Tag Archive | Mahendra

চোখের বালি ২৬/Chokher Bali 26

২৬

এক দিকে চন্দ্র অস্ত যায়, আর-এক দিকে সূর্য উঠে। আশা চলিয়া গেল, কিন্তু মহেন্দ্রের ভাগ্যে এখনো বিনোদিনীর দেখা নাই। মহেন্দ্র ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, মাঝে মাঝে ছুতা করিয়া সময়ে-অসময়ে তাহার মার ঘরে আসিয়া উপস্থিত হয়, বিনোদিনী কেবলই ফাঁকি দিয়া পালায়, ধরা দেয় না।

রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রের এইরূপ অত্যন্ত শূন্যভাব দেখিয়া ভাবিলেন, “বউ গিয়াছে, তাই এ বাড়িতে মহিনের কিছুই আর ভালো লাগিতেছে না।’ আজকাল মহেন্দ্রের সুখদুঃখের পক্ষে মা যে বউয়ের তুলনায় একান্ত অনাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে, তাহা মনে করিয়া তাঁহাকে বিঁধিল–তবু মহেন্দ্রের এই লক্ষ্মীছাড়া বিমর্ষ ভাব দেখিয়া তিনি বেদনা পাইলেন। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিলেন, “সেই ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জার পর হইতে আমার হাঁপানির মতো হইয়াছে; আমি তো আজকাল সিঁড়ি ভাঙিয়া ঘন ঘন উপরে যাইতে পারি না। তোমাকে বাছা, নিজে থাকিয়া মহিনের খাওয়াদাওয়া সমস্তই দেখিতে হইবে। বরাবরকার অভ্যাস, একজন কেহ যত্ন না করিলে মহিন থাকিতে পারে না। দেখো-না, বউ যাওয়ার পর হইতে ও কেমন একরকম হইয়া গেছে। বউকেও ধন্য বলি, কেমন করিয়া গেল?”

বিনোদিনী একটুখানি মুখ বাঁকাইয়া বিছানার চাদর খুঁটিতে লাগিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কী বউ, কী ভাবিতেছ। ইহাতে ভাবিবার কথা কিছু নাই। যে যাহা বলে বলুক, তুমি আমাদের পর নও।”   বিনোদিনী কহিল, “কাজ নাই, মা।”

রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আচ্ছা, তবে কাজ নাই। দেখি আমি নিজে যা পারি তাই করিব।”   বলিয়া তখনই তিনি মহেন্দ্রের তেতলার ঘর ঠিক করিবার জন্য উদ্যত হইলেন। বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “তোমার অসুখ-শরীর, তুমি যাইয়ো না, আমি যাইতেছি। আমাকে মাপ করো পিসিমা, তুমি যেমন আদেশ করিবে আমি তাহাই করিব।”

রাজলক্ষ্মী লোকের কথা একেবারেই তুচ্ছ করিতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর হইতে সংসারে এবং সমাজে তিনি মহেন্দ্র ছাড়া আর কিছুই জানিতেন না। মহেন্দ্র সম্বন্ধে বিনোদিনী সমাজনিন্দার আভাস দেওয়াতে তিনি বিরক্ত হইয়াছিলেন। আজন্মকাল তিনি মহিনকে দেখিয়া আসিতেছেন, তাহার মতো এমন ভালো ছেলে আছে কোথায়। সেই মহিনের সম্বন্ধেও নিন্দা! যদি কেহ করে, তবে তাহার জিহ্বা খসিয়া যাক। তাঁহার নিজের কাছে যেটা ভালো লাগে ও ভালো বোধ হয় সে-সম্বন্ধে বিশ্বের লোককে উপেক্ষা করিবার জন্য রাজলক্ষ্মীর একটা স্বাভাবিক জেদ ছিল।

আজ মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া আপনার শয়নঘর দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। দ্বার খুলিয়াই দেখিল, চন্দনগুঁড়া ও ধুনার গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়াআছে। মশারিতে গোলাপি রেশমের ঝালর লাগানো। নীচের বিছানায় শুভ্র জাজিম তকতক করিতেছে এবং তাহার উপরে পূর্বেকার পুরাতন তাকিয়ার পরিবর্তে রেশম ও পশমের ফুলকাটা বিলাতি চৌকা বালিশ সুসজ্জিত। তাহার কারুকার্য বিনোদিনীর বহুদিনের পরিশ্রমজাত। আশা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিত, “এগুলি তুই কার জন্যে তৈরি করিতেছিস, ভাই।” বিনোদিনী হাসিয়া বলিত, “আমার চিতাশয্যার জন্য। মরণ ছাড়া তো সোহাগের লোক আমার আর কেহই নাই।”

দেয়ালে মহেন্দ্রের যে বাঁধানো ফোটোগ্রাফখানি ছিল, তাহার ফ্রেমের চার কোণে রঙিন ফিতার দ্বারা সুনিপুণভাবে চারিটি গ্রন্থি বাঁধা, এবং সেই ছবির নীচে ভিত্তিগাত্রে একটি টিপাইয়ের দুই ধারে দুই ফুলদানিতে ফুলের তোড়া, যেন মহেন্দ্রের প্রতিমূর্তি কোনো অজ্ঞাত ভক্তের পূজা প্রাপ্ত হইয়াছে। সবসুদ্ধ সমস্ত ঘরের চেহারা অন্যরকম। খাট যেখানে ছিল সেখান হইতে একটুখানি সরানো। ঘরটিকে দুই ভাগ করা হইয়াছে; খাটের সম্মুখে দুটি বড়ো আলনায় কাপড় ঝুলাইয়া দিয়া আড়ালের মতো প্রস্তুত হওয়ায় নীচে বসিবার বিছানা ও রাত্রে শুইবার খাট স্বতন্ত্র হইয়া গেছে। যে আলমারিতে আশার সমস্ত শখের জিনিস চীনের খেলনা প্রভৃতি সাজানো ছিল, সেই আলমারির কাঁচের দরজায় ভিতরের গায়ে লাল সালু কুঞ্চিত করিয়া মারিয়া দেওয়া হইয়াছে; এখন আর তাহার ভিতরের কোনো জিনিস দেখা যায় না। ঘরের মধ্যে তাহার পূর্ব-ইতিহাসের যে-কিছু চিহ্ন ছিল, তাহা নূতন হস্তের নব সজ্জায় সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হইয়া গেছে।

পরিশ্রান্ত মহেন্দ্র মেঝের উপরকার শুভ্র বিছানায় শুইয়া নূতন বালিশগুলির উপর মাথা রাখিবামাত্র একটি মৃদু সুগন্ধ অনুভব করিল–বালিশের ভিতরকার তুলার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে নাগকেশর ফুলের রেণু ও কিছু আতর মিশ্রিত ছিল।   মহেন্দ্রের চোখ বুজিয়া আসিল, মনে হইতে লাগিল, এই বালিশের উপর যাহার নিপুণ হস্তের শিল্প, তাহারই কোমল চম্পক-অঙ্গুলির যেন গন্ধ পাওয়া যাইতেছে।

এমন সময় দাসী রূপার রেকাবিতে ফল ও মিষ্ট এবং কাঁচের গ্লাসে বরফ-দেওয়া আনারসের শরবত আনিয়া দিল। এ সমস্তই পূর্বপ্রথা হইতে কিছু বিভিন্ন এবং বহু যত্ন ও পারিপাট্যের সহিত রচিত। সমস্ত স্বাদে গন্ধে দৃশ্যে নূতনত্ব আসিয়া মহেন্দ্রের ইন্দ্রিয়-সকল আবিষ্ট করিয়া তুলিল।   তৃপ্তিপূর্বক ভোজন সমাধা হইলে, রূপার বাটায় পান ও মসলা লইয়া বিনোদিনী ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। হাসিতে হাসিতে কহিল, “এ কয়দিন তোমার খাবার সময় হাজির হইতে পারি নাই, মাপ করিয়ো, ঠাকুরপো। আর যাই কর, আমার মাথার দিব্য রহিল, তোমার অযত্ন হইতেছে, এ খবরটা আমার চোখের বালিকে দিয়ো না। আমার যথাসাধ্য আমি করিতেছি–কিন্তু কী করিব ভাই, সংসারের সমস্ত কাজই আমার ঘাড়ে।”

এই বলিয়া বিনোদিনী পানের বাটা মহেন্দ্রের সম্মুখে অগ্রসর করিয়া দিল। আজিকার পানের মধ্যেও কেয়া খয়েরের একটু বিশেষ নূতন গন্ধ পাওয়া গেল।

মহেন্দ্র কহিল, “যত্নের মাঝে মাঝে এমন এক-একটা ত্রুটি থাকাই ভালো।”

বিনোদিনী কহিল, “ভালো কেন, শুনি।”

মহেন্দ্র উত্তর করিল, “তার পরে খোঁটা দিয়া সুদসুদ্ধ আদায় করা যায়।”

“মহাজন-মহাশয়, সুদ কত জমিল?”   মহেন্দ্র কহিল, “খাবার সময় হাজির ছিলে না, এখন খাবার পরে হাজরি পোষাইয়া আরো পাওনা বাকি থাকিবে।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “তোমার হিসাব যেরকম কড়াক্কড়, তোমার হাতে একবার পড়িলে আর উদ্ধার নাই দেখিতেছি।”

মহেন্দ্র কহিল, “হিসাবে যাই থাক্‌, আদায় কী করিতে পারিলাম।”   বিনোদিনী কহিল, “আদায় করিবার মতো আছে কী। তবু তো বন্দী করিয়া রাখিয়াছ।” বলিয়া ঠাট্টাকে হঠাৎ গাম্ভীর্যে পরিণত করিয়া ঈষৎ একটু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

মহেন্দ্রও একটু গম্ভীর হইয়া কহিল, “ভাই বালি, এটা কি তবে জেলখানা।”

এমন সময় বেহারা নিয়মমত আলো আনিয়া টিপাইয়ের উপর রাখিয়া চলিয়া গেল।   হঠাৎ চোখে আলো লাগাতে মুখের সামনে একটু হাতের আড়াল করিয়া নতনেত্রে বিনোদিনী বলিল, “কী জানি ভাই। তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে। এখন যাই, কাজ আছে।”

মহেন্দ্র হঠাৎ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “বন্ধন যখন স্বীকার করিয়াছ তখন যাইবে কোথায়?”   বিনোদিনী কহিল, “ছি ছি, ছাড়ো–যাহার পালাইবার রাস্তা নাই, তাহাকে আবার বাঁধিবার চেষ্টা কেন।”   বিনোদিনী জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইয়া প্রস্থান করিল।

মহেন্দ্র সেই বিছানার সুগন্ধ বালিশের উপর পড়িয়া রহিল, তাহার বুকের মধ্যে রক্ত তোলপাড় করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যা, নির্জন ঘর, নববসন্তের বাতাস দিতেছে, বিনোদিনীর মন যে ধরা দিল-দিল–উন্মাদ মহেন্দ্র আপনাকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিবে না, এমনি বোধ হইল। তাড়াতাড়ি আলো নিবাইয়া ঘরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করিল, তাহার উপরে শার্সি আঁটিয়া দিল, এবং সময় না হইতেই বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল।   এও তো সে পুরাতন বিছানা নহে। চার-পাঁচখানা তোশকে শয্যাতল পূর্বের চেয়ে অনেক নরম। আবার একটি গন্ধ–সে অগুরুর কি খসখসের, কি কিসের ঠিক বুঝা গেল না। মহেন্দ্র অনেক বার এপাশ-ওপাশ করিতে লাগিল–কোথাও যেন পুরাতনের কোনো একটা নিদর্শন খুঁজিয়া পাইয়া তাহা আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা। কিন্তু কিছুই হাতে ঠেকিল না।

রাত্রি নটার সময় রুদ্ধ দ্বারে ঘা পড়িল। বিনোদিনী বাহির হইতে কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার খাবার আসিয়াছে, দুয়ার খোলো।”   তখনই দ্বার খুলিবার জন্য মহেন্দ্র ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া শার্শির অর্গলে হাত লাগাইল। কিন্তু খুলিল না–মেঝের উপর উপুড় হইয়া লুটাইয়া কহিল, “না না, আমার ক্ষুধা নাই, আমি খাইব না।”   বাহির হইতে উদ্‌বিগ্ন কণ্ঠের প্রশ্ন শোনা গেল, “অসুখ করে নি তো? জল আনিয়া দিব? কিছু চাই কি।”   মহেন্দ্র কহিল, “আমার কিছুই চাই না–কোনো প্রয়োজন নাই।”   বিনোদিনী কহিল, “মাথা খাও, আমার কাছে ভাঁড়াইয়ো না। আচ্ছা, অসুখ না থাকে তো একবার দরজা খোলো।”   মহেন্দ্র সবেগে বলিয়া উঠিল, “না খুলিব না, কিছুতেই না। তুমি যাও।”   বলিয়া মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি উঠিয়া পুনর্বার বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল এবং অন্তর্হিতা আশার স্মৃতিকে শূন্য শয্যা ও চঞ্চল হৃদয়ের মধ্যে অন্ধকারে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল।

ঘুম যখন কিছুতেই আসিতে চায় না; তখন মহেন্দ্র বাতি জ্বালাইয়া দোয়াত কলম লইয়া আশাকে চিঠি লিখিতে বসিল। লিখিল, “আশা, আর অধিক দিন আমাকে একা ফেলিয়া রাখিয়ো না। আমার জীবনের লক্ষ্মী তুমি। তুমি না থাকিলেই আমার সমস্ত প্রবৃত্তি শিকল ছিঁড়িয়া আমাকে কোন্‌ দিকে টানিয়া লইতে চায়, বুঝিতে পারি না। পথ দেখিয়া চলিব, তাহার আলো কোথায়–সে আলো তোমার বিশ্বাসপূর্ণ দুটি চোখের প্রেমস্নিগ্ধ দৃষ্টিপাতে। তুমি শীঘ্র এসো, আমার শুভ, আমার ধ্রুব, আমার এক। আমাকে স্থির করো, রক্ষা করো, আমার হৃদয় পরিপূর্ণ করো। তোমার প্রতি লেশমাত্র অন্যায়ের মহাপাপ হইতে, তোমাকে মুহূর্তকাল বিস্মরণের বিভীষিকা হইতে আমাকে উদ্ধার করো।”

এমনি করিয়া মহেন্দ্র নিজেকে আশার অভিমুখে সবেগে তাড়না করিবার জন্য অনেক রাত ধরিয়া অনেক কথা লিখিল। দূর হইতে সুদূরে অনেকগুলি গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া তিনটা বাজিল। কলিকাতার পথে গাড়ির শব্দ আর প্রায় নাই, পাড়ার পরপ্রান্তে কোনো দোতলা হইতে নটীকণ্ঠে বেহাগ-রাগিণীর যে গান উঠিতেছিল সেও বিশ্বব্যাপিনী শান্তি ও নিদ্রার মধ্যে একেবারে ডুবিয়া গেছে। মহেন্দ্র একান্তমনে আশাকে স্মরণ করিয়া এবং মনের উদ্‌বেগ দীর্ঘ পত্রে নানারূপে ব্যক্ত করিয়া অনেকটা সান্ত্বনা পাইল, এবং বিছানায় শুইবামাত্র ঘুম আসিতে তাহার কিছুমাত্র বিলম্ব হইল না।

সকালে মহেন্দ্র যখন জাগিয়া উঠিল, তখন বেলা হইয়াছে, ঘরের মধ্যে রৌদ্র আসিয়াছে। মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল; নিদ্রার পর গতরাত্রির সমস্ত ব্যাপার মনের মধ্যে হালকা হইয়া আসিয়াছে।

বিছানার বাহিরে আসিয়া মহেন্দ্র দেখিল–গতরাত্রে আশাকে সে যে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা টিপাইয়ের উপর দোয়াত দিয়া চাপা রহিয়াছে। সেখানি পুনর্বার পড়িয়া মহেন্দ্র ভাবিল, “করেছি কী। এ যে নভেলি ব্যাপার! ভাগ্যে পাঠাই নাই। আশা পড়িলে কী মনে করিত। সে তো এর অর্ধেক কথা বুঝিতেই পারিত না।’ রাত্রে ক্ষণিক কারণে হৃদয়াবেগ যে অসংগত বাড়িয়া উঠিয়াছিল, ইহাতে মহেন্দ্র লজ্জা পাইল; চিঠিখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল; সহজ ভাষায় আশাকে একখানি সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখিল–

“তুমি আর কত দেরি করিবে। তোমার জেঠামহাশয়ের যদি শীঘ্র ফিরিবার কথা না থাকে, তবে আমাকে লিখিয়ো, আমি নিজে গিয়া তোমাকে লইয়া আসিব। এখানে একলা আমার ভালো লাগিতেছে না।’   img_9613_1_1 26   The moon sets in one direction and the sun rises in another. Asha might have left but Mahendra did not manage to see Binodini yet.  Mahendra wandered about and came to his mother’s rooms at odd hours on various excuses but Binodini did not yield so easily.

When she saw his extremely dejected spirits, Rajlakshmi thought to herself, ‘His wife’s absence is causing Mahendra to dislike this house and all in it.’ She felt slighted by the fact that his happiness now seemed to depend more on his wife rather than his mother but she was still upset by his unhappy appearance.

She sent for Binodini and said to her, ‘I have been having breathing difficulties since that bout of influenza and cannot climb the stairs to go upstairs as much as I once did. You must look after Mahendra’s welfare from now on. He is used to having someone tend to his needs for a long time. Have you seen how sad he looks ever since his wife left? What a wife! How could she even go?’

Binodini pulled a face and continued picking at the threads of the bedsheet. Rajlakshmi asked, ‘What are you thinking about? You don’t have to think about this. Whatever people may say, you are no stranger to us.’ Binodini answered, ‘There is no need for all that mother.’

Rajlakshmi said, ‘Alright, let it be. I will see if I can manage things on my own.’ She then immediately prepared to tidy up Mahendra’s third floor room.

Binodini then grew anxious and said, ‘You are not well, you do not have to go, I will go instead. Forgive me aunt, I will do whatever you order.’ Rajlakshmi completely ignored what other people said. Since the death of her husband she had devoted herself to none other than Mahendra. She had been annoyed by the hint in Binodini ‘s remark about what others in the wider society might think. She had known Mahendra his whole life and was certain there was not another person anywhere as good as him. If someone said a thing against him, she hoped that their tongue would wither and fall off. She had a natural obstinacy that allowed her to have a total disregard for everyone else and do exactly as she pleased.

Mahendra was astonished when he entered his bedroom after returning from his classes. He opened the door and found the room filled with the perfume of sandalwood powder and incense. A pink silken frill had been attached to the mosquito net. A clean white carpet had been spread on the bed and his old bolsters had been replaced by square cushions embroidered in silk and wool. Binodini had spent much time making these. Asha would ask her, ‘Who are you making these for?’ Binodini smiled and answered, ‘For my funeral. Who else but Death will be my lover?’

The photograph of his that hung in a frame on the wall had been skillfully tied with ribbons and a low table placed immediately below the picture with two vases full of bunches of flowers on it; as if Mahendra’s likeness was being worshipped by an unknown devotee. The whole room looked different. The bed had been shifted slightly. The room was now divided into two areas; two supports now held a curtain that created shelter for the bed and separated the sleeping area from the space for lounging during the day. The showcase which contained all the fancies Asha had collected including her porcelain toys had been lined with red pleated fabric on the inside and the interior could not be seen any more. The new décor of the room seemed to have erased all its past history.

Exhausted, Mahendra lay down on the spotless sheets spread on the floor; he detected a slight fragrance as his head touched the new pillows – a large quantity of pollen and a few drops of perfume had been added to the cotton stuffing of the pillows. His eyes closed and he felt as though he could smell the soft fingers that had worked such skilful magic on the pillows. The maid entered at this point with a silver bowl filled with fruits and sweets and a glass filled with iced pineapple juice. All this was very different from what he was used to and was done with infinite care and attention. The novelty of these new sensations enveloped Mahendra’s feelings.

After he had eaten to his heart’s content, Binodini entered the room slowly with a silver container filled with mouth freshening pan and spices. She smiled and said, ‘I have not been able to attend you at meal times for the past few days, please forgive me. Whatever you do, you must pledge to me that you will not tell my Bali that you have been not been taken care of. I am doing as much as I can but what can I do, all the household is my responsibility.’ She then gave him the container. There was something new there too, in the perfume of the catechu powder.

Mahendra said, ‘It is good when there is an occasional oversight in attention.’

Binodini asked, ‘Why is it good, pray tell.’

Mahendra: One can charge extra interest.

‘Dear lender, what is the amount?’

Mahendra: You were not here when I was eating, now you must stay with me for longer.

Binodini laughed and said, ‘Your rules are so strict that it seems it will be difficult escaping from your clutches once caught!’

Mahendra answered, ‘Whatever my calculations, have I ever managed to get anything from you?’

Binodini said, ‘What do I have worth taking? But you hold me.’she suddenly turned serious and let out a sigh.

Mahendra grew serious too and asked, ‘Bali, is this then a prison for you?’

The man-servant came in a light as usual and left it on the three legged table. The sudden light in the room made Binodini shade her eyes with her hands as she said with downcast eyes, ‘How should I know! Who can win an argument against you? Let me go now, I have much to do.’ Mahendra grabbed her hand without warning and said, ‘When you have admitted to the bonds where do you want to go now?’ Binodini said, ‘Shame! Why try to stop the one who has nowhere to escape!’ She then drew her hand free and left the place.

Mahendra lay on the scented pillow as his heart beat faster and faster. In the midst of that silent evening in the lonely room and the fresh spring breeze, he felt as though he would not be able to control his madness now that Binodini’s mind seemed on the verge of yielding. He turned the light off, shut the door and closed the shutters and lay down much earlier than usual. This wasn’t even his old bed. Four or five mattresses had been added to make the bed much softer than before. These were perfumed as well, whether with Khus khus or with Aguru he was not sure. He kept turning from side to side in an effort to hold onto the old. But there was nothing.

There was a knock on the barred door at nine o’clock in the night. Binodini asked from outside, ‘Good Sir, your food is here, open the door.’ Mahendra hurried to open the door instantly. But he did not open it, lying down instead on the floor and saying, ‘No, I am not hungry, I will not eat.’ A worried voice was heard outside, ‘You are not well? Do you want me to get you some water? What would you like?’ Mahendra said, ‘I do not want anything, I really do not.’ Binodini said, ‘Please, do not lie to me. Even if you are not unwell, open the door once!’ Mahendra said with some force, ‘No, I will not open my door. No matter what! You can leave!’ He lay down quickly in his bed again and continued to search for memories of Asha in the empty bed and within the darkness that filled his unsettled heart.

When sleep refused to come to him, he lit a lamp and sat down with inkwell and pen to write a letter to Asha. He wrote, ‘Asha, do not leave me alone like this for too long. You are the guardian spirit of my life. I cannot tell which way my inclinations will carry me without the anchor of your presence. The light that guides my steps comes from the trusting eyes that look upon me, softened with love. Return quickly, you are my good, my steadfast, my only delight! Anchor me, save me, fulfil my heart. Rescue me from the great evil that I may commit by wronging you and the terrible act of forgetting you for more than a moment.’

Mahendra tried to push himself vigorously in Asha’s direction by writing to her till late into the night. Several church bells rang out from far away at three o’clock. There was hardly any noise from the traffic on the roads and even the songstress who had been humming Behag from her second storey window at the other end of the street had become silent and merged in the peace that descended upon the world. Mahendra expressed many sentiments to Asha in a long letter that seemed to calm his agitation greatly and when he finally lay down he fell asleep immediately.

When Mahendra woke in the morning, it was late and the sunshine streamed into the room. Mahendra sat up quickly and found that the events of the previous night seemed less foreboding now. After leaving the bed he found the letter he had written to Asha last night was on the stool under an inkwell. He re-read it and thought, ‘What have I done? This is the stuff of novels! Thank goodness I did not send it. What would she have thought on reading this? She would not have understood half the words.’ He felt ashamed that he had been so emotional previously and ripped the letter into pieces.

He then wrote a letter to Asha in a calmer frame of mind — ‘How many days do you need to be away for? If your uncle’s return is not fixed for sometime soon, write to me and I will go and fetch you myself. I do not like being here on my own.’

Advertisements

চোখের বালি ২, Chokher Bali Chapter 2

চোখের বালি

kalighat_pat_

মেয়ে দেখিবার কথা মহেন্দ্র প্রায় ভুলিয়াছিল, অন্নপূর্ণা ভোলেন নাই। তিনি শ্যামবাজারে মেয়ের অভিভাবক জেঠার বাড়িতে পত্র লিখিয়া দেখিতে যাইবার দিন স্থির করিয়া পাঠাইলেন।

দিন স্থির হইয়াছে শুনিয়াই মহেন্দ্র কহিল, “এত তাড়াতাড়ি কাজটা করিলে কেন কাকী। এখনো বিহারীকে বলাই হয় নাই।”

অন্নপূর্ণা কহিলেন, “সে কি হয় মহিন। এখন না দেখিতে গেলে তাহারা কী মনে করিবে।”

মহেন্দ্র বিহারীকে ডাকিয়া সকল কথা বলিল। কহিল, “চলো তো, পছন্দ না হইলে তো তোমার উপর জোর চলিবে না।”

বিহারী কহিল, “সে কথা বলিতে পারি না। কাকীর বোনঝিকে দেখিতে গিয়া পছন্দ হইল না বলা আমার মুখ দিয়া আসিবে না।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে তো উত্তম কথা।”

বিহারী কহিল, “কিন্তু তোমার পক্ষে অন্যায় কাজ হইয়াছে মহিনদা। নিজেকে হালকা রাখিয়া পরের স্কন্ধে এরূপ ভার চাপানো তোমার উচিত হয় নাই। এখন কাকীর মনে আঘাত দেওয়া আমার পক্ষে বড়োই কঠিন হইবে।”

মহেন্দ্র একটু লজ্জিত ও রুষ্ট হইয়া কহিল, “তবে কী করিতে চাও!”

বিহারী কহিল, “যখন তুমি আমার নাম করিয়া তাঁহাকে আশা দিয়াছ, তখন আমি বিবাহ করিব– দেখিতে যাইবার ভড়ং করিবার দরকার নাই।”

অন্নপূর্ণাকে বিহারী দেবীর মতো ভক্তি করিত।

অবশেষে অন্নপূর্ণা বিহারীকে নিজে ডাকিয়া কহিলেন, “সে কি হয় বাছা। না দেখিয়া বিবাহ করিবে, সে কিছুতেই হইবে না। যদি পছন্দ না হয়, তবে বিবাহে সম্মতি দিতে পারিবে না, এই আমার শপথ রহিল।”

নির্ধারিত দিনে মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া মাকে কহিল, “আমার সেই রেশমের জামা এবং ঢাকাই ধুতিটা বাহির করিয়া দাও।”

মা কহিলেন, “কেন, কোথায় যাবি।”

মহেন্দ্র কহিল, “দরকার আছে মা, তুমি দাও-না, আমি পরে বলিব।”

মহেন্দ্র একটু সাজ না করিয়া থাকিতে পারিল না। পরের জন্য হইলেও কন্যা দেখিবার প্রসঙ্গমাত্রেই যৌবনধর্ম আপনি চুলটা একটু ফিরাইয়া লয়, চাদরে কিছু গন্ধ ঢালে।

দুই বন্ধু কন্যা দেখিতে বাহির হইল।

কন্যার জেঠা শ্যামবাজারের অনুকূলবাবু– নিজের উপার্জিত ধনের দ্বারায় তাঁহার বাগানসমেত তিনতলা বাড়িটাকে পাড়ার মাথার উপর তুলিয়াছেন।

দরিদ্র ভ্রাতার মৃত্যুর পর পিতৃমাতৃহীনা ভ্রাতুষ্পুত্রীকে তিনি নিজের বাড়িতে আনিয়া রাখিয়াছেন। মাসি অন্নপূর্ণা বলিয়াছিলেন, “আমার কাছে থাক্‌।” তাহাতে ব্যয়লাঘবের সুবিধা ছিল বটে, কিন্তু গৌরবলাঘবের ভয়ে অনুকূল রাজি হইলেন না। এমন-কি, দেখাসাক্ষাৎ করিবার জন্যও কন্যাকে কখনো মাসির বাড়ি পাঠাইতেন না, নিজেদের মর্যাদা সম্বন্ধে তিনি এতই কড়া ছিলেন।

কন্যাটির বিবাহ-ভাবনার সময় আসিল কিন্তু আজকালকার দিনে কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে “যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী’ কথাটা খাটে না। ভাবনার সঙ্গে খরচও চাই। কিন্তু পণের কথা উঠিলেই অনুকূল বলেন, “আমার তো নিজের মেয়ে আছে, আমি একা আর কত পারিয়া উঠিব।” এমনি করিয়া দিন বহিয়া যাইতেছিল। এমন সময় সাজিয়া-গুজিয়া গন্ধ মাখিয়া রঙ্গভূমিতে বন্ধুকে লইয়া মহেন্দ্র প্রবেশ করিলেন।

তখন চৈত্রমাসের দিবসান্তে সূর্য অস্তোন্মুখ। দোতলার দক্ষিণবারান্দায় চিত্রিত চিক্কণ চীনের টালি গাঁথা; তাহারই প্রান্তে দুই অভ্যাগতের জন্য রুপার রেকাবি ফলমূলমিষ্টান্নে শোভমান এবং বরফজলপূর্ণ রুপার গ্লাস শীতল শিশিরবিন্দু জালে মণ্ডিত। মহেন্দ্র বিহারীকে লইয়া আলজ্জিতভাবে খাইতে বসিয়াছেন। নীচে বাগানে মালী তখন ঝারিতে করিয়া গাছে গাছে জল দিতেছিল; সেই সিক্ত মৃত্তিকার স্নিগ্ধ গন্ধ বহন করিয়া চৈত্রের দক্ষিণ বাতাস মহেন্দ্রের শুভ্র কুঞ্চিত সুবাসিত চাদরের প্রান্তকে দুর্দাম করিয়া তুলিতেছিল। আশপাশের দ্বার-জানালার ছিদ্রান্তরাল হইতে একটু-আধটু চাপা হাসি, ফিসফিস কথা, দুটা-একটা গহনার টুংটাং যেন শুনা যায়।

আহারের পর অনুকূলবাবু ভিতরের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “চুনি, পান নিয়ে আয় তো রে।”

কিছুক্ষণ পরে সংকোচের ভাবে পশ্চাতের একটা দরজা খুলিয়া গেল এবং একটি বালিকা কোথা হইতে সর্বাঙ্গে রাজ্যের লজ্জা জড়াইয়া আনিয়া পানের বাটা হাতে অনুকূলবাবুর কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তিনি কহিলেন, “লজ্জা কী মা। বাটা ঐ ওঁদের সামনে রাখো।”

বালিকা নত হইয়া কম্পিতহস্তে পানের বাটা অতিথিদের আসন-পার্শ্বে ভূমিতে রাখিয়া দিল। বারান্দায় পশ্চিম-প্রান্ত হইতে সূর্যাস্ত-আভা তাহার লজ্জিত মুখকে মণ্ডিত করিয়া গেল। সেই অবকাশে মহেন্দ্র সেই কম্পান্বিতা বালিকার করুণ মুখচ্ছবি দেখিয়া লইল।

বালিকা তখনি চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে অনুকূলবাবু কহিলেন, “একটু দাঁড়া চুনি। বিহারীবাবু, এইটি আমার ছোটো ভাই অপূর্বর কন্যা। সে তো চলিয়া গেছে, এখন আমি ছাড়া ইহার আর কেহ নাই।” বলিয়া তিনি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন।

মহেন্দ্রের হৃদয়ে দয়ার আঘাত লাগিল। অনাথার দিকে আর-এক বার চাহিয়া দেখিল।

কেহ তাহার বয়স স্পষ্ট করিয়া বলিত না। আত্মীয়েরা বলিত, “এই বারো-তেরো হইবে।” অর্থাৎ চৌদ্দ-পনেরো হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। কিন্তু অনুগ্রহপালিত বলিয়া একটি কুণ্ঠিত ভীরু ভাবে তাহার নবযৌবনারম্ভকে সংযত সংবৃত করিয়া রাখিয়াছে।

আর্দ্রচিত্ত মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার নাম কী।” অনুকূলবাবু উৎসাহ দিয়া কহিলেন, “বলো মা, তোমার নাম বলো।” বালিকা তাহার অভ্যস্ত আদেশপালনের ভাবে নতমুখে বলিল, “আমার নাম আশালতা।”

আশা! মহেন্দ্রের মনে হইল নামটি বড়ো করুণ এবং কণ্ঠটি বড়ো কোমল। অনাথা আশা!

দুই বন্ধু পথে বাহির হইয়া আসিয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল। মহেন্দ্র কহিল, “বিহারী, এ মেয়েটিকে তুমি ছাড়িয়ো না।”

বিহারী তাহার স্পষ্ট উত্তর না করিয়া কহিল, “মেয়েটিকে দেখিয়া উহার মাসিমাকে মনে পড়ে; বোধ হয় অমনি লক্ষ্মী হইবে।”

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার স্কন্ধে যে বোঝা চাপাইলাম, এখন বোধ হয় তাহার ভার তত গুরুতর বোধ হইতেছে না।”

বিহারী কহিল, “না, বোধ হয় সহ্য করিতে পারিব।”

মহেন্দ্র কহিল, “কাজ কী এত কষ্ট করিয়া। তোমার বোঝা না হয় আমিই স্কন্ধে তুলিয়া লই। কী বল।”

বিহারী গম্ভীরভাবে মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিল। কহিল, “মহিনদা, সত্য বলিতেছ? এখনো ঠিক করিয়া বলো। তুমি বিবাহ করিলে কাকী ঢের বেশি খুশি হইবেন-তাহা হইলে তিনি মেয়েটিকে সর্বদাই কাছে রাখিতে পারিবেন।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমি পাগল হইয়াছ? সে হইলে অনেক কাল আগে হইয়া যাইত।”

বিহারী অধিক আপত্তি না করিয়া চলিয়া গেল, মহেন্দ্রও সোজা পথ ছাড়িয়া দীর্ঘ পথ ধরিয়া বহুবিলম্বে ধীরে ধীরে বাড়ি গিয়া পৌঁছিল।

মা তখন লুচিভাজা-ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলেন, কাকী তখনো তাঁহার বোনঝির নিকট হইতে ফেরেন নাই।

মহেন্দ্র একা নির্জন ছাদের উপর গিয়া মাদুর পাতিয়া শুইল। কলিকাতার হর্ম্যশিখরপুঞ্জের উপর শুক্লসপ্তমীর অর্ধচন্দ্র নিঃশব্দে আপন অপরূপ মায়ামন্ত্র বিকীর্ণ করিতেছিল। মা যখন খাবার খবর দিলেন, মহেন্দ্র অলসস্বরে কহিল, “বেশ আছি, এখন আর উঠিতে পারি না।”

মা কহিলেন, “এইখানেই আনিয়া দিই না?”

মহেন্দ্র কহিল, “আজ আর খাইব না, আমি খাইয়া আসিয়াছি।”

মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় খাইতে গিয়াছিলি।”

মহেন্দ্র কহিল, “সে অনেক কথা, পরে বলিব।”

মহেন্দ্রের এই অভূতপূর্ব ব্যবহারে অভিমানিনী মাতা কোনো উত্তর না করিয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলেন।

তখন মুহূর্তের মধ্যে আত্মসংবরণ করিয়া অনুতপ্ত মহেন্দ্র কহিল, “মা, আমার খাবার এইখানেই আনো।”

মা কহিলেন, “ক্ষুধা না থাকে তো দরকার কী!”

এই লইয়া ছেলেতে মায়েতে কিয়ৎক্ষণ মান-অভিমানের পর মহেন্দ্রকে পুনশ্চ আহারে বসিতে হইল।

Chokher Bali Chapter 2

Mahendra had almost completely forgotten their discussion about going to see the girl, but Annapurna had not. She wrote to the girl’s guardian, her uncle in Shyambajar, and fixed a date for the meeting.
As soon as Mahendra heard that the day had been decided upon, he said, ‘Why did you rush into this Aunt? I have not told Bihari yet.’
Annapurna said, ‘How can you not go now? What will they think?’

Mahendra summoned Bihari and told him everything. He added, ‘Let us go, if you do not like her, there is no question of any pressure on you.’
Bihari said, ‘I cannot promise that. If I do not like Aunt’s niece, I will never be able to say that out loud.’
Mahendra said, ‘That is perfect.’
Bihari said, ‘But you have not done the right thing Mahendra. You should not have placed this responsibility on my shoulders to save yourself. Now it will be very hard for me to hurt our Aunt.’
Mahendra was slightly ashamed and more than a little annoyed; he said, ‘What do you want to do then?’
‘When you have given her some assurance on my behalf, I will marry the girl – there is no need to go through the farce of seeing her beforehand,’ said Bihari.
Bihari respected Annapurna greatly.

Eventually Annapurna heard this and sent for Bihari, saying, ‘How can that be, my child? You must not marry without seeing her once. If you do not like her, you must not agree to this marriage, promise me this much.’
On the day Mahendra came back from college and told his mother, ‘Fetch me my silk shirt and the Dhakai dhoti.’
His mother asked, ‘Why, where are you going?’
Mahendra replied, ‘I need them, give them to me now, I will tell you later.’

Mahendra could not help dressing with a bit more care than usual. The nature of youth is such that the occasion of going to meet a girl demands an extra brushing of hair, a touch of perfume on one’s clothes, even if it is for another man.

The two friends went to see the prospective bride.
The girl’s uncle was Anukul babu and he had built a three storeyed house set in a garden in Shyambajar with his own earnings.
He had brought his orphaned niece to his own house after his poor brother passed away. Her mother’s sister Annapurna had offered to take her; this would have helped to lessen his household expenditure but being more concerned about loss of pride, he did not agree. He did not even send her to her aunt’s house, such was his strict attention to his own position.
It was time to start thinking about her marriage but these days the phrase ‘Thought begets action’ does not apply to the marriage of a female child. There are expenses that must accompany the thought. But whenever talk of a dowry arose, Anukul said, ‘I have a daughter of my own, how much can I spend by myself?’ Days passed in this manner. This was the arena that Mahendra found himself in, perfumed and dressed to the nines, along with his friend.

The sun was almost setting as the Chaitra day drew to an end. The verandah on the southern side of the second floor was covered with smooth painted porcelain tiles; silver bowls of fruits and sweets and silver glasses filled with iced water, filigreed with dew drops of condensation had been placed at one end of that for the guests. Mahendra and Bihari had begun eating, rather bashfully. The gardener was watering each plant in the garden below; the moist soil giving off a gentle perfume that rose in the southerly breeze of Chaitra to move the white, folded, perfumed ends of Mahendra’s wrap. A few snatches of suppressed laughter, a whispered word, a tinkling of jewellery seemed to come from the gaps of surrounding doors and windows.

After the meal, Anukulbabu looked at one of the doors and said to someone behind it, ‘Chuni, do bring some pan.’
A little later a door behind them opened somewhat hesitantly, a girl appeared bearing a container of pan; she came and stood near Anukulbabu. He said, ‘Why so shy? Put it in front of these gentlemen.’
The girl bent down and placed the pan next to their seats with a trembling hand. The glow of the setting sun enveloped her shy face with light from the western end of the verandah. At that very moment, Mahendra caught a glimpse of her sorrowful face and her trembling form.
She was about to leave immediately but Anukulbabu said, ‘Wait for a while, Chuni. Biharibabu, this is my younger brother Apurba’s daughter. He has passed away and she has no one apart from me now.’ He sighed after saying this.
Mahendra felt a stirring of pity in his heart. He looked at the orphaned girl once more.

No one ever spoke frankly about her age. The relatives would say, ‘Not more than twelve or thirteen,’ which meant it was very possible that she was fourteen or perhaps even fifteen years old. But a tentative fear which came from being raised by the grace of others had suppressed the arrival of glorious youth in her appearance.

Mahendra said gently, ‘What is your name?’ Anukulbabu encouraged her saying, ‘Tell them dear, tell them your name.’ The girl looked at the ground and said in her usual submissive manner, ‘My name is Ashalota.’

Ashalota! Mahendra thought her voice very soft and her name filled with pathos. Asha the orphan!

The two friends let the carriage go when they left the house. Mahendra said, Bihari, do not let this girl slip away.’

Bihari did not directly respond to that, saying instead, ‘I was reminded of her aunt when I saw the girl. She will most probably be just as gracious.’

Mahendra said, ‘I suppose the responsibility I have placed on your shoulders does not seem as irksome as before.’

Bihari answered, ‘No, I have a feeling I will be able to bear it.’

Mahendra said, ‘Why do you have to try so hard? Let me take the responsibility instead. What do you think?’

Bihari looked at Mahendra’s face intently. He then said, ‘Mahendra, are you serious? There is still time. If you were to indeed marry her, it would make our aunt even happier – she will be able to have the girl close by all the time.’

Mahendra said, ‘Are you mad? If that was to be, it would have happened a long time ago.’

Bihari went away without further protest, and Mahendra walked up and down many streets before making his way home very late.

His mother was busy frying luchis at the time and his aunt had not returned from her niece’s house.

Mahendra went up to the empty roof terrace and lay down on a mat. A half moon was casting its magical spell on the houses and mansions of Kolkata. When his mother sent word of dinner, Mahendra answered languidly, ‘I am fine, I do not feel like getting up any more.’

His mother asked, ‘Why don’t I bring the food here?’
Mahendra said, ‘I do not want to eat any more today, I have had dinner.’
‘Where did you go for a meal?’ asked his mother.
Mahendra answered, ‘That is a long story, I will tell you later.’

She was mortified at this hitherto unseen behavior on Mahendra’s part and prepared to leave.
Mahendra collected himself quickly and in an attempt to pacify her, said, ‘Ma, you may bring my food here.’
His mother said, ‘You do not have to eat if you are not hungry.’
This process of soothing her ruffled feelings went on for a while before Mahendra had to sit down to eat dinner once again.

Image: http://chandradey.blogspot.com.au/2009_12_31_archive.html