ছাত্রের পরীক্ষা / Cchatrer Porikkha/ The Student’s Test

ছাত্রের পরীক্ষা

 

 

ছাত্র শ্রীমধুসূদন

 

 

 

শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

 

 

 

অভিভাবকের প্রবেশ

 

 

 

অভিভাবক।

 

মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু?

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

আজ্ঞে, মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে, কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত। কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না।

 

 

 

অভিভাবক।

 

বটে! তা, আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

তা , দেখুন-না।

 

 

 

মধুসূদন।

 

(স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে। আজ এর শোধ তুলব। ওঁকে আমি তাড়াব।

 

 

 

অভিভাবক।

 

কেমন রে মোধো, পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো?

 

 

 

মধুসূদন।

 

মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি।

 

 

 

মধুসূদন।

 

যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

একটা উদাহরণ দে।

 

 

 

মধুসূদন।

 

কেঁচো!

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

(চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

 

 

 

অভিভাবক।

 

রসুন মশায়, এখন কিছু বলবেন না।

 

 

 

মধুসূদনের প্রতি

 

 

 

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ; আচ্ছা, কাননে কী ফোটে বলো দেখি?

 

 

 

মধুসূদন।

 

কাঁটা।

 

 

 

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

 

 

 

কী মশায়, মারেন কেন? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে? ইতিহাসে কী বলে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

পোকায়।

 

 

 

বেত্রাঘাত

 

 

 

আজ্ঞে, মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি– শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন, সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন।

 

 

 

প্রদর্শন।

 

কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

 

 

 

অভিভাবক।

 

ব্যাকরণ মনে আছে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

আছে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

“কর্তা’ কী, তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি।

 

 

 

মধুসূদন।

 

আজ্ঞে, কর্তা ওপাড়ার জয়মুন্‌শি।

 

 

 

অভিভাবক।

 

কেন বলো দেখি।

 

 

 

মধুসূদন।

 

তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

(সরোষে) তোমার মাথা!

 

 

 

পৃষ্ঠে বেত্র

 

 

 

মধুসূদন।

 

(চমকিয়া) আজ্ঞে, মাথা নয়, ওটা পিঠ।

 

 

 

অভিভাবক।

 

ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে?

 

 

 

মধুসুদন।

 

জানি নে।

 

 

 

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

 

 

 

মধুসদন।

 

ওটা বিলক্ষণ জানি– ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ।

 

 

 

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

 

 

 

অভিভাবক।

 

অঙ্কশিক্ষা হয়েছে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

হয়েছে।

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, তোমাকে সাড়ে ছ’টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে,পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে। একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে, কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

একটাও নয়।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

কেমন করে।

 

 

 

মধুসূদন।

 

সবগুলো খেয়ে ফেলব। দিতে পারব না।

 

 

 

অভিভাবক।

 

আচ্ছা, একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে?

 

 

 

মধুসূদন।

 

যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে, যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া, মেরে তোমার পিঠ লাল করব, তবে তুমি সিধে হবে!

 

 

 

মধুসূদন।

 

আজ্ঞে, মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায়।

 

 

 

অভিভাবক।

 

কালাচাঁদবাবু, ওটা আপনার ভ্রম। মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয়। কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না, কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায়। অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না। কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই। আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন, দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক, তার পরে আমিই ওকে পড়াব।

 

 

 

মধুসূদন।

 

( স্বগত) আঃ, বাঁচা গেল।

 

 

 

কালাচাঁদ।

 

বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম, কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার। ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই, সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয়।

 

 

 

শ্রাবণ ১২৯২

***

The Student’s Test

 

 

Student: Master Madhusudan
Tutor: Kalachand Master.
Madhu’s guardian’s enters.

 

Guardian: How is Madhusudan doing, Kalachand babu?

Kalachand: Even though he is extremely naughty, he is very strong academically. I never have to repeat things. Once I have gone over a topic with him he never forgets it.

Guardian: Really? Well. I will test him with some questions today.

Kalachand: Yes, please go ahead by all means.

Madhusudan (to himself): You gave me such a thrashing yesterday that my back is still aching. I will take revenge today. I will get rid of you!

Guardian: So, Modho, do you remember all your old lessons?

Madhusudan: I remember everything that the teacher said.

Guardian: So, tell me what a plant is.

Madhusudan: Things that appear out of the ground.

Guardian: And an example of that would be…

Madhusudan: An earthworm.

Kalachand (fiercely): What did you say?

Guardian: Wait now, do not say anything.

To Madhu: You have studied the poetry primer: tell me please, what draws our attention in the garden?

Madhusudan: Thorns

(The cane in Kalachand’s grasp comes down angrily)

Madhusudan: Why are you hitting me? Am I lying?

Guardian: What destroyed Sirajuddaulah? What does history tell us?

Madhusudan: Termites

(The cane swishes again)

Pardon me, but I am getting beaten for no reason – why just Sirajuddaulah, the whole history book has been ruined by termites. Here, have a look.

(The book is brought out, Kalachand scratches his head)

Guardian: Do you remember your grammar lessons?

Madhusudan: Yes

Guardian: Explain what first person means with an example.

Madhusudan: That would be Joy Munshi from down the street.

Guardian: Why is that?

Madhusudan: Because he is always talking about himself.

Kalachand (angrily): Your foot!

(Hitting Madhu on the back with his cane)

Madhusudan (startled): That is not my foot, that is my back.

Guardian: What is a portmanteau word?

Madhusudan: I do not know.

Kalachand shakes the cane at him.

Madhusudan: I know that! It is a dangling participle.

 

His guardian smiles while Kalachand frowns.

Guardian: Have you had lessons in mathematics?
Madhusudan: Yes.

Guardian: You are given six and half sweets and told that you can eat as many as you can in five minutes and give the rest to your younger brother. You take two minutes to eat one sweet, how many then will you give him?

Madhusudan: None!

Kalachand: How did you arrive at that answer?

Madhusudan: I would eat them all. I would not be giving any away.

Guardian: Now, if a tree grows a quarter of an inch every day then how tall will a tree be in a year if it was ten inches tall on the first day of that year?

Madhusudan: I could not tell you what the final height would be if the tree was bent. But if it grew straight then one needs to measure its height to find out the answer: and if it dried up in that time, then the question does not arise at all.

Kalachand: The only way you will apply yourself is with a beating! Scoundrel, you will learn once I have beaten you black and blue!

Madhusudan: Even upright things can become bent through punishment.

Guardian: That is where you have made a mistake. Little can be achieved through corporal punishment. As the saying goes, a donkey cannot be beaten into becoming a horse but a horse may be broken down and made to follow orders. Most boys have the ability to learn, but most teachers cannot teach. The student gets beaten into submission. You may take your cane and go, let his body recover a bit. After that I will tutor him.

Madhusudan to himself: Freedom at last.

Kalachand: Thank God for that! Teaching this boy is hard work, pure manual labour. I get so little from teaching a boy for thirty days, I could make double that in a day if I dug earth for a living.

 

Shravan 1292/ AD 1885

Advertisements

প্রভু, বলো বলো কবে/ Prabhu, bawlo bawlo kawbe/ Lord, I beseech you, tell me when

প্রভু,   বলো বলো কবে

তোমার    পথের ধুলার রঙে রঙে আঁচল রঙিন হবে।

              তোমার বনের রাঙা ধূলি  ফুটায় পূজার কুসুমগুলি,

    সেই ধূলি হায় কখন আমায় আপন করি’ লবে?

    প্রণাম দিতে চরণতলে  ধুলার কাঙাল যাত্রীদলে

    চলে যারা, আপন ব’লে চিনবে আমায় সবে॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1342
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1936
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

Lord, I beseech you, tell me when

My robes will turn red in the dust that rises from the path that leads to you

              The red dust in your forests takes the form of the blooms that I offer at your feet

    When will that dust alas accept me as one of its own?

    Those who journey to your feet, craving the dust as a blessing

    They too will then know me on sight.

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written: 1936
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link, to hear Suchitra Mitra:

This entry was posted on September 4, 2014, in Prayer/Puja.

তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

ময়ূরের দৃষ্টি/ Mayurer Drishti/ Through the Eyes of a Peacock

ময়ূরের দৃষ্টি     

 

দক্ষিণায়নের সূর্যোদয় আড়াল ক’রে

সকালে বসি চাতালে।

অনুকূল অবকাশ;

তখনো নিরেট হয়ে ওঠে নি কাজের দাবি,

ঝুঁকে পড়ে নি লোকের ভিড়

পায়ে পায়ে সময় দলিত করে দিয়ে।

লিখতে বসি,

কাটা খেজুরের গুঁড়ির মতো

ছুটির সকাল কলমের ডগায় চুঁইয়ে দেয় কিছু রস।

 

আমাদের ময়ূর এসে পুচ্ছ নামিয়ে বসে

পাশের রেলিংটির উপর।

আমার এই আশ্রয় তার কাছে নিরাপদ,

এখানে আসে না তার বেদরদী শাসনকর্তা বাঁধন হাতে।

বাইরে ডালে ডালে কাঁচা আম পড়েছে ঝুলে,

নেবু ধরেছে নেবুর গাছে,

একটা একলা কুড়চিগাছ

আপনি আশ্চর্য আপন ফুলের বাড়াবাড়িতে।

প্রাণের নিরর্থক চাঞ্চল্যে

ময়ূরটি ঘাড় বাঁকায় এদিকে ওদিকে।

তার উদাসীন দৃষ্টি

কিছুমাত্র খেয়াল করে না আমার খাতা-লেখায়;

করত, যদি অক্ষরগুলো হত পোকা;

তা হলে নগণ্য মনে করত না কবিকে।

হাসি পেল ওর ওই গম্ভীর উপেক্ষায়,

ওরই দৃষ্টি দিয়ে দেখলুম আমার এই রচনা।

দেখলুম, ময়ূরের চোখের ঔদাসীন্য

সমস্ত নীল আকাশে,

কাঁচা-আম-ঝোলা গাছের পাতায় পাতায়,

তেঁতুলগাছের গুঞ্জনমুখর মৌচাকে।

ভাবলুম, মাহেন্দজারোতে

এইরকম চৈত্রশেষের অকেজো সকালে

কবি লিখেছিল কবিতা,

বিশ্বপ্রকৃতি তার কোনোই হিসাব রাখে নি।

কিন্তু, ময়ূর আজও আছে প্রাণের দেনাপাওনায়,

কাঁচা আম ঝুলে পড়েছে ডালে।

নীল আকাশ থেকে শুরু করে সবুজ পৃথিবী পর্যন্ত

কোথাও ওদের দাম যাবে না কমে।

আর, মাহেন্দজারোর কবিকে গ্রাহ্যই করলে না।

পথের ধারের তৃণ, আঁধার রাত্রের জোনাকি।

 

নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথিবীতে

মেলে দিলাম চেতনাকে,

টেনে নিলেম প্রকৃতির ধ্যান থেকে বৃহৎ বৈরাগ্য

আপন মনে;

খাতার অক্ষরগুলোকে দেখলুম

মহাকালের দেয়ালিতে

পোকার ঝাঁকের মতো।

ভাবলুম, আজ যদি ছিঁড়ে ফেলি পাতাগুলো

তা হলে পর্শুদিনের অস্ত্যসৎকার এগিয়ে রাখব মাত্র।

 

এমন সময় আওয়াজ এল কানে,

“দাদামশায়, কিছু লিখেছ না কি।”

ওই এসেছে–ময়ূর না,

ঘরে যার নাম সুনয়নী,

আমি যাকে ডাকি শুনায়নী ব’লে।

ওকে আমার কবিতা শোনাবার দাবি সকলের আগে।

আমি বললেম, “সুরসিকে, খুশি হবে না,

এ গদ্যকাব্য।”

কপালে ভ্রূকুঞ্চনের ঢেউ খেলিয়ে

বললে, “আচ্ছা, তাই সই।”

সঙ্গে একটু স্তুতিবাক্য দিলে মিলিয়ে;

বললে, “তোমার কণ্ঠস্বরে,

গদ্যে রঙ ধরে পদ্যের।”

ব’লে গলা ধরলে জড়িয়ে।

আমি বললেম, “কবিত্বের রঙ লাগিয়ে নিচ্ছ

কবিকণ্ঠ থেকে তোমার বাহুতে?”

সে বললে, “অকবির মতো হল তোমার কথাটা;

কবিত্বের স্পর্শ লাগিয়ে দিলেম তোমারই কণ্ঠে,

হয়তো জাগিয়ে দিলেম গান।”

 

শুনলুম নীরবে, খুশি হলুম নিরুত্তরে।

মনে-মনে বললুম, প্রকৃতির ঔদাসীন্য অচল রয়েছে

অসংখ্য বর্ষকালের চূড়ায়,

তারই উপরে একবারমাত্র পা ফেলে চলে যাবে

আমার শুনায়নী,

ভোরবেলার শুকতারা।

সেই ক্ষণিকের কাছে হার মানবে বিরাটকালের বৈরাগ্য।

 

মাহেন্দজারোর কবি, তোমার সন্ধ্যাতারা

অস্তাচল পেরিয়ে

আজ উঠেছে আমার জীবনের

উদয়াচলশিখরে।

 

 

? শান্তিনিকেতন, এপ্রিল ১৯৩৯

***

THROUGH THE EYES OF A PEACOCK

 

I hide from the sunrise in summer

 

And sit on the terrace each morning.

 

A convenient leisure;

 

The demands of the day are not quite insistent yet,

 

People do not come crowding close

 

Crushing the hours underfoot.

 

I sit down to write,

 

Like the cut trunk of a date palm

 

A little sweetness from the restful morning drips from my pen.

 

 

 

Our peacock comes to rest its plumage

 

Upon the railing beside me.

 

This proximity of ours makes it feel safe,

 

Its humourless minder will not venture here, cage in hand.

 

Outside the branches drip with green mangoes,

 

Lemons hang upon the lemon tree’s boughs,

 

And a solitary ervatamia

 

Astonishes itself in an exuberance of flowering.

 

Alerted by nothing more than life itself

 

The peacock looks, first this way then that.

 

Its idle wandering eye

 

Does not take note of my scribbling;

 

It would, had the letters been insects crawling across the page;

 

Then it would not have spurned the poet so.

 

A smile rises at such studied neglect,

 

And I begin to see my work through its eyes.

 

And I see, the same ambivalence

 

Across the blue skies,

 

In each leaf of the fruit festooned mango tree,

 

In the humming hive nestled in the tamarind tree.

 

And I find myself thinking, in Mohenjodaro too

 

On just such a slow morning at the close of a year

 

Poets wrote odes,

 

None of which remain today.

 

But the peacock still lives on in the ebb and flow of life,

 

Green mangoes hang from every branch.

 

From the blue skies to the verdant earth

 

There will be no lessening of their value to us.

 

Yet the poet of Mohenjodaro was unheeded

 

Merely a blade of grass by the path, a firefly on a dark nights.

 

 

 

I open my eyes to the endless march of time and the vast world

 

Allowing my consciousness to absorb,

 

A great ambivalence from nature’s meditative silence

 

Into myself;

 

And the words on my pages appear

 

Like so many insects drawn

 

To the festival of lights in time

 

And I think to myself, if I should tear these pages up today

 

I am merely doing what will need to be done in the near future.

 

 

 

When I suddenly hear the words,

 

“Grandfather, have you written anything?”

 

There she is, no – not the peacock

 

The one who is called Sunayani at home,

 

The one I call Shunayoni, the one who must be heeded.

 

She demands each poem of mine before all the others.

 

I said, “Appreciative though you are, this will not please you,

 

This play of words.”

 

A frown plays across her brow

 

As she says, “So be it.”

 

Adding a few words aimed to appease;

 

She says, “ In your voice,

 

Even mere words take on a poetic hue.”

 

And she wrapped her arms about my neck.

 

I ask, “Are you drawing those colours

 

From my throat to your arm?”

 

She says, “That is what a non poet would say;

 

I merely touch your throat with beauty,

 

Hoping to awaken a song.”

 

 

 

I listen in silence, I am wordless with joy.

 

I tell myself, the ambivalence of nature sits

 

Across the peaks of countless years,

 

She merely has to step across them once

 

My Shunayoni,

 

My star of dawn.

 

That will be enough to defeat the austere meditation of time.

 

 

 

Ancient poet of Mohenjodaro, your evening star

 

Has travelled across setting suns

 

To rise once again in my life

 

Upon the peaks of the waking sun.

 

 

 

SANTINIKETAN, April 1939

Khanika: Poem 63 Shawmapti/The Ending

সমাপ্তি

 

পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।

 

সব শেষ হল যেখানে সেথায় তুমি আর আমি একা।

 

নানা বসন্তে নানা বরষায়

 

অনেক দিবসে অনেক নিশায়

 

দেখেছি অনেক, সহেছি অনেক, লিখেছি অনেক লেখা–

 

পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।

 

 

 

কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!

 

পিছনে চাহিয়া দেখিনু কখন চলিয়া গিয়াছে সবে।

 

তোমার নীরব নিভৃত ভবনে

 

জানি না কখন পশিনু কেমনে।

 

অবাক রহিনু আপন প্রাণের নূতন গানের রবে।

 

কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!

 

 

 

চিহ্ন কি আছে শ্রান্ত নয়নে অশ্রুজলের রেখা?

 

বিপুল পথের বিবিধ কাহিনী আছে কি ললাটে লেখা?

 

রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন,

 

বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন,

 

তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে তুমি আর আমি একা।

 

নয়নে আমার অশ্রুজলের চিহ্ন কি যায় দেখা!

 

 

***

 

 

 

 

The Ending

All the while I walked the road I came to know a crowd

But where it all draws to a close, there is but you and me alone

Over many a spring and inclement shower

Through many a day and dark night

I have seen much and borne a lot, I have written many a word –

All the while I walked the road I came to know a crowd.

 

 

When did the road draw to an end, when did evening fall!

I look back and see that the others have all gone.

In your great silent halls of your abode

I know not how I found the way in

But I listen with wonder as a new song rises from my lips

When did the road draw to an end, when did evening fall!

 

 

Can you see them traced upon my cheek, those tears that dried in these weary eyes?

Do the lines upon my brow speak of the journeys I have made?

You have drawn the shades,

And made a restful bower

By the light of your evening lamp we sit together

Can you see them traced upon my cheek, those tears that dried in these weary eyes?

 

 

 

শেষ সপ্তক: তেতাল্লিশ (পঁচিশে বৈশাখ চলেছে)/Shesh Shoptok: Poem Forty Three ( Ponchishey Baishakh Cholecche)/The twenty fifth day of Baisakh

 

শ্রীমান অমিয়চন্দ্র চক্রবতী কল্যাণীয়েষু

পঁচিশে বৈশাখ চলেছে

 

জন্মদিনের ধারাকে বহন করে

 

মৃত্যুদিনের দিকে।

 

সেই চলতি আসনের উপর বসে

 

কোন্‌ কারিগর গাঁথছে

 

ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়

 

নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা।

 

রথে চড়ে চলেছে কাল;

 

পদাতিক পথিক চলতে চলতে

 

পাত্র তুলে ধরে,

 

পায় কিছু পানীয়;–

 

পান সারা হলে

 

পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে;

 

চাকার তলায়

 

ভাঙা পাত্র ধুলায় যায় গুঁড়িয়ে।

 

তার পিছনে পিছনে

 

নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে,

 

পায় নতুন রস,

 

একই তার নাম,

 

কিন্তু সে বুঝি আর-একজন।

 

একদিন ছিলেম বালক।

 

কয়েকটি জন্মদিনের ছাঁদের মধ্যে

 

সেই যে-লোকটার মূর্তি হয়েছিল গড়া

 

তোমরা তাকে কেউ জান না।

 

সে সত্য ছিল যাদের জানার মধ্যে

 

কেউ নেই তারা।

 

সেই বালক না আছে আপন স্বরূপে

 

না আছে কারো স্মৃতিতে।

 

সে গেছে চলে তার ছোটো সংসারটাকে নিয়ে;

 

তার সেদিনকার কান্না-হাসির

 

প্রতিধ্বনি আসে না কোনো হাওয়ায়।

 

তার ভাঙা খেলনার টুকরোগুলোও

 

দেখিনে ধুলোর ‘পরে।

 

সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে

 

সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।

 

তার বিশ্ব ছিল

 

সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে।

 

তার অবোধ চোখ-মেলে চাওয়া

 

ঠেকে যেত বাগানের পাঁচিলটাতে

 

সারি সারি নারকেল গাছে।

 

সন্ধ্যেবেলাটা রূপকথার রসে নিবিড়;

 

বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝখানে

 

বেড়া ছিল না উঁচু,

 

মনটা এদিক থেকে ওদিকে

 

ডিঙিয়ে যেত অনায়াসেই।

 

প্রদোষের আলো-আঁধারে

 

বস্তুর সঙ্গে ছায়াগুলো ছিল জড়িয়ে,

 

দুইই ছিল একগোত্রের।

 

সে-কয়দিনের জন্মদিন

 

একটা দ্বীপ,

 

কিছুকাল ছিল আলোতে,

 

কাল-সমুদ্রের তলায় গেছে ডুবে।

 

ভাঁটার সময় কখনো কখনো

 

দেখা যায় তার পাহাড়ের চূড়া,

 

দেখা যায় প্রবালের রক্তিম তটরেখা।

 

পঁচিশে বৈশাখ তার পরে দেখা দিল

 

আর-এক কালান্তরে,

 

ফাল্গুনের প্রত্যুষে

 

রঙিন আভার অস্পষ্টতায়।

 

তরুণ যৌবনের বাউল

 

সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে,

 

ডেকে বেড়াল

 

নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে

 

অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে।

 

সেই শুনে কোনো-কোনোদিন বা

 

বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীর আসন টলেছিল,

 

তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন

 

তাঁর কোনো কোনো দূতীকে

 

পলাশবনের রঙমাতাল ছায়াপথে

 

কাজ-ভোলানো সকাল-বিকালে।

 

তখন কানে কানে মৃদু গলায় তাদের কথা শুনেছি,

 

কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝিনি।

 

দেখেছি কালো চোখের পক্ষ্ণরেখায়

 

জলের আভাস;

 

দেখেছি কম্পিত অধরে নিমীলিত বাণীর

 

বেদনা;

 

শুনেছি ক্বণিত কঙ্কণে

 

চঞ্চল আগ্রহের চকিত ঝংকার।

 

তারা রেখে গেছে আমার অজানিতে

 

পঁচিশে বৈশাখের

 

প্রথম ঘুমভাঙা প্রভাতে

 

নতুন ফোটা বেলফুলের মালা;

 

ভোরের স্বপ্ন

 

তারি গন্ধে ছিল বিহ্বল।

 

সেদিনকার জন্মদিনের কিশোর জগৎ

 

ছিল রূপকথার পাড়ার গায়ে-গায়েই,

 

জানা না-জানার সংশয়ে।

 

সেখানে রাজকন্যা আপন এলোচুলের আবরণে

 

কখনো বা ছিল ঘুমিয়ে,

 

কখনো বা জেগেছিল চমকে উঠে’

 

সোনার কাঠির পরশ লেগে।

 

দিন গেল।

 

সেই বসন্তীরঙের পঁচিশে বৈশাখের

 

রঙ-করা প্রাচীরগুলো

 

পড়ল ভেঙে।

 

যে পথে বকুলবনের পাতার দোলনে

 

ছায়ায় লাগত কাঁপন,

 

হাওয়ায় জাগত মর্মর,

 

বিরহী কোকিলের

 

কুহুরবের মিনতিতে

 

আতুর হত মধ্যাহ্ন,

 

মৌমাছির ডানায় লাগত গুঞ্জন

 

ফুলগন্ধের অদৃশ্য ইশারা বেয়ে,

 

সেই তৃণ-বিছানো বীথিকা

 

পৌঁছল এসে পাথরে-বাঁধানো রাজপথে।

 

সেদিনকার কিশোরক

 

সুর সেধেছিল যে-একতারায়

 

একে একে তাতে চড়িয়ে দিল

 

তারের পর নতুন তার।

 

সেদিন পঁচিশে বৈশাখ

 

আমাকে আনল ডেকে

 

বন্ধুর পথ দিয়ে

 

তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে।

 

বেলা-অবেলায়

 

ধ্বনিতে ধ্বনিতে গেঁথে

 

জাল ফেলেছি মাঝদরিয়ায়;

 

কোনো মন দিয়েছে ধরা,

 

ছিন্ন জালের ভিতর থেকে

 

কেউ বা গেছে পালিয়ে।

 

কখনো দিন এসেছে ম্লান হয়ে,

 

সাধনায় এসেছে নৈরাশ্য,

 

গ্লানিভারে নত হয়েছে মন।

 

এমন সময়ে অবসাদের অপরাহ্নে

 

অপ্রত্যাশিত পথে এসেছে

 

অমরাবতীর মর্ত্যপ্রতিমা;

 

সেবাকে তারা সুন্দর করে,

 

তপঃক্লান্তের জন্যে তারা

 

আনে সুধার পাত্র;

 

ভয়কে তারা অপমানিত করে

 

উল্লোল হাস্যের কলোচ্ছ্বাসে;

 

তারা জাগিয়ে তোলে দুঃসাহসের শিখা

 

ভস্মে-ঢাকা অঙ্গারের থেকে;

 

তারা আকাশবাণীকে ডেকে আনে

 

প্রকাশের তপস্যায়।

 

তারা আমার নিবে-আসা দীপে

 

জ্বালিয়ে গেছে শিখা,

 

শিথিল-হওয়া তারে

 

বেঁধে দিয়েছে সুর,

 

পঁচিশে বৈশাখকে

 

বরণমাল্য পরিয়েছে

 

আপন হাতে গেঁথে।

 

তাদের পরশমণির ছোঁওয়া

 

আজো আছে

 

আমার গানে আমার বাণীতে।

 

সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে

 

দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত

 

গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।

 

একতারা ফেলে দিয়ে

 

কখনো বা নিতে হল ভেরী।

 

খর মধ্যাহ্নের তাপে

 

ছুটতে হল

 

জয়পরাজয়ের আবর্তনের মধ্যে।

 

পায়ে বিঁধেছে কাঁটা,

 

ক্ষত বক্ষে পড়েছে রক্তধারা।

 

নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ

 

আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে,

 

জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে

 

নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে।

 

বিদ্বেষে অনুরাগে

 

ঈর্ষায় মৈত্রীতে,

 

সংগীতে পরুষ কোলাহলে

 

আলোড়িত তপ্ত বাষ্পনিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে

 

আমার জগৎ গিয়েছে তার কক্ষপথে।

 

এই দুর্গমে, এই বিরোধ-সংক্ষোভের মধ্যে

 

পঁচিশে বৈশাখের প্রৌঢ় প্রহরে

 

তোমরা এসেছ আমার কাছে।

 

জেনেছ কি,

 

আমার প্রকাশে

 

অনেক আছে অসমাপ্ত

 

অনেক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন

 

অনেক উপেক্ষিত?

 

অন্তরে বাহিরে

 

সেই ভালো মন্দ,

 

স্পষ্ট অস্পষ্ট,

 

খ্যাত অখ্যাত,

 

ব্যর্থ চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণের মধ্য থেকে

 

যে আমার মূর্তি

 

তোমাদের শ্রদ্ধায়, তোমাদের ভালোবাসায়,

 

তোমাদের ক্ষমায়

 

আজ প্রতিফলিত,

 

আজ যার সামনে এনেছ তোমাদের মালা,

 

তাকেই আমার পঁচিশে বৈশাখের

 

শেষবেলাকার পরিচয় বলে

 

নিলেম স্বীকার করে,

 

আর রেখে গেলেম তোমাদের জন্যে

 

আমার আশীর্বাদ।

 

যাবার সময় এই মানসী মূর্তি

 

রইল তোমাদের চিত্তে,

 

কালের হাতে রইল বলে

 

করব না অহংকার।

 

তার পরে দাও আমাকে ছুটি

 

জীবনের কালো-সাদা সূত্রে গাঁথা

 

সকল পরিচয়ের অন্তরালে;

 

নির্জন নামহীন নিভৃতে;

 

নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে

 

সুর মিলিয়ে নিতে দাও

এক চরম সংগীতের গভীরতায়।

****

To Sriman Amiya Chandra Chakravarty

 

The twenty fifth day of Baisakh

Carries with it a stream of birthdays

Towards the finality of death.

Seated on that moving throne

Who is the craftsman that strings

A hundred inconsequential lives and little deaths,

A strand of all the different expressions of me.

Time moves along like a chariot;

We are but travellers who walk along

Raising their bowl in supplication,

Receiving a little reward;

Once that is gone

We are slowly lost in the darkness;

While the wheels crush underfoot

The broken bowl to dust.

The one who follows

Raising arms in hope,

The one who receives new reward,

They carry the same name,

But verily they are not the same.

Once I was a boy.

A few birthdays together helped to form

A certain me.

But not one of you know that boy.

Those whose consciousness made his life a reality

None of them live to speak.

That boy lives neither in physical form

Nor in anyone’s memory.

He has gone taking all trace of his existence

The tears he shed and his laughter both

Invite no echoes on the wind

I do not even see his broken toys

Upon the dust today.

And yet once he too sat at life’s window

Looking outward

At the world that was his

Held within that little encompass

His innocent wide eyed gaze

Would find itself bound by the garden’s boundary walls

Trapped by row upon row of coconut palms

His evenings were rich with the mystery of fables

Suspended between trust and disbelief

In his eyes both very nearly the same,

His mind would journey from one to the other

With supple ease.

Like evenings touched by darkness and light

Shadows clung to reality,

There was little to separate the two.

Those birthdays

Together an island,

Once lit by beams,

Now lost beneath an ocean of time.

Sometimes when the waves pull back

Its peaks yield themselves to view,

Encircled by blushing coral shores.

Then the twenty fifth of Baishakh appears

Another turn of the wheels of time,

At the dawn of Phalgun

Through a shimmering haze.

The minstrel of youth

Tuned his strings to his own song

And called out

To the wanderer’s heart

His voice plaintive with the maddening lilt of unspoken sorrow

Some days it must even have reached

The gods sitting high above and shook their seats,

And they sent

One of their maidens

To walk the hidden paths under the intoxicating shade of Palas boughs

Setting aside all thought of work for those hours

It was then that I used to hear them softly whisper in my ear,

I understood some of what they said, some of the words were beyond my ken.

I have seen dark luminous eyes glisten

With the threat of held back tears

I have seen the pain of unsaid words pause on trembling lips;

I have heard the tinkling of anklets

Raised suddenly in eager response.

They have left without my knowledge

On the first hour of dawn

On the twenty fifth of Baishakh

A garland of freshly opened jasmine buds;

My dreams at that hour

Were stirred by that perfume.

The youthful realization of that birthday

Was neighbour to the fantasy of fairy tales

United by uncertainty over truth and illusion.

There a princess lay clothed in open tresses

Now asleep;

Now suddenly awake

At the touch of a golden wand.

The day passed.

Its spring tinted hours fading,

Its colourful walls

Crashing down.

The paths where light and shadow had once danced

Shimmering under trembling mimosa leaves

Raising a murmur in the winds,

Where a lonely cuckoo

Called incessantly

Filling the midday with its yearning song,

Bee wings hummed

Heeding the unseen messages of floral perfume,

Then that grassy bower was no more

Became a thoroughfare of stone

The youth who

Had once tuned his strings

Now began to string them anew

Note upon note and wire upon wire.

The twenty fifth of Baishakh

Called to me

Along thoroughfares roughened with wear

To face the clamour of a great sea of people.

And I spent hour upon hour

Weaving sounds together

A web to cast over the waves;

Some minds yielded to me,

Some escaped through the rents

Returning to whence they had come from.

Sometimes as the day faded,

Despair grew entwined with my efforts,

And sadness burdened my heart.

When as evening drew down upon my weariness

Along unexpected avenues there arrived

Celestial beings drawn from this earth;

They bring beauty to their administrations

And for the belaboured they bring

Ambrosia;

They drive doubt away

With peals of joyous laughter;

They help stoke the flames of adventure anew

From hidden embers;

And coax speech from the heavens

As reward for untiring effort.

They have lit my dying lamp

And brought it to life

They have brought music afresh

To my slackened bow,

They have greeted the twenty fifth of Baishakh

Garlanding it

With their own hands

Their magical touch

Still lingers

In my song and in the midst of my words.

And some days on the battle field that is life

The sounds of conflict rose in every direction

Deep like thunder among the clouds.

Some days I had to cast the lute aside

To take up the trumpet call to arms.

In the midday heat

I had to enter headfirst

Into a maelstrom of victory and defeat.

Thorns pierced my feet,

And my heart bled with pain.

Cruel waves struck

My craft from all sides,

The very business of life threatening

To drag me below calumny and vicious filth.

In hatred and love

In jealousy and amity,

In song and wicked cacophony

When each breath came as a gasp

As my existence journeyed on its path.

In the midst of this strife

As the twenty fifth of Baishakh grows grey

You have come to me

But do you realise

That within what you see

Much is incomplete

And so much has been lost

And ever more ruined by neglect?

Within and without

Good and evil,

Clarity and shadows,

Fame and ignorance,

From the complex marriage of failure and achievement

The form that you see

Through your respect and affection,

Through your forgiving eyes

That is a reflection of me.

The one to whom you bring your gifts,

I will accept that

As who I am on this twenty fifth day

As the one I am today,

And I will leave for you all

My blessings.

As I leave, may this image of mine wrought from the mind

Live on in your hearts,

I will not suffer false pride

That time will take pains to preserve it.

After that, allow me to leave

To retreat where life comes to rest,

Away from all pretence of fame;

Where solitude takes the place of name;

And all the music from every throat and string

Must be allowed to add their tune

To the depth of one final song.

বিস্ময়/Bishmoy/Wonder

আবার জাগিনু আমি। রাত্রি হল ক্ষয়।
পাপড়ি মেলিল বিশ্ব। এই তো বিস্ময়
অন্তহীন।
ডুবে গেছে কত মহাদেশ,
নিবে গেছে কত তারা, হয়েছে নিঃশেষ
কত যুগ যুগান্তর। বিশ্বজয়ী বীর
নিজেরে বিলুপ্ত করি শুধু কাহিনীর
বাক্যপ্রান্তে আছে ছায়াপ্রায়। কত জাতি
কীর্তিস্তম্ভ রক্তপঙ্কে তুলেছিল গাঁথি
মিটাতে ধূলির মহাক্ষুধা। সে-বিরাট
ধ্বংসধারা-মাঝে আজি আমার ললাট
পেল অরুণের টিকা আরো একদিন
নিদ্রাশেষে, এই তো বিস্ময় অন্তহীন।
আজ আমি নিখিলের জ্যোতিষ্কসভাতে
রয়েছি দাঁড়ায়ে। আছি হিমাদ্রির সাথে
আছি সপ্তর্ষির সাথে, আছি যেথা সমুদ্রের
তরঙ্গে ভঙ্গিয়া উঠে উন্মত্ত রুদ্রের
অট্টহাস্যে নাট্যলীলা। এ বনস্পতির
বল্কলে স্বাক্ষর আছে বহু শতাব্দীর,
কত রাজমুকুটেরে দেখিল খসিতে।
তারি ছায়াতলে আমি পেয়েছি বসিতে
আরো একদিন —
জানি এ দিনের মাঝে
কালের অদৃশ্য চক্র শব্দহীন বাজে।
কোণার্ক , শান্তিনিকেতন, ১২ আষাঢ়, ১৩৩৯

I am awake once again. As night ends.
The world unfurls its petals. This is itself wonder infinite.
Continents have risen and sunk,
Stars have lost their fire,
Era after era into oblivion. All conquering champions
Diminish themselves and wait
As shadows marking a saga’s end. So many races
Raised victory columns upon bloodied mud
Hoping to satiate a great hunger lurking in the dust. In the midst of
That mighty current of destruction, today my forehead
Is anointed by the sun once more
As I wake from slumber, this is itself wonder infinite.
Today in the midst of a celestial array
I stand. As I stand with the tallest peaks
And with the seven sages in the sky, even where
The sea rises in roiling waves, laughter
Roaring forth from an angry god. In this
Tree bark centuries have signed their name,
So many crowns has it seen rise and fall.
And I, chosen to sit in its shade
Yet another day …..
I know through these hours
The unseen wheels of time do travel in silence.

Konark, Santiniketan, 12th of AshaD, 1339

নূতন ও পুরাতন/ Nuton O Puraton/ The Old and the New

 

আমরা পুরাতন ভারতবর্ষীয়; বড়ো প্রাচীন, বড়ো শ্রান্ত। আমি অনেক সময়ে নিজের মধ্যে আমাদের সেই জাতিগত প্রকাণ্ড প্রাচীনত্ব অনুভব করি। মনোযোগপূর্বক যখন অন্তরের মধ্যে নিরীক্ষণ করে দেখি তখন দেখতে পাই, সেখানে কেবল চিন্তা এবং বিশ্রাম এবং বৈরাগ্য। যেন অন্তরে বাহিরে একটা সুদীর্ঘ ছুটি। যেন জগতের প্রাতঃকালে আমরা কাছারির কাজ সেরে এসেছি, তাই এই উত্তপ্ত মধ্যাহ্নে যখন আর-সকলে কার্যে নিযুক্ত তখন আমরা দ্বার রুদ্ধ করে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করছি : আমরা আমাদের পুরা বেতন চুকিয়ে নিয়ে কর্মে ইস্তফা দিয়ে পেন্সনের উপর সংসার চালাচ্ছি। বেশ আছি।

এমন সময়ে হঠাৎ দেখা গেল, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বহুকালের যে ব্রহ্মত্রটুকু পাওয়া গিয়েছিল তার ভালো দলিল দেখাতে পারি নি বলে নূতন রাজার রাজত্বে বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। হঠাৎ আমরা গরিব। পৃথিবীর চাষারা যেরকম খেটে মরছে এবং খাজনা দিচ্ছে আমাদেরও তাই করতে হবে। পুরাতন জাতিকে হঠাৎ নূতন চেষ্টা আরম্ভ করতে হয়েছে।

অতএব চিন্তা রাখো, বিশ্রাম রাখো, গৃহকোণ ছাড়ো; ব্যাকরণ ন্যায়শাস্ত্র শ্রুতিস্মৃতি এবং নিত্যনৈমিত্তিক গার্হস্থ্য নিয়ে থাকলে চলবে না; কঠিন মাটির ঢেলা ভাঙো, পৃথিবীকে উর্বরা করো এবং নব-মানব রাজার রাজস্ব দাও; কালেজে পড়ো, হোটেলে খাও এবং আপিসে চাকরি করো।

হায়, ভারতবর্ষের পুরপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এই অনাবৃত বিশাল কর্মক্ষেত্রের মধ্যে আমাদের কে এনে দাঁড় করালে। আমরা চতুর্দিকে মানসিক বাঁধ নির্মাণ করে কালস্রোত বন্ধ করে দিয়ে সমস্ত নিজের মনের মতো গুছিয়ে নিয়ে বসেছিলুম। চঞ্চল পরিবর্তন ভারতবর্ষের বাহিরে সমুদ্রের মতো নিশিদিন গর্জন করত, আমরা অটল স্থিরত্বের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে গতিশীল নিখিল-সংসারের অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে বসেছিলুম। এমন সময় কোন্‌ ছিদ্রপথ দিয়ে চির-অশান্ত মানবস্রোত আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে সমস্ত ছারখার করে দিলে। পুরাতনের মধ্যে নূতন মিশিয়ে, বিশ্বাসের মধ্যে সংশয় এনে, সন্তোষের মধ্যে দুরাশার আক্ষেপ উৎক্ষিপ্ত করে দিয়ে সমস্ত বিপর্যস্ত করে দিলে।

মনে করো আমাদের চতুর্দিকে হিমাদ্রি এবং সমুদ্রের বাধা যদি আরো দুর্গম হত তা হলে এক-দল মানুষ একটি অজ্ঞাত নিভৃত বেষ্টনের মধ্যে স্থির-শান্ত-ভাবে এক-প্রকার সংকীর্ণ পরিপূর্ণতা লাভের অবসর পেত। পৃথিবীর সংবাদ তারা বড়ো একটা জানতে পেত না এবং ভূগোলবিবরণ সম্বন্ধে তাদের নিতান্ত অসম্পূর্ণ ধারণা থাকত; কেবল তাদের কাব্য, তাদের সমাজতন্ত্র, তাদের ধর্মশাস্ত্র, তাদের দর্শনতত্ত্ব অপূর্ব শোভা সুষমা এবং সম্পূর্ণতা লাভ করতে পেত; তারা যেন পৃথিবী-ছাড়া আর-একটি ছোটো গ্রহের মধ্যে বাস করত; তাদের ইতিহাস, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সুখ-সম্পদ তাদের মধ্যেই পর্যাপ্ত থাকত। সমুদ্রের এক অংশ কালক্রমে মৃত্তিকাস্তরে রুদ্ধ হয়ে যেমন একটি নিভৃত শান্তিময় সুন্দর হ্রদের সৃষ্টি হয়; সে কেবল নিস্তরঙ্গভাবে প্রভাতসন্ধ্যার বিচিত্র বর্ণচ্ছায়ায় প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে এবং অন্ধকার রাত্রে স্তিমিত নক্ষত্রালোকে স্তম্ভিতভাবে চিররহস্যের ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকে।

****
THE OLD AND THE NEW

We Indians are an ancient people; extremely old and weary. I often sense our race’s natural sense of a great burden of age within myself. When I examine myself with attention I see only doubts and lethargy and aloofness there. A sort of extended holiday within and without. As if we have finished all our official work at the dawn of creation and can engage in resting without a care in the world behind closed doors, when everyone else is working away in the midday heat; as if we have earned our salaries, resigned from our jobs and are now existing solely on our pensions. This is what satisfies us.

But suddenly we find that the times have changed. The safe haven that we had long believed to be ours is taken away by the leaders of the new order because we failed to prove our rights to it. Suddenly we are rendered poor. We must now work hard like the farmers of the world and pay our dues. An ancient race must suddenly learn to try anew.

Therefore I say to you, put aside your worries, your rest, your love for the corners of your homes; it will not do to occupy your time with grammar, logic and the scriptures and the routines of daily existence; forge this hard earth and make it yield its riches, pay your dues to the new order; go to college, eat out at hotels and take to working in offices.

Alas, who could have brought down the fortress like walls of India and brought us out into this vast open arena of activity! We had put up mental barriers and stemmed the flow of time in order to have things just the way we liked them to be. Restless change has surrounded India like a great roaring ocean since time immemorial but we took comfort from immovable stagnation and forgot all about the existence of the world outside. But everything was shattered when that ever volatile outer world entered ours. Everything was shaken by the mingling of old with new, the collision of question with steadfast belief, the addition of unattainable dreams to complacent satisfaction.

Imagine if the mountains and sea that surround us had been even more inhospitable; within that undiscovered remoteness our people would have attained a certain kind of insulated success. They would not know much of the world and have a very incomplete sense of geography. Only their poems, their social structures, their religion and philosophy would have a chance to flourish and flower; they would live as on a smaller planet separated from this earth; their own history and sciences, their own happiness and wealth would have sufficed for them. Much as silt isolates a part of the sea over time to create a lake of still water which reflects the myriad colours of the sky at dawn and dusk and meditates on the inscrutable by soft starlight in the darkness of night.

আকাশপ্রদীপ/Akash Prodeep/ Lights in the sky, from the collection known as Lights in the Sky

                               গোধূলিতে নামল আঁধার,

                                        ফুরিয়ে গেল বেলা,

                          ঘরের মাঝে সাঙ্গ হল

                                        চেনা মুখের মেলা।

                          দূরে তাকায় লক্ষ্যহারা

                                        নয়ন ছলোছলো,

                          এবার তবে ঘরের প্রদীপ

                                        বাইরে নিয়ে চলো।

                          মিলনরাতে সাক্ষী ছিল যারা

                   আজো জ্বলে আকাশে সেই তারা।

                          পাণ্ডু-আঁধার বিদায়রাতের শেষে

                   যে তাকাত শিশিরসজল শূন্যতা-উদ্দেশে

                          সেই তারকাই তেমনি চেয়েই আছে

                                অস্তলোকের প্রান্তদ্বারের কাছে।

                   অকারণে তাই এ প্রদীপ জ্বালাই আকাশ-পানে–

                          যেখান হতে স্বপ্ন নামে প্রাণে।

 

শান্তিনিকেতন, ২৪। ৯। ৩৮

 

                                                       Lights in the sky

                         Darkness descends at the twilit hour,

                                        This day is nearly done,

                          Within my heart draws to a close

                                        The gathering of familiar faces.

                          The eye traces without purpose

                                       The distance through unshed tears,

                           Let us then carry the lamp 

                                        And take ourselves without.

                          Those stars that once watched over our nights of love

                  Still burn bright in the sky above.

                          In the fading night when the hour was right for me to leave,

                   That star which once wept tears of dew

                          Still watches over me as always,

                                At that junction where life must pause.

                  That is why I lift this lamp to that very sky….

                          From whence dreams will descend upon my soul.

 

Santiniketan, 24.09.38