Tag Archive | Stories from Lipika

বাণী /Bani/ A Message

বাণী

 

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব’লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।

 

তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই– আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।

 

কিন্তু, কোন দেবতার কৌতুকহাস্যের মতো অপরিমিত চঞ্চলতা নিয়ে আমাদের পাড়ায় ঐ ছোটো মেয়েটির জন্ম। মা তাকে রেগে বলে ‘দস্যি’, বাপ তাকে হেসে বলে ‘পাগলি’।

 

সে পলাতকা ঝরনার জল, শাসনের পাথর ডিঙিয়ে চলে। তার মনটি যেন বেণুবনের উপরডালের পাতা, কেবলই ঝির্‌ ঝির্‌ করে কাঁপছে।

 

 

আজ দেখি, সেই দুরন্ত মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙে ভর দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে, বাদলশেষের ইন্দ্রধনুটি বললেই হয়। তার বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ আজ অচঞ্চল, তমালের ডালে বৃষ্টির দিনে ডানাভেজা পাখির মতো।

 

ওকে এমন স্তব্ধ কখনো দেখি নি। মনে হল, নদী যেন চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে সরোবর হয়েছে।

 

 

কিছুদিন আগে রৌদ্রের শাসন ছিল প্রখর; দিগন্তের মুখ বিবর্ণ; গাছের পাতাগুলো শুকনো, হলদে, হতাশ্বাস।

 

এমন সময় হঠাৎ কালো আলুথালু পাগলা মেঘ আকাশের কোণে কোণে তাঁবু ফেললে। সূর্যাস্তের একটা রক্তরশ্মি খাপের ভিতর থেকে তলোয়ারের মতো বেরিয়ে এল।

 

অর্ধেক রাত্রে দেখি, দরজাগুলো খড়্‌খড়্‌ শব্দে কাঁপছে। সমস্ত শহরের ঘুমটাকে ঝড়ের হাওয়া ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে দিলে।

 

উঠে দেখি, গলির আলোটা ঘন বৃষ্টির মধ্যে মাতালের ঘোলা চোখের মতো দেখতে। আর, গির্জের ঘড়ির শব্দ এল যেন বৃষ্টির শব্দের চাদর মুড়ি দিয়ে।

 

সকালবেলায় জলের ধারা আরও ঘনিয়ে এল, রৌদ্র আর উঠল না।

 

 

এই বাদলায় আমাদের পাড়ার মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে।

 

তার বোন এসে তাকে বললে, ‘মা ডাকছে।’ সে কেবল সবেগে মাথা নাড়ল, তার বেণী উঠল দুলে; কাগজের নৌকো নিয়ে তার ভাই তার হাত ধরে টানলে। সে হাত ছিনিয়ে নিলে। তবু তার ভাই খেলার জন্যে টানাটানি করতে লাগল। তাকে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলে।

 

 

বৃষ্টি পড়ছে। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এল। মেয়েটি স্থির দাঁড়িয়ে।

 

আদিযুগে সৃষ্টির মুখে প্রথম কথা জেগেছিল জলের ভাষায়, হাওয়ার কণ্ঠে। লক্ষকোটি বছর পার হয়ে সেই স্মরণবিস্মরণের অতীত কথা আজ বাদলার কলস্বরে ঐ মেয়েটিকে এসে ডাক দিলে। ও তাই সকল বেড়ার বাইরে চলে গিয়ে হারিয়ে গেল।

 

কত বড়ো কাল, কত বড়ো জগৎ, পৃথিবীতে কত যুগের কত জীবলীলা! সেই সুদূর, সেই বিরাট, আজ এই দুরন্ত মেয়েটির মুখের দিকে তাকালো মেঘের ছায়ায়, বৃষ্টির কলশব্দে।

 

ও তাই বড়ো বড়ো চোখ মেলে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল, যেন অনন্তকালেরই প্রতিমা।

 

A Message

1
The clouds descend as drops of rain, to surrender to the earth. Just as women come to earth to be caught.

They do not need much more than a  little space and a few people to feel happy about the world. And they fill that tiny space with their words, their pains and their thoughts. That is why their heads are veiled, bangles tinkle about their arms and their courtyards are fenced. They are the queens within their little heavens.

Some heavenly being surely came to play on earth through that girl, with her unceasing activity. Her mother calls her a bandit when she is angry, her father smiles and calls her his mad one.

She flows merrily like a waterfall and trips over all obstacles and restrictions. Her mind is like the leafy tips atop a bamboo grove, always rippling with thoughts.

 

2

Today I saw that lively child standing all quiet, leaning on the railings of the verandah, as subdued as a rainbow at the end of the rainy season. Her large dark eyes were still today, like a rain drenched bird in pensive rest upon the branches of the Tamal.

I had never seen her being silent like this. It was as though a river had been made to pause suddenly and a lake had formed.

 

3

A few days ago, the sun had beaten down with great intensity. The horizon sulked, the leaves on the trees were dry and yellow with despair.

Suddenly a dark ill-mannered cloud filled the sky, covering it in all directions like a tent. A blood red beam of sunshine emerged like a blade from a scabbard.

At midnight I woke to find all the doors shaking and rattling. The storm and the winds had taken the sleeping city by the hair and shaken it awake.

I rose and found the streetlight staring back at me through the driving rain like a bleary eye drunk. The church bell rang, its sound muffled by the rain as though smothered in a blanket.

In the morning the rain grew heavier and the sun did not come up.

4

And amid the rain that girl stood, quiet by the railings of the verandah.
Her sister came and called her saying, ‘Mother wants you.’ She only shook her head vigorously, her plaits moving. Her brother came with a paper boat and pulled her by the hand. But she pulled back. He still kept asking her. She slapped him back.

 

5

It is raining. The darkness grows. The girl stands, quiet.

In the ancient times, the first sounds heard on the lips of creation emerged from the language spoken by water and the voices that are carried on the wind. Those half forgotten words traversed the millennia and stirred the heart of the girl. That was why she had escaped to where no fences could hold her back.

Vast is the ocean of time and vast this world and innumerable the things that have happened to this earth through all that time. That vast distance had spoken to the girl today through cloud shadow and rain murmur.

And so she stood and listened, her large eyes silent, like a deity that has ruled since eternity.

 

 

Advertisements

মেঘদূত/Meghduut/The Cloud Messenger

মেঘদূত

 

মিলনের প্রথম দিনে বাঁশি কী বলেছিল।

 

সে বলেছিল, ‘সেই মানুষ আমার কাছে এল যে মানুষ আমার দূরের।’

 

আর, বাঁশি বলেছিল, ‘ধরলেও যাকে ধরা যায় না তাকে ধরেছি, পেলেও সকল পাওয়াকে যে ছাড়িয়ে যায় তাকে পাওয়া গেল।’

 

তার পরে রোজ বাঁশি বাজে না কেন।

 

কেননা, আধখানা কথা ভুলেছি। শুধু মনে রইল, সে কাছে; কিন্তু সে যে দূরেও তা খেয়াল রইল না। প্রেমের সে আধখানায় মিলন সেইটেই দেখি, যে আধখানায় বিরহ সে চোখে পড়ে না, তাই দূরের চিরতৃপ্তিহীন দেখাটা আর দেখা যায় না; কাছের পর্দা আড়াল করেছে।

 

দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।

 

সেই আমাদের মাঝের আকাশটি আঁধিতে ঢেকেছে, প্রতি দিনের কাজে কর্মে কথায় ভরে গিয়েছে, প্রতি দিনের ভয়ভাবনা-কৃপণতায়।

***

The Cloud Messenger

1

What did the flute say on the first day of union?

It said, ‘The one who was once distant has now come near.’

And, it said, ‘The one who may not be bound by bonds has been caught, the one who is beyond all capture even when caught has been found.’

Then why does the flute no longer play each day.

Because I have forgotten half of what I had to say. All I remember is that the beloved is near; but the vast distance that still parts us no longer bothers me. I only see that part of love where one meets the beloved, I ignore the part where there is separation and that is why I fail to see the unfulfilled in the gaze of the distant; proximity has curtained it from me.

The endless sky that lies between two people is always silent, that space is not for words. That vast silence must be filled with flute song. The flute cannot play without the freedom of the infinite sky.

That sky that lies between us is often obscured by dust storms, the daily business of words and tasks and shrouded by the miserliness that is companion to mundane doubts and fears.
 

 

 

এক-একদিন জ্যোৎস্নারাত্রে হাওয়া দেয়; বিছানার ‘পরে জেগে ব’সে বুক ব্যথিয়ে ওঠে; মনে পড়ে, এই পাশের লোকটিকে তো হারিয়েছি।

 

এই বিরহ মিটবে কেমন করে, আমার অনন্তের সঙ্গে তার অনন্তের বিরহ।

 

দিনের শেষে কাজের থেকে ফিরে এসে যার সঙ্গে কথা বলি সে কে। সে তো সংসারের হাজার লোকের মধ্যে একজন; তাকে তো জানা হয়েছে, চেনা হয়েছে, সে তো ফুরিয়ে গেছে।

 

কিন্তু, ওর মধ্যে কোথায় সেই আমার অফুরান একজন, সেই আমার একটিমাত্র। ওকে আবার নূতন করে খুঁজে পাই কোন্‌ কূলহারা কামনার ধারে।

 

ওর সঙ্গে আবার একবার কথা বলি সময়ের কোন্‌ ফাঁকে, বনমল্লিকার গন্ধে নিবিড় কোন্‌ কর্মহীন সন্ধ্যার অন্ধকারে।

***

The Cloud Messenger
2

Some times the wind grows strong on a full moon night; the heart pines for something as one wakes up; and I remember, the one who lies beside is already lost to me.

How will this separation be overcome, this that divides my eternal from his.

Who is this that I speak with after returning from work at day’s end? That is but one among the thousands on this earth; I have learned him and known him, that is done with.

But where within is the one without end, the one who is mine alone. Where will I discover him anew, led by what desire.

Where will I find the time to talk to him again, on an indolent evening perfumed and heavy with jasmine.

 

বিদূষক/ Bidushak/The King’s Jester

বিদূষক

কাঞ্চীর রাজা কর্ণাট জয় করতে গেলেন। তিনি হলেন জয়ী। চন্দনে, হাতির দাঁতে, আর সোনামানিকে হাতি বোঝাই হল।

দেশে ফেরবার পথে বলেশ্বরীর মন্দির বলির রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে রাজা পুজো দিলেন।

পুজো দিয়ে চলে আসছেন– গায়ে রক্তবস্ত্র, গলায় জবার মালা, কপালে রক্তচন্দনের তিলক; সঙ্গে কেবল মন্ত্রী আর বিদূষক।

এক জায়গায় দেখলেন, পথের ধারে আমবাগানে ছেলেরা খেলা করছে।

রাজা তাঁর দুই সঙ্গীকে বললেন, ‘দেখে আসি, ওরা কী খেলছে।’

ছেলেরা দুই সারি পুতুল সাজিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলছে।

রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার সঙ্গে কার যুদ্ধ।’

তারা বললে, ‘কর্ণাটের সঙ্গে কাঞ্চীর।’

রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার জিত, কার হার।’

ছেলেরা বুক ফুলিয়ে বললে, ‘কর্ণাটের জিত, কাঞ্চীর হার।’

মন্ত্রীর মুখ গম্ভীর হল, রাজার চক্ষু রক্তবর্ণ, বিদূষক হা হা ক’রে হেসে উঠল।

রাজা যখন তাঁর সৈন্য নিয়ে ফিরে এলেন, তখনো ছেলেরা খেলছে।

রাজা হুকুম করলেন, ‘এক-একটা ছেলেকে গাছের সঙ্গে বাঁধো, আর লাগাও বেত।’

গ্রাম থেকে তাদের মা-বাপ ছুটে এল। বললে, ‘ওরা অবোধ, ওরা খেলা করছিল, ওদের মাপ করো।’

রাজা সেনাপতিকে ডেকে বললেন, ‘এই গ্রামকে শিক্ষা দেবে, কাঞ্চীর রাজাকে কোনোদিন যেন ভুলতে না পারে।’

এই বলে শিবিরে চলে গেলেন।

সন্ধেবেলায় সেনাপতি রাজার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। প্রণাম করে বললে, ‘মহারাজ, শৃগাল কুকুর ছাড়া এ গ্রামের কারো মুখে শব্দ শুনতে পাবে না।’

মন্ত্রী বললে, ‘মহারাজের মান রক্ষা হল।’

পুরোহিত বললে, ‘বিশ্বেশ্বরী মহারাজের সহায়।’

বিদূষক বললে, ‘মহারাজ, এবার আমাকে বিদায় দিন।’

রাজা বললেন, ‘কেন।’

বিদূষক বললে, ‘আমি মারতেও পারি নে, কাটতেও পারি নে, বিধাতার প্রসাদে আমি কেবল হাসতে পারি। মহারাজের সভায় থাকলে আমি হাসতে ভুলে যাব।’

king

The Jester

1

The king of Kanchi went to war against Karnat. After his victory he ordered his elephants to be loaded with sandalwood, ivory and precious gold from the vanquished kingdom.

On the way back to his lands, in gratitude he washed the very stones of the temple of the goddess Baleswari with blood from the sacrifices he made in her honour.

As he left the temple dressed in blood red silk, he wore marigolds around his neck and red sandalwood paste on his brow. With him were only two companions, his minister and his jester.

At one place by the road, there were boys playing in a grove of mango trees.

To his companions the king said, ‘Let me go and see what they are playing.’

2

The boys had arranged their toy soldiers in two rows and were playing at war.

The king asked, ‘Who fights with whom?’

They answered, ‘Karnat fights Kanchi.’

The king asked, ‘Who wins, and who is it that loses?’

The boys puffed their chest out in pride and said, Karnat wins, Kanchi loses.’

The minister grew sombre and the king’s eyes reddened with rage but the jester roared with laughter.

3

When the king came back from war with his army, the boys were still playing.

He ordered, ‘Tie each of them to a tree and have them caned.’

Their parents came running from the village. They wept, ‘These were innocents at play, please, forgive them!’

The king summoned his general and said, ‘Teach this village such a lesson that they never forget who the King of Kanchi is.’

He then went back to the camp to rest.

4

In the evening the general of the king’s armies stood before him, bowed his head and announced, ‘Oh King! You may go where you wish, for there is no other sound in the village tonight, but the barking of dogs and jackals.’

The minister declared, ‘The king’s honour has been upheld.’

The priest cackled, ‘The goddess is the king’s savior.’

The jester said, ‘Oh King! Give me permission now to leave.’

The king asked, ‘But why?’

The jester said, ‘I know little about hitting hard and even less about cutting down; by the grace of God all I know is how to laugh. But if I have to stay in this court I will certainly forget how to do even that!’

**

This and the other stories of Lipika were written in 1922.