প্রভু, বলো বলো কবে/ Prabhu, bawlo bawlo kawbe/ Lord, I beseech you, tell me when

প্রভু,   বলো বলো কবে

তোমার    পথের ধুলার রঙে রঙে আঁচল রঙিন হবে।

              তোমার বনের রাঙা ধূলি  ফুটায় পূজার কুসুমগুলি,

    সেই ধূলি হায় কখন আমায় আপন করি’ লবে?

    প্রণাম দিতে চরণতলে  ধুলার কাঙাল যাত্রীদলে

    চলে যারা, আপন ব’লে চিনবে আমায় সবে॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1342
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1936
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

Lord, I beseech you, tell me when

My robes will turn red in the dust that rises from the path that leads to you

              The red dust in your forests takes the form of the blooms that I offer at your feet

    When will that dust alas accept me as one of its own?

    Those who journey to your feet, craving the dust as a blessing

    They too will then know me on sight.

Raga: Bhairavi
Beat: Dadra
Written: 1936
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link, to hear Suchitra Mitra:

https://www.youtube.com/watch?v=fwqJqoFcUSs

This entry was posted on September 4, 2014, in Prayer/Puja.

তোতাকাহিনী/Totakahinee/The bird’s tale

তোতাকাহিনী

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।

পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।

সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।

রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’

স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।

পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’

ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’

লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।

অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’

লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।

তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’

কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’

জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।

দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’

মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’

ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’

রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’

রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’

ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’

দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।

এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।

কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’

তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।

রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’

তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।

কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

cage

Totakahinee or The Bird’s Tale

1
Once there was a bird. It was uneducated. It used to sing, but it had never read the scriptures. It hopped about and it flew but it did not know what good manners were.
The king said, ‘This kind of bird is of no use, for it eats the fruits of the forest and this is leading to losses in the markets.’
He ordered the minister, ‘Teach the bird a lesson.’

2
The duty of training the bird fell upon the shoulders of the king’s nephews.
The learned men sat and discussed at length why the accused creature was versed in the wrong kind of knowledge.
They concluded that the nest the bird built out of ordinary straw was not enough to hold a great deal of knowledge. Thus the first thing needed was the construction of a good cage.
The pundits went home happily with their grants from the king.

3
The goldsmith set about making a golden cage. This was so amazing that people from near and far came to look at it. Some said, ‘This is the ultimate in education!’ Others said, ‘Even if it is not educated, it got a cage out of all this! What luck!’
The fellow got a sack filled with money as payment. He set off for home in high spirits immediately.
The wise man sat down with the bird to teach it. He took a pinch of snuff and said, ‘This will never do with a few books.’
The nephew then sent for the writers. They made copies of books and then copies of the copies till there was a mountain of paper. Whoever saw this said, ‘Bravo! This is education if nothing else.’
The scribes had to carry their rewards home by bullock cart. They went back quickly too. From that day onwards there was no more need in their homes.
There was no end to the attention the nephews gave the costly golden cage. There were ongoing maintenance costs. It also needed regular dusting and polishing which made everyone agree, ‘This is improvement.’
Many people had to be employed and many other people were engaged to keep an eye on the first lot of employees. This army filled their coffers with fistfuls of cash each month.
They and all the cousins they had of every hue were now able to behave like men of means and leisure.

4
There is need of every kind in life, but never a shortage of critics. They now said, ‘The cage is an improvement, but what news of the bird?’
This remark made its way to the king’s ears. He called for his nephews and said, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Oh Great King, if you wish to hear the truth, send for the goldsmith, the learned men and the scribes, call those who repair the cage and summon those who keep an eye on those that repair the cage. The naysayers are the ones who have not made any profit out of this.’
The king understood exactly what was going on and gifted a golden chain to his nephew immediately.

5
The king expressed a wish to see for himself how the great education of the bird was going. One day he arrived at the classroom with all his courtiers.
At that very moment the gates rang out with conch shells, bells, drums of every kind, cymbals, flutes and gongs, The learned men were loudly reciting the lessons , their sacred tufts of hair shaking with the effort. There was a welcoming roar from the masons, the goldsmith, the scribes, the overseers and their supervisors as well the various cousins.
The nephew said, ‘King, you see what a great affair this is!’
The king said, ‘Astounding! And so noisy too!’
The nephew answered, ‘Not just noise, there is much meaning to all of this.’
The king happily crossed the gate and was just about to mount his elephant when a critic hiding in the bushes said to him, ‘Great king, but did you see the bird?’
The king, startled though he was, had to admit, ‘Alas! That completely slipped my mind. I did not get to see the bird.’
He came back and said to the pundit, ‘I should like to see how you teach the bird.’
He went and saw. It pleased him greatly. The pomp surrounding the bird was so great that it was hardly to be seen. And to tell the truth, it did not seem that important that one saw the creature. The king understood that there was no lapse in the arrangements. There was no food in the cage, nor any water; but the pages of a hundred wise tomes were being stuffed into the bird’s mouth. It was unable to open its beak even to shriek, let along sing. It was truly thrilling.
This time while mounting the elephant, the king told his principal ear-boxer to box the ears of the critic very soundly indeed.

6
The bird grew more and more civilized each day as its life drained away. Its guardians understood that the situation was very encouraging. And yet the bird still fluttered its wings most annoyingly each morning as it gazed upon the morning light, thanks to its intemperate nature. It was even observed that on some days it tried to gnaw through the bars of its cage with its puny beak.
The jailer said, ‘What insolence!’
The blacksmith was brought to the schoolhouse, complete with his bellows, hammers and furnace. With a tremendous clanging an iron chain was fashioned and the bird’s wings were also clipped.
The king’s sycophants made glum faces and shook their heads saying, ‘In this kingdom the birds are not just ignorant, they have no sense of gratitude either.’
Then the wise men picked up pens in one hand and spears in another and gave a demonstration of real teaching.
The blacksmith made so much money that his wife was able to buy herself gold jewellery and the king rewarded the jailer’s vigilance with a title.

7
The bird died. No one had even noticed when this had happened. The good for nothing critic went about saying, ‘The bird is dead.’
The king called for his nephew and asked, ‘Royal nephew, what is this I hear?’
The nephew said, ‘Great king, it has been educated.’
The king asked, ‘Does it flap around anymore?’
The nephew answered, ‘Dear God, No!’
‘Does it fly anymore?’
‘No.’
‘Does it burst into song anymore?’
‘No.’
‘Does it shriek when not fed?’
‘No.’
The king commanded, ‘Bring the bird to me once, I so wish to see it.’
The bird came. The jailer came with it, as did the guards and the mounted policemen. The king poked the bird; it did not utter a single sound in agreement or in protest. There was just a rustling from the dry paper that filled its body.

Outside the palace, the southerly winds of spring sighed among the new buds and drove the skies above the flowering forests quite mad.

Image: http://antiquesimagearchive.com/items

কর্ণ কুন্তি সংবাদ/Karna Kunti Sambad/Karna and Kunti Speak

 

কর্ণ।

মাতঃ, করিয়ো না ভয়।

কহিলাম, পাণ্ডবের হইবে বিজয়।

আজি এই রজনীর তিমিরফলকে

প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র-আলোকে

ঘোর যুদ্ধ-ফল। এই শান্ত স্তব্ধ ক্ষণে

অনন্ত আকাশ হতে পশিতেছে মনে

জয়হীন চেষ্টার সংগীত, আশাহীন

কর্মের উদ্যম– হেরিতেছি শান্তিময়

শূন্য পরিণাম। যে পক্ষের পরাজয়

সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান।

জয়ী হোক, রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান–

আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে।

জন্মরাত্রে ফেলে গেছ মোরে ধরাতলে

নামহীন, গৃহহীন– আজিও তেমনি

আমারে নির্মমচিত্তে তেয়াগো জননী

দীপ্তিহীন কীর্তিহীন পরাভব-‘পরে।

শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে

জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,

বীরের সদ্‌গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।

 

১৫ ফাল্গুন, ১৩০৬

***

Karna:

Mother, do not fear.

I say, victory will be the Pandavas’.

Upon the dark backdrop of this night

I can see clearly lit by star light

The fate of the great battle to come. At this serene silent moment

Descends upon my mind from the endless skies

A song that speaks of fruitless effort, of hopeless

Striving – I see the peace that will come at

The empty end. The side that will certainly lose

Do not beseech me to abandon them.

Let them be victorious, let them be kings – your Pandava sons

Let me remain, as ever with those who yield no fruit, nor know success.

You left me to the embrace of the earth on the night of my birth

Without a name or a home to call my own – today as well

Forsake me with a cruel heart, give me up Mother

To the darkness and ignominy of defeat

Simply leave for me this blessing if you may

That lust for victory, for fame and wealth does not sway

This son of yours from the path of the brave, from Truth’s way .

 

15th Phalgun, 1306

দুর্বোধ /Duurbodh/Beyond Understanding

দুর্বোধ

 

অধ্যাপকমশায় বোঝাতে গেলেন নাটকটার অর্থ,

সেটা হয়ে উঠল বোধের অতীত।

আমার সেই নাটকের কথা বলি।–

বইটার নাম “পত্রলেখা’,

নায়ক তার কুশলসেন।

নবনীর কাছে বিদায় নিয়ে সে গেল বিলেতে।

চার বছর পরে ফিরে এসে হবে বিয়ে।

নবনী কাঁদল উপুড় হয়ে বিছানায়,

তার মনে হল, এ যেন চার বছরের মৃতুদণ্ড।

নবনীকে কুশলের প্রয়োজন ছিল না ভালোবাসার পথে,

প্রয়োজন ছিল সুগম করতে বিলাত-যাত্রার পথ।

সে কথা জানত নবনী,

সে পণ করেছিল হৃদয় জয় করবে প্রাণপণ সাধনায়।

কুশল মাঝে মাঝে

রুচিতে বুদ্ধিতে উঁচট খেয়ে ওকে হঠাৎ বলেছে রূঢ় কথা,

ও সয়েছে চুপ করে;

মেনে নিয়েছে নিজেকে অযোগ্য বলে,

ওর নালিশ নিজেরই উপরে।

ভেবেছিল দীনা বলেই একদিন হবে ওর জয়,

ঘাস যেমন দিনে দিনে নেয় ঘিরে কঠোর পাহাড়কে।

এ যেন ছিল ওর ভালোবাসার শিল্পরচনা,

নির্দয় পাথরটাকে ভেঙে ভেঙে রূপ আবাহন করা

ব্যথিত বক্ষের নিরন্তর আঘাতে।

আজ নবনীর সেই দিনরাতের আরাধনার ধন গেল দূরে।

ওর দুঃখের থালাটি ছিল অশ্রু-ভেজা অর্ঘ্যে ভরা,

আজ থেকে দুঃখ রইবে কিন্তু দুঃখের নৈবেদ্য রইবে না।

এখন ওদের সম্বন্ধের পথ রইল

শুধু এ পারে ও পারে চিঠি লেখার সাঁকো বেয়ে।

কিন্তু নবনী তো সাজিয়ে লিখতে জানে না মনের কথা,

ও কেবল যত্নের স্বাদ লাগাতে জানে সেবাতে,

অর্‌কিডের চমক দিয়ে যেতে ফুলদানির ‘পরে

কুশলের চোখের আড়ালে,

গোপনে বিছিয়ে আসতে

নিজের-হাতে-কাজ-করা আসন

যেখানে কুশল পা রাখে।

কুশল ফিরল দেশে,

বিয়ের দিন করল স্থির।

আঙটি এনেছে বিলেত থেকে,

গেল সেটা পরাতে;

গিয়ে দেখে ঠিকানা না রেখেই নবনী নিরুদ্দেশ।

তার ডায়ারিতে আছে লেখা,

“যাকে ভালোবেসেছি সে ছিল অন্য মানুষ,

চিঠিতে যার প্রকাশ, এ তো সে নয়।”

এ দিকে কুশলের বিশ্বাস

তার চিঠিগুলি গদ্যে মেঘদূত,

বিরহীদের চিরসম্পদ।

আজ সে হারিয়েছে প্রিয়াকে,

কিন্তু মন গেল না চিঠিগুলি হারাতে —

ওর মমতাজ পালালো, রইল তাজমহল।

নাম লুকিয়ে ছাপালো চিঠি “উদ্‌ভ্রান্তপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে

নবনীর চরিত্র নিয়ে

বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা হয়েছে বিস্তর।

কেউ বলেছে, বাঙালির মেয়েকে

লেখক এগিয়ে নিয়ে চলেছে

ইবসেনের মুক্তিবাণীর দিকে —

কেউ বলেছে রসাতলে।

অনেকে এসেছে আমার কাছে জিজ্ঞাসা নিয়ে;

আমি বলেছি, ” আমি কী জানি।”

বলেছি, ” শাস্ত্রে বলে, দেবা ন জানন্তি।”

পাঠকবন্ধু বলেছে,

“নারীর প্রসঙ্গে না হয় চুপ করলেম

হতবুদ্ধি দেবতারই মতো,

কিন্তু পুরুষ?

তারও কি অজ্ঞাতবাস চিররহস্যে।

ও মানুষটা হঠাৎ পোষ মানলে কোন্‌ মন্ত্রে।”

আমি বলেছি,

“মেয়েই হোক আর পুরুষই হোক; স্পষ্ট নয় কোনো পক্ষই;

যেটুকু সুখ দেয় বা দুঃখ দেয় স্পষ্ট কেবল সেইটুকুই।

প্রশ্ন কোরো না,

পড়ে দেখো কী বলছে কুশল।”

কুশল বলে, “নবনী চার বছর ছিল দৃষ্টির বাইরে,

যেন নেমে গেল সৃষ্টির বাইরেতেই;

ওর মাধুর্যটুকুই রইল মনে,

আর সব-কিছু হল গৌণ।

সহজ হয়েছে ওকে সুন্দর ছাঁদে চিঠি লিখতে।

অভাব হয়েছে, করেছি দাবি —

ওর ভালোবাসার উপর অবাধ ভরসা

মনকে করেছে রসসিক্ত, করেছে গর্বিত।

প্রত্যেক চিঠিতে আপন ভাষায় ভুলিয়েছি আপনারই মন।

লেখার উত্তাপে ঢালাই করা অলংকার

ওর স্মৃতির মূর্তিটিকে সাজিয়ে তুলেছে দেবীর মতো।

ও হয়েছে নূতন রচনা।

এই জন্যেই খ্রীষ্টান শাস্ত্রে বলে,

সৃষ্টির আদিতে ছিল বাণী।”

পাঠকবন্ধু আবার জিগেস করেছে,

“ও কি সত্যি বললে,

না, এটা নাটকের নায়কগিরি?”

আমি বলেছি, “আমি কী জানি।”

 

 

শান্তিনিকেতন, ৫ জুলাই, ১৯৩৬

***

BEYOND UNDERSTANDING

 

The professor tried to explain the meaning of the play,

And took it beyond the scope of comprehension.

Let me talk about that play of mine.

The story is called ‘Letters to a loved one’,

The main character is Kushal Sen.

He went abroad after bidding farewell to Noboni.

They are to marry once he returns in four years.

Noboni prostrated herself upon her bed and wept,

She felt it was a death sentence prolonged over four years.

Kushal had no need for her love on his journey,

But she had smoothed his path to foreign climes.

She knew it too,

And had pledged to make her place in his heart.

Some times when Kushal

Forgot over both manners and wisdom and uttered a rude word,

She bore it in stoic silence;

Accepting herself to be the lesser,

Blaming herself every time.

She had hoped that she would triumph at the end just as the meek are said to do,

Just as grass takes over the tallest mountain day by day.

This was to be the crowning glory of her love,

To breathe life into heartless stone by chipping away

Endlessly beating her pain against it.

Today the object of her adoration goes far away.

Her offerings were soaked in tears,

From today there will remain pain but no one to see it.

Now their relationship exists

Along a bridge spanned by letters to each other.

But Noboni does not know how to put her words down on paper well,

She only knows how to express herself through solicitous care,

Through the placing of an orchid stem in a vase

While Kushal is unaware,

Or by spreading out on the floor

A mat she has embroidered with her own hands

So that Kushal may walk upon it.

Kushal has returned,

The day is fixed for their marriage to take place.

He has brought the ring from abroad,

He went to place it upon her finger;

but Noboni had left without leaving a forwarding address.

In her diary she had written,

“The one I had loved was someone else,

The one who wrote to me is not the same.”

And yet Kushal had imagined

His letters to be romantic odes in prose,

Eternal favours to the one separated.

Today he has lost his beloved,

But he could not fault his letters for that –

Mumtaz had escaped but he still had the edifice he had painstakingly created.

He published them under an alias as ‘Lost in love’

There has been much discussion

About the character of Noboni.

Some have said, Bengali women

Are being taken by the writer

Towards the creed of independence preached by Ibsen

Some have said they are going to hell.

Many have come to me with questions;

I have said, “What do I know!”

I have said, “The Scriptures say even the gods do not know the ways of women, etcetera.”

The readers have said,

“Let us put the woman aside then

Like a dumbfounded god,

But the man?

Will he be exiled in everlasting mystery as well?

What spells had tamed him in the first place!”

I have said,

“Whether woman or man; it is never very clear;

The only thing apparent is the happiness or sorrow they cause.

Do not ask questions,

Just read what Kushal says.”

Kushal says, “Noboni was out of sight for four years,

She seemed to leave completely;

Simply leaving the sweetness that was hers,

Making everything else secondary.

It has been easy writing beautiful letters to her.

When there was need, I made demands –

My great confidence in her affections

Kept my mind happy, proud in its existence.

With each letter I fooled myself alone with more words.

The warmth of those words shaped themselves

Into gifts that I adorned my memories of her.

She was made anew.

This is why the Christians say,

“At the start of Creation there were words.”

The readers asked again,

“Was that true,

Or is this just the play taking over?”

I said, “What do I know!”

 

 

Santiniketan, 5th July 1936

 

শেষ সপ্তক, এক / Shesh Shawptok, Ek/ The final Collection, One

এক

 

স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে,

মনেও হয়নি

তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা।

তুমিও মূল্য করনি দাবি।

দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত,

দিলে ডালি উজাড় ক’রে।

আড়চোখে চেয়ে

আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে;

পরদিনে মনে রইল না।

নববসন্তের মাধবী

যোগ দিয়েছিল তোমার দানের সঙ্গে,

শরতের পূর্ণিমা দিয়েছিল তারে স্পর্শ।

তোমার কালো চুলের বন্যায়

আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে

“তোমাকে যা দিই

তোমার রাজকর তার চেয়ে অনেক বেশি;

আরো দেওয়া হল না

আরো যে আমার নেই।”

বলতে বলতে তোমার চোখ এল ছলছলিয়ে।

আজ তুমি গেছ চলে,

দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত,

তুমি আস না।

এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে

দেখছি তোমার রত্নমালা,

নিয়েছি তুলে বুকে।

যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন

সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে

যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা।

তোমার প্রেমের দাম দেওয়া হল বেদনায়,

হারিয়ে তাই পেলেম তোমায় পূর্ণ ক’রে।

 

শান্তিনিকেতন, ১ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯

 

***

One

 I knew with certainty that you were mine,

 I never thought

Of measuring the worth of what you gave

You had never asked to be paid in kind.

Day after day passed and night followed night,

 You gave till you could give no more.

 I gave it but a glance

Taking even that for my hoard;

No memory remained the following day.

 The blossoms of spring

 Joined you in offering themselves,

 And the moonlight of autumn gilded it with its touch.

Your black hair cascading down

Over my feet you spread them and said

“What I give you

Your demands are far greater;

I could not give you more

For I have nothing left.”

As you spoke, your eyes filled with unspilled tears.

Today you are no more,

Day follows day and night follows night,

 But you return no more.

 After all this time I look to my stores

At your jewelled bonds

Raising them to my breast.

The neglectful pride that was once my bane

 Now bends to the very ground

Where your feet once stepped.

 I paid for your love with my pain,

 And so I finally find you, now that you are gone.

Santiniketan, 1st Agrahayan 1339

 

ধর্মবোধের দৃষ্টান্ত/ Dharma Bodher Drishtanto/Examples of Right Action

অন্যত্র বলিয়াছি কোনো ইংরেজ অধ্যাপক এ দেশে জুরির বিচার সম্বন্ধে আলোচনাকালে বলিয়াছিলেন যে, যে দেশের অর্ধসভ্য লোক প্রাণের মাহাত্ম্য (Sanctity of Life) বোঝে না, তাহাদের হাতে জুরি-বিচারের অধিকার দেওয়া অন্যায়।

প্রাণের মাহাত্ম্য ইংরেজ আমাদের চেয়ে বেশি বোঝে, সে কথা নাহয় স্বীকার করিয়াই লওয়া গেল। অতএব সেই ইংরেজ যখন প্রাণ হনন করে তখন তাহার অপরাধের গুরুত্ব আমাদের চেয়ে বেশি। অথচ দেখিতে পাই, দেশীয়কে হত্যা করিয়া কোনো ইংরেজ খুনি ইংরেজ জজ ও ইংরেজ জুরির বিচারে ফাঁসি যায় নাই। প্রাণের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে তাহাদের বোধশক্তি যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ইংরেজ অপরাধী হয়তো তাহার প্রমাণ পায়, কিন্তু সে প্রমাণ দেশীয় লোকদের কাছে কিছু অসম্পূর্ণ বলিয়াই ঠেকে।

এইরূপ বিচার আমাদিগকে দুই দিক হইতে আঘাত করে। প্রাণ যা যাবার সে তো যায়ই, ও দিকে মানও নষ্ট হয়। ইহাতে আমাদের জাতির প্রতি যে অবজ্ঞা প্রকাশ পায় তাহা আমাদের সকলেরই গায়ে বাজে।

ইংলণ্ডে গ্লোব বলিয়া একটি সংবাদপত্র আছে। সেটা সেখানকার ভদ্রলোকেরই কাগজ। তাহাতে লিখিয়াছে– টমি অ্যাট্‌কিন (অর্থাৎ পল্টনের গোরা) দেশী লোককে মারিয়া ফেলিবে বলিয়া মারে না, কিন্তু মার খাইলেই দেশী লোকগুলা মরিয়া যায়; এইজন্য টমি-বেচারার লঘু দণ্ড হইলেই দেশী খবরের কাগজগুলা চীৎকার করিয়া মরে।

টমি অ্যাট্‌কিনের প্রতি দরদ খুব দেখিতেছি, কিন্তু “স্যাঙ্ক্‌টিটি অফ লাইফ’ কোন্‌খানে। যে পাশব আঘাতে আমাদের পিলা ফাটে এই ভদ্রকাগজের কয় ছত্রের মধ্যেও কি সেই আঘাতেরই বেগ নাই। স্বজাতিকৃত খুনকে কোমল স্নেহের সহিত দেখিয়া হত ব্যক্তির আত্মীয়সম্প্রদায়ের বিলাপকে যাহারা বিরক্তির সহিত ধিক্‌কার দেয় তাহারাও কি খুন পোষণ করিতেছে না।

কিছুকাল হইতে আমরা দেখিতেছি, য়ুরোপীয় সভ্যতায় ধর্মনীতির আদর্শ সাধারণত অভ্যাসের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। ধর্মবোধশক্তি এই সভ্যতার অন্তঃকরণের মধ্যে উদ্‌ভাসিত হয় নাই। এইজন্য অভ্যাসের গণ্ডির বাহিরে এই আদর্শ পথ খুঁজিয়া পায় না, অনেক সময় বিপথে মারা যায়।

য়ুরোপীয় সমাজে ঘরে ঘরে কাটাকাটি-খুনাখুনি হইতে পারে না, এরূপ ব্যবহার সেখানকার সাধারণ স্বার্থের বিরোধী। বিষপ্রয়োগ বা অস্ত্রাঘাতের দ্বারা খুন করাটা য়ুরোপের পক্ষে কয়েক শতাব্দী হইতে ক্রমশ অনভ্যস্ত হইয়া আসিয়াছে।

কিন্তু খুন বিনা অস্ত্রাঘাতে বিনা রক্তপাতে হইতে পারে। ধর্মবোধ যদি অকৃত্রিম আভ্যন্তরিক হয়, তবে সেরূপ খুনও নিন্দনীয় এবং অসম্ভব হইয়া পড়ে।

একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত অবলম্বন করিয়া এ কথাটা স্পষ্ট করিয়া তোলা যাক।

হেনরি স্যাভেজ ল্যাণ্ডর একজন বিখ্যাত ভ্রমণকারী। তিব্বতের তীর্থস্থান লাসায় যাইবার জন্য তাঁহার দুর্নিবার ঔৎসুক্য জন্মে। সকলেই জানেন, তিব্বতিরা য়ুরোপীয় ভ্রমণকারী ও মিশনারি প্রভৃতিকে সন্দেহ করিয়া থাকে। তাহাদের দুর্গম পথঘাট বিদেশীর কাছে পরিচিত নহে, ইহাই তাহাদের আত্মরক্ষার প্রধান অস্ত্র; সেই অস্ত্রটি যদি তাহারা জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির হস্তে সমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া বসিতে অনিচ্ছুক হয় তবে তাহাদিগকে দোষ দেওয়া যায় না।

কিন্তু অন্যে তাহার নিষেধ মানিবে, সে কাহারো নিষেধ মানিবে না, য়ুরোপের এই ধর্ম। কোনো প্রয়োজন থাক্‌ বা না থাক্‌, শুদ্ধমাত্র বিপদ লঙ্ঘন করিয়া বাহাদুরি করিলে য়ুরোপে এত বাহবা মিলে যে অনেকের পক্ষে সে একটা প্রলোভন। য়ুরোপের বাহাদুর লোকেরা দেশ-বিদেশে বিপদ সন্ধান করিয়া ফেরে। যে-কোনো উপায়ে হোক, লাসায় যে য়ুরোপীয় পদার্পণ করিবে সমাজে তাহার খ্যাতি-প্রতিপত্তির সীমা থাকিবে না।

অতএব তুষারগিরি ও তিব্বতির নিষেধকে ফাঁকি দিয়া লাসায় যাইতে হইবে। ল্যাণ্ডর সাহেব কুমায়ুনে আলমোড়া হইতে যাত্রা আরম্ভ করিলেন। সঙ্গে এক হিন্দু চাকর আসিয়া জুটিল, তাহার নাম চন্দন সিং।

কুমায়ুনের প্রান্তে তিব্বতের সীমানায় বৃটিশ রাজ্যে শোকা বলিয়া এক পাহাড়ি জাত আছে। তিব্বতিদের ভয়ে ও উপদ্রবে তাহারা কম্পমান। বৃটিশরাজ তিব্বতিদের পীড়ন হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিতে পারেন না বলিয়া ল্যাণ্ডর সাহেব বারম্বার আক্ষেপ প্রকাশ করিয়াছেন। সেই শোকাদের মধ্য হইতে সাহেবকে কুলি মজুর সংগ্রহ করিয়া লইতে হইবে। বহুকষ্টে ত্রিশজন কুলি জুটিল।

ইহার পর হইতে যাত্রাকালে সাহেবের এক প্রধান চিন্তা ও চেষ্টা, কিসে কুলিরা না পালায়। তাহাদের পালাইবার যথেষ্ট কারণ ছিল। ল্যাণ্ডর তাঁহার ভ্রমণবৃত্তান্তের পঁচিশ পরিচ্ছেদে লিখিয়াছেন —

এই বাহকদল যখন নিঃশব্দ গম্ভীরভাবে বোঝা পিঠে লইয়া করুণাজনক শ্বাসকষ্টের সহিত হাঁপাইতে হাঁপাইতে উচ্চ হইতে উচ্চে আরোহণ করিতেছিল তখন এই ভয় মনে হইতেছিল, ইহাদের মধ্যে কয়জনই বা কোনো কালে ফিরিয়া যাইতে পারিবে।

আমাদের জিজ্ঞাস্য এই যে, এ শঙ্কা যখন তোমার মনে আছে তখন এই অনিচ্ছুক হতভাগ্যদিগকে মৃত্যুমুখে তাড়না করিয়া লইয়া যাওয়াকে কী নাম দেওয়া যাইতে পারে। তুমি পাইবে গৌরব এবং তাহার সঙ্গে অর্থলাভের সম্ভাবনাও যথেষ্ট আছে। তুমি তাহার প্রত্যাশায় প্রাণপণ করিতে পার, কিন্তু ইহাদের সম্মুখে কোন্‌ প্রলোভন আছে?

বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে জীবচ্ছেদ (vivisection) লইয়া য়ুরোপে অনেক তর্কবিতর্ক হইয়া থাকে। সজীব জন্তুদিগকে লইয়া পরীক্ষা করিবার সময়ে যন্ত্রণানাশক ঔষধ প্রয়োগ করিবার ঔচিত্যও আলোহিত হয়। কিন্তু বাহাদুরি করিয়া বাহবা লইবার উদ্দেশে দীর্ঘকাল ধরিয়া অনিচ্ছুক মানুষদের উপরে যে অসহ্য পীড়ন চলে ভ্রমণবৃত্তান্তের গ্রন্থে তাহার বিবরণ প্রকাশ হয়, সমালোচকেরা করতালি দেন, সংস্করণের পর সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়া যায়, হাজার হাজার পাঠক ও পাঠিকা এই-সকল বর্ণনা বিস্ময়ের সহিত পাঠ ও আনন্দের সহিত আলোচনা করেন। দুর্গম তুষারপথে নিরীহ শোকা বাহকদল দিবারাত্র যে অসহ্য কষ্ট ভোগ করিয়াছে তাহার পরিণাম কী। ল্যাণ্ডর সাহেব নাহয় লাসায় পৌঁছিলেন, তাহাতে জগতের এমন কী উপকার হওয়া সম্ভব যাহাতে এই-সকল ভীত পীড়িত পলায়নেচ্ছু মানুষদিগকে অহরহ এত কষ্ট দিয়া মৃত্যুর পথে তাড়না করা লেশমাত্র বিহিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে। কিন্তু কই, এজন্য তো লেখকের সংকোচ নাই, পাঠকের অনুকম্পা নাই!

তিব্বতিরা কিরূপ নিষ্ঠুরভাবে পীড়ন ও হত্যা করিতে পারে, শোকারা সেই কারণে তিব্বতিদিগকে কিরূপ ভয় করে, এবং তাহাদিগকে তিব্বতিদের হস্ত হইতে রক্ষা করিতে বৃটিশরাজ কিরূপ অক্ষম, তাহা ল্যাণ্ডর জানিতেন। ইহাও তিনি জানিতেন, তাঁহার মধ্যে যে উৎসাহ উত্তেজনা ও প্রলোভন কাজ করিতেছে, শোকাদের মধ্যে তাহার লেশমাত্র নাই। তৎসত্ত্বেও ল্যাণ্ডর তাঁহার গ্রন্থের ১৬৫ পৃষ্ঠায় যে ভাষায় যে ভাবে তাঁহার বাহকদের ভয়দুঃখের বর্ণনা করিয়াছেন তাহা তর্জমা করিয়া দিলাম–

তাহারা প্রত্যেকে হাতে মুখ ঢাকিয়া ব্যাকুল হইয়া কাঁদিতেছিল। কাচির দুই গাল বাহিয়া চোখের জল ঝরিয়া পড়িতেছিল, দোলা ফোঁপাইয়া কাঁদিতেছিল, এবং ডাকু ও অন্য যে-একটি তিব্বতি আমার কাজ লইয়াছিল– যাহারা ভয়ে ছদ্মবেশ গ্রহণ করিয়াছিল– তাহারা তাহাদের বোঝার পশ্চাতে লুকাইয়া বসিয়া ছিল। আমাদের অবস্থা যদিও সংকটাপন্ন ছিল তবু আমাদের লোকজনদের এই আতুর দশা দেখিয়া আমি না হাসিয়া থাকিতে পারিলাম না।

ইহার পরে এই দুর্ভাগারা পলায়নের চেষ্টা করিলে ল্যাণ্ডর তাহাদিগকে এই বলিয়া শান্ত করেন যে, যে-কেহ পলায়নের বা বিদ্রোহের চেষ্টা করিবে তাহাকে গুলি করিয়া মারিব।

কিরূপ তুচ্ছ কারণেই ল্যাণ্ডর সাহেবের গুলি করিবার উত্তেজনা জন্মে অন্যত্র তাহার পরিচয় পাওয়া গেছে। তিব্বতি কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে ল্যাণ্ডর যখন প্রথম নিষেধ প্রাপ্ত হইলেন তখন তিনি ভান করিলেন, যেন, ফিরিয়া যাইতেছেন। একটা উপত্যকায় নামিয়া আসিয়া দুরবীন কষিয়া দেখিলেন, পাহাড়ের শৃঙ্গের উপর হইতে প্রায় ত্রিশটা মাথা পাথরের আড়ালে উঁকি মারিতেছে। সাহেব লিখিতেছেন–

আমার বড়ো বিরক্তি বোধ হইল। যদি ইচ্ছা হয় তো ইহারা প্রকাশ্যভাবেই আমাদের অনুসরণ করে না কেন। দূর হইতে পাহারা দিবার দরকার কী। অতএব আমি আমার আটশো-গজি রাইফেল লইয়া মাটিতে চ্যাপটা হইয়া শুইলাম এবং যে মাথাটাকে অন্যদের চেয়ে স্পষ্ট দেখা যাইতেছিল তাহার প্রতি লক্ষ্য স্থির করিলাম।

এই “অতএব’ -এর বাহার আছে। লুকাচুরিতে ল্যাণ্ডর সাহেব কী ঘৃণাই করেন। তিনি এবং তাঁহার সঙ্গের আর-একটা মিশনারি সাহেব নিজেদের হিন্দু তীর্থযাত্রী বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন, প্রকাশ্যে ভারতবর্ষে ফিরিবার ভান করিয়া গোপনে লাসায় যাইবার উদ্‌যোগ করিতেছেন, কিন্তু পরের লুকাচুরি ইঁহার এতই অসহ্য যে, ভূমিতে চ্যাপটা হইয়া আত্মগোপনপূর্বক তৎক্ষণাৎ আটশো-গজি রাইফেল বাগাইয়া কহিলেন : I only wish to teach these cowards a lesson। “আমি এই কাপুরুষদিগকে শিক্ষা দিতে ইচ্ছা করি’। দূর হইতে লুকাইয়া রাইফেল-চালনায় সাহেব যে পৌরুষের পরিচয় দিতেছিলেন তাহার বিচার করিবার কেহ ছিল না। আমাদের ওরিয়েন্টাল্‌দের অনেক দুর্বলতার কথা আমরা শুনিয়াছি, কিন্তু চালুনি হইয়া ছুঁচকে বিচার করিবার প্রবৃত্তি পাশ্চাত্যদের মতো আমাদের নাই। আসল কথা, গায়ের জোর থাকিলে বিচারাসনের দখল একচেটে করিয়া লওয়া যায়। তখন অন্যকে ঘৃণা করিবার অভ্যাসটাই বদ্ধমূল হইয়া যায়, নিজেকে বিচার করিবার অবসর পাওয়া যায় না।

আশিয়ায় আফ্রিকায় ভ্রমণকারীরা অনিচ্ছুক ভৃত্য বাহকদের প্রতি যেরূপ অত্যাচার করিয়া থাকেন, দেশ-আবিষ্কারের উত্তেজনায় ছলে বলে কৌশলে তাহাদিগকে যে করিয়া বিপদ ও মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া লইয়া যান, তাহা কাহারো অগোচর নাই। অথচ Sanctity of Life সম্বন্ধে এই-সকল পাশ্চাত্য সভ্যজাতির বোধশক্তি অত্যন্ত সুতীব্র হইলেও কোথাও কোনো আপত্তি শুনিতে পাই না। তাহার কারণ, ধর্মবোধ পাশ্চাত্য সভ্যতার আভ্যন্তরিক নহে; স্বার্থরক্ষার প্রাকৃতিক নিয়মে তাহা বাহির হইতে অভিব্যক্ত হইয়া উঠিয়াছে। এইজন্য য়ুরোপীয় গণ্ডির বাহিরে তাহা বিকৃত হইতে থাকে। এমন-কি, সে গণ্ডির মধ্যেও যেখানে স্বার্থবোধ প্রবল সেখানে দয়াধর্ম রক্ষা করার চেষ্টাকে য়ুরোপ দুর্বলতা বলিয়া ঘৃণা করিতে আরম্ভ করিয়াছে! যুদ্ধের সময় বিরুদ্ধ পক্ষের সর্বস্ব জ্বালাইয়া দেওয়া, তাহাদের অনাথ শিশু ও স্ত্রীলোকদিগকে বন্দী করিবার বিরুদ্ধে কথা কহা “সেন্টিমেন্টালিটি’। য়ুরোপে সাধারণত অসত্যপরতা দূষণীয়, কিন্তু পলিটিক্সে এক পক্ষ অপর পক্ষকে অসত্যের অপবাদ সর্বদাই দিতেছে। গ্লাডস্টোনও এই অপবাদ হইতে নিষ্কৃতি পান নাই। এই কারণেই চীনযুদ্ধে য়ুরোপীয় সৈন্যের উপদ্রব বর্বরতারও সীমা লঙ্ঘন করিয়াছিল এবং কংগো-প্রদেশে স্বার্থোন্মত্ত বেলজিয়ামের ব্যবহার পৈশাচিকতায় গিয়া পৌঁছিয়াছে।

দক্ষিণ-আমেরিকায় নিগ্রোদের প্রতি কিরূপ আচরণ চলিতেছে তাহা নিউইয়র্কে প্রকাশিত “পোস্ট’ সংবাদপত্র হইতে গত ২রা জুলাই তারিখের বিলাতি “ডেলি নিউস’ -এ সংকলিত হইয়াছে। তুচ্ছ অপরাধের অছিলায় নিগ্রো স্ত্রীপুরুষকে পুলিসকোর্টে হাজির করা হয়; সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট তাহাদিগকে জরিমানা করে, সেই জরিমানা আদালতে উপস্থিত শ্বেতাঙ্গেরা শুধিয়া দেয় এবং এই সামান্য টাকার পরিবর্তে তাহারা সেই নিগ্রোদিগকে দাসত্বে ব্রতী করে। তাহার পর হইতে চাবুক লৌহশৃঙ্খল এবং অন্যান্য সকলপ্রকার উপায়ে তাহাদিগকে অবাধ্যতা ও পলায়ন হইতে রক্ষা করা হয়। একটি নিগ্রো স্ত্রীলোককে তো চাবুক মারিতে মারিতে মারিয়া ফেলা হইয়াছিল। একটি নিগ্রো স্ত্রীলোককে দ্বৈধব্য (bigamy)-অপরাধে গ্রেফতার করা হইয়াছিল। হাজতে থাকার সময় একজন ব্যারিস্টার তাহার পক্ষ অবলম্বন করিতে স্বীকার করে। কিন্তু কোনো বিচার না হইয়াই নির্দোষ বলিয়া এই স্ত্রীলোকটি খালাস পায়। ব্যারিস্টার ফি’য়ের দাবি করিয়া তাহার প্রাপ্য টাকার পরিবর্তে এই নিগ্রো স্ত্রীলোকটিকে ম্যাক্রিক্যাম্পে চৌদ্দ মাস কাজ করিবার জন্য পাঠায়। সেখানে তাহাকে নয়মাস চাবি তালা দিয়া বন্ধ করিয়া খাটানো হইয়াছে, জোর করিয়া আর-এক ব্যক্তির সহিত তাহার বিবাহ দিয়া বলা হইয়াছে যে, তোমার বৈধস্বামীর সহিত তোমার কোনো কালে মিলন হইবে না। পলায়নের আশঙ্কা করিয়া তাহার পশ্চাতে কুকুর ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহার প্রভু ম্যাক্রিরা তাহাকে নিজের হাতে চাবুক মারিয়াছে এবং তাহাকে শপথ করাইয়া লইয়াছে যে, খালাস পাইলে তাহাকে স্বীকার করিতে হইবে যে সে মাসে পাঁচ ডলার করিয়া বেতন পাইত।

ডেলি নিউস বলিতেছেন, রাশিয়ায় ইহুদি-হত্যা, কংগোয় বেলজিয়ামের অত্যাচার প্রভৃতি লইয়া প্রতিবেশীদের প্রতি দোষারোপ করা দুরূহ হইয়াছে।

 

After all, no great power is entirely innocent of the charge of treating with barbarous harshness the alien races which are subject to its rule.

 

আমাদের দেশে ধর্মের যে আদর্শ আছে তাহা অন্তরের সামগ্রী, তাহা বাহিরে গণ্ডির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিবার নহে। আমরা যদি Sanctity of Life একবার স্বীকার করি তবে পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ কোথাও তাহার সীমাস্থাপন করি না। ভারতবর্ষ একসময়ে মাংসাশী ছিল; মাংস আজ তাহার পক্ষে নিষিদ্ধ। মাংসাশী জাতি নিজেকে বঞ্চিত করিয়া মাংসাহার একেবারে পরিত্যাগ করিয়াছে, জগতে বোধ হয় ইহার আর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নাই। ভারতবর্ষে দেখিতে পাই অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিও যাহা উপার্জন করে তাহা দূর আত্মীয়দের মধ্যে ভাগ করিয়া দিতে কুণ্ঠিত হয় না। স্বার্থেরও যে একটা ন্যায্য অধিকার আছে, এ কথাটাকে আমরা সর্বপ্রকার অসুবিধা স্বীকার করিয়া যত দূর সম্ভব খর্ব করিয়াছি। আমাদের দেশে বলে, যুদ্ধেও ধর্মরক্ষা করিতে হইবে; নিরস্ত্র, পলাতক, শরণাগত শত্রুর প্রতি আমাদের ক্ষত্রিয়দের যেরূপ ব্যবহার ধর্মবিহিত বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে য়ুরোপে তাহা হাস্যকর বলিয়া গণ্য হইবে। তাহার একমাত্র কারণ, ধর্মকে আমরা অন্তরের ধন করিতে চাহিয়াছিলাম। স্বার্থের প্রাকৃতিক নিয়ম আমাদের ধর্মকে গড়িয়া তোলে নাই, ধর্মের নিয়মই আমাদের স্বার্থকে সংযত করিবার চেষ্টা করিয়াছে। সেজন্য আমরা যদি বহির্বিষয়ে দুর্বল হইয়া থাকি, সেইজন্যই বহিঃশত্রুর কাছে যদি আমাদের পরাজয় ঘটে, তথাপি আমরা স্বার্থ ও সুবিধার উপরে ধর্মের আদর্শকে জয়ী করিবার চেষ্টায় যে গৌরবলাভ করিয়াছি তাহা কখনোই ব্যর্থ হইবে না — এক দিন তাহারও দিন আসিবে।

 

১৩১০

McRee letter

A letter from an African American woman Carrie Kinsey in July 1903 seeking help from then President Roosevelt in freeing her fourteen year old brother from a McRee camp.

 

Article similar to the Daily Post one that Tagore must have read:

http://archives.chicagotribune.com/1903/06/19/page/4/article/georgia-negroes-sold-to-slavery

 

***

I have described elsewhere how an English professor while discussing the role of juries in this country opined that it was not right that a half civilized people who lack an understanding of the concept of sanctity of life should have the right to form juries.

Let us for the sake of this argument accept that the English appreciate the sanctity of life better than us. Thus when the English take lives, the gravity of their crime should be greater than when we commit the same crime. But we observe no Englishman being hanged by an English judge and an English jury for killing an Indian. Perhaps this gives the English murderer proof of the fact that his countrymen have a very acute understanding of the sanctity of life, but the evidence remains somewhat elusive to Indians.

These rulings are an affront to us on two counts. On one front there is the inevitability of death and on the other the loss of face. The contempt that is expressed towards our countrymen is an insult to all of us.

There is a newspaper in England titled The Globe. It is for the civilized classes of that country. It said – Tommy Atkins (common slang for a common soldier) does not hit the Indian with the idea of killing him but the Indians die as soon as they are beaten; and when poor Tommy receives a mild sentence the native papers are up in arms.

I see great sympathy for Tommy Atkins but what of the ‘sanctity of life’? Why is there no sign of outrage regarding the brutality that is killing us in even a few lines of this civilized newspaper? Are those who look upon a murder by their own kind with gentle indulgence not guilty of murder too, as they mock the mourning of the families who have suffered a loss?

For some time we have observed that the religious ideals in European civilization are founded on habit alone. The true meaning of religion has not reached the inner core of this civilization. That is why these ideals lose their way outside the familiar boundaries and often die an untimely death.

Murders or killings are no longer regular occurrences in European society within families as that sort of behaviour goes against the common interest. Poisoning or murder with a weapon has grown rare over a few centuries.

But murder can be committed without the use of weapons or bloodshed. If religion is natural and embedded in the soul, then that kind of murder becomes shameful and impossible to carry out as well.

Let us look at a specific example to understand this better;

Henry Savage Landor was a famous traveller. He became greatly interested in visiting Lhasa which is a pilgrimage in Tibet. Everyone will know that the Tibetans are suspicious of European travellers and missionaries. Their main mode of defence is their remoteness and the fact that their remote areas are not known to foreigners; if they feel unwilling to hand that defence over to the Geographical Society complacently, one cannot blame them.

But it is the practice of Europe to not heed anyone else’s restrictions while expecting compliance from others regarding their own. Whether there is a need for it or not, such a tremendous amount of ovation is available in Europe for simply overcoming certain dangers that this proves enticing to many of them. The brave men of Europe seek these dangers in countries across the world. The European to first set foot in Lhasa by hook or by crook would have no end to the honours and fame showered upon him.

And hence to Lhasa one must go, trampling over snowy peaks and the restrictions placed by the Tibetans themselves. Landor began his journey from Almora in the Kumaon Himalayas. With him was a Hindu servant known as Chandan Singh.

A tribe known as the Shaukas lived within the British territory at the borders of Kumaon. They were greatly afraid of the Tibetans. Landor has expressed his dismay at the failure of the British rulers to provide the Shaukas with respite from attack by the Tibetans. He had to organise porters from the members of the Shauka tribe and managed to convince thirty of them to join his expedition with great difficulty.

From then on his main concern and effort was devoted to the possibility of these porters escaping. They had more than sufficient reason to do so. In the twenty fifth chapter of his travelogue Landor wrote –

‘When the porters began climbing higher and higher in solemn silence, gasping miserably for air I was worrying about how many of them would possibly return.’

We ask the question, when this was the fear in your mind then what name would you assign to the relentless pressure on these unwilling wretches to advance towards certain death? You will be showered with praise and quite possibly gain some financial prizes as well. You may give your life in that hope but what sort of reward awaits these people?

Much debate takes place in Europe over the need for vivisection for the advancement of scientific knowledge. The need for alleviating the pain of the live animals while subjecting them to scientific experiments is also discussed. But the unbelievable cruelty that is exerted on unwilling people in the name of bravery and with the aim of attaining fame is described at length in accounts of those journeys, the books run into multiple editions and thousands of readers of both sexes read them with a great sense of wonder and enjoyment. What is the result of the continual suffering that the innocent Shauka porters underwent on the remote icy passes? What kind of benefit was it to the world even if Landor did reach Lhasa that would render negligible the sufferings of the frightened porters who wished to escape but were pushed towards certain death under great duress? But I do not notice any hesitation regarding this on the writer’s part and certainly no sympathy on part of the reader.

Landor knew how cruelly the Tibetans tortured and killed the Shaukas and how they feared the Tibetans for that reason and how ineffectual the British government was at protecting them from the Tibetans. He also knew that the eagerness and hope for adulation that was within him was not present in the Shaukas even in the smallest measure. I provide a translation of the description that he provides of their fearful behavior on Page 165 of his book, despite knowing everything:
‘They all covered their faces with their hands and cried piteously. Tears streamed down both Kachi’s cheeks, Dola’s shoulders heaved and Daku and the other Tibetan who had disguised themselves as Shokas to become my porters hid behind their loads. Even though our plight was fraught with danger, I could not help but laugh at the pathetic state of my entourage.’

After this Landor calmed the porters who were attempting to escape by assuring them that he would shoot them down if they ran away or tried to incite others to revolt.

There is more proof of how easily Landor was driven to a desire to shoot someone. When he received the first notice from the Tibetan authorities asking him to turn back, he pretended to follow their instructions. He descended into a valley and looked through a telescope to find that nearly thirty heads were watching his departure from behind the rocks. He writes –

‘I felt very annoyed. If they wanted to they should have followed us openly. Why guard us from afar? Hence I lay facedown upon the ground and aimed at the most visible head with my rifle which had a range of 800 yards.’

There is a certain style in the usage of the word ‘hence’. How abhorrent Landor finds all this artifice. He and a missionary accompanying him were trying to pass themselves off as Hindu pilgrims, he was openly pretending to return to India while secretly trying to enter Lhasa but when it came to others, he felt so annoyed that he had to hide by lying flat on the ground, take aim with an 800 yard rifle and say: I only wish to teach these cowards a lesson. There was no one there to judge him for his courage in taking aim secretly from such a distance. We have heard of many weaknesses of part of the Orientals but we have no inclination to judge a needle while we are akin to sieves ourselves in the style of the Westerner. The truth is, one can grab the judgement seat if one is stronger. In those instances, despising others becomes a habit and there is little time to analyse one’s own actions.

The ways in which travellers in Asia and Africa torment their unwilling servants and porters and push them towards danger and death by trickery, force and subterfuge in the exultation of discovering new lands are not unknown to anyone. And yet we never hear about Sanctity of Life from anyone despite the acute sensitivity of the West to that issue. The reason for that is that piety is not at the heart of Western civilization; it has escaped under pressure and become distorted outside the boundaries of Europe. Even within those boundaries when self interest is powerful enough, maintaining compassion has recently been deemed as weakness by Europe. It is called ‘sentimentality’ when there are protests against the scorched earth policy and the imprisoning of helpless women and children. Deceit is usually frowned upon in Europe but political sides are forever calling each other liars. Even Gladstone was not exempt from this. That is why the European soldiers crossed the limits of barbaric behavior in the China wars and the self serving actions of Belgium are bordering on hellish in the Congo.

News about how the negroes of Southern America are being treated was published in the Daily News of the second of July. Black men and women are taken to court on minor charges; the magistrate orders them to pay a fine and white people present in the court post bail for them. These small sums bind them into a contract of slavery. From then on they are prevented from committing any transgressions or escaping by means of whips, metal shackles and other methods. One woman was whipped till she died. Another was arrested on grounds of bigamy. While in prison a barrister agreed to take her case. But the woman was freed before the case could be heard as she was innocent. The barrister claimed his fee and sent this woman to the McRee Camp for fourteen months to work off her debt. She was put under lock and key and forced to work for nine months. She was also made to marry a man and told that she would never see her first husband again. Dogs were sent after her when she tried to escape and her owner McRee whipped her himself and extracted a promise from her that she would be freed on condition that she declared that she was paid five dollars every month as a salary.

The Daily News says the killing of Jews in Russia and the Belgian war crimes in the Congo are incidents for which it is increasingly difficult to blame one’s neighbours.

‘After all, no great power is entirely innocent of the charge of treating with barbarous harshness the alien races which are subject to its rule.’

The religious ideals that exist in our country are close to the soul and are not easily transferred to the outside and confined within boundaries. If we once admit to the Sanctity of Life we do not place any further restrictions on animals, birds or insect life. India was once a meat eating nation; today there are bans on eating meat. There is possibly no other example in the world of a meat eating race having given up meat completely. I have seen even the very poor in India give away their meagre earnings to distant family without any qualms. We have accepted every kind of deprivation and diminished the importance that was accorded to self interest as far as possible. It is said in our country that what is right must be adhered to, even in war; the fair treatment of their unarmed enemies, fleeing armies and shelter seekers that the Kshatriyas followed as principle would be laughable to the Europeans. The sole reason for this was that we strove to make religion something of the heart. The natural laws of self-interest did not form our religion; rather the laws of religion helped restrict our self-interest. And for that reason alone, if we are weak in outside matters and if we are defeated by external forces, there will be no lessening of the honour in the victory that we have attained by placing the ideal of truth above self-interest and ease – there will come a day for that too.

1310

Letter image: http://www.washingtonmonthly.com/magazine/january_february_2013/features/americas_twentiethcentury_slav042038.php?page=all

Upcoming book of Tagore translations.

I am rather happy to announce that a new book of my translations of Tagore, the fourth one so far, is being published soon. The publishers are Vitasta of Delhi. The book is titled Reliving Tagore, Poetry, Prose and Perceptions.

I will keep everyone posted about the publication. There will be a book giveaway as well, soon!

In the meantime, find the book on Facebook at:
https://www.facebook.com/RelivingTagore/

NEW BOOK

বাণী /Bani/ A Message

বাণী

 

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব’লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।

 

তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই– আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।

 

কিন্তু, কোন দেবতার কৌতুকহাস্যের মতো অপরিমিত চঞ্চলতা নিয়ে আমাদের পাড়ায় ঐ ছোটো মেয়েটির জন্ম। মা তাকে রেগে বলে ‘দস্যি’, বাপ তাকে হেসে বলে ‘পাগলি’।

 

সে পলাতকা ঝরনার জল, শাসনের পাথর ডিঙিয়ে চলে। তার মনটি যেন বেণুবনের উপরডালের পাতা, কেবলই ঝির্‌ ঝির্‌ করে কাঁপছে।

 

 

আজ দেখি, সেই দুরন্ত মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙে ভর দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে, বাদলশেষের ইন্দ্রধনুটি বললেই হয়। তার বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ আজ অচঞ্চল, তমালের ডালে বৃষ্টির দিনে ডানাভেজা পাখির মতো।

 

ওকে এমন স্তব্ধ কখনো দেখি নি। মনে হল, নদী যেন চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে সরোবর হয়েছে।

 

 

কিছুদিন আগে রৌদ্রের শাসন ছিল প্রখর; দিগন্তের মুখ বিবর্ণ; গাছের পাতাগুলো শুকনো, হলদে, হতাশ্বাস।

 

এমন সময় হঠাৎ কালো আলুথালু পাগলা মেঘ আকাশের কোণে কোণে তাঁবু ফেললে। সূর্যাস্তের একটা রক্তরশ্মি খাপের ভিতর থেকে তলোয়ারের মতো বেরিয়ে এল।

 

অর্ধেক রাত্রে দেখি, দরজাগুলো খড়্‌খড়্‌ শব্দে কাঁপছে। সমস্ত শহরের ঘুমটাকে ঝড়ের হাওয়া ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে দিলে।

 

উঠে দেখি, গলির আলোটা ঘন বৃষ্টির মধ্যে মাতালের ঘোলা চোখের মতো দেখতে। আর, গির্জের ঘড়ির শব্দ এল যেন বৃষ্টির শব্দের চাদর মুড়ি দিয়ে।

 

সকালবেলায় জলের ধারা আরও ঘনিয়ে এল, রৌদ্র আর উঠল না।

 

 

এই বাদলায় আমাদের পাড়ার মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে।

 

তার বোন এসে তাকে বললে, ‘মা ডাকছে।’ সে কেবল সবেগে মাথা নাড়ল, তার বেণী উঠল দুলে; কাগজের নৌকো নিয়ে তার ভাই তার হাত ধরে টানলে। সে হাত ছিনিয়ে নিলে। তবু তার ভাই খেলার জন্যে টানাটানি করতে লাগল। তাকে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলে।

 

 

বৃষ্টি পড়ছে। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এল। মেয়েটি স্থির দাঁড়িয়ে।

 

আদিযুগে সৃষ্টির মুখে প্রথম কথা জেগেছিল জলের ভাষায়, হাওয়ার কণ্ঠে। লক্ষকোটি বছর পার হয়ে সেই স্মরণবিস্মরণের অতীত কথা আজ বাদলার কলস্বরে ঐ মেয়েটিকে এসে ডাক দিলে। ও তাই সকল বেড়ার বাইরে চলে গিয়ে হারিয়ে গেল।

 

কত বড়ো কাল, কত বড়ো জগৎ, পৃথিবীতে কত যুগের কত জীবলীলা! সেই সুদূর, সেই বিরাট, আজ এই দুরন্ত মেয়েটির মুখের দিকে তাকালো মেঘের ছায়ায়, বৃষ্টির কলশব্দে।

 

ও তাই বড়ো বড়ো চোখ মেলে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল, যেন অনন্তকালেরই প্রতিমা।

 

A Message

1
The clouds descend as drops of rain, to surrender to the earth. Just as women come to earth to be caught.

They do not need much more than a  little space and a few people to feel happy about the world. And they fill that tiny space with their words, their pains and their thoughts. That is why their heads are veiled, bangles tinkle about their arms and their courtyards are fenced. They are the queens within their little heavens.

Some heavenly being surely came to play on earth through that girl, with her unceasing activity. Her mother calls her a bandit when she is angry, her father smiles and calls her his mad one.

She flows merrily like a waterfall and trips over all obstacles and restrictions. Her mind is like the leafy tips atop a bamboo grove, always rippling with thoughts.

 

2

Today I saw that lively child standing all quiet, leaning on the railings of the verandah, as subdued as a rainbow at the end of the rainy season. Her large dark eyes were still today, like a rain drenched bird in pensive rest upon the branches of the Tamal.

I had never seen her being silent like this. It was as though a river had been made to pause suddenly and a lake had formed.

 

3

A few days ago, the sun had beaten down with great intensity. The horizon sulked, the leaves on the trees were dry and yellow with despair.

Suddenly a dark ill-mannered cloud filled the sky, covering it in all directions like a tent. A blood red beam of sunshine emerged like a blade from a scabbard.

At midnight I woke to find all the doors shaking and rattling. The storm and the winds had taken the sleeping city by the hair and shaken it awake.

I rose and found the streetlight staring back at me through the driving rain like a bleary eye drunk. The church bell rang, its sound muffled by the rain as though smothered in a blanket.

In the morning the rain grew heavier and the sun did not come up.

4

And amid the rain that girl stood, quiet by the railings of the verandah.
Her sister came and called her saying, ‘Mother wants you.’ She only shook her head vigorously, her plaits moving. Her brother came with a paper boat and pulled her by the hand. But she pulled back. He still kept asking her. She slapped him back.

 

5

It is raining. The darkness grows. The girl stands, quiet.

In the ancient times, the first sounds heard on the lips of creation emerged from the language spoken by water and the voices that are carried on the wind. Those half forgotten words traversed the millennia and stirred the heart of the girl. That was why she had escaped to where no fences could hold her back.

Vast is the ocean of time and vast this world and innumerable the things that have happened to this earth through all that time. That vast distance had spoken to the girl today through cloud shadow and rain murmur.

And so she stood and listened, her large eyes silent, like a deity that has ruled since eternity.

 

 

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা/ Bipawdey Morey Rokkha Kawro/I do not ask that you save me from tribulation, this is not my plea –

diyas

 

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা–

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়॥

সহায় মোর না যদি জুটে  নিজের বল না যেন টুটে,

সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা

নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা–

তরিতে পারি শকতি যেন রয়।

আমার ভার লাঘব করি নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

বহিতে পারি এমনি যেন হয়।

নম্রশিরে সুখের দিনে  তোমারি মুখ লইব চিনে–

দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা

তোমারে যেন না করি সংশয়।

রাগ: ইমনকল্যাণ
তাল: ঝম্পক
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1313
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1907
স্বরলিপিকার: কাঙ্গালীচরণ সেন, ভীমরাও শাস্ত্রী

 

To listen to the great Bengali thespian Soumitra Chatterjee recite:

To listen to the song by Swagatalakshmi Dasgupta:

 

I do not ask that you save me from tribulation, this is not my plea –

But make me fearless in the face of troubles.

Perhaps you do not need to console my broken soul when sorrow weighs it down,

But teach me to conquer that weight.

If I find myself without support let my own strength be enough,

When fate deals me loss and my only reward has been deprivation

Let me not be eaten away from within

That you will secure me, this is not my plea –

But simply that I am able to overcome.

Perhaps you do not need to lessen my load by way of solace,

But make me able to bear it.

I will learn you with humility in my days of happiness and plenty –

And on that darkest of nights when the whole world turns its face away

I will not doubt you for once.

Raga: Yaman Kalyan
Beat: Jhampak
Written: 1907
Score: Kangalicharan Sen, Bheemrao Shastri