Archives

ক্ষীরের পুতুল ৪/ Kheerer Putul 4/ The Milk Doll 4

বানর বললে—মহারাজ, ভাঙা ঘরে মা আমার বড় দুঃখ পান ।

ঘরের দুয়োর ফাটা, চালে খড় নেই, শীতের হিম ঘরে আসে । মা আমার গায়ে দিতে নেপ পান না, আণ্ডন জ্বালাতে কাঠ পান না, সারা রাত শীতে কাঁপেন।

রাজা বললেন—তাইতো তাইতো ! একথা বলতে হয় । বানর, তোর মাকে রাজবাড়িতে নিয়ে আয়, আমি মহল সাজাতে বলি । বানর বললে—মহারাজ, মাকে আনতে ভয় হয়, ছোটরানী বিষ খাওয়াবে।

রাজা বললেন—সে ভয় নেই । নতুন মহলে রানীকে রাখব, মহল ঘিরে গড় কটাব, গড়ের দুয়ারের পাহারা বসাব, ছোটরানী আসতে পারবে না। সে মহলে বড়রানী থাকবেন, বড়রানীর বোবা-কালা দাই থাকবে ? আর বড়রানীর পোষা ছেলে তুই থাকবি ।

বানর বললে—মহারাজ, যাই তবে মাকে আনি ।

রাজা বললেন—যাও মন্ত্রী মহল সাজাও গে।

মন্ত্রী লক্ষ লক্ষ লোক লাগিয়ে একদিনে বড়রানীর নতুন মহল সাজালেন।

দুওরানী ভাঙা ঘর ছেড়ে, ছেঁড়া কাঁথা ছেড়ে, সোনার শাড়ি পরে নতুন মহলে এলেন। সোনার পালঙ্কে বসলেন, সোনার থালে ভাত খেলেন, দীন-দুঃখীকে দান দিলেন, রাজ্যে জয় জয় হল; রাগে  ছোট রানীর সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল।

ডাকিনী ব্রাহ্মণী—ছোটরানীর ‘মনের কথা’, প্রাণের বন্ধু। ছোটরানী বলে পাঠালেন—মনের কথাকে আসতে বল, কথা আছে। রানী ডেকেছেন —ডাকিনী বুড়ি তাড়াতাড়ি চলে এল । রানী বললেন— এস ভাই, মনের কথা, কেমন আছ? কাছে বোসো। ডাকিনী ব্রাহ্মণী ছোটরানীর পাশে বসে বললে—কেন ভাই ডেকেছ কেন? মুখখানি ভারভার, চোখের কোণে জল, হয়েছে কি? রানী বললেন—হয়েছে আমার মাথা আর মুণ্ডু ! সতীন আবার ঘরে ঢুকেছে, সে সোনার শাড়ি পরেছে, নতুন মহল পেয়েছে, রাজার প্রেয়সী রানী হয়েছে। ভিখারিনী দুওরানী এতদিনে সুওরানীর রানী হয়ে রাজমহল জুড়ে বসেছে! বামুন সই, দেখে অঙ্গ জ্বলে গেল, আমায় বিষ দে খেয়ে মরি, সতিনের এই আদর প্রাণে সয় না। ব্রাহ্মণী বললে—ছি ! ছি ! সই । ও কথা কি  মুখে আনে ! কোন্‌ দুঃখে বিষ খাবে ? দুওরানী আজ রানী হয়েছে, কাল ভিখারিনী হবে, তুমি যেমন সুওরানী তেমনি থাকবে ।

সুওরানী বললেন—না ভাই, বাঁচতে আর সাধ নেই । আজ বাদে  কাল দুওরানীর ছেলে হবে, সে ছেলে রাজ্য পাবে ! লোকে বলবে, আহা, দুওরানী রত্নগর্ভা, রাজার মা হল ! আর দেখ না, পোড়ামুখী সুওরানী মহারাজার সুওরানী হল, তবু রাজার কোলে দিতে ছেলে পেলে না ! ছি ! ছি ! অমন অভাগীর মুখ দেখে না, নাম করলে সারা দিন উপোস যায় । ভাই, এ গঞ্জনা প্রাণে সবে না । তুই বিষ দে, হয় আমি খাই, নয়তো সতীনকে খাওয়াই

ব্রাহ্মণী বললে—চুপ কর রানী, কে কোন্‌দিকে শুনতে পাবে ! ভাবনা কি ? চুপি চুপি বিষ এনে দেব, দুওরানীকে খেতে দিও । এখন বিদায় দাও, বিষের সন্ধানে যাই।

রানী বললেন—যাও ভাই। কিন্তু দেখো, বিষ যেন আসল হয়, খেতে-না-খেতে বড়রানী ঘুরে পড়বে ।

ডাকিনী বললে— ভয় নেই গো, ভয় নেই ! আজ বাদে কাল বড়রানীকে বিষ খাওয়াব, জন্মের মতো মা হবার সাধ ঘোচাব, তুমি নির্ভয়ে থাক ।

ডাকিনী বিষের সন্ধানে গেল । বনে বনে খুঁজে-খুঁজে ভর-সন্ধ্যাবেলা ঝোপের আড়ালে ঘুমন্ত সাপকে মন্ত্রে বশ করে, তার মুখ থেকে কালকূট বিষ এনে দিল ।

ছোটরানী সেই বিষে মুগের নাড়ু, ক্ষীরের ছাঁচ, মতিচুর মেঠাই গড়লেন । একখানা থালা সাজিয়ে ডাকিনী ব্রাহ্মণীকে বললেন–ভাই এক কাজ কর, এই বিষের নাড়ু বড়রানীকে বেচে আয় ।

ব্রাহ্মণী থালা হাতে বড়রানীর নতুন মহলে গেল ।

বড়রানী বললেন—আয় লো আয়, এতদিন কোথায় ছিলি? দুওরানী বলে কি ভুলে থাকতে হয়?

ডাকিনী বললে—সে কি গো ! তোমাদের খাই, তোমাদের পরি, তোমাদের কি ভুলভে পারি ? এই দেখ, তোমার জন্যে যতন করে মুগের নাড়ু, ক্ষীরের ছাঁচ, মতিচুর মেঠাই এনেছি ।

রানী দেখলেন, বুড়ি বাহ্মণী বড় যত্ন করে, থালা সাজিয়ে সামগ্রী এনেছে । খুশি হয়ে তার দুহাতে দুমুঠো মোহর দিয়ে বিদায় করলেন, ব্রাহ্মণী হাসতে-হাসতে চলে গেল ।

রানী ক্ষীরের ছাঁচ ভেঙে খেলেন, জিবের স্বাদ গেল । মুগের নাড়ু  মুখে দিলেন, গলা কাঠ হল । মতিচুর মেঠাই খেলেন, বুক যেন জ্বলে গেল । বানরকে ডেকে বললেন—ব্রাহ্মণী আমায় কি খাওয়ালে ! গা-কেমন করছে, বুঝি আর বাঁচব না।

বানর বললে—চল্‌ মা, খাটে শুবি, অসুখ সারবে ।

রানী উঠে দাড়ালেন, সাপের বিষ মাথায় উঠল । রানী চোখে আঁধার দেখলেন, মাথা টলে গেল, সোনার প্রতিমা সানের উপর ঘুরে পড়লেন।

বানর রানীর মাথা কোলে নিলে, হাত ধরে নাড়ি দেখলে, চোখের পাতা খুলে চোখ দেখলে—রানী অজ্ঞান, অসাড় !

বানর সোনার প্রতিমা বড়রানীকে সোনার খাটে শুইয়ে দিয়ে  ওষুধের সন্ধানে বনে ছুটে গেল । বন থেকে কে জানে কি লতাপাতা, কোন গাছের কি শিকড় এনে নতুন শিলে বেটে বড়রানীকে খাওয়াতে লাগল ।

রাজবাড়িতে খবর গেল—বড়রানী বিষ খেয়েছেন । রাজা  উঠতে-পড়তে রানীর মহলে এলেন । রাজমন্ত্রী ছুটতে ছুটভে সঙ্গে এলেনা রাজবৈদ্য মন্তর আওড়াতে আওড়াতে তারপর এলেন।  তারপর রাজার লোক-লস্কর, দাসী-বাঁদী যে যেখানে ছিল হাজির হল ।  বানর বললে—মহারাজ, এত লোক কেন এনেছ? আমি মাকে  ওষুধ দিয়েছি মা আমার ভালো আছেন, একটু ঘুমোতে দাও । এত লোককে যেতে বল ।

রাজা বিষের নাড়ু পরখ করিয়ে রাজবৈদ্যকে বিদায় করলেন । রাজ্যের ভার দিয়ে রাজমন্ত্রীকে বিদায় করলেন । বড়রানীর মহলে নিজে রইলেন ।

তিন দিন, তিন রাত বড়রানী অজ্ঞান । চার দিনে জ্ঞান হল, বড়রানী  চোখ মেলে চাইলেন। বানর রাজাকে এসে খবর দিলে—মহারাজ, বড়রানী সেরে উঠেছেন, তোমার একটি রাজচক্রবতী ছেলে হয়েছে।

রাজা বানরকে হীরের হার খুলে   বললেন –

চল বানর,  বড়রানীকে আর বড়রানীর ছেলেকে দেখে আসি ।

বানর বললে—মহারাজ, গণনা করেছি ছেলের মুখ এখন দেখলে  তোমার চক্ষু অন্ধ হবে। ছেলের বিয়ে হলে মুখ দেখো, এখন  বড়রানীকে দেখে এস ছোটরানী কি দুর্দশা করেছে। রাজা দেখলেন – বিষের জ্বালায় বড়রানীর সোনার অঙ্গ কালি হয়ে গেছে, পাতখানার মত পড়ে আছেন, রানীকে আর চেনা যায় না ।রাজা রাজবাড়িতে এসে ছোট রাণীকে প্রহরী খানায় বন্ধ করলেন, আর ডাকিনী বুড়িকে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে,উলটো গাধায় চড়িয়ে দেশের বার করে দিলেন ।  তারপর হুকুম দিলেন—মন্ত্রীবর, আজ বড় শুভদিন, এতদিনে পরে রাজচক্রবর্তী ছেলে পেয়েছি. তুমি পথে-পথে আলো জ্বালাও, ঘরে-ঘরে বাজি পোড়াও, দীন দুঃখী ডেকে রাজভাণ্ডার লুটিয়ে দাও, রাজ্যে যেন একটিও ভিখারী না থাকে । মন্ত্রী রাজার আজ্ঞায় নগরের পথে-পথে আলো দিলেন, ঘরে-ঘরে বাজি  পোড়ালেন, দীন –দু:খীকে রাজভাণ্ডার দিলেন, রাজ্যে জয়-জয়কার হল ।

এমনি করে নিত্য নতুন আমোদে, দেবতার মন্দিরে পূজা দিয়ে, মা কালীর পায়ে বলি দিয়ে দেখতে দেখতে দশ বৎসর কেটে গেল । রাজা বানরকে ডেকে বললেন-দশ বৎসর তো পূর্ণ হল এখন ছেলে দেখাও !

বানর বললে – মহারাজ,আগে ছেলের বৌ ঠিক কর, তারপর তার বিযে দাও, তারপর মুখ দেখ ! এখন ছেলে দেখলে অন্ধ হবে। রাজা বানরের কথায় দেশে বিদেশে ভাট পাঠালেন। কত দেশের কত রাজকন্যার সন্ধান এল, একটিও রাজার মনে ধরল না । শেষে য পাটলী দেশের রাজার ভাট সোনার কৌটোয় সোনার প্রতিমা রাজকন্যার  ছবি নিয়ে  এল! কন্যার অঙ্গের বরণ কাঁচা সোনা, জোড়া-ভুরু – বাঁকাধনু  দুটি চোখ টানা-টানা, দুটি ঠোঁটি হাসি-হাসি, এলিয়ে দিলে মাথার কেশ পায় পড়ে। রাজার সেই কন্যা পছন্দ হল। বানর কে ডেকে বললেন – ছেলের বৌ ঠিক করেছি, কাল শুভ দিন শুভ লগ্নে বিয়ে দিতে যাব। বানর বললে – মহারাজ, কাল সন্ধে বেলা বেহারা দিয়ে বরের পালকি মায়ের দুয়ারে পাঠিয়ে দিও,  বরকে নিয়ে বিয়ে দিতে যাব। রাজা বললেন –

দেখ বাপু, দশ বৎসর তোমার কোথা শুনেছি কাল ছেলে না দেখালে অনর্থ করব।

বানর বললে – মহারাজ, সে ভাবনা নেই। তুমি বেহাই-বাড়ি চলে যাও, আমরা কাল বর নিয়ে যাব। রাজা পাছে রানীর ছেলেকে দেখে ফেলেন, পাছে চক্ষু অন্ধ হয়, সেই ভয় তারাতারি  বেহাই-বাড়ি চলে গেলেন আর বানর নতুন-মহলে বড়রাণীর কাছে গেল।  বড়রাণী ছেলে বিয়ে শুনে অবধি পড়ে পড়ে কাঁদছেন আর ভাবছেন–

download

The monkey then said – King, my mother suffers greatly in her broken room

The door is cracked, there is no straw on the roof and the winter cold comes into the room. My mother has no quilt to keep herself warm nor wood to light a fire and so she shivers all night long.

The king said – That is true. You should have told me! Monkey, bring your mother to the palace, I will give orders for her rooms to be decorated.

The monkey answered – But King, I worry that the younger queen will poison my mother if I bring her here.

The king reassured him, saying – Have no fear. I will keep the queen in the new quarters, with a moat to surround her and guards at the gates, the younger queen will not be able to come near her. That will be for the queen alone and for her deaf mute of a maid and for her pet son, the monkey.

 The monkey said -Then let me go and fetch my mother.

The king said – Minister, go and decorate the new palace.

The minister set thousands of people to work and the new castle was built in a day.

The neglected queen moved from her broken rooms with its ragged quilt and came to the new palace wearing a sari of the finest gold. she sat on a bed of gold, ate from a golden plate, gave alms to the poor and won the hearts of the kingdom. The younger queen seethed in anger.

The witch Brahmani was the chosen companion of the younger queen; her confidante. The queen sent for her – Ask my confidante to come for I have things to tell her. When the queen sent word, the old witch came hobbling as fast as she could.

The queen said to her – Come and sit with me and tell me how you are.

The witch answered – Why have you called for me? Why do you look as if you are about to cry?

The queen muttered – I am at wit’s end! My king has taken the old wife back, she now wears a sari of the finest gold, lives in a new palace and is the king’s darling. Now she sits above me in rank. My dear friend, I seethe in anger, give me some poison so that I can die for I cannot bear this good luck that comes her way.

The witch clucked and said – What kind of talk is that? That sad sack may be queen today but you will soon get your position back.

The evil queen said – No, I do not wish to live any longer. Soon the other queen will have a son and that son will have the kingdom. People will say, look at her, she is a king’s mother. The other one was the king’s favourite but she did not manage to give him a child. Who will want to look upon my ill fated face, or even speak my name for fear of having to go without food the rest of the day. I cannot bear the thought of that. Give me something that either I can take and die or give to the queen and kill her.

The old woman said – Be quiet, for someone might hear you! I will bring you the poison, give it to her. Bid me farewell that I may go and get the poison.

The queen said – Go but make sure that the poison is strong and that the queen falls ill as soon as she takes it.

The old woman said – Never fear! I will give her the poison and make sure her plans to become a mother are thwarted! Never fear!

She went to look for the poison. She wandered in the forests and when it was dark and evening had fallen, she cast a spell on a sleeping snake and stole the poison from its fangs.

The younger queen made sweets with that poison. She laid them out on a platter and called the witch saying – Take these to the queen and sell them to her.

The old woman came with the platter to the new palace.

The queen said – Come, come! Where have you been? Have you forgotten me because I am not favoured?

The witch said – How can that be? I live because of your largesse, how can I forget you? See I have brought some home made sweets for you!

The queen saw that the old woman had brought a few sweets that she had arranged with great care on a platter. She gave her handfuls of gold coins and the woman went away laughing.

The queen then broke a piece off and put it in her mouth but her tongue grew numb. She ate another piece and her throat grew parched. She ate from another and her chest burned as if on fire. She called the monkey and said – What did the old woman give me? I feel so ill, perhaps I am going to die.

The monkey said – Come mother, lie down on the bed, you will feel better.

The queen stood up and the poison rose to her brain. She could not see any longer and as she grew dizzy, she fell down in a dead faint on the stone floor.

The monkey took her head into his lap, checked her pulse, pulled her eyelid to look at the eye and found that she had passed out.

He then placed his beautiful mother on her golden bed and ran to the forest for her cure. He brought stems and roots that he crushed to make a potion that he gave to the queen.

News went to the palace that the queen had taken poison. The king came rushing to her chambers. The minister came. The royal physician came mumbling his spells. Then all the servants and maids and workers cane. The monkey asked the king – Why did you bring all these people? I have given my mother medicines and she is better. All she needs is sleep. Ask all the people to leave.

The king had the physician test the poisoned sweets and then leave. The minister was given charge of the kingdom and the king stayed by the queen’s bedside.

The queen lay in a dead faint for three days and three nights. On the fourth day she came to and opened her eyes. The monkey came and said to the king – The queen is better and now you have a son who will be a king of kings.

The king gave his diamond necklace to the monkey and said – Let us go and see the queen and our son.

The monkey said – King, I have seen it in the stars that you will be blinded if you see your son now. Let him get married first, then see him. Now go and see what the younger queen has done to my mother. The king went and saw how the queen’s skin had turned dark with the poison, she lay like a leaf upon her bed and was barely recognisable. The king returned to his palace and had the younger queen imprisoned and had her confidante shaved, placed on an ass backwards and exiled from the kingdom.

He then ordered his minister – It is a very good day today, we have a prince at long last. Organise lights on every street, fireworks in every household and feed every poor beggar in the kingdom. The minister went and did as the king said and his subjects were thankful for the king’s benevolence.

Ten years passed like this in happiness and entertainment. The king said – It is ten years, now show me my son!

The monkey said – King, first arrange a bride for your son, let the marriage take place and then look upon his face. If you see him now, you will go blind. The king sent messengers to all corners of the world on hearing this. So many kings sent word of their daughters, but the king said no to all of them. At the end, the brother of the king of Patali brought a likeness of their princess concealed in a golden frame. She had skin the colour of molten gold, her eye brows curved like a bow, her eyes were like a deer’s, her mouth was wreathed in smiles and her hair fell to her feet in great waves. The king saw her and sent for the monkey saying – I have found my son a bride. Tomorrow is a good day for a marriage. The monkey answered – King, send a palanquin and men to the queen’s quarter’s tomorrow in the evening, we will go to have him married.

The king said – Look now, I have listened to everything you said for ten years. I will lose my temper if I cannot see my son now that the ten years at an end.

The monkey said – Do not worry about that Great King! You go to the venue today, we will go with the groom tomorrow. The king was so worried that he would go blind if he saw his son that he quickly set out for the kingdom of his new in-laws. The monkey then went to the queen in her new palace where she had been weeping ever since she heard that her son was to be married.

Advertisements

ক্ষীরের পুতুল ৩/ Kheerer Putul 3/ The Milk Doll 3

দুঃখের কথা বলতে-বলতে রানীর চক্ষের জলে বুক ভেসে গেল। তখন সেই বনের বানর রানীর কোলে উঠে বসে,  চোখের জল মুছে দিয়ে রানীকে বললে—মা,তুই কাঁদিস নে। আমি তোর  দুঃখ ঘোচাবো, তোর সাতমহল বাড়ি দেবো, সাতখানা মালঞ্চ দেবো, সাতশো দাসী ফিরে দেবো, তোকে সোনার মন্দিরে রাজার পাশে রানী করে কোলে নিতে সোনারচাঁদ ছেলে দেবো তবে আমার নাম বাঁদর। আমি যা বলি যদি তা করতে পারিস তবে তোর রাজবাড়িতে যেমন ঐশ্বর্য যেমন আদর ছিল তেমনি হবে।

বানরের কথায় রানীর চোখের কোণে জল, ঠোঁটের কোণে হাসি এল। রানী কেঁদে-কেঁদে হেসে বললেন—ওরে বাছা, দেবতার মন্দিরে কত বলি দিয়েছি, তীর্থে-তীর্থে কত না পুজো দিয়েছি, তবু একটি রাজপুত্র কোলে পাইনি। তুই কি তপস্যা করে কোন্‌ দেবতার বরে, বনের বানর হয়ে আমাকে রাজরানী করে রাজপুত্র কোলে এনে দিবি? বাছা থাক্‌, আমার রাজা সুখে থাক্‌, আমার সতীন সুখে থাক্‌, আমার যে দুঃখ সেই দুঃখই থাক্‌, তোর এ অসাধ্য-সাধনে কাজ নেই। রাত হল তুই ঘুম যা।

বানর বললে—না মা,আমার কথা না-শুনলে ঘুম যাব না।

রানী বললেন—ওরে তুই ঘুমো, রাত যে অনেক হল! পুব-পশ্চিমে মেঘ উঠল,আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এল,রাজ্য জুড়ে ঘুম এল,তুই আমার ঘুমো। কাল যা বলবি তাই শুনব,আজ তুই ঘুম যা। ভাঙা ঘরে দ্বার দিয়েছি—ঝড় উঠেছে,ঘরের মাঝে কাঁথা পেতেছি-শীত লেগেছে,তুই দুধের বাছা, আমার কোলে, বুকের কাছে ঘুম যা ।

বানর রানীর বুকে মাথা রেখে ঘুম গেল । রানি ছেঁড়া কাঁথায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন ।

এমনি করে রাত কাটল। ছোটরানীর সোনার পালঙ্কে ফুলের বিছানায়, রাজার পাশে রাত কাটল ; আর বড়রানীর জলে ঝড়ে,ভাঙা ঘরে, ছেঁড়া কাঁথায় রাত কাটল।

সকাল হল । রাজবাড়িতে প্রহরীখানায় প্রহর বাজল, নাকরাখানায় নবৎ বাজল, রাজারানীর ঘুম ভাঙলো।

রাজা সোনার ভৃঙ্গারে স্ফটিকজলে মুখ ধুয়ে, রাজবেশ অঙ্গে পরে রাজ-দরবারে নেবে গেলেন—আর ছোটরানী সোনার পালঙ্কে, ফুলের  বিছানায়, ফুলের পাখায় হাওয়া খেতে খেতে পাশ ফিরে ঘুম গেলেন ।

আর বড়রানী কি করলেন?

ভাঙা ঘরে সোনার রোদ মুখে পড়ল, রানী উঠে বসলেন । এদিক দেখলেন ওদিক দেখলেন, এপাশ দেখলেন ওপাশ দেখলেন—বানর নেই! রানী এ-ঘর খুঁজলেন ওঘর খুঁজলেন,ঘরের চাল খুঁজলেন, গাছের ডাল খুঁজলেন—বানর নেই! বড়রানী কাঁদতে লাগলেন ।

বানর কোথা গেল?

বানর ভাঙা ঘরে ঘুমন্ত রানীকে একলা রেখে রাত না-পোহাতে । রাজ-দরবারে চলে গেল।

রাজা বার দিয়ে দরবারে বসেছেন । চারিদিকে সভাসদ মন্ত্রী, দুয়ারে সিপাই-সান্ত্রী, আশেপাশে লোকের ভিড় । রানীর বানর সেই লোকের ভিড় ঠেলে,সিপাই-সান্ত্রীরর হাত এড়িয়ে, রাজার পায়ে প্রণাম করে বললে—মহারাজ, বড় সুখবর এনেছি, মায়ের আমার ছেলে হবে ।

রাজা বললেন—ওরে বানর বলিস কি ? একথা কি সত্য ? বড়রানী দুওরানী,তার ছেলে হবে ? দেখিস্‌ এ-কথা যদি মিথ্যা হয় তো তোকেও কাটব আর তোর মা দুওরানীকেও কাটব ।

বানর বললে—মহারাজ সে ভাবনা আমার । এখন আমায় খুশি কর, আমি বিদায় হই ।

রাজা গলার গজমোতি হার খুলে দিয়ে  বানরকে বিদায় করলেন ।

বানর নাচতে নাচতে—ভাঙা ঘরে দুওরানী পড়ে-পড়ে কাঁদছেন—সেখানে গেল ।

দুওরানীর চোখের জল, গায়ের ধুলো মুছিয়ে বানর বললে—এই দেখ্‌ মা, তোর জন্যে কি এনেছি ! তুই রাজার রানী, গলায় দিভে হার পাসনে,কাঠের মালা কিনে পরিস, এই মুক্তোর মালা পর !

রানী বানরের হাতে গজমোতি হার দেখে বললেন—এই হার তুই কোথা পেলি ? এ যে রাজার গলার গজমোতি হার ! যখন রানী ছিলুম রাজার জন্যে গেঁথেছিলুম, তুই-এ হার কোথায় পেলি ? বল্‌ বানর, রাজা কি এ-হার ফেলে দিয়েছেন, রাজপথে কুড়িয়ে পেলি ? বানর বললে -না মা, কুড়িয়ে পাইনি । তোর হাতে গাঁথা রাজার গলার গজমোতি হার কুড়িয়ে কি পাওয়া যায়?

রানী বললেন— তবে কি রাজার ঘরে চূরি করলি?

বানর বললে— ছি ছি মা, চুরি কি করতে আছে! আজ রাজাকে সু-খবর দিয়েছি তাই রাজা হার দিয়ে খুশি করেছেন ।

রানী বললেন-ওরে বাছা, তুই যে দুঃখীর সন্তান, বনের বানর । ভাঙা ঘরে দুঃখিনীর কোলে শুয়ে, রাজাকে দিতে কি সুখের সন্ধান পেলিযে  রাত না-পোয়াতে রাজবাড়িতে ছুটে গেলি!

বানর বললে— মা আমি স্বপ্ন পেয়েছি আমার যেন ভাই হয়েছে, তোর কোলে খোকা হয়েছে; সেই খোকা যেন রাজসিংহাসনে রাজা   হয়েছে। তাই ছুটে রাজাকে খবর দিলুম-রাজামহাশয়, মায়ের খোকা হবে। তাইত রাজা খুশি হয়ে গলার হার খুলে দিলেন ।  রানী বললেন— ওরে, রাজা আজ ণ্ডনলেন ছেলে হবে, কাল শুনবেন মিছে কথা ! আজ রাজা গলায় দিতে হার দিলেন, কাল যে মাথা নিতে  হুকুম দেবেন । হায় হায়, কি করলি ? একমুঠো খেতে পাই, একপাশে পড়ে থাকি, তবু বছর গেলে রাজার দেখা পাই, তুই আমার তাও ঘোচালি ? ওরে তুই কি সর্বনাশ করলি ? মিছে খবর কেন রটালি ? এ জঞ্জাল কেন ঘটালি!

বানর বললে— মা তোর  ভয় কি, ভাবিস কেন ? এ দশমাস চুপ করে থাক।  সবাই জানুক— বড় রানীর  ছেলে হবে । তারপর রাজা যখন ছেলে দেখবেন তখন তোর কোলে সোনার চাঁদ  ছেলে দেব, তুই রাজাকে দেখাস। এখন চল বেলা হল , খিদে পেয়েছে।

রানী বললেন— চল্‌ বাছা চল্‌। বাটি পুরে জল রেখেছি, গাছের ফল এনেছি, খাবি চল।

রানী ভাঙা পিঁড়েয় বানর কে খাওয়াতে বসলেন।

আর রাজা ছোটরানীর ঘরে গেলেন।

ছোটরানী কূস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে সোনার পালঙ্কে বসে-বসে ভাবছেন এমন সময় রাজা এসে খবর দিলেন— আরে শুনেছ ছোটরানী, বড়রানীর ছেলে হবে ! বড় ভাবনা ছিল রাজসিংহাসন কাকে দেব, এতদিনে সে ভাবনা ঘুচল ! যদি ছেলে হয় তাকে রাজা করব, আর যদি মেয়ে হয়, তবে তার বিয়ে দিয়ে জামাইকে রাজ্য দেব । রানী, বড় ভাবনা ছিল, এতদিনে নিশ্চিন্ত হলুম ।

রানী বললেন— পারিনে বাপু, আপনার  জ্বালায় বাঁচিনে, পরের ভাবনা !

রাজা বললেন— সে কি রানী? এমন সুখের দিনে এমন কোথা বলতে হয়? রাজপুত্র কোলে পাব, রাজসিংহাসনে রাজা করব, একথা শুনে মুখ-ভার করে? রানী, রাজবাড়িতে সবার মুখে হাসি, তুমি কেন অকল্যাণ কর?

রানী বললেন–

আর পারিনে ! কার ছেলে রাজা হবে, কার মেয়ে রাজ্য পাবে,কে সিংহাসনে বসবে, এত ভাবনা ভাবতে পারিনে। নিজের জালায় মরি, পরের ছেলে মোলো বাঁচল তাঁর খবর রাখিনে। বাবারে, সকাল বেলা বকে বকে ঘুম হল না, মাথা ধরল, যাই নেয়ে আসি।

রাতভরে ছোটরানী আটগাছা চুরি, দশ গাছা মল ছমছমিয়ে একদিকে চলে গেলেন।

রাজার বড় রাগ হল। রাজকুমার কে ছোটরানী মর্‌ বললে। রাজা মুখ আঁধার করে বার-মহলে চলে এলেন। রাজা-রানী তে ঝগড়া হল। রাজা আর ছোটরানীর মুখ দেখলেন না, বররানীর ঘরেও গেলেন না— ছোট রানী শুনে যদি বিষ খাওয়ায়, বররানিকে নয় প্রাণে মারে! রাজা বার-মহলে একলা রইলেন।

একমাস গেল, দুমাস গেল, দু মাস গিয়ে তিন মাস গেল, রাজা-রানীর ভাব হল না।ঝগড়ায়-ঝগড়ায় চার মাস কাটল। পাঁচ মাসে দুওরানির পোষা বানর রাজার সঙ্গে দেখা করলে। রাজা বললেন— কি হে বানর,  খবর কি ?

বানর বললে—মহারাজ, মায়ের বড় দুঃখ !মোটা চালের ভাত মুখে রোচে না, মা আমার না খেয়েকাহিল হলেন।

রাজা বললেন— একথা তো আমি জানিনে । মন্ত্রীবর, যাও এখনি সরু চালের ভাত, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন, সোনার থালে সোনার বাটিতে বড়রানীকে পাঠিয়ে দাও । আজ থেকে আমি যা খাই বড়রানীও তাই খাবেন । যাও মন্ত্রী, বানরকে হাজার মোহর দিয়ে বিদায় কর ।

মন্ত্রী বানরকে বিদায় করে রান্নাঘরে গেলেন । আর রানীর বানর মোহরের তোরা নিয়ে রানীর কাছে এল ।

রানী বললেন – আজ আবার কোথা ছিলি? এতখানি বেলা হল নাইতে পেলুম না,রাঁধব কখন? খাব কখন?

বানর বললে—মা,আর তোকে রাঁধতে হবে না । রাজবাড়ি থেকে সোনার থালায় সোনার  বাটিতে সরু চালের ভাত, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন আসবে, তাড়াতাড়ি নেয়ে আয়।

রানী নাইতে গেলেন । বানর একমুঠো মোহর নিয়ে বাজারে গেল । ষোলো থান মোহরে ষোলজন ঘরামি নিলে, ষোলোগাড়ি খড় নিলে, ষোলশ বাঁশ নিলে। সেই ষোলশ বাঁশ দিয়ে, ষোলোগাড়ি খড় দিয়ে ষোলজন ঘরামি খাটিয়ে, চক্ষের নিমেষে দুওরানীর বানর ভাঙাঘর নতুন করলে। শোবার ঘরে নতুন কাঁথা পাতলে, খাবার ঘরে নতুন পিঁড়ি পাতলে, রাজবাড়ির ষোলো বামুনে রানীর ভাত নিয়ে এল; ষোলো মোহর বিদায় পেলে !

দুওরানী নেয়ে এলেন । এসে দেখলেন—নতুন  ঘর । ঘরের চাল নতুন ! চালের খড় নতুন ! মেঝেয় নতুন কাঁথা ! আলনায় নতুন শাড়ি ! রানী অবাক হলেন । বানর কে বললেন—বাছা, ভাঙা ঘর দেখে ঘাটে গেলুম, এসে দেখি নতুন ঘর ! কেমন করে হল ?

বানর বললে—মা, রাজা-মশায় মোহর দিয়েছেন। সেই মোহরে ভাঙা ঘর নতুন করেছি, ছেঁড়া কাঁথা নতুন করেছি, নতুন পিঁড়ে পেতেছি,  তুই সোনার থালে গরম ভাত; সোনার বাটিতে তপ্ত দুধ খাবি চল্‌।

রানী খেতে বসলেন । কতদিন পরে সোনার থালায় ভাত খেলেন,   সোনার ঘটিতে মুখ ধুলেন, সোনার বাটায় পান খেলেন, তবু মনে সুখ পেলেন না । রানী রাজভোগ খান আর ভাবেন—আজ রাজা সোনার থালে ভাত পাঠালেন, কাল হয়তো মশানে নিয়ে মাথা কাটবেন ।

এমনি করে ভয়ে-ভয়ে এক মাস, দুমাস, তিন মাস গেল । বড়রানীর নতুন ঘর পুরোনো হল, ঘরের চাল ফুটো হল, চালের খড় উড়ে গেল । বানর রাজার সঙ্গে দেখা করলে ।

রাজা বললেন—কি বানর, কি মনে করে ?

বানর বললে—মহারাজ, ভয়ে কবো না নির্ভয়ে কবো ?   রাজা বললেন—নির্ভয়ে কও ।

 

ccf0115201200000small

 

As she spoke of her sadness, the queen wept floods of tears. The monkey from the forest then climbed into her lap, dried her eyes and said to her, ‘Mother, do not cry! I will rid you of your sorrows, give you a seven storied house, seven gardens of your own and seven hundred maids to look after you; I am not a true monkey unless I manage to seat you beside the king in a temple of gold as his queen, with a son like a sliver of the golden moon. If you do all the things I tell you, you will get back all the wealth and affection you once had.

The queen heard what the monkey said and while tears welled in her eyes, her lips curled in a smile. She smiled through her tears and said – My child, I have sacrificed so many things to the gods, and made so many offerings to the holy shrines and I am yet to be blessed with a prince. What prayers will you offer and gain the blessings of which god that you can promise to make me a queen and give me a prince of my own to hold? You, a monkey of the forest? Let it be, my precious! Let my king be happy, let my co-wife be happy, let my sorrows not grow, you do not have to try and accomplish this impossible task! It is late, go to sleep!

The monkey protested – No mother, I will not sleep if you do not listen to me.

The queen said – Go to sleep, for the hour is late! There are clouds in the east and the west, the rain pours down in torrents, the kingdom sleeps and so must you. I will listen to whatever you say tomorrow, today you must sleep. I have closed the door to my broken room against the storm, I have spread my quilt on the floor against the cold, you are just a child, come to my lap; nestle in my breast and go to sleep.

The monkey nestled its head on her breast and slept. The queen rested her head on her faded and torn quilt and went to sleep.

The night passed. For the younger queen, it passed in her golden bed, on a layer of flowers by the side of the king; but the older queen spent her night buffeted by rain and wind in her broken down room, lying on her patched quilt.

Morning broke. The hours were called by the timekeeper in the palace, the flutes played in the musicians’ gallery and the king and queen rose from their slumbers.

The king washed his face in crystal clear water from a golden basin, dressed in his royal robes and descended to the royal court – the younger queen turned on her side on her golden bed on her flower mattress and went back to sleep as her handmaidens fanned her gently with a flowery fan.

What did the elder queen do?

The golden sun fell through the cracks of the wall on her face and she woke up. She looked this way and that; she searched here and there, but the monkey had vanished. She looked in this room and then the other, she looked in the roof and on the branches – there was no monkey! She began to cry.

Where did the monkey go?

The monkey had left the sleeping queen in her broken room and had gone to the court as soon as the night lightened in the east.

The king was sitting in the court surrounded by his courtiers and ministers, guards at the doors. People milled about. The queen’s monkey pushed through the crowd and managed to dodge the guards and soldiers. He threw himself at the king’s feet and said – Great King, I bring such good news! My mother is with child!

The king said – What are you saying! Is this true? The older queen, the sad queen is to have a baby? If you have told me a lie, I will have you both killed!

The monkey answered – That is for me to worry about. Now give me a reward, I have to go.

The king took off his ivory necklace and gave it to the monkey.

The monkey hopped and skipped its way to where the queen was weeping on her torn quilt in her broken room.

It dried her tears and dusted off her body and said – Look at what I have brought you mother! You are a queen and yet you wear beads of wood that you have to buy, now you will wear this!

The queen looked at the ivory beads in the monkey’s hand and said – Where did you get this? This is the king’s. I made it for the king when I was his queen, where did you chance upon this? Tell me you monkey, did the king throw this upon the dusty street? Is that where you found this? The monkey answered – No mother, I did not find this. Why should I find a present you made for the king in the dusty street?

The queen asked – Did you steal it from the king then?

The monkey answered – Shame on you, mother! Why would I steal from anyone? I gave the king such good news that the king gave this to me as a reward.

The queen declared – You are the child of a sad creature, a monkey from the forest. What happy news could you have heard as you lay in my lap that you had to wake up early and go to the palace?

The monkey said – I dreamed that I have a brother, that you have a son; that son will one day be the king of all of this. I ran to tell the king and the king was so happy that he gave me a reward. The queen was frightened – Today you have told him I will have a son, but what of tomorrow when he hears you had lied. Today you have the pearls from his neck but tomorrow he will be chopping off your head. Alas! What have you done! I may eat a handful and be pushed to a corner, but at least I get to see the king once a year and now you have destroyed even that! Why did you do this? Why did you lie? Why did you ruin everything!

The monkey said – Why are you worrying mother? Why are you afraid? Just wait for ten months. Let everyone know that the elder queen is going to have a baby. Then when the king comes to see the baby I will give you a son like a sliver of a golden moon and you can show him. Now let us go and eat, I am hungry.

The queen said – Let us do that. I have water in a bowl and fruits from the tree, come and eat.

She made him sit on a broken plank and served him his food.

The king in the meantime went to his younger queen’s palaces.

The queen had woken up from a nightmare and was thinking about it as she sat on her golden bed when the king arrived and told her – Have you heard, the elder queen is to have a baby! How worried I have been about who would succeed me to the throne, now I am so relieved! If it is a boy, I will make him king and if it is a girl I will make my son-in-law king and give him my kingdom. I was so worried my queen, but finally I feel at rest.

The queen said – I can’t handle this! I have so many issues of my own, and you want me to think of others!

The king said – What! Who says such things on a day as happy as this? I am talking about having a son and making him king and you are sulking? Why are you like this when everyone else is smiling with joy?

The queen said – I just can’t! I cannot think about whose son is to be king, whose daughter is to get the kingdom and who will get the throne. I have enough hassles of my own, who has the time to think about whether another person’s child lives or dies. All this talking is giving me a headache, let me go and have a bath.

She then went away, jangling her eight pairs of bangles and her ten stranded anklets.

The king felt very angry for she had said the baby prince could die for all she cared. He came to the outer chambers with a face like thunder. The two had quarreled; from then on, the king never went to see her or the elder queen. He was worried the younger queen would try to poison the older one if she heard of it. He lived by himself in the outer chambers.

One month passed and then two. Soon three months had passed but the king and the younger queen had not forgiven each other. Four months went thus. In the fifth month the monkey came to see the king who asked – Monkey, what is the news?

The monkey said – My mother is suffering so much! She cannot eat thick rice grains and her health suffers from her not eating a thing for the past few days.

The king declared – What! I knew nothing of this! Minister, go at once and send the finest rice, fifty kinds of accompaniments in golden plates and bowls to the elder queen. From this day on wards, my elder queen eats whatever I eat! Give the monkey a thousand coins before he goes!

The Minister paid the monkey and went to the kitchens. The monkey took the coins to his mother the queen.

The queen asked him – Where were you today? You are so late, I have not had time to bathe and now I will have to go hungry.

The monkey answered – Mother, you will not have to cook for us any more. Soon the royal kitchens will send golden plates full of rice and golden bowls filled with fifty different accompaniments, go and bathe quickly.

The queen went to bathe. The monkey now went to the markets with a fistful of coins. He used sixteen coins to hire sixteen builders, sixteen loads of straw and sixteen hundred bamboo poles. Those were used by the sixteen builders to repair the broken house and to thatch its threadbare roof. He bought new quilts for the bed, a new wooden seat for the dining room and gave sixteen coins to the sixteen Brahmins who brought the queen her food from the royal kitchens.

Duyorani came back from her bath. She saw that the house was repaired, the newly thatched roof had new straw. On the floor lay new mats and quilts; on the line hung new clothes for her. She was astonished and said to the monkey – I went to bathe from an old broken house and now it is all new! How did this happen?

The monkey said – Mother, the king has given me gold coins. I paid for repairs to the room, darning for the quilt, a proper wooden stool; come and eat hot rice from a golden plate and drink warm milk from a golden bowl!

The queen sat down to eat. She ate rice from a golden plate after such a long time, she rinsed her mouth from a golden cup and even ate a mouth freshening pan from a golden container; but she could not feel happy. The queen ate her royal meals and thought – Today I eat from a golden plate, perhaps tomorrow the king will have my head on a platter.

One month passed cautiously, then two and then three. The queen’s new rooms were now old, the new thatch had holes once again and the straw from the roof flew freely here and there. The monkey went to meet the king again.

Hello monkey, what is the news? The king asked.

The monkey said – Can I speak freely or must I watch what I say? The king answered – Speak freely!

ক্ষীরের পুতুল ২: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul 2

Image

 

সন্ধেবেলা সোনার জাহাজ সোনার পাল মেলে অগাধ সাগরের নীল জল কেটে সোনার মেঘের মতো পশ্চিমে মুখে ভেসে গেল।

ভাঙা ঘরে দুওরানী নীল সাগরের পানে চেয়ে,ছেঁড়া কাঁথায় পড়ে রইলেন। আর আদরিনী সুওরানী সাতহল অন্তঃপুরে,সাতশো সখীর  মাঝে,গহনার কথা ভাবতে ভাবতে, সোনার পিঞ্জরে সোনার পাখির গান শুনতে-শুনতে,সোনার পালঙ্কে ঘুমিয়ে পড়লেন।

রাজাও জাহাজে চড়ে দুঃখিনী বড়রানীকে ভুলে গেলেন । বিদায়ের  দিনে ছোটরানীর সেই  হাসি-হাসি মুখ মনে পড়ে আর ভাবেন—এখন রানী কি করছেন ? বোধ হয় চুল বাঁধছেন । এবার রানী কি করছেন? বুঝি রাঙা পায়ে আলতা পরছেন । এবার রানী সাত মালঞ্চে ফুল তুলছেন,এবার বুঝি সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুলে রানী মালা গাঁথছেন আর আমার কথা ভাবছেন । ভাবতে-ভাবতে বুঝি দুই চক্ষে জল এল,মালা আর গাঁথা হল না । .সোনার সুতো, ফূলের সাজি পায়ের  কাছে পড়ে রইল ; বসে বসে সারা  রাত কেটে গেল, রানীর চক্ষে ঘুম  এল না ।

সুওরানী—ছোটরানী রাজার আদরিনী,রাজা তারই কথা ভাবেন ।  আর বড়রানী রাজার জন্যে পাগল,তাঁর কথা একবার মনেও পড়ে না ।

এমনি করে জাহাজে দেশ-বিদেশে রাজার বারো-মাস কেটে গেল।

তেরোমাসে রাজার জাহাজ মানিকের দেশে এল ।

মানিকের দেশে সকলই মানিক । ঘরের দেওয়াল মানিক, ঘাটের  সান্‌ মানিক,পথের কাঁকর মানিক। রাজা সেই মানিকের দেশে সুওরানীর চুড়ি গড়ালেন । আট হাজার মানিকের আটগাছা চুড়ি, পরলে মনে হয় গায়ের রক্ত ফুটে পড়ছে ।

রাজা সেই মানিকের চুড়ি নিয়ে,সোনার দেশে এলেন । সেই সোনার দেশে স্যাকরার দোকানে নিরেট সোনার দশগাছা মল  গড়ালেন । মল জ্বলতে লাগল যেন আণ্ডনের ফিন্‌কি, বাজতে লাগল যেন বীণার ঝঙ্কার—মন্দিরার রিনি-রিনি ।

রাজা মানিকের দেশে মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সোনার মল গড়িয়ে, মুক্তোর রাজ্যে এলেন ।

সে দেশে রাজার বাগানে দুটি পায়রা । তাদের মুক্তোর পা, মানিকের  ঠোঁট, পান্নার গাছে মুক্তোর ফল খেয়ে মুক্তোর ড়িম পাড়ে । দেশের রানী সন্ধ্যাবেলা সেই মুক্তোর মালা গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায়  পরেন, সকাল বেলায় ফেলে দেন ।

দাসীরা সেই বাসি মুক্তোর হার এক জাহাজ রুপো নিয়ে বাজারে  বেচে আসে ।

রাজা এক জাহাজ রুপো দিয়ে সুওরানীর গলায় দিতে সেই মুক্তোর এক ছড়া হার কিনলেন ।

তারপর মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সোনার মল গড়িয়ে,  মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর হার গাঁথিয়ে, ছ’মাস পরে রাজা এক দেশে  এলেন । সে দেশে রাজকন্যের উপবনে নীল মানিকের গাছে নীল  গুটিপোকা নীলকান্ত মণির পাতা খেয়ে,জলের মতো চিকন,বাতাসের মতো ফুরফুরে,আকাশের মতো নীল রেশমের গুটি বাঁধে । রাজার মেয়ে সারা রাত ছাদে বসে,আকাশের সঙ্গে রঙ  মিলিয়ে, সেই নীল রেশমের শাড়ি বোনেন । একখানি শাড়ি বুনতে ছ’মাস যায় । রাজকন্যে একটি দিন সেই আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন শাড়ি পরে  শিবের মন্দিরে মহাদেব নীলকণ্ঠের পূজা করেন। ঘরে এসে শাড়ি ছেড়ে দেন,দাসীরা যার কাছে সাত জাহাজ সোনা পায় তার কাছে শারি বেচে। রাজা সাত জাহাজ সোনা দিয়ে আদরিনী সুওরানীর শখের শাড়ি কিনে নিলেন ।

তারপর আর ছ’মাসে রাজার সাতখানা জাহাজ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে  ছোটোরানীর মানিকের চুড়ি, সোনার মল, মুক্তোর মালা, সাধের শাড়ি নিয়ে দেশে এল। তখন রাজার মনে পড়ল বড়রানী বাঁদর চেয়েছেন।

রাজা মন্ত্রীকে বললেন—মন্ত্রীবর,বড় ভুল হয়েছে। বড়রানীর বাঁদর আনা হযনি, তুমি একটা বাদরের সন্ধানে যাও

রাজমন্ত্রী একটা বাঁদরের সন্ধানে চলে গেলেন। আর রাজা শ্বেতহস্তী চড়ে, লোকারণ্য রাজপথ দিয়ে, ছোটরানীর সাধের গহনা, শখের শাড়ি নিয়ে অন্তঃপুরে চলে গেলেন।

ছোটোরানী সাত-মহল বাড়ির সাত-তলার উপরে সোনার আয়না সামনে রেখে সোনার কাঁকুইয়ে চুল চিরে, সোনার কাঁটা সোনার দরি দিয়ে খোঁপা বেঁধে সোনার চিয়াড়িতে সিঁদুর নিয়ে ভুরুর মাঝে টিপ পরছেন, কাজল-লতায় কাজল পেড়ে চোখের পাতায় কাজল পরছেন, রাঙা পায়ে আলতা দিচ্ছেন, সখীরা ফুলের থালা নিয়ে,পানের বাটা নিয়ে রাজরানী ছোটোরানীর  সেবা করছে—রাজা সেখানে এলেন।

স্ফটিকের সিংহাসনে রানীর পাশে বসে বললেন—এই নাও, রানী! মানিকের  দেশে মানিকের  ঘাট,মানিকের বাট—সেখান থেকে হাতের চুড়ি এনেছি। সোনার  দেশে সোনার ধুলো, সোনার বালি—সেখান থেকে পায়ের মল এনেছি । মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর পা, মানিকের ঠোঁট, দুটি পাখি মুক্তোর ডিম পাড়ে । দেশের রানী সেই  মুক্তোর হার গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায় পরেন, ভোরের বেলায় ফেলে দেন । রানী, তোমার জন্যে সেই মুক্তোর হার এনেছি। রানী, এক দেশে রাজার  মেয়ে এক-খী রেশমে সাত-খী সুতো কেটে নিশুতি রাতে ছাদে বসে  ছ’টি মাসে একখানি শাড়ি বোনেন, এক দিন পরে পূজো করেন, ঘরে  এসে ছেড়ে দেন । রানী, আমি সেই রাজার মেয়ের দেশ থেকে সাত  জাহাজ সোনা দিয়ে রাজকন্যার হাতে বোনা শাড়ি এনেছি। তুমি  একবার চেয়ে দেখ ! পৃথিবী খুজে গায়ের গহনা, পরনের শাড়ি আনলুম, একবার পরে দেখ !

রানী -তখন দু’হাতে আটগাছা চুড়ি পরলেন; মানিকের চুড়ি রানীর হাতে  ঢিলে হল, হাতের চুড়ি  কাধে উঠল।

রানী তখন দু’পায়ে দশ-গাছা মল পরলেন; রাঙা পায়ে সোনার মল আল্‌গা হল; দু-পা যেতে দশ-গাছা মল সানের উপর  খসে পড়ল। রানী  মুখ ভার করে  মুক্তোর  হার গলায় পরলেন ; মুক্তোর  দেশের মুক্তোর হার রানীর গলায় খাটো হল, হার পরতে গলার মাস কেটে গেল।  রানী  ব্যথা পেলেন !

সাত-পুরু করে শখের শাড়ি অঙ্গে পরলেন ; নীল রেশমের নীল  শাড়ি হাতে-বহরে কম পড়ল। রানীর চোখে জল এল ।

তখন মানিনী  ছোটরানী আট-হাজার মানিকের আট-গাছা চুড়ি খুলে  ফেলে, নিরেট সোনার দশ-গাছা মল পায়ে ঠেলে, মুক্তোর  মালা,শখের শাড়ি ধুলোয় ফেলে, বললেন—ছাই গহণা ! ছাই  এ-শাড়ি ! কোন পথের কাঁকর কুড়িয়ে এ-চুড়ি গড়ালে ? মহারাজ, কোন দেশের ধুলো বালিতে এ-মল গড়ালে ? ছি ছি, এ কার বাসি মুক্তোর বাসি হার ! এ কোন রাজকন্যার পরা শাড়ি! দেখলে যে ঘৃণা আসে, পরতে যে লজ্জা হয় ! নিয়ে যাও মহারাজ,এ পরা-শাড়ি পরা-গহণায় আমার কাজ নেই ।

রানী অভিমানে গোসা-ঘরে খিল দিলেন । আর রাজা মলিন-মুখে সাত জাহাজ সোনা দিয়ে কেনা সেই সাধের গহনা,শখের শাড়ি নিয়ে রাজসভায় এলেন ।

রাজমন্ত্রী রাজসিংহাসনের এক পাশে, রাজ্যের মাঠ-ঘাট দোকান-পাট সন্ধান করে, যাদুকরের দেশের এক বণিকের জাহাজ থেকে কানা-কড়ি দিয়ে একটি বাঁদরছানা কিনে বসে আছেন ।

রাজা এসে বললেন—মন্ত্রীবর, আশ্চর্য হলুম ! মাপ দিয়ে ছোটরানীর  গায়ের গহনা,পরনের শাড়ি  আনলুম, সে-শাড়ি, সে-গহনা রানীর গায়ে  হল না !

তখন সেই বনের বানর রাজার পায়ে প্রণাম করে বললে—বড় ভাগ্যবতী পুণ্যবতী না হলে দেবকন্যের হাতে বোনা,নাগকন্যের হাতে গাঁথা, মায়া-রাজ্যের এ  মায়া-গহনা, মায়া-শাড়ি পরতে পারে না । মহারাজ, রাজভাণ্ডারে তুলে রাখ, যাকে বৌ করবে তাকে পরতে দিও ।

বানরের কথায় রাজা অবাক হলেন । হাসতে হাসতে মন্ত্রীকে বললেন—মন্ত্রী, বানরটা বলে কি? ছেলেই হল না বৌ আনব কেমন করে ? মন্ত্রী, তুমি স্যাকরার দোকানে ছোটরানীর নতুন গহনা গড়তে দাওগে, তাঁতির তাঁতে রানীর নতুন শাড়ি বুনতে দাওগে। এ-গহনা, এ-শাড়ি রাজভাণ্ডারে তুলে রাখ; যদি বৌ ঘরে আনি তাকে পরতে দেব।

রাজমন্ত্রী স্যাকরার দোকানে ছোটরানীর নতুন গহনা গড়াতে গেলেন । আর রাজা সেই বাঁদর-কোলে বড়রানীর কাছে গেলেন ।

দুঃখিনী বড়রানী, জীর্ণ আঁচলে পা মুছিয়ে,ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় রাজাকে  বসতে দিয়ে কাদঁতে-কাদঁতে বললেন—মহারাজ, বোসো। আমার এই ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বোসো । আমার আর কি আছে তোমায় বসতে দেব ? হায়,মহারাজ,কতদিন পরে তুমি ফিরে এলে,আমি এমনি অভাগিনী তোমার জন্যে ছেঁড়া কাঁথা পেতে দিলুম ।

রানীর কথায় রাজার চোখে জল এল । ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বসে বড়রানীর কোলে বাঁদর-ছানা দিয়ে বললেন—মহারানী, তোমার এ ছেঁড়া কাঁথা ভাঙা ঘর, ছোটরানীর সোনার সিংহাসন, সোনার ঘরের চেয়ে লক্ষ গুণে ভালো । তোমার এ-ভাঙা ঘরে আদর আছে, যত্ন আছে, দুটো মিষ্টি কথা  আছে, সেখানে তা তো  নেই।  রানী,সাত জাহাজ সোনা দিয়ে গায়ের গহনা, পরনে শাড়ী দিয়েছি, ছোটরানী পায়ে ঠেলেছে; আর কানা-কড়ি দিয়ে তোমার বাঁদর এনেছি, তুমি আদর করে কোলে নিয়েছ । রানী, আমি আর তোমায় দুঃখ দেব না । এখন  বিদায় দাও, আমি আবার আসব রানী ! কিন্তু দেখো, ছোটরানী যেন জানতে না পারে ! তোমার কাছে এসেছি শুনলে আর রক্ষে রাখবে না !  হয় তোমায়, নয়তো আমায় বিষ খাওয়াবে ।

রাজা বড়রানীকে প্রবোধ দিয়ে চলে গেলেন । আর বড়রানী সেই ভাঙা ঘরে দুধ-কলা দিয়ে সেই বাঁদরেরর ছানা মানুষ করতে লাগলেন।

এমনি করে দিন যায়। ছোটরানীর সাতমহলে সাতশ দাসীর মাঝে দিন যায়; আর বড়রানীর  ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় বাঁদর-কোলে দিন যায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে গেল! বড়রানীর যে দুঃখ সেই দুঃখই রইল, মোটা চালের ভাত, মোটা সুতোর শাড়ি আর ঘুচলো না। বড়রানী সেই ভাঙা ঘরের দুঃখের দুখী, সাথের সাথী বনের বানরকে কোলে নিয়ে ছোটরানীর সাতমহল বাড়ি,সাতখানা ফুলেরবাগানের দিকে চেয়ে চেয়ে কাঁদেন। বানর বড়রানীকে যখন দেখে তখনই রানীর চোখে জল,একটি দিন হাসতে দেখেনা।

একদিন বানর বললে—হ্যাঁ মা,তুই কাদিস কেন? তোর কিসের দুঃখ ? রাজবাড়ির দিকে চেয়ে চেয়ে কেন কাঁদিস, মা ? ওখানে তোর কে আছে?

রানী বললেন—ওরে বাছা,ওখানে আমার সব আছে আমা্র সাতমহল বাড়ি আছে,সাতশ দাসী আছে,সাতসিন্দুক গহনা আছে, সাতখানা মালঞ্চ আছে। আর বাছা, ওই সাতমহল বাড়িতে রাজার ছোটোরানী আমার এক সতীন আছে। সেই রাক্ষসী আমার রাজাকে জাদু করে আমার সাতমহল বাড়ি, সাতশ দাসী, সাত সিন্দুক গহনা কেড়ে নিয়ে ওই ফুলের মালঞ্চে সোনার মন্দিরে সুখে আছে; আমার সর্বস্বধন রাজাকে নিয়ে আমায় পথের কাঙ্গালিনী করেছে। ওরে বাছা, আমার কিসের দুঃখ! আমি রাজার মেয়ে ছিলুম, রাজার বৌ হলুম, সাতশ দাসী পেলুম, সাতমহল বাড়ি পেলুম, মনের মত রাজস্বামী পেলুম। সব পেলুম তবু কে জানে কার অভিশাপে, চিরদিনে পেলুম না কেবল রাজার কোলে দিতে সোনার চাঁদ রাজপুত্র! হায়, কতজন্মে কত পাপ করেছি, কত লোকের কত সাধে বাধ সেধেছি, কত মায়ের প্রাণে ব্যথা দিয়েছি, তাই এজন্মে সোনার সংসার সতীনকে দিয়ে, রানীর গরবে, স্বামীর সোহাগে, রাজপুত্রের আশায় ছাই দিয়ে পথের কাঙ্গালিনী হয়েছি! বাছারে, বড় পাষাণী তাই এতদিন এত অপমান, এত যন্ত্রণা বুকে সয়ে বেঁচে আছি!

 

***

 

The golden ship unfurled its golden sails and sailed across the endless blue waters of the sea towards the west like a golden cloud.

The Duorani lay on her tattered bed in her broken down room and gazed towards the blue sea. The beloved Shuyorani fell asleep on her golden bed, listening to the golden plumed song birds in their golden cages as she thought of the jewellery she would soon have and her seven hundred hand maidens sat about her.

The king too forgot his sorrowful elder queen as soon as he boarded the ship. All he remembered was the smiling face of the younger queen on the day he had left her.  He thought of her all day; what was she doing then? Perhaps she was doing her hair. What was she doing now? She must have been colouring the soles of her feet; now she must be collecting flowers now from the seven gardens to make garlands from seven baskets filled with blooms while she thinks of me. As she remembers me, her eyes well with tears and the garlands never get made. The golden thread and the basket lie at her feet; she sits there sleepless with worry.

The young Shuyorani is his one love, he only thinks of her. He never once remembers the older queen, the one who is madly in love with him.

The king spent twelve months at sea roaming various lands.

In the thirteenth month the king came to the land of the rubies.

In the land of rubies everything was made of that precious stone. The walls were made of stones as were the steps by the river and the gravel on the streets. The king had bracelets made for his younger queen. The eight thousand stones on her eight bracelets glowed red like droplets of blood on skin.

With the bracelets of rubies, he journeyed to the land of gold. He bought ten pairs of solid gold anklets from the gold smiths of the land. The anklets shone like molten fires, they rang against each other like the tinkling of cymbals and the flourish of veenas.

After he had bought the ruby bracelets from the land of rubies and the golden anklets from the land of gold his ship arrived in the land of pearls.

The king of the land had two pigeons in his gardens. They had feet of pearl and beaks of rubies with which they plucked pearl fruit from emerald trees and laid pearl eggs. His queen made garlands in the evening from those eggs, dressed her hair with them at night and threw them away each day at dawn.

Her maids took those cast offs to sell them at the markets for a ship filled with silver.

Our king bought one of those necklaces with a ship’s cargo of silver for the slender throat of Shuyorani.

Six months after he had bought the bracelets of rubies, the anklets of gold and the necklace of pearls, the king arrived in a new land. In the pleasure gardens of the princess of that land, blue silkworms grew upon sapphire trees. They fed on blue leaves and wove cocoons of blue silk that was as silky as water, as light as the air and as blue as the sky. The princess sat upon her roof all night and wove a blue sari to match the colour of the sky above her. Each sari took her six months. The princess wore the sari which was as silky as water, as light as the air and blue as the sky on the day that she worshipped at the temple of the blue throated god Lord Shiva. When she came home from the temple she discarded the sari on the floor and her handmaidens sold it to anyone who could pay them with seven ships filled with gold. Our king bought this sari for his beloved with seven ships worth of gold.

Six more months passed after that and then the seven ships traversed the seven seas and the thirteen rivers and came back to his own country with rubies for the queen’s arms, gold for her ankles, pearls for her neck and a sari as blue as the sky for her form. Now the king remembered that Duorani had asked for a monkey.

The kind said to his minister, ‘There has been a mistake. I do not have the monkey that the older queen wanted; you must go and look for one.’

The minister went off in search of a monkey. The king rode on a white elephant along streets filled with cheering subjects and went to the palace with all the jewellery and the sari for the younger queen.

She was sitting in the palace with the seven floors, on the seventh floor. She had a golden mirror before her and she combed her hair with a golden comb, tied it with golden cords and fixed it with pins of gold before using a golden nib to paint a dot between her eyebrows. She then drew kohl lines on her eyes, applied red dye to her feet and allowed her handmaidens to tend to her with flowers and trays of mouth freshener. The king came to see her there.

He sat by his queen on a crystal throne and said, ‘Here is what you asked for, my queen! In the land of rubies, the very steps are made of rubies! From there I have brought you bracelets for your arms. In the land of gold the very dust is made of gold! From there I brought you anklets for your feet. In the land of pearls the pigeons with feet of pearls and beaks of rubies lay eggs of pearl. The queen makes necklaces from them, wears them at night and throws them away at dawn. From there I bought them for you. In another country the princess weaves seven measures of silken thread from one measure of silk and sits up at night for six months to make herself a sari. She wears this for a day and never touches it again. I bought that sari for seven ships filled with the yellowest gold, so that you might have it. Here it is! I have roamed the world to bring you jewels for your throat and silk for your skin, wear them once, for me.

The queen then pulled the eight bracelets over her hands but the rubies hung limply against her arms and the bangles rode all the way to her shoulders.

She drew the anklets on to her feet but they were loose about her ankles; as she walked but two paces, they fell off her feet with a clanging sound. She sullenly fastened the pearl necklace around her throat; but the pearls from the land of pearls were too tight around her neck and cut into her flesh, hurting her.

She wore the sari after wrapping it around herself seven times but the blue silk sari was too short for her. Tears welled in her eyes.

The petulant young queen then pulled off the bracelets with their eight thousand rubies, the solid gold anklets, the pearls about her throat and the treasured sari! She said – Fie on these jewels, this sari! Where did you get the pebbles to make these bracelets? Where did you gather the dust to make these anklets? Shame on you for bringing me someone else’s cast off pearls! I hate the sight of this used sari, I am ashamed to wear them all! Take these away king, for I have no use for these old things!

The queen then locked herself in her chamber of anger and sulked. The king grew sombre and brought the sari and the jewels he had bought with seven ships filled with gold to his court.

The minister sat waiting by the king’s throne with a baby monkey that he had bought from a merchant from the land of magic for just a coin.

The king said to his minister, ‘How strange, minister that the things I had made for my younger queen do not fit her!’

The wild monkey then paid his respects to the king and said – Only the very fortunate are allowed to wear what the daughters of gods and snakes weave and make for themselves; these jewels and saris from the lands of make-believe. Put these away in the royal treasury, give them to your daughter-in-law when she comes into the family.

The king was astonished at the monkey’s words. He laughed and said to the minister, ‘What is this monkey saying? I do not even have a son yet! How will I greet a granddaughter-in-law? Go and order new jewels for the younger queen and new saris from the weavers. Put these jewels and clothes away in the royal treasuries for now; if there is ever a daughter-in-law in this house, she will have all these.’

The minister went to the goldsmith to order new jewels for the young queen. The king went to the older queen with the monkey she had wished for.

The unfortunate queen wiped his feet with the end of her threadbare sari, and made the king sit on a tattered mat in her broken room. She wept and said, ‘Sit down, my king. This is all I have to give you as a seat after all these days of absence. How miserable am I!’

The king’s eyes filled with tears when he heard her words. He gave her the monkey child as he sat in her broken room upon her tattered quilt. He said, ‘My queen, your tattered rags and broken doors are a million times better than the other queen’s thrones and rooms of gold. There is kindness and compassion here, there are sweet words to be heard; she has none of that. She kicks away the jewels I bought and the  sari I gave her. Yet, you are embracing the monkey I gave you which did not cost anywhere near that amount. I will not be the cause of your sorrow any more. Bid me farewell, I will return to you again, my queen. But beware, let not the young queen hear of this. She will not rest if she hears of this; she will either poison you and kill me.

The king went away after consoling the queen. She continued to live in her broken room raising the monkey on milk and bananas.

The days passed, as days always do. The younger queen spent her days in the palace with the seven floors surrounded by seven hundred hand maidens; while the older queen lay on a tattered rag in her broke down room, hugging a monkey to her bosom. Days became months and months turned into years. The older queen’s plight did not change; she had coarse rice to eat and coarse clothes to wear. She lay on her broken room, clutched her only companion the monkey to her breast and wept as she looked at the palace and its seven gardens. The monkey always saw her with tears in her eyes.

One day it asked, ‘Mother why do you cry? Why do you cry as you look at the palace? Whom have you lost there?’

The queen said, ‘Child, I have everything there. I have a house with seven floors, seven hundred hand maidens to serve my every need, seven chests filled with jewels and seven gardens to wander in. But in that seven floored palace lives my rival, the younger queen. That witch has cast a spell on my king and taken my house, my maids and my jewels from me; she lives happily in my gardens while I live in poverty. Dear child, what sorrow do I have! I was a king’s daughter, I became a king’s wife with seven hundred handmaidens and a seven floored palace; my husband was what I had dreamed of. I had everything but some curse meant that I could never give the king the heir he desired; a prince as precious as burnished gold! I must have sinned so much, been in the way of so many wishes being fulfilled, hurt so many mothers’ feelings and that is why I have to see my position taken by a usurper who has my all; while I taste only the ashes of disappointment after losing my king and kingdom and with it all hopes of giving him a prince. My child, I am so stony hearted that such ignominy and pain has not been able destroy me.’

 

 

 

ক্ষীরের পুতুল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul, Abanindranath Thakur

ক্ষীরের পুতুল

এক রাজার দুই রানী দুও আর সুও। রাজবাড়িতে সুওরানীর বড় আদর, বড় যত্ন। সুওরানী সাতমহল বাড়িতে থাকেন। সাতশো দাসী তাঁর সেবা করে,পা ধোয়ায়, আলতা পরায়, চুল বাঁধে । সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুল, সেই ফুলে সুওরানী মালা গাঁথেন । সাত সিন্দুকে-ভরা সাত-রাজার-ধন মানিকের গহনা, সেই গহনা অঙ্গে পরেন। সুওরানী রাজার প্রাণ !

আর দুওরানী– বড়োরাণী, তাঁর বড়ো অনাদর, অযত্ন। রাজা বিষ নয়নে দেখেন। একখানি ঘর দিয়েছেন– ভাঙাচোরা ।এক দাসী দিয়েছেন– বোবা-কালা । পরতে দিয়েছেন জীর্ণ শাড়ি, শুতে দিয়েছেন ছেঁড়া কাঁথা। দুওরানীর ঘরে রাজা একটি দিন আসেন একবার বসেন, একটি কথা কয়ে উঠে যান।
সুওরানী—ছোটোরানী, তাঁরই ঘরে রাজা বারোমাস থাকেন ।

একদিন রাজা রাজমন্ত্রীকে ডেকে বললেন–মন্ত্রী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তুমি জাহাজ সাজাও। রাজার আজ্ঞায় রাজমন্ত্রী জাহাজ সাজাতে গেলেন । সাতখানা জাহাজ সাজাতে সাত মাস হয়ে গেল। ছ’খানা জাহাজে রাজার চাকর-বাকর যাবে, আর সোনার চাঁদোয়া-ঢাকা সোনার জাহাজে রাজা নিজে যাবেন। মন্ত্রী এসে খবর দিলেন—মহারাজ জাহাজ প্রস্তুত।

রাজা বললেন— কাল যাব।
মন্ত্রী ঘরে গেলেন।

ছোটো রানী — সুওরানী রাজ-অন্তঃপুরে সোনার পালঙ্কে শুয়েছিলেন, সাত সখী সেবা করছিল, রাজা সেখানে গেলেন। সোনার পালঙ্কে মাথার শিয়রে বসে আদরের ছোটোরানীকে বললেন—রানী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তোমার জন্য কী আনব ?

রানী ননীর হাতে হীরের চুড়ি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বললেন,—হীরের রঙ বড়ো শাদা, হাত যেন শুধু দেখায় । রক্তের মতো রাঙা আট-আট গাছা মানিকের চুড়ি পাই তো পরি।
রাজা বললেন—আচ্ছা রানী, মানিকের দেশ খেকে মানিকের চুড়ি আনব ।

রানী রাঙা-পা নাচিয়ে-নাচিয়ে, পায়ের নূপুর বাজিয়ে-বাজিয়ে বললেন—এ নূপুর ভালো বাজে না । আগুনের বরন নিরেট সোনার দশ গাছা মল পাই তো পরি।
রাজা বললেন—সোনার দেশ থেকে তোমার পায়ের সোনার মল আনব ।

রানী গলার গজমতি হার দেখিয়ে বললেন—দেখ রাজা, এ মুক্তো বড়ো ছোটো, শুনেছি কোন দেশে পায়রার ডিমের মতো মুক্ত আছে, তারি এক ছড়া হার এনো । রাজা বললেন—সাগরের মাঝে মুক্তোর রাজ্য, সেখান থেকে গলার হার আনব । আর কী আনব রানী ?

তখন আদরিনী সুওরানী সোনার অঙ্গে সোনার আঁচল টেনে বললেন— মা গো, শাড়ি নয় তো বোঝা ! আকাশের মতো নীল, বাতাসের মতো ফুরফুরে, জলের মতো চিকন শাড়ি পাই তো পরে বাঁচি।

রাজা বললেন—আহা, আহা, তাই তো রানী, সোনার আঁচলে সোনার অঙ্গে ছড় লেগেছে, ননীর দেহে ব্যথা বেজেছে। রানী হাসি মুখে বিদায় দাও, আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন শাড়ি আনিগে।
ছোট রানী হাসি মুখে রাজাকে বিদায় করলেন।
রাজা বিদায় হয়ে জাহাজে চড়বেন— মনে পড়ল দুঃখিনী বড়োরানীকে। দুওরানী—বড়োরাণী ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কাঁদছেন, রাজা সেখানে এলেন । ভাঙা ঘরের ভাঙা দুয়ারে দাড়িয়ে বললেন- বড়োরাণী, আমি বিদেশ যাব । ছোটোরানীর জন্য হাতের বালা, গলার মালা, পায়ের মল, পরনের শাড়ি আনব। তোমার জন্যে কী আনব? বলে দাও যদি কিছু সাধ থাকে।

রানী বললেন—মহারাজ, ভালোয় ভালোয় তুমি ঘরে এলেই আমার সকল সাধ পূর্ণ হয় । তুমি যখন আমার ছিলে তখন আমার সোহাগও অনেক ছিল, সাধও অনেক ছিল। সোনার শাড়ি অঙ্গে পড়ে সাতমহল বাড়িতে হাজার হাজার আলো জ্বালিয়ে সাতশো সখীর মাঝে রানী হয়ে বসবার সাধ ছিল, সোনার পিঞ্জরে শুক-শারীর পায়ে সোনার নূপুর পড়িয়ে দেবার সাধ ছিল। মহারাজ, অনেক সাধ ছিল। অনেক সাধ মিটেছে। এখন আর সোনার গহনায়, সোনার শাড়িতে কি কাজ ? মহারাজ, আমি কার সোহাগে হীরের বালা হাতে পরব ? মোতির মালা গলায় দেব ? মানিকের সিঁথি মাথায় বাঁধব ? মহারাজ, সেদিন কি আর আছে ! তুমি সোনার গহনা দেবে, সে সোহাগ তো ফিরে দেবে না! আমার সে সাতশো দাসী সাতমহল বাড়ি তো ফিরে দেবে না! বনের পাখি এনে দেবে, কিন্তু মহারাজ, সোনার খাঁচা তো দেবে না! ভাঙা ঘরে সোনার গহনা চোর-ডাকাতে লুটে নেবে, ভাঙা খাঁচায় বনের পাখি কেন ধরা দেবে? মহারাজ, তুমি যাও, যাকে সোহাগ দিয়েছ তার সাধ মেটাও গে, ছাই সাধে আমার কাজ নেই।
রাজা বললেন— না রানী, তা হবে না, লোকে শুনলে নিন্দে করবে। বল তোমার কি সাধ? রানী বললেন— কোন লাজে গহনার কথা মুখে আনব? মহারাজ আমার জন্য পোড়ামুখ একটা বাঁদর এনো।
রাজা বললেন — আচ্ছা রানী, বিদায় দাও।
তখন বড়রানী — দুয়োরানী ছেঁড়া কাঁথায় লুটীয়ে পড়ে কাঁদতে-কাঁদতে রাজা গিয়ে জাহাজে চড়লেন।

1393157873

Kheerer Putul

There was once a king who had two queens, Duyo, the sad queen and Shuyo, the happy queen. Shuyorani lives in the palace surrounded by much love and great comfort. Shuyorani lives in the palace with the seven floors. Seven hundred maids look after her every need, they wash her feet and paint them with red dye and do her hair. Shuyorani makes garlands from flowers she selects from seven baskets filled from seven gardens. She wears the jewels that the king has chosen from the treasures of the seven kings and stored in seven great chests. Shuyorani is the queen of the king’s heart.

Duyorani is the older of the queens, but she lives in great neglect. The king hates her. He has given her one room to stay in but it is falling to pieces. For her, he has hired one maid but she is both deaf and mute. He has given her an old sari to wear and a tattered quilt to lie on. He comes to her but once a month, sits but for a little while and says but one word.
Shuyorani is the younger queen, the king spends the whole year in her rooms.

One day the king called his minister and said, ‘Minister, I wish to go and see the countries of the world, get my ships ready.’ The minister went off to do this. It took seven months to get the seven ships ready. Six of the ships were for the king’s horses and the king’s men, the golden ship with the golden sails was for the king himself.

The minister came and said, ‘Oh King! The ship is ready!’
The king answered, ‘Then we must leave tomorrow.’
The minister went home that day.

The younger queen Shuyorani was lying on her golden bed in the bed chambers while seven ladies-in-waiting tended to her; the king went there. He sat at the head of the golden bed and asked his beloved junior queen, ‘Rani, I am going to faraway lands, what shall I bring back for you?’

The queen moved her milk white arms and looked at her diamond encrusted bangles, saying, ‘Diamonds are so very white, I can barely see them against my arms. If you bring me eight pairs of bracelets studded with blood red rubies , I would wear them and be pleased.’
The king promised, ‘That will be done, I will bring you the ruby bracelets from the land of rubies.’

The queen then tapped her little feet and made her anklets ring out, saying, ‘These anklets do not make a pretty sound. If you bring me ten pairs anklets of solid gold the colour of fire, I would wear them and be pleased.’
The king promised, ‘I will bring you golden anklets from the land of gold.’

The queen played with her necklace of ivory pearls and said, ‘See my king how small these pearls are! I have heard of pearls that are as big as a pigeon’s egg, bring me a strand of those.’
The king promised, ‘There is a kingdom of pearls in the centre of all the seas, I will bring you a strand from the markets there. What else can I bring for you, my queen?’

The beloved queen then drew her golden veil over her golden body and said, ‘How I hate this heavy fabric! If you bring me a sari as blue as the skies, as light as the breeze and as silken as water, I would wear it and be pleased.’

The king said, ‘Sorry, I had not thought of this! The golden sari has scratched you pale gold skin and pained your milky white limbs. Smile at me as I leave, for I go to bring you a sari as blue as the sky, as light as the breeze and as soft as water.’
The younger queen smiled in delight and said farewell to the king.

Just as the king was about to board the ship, he remembered the neglected older queen. He came to where she was, wrapped in her tattered quilt, weeping in her room that was falling to pieces. He stood on the crumbling threshold of that room and said, ‘Queen, I am going on a journey. I shall bring bracelets, necklaces, anklets and saris for the younger queen. What can I bring for you? Tell me if you have any special wishes.’

The queen said, ‘My king, all my wishes will come true if you come back safe and sound. When you were mine and mine alone, I had much love and many wishes. I wished to live as a queen in a house with seven floors, tended by seven hundred maids, as a thousand lamps shone upon my golden sari. I wished to keep a pair of Shuk and Shari birds in a golden cage and shackle their feet with golden chains. My king, I had many wishes once upon a time. Many of them have been fulfilled. What will I do now, with golden necklaces and saris? Whose love will I rejoice in as I show off my diamond bracelets on my arms or the pearls around my throat? Who will look upon me as I place rubies in my hair? My king, those days are long gone. You may give me jewels but you will not give me your love! You will not return me to that house with its seven floors or the seven hundred maids! You will bring a bird from the forests but not the golden cage for it to live in! My jewels will fall to thieves and robbers in this room and the bird will not want to stay in a broken cage! My king, go to the one who has your love, for I have no wishes any more.’

The king answered, ‘No! That cannot be, for people will say I have wronged you. Tell me what you wish for.’

The queen said, ‘How can I ask for jewels when I cannot have you? Bring me a monkey instead.’
The king said, ‘That is what I will do, now bid me farewell.’

The older queen then fell back on her tattered quilt and wept. The king went away and boarded his ship.

Jorashankor Dharey/Beside the Two Bridges by Abanindranath Tagore

Are you staging the celebration of the rains here today? We used to have that when we were young too. Do you know what we used to do? We played on palm leaf flutes that we bought at the Chariot festival during the rains and we pulled on tin chariots carrying earthen statues of the god Jagannath; the wheels would make jangling sounds, like sitars and anklets playing together. We would watch the skies descend in torrents of rain, every now and then the sunlight decking the cloud filtered light in orange hues – how beautiful it looked! Let me tell you about the rains of my childhood.

It started raining from the evening, how it rained and blew! The three storey house at Jorashanko seemed to shake with the force of the wind, the ceiling leaking and dripping water in every bedroom. The maids lit lamps only to have them almost immediately go out in the wind. They rolled up the bedding and carried us in their laps to the dance hall on the second floor. Father, mother, aunts, uncles, servants, maids and children; all crowded into one room. At one corner my maid, Padma Dashi sits, crunching fried peas with me on her lap. She gives me a couple occasionally and tries to put me to sleep with soft lullabies – ghumta ghumay, come sleep, come. She pats my cheek as she moves her legs to the beat of her own song.

The wind outside raises a howling noise – sometimes the huge doors in the big rooms move. The stormy night passes in intermittent sleep and wakefulness. The crows do not call in the morning, the sky does not clear. There are no fish in the fishmongers’ markets nor has the pan grower brought any pan leaves to sell. The barber Shashi comes to report that the roads are waist deep in water.

‘What is cooking, Diba Thakur?’ ‘A mix of rice boiled with vegetables – khichuri,’ he answers as he walks away towards the kitchen swinging his ladle. Since the horses could not break through the mud, the head babus of the banks are going about their business by bullock cart huddled under toadstool umbrellas. Fish are escaping from the overflowing pond in the Singhi house and local people catch them for food. As soon as Hiru the cleaner came and told us this story, Bipne the servant went out in a small dinghy to wander the lanes of the city. We float paper boats – around the trees and about the submerged circular area in the garden, down the currents until they get stuck between the iron bars at the entrance gate and finally set anchor in the floating bits of hay and mud.

Ishwardada comes limping, his stick tap-tapping to the Bhindikhana, shouting ‘Bishweshwar!’ ‘Coming’ – replies Bishweshwar, giving him a hookah upon which he says, ‘seven days of rain if it starts on Saurday, three days for Tuesday, all the rest are a day’s worth of rain,’ and raises bubbling sounds on the hookah, chup, chup, chhup, chhup, jhupur jhup. Those days when the rain came, I saw it wreck both the straw roofs and the tiled ones. The food used to be khichuri made with dal. The markets would flood as soon as it got cloudy, the fish would swim into the courtyards of the kitchens. As they played freely they would end up caught and then fried without knowing what had happened.

Holes in the roof, boiled rice

Fry the fish.

It rained for seven days and seven nights. Fried peas, fried lentils, wet umbrellas. Wherever you looked there would be wet clothes curtaining the way, moving in the breeze. We played under them all day. Bull frogs start their music in the evenings; all the mosquitoes of the kingdom enter the room and dance around the nets. Maids, servants, superintendents all cover their heads with golpata leaves – there were no sola hats or waterproof rain coats in those days but there was song and story telling, in the company of brothers and masters and so many other fun activities. The hookahs used to sound like frogs from Persia croaking.

Now I see little boys go to school whooping with excitement as they clutch their textbooks, exercise books and cushions to themselves with both hands. What fun they have! If I had gone to a school like that when I was young, I too might have learnt a bit of the things needed. Normal School was close to the house but that was little help. I never went to school of my own will. I ran about and hid, complaining of stomach aches one day and headaches the next – there was no respite try as I might. The carriage that took me to school came to the gate. I screamed and cried, ‘I will not go, never!’ The servants would pack me into the carriage at any cost. I would think it would have been better if the wheels had run over my chest. There would be a struggle, all in vain, for how was a little boy supposed to win against them? Some days my youngest aunt, seeing my tears, would feel sorry for me and say, ‘Gunu, what harm in Aba not going to school today?’ She would say to Ramlal, ‘Let him be, he does not have to go today.’ Some days I would have a break thanks to her. But most days the servants would hold me with both hands, push me into the carriage and lock the door. It starts to move, I sit captive and unable to fight back, in silence after drying my eyes. I do not like school at all. I only like one room in the whole school where in a glass cabinet there is a toy ship and a couple of shells of different shapes. I spend a lot of time sitting in front looking at them. Do you know that I was initiated into drawing there, at the Normal School? I never learnt any other skills but luckily I learnt that one. That is why I am able to keep you all happy even now with a few pictures. Or else I would never have been of any use to anyone else. Now listen to the story of that initiation.

One earthenware water jug, one glass of the same material, these were the things I drew as part of my initiation. As I said, I was at the Normal School, not studying really but going there as a matter of routine. Next to us was a senior class, I would sit next to the window to that class. The teacher would mix bottles of red and blue liquids; the red became blue, the blue became red, sometimes red and blue would both disappear while a pale liquid would remain in the bottle. I would watch, greatly entertained. After chemistry it was the turn of the drawing master Satkoribabu.  He would hang a thick sheet of paper with large drawings of an earthen jug and a glass from the blackboard, asking the boys to, ‘look at them and copy the drawings.’ The boys would draw that in their own books. The master would wander about the room looking at each. One of the boys in the class was Bhulu who lived in the next lane. We travelled to and from school together. I begged him, ‘Please show me how you draw a jug and a glass!’ When I learned how to draw from him I was very pleased indeed. Whenever I had the chance I would draw the jug and the glass. It was great fun to draw the line around the mouth of the jug. My mind would want to jump into the jug just like a frog living in a well. And that boat, I wanted to captain it across the seven seas and beyond the thirteen rivers. What a toy it was – with a mast and sails, ropes, every detail was like a real boat.

Abanindranath Tagore-

As one can see, he progressed far beyond that first jug and glass! The above is an oil painting by Abanindranath Thakur titled ‘Hunting On The Wular’