Arogyo 3: নির্জন রোগীর ঘর। খোলা দ্বার দিয়ে বাঁকা ছায়া পড়েছে শয্যায়

নির্জন রোগীর ঘর।

খোলা দ্বার দিয়ে

বাঁকা ছায়া পড়েছে শয্যায়।

শীতের মধ্যাহ্নতাপে তন্দ্রাতুর বেলা

চলেছে মন্থরগতি

শৈবালে দুর্বলস্রোত নদীর মতন।

মাঝে মাঝে জাগে যেন দূর অতীতের দীর্ঘশ্বাস

শস্যহীন মাঠে।

মনে পড়ে কতদিন

ভাঙা পাড়িতলে পদ্মা

কর্মহীন প্রৌঢ় প্রভাতের

ছায়াতে আলোতে

আমার উদাস চিন্তা দেয় ভাসাইয়া

ফেনায় ফেনায়।

স্পর্শ করি শূন্যের কিনারা

জেলেডিঙি চলে পাল তুলে,

যূথভ্রষ্ট শুভ্র মেঘ পড়ে থাকে আকাশের কোণে।

আলোতে ঝিকিয়া-ওঠা ঘট কাঁখে পল্লীমেয়েদের

ঘোমটায় গুন্ঠিত আলাপে

গুঞ্জরিত বাঁকা পথে আম্রবনচ্ছায়ে

কোকিল কোথায় ডাকে ক্ষণে ক্ষণে নিভৃত শাখায়,

ছায়ায় কুন্ঠিত পল্লীজীবনযাত্রার

রহস্যের আবরণ কাঁপাইয়া তোলে মোর মনে।

পুকুরের ধারে ধারে সর্ষেখেতে পূর্ণ হয়ে যায়

ধরণীর প্রতিদান রৌদ্রের দানের,

সূর্যের মন্দিরতলে পুষ্পের নৈবেদ্য থাকে পাতা।

আমি শান্ত দৃষ্টি মেলি নিভৃত প্রহরে

পাঠায়েছি নিঃশব্দ বন্দনা,

সেই সবিতারে যাঁর জ্যোতীরূপে প্রথম মানুষ

মর্তের প্রাঙ্গণতলে দেবতার দেখেছে স্বরূপ।

মনে মনে ভাবিয়াছি, প্রাচীন যুগের

বৈদিক মন্ত্রের বাণী কন্ঠে যদি থাকিত আমার

মিলিত আমার স্তব স্বচ্ছ এই আলোকে আলোকে;

ভাষা নাই, ভাষা নাই;

চেয়ে দূর দিগন্তের পানে

মৌন মোর মেলিয়াছি পাণ্ডুনীল মধ্যাহ্ন-আকাশে।

  উদয়ন, ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ – দুপুর, পূর্বপাঠ: ৭ পৌষ, ২২ ডিসেম্বর, ১৯৪০

***

The quiet room of the convalescent.

Through the open door

Shadows bend to fall across the bed.

Winter’s welcome sun kisses the hours to sleep

Slowing down the day

 Like a stream slowed down by algae

 Some times a sigh breaks the reverie

Memories of a distant past upon today’s barren field.

I remember once 

How the river would roil beneath broken deck

As idle morning unfolded

 In shadow and glorious light

I let my thoughts ramble

With ebb and flow of foam

Touching the edge of nothingness

 A fishing craft follows its sail,

While an errant cloud is left to wander the skies on its own.

The village women with flashing water pots on hip

In their veiled conversation

 By the shade of mango trees on winding paths

Where does the cuckoo call, unseen upon a dense branch,

The life of the village, shy under tree shade

The mystery deepens in my mind.

 The mustard fields by the lake ripen with seed

The earth’s repayment for sunshine’s gift,

A golden offering at the sun’s feet.

I cast my calm glance upon the silent hour

Sending a wordless prayer

To the sun in whose rays the first humans beheld

The image of god upon the dust of this earth.

I have thought to myself, if only

I had the words of the ancient Vedic hymns on my lips

I would have sent them to join that purest of light;

 But words I lack, I have none to speak;

As I gaze at the distant horizon

My silence I hold in offering to the pale blue of the midday firmament.

Udayan, afternoon February 1st 1941
Previously: 7th Poush, 22nd December 1940

 

এই-যে কালো মাটির বাসা শ্যামল সুখের ধরা/Ei Je Kalo Matir Baasha Shyamol Shukher Dhora/This home of ours wrought from dark earth and joyous green

এই-যে কালো মাটির বাসা শ্যামল সুখের ধরা–

এইখানেতে আঁধার-আলোয় স্বপন-মাঝে চরা ॥

এরই গোপন হৃদয় ‘পরে   ব্যথার স্বর্গ বিরাজ করে

                   দুঃখে-আলো-করা ॥

বিরহী তোর সেইখানে যে একলা বসে থাকে–

হৃদয় তাহার ক্ষণে ক্ষণে নামটি তোমার ডাকে।

দুঃখে যখন মিলন হবে   আনন্দলোক মিলবে তবে

                   সুধায়-সুধায়-ভরা ॥

রাগ: ছায়ানট-কেদারা
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১৬ ভাদ্র, ১৩২১
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ২ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪
রচনাস্থান: সুরুল
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

***

This home of ours wrought from dark earth and joyous green

Where we walk, caught in dreams between light and dark.

Within its secret heart is held a heaven where pain lights the way

 There is one who waits there for you alone –

Whose heart calls to you time and again.

Blessed are those who suffer for they will inherit a kingdom of joy

 Fulfilling them with sweetness

Raga: Chayanawt – Kedara
Beat: Dadra
Written: 2nd September, 1914
Written in Surul
Score: Dinendranath Tagore

 

Follow the link to hear Ritu Guha sing:

পরম সুন্দর/ Pawrom Shundor/In the glorious beauty

পরম সুন্দর

আলোকের স্নানপুণ্য প্রাতে।

অসীম অরূপ

রূপে রূপে স্পর্শমণি

রসমূর্তি করিছে রচনা,

প্রতিদিন

চিরনূতনের অভিষেক

চিরপুরাতন বেদীতলে।

মিলিয়া শ্যামলে নীলিমায়

ধরণীর উত্তরীয়

বুনে চলে ছায়াতে আলোতে।

আকাশের হৃৎস্পন্দন

পল্লবে পল্লবে দেয় দোলা।

প্রভাতের কন্ঠ হতে মণিহার করে ঝিলিমিলি

বন হতে বনে।

পাখিদের অকারণ গান

সাধুবাদ দিতে থাকে জীবনলক্ষ্মীরে।

সবকিছু সাথে মিশে মানুষের প্রীতির পরশ

অমৃতের অর্থ দেয় তারে,

মধুময় করে দেয় ধরণীর ধূলি,

সর্বত্র বিছায়ে দেয় চিরমানবের সিংহাসন।

 

 

উদয়ন, ১২ জানুয়ারি, ১৯৪১ – দুপুর

***

In the glorious beauty

Of a dawn bathed with the purest of light.

The formless eternal

Touches the ordinary with beauty

To create images of grace,

Daily.

The crowning of the forever new

At the altar of the forever familiar.

Blues and greens join

In cloaking the earth

Spinning a veil from shadow and light.

The heartbeat of the sky

Moves each leaf in dance.

Dawn’s necklace glitters

In each tree and forest.

Birds sing without cause

Hailing the glory of life.

Man’s love joins the symphony

Raising it all to immortal planes,

Granting sweetness even to dust,

And thus we ascend to greatness enthroned.

 

 

Udayan, 12th January afternoon, 1941

 

এ দ্যুলোক মধুময়/ E dyulok modhumoy/ This earth is filled with sweetness

এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি–

অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি

এই মহামন্ত্রখানি,

চরিতার্থ জীবনের বাণী।

দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহার

মধুরসে ক্ষয় নাই তার।

তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে–

সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে।

শেষ স্পর্শ নিয়ে যাব যবে ধরণীর

ব’লে যাব তোমার ধূলির

তিলক পরেছি ভালে,

দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে।

সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মুরতি,

এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি।

 উদয়ন, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ – সকাল

***

 This earth is filled with sweetness, sweet its very dust –

 And I have taken to heart

This great tenet,

To fulfil the song of life.

 What I have received each day as a gift of truth

Will not be diminished at all.

And that is why it rings out on the eve of death –

Erasing all loss, shining as a beacon infinite.

  When I let go for the final time

I will declare to the earth

 Your dust I have worn with pride upon my brow,

 I have seen your light burn bright behind the illusion of loss

 Truth finds its most joyous expression in this dust,

 In this I believe as I bow in respect.

  Udayan, 14th February, 1941 – morning.

তোমারে জানি নে হে/ Tomarey jani ne hey/ I know you not

তোমারে জানি নে হে, তবু মন তোমাতে ধায়।
তোমারে না জেনে বিশ্ব তবু তোমাতে বিরাম পায়।।
অসীম সৌন্দর্য তব কে করেছে অনুভব হে,
সে মাধুরী চিরনব–
আমি না জেনে প্রাণ সঁপেছি তোমায়।।
তুমি জ্যোতির জ্যোতি, আমি অন্ধ আঁধারে।
তুমি মুক্ত মহীয়ান, আমি মগ্ন পাথারে।
তুমি অন্তহীন, আমি ক্ষুদ্র দীন– কী অপূর্ব মিলন তোমায় আমায়।।

রাগ: ভৈরবী
তাল: ঝাঁপতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1293
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1887

I know you not and yet, my heart rushes to you
The world knows you not and yet, it finds solace in you.
The endless beauty that is yours                             who has truly known,
The beauty that is renewed and eternally new –
And yet, I gave my soul to you without a thought.
You, the light brightest of all                               while I shut my eyes in darkness.
You, the freedom infinite in its grace, while I flounder in this ocean.
You are without end and I have nothing – yet how marvellous our union.

Raga: Bhairavi
Beat: Jhnaptaal
Written: 1887

Suchitra Mitra:
https://www.youtube.com/watch?v=tj-yCrtGAJU

Correspondence between Surajit Sinha, V.C Visva Bharati and Edith Geheeb

This post comes courtesy of my dear Facebook friend Sukanya Sinha. Her father Surajit Sinha was the Vice Chancellor of Visva Bharati University between 1975 and 1980. In Sukanya’s words:

“While rummaging through old papers I came across a postcard that I had never seen before. It was addressed to my father and was written in 1980 by a ninety-four year woman named Edith Geheeb.
The postcard had her photograph printed on it. In the letter it mentioned that she was the wife of Paul Geheeb and Rabindranath Tagore visited them in Germany in 1930.

I had never heard her name before and was curious to find out about her. Fortunately, in the Google age this is possible without stepping outside home. It was like following a mystery trail.

Paul Geheeb was a remarkable educationist , who along with his wife Edith established a special residential school in Germany in 1910 called Odenwaldschule. It was a unique school, implementing progressive non-authoritarian practices and a holistic learning philosophy with emphasis on being a part of a community. The Geheebs moved to Switzerland following the Nazi takeover of the Odenwaldschule and started a new school called Ecole d’ Humanite there in 1935. The postcard had the same address. Rabindranath Tagore visited the Geheebs and their school in Germany in 1930. Their educational philosophies found resonance and they formed a lifelong bond and corresponded frequently. Paul Geheeb was conferred the honorary title of Desikottama by Visva Bharati in 1961. He passed away a few days before the award ceremony. As is evident from the contents of the postcard, Edith remained in touch with Santiniketan over two decades following his death.”

Paul Geheeb.jpg

Paul Geheeb and the poet

Edith Geheeb 1

The postcard to the late Upacharya

Edith Geheeb

Edith Geheeb

More information: http://www.ecole.ch/en/history

কর্ণ কুন্তি সংবাদ/Karna Kunti Sambad/Karna and Kunti Speak

 

কর্ণ।

মাতঃ, করিয়ো না ভয়।

কহিলাম, পাণ্ডবের হইবে বিজয়।

আজি এই রজনীর তিমিরফলকে

প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র-আলোকে

ঘোর যুদ্ধ-ফল। এই শান্ত স্তব্ধ ক্ষণে

অনন্ত আকাশ হতে পশিতেছে মনে

জয়হীন চেষ্টার সংগীত, আশাহীন

কর্মের উদ্যম– হেরিতেছি শান্তিময়

শূন্য পরিণাম। যে পক্ষের পরাজয়

সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান।

জয়ী হোক, রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান–

আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে।

জন্মরাত্রে ফেলে গেছ মোরে ধরাতলে

নামহীন, গৃহহীন– আজিও তেমনি

আমারে নির্মমচিত্তে তেয়াগো জননী

দীপ্তিহীন কীর্তিহীন পরাভব-‘পরে।

শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে

জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,

বীরের সদ্‌গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।

 

১৫ ফাল্গুন, ১৩০৬

***

Karna:

Mother, do not fear.

I say, victory will be the Pandavas’.

Upon the dark backdrop of this night

I can see clearly lit by star light

The fate of the great battle to come. At this serene silent moment

Descends upon my mind from the endless skies

A song that speaks of fruitless effort, of hopeless

Striving – I see the peace that will come at

The empty end. The side that will certainly lose

Do not beseech me to abandon them.

Let them be victorious, let them be kings – your Pandava sons

Let me remain, as ever with those who yield no fruit, nor know success.

You left me to the embrace of the earth on the night of my birth

Without a name or a home to call my own – today as well

Forsake me with a cruel heart, give me up Mother

To the darkness and ignominy of defeat

Simply leave for me this blessing if you may

That lust for victory, for fame and wealth does not sway

This son of yours from the path of the brave, from Truth’s way .

 

15th Phalgun, 1306