ক্ষীরের পুতুল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul, Abanindranath Thakur

ক্ষীরের পুতুল

এক রাজার দুই রানী দুও আর সুও। রাজবাড়িতে সুওরানীর বড় আদর, বড় যত্ন। সুওরানী সাতমহল বাড়িতে থাকেন। সাতশো দাসী তাঁর সেবা করে,পা ধোয়ায়, আলতা পরায়, চুল বাঁধে । সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুল, সেই ফুলে সুওরানী মালা গাঁথেন । সাত সিন্দুকে-ভরা সাত-রাজার-ধন মানিকের গহনা, সেই গহনা অঙ্গে পরেন। সুওরানী রাজার প্রাণ !

আর দুওরানী– বড়োরাণী, তাঁর বড়ো অনাদর, অযত্ন। রাজা বিষ নয়নে দেখেন। একখানি ঘর দিয়েছেন– ভাঙাচোরা ।এক দাসী দিয়েছেন– বোবা-কালা । পরতে দিয়েছেন জীর্ণ শাড়ি, শুতে দিয়েছেন ছেঁড়া কাঁথা। দুওরানীর ঘরে রাজা একটি দিন আসেন একবার বসেন, একটি কথা কয়ে উঠে যান।
সুওরানী—ছোটোরানী, তাঁরই ঘরে রাজা বারোমাস থাকেন ।

একদিন রাজা রাজমন্ত্রীকে ডেকে বললেন–মন্ত্রী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তুমি জাহাজ সাজাও। রাজার আজ্ঞায় রাজমন্ত্রী জাহাজ সাজাতে গেলেন । সাতখানা জাহাজ সাজাতে সাত মাস হয়ে গেল। ছ’খানা জাহাজে রাজার চাকর-বাকর যাবে, আর সোনার চাঁদোয়া-ঢাকা সোনার জাহাজে রাজা নিজে যাবেন। মন্ত্রী এসে খবর দিলেন—মহারাজ জাহাজ প্রস্তুত।

রাজা বললেন— কাল যাব।
মন্ত্রী ঘরে গেলেন।

ছোটো রানী — সুওরানী রাজ-অন্তঃপুরে সোনার পালঙ্কে শুয়েছিলেন, সাত সখী সেবা করছিল, রাজা সেখানে গেলেন। সোনার পালঙ্কে মাথার শিয়রে বসে আদরের ছোটোরানীকে বললেন—রানী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তোমার জন্য কী আনব ?

রানী ননীর হাতে হীরের চুড়ি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বললেন,—হীরের রঙ বড়ো শাদা, হাত যেন শুধু দেখায় । রক্তের মতো রাঙা আট-আট গাছা মানিকের চুড়ি পাই তো পরি।
রাজা বললেন—আচ্ছা রানী, মানিকের দেশ খেকে মানিকের চুড়ি আনব ।

রানী রাঙা-পা নাচিয়ে-নাচিয়ে, পায়ের নূপুর বাজিয়ে-বাজিয়ে বললেন—এ নূপুর ভালো বাজে না । আগুনের বরন নিরেট সোনার দশ গাছা মল পাই তো পরি।
রাজা বললেন—সোনার দেশ থেকে তোমার পায়ের সোনার মল আনব ।

রানী গলার গজমতি হার দেখিয়ে বললেন—দেখ রাজা, এ মুক্তো বড়ো ছোটো, শুনেছি কোন দেশে পায়রার ডিমের মতো মুক্ত আছে, তারি এক ছড়া হার এনো । রাজা বললেন—সাগরের মাঝে মুক্তোর রাজ্য, সেখান থেকে গলার হার আনব । আর কী আনব রানী ?

তখন আদরিনী সুওরানী সোনার অঙ্গে সোনার আঁচল টেনে বললেন— মা গো, শাড়ি নয় তো বোঝা ! আকাশের মতো নীল, বাতাসের মতো ফুরফুরে, জলের মতো চিকন শাড়ি পাই তো পরে বাঁচি।

রাজা বললেন—আহা, আহা, তাই তো রানী, সোনার আঁচলে সোনার অঙ্গে ছড় লেগেছে, ননীর দেহে ব্যথা বেজেছে। রানী হাসি মুখে বিদায় দাও, আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন শাড়ি আনিগে।
ছোট রানী হাসি মুখে রাজাকে বিদায় করলেন।
রাজা বিদায় হয়ে জাহাজে চড়বেন— মনে পড়ল দুঃখিনী বড়োরানীকে। দুওরানী—বড়োরাণী ভাঙা ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কাঁদছেন, রাজা সেখানে এলেন । ভাঙা ঘরের ভাঙা দুয়ারে দাড়িয়ে বললেন- বড়োরাণী, আমি বিদেশ যাব । ছোটোরানীর জন্য হাতের বালা, গলার মালা, পায়ের মল, পরনের শাড়ি আনব। তোমার জন্যে কী আনব? বলে দাও যদি কিছু সাধ থাকে।

রানী বললেন—মহারাজ, ভালোয় ভালোয় তুমি ঘরে এলেই আমার সকল সাধ পূর্ণ হয় । তুমি যখন আমার ছিলে তখন আমার সোহাগও অনেক ছিল, সাধও অনেক ছিল। সোনার শাড়ি অঙ্গে পড়ে সাতমহল বাড়িতে হাজার হাজার আলো জ্বালিয়ে সাতশো সখীর মাঝে রানী হয়ে বসবার সাধ ছিল, সোনার পিঞ্জরে শুক-শারীর পায়ে সোনার নূপুর পড়িয়ে দেবার সাধ ছিল। মহারাজ, অনেক সাধ ছিল। অনেক সাধ মিটেছে। এখন আর সোনার গহনায়, সোনার শাড়িতে কি কাজ ? মহারাজ, আমি কার সোহাগে হীরের বালা হাতে পরব ? মোতির মালা গলায় দেব ? মানিকের সিঁথি মাথায় বাঁধব ? মহারাজ, সেদিন কি আর আছে ! তুমি সোনার গহনা দেবে, সে সোহাগ তো ফিরে দেবে না! আমার সে সাতশো দাসী সাতমহল বাড়ি তো ফিরে দেবে না! বনের পাখি এনে দেবে, কিন্তু মহারাজ, সোনার খাঁচা তো দেবে না! ভাঙা ঘরে সোনার গহনা চোর-ডাকাতে লুটে নেবে, ভাঙা খাঁচায় বনের পাখি কেন ধরা দেবে? মহারাজ, তুমি যাও, যাকে সোহাগ দিয়েছ তার সাধ মেটাও গে, ছাই সাধে আমার কাজ নেই।
রাজা বললেন— না রানী, তা হবে না, লোকে শুনলে নিন্দে করবে। বল তোমার কি সাধ? রানী বললেন— কোন লাজে গহনার কথা মুখে আনব? মহারাজ আমার জন্য পোড়ামুখ একটা বাঁদর এনো।
রাজা বললেন — আচ্ছা রানী, বিদায় দাও।
তখন বড়রানী — দুয়োরানী ছেঁড়া কাঁথায় লুটীয়ে পড়ে কাঁদতে-কাঁদতে রাজা গিয়ে জাহাজে চড়লেন।

1393157873

Kheerer Putul

There was once a king who had two queens, Duyo, the sad queen and Shuyo, the happy queen. Shuyorani lives in the palace surrounded by much love and great comfort. Shuyorani lives in the palace with the seven floors. Seven hundred maids look after her every need, they wash her feet and paint them with red dye and do her hair. Shuyorani makes garlands from flowers she selects from seven baskets filled from seven gardens. She wears the jewels that the king has chosen from the treasures of the seven kings and stored in seven great chests. Shuyorani is the queen of the king’s heart.

Duyorani is the older of the queens, but she lives in great neglect. The king hates her. He has given her one room to stay in but it is falling to pieces. For her, he has hired one maid but she is both deaf and mute. He has given her an old sari to wear and a tattered quilt to lie on. He comes to her but once a month, sits but for a little while and says but one word.
Shuyorani is the younger queen, the king spends the whole year in her rooms.

One day the king called his minister and said, ‘Minister, I wish to go and see the countries of the world, get my ships ready.’ The minister went off to do this. It took seven months to get the seven ships ready. Six of the ships were for the king’s horses and the king’s men, the golden ship with the golden sails was for the king himself.

The minister came and said, ‘Oh King! The ship is ready!’
The king answered, ‘Then we must leave tomorrow.’
The minister went home that day.

The younger queen Shuyorani was lying on her golden bed in the bed chambers while seven ladies-in-waiting tended to her; the king went there. He sat at the head of the golden bed and asked his beloved junior queen, ‘Rani, I am going to faraway lands, what shall I bring back for you?’

The queen moved her milk white arms and looked at her diamond encrusted bangles, saying, ‘Diamonds are so very white, I can barely see them against my arms. If you bring me eight pairs of bracelets studded with blood red rubies , I would wear them and be pleased.’
The king promised, ‘That will be done, I will bring you the ruby bracelets from the land of rubies.’

The queen then tapped her little feet and made her anklets ring out, saying, ‘These anklets do not make a pretty sound. If you bring me ten pairs anklets of solid gold the colour of fire, I would wear them and be pleased.’
The king promised, ‘I will bring you golden anklets from the land of gold.’

The queen played with her necklace of ivory pearls and said, ‘See my king how small these pearls are! I have heard of pearls that are as big as a pigeon’s egg, bring me a strand of those.’
The king promised, ‘There is a kingdom of pearls in the centre of all the seas, I will bring you a strand from the markets there. What else can I bring for you, my queen?’

The beloved queen then drew her golden veil over her golden body and said, ‘How I hate this heavy fabric! If you bring me a sari as blue as the skies, as light as the breeze and as silken as water, I would wear it and be pleased.’

The king said, ‘Sorry, I had not thought of this! The golden sari has scratched you pale gold skin and pained your milky white limbs. Smile at me as I leave, for I go to bring you a sari as blue as the sky, as light as the breeze and as soft as water.’
The younger queen smiled in delight and said farewell to the king.

Just as the king was about to board the ship, he remembered the neglected older queen. He came to where she was, wrapped in her tattered quilt, weeping in her room that was falling to pieces. He stood on the crumbling threshold of that room and said, ‘Queen, I am going on a journey. I shall bring bracelets, necklaces, anklets and saris for the younger queen. What can I bring for you? Tell me if you have any special wishes.’

The queen said, ‘My king, all my wishes will come true if you come back safe and sound. When you were mine and mine alone, I had much love and many wishes. I wished to live as a queen in a house with seven floors, tended by seven hundred maids, as a thousand lamps shone upon my golden sari. I wished to keep a pair of Shuk and Shari birds in a golden cage and shackle their feet with golden chains. My king, I had many wishes once upon a time. Many of them have been fulfilled. What will I do now, with golden necklaces and saris? Whose love will I rejoice in as I show off my diamond bracelets on my arms or the pearls around my throat? Who will look upon me as I place rubies in my hair? My king, those days are long gone. You may give me jewels but you will not give me your love! You will not return me to that house with its seven floors or the seven hundred maids! You will bring a bird from the forests but not the golden cage for it to live in! My jewels will fall to thieves and robbers in this room and the bird will not want to stay in a broken cage! My king, go to the one who has your love, for I have no wishes any more.’

The king answered, ‘No! That cannot be, for people will say I have wronged you. Tell me what you wish for.’

The queen said, ‘How can I ask for jewels when I cannot have you? Bring me a monkey instead.’
The king said, ‘That is what I will do, now bid me farewell.’

The older queen then fell back on her tattered quilt and wept. The king went away and boarded his ship.

Advertisements

2 thoughts on “ক্ষীরের পুতুল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Kheerer Putul, Abanindranath Thakur

Comments are closed.