…
Too lazy to wave my white-feathered fan.
I hang my cap on a crag,
And bare my head to the wind that comes
Blowing through the pine trees.

A river merchant’s wife writes:

I would play, plucking flowers by the gate;
My hair scarcely covered my forehead, then.
You would come, riding on your bamboo horse,
And loiter about the bench with green plums for toys.
So we both dwelt in Chang-kan town,
We were two children, suspecting nothing.At fourteen I became your wife,
And so bashful I could never bare my face,
But hung my head, and turned to the dark wall;
You would call me a thousand times,
But I could not look back even once.

At fifteen I was able to compose my eyebrows,
And beg you to love me till we were dust and ashes.

I was sixteen when you went on a long journey.
Traveling beyond the Ken-Tang gorge,
Where the giant rocks heap up the swift river,
And the rapids are not passable in May.
Did you hear the monkeys wailing
Up on the skyey height of the crags?

Do you know your footmarks by our gate are old,
And each and every one is filled up with green moss?
The mosses are too deep for me to sweep away;
And already in the autumn wind the leaves are falling.

The yellow butterflies of October
Flutter in pairs over the grass of the west garden
My heart aches at seeing them …
I sit sorrowing alone, and alas!
The vermillion of my face is fading.

Some day when you return down the river,
If you will write me a letter beforehand,
I will come to meet you – the way is not long –
I will come as far as the Long Wind Bench instantly.

In this poem the sentiment is neither maudlin nor ridiculous. The subject is familiar, and there is feeling. If the tone were sarcastic and there was ridicule, then the poem would be modern, because the moderns scorn to acknowledge in poetry that which everybody acknowledges naturally. Most probably a modern poet would have added at the end of this poem that the husband went his way after wiping his eyes and looking back repeatedly, and the girl at once set about frying dried prawn fish-balls. For whom? In reply there are a line-and-a-half of asterisks. The old-fashioned reader would ask, “What does this mean?” The modern poet would answer “This is how things are.” The reader would say, “But they also happen otherwise.” And the modern would answer, “Yes, they do, but that is too respectable. Unless it sheds its refinement, it does not become modern….”

Edwin Arlington Robinson has described an aristocrat thus:

Whenever Richard Cory went down town,
We people on the pavement looked at him:
He was a gentleman from sole to crown,
Clean favoured, and imperially slim.And he was always quietly arrayed,
And he was always human when he talked;
But still he fluttered pulses when he said,
“Good morning,” and he glittered when he walked.

And he was rich – yes, richer than a king –
And admirably schooled in every grace:
In fine, we thought that he was everything
To make us wish that we were in his place.

So on we worked, and waited for the light,
And went without the meat, and cursed the bread;
And Richard Cory, one calm summer night,
Went home a put a bullet through his head.

There is no modern sarcasm or loud laughter in this poem; on the contrary, there is pathos, which consists in the fact that there may be some fatal disease lurking inside the apparently healthy and beautiful.

He whom we consider rich has a hidden personality. The anchorites spoke in the same way. They remind the living that one day they would go to the burning-ground slung on bamboo poles. European monks have described how the decomposed body beneath the soil is eaten by worms. In dissertations on morality we have seen attempts to destroy our illusion by reminding us that the body which seems beautiful is a repulsive compound of bones and flesh and blood and fluids. The best way of cultivating detachment is repeatedly to instil into our minds a contempt for the reality which we perceive. But the poet is not a disciple of detachment, he has come to cultivate attachment. Is the modern age so very degenerate that even the poet is infected with the atmosphere of cremation, that he begins to take pleasure in saying that which we consider great is decayed, that which we admire as beautiful is untouchable at the core? …

The mid-Victorian age felt a respect for reality and wished to accord it a place of honor; the modern age thinks it part of its program to insult reality and tear aside all the veils of decency.

If you call a reverence for universal things sentimentalism, then you must also call your rebellion against them by the same name. If the mind becomes bitter, for whatever reason, the vision can never be natural. Hence, if the mid-Victorian age is to be ridiculed as being the leader of ultra-respectability, then the Edwardian age must also be ridiculed with the opposite adjectives. The thing is not natural and therefore not perennial. As for science, so for art, the detached mind is the best vehicle. Europe has gained that mind in science, but not in literature.

নতুন পুতুল/ Notun Putul/ The New Dolls

নতুন পুতুল

 

এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।

 

 

 

বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।

 

 

 

যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমনসময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল। তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা।

 

 

 

যে পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রঙ দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয়, পুতুলগুলো যেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না।

 

 

 

নবীনের দল বললে, ‘লোকটা সাহস দেখিয়েছে।’

 

 

 

প্রবীণের দল বললে, ‘একে বলে সাহস? এ তো স্পর্ধা।’

 

 

 

কিন্তু, নতুন কালের নতুন দাবি। এ কালের রাজকন্যারা বলে, ‘আমাদের এই পুতুল চাই।’

 

 

 

সাবেক কালের অনুচরেরা বলে, ‘আরে ছিঃ।’

 

 

 

শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়।

 

 

 

বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার ঝাঁকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মতো ও পারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

 

 

 

এক বছর যায়, দু বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুলহাটের সর্দার।

 

 

 

 

বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না। শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, ‘তুমি আমার বাড়িতে এসো।’

 

 

 

জামাই বললে, ‘খাও দাও, আরাম করো, আর সবজির খেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখো।’

 

 

 

বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে। তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নৌকো বোঝাই করে শহরে নিয়ে যায়।

 

 

 

নতুন কাল এসেছে সে কথা বুড়ো বোঝে না, তেমনিই সে বোঝে না যে, তার নাৎনির বয়স হয়েছে ষোলো।

 

 

 

যেখানে গাছতলায় ব’সে বুড়ো খেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনি গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে; বুড়োর বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘কী দাদি, কী চাই।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।’

 

 

 

বুড়ো বলে, ‘আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘তোমার চেয়ে ভালো পুতুল কে গড়ে শুনি।’

 

 

 

বুড়ো বলে, ‘কেন, কিষণলাল।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘ইস্‌! কিষণলালের সাধ্যি!’

 

 

 

দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েছে। বারে বারে একই কথা।

 

 

 

তার পরে বুড়ো তার ঝুলি থেকে মালমশলা বের করে; চোখে মস্ত গোল চশমাটা আঁটে।

 

 

 

নাৎনিকে বলে, ‘কিন্তু দাদি, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে।’

 

 

 

নাৎনি বলে, ‘দাদা, আমি কাক তাড়াব।’

 

 

 

বেলা বয়ে যায়; দূরে ইঁদারা থেকে বলদে জল টানে, তার শব্দ আসে; নাৎনি কাক তাড়ায়, বুড়ো বসে বসে পুতুল গড়ে।

 

 

 

 

বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড়ো কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে।

 

 

 

বুড়ো আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেছে; হুঁশ হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত দুলিয়ে আসছে।

 

 

 

কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মতো তাকিয়ে রইল।

 

 

 

মেয়ে বললে, ‘দুধ দোওয়া পড়ে থাক্‌, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও। অত বড়ো মেয়ে, ওর কি পুতুলখেলার বয়স।’

 

 

 

বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘সুভদ্রা খেলবে কেন। এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচব। আমার দাদির যেদিন বর আসবে সেদিন তো ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই।’

 

 

 

মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, ‘রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে।’

 

 

 

বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল।

 

 

 

সুভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, ‘দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখব।’

 

 

 

 

দু দিন পরে সুভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, ‘এই নাও, আমার দাদার পুতুলের দাম।’

 

 

 

মা বললে, ‘কোথায় পেলি।’

 

 

 

মেয়ে বললে, ‘রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেছি।’

 

 

 

বুড়ো হাসতে হাসতে বললে, ‘দাদি, তবু তো তোর দাদা এখন চোখে ভালো দেখে না, তার হাত কেঁপে যায়।’

 

 

 

মা খুশি হয়ে বললে, ‘এমন ষোলোটা মোহর হলেই তো সুভদ্রার গলার হার হবে।’

 

 

 

বুড়ো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী।’

 

 

 

সুভদ্রা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘দাদাভাই, আমার বরের জন্যে তো ভাবনা নেই।’

 

 

 

বুড়ো হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে ফেললে।

 

 

 

 

বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইঁদারায় বলদে ক্যাঁ-কোঁ করে জল টানে।

 

 

 

একে একে ষোলোটা মোহর গাঁথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

 

 

মা বললে, ‘এখন বর এলেই হয়।’

 

 

 

সুভদ্রা বুড়োর কানে কানে বললে, ‘দাদাভাই, বর ঠিক আছে।’

 

 

 

দাদা বললে, ‘বল্‌ তো দাদি, কোথায় পেলি বর।’

 

 

 

সুভদ্রা বললে, ‘যেদিন রাজপুরীতে গেলেম দ্বারী বললে, কী চাও। আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না। ব’লে আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও তো, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর দাদা, তা হলে আমি তার গলায় মালা দিই।’

 

 

 

বুড়ো জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে আছে কোথায়।’

 

 

 

নাৎনি বললে, ‘ঐ যে, বাইরে পিয়ালগাছের তলায়।’

 

 

 

বর এল ঘরের মধ্যে; বুড়ো বললে, ‘এ যে কিষণলাল।’

 

 

 

কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘হাঁ, আমি কিষণলাল।

 

 

 

বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, ‘ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।’

 

 

 

নাৎনি বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, ‘দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।’

 

***

The New Dolls

1

 

This artisan only made dolls; dolls for the girls of the royal family to play with.

Each year there was a doll fair in the grounds of the palace. All the artisans there have always honoured this artisan as their leader.

When he was nearly eighty years old, a new artisan came to the fair. His name was Kishanlal, he was youthful in years and his style was new.

The dolls he makes are complete but not quite formed, fully painted but still untouched by the brush in parts. It is almost as if the dolls are not quite finished, as if they will never quite grow old.

The young people said, “This is brave work!”

The old people said, “Bravery? More like audacity if you ask us!”

But modern times demand modern things. The princesses of today said, “We want these dolls!”

 

The ancient courtiers said, “For shame!”

That made the princesses crave the new fangled dolls even more.

There were no crowds at the old artisan’s shop these days. Baskets filled with dolls waited like passengers waiting for a ferry with their eyes fixed on the far banks of a river.

One year passed and then another. Everyone forgot all about the old man. Kishanlal was now the top maker of dolls in the fair held in the palace.

 

The old man was heart broken and he barely made any money. Finally his daughter came to him and said, “Come and live with me.”

 

His son-in-law said, “Eat, drink and rest! The only thing you have to do is drive stray cattle from the vegetable patch.”

 

His daughter was busy with her household chores all day. His son-in-law made clay lamps and took them by boat to the town to sell.

 

Just as the old man fails to notice that the times are changing, he also fails to understand that his granddaughter is no child anymore but a young woman of sixteen.

The girl comes and puts her arms around his neck as he sits beneath a tree guarding vegetables in between nodding off to sleep. Even the ribs surrounding his heart ache with happiness when she does this.

His granddaughter says, “Make me a doll, I want to play!”

 

The old man says, “Now, now! Why would you like my work?”

 

The girl says, “Who can make better dolls than you?”

 

 

 

The old man answers, “What about Kishanlal?”

 

The girl answers, “What! Kishanlal wishes he could make these dolls!”

 

How often the two have argued about this! It is always the same.

 

Then the old man takes clay and other stuff out of his bundle and puts his great round rimmed glasses on.

 

He says to his granddaughter, “But child, what of the corn? The crows will eat it all!”

 

 

 

The girl says, “Grandfather, I will drive them away!”

The day passes. The bullock draws water noisily from the distant canal; the girl drives the crows away and the old man makes dolls out of clay.

 

 

 

3

The old man feared his daughter most of all. She was the strictest of them al and everyone in the family was afraid of her.

He was making his dolls with such concentration one day that he did not notice anything else. He certainly never heard his daughter swinging her arms fast as she walked up to him from behind.

He took his glasses off and stared at her like an uncomprehending child when she called him from close by.

She said, “The milking can wait I suppose while you spend time with Subhadra! Why make dolls for her, is she still young enough to play with those?”

The old man spoke up quickly, “Why would Subhadra play with these? I will sell them in the palace. We will need a necklace of gold when a groom comes for my child. I need to save money for that.”

His daughter was annoyed and said, “Who will buy these in the palace?”

The old man bowed his head at this and fell quiet.

Subhadra shook her head and said, “I would like to see anyone say no to dolls made by my grandfather!”

 

 

4

Two days later Subhadra gave a gold coin to her mother and said, “Here, the price for my grandfather’s dolls.”

Her mother asked, “Where did you get these?”

The girl said, “I sold them in the palace.”

The old man smiled and said, “Child, just imagine! I do not see well these days and my hands tremble!”

Her mother was pleased. She said, “Sixteen coins like this will make a beautiful necklace for Subhadra.”

The old man answered, “That should not be a problem.”

Subhadra wrapped her arms about her grandfather’s neck and said, “I do not worry about finding myself a husband!”

The old man smiled and wiped a tear away.

 

 

 

 

 

5

The old man seemed to have found his second youth. He sat under the tree sculpting his dolls while Subhadra drove the crows away. The bullock drew water from the canal with a creaking of the wheel in the distance.

One by one sixteen gold coins were strung on a thread and the necklace was completed.

Her mother said, “All we need now is a groom!”

Subhadra whispered in the old man’s ear, “Grandfather, there is a groom.”

The grandfather asked, “Tell me child, where did you find your groom?”

Subhadra said, “The day I went to the palace, the sentry asked me what I wanted and I told him that I was there to sell dolls to the princesses. He said to me, these dolls are not selling these days and  turned me away with those words. There was one man who saw my tears and said, let me touch those dolls up with a little paint for you, they will sell easily enough. Grandfather, if you like him too, I should like to marry him.”

The old man asked, “Where is he?”

The girl answered, “There, by the Piyal tree outside.”

The groom entered the room; the old man said, “But this is Kishanlal!”

Kishanlal bowed to touch the old man’s feet and said, “Yes, I am Kishanlal indeed.”

The old man hugged him close and said, “Once upon a time you took over the dolls that I made with my own hands, and today you come for the one that lives within my heart.”

His granddaughter threw her arms about his neck and whispered, “He is here to take you too!”

ছেলেটা/ Cheleta/ That Boy

ছেলেটা

 

ছেলেটার বয়স হবে বছর দশেক–

 

পরের ঘরে মানুষ।

 

যেমন আগাছা বেড়ে ওঠে ভাঙা বেড়ার ধারে–

 

মালীর যত্ন নেই,

 

আছে আলোক বাতাস বৃষ্টি

 

পোকামাকড় ধুলোবালি–

 

কখনো ছাগলে দেয় মুড়িয়ে,

 

কখনো মাড়িয়ে দেয় গোরুতে–

 

তবু মরতে চায় না, শক্ত হয়ে ওঠে,

 

ডাঁটা হয় মোটা,

 

পাতা হয় চিকন সবুজ।

 

 

 

ছেলেটা কুল পাড়তে গিয়ে গাছের থেকে পড়ে,

 

হাড় ভাঙে,

 

বুনো বিষফল খেয়ে ওর ভির্মি লাগে,

 

রথ দেখতে গিয়ে কোথায় যেতে কোথায় যায়,

 

কিছুতেই কিছু হয় না–

 

আধমরা হয়েও বেঁচে ওঠে,

 

হারিয়ে গিয়ে ফিরে আসে

 

কাদা মেখে কাপড় ছিঁড়ে–

 

মার খায় দমাদম,

 

গাল খায় অজস্র–

 

ছাড়া পেলেই আবার দেয় দৌড়।

 

 

 

মরা নদীর বাঁকে দাম জমেছে বিস্তর,

 

বক দাঁড়িয়ে থাকে ধারে,

 

দাঁড়কাক বসেছে বৈঁচিগাছের ডালে,

 

আকাশে উড়ে বেড়ায় শঙ্খচিল,

 

বড়ো বড়ো বাঁশ পুঁতে জাল পেতেছে জেলে,

 

বাঁশের ডগায় বসে আছে মাছরাঙা,

 

পাতিহাঁস ডুবে ডুবে গুগলি তোলে।

 

বেলা দুপুর।

 

লোভ হয় জলের ঝিলিমিলি দেখে–

 

তলায় পাতা ছড়িয়ে শেওলাগুলো দুলতে থাকে,

 

মাছগুলো খেলা করে।

 

আরো তলায় আছে নাকি নাগকন্যা?

 

সোনার কাঁকই দিয়ে আঁচড়ায় লম্বা চুল,

 

আঁকাবাঁকা ছায়া তার জলের ঢেউয়ে।

 

ছেলেটার খেয়াল গেল ওইখানে ডুব দিতে–

 

ওই সবুজ স্বচ্ছ জল,

 

সাপের চিকন দেহের মতো।

 

“কী আছে দেখিই-না’ সব তাতে এই তার লোভ।

 

দিল ডুব, দামে গেল জড়িয়ে–

 

চেঁচিয়ে উঠে, খাবি খেয়ে, তলিয়ে গেল কোথায়।

 

ডাঙায় রাখাল চরাচ্ছিল গোরু,

 

জেলেদের ডিঙি নিয়ে টানাটানি করে তুললে তাকে–

 

তখন সে নিঃসাড়।

 

তার পরে অনেক দিন ধরে মনে পড়েছে

 

চোখে কী করে সর্ষেফুল দেখে,

 

আঁধার হয়ে আসে,

 

যে মাকে কচি বেলায় হারিয়েছে

 

তার ছবি জাগে মনে,

 

জ্ঞান যায় মিলিয়ে।

 

ভারি মজা,

 

কী করে মরে সেই মস্ত কথাটা।

 

সাথিকে লোভ দেখিয়ে বলে,

 

“একবার দেখ্‌-না ডুবে, কোমরে দড়ি বেঁধে,

 

আবার তুলব টেনে।’

 

ভারি ইচ্ছা করে জানতে ওর কেমন লাগে।

 

সাথি রাজি হয় না;

 

ও রেগে বলে, “ভীতু, ভীতু, ভীতু কোথাকার।’

 

 

 

বক্সিদের ফলের বাগান, সেখানে লুকিয়ে যায় জন্তুর মতো।

 

মার খেয়েছে বিস্তর, জাম খেয়েছে আরো অনেক বেশি।

 

বাড়ির লোকে বলে, “লজ্জা করে না বাঁদর?’

 

কেন লজ্জা।

 

বক্সিদের খোঁড়া ছেলে তো ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে ফল পাড়ে,

 

ঝুড়ি ভরে নিয়ে যায়,

 

গাছের ডাল যায় ভেঙে,

 

ফল যায় দ’লে–

 

লজ্জা করে না?

 

একদিন পাকড়াশীদের মেজো ছেলে একটা কাঁচ-পরানো চোঙ নিয়ে

 

ওকে বললে, “দেখ্‌-না ভিতর বাগে।’

 

দেখল নানা রঙ সাজানো,

 

নাড়া দিলেই নতুন হয়ে ওঠে।

 

বললে, “দে-না ভাই, আমাকে।

 

তোকে দেব আমার ঘষা ঝিনুক,

 

কাঁচা আম ছাড়াবি মজা ক’রে–

 

আর দেব আমের কষির বাঁশি।’

 

 

 

দিল না ওকে।

 

কাজেই চুরি করে আনতে হল।

 

ওর লোভ নেই–

 

ও কিছু রাখতে চায় না, শুধু দেখতে চায়

 

কী আছে ভিতরে।

 

খোদন দাদা কানে মোচড় দিতে দিতে বললে,

 

“চুরি করলি কেন।’

 

লক্ষ্মীছাড়াটা জবাব করলে,

 

“ও কেন দিল না।’

 

যেন চুরির আসল দায় পাকড়াশিদের ছেলের।

 

 

 

ভয় নেই ঘৃণা নেই ওর দেহটাতে।

 

কোলাব্যাঙ তুলে ধরে খপ ক’রে,

 

বাগানে আছে খোঁটা পোঁতার এক গর্ত,

 

তার মধ্যে সেটা পোষে–

 

পোকামাকড় দেয় খেতে।

 

গুবরে পোকা কাগজের বাক্সোয় এনে রাখে,

 

খেতে দেয় গোবরের গুটি–

 

কেউ ফেলে দিতে গেলে অনর্থ বাধে।

 

ইস্কুলে যায় পকেটে নিয়ে কাঠবিড়ালি।

 

একদিন একটা হেলে সাপ রাখলে মাস্টারের ডেস্কে–

 

ভাবলে, “দেখিই-না কী করে মাস্টারমশায়।’

 

ডেক্‌সো খুলেই ভদ্রলোক লাফিয়ে উঠে দিলেন দৌড়–

 

দেখবার মতো দৌড়টা।

 

 

 

একটা কুকুর ছিল ওর পোষা,

 

কুলীনজাতের নয়,

 

একেবারে বঙ্গজ।

 

চেহারা প্রায় মনিবেরই মতো,

 

ব্যবহারটাও।

 

অন্ন জুটত না সব সময়ে,

 

গতি ছিল না চুরি ছাড়া–

 

সেই অপকর্মের মুখে তার চতুর্থ পা হয়েছিল খোঁড়া।

 

আর, সেইসঙ্গেই কোন্‌ কার্যকারণের যোগে

 

শাসনকর্তাদের শসাখেতের বেড়া গিয়েছিল ভেঙে।

 

মনিবের বিছানা ছাড়া কুকুরটার ঘুম হত না রাতে,

 

তাকে নইলে মনিবেরও সেই দশা।

 

একদিন প্রতিবেশীর বাড়া ভাতে মুখ দিতে গিয়ে

 

তার দেহান্তর ঘটল।

 

মরণান্তিক দুঃখেও কোনোদিন জল বেরোয় নি যে ছেলের চোখে

 

দু দিন সে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে কেঁদে বেড়ালো,

 

মুখে অন্নজল রুচল না,

 

বক্সিদের বাগানে পেকেছে করম্‌চা–

 

চুরি করতে উৎসাহ হল না।

 

সেই প্রতিবেশীদের ভাগ্নে ছিল সাত বছরের,

 

তার মাথার উপর চাপিয়ে দিয়ে এল এক ভাঙা হাঁড়ি।

 

হাঁড়ি-চাপা তার কান্না শোনালো যেন ঘানিকলের বাঁশি।

 

 

 

গেরস্তঘরে ঢুকলেই সবাই তাকে “দূর দূর’ করে,

 

কেবল তাকে ডেকে এনে দুধ খাওয়ায় সিধু গয়লানী।

 

তার ছেলেটি মরে গেছে সাত বছর হল,

 

বয়সে ওর সঙ্গে তিন দিনের তফাত।

 

ওরই মতো কালোকোলো,

 

নাকটা ওইরকম চ্যাপ্টা।

 

ছেলেটার নতুন নতুন দৌরাত্মি এই গয়লানী মাসীর ‘পরে।

 

তার বাঁধা গোরুর দড়ি দেয় কেটে,

 

তার ভাঁড় রাখে লুকিয়ে,

 

খয়েরের রঙ লাগিয়ে দেয় তার কাপড়ে।

 

“দেখি-না কী হয়’ তারই বিবিধ-রকম পরীক্ষা।

 

তার উপদ্রবে গয়লানীর স্নেহ ওঠে ঢেউ খেলিয়ে।

 

তার হয়ে কেউ শাসন করতে এলে

 

সে পক্ষ নেয় ওই ছেলেটারই।

 

 

 

অম্বিকে মাস্টার আমার কাছে দুঃখ ক’রে গেল,

 

“শিশুপাঠে আপনার লেখা কবিতাগুলো

 

পড়তে ওর মন লাগে না কিছুতেই,

 

এমন নিরেট বুদ্ধি।

 

পাতাগুলো দুষ্টুমি ক’রে কেটে রেখে দেয়,

 

বলে ইঁদুরে কেটেছে।

 

এতবড়ো বাঁদর।’

 

আমি বললুম, “সে ত্রুটি আমারই,

 

থাকত ওর নিজের জগতের কবি

 

তা হলে গুবরে পোকা এত স্পষ্ট হত তার ছন্দে

 

ও ছাড়তে পারত না।

 

কোনোদিন ব্যাঙের খাঁটি কথাটি কি পেরেছি লিখতে,

 

আর সেই নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি।’

 

 

 

 

 

২৮ শ্রাবণ, ১৩৩৯

 

***

 

 

 

 

THAT BOY

 

That boy would be no older than ten –

Growing up in a home not his own.

Just as a weed flourishes by a broken fence –

No gardener to watch his every step,

Bathed in light, wind and rain

Under attack from insects and dust

 

Sometimes a goat trims it back to the roots,

 

Sometimes a cow crushes it underfoot –

 

But it still does not die, growing stronger each day

 

Its stem thickening

 

While its leaves grow lush and green.

 

 

 

The boy falls from a tree while picking fruit

 

A bone or two are broken,

 

He falls into a faint after eating poison fruit

 

Ends up far from where he should have been, on his way to the fair.

 

Nothing happens to him though –

 

He comes back from the doors of death,

 

He returns from being lost

Covered in mud, clothes ripped –

 

Fists rain down on him,

 

Harsh words too –

 

But once free he is off again, up to no good.

 

 

 

There by the dried river bed, where algae clouds the stream,

 

Herons wait for fish,

 

A crow perches on a Carissa branch,

 

A kite flies in the skies above,

 

And fishermen have draped their nets over tall bamboo poles,

Capped by jewel bright kingfishers,

Ducks dip their heads looking for things to eat, snails and their like,

 

All under the midday sun.

 

He feels drawn to the sparkling waters –

 

And the dancing weeds beneath,

 

Where the fish dart and play.

 

Does the snake princess live even deeper below?

 

Combing her long hair out with a comb of gold,

 

Till it shimmers, light and shade playing on the waves.

 

The boy thought of diving into that very spot –

 

In the clear green waters,

His body slicing in smooth as a snake.

‘Why not see what there is -’ this his chief wish.

He dived in, only to be entangled in the winding weeds –

He called, struggled a bit, then sank into the depths.

 

There was a cowherd on the banks,

He mustered a fishing boat and managed to pull the boy out –

 

Dead to the world for all purpose.

He has often thought of it since then

 

How stars seemed to fill his eyes,

And it all went dark,

 

And the mother he had lost as a child

 

Why did she come to mind,

Just before everything faded?

 

Such fun,

So that was the big secret about how one died!

He tried to tempt a play mate,

‘Why don’t you take a dip with a rope around your waist,

I will pull you out.’

 

He would really like to know how they feel.

 

But his friend does not want to do it;

 

He screams angrily, ‘Coward, coward, coward!’

 

 

 

He hides in the orchard belonging to the Bakshis, wild thing in its lair.

 

He has been beaten often enough but feasted far more.

 

The people at home ask, ‘Have you no shame, you animal!’

 

But why should he feel any shame?

What about the lame son of the Bakshis, who hits the branches to get the fruit,

 

Fills baskets with the bounty,

 

Leaves the tree’s branches bruised and broken,

 

Stamping the fruit into the ground –

 

Does he feel any shame?

 

One day one of the Pakrashis came with a tube with glass windows

 

Told him, ‘Have a look inside!’

 

Inside, a world of colours

 

Renewing with each shake.

 

The boy said, ‘Please, let me have it.

 

You can have my treasured shell knife, sharpened,

 

Such fun to peel green mangoes with –

 

I will even throw in my mango seed flute!’

 

 

 

But to no avail.

 

What was he to do but steal it then?

 

He does not crave ownership –

He does not care to keep things, he just wants to see

 

What lies inside.

 

But the grown ups twisted his ear so hard as they asked,

 

‘Why did you have to steal?’

 

The rascal replied,

 

‘But why did he not give it to me?’

 

As if all fault lay with the Pakrashi boy.

 

 

 

He knows neither fear not shame.

Happily snatching up a toad,

He puts it in a hole made for a garden post

 

It is his pet to feed –

 

With insects and other creatures.

 

He keeps dung beetles in paper boxes,

 

Feeding them balls of dung –

Raging when anyone suggests throwing them out.

 

He takes a squirrel in his pockets to school.

 

Once he put a snake in the master’s desk –

 

Thinking, ‘Let us see what he does!’

 

The poor man ran as soon as his desk was open –

 

His speed was something to behold.

 

 

 

He had a pet dog,

 

No pedigree of any kind,

 

A mongrel born and raised.

 

In looks a close match to his owner,

 

In his manners too.

 

It never got enough to eat,

The only way out was to steal what it could –

 

That had resulted in one of his legs being lamed.

 

At the same time, mysteriously

 

A section of fence belonging to the disciplining hand was found to be damaged.

 

The dog could not sleep unless it was in its owner’s bed at night,

 

The boy could not sleep either if they were apart.

 

One day the dog got too close to a neighbour’s plate of food

 

Retribution came in death.

The boy who had never cried even in heart rending sorrow

 

Hid his tears for days,

 

Unable to eat or drink,

 

Not even the prospect of ripe fruit in the Bakshi garden –

Could inspire him to theft.

 

The neighbour had a seven year old nephew,

 

The boy jammed a broken pot over the child’s head.

 

The boy’s tears sounded like muffled machinery from his earthen prison.

 

 

 

Everyone chases him off the minute he enters a house,

 

The only one who views him with love is Sidhu Goylani the milk maid.

 

Her own son dead these seven desolate years,

 

They were born merely three days apart, the two.

 

Dark of limb and face,

 

Snub nosed, twins in their plainness.

 

He subjects this loving woman to new torments daily.

 

He lets her cows roam loose, cutting them free.

 

He hides her milk pails,

 

He smears her clothes with catechu.

 

All these are his way to ‘see what happens if -!’

 

But each new trick makes her heart swell with love.

 

When others try to berate him on her behalf

 

She takes up cudgels on his.

 

 

The teacher came to me and ruefully complained,

 

‘Even your poems in the primer

 

He will not once sit down to read,

 

Such a dullard is rarely to be seen.

 

He cuts holes in the pages on purpose,

 

Claiming the mice have been at work.

 

Who knew he had such a wicked heart!’

 

I said, ‘But that is my failing,

 

If only there was a poet who came from his own world

 

They would have caught the dung beetle’s rhythm in their stanzas

 

And the boy would have not been able to put the book down.

 

Have I ever written of what goes on in a toad’s heart,

 

Or of the tragedies that afflict daily the life of a stray dog?’

 

 

 

 

 

 

28th Shravan 1339

ময়ূরের দৃষ্টি/ Mayurer Drishti/ Through the Eyes of a Peacock

ময়ূরের দৃষ্টি     

 

দক্ষিণায়নের সূর্যোদয় আড়াল ক’রে

সকালে বসি চাতালে।

অনুকূল অবকাশ;

তখনো নিরেট হয়ে ওঠে নি কাজের দাবি,

ঝুঁকে পড়ে নি লোকের ভিড়

পায়ে পায়ে সময় দলিত করে দিয়ে।

লিখতে বসি,

কাটা খেজুরের গুঁড়ির মতো

ছুটির সকাল কলমের ডগায় চুঁইয়ে দেয় কিছু রস।

 

আমাদের ময়ূর এসে পুচ্ছ নামিয়ে বসে

পাশের রেলিংটির উপর।

আমার এই আশ্রয় তার কাছে নিরাপদ,

এখানে আসে না তার বেদরদী শাসনকর্তা বাঁধন হাতে।

বাইরে ডালে ডালে কাঁচা আম পড়েছে ঝুলে,

নেবু ধরেছে নেবুর গাছে,

একটা একলা কুড়চিগাছ

আপনি আশ্চর্য আপন ফুলের বাড়াবাড়িতে।

প্রাণের নিরর্থক চাঞ্চল্যে

ময়ূরটি ঘাড় বাঁকায় এদিকে ওদিকে।

তার উদাসীন দৃষ্টি

কিছুমাত্র খেয়াল করে না আমার খাতা-লেখায়;

করত, যদি অক্ষরগুলো হত পোকা;

তা হলে নগণ্য মনে করত না কবিকে।

হাসি পেল ওর ওই গম্ভীর উপেক্ষায়,

ওরই দৃষ্টি দিয়ে দেখলুম আমার এই রচনা।

দেখলুম, ময়ূরের চোখের ঔদাসীন্য

সমস্ত নীল আকাশে,

কাঁচা-আম-ঝোলা গাছের পাতায় পাতায়,

তেঁতুলগাছের গুঞ্জনমুখর মৌচাকে।

ভাবলুম, মাহেন্দজারোতে

এইরকম চৈত্রশেষের অকেজো সকালে

কবি লিখেছিল কবিতা,

বিশ্বপ্রকৃতি তার কোনোই হিসাব রাখে নি।

কিন্তু, ময়ূর আজও আছে প্রাণের দেনাপাওনায়,

কাঁচা আম ঝুলে পড়েছে ডালে।

নীল আকাশ থেকে শুরু করে সবুজ পৃথিবী পর্যন্ত

কোথাও ওদের দাম যাবে না কমে।

আর, মাহেন্দজারোর কবিকে গ্রাহ্যই করলে না।

পথের ধারের তৃণ, আঁধার রাত্রের জোনাকি।

 

নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথিবীতে

মেলে দিলাম চেতনাকে,

টেনে নিলেম প্রকৃতির ধ্যান থেকে বৃহৎ বৈরাগ্য

আপন মনে;

খাতার অক্ষরগুলোকে দেখলুম

মহাকালের দেয়ালিতে

পোকার ঝাঁকের মতো।

ভাবলুম, আজ যদি ছিঁড়ে ফেলি পাতাগুলো

তা হলে পর্শুদিনের অস্ত্যসৎকার এগিয়ে রাখব মাত্র।

 

এমন সময় আওয়াজ এল কানে,

“দাদামশায়, কিছু লিখেছ না কি।”

ওই এসেছে–ময়ূর না,

ঘরে যার নাম সুনয়নী,

আমি যাকে ডাকি শুনায়নী ব’লে।

ওকে আমার কবিতা শোনাবার দাবি সকলের আগে।

আমি বললেম, “সুরসিকে, খুশি হবে না,

এ গদ্যকাব্য।”

কপালে ভ্রূকুঞ্চনের ঢেউ খেলিয়ে

বললে, “আচ্ছা, তাই সই।”

সঙ্গে একটু স্তুতিবাক্য দিলে মিলিয়ে;

বললে, “তোমার কণ্ঠস্বরে,

গদ্যে রঙ ধরে পদ্যের।”

ব’লে গলা ধরলে জড়িয়ে।

আমি বললেম, “কবিত্বের রঙ লাগিয়ে নিচ্ছ

কবিকণ্ঠ থেকে তোমার বাহুতে?”

সে বললে, “অকবির মতো হল তোমার কথাটা;

কবিত্বের স্পর্শ লাগিয়ে দিলেম তোমারই কণ্ঠে,

হয়তো জাগিয়ে দিলেম গান।”

 

শুনলুম নীরবে, খুশি হলুম নিরুত্তরে।

মনে-মনে বললুম, প্রকৃতির ঔদাসীন্য অচল রয়েছে

অসংখ্য বর্ষকালের চূড়ায়,

তারই উপরে একবারমাত্র পা ফেলে চলে যাবে

আমার শুনায়নী,

ভোরবেলার শুকতারা।

সেই ক্ষণিকের কাছে হার মানবে বিরাটকালের বৈরাগ্য।

 

মাহেন্দজারোর কবি, তোমার সন্ধ্যাতারা

অস্তাচল পেরিয়ে

আজ উঠেছে আমার জীবনের

উদয়াচলশিখরে।

 

 

? শান্তিনিকেতন, এপ্রিল ১৯৩৯

***

THROUGH THE EYES OF A PEACOCK

 

I hide from the sunrise in summer

 

And sit on the terrace each morning.

 

A convenient leisure;

 

The demands of the day are not quite insistent yet,

 

People do not come crowding close

 

Crushing the hours underfoot.

 

I sit down to write,

 

Like the cut trunk of a date palm

 

A little sweetness from the restful morning drips from my pen.

 

 

 

Our peacock comes to rest its plumage

 

Upon the railing beside me.

 

This proximity of ours makes it feel safe,

 

Its humourless minder will not venture here, cage in hand.

 

Outside the branches drip with green mangoes,

 

Lemons hang upon the lemon tree’s boughs,

 

And a solitary ervatamia

 

Astonishes itself in an exuberance of flowering.

 

Alerted by nothing more than life itself

 

The peacock looks, first this way then that.

 

Its idle wandering eye

 

Does not take note of my scribbling;

 

It would, had the letters been insects crawling across the page;

 

Then it would not have spurned the poet so.

 

A smile rises at such studied neglect,

 

And I begin to see my work through its eyes.

 

And I see, the same ambivalence

 

Across the blue skies,

 

In each leaf of the fruit festooned mango tree,

 

In the humming hive nestled in the tamarind tree.

 

And I find myself thinking, in Mohenjodaro too

 

On just such a slow morning at the close of a year

 

Poets wrote odes,

 

None of which remain today.

 

But the peacock still lives on in the ebb and flow of life,

 

Green mangoes hang from every branch.

 

From the blue skies to the verdant earth

 

There will be no lessening of their value to us.

 

Yet the poet of Mohenjodaro was unheeded

 

Merely a blade of grass by the path, a firefly on a dark nights.

 

 

 

I open my eyes to the endless march of time and the vast world

 

Allowing my consciousness to absorb,

 

A great ambivalence from nature’s meditative silence

 

Into myself;

 

And the words on my pages appear

 

Like so many insects drawn

 

To the festival of lights in time

 

And I think to myself, if I should tear these pages up today

 

I am merely doing what will need to be done in the near future.

 

 

 

When I suddenly hear the words,

 

“Grandfather, have you written anything?”

 

There she is, no – not the peacock

 

The one who is called Sunayani at home,

 

The one I call Shunayoni, the one who must be heeded.

 

She demands each poem of mine before all the others.

 

I said, “Appreciative though you are, this will not please you,

 

This play of words.”

 

A frown plays across her brow

 

As she says, “So be it.”

 

Adding a few words aimed to appease;

 

She says, “ In your voice,

 

Even mere words take on a poetic hue.”

 

And she wrapped her arms about my neck.

 

I ask, “Are you drawing those colours

 

From my throat to your arm?”

 

She says, “That is what a non poet would say;

 

I merely touch your throat with beauty,

 

Hoping to awaken a song.”

 

 

 

I listen in silence, I am wordless with joy.

 

I tell myself, the ambivalence of nature sits

 

Across the peaks of countless years,

 

She merely has to step across them once

 

My Shunayoni,

 

My star of dawn.

 

That will be enough to defeat the austere meditation of time.

 

 

 

Ancient poet of Mohenjodaro, your evening star

 

Has travelled across setting suns

 

To rise once again in my life

 

Upon the peaks of the waking sun.

 

 

 

SANTINIKETAN, April 1939