Archive | October 2014

বর্ষার চিঠি/ Borshar Chithi/ Letter written on a rainy day

বর্ষার চিঠি

সুহৃদ্‌বর, আপনি তো সিন্ধুদেশের মরুভূমির মধ্যে বাস করছেন। সেই অনাবৃষ্টির দেশে বসে একবার কলকাতার বাদলাটা কল্পনা করুন।

এবারকার চিঠিতে আপনাকে কেবল বাংলার বর্ষাটা স্মরণ করিয়ে দিলুম– আপনি বসে বসে ভাবুন। ভরা পুকুর, আমবাগান, ভিজে কাক ও আষাঢ়ে গল্প মনে করুন। আর যদি গঙ্গার তীর মনে পড়ে, তবে সেই স্রোতের উপর মেঘের ছায়া, জলের উপর জলবিন্দুর নৃত্য, ওপারের বনের শিয়রে মেঘের উপর মেঘের ঘটা, মেঘের তলে অশথগাছের মধ্যে শিবের দ্বাদশ মন্দির স্মরণ করুন। মনে করুন পিছল ঘাটে ভিজে ঘোমটায় বধূ জল তুলছে; বাঁশঝাড়ের তলা দিয়ে, পাঠশাল ও গয়লাবাড়ির সামনে দিয়ে সংকীর্ণ পথে ভিজতে ভিজতে জলের কলস নিয়ে তারা ঘরে ফিরে যাচ্ছে; খুঁটিতে বাঁধা গোরু গোয়ালে যাবার জন্যে হাম্বারবে চিৎকার করছে; আর মনে করুন, বিস্তীর্ণ মাঠে তরঙ্গায়িত শস্যের উপর পা ফেলে ফেলে বৃষ্টিধারা দূর থেকে কেমন ধীরে ধীরে চলে আসছে; প্রথমে মাঠের সীমান্তস্থিত মেঘের মতো আমবাগান, তার পরে এক-একটি করে বাঁশঝাড়, এক-একটি করে কুটির, এক-একটি করে গ্রাম বর্ষার শুভ্র আঁচলের আড়ালে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে আসছে, কুটিরের দুয়ারে বসে ছোটো ছোটো মেয়েরা হাততালি দিয়ে ডাকছে “আয় বৃষ্টি হেনে, ছাগল দেব মেনে’– অবশেষে বর্ষা আপনার জালের মধ্যে সমস্ত মাঠ, সমস্ত বন, সমস্ত গ্রাম ঘিরে ফেলেছে; কেবল অবিশ্রান্ত বৃষ্টি– বাঁশঝাড়ে, আমবাগানে, কুঁড়ে ঘরে, নদীর জলে, নৌকোর হালের নিকটে আসীন গুটিসুটি জড়োসড়ো কম্বলমোড়া মাঝির মাথায় অবিশ্রাম ঝরঝর বৃষ্টি পড়ছে। আর কলকাতায় বৃষ্টি পড়ছে আহিরিটোলায়, কাঁশারিপাড়ায়, টেরিটির বাজারে, বড়বাজারে, শোভাবাজারে, হরিকৃষ্ণর গলি, মতিকৃষ্ণর গলি, রামকৃষ্ণর গলিতে, জিগ্‌জ্যাগ্‌ লেনে– খোলার চালে, কোঠার ছাতে, দোকানে, ট্রামের গাড়িতে, ছ্যাকরা গাড়ির গাড়োয়ানের মাথায় ইত্যাদি।

কিন্তু আজকাল ব্যাঙ ডাকে না কেন? আমি কলকাতার কথা বলছি। ছেলেবেলায় মেঘের ঘটা হলেই ব্যাঙের ডাক শুনতুম– কিন্তু আজকাল পাশ্চাত্য সভ্যতা এল, সার্বভৌমিকতা এবং “ঊনবিংশ শতাব্দী’ এল, পোলিটিকল্‌ অ্যাজিটেশন, খোলা ভাঁটি এবং স্বায়ত্তশাসন এল, কিন্তু ব্যাঙ গেল কোথায়? হায় হায়, কোথায় ব্যাস বশিষ্ঠ, কোথায় গৌতম শাক্যসিংহ, কোথায় ব্যাঙের ডাক!

ছেলেবেলায় যেমন বর্ষা দেখতেম, তেমন ঘনিয়ে বর্ষাও এখন হয় না। বর্ষার তেমন সমারোহ নেই যেন, বর্ষা এখন যেন ইকনমিতে মন দিয়েছে– নমোনমো করে জল ছিটিয়ে চলে যায়– কেবল খানিকটা কাদা, খানিকটা ছাঁট, খানিকটা অসুবিধে মাত্র– একখানা ছেঁড়া ছাতা ও চীনে বাজারের জুতোয় বর্ষা কাটানো যায়– কিন্তু আগেকার মতো সে বজ্র বিদ্যুৎ বৃষ্টি বাতাসের মাতামাতি দেখি নে। আগেকার বর্ষার একটা নৃত্য ও গান ছিল, একটা ছন্দ ও তাল ছিল– এখন যেন প্রকৃতির বর্ষার মধ্যেও বয়স প্রবেশ করেছে, হিসাব কিতাব ও ভাবনা ঢুকেছে, শ্লেষ্মা শঙ্কা ও সাবধানের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। লোকে বলছে, সে আমারই বয়সের দোষ।

তা হবে! সকল বয়সেরই একটা কাল আছে,আমার সে বয়স গেছে হয়তো। যৌবনের যেমন বসন্ত, বার্ধক্যের যেমন শরৎ, বাল্যকালের তেমনি বর্ষা। ছেলেবেলায় আমরা যেমন গৃহ ভালোবাসি এমন আর কোনো কালেই নয়। বর্ষাকাল ঘরে থাকবার কাল, কল্পনা করবার কাল, গল্প শোনবার কাল,ভাইবোনে মিলে খেলা করবার কাল। বর্ষার অন্ধকারের মধ্যে অসম্ভব উপকথাগুলো কেমন যেন সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। ঘনবৃষ্টিধারার আবরণে পৃথিবীর আপিসের কাজগুলো সমস্ত ঢাকা পড়ে যায়। রাস্তায় পথিক কম, ভিড় কম, হাটে হাটে কাজের লোকের ঘোরতর ব্যস্ত ভাব আর দেখা যায় না– ঘরে ঘরে দ্বাররুদ্ধ, দোকানপসারের উপর আচ্ছাদন পড়েছে– উদরানলের ইস্টিম প্রভাবে মনুষ্যসমাজ যে রকম হাঁসফাঁস ক’রে কাজ করে সেই হাঁসফাঁসানি বর্ষাকালে চোখে পড়ে না এইজন্যে মনুষ্যসমাজের সাংসারিক আবর্তের বাইরে বসে উপকথাগুলিকে সহজেই সত্য মনে করা যায়, কেউ তার ব্যাঘাত করে না। বিশেষত মেঘ বৃষ্টি বিদ্যুতের মধ্যে উপকথার উপকরণ আছে যেন। যেমন মেঘ ও বৃষ্টিধারা আবরণের কাজ করে– তেমনি বৃষ্টির ক্রমিক একঘেয়ে শব্দও একপ্রকার আবরণ। আমরা আপনার মনে যখন থাকি তখন অনেক কথা বিশ্বাস করি– তখন আমরা নির্বোধ, আমরা পাগল, আমরা শিশু; সংসারের সংস্রবে আসলেই তবে আমরা সম্ভব-অসম্ভব বিচার করি, আমাদের বুদ্ধি জেগে ওঠে, আমাদের বয়স ফিরে পাই। আমরা অবসর পেলেই আপনার সঙ্গে পাগলামি করি, আপনাকে নিয়ে খেলা করি– তাতে আমাদের কেউ পাগল বলে না, শিশু বলে না– সংসারের সঙ্গে পাগলামি বা খেলা করলেই আমাদের নাম খারাপ হয়ে যায়। একটু ভেবে দেখলেই দেখা যায় বুদ্ধি বিচার তর্ক বা চিন্তার শৃঙ্খলা– এ আমাদের সহজ ভাব নয়, এ আমাদের যেন সংসারে বেরোবার আপিসের কাপড়– দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করবার সময়েই তার আবশ্যক– আপনার ঘরে এলেই ছেড়ে ফেলি। আমরা স্বভাব-শিশু, স্বভাব-পাগল, বুদ্ধিমান সেজে সংসারে বিচরণ করি। আমরা আপনার মনে বসে যা ভাবি– অলক্ষ্যে আমাদের মনের উপর অহরহ যে-সকল চিন্তা ভিড় করে– সেগুলো যদি কোনো উপায়ে প্রকাশ পেত! সংসারের একটু সাড়া পেয়েছি কী, একটু পায়ের শব্দ শুনেছি কী অমনি চকিতের মধ্যে বেশ পরিবর্তন করে নিই– এত দ্রুত যে আমরা নিজেও এ পরিবর্তনপ্রণালী দেখতে পাই নে! তাই বলছিলেম যদি কোনোমতে আমরা আপনার মনে থাকতে পাই তা হলে আমরা অনেক অসম্ভবকে বিশ্বাস করতে পারি। সেইজন্যে গভীর অন্ধকার রাত্রে যা সম্ভব বলে বোধ হয় দিনের আলোতে তার অনেকগুলি কোনোমতে সম্ভব বোধ হয় না– কিন্তু এমনি আমাদের ভোলা মন যে, রোজ দিনের বেলায় যা অবিশ্বাস করি রোজ রাত্রে তাই বিশ্বাস করি। রাত্রিকে রোজ সকালে অবিশ্বাস করি, সকালকে রোজ রাত্রে অবিশ্বাস করি! আসল কথা এই, আমাদের বিশ্বাস স্বাধীন, সংসারের মধ্যে পড়ে সে বাঁধা পড়েছে– আমরা দায়ে পড়েই অবিশ্বাস করি– একটু আড়াল পেলে, একটু ছুটি পেলে, একটু সুবিধা পেলেই আমরা যা-তা বিশ্বাস করে বসি, আবার তাড়া খেলেই গণ্ডির মধ্যে প্রবেশ করি। নিতান্ত আপনার কাছে থাকলে তাড়া দেবার লোক কেউ থাকে না। বর্ষাধারার ক্রমিক ঝর্ঝর শব্দ সংসারের সহস্র শব্দ হতে আমাদের ঢেকে রাখে– আমরা অবিশ্রাম ঝর্ঝর শব্দের আচ্ছাদনের মধ্যে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে বিশ্রাম করবার স্বাধীনততা উপভোগ করি। এইজন্যেই বর্ষাকাল উপকথার কাল। এইজন্য আষাঢ় মাসের সঙ্গেই আষাঢ়ে গল্পের যোগ। এইজন্যই বলছিলাম, বর্ষাকাল বালকের কাল– বর্ষাকালে তরুলতার শ্যামল কোমলতার মতো আমাদের স্বাভাবিক শৈশব স্ফূর্তি পেয়ে ওঠে– বর্ষার দিনে আমাদের ছেলেবেলার কথাই মনে পড়ে।

তাই মনে পড়ে, বর্ষার দিন আমাদের দীর্ঘ বারান্দায় আমরা ছুটে বেড়াতাম– বাতাসে দুমদাম করে দরজা পড়ত, প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছ তার সমস্ত অন্ধকার নিয়ে নড়ত, উঠোনে একহাঁটু জল দাঁড়াত, ছাতের উপরকার চারটে টিনের নল থেকে স্থূল জলধারা উঠোনের জলের উপর প্রচণ্ড শব্দে পড়ত ও ফেনিয়ে উঠত, চারটে জলধারাকে দিক্‌হস্তীর শূঁড় বলে বনে হত। তখন আমাদের পুকুরের ধারের কেয়াগাছে ফুল ফুটত। (এখন সে গাছ আর নেই)। বৃষ্টিতে ক্রমে পুকুরের ঘাটের এক-এক সিঁড়ি যখন অদৃশ্য হয়ে যেত ও অবশেষে পুকুর ভেসে গিয়ে বাগানে জল দাঁড়াত– বাগানের মাঝে মাঝে বেলফুলের গাছের ঝাঁকড়া মাথাগুলো জলের উপর জেগে থাকত এবং পুকুরের বড়ো বড়ো মাছ পালিয়ে এসে বাগানের জলমগ্ন গাছের মধ্যে খেলিয়ে বেড়াত, তখন হাঁটুর কাপড় তুলে কল্পনায় বাগানময় জলে দাপাদাপি করে বেড়াতেম। বর্ষার দিনে ইস্কুলের কথা মনে হলে প্রাণ কী অন্ধকারই হয়ে যেত, এবং বর্ষাকালের সন্ধেবেলায় যখন বারান্দা থেকে সহসা গলির মোড়ে মাস্টার মহাশয়ের ছাতা দেখা দিত তখন যা মনে হত তা যদি মাস্টারমশায় টের পেতেন তা হলে–। শুনেছি এখনকার অনেক ছেলে মাস্টারমশায় টের পেতেন তা হলে–। শুনেছি এখনকার অনেক ছেলে মাস্টারমশায়কে প্রিয়তম বন্ধুর মতো জ্ঞান করে, এবং ইস্কুলে যাবার নাম শুনে নেচে ওঠে। শুভলক্ষণ বোধ হয়। কিন্তু তাই বলে যে ছেলে খেলা ভালোবাসে না, বর্ষা ভালোবাসে না, গৃহ ভালোবাসে না এবং ছুটি একেবারেই ভালোবাসে না– অর্থাৎ ব্যাকরণ ও ভূগোলবিবরণ ছাড়া এই বিশাল বিশ্বসংসারে আর কিছুই ভালোবাসে না, তেমন ছেলের সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়াও কিছু নয়। তেমন ছেলে আজকাল অনেক দেখা যাচ্ছে। তবে হয়তো প্রখর সভ্যতা, বুদ্ধি ও বিদ্যার তাত লেগে ছেলেমানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে কমে এসেছে, পরিপক্কতার প্রাদুর্ভাব বেড়ে উঠেছে। আমাদেরই কেউ কেউ ইঁচড়ে-পাকা বলত, এখন যে-রকম দেখছি তাতে ইঁচড়ের চিহ্নও দেখা যায় না, গোড়াগুড়িই কাঁঠাল।

  বালক, শ্রাবণ, ১২৯২

 

children-play-rain-india_18731_990x742

Photo: http://photography.nationalgeographic.com/photography/photo-of-the-day/children-play-rain-bangladesh/

 

 

 

 

LETTER WRITTEN ON A RAINY DAY

 

Dear Friend, you live in the deserts of Sindh. Imagine for once if you will, the monsoon in Kolkata as you sit in that rainless land.

I am only going to remind you of the wet season in Bengal with this letter – you can muse upon it. Try and remember the ponds, filled to overflowing, the mango groves, the wet crows and the tall tales of a rainy afternoon. And if you recall the banks of the Ganga, then think too of the shadows of clouds on the currents, the dance of water drops on the river, the clouds gathering in their ranks above the forests on the opposite bank and the temple to the twelve Shivas beneath the pipal trees under the clouds. Imagine the women, fetching water in wet sarees at the slippery paved edge; they return, walking under the bamboos, along the narrow path that passes in front of the village school and the milkman’s house, getting wetter as they bring their filled water pots home; the cow tied at a post that lows plaintively wanting to return to shelter; and also imagine how the slanting rain slowly comes towards us in sheets, stepping across the waves of crops in distant fields; the nearest things are the clouds of mango groves at the end of the field, then lie a few bamboo clumps, a couple of houses, then one by one the villages fade away under the white sheet of rain, little children sit on door steps and clap as they sing, ‘Rain, rain come again!’ Eventually the rain covers all the fields, forests and villages with its spell; then it is only rain – on bamboo clumps, mango groves, humble huts, the river, the miserable boatman who sits wrapped in a blanket near the oars – it pours down on all without pause. And in Kolkata it is raining in Ahiritolla, in Kansharipara, on Territybazar, on Burrabazar and Shova bazaar, on Harikrishna’s alley and Motikrishna’s alley, on Ramkrishna’s lane and on Zigzag Lane – on tiled roof, on the roofs of the kothas, on shops, trams and on the heads of the men who drive the horse drawn carriages.

 

By the way, why don’t the frogs croak any more? I am talking about Kolkata. In my childhood we heard frogs croaking whenever there were clouds – but then western ways came, along came universality and the ‘nineteenth century’, political agitations, brickworks and self rule, but where did the frogs go? Alas where have Vyasa and Vashisht gone, where is Gautama the Sakya lion, where are the calls of the frogs!

 

It does not even rain with the sort of fanfare that it used to when I watched in my childhood. The rains just do not have the same kind of pomp, as if they too have turned their mind to economy – a little sprinkle of water and they are gone – leaving behind just a little mud, an errant spray, a slight inconvenience – one can spend a wet season with a torn umbrella and a pair of cheap Chinese sandals – but I never see the tremendous uproar of thunder, lightning, rain and winds. There was a sense of drama and music to the rains in the days past, a rhythm and a beat – whereas now it seems that even rain is aging, it has learned to calculate and think, it too is cowed by apprehensions of phlegm and is grown cautious. People say, it is all the fault of my advanced years.

 

It could well be! All ages have a use by date, possibly I have passed mine. Just as spring belongs to youth and autumn to old age, the rains belong to childhood. We never love our homes in the same way we are attached to them as children. The rainy season is a time for staying at home, for imagining things, for listening to stories, for playing with our siblings. Even the most impossible of tall tales take on life during the rains. All the mundane chores on the planet are veiled from us by sheets of dense raindrops.There are not many people on the roads, the crowds are gone, people no longer seem as earnestly busy as they used to be – the main doors to the houses are barred, the merchandise is covered against the weather – the impatient speed seen in people driven by a buildup of steam in their internal organs is not noticed during the rains and one can sit, removed from the daily grind and imagine the legends to be true without being disturbed. The ingredients for legends are most certainly hidden in clouds, rain and lightning. Just as clouds and rain act as a veil – so does the constant monotonous sound of rain. When we are left to our own thoughts we can believe a great number of things – then we allow ourselves to be foolish, mad and childish. It is only when we return to people that we start thinking about the impossibility of things, our senses come to the fore and we are reminded of our age. Given the chance we can be ourselves, mad and playful – but there is no one to call us insane or childish – but do those things amidst people and you get labelled instantly. If one thinks about it, intelligence, the ability to discern or regimented thoughts are not natural to us, they are more like office clothes for life – needed only when one is meeting another person – to be discarded when we return home. We are by nature children and naturally mad, we wander through life disguised as clever. The things we think about, the thoughts that crowd our minds without us being aware of them – if only they could be expressed. The moment we hear a little sound from the outer world, a foot step from outside, we change ourselves in a trice – so rapidly that we do not notice the mode of change ourselves. That is why I was saying that if we are allowed to stay with our own thoughts, we can believe in many impossible things. And thus many of things that seem possible in the darkness of night seem largely impossible in the cold light of day – but we are so forgetful that we believe at night the same things that we discount during the day. We disbelieve the existence of night at dawn and we doubt dawn at night. The truth is that our beliefs are independent, they are caught up in living – we lose belief under those pressures and when we get the slightest chance, a little break, a holiday from reality, we go back to believing all manner of things, till pushed back into the cage again. Only when we are left to ourselves do we have freedom from these pressures. The incessant dripping of rain shields us from the thousand sounds of daily living – we sit within the shelter of the continuous downpour unworried and able to rest in freedom. This is why the rains are the time of legends. This is why the month of AshaDh is associated with AshaDhey golpo or tall tales. This is why I was saying that the rainy season is the time of the child – the green softness of the trees in the rainy season encourages the child within us to awaken – we remember our own childhood on rainy days.

 

That is why I remember, we used to run on the long verandahs on rainy days – the doors slamming in the wind, the great tamarind tree shaking its dark shadows all over, water standing a foot deep in the courtyard; four tin pipes would bring water down in great thick snakes from the roof to splash noisily into the courtyard; I used to think of them as the four trunks of the elephants who guard the four compass points. At that time, there were flowering screw pine trees by our pond. That tree is now gone. When the steps leading to the pond were gradually being covered one at a time by the rain and eventually the pond flooded into the garden – the bushy heads of the jasmine shrubs stayed above the water and large fish would swim among the submerged trees of the garden after escaping the pond, I would pull my clothing up and jump about in that water in my imagination. When I thought of going to school on rainy days, my heart would sink and if ever on rainy evenings I caught sight of the teacher’s umbrella from the balcony – the things that came to mind; if only he knew, I wonder what he would have done. I have heard that many of today’s students think of their teachers as dear friends and dance in joy when they hear they are to go to school. This must be a good sign. But that does not mean that it is a good thing that the number of boys who do not love to play games, who do not love the rain, who do not like their own homes and who hate holidays – in short the type of boy who loves nothing in this vast wide world but his grammar books and his geography texts, should be growing. We are noticing an increase in the numbers of such boys. But it is possible that the heat given off by great progress, intelligence and education has helped in reducing the number of youthful people in our country and has led to an increase in maturity. Some people used to call us precocious like unseasonal jackfruit, but today they all seem to be born knowing everything they need to, already ripe as the mature fruit itself.

শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে? Shesh nahi je, shesh katha ke bolbe? Who will speak the final words, for there is no real ending?

diyas

 

শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?

          আঘাত হয়ে দেখা দিল, আগুন হয়ে জ্বলবে ॥

              সাঙ্গ হলে মেঘের পালা   শুরু হবে বৃষ্টি-ঢালা,

                   বরফ-জমা সারা হলে নদী হয়ে গলবে ॥

     ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে,

          অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে।

              পুরাতনের হৃদয় টুটে   আপনি নূতন উঠবে ফুটে,

                   জীবনে ফুল ফোটা হলে মরণে ফল ফলবে ॥

রাগ: মিশ্র খাম্বাজ
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৮ ভাদ্র, ১৩২১
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪
রচনাস্থান: সুরুল
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

 

Who will speak the final words, for there is no real ending

          What comes to us as sorrow and blows, will burn long as cleansing flames

              When the clouds have had their turn, the rains descend to soothe,

                   When the ice can freeze no more, it is time for a flowing river to be born.

     The only endings come to what we can see,

           As souls pass through darkness into eternal light.

              Whatever was old must fall to pieces, to give birth to something new and bright

                   All the flowers that bloomed in life, will surely find fruition in death. 

 

 

Raga: Mishra Khambaj
Beat: Kaharba
Written: 14th September, 1914 at Surul
Score: Dinendranath Tagore

 

Follow the link to hear Suchitra Mitra sing:

বিসর্জন/ Bisarjan/ The sacrifice

বিসর্জন

 

দুইটি কোলের ছেলে গেছে পর-পর

বয়স না হতে হতে পুরা দু-বছর।

এবার ছেলেটি তার জন্মিল যখন

স্বামীরেও হারালো মল্লিকা। বন্ধুজন

বুঝাইল–পূর্বজন্মে ছিল বহু পাপ,

এ জনমে তাই হেন দারুণ সন্তাপ।

শোকানলদগ্ধ নারী একান্ত বিনয়ে

অজ্ঞাত জন্মের পাপ শিরে বহি লয়ে

প্রায়শ্চিত্তে দিল মন। মন্দিরে মন্দিরে

যেথা সেথা  গ্রামে গ্রামে পূজা দিয়ে ফিরে,

ব্রত ধ্যান উপবাসে আহ্নিকে তর্পণে

কাটে দিন, ধূপে দীপে নৈবেদ্যে চন্দনে

পূজাগৃহে; কেশে বাঁধি রাখিল মাদুলি

কুড়াইয়া শত ব্রাহ্মণের পদধূলি;

শুনে রামায়ণ-কথা; সন্ন্যাসী সাধুরে

ঘরে আনি আশীর্বাদ করায় শিশুরে।

বিশ্বমাঝে আপনারে রাখি সর্বনীচে

সবার প্রসন্নদৃষ্টি অভাগী মাগিছে

আপন সন্তান লাগি। সূর্য চন্দ্র হতে

পশুপক্ষী পতঙ্গ অবধি কোনোমতে

কেহ পাছে কোনো অপরাধ লয় মনে,

পাছে কেহ করে ক্ষোভ, অজানা কারণে

পাছে কারো লাগে ব্যথা–সকলের কাছে

আকুল-বেদনা-ভরে দীন হয়ে আছে।

 

যখন বছর দেড় বয়স শিশুর

যকৃতের ঘটিল বিকার; জ্বরাতুর

দেহখানি শীর্ণ হয়ে আসে। দেবালয়ে

মানিল মানত মাতা, পদামৃত লয়ে

করাইল পান, হরিসংকীর্তন-গানে

কাঁপিল প্রাঙ্গণ। ব্যাধি শান্তি নাহি মানে।

কাঁদিয়া শুধালো নারী, “ব্রাহ্মণ ঠাকুর,

এত দুঃখে তবু পাপ নাহি হল দূর?

দিনরাত্রি দেবতার মেনেছি দোহাই,

দিয়েছি এত যে পূজা তবু রক্ষা নাই?

তবু কি নেবেন তাঁরা আমার বাছারে?

এত ক্ষুধা দেবতার? এত ভারে ভারে

নৈবেদ্য দিলাম খেতে বেচিয়া গহনা,

সর্বস্ব খাওয়ানু, তবু ক্ষুধা মিটিল না?’

ব্রাহ্মণ কহিল, “বাছা, এ যে ঘোর কলি!

অনেক করেছ বটে তবু এও বলি,

আজকাল তেমন কি ভক্তি আছে কারো?

সত্যযুগে যা পারিত তা কি আজ পারো?

দানবীর কর্ণ-কাছে ধর্ম যবে এসে

পুত্রেরে চাহিল খেতে ব্রাহ্মণের বেশে,

নিজহস্তে সন্তানে কাটিল; তখনি সে

শিশুরে ফিরিয়া পেল চক্ষের নিমেষে।

শিবিরাজা শ্যেনরূপী ইন্দ্রের মুখেতে

আপন বুকের মাংস কাটি দিল খেতে,

পাইল অক্ষয় দেহ। নিষ্ঠা এরে বলে।

তেমন কি এ কালেতে আছে ভূম#ডলে?

মনে আছে ছেলেবেলা গল্প শুনিয়াছি

মার কাছে–তাঁদের গ্রামের কাছাকাছি

ছিল এক বন্ধ্যা নারী, না পাইয়া পথ

প্রথম গর্ভের ছেলে করিল মানত

মা গঙ্গার কাছে; শেষে পুত্রজন্ম-পরে

অভাগী বিধবা হল, গেল সে সাগরে,

কহিল সে নিষ্ঠাভরে মা গঙ্গারে ডেকে,

মা, তোমারি কোলে আমি দিলাম ছেলেকে–

এ মোর প্রথম পুত্র, শেষ পুত্র এই,

এ জন্মের তরে আর পুত্র-আশা নেই।

যেমনি জলেতে ফেলা, মাতা ভাগীরথী

মকরবাহিনী-রূপে হয়ে মূর্তিমতী

শিশু লয়ে আপনার পদ্মকরতলে

মার কোলে সমর্পিল। নিষ্ঠা এরে বলে।’

মল্লিকা ফিরিয়া এল নতশির করে,

আপনারে ধিক্কারিল–এতদিন ধরে

বৃথা ব্রত করিলাম, বৃথা দেবার্চনা,

নিষ্ঠাহীনা পাপিষ্ঠারে ফল মিলিল না।

 

ঘরে ফিরে এসে দেখে শিশু অচেতন

জ্বরাবেশে। অঙ্গ যেন অগ্নির মতন।

ঔষধ গিলাতে যায় যত বারবার

পড়ে যায়, কণ্ঠ দিয়া নামিল না আর।

দন্তে দন্তে গেল আঁটি। বৈদ্য শির নাড়ি

ধীরে ধীরে চলি গেল রোগীগৃহ ছাড়ি।

সন্ধ্যার আঁধারে শূন্য বিধবার ঘরে

একটি মলিন দীপ, শয়নশিয়রে

একা শোকাতুরা নারী। শিশু একবার

জ্যোতিহীন আঁখি মেলি যেন চারি ধার

খুঁজিল কাহারে। নারী কাঁদিল কাতর,

“ও মানিক, ওরে সোনা, এই-যে মা তোর,

এই-যে মায়ের কোল, ভয় কী রে বাপ!’

বক্ষে তারে চাপি ধরি তার জ্বরতাপ

চাহিল কাড়িয়া নিতে অঙ্গে আপনার

প্রাণপণে। সহসা বাতাসে গৃহদ্বার

খুলে গেল, ক্ষীণ দীপ নিবিল তখনি–

সহসা বাহির হতে কলকলধ্বনি

পশিল গৃহের মাঝে। চমকিল নারী।

দাঁড়ায়ে উঠিল বেগে শয্যাতল ছাড়ি,

কহিল, “মায়ের ডাক ওই শুনা যায়–

ও মোর দুঃখীর ধন, পেয়েছি উপায়,

তোর মার কোল চেয়ে সুশীতল কোল

আছে ওরে বাছা!’

 

জাগিয়াছে কলরোল

অদূরে জাহ্নবীজলে, এসেছে জোয়ার

পূর্ণিমায়। শিশুর তাপিত দেহভার

বক্ষে লয়ে মাতা, গেল শূন্যঘাট-পানে।

কহিল, “মা, মার ব্যথা যদি বাজে প্রাণে

তবে এ শিশুর তাপ দে গো মা জুড়ায়ে।

একমাত্র ধন মোর দিনু তোর পায়ে

এক-মনে।’ এত বলি সমর্পিল জলে

অচেতন শিশুটিরে লয়ে করতলে

চক্ষু মুদি। বহুক্ষণ আঁখি মেলিল না;

ধ্যানে নিরখিল বসি মকরবাহনা

জ্যোতির্ময়ী মাতৃমূর্তি ক্ষুদ্র শিশুটিরে

কোলে ক’রে এসেছেন, রাখি তার শিরে

একটি পদ্মের দল; হাসিমুখে ছেলে

অনিন্দিত কান্তি ধরি দেবী-কোল ফেলে

মার কোলে আসিবারে বাড়ায়েছে কর।

কহে দেবী, “রে দুঃখিনী, এই তুই ধর্‌

তোর ধন তোরে দিনু।’ রোমাঞ্চিতকায়

নয়ন মেলিয়া কহে, “কই মা!॥।কোথায়!’

পরিপূর্ণ চন্দ্রালোকে বিহ্বলা রজনী;

গঙ্গা বহি চলি যায় করি কলধ্বনি।

চীৎকারী উঠিল নারী, “দিবি নে ফিরায়ে?’

মর্মরিল বনভূমি দক্ষিণের বায়ে।

 

 

২৪ আশ্বিন, ১৩০৬

 

Ganga_Kalighat_1875

(Ganga, on Makara, Kalighat painting 1851)

 

Sacrifice

 

She had lost two sons; one after the other

Before either could turn two.

When she gave birth this time,

Her husband did the unthinkable. He died too.

Friends convinced her of the great sins of her past

Leading to the great pain meted out in this life.

The pitiful woman, with utmost humility

Took all responsibility for what she could no longer recall

Setting out to repent. From village to village

She went, offering prayers to the temples there.

Her time she spent in fasting, prayers and offerings

In the aroma of incense, flame, flowers and sandalwood

In rooms where the idol reigned; she tied to her hair

An amulet containing the dust from a hundred Brahmin feet

She listened to the tales of Rama; she invited the holy men

Into her home to bless her child.

She put herself behind everyone else

She asked others to look upon him with kindness

And bless her child. Taking care not to offend neither sun nor moon

Nor bird, nor beast nor winged insect in any way

For fear that someone should take offence,

Or suffer anguish for unknown reason

Or feel pain, she was always

Bowed in her own misery before others.

 

When this infant turned one and half

A fever gripped him; the malaise

Making him grow frailer by the day. At the temple

The mother made more promises, washing the idol’s feet

She fed the child that water, the sounds of hymns

Thundered through their yard. But the illness would not pay heed.

The woman cried out, ‘My lord,

Was my sin not removed by so much sorrow?

I have thought of nothing but the gods day and night,

I have offered so many prayers and still, no respite?

Must they still have of all things, my child?

Are they so hungry? All the offerings

That I gave, selling each ornament I had,

I gave them my all, and still they crave more?’

The priest said, ‘Look child, the times are a’changing!

You may have done a lot, but still I must say,

Have you done these with the purest motives?

Can people do in Kalyug what they could in Satyayug

When Truth garbed as a Brahmin asked the demoness

For her son’s life as he was famished ,

She cut her own son in two, only

Have the child restored in the blink of an eye.

When Shibi gave Indra in the form of a hawk

A pound of flesh from the region of his own heart

He was granted eternal life, now that is devotion! My child,

Is there anything remotely like that on this world anymore?

I remember hearing stories as a child.

From my mother – near their village lived

A woman most unfortunate, barren of womb. If she was ever given a son

She had promised her first born

To the holy river; then when the child was born

She became a widow and went to the place where the waters mingle,

Calling upon the river with great piety

Mother, I have given my son to you –

My first and my last born,

I have no hope of having another one.

As soon as she cast the child upon the waters, the river

Took the form of a Makar and returned

The child with her own two lotus hands

To the lap of his own mother. Now that is devotion!’

Mallika returned, head bowed,

Silently rebuking herself – for all these days

So many words, so many promises and prayers

But nothing comes to the selfish sinner.

 

She returned to find her child senseless

Burning up with fever, a fire consuming him

Each time she tried to give him his potion

She failed at making him swallow

His teeth were set together. The doctor shook his head

Ceding defeat, even he walked away slowly.

In the darkness of evening, the widow’s room bereft

Only one faint lamp flickers at the little child’s head

The grieving woman all alone; suddenly the child

Opens its listless eyes and looks around

As if seeking someone. The woman cried piteously,

‘My dearest, my precious, here I am am!

Here is your mother’s lap, why fear?’

She clasped him to her breast and tried

To take his fever to her own flesh

Most fervently. Suddenly the wind blew the doors

Open, blowing the faint lamp out

And a hundred voices came rushing in

Into the room startling the woman.

She stood up at once!

Said, ‘There, I hear the mother calling –

My dearest, my treasure, now I know how,

There is she, whose lap is more soothing

There is one, more loving than me! Never fear!’

 

There was a rising sound

In the waters of the Jahnavi, the tide had come in

Pulled by the full moon, she carried his little form

Towards the desolate banks.

She cried, ‘Mother, If you have ever felt my pain

Then take this child’s suffering

I give the only treasure I have to you

Without fear,’ as she gave him up to the waves

The unconscious child she had held in her hands

Her eyes closed in prayer. She did not open them  in haste;

Her mind’s eye saw, the goddess, seated upon a mythical beast

The luminous mother accepting the tiny child

Brings it back, placing at its head a lotus petal;

The child smiles, wishing to now return

His face without compare, as he seeks

To come to his mother, leaving the heavenly embrace.

The goddess says, ‘Wretch, here, hold him

I return your treasure to you.’ Eagerly

She opened her eyes. ‘Where Mother? Where?’

The river flowed to its usual tune.

The woman cried, ‘Will you not give him back?’

But only the forest answered her, whispering on the south wind.

 

 

24th Ashwin, 1306

 

ক্ষীরের পুতুল ৪/ Kheerer Putul 4/ The Milk Doll 4

The monkey said, ‘My mother suffers in that broken down room. The door has cracks, the thatch is old and the cold enters the room all day and all night. My mother has no coverlet to cover herself, nor wood to light a warming fire; she shivers all night long in the cold.’

The king said, ‘That will not do! That will not do! Go and fetch your mother here, I will tell them to prepare a palace for her.’

The monkey answered, ‘I am worried about bringing her here for the younger queen will surely try and poison her.’

The king said, ‘There is no fear of that. She will be in a new palace with a moat all around it. The younger queen will never manage to get close to her. The queen will stay in the new palace, along with her deaf mute hand maiden and you, her adopted son.’

3-4ee98d3d1b

The monkey said, ‘Then let me go and get her.’

The king said, ‘Minister, build us a palace!’

The minister employed hundreds and thousands of people who all worked to build a new palace overnight.

The wretched queen left her broken house, put aside her torn coverlet, put on a sari of the finest gold and entered her new palace. She sat upon her golden bed, ate from a golden plate and gave generously to the poor and the unfortunate who praised her throughout the kingdom. The younger queen felt as if she would burn up in jealousy.

The witch Brahmani was the younger queen’s very best friend in the whole wide world. The queen sent for her saying, ‘Ask her to come, I am unhappy and need cheering up.’

The call came from the queen; the witch had to come as soon as she could.

The queen said, ‘How are you? Come and sit by me, my dearest friend.’

The witch sat down beside her and asked, ‘Why have you called me? Your smile has vanished, your eyes are filled with tears! What is wrong?’

The queen answered, ‘The worst thing possible has happened! My step wife has come back to the palace. She wears sarees of gold and lives in a new palace, she is now the king’s favourite. The wretch is now queening it over me! I burn in hatred, give me some poison and let me die! I cannot bear this anymore’

The witch said, ‘For shame, my friend! Why say such things? Why should you take poison? The wretch has become queen and soon enough she will return to being a wretch again. You will have your glory just as you always did’

The queen answered, ‘No, I do not wish to live any longer! Sooner than later, she will have a son and that son will inherit the kingdom. People will say how lucky she is to be a king’s dam. And they will say, look at the ugly queen, she had the king’s love but she could never give him a son. Shame on her! Fie! If one sees her face by mistake, the whole day is sure to be ruined, and one goes without food. Look sister, I will not be able to bear it. Either give me some poison so that I may die, or so that I can feed it to her!’

The witch said, ‘Shh! Someone might hear you saying all this! Do not worry, I will secretly bring yu some poison, give that to her. Now, farewell me so that I may go in search of the brew.’

The old woman went looking. She looked far and wide till in the darkening hours of the evening, she cast a spell on a sleeping snake she found in a bush and brought all its venom to the queen.

The queen made sweets of various kinds and mixed the snake’s evil into all of them. She then arranged them on a plate and said to her friend the witch, ‘Can you go and sell these to the queen?’

The witch took the platter of sweets and went to the new palace.

The queen saw her and said in a kindly manner, ‘Welcome, you have not come to see me for so long! All because I was only the second queen.’

The old woman answered, ‘What a thing to say! I eat, by your grace! I am clothed, by your grace! How can I forget you? Here, have some of these sweets I made.’

The queen saw the sweets all piled high with loving care that the old woman had brought. She crossed the witch’s palms with gold and bade her farewell, the woman went away with a smile on her lips.

She then broke a piece of the milk cake and ate it; her tongue grew numb. She ate a piece of the lentil cake and her throat grew dry as wood. She put a piece of Motichur in her mouth and her heart began to burn. She called the monkey and said, ‘I wonder what the Brahmani fed me! I feel so strange, as if I will not live for much longer!’

The monkey said, ‘Mother, come and lie down.’

She stood up and all the venom of the snake rose into her brain. She felt everything grow dark around her, spun around and her golden limbs struck the stone floors.

The monkey supported her head in his arms and checked her pulse and pulled her eyelids to look at her eyes. The queen was truly unconscious.

He lifted the golden queen and laid her on her golden bed before going to look for medicines in the forest. Who knows what he brought from the forest, but he began to crush the roots and leaves on a new grinding stone and gave the queen a little at a time.

The king heard that the queen had taken poison. He dropped whatever he was doing and rushed to be by her side. The minister saw the king and followed him. After that came the royal physician, mumbling incantations. Then the palace filled up with all the servants and gadabouts of the kingdom.

The monkey asked, ‘Why have you brought so many people with you my king? I have given my mother medicines and she is sleeping a little. Ask all these people to leave.

The king gave the sweets to the royal physician to be tested. He gave the command of the kingdom to his minister and remained at the side of his sickening queen.

The queen remained senseless for three days and three nights. On the fourth day, she opened her eyes.

The monkey went to the king and said, ‘The queen has woken up. You have a son with all the auspicious marks of being a fitting heir.’

The king took his diamond necklace off and gave it to the monkey saying, ‘Let us go and see the mother and son.’

The monkey answered, ‘I have read his fortunes. If you see him now, you will become blind. See him when he gets married. Now go and see what harm the younger queen did to my mother.’

মম দুঃখের সাধন যবে করিনু নিবেদন তব চরণতলে/ Momo dukkhero shadhono jawbe korinu/ When I placed before you the fruits of my sorrowful prayers at your feet

মম      দুঃখের সাধন   যবে করিনু নিবেদন   তব চরণতলে

     শুভলগন গেল চলে,

              প্রেমের অভিষেক কেন হল না   তব নয়নজলে॥

রসের ধারা নামিল না,   বিরহে তাপের দিনে ফুল গেল শুকায়ে–

                   মালা পরানো হল না তব গলে॥

মনে হয়েছিল দেখেছিনু করুণা তব আঁখিনিমেষে,

                             গেল সে ভেসে।

          যদি   দিতে বেদনার দান, আপনি পেতে তারে ফিরে

                                  অমৃতফলে॥

রাগ: মিশ্র বেহাগ
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1346
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

When I placed before you the fruits of my sorrowful prayers at your feet

the sacred hour had passed,

Why did your tears not acknowledge my love, crowning it with glory.

My thirst was not slaked, the flowers I had gathered wilting in desolate separation

My garland I did not place about your throat

I thought I had seen compassion shine forth from your steadfast gaze,

But alas, even that was lost.

If you had deigned to reward me for my pains, you would have received

Eternal sweetness in equal measure.

****
Raga: Mishra Behag
Beat: Kaharba
CE: 1939
Score: Shailajaranjan Majumdar

 

Follow the link to listen to Debabrata Biswas:

চোখের বালি ২৮ / Chokher Bali 28

২৮

সেদিন রাত্রিজাগরণ ও প্রবল আবেগের পরে সকালবেলায় মহেন্দ্রের শরীর-মনে একটা অবসাদ উপস্থিত হইয়াছিল। তখন ফাল্গুনের মাঝামাঝি, গরম পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। মহেন্দ্র অন্যদিন সকালে তাহার শয়নগৃহের কোণে টেবিলে বই লইয়া বসিত। আজ নীচের বিছানায় তাকিয়ায় হেলান দিয়া পড়িল। বেলা হইয়া যায়, স্নানে গেল না। রাস্তা দিয়া ফেরিওয়ালা হাঁকিয়া যাইতেছে। পথে আপিসের গাড়ির শব্দের বিরাম নাই। প্রতিবেশীর নূতন বাড়ি তৈরি হইতেছে, মিস্ত্রি-কন্যারা তাহারই ছাদ পিটিবার তালে তালে সমস্বরে একঘেয়ে গান ধরিল। ঈষৎ তপ্ত দক্ষিণের হাওয়ায় মহেন্দ্রের পীড়িত স্নায়ুজাল শিথিল হইয়া আসিয়াছে; কোনো কঠিন পণ, দুরূহ চেষ্টা, মানস-সংগ্রাম আজিকার এই হালছাড়া গা-ঢালা বসন্তের দিনের উপযুক্ত নহে।

“ঠাকুরপো, তোমার আজ হল কী। স্নান করিবে না? এ দিকে খাবার যে প্রস্তুত। ও কী ভাই, শুইয়া যে! অসুখ করিয়াছে? মাথা ধরিয়াছে?” বলিয়া বিনোদিনী কাছে আসিয়া মহেন্দ্রের কপালে হাত দিল।

মহেন্দ্র অর্ধেক চোখ বুজিয়া জড়িতকণ্ঠে বলিল, “আজ শরীরটা তেমন ভালো নাই–আজ আর স্নান করিব না।”

বিনোদিনী কহিল, “স্নান না কর তো দুটিখানি খাইয়া লও।” বলিয়া পীড়াপীড়ি করিয়া সে মহেন্দ্রকে ভোজনস্থানে লইয়া গেল এবং উৎকণ্ঠিত যত্নের সহিত অনুরোধ করিয়া আহার করাইল।

আহারের পর মহেন্দ্র পুনরায় নীচের বিছানায় আসিয়া শুইলে, বিনোদিনী শিয়রে বসিয়া ধীরে ধীরে তাহার মাথা টিপিয়া দিতে লাগিল। মহেন্দ্র নিমীলিতচক্ষে বলিল, “ভাই বালি, এখনো তো তোমার খাওয়া হয় নাই, তুমি খাইতে যাও।”

বিনোদিনী কিছুতেই গেল না। অলস মধ্যাহ্নের উত্তপ্ত হাওয়ায় ঘরের পর্দা উড়িতে লাগিল এবং প্রাচীরের কাছে কম্পমান নারিকেলগাছের অর্থহীন মর্মরশব্দ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। মহেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড ক্রমশই দ্রুততর তালে নাচিতে লাগিল এবং বিনোদিনীর ঘন নিশ্বাস সেই তালে মহেন্দ্রের কপালের চুলগুলি কাঁপাইতে থাকিল। কাহারো কণ্ঠ দিয়া একটি কথা বাহির হইল না। মহেন্দ্র মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “অসীম বিশ্বসংসারের অনন্ত প্রবাহের মধ্যে ভাসিয়া চলিয়াছি, তরণী ক্ষণকালের জন্য কখন কোথায় ঠেকে, তাহাতে কাহার কী আসে যায় এবং কতদিনের জন্যই বা যায় আসে।’

শিয়রের কাছে বসিয়া কপালে হাত বুলাইতে বুলাইতে বিহ্বল যৌবনের গুরুভারে ধীরে ধীরে বিনোদিনীর মাথা নত হইয়া আসিতেছিল; অবশেষে তাহার কেশাগ্রভাগ মহেন্দ্রের কপোল স্পর্শ করিল। বাতাসে আন্দোলিত সেই কেশগুচ্ছের কম্পিত মৃদু স্পর্শে তাহার সমস্ত শরীর বারংবার কাঁপিয়া উঠিল, হঠাৎ যেন নিশ্বাস তাহার বুকের কাছে অবরুদ্ধ হইয়া বাহির হইবার পথ পাইল না। ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া মহেন্দ্র কহিল, “নাঃ আমার কালেজ আছে, আমি যাই।” বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে না চাহিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল।

বিনোদিনী কহিল, “ব্যস্ত হইয়ো না, আমি তোমার কাপড় আনিয়া দিই।” বলিয়া মহেন্দ্রের কালেজের কাপড় বাহির করিয়া আনিল।

মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি কালেজে চলিয়া গেল, কিন্তু সেখানে কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। পড়াশুনায় মন দিতে অনেকক্ষণ বৃথা চেষ্টা করিয়া সকাল সকাল বাড়ি ফিরিয়া আসিল।

ঘরে ঢুকিয়া দেখে, বিনোদিনী বুকের তলায় বালিশ টানিয়া লইয়া নীচের বিছানায় উপুড় হইয়া কী একটা বই পড়িতেছে–রাশীকৃত কালো চুল পিঠের উপর ছড়ানো। বোধ করি বা সে মহেন্দ্রের জুতার শব্দ শুনিতে পায় নাই। মহেন্দ্র আস্তে আস্তে পা টিপিয়া কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। শুনিতে পাইল, পড়িতে পড়িতে বিনোদিনী একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

মহেন্দ্র কহিল, “ওগো করুণাময়ী, কাল্পনিক লোকের জন্য হৃদয়ের বাজে খরচ করিয়ো না। কী পড়া হইতেছে।”

বিনোদিনী ত্রস্ত হইয়া উঠিয়া বসিয়া তাড়াতাড়ি বইখানা অঞ্চলের মধ্যে লুকাইয়া ফেলিল। মহেন্দ্র কাড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। অনেকক্ষণ হাতাহাতি-কাড়াকাড়ির পর পরাভূত বিনোদিনীর অঞ্চল হইতে মহেন্দ্র বইখানি ছিনাইয়া লইয়া দেখিল–বিষবৃক্ষ। বিনোদিনী ঘন নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

মহেন্দ্রের বক্ষঃস্থল তোলপাড় করিতেছিল। অনেক চেষ্টায় সে হাসিয়া কহিল, “ছি ছি, বড়ো ফাঁকি দিলে। আমি ভাবিয়াছিলাম, খুব একটা গোপনীয় কিছু হইবে বা। এত কাড়াকাড়ি করিয়া শেষকালে কিনা বিষবৃক্ষ বাহির হইয়া পড়িল।”

বিনোদিনী কহিল, “আমার আবার গোপনীয় কী থাকিতে পারে, শুনি।”

মহেন্দ্র ফস্‌ করিয়া বলিয়া ফেলিল, “এই মনে করো, যদি বিহারীর কাছ হইতে কোনো চিঠি আসিত?”

নিমেষের মধ্যে বিনোদিনীর চোখে বিদ্যুৎ স্ফুরিত হইল। এতক্ষণ ফুলশর ঘরের কোণে খেলা করিতেছিল, সে যেন দ্বিতীয় বার ভস্মসাৎ হইয়া গেল। মুহূর্তে-প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার মতো বিনোদিনী উঠিয়া দাঁড়াইল। মহেন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “মাপ করো, আমার পরিহাস মাপ করো।”

বিনোদিনী সবেগে হাত ছিনাইয়া লইয়া কহিল, “পরিহাস করিতেছ কাহাকে। যদি তাঁহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিবার যোগ্য হইতে, তবে তাঁহাকে পরিহাস করিলে সহ্য করিতাম। তোমার ছোটো মন, বন্ধুত্ব করিবার শক্তি নাই, অথচ ঠাট্টা।”

বিনোদিনী চলিয়া যাইতে উদ্যত হইবামাত্র মহেন্দ্র দুই হাতে তাহার পা বেষ্টন করিয়া বাধা দিল।

এমন সময়ে সম্মুখে এক ছায়া পড়িল, মহেন্দ্র বিনোদিনীর পা ছাড়িয়া চমকিয়া মুখ তুলিয়া দেখিল, বিহারী।

বিহারী স্থির দৃষ্টিপাতে উভয়কে দগ্ধ করিয়া শান্ত ধীর স্বরে কহিল, “অত্যন্ত অসময়ে উপস্থিত হইয়াছি, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকিব না। একটা কথা বলিতে আসিয়াছিলাম। আমি কাশী গিয়াছিলাম, জানিতাম না, সেখানে বউঠাকরুণ আছেন। না জানিয়া তাঁহার কাছে অপরাধী হইয়াছি; তাঁহার কাছে ক্ষমা চাহিবার অবসর নাই, তাই তোমার কাছে ক্ষমা চাহিতে আসিয়াছি। আমার মনে জ্ঞানে অজ্ঞানে যদি কখনো কোনো পাপ স্পর্শ করিয়া থাকে, সেজন্য তাঁহাকে যেন কখনো কোনো দুঃখ সহ্য করিতে না হয়, তোমার কাছে আমার এই প্রার্থনা।”

বিহারীর কাছে দুর্বলতা হঠাৎ প্রকাশ পাইল বলিয়া মহেন্দ্রের মনটা যেন জ্বলিয়া উঠিল। এখন তাহার ঔদার্যের সময় নহে। সে একটু হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরঘরে কলা খাইবার যে গল্প আছে, তোমার ঠিক তাই দেখিতেছি। তোমাকে দোষ স্বীকার করিতেও বলি নাই; অস্বীকার করিতেও বলি নাই; তবে ক্ষমা চাহিয়া সাধু হইতে আসিয়াছ কেন।”

বিহারী কাঠের পুতুলের মতো কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল–তার পরে যখন কথা বলিবার প্রবল চেষ্টায় তাহার ঠোঁট কাঁপিতে লাগিল, তখন বিনোদিনী বলিয়া উঠিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, তুমি কোনো উত্তর দিয়ো না। কিছুই বলিয়ো না। ঐ লোকটি যাহা মুখে আনিল, তাহাতে উহারই মুখে কলঙ্ক লাগিয়া রহিল, সে কলঙ্ক তোমাকে স্পর্শ করে নাই।”

বিনোদিনীর কথা বিহারীর কানে প্রবেশ করিল কি না সন্দেহ–সে যেন স্বপ্নচালিতের মতো মহেন্দ্রের ঘরের সম্মুখ হইতে ফিরিয়া সিঁড়ি দিয়া নামিয়া যাইতে লাগিল।

বিনোদিনী তাহার পশ্চাতে গিয়া কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, আমাকে কি তোমার কোনো কথা বলিবার নাই। যদি তিরস্কারের কিছু থাকে, তবে তিরস্কার করো।”

বিহারী যখন কোনো উত্তর না করিয়া চলিতে লাগিল, বিনোদিনী সম্মুখে আসিয়া দুই হাতে তাহার দক্ষিণ হাত চাপিয়া ধরিল। বিহারী অপরিসীম ঘৃণার সহিত তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল। সেই আঘাতে বিনোদিনী যে পড়িয়া গেল তাহা সে জানিতেও পারিল না।

পতনশব্দ শুনিয়া মহেন্দ্র ছুটিয়া আসিল। দেখিল, বিনোদিনীর বাম হাতের কনুয়ের কাছে কাটিয়া রক্ত পড়িতেছে।

মহেন্দ্র কহিল, “ইস্‌, এ যে অনেকটা কাটিয়াছে” বলিয়া তৎক্ষণাৎ নিজের পাতলা জামা খানিকটা টানিয়া ছিঁড়িয়া ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধিতে প্রস্তুত হইল।

বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত সরাইয়া লইয়া কহিল, “না না, কিছুই করিয়ো না, রক্ত পড়িতে দাও।”

মহেন্দ্র কহিল, “বাঁধিয়া একটা ঔষধ দিতেছি, তা হইলে আর ব্যথা হইবে না, শীঘ্র সারিয়া যাইবে।”

বিনোদিনী সরিয়া গিয়া কহিল, “আমি ব্যথা সারাইতে চাই না, এ কাটা আমার থাক্‌।”

মহেন্দ্র কহিল, “আজ অধীর হইয়া তোমাকে আমি লোকের সামনে অপদস্থ করিয়াছি, আমাকে মাপ করিতে পারিবে কি।”

বিনোদিনী কহিল, “মাপ কিসের জন্য। বেশ করিয়াছ। আমি কি লোককে ভয় করি। আমি কাহাকেও মানি না। যাহারা আঘাত করিয়া ফেলিয়া চলিয়া যায়, তাহারাই কি আমার সব, আর যাহারা আমাকে পায়ে ধরিয়া টানিয়া রাখিতে চায়, তাহারা আমার কেহই নহে?”

মহেন্দ্র উন্মত্ত হইয়া গদগদকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “বিনোদিনী, তবে আমার ভালোবাসা তুমি পায়ে ঠেলিবে না?”

বিনোদিনী কহিল, “মাথায় করিয়া রাখিব। ভালোবাসা আমি জন্মাবধি এত বেশি পাই নাই যে, “চাই না’ বলিয়া ফিরাইয়া দিতে পারি।”

মহেন্দ্র তখন দুই হাতে বিনোদিনীর দুই হাত ধরিয়া কহিল,”তবে এসো আমার ঘরে। তোমাকে আজ আমি ব্যথা দিয়াছি, তুমিও আমাকে ব্যথা দিয়া চলিয়া আসিয়াছ–যতক্ষণ তাহা একেবারে মুছিয়া না যাইবে, ততক্ষণ আমার খাইয়া শুইয়া কিছুতেই সুখ নাই।”

বিনোদিনী কহিল,”আজ নয়, আজ আমাকে ছাড়িয়া দাও। যদি তোমাকে দুঃখ দিয়া থাকি, মাপ করো।”

মহেন্দ্র কহিল, “তুমিও আমাকে মাপ করো, নহিলে আমি রাত্রে ঘুমাইতে পারিব না।”

বিনোদিনী কহিল,”মাপ করিলাম।”

মহেন্দ্র তখনই অধীর হইয়া বিনোদিনীর কাছে হাতে-হাতে ক্ষমা ও ভালোবাসারএকটা নিদর্শন পাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিল। কিন্তু বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। বিনোদিনী সিঁড়ি দিয়া নামিয়া চলিয়া গেল– মহেন্দ্রও ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া ছাদে বেড়াইতে লাগিল। বিহারীর কাছে হঠাৎ আজ মহেন্দ্র ধরা পড়িয়াছে, ইহাতে তাহার মনে একটা মুক্তির আনন্দ উপস্থিত হইল। লুকোচুরির যে-একটা ঘৃণ্যতা আছে, একজনের কাছে প্রকাশ হইয়াই যেন তাহা অনেটা দূর হইল। মহেন্দ্র মনে মনে কহিল, “আমি নিজেকে ভালো বলিয়া মিথ্যা করিয়া আর চালাইতে চাহি না–কিন্তু আমি ভালোবp–আমি ভালোবাসি, সে কথা মিথ্যে নহে।’ — নিজের ভালোবাসার গৌরবে তাহার স্পর্ধা এতই বাড়িয়া উঠিল যে, নিজেকে মন্দ বলিয়া সে আপন মনে উদ্ধতভাবে গর্ব করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যাকলে নীরব-জ্যোতিষ্কমণ্ডলী-অধিরাজিত অনন্ত জগতের প্রতি একটা অবজ্ঞা নিক্ষেপ করিয়া মনে মনে কহিল, “যে আমাকে যত মন্দই মনে করুক, কিন্তু আমি ভালোবাসি।’ বলিয়া বিনোদিনীর মানসী মূর্তিকে দিয়া মহেন্দ্র সমস্ত আকাশ, সমস্ত সংসার, সমস্ত কর্তব্য আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। বিহারী হঠাৎ আসিয়া আজ যেন মহেন্দ্রের জীবনের ছিপি-আঁটা মসীপাত্র উলটাইয়া ভাঙিয়া ফেলিল–বিনোদিনীর কালো চোখ এবং কালো চুলের কালি দেখিতে দেখিতে বিস্তৃত হইয়া পূর্বেকার সমস্ত সাদা এবং সমস্ত লেখা লেপিয়া একাকার করিয়া দিল।

punampntg

28

Mahendra had been physically and mentally exhausted the next morning after spending a sleepless night in tremendous emotional upheaval. It was the middle of the month of Phalgun and the weather was growing warmer. On other days, Mahendra sat with his books at the table in the corner of his bedroom. Today he leaned against a bolster on the floor and studied. The hours passed but he did not go for a bath. The street vendors hawked their wares on the street. Carriages passed incessantly on the road carrying people to work. The neighbour was building a new house, the women who worked as labourers began their monotonous song to the thuds of the terrace building. The warm southerly breeze made Mahendra’s troubled nerves relax; no terrible pledge, strenuous effort or deep thought seemed to suit the mood of the spring day.

 ‘Sir, what is wrong with you today? Will you not bather? The food is prepared. Why are you lying down? Are you ill? Do you have a headache?’ Binodini drew close to him and felt his forehead.

 Mahendra mumbled, his eyes half closed, ‘I do not feel very well – I will not bathe today.’

 Binodini said, ‘Even if you do not bathe, at least eat something.’ She remonstrated with Mahendra til he submitted to her anxious attentions and went to the dining room where he ate his lunch.

 He returned to his room and lay down on the floor after his meal while Binodini gently pressed his temples. His eyes half closed, he said to her, ‘Bali, you have not eaten yet, go and eat now.’

 Binodini could not be persuaded to leave. The curtains stirred in the hot breeze of that lazy afternoon and the meaningless rustlings of the trembling coconut leaves near the wall filled the room. Mahendra’s heart beat faster and faster and Binodini’s breath blew on the hair on his forehead. No one spoke a word. Mahendra thought, ‘I am floating on the eternal currents of this endless world, does it matter to anyone where my boat moors and for how long.’

As she sat by his head stroking his forehead, the desires of her eager unfulfilled youth made Binodini lean lower and lower till her hair touched Mahendra’s cheek. His body trembled at the gentle touch of that tendril of hair and he felt as though his breath was confined in his chest from whence it could not escape. He sat up suddenly and said, ‘No, I have classes, I have to go!’ He then stood up without looking at Binodini.

 Binodini said, ‘Why the hurry, let me get your clothes,’ and she took his clothes out of the cupboard.

 Mahendra went to classes quickly, but he could not concentrate there either. He tried in vain to focus on his studies but failing that, came home early.

 When he came home, he found Binodini lying on the floor with a pillow under her chest reading a book –  a cloud of black hair covering her back. Possibly she had not heard the sound of his shoes. Mahendra stepped carefully and drew close to her just in time to hear her sigh deeply.

 Mahendra jested, ‘Oh paragon of mercy, do not waste your feelings for imaginary people. What are you reading?’

 Startled, Binodini got up hurriedly and hid the book in her clothes. Mahendra tried to take it from her by force. After much struggling, he got hold of the book and read its title – ‘The Poison Tree’. Binodini panted with the exertions and turned her face from him in anger.

 Mahendra’s heart was filled with emotions. He smiled with a great effort and said, ‘Shame! This is nothing! I thought it would be some great secret that I was wresting from you. ‘The Poison Tree’ after all that!’

Binodini answered, ‘What great secret could I possibly have?’

 Mahendra burst out, ‘Suppose, it had been a letter from Bihari?’

Binodini’s eyes flashed angrily like lightning. Her gentle mood was gone in an instant and she stood up straight as a flame. Mahendra grabbed her hand and entreated, ‘Forgive me, forgive my jest!’

 Binidini snatched her hand away forcefully, saying, ‘Who are you jesting about? If you were even worthy of his friendship, I could have borne your jests. But you have a narrow mind without the strength to sustain a friendship and yet you think you may jest!’

 As she tried to leave, Mahendra circled her feet with his arms and prevented her from moving.

A shadow fell across them and he let go of her feet, looking up to see Bihari.

 Bihari’s constant gaze chastised both as he said calmly, ‘I can see that I have come at the wrong time, but I will not stay for long. I came to say but one thing. I went to Kashi without knowing that your wife was there. I wronged her unknowingly but as there is no time to beg her forgiveness, I am here to beg yours. If I have ever allowed any impure thoughts to dwell within me with or without my knowledge, I implore you that she never be blamed for that.’

Mahendra was furious at being suddenly found out by Bihari. This was not his time to be generous.

He smiled a little and said, ‘The story about someone eating bananas in the temple seems to suit your situation. I have neither asked you to admit you are at fault or to deny it; then why are you trying to redeem yourself by begging to be pardoned?’

 Bihari stood there for a while like a statue – then his lips trembled when he tried to speak. Binodini now spoke out, ‘Bihari, do not answer these words. Say nothing, Whatever this man is saying blackens him alone, it does not touch you at all.’

 I doubt that Bihari heard a word of what Binodini said – for he began descending the stairs like a sleep walker.

Binodini followed him and said, ‘Bihari, do you have nothing to say to me? If you have harsh words, say them.’

 Seeing that Bihari was not listening to her, Binodini held his right hand with both of hers to try and stop him. He shook her off with immense hatred and did not look back to see that she fell down when he pushed her away.

 Mahendra heard the sound of her fall and came rushing to see that she was bleeding from a cut near her left elbow.

He ripped a piece from his own shirt and prepared to bind the cut saying, ‘This is a deep cut.’

Binodini quickly moved her arm away and said, ‘It is nothing, let it bleed.’

Mahendra said, ‘Let me give you a medicine after bandaging it, then it will not hurt so much and will heal quickly.’

Binodini moved away, ‘I do not want to get better, let this pain be mine.’

 Mahendra persisted, ‘I have insulted you in front of others today, will you be able to forgive me?’

 Binodini asked, ‘Why ask for forgiveness? You have done the right thing. Do I fear people? I heed no one. Are those who push me away and leave me, the ones I must care for, and the one who clings to my feet be of no consequence to me?’

 Mahendra, maddened with feeling, said, ‘Binodini, so you will not spurn my love?’

 Binodini answered, ‘I will worship your love. I have not had so much affection that I can afford to turn it away, saying ‘I do not want this.’

Mahendra held her hands in his and said, ‘Then come to my room. I have hurt you today and you too have hurt me – I cannot be happy until I have erased those memories.’

 Binodini: Not today. Let me be today. If I have hurt you, forgive me.

Mahendra: You must forgive me too. Else I will not be able to sleep.

Binodini said, ‘I have forgiven you.’

Mahendra was eager to receive some immediate proof of Binodini’s forgiveness and love, But he could not say anything when he looked at her face. She went downstairs while he climbed up to the terrace where he walked about. He was feeling a sense of freedom at being discovered by Bihari. There is a kind of shame in secrecy and that seemed to have been greatly removed by his unveiling. He told himself, ‘I do not want to pretend to be good but it is no lie that I love someone else.’ He was so emboldened with his pride in being in love that he rejoiced in the knowledge of his own wrong doing. He threw a wordless challenge at the vast universe that lay above him with its stars and constellations and said, ‘No matter what evil people think I am capable of, I am in love.’ His thoughts of Binodini’s gradually drowned out the sky and the world and even his responsibilities. It was as if Bihari had come and tipped over the tightly sealed ink well of Mahendra’s life – the darkness of Binodini’s eyes and her hair seemed to obliterate all the clarity of his past existence and wipe out all that had happened earlier.

বিপুল তরঙ্গ রে/Bipulo tawrongo re/ Hail this great wave

opera-fair-discover-your-inner-light-86

 

 

বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে।
সব গগন উদ্‌বেলিয়া– মগন করি অতীত অনাগত
আলোকে-উজ্জ্বল জীবনে-চঞ্চল একি আনন্দ-তরঙ্গ ॥
তাই, দুলিছে দিনকর চন্দ্র তারা,
চমকি কম্পিছে চেতনাধারা,
আকুল চঞ্চল নাচে সংসারে, কুহরে হৃদয়বিহঙ্গ ॥

 

Bipulo tawrongo re, bipulo tawrongo re.

Shawbo gawgawno udbeliya – mawgon kori oteeto awnagoto

Aalokey-ujjwalo jeeboney-chawnchawlo eki anondo tawrongo.

Tai, dulicche dinokawro chandro tara,

Chawmoki kompicche chetonadhara,

Akulo chawnchawlo naache shongsharo, kuhawre hridoyobihongo.

 

 

Hail this great wave!
That stirs the skies and enfolds both past and future within itself
What wave of happiness is this, glowing with light and life?
This is why the sun moves along with companion moon and stars,
My consciousness quivers in joyous response,
The universe dances in unison, the bird in my soul singing along in exultation.

 

Follow the links:

 

Kanika Bandopadhyay:

Sounak Chattopadhyay: